Monday, 16 August 2021

প্রদীপের নিচে অন্ধকার

যদিও জনমোহিনী সামাজিক প্রকল্পই এখন রাজনীতি

সোমনাথ গুহ


গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রথম যখন 'দুয়ারে সরকার' প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তখন বিজেপির বঙ্গ বিজয়ের অভিলাষ তুঙ্গে। প্রচুর অর্থ, প্রচার, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সীমাহীন প্রশ্রয়ে বলীয়ান, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এই দল ব্যঙ্গ করে বলেছিল- যমের দুয়ারে সরকার। আজ সাত মাস বাদে আমরা এক উলটপুরাণ প্রত্যক্ষ করছি: প্রবল প্রত্যাশা জাগিয়ে দুয়ারে সরকার ২.০ যখন শুরু হচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলায় চমকপ্রদ সাফল্যের পর দিল্লি, ত্রিপুরায় ডানা মেলার চেষ্টা করছে আর প্রবল গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে দীর্ণ রাজ্য বিজেপি দিশাহারা, নিজেদের ঘর সামলাতে রীতিমতো খাবি খাচ্ছে। রাজ্যের প্রধান বাম দল ভুল স্বীকার করেছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুদান-নির্ভর সামাজিক প্রকল্পগুলিকে ভিক্ষার ঝুলি বলা তাদের ভুল হয়েছিল; মানুষের কাছে ভুল বার্তা গেছে। তারা তো বটেই, অন্য বাম দলগুলিও দিশাহীন। কারণ, এটা পরিষ্কার যে এই প্রকল্পগুলি বিপুল সংখ্যক মানুষকে উপকৃত করেছে যার ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, মেহনতী মানুষের ওপর মুখ্যমন্ত্রী প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। হায়, যা ছিল এক সময় প্রধানত সিপিএম এবং অন্য বাম দলগুলির অটুট জনভিত্তি তাতে আজ তারা আর দাঁত ফোটাতে পারছে না।  

শুধুমাত্র সংখ্যার নিরিখেই এই প্রকল্পগুলির সাফল্য তাক লাগানো। প্রথম 'দুয়ারে সরকার' প্রকল্পে ৩২,৮৩০টি ক্যাম্প হয়েছিল যাতে ২ কোটি ৭৫ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। এক কোটি ৭৭ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ২০০০ বাদে বাকি সব মঞ্জুর হয়েছিল। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড পেয়েছেন ৮৫ লক্ষ মানুষ, জাতি শংসাপত্র পেয়েছেন ২২ লক্ষ,  'কৃষক বন্ধু' প্রকল্পে সাহায্য পেয়েছেন ৬২ লক্ষ মানুষ। 'পাড়ায় সমাধান' প্রকল্পে ১০,০০০ আবেদনের মধ্যে ৭৫০০ সমাধান হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ‘পাবলিক টু সিএম’, যে প্রকল্পে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে অভাব অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে গত দেড় বছরে ১২ লক্ষ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। মহিলাদের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে এই প্রকল্পগুলি, ভোটবাক্সে যার প্রতিফলন দেখা গেছে। বলা হচ্ছে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী'র মাধ্যমে তিনি ৪৮ শতাংশ মহিলার কাছে পৌঁছে গেছেন। গতবার ছিল বারোটা প্রকল্প, এবার হয়েছে আঠারোটা, যার মধ্যে আছে 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'এর মতো প্রকল্প যা ইতিমধ্যেই মহিলাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। আছে 'স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড' যার অপকারিতা সম্পর্কে বিদ্বজ্জনেরা জ্ঞান দিলেও গরিব ছাত্ররা কিন্তু এটাকে উচ্চশিক্ষার সোপান হিসাবে মনে করছে। 

কোনও সন্দেহ নেই, এই প্রকল্পগুলির ফলে মুখ্যমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে তিনি প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন। এই ধরনের জনমোহিনী রাজনীতি নতুন নয়, বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে তা বহু দিন ধরেই চালু আছে। সেই ১৯৬৭ সালে ডিএমকে'র প্রবল প্রতিপত্তিশালী প্রতিষ্ঠাতা সি এন আন্নাদুরাই  প্রথম এই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া শুরু করেছিলেন। তিনি দুঃস্থ মানুষদের এক টাকায় সাড়ে চার কিলো চাল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে ভোটে বাজিমাত করেছিলেন। ১৯৮২ সালে কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে এন টি রামা রাও অন্ধ্রপ্রদেশে রীতিমতো সাড়া জাগিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর জয়ের অন্যতম কারণ ছিল দু' টাকা কেজি চাল দেওয়ার  প্রতিশ্রুতি। এবারের তামিলনাড়ু নির্বাচনে ডিএমকে এক বছরের মাতৃত্ব ছুটি এবং মহিলাদের বাস ভাড়া মকুব করে দিয়ে তাদের বিপুল সমর্থন নিশ্চিত করেছে। মন্দির সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ, এমনকি তীর্থযাত্রার জন্য অর্থ দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংখ্যাগুরু মানুষদের তুষ্ট করেছে এবং হেলায় নির্বাচন জিতেছে। এগুলি হল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যার কিছু পূরণ হয়, অনেকটাই হয় না। গালভরা প্রতিশ্রুতির কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচনী ইস্তাহারগুলি হাস্যাস্পদ হয়ে দাঁড়ায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্পগুলি কিন্তু নিছক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়। তিনি জনমোহিনী রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন এনেছেন; তিনি এই প্রকল্পগুলিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, বছরে দুবার দুয়ারে সরকার হবে। এর অর্থ ১৮টি প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে প্রতিটা দিন চালু থাকবে। 

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সাধারণ মানুষের কাছে সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ব্যাপার যা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভোটের সময় তাদের প্রতিনিধিদের টিকিটা মাত্র দেখা যায়, তাই মানুষ ভাবেন এদের ওপর ভরসা করে লাভ নেই, নিজেকেই করে কম্মে খেতে হবে। অর্থাৎ, সরকার আর মানুষের মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় ফাঁক থাকে যা ভরাট হবার নয়। 'দুয়ারে সরকার' নামক কনসেপ্ট এই ফাঁক অনেকটা ভরাট করে দিচ্ছে, সরকারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসছে, মানুষ ভাবছে এটা আমাদেরই সরকার।   

মুদ্রার একটা পিঠ যদি এরকম ঝলমলে হয়, অন্য পিঠটা বিবর্ণ, অন্ধকার না হলেও মলিন। নার্সরা বেতন সমতার জন্য কয়েক বছর ধরে সোচ্চার, কোনও সমাধান নেই। তাঁদের দাবি মেটানোর জন্য আবার প্রায় ছয় মাস সময় চাওয়া হয়েছে। এসএসসি প্রার্থীরা পরীক্ষায় পাস করার পরেও ২০১৬ থেকে নিয়োগপত্রের আশায় বসে আছেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও নতুন সরকার এখনও অবধি তাঁদের সমস্যার কোনও সমাধান করে উঠতে পারেনি। ঝড় জলের মধ্যে তাঁরা অবস্থান করেছেন, পুলিশ মারধোর করে তাঁদের তুলে দিয়েছে, সরকার আদৌ তাঁদের নিয়োগ করতে আগ্রহী কিনা তাও এখনও পরিষ্কার না। গ্রুপ ডি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রায় ৫৮০টি পদ এখনও খালি রয়েছে, ১২০০ নাম ওয়েটিং লিস্টে রয়েছে কিন্তু এই শূন্য পদগুলি পূরণ করা হচ্ছে না। অনেক ঘটা করে ‘খেলা হবে’ দিবস হচ্ছে, ক্লাবগুলোকে লাখ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে, প্রচুর ফুটবল বিলি হচ্ছে, খেলাধুলোর কিছু উন্নতি হচ্ছে কী? ভারতীয় ফুটবল দলে বাঙালি খেলোয়াড় এখন দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয় অথচ এই বাংলাকে এক সময় ফুটবলের মক্কা হিসাবে গণ্য করা হত। অলিম্পিকে ছোট রাজ্যগুলি সাফল্য পাচ্ছে, বাংলার কেউ নেই। থাকবে কী করে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিকাঠামো নেই, অনুশীলন করতে অন্যত্র যেতে হয়। হকি খেলা তো উঠেই গেছে। অথচ এক সময় দেশের সেরা খেলোয়াড়রা কলকাতার মাঠে খেলে গেছেন। সেই ২০১৬ সালে একটা অ্যাস্ট্রো টার্ফ মাঠ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এখনও সেই প্রকল্প বিশ বাঁও জলে। প্রবাদপ্রতিম গুরুবক্স সিং চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। রাজ্যের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থাগুলো চাটুকারদের আখড়া, খেলাধুলোর উন্নতি করার কোনও আগ্রহই তাঁদের নেই।   

তাই, প্রদীপের তলায় অন্ধকার আছে। বাম দলগুলিকে শ্রেণি আন্দোলনে জোর দিতে হবে। 'কৃষক বন্ধু' প্রকল্পে শুধু যাঁদের জমি আছে তাঁরা টাকা পাচ্ছেন, এক একরের কম জমি থাকলে ৪০০০ টাকা, তার বেশি হলে ১০,০০০ টাকা। ভূমিহীন চাষি, ক্ষেতমজুরদের কী হবে? কৃষকদের নিয়ে তো চরম দ্বিচারিতা চলছে। দিল্লিতে সংগ্রামরত কৃষকদের আন্দোলনে সমর্থন জানাচ্ছি অথচ নিজের রাজ্যে মান্ডি প্রবল ভাবে অপ্রতুল, কৃষিপণ্যের ন্যূনতম দাম পাওয়া তো স্বপ্নের শামিল। এসব নিয়ে বামপন্থী কৃষক সংগঠনগুলিরও কোনও হেলদোল নেই, তারা ধর্মতলায় অবস্থান করেই সন্তুষ্ট। বাংলার কৃষকের কী সমস্যা সেটা নিয়ে তারা আদৌ ওয়াকিবহাল কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে! 

শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রের নয়া শ্রম বিধিও নাকি এই রাজ্যে লাগু হবে। সেটা হলে সর্বতোভাবে তার বিরোধিতা করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি নিয়ে লুকোচুরি চলছে। বলা হচ্ছে, ৬৩ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাঁরা কারা তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও ঘোষণা নেই। সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার জোরদার দাবি করতে হবে। যাঁরা ইউএপিএ ধারায় অভিযুক্ত তাঁদেরকে এই ধারা থেকে মুক্তি দিতে হবে; সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে এই রাজ্যে ইউএপিএ প্রয়োগ করা হবে না। বাংলায় ৯০ শতাংশ কৃষকের জমি দুই একরের কম। এখানে বহু বছর ধরে সরকারি ব্যবস্থা দুর্বল, এমএসপি প্রায় কেউই পায় না। এখানে মান্ডি ব্যবস্থা আরও প্রসারিত করতে হবে, কৃষক যাতে চাষের লাভজনক দাম পায় তা নিশ্চিত করতে হবে, অভাবী বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বাংলার মতো রাজ্যে সরকারকে চাষির স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। আক্রমণের বর্শামুখ অবশ্যই আরএসএস-বিজেপি মুখি হতে হবে। কিন্তু আবার হিন্দুত্ববাদীদের বিরোধিতার পুরো পরিসর তৃণমূলের হাতে ন্যস্ত করা যাবে না। তাহলে তো বাম দলগুলিকে হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হয়। মুখ্যমন্ত্রীর জনমোহিনী প্রকল্পগুলির সুবিধা যাতে মানুষ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে, একই সাথে বাম রাজনীতির ভিত নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।


Saturday, 14 August 2021

ভাবের ঘরে চুরি

দুটি বা একটি প্রশ্ন যা করতে পারি!

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


 

দু' চারটে বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি যেন এখনও কাটছে না। 

'বৃদ্ধতন্ত্রের' বিদায়?

বিগ মিডিয়া এবং বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, মূলত সিপিএম দলকে উদ্দেশ্য করে, যে এদের নেতারা সব বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং এই সাদা চুলের নেতৃত্বে পার্টিটা আর চলছে না, নবীন প্রজন্মকে এবার উঠিয়ে নিয়ে আসা উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বেই কিন্তু বৃদ্ধদের রমরমা! তাহলে সিপিএম'এর উদ্দেশ্যেই কথাটা কেন বারবার বলা? এটা আসলে এক ধরনের চাল। সিপিএম'এর সমস্যাটা যে নেতৃত্বে বৃদ্ধদের আধিক্য নয়, বরং তাদের চিন্তা-চৈতন্যের বার্ধক্য- তা বললে কেঁচো খুড়তে সাপ বেরতে পারে। তাই বহু প্রশ্ন ধামাচাপা দিতে বৃদ্ধদের বলির পাঁঠা করাই সাব্যস্ত ছিল। রাজনীতিতে এরকম কোনও নিদান নেই যে বৃদ্ধ হলে তার নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা চলে যাবে, অথবা, অল্পবয়সীদের নেতৃত্বে এনে বসিয়ে দিলেই তরতর করে সংগঠন এগোতে থাকবে ও চিন্তা-চেতনার দুনিয়া খুলে যাবে। 

আমরা যদি চারপাশে তাকাই, ধরুন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বে আজ যিনি আসীন ও দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর বয়স ৭০ পেরিয়েছে। তাঁর নিজ দলের সাফল্যের নিরিখে তিনি এখনও অত্যন্ত কুশলী এক রাজনৈতিক নেতা। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরও বয়স ৬৫ কি ৬৬। আমরা দেখব, ১৯৪২ সালে গান্ধীজী যখন 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৭২-৭৩। চীনে মাওজেদং'এর মৃত্যুর (১৯৭৬) পর গত শতকের ৮০-র দশকে দেংজিয়াওপিং'এর নতুন করে যখন পার্টির নেতৃত্বে অভিষেক হল তখন তাঁর বয়স ৮০'র কাছাকাছি। সেই দেং'ই কিন্তু চীনের অর্থনীতির গতিপথটাকে বদলে দিলেন। অথচ এঁদের বয়স নিয়ে কুতর্কগুলি ওঠেনি! বেশি বয়স হলেই কেউ অক্ষম হয়ে পড়বেন অথবা বয়স কম থাকলেই খুব সুস্থভাবে যথাযোগ্য নেতৃত্ব দেওয়া যাবে- এইরকম কোনও বিধি-বিধান কি কোথাও লিপিবদ্ধ আছে? তাহলে নানান টালবাহানার পর সিপিএম কার্যত তা মেনে নিল কেন? অবশ্যই দিশেহারা ও বিভ্রান্ত হয়ে। 

আর এই বিভ্রান্তি থেকেই বয়সের 'গোলযোগে' সিপিএম তাদের বিভিন্ন কমিটিতে সম্প্রতি নানারকম নিয়মেরও প্রবর্তন করে ফেলল। যেমন, ৭২ বছর হয়ে গেলে পাকাপাকি অবসর, ৬০ পেরিয়ে গেলে রাজ্য কমিটিতে নতুন অন্তর্ভুক্তি নয়, এরকম আরও বহু কিছু। ওরা কি এটা বুঝল না যে, মূলত বিগ মিডিয়ার তরফে আসলে তাদের রাজনৈতিক অসফলতাকে 'বৃদ্ধতন্ত্র' বলে হাসির খোরাক করা হয়েছিল! অন্ধ মানুষকে যেমন 'কানা' বলতে নেই (কারণ, সে ব্যক্তির অন্ধত্ব এক সক্ষমতা-বিশেষ), তেমনই বয়স্ক মানুষকে বৃদ্ধ বলে তাঁর সক্ষমতা-বিশেষকে উপহাস ও খর্ব করাও শিষ্টাচার নয়। একজন মানুষ ৭০ কি ৭৫ অথবা ৮০ বছর বয়সেও সক্ষম থাকতে পারেন। সকলের মনে না থাকতে পারে, কিন্তু সিপিএম ও অন্যান্য বামপন্থীদের নিশ্চয়ই খেয়াল আছে, জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৭৭ সালে যখন জনতা পার্টি তৈরি হয়, তার মূল উদ্যোক্তা ও সংগঠক ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, যার বয়স তখন মধ্য-৭০। 

আসলে সমস্যাটা অন্য জায়গায়- তরুণ বনাম বৃদ্ধ বিতণ্ডার সঙ্গে এগুলোর কোনও সম্পর্ক নেই। সমস্যাটা সমাজ-বাস্তবতাকে বোঝা, মানুষের সমস্যাগুলিকে উপলব্ধি করা, রাজনীতির জনগ্রাহ্য পথকে সাব্যস্ত করার মধ্যে নিহিত। এখানেই প্রায়-গোটা সিপিএম পার্টিটা কার্যত অক্ষম হয়ে পড়েছে। তরুণ-বৃদ্ধ-মধ্যবয়সী সকলে মিলে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিজনিত সমস্যার কারণেই তারা আজ এ রাজ্যে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষক অভ্যুত্থানকে তারা মোকাবিলা করেছিল টাটা'র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। অথচ, অশীতিপর বৃদ্ধ ও অবসরপ্রাপ্ত জ্যোতি বসু কিন্তু পার্টির এই খামতিটাকে খানিকটা হলেও বোধ করেছিলেন। সিঙ্গুরে টাটা'র দল যখন প্রথম জমি দেখতে যায় (২০০৬), তখন গ্রামের মহিলাদের তাড়া খেয়ে তাদের পালিয়ে আসার কথা শুনে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, 'কৃষক সভাকে না জানিয়ে টাটা'র দল ওখানে গেল কেন?' সেদিন জ্যোতিবাবুর এই কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে বোঝার ক্ষমতায় পার্টি ছিল না। তার মাশুল তারা এরপর দিয়েই গেছে; আজ এসে বিধানসভায় শূন্য আসন প্রাপ্তিতে খানিক বোধোদয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। 

তবে এ কথা তো ঠিক, একটি দল বা একটি আদর্শ অথবা একটি আন্দোলনের সার্থকতা নির্ভর করে তার পেছনে তরুণদের বিপুল সমাবেশকে ঘিরেই। অর্থাৎ, একটি আন্দোলন বা একটি সংগঠন তখনই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তার পেছনে তারুণ্যের জমায়েত দেখা যায়। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, অতএব, তরুণদের হঠাৎ করে এনে উচ্চতর নেতৃত্বে বসিয়ে দিতে হবে। কারণ, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, মতাদর্শ, রাজনৈতিক লাইন, সাংগঠনিক ক্ষমতা- নেতৃত্বের জন্য এগুলোর প্রাসঙ্গিকতাই সর্বাধিক। এই গুণসমূহ একজন তরুণ অথবা বৃদ্ধ উভয়ের মধ্যেই বিরাজ করতে পারে। তাই বয়স নয়, নেতৃত্বে আসতে হলে বিচার্য হওয়া উচিত প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক চিন্তার মিশেলে এক আস্থাভাজন, আবেগলব্ধ পরিণত মনস্কতা। বয়সের কোটা বেঁধে দিয়ে সিপিএম সম্ভবত আবারও এক যান্ত্রিক অভিসারে নিজেদের গলদঘর্ম করে তোলার আয়োজন করল।

শিক্ষার আতিশয্য!

অনুরূপ, আরও একটি ভাবের ঘরে চুরি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তা এই যে, গত দেড় বছর ধরে এখানে ও অন্যান্য রাজ্যেও করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে স্কুল-কলেজ সব বন্ধ হয়ে আছে। তা এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। 

লকডাউন উচিত কি উচিত নয়, অথবা শিথিল লকডাউনে সব কিছু খুলে গেলেও স্কুল-কলেজ না খোলাটা যথার্থ কিনা- এইসব তর্কে আপাতত যাচ্ছি না। আমার বলার কথা এই, এ রাজ্যে (এবং অন্যত্রও) গুটি কয়েক এলিট স্কুল-কলেজ বাদ দিলে প্রাক-করোনা সময়ে গত ২০-২৫ বছরে কোন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে সকলে জগৎ-সংসার উল্টে দিয়েছে? গত ৩০-৩৫ বছর ধরে সকলেই এ রাজ্যে দেখছেন, স্কুল-কলেজে নাম-রাখা আর উপস্থিতিটুকুই সার, বিকেলের খেলা বন্ধ রেখে রাত গড়িয়ে কোচিং সেন্টার আর টিউটোরিয়ালে ভীড় জমিয়ে নোট সংগ্রহ করে তবে ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফেরা। অর্থাৎ, টাকা গুনে দেওয়া একটা সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা জোরকদমে চলতে চলতে আজ এসে স্বাভাবিক এক ব্যবস্থাপনায় পরিণতি পেয়েছে। এ নিয়ে কারও কোনও খেদও দেখি না, আক্ষেপও নয়; যে কারণে অনার্স'এর ছাত্ররাও এখন কোচিং'এ অথবা শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে পয়সা দিয়ে আলাদা করে পরীক্ষা-পাসের নোট কিনে আনছে। 

এই জন্যই কি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে তেমন তাগিদ নেই? বামপন্থীদের বিভিন্ন গণসংগঠনগুলি তো রাস্তায় নেমে স্কুল-কলেজ খোলার দাবিতে সোচ্চার, কিন্তু ব্যাপক ছাত্র-ছাত্রীদের কেন এই প্রশ্নে তেমন হেলদোল নেই? এলিট স্কুল-কলেজগুলির ক্ষেত্রে না হয় বোঝা গেল, তাদের আধুনিক অনলাইন ব্যবস্থায় ও নানাবিধ প্রাযুক্তিক কৌশলে তারা উতরে যাচ্ছে। কিন্তু ৯০ শতাংশের ওপর সর্বজনীন স্কুল-কলেজগুলিতে তাহলে হচ্ছে টা কী? গোপনে পাড়ার কোচিং সেন্টার আর টিউটোরিয়াল খ্যাত শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সরাসরি নোট ক্রয়? গত ৩০-৩৫ বছর ধরে এই তো শিক্ষার মূলধারা! স্কুলে মাইনে দিতে হয় না কিন্তু কোচিং সেন্টারে হাজার হাজার টাকা গচ্ছা দিয়ে গরিব শ্রমজীবী ঘরের ছেলেমেয়েদের 'শিক্ষা' কিনতে ওষ্ঠাগত প্রাণ! প্রায় সকলের দুটো করে স্কুল- এক নং স্কুল, যেখানে নাম নথিবদ্ধ, শংসাপত্র মিলবে; দুই নং স্কুল, যেখানে আগত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর কিনতে পাওয়া যাবে। যদি এই ব্যবস্থাই চলে আর তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু না বলতে পারে, তবে আজ হঠাৎ 'শিক্ষা প্রাঙ্গণে শিক্ষার দাবি'তে (স্কুল-কলেজ খোলা) ছাত্র-ছাত্রীরা সোচ্চার হতে যাবে কেন?

'বৃহন্নলা ছিন্ন করো ছদ্মবেশ'। সমাজ বাস্তবতা এক আর আমাদের দাবি আরেক- তা জনতা শুনবে আর মানবেই বা কেন?


Thursday, 12 August 2021

কার হাতে আজ স্বাধীনতার পতাকা?

স্বাধীনতা সংগ্রামে নেই 

লাল কেল্লায় পতাকা উত্তোলনে আছি!

শোভনলাল চক্রবর্তী


বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাতে সঙ্ঘ পরিবারের অংশগ্রহণের যে কালিমালিপ্ত অধ্যায়, তা থেকে তাদের জাতীয়তাবাদী চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠার আগে কংগ্রেসের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে একবার জেলে গিয়েছিলেন (১৯২২) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যক্তিগত কৌঁসুলি নিয়োগ করে জেল থেকে ছাড়া পান। তিনি দ্বিতীয়বার জেলে যান ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দিয়ে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই আন্দোলনে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে যোগদান করেছিলেন এবং আরএসএস'কে যোগদান করতে বারণ করেছিলেন। তিনি পুস্তিকা প্রকাশ করে জানিয়ে দেন যে সঙ্ঘ সত্যাগ্রহে অংশ নেবে না, তবে ব্যক্তিগত ভাবে কেউ অংশ নিলে তাতে বাধা দেওয়া হবে না। 

আসলে, সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে জেলে গিয়ে হেডগেওয়ার জেলে বন্দি কংগ্রেসি নেতাদের সঙ্গে সঙ্ঘের ব্যাপারে আলোচনা করেন এবং ভবিষ্যতে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস নিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। সুতরাং, তিনি দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী হিসেবে জেলে যাননি, গিয়েছিলেন নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য। 

সঙ্ঘ প্রকাশিত ও অন্যান্য বহু দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটেও ইতিহাসবিদরা সঙ্ঘ পরিবারের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার কোনও নজির খুঁজে পাননি। ব্রিটিশ শাসকদের উৎখাত করা দূরে থাক, নিদেনপক্ষে তাদের বিরোধিতা করার কোনও নজিরও খুঁজে পাওয়া যায়নি। হেডগেওয়ার যে সব বক্তব্য রেখেছেন সেখানে রয়েছে শুধুই হিন্দু সংগঠনের কথা। ব্রিটিশ সরকার সম্বন্ধে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার চেয়ে তিনি অনেক বেশি মনোনিবেশ করেছেন হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতি রক্ষায়। কারণ, তিনি মনে করতেন যে হিন্দু সংস্কৃতি হল হিন্দুস্থানের প্রাণবায়ু। তাই হিন্দুস্থানকে রক্ষায় তিনি চেয়েছিলেন হিন্দু সংস্কৃতিকে পুষ্ট করতে। ব্রিটিশ শাসন বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হেডগেওয়ারের মতে ছিল এক অগভীর জাতীয়তাবাদ এবং তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনে কোনওমতেই যেন আরএসএস কর্মীরা যোগদান না করেন। কারণ, তাতে আরএসএস'এর অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। 

হেডগেওয়ারের পরবর্তী আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকরের অবস্থান আলাদা কিছু ছিল না। তাঁর সঙ্ঘের প্রধান হওয়ার (১৯৪০) দুই বছরের মধ্যে ঘটে ১৯৪২'এর 'ভারত ছাড়ো'র মতো উত্তাল আন্দোলন যাতে দেশের শ্রমিক-কৃষক সহ ব্যাপক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ঘটে। গোলওয়ালকর যে প্রচলিত অর্থে কোনও বিপ্লবী ছিলেন না তা ব্রিটিশরা খুব ভালো করে জানতেন। ১৯৪৩ সালে আরএসএস'এর কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি রিপোর্টে তৎকালীন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর লেখে, '১৯৪২-এর আগস্টে যে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল, সঙ্ঘ কর্তব্যপরায়ণতা দেখিয়ে তাতে অংশগ্রহণে বিরত ছিল।' শুধু ১৯৪২ নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের সমগ্র পর্যায়ে সঙ্ঘের কোনও ভূমিকা ছিল না। বরং তাদের মত ছিল, আন্দোলনগুলি জনসাধারণের ওপর অনেক মন্দ প্রভাব ফেলছে। আন্দোলনের ফলে ছেলেরা নাকি শৃঙ্খলাবোধ হারিয়ে ফেলেছে। ব্রিটিশ প্রণীত আইনে তিনি দোষের কিছু পাননি। ব্রিটিশ শাসনের দানবীয় আইন-কানুন ভারতের জনগণের উপর যে ভয়ঙ্কর নিপীড়ন ও অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল, সেই সব আইন-কানুনে গোলওয়ালকরের চিন্তিত না হওয়া নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ শাসকদের তৃপ্ত করেছিল। বিশেষ করে উত্তাল চল্লিশের দশকে প্রায় সমগ্র ভারত ভূখণ্ডে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেভাবে ব্যাপক সাধারণ মানুষ ধর্ম-বর্ণ-ভাষা ও শ্রেণি নির্বিশেষে সামিল হয়েছিলেন তা গোলওয়ালকরের একেবারেই পছন্দ হয়নি। ৪২'র আন্দোলনের প্রভাবকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। সেই সময় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে যে স্বাধীনতার দাবি উঠেছিল, তাও ছিল গোলওয়ালকরের না-পসন্দ। বরং তাঁর কাছে অঞ্চলগত জাতীয়তার পরিবর্তে  হিন্দু জাতীয়তা তথা হিন্দু রাষ্ট্র গঠন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি লিখেছেন, 'ব্রিটিশ বিরোধিতাকে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একাসনে দেখা হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতা আন্দোলনের সমস্ত পর্যায়ে, তার নেতাদের উপর ও সাধারণ মানুষের উপর এক বিপর্যয়কারী প্রভাব ফেলেছে।' বস্তুত, ব্রিটিশ  সাম্রাজ্যবাদী অধীনতা থেকে জাতীয় মুক্তি অর্জনের বদলে তাঁর মনপ্রাণ একাগ্র ছিল কীভাবে বিদেশি ও বিজাতীয় মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করা যায়। তাঁর নেতৃত্বে সঙ্ঘের নেতারা ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। 

ব্রিটিশ সরকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলকারীদের উপর লাঠির ঘা বসাতে যে সিভিক গার্ড নিয়োগ করে, তার বেশির ভাগই ছিল আরএসএস কর্মী। এহ বাহ্য, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় গোলওয়ালকর কোনওরকম রাখঢাকের বালাই না রেখেই বলে দেন যে দেশের দুর্দশার জন্য ব্রিটিশরা নয়, দায়ী বিজাতীয় মুসলমানরা। তিনি লেখেন, 'আমাদের প্রতিজ্ঞায় আমরা ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে স্বাধীনতা প্রাপ্তির কথা বলেছিলাম। সেখানে ব্রিটিশদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনও কথা ছিল না।' সঙ্ঘের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিন্দু মহাসভা ও তাদের নেতৃত্বের অবস্থান ছিল আরও ন্যক্কারজনক। ভির সাভারকার কীভাবে ব্রিটিশের কাছে নির্লজ্জের মতো ক্ষমা ভিক্ষা করে সেলুলার জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন তা আমরা সকলেই জানি। অথচ, পোর্ট ব্লেয়ার বিমানবন্দরের নাম দেওয়া হয়েছে ওই বিশ্বাসঘাতকের নামে। সেখান বিমানবন্দরের নাম পাল্টে উল্লাসকর দত্তের নামে করার আন্দোলন চলছে। 

সাভারকার ১৯৩৭ সালে ছাড়া পেয়ে পাঁচ বছরের জন্য 'হিন্দু মহাসভা'র সভাপতি হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তিনি তৎকালীন গণআন্দোলনের পিঠে কার্যত ছুরি মারেন। ১৯৩৯ সালের ৯ অক্টোবর সাভারকার বড়লাট লিনলিথগো'র সঙ্গে দেখা করেন এবং ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। পরে লিনলিথগো লেখেন, 'এখন আমাদের স্বার্থগুলি এত নিবিড়ভাবে আবদ্ধ যে প্রয়োজনীয় বিষয় হল হিন্দুবাদ এবং গ্রেট ব্রিটেনের বন্ধু হওয়া দরকার। হিন্দু মহাসভা যুদ্ধ শেষে ডমিনিয়ন মর্যাদা মেনে নিতে সম্পূর্ণরূপে রাজী।' স্বাধীনতার দাবিতে যে সময়ে সমগ্র ভারত জেগে উঠল, সেই সময়ে যুদ্ধ শেষে মহাসভা কথামতো ডমিনিয়ন মর্যাদাতেই সায় দিয়েছিল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম? নৈব নৈব চ। কিন্তু ব্রিটিশরা এই দেশ থেকে কখনও চলে গেলে হিন্দু রাষ্ট্র গঠিত হবে এবং মুসলমানরা সেই হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে বিপদজনক হবে- এই ছিল মহাসভার দর্শন। বিস্ময়কর হল, সেই মুসলমানদের স্বঘোষিত প্রতিনিধি সাম্প্রদায়িক মুসলিম লিগের সঙ্গে ১৯৪২-এর উত্তাল পর্বে নির্বাচনী আঁতাত গড়ে তুলে সরকার গঠনে কোনও নীতিগত বাধা সাভারকার বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়রা দেখতে পাননি। 

চল্লিশের দশকের উত্তাল সময়ে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ বাংলার গভর্নর স্যার জন হারবাটকে একটি চিঠিতে লেখেন, 'যুদ্ধের সময়ে যদি কেউ গণ অনুভবকে নাড়া দিয়ে বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে, তবে মহাসভা তা প্রতিরোধ করবে।' এই ভাবে ব্রিটিশ শাসকদের সেবক হিন্দু মহাসভা ভারতের গণ আন্দোলনকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নিয়েছিল। সঙ্ঘ ও মহাসভা এরপর স্পষ্ট করে বলে যে স্বাধীনতার একমাত্র অর্থ হিন্দু রাষ্ট্র গঠন, যার জন্য তারা প্রাণ দিতে পারে। 

স্বাধীনতার এই অর্থের যাঁরা উত্তরসূরী তাঁরাই এখন আমাদের স্বাধীনতার পাঠ পড়াচ্ছেন। দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদ কাকে বলে বোঝাচ্ছেন। যে দলের অস্তিত্ব স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে হাব্বল টেলিস্কোপ লাগিয়েও টের পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁদের হাতে নিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে ভারতের জাতীয় পতাকা। এটা তাঁরাও জানেন। তাই তাঁরা ক্ষমতায় এসেই শুরু করেছেন ভারতের স্বাধীনতার বিনির্মাণ। পাকিস্তানকে মুসলমান প্রতিপক্ষ খাড়া করে সকাল-বিকাল গাল পারা, কাশ্মীর সমস্যা জিইয়ে রাখা, চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষ জীবন্ত রাখা- এই সবই সেই বিনির্মাণের অংশ। অর্থাৎ, স্বাধীনতার নামে আমরা এই পেয়েছি- এটাই লোককে গেলানো। স্বাধীনতা যুদ্ধ ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য টাটকা জাতীয়তা সৃষ্টি করেছে তারা। সেই জাতীয়তাবাদে ভারতকে অমর্যাদা করার সকল প্রয়াস শক্ত হাতে দমন করা হবে। ভারত মাতার জয়ধ্বনি কেউ না দিলে তিনি জাতীয়তা বিরোধী। সরকারের সমালোচনা করলে দেশদ্রোহী। ইতিহাস কিন্তু বলছে, সবচেয়ে বড় জাতীয়তা বিরোধী, সবচেয়ে বড় দেশদ্রোহী শাসক দল নিজেই। তাই তো আজ তাদের লালকেল্লার একশো মিটার পর্যন্ত সুরক্ষা বলয়ে ঘিরে ফেলে স্বাধীনতা উৎসব যাপন করতে হয়। 

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি।' ভারত তীর্থ ভারতবর্ষের পতাকা বহনের শক্তি কেন্দ্রের বর্তমান শাসক দলের নেই। স্বাধীনতা দিবসে তাই ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতির আত্মমগ্ন প্রধানমন্ত্রী সং সেজে আরও একবার স্বাধীনতা দিবসের পতাকা উত্তোলন করবেন। তাঁর সাহস নেই এ কথা বলার যে তাঁর পূর্বসূরীরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বস্তুত বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর তাই নৈতিক অধিকার নেই এই পতাকা তোলার। এই পতাকা তুলে তিনি ভারত মাতাকে অসম্মান করছেন। পতাকার অবমাননা কিন্তু মানুষ মনে রাখছেন। একদিন সব কিছু কড়ায় গণ্ডায় সুদে আসলে মেটাতে হবে জনতার দরবারে।


Tuesday, 10 August 2021

'আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব'

স্বাধীনতার ৭৫ বছর 

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত


স্বাধীনতার ৭৫ বছরে আমাদের পদার্পণ। ব্যক্তি জীবনে সময়টা অনেক হলেও জাতি বা দেশের জীবনে অধিক নয়। তবে তা নিছক কমও নয়। লাল চীনের কথা নয় বাদই দিলাম, এই তো সেদিন স্বাধীন হল বাংলাদেশ। সে তো দিব্য এগিয়ে চলেছে, অনেক বিষয়ে ভারতবর্ষের চেয়েও দ্রুত তার প্রগতির হার। সুখাংকের বিচারে অনেক এগিয়ে ছোট্ট দেশ ভূটান। আমাদের জীবনে না এল সুখ, না সমৃদ্ধি, না দূর হল সম্পদের অসম বন্টন। দুর্নীতির চাকা টগবগিয়ে ছুটছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয় সবেতেই পিছিয়ে থাকা এই মহান দেশের নাগরিকের যেন ধর্মই মহান। ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া এই দেশ এখনও ভুলতে পারছে না সেই স্মৃতি, যাবতীয় শত্রুতার কেন্দ্রে তার যেন পাকিস্তান।

ক'দিন আগেই গেছে ২২শে শ্রাবণ। সেদিন এই দুনিয়া ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন আমাদের প্রিয় কবি। ফ্যাসিবাদ-বিরোধী দুনিয়ার অন্যতম সেরা এই দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখেছিলেন এক মহান ভারতবর্ষের, সর্বজনবাসযোগ্য এক শান্তির আবাস। এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশের পিতা গান্ধীজীও। পেলাম কী? হিন্দু রাষ্ট্র? 

তখনও দেশের প্রধান নেতৃত্ব বা সাধারণ মানুষ পাকিস্তান বা দুই ধর্মের দুই পৃথক দেশের কথা স্বপ্নেও দেখেননি, ভাবেনওনি। যদিও এই দেশের সর্বত্র সব ধর্মের সব মানুষ পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে শান্তিতে থেকেছেন।  সবাই সব ধর্মকে সম্মান জানিয়েছেন। আমরা দেখেছি মহাজাতি সদনের প্রতিষ্ঠা, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, দেখেছি দেশ গড়তে দুই ধর্মের মানুষের যৌথ উদ্যোগের লড়াই। দেখেছি সিপাহী বিদ্রোহ থেকে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সব ধর্মের সব মানুষের লড়াই। 

ওদিকে বিশ্বযুদ্ধ থামল। একদিকে আইএনএ অন্যদিকে 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন'- এই দুয়ের চাপে ইংরেজরা এই উপনিবেশ ছাড়তে বাধ্য হল। দেশ স্বাধীন হল। তবে, তাদের কূট চালে ধর্মের নামে এক নয়, দুটো অঙ্গ (পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্থান) হারিয়ে, বেশ কিছু মানুষ, বেশ কিছু জমি ইত্যাদি হারিয়ে পেলাম নতুন ভারতবর্ষকে। যে ভারতবর্ষ থেকে হারিয়ে গেল ভারতীয় সংস্কৃতির মূল সুর। ভিন্ন হল দেশ, ভিন্ন হল সংস্কৃতি। বেড়ে উঠল অবিশ্বাস, ধর্মীয় সংকীর্ণতা। তারপর? খণ্ডযুদ্ধ লেগেই  রইল বা রয়েছে, যেমন লেগেই রয়েছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসাম্যর মতো অসুখগুলো। এসব ছিল, অনুকূল হাওয়ায় যেন পল্লবিত হল। অনুকূল হাওয়া কেমন?

সংবিধান মেনে চললে নিশ্চয় মানতে হয় যে এই দেশের কাঠামোটা যুক্তরাষ্ট্রীয়, কিন্ত বাস্তব পরিস্থিতি যা তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। বস্তুত এমন সংশয় অনেকেরই। তবে, এই পরিস্থিতির জন্য আমরা দোষ দেব কাকে? আমাদের ধারণাকে, আমাদের চাহিদাকে, না সংবিধানকে? আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গঠন দেখে কিছু দেশ বুঝি উৎসাহিত হয়ে একদা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আগ্রহী হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কী? এই ব্যবস্থার চালিকাশক্তি মূলত দু'টি: এক, রাজনৈতিক ও দুই, সামাজিক। দুয়েরই মধ্যে কখনও স্পষ্ট,  কখনও অস্পষ্ট হয়ে খেলা করে অর্থনীতি। তবু পৃথিবীর মাত্র ২০ শতাংশের সামান্য বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আছে (অবশ্য মনে রাখা দরকার যে, পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ মানুষ রয়েছে এই ব্যবস্থায়)। তাদের কতজন স্বেচ্ছায় এই ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। মোদ্দা কথা: কর্তা বা দেশনায়করা বেছে নিয়েছেন তাই এই ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা। দেশনায়করা এই ব্যবস্থা বেছে যে নিয়েছেন তা মোটেই অকারণ বা অযৌক্তিক নয়। এই ব্যবস্থায় বেশ কিছু রক্ষাকবচ আছে যা যে কোনও ধর্মের, যে কোনও বিত্তের মানুষকে বিশেষত সংখ্যালঘু, দুর্বল আদিবাসীদের কিছুটা হলেও ভরসা জোগায়। তাদের জন্য রয়েছে সংরক্ষণ বিধি, নানাবিধ কাজ, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার সুযোগ। তবুও অশান্তি, স্বার্থের সংঘাত। কেন? দেখা যাক সাম্প্রতিক ঘটনার আলোয়। বেছে নিচ্ছি ৪২তম সংবিধান সংশোধন, তাকাই আরও সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে- জিএসটির প্রচলন, বিমুদ্রাকরণ, শ্রমবিধি ইত্যাদি। পাশে রাখি শিক্ষানীতি। 

১৯৭৬ সাল। তখনও দেশে জারি রয়েছে আপৎকালীন অবস্থা, বকলমে সঞ্জয় গান্ধির একনায়কতন্ত্র।  সে সময়ে এল ৪২তম সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব বা বিল। লোকসভা তো সম্মতি দিলই, রাজ্যে রাজ্যে বিধানসভাগুলিও প্রায় সকলে মেনে নিল সে সংশোধন। আইনে পরিণত হল সেই বিল। সংবিধান সংশোধন আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে, কিন্তু এমন সর্বনাশা সংশোধন কেউ আগে দেখেনি বা ভাবেনি। এই সংশোধনে কার্যত সংবিধানের চরিত্র তথা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাকেই বদলে দেওয়া হয়। কিছু রাজ্য বাধা দিয়েছিল, তবে তাদের সে বাধা উড়ে যায় সংখ্যার ধমকে চমকে। আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এই  সংশোধনীর সুবাদে। জনতা সরকার সংশোধনের সুযোগ পেয়েছিল, সংশোধন  তারা করেও, কিন্তু তা তারা করে সংশোধনের মূল সুর না বদলে। এর অর্থ দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অগ্রাহ্য করা। অবশ্য সংবিধান রচয়িতারা এই দেশ যে একটা  যুক্তরাষ্ট্র তা বলেননি স্পষ্ট ভাবে; বলেছিলেন এই দেশ 'নানা প্রাদেশিক রাজ্যের সমাহার'। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে বলবৎ করেন এক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। বর্তমানে  প্রশ্ন তা নিয়েই।

বিমুদ্রাকরণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণা ছিল এর ফলে নাকি উদ্ধার হবে 'কালো টাকা, চাঙ্গা হবে দেশের অর্থনীতি '। হয়নি তা, অন্তত সাধারণ মানুষ তার সুবিধা পাননি কিছুই। উলটে বহু মানুষের প্রাণ গেছে, কাজ গেছে। 

জিএসটি যে কেবল মধ্যবিত্ত মানুষের বিপদ বাড়িয়েছে তা নয়, এই ব্যবস্থায় সব শ্রেণির মানুষের জীবনযাপন দুরূহ হয়ে উঠেছে। একে আমরা রাজ্যের অধিকারে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপও বলতে পারি না, কারণ এই ব্যবস্থা তো অঙ্গরাজ্যগুলির সম্মতিতেই চালু হয়েছে, কোনও রাজ্য সরকার আপত্তি জানিয়েছে বলে জানি না।  

শিশু শ্রম তথা শ্রমবিধিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ, শিশু শ্রমিক বেড়েছে, উঁকি মারছে দাসপ্রথা। শিশু সুরক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

শিক্ষানীতি মানুষের শিক্ষার অধিকারকেই যেন হাস্যকর এক মৌলিক অধিকার বলে তুলে ধরেছে। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘিত হয়েছে এই শিক্ষার অধিকার আইনে।

মৌলিক  বা মানবাধিকার যেন এ কালে এ দেশে দূর আকাশের তারার আলো। মানবাধিকার নিশ্চিত হয় গণতান্ত্রিক কাঠামো দৃঢ় হলে; গণতান্ত্রিক কাঠামোর নিশ্চয়তা আসে সংবিধান থেকে, যদি সংবিধানের ওয়াচডগ বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম যথাযথ দায়িত্ব পালন করে। তারা যে তা করে না তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে ফাদার স্ট্যানের বিচারবিভাগীয় হত্যায়, প্রমাণ মেলে কেন্দ্রে আসীন সরকারি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বে। অন্য 'স্তম্ভ'গুলিও কাজ করে নিজ নিজ শিরদাঁড়া বেচে কেবল সরকারকে তুষ্ট করতে। 

সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ছিল যে, রাষ্ট্র সুশিক্ষা ও কার্যকর শিক্ষার আয়োজন করবে। তা যে হয়নি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে বহু। অপ্রত্যক্ষ প্রমাণও কিছু কম নয়। ওদের বেড়ে ওঠা লোভ, আত্মসম্মানের অভাব এই সবই তো অশিক্ষার নিশ্চিত প্রমাণ। নিজেদের দোষই বা কম কী? এই দেশে এখন যে শক্তি কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছে তারা এল কোথা থেকে? এরা তো আমাদেরই ভোটে নির্বাচিত। তারা সংবিধানের শর্তগুলি মানছে না কৌশলে এবং তাদের সে কৌশলে সাহায্য করছেন যারা তারা তো আমাদেরই লোক বা প্রতিনিধি। অন্য শক্তিগুলিও নির্ভরযোগ্য কী? অতীতে তারা যে যেখানে ক্ষমতা পেয়েছে সেখানেই তারা সাধ্যমতো মানুষের বাঁচার অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। মানবাধিকার খর্ব করতে উদ্যত হয়েছে। 

মাঝে মাঝে দেখি এরা ওদের 'ব্রুট মেজরিটি'র জোরে কিছু জিনিস চাপিয়ে দেয়। যেমন এনআরসি-সিএএ বা কৃষি আইন। স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাজার তথা কর্পোরেট শক্তির সঙ্গে তাদের নৈকট্য।  কিন্তু,কর্পোরেট শক্তি যে বিরোধী শক্তিকেও যথেষ্ট তেল দেয়! আমরা কোন পথে যে চলি! কানের পাশে দিবারাত্র ঢোলক বাজায় দুর্নীতিবাজ অশিক্ষিত কিছু হিন্দুবাদী, সামনে এক স্বৈরাচারী সরকার, পেছনে পেগাসাস! এ তো আমার সেই যুক্তরাষ্ট্র নয়, নয় আমার সেই ভারতবর্ষ।


Monday, 9 August 2021

জীবন যুদ্ধ

আমরা অবশ্যই অসাধু-অসৎ হব

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বিবর্তনবাদের ধারণায় অব্যবহৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি সম্পর্কে ডারউইন বলেছিলেন, যে-অঙ্গগুলির ব্যবহার ক্রমাগত কমতে কমতে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় সেগুলি হয় প্রকৃতির নিয়মেই সম্পূর্ণ বিলুপ্তি পায়, নয়তো গৌণ ভূমিকায় অস্তিত্ব বজায় রাখে। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন লেজ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে, আবার অ্যাপেন্ডিক্স কিংবা আক্কেল দাঁত গৌণ ভূমিকায় থেকে গিয়েছে। গৌণ ভূমিকায় থাকলেও মাঝে মধ্যে সেগুলি মানুষের জীবনে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন অর্থ ও সময় ব্যয় করে, কিছু শারীরিক বেদনা সহ্য করে হলেও সেগুলিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেঁটে বাদ দিতে হয়। আর এই নিয়ম কেবলমাত্র মানুষের শরীরের জন্যই যে প্রযোজ্য তা নয়, সমগ্র সমাজশরীরেও সমান অর্থবহ। প্রগতি ও উন্নয়নের ধারায় সমাজের জন্য সততা, নৈতিকতা, সত্য ভাষণ, সহনশীলতা ও ঔদার্যের মতো গুণগুলিও ক্রমাগত ভেস্টিজিয়াল হয়ে গিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, প্রাচীনকালে এগুলি ভীষণ দৃঢ় ছিল, কিছুতেই তার ব্যত্যয় হত না। এ প্রসঙ্গে ১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষণটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন,

'এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই প্রাচীন ভারতবর্ষে সবাই ছিলেন সম্পূর্ণ নির্ভুল ও আদর্শ মানুষ, তাঁরাই শিল্প ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার করেছিলেন সর্বপ্রথম আর পুরানো যুগ ছিল সোনায় গড়া, ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য ছিল সুমিষ্ট ফল আর কূপে ছিল অমৃত।'

সুতরাং, গুণের পাশাপাশি দোষ সর্বদা ও সর্বত্র বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তুলনামূলক অনুপাতের হিসাবে বলা যায়, গুণগুলি একটা সময় অবধি মুখ্য ভূমিকায় বহাল ছিল। মানুষজনের মধ্যেও এগুলিকে পালন করা ও যতদূর সম্ভব রক্ষা করার তাগিদ ছিল। শিক্ষা ও আচার-ব্যবহারে এগুলির প্রকাশ যে মানুষের চরিত্রের অবশ্য প্রয়োজনীয় কর্তব্য সে-সম্বন্ধে সবিশেষ মতান্তর ছিল না। সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হিসাবেও সেগুলির কদর ছিল। কিন্তু ধীরে-ধীরে ভারতের সমাজ-অর্থনীতির পরিবর্তন ও বৈশ্বিক রাজনীতির পালাবদলের আবহে সে-চল অস্তাচলে যেতে শুরু করেছিল। বাংলার ক্ষেত্রে যদি ইংরেজ আগমনের পরবর্তী সময়কে বিচারের যবনিকা উন্মোচনকাল হিসাবে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে নবজাগরণের দরুণ বঙ্গজীবনে একদিকে রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ মানুষদের উত্থান যেমন দেখতে পাওয়া যায়, তেমনই অন্যদিকে এঁদের জীবনকে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে এঁরা কেউই সুখী ছিলেন না, হতেও পারেননি। সাময়িক আর্থিক অনটন কিংবা আজীবন দারিদ্রের বিচারে সুখের কথা ছেড়ে দিলেও ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এঁরা প্রত্যেকেই প্রায় তীব্র একাকিত্ব ও ভয়াবহ মনঃকষ্টের আগুনে প্রতিনিয়ত জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েছেন। 

উনিশ শতকের ব্যতিক্রমী মনীষা ও বলিষ্ঠতম মানুষ বিদ্যাসাগরের কথাই যদি ধরে নিই, তাহলেই প্রায় প্রত্যেকের জীবনে অর্জিত যন্ত্রণার আঁচের আভাস পাওয়া যাবে। বিদ্যাসাগরের চরিত্রে ছিল এমন মহৎ গুণ যা পৃথিবী চষে ফেললেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। পক্ষান্তরে, তাঁর আপসহীন জীবনযাপনের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথাও কারও অজানা নয়। এমনকি তাঁর মমত্বে ভরা নিটোল হৃদয়খানি যে আমৃত্যু দয়াপরবশতায় অবিচল ছিল, সে-কথাও বহু চর্চিত। অর্থাৎ, সর্বার্থে তিনি একজন শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন। আর এই মানুষটিই জীবিত অবস্থায় কী পেয়েছেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

'বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাঁহার স্বজাতি-সোদর কেহ ছিল না। এ দেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না।'

কিন্তু সমাজের জন্য এত কিছু করার পরে ও নিজের জীবনকে শ্রেষ্ঠতম আদর্শে আমৃত্যু শাসন করেও কেন বিদ্যাসাগর সুখী হতে পারেননি? রবীন্দ্রনাথই লিখেছেন,

'তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন চারিদিকের জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কার্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই। তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন– আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরিপরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্‌, এবং নিজের বাক্‌চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল। কারণ, তিনি সর্ববিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন।'

আর এই কথা স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশায়ও গোপন করেননি। তিনি জীবনের শেষভাগে এসে বন্ধু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছেন,

'আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।'

শুধুমাত্র বিধবা বিবাহ নয়, তাঁর জীবনের প্রধানতম ব্রত শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও তিনি কাউকেই পাশে পাননি। একাই প্রায় সমস্ত কাজ নির্বাহ করেছেন। তারপরেও জীবনসায়াহ্নে প্রাণপ্রিয় বীরসিংহ থেকেও তাঁকে গ্রামছাড়া হতে হয়। ইন্দ্র মিত্র লিখেছেন,

'কয়েকদিন বীরসিংহে থেকে বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, রাখাল স্কুল, বালিকা বিদ্যালয় প্রভৃতি সকল বিষয়ের বন্দোবস্ত করে বিদ্যাসাগর চিরদিনের জন্য বীরসিংহ ত্যাগ করলেন।'

তাই-ই নয়, তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল বাবা-মা-ভাই ও স্ত্রীকেও (পুত্রকে তো আগেই ত্যাগ করেছিলেন)। প্রায় প্রত্যেককেই স্বতন্ত্র চিঠি লিখে তিনি জানিয়েছিলেন যে,

'নানা কারণে আমার মনে সম্পূর্ণ বৈরাগ্য জন্মিয়াছে- আর আমার ক্ষণকালের জন্যও সাংসারিক কোন বিষয়ে লিপ্ত থাকিতে বা কাহারও সহিত কোন সংশ্রব রাখিতে ইচ্ছা নাই। ...সাংসারিক বিষয়ে আমার মতো হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না।'

জীবিতকালে তাঁর বেদনাদগ্ধ জীবন সম্পর্কে চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,

'দীর্ঘকাল ধরিয়া লোকের প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, মিথ্যাচারণ প্রভৃতি দেখিয়া মানুষের আচরণের প্রতি তাঁহার এক প্রকার বিজাতীয় ঘৃণার সঞ্চার হইয়াছিল। একদিকে প্রেমিকহৃদয় বিদ্যাসাগর মহাশয় মানবের প্রতি মহাপ্রেমে অনুপ্রাণিত, অপরদিকে মানুষের আচরণে ভগ্নহৃদয় ও বিশ্বাসবিহীন।'

তাছাড়া জীবিতকালেই শুধু নয়, মৃত্যুর পরেও তিনি যে খুব সুখী হয়েছিলেন এমনটা হয়তো নয়। 'বিদ্যাসাগর'-এর মতো মানুষের মহাপ্রয়াণের যে-ছবি পাওয়া যায় সেখানে দেখা যায় শ্মশানে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা মোটে পাঁচজন- শম্ভুচন্দ্র, ঈশানচন্দ্র, সূর্যকুমার, নারায়ণ ও সম্ভবত অঘোরনাথ বা কার্তিকচন্দ্র। না সমকালীন বঙ্গীয় বিদগ্ধজনেদের কেউ, না বিপুল জনসমাজ যাদের জন্য বিদ্যাসাগরের সম্পূর্ণ জীবনটাই ব্যয়িত, কেউ নয়। প্রায় কেউ জানতেই পারল না এই ধরাধাম থেকে কে চিরজীবনের মতো বিদায় নিল! পক্ষান্তরে যদি মৃত্যু পরবর্তী প্রাপ্তির কথাও ধরা হয় তাহলে প্রথমেই মনে করতে হয় তাঁর পুত্র নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারা সম্পত্তির আত্মসাতের ঘটনা। বিদ্যাসাগর স্বয়ং তাঁর উইলের ২৫ নম্বর ধারায় নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী’ বলে সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকারী বলে বাদ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, উইলের কার্যদর্শীও নিযুক্ত করেননি। অথচ তাঁর ইচ্ছাকে মর্যাদাটুকুও কেউ দেয়নি, উপরন্তু উইলে সাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদ্যাসাগরের ইচ্ছার পক্ষে সাক্ষ্যও দেননি, কেবলমাত্র কালীচরণ ঘোষ ও যোগেশচন্দ্র দে ব্যতীত। এছাড়াও আমরা অহরহ আজও তাঁর মূর্তির ভূপতিত দশার সাক্ষী হই, এমনকি আজকের দিনের বেশিরভাগ নারীরই তিনি পূজ্য হয়ে উঠতে পারেননি, আর সমাজও যে ভারী পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে তাও তো নয়। 

এই যখন অবস্থা তখন কেন মানুষ যেচে এই জীবনযন্ত্রণাকে ডেকে আনতে যাবে! কীসের প্রত্যাশায়? ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে চরমতম একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা চেয়ে কেন কেউ এই আদর্শকে আয়ুধ বলে গ্রহণ করবে? করার তো কথা নয়। আর তাই করছেও না। কেউই বিদ্যাসাগরের মতো ছেলে আর প্রীতিলতার মতো মেয়ে প্রত্যাশা করছেন না। আজকাল প্রায় কেউই ‘কথার ও কাজের সাযুজ্য পালন করেন না, ইচ্ছাকে মেরুদণ্ডের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে সমাজব্যবস্থার সঙ্গে অহেতুক টক্কর’ নিতে চান না। কেননা, একদিকে মহামানবদের জীবনের পরিণতি থেকে শিক্ষা, অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের দলীয় কাঠামোয় যেখানে দীর্ঘদিনের বাম রাজত্ব থেকে শুরু হওয়া রীতি অনুযায়ী ‘আমাদের লোক’ হওয়ার সুবিধাগুলি ছেড়ে ‘ওদের লোক’ হয়ে খামোকা মাথা ফাটানো কিংবা আইনি ফ্যাসাদের জালে জড়ানোকে কেউই বুদ্ধিমানের কাজ বলে প্রশ্রয় দিতে রাজি হয় না। হওয়া উচিতও নয়। এ তো জানা কথা যে, অতীত থেকে মানুষকে শিক্ষা নিয়েই সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে। 

বিদ্যাসাগর এত কাণ্ড করেও কিছুই প্রায় পাননি, কয়েকজনের লেখা প্রবন্ধ, খানকতক বই আর কিছু মূর্তি নির্মাণ ছাড়া (কেউ আমাকে নিয়ে এককালে বই-প্রবন্ধ লিখবে, মূর্তি গড়বে, এ নিশ্চয় তাঁর মনোবাঞ্ছা ছিল না, যার জন্য গোটা জীবনটাকেই তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন অকাতরে, আর বিলিয়ে দিয়েও ভারি অসুখী হয়েছিলেন)। পক্ষান্তরে, এখন যদি কেউ সেরকম আদর্শে জীবনযাপনের চেষ্টা করে তবে দিনের শেষে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক একাকিত্ব ছাড়াও প্রায় না খেতে পেয়ে মরবে, না পাবে চাকরি না নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে পাড়ায় টিকতে পারবে। সুতরাং, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটে প্রাপ্ত আদর্শ মানুষের ধারণা, 'What a piece of work is a man! How noble in reason, how infinite in faculty! In form and moving how express and admirable! In action how like an angel, in apprehension how like a god! The beauty of the world. The paragon of animals!' আজ একেবারেই বাতিল। ডারউইনের তত্ত্বানুযায়ী মহান গুণগুলি অব্যবহারের ফলে আজ হয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, নয়তো গৌণরূপে টিকে আছে। যাঁদের জীবনে সেগুলি গৌণ তাঁরা জানেন কী যন্ত্রণা তাঁদের সহ্য করতে হয়, অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা কি চাট্টিখানি! ফলে, ধীরে-ধীরে প্রায় সকলেই মানসিক অস্ত্রোপচারের দ্বারা এগুলিকে বর্জন করছেন। 

এমন আজেবাজে মূল্যবোধের ব্যামোহীন এক সমাজ গড়ার দিকে আমরা আজ ধাবমান ও প্রায় সফল। তাছাড়া ডারউইনেরই তত্ত্ব তো অস্তিত্বের জন্য সংঘর্ষের কথাও বলেছে। এই প্রজন্মের নাগরিকের কাছে বেশিরভাগ পূর্বপুরুষরা তো অসততা, অনৈতিকতা, মিথ্যা ভাষণ, অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি ও  রক্ষণশীলতাকেই জীবনধারণের উপায় হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। আর তাই তো এই দেশ গান্ধীর হত্যা দেখেছে কিন্তু নেতাজির মৃত্যু রহস্যের কিনারা দেখেনি, দেশভাগ-দাঙ্গা দেখেছে কিন্তু আজও হিন্দু-মুসলমানের দূরত্বের নিষ্পত্তি দেখেনি, এমারজেন্সি-বোফর্স দেখেছে কিন্তু ভিখারিহীন অনাহারবিহীন হাসিমুখের জনকল্যানকামী দেশ দেখেনি। একের পর এক কারখানা বন্ধ থেকে মরিচঝাঁপি-বানতলা দেখেছে কিন্তু ঘুষহীন সরকারি দফতর দেখেনি, নোটবন্দী-এনআরসি-রাফায়েল-পেগাসাস-সারদা-নারদা-কামদুনি-সিন্ডিকেট-জনপ্রতিনিধিদের কটূভাষ ইত্যাদি তো শুধু দেখছে, দেখছে এবং দেখেই চলেছে। তাই যুগধর্ম অনুযায়ী যখন অসাধুতাই টিকে থাকার মূল সংঘর্ষ তখন এই প্রকৃতি তাদেরই নির্বাচন করবে যারা যোগ্যতম। সুতরাং, আজ আমাদের তীব্রতম, চরমতমভাবে অসাধু ও অসৎ হতেই হবে, নইলে অস্তিত্ব সংকটে ফসিল হয়ে যেতে হবে। 


Saturday, 7 August 2021

জনকল্যাণ কর্মসূচি মানে কি ভিক্ষা দেওয়া?

পুরনো রোগ: দাওয়াই নাই

মালবিকা মিত্র


'The bourgeoisie can't exist without constantly revolutionising the instrument of production.' অবিরাম যন্ত্রের উন্নতি না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি বাঁচতে পারে না। উৎপাদন হয় পর্বত প্রমাণ। অপরদিকে যন্ত্রের উন্নতি মানবিক শ্রমকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে। কর্মহীনতা, ছাঁটাই, মজুরি সংকোচন বাড়তে থাকে। পরিণতি বাজারে চাহিদা হ্রাস। অতি উৎপাদনের সমস্যা। অর্থনৈতিক মন্দা।

এই চক্রবৎ দূষিত আবর্তনের প্রেসক্রিপশনটি আজ থেকে ১৭৪ বছরের পুরনো। ১৮৪৮'এ লেখা কমিউনিস্ট ইশতেহার। চক্রবৎ এই সংকট আসে, আবার সামলে ওঠে। যে দেশে শিল্প যত বেশি আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর, সংকটের চেহারা সেখানে ততই ভয়ঙ্কর। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতে এই সমস্যা তুলনায় কম। কিন্তু দুই বিশ্বযুদ্ধ অন্তর্বর্তী সময়ে এই সংকট ১৯২৯ সালে গভীরতর রূপ ধারণ করে। আর কোনও জোড়াতালি সমাধান চলছে না। পরিণতি হিসেবে রাজনীতিতে জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের তত্ত্ব, গণতান্ত্রিক সমাজবাদ, হ্যারল্ড লাস্কি, উইলিয়াম বেভারিজ প্রমুখের উত্থান। আর অর্থনীতিতে যুগপুরুষ কেইনস'এর আবির্ভাব। তিনি সংকটের জন্য অপরিকল্পিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি, উৎপাদক শিল্পপতিদের 'un-coordinated optimism'কে দায়ী করেন। তিনি বিশেষ বিশেষ ভারি শিল্পের উৎপাদনে আংশিক পরিকল্পনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শিল্পপতিদের উপর কিছু শুল্ক আরোপ, সামাজিক দায়িত্ব আরোপ করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধি করে সেই আয়কে জনকল্যাণে ব্যয় করার বিধান দেন। যে কোনও উপায়ে ক্রয়ক্ষমতাহীন মানুষের কাছে নগদ অর্থ পৌঁছে দিতে হবে; নানাবিধ ভাতার মাধ্যমে। দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনা নয়, সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়া চাই। একবার মজুরি দিয়ে পুকুর কাটাও, আবার মজুরি দিয়ে পুকুর ভরাট করো। 

এই সময় বুর্জোয়া অর্থনীতিতে বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, অবসরকালীন সুযোগ ও ভাতা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত কারণে ভাতা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা রক্ষা- এইসব কত না আয়োজন। সংকটের যুগে ধনতন্ত্রের রূপ গণতান্ত্রিক সমাজবাদ। হ্যাঁ, বনসাই। সমাজবাদের বনসাই। জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের রূপ। এইভাবে বহু দিন টিঁকে ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ সমগ্র খাঁটি বা ভেজাল সমাজতন্ত্রের পতন হল। ধনতান্ত্রিক দুনিয়া একমেরু বিশ্ব অনুমান করে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যেতে থাকে। শিল্পপতির দেওয়া শর্তে সরকার লগ্নি আনে। শিল্পগোষ্ঠীর ইচ্ছায় মুক্ত বাজারের বিশ্বায়ন হয়। আবার চিনা পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা জারি চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আউটসোর্সিং'এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। তবুও ঠেকাতে পারে না অর্থনৈতিক মন্দা। আসলে সমস্যা তো সমাজবাদ নয়, একমেরু দ্বিমেরু বিশ্ব নয়। ব্যাধি তো জন্মগত। ১৭৪ বছর পূর্বে রোগ নির্ণয় করা হয়েছে। 

অতএব, আজকের এই সংকট করোনা ১৯ জনিত নয়। আরও আগে থেকেই। জন্মগত। করোনা ১৯ ব্যাধির প্রকাশকে তীব্রতর করেছে মাত্র। ফলে, আজ বুর্জোয়া অর্থনীতিকে পুনরায় কেইনস'এর শরণাপন্ন হতে হয়েছে। নানাবিধ ভাতা ত্রাণ অনুদান নিয়ে জনকল্যাণের রূপ ধারণ করে হাজির। সমস্ত অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে অবিলম্বে চাহিদা সৃষ্টি করে বাজারকে সচল করা প্রয়োজন। তার জন্য অবিলম্বে মানুষের কাছে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া দরকার। এতে ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারে চাহিদা বাড়বে। 

ফলত, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড এসবই বুর্জোয়া অর্থনীতির অনিবার্য রূপ। সংসদীয় বামেরা বিপ্লবী পথ বর্জন করেছে। অথচ দাবি করছে 'সকলের জন্য কাজ চাই'। ভাতা এদের কাছে ভিক্ষা। তারা এসএসসি, শিল্পায়ন দাবি করছে। অথচ একদা এদের দাবি ছিল 'হাত আছে কাজ দাও, নইলে বেকার ভাতা দাও'। এরা দাবি করছে, কারখানা বৃহৎ শিল্প লগ্নি চাই। অথচ মন্দার সময় প্রয়োজন ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প, হস্ত ও কুটির শিল্প ইত্যাদির প্রসারে জোর দেওয়া। বিশ্বব্যাপী বাজার গড়ে উঠলেই সংকট ও মন্দা দেখা দেয়। 

বাম নেতা রবীন দেব ২০১৬'র নির্বাচনের সমগ্র প্রচারপর্বে সিঙ্গুরে ন্যানো মোটরে চেপে ঘুরে গোহারা হারলেন। ২০১৯'এর ভোটে সেই একই প্রচার এবং হার। ২০২১'এর ভোটে নবীন প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্য টাটা মোটরস'এর প্রতীকী শিলান্যাস করে প্রচার শুরু করে পুনরায় ধরাশায়ী। আর অপরদিকে গোঁয়ার কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস মোদী, সীতারমন নগদ সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে নানাবিধ ঋণ, প্রকল্প ঘোষণা করছেন, যা তাৎক্ষণিক ভাবে সমস্যা সমাধানে সক্ষম নয়। বিপদের দিনে যে কর্পোরেটকে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সেই সত্য বিস্মৃত হয়েছে। এই সংকট পরিবেশ বিধি লঙ্ঘন করে জল, জমি, জঙ্গল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা তুলে দিচ্ছে পুঁজিপতিদের হাতে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষাকারী ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য প্রত্যাহার করে নতুন কৃষি আইনে কৃষককে আম্বানি আদানির বলির পাঁঠা করা হয়েছে।

আসলে ধনতান্ত্রিক সংকটের তীব্রতার কালে ধনতন্ত্রের সামনে দুটি মাত্র বিকল্প পথ:

১) আংশিক ভাবে সংকটের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়া। একটু কৌশলে দায়িত্বশীল ভাবমূর্তির মুখোশ ধারণ। কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদান। এভাবে অনেকদিন টিঁকে থাকা যায়। 

২) সংকটের বোঝা সম্পূর্ণ ভাবে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। বেলাগাম শোষণ-পীড়ন চালানো। পরিণতি গণ অসন্তোষ, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ। তবে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দল না থাকলে সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়াও সম্ভব হয়। 

মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্যাসিবাদ ও গণতান্ত্রিক সমাজবাদের আবির্ভাবের পটভূমি কিন্তু একই। নরমপন্থী উপায়ে সাময়িক সমাধান ও উপশম হল গণতান্ত্রিক সমাজবাদ। আর উগ্র দেশপ্রেম, জাতি-ধর্ম বিদ্বেষী মতাদর্শের সাহায্যে সমস্ত প্রতিবাদ ভিন্ন মতামতকে দেশদ্রোহী দেগে দিয়ে মানুষের কাঁধে সংকটের বোঝা বিনা বাধায় আরও ভারী করে তোলার কৌশল হল ফ্যাসিবাদ। দুটিরই জন্ম দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ও বিশ্ব মন্দার সময়ে। এ দুটিই ধনতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান। 

ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের একটি তৃতীয় প্রায়-অনুশীলনহীন পন্থা হল শ্রমজীবী আত্মপরিচয়কে ভিত্তি করে জণগণের সুদৃঢ় ঐক্য। এর আশা-দুরাশা দু' দিকই আছে। শ্রমজীবী নামধারী ভেজাল দলীয় সংগঠনের পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়। বাস্তবে সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলি গণতান্ত্রিক সমাজবাদের আদলে সংগঠিত, অথচ কর্মসূচির ক্ষেত্রে এরা বিপ্লবী। এরা অতি সহজেই জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্মসূচির অংশীদার হতে পারত। পরিবর্তে, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতাকে এরা ভিক্ষা বলে সমালোচনা করল। আবার শ্রমজীবী শ্রেণিকে শুরু থেকেই আত্মসাহায্যে অক্ষম একটি শ্রেণিতে পরিণত করে পেটি-বুর্জোয়া প্রধান দল গঠন করেছে। হবে নাই বা কেন, জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক গুরু লন্ডনের গণতান্ত্রিক সমাজবাদের প্রবক্তা হ্যারল্ড লাস্কি।

অতএব তৃতীয় পন্থাটির করুণতম দশা। বাবা রামদেবের মতো মাথার চুল, মুখের চুল, বুকের চুলে জড়াজড়ি করে হাঁসজারু বকচ্ছপ। বিপ্লবী কর্মসূচি, পেটি বুর্জোয়া প্রধান পার্টি, সংসদীয় পন্থা ঘেঁটে ঘন্ট। আমরা বাংলার বহু মানুষ যারা ফ্যাসিস্ট বিজেপি-আরএসএস'এর বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলাম, আমরা ও আরও অনেকে দান খয়রাত জনকল্যাণকেই বেছে নিলাম ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে। জানি এটা স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু এই সময়ের, এই মুহূর্তের আশু কর্তব্য। 

ফ্যাসিজম সম্পর্কে আর পি দত্ত বলেন, ফ্যাসিবাদ শ্রমজীবী শ্রেণিকে ধ্বংস করেনি, তাদের সেই সাধ্য ছিল না। কমিউনিস্ট ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের আন্দোলনহীনতা, সংসদ সর্বস্বতা, বৃহত্তর ঐক্য গঠনের ব্যর্থতা শ্রমজীবী জনতাকে আঘাত, আহত ও হতাশ করে। তখন ফ্যাসিস্ট শৃগালরা সেই আহত সিংহকে আক্রমণ করে হত্যা করে। আমাদের এক শ্রেণির তথাকথিত বাম ও কমিউনিস্টরা কি সেই পথই অনুসরণ করছেন না? 


Friday, 6 August 2021

রাজনীতির নতুন অধ্যায়?

প্রশান্ত কিশোরের এত গুরুত্ব কেন

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


গত পাঁচ-সাত বছরে ভোট-কুশলী প্রশান্ত কিশোর ভারতীয় রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনী লড়াইয়ে আজ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক দলগুলির হয়ে তিনি বায়না নিয়েছেন, একমাত্র ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস ছাড়া তিনি অন্যান্য প্রত্যকেটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করিয়েছেন। সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন- যেখানে তিনি গভীর আত্মপ্রত্যয়ে নানান প্রতিকূল আবহেও খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বারংবার ঘোষণা দিয়েছিলেন যে দিনের শেষে বিজেপি ১০০ আসনের কোটা পেরতে পারবে না। তাঁর নিশানা অব্যর্থ লক্ষ্যে বিদ্ধ হয়েছে।

এই ব্লগেই আগের একটি লেখায় আমি প্রশান্ত কিশোরের রাজনীতি নিয়ে খানিক আলোকপাত করেছিলাম (উৎসাহী পাঠকেরা এই লিঙ্কে দেখতে পারেন: https://ekakmatra2013.blogspot.com/2021/03/blog-post_22.html )। আজ পরিস্থিতি আরও অভিনব দিকে পা ফেলেছে। সে ইঙ্গিত আমার উল্লিখিত লেখায় ছিল।

বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিনই প্রশান্ত কিশোর একটি টেলিভিশন চ্যানেলে জানিয়ে দেন যে তিনি আর আই-প্যাক’এর সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না এবং এতদিন ভোট-কৌশলের যে কাজ তিনি করে এসেছেন তার থেকে অব্যাহতি নেবেন। অবশ্য বাজীটা ছিল, যদি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ১০০’র বেশি আসন পায় তবেই তিনি তাঁর ভোট-কৌশলের কাজ থেকে সরে আসবেন। সকলকে অবাক করে দিয়ে তিনি জানিয়ে দেন, বিজেপি ১০০’র কোটা না পেরনো সত্ত্বেও তিনি তাঁর বর্তমান পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন। কারণ? তা তিনি খোলসা করে বলেননি তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি আরও অধিক অর্থপূর্ণ কাজের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু সেটা কী, তা নিয়ে কারও কাছেই কিছু পরিষ্কার হয়নি।

দেখা গেল, আসন্ন পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে কংগ্রেস নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং’এর যে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা হয়েছিল সেখান থেকেও তিনি পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে রাহুল গান্ধীর ইঙ্গিতপূর্ণ কথার রেশ ধরে রব উঠেছে যে তিনি হয়তো কংগ্রেস দলে যোগ দিতে পারেন এবং সরাসরি রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হবেন। এও শোনা যাচ্ছে, তিনি নাকি কংগ্রেসকে পরামর্শ দিয়েছেন যে তারা যেন সোনিয়া গান্ধীর সভাপতিত্বে একটি উপদেষ্টা কমিটি তৈরি করে, যেখানে তিনি সাংগঠনিক ভাবে থাকবেন; এবং সেই কমিটি একদিকে যেমন কংগ্রেস দলকে পুনরুজ্জীবিত করে ২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলিকে একটি জোটে নিয়ে আসতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এমনতর আরও বিবিধ সম্ভাবনা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোনটা ঠিক আর আদতে কী হতে চলেছে তা নিয়ে প্রশান্ত কিশোর স্বয়ং নিশ্চুপ ও তাঁর চলাবলাও বেশ বিভ্রান্তিকর। কিন্তু এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই যে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতিতে অন্যতম কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছেন।

প্রশ্ন হল, প্রশান্ত কিশোর এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন কেন? এর উত্তর বেশ জটিল। কারণ, এই উত্তরে ব্যক্তি প্রশান্ত কিশোরের মুন্সিয়ানার প্রসঙ্গ তো থাকবেই, তার সঙ্গে গত এক দশকে গোটা বিশ্ব সহ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে গেছে তার যোগও একইরকম ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এক কথায় বললে, প্রশান্ত কিশোর এই প্রায়-আমূল পরিবর্তিত আর্থ-রাজনৈতিক ঘরানা-সৃষ্ট এক ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ সম, যার ব্যক্তি-নৈপুণ্য নিঃসন্দেহে সমাজবিজ্ঞানের চর্চার বিষয়। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে, ইতিহাস যদি তার নিজ চালিকা শক্তিকে নির্মাণ করে নিতে জানে, তবে সেই ইতিহাসের গর্ভেই রোপিত ছিল সেই বীজ যে প্রস্ফুটনকালে সারথীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। যদিও বলাই বাহুল্য, প্রশান্ত কিশোরের কাজের সামগ্রিক বিচার এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।

কিন্তু তিনি আদতে করলেন’টা কী? কেনই বা তাঁকে নিয়ে এত হৈচৈ? আপাতদৃষ্টিতে, সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি একটি ‘মামুলি’ চলার পথ নির্দিষ্ট করলেন। 'মামুলি' কারণ, যে যে রাজনৈতিক দলকে তিনি এতাবৎ নির্বাচনী পরামর্শ দিয়েছেন তার প্রধান রণকৌশল হরেদরে একটিই: সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া, অভাব-অভিযোগ, ক্ষোভ-বিক্ষোভকে পর্যালোচনা করে এমন একটি কর্মসূচি সেই দলের জন্য তৈরি করা যাতে তাদের প্রতি জনতার আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। কেউ বলতেই পারেন, এ আর এমন কী কাজ, এই কাজগুলিই তো হওয়ার কথা, আগে তো রাজনৈতিক দলগুলি এইসব কাজের মধ্য দিয়েই নিজেদের জনভিত্তি নির্মাণ করত। কিন্তু সে দিন গিয়েছে। কারণ, আগে সেই কাজগুলির মধ্যে রাজনৈতিক নীতি ও মতাদর্শের প্রভাব ছিল, রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে রকমফের কর্মসূচি ও উদ্যোগ নেওয়ার বিষয় ছিল, সে সব নিয়ে বাক-বিতণ্ডা ছিল। যেমন, সমাজতন্ত্রের ভাবধারার সঙ্গে পুঁজিবাদী ভাবধারার বিরোধ, উদারবাদী পুঁজিবাদের সঙ্গে কট্টর পুঁজিবাদের বিবাদ ও দ্বন্দ্ব, বামপন্থী কার্যসূচির সঙ্গে দক্ষিণপন্থী কার্যক্রমের বেজায় গোলমাল- এসবের ফলে অর্থনীতিতে নীতিগত অবস্থান নিয়ে তুমুল হৈ-হট্টগোল ছিল এবং সমাজও নানা মতে নানা পথে দ্বন্দ্বমুখর হত। তার প্রতিফলন নির্বাচনী রণাঙ্গনে তুমুল ভাবে দেখা দিত। তখন কোনও দল ভাবতেই পারত না যে তাদের জনসংযোগ ও যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণের কাজটা কোনও ভোট-কুশলী এসে করে দেবেন (অবশ্য আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরেই পেশাদার ভোট-ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কদর আছে, তবে তাদের কাজটা অতটা নির্ধারক কিছু নয়)। দলের নেতা ও কর্মীরাই সে কাজে পারদর্শী ও সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এই চিত্রটা গত এক দশকে ধীরে ধীরে বদলে গেল।

আজ এসে প্রায় প্রতিটি সংসদীয় রাজনৈতিক দলের কাছেই এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে রাজনীতি ও অর্থনীতির কন্দরে তেমন বড়সড় মৌলিক পথ নির্মাণের আর কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ, প্রথমত, যে যে উদ্যোগের নিরিখে দেশ জুড়ে মানুষের মননে হিল্লোল উঠত, যেমন, ব্যাপক শিল্পায়ন ও তৎপ্রসূত কর্মসংস্থান (দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকারি উদ্যোগে ভারী শিল্পের পত্তন), জাতীয়করণের কর্মসূচি ও চাকুরির নিরাপত্তা (৬০ ও ৭০’এর দশকে ব্যাঙ্ক, কয়লা, বীমা শিল্পের জাতীয়করণ), শ্রমজীবী মানুষের মজুরি ও অধিকারের ন্যায্যতা ও স্বীকৃতি অথবা যুদ্ধের দামামা ও জাতীয়তাবাদের হিড়িক, পিছিয়ে পড়া মানুষজনের জন্য সংরক্ষণ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং এর সঙ্গে বিভাজনের রাজনীতির জিগির তুলেও সমর্থন আদায়ের চল ছিল। এইসব আলোড়নে মানুষ উপযোগী নেতা ও রাজনৈতিক দলের পেছনে সমর্থনের বরমাল্য নিয়ে হাজির হয়ে যেত।

আজ আর সে সবের প্রয়োজন নেই। কারণ, আজ নতুন করে কোনও অভিনব রাজনীতি বা অর্থনীতি প্রজ্ঞাজাত কর্মসূচি প্রণয়নের সুযোগ বা অবসর নেই। সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতিকে হাতিয়ার করে ২০১৪ ও তার পরবর্তীকালে বিজেপি যে ভাবে ক্ষমতার শীর্ষে চেপে বসেছে, তাদের সে আবেদনেরও তাৎপর্য আজ অনেকটাই ফুরিয়েছে। আজ প্রায় সারা বিশ্ব জুড়েই এক-অর্থনীতি, এক-রাজনীতির বয়ান তৈরি হয়ে যাচ্ছে: এক বৈশ্বিক ভার্চুয়াল জগতের উদয় যেখানে ক্ষমতার রাশ চলে যাচ্ছে দুরন্ত প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক ও তাদের লাগামধারীদের হাতে, রাজনৈতিক-অর্থনীতির বাধ্যত এক-ধরনের পথই নির্মিত হচ্ছে ও কাঠামোগত ভাবে শ্রমজীবী মানুষের নিজ ক্ষমতায়নের উপাদানগুলি দুর্বলতর হচ্ছে। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলিও কতকটা অসহায়। কারণ, চাইলেও ক্ষমতায় গিয়ে শিল্পায়নের পরিসর তৈরি করে চাকরি দেওয়ার অধিকারী আর তারা নয় (শিল্পায়নের মডেলটাই এখন বদলে গেছে), এমনকি সরকারি চাকরি দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের নেই, অর্থনীতির পরিসরে কোনও বড়সড় সংস্কার সাধন করার ক্ষমতাও তাদের ফুরিয়েছে; যা আছে বা তারা যেটা করতে পারে তা বড়জোর, নানা ধরনের সরকারি প্রকল্প মারফত বেঁচেবর্তে থাকার ন্যূনতম উপাদানগুলি মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া। এগুলিকে বলা যায় ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’এর প্রাক-পর্ব। আর এগুলিই আজকের কর্পোরেট দুনিয়া চায়, যে স্বাস্থ্য-শিক্ষা-অন্ন-বাসস্থানের ন্যূনতম ব্যবস্থাপনা সরকারগুলি করুক যাতে সমাজের টেনশন ও অস্থিরতা কোনওভাবে গ্লোবাল ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসরকে ব্যতিব্যস্ত না করতে পারে। সেই কারণে পরস্পর দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ বা এক দেশ কর্তৃক অন্য দেশ দখল অথবা জোর করে জল-জঙ্গল-জমি কেড়ে নেওয়ার প্রয়াস- এগুলির প্রয়োজনও আজ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। আজকের যুদ্ধ প্রযুক্তির যুদ্ধ, ভার্চুয়াল যুদ্ধ আর প্রযুক্তি মারফত দখলদারির যুদ্ধ। ভূ-রাজনৈতিক পরিসর থেকে আমাদের যাত্রা আজ ভার্চুয়াল-প্রযুক্তিগত-তথ্যভিত্তিক এক নতুন রাষ্ট্রের দিকে।

এই প্রেক্ষাপটেই প্রশান্ত কিশোরের মতো নতুন ধরনের ব্যক্তিত্বের উদয় ও প্রাসঙ্গিকতা। রাজনৈতিক দলগুলিও বুঝেছে, তাদের কার্যকারিতা ও ফাংশানালিটি আজ অনেকাংশে অস্তগামী। একমাত্র সামাজিক সুরক্ষা বিলি করা ছাড়া তাদের হাতে আর বিশেষ কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে তাই অভিনব সব প্রকল্প ও কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে জনতার দুয়ারে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ। প্রশান্ত কিশোর ও তাঁর টিম এই কাজগুলিই প্রত্যাশী দলগুলির জন্য পেশাদারি উদ্যোগে এতদিন সাজিয়ে দিয়েছেন। সে কাজগুলি একেকটা রাজ্যে একেকটা দলের জন্য তিনি করেছেন। এ ক্ষেত্রে সফলতার নিরিখে অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের কথা সর্বাগ্রে আসবে।

আজ সময় হয়েছে, এই কাজের একটা জাতীয় কাঠামো তৈরি করা এবং এই কাজগুলিকেই সরকারের প্রধান কর্তব্যকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। এক কথায়, নব-উত্থিত ডিজটাল পরিসরে গভর্নেন্স বা প্রশাসনের উত্তরণ ঘটিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থাপনার দিকে যাওয়া। হতে পারে, এ ক্ষেত্রে প্রশান্ত কিশোর সারা বিশ্বের কাছেই একটি মডেল তৈরি করতে চাইছেন। আর সেই নতুন জাতীয় মডেল নির্মাণের অনুশীলনেই তিনি হয়তো চাইছেন শাসনক্ষমতায় গেঁড়ে বসা বিভাজনকারী দল বিজেপি’কে ২০২৪’এর নির্বাচনে পরাজিত করতে। কারণ, ধর্মের নামে, ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের নামে বিজেপি সারা দেশ জুড়ে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে, তার নিকেশ না হলে সামাজিক-অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে জনতার দুয়ারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও সফলতা পাবে না। তাঁর কাছে এ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর সম্ভবত সে কারণেই প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত হতে চাইছেন তাদের জাতীয় চরিত্রের জন্য, যদিচ আঞ্চলিক দলগুলিকে সম্পূর্ণ আস্থার মধ্যে নিয়েই। উদীয়মান এক নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্যের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তা অবশ্যই ১৯৭৭’এর জয়প্রকাশ নারায়ণের জনতা পার্টি এক্সপেরিমেন্টের থেকে সর্বৈব আলাদা।

এখানেই প্রশান্ত কিশোরের নবতর চ্যালেঞ্জ। এখানেই তাঁর গুরুত্বও। তাঁর এতাবৎ নির্বাচনী সাফল্য ও গভর্নেন্স’এর নানান সৃজনশীল ভাবনার মাপকাঠিতে অনেকে হয়তো তাই তাঁর ওপরে ভরসাও রাখছেন। দেখা যাক। 

  

Tuesday, 3 August 2021

শিক্ষা যখন পণ্যগ্রাসী

সাক্ষরতার ভিন্ন ভুবন

প্রবুদ্ধ বাগচী


ছেলেটাকে দেখে মনে হয়েছিল বেশ চৌখস। কোম্পানির দেওয়া ইউনিফর্ম পরে যখন কাজে এল, প্রথমেই খুব পেশাদারি ভাবে তার কোম্পানির পরিষেবা সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ ভাষণ শুনতে হল আমায়। তারপর কাজ। আদপে সে একজন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি। সদ্য চালু হওয়া অ্যাপ-নির্ভর গৃহস্থালির পরিষেবা কেন্দ্র থেকে বুকিং করতে হয়েছিল তাকে। অবশ্য তাকে ঠিক নয়, এলাকা অনুসারে কোম্পানিই তাকে কাজে পাঠায়। তার কোম্পানির অ্যাপটির খুঁটিনাটি অত বিশদে সত্যিই আমার জানা ছিল না। তার কাছেই শিখলাম, বলতে গেলে প্রায় হাতেনাতে। কীভাবে বুক করলে রিবেট পাওয়া যায়, কীভাবে টাকা পেমেন্ট করে রশিদ পাওয়া যায়, কীভাবেই বা ফিডব্যাক দেওয়া যায় সব সে আমায় শিখিয়ে দিল। কিন্তু মুশকিল হল, যখন আমি তাকে বললাম আপনি যে সব যন্ত্রাংশ কিনে আনলেন তার একটা হাতে লেখা রশিদ দিন। লেখা ও সই করায় দেখলাম তার প্রবল আড়ষ্টতা। কার্যত কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং হাতের লেখায় যে কাগজ আমি হাতে পেলাম তার মর্মোদ্ধার করা কঠিন।

বস্তুত এই ধরনের ঘটনা যে খুব নতুন তা নয়। রাস্তাঘাটে এমন অনেক মানুষের এখন দেখা মেলে যারা নিজেরা শিক্ষা ও সামর্থ্যে তেমন পোক্ত না হলেও মোবাইল ফোন, বিশেষত স্মার্ট ফোন নিয়ে তাদের একটা অন্যরকম সাক্ষরতা আছে। নিজে চোখে দেখেছি রিকশায় আয়েস করে বসে রিকশাচালক হাতের স্মার্টফোনে ইউটিউবে ফিল্ম দেখছে, এমনকি তার জন্য সে সওয়ারি তুলতেও বিতৃষ্ণ। ভ্যানগাড়ির ওপর সব্জি সাজিয়ে পথে নামা যুবক বিক্রিবাটার অবসরে টুক টুক করে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ আদান-প্রদান করছে। চলতে-ফিরতে অনেক তথাকথিত সাধারণ মানুষকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেখতে পাই, নিজেরা সেলফি তুলছেন বা অন্য কোনও ছবি তুলে ফেলছেন হাতের ক্যামেরা-যুক্ত স্মার্টফোনে এবং দ্রুত নিজের বন্ধুমহলে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফেসবুক বা অন্য কোনও মাধ্যমে ভর করে। পরিচিত এক ভদ্রমহিলার বাড়ি কাজ করেন এক মধ্যবয়সী গৃহ পরিচারিকা, যিনি জাতি পরিচয়ে তপশীলী উপজাতি এবং থাকেন বর্ধমান জেলার এক প্রান্তীয় ব্লকে- সম্পূর্ণ নিরক্ষর এই মহিলা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, দিব্যি হোয়াটসঅ্যাপ করতে পারেন।

এখানে দুটো বিষয়ে কথা বলার জায়গা আছে। প্রথমত, স্মার্টফোন প্রচলনের পর এবং প্রতিদিনে তার সর্বস্তরে উপযোগিতা বেড়ে বেড়ে চলার প্রেক্ষিতে একটা সমস্যার কথা আমরা শুনি- অনেক প্রবীণ/প্রবীণা সেই সঙ্গে অন্য একশ্রেণির মানুষ এই সুবিধার নাগাল না পেয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। বলা ভালো, একরকমের অসুবিধের সম্মুখীন হচ্ছেন। তাঁরা ফোন-নিরক্ষর- এই মর্মে একটা পরিভাষাই প্রায় চালু হয়ে গেছে। এঁরা যে সকলেই শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে আছেন তা মোটেও নয়, সমস্যাটা প্রযুক্তির সঙ্গে মোকাবিলা ও পরিচিত হওয়ার। খেয়াল করা দরকার, মোবাইল ফোনে ব্যবহারকারীর জন্য সমস্ত নির্দেশ দেওয়া থাকে ইংরেজি ভাষায়। ইদানীং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার হচ্ছে বটে কিন্তু অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তির আওতায় সেই অনুদিত বাংলার এমন হাল যে তা অনুসরণ করে কাজ চালানো দুষ্কর। মূলত ব্যবহারকারীরা ইংরেজি ভাষার নির্দেশ নিয়েই কাজ করেন। এটা তাই বেশ বিস্ময়কর যে শিক্ষিত সাক্ষর ব্যবহারকারীরা এইসব নির্দেশ মেনে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে ভয় পান, আড়ষ্ট হয়ে থাকেন অথচ প্রায়-নিরক্ষর মানুষও দিব্যি সেটা ব্যবহার করতে পারেন।

কেউ বলতেই পারেন, দৃষ্টিহীন বা বধির মানুষও তো লেখাপড়া শেখেন বা ডিগ্রি পান- শিখবার পদ্ধতির মধ্যে তফাত আছে। কিন্তু জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাঁদের শিক্ষার কিছু নিজস্ব প্রকরণ বৈজ্ঞানিকভাবেই তৈরি করা গেছে। তার সঙ্গে নিরক্ষর মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারের তুলনা টানা সমীচীন নয়। কম্পিউটার প্রযুক্তিও আজকাল সকলেই ব্যবহার করতে পারেন। একটা সময় ছিল যখন কম্পিউটার বিষয়টা নিয়ে মানুষ কিছুই জানতেন না, মুষ্টিমেয় কিছু প্রযুক্তিবিদ ছাড়া। ডেস্কটপ বা পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি) এই ধারণায় একটা বিপ্লব এনে দিয়েছে বহুদিন আগেই। সম্ভবত গত শতকের শেষ দশকে লন্ডনের 'টাইমস' পত্রিকা ‘ম্যান অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল একটি পার্সোনাল কম্পিউটারকে। প্রথম দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছাত্ররাই এই যন্ত্রের সঙ্গে সড়গড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, যারা কম্পিউটারের প্রকৌশল জানতেন। কাকে বলে অপারেটিং সিস্টেম, কোনটা র‍্যাম, রম'এর সঙ্গে র‍্যামের কী পার্থক্য, হার্ড ডিস্ক আসলে কীভাবে কাজ করে, ফ্লোচার্ট কী ইত্যাদি ইত্যাদি খুঁটিনাটি জানতে হত। আজ তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আজ একজন কলা বিভাগের পড়ুয়া বা সাধারণ স্বল্প শিক্ষিত কেউ এতটুকু বিজ্ঞান বা কম্পিউটার প্রযুক্তি না-জেনেও তা অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন।

আসলে এর পেছনে একটা ভিন্ন কারণ আছে। প্রযুক্তি তার নিজের স্বার্থেই সাক্ষরতার এক নতুন পাঠ্যক্রম নির্মাণ করে নিয়েছে যা আমাদের চেনা আদলের শিক্ষা ও সাক্ষরতাকে তোয়াক্কা করে না। প্রযুক্তির আছে একটা অন্যরকমের ভাষা যা শেখার জন্য সহজপাঠ বা ফার্স্ট বুক পড়তে হয় না। এইটাই খেয়াল করার মতো বিষয়। যে কোনও যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা কথা শুনতে পাওয়া যায়- ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’ বা ‘ব্যবহারকারীর পক্ষে সহায়ক’- এই শব্দের পেছনে থেকে গেছে এক বিরাট আয়োজন। যন্ত্র ও প্রযুক্তিকে দ্রুত সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে গেলে অন্য একরকম সাক্ষরতার দরকার। কারণ, প্রযুক্তি কিন্তু স্বয়ম্ভু নয়, তার পেছনে বিপুল বিনিয়োগ আছে, আছে অপার পুঁজির স্বার্থ। তাই শুধু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয় বিজ্ঞান বিভাগের পড়ুয়ার জন্য আর পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরি করলে চলবে না। পিসি ছাড়িয়ে আরও নিজের মতো ল্যাপটপ- তার ক্রেতা চাই, বিপুল ক্রেতা চাই। এত ক্রেতা পেতে গেলে চাই সেই ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের ভিন্ন এক ভাষ্য যা স্কুল-কলেজে শেখার প্রয়োজন হয় না। একইভাবে স্মার্টফোনের হরেকরকম প্রযুক্তি প্রতিদিন পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু ওই যারা শুধু পড়তে জানে লিখতে জানে তাঁদের দিকে তাকিয়ে স্মার্টফোন-এর বাণিজ্য চলা সম্ভব নয়। প্রচুর প্রচুর মানুষকে আনতে হবে উপভোক্তা হিসেবে, ক্রেতা হিসেবে, নইলে বিনিয়োগের ফসল ওঠে না।

সরকারি তথ্যও তো এর পক্ষে সায় দেয়। দেশের সাক্ষরতার হার প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থাৎ যারা কেবল স্বাক্ষর করতে পারেন। আর এই মুহূর্তে দেশে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছেন ৭৬ কোটি মানুষ। আর এই বাজার বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের সঙ্গে জুড়েছে অনলাইন কেনাবেচা ও নানা পরিষেবার সুবিশাল জগৎ যার সুবিধে পেতে গেলে ওই দুটির কোনও একটি হাতে থাকা দরকার। সব মিলিয়ে এক প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য। কম্পিউটার প্রযুক্তি মানে মাইক্রোসফট, স্মার্টফোন প্রযুক্তি মানে গুগল- এই কথা আজ অতি সাধারণ মানুষও জেনে গেছেন আর এই জ্ঞানের জন্য তাঁদের কোনও শিক্ষাসত্রে গিয়ে যোগ দিতে হয়নি, বিএ এমএ পাশ করতে হয়নি। প্রযুক্তির এক অন্য সাম্রাজ্য যারা তাদের ক্রেতার সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের বিস্ফোরণ চায় তারা ঠিক তাদের মতো করে শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছে মানুষকে। যিনি নাম সই করতে জানেন না তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করতে জানেন, জানেন কীভাবে ইউটিউবে গান শুনতে হয় বা ছবি দেখতে হয়। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

লর্ড মেকলে নামে এক সাহেবকে এক সময় আমরা খুব গালমন্দ করেছি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের টিকে থাকার স্বার্থে তিনি আমাদের দেশে একরকম কেরানি তৈরি করার শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। তার সেই বিখ্যাত লেখা আজকাল ইন্টারনেটে পড়া যায়। কিন্তু আজ তার থেকেও অনেক গুন বড় এক সাম্রাজ্য তার পণ্যের সঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছে ভিন্ন এক শিক্ষা আর সাক্ষরতার সিলেবাস। সমাজবিজ্ঞানের চর্চায় এই নতুন দিকটা আমরা খেয়াল রাখছি তো?


Monday, 2 August 2021

কত্তা ঘোড়ায় হাসব!

সিপিএম'এর আত্মোপলব্ধি

সোমনাথ গুহ


সিপিএমের ভুল স্বীকার আর পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়া- এই দুটি বিষয়ের মতো নিয়মিত ও প্রত্যাশিত ঘটনা আমাদের দেশের রাজনীতিতে আর কিছু আছে কি? ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করা এই দলটির মজ্জাগত অভ্যাস। বিশেষ করে দুটি ভুল সম্পর্কে তো তাদের সীমাহীন আক্ষেপ: এক, ১৯৯৬'এ পার্টি যদি একবার জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুমতি দিত তাহলে ভারতবর্ষ আজ নিশ্চিত ভাবে সমাজতন্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেত; দুই, ২০০৮'এ যদি ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া না হত তবে আজও পশ্চিমবঙ্গে তাদের মৌরসি পাট্টা, দাদাগিরি, ঘরে ঘরে খোচরগিরি বহাল থাকত। 

গত বিধানসভা নির্বাচনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পর আবার এই ভুল স্বীকারের মরসুম উপস্থিত। যথারীতি এবারেও অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে তারা নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিল, বাহারি রামধনু-সম মোর্চা গড়েছিল। আমরাই ধর্মনিরপেক্ষ, আমরাই ভবিষ্যৎ, আমরাই বিকল্প ইত্যাদি বলে লম্বা-চওড়া ভাষণ মেরেছিল। ফলাফল বেরনোর পর যখন দেখা গেল ভাঁড়ে মা ভবানী, তখন আবারও সেই অজুহাতের বন্যা। কেউ বলল, মানুষ যদি সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে হরনাথ চক্রবর্তীকে শ্রেয় মনে করে আমাদের কী করার আছে; কেউ বলল, চাকরির চেয়ে মানুষের ভিক্ষার ঝুলি বেশি পছন্দ, হায় গণচেতনার কী অবনতি; তাদের হতাশা এতই চরমে পৌঁছল যে আর কোনও যুৎসই কারণ না পেয়ে তারা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আর সিপিআইএমএল-লিবারেশনকে তাদের হারের জন্য দায়ী করল। এই দুই মঞ্চ ও দল এতে অবশ্য পুলকিত হওয়ার চেয়ে বিস্মিত বেশি, কারণ তারা নিজেরাও ভাবেনি বঙ্গের ভোটে তাদের এত গুরুত্ব আছে!  

প্রায় দু' মাস বাদে স্বয়ং রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র এবার মুখ খুলেছেন। তিনি বললেন, বিজেপি ও তৃণমূলকে এক করে দেখা ভুল হয়েছে। বাইশ বছর আগে থেকেই এটা তাঁরা জানতেন, কারণ বিজেপির পিছনে আরএসএস'এর মতো একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি আছে। অবশ্য বিজেপি দলটা ফ্যাসিস্ট কিনা তা কিন্তু তাঁরা নির্দিষ্ট ভাবে বলতে নারাজ। বাইশ বছর ধরে জানা সত্ত্বেও তাঁরা কী করে এই ভুল করলেন? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো একাধিকবার সতর্ক করেছেন যে তৃণমূলকে হটাতে গিয়ে বিজেপির সঙ্গে সখ্য তপ্ত কড়াই থেকে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। ওনার কথা তো দলে বেদবাক্য। সেটাও তাঁরা বিস্মৃত হলেন? ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বারবার এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, হয়তো তার জন্যই বাংলার ভোটের প্রচারে তাঁকে সে ভাবে দেখাই যায়নি। 

সুর্যবাবু ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে দলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, যার ফলে দিদিভাই-মোদিভাই তত্ত্ব চলে আসে, বিজেমূল কথাটাও চলে আসে এবং আমরাও (পড়ুন নেতৃত্ব) সেটা ব্যবহার করে ফেলি। অর্থাৎ, সবই হয়ে যায় ঘটনার আকস্মিকতায়, কর্মী, সমর্থকদের স্বতঃস্ফুর্ততার কারণে সব ঘটে যায়, দলীয় নেতৃত্বের কোনও সচেতন সূত্রায়নের ফলে এসব ঘটেনি। তিনি এটাও বলেন যে দুটি পার্টিকে একই মুদ্রার দুটি পিঠ বলা হয়েছে, কিন্তু দুটি পিঠ হলেও সেটার তো একটা দিক হেড আরেকটা দিক টেল থাকে! বাহবা! এত তীক্ষ্ণ, অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণ কোনও মার্কসবাদী দল ইতিপূর্বে করেছে কিনা সন্দেহ আছে। যেটা লক্ষণীয়, উনি বারবার জোর দিচ্ছেন যে দুটি দলকে এক করে দেখার এই প্রক্রিয়াটা ঘটে গেছে, এটা দলীয় নেতৃত্বের কোনও সচেতন সিদ্ধান্ত নয়। আবার ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’- এটা তিনি বলছেন বিজেপি রটিয়েছে, এতে নেতৃত্ব তো বটেই, কর্মী সমর্থকদেরও কোনও দায় নেই। 

এর কিছুদিন পরেই বর্ষীয়ান নেতা বিমান বসু চমকে দিয়ে বললেন, জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁরা যে কোনও দলের সাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে রাজি আছেন। হতচকিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বারবার বললেন, গলা চড়িয়ে বললেন যে তাঁরা তৃণমূলের (শব্দটার ওপর জোর দিলেন) সাথেও যৌথ আন্দোলনে রাজি। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সর্বত্রই চিরকালই নাকি এটা তাঁদের স্ট্যান্ড ছিল। অনেকেই বলবেন, এই দলটা চিরকালই সব কিছু একটু দেরিতে উপলব্ধি করে। প্রশ্নটা হল, আদৌ তারা উপলব্ধি করে, না উপলব্ধি করার ভান করে? এই সন্দেহটা হয়, কারণ, এই দুই নেতার বক্তব্যে নানা ফাঁক তো আছেই এবং যতটুকু সার আছে সেটার সাথেও নীচুতলার প্রতিক্রিয়া আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

প্রথম কথা, বিজেপি-তৃণমূল এক নয় বলার পাশাপাশি সূর্যকান্ত মিশ্র এটাও কিন্তু বলছেন যে ২০০১ থেকে ২০১৬- সব নির্বাচনেই এদের মধ্যে আঁতাত ছিল। তাহলে ঐ নির্বাচনগুলিতে বিজেমূল বা দিদিভাই-মোদিভাই বা দিদিভাই-অটলভাই শ্লোগান এল না কেন? এইসব নির্বাচনে বিজেপির ভোট তো ছিল নগণ্য। তাহলে তারা কি নিঃস্বার্থ ভাবে তৃণমূলকে সাহায্য করে গেছে, এমনকি ২০১৪'এ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরেও? তাহলে তো বিজেপি দলটা অত্যন্ত মহানুভব বলতে হয়! সিপিএম'এর কথায়, এদের মধ্যে যদি সত্যিই সমঝোতা হয়ে থাকে তাহলে তৃণমূল লাভবান হয়েছে, তাদের শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ বিহার, অসম বা সর্বত্র দেখা গেছে যে এদের সাথে সমঝোতার ফলে স্থানীয় দলের শক্তি হানি হয়েছে। সুজন চক্রবর্তী তাঁর নেতাদের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তৃণমূল ঘাড়ে করে বিজেপিকে এই রাজ্যে নিয়ে এসেছে, সুতরাং তাদের সাথে বোঝাপড়ার কোনও জায়গাই নেই। এর উত্তরে বলা যায়, এমনটা নয় যে সিপিএম একেবারে সাত্ত্বিক, কোনওদিন বিজেপির সাথে গা শোঁকাশুঁকি করেনি। যাক গে ওসব পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। কিন্তু ২০১৯'র লোকসভা নির্বাচনের পরপরই সীতারাম ইয়েচুরি স্বীকার করেন, তাঁদের দলের বহু সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। সবার স্মরণে আছে যে এর ফলে সিপিএমের প্রায় ২০ শতাংশ ভোট বিজেপির ঝুলিতে যায় এবং তারা ১৮টা আসনে জয়লাভ করে। তাহলে কাঁধে করে কে নিয়ে এল সংঘীদের? এখানেও সিপিএমের যুক্তি আছে। ২০১৮'র পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাদের ওপর এত অত্যাচার হয়েছিল যে তারা সদলবলে বিজেপিকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিল। অত্যাচারের ফলে একটা বামপন্থী দলের কর্মী সমর্থকরা পালটি খেয়ে যাবে? এত মেরুদণ্ডহীন? তাহলে তো বিহারে এতদিনে সিপিআইএমএল-লিবারেশন লুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। গত পঞ্চাশ বছরে তাদের তো সেখানে বারে বারে গণহত্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, হাজারও কর্মী শহীদ হয়েছেন। 

আসলে সিপিএম'এর বিপুল সংখ্যক কর্মী জীবনের শুরু থেকেই তাদের দলকে ক্ষমতায় আসীন দেখতে অভ্যস্ত। ১৯৭৭ সালে যখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে তখন পঞ্চাশের দশকের শেষে যাদের জন্ম তারা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত। সংগঠন গড়ার জন্য তাদের আর নতুন করে প্রায় কিছুই করতে হয়নি। সব কিছু রেডিমেড পেয়ে গেছে। কংগ্রেসি কিছু নেতাদের হাত করে নেওয়ার ফলে তাদের সমর্থকরা অচিরেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। নকশালদের তারা নির্মম ভাবে দমন করেছে, তাতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পুলিশ প্রশাসন দিয়ে কাজ হাসিল করেছে। এর ফলে পুরো সংগঠনটাই অমেরুদণ্ডি হয়ে গেছে, যার ফলে ২০১১'এ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেই পুরো সংগঠন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। প্রতিরোধ করা ব্যাপারটা সম্পর্কেই তারা ওয়াকিবহাল নয়, এটা তারা কোনওদিনও করেনি। ক্ষমতার বাইরে থাকা তারা ভাবতেই পারে না। এর জন্য যাঁরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যেমন ঋতব্রত বা ইদানীং অজন্তা বিশ্বাস, তাঁরা হয় দল পাল্টাচ্ছেন নয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণগান করছেন।   

আরেকটা বিষয়- সিপিএম এমন একটা দল যারা সমস্যায় বা বিপদে পড়লে সব সময় তার মধ্যে চক্রান্তের গন্ধ পায়- বিরোধীদের চক্রান্ত, কেন্দ্রের চক্রান্ত, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, সিয়া! নকশালবাড়ি তো সিয়ার চক্রান্ত, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামও তাই, ‘দেখলে না ক্ষমতায় আসার পরই হিলারি ক্লিন্টন কীভাবে মমতার কাছে ছুটে এল’- এক্কেবারে নির্ঘাৎ প্রমাণ যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই আসলে ২০১১'এ তাদের পরাজয়ের মূলে ছিল। ‘আমরা যে ঐ পারমাণবিক চুক্তি আটকে দিয়েছিলাম’, সঙ্গে বিজ্ঞ হাসি। কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম তো ২০০৮'এর আগেই ঘটে গেছে! আরে ওরা সুযোগের জন্য ওত পেতে ছিল! আর সঙ্গে দোসর পেয়ে গেছে মিডিয়া, নকশাল সহ সমস্ত বিরোধীদের। এরা গতানুগতিক ভাবে অনুতাপ প্রকাশ করে, কিন্তু তা অন্তঃসারশূন্য; এদের অভিধানে অন্তর্দর্শন বা আত্মসমীক্ষা বলে কিছু নেই, কোনওদিন ছিল না।  

সিপিএম এখন দিশাহারা। কংগ্রেস সরে যাচ্ছে, তৃণমূলের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। লোকসভায় একটা আসনও যদি জিততে না পারে তাহলে তো ৪.৭ শতাংশ যে ভোট আছে সেটাও হরিবোল হয়ে যাবে। তাই তারা ছক করছে যদি একটু তৃণমূলের দয়াদাক্ষিণ্য হয়। কিন্তু কর্মীবাহিনী তো সেটা সহজে মানবে না। চৌত্রিশ বছর ধরে ’৭২ থেকে ‘৭৭-এর গল্প শুনিয়ে কংগ্রেসের সাথে গলায় গলায় হয়েছ, আবার তৃণমূলের সাথেও তাই হবে? বলা যায় না, এদের কর্মীদের যা হাল, টিকে থাকার জন্য হয়তো এটাও তারা মেনে নেবে। যদি অবশ্য মাননীয়া দয়াভিক্ষা করেন!


Sunday, 1 August 2021

শিক্ষাদীক্ষার অশ্বডিম্ব!

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় সিঁদুরে মেঘ

শোভনলাল চক্রবর্তী


জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন যা ইতিমধ্যেই সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা সহ আরও চারটি আঞ্চলিক ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠ, ডাক্তারি পড়ার পরিকাঠামো বাড়ানোর জন্য আরও কলেজ তৈরি, যার মধ্যে বাংলায় তৈরি হবে দুটি নতুন কলেজ, ডাক্তারি পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে ওবিসি সংরক্ষণ বৃদ্ধি করা (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে নয়া মন্ত্রীসভাতেও ওবিসি মুখের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে)। বোঝাই যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে এই ওবিসি প্রেম। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্প যেমন, গ্রামে প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য 'বিদ্যাপ্রবেশ', শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য 'নিষ্ঠা ২.০' উল্লেখযোগ্য। সাইন ল্যাংগুয়েজ (সাংকেতিক ভাষা)কে  পৃথক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যা বিশেষভাবে সক্ষম পড়ুয়াদের উপকারে লাগবে। 

এই পর্যন্ত সব ঠিকই আছে। এর পরেই প্রধানমন্ত্রীর ঝুলি থেকে বেরিয়েছে একাধিক বেড়াল যাতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে শিক্ষাবিদ মহলে। প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন উচ্চ শিক্ষায় একাডেমিক ব্যাংক অফ ক্রেডিটের কথা, যা নিয়ে চটজলদি নির্দেশিকা জারি করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। যে নির্দেশিকা অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষায় যে কোনও সময় পড়ুয়ারা যে কোনও কোর্সে ভর্তি হতে ও ছাড়তে পারবে। এহ বাহ্য, পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েও পরে ফের সংশ্লিষ্ট বা অন্য কোর্সে যুক্ত হয়ে ক্রেডিট তুলে ডিগ্রি পেতে পারবেন! এমন মামাবাড়ি ব্যবস্থায় পড়াশোনা যে ক্রমে লাটে উঠবে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন আছে কী? প্রধানমন্ত্রীর তরফে এই ক্রেডিট ব্যাংকের সুবিধা সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, এর ফলে উচ্চ শিক্ষায় পড়ুয়ারা একসঙ্গে সম্পর্কহীন অনেক বিষয়ে পড়তে পারবেন, যেমন, কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং'এর পড়ুয়া ইচ্ছে করলে মিউজিক বা ইতিহাস থেকে ক্রেডিট সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে তাঁদের জানার ও জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। 

এখানে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে যে, উচ্চ শিক্ষায় পড়ুয়ারা একসঙ্গে অনেকগুলি সম্পর্কহীন বিষয়ে পড়ে কী করবেন?  উচ্চ শিক্ষায় পড়ুয়ারা যান কোনও একটি বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী হওয়ার জন্য। তবে কি সেই রাস্তা সুকৌশলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে? এই নীতির ফলে শিক্ষার মান লঘু হবে এবং গভীর জ্ঞানচর্চার সুযোগ আর থাকবে না। বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার বাহাদুর উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এমন মানুষ চাইছেন যারা প্রকৃত অর্থেই হবে 'জ্যাক অফ অল ট্রেড, মাস্টার অফ নান'। 

এ তো গেল বহিরঙ্গের দিকটা। এবার আসা যাক প্রয়োগগত দিকটায়। প্রথমত, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্তর থেকে বার্ষিক পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে যে সেমেস্টার ও চয়েস বেসড ক্রেডিট সিস্টেম চালু করা হয়েছে তার সুযোগ বাস্তবে কত জন পরীক্ষার্থী পান, তার কোনও হিসেব কি সরকার পক্ষের কাছে আছে? থাকলে দেখা যেত, সেই সুযোগ পাচ্ছেন শুধুই সমাজের উঁচুতলার মানুষ। ক্রেডিট ব্যাংকে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী পড়ুয়ারা একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহু বিষয়ে প্রয়োজনীয় ক্রেডিট সংগ্রহ করে ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন। এই ক্রেডিট দেশি-বিদেশি যে কোনও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সংগ্রহ করা যাবে। বেশ, কিন্তু কীসের বিনিময়ে? সেখানেই আসল খেলা। বিনিময় মূল্য এখানে মেধা নয়, শুধুই অর্থ। একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেডিট সংগ্রহের জন্য প্রচুর ফি গুনতে হবে। উচ্চ শিক্ষার খরচ এক ধাপে অনেকটা বেড়ে যাবে। ক্রেডিট ব্যাংক চালু হলে বেসরকারি ও বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিই ফয়দা পাবে এবং শহরের ধনী ঘরের পড়ুয়ারা টাকার বিনিময়ে ক্রেডিট সংগ্রহ করবে। বিপাকে পড়বে গ্রামের ও দরিদ্র ঘরের পড়ুয়ারা। উচ্চ শিক্ষায় এইসব সুযোগ পেতে গেলে আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে  ন্যাক'এর 'এ' গ্রেডে থাকতে হবে, এনবিএ'তে ৬৫০ পয়েন্টে থাকতে হবে এবং বিভিন্ন বিদেশি র‍্যাঙ্কিং-এর প্রথম সারিতে থাকতে হবে। আমাদের দেশের ক'টা সরকারি প্রতিষ্ঠান সেই তালিকায় আছে? এই প্রশ্নের উত্তর হাওয়ায় উড়ছে। 

এবার আসা যাক অনলাইন পড়াশোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে, যা আমাদের দেশের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। সারা দেশ জুড়ে যখন প্রায় সমস্ত শিক্ষক সংগঠন অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পর্কে তাঁদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে অনলাইনে পড়াশোনাতেই দেশের ভবিষ্যৎ। তিনি অনলাইন ক্লাসের ভূয়সী প্রশংসা করেন ও বলেন যে পরীক্ষা অনলাইন হওয়ায় পড়ুয়াদের পরীক্ষা ভীতি কেটে গেছে এবং তারা চাপহীন হয়ে পড়াশোনা করছে। আমাদের মতো গরিব দেশে অনলাইন ক্লাস করার পরিকাঠামো, যেমন স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ, উপযুক্ত ডাটা ইত্যাদিতে পয়সা খরচ করা যখন একটা বিপুল অংশের মানুষের কাছে স্বপ্ন এবং একটা আরও বড় অংশের মানুষের কাছে বিলাসিতা, তখন সে সব ভুলে গিয়েও যদি চারপাশে তাকাই তাহলে বাস্তবতা কি তাই? দেখা যাচ্ছে, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অনলাইন পড়া অনেকটাই সামলাচ্ছেন পড়ুয়ার বাবা মায়েরা। স্কুল থেকে নির্দেশিকা দিয়ে বলা হচ্ছে যে পড়ুয়ারা ঠিক করে নিয়মিত ক্লাস করছে কিনা তার দেখভাল করতে হবে বাবা মাকেই। ফলে এখন বেশিরভাগ বাড়ির একটি ঘর ক্লাসরুম, অন্য ঘরটি বাবা বা মায়ের অফিস। বাড়ি বলে আর কিছু নেই। যে বাড়িতে বাবা মা দুজনেই কর্মরত সেখানে অবস্থা আরও খারাপ। বহু বাবা মায়ের চাকরি গেছে করোনা কালবেলায়। সেখানে বেড়েছে গার্হস্থ্য হিংসা যার শিকার শিশুরা। জাতীয় শিশু অধিকার কমিশন তাদের রিপোর্টে তুলে ধরেছে সেই ছবি। এই ভয়ঙ্কর সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ক্লাসের স্মার্টফোন গ্রাস করেছে শৈশব। আকাশ, রূপকথা, গান, নদী, ছড়া ভুলে তারা ডুব দিয়েছে মোবাইলের অতলে। আমাদের দেশের তেরো বছরের বেশি যাদের বয়স তাদের ক্লাস করার জন্য প্রয়োজন হয়েছে স্মার্টফোন, তাদের ৩৭ শতাংশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে পর্ন সাইটে। দশ বছর বয়সী যারা তারা আসল বন্ধু ছেড়ে মেতেছে সমাজ মাধ্যমের নকল ফ্রেন্ড নিয়ে। এর ফলে এদের শরীর ও মনের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। এরা ক্রমশ হয়ে উঠছে ভাঙা মনের মানুষ, অস্থির, বিরক্ত, স্বার্থপর। সমীক্ষাটি এই পরিস্থিতিতে সরাসরি দায়ী করেছে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থাকে। ছোট, মেজ, বড় সবার কাছেই স্মার্টফোন। পর্দা থেকে দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা সরে গেলেই মোবাইল তার মায়া, বিভ্রম, মোহের রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে অপরিণত মনের কাছে। সে বড় ভয়ঙ্কর হাতছানি: মিথ্যের, অপরাধের, লোভের। 

প্রযুক্তির জয়গান গেয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা বন্ধ হোক। ধিক এই মোবাইল নিয়ে দিনরাত বসে থাকার প্রযুক্তি। আগুন প্রয়োজন, বিদ্যুৎ প্রয়োজন- তবে সে কি হাতে করে খেলার জিনিস? স্মার্টফোন দিয়ে অনলাইন ক্লাস হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতবর্ষের মতো গরিব দেশের জন্য অনলাইন ক্লাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হতে পারত টেলিভিশন চ্যানেল। চ্যানেল বাড়িয়ে ইচ্ছামতো ক্লাস করা যেত। তাতে খরচ কমত। একটা টেলিভিশন দিয়ে অনেকে ক্লাস করতে পারত। কিন্তু আমাদের দেশ ধর তক্তা মার পেরেকের দেশ। যে প্রধানমন্ত্রীর সরকার বলছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে করোনায় কোনও সমস্যা হয়নি, অক্সিজেন ঘাটতির জন্য কেউ মারা যাননি, তারা যে দুদিন পরেই বলবে দিল্লির বুকে কোনও গণচিতা জ্বলেনি, গঙ্গা দিয়ে কোনও শব ভেসে যায়নি, তাতে আর আশ্চর্য কী। আর তারাই একটা প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিয়ে বলছে অনলাইন ক্লাস লা জবাব, এটাই স্বাভাবিক। 

একাদশ-দ্বাদশ ও কলেজের অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে যত কম বলা যায় ততই ভালো। সেখানে ক্লাস চলছে ক্লাসের মতো, পাশাপাশি চলছে উচ্চগ্রামে গান, গেম, নেটফ্লিক্স, লাইভ সেক্স চ্যাট (এই দলটি আবার পর্ন সাইট দেখে দেখে ক্লান্ত) ইত্যাদি। হাতে গোনা দু' চারজন ক্লাস করে। অনলাইন পরীক্ষা এখন পুরোটাই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে চুরি। এটা সবাই জানেন এবং মেনে নিয়েছেন। পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধানের জন্য এখন অনেককে পাওয়া যায়, অবশ্যই টাকার বিনিময়ে। স্কুল, কলেজ সমস্ত স্তরে এই ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। এছাড়াও নেটের যে কোনও সার্চ ইঞ্জিনে প্রশ্ন টাইপ করে দিলেই উত্তর পাওয়া যায়। সেটাই পড়ুয়ারা লেখে। লিখে পুরো নম্বর পায়। কম নম্বর দেওয়া হলে বাবা মায়েরা স্কুলে এসে মোবাইল খুলে দেখিয়ে দেন যে তাঁর সন্তান ঠিক লিখেছে! বেশির ভাগ পড়ুয়ার কাছেই পড়ার জন্য পাঠ্য বই বলে আর কিছু নেই। কারণ, পড়ার কিছু নেই, পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এখন আর কিছু পড়ার দরকার হয় না। সত্যিই পড়াশোনা আজ একটা দূরগত নক্ষত্রের মতো। 

এই গা শিউরে ওঠা ব্যবস্থার জয়গান গাইছেন প্রধানমন্ত্রী! বোঝাই যাচ্ছে, তিনি চাইছেন সবাই তাঁর মতো শিক্ষিত হয়ে উঠুন। স্কুল, কলেজ খোলা আপাতত অতএব দূর অস্ত। আমাদের দেশে লেখাপড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে গেলে এখন একটি দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের দরকার। সেই যুদ্ধ লড়ার লোক সহজে পাওয়া যাবে কী?

 

Saturday, 31 July 2021

বিগ মিডিয়ায় বামপন্থীদের টিউটোরিয়াল!

নিছক সেবা নয়, শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে নীতির লড়াই

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


পশ্চিমবঙ্গে গত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের আসন শূন্যে নেমে আসায়, দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক ভাবে বামশক্তিকে কেউই ছেড়ে কথা বলছেন না। সে তুলনায় কংগ্রেসের দুরবস্থা নিয়ে তেমন সোরগোল খুব একটা কিছু নেই। বিশেষ করে বিগ মিডিয়ায় তো বামেদের প্রতি নানারকম টোটকা ও পরামর্শের ছড়াছড়ি। যেন টিউটোরিয়ালের আসর বসেছে। ‘আনন্দবাজার’ বা ‘এই সময়’এ এ বিষয়ক ঘন ঘন উত্তর-সম্পাদকীয়গুলি পড়লে মনে হবে বামেদের এই ভরাডুবির কারণে তারা যারপরনাই চিন্তিত এবং কী উপায়ে আবারও বাম-উত্থান হতে পারে তার জন্য নানাবিধ পরামর্শ ও উপদেশ দিতে তারা কসুর করছে না। অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে প্রণব বর্ধনের মতো বিদ্দ্বজ্জনেরা বহু শব্দ ব্যয় করে লিখছেন বা বলছেন। মোদ্দা কথায়, সকলেই বাম বিধ্বস্ততায় কাতর। আর তাঁদের এই যাতনায় প্রধানত একটি অভিমুখই খুব স্পষ্ট করে পাচ্ছি- তা এই যে, বামেরা মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কারণ, তাঁরা মানুষের কথা শুনতে অনাগ্রহী এবং পরিস্থিতির বিচারে রণকৌশলগত ভাবে নানারকম ভুলভ্রান্তি করে চলেছেন।

আমি অবশ্য জানি না, এ দেশে কোন দল মানুষের কথা শুনে কাজ করে! ভোটের আগে তারা কথা শোনার ভান করে, কিছু কিছু জনমুখি উদ্যোগ নেয় এবং এমন একটা হাওয়া তৈরির চেষ্টা করে যে ক্ষমতায় এলে তারা মানুষের নানাবিধ উপকারে লাগবে ও তাদের সরকার আপেক্ষিক বিচারে মানুষের পক্ষে কাজ করবে। মানুষও সময়ের নিরিখে ভোটের মুখে একটা অদৃশ্য যূথবদ্ধতা গড়ে তোলে- সমর্থন ও বিরোধিতার একটা ম্যাট্রিক্স তৈরি হয় এবং সেই সুবাদেই খুব নিকৃষ্ট ধরনের সরকার চালানো দলটির পরাজয় ঘটে। কখনও কখনও সরকার ততটা নিকৃষ্ট না হলেও, বিরোধী দল এমন একটা সম্ভাবনাময় পরিবেশ-পরিস্থিতির রূপকল্প হাজির করে যে মানুষ তাতে বিশ্বাস করে নতুন সরকারের অভিষেক ঘটায়। তবে হ্যাঁ, মানুষের কথা শোনার একটা আলতো প্রক্রিয়া থাকে, তা এই অর্থে যে, কোন কোন বিষয় নিয়ে জনতা ক্ষুব্ধ ও তাদের সমস্যার মুল জায়গাগুলিকে তারা কীভাবে দেখছে- সেই সব বুঝে নির্বাচনী রণকৌশলকে সাজাতে হয়। তবে এইসব সমস্যার উপাদানগুলিকে বোঝার জন্য নানাবিধ সমীক্ষারও প্রচলন আছে এবং পেশাদার সংস্থার সাহায্যেও তার আঁচ পাওয়া যেতে পারে। যেমন, এবারের ভোটে জনমতকে বুঝতে তৃণমূল দল আই-প্যাক’এর সাহায্য নিয়েছিল।

উপরন্তু, নির্বাচনী রণাঙ্গণে ‘কোর্স কারেকশন’ বলে একটি কথা আছে। যে কোনও দলই একগুঁয়েমি ছেড়ে যদি জনতার রোষের কারণগুলিকে অনুধাবন করতে পারে এবং সেই মোতাবেক নিজেদের পরিমার্জন করে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে নির্বাচনী বিপর্যয়কে হয়তো এড়ানো যায়। এর জন্যও পেশাদার সংস্থার সাহায্য নেওয়ার চল শুরু হয়েছে। কারণ, দলের নিচুতলা থেকে আসা ফিডব্যাকগুলি সব সময় নির্ভরযোগ্য হয় না।

পেশাদার সংস্থার সাহায্যেই হোক অথবা নিজ দলের কর্মীদের ফিডব্যাকের ভিত্তিতে- আসল জায়গাটা হল বাস্তবতাকে অনুধাবন করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলিকে প্রতিফলিত করতে পারা। এক বড় সংখ্যক মানুষ যদি মনে করতে শুরু করে যে অমুক দলটির ওপর নির্ভর করলে তাদের দাবি-দাওয়া কিছুটা পাত্তা পেতে পারে, তবে সেই দল লড়াইয়ের ময়দানে কার্যকরী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। জেতা-হারা তো পরের প্রশ্ন। এবারের রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট কোনও প্রতিপক্ষই ছিল না- সেটি বোঝার জন্য নির্বাচনী ফলাফল অবধি অপেক্ষা করার দরকার পড়েনি। তা খালি চোখে গত কয়েক বছরেই বেশ বোঝা যাচ্ছিল। এর কারণ আর কিছুই নয়, বামপন্থার নীতিগত অবস্থান থেকে তাদের বিচ্যুতি ও কৌশলগত দান ফেলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অলীক (কু) বাসনা। একে ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’ বললে অত্যুক্তি হয় না। মনে হয় না, বাম বিপর্যয়ের এই মৌলিক দিকটি (নীতিগত বিচ্যুতি) নিয়ে বিগ মিডিয়া বেশি অগ্রসর হতে চাইবে। তাদের বেদনাবোধের একটা বড় কারণ সম্ভবত বিজেপি’র মতো একটি ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্ট শক্তির এ রাজ্যে প্রায় শূন্য থেকে প্রধান বিরোধী পক্ষ রূপে উত্তরণ। সেই বেদনার যাথার্থ্য আছে এবং বামপন্থীদেরও উচিত এই ধরনের ফ্যাসি-বিরোধী সরব রাজনৈতিক উদারবাদীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, বামপন্থীদের বিপর্যয়ের কারণগুলিকে বিগ মিডিয়ার উত্তর-সম্পাদকীয়র প্রান্তরে বেঁধে রাখা। তাহলে আরও বড় বিপর্যয় বামপন্থীদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিগ মিডিয়ার বিশ্লেষণকে অতিক্রম করে বামপন্থীদের বুঝতে হবে তাদের নীতিগত অবস্থান থেকে স্খলনের তাৎপর্যকে। এক কথায়, শ্রমজীবী শ্রেণির পক্ষে থাকার যে রাজনীতি দিয়ে বামপন্থার পরিচয়, তার থেকে শত যোজন দূরে সরে যাওয়ার তাদের যে বিচ্যুতি আর সে বিচ্যুতির কারণে তাদের ফেলে যাওয়া পরিসর-হরণের কাহিনিকেও বুঝতে হবে।

অতএব, অল্প কথায়, বামপন্থীদের (বামফ্রন্টকে গণ্য করে) গৌরব হারানোর পেছনে দুটি বড় কারণকে গভীর চর্চায় নিয়ে আসা উচিত। এক, একুশ শতকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক-অর্থনীতির পরিসরে শ্রমজীবী মানুষের বিবর্তনকে অনুধাবন না করার চেষ্টা করে উদারবাদী পুঁজিবাদের পক্ষে জোরালো ভাবে দাঁড়িয়ে পড়া এবং দুই, ফলত শ্রমজীবী মানুষের পরিসরটি অন্যের দ্বারা দখলিকৃত হওয়া।

প্রথম কারণটির ক্ষেত্রে বলতেই হয়, আজও বামফ্রন্ট সম্যক ভাবে বুঝে উঠতে পারেনি, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে জোরপূর্বক কৃষিজমি অধিগ্রহণ ও কর্পোরেট কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজকে চাকুরি জোগানের যে খোয়াব তারা দেখেছিল তা এক অলীক কুনাট্য ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। কারণ, এ সত্য প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে আধুনিক কর্পোরেট শিল্পে চাকরি হয় খুব স্বল্পজনের। বরং, দখলিকৃত কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষের যে কর্মচ্যুতি হয় তা ওই সামান্য কর্মসংস্থানের থেকে অতি বহুল পরিমাণে বেশি। এই কথা শীর্ষ আদালত তাদের রায়েও পরিষ্কার ভাবে বলেছিল। সিপিএম’এর তাত্ত্বিক নেতা প্রভাত পট্টনায়ক এবং বামফ্রন্টের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র মহাশয়ও এই কথাগুলি স্পষ্ট ভাবে লিখেছিলেন। কিন্তু কর্পোরেট বিগ মিডিয়া দ্বারা প্রশংসিত ও উদারবাদী পুঁজিবাদে আচ্ছন্ন বামফ্রন্ট তখন কর্পোরেট শিল্প স্থাপনার লক্ষ্যে আন্দোলনরত কৃষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারপরের পরিণতি আমরা জানি। আর সেই পতন থেকে বামফ্রন্ট তো উঠে দাঁড়াতে পারলই না বরং আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হল নিজেদের সেই পুরনো অবস্থানকে আঁকড়ে ধরে থাকায়; এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়া হল এবারের নির্বাচনে সিঙ্গুরে গিয়ে সিপিএম প্রার্থীর প্রতীকী শিলান্যাস করে সেই পুরনো খোয়াব দেখানোয়। সবটা মিলিয়ে তাদের নীতিগত অবস্থান প্রকারান্তরে দাঁড়িয়ে গেল শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে। তাই প্রশ্নটা নীতি ও অবস্থানের। এই জায়গাটা যতদিন না তাঁরা বুঝতে পারবেন, ততদিন তাঁদের ‘ঘুরে দাঁড়ানো’র কোনও আবহই তৈরি হবে না। তাঁরা তাঁদের যথার্থ সমালোচকদের যত ইচ্ছে গালমন্দ করতে পারেন, কিন্তু আখেরে ক্ষতিটা যে তাঁদেরই হচ্ছে সেটা তাঁরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবেন ততই মঙ্গল।

আর দ্বিতীয় কারণটি স্বতঃসিদ্ধ। পরিত্যক্ত ভূমি কখনও পড়ে থাকে না। গরিব শ্রমজীবী মানুষকে পরিত্যাগ করে যে ‘উন্নয়ন’এর রথ ছোটানোর কথা ভাবা হয়েছিল, সেই পরিত্যক্ত গরিব কৃষকের পাশে রাজনীতির কারণেই তৃণমূল দল দাঁড়িয়ে গেল। নিছক দাঁড়ালেই তো চলে না, বামপন্থী ভূষণকেও তারা শিরোধার্য করল। তাদের বলতে আটকালো না যে তারাও একটি বামপন্থী দল। তারা জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আইন পাশের পক্ষেও কাজ করল। ক্ষমতায় এসে এক নতুন ধরনের জনপ্রিয়মূলক ও জনমুখি কার্যক্রমের ধারা প্রবর্তন করে তারা গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের অনেকটা আস্থাও অর্জন করল। তাদের নানারকমের নেতিবাচক কাজের ধারাগুলিকে তারা সেই জনমুখি কর্মসূচি দিয়ে কিছুটা আড়াল করতেও সক্ষম হল। অর্থাৎ, এখানেও সেই নীতিগত প্রশ্নেই তৃণমূল কিন্তু জনমুখি একটা অবস্থান গ্রহণের প্রচেষ্টা নিল যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনের আস্থা অর্জনে কিছুটা সফল হল। অথচ, বামফ্রন্টের বাইরে যে বামপন্থীরা রয়েছে, তারা কিন্তু বামফ্রন্টের ফেলে যাওয়া জমিতে দাগ কাটতে পারল না। সেও বামপন্থার এক সংকটই বটে!

তাই, মনে হয় না, বামপন্থীরা নিছক সুবোধ বালক হয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে। নীতির প্রশ্নে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তাদের স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে যা কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে দ্বন্দ্ব আহ্বান করবে। বুঝতে হবে, বামপন্থীরা থাকুক বা না থাকুক, শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন কিন্তু থেমে থাকে না। গত দশ মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির উপকন্ঠে কৃষকদের দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন সে কথা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট (অবশ্য এই আন্দোলনে অন্যান্য শক্তির সাথে সাথে নানাবিধ বামপন্থীদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়)। সেখানে বিগ মিডিয়ার সমালোচনাকে ভয় করলে চলবে না। নানা ধরনের বুদ্ধিজীবী, অ্যাকাডেমিশয়ানদের ‘পেপার’ উৎপাদনের তাগিদে বিচিত্র গবেষণা অনুসারী নানা ধরনের একাডেমিক মাত্রাধারী উপাদানে ভরপুর তর্জায় প্রভাবিত হয়ে বিভ্রান্ত হলেও চলবে না। শ্রমজীবী জনতার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রাখলেও তা কাজে দেবে না যদি না নীতিগত ভাবে তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আওয়াজ তোলা যায়। আর সে নীতি হল, শ্রমজীবী শ্রেণির পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রাজনীতির পথকে নির্ধারণ করা। সে কাজে ঝুঁকি আছে, আশঙ্কা আছে। ভুললে চলবে না, এই ঝুঁকিপূর্ণ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই বামপন্থীরা শুধুমাত্র এ রাজ্যেই নয়, সারা দেশের বহু জায়গায় প্রবল ভাবে শক্তিশালী হয়েছিল।

আজ বামপন্থার পুনরুত্থানের প্রশ্নকে তাই নবউত্থিত রাজনৈতিক-অর্থনীতির বাতাবরণে শ্রেণি অবস্থান নেওয়ার পথ ধরেই এগোতে হবে। তেভাগা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব ও প্রসার কিন্তু বাস্তব শ্রেণি সংঘাতের জমি থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল। তাই, বামপন্থীরা যদি শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎ-অনুসৃত অনুশীলন থেকে বিচ্যুত হয় তাহলে তাদের শৃঙ্খল ব্যতীত সব কিছুই কিন্তু খোয়াতে হবে; এ রাজ্যে কফি হাউস, কর্পোরেট মিডিয়ার উত্তর-সম্পাদকীয় ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার আর পেপারেই আবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। আশাকরি, সকলে না হলেও অনেকেই, এই প্রগাঢ় সত্য ও প্রখর বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে সক্ষম।