Monday, 9 February 2026

বাণিজ্য লেনদেনের অজানা পরিণতি?

'সব চুক্তির সেরা' না 'সব বোঝার ভার'?

কৌশিকী ব্যানার্জী



সাম্প্রতিককালে ‘ট্রাম্প-ট্যারিফ’/ ‘শুল্কবাণ’ এই শব্দগুলো আমজনতার কাছে অতি পরিচিত। ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে আমেরিকায় আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ, তারপর গত ২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমাজ মাধ্যমে ইন্দো-মার্কিন নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা (যেখানে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ করার কথা বলা হয়) নাটকীয়তার চূড়ান্ত প্রদর্শন বলে অনেকেরই অভিমত। অবশ্য, ৬ ফেব্রুয়ারি দু-দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই ঘোষণাকে সিলমোহর দিয়েছে। তবে এখনও চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও এই চুক্তিকে ‘father of all deals’ (বা, 'সব চুক্তির সেরা') বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে; যদিও বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ভারতবাসীর কাছে এসব নিয়ে মাথাব্যথার সময় কম। তবুও বলতে হয়, এই ভারত-মার্কিন দ্বৈরথের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী।

আমরা জানি, বাড়তি শুল্কের ফলে আমদানিকারী দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায় ঠিকই তবে মূলত আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশল হিসেবে এটি আরোপিত হয় যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় দেশীয় পণ্যের প্রসারে সুবিধা হয়। বলাই বাহুল্য, এটি মুক্ত বাণিজ্যে বাধাস্বরূপ কিন্তু আমদানিকারী দেশে আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে তোলায় দেশের ভোক্তাদের উদ্বৃত্ত হ্রাস পায়, যেহেতু তাদের আগের থেকে বেশি দাম গুনতে হয়। ফলত, এটি মৃত-ভার ক্ষতি (অর্থাৎ, যখন অতিরিক্ত ক্ষতি বা বোঝা শুল্ক থেকে সংগৃহীত মূল্যের চেয়ে বেশি হয়) বাড়িয়ে তোলে। অতীতের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার সময়ে বিভিন্ন দেশ আমদানি-শুল্ক আরোপ করলে সর্বত্র বাণিজ্য-বাধা বেড়ে যায় যা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়, যার অবসান হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। পরে শুল্কের বোঝা বিভিন্ন দেশ কমাতে থাকে ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (গ্যাট) এবং পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির (FTA) প্রসারে সদর্থক ভূমিকা পালন করে। যদিও বিগত দশকে বেশির ভাগ দেশ আবার সংরক্ষণবাদী নীতি অনুসরণ করছে এবং দ্বিপাক্ষিক-চুক্তির প্রবণতা দেখা দিয়েছে।   

এমতাবস্থায় ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মসনদে বসার দিন থেকেই বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক চাপিয়েছেন। মেক্সিকো, কানাডা, চীনের ওপর শুল্ক আরোপ এবং চীনের সঙ্গে শুল্ক-যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গোটা বিশ্বকে ‘Buy American’ নীতি অনুসরণ করাতে চাইছেন তিনি। এতে আমেরিকায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দেশীয় আমেরিকান পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতির (যখন আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য রফতানির চেয়ে অধিক হয়) পরিমাণ হ্রাস এবং সর্বোপরি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কখনও কখনও এই শুল্ককে তিনি হাতিয়ার করছেন চোরাচালান বা অনথিভুক্ত অভিবাসন রুখতে। এর ফলে, জেপি-মরগানের বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন যে, এই শুল্কনীতি ঘরে-বাইরে তীব্র অনিশ্চয়তা সৃষ্টি, শেয়ার বাজারে পতন, এমনকি ১৯৭০-র দশকের Stagflation বা নিশ্চলতা-স্ফীতির (যেখানে  স্তিমিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সহাবস্থান) সম্ভাবনাকেও প্রকট করেছে। 

পাশাপাশি, ‘ট্রাম্প-নীতি’ ভারত-আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্যেও সমূহ প্রভাব ফেলেছে। মূলত, রাশিয়া থেকে সুলভে তেল কেনা ও ইউক্রেন যুদ্ধে পরোক্ষ মদত দেবার অজুহাতে আমেরিকা গত ২৭ অগস্ট ২০২৫-এ ভারতীয় পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশ শুল্ক (১০ শতাংশ বেসলাইন-শুল্ক + ১৫ শতাংশ পারস্পরিক-শুল্ক বা ‘রেসিপ্রোকাল-ট্যারিফ’ + ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক-শুল্ক) ধার্য করে, যা এ পর্যন্ত ছিল ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হার। এইভাবে শক্তি প্রদর্শন করে ভারতকে বৈদেশিক বাণিজ্যে কোণঠাসা করতে চাওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কিন্তু, সংবাদসংস্থা PTI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন বলেন, স্বল্পমেয়াদে এটি সর্বাগ্রে মার্কিন অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, ভারতের রফতানির ওপর এই শুল্কের প্রত্যক্ষ ফল হবে মার্কিন ভোক্তাদের জন্য দাম বৃদ্ধি, যা ভারতীয় পণ্যের চাহিদা কমাবে এবং ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বৃদ্ধিও হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কারণ, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছে ফলে ভারতের উপর সামগ্রিক প্রভাব ততটা তীব্র হবে না, যতটা হতে পারত যদি শুল্ক শুধু ভারতের ওপরই আরোপ করা হত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বরং ভারতের সামনে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক' ঝালিয়ে নেওয়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, দীর্ঘ দু' দশক পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সফল মুক্ত বাণিজ্য, এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, সাউথ এশিয়া, সংযুক্ত আরব আমির শাহীর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, চীন থেকে মোট আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনাও প্রশস্ত।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, মূল্যবান পাথর ও গয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২৯.২ বিলিয়ন USD থাকলেও ৫০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধিতে বস্ত্র, গহনা, চামড়াজাত দ্রব্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ - এই শিল্পগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি, ভারতীয় মুদ্রার ক্রম-অবমূল্যায়ন (যা গত মাসে ৯২ টাকা প্রতি USD দাঁড়ায়) ও শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও মূলধনের বহির্গমন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা গেল, ট্রাম্পের শুল্ক হ্রাসের ঘোষণার পর পরই ভারতীয় মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে যা এখন ৯০ টাকার আশেপাশে এবং সেনসেক্স-নিফটির সূচকও বেড়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় বাজারে আর্থিক অনিশ্চয়তা হয়তো কমবে যা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। 

আমেরিকার এই মত পরিবর্তন আদতে রঘুরাম রাজনের বক্তব্য ও জেপি মরগানের অনুমানকে সঠিক প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প-নীতির ফলে মার্কিন অর্থনীতির খুব একটা উন্নতি তো হয়ইনি উপরন্তু অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক ও বাণিজ্য চুক্তি সফল হলে ভারতের বিপুল বাজার আমেরিকা চিরতরে হারাবে-- এই আশঙ্কায় আমেরিকার মত পরিবর্তন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা অন্যত্র। গত ৬ ফেব্রুয়ারির যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক ধার্য করবে এবং পরিবর্তে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ওপর আরোপিত সমস্ত শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নেবে। ফলে, নতুন ঘোষিত চুক্তি অনুসারে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান জ্বালানি, কৃষি পণ্য, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্য কিনবে যা বেশ উদ্বেগজনক। ভারতে আমদানির বাজারের সিংহভাগ আমেরিকার হস্তগত হবে এবং অন্য দেশের সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ পড়বে প্রশ্নের মুখে। ইতিমধ্যেই এই চুক্তি ভারতীয় কৃষকদের ক্ষোভের কারণ হয়েছে, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি পণ্য ভারতীয় বাজারকে ছেয়ে ফেলবে। খবরে প্রকাশ, ভারতীয় কৃষক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনের পথে। অবশ্য ট্রাম্প এই হুমকিও দিয়ে রেখেছেন যে ভারত বেশি বেগড়বাই করলে আবারও উচ্চ শুল্ক চাপবে। ভারত যেন খেলার পুতুল। প্রধানমন্ত্রীও নির্বিকার।

২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষক জনসংখ্যা মাত্র ১৮.৮ লক্ষ এবং কৃষিপণ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ ভর্তুকিপ্রাপ্ত। সবচেয়ে বড় অংশ ভুট্টা, সয়াবিন, গম, তুলা ও ধানের জন্য বরাদ্দকৃত যা ভারতের কৃষি ভর্তুকির তুলনায় অনেক বেশি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতে কৃষি ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন খরচ লাঘবের জন্য প্রদত্ত এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের মাধ্যমে দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে একটি অসত্য অভিযোগ করে WTO'র কৃষি-চুক্তি (AoA) অনুসারে ভারতকে ফসলের উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে ভর্তুকিকে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করে। বর্তমানে ভারতে ১৪.৬৫ কোটি কার্যকর কৃষি খামার রয়েছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ কর্মশক্তি ও ৬৫ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী। অতএব, নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় ও জীবিকার মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের নিজ দেশের কৃষকদের স্বার্থে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজেদের কৃষিপণ্য ‘ডাম্পিং’ করতে কৃষি-ভর্তুকি ও WTO-র কৃষি-চুক্তিকে (AoA) অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও, অস্বাস্থ্যকর জিনগত উপায়ে পরিবর্তিত মার্কিন ভুট্টা ও অন্যান্য শস্যের ভারতে বাজার দখলের সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে আমেরিকার কাছে তা 'সব চুক্তির সেরা' হলেও সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির চাপে পর্যুদস্ত হয়ে ভারতের কাছে তা ‘Mother of all burdens’ (বা, 'সব বোঝার ভার') হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও যথেষ্ট।


Wednesday, 4 February 2026

আবারও বাংলা

বাংলা ও বাঙালির বাঁচার লড়াই

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



বিজেপি’র আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের নতুন অস্ত্র SIR’এর ধুরন্ধর আক্রমণের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ বিহারের মাটি থেকে উঠেছিল, তাকে বাংলা ও দেশবাসীর পক্ষ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শীর্ষ আদালতে এক কার্যকরী ও নির্ধারক জায়গায় পৌঁছে দিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সুপরিচিত ভঙ্গিতে যে সওয়াল করলেন তা রাজনৈতিক লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই অভিনব ঘটনার সঙ্গে কিছুটা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সালের ১৮ এপ্রিল চম্পারণের মোতিহারি জেলা আদালতে নিজে দাঁড়িয়ে নিজ পক্ষে গান্ধীজীর সওয়াল করার স্মৃতি মনে আসতে পারে। দুই ঘটনার বাস্তবতা আলাদা হলেও প্রেক্ষিত ছিল প্রায় একই, যেখানে জনতার ওপর নেমে আসা একতরফা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, আইনি কূটকচালিকে অতিক্রম করে সর্বস্তরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগ্রগণ্য ভূমিকা দাবি করে।    

দেশ আজ যে কী ভয়ঙ্কর গহ্বরে প্রবেশ করেছে তা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান। আমরা দেখলাম, গত ২ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালতের এক শুনানিতে ভারত সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার মেহতা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দীর্ঘদিন বন্দী দেশের অন্যতম শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক’এর জামিনের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রকারান্তরে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বললেন যে তিনি নাকি GenZ’কে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামার আহ্বানও এখন এ দেশে দেশদ্রোহ! অথচ, ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত রাম রহিম বা আশারাম বাপু দু’ দিন পর পর নিয়মিত দিব্যি জেল থেকে প্যারোলে বেরিয়ে ঘরে-বাইরে আরামে জীবনযাপন সেরে নেয়। অথবা, আমরা এখনও জানি না, এপস্টাইন ফাইলের স্তূপ থেকে মহামহিম মোদি মহারাজের আর কী কী কীর্তি প্রকাশ পাবে এবং সে জন্যও তাঁর আদৌ কোনও বিচার হবে কিনা! অথচ, টানা পাঁচ বছর ধরে ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে এখনও বিনা বিচারে জেলে পচতে হয় শারজিল ও উমর খালিদ’কে।

এই এখন নতুন ভারতবর্ষ।

এই নতুন ভারতবর্ষেই এবার শুরু হয়েছে বাঙালি নিধনযজ্ঞের ব্যাপক প্রস্তুতি ও সূত্রপাত। কতকটা হিটলারের ইহুদি নিধন অথবা একদা দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস বানিয়ে রাখার মতো। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে গত কয়েক মাস ধরে বেছে বেছে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের পুলিশ চূড়ান্ত হেনস্থা করছে, ‘বাংলাদেশি’ বলে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে, অনেককে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক করে ওই দেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অ-বিজেপি রাজ্যগুলিতেও বিজেপি লালিত হিন্দুবাদী সংগঠনগুলি মারফত পরিযায়ী বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে পিটিয়ে মেরেও ফেলা হচ্ছে। এই নিধনযজ্ঞ আরও ফলপ্রসূ হতে পারে যদি দেশ জুড়ে এক ভয়ঙ্কর নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ (অর্থাৎ, এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ওপর ওপর দেখলে মনে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই যেন সব কিছু হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা চরম ফ্যাসিবাদ, যেমন রাশিয়া ও বর্তমানে উক্ত পথে অগ্রসরমান আমেরিকা) চালু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সহ যাবতীয় ক্ষমতা সমূহকে দখল করা যায়। তা কতকটা সফলও হয়েছে।.২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় ফল করার পর বুঝে যায় যে তাদের দিন এবার সমাগত, যদি না ভোটার তালিকায় কিছু বড় ধরনের ঘোটালা পাকিয়ে সব তছনছ করে দলীয় আদর্শ অনুসারী একটি তালিকা তৈরি করা যায়। ইতিমধ্যে সিবিআই-ইডি-আয়কর ইত্যাদি এজেন্সিগুলিকে নিজেদের দাসানুদাস বানাবার পর পরই তারা আইন বদলে নির্বাচন কমিশনকেও নিজেদের তাঁবে নিয়ে এসেছে। এবার আর দেরি কেন! কমিশন যখন হাতের মুঠোয়, কমিশনাররা যখন সব তুরুপের তাস, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভোটার তালিকার খোলনলচে বদলে দেওয়ার ‘মাদারি কা খেল’ তো বাঁ হাতের ব্যাপার। তাই হল! লোকসভা নির্বাচনের পর পরই ভোটার লিস্ট লণ্ডভণ্ড করে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের নামে যা হল তা সাদা বাংলায় ‘প্রহসন’ বৈ আর কিছু নয়। একদিকে বিপুল সংখ্যায় বাদ দেওয়া হল বিজেপি-বিরোধী ভোটারদের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মারফত বুথ ধরে ধরে আগের নির্বাচনে ভোটদানের তথ্যের ম্যাপিং করে), অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিজেপি ভোটারদের ব্যাপক নাম ঢুকিয়ে পালটে দেওয়া হল ভোটার তালিকার মৌলিক চরিত্র। বিজেপি’র রথ ছুটল উর্ধ্বশ্বাসে, নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের ভিত্তিভূমি তৈরি হল।

আর এই সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা বধের পালা! কারণ, বাংলা হল সেই ভূমি যেখান থেকে উদিত হয়েছে সর্বধর্ম সমন্বয় ও উদারতার চেতনা। চৈতন্য ও লালন এখানে হাত ধরাধরি করে এখনও হেঁটে চলেন। ইসলামি সুফিতন্ত্র ও হিন্দুয়ানার ভক্তিযোগ বাংলার আকাশে-বাতাসে চির প্রবহমান। তাই, বাংলাকে ছিন্নভিন্ন এবং বাঙালিদের গৌরব ও অস্মিতাকে ধ্বংস না করতে পারলে নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের অবয়ব নির্মিতি সম্পূর্ণ হয় না। কারণ, বাংলাই সেই প্রতিরোধের শেষ দূর্গ যা সারা দেশকে গত পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তি ও স্বস্তি দিয়ে গেছে। এ কথা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জানে আর সে জন্যই তাদের যাবতীয় অপচেষ্টা।

এই অসহনীয় ও দুর্বিষহ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলার মাটিতে কবরে যাওয়া মীরজাফর-উমিচাঁদের  প্রেতাত্মা ও তাদের উত্তরসূরীরা আবারও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ সেই সরকারবাড়ির ‘ধেড়ে আনন্দ’ ও পূর্ব মেদিনীপুরের জনৈক মেজখোকার যৌথ নেতৃত্বে উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত একপাল খোকাখুকুর দল তাদের জাল ছড়িয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরার খেলায় নেমে পড়েছে। এ লড়াই বাংলায় বরাবরই ছিল। যে ধেড়ে খুকু খুব আপসোস করে বলেন যে বাংলার ‘ডেমোগ্রাফি’ বদলে যাচ্ছে, সব মুসলমানে ছেয়ে গেল গা, নধরকান্তি সঞ্চালক হৈ হৈ করে হাবিবপুর সীমান্তে শ’খানেক লোককে বসে থাকতে দেখে ক্যামেরা তাক করে ফাটা রেকর্ডের মতো বলতে থাকেন যে ওই ওই পালাচ্ছে, লাখে লাখে রোহিঙ্গা পালাচ্ছে, তারা যে বাংলার ওপর আজকের বর্গী আক্রমণে বেজায় খুশি তা বলাই বাহুল্য। এরাই হল বাঙালিদের সেই ক্ষমতাধারী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত উত্তরাধিকার যারা নবদ্বীপে চৈতন্য মহাপ্রভুর নগর সংকীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের হয়ে দালালি করেছিল, লালনের আখড়া ভেঙে দিয়েছিল, বিদেশ থেকে ফেরার পর স্বামী বিবেকানন্দকে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে পরিত্যাগ করেছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ঢিল ছুঁড়ে অপমানে জর্জরিত করে কলকাতা ছাড়া করেছিল, ১৯৩৭ সালে বঙ্গদেশে ফজলুল হকের সরকারকে আখ্যায়িত করেছিল ‘বাংলার মসনদে এখন এক চাষা বসেছে’; এদেরই প্রগাঢ় উত্তরসুরী চন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৪ সালে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে একটি ছাতামাথা বই লিখে বিধবা বিবাহ ও স্ত্রী-শিক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন। আজ সেই এরাই, কেন্দ্রে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী শাসকের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে বাংলায় কবর ফুঁড়ে উঠে আসার চেষ্টা করছে।

SIR তাই মামুলি ভোটার তালিকা সংশোধনের কোনও কার্যক্রম নয়; তা মুসলমান বাঙালি, নমঃশূদ্র বাঙালি, সুফিতন্ত্রে প্রভাবিত বাঙালি, বাউল সাধনায় ধৌত বাঙালি, উদারতার পরশে নবজন্মে রাঙা বাঙালি, বিচিত্র সম্ভারে শ্রমশীল বাঙালি, কবি-লেখক-গায়ক-চিত্রকর ও সৃষ্টিশীল বাঙালি, যাদের গত ৫০০ বছরের অর্জিত সমস্ত সম্মান ও বোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী কৌলিন্য প্রথাকে ফিরিয়ে আনার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা। আমাদের অর্জিত বোধ ইতিহাসের মর্মে লিপিবদ্ধ যেখানে নবাব সিরাজদ্দৌলা গঙ্গার ঘাটে নৌকায় বসে রামপ্রসাদ সেনকে গাইবার অনুরোধ করলে তিনি শোনান, ‘আমায় দাও মা তবিলদারি/ আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’, হিন্দু ব্রাহ্মণেরা চৈতন্যদেবের নগর সংকীর্তন বেআইনি ঘোষণা করলে বাংলার সুলতান হুসেন শাহ চৈতন্যদেবের পাশে এসে দাঁড়ান, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে (১৮৫৭) ব্যারাকপুর ও বহরমপুরে এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ বাঙালি মানুষ যে ঐক্য-সংস্কৃতির পরিচায়ক ছিলেন, তাইই আমাদের গৌরব ও পরম্পরা। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও এই পরম্পরা অটুট আছে বটে কিন্তু বহির্শত্রুর যে তীব্র আক্রমণ ও মরীয়া প্রচেষ্টা বাংলাকে দখলে নেওয়ার, সঙ্গে মীরজাফর-নরেন গোঁসাই, সাভারকার-শ্যামাপ্রসাদের শিষ্যরা, ইডি-সিবিআই’এর ভয়ে কিছু দালাল-সাংবাদিক ও প্রচারক, তাতে আমাদের বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, কিন্তু লড়াইও হয়ে উঠছে সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী।

এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রাজ্যের বাকী সব তথাকথিত বিজেপি বিরোধী দলগুলি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও ‘বিজেপি বনাম তৃণমূল’ এই অঙ্কে ভাবতে গিয়ে কোণঠাসা ও জনবিচ্ছিন্ন, বরং উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত ভাবনার ফাঁদে পড়ে আরও ল্যাজেগোবরে অবস্থা তখন সাধারণ শ্রমজীবী-নিম্নবর্ণ ও আঘাতপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণ কিছু মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে প্রায় প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল যে সহায়তা ও সমর্থন জুগিয়ে গেছে এবং এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে সর্বতোভাবে লড়াইকে এক উচ্চমার্গে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, তা শুধু এ রাজ্যে নয় গোটা দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ফলে, বিজেপি পাড়ায় পাড়ায় বা গ্রামেগঞ্জে লোক তো আর পাচ্ছেই না, বরং বাম ও অন্যান্যদের অবস্থা আরও করুণ দেখাচ্ছে যখন তারা মমতার সার্বিক এই রণংদেহী অবস্থানকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে আরও জনবিচ্ছিন্নতার বিপাকে পড়ছে।

এখন দেখার, সংসদীয়, অসংসদীয় ও ন্যায় বিচারের পথে যে লড়াইয়ের ধারাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল গড়ে তুলেছে তা সারা দেশে মোদি জমানার ‘নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ’এর সার্বিক পরাজয়ের কারণ ও সড়ক হয়ে উঠতে পারে কিনা। ইতিমধ্যেই অখিলেশ যাদব ও ওমর আবদুল্লা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এই লড়াইয়ে মমতার সঙ্গে আছেন। আমরা তাকিয়ে রইলাম আগামী দিনের দিকে।