Thursday, 10 June 2021

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

‘এই তো নিয়ম, এসো দূরে যাই’

প্রবুদ্ধ বাগচী


পঁয়ত্রিশ বছর আগে একদিন দুপুরে গিয়েছিলাম তাঁর কাছে। তখন ‘দূরত্ব’ ও ‘গৃহযুদ্ধ’ দেখে মুগ্ধ ও উত্তেজিত। সেই অঞ্জন দত্তের মাউথঅরগানে ধীর লয়ে বাজানো ‘উই শ্যাল ওভারকাম’। সেই সুনীল মুখোপাধ্যায়ের গোলকিপারের ভূমিকা, সিনেমায় তাঁর চরিত্রের নাম ছিল শীতল। আর অনবদ্য মমতাশঙ্কর। আর মোদ্দা কথাটা হল, সাংবাদিক হিসেবে একটা অন্যায়ের তদন্ত করতে গিয়ে যে ভাবে সাংবাদিক চরিত্রের গৌতম ঘোষকে নিহত হতে হল, তা আসলে আমাদের এক গভীর রাজনৈতিক সত্যের দিকে টেনে আনে। অন্যায়ের পক্ষে সব সময়েই থাকে ক্ষমতার সমর্থন। কখনও তার নাম মিল মালিক, কখনও বিকিয়ে যাওয়া ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, অথবা রাজনীতির কেষ্টবিষ্টুরা। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে, রেড রোডের নির্জনতায় অচেনা গাড়ি এসে থেঁতো করে দিতে পারে প্রতিবাদীর শরীর। এই নিকেশ করার শিল্প গত সাড়ে তিন দশকে আরও ফুলে ফলে বিকশিত হয়েছে। পরিচালকের এই সিরিজের তৃতীয় ছবি ‘অন্ধিগলি’ হিন্দিতে হওয়ায় খুব সহজে তা দেখা হয়ে ওঠেনি। তবে তার পরে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি দেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছি বারবার। 

সেই সাড়ে তিন দশক আগের এক দুপুরে তাঁর সেলিমপুরের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম একটা সাক্ষাৎকার নিতে। আমি, আমার এক বন্ধু ও আমাদের এক স্কুলের মাস্টারমশায়। যদিও আমরা দুই বন্ধু তখন কলেজে। আমি যাদবপুর, বন্ধু আরজিকর। মফস্বল শহরের এঁদো পরিবেশ থেকে গিয়ে সেই প্রথম এক চিত্র পরিচালকের মুখোমুখি হওয়া। তবে সুবিধে ছিল একটা, চিত্র পরিচালক স্বয়ং মফস্বলের জীবন সম্পর্কে ছিলেন পুরো ওয়াকিবহাল। কারণ, তিনি নিজে ছিলেন হাওড়ার জাতক, বাবার চাকরির সূত্রে ঘুরেছেন এখানে ওখানে। নিজে অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন মফস্বলের কলেজে। আর এই সূত্রেই তিনি আমাদের কথাবার্তার মধ্যে তুলে ধরেছিলেন এক আশ্চর্য প্রসঙ্গ। আসলে তা তাঁর পরবর্তী কোনও সিনেমার আকরভাবনা। তিনি বলেছিলেন এমন একটি চরিত্রের কথা, যিনি মফস্বল এলাকায় একেবারে নিজের উদ্যোগে একটা আঞ্চলিক খবরের কাগজ চালান। তার জীবনটা ঠিক কেমন হতে পারে? বড় পত্রিকার সঙ্গে তার বিরোধ অথবা আন্তঃসম্পর্ক কীভাবে তৈরি হতে থাকে ভিতরে ভিতরে? এইসব নানা কথা বলছিলেন তিনি। ভাবছিলেন, এইরকম চরিত্র নিয়ে একটা ফিল্মের কথা। সেই ছবি শেষ অবধি তিনি আর করে উঠতে পারেননি। কিন্তু ভাবনা হিসেবে সেটা ছিল একটা নতুন হাওয়া। বাংলার সাহিত্যে ও সমাজে প্রান্তীয়তার ধারণা এর পরে নানা ভাবে বিকশিত হয়েছে কিন্তু এত বছর আগে সেটা ছিল বেশ অবাক করার মতোই। 

এই ছবি না করলেও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বেশির ভাগ ছবির পটভূমি মফস্বল বা একেবারে প্রান্তীয় এলাকা। লং শটে আবছায়া পাহাড়ের রেখা, তার সামনে উঁচু রাস্তা, আদ্যিকালের ভাঙ্গা জিপ গাড়ি, প্রান্তীয় মানুষজন- এসব বুদ্ধদেবের ছবির টিপিকাল অনুষঙ্গ। এবং তার সঙ্গে উচ্চকিত রাজনীতির চড়া সুরকে শমিত করে আলতো ভাবে একটা সুরকে ভাসিয়ে দেওয়া, আদপে যা রাজনৈতিক ভাষ্য। 

‘উত্তরা’ ছবিটার কথাই ধরা যাক না। সেই এক কুস্তিগীরের ছবি, যে গোটা ছবি জুড়ে লড়াই করে যায়। এরই আড়ালে খ্রিস্টান ধর্মযাজককে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ছায়া ফেলে। অথবা ‘বাঘ বাহাদুর’- সেও তো আসলে এক অসম লড়াইয়ের গল্পই শোনায়। কিংবা ‘তাহাদের কথা’র মতো কমলকুমারীয় গদ্যকে চিত্রভাষা দেওয়া খুব সহজ কাজ ছিল না মোটেই, সেই কাজ তিনি করে ফেলেছেন। আর সেই গল্পও তো এক অবহেলিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর আখ্যান, যিনি তার প্রতিবাদকে মূর্ত করে তোলেন তার শারীরিক বায়ু নির্গমনকে সশব্দে জানিয়ে দিয়ে। এইভাবেও প্রতিবাদ হতে পারে? পরে অবশ্য আমরা নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখায় এইসব ‘অশীলিত’ প্রতিবাদকে আরও চওড়া ক্যানভাসে পেয়েছি। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর দারিদ্রের সুতীব্র কশাঘাত ঠিক কেমন ভাবে ছবিতে ধরিয়ে দেওয়া যায় তার এক অনবদ্য চিত্রায়ন তাঁর ‘নিম অন্নপূর্ণা’- এটাও কমলকুমারের কাহিনি। এখানে বলা দরকার, এই দারিদ্রের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’কে যেন কেউ গুলিয়ে না ফেলেন। সত্যজিৎ, দারিদ্র নয়, জীবনের ছন্দকে ধরেছেন তাঁর ছবিতে, বুদ্ধদেবের সেই দায় নেই। তিনি সরাসরি একটা পরিবারের দারিদ্রকে ফুটিয়েছেন সেলুলয়েডে, শুধু ওই বিড়ম্বিত জীবনটুকু দেখাবেন বলেই। 

 

একটা অভিযোগ তাঁর ছবি বিষয়ে ছিলই। তার পরের দিকের ছবিগুলি বড় শ্লথ। কথাটা একেবারে ভুল নয়। আসলে প্রথম দিকের ছবি থেকে যত তিনি পরের দিকে এগিয়েছেন তত তার মধ্যে তৈরি হয়েছে একটা অন্য ঝোঁক। সেলুলয়েডের ক্যানভাসে ছবি আঁকার প্রবণতা। এখন ছবি ব্যাপারটা নিজে ঠিক গতিশীল মাধ্যম নয়। ভালো ছবির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাকে আঁতিপাঁতি করে চিনতে হয় শিল্পের শর্তে। অথচ সিনেমার মতো একটা গতিশীল মাধ্যমে ছবিকে দাঁড় করানো একটা নিরীক্ষা হিসেবে দেখা যেতেই পারে, কিন্তু তাই বলে সব ক্ষেত্রেই তা সফল হবে এমন নাও হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর ‘স্বপ্নের দিন’ ও ‘কালপুরুষ’ এইদিক দিয়ে খুব উত্তীর্ণ এমন নয়। আর তাঁর ছবি দেখতে দেখতে আমাদের এই আফসোস হয়েছে, সব ছবির মধ্যেই একটা গতির বিরুদ্ধ স্রোত প্রবাহিত করতে গিয়ে কিছু ছবির প্রতি সুবিচার বাধা পেল না তো? 

আলাদা করে দুটো ছবির কথা বলব। একটি ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ (কাহিনি: প্রফুল্ল রায়) এবং ‘টোপ’ (কাহিনি: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়)। দুটি ছবির গল্পে এমন উপাদান ছিল যা উৎকৃষ্ট ছবির পক্ষে সহায়ক। বিশেষ করে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পটি তো বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাঠ্যও হয়েছে। কিন্তু অনেক আশা নিয়ে ছবি দুটো দেখতে বসে যথেষ্ট আশাভঙ্গ হয়েছিল। অতিরিক্ত আঙ্গিক-নির্ভরতা ছবিতে গল্প বলার গতিকে আটকে ধরেছে বারবার। ‘টোপ’ গল্পের যে অসামান্য ট্রাজেডি তা ছবিতে ফুটে উঠল কই? ছবির দর্শককে অনেকটা অনুমান করে নিতে হয় এইখানে।

অবশ্য একজন লেখকের সব লেখা যেমন ভাল হয় না, একজন পরিচালকের সব ছবিই সবার ভাল লাগবে এমন নয়। বিশেষ করে শেষের দিকে তাঁর ছবি মেইনস্ট্রিম হলে প্রায় রিলিজই হত না, বেশিটাই যেত পুরস্কারের জন্য বিদেশে। বরং আজ তাঁর অনুপস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে অন্য একটা কথা বলা দরকার। সেটা তাঁর কবিসত্তার কথা। চিত্র পরিচালনার আগে তিনি ছিলেন ষাটের দশকের একজন উজ্জ্বল কবি। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘গভীর এরিয়েলে’, ‘কফিন কিংবা সুটকেশ’, ‘হিম যুগ’, ‘ছাতা কাহিনী’ বা ‘রোবটের গান’ ছিল একদম নতুন ধরনের কবিতার উচ্চারণ। সেখানে আমরা পেয়ে যাই ‘মাগুর মাছের স্বপ্ন’র কথা, পাই ‘পিপড়ে জন্মের’ স্বাদ, ‘শুয়ে থাকা বন্দুকের’ ক্রোধ, ‘রবারের রাস্তা’ বা রোবটের জন্য লেখা ‘এপিটাফ’- একেবারে এক ভিন্ন জগতের পরাবাস্তব। একটা সময়ের পর কবিতা থেকে ফিল্মে গেলেও আসলে কবিতা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। সিনেমা তৈরির পাশে পাশে সেই কবিতার বিচিত্র জগত তাঁকে ভিতরে ভিতরে নির্মাণ করেছে। 

খুব সহজেই মনে করতে পারি তাঁর দুটি অনবদ্য ছবির কথা- ‘চরাচর’ ও ‘লাল দরজা’। কার্যত এই দুটি ছবির বুননে প্রধান নায়ক তাঁর কাব্যভাষা। ছবি দুটির সামগ্রিকতায় যেন এক কবিতা লিখবার আন্তরিক প্রয়াস। তাই ‘চরাচর’এ জমিদার বাড়ির নিমন্ত্রণে খেতে বসা রাজিত কাপুর (সিনেমার চরিত্রের নাম মনে পড়ছে না) যেভাবে পাখি হত্যার বার্তা পেয়ে প্রত্যাখ্যান করে সেই নিমন্ত্রণ, তা তো এক শিল্পিত কবিতাই। আর ‘লাল দরজা’য় সেই দন্ত চিকিৎসক (অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়) সিনেমার মধ্যে বারবার একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে থেমে যান একটা লাল দরজার সামনে, এই পৌনঃপুনিক আবর্তনের ভিতর দিয়ে উঠে আসে ব্যক্তির এক সংকট চিত্র, যা তিনি একদিন লিখেছিলেন তার কবিতায় ‘একদিন অদ্ভুতভাবে দ্যাখা হবে/ মুখোমুখি/ দাঁড়াতে হবেই, কোথায় পালাবে’। 

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আসলে এই কবিতা আর ফিল্মের মধ্যে এক যোজক হয়েই থেকে যাবেন অনেক দিন। তাঁর ছবির সঙ্গে বসে আমরা কবিতা পড়তে পারব অনায়াসেই। তাই হয়তো মনে পড়ে গেল তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হওয়া সন্ধ্যেটা। স্টুডেন্টস হলে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর স্মরণসন্ধ্যায় তিনি চুপ করে বসেছিলেন তাঁর সমকালীন বন্ধু কবির প্রতি আনত শ্রদ্ধায়, পেছন দিকের চেয়ারে। অনুষ্ঠান শেষের কিছু আগে ভিড় এড়িয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন নির্জনে। এই বিবিক্ত পটভূমিতেই তাঁকে হয়তো আরও ভাল করে চিনতে পারব আমরা ।


Tuesday, 8 June 2021

কাদের খেলা?

যে ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক তা আমাদের সাথীও 

স্থবির দাশগুপ্ত

 

কুকুরটা ডাকেনি! এটাই ছিল কোনান ডয়েল-এর রহস্যগল্পে শার্লক হোমস-এর ‘ক্লু’। ওই সূত্র ধরেই তিনি একটি খুনের রহস্যের সমাধান করে ফেললেন।

কুকুরের ডাক নিয়ে অমন কিছু রহস্যঘন মুহূর্ত কোভিড-১৯-এর অতিমারীতেও! যেমন ধরা যাক, অতিমারীর প্রথম দিকে দেখা গেল, বেশির ভাগ এশীয় এবং আফ্রিকান দেশের তুলনায় অতিমারীর দাপট পশ্চিমা দেশগুলিতে অনেক বেশি। সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম, প্রতিবেশ পরিচ্ছন্ন। ৯/১১-এর মতো সাংঘাতিক কিছু ঘটে না-গেলে এইসব দেশে কুকুর সাধারণত ডেকে ওঠে না। অথচ ২০২০ সালের প্রত্যুষে ওই দেশগুলিতেই কুকুর ডেকে উঠল। আর উলটোদিকে ধরা যাক, আমাদের দেশ- আকারের দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় তিন গুণ ছোট, লোকসংখ্যার চাপ যেখানে অন্তত চার গুণ বেশি, মানে জনঘনত্ব অনেক বেশি। সেখানে কুকুর শান্ত, নিশ্চুপ, নিদ্রাতুর। সাক্ষাৎ রহস্যই, কেননা শ্বাসতন্ত্রীয় ভাইরাস তো ভিড়ের ব্যাধি (‘ক্রাউড ডিজিজ’); তাই এখানেই বরং কুকুর ডেকে উঠবে। ডাকল না, কেন?

আমাদের সরকারি, অসরকারি বিশেষজ্ঞ, পারদর্শীরা গলা মিলিয়ে জানালেন, চোপ, ঘন ঘন সাবান চাই, প্রত্যেকে অন্তত ছয় ফুট দূরত্বে থাক, নইলে কুকুর এক্ষুনি এমনভাবে ডাকতে থাকবে যে শিউড়ে উঠবে একশো আটত্রিশ কোটি মানুষের ঘরে ঘরে খিল তুলে দিয়ে বলা হল, পশ্চিম থেকে দেখে শেখ, নইলে দেশটা শ্মশান হয়ে যাবে। শুধু পশ্চিম না, আমরা চতুর্দিক দেখলাম; কই, ‘কিচ্ছু মিলছে না’! কেউ কেউ বললাম, নাক-মুখ ঢেকে, যথেচ্ছ ‘টেস্ট’, দূরত্ব রচনা, কাঁরাটিন আর দরজায় খিল দিয়ে যে শ্বাসতন্ত্রীয় ভাইরাস আটকানো যায়, এমন তথ্যপ্রমাণ তো কোথাও নেই। এখানে যখন অতিমারীতে মৃত্যুর সংখ্যা দশ লক্ষে এক, পশ্চিমা দেশগুলোতে তখন একশো ছাড়িয়ে গেছে। এখানে বস্তিবাসীর সংখ্যা সাড়ে ছয় কোটির বেশি, ইংল্যান্ড বা ইতালির জনসংখ্যার প্রায় সমান। কীসের তুলনা, শিখবটা কী?

ভাইরাস এবং সংক্রমণ বিদ্যায় পারদর্শীরাও জানালেন, একই মাপের জুতো সবার পায়ে গলিয়ে দিতে হবে এমন উচ্চ বিজ্ঞানের হদিশ জানা নেই। একটা বুদ্ধিমান ভাইরাস প্রজাতি সর্বত্র একইরকম আচরণ করবেই বা কেন? সংক্রমণের গতিবিধি বুঝতে গেলে কিছু জনতাত্ত্বিক (‘ডেমোগ্রাফি’) যুক্তি আছে, জনবয়স (‘মিডিয়ান এজ’) আর জনস্বাস্থ্যের হিসেব নিকেশ আছে। যেমন, পৃথুলতা যে শ্বাসতন্ত্রীয় সংক্রমণের পক্ষে উপযুক্ত, সে কথা জানাই ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে সব অঞ্চলে অন্যান্য করোনা ভাইরাসের পরিক্রমণ ঘটে গেছে সেখানে এক ধরনের অনাক্রম্যতাও (‘ইমিউনিটি’) আছে; সেই ক্ষমতা ‘নভেল’ ভাইরাসের বিরুদ্ধেও খাটে। কারণ, আমাদের শারীরবৃত্তের (‘ফিজিওলজি’) স্মৃতিশক্তি অতি প্রখর, স্মৃতিমেদুরতাই তার মাহাত্ম্য। নইলে ভাইরাস পরিবৃত হয়ে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

কিন্তু এসব কথা শোনার মতো কান শাসক সমাজে নেই। তার ওপর চলছে 'অতিবিশেষজ্ঞতার' যুগ, সেখানে ক্যানসার, হৃদরোগ, মধুমেহ, কিডনি আর পৈষ্টিক তন্ত্র বিষয়ে পারঙ্গমদের রমরমা; সংক্রমণ বিশেষজ্ঞরা পিছনের সারিতে। আমরা বুঝলাম, জুতো একই মাপের হতে হবে, একই নকশারও। অতএব বস্তিবাসীদের নিয়ে চলল কয়েক মাস ধরে এক নির্মম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সাবান, দূরত্ব আর মুখোশ যে তাঁদের কাছে এক নিষ্ঠুর বিড়ম্বনা, তা ক্ষীণদৃষ্টি, অতি-বিশেষজ্ঞদের বোধবুদ্ধির বাইরে। শ্বাসতন্ত্রীয় ভাইরাস নিয়ে বহুকালের অর্জিত, অধীত বিদ্যা ভুলতে হল, কেননা একটা অযৌক্তিক ছক জোর করে খাটাতে গেলে কাণ্ডজ্ঞান ভুলতেই হয়। এ কথাও ভুলতে হয় যে, অনিশ্চয়তার উপাদান ভাইরাসের চরিত্রেও থাকে; ধরিত্রীর আদিম সন্তান হিসেবে সেও নিয়মে বাঁধাসেই উপাদানগুলোকে, নিয়মগুলোকে বুঝে নেওয়ার নামই বিজ্ঞান চর্চা।

কিন্তু বিজ্ঞান চর্চার সেই ময়দান এখন মরুভূমির মতো মনে হয়। তাই বুদ্ধিবিলাসী, আত্মরতিমগ্ন মানুষজনের আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। যাঁরা ভেবেছিলেন একশো মিটারের দৌড়, তাঁরা এখন ম্যারাথনে ব্যস্ত; প্রান্তিক মানুষজন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। এদিকে গবেষণা চলছে অবিরাম। তাতে শুধু কাঁচ না, মণি-মুক্তোও জুটছে। ‘লকডাউন’ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আর দূরত্ব রচনা করে যে ভাইরাসকে বোকা বানানো যায়, এই আধুনিক বুদ্ধির উৎস ছিল প্রায় চৌদ্দ বছর আগে, এক আমেরিকান বিজ্ঞানীর স্কুল ছাত্রী কন্যার অবদান। স্কুলে ওই ‘কম্পিউটার সিমুলেশন প্রোজেক্ট’ জমা দিয়ে সেই কিশোরী পুরস্কারও পেয়েছিলেন। মুখোশ পরে সংক্রমণ রোধ করার বুদ্ধি এসেছিল গবেষণাগার থেকে, ধেঁড়ে ইঁদুরের উপর পরীক্ষায়। কিন্তু গবেষণাগারের পরীক্ষার ফল যে জনজীবনে খাটে না সে কথা পরে প্রমাণিত হয়েছে।

তাতে কী? বরং এগুলোই এখন ‘কোভিড সুলভ ব্যবহার’-এর নমুনা। এখন দেখছি, দু’ তিনটি মুখোশ, তার উপর ঢাকনা আর দস্তানা– বর্ণাঢ্য ‘কোভিড যোদ্ধা’। কিন্তু এত করেও সংক্রমণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ল, মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ল; কুকুর এবার ডেকে উঠল– ‘দ্বিতীয় ঢেউ’তার কারণ নিয়ে চলল চাপান-উতোর; ভোটের ভিড়, নাকি মেলা, নাকি অসভ্য, অশিক্ষিত জনমানুষের অবিমৃশ্যকারিতা? গ্রাম্য কোন্দল। আর সেই অবসরে ঢেউয়ের পর ঢেউ যে ভাইরাসের আবক্রপথের অংশ, সেই ভাইরাস বিজ্ঞান রসাতলে গেল। যাঁরা নিজেদেরকে ভাইরাসের চেয়েও শুধু শক্তিমান না, তীক্ষ্ণতর বুদ্ধিমান বলে ভেবেছিলেন, তাঁদের অনেকের কপালে এখন ভাঁজ- ভাইরাসকে তাড়া করে বেড়াবার, নির্মূল করে দেওয়ার নীতিই কি তাহলে সর্বনেশে? এখন যেন মানসম্মান বাঁচানোর প্রশ্ন, সরকার এবং বিজ্ঞানদরদী, যুদ্ধনিপুণ মানুষজনের। কিন্তু কেন?

সব কিছু বন্ধ করে, গোল গোল গণ্ডির মধ্যে ঢুকে পড়লেই অক্ষয় জীবন- এমন ধারণা যাঁদের মনে সঞ্জাত হল সেই পাণ্ডিত্যাভিমানী ডাক্তাররা কেন ভাবলেন না যে, আঙ্কিক মডেল যত দুর্ধর্ষ, যত কেতাদুরস্তই হোক, চলমান জনসমাজে তা খাপে খাপে খাটে না কোনওদিন? কেন তাঁরা ভাবলেন না যে, জনমানুষ কোনও গবেষণাগারে পালিত ধেঁড়ে ইঁদুর না? আসলে সর্বাগ্রে তাঁরাই আতঙ্কিত হয়েছেন, তারপর সেই আতঙ্কের বোঝা চাপিয়েছেন জনমানুষের কাঁধে- জনসচেতনতার রিহার্সাল। যা ছিল ভাইরাসের অতিমারী তা হয়ে গেছে আতঙ্কের অতিমারী। শাস্ত্রজ্ঞানীদের এমন স্মৃতিলোপ, একই সঙ্গে মননশীল মানুষজনের বিবেচনাশক্তির এমন অন্তর্জলী যাত্রার পূর্বেতিহাস নেই। এখন তাই অপার শূন্যতা, আর সেই অবসরে বধির সরকার তার যাবতীয় জনবিরোধী কর্মকাণ্ড নির্দ্বিধায় সেরে ফেলছে।

আর আমরা মেতে আছি ‘মিউটেশন’ চর্চায়। ভাইরাসের ‘মিউটেশন’ ঘটছে, ঘরে ঘরে ‘সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে’! অথচ মিউটেশন মানেই নরখাদক, জীববিদ্যা কখনও সে কথা বলেনি। ডারউইন স্মরণে থাকলে আমরা বুঝতাম, ভাইরাস আমাদের ক্ষুধার্ত অতিথি হলেও প্রকৃতির নিয়মের অবাধ্য নয়। গৃহস্বামী মারা পড়লে যে তারও মৃত্যু অনিবার্য এ কথা তার জানা। তাই বাঁচবার জন্য সে রূপ পালটায়, স্বভাবও– ‘মিউটেশন’। তার ফল নানাবিধ। কেউ কেউ যেমন অতি ক্রূর, অতি ভয়ংকর হয়, তেমনি তাদের গতিও শ্লথ হয়; তারা সংখ্যায় কম, মারে প্রচুর, মারাও পড়ে আবার কেউ হয়ে যায় যেন নিছক নিরামিষাশী, সজ্জন; হয়তো বিবর্তনের নিয়ম মেনে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু বাকিরাই সংখ্যাধিক, অগণন। খিদে না-মিটলে তারা বারবার আসে, ঢেউয়ের মতো।

তারা কিছুদিন সংক্রমণ ঘটায়, কিছু মানুষ বেঘোরে মারাও যান; কিন্তু বেশির ভাগই বেঁচে থাকেন, বহাল তবিয়তে। সংক্রমণের হার বেশি, কিন্তু মারণ ক্ষমতা কম বলেই তারা দীর্ঘজীবী হয়ে আমাদের সঙ্গে থেকে যায়। কেউ কেউ খিদে মিটলেও নিজ নিজ কুঞ্জে ফিরে যেতে যেতে বলে যায়, ‘আবার আসিব ফিরে’। এইভাবে সমাজসংসারে তৈরি হয় এক অনাক্রম্যতা (‘ইমিউনিটি’), যা জৈবিক, স্বাভাবিক। এই অর্জিত ক্ষমতা নতুন ভাইরাসকে করমর্দন করে বেঁধে ফেলতে পারে, নিস্তেজ করে দিতে পারে। সব অতিমারীতেই একই শিক্ষা। যে-ভাইরাস নিয়ে এত আতঙ্ক, তার বেশির ভাগই থেকে যাবে আমাদের সাথী হয়ে, মরশুমি ফ্লু-এর মতো। হাজার বছর ধরে এই একই খেলা চলছে, নতুন কিছু ঘটেনি। বরং নতুন খেলায় মেতেছে কর্পোরেট ভাবনাপুষ্ট, নিরীহমনা, বিজ্ঞানভক্তের দল।

তাঁরা নতুন যুগ রচনা করবেন, নতুন শাস্ত্র। সেখানে শুধু ভাইরাস না, সমস্ত জীব এবং মানুষও মানুষের গোপন শত্রু। নতুন শাস্ত্রে আমাদের অরুচি নেই, যদি তা জনমানুষের উপযোগী হয়, কল্যাণকর হয়। কিন্তু তাঁদের বাকচাতুরতা শুনে মনে হচ্ছে, আমাদের স্বাভাবিক, জৈবিক সংঘটনগুলো (‘বায়োলজিকাল ফেনোমেনন’) তাঁরা ভুলিয়ে ছাড়বেন; এই শরীর যেন মাত্র গতকাল জন্মানো শিশু, অসহায়, তার ‘পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত’। তাঁরা প্রচার করবেন, এই ঘনঘোর অমাবস্যায় টিকা ছাড়া গতি নেই। অস্বাভাবিক জীবনের একমাত্র বিকল্প, টিকা। আমাদের অসহায় শরীরে টিকাই অনাক্রম্যতা এনে দেবে, নইলে সর্বনাশ। কারণ, এই ভাইরাস ‘নতুন’, লেলিহান তার জিহ্বা, গলায় মুণ্ডমালা, এমন ভয়ানক দৃশ্য মানুষ আগে দেখেনি; টিকাই তার একমাত্র শোধনমন্ত্র। এই শোধনমন্ত্র একবার না, বারবার উচ্চারণ করে যেতে হবে।

টিকা মহৎ, সে বিজ্ঞানেরই দান; এখন তা বিনামূল্যে, তাই দায়ে পড়ে সরকারেরও দানকিন্তু দান গবেষণাগার থেকে আসুক বা সরকারি কোষাগার থেকে, তার উপযোগিতা বুঝব না? হিসেব কষতে হবে না? একটি নতুন সংক্রমণ রোধ করতে যদি অন্তত ছিয়াত্তর থেকে একশো সতেরো জনকে টিকা নিতে হয়, তাহলে দানের মাহাত্ম্য কতটা?

মহাকালীর রূপ দেখে কমলাকান্ত প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি?’ নির্বিরোধী, বুনিয়াদি প্রশ্ন। টিকা কপালে ঠেকিয়েও অমন বুনিয়াদি প্রশ্ন কি আমরা তুলতে পারব– ‘নতুন’ ভাইরাসটি এল কোন গোপন গুহা থেকে?

দোহাই:

১)  Dr Amitav Banerjee. (Professor and Head, Community Medicine, DY Patil Medical College, Pune) 29 May 2021, https://www.nationalheraldindia.com/india/expert-view-what-evolutionary-biology-tells-us-about-coronavirus-mutants

২) Mia Rozenbaum. Masks reduce COVID-19 transmission between hamsters. 26 May 2020. https://www.understandinganimalresearch.org.uk/news/research-medical-benefits/masks-reduce-covid-19-transmission-between-hamsters/

৩) Ollie Reed Jr.  Social distancing born in ABQ teen’s science project. https://www.abqjournal.com/1450579/social-distancing-born-in-abq-teens-science-project.html.

৪) Piero Olliaro, Els Torreele, Michel Vaillant. Comment. COVID-19 vaccine efficacy and effectiveness—the elephant (not) in the room. Lancet Microbe. April 20, 2021. https://doi.org/10.1016/S2666-5247(21)00069-0


 

 

Monday, 7 June 2021

আগত ভয়ঙ্কর দিন

একের পর এক কন্ঠরোধ করা হচ্ছে

সোমনাথ গুহ


সত্তরের দশকে মিলিটারি স্কুলগুলিতে ভারত-চিন যুদ্ধের ওপর একটি মোটা বই ছাত্রদের হাতে দেখা যেত। বইটির নাম ‘দ্য হিমালয়ান ব্লান্ডার’, লেখক ব্রিগেডিয়ার জন দালভি। ব্রিগেডিয়ার তৎকালীন নেফাতে সপ্তম ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন, যে ব্রিগেড চিনা আক্রমণে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তিনি নিজে যুদ্ধবন্দী হন। সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ঐ যুদ্ধে ভারতীয় সেনার লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তুলোধোনা করেন। সেনাবাহিনী এতটাই অপ্রস্তুত ছিল যে তাঁদের যথেষ্ট শীতের পোশাক ছিল না, ব্রিগেডিয়ার লেখেন। 

গত ৩১ মে কেন্দ্রীয় সরকার ‘সেন্ট্রাল সার্ভিসেস (পেনশনস) রুলস’এ যে সংশোধনী এনেছে তা এখন অবধি সরকারি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার অফিসারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেনাবাহিনীর অফিসাররা এখনও এতে অন্তর্ভুক্ত হননি। কার্গিল খ্যাত জেনারেল ভিপি মালিক আশা করেন যে অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের এই আইনের আওতায় আনা হবে না, কারণ, এই নতুন সংশোধনীতে কিছু বাড়াবাড়ি আছে এবং সেটির পুনর্বিবেচনা দরকার। যদি সেনা অফিসাররা এর অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে ‘দ্য হিমালয়ান ব্লান্ডার’এর মতো অন্তর্তদন্তমূলক বই যাতে সেনাবাহিনীর কঙ্কালসার রূপ দেশবাসীর কাছে বেআব্রু হয়ে গিয়েছিল তা আমরা আর কখনও পাব না। সেগুলো চিরকাল সরকারি ফাইলেই বন্দী থাকবে। যেমন, নতুন সংশোধনী অনুযায়ী ভবিষ্যতে ‘রিসার্চ এন্ড অ্যান্যালাইসিস উইং’ (র)'এর প্রথম প্রধান আর এন কাওয়ের আত্মজীবনীর মতো গোয়েন্দা জগতের রোমহর্ষক কাহিনি আমরা আদৌ আর পাব কিনা সন্দেহ আছে। 

কেন্দ্রীয় সরকারের পেনশনের এই নিয়মাবলী ১৯৭২ সালে গঠিত এবং তারপর এর ৪৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। ২০০৮ সালের সংশোধনীতে বলা হয়, সঠিক আচরণ সাপেক্ষে পেনশন দেওয়া হবে। তাতেই দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা (কৌশলগত, বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক) এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বিঘ্নিত হয় এমন কিছু প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সাম্প্রতিক সংশোধনীতে কেন্দ্রীয় সরকার এই নিয়মের পরিসর আরও বৃদ্ধি করেছে- এখন চাকরিরত ব্যক্তি যে সংগঠনে ছিলেন সেটির কর্মপদ্ধতি, কোনও কর্মীর পদ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও কিছু ব্যক্ত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। যদি কোনও অবসরপ্রাপ্ত অফিসার এইসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু লিখতে চান তাহলে তাঁকে সেই বিশেষ সরকারি বিভাগ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। তিনি উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে কোনও সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন না, কোনও ধরনের সংবাদমাধ্যমে কোনও প্রতিবেদন বা প্রবন্ধ লিখতে পারবেন না, কোনও বই প্রকাশ করতে পারবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এখন প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে যে যদি তিনি তা করেন তাহলে তাঁর পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এখন থেকে সরকারি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগ সহ আঠারোটি সংগঠনের অফিসারদের ফর্ম ২৬ পূরণ করা বাধ্যতামূলক যাতে তিনি অঙ্গীকার দেবেন যে সরকারের অনুমতি ছাড়া সংগঠন সংক্রান্ত কোনও তথ্য তিনি প্রকাশ করবেন না। আইবি, র ছাড়া অন্যান্য সংগঠনগুলির কয়েকটি হল সিবিআই, বিএসএফ, সিআরপিএফ, আইটিবিপি, সিআইএসএফ, ডিআরডিও ইত্যাদি। আপাতত আইএএস, আইএফএস, ক্যাগ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সেনাবাহিনীর অফিসার এবং অন্যান্যরা এই নতুন পেনশন নিয়মাবলীর বাইরে। 

প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় তার জন্য তো ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ এবং ভারতীয় ফৌজদারি আইন ছিলই। নতুন করে পঞ্চাশ বছরের পুরনো আইন ইতিহাসের গর্ভ থেকে উদ্ধার করে সেটাতে একটি সংশোধনী জুড়ে দানবীয় করে তুলে চালু করার হঠাৎ এই প্রচেষ্টা কেন? ইতিপূর্বে ‘র’এর প্রধানরা তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখেননি এমনটা তো নয়। প্রাক্তন প্রধান বিক্রম সুদ'এর ‘দ্য  আনএনন্ডিং গেম: আ ফরমার র চিফস ইনসাইটস ইন্টু এস্পায়নেজ’ বেশ সাড়া ফেলেছিল। আরেক প্রাক্তন প্রধান ও কাশ্মীর বিশেষজ্ঞ এ এস দুলাত তো আইএসআই'এর প্রধান আসাদ দুরানির সাথে যৌথ ভাবে একটি বই রচনা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। বইটি ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়- ‘দ্য স্পাই ক্রোনিকলস: র, আইএসআই অ্যান্ড দ্য ইল্যুশন অফ পিস’। বইটি এই দুই স্পাই মাস্টারের মধ্যে একটি কথোপকথন যাতে কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ২৬/১১'র মুম্বাই আক্রমণ, ওসামা বিন লাদেন, ভ্লাদিমির পুতিন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, বালুচিস্তান, সার্জিকাল স্ট্রাইক সহ অনেক কিছুই আলোচনা হয়েছিল। ২০১৮'র ২৪ মে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি যৌথভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। ভারত সরকার এই অনুষ্ঠানে আসাদ দুরানিকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল। এছাড়া সরকারের দিক থেকে বইটি সম্পর্কে কোনও বিরূপ মন্তব্য করা হয়নি বা এ এস দুলাত'এর ওপর কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। অথচ পাকিস্তানে আসাদ দুরানি রাতারাতি খলনায়ক হয়ে গিয়েছিলেন এবং ভারতের দালাল, বিশ্বাসঘাতক ইত্যাদি তকমায় তাঁকে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অদ্ভুত ভাবে ভারত সরকার এখন পাকিস্তানের প্রদর্শিত পথেই এই আমলাদের কন্ঠরোধ করছে, বাকস্বাধীনতা হরণ করছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে, তখনও তো বিজেপি সরকারই ক্ষমতায় ছিল! তাহলে এই দু' বছরের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু বিপুল জনবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা হবে যে কারণে সরকার এখন সমস্ত ধরনের সমালোচনা, ভিন্ন মতামতের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো প্রয়োজন মনে করছে। যার  জন্য তারা ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করছে, তাদের যে কোনও পোস্টের উৎস প্রকাশ করতে বাধ্য করছে। কোনও সংবাদমাধ্যম সরকার বা প্রধানমন্ত্রী বিরোধী কোনও মন্তব্য করলেই সেটাকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। মুড়িমুড়কির মতো রাষ্ট্রদ্রোহী আইন ব্যবহার করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ভর্ৎসনা করেছে। মহামান্য আদালত বলেছে, ভিন্ন মত পোষণ করা, সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়। এর অর্থ কী? গোদি মিডিয়া সৃষ্টি করার পরও, তাদের কুখ্যাত আইটি সেলের দাপট সত্ত্বেও, সরকার তার দিকে প্লাবিত হয়ে আসা ব্যঙ্গবিদ্রুপ, উপহাস, মিম, কার্টুন ইত্যাদির জোয়ার বন্ধ করতে পারছে না, প্রতিবাদ আন্দোলনকে দমন করতে পারছে না।

এখন তারা দেখছে, পোড় খাওয়া আমলা যাঁরা সরকারের ‘নিজস্ব’ ব্যক্তি ছিলেন, তাঁরাও ভিন্ন সুর গাইছেন। এ এস দুলাত'এর কাশ্মীর সংক্রান্ত বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ২০২০'র ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেন, শুধুমাত্র আল্লাই জানেন কাশ্মীরে কী হচ্ছে! এবং দিল্লিরও এই নিয়ে চিন্তাভাবনা কী তা কারও ধারণা নেই। তিনি বলছেন, কাশ্মীরের সাথে দিল্লির সব সময় সমস্যা ছিল, কিন্তু ভারতের মানুষের সাথে তাঁদের কোনও সমস্যা ছিল না। আমাদের ভাবতে হবে, কেন এখন কাশ্মীরের মানুষ বনাম ভারতের মানুষ হয়ে গেছে যখন বাস্তবে কাশ্মীরিরাও ভারতীয়? কাশ্মীর শুধুমাত্র একটা নিরাপত্তাজনিত বিষয় নয়, এটা একটা রাজনৈতিক, আবেগ জড়িত বিষয়, তিনি যোগ করেন। দুলাত বলেছেন, জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি কোনও লেখার জন্য কারও কাছে অনুমতি চাইতে যাবেন না। দরকার হলে তিনি ইতিহাস লিখবেন, ফিকশন লিখবেন, কবিতা লিখবেন, কে আটকাবে তাঁকে? 

লাক্ষাদ্বীপের তথাকথিত উন্নয়নের বিরোধিতা করে যে নব্বই জন আমলা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন, তার মধ্যে তো ভূতপূর্ব জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের নাম আছে। তাহলে এই নতুন সংশোধনীর ফলে তিনি কি এই ধরনের আর কোনও প্রতিবাদ করতে পারবেন না? সরকারি মহলে শ্রদ্ধেয় এম কে নারায়ণন (প্রাক্তন আইবি প্রধান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পশ্চিমবঙ্গের ভূতপূর্ব রাজ্যপাল)- তিনি তো 'হিন্দু' পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। এবং সেগুলো যে সরকারের খুব সুখ্যাতি করে এমনটা নয়। যেমন ২০২০'র বছর শেষে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে এমন একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে ভারত ক্রমশ একটা ‘ক্ষয়িষ্ণু গণতন্ত্র’ হয়ে যাচ্ছে, সরকার এই অবনতি সম্পর্কে অবহিত আছে? ২১ মে'র নিবন্ধে লিখছেন, এই অতিমারিকে নিয়ন্ত্রণ এবং গণতন্ত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য শাসকবর্গের যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন। তো ইনি কি প্রতিটি লেখার জন্য সরকারের কাছে অনুমতির জন্য ছুটবেন?

সরকার কী এত লুকোতে চাইছে? এমন কী গুরুত্বপূর্ণ যার জন্য প্রাক্তন বাবুদের জীবিকা ধরে টান দিতে হচ্ছে? আলমারিতে কি প্রচুর কঙ্কাল চাপা দেওয়া আছে (Too many skeletons in the cupboard)? পুলওয়ামা কান্ডে কি কোনও ঘাপলা আছে, বা বালাকোট স্ট্রাইকে? ধারা ৩৭০ কাশ্মীর থেকে তুলে নেওয়ার পর সেখানে মানুষের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা অতি উচ্চপদস্থ হাতে গোনা দু' চারজন গোয়েন্দা ও সেনা অফিসাররা ছাড়া কেউ কিছু জানেন না। নাকি সরকার আগামী দিনে এমন কিছু ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনা করছে যেটা প্রকাশ্যে এলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে? সরকার কি সিঁদুরে মেঘ দেখছে তাই সম্ভাব্য সমস্ত তথ্য নিষ্ক্রমণের জায়গাগুলো রুদ্ধ করে দিতে চাইছে? এরপর যদি আইএএস, আইপিএস, সেনা অফিসারদের ওপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয় তাহলে তো হর্ষ মান্দার, জুলিও রিবেরিও, অ্যাডমিরাল এল রামদাস যাঁরা সরকারি নানা কুকীর্তির বিরুদ্ধে সরব এবং সক্রিয়, তাঁদের তো কণ্ঠরুদ্ধ করে দেওয়া হবে। 

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বিরোধী দলগুলি এইসব স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে খালি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েই খালাস। কোভিড বিধি মেনেও তো রাজধানীতে কিছু প্রতিবাদ সংঘটিত করা যায়। সরকার ঘুঁটি সাজাচ্ছে, বিরোধীদের কিন্তু এখন ‘ক্যাচ আপ’ খেলা বন্ধ করতে হবে।  


Sunday, 6 June 2021

পরিবেশের কথা

জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ 

ও কোভিডের ত্র্যহস্পর্শ 

শোভনলাল চক্রবর্তী


২০১৫-র প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর ব্যাপারে গুটিকয়েক মাতব্বর দেশ ঠিকা নিয়েছিল। তারাই আগ বাড়িয়ে 'নেট জিরো এমিশন'-এ পৌঁছনোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। যেমন, আমেরিকা আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০৫০ সালে, চিন ২০৬০ সালে। ইউরোপের ৫০০টি বিমানবন্দর 'নেট জিরো এমিশন'-এ পৌঁছতে প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করেছিল। যে পরিমাণ যাত্রী সারা বছর ধরে ওই বিমানবন্দরে যাতায়াত করেন তাতে মাত্র ২ শতাংশ এমিশনে লাগাম পরানো যাবে বলে স্থির হয়েছিল। 

আসলে, পরিবেশ সংক্রান্ত পেল্লায় প্রতিশ্রুতির গোটাটাই ছিল অন্তঃসারশূন্য। কোভিডের মৃত্যু মিছিলে সেই সত্যই সোচ্চারে প্রতিষ্ঠিত। ভারতের দিকে তাকালে অবস্থা আরও ভয়াবহ। ২০১৯-এ এই দেশে ১৬ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন স্রেফ বায়ু দূষনের কারণে। ভারতের মোট মৃত্যুর ১৭.৮ শতাংশ মৃত্যুর কারণ বায়ু দূষণ। অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম ২.৫ এবং ওজোন দূষণ যার বৃদ্ধি বর্তমানে ১৩৯.২ শতাংশ! বায়ু দূষণ জনিত অকালমৃত্যু, অসুস্থতা বা বিকলাঙ্গতার কারণে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৬.৮ বিলিয়ন ডলার। বেলাগাম বায়ু দূষণের প্রাবল্যেই ২০২৪ সালে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিবাস্বপ্ন পরিণত হতে পারে দুঃস্বপ্নে। দূষণ কমাতে পারলে ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল ফেরার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতেও বইত সুপবন। বায়ু দূষণ ঠেকাতে ১৯৭০ সাল থেকেই আমেরিকা কোমর বেঁধে নেমেছিল। আজ হিসেব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ উন্নয়নে প্রতি ১ ডলার  বিনিয়োগে আমেরিকা ৩০ ডলারের সুফল ঘরে তুলেছে। স্রেফ সিসা মুক্ত গ্যাসোলিন ব্যবহারেই শিশুদের রক্তে সিসা জনিত দূষণ কমায় লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে শিশুদের আই-কিউ, বেড়েছে উৎপাদনশীলতা। অর্থনীতির উজ্জীবন ঘটেছে। 

ভারত ১৯৮৪ সালে দূষণ নিয়ন্ত্রণে নড়েচড়ে বসে এবং স্থাপন করে 'দ্য ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং প্রোগ্রাম'। ২৯টি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ৩৩৯টি শহরের ৭৭৯টি কেন্দ্রের মাধ্যমে আজ বাতাসের গুণমান নির্ণীত হয়। বাড়ির ভেতরের দূষণ কমাতে ২০১৪ সালে তৈরি হয় 'উন্নত চুলা অভিযান'। ২০১৫-এ শহরবাসীর ফুসফুসকে চাঙ্গা করতে চালু হল 'স্মার্ট সিটি মিশন'। ২০১৬-তে 'প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা'। ২০১৯-এ 'দ্য ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম'-এ ১০২টি শহরে ভাসমান ধূলিকণার মাত্রা ২০২৪ সালের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছিল। মোদিজির সব গজদন্তমিনারি প্রকল্পের মতোই অধিকাংশ পরিবেশ প্রকল্পই জন্মের প্রথম শুভক্ষণেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে হরিনাম সংকীর্তন শুরু করে। গোটা বিশ্বে আজও তাই ওজোন ও অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণাজাত দূষণে সবার ওপরে ভারত। 

'উজ্জ্বলা যোজনা'-র সিলিন্ডার পিছু এক ধাক্কায় ১২৫ টাকা দাম বাড়ায় ৮৬ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবার গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন কাঠ বা কয়লা-ঘুঁটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ঘাতক চুলায়। অদূরদর্শিতা, পরিকল্পনাহীনতা, সস্তা হাততালি কুড়োনোর অভিলাষ আর পেশাদারিত্বের অভাবেই বিপর্যস্ত পরিবেশ সংক্রান্ত প্রায় সব প্রকল্প। বায়ু দূষণ শুধু মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি করে তাইই নয়, বায়ু দূষণে ফোঁপরা হতে থাকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও দক্ষতা। মানবসম্পদের অপূরণীয় অপচয়ে দেশের সামুদয়িক উন্নয়নে হয় কুঠারাঘাত। বায়ু দূষণে কোভিডের তুলনায় মৃত্যু হার ১৩ গুন বেশি। 

আসলে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম ২.৫-এর ঘাড়ে চেপেই সার্স কোভ-টু ড্রপলেটের মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বায়ু দূষণ বা আরও স্পষ্ট করে বললে, পিএম ২.৫-এর সৌজন্যেই ভারতবাসীর ফুসফুসের অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। সারা বিশ্বের তুলনায় ভারতের কোভিড রোগীদের তাই সবচেয়ে বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ছে। ভারতে বায়ুতে মাত্র ১ শতাংশ পিএম ২.৫ -এর বৃদ্ধি কোভিডের মৃত্যুহারকে বাড়াচ্ছে ৫.৭ শতাংশ, ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সের মানুষের অন্ধত্ব বাড়াচ্ছে ৮ শতাংশ এবং গ্লুকোমা রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে ১২ শতাংশ। ২০২০ লকডাউনের সময় কলকাতার বাতাসের প্রতি ঘন মিটারে ভাসমান পিএম ২.৫ ছিল সর্বনিম্ন ১৬.৮৬ মাইক্রোগ্রাম এবং সর্বোচ্চ ৪২.৮২ মাইক্রোগ্রাম, যখন হু'র সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম। 

লকডাউনের সময় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে ওজোনের পরিমাণ। লকডাউনের সময়ে হয়তো কোভিড সংক্রমণ কমেছে কিন্তু বেকার হয়ে যাওয়া মানুষের কাঠ কয়লার আগুনের রান্নার কারণে প্রাণঘাতী বায়ু দূষণকে তালাবন্দি করা যায়নি। ভ্যাকসিনে কোভিডকে নিরস্ত্র করা গেলেও, বায়ু দূষণ কীভাবে কমবে তা নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। কলকাতার বায়ু দূষণ কমানোর জন্য অনেকেই বিভিন্ন রকম বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দিতে বলেছেন। গাছ লাগানোর সময় যে সব গাছ লাগানো হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বট, পেয়ারা, আম, জবা, কদম, করবী, নিম, ভেরেন্ডা এবং ইউক্যালিপটাস। কলকাতার ফুটপাথে পাকা পেয়ারায় বা কদম ফুলে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। কলকাতার ফাঁকা মাঠে বা পার্কে বট বা পিপুল গাছ লাগানো যেতে পারে অবশ্যই, তবে পার্ক বা বড় মাঠ দুটোই এখন কলকাতায় অতীত। নিম, ছাতিম, বকুল কলকাতার পরিবেশের ফলে উপযুক্ত। 

অরণ্য নিধন যেমন ক্ষতিকারক, তেমনই ক্ষতিকর অপরিকল্পিত, অবৈজ্ঞানিক বৃক্ষরোপন, বনসৃজন। স্থানীয় দেশজ প্রজাতির পরিবর্তে লাগানো অন্য গাছ যেমন জীববৈচিত্রের বারোটা বাজাচ্ছে, তেমনই বাড়ছে জুনোটিক অসুখের (যেমন, সার্স, মার্স, নিফা, কোভিড প্রভৃতির ) সম্ভাবনা। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৮৮৪টি রোগের প্রাদুর্ভাবের ঘটনায় দায়ী ছিল ১১৬টি জুনোটিক সংক্রমণ।পতঙ্গ বাহিত সংক্রমণ যেমন ম্যালেরিয়া, জিকা, চিকনগুনিয়া'র মতো প্রায় ১৯৯৬টি রোগের জন্য ওই একই সময়পর্বে দায়ী ছিল বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ। এই সব সমস্যা ডিঙ্গিয়ে বায়ু দূষণ কমানো এখন দূর অস্ত। 

আমেরিকা, চিন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে যে সময় চেয়েছে (২০৫০-৬০) তার আগেই স্রেফ উষ্ণায়নের কারণে ২০৩০-এর পরেই পরিস্থিতি চলে যাবে হাতের বাইরে। বিজ্ঞানীরাই এমন কথা জানাচ্ছেন। সুতরাং, হাতে সময় খুব কম। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের উচিত আজই জলবায়ু নিয়ে সোচ্চার হওয়া, কাল কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে। 

পুনশ্চ: হাড় হিম করা সমস্ত তথ্যই 'দ্য ল্যানসেট', 'গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি-২০১৯'-এর সৌজন্যে প্রাপ্ত।


Saturday, 5 June 2021

গিগ অর্থনীতিই ভবিষ্যৎ

সংকুচিত হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 

সারা বিশ্বেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও। করোনা পরিস্থিতি এই সংকোচকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পিউ রিসার্চের একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালে ভারতে মধ্যশ্রেণি (দৈনিক আয় ১০.১ থেকে ২০ ডলার) থেকে ৩.২ কোটি মানুষ ছিটকে নিচে নেমে গেছে। একই সময়ে দারিদ্র্য হার বেড়ে হয়েছে ৯.৭ শতাংশ এবং দরিদ্র মানুষের (দৈনিক আয় ২ ডলারের কম) সংখ্যা আরও ৭.৫ কোটি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি বিশ্বে মোট দারিদ্র্য বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ। এটা ছিল গত বছরে কোভিডের প্রথম তরঙ্গের ধাক্কা। দ্বিতীয় তরঙ্গে এই অবস্থা আরও করুণ হয়েছে।

সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)’এর তরফে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, ভারতে চাকুরিরত ৮.৫ কোটি মানুষের মধ্যে গত এপ্রিল-মে মাসেই ১.২ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এছাড়াও ৯.১ কোটি ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ এবং ১.৮ কোটি স্বউদ্যোগী মানুষের কাজ গেছে। গত ৩ জুন দেশে বেকারত্বের হার ১২.৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে (শহরে ১৫.১ ও গ্রামে ১১.২ শতাংশ)। মধ্য ও নিম্নমধ্য শ্রেণির এই আর্থিক অবনমনে সামগ্রিক ভাবে চাহিদার ওপর প্রভাব পড়েছে এবং গত ৩০ বছর ধরে যে ভোগবাদী অর্থনীতির বয়ান নির্মিত হচ্ছিল তাতে সজোরে ধাক্কা লেগেছে। এই অবস্থা ভোগ্যবস্তু উৎপাদনকারী শিল্পের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মোটা দাগে দেখলে, ভারতীয় অর্থনীতিতে মন্দার অগ্রভাগকে আমরা প্রত্যক্ষ করছি এবং ভবিষ্যতে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা মুশকিল। রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস জানিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলিতে আমরা পড়তি বৃদ্ধির হার লক্ষ্য করতে চলেছি যা এই আর্থিক বছরের শেষার্ধে (জানু-মার্চ ২০২২) গিয়ে দাঁড়াবে ৬.৬ শতাংশে।

আরও উল্লেখ্য, পিউ রিসার্চের তথ্য দেখাচ্ছে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই তথ্যরাশির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল, নিম্নমধ্য শ্রেণির (দৈনিক আয় ২.০১ থেকে ১০ ডলার) অন্তর্ভুক্ত মানুষের সংখ্যায় খুব একটা বেশি হেরফের হয়নি, বরং আপেক্ষিক বিচারে (এই বর্গের জনসংখ্যা বিশাল) তা সামান্য কমেছে (৩.৫ কোটি)। কারণ, প্যানডেমিকের আগে (জানুয়ারি ২০২০) নিম্নমধ্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ১১৯.৭ কোটি যা নেমে এসে দাঁড়ায় ১১৬.২ কোটিতে (প্রথম তরঙ্গের পরে)। অর্থাৎ, মধ্যশ্রেণির যে ৩.২ কোটি মানুষ নিচে নেমে গেলেন (৯.৯ থেকে ৬.৬ কোটি) তাঁরা গিয়ে দরিদ্রদের দল ভারী করেছেন। শুধু তাঁরাই নন, উচ্চমধ্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মানুষের সংখ্যাও ৬০ লক্ষ কমে গেছে। অতএব, এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক যে, নিম্নমধ্য শ্রেণি থেকেও বহু মানুষ দরিদ্রদের দল ভারী করেছেন কিন্তু মধ্য ও উচ্চমধ্য শ্রেণি থেকে আবার বহু মানুষ নিম্নমধ্য শ্রেণিতে দলভুক্ত হয়ে সেই শ্রেণির কমবেশি ভারসাম্য আপাতত বজায় রেখেছেন।

এই সামগ্রিক তথ্য বিন্যাস থেকে একটাই সুত্র খুব পরিষ্কার ভাবে বেরিয়ে আসে যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বিপুল ভাবে বেড়ে যাওয়ায় (৫.৯ কোটি থেকে ১৩.৪ কোটি) দেশের শ্রমজীবী মানুষের গড় আয়ের এক সামগ্রিক অবনমন হয়েছে। এর তাৎপর্য দুটি: এক) কাজের ক্ষেত্রে মজুরি বা আয় কমে যাওয়া এবং দুই) কাজের ক্ষেত্রটিই বদলে যাওয়া। উপরের তথ্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা গেল যে, শ্রমজীবী মানুষের গড় আয় কমে গেছে, কিন্তু কাজের ক্ষেত্র বদলে যাওয়ার অর্থ কী? বহু মানুষের চাকরি চলে গেছে, সেও এক বাস্তবতা। কিন্তু কাজের নতুন ক্ষেত্র কি তৈরি হয়েছে? না হলে কেন বলা হচ্ছে কাজের ক্ষেত্রটিই বদলে গেছে?

এই তথ্য এখনও সংগৃহীত হয়নি যে, যত লোকের চাকরি চলে গেছে তাঁরা আবার সকলে কাজ পেয়েছেন কিনা। বহু ক্ষেত্রেই জানি, তাঁরা কোনও কাজ পাননি। অনেকের বাজারে প্রচুর দেনা হয়ে গেছে, গরিব মানুষের অনেকেই নানাবিধ ছোটখাটো কাজকর্ম করে নিজেদের অবস্থাটাকে ঠেকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ সরকারি ত্রাণ ও রিলিফের ওপর নির্ভর করে কোনওরকমে নিজেদের রক্ষা করছেন। হতাশা ও বিপন্নতা বাড়ছে, অবসাদ একেকটা পরিবারকে গ্রাস করছে, অপরাধপ্রবণতা, মানসিক বৈকল্য ও হিংসার প্রকোপ সমাজকে জড়িয়ে ধরছে। কিন্তু এর বিপ্রতীপে অন্য একটা ছবিও পরিস্ফুটমান যা অনেকের সাবেকি চোখে ধরা পড়ছে না এখনও; বা কিছুটা ধরা পড়লেও আলোচনার পরিসরে এনে ঠিকঠাক ফেলতে পারছেন না বোঝাপড়ার পিছুটানের জন্য। তা হল, গিগ অর্থনীতির দ্রুতলয়ে প্রসার।

পুঁজিবাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আবহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভিঘাতে গত চার-পাঁচ বছরে বিশ্ব জুড়ে ও আমাদের দেশেও গিগ অর্থনীতির যে প্রসারপর্ব শুরু হয়েছিল তা প্যানডেমিকের কবলে পড়ে আরও দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়েছে। এক বিশাল সংখ্যক গিগ শ্রমিকের অস্তিত্ব ও ক্রমপ্রসারমানতা এখন ঘোরতর বাস্তব। রাজনৈতিক অর্থনীতির বয়ান আমূল বদলে যাচ্ছে। এই প্রবণতাকে বুঝতে না পেরে বহু রাজনীতি ও অর্থনীতির পণ্ডিত, মায় রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতারা, চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। ‘কোথা হইতে কী হইয়া’ যাইতেছে বুঝতে না পেরে তারা ঘটনার পিছু পিছু যন্ত্রের মতো ছুটে হোঁচট খেয়ে পড়ছেন। ‘শিল্প শিল্প’ ও ‘চাকরি চাকরি’ করে যারা নিত্য দাপাদাপি করেন, তাঁরাও ট্যারা চোখে দেখছেন, (আরে), ‘কাজ আছে চাকরি নেই’। চারপাশে অফুরন্ত কাজ, কিন্তু চাকরি নেই। কতিপয় কর্পোরেট চালিত এই ভুবনে কাজের যে নেটওয়ার্ক-সিরিজ, সেখানে কাজের উদয় ও লয়ের কোনও নির্দিষ্ট আঙ্গিক নেই। বেকার ছেলেমেয়েরা অথবা কর্মচ্যুত চাকরিজীবীরা- যারা বুঝতে পারছেন, উদিত কাজগুলিকে ধরে নিচ্ছেন। সে কাজে মজুরি কম, উদয়াস্ত খাটুনি, স্থায়িত্ব নেই, সামাজিক সুরক্ষারও কোনও বালাই নেই (এক কথায় 'চাকরি নেই'), কিন্তু সে ছাড়া আপাতত উপায়ও নেই। উপায়ন্তরহীন মানুষ প্রবেশ করে গেছেন গিগ অর্থনীতির বলয়ে যেখানে কাজের উদয় ও বিদায় চোখের পলকের মতো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সদাই হাজির পরিবর্তনশীল অফুরন্ত কাজের মেলা। অবশ্য, এই মুহূর্তের বৈশিষ্ট্যে, প্যানডেমিকে ঘরবন্দী মানুষের কাছে সে কাজ হয়ে উঠছে আরও বেশি বেশি ভার্চুয়াল। সাদা-কলারধারী বাবুদের পরিষেবা-ভিত্তিক সফিস্টিকেটেড কাজ থেকে শুরু করে নীল-কলারধারী শ্রমজীবী মানুষের ‘মামুলি’ কাজগুলিও এখন গিগ অর্থনীতির অংশভাক। বাড়িতে খাবার থেকে নানাবিধ পণ্য ডেলিভারি অথবা গেরস্তের কল সারাই থেকে ইলেক্ট্রিক ফিটিং, নয়তো গ্রাহকের কাছে ব্যাঙ্ক বা বীমা পরিষেবার সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কিংবা কন্টেন্ট রাইটিং, নিদেনপক্ষে থ্রি-ডি প্রযুক্তিতে উৎপাদন ও এমন আরও বিবিধ, ভৌগোলিক সীমার কাঁটাতার পেরিয়ে, অযূত কাজের সম্ভারে সারা বিশ্ব আজ রোমাঞ্চিত।

বস্টন কনসালটিং গ্রুপ (বিসিজি) জানাচ্ছে, আমাদের দেশে আগামী বছরগুলিতে অ-কৃষি ক্ষেত্রে ৯ কোটি গিগ কাজ তৈরি হয়ে যাবে। প্যানডেমিকের দরুণ বর্তমানের বহু কাজ গিগ কাজে রূপান্তরিত হবে। হচ্ছেও তাই। অনুমান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সাদা-কলারওয়ালা পরিষেবা-ভিত্তিক কাজের জগতে ৫০ থেকে ৭৬ শতাংশ কর্মীরা হবেন গিগ কর্মী। অর্থাৎ, এরা কাজ করবেন চুক্তির ভিত্তিতে, নির্দিষ্ট সময়ে জন্য এবং চাহিদা মোতাবেক। এক জায়গায় কাজ ফুরিয়ে গেলে পরে আবার অন্যত্র একইভাবে অন্য কাজের সঙ্গে যুক্ত হবেন। ‘চাকরি’ বলে যে শব্দটিতে আমরা এতদিন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি ও স্বস্তি বোধ করেছি, সে শব্দের বৃহৎ কোনও অস্তিত্বই আর আগামী দিনে থাকবে না। আমরা প্রবেশ করছি ‘কাজ’এর এমন এক নতুন জগতে যেখানে ‘কাজ’ বলতে বোঝাবে স্বল্প সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক এক অযূত পরিসর- এক খোপ থেকে আরেক খোপে যাতায়াত করেই মানুষের জীবনকাল অতিবাহিত হবে। সেই গতায়াতে বিপদ আছে, কর্মহীনতা আছে, মজুরি কমে যাওয়া আছে, অন্যান্য আরও নানাবিধ অনিশ্চয়তা আছে, আবার হয়তো লাভালাভও আছে। সে যাই হোক, তবে এটাই হয়ে উঠছে আজ ও আগামীকল্যের কাজ ও যাপনের পরিসর। উচ্চমধ্য শ্রেণি থেকে গরিব- সমস্ত শ্রেণির মানুষের জন্যই এই হতে চলেছে অমোঘ নিয়তি।

আর সেই সুবাদে আমূল পালটে যেতে বসেছে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের চালচলন। রাজনীতির জগতে অতি দক্ষিণপন্থীরা যতই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-জাতপাত-লিঙ্গ ইত্যাকার ধোঁয়া তুলে বিভাজনের রাজনীতির চেষ্টা করে যাক, আর সে আতঙ্কে সাবেকি বামপন্থীরাও এইসব ফাঁদে আটকে পড়ুক না কেন, গিগ অর্থনীতির নব উদয় যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনীতির আঙ্গিক নির্মাণ করছে, সেখানে মানুষের প্রাথমিক পরিচয় হবে শ্রমজীবী মানুষ হিসেবেই। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনুশাসিত ভুবনে ব্যক্তি শ্রমের আধুনিকতর দক্ষতা ও প্রজ্ঞা অর্জনের ওপরেই ব্যক্তির কাজের সম্ভাবনা তৈরি হবে, আর সে জন্য তাকে হন্যে হয়ে বারবার নিজেকে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। আর এই স্পর্শকাতর, ভঙ্গুর সামাজিক-অর্থনৈতিক অবয়বটিকে রক্ষা দিতে রাষ্ট্রকে সামাজিক সুরক্ষার নিদান নিয়ে হাজির হতে হবে। যেমন, ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য- এই দুটি হবে রাষ্ট্রের তরফে এমন এক রক্ষাকবচ যে, কোনও গিগ শ্রমিক যখন কর্মহীন বসে থাকবেন তখন তাঁর ন্যূনতম অন্নাভাব যেন না হয়। কারণ, সদা-সতর্ক রাষ্ট্র খেয়ালে রেখেছে, কাজের জগতের এই চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা যেন সমাজের বুকে বিদ্রোহের কারণ না হয়ে উঠতে পারে। প্যারি কমিউনের সার্ধ শতবর্ষে এ কথা তাদের আরও বেশি বেশি করে মনে পড়বে।  

যদিও এইসব কঠোর বাস্তবতা থেকে আমরা এই মুহূর্তে এখনও বেশ কিছুটা দূরে। কারণ, চলতি প্যানডেমিকের অবসান না হলে স্বাভাবিক চলমানতার ছবিটা স্পষ্ট হবে না। কিন্তু অতি-দক্ষিণপন্থী ভাবধারা মুক্ত রাজনৈতিক-অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র বা সরকার যে সে পথেই এগোতে চাইছে তা ক্রমশ স্পষ্ট। যারা রাজনীতিতে জনপ্রিয়, উদারবাদী ও প্রাসঙ্গিক থাকতে চাইছেন, তাঁরা চেষ্টা করছেন এই পরিবর্তিত বলয়টিকে অনুধাবন করতে এবং নব উদিত অনিশ্চিত ও বিপন্ন শ্রমজীবী মানুষের কাছে নতুন ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও মুক্ত রাজনীতির বার্তা বয়ে নিয়ে যেতে। কৃষি ক্ষেত্রের বাইরে এই যে বিপুল শ্রমজীবী জনতা, যাদের এক বড় অংশ এক নতুন আঙ্গিকে আজ উদিত হচ্ছে, তাদের সম্যক ভাবে বোঝার ওপরেই রাজনীতির দলগুলির প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করছে। পুঁজিবাদের এই চতুর্থ বিপ্লব যা শ্রমজীবী মানুষকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন ও পদানত যন্ত্রে পরিণত করবে, তার থেকে মুক্তির উপায় কীভাবে, তা অন্বেষণ করে ওঠা আরও বড় চ্যালেঞ্জ।   

 

Friday, 4 June 2021

প্যারি কমিউনের সার্ধ শতবর্ষে

স্মরণে মননে ফিরে দেখা

শোভনলাল চক্রবর্তী


মোট ৭২ দিন। ১৮৭১ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মে- প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা তৈরি করেছিলেন প্যারি কমিউন, যা দুনিয়া জুড়ে বৈপ্লবিক স্বপ্নের দুয়ার উন্মুক্ত করেছিল। ফ্রান্সকে একটা বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যে শাসক শ্রেণি, প্রুশিয়ার ক্রীতদাসত্বের অধীনে ঠেলে দিচ্ছিল যে শাসক শ্রেণি, তাদেরই মুখোমুখি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা। 

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৮৪৮ সালের বিদ্রোহের উত্তরাধিকার নিয়ে প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই দুই সময়পর্ব এমন ছিল যেন শ্রমজীবী মানুষ কোনও পুণ্যলোকে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, দুনিয়ার শ্রমজীবী জনতার পরিকল্পিত শ্রমজীবী মানুষের শাসনে চলা একটা বিশ্ব তাঁরা গড়ে তুলতে পারবেন। ৭২ দিনের এই হাতেকলমে পরীক্ষা প্যারি কমিউন নামে সুপরিচিত ছিল। একে কমিউন বলা হয় কারণ বিপ্লবীরা নগরের অংশগুলোকে এক একটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন যেখান থেকে শাসনের বিভিন্ন নীতিগুলি প্রস্তুত হতে থাকে। এই যৌথ ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছিল 'কমিউন'। কমিউন শুরু হয়েছিল দেশপ্রেমের তরঙ্গ শীর্ষে, প্রুশিয়ার সেনার হাত থেকে প্যারিসকে বাঁচানোর একটা উপায় হিসেবে। কিন্তু, সাধারণ মানুষের মেজাজ আর বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব- এই দু'য়ের সম্মিলিত ফলাফল হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে তার মোড় ঘুরে যায় একটা বৈপ্লবিক, গণতান্ত্রিক চরিত্রের অভিমুখে। 

যারা কমিউনের উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন তাঁরা সকলেই ছিলেন অপরিচিত সাধারণ শ্রমিক। ফলে, কমিউন হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন, নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর নয়। যেদিন কমিউন গড়ে তোলার বৈপ্লবিক কাজ শুরু হয়, ঠিক তার পরের দিন ১৯ মার্চ হোটেল ডি ভিলার মাথায় লাল পতাকা উড়ল। ভোরের কুয়াশার সাথে একই সঙ্গে উবে গেল সেনাবাহিনী, সরকার ও প্রশাসন। বাস্তিলের গহ্বর থেকে, বাসফ্রোইয়ের অজ্ঞাত ঠিকানা থেকে তুলে এনে কেন্দ্রীয় কমিটিকে বসানো হল প্যারিসের সর্বোচ্চ আসনে এবং সেটা করা হল সমগ্র বিশ্বের চোখের সামনে। প্যারি কমিউনের সনদ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে তার প্রশাসনের চরিত্র ছিল শ্রমিকশ্রেণির চরিত্র। 

পরিত্যক্ত কারখানাগুলো শ্রমিকরা দখল করে কাজ শুরু করে দেন, শ্রমিকদের ওপর চাপানো জরিমানার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বেকারিগুলিতে রাত্রিকালীন কাজ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সামাজিক কাজে ব্যবহারের জন্য চার্চের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়। বন্ধকী কারবারের জায়গায় নিয়ে আসা হয় একটি সামাজিক সংগঠন, যারা কাজ থেকে ছাঁটাই শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারে। শ্রমিকশ্রেণি ভুক্ত প্রত্যেকটি মানুষ, প্রতিটি দরিদ্র কৃষক, এমন কি যাঁরা কমিউনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সবাইকে নতুন সমাজে জুড়ে নিতে হবে এই ছিল কমিউনের মনোভাব। 

কমিউনের নেতৃত্বে ছিলেন যাঁরা, তাঁরা উঠে এসেছিলেন বহু ধরনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে। নানান দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কমিউনের সদস্যদের বেশ বড় মাপের একগুচ্ছ সংস্কারমূলক কাজ করতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যেটার অভাব তাঁদের ছিল তা হল কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সামগ্রিকভাবে পরিকল্পিত একটা সুস্পষ্ট কর্মসূচি। কমিউন ছিল ব্যাংক অফ ফ্রান্সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ফরাসি রাষ্ট্রের কাঠামোগুলির প্রতি আস্থাশীল। মহত্বের এমন নজির ইতিহাসে আর নেই। শ্রমিকরা প্যারিসের দখল নিয়েছিলেন কিন্তু ব্যাংক দখল করেননি। এমন কি তাঁদের শক্তির উল্লেখযোগ্য সমাবেশ ঘটিয়ে দ্রুততার সাথে ভার্সাই পৌঁছে বুর্জোয়া শ্রেণির সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার কাজও করেননি। আইডলফ থায়ার্স-এর সরকারকে ক্ষমতায় বসে থাকার সুযোগ দিয়ে প্যারি কমিউন নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে এনেছিল। 

এই ঘটনাক্রমে ক্ষিপ্ত মার্কস প্যারি কমিউন গঠনের কয়েক সপ্তাহ পর তাঁর বন্ধু, সহযোগী লুই কুগেলম্যানকে লিখেছিলেন, 'ওরা যদি পরাজিত হয়, তাহলে তার জন্য ওদের দয়ালু প্রবৃত্তিকেই একমাত্র দায়ী করতে হবে। প্যারিস ন্যাশনাল গার্ডের মধ্যে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল অংশ যে মুহূর্তে নিজেদের পিছু হটিয়ে নিতে বাধ্য হল, তখনই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের ভার্সাইয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বিবেকের দ্বন্দ্বে ওরা সঠিক সময়টা নষ্ট করল। ওরা গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চায়নি। ওরা কি ভেবেছিল যে অনিষ্টকারী, বিকৃত মানসিকতার জীব ওই থায়ার্স প্যারিসকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি না নিয়ে বসে আছে।' 

মার্কস যা লিখেছিলেন বাস্তবে হলও তাই। ভার্সাইয়ের সেনাবাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে প্যারিসের ৪০ হাজার মানুষকে খুন করেছিল। ওই গণহত্যার ১৫০ বছর পরে আজও বুলেটের ক্ষতচিন্হ রয়ে গেছে। প্যারিসের রাস্তায় মৃতদেহগুলি স্তূপীকৃত করে পেট্রোল ঢেলে খোলা আকাশের নিচে পোড়ানো হয়। রক্তস্নাত প্যারিসের রাস্তা পরিদর্শন করে থায়ার্স ঘোষণা করেছিলেন, 'প্যারিসের মাটি ওদের মৃতদেহ দিয়ে ঢেকে গেছে। আশা করতে পারি, যাঁরা নিজেদের প্যারি কমিউনের অনুগামী বলে ঘোষণা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল, সন্ত্রাসের এই ভয়াবহ দৃশ্য সেই সমস্ত রাজদ্রোহীদের কাছে একটা শিক্ষা হতে পারে।' সেই দিনটা ছিল ২৫ মে। তার তিনদিন পরে ২৮ মে প্যারি কমিউনের পতন ঘটে। কমিউন টিকে ছিল দু' মাসের কিছু বেশি সময়। কমিউনের মৃত ব্যক্তিদের ওপরে ফ্রান্সের বুর্জোয়া শ্রেণি বিপুল আকারের এক গির্জা বানিয়ে তার নাম দেয় 'সক্রে কোওর' (পবিত্র হৃদয়)। ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, 'প্যারি কমিউন যে পাপ করেছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে এটা গড়ে তোলা হল।' গণতন্ত্রের পথে চলতে থাকা প্যারি কমিউনের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে তার স্মৃতিকে মুছে ফেলতে তাকে গির্জার তলায় চাপা দেওয়া হয়েছিল। 

কখনও কখনও ইতিহাসে এক একটা সময় এসে হাজির হয় যখন কোনও ব্যর্থ কারণ হলেও জনতার একটা সংগ্রাম প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাঁদেরই ভবিষ্যতের শিক্ষার জন্যে, তাঁদেরই পরের লড়াইয়ের প্রয়োজনে, প্রশিক্ষণের জন্যে। কমিউনের শিক্ষা কেবলমাত্র প্যারিসের শ্রমিকদের জন্য নয় বা ফ্রান্সের জন্যও নয়, বরং তা ছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির জন্য একটা পাঠ। শ্রমিকশ্রেণির আত্মশিক্ষার জন্য একটা পাঠ। সেই শিক্ষা হল মানবতার দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে ফেলার পক্ষে। সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নিজেদের লড়াই সংগ্রাম সুসংহত করার পক্ষে। সর্বোপরি, প্যারি কমিউন নিয়ে মার্কস'এর এই অমোঘ কথাটিকে উপলব্ধি করার মধ্যে: পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শুধু দখল করলেই চলবে না, তাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন ব্যবস্থার পত্তন করতে হবে। (ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ, ১৮৭১)।


Thursday, 3 June 2021

মারি ও মড়ক

'নীরবে মৃত্যু' ও অপরাধ প্রবণতার মন্তাজ

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- বেশিদিন অবধি বেঁচে থাকার একটা অন্যতম শাস্তি হল, প্রতিদিন কোনও না কোনও স্বজনের মৃত্যু সংবাদ পেতে হয়। কথাটা বড় নির্মম সত্য। কিন্তু সে-দিন কি অনুমান করা গিয়েছিল যে এমন একদিন আসবে যে-দিন যৌবনের চন্দ্রমার্গী কাব্য রচনা করবে নিত্যনৈমিত্তিক এক মৃত্যুবলয়- কখনও নিকট আত্মীয়ের, কখনও বা ছেলেবেলার বন্ধুর। অস্ফুটে বলবে, আহা কতই বা বয়স ছিল, এমনভাবে চলে গেল। 

ফেসবুকের পাতা কিংবা মোবাইল ফোনের রিংটোন এখন যেন মৃতস্তূপের হাহাকার বয়ে আনে। ভয়ে আতঙ্কে মানুষ জড়োসড়ো হয়ে যায় যখন মধ্যরাতের মুঠোফোনে চিরাচরিত অভ্যেসের জীবনানন্দ পাঠরত কণ্ঠের বদলে আসে একটি অন্যস্বর; জানান দেয় সেই সুললিত উচ্চারণ চিরকালের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। মনে হয়, দোষারোপের পাহাড় এনে আছড়ে ফেলা যাক রাষ্ট্র কিংবা বিজ্ঞানের ওপর। কিন্তু সে সব আবেগ ক্ষণস্থায়ী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম, কেন না ততক্ষণে যে আরেকটি ফোন এসে যায়। মানুষ স্তব্ধবাক দৃষ্টিতে ভাবতে থাকে এই ফোন ধরবে কি না!  

করোনাজনিত মৃত্যুই যে স্থবিরতার একমাত্র কারণ তা কিন্তু নয়। এর বাইরে আগামীর জন্য থেকে গেছে একটি বৃহৎ আশঙ্কা। আজ থেকে বহু বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, 'আজ সব নীরব। বাজারে দোকান বন্ধ, দোকানদার কোথায় পলাইয়াছে ঠিকানা নাই। আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশু ক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপকে টোল বন্ধ করিয়াছে; শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না। বৃক্ষে পক্ষী দেখি না। গোচারণে গরু দেখি না। কেবল শ্মশানে শৃগাল-কুকুর।' 

তিনি আরও লিখেছিলেন, 'লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল, তার পরে কে ভিক্ষা দেয়!—উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তার পরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল, লাঙ্গল জোয়াল বেচিল, বীজ ধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ী বেচিল। জোত জমা বেচিল। তার পর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কিনে? খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। রোগ সময় পাইল, জ্বর, ওলাউঠা, ক্ষয়, বসন্ত। বিশেষতঃ বসন্তের বড় প্রাদুর্ভাব হইল। গৃহে গৃহে বসন্তে মরিতে লাগিল। কে কাহাকে জল দেয়, কে কাহাকে স্পর্শ করে। কেহ কাহার চিকিৎসা করে না; কেহ কাহাকে দেখে না; মরিলে কেহ ফেলে না। অতি রমণীয় বপু অট্টালিকার মধ্যে আপনা আপনি পচে। যে গৃহে একবার বসন্ত প্রবেশ করে, সে গৃহবাসীরা রোগী ফেলিয়া ভয়ে পলায়।' 

অল্প বয়সে এই সব উপন্যাস পাঠের মুহূর্তে পাঠকের মন যেরকম গম্ভীর হয়ে যেত একদিকে, অন্যদিকে বর্ণনার সুলালিত্যে মুগ্ধ সাহিত্যরস-পিপাসু হৃদয় উদ্বেলিত হত। কিন্তু এখন শুধু শিহরণ জাগে, বুকের ভেতরে একটা হাঁসফাঁস আওয়াজ দরজায় ধাক্কা দেয়, বলে, কালকে কি তবে এমন দিন আবারও আসবে, নাকি সমাগত? 

এইসব লেখার মর্মবস্তু ছিল তৎকালীন মড়ক ও দুর্ভিক্ষ। তবে এ কথা তো অস্বীকার করা যায় না যে মহামারি একলা আসে না। আসে দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে। বিশ্ব ব্যাঙ্ক একটি তথ্যে জানিয়েছে, করোনার কারণে এখন দারিদ্র সর্বাধিক পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে। আর দারিদ্রের মূল কারণগুলি হল কর্মহীনতা ও দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষের রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়া। পক্ষান্তরে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গত বছরের আমফানে কত যে-মানুষ গৃহহীন হয়েছে, কত ছাত্রছাত্রীর পাঠ্যপুস্তক ভেসে গেছে নোনাজলে, কেউ তার হিসাব রাখেনি। আর এই বছর দেশের একপ্রান্তে ‘তওতে’ ও অন্য প্রান্তে বাংলা-উড়িষ্যার বুকে ‘যশ’। 

সরকার বাহাদুর জমির ফসল বিক্রির এমন আইন জারি করতে চলেছে যে কৃষকরা হন্যে হয়ে আন্দোলন করছে, কেউ তাতে মুখ ফিরিয়েও দেখছে না। বহু মানুষের মাথার ওপরে ঝুলছে ডিটেনশন ক্যাম্পের খাঁড়া। মানুষ অসহায়। বৃদ্ধি পাচ্ছে দৈনিক অপরাধ প্রবণতা। চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানি থেকে শুরু করে গৃহস্থালি অপরাধের হার ক্রমবর্ধমান। তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে ভারতবর্ষে গত ১০ বছরে গৃহস্থালি অপরাধ বেড়েছে ১৪.৩ শতাংশ। এছাড়া ভুয়ো অনুদান প্রকল্পের নামে সক্রিয় হয়েছে সাইবার অপরাধচক্র। ইন্টারপোল জানাচ্ছে, কয়েক মাসের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট রেজিস্ট্রেশন ৭৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে ও ৬০০ শতাংশ বেড়েছে ফিশিং মেইল। ভারতবর্ষে ২০২০ সালের প্রথম অর্ধে অপরাধের ২২,৯৯,৬৮২টি ঘটনা ঘটেছে যা ২০১৯ সালের শেষ অর্ধের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন। এমনকি বেড়েছে অবৈধ ড্রাগ, অস্ত্র ও মানুষ পাচারের ঘটনাও। পক্ষান্তরে মেডিক্যাল সামগ্রীর কালোবাজারি তো আছেই। দেশ ও বিদেশের নানা জরিপ-তথ্য এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ এসবের নানা প্রমাণ প্রতিদিন হাজির করছে জনসমক্ষে।  

কিন্তু তারপরেও থেকে যায় একটি মৌলিক প্রশ্ন। অপরাধ তো দুই প্রকারের: এক) শাস্তিযোগ্য ও দুই) ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু অতিমারি জনিত অপরাধকে রাষ্ট্র কোন দৃষ্টিতে দেখবে? নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই এখানে জনসমাজ অপরাধী ঠাওরাবে! রেশনের চাল-ডাল তো আর মানুষের দৈনন্দিন সকল চাহিদা মেটাতে পারে না, পারে না জন্ম থেকে গড়ে ওঠা অভ্যেসের পাঠক্রমকে এক লহমায় বদলে দিতে। যেমন ধরা যাক, কোনও সন্তানের পিতা যদি আজ শিশুর দুধের পয়সাটুকু জোগাড় করতে না পারে কিংবা কোনও গৃহস্থ যদি তার মায়ের সুগারের ওষুধ, বাবার চশমা বদল বা স্কুল পড়ুয়া কচিকাঁচাদের আবদারের একটা জেল-পেন জোটাতে হিমসিম খায়, অথবা যে মা তার সন্তানকে এতকাল মাছ ছাড়া ভাত তুলে দেয়নি কোনওদিন, তাকেই আজ শাকান্ন কিংবা সেদ্ধপক্ক বেড়ে দিতে হয় রোজ, পারিবারিক ঋণগ্রস্ততার কারণে এতদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলি যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় আচমকা– এসবের কী পরিণতি আমরা কি জানি! কতদিন মানুষ নৈতিকতা ও শিক্ষার দোহাই দিয়ে অপরাধের প্রবণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে? 

যদি কোনও একদিন কেউ স্ত্রীর দৈনন্দিন কান্নায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে গায়ে হাত তুলে দেয় কিংবা মুদিখানার দোকান থেকে একটা পাউরুটির প্যাকেট দোকানদারের অজান্তে ব্যাগে ভরে ফেলে এবং তারপর গুমরে গুমরে বালিশ ভেজায় বিবেক দংশনের জ্বালায় অথবা সংগঠিত অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ে দৈবাৎক্রমে– কী হিসাবে গণ্য করা হবে এই অপরাধগুলিকে? নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা জনিত দুর্দশার জন্য অন্তিমে মানুষকেই জীবন ও আত্মসম্মানের বিনিময়ে মূল্য চোকাতে হবে! আগামী নিশ্চয় এর সদুত্তর দেবে, আপাতত মনে পড়ে যায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘বোধন’ কবিতাখানির কয়েকটি পঙক্তি:

'কোথাও নেইকো পার

মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার

আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,

এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,

ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,

হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।'

 

Wednesday, 2 June 2021

নিউ নর্মাল

আমূল বদলে যাচ্ছে যাপনের চালচিত্র

সঞ্জয় মজুমদার


সাত সকালে সুবলের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। মাঝারি উচ্চতার বিশুদ্ধ বাঙালি, টিপটপ দেখতে সুবল যাদবপুর ৮বি অঞ্চলের একজন সফল মুদি ব্যবসায়ী‌। রোগী দেখার ফাঁক-ফোকরে সফল চিকিৎসকরা যেমন হেলায় বড় বড় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি সামলান, সুবলকেও দেখেছি বিক্রি-বাটার মধ্যেই তাবড় FMCG'র এজেন্টের সাথে টুকটাক কথা চালিয়ে যেতে। বছর কুড়ির ব্যবসায় গত পাঁচ বছরে সুবলের দোকান প্রথম সারির FMCG (Hindustan Unilever, P&G, ITC, Britannia, Nestle, Dabur, Godrej আরও কত কী)'র ঝাঁ-চকচকে চোখ টেনে নেওয়া সাজানো-গোছানো জিনিসে ভরপুর। বছর তিনেক আগে কার্ডে কেনাবেচার জন্য কাঠখড় পুড়িয়ে একটা POS মেশিন কাউন্টারে রাখল। সঙ্গে ফোনে অর্ডার নেওয়া আর হোম ডেলিভারির সুবন্দোবস্ত। 

আর জনসংযোগ? কলকাতায় পেট্রোল-ডিজেলের দাম একশোর দিকে হাঁটা দিক, জেনে না-জেনে চীন করোনার ফ্রি হোম-ডেলিভারি করুক, লকডাউনের গুঁতো থাক না-থাক, বাংলা যতই 'যশ'-স্বী হোক, অর্থনীতির রেখাচিত্র 'হায় হায়' করতে করতে যতই নামুক আর শেষমেশ বাংলা সবুজ হোক বা গেরুয়া, চব্বিশ ঘন্টা ক্লিন-শেভড্ সুবল সকাল সকাল বাঙালি খদ্দেরকে সামনের দিকে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে চার-আনার হাসি মাখিয়ে গুড-মর্নিং বলবেই। মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট না পড়েও এসব হাবভাবের সাথে কেনাকাটার কোনও সম্পর্ক সে রাখেনি। ভাগ্যিস রাখেনি, না হলে আমার মতো বাঙালি, যারা বাংলা বনধ্, লকডাউন কেমন চলছে সেটা দেখতে বেশি করে রাস্তায় বেরয়, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে সুবলদের সাথে আড্ডায় মাতে, তাদের বোধহয় সকালেই রাত্রি নেমে আসত।

মাছ-মাংস ফল সবজি মুদি এবং অন্যান্য সব কিছু মিলিয়ে প্রায় সবরকম আমিষ-নিরামিষ দোকানে উঁকি দেওয়ার অভ্যাস আমার আছে। বেচাকেনা ছাড়াও ক্রেতা-বিক্রেতার একটা আত্মিক যোগাযোগ প্রতিদিন দেখা সাক্ষাতের ফলে হয়েই যায়। এটা নতুন কিছু নয়। এর ফলে নিক্তিতে মেপে সঠিক ওজনে বাজারের সেরা দামের জিনিসপত্র নিয়ে আমি যে গর্বিত হয়ে বাড়ি ফিরি, তাও না। উল্টোদিকে, বিক্রেতার ছোটখাটো অপরাধ মার্জনা করে দিয়ে ছেঁড়াফাটা নোট বদল, কিছুই না কিনে খুচরো করিয়ে নেওয়া এবং আগের দিনের পচা মাছ, টক আম ইত্যাদি বদলের পরম সৌভাগ্যও ঘটে। ভীষণ হিসেবি শৃঙ্খলাপরায়ণ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা সংসারী নই বলেই হয়তো দোকানির সাথে আলাপ জমিয়ে রাখার রণকৌশল অজান্তেই নিয়ে ফেলি। 

তা যাই হোক, মাসখানেক হল কোভিড নেগেটিভ হয়ে ফুরফুরে মেজাজে এ হেন সুবলের সাথে জোড়া মাস্ক ভেদ করে ছ' ফুটের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আড্ডা চলছিল। আড্ডার একটু নমুনা দিই:

'বুঝেছ সুবল, বাজারে শুধু আড্ডা মারতেই আসব... পাঁচশো মুসুর আড়াইশো মুগ... কেনাকাটা আর কিছু হবে না... কাবলি তিনশো.. কালকের খবর শুনেছ?... মুম্বইতে পেট্রল সেঞ্চুরি করল। এরা বাঁচতে দেবে না আর... সার্ফ এক্সেল পাঁচশ...' 

এইরকম আর কি। বেচাকেনার সাথে আড্ডা ফ্রি দিতে দিতে সুবল কিন্তু চিরকুটে আমার আইটেমগুলো লিখেই যাচ্ছে। এর মধ্যে হয়তো সেদিনের বাজার দর জেনে, দশটা দোকানে দরদাম করে, চারজনের সাথে দাম নিয়ে ঝগড়া করে নোটবুকে বাজারের ফর্দ সমেত কেউ এসে পড়েছে। সুবল তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।‌ ফলে, সুবলের সামনে এখন দুটো ফর্দ। একজনকে মুম্বইয়ের পেট্রোলের দামের একটা মোটামুটি ব্যাখ্যা দিলেই চলবে, আর পরের জনকে টিক দিয়ে লিস্ট মিলিয়ে কোন জিনিসের দাম কী এবং কেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় গোত্রের ক্রেতা প্রথমজনের পরে এসে টাকাপয়সা এবং সময় একটুও বাড়তি খরচা না করে কাজ সেরে আগেই চলে যাবে, বলাই বাহুল্য। 

'দাদা আর কিছু?', সুবলের প্রশ্ন আমাকে। আমিও এবার সজাগ হয়ে উঠেছি। কারণ, মুম্বইয়ের পেট্রোল দুশোয় পৌঁছনোর আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। ইতিমধ্যে জনা ছয়েক আরও এসে পড়েছেন। তাতেও সুবল একটুও বিচলিত হয় না। ও জানে দাদা এবার দোকানের ঝাঁ-চকচকে তাকে চোখ বুলিয়ে অবশিষ্ট তালিকা শেষ করবে। হেঁসেলে চাল ডাল তেল নুনের স্টকের একটা ছবি মাথায় মোটামুটি থাকেই। কোনটা রি-অর্ডার লেভেলে পৌঁছেছে সেটার একটা আন্দাজ নিয়েই আসি। আর কিছু বেশি নিলে বা ভুলে গেলে বকা খাওয়ার বিষয়টাও তালিকায় থাকে। এত বছর বাজারে তীর্থ করে জিনিস ভর্তি ব্যাগের দিকে একবার তাকালে অন্তত বুঝতে পারি কত টাকার জিনিস আছে। এক-দু'বার বারো আনা দরদাম চেল্লামেল্লি করে, চার আনা বাঁচিয়ে, সারা মাসে ট্রেন বাস অটোয় যাতায়াতের ভাড়াও ওঠাতে না পেরে ক্ষ্যামা দিয়েছি। আর সবচেয়ে তৃপ্তির, কোনও দোকানে বাকির খাতা খুলে রাখিনি। কাজেই বাজারে আসি বিন্দাস মুডে। ঘরে বসে প্রাক-কোভিড জীবনের নস্টালজিয়ায় ভুগতে চাই না, বরং আগামী দিন আবার আগের মতো হবে, অর্থাৎ ভবিষ্যৎটা অতীতের মতো হবে- এই 'পোস্টালজিয়া'য় (বাজারের নতুন শব্দ) বাঁচতে চাই। 

ডাক্তারবাবু ছাড়াও রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কোভিড এক্সপার্টদের তালিকায় অ্যানিমাল প্রোটিন ঢুকে পড়েছে। ব্যস আর যায় কোথায়, বিল্টুর কপাল খুলে গেছে। তার মুরগির দোকানটা সুবলের মুদিখানা আর ওষুধের দোকানের মতো রমরমিয়ে চলছে। মুরগির গলা কেটে ছাল ছাড়িয়েই শুধু  ক্ষান্ত হচ্ছে না, তার ডিম এবং সঙ্গে আলু পেয়াঁজ আদা রসুনও বাদ যায়নি। আলি আর রহমত তো ফল সবজি বেচে কুল করতে পারছে না। দিন দুয়েক রহমতের নাদুস-নুদুস ছেলেটাকে তার বাপের সাথে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কি ব্যাপার, তোমার ব্যাটা কোথায়?' প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর চলে এল, 'হোম ডেলিভারিতে পাঠিয়েছি।'

'অর্ডার ধরছ কী করে?'

'কেন দাদা, ফোনে, হোয়াটসঅ্যাপে।' 

'বাজারেও তো খদ্দের কম নয়, এখানে সামলাচ্ছো কী করে? 

'ঐ যে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, শ্যামল।' 

বোঝো কারবার। আমি ভাবছিলাম এও আমার মতো খদ্দের। পরে জানলাম, বিড়ির কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়ে শ্যামল এখন বেকার। আলির গ্রামেই থাকে। আপাতত আলি তাকেই সাগরেদ বানিয়ে নিয়েছে। শ্যামলেরও টু' পাইস রোজগার হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বেশির ভাগটাই FMCG ব্যবসার মধ্যে পড়ে। মানে যা প্রতিদিন বাজারে আসবে, খরচাও হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। এইজন্যই Fast Moving. কিন্তু মুশকিল হল FMCG'র বেশির ভাগ জিনিস ব্র্যান্ড নাম দিয়ে বিক্রি হয়। ফলে, সুবল মুদিখানার দোকানে এই ধরনের ব্যবসা করতে পারে, যেটা বিল্টু রহমত বা আলি আপাতত পারছে না। কোনওদিন পারবে না, এ কথা কিন্তু জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবে দিনের শেষে লকডাউনের বাজারে এরা চারজনেই অনলাইন-অফলাইন ব্লেন্ডিং করে দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই তো করেইনি, উল্টে অন্য জায়গা থেকে হোঁচট খাওয়া লোকজনকে কাজে লাগিয়েছে আর অনলাইনে অর্ডার নিয়ে হোম ডেলিভারিতে রোজগার বাড়িয়েছে। সুবল তো এর মধ্যে স্যুইগি, জোমাটো'র হাতও ধরে ফেলেছে। বাজার ধরে রাখার কোনও রাস্তাই বাদ রাখেনি। মাস ছয়েক পরে হয়তো দেখব- www.alirsobji.com কিংবা www.biltuchiken.com নাম দিয়ে ওয়েবসাইটও তৈরি হয়েছে।

উপরে যা কিছু লিখলাম সবটাই কিন্তু আদ্যোপান্ত সত্যি। তবে সচেতন পাঠক বুঝতেই পারছেন, দোকানির নামগুলো শুধু পরিবর্তন করেছি। যাদবপুর ৮বি'র মতো একটা সাধারণ বাজারের যদি এই ছবি পাই, তাহলে চারিদিকে যতই 'গেল গেল' রব উঠুক, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, বাজার কিন্তু সে কথা বলছে না, বলবেও না। বাজারে চাহিদা আর জোগানের খেলাটা অনেকটা গরম হাওয়া ঠাণ্ডা হাওয়ার মতো। একজন আরেকজনকে টানে। শেষমেশ ভারসাম্যটা বাজার নিজেই তৈরি করে নেয়। 

তাই বলে চোখ উল্টে বসে থাকলে হবে না। প্রাক-কোভিড এবং কোভিড-পরবর্তী উপভোক্তার আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা, কেনার ক্ষমতা সবই যে পরিবর্তন হবে সেটা তো স্বাভাবিক। এইসব জেনে ফেলা বিপদের মধ্যে বাজার খুব একটা ঘাবড়ায় না। প্রতিকূল-অনুকূল সব পরিস্থিতির জন্য শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুত থাকেন। সে কারণেই লকডাউন, বেহাল অর্থনীতি, কর আদায়ের ঘাটতির পরেও শেয়ার বাজার দিব্যি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকাও বদলাতে থাকে। এর উপর সরকারি সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলের বাস্তব পরিস্থিতি, এসব তো আছেই। 

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা: প্রযুক্তি। আমাদের নিত্যকর্ম পদ্ধতির অনেক কিছুই যে অনলাইনে করা সম্ভব সেটা কিন্তু সবাই বুঝতে পারছি। তার চেয়েও বড় কথা, বাজার এবং তার বিনিয়োগকারীরাও বুঝতে পারছে। অভাব উদ্ভাবনের জন্ম দেয়, আর তা শুধু মানুষের মেধাশক্তির সহজাত ক্ষমতা দিয়ে পূরণ করা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতার বাজারে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও দ্রুত নিখুঁত এবং পরিণত হতে হবে। কম্পিউটার কিন্তু আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে সেই মঞ্চ তৈরি করেছিল। দুঃখের বিষয়, আজকের বাস্তবতায় তা কিন্তু একেবারেই যথেষ্ট নয়। নিত্যনতুন সমস্যায় জর্জরিত পৃথিবীতে, অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় নিখুঁত এবং অভিনব সমাধানের রাস্তা বার করে আনতে হবে। রাস্তা একটা বেরিয়েছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই প্রসঙ্গে অনুসন্ধিৎসু সচেতন পাঠককে অনুরোধ করব, অনিন্দ্য ভট্টাচার্য'র বহু চর্চিত 'আশায় বাঁচে চাষা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও একুশ শতকের রাজনৈতিক অর্থনীতি' শীর্ষক 'উপপথ' প্রকাশনার বাংলা ভাষায় লেখা বইটি পড়ে নিতে। 

শেষমেশ যত কথাই বলি না কেন, না বলা কথার তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। এই লেখাতেও তার অন্যথা হল না। 'যশ'-এর তাণ্ডবে যেদিন উপকূলের গ্রামগুলো লণ্ডভণ্ড হল, সেই রাতে ঘুম আসছিল না। দোতলার বারান্দা থেকে পাড়ার নির্জন নিস্তব্ধ গলিটায় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিলাম, মৃত্যুই যদি জন্মের একমাত্র শর্ত হয় তবে আর ভয় কীসের? ভাবনাটা যে ঠিক ছিল, পরদিন সকালে প্রমাণ পেলাম। টেলিভিশনের পর্দায় সন্দেশখালিতে জনৈক মৎস্যজীবী তপন সর্দারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কন্যা, ঝড় জলে বিধ্বস্ত ভেঙে পড়া বাড়িটার সামনে দু' চোখ ভরা আশা নিয়ে সাংবাদিককে বলছে, 'সব বই ভেসে গেছে, কিচ্ছুটি নাই। স্কুলের মাস্টারের থেকে বই চেয়ে নিয়ে এসেছি। পড়তে হবে যে।'


Tuesday, 1 June 2021

আলাপন

বাংলাই পথ দেখাবে

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


বিষয়টা নিছক এক মুখ্যসচিবের অবসর বা করোনা ও ইয়াস পরিস্থিতিতে তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রশ্নে আটকে রইল না। সর্বশেষ খবর মোতাবেক, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে অবসরপ্রাপ্ত মুখ্যসচিবকে জাতীয় বিপর্যয় আইনে শোকজ নির্দেশ ধরানো হয়েছে। যদিও ২৪ মে কেন্দ্রীয় সরকার মুখ্যসচিব পদে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের মেয়াদ আরও তিন মাস বৃদ্ধির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল। তৎসত্ত্বেও, ২৮ মে এক নির্দেশবলে আলাপনকে দিল্লির ডিওপিটি মন্ত্রকে ৩১ মে (তাঁর অবসর গ্রহণের দিন) হাজিরা দিতে বলা হয়। এই অদ্ভুত উন্মাদকর নির্দেশের পিছনে যুক্তি সাজানো হল যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর একটি সভায় উপস্থিত হয়েও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে অন্য আরেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ, এটা সবাই জানেন, একটি রাজ্যের মুখ্যসচিব মুখ্যমন্ত্রীর অধীনেই তাঁর নির্দেশে কাজ করেন। ফলে, মুখ্যমন্ত্রী যদি মুখ্যসচিবকে তলব করেন তখন তাঁর দায়িত্ব তা পালন করা। যদি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবকে সেই একই সময়ে অন্য কোনও কাজে প্রয়োজন পড়ে তবে প্রোটোকল মোতাবেক তা তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেই তাঁকে চেয়ে নিতে পারতেন। তা তিনি করেননি। যখন মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের ও মুখ্যসচিবের বিদায় চেয়েছেন তখন তাঁর তাহলে উচিত ছিল মুখ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া যে মুখ্যসচিবকে আপনি রেখে যান। তিনি তা না করে বরং মুখ্যমন্ত্রীর বিদায়-প্রার্থনাকে মঞ্জুর করেছেন।

কিন্তু ৩১ মে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যসচিবের পদ থেকে অবসর নেওয়ায় দিল্লিতে কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ মন্ত্রকে তাঁর হাজিরা দেওয়ার আর কোনও প্রাসঙ্গিকতা রইল না। এবার তাহলে কী প্যাঁচ কষা যায়? মোদি-শাহ জুটি মাথা খাটিয়ে বের করলেন, তাহলে ব্যাটাকে জিজ্ঞেস করো, সেদিন কলাইকুণ্ডাতে প্রধানমন্ত্রীর সভায় সে সারাক্ষণ উপস্থিত থাকেনি কেন! অথচ, এই অজুহাতটা কিন্তু মুখ্যসচিবের অবসরের আগেই খাড়া করা যেত (যদিও তাঁরা জানতেন যে, মুখ্যসচিব মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই সেদিন তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন)। মোটা মাথায় তাঁরা ভেবেছিলেন, আলাপন হয়তো চাকরিতে বাড়তি তিন মাস বহাল থাকবেন। তিনি থাকলেন না, তাই অবসর নেওয়ার পর শোকজ (একটা কিছু করলেই হল আর কী!)। এমন বিচিত্র কাণ্ডকারখানা এই উদ্ভট ধরনের গোমূত্র-খেকো ম্যানিয়াক লোকজনের পক্ষেই করা সম্ভব।   

আসলে একটা অজুহাত তাঁরা খুঁজছিলেন। তাই দিল্লি ফিরেই যুগলে মিলে প্রথমে- সংবিধানের সমস্ত প্রথা ও বিধিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পদদলিত করে- সেই রাতেই নির্দেশ পাঠালেন মুখ্যসচিবকে ৩১ মে সকাল দশটায় দিল্লিতে হাজির হতে। তারপরের ঘটনাবলী আমরা জানি। প্রশ্নটা এখন আর এই নয় যে, কতটা অসাংবিধানিক ও বেআইনি কাজ তাঁরা করেছেন (কারণ সে কাজে তাঁরা সিদ্ধহস্ত)। প্রশ্নটা এখন এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, তাঁরা গোটা দেশের কাছে কী বার্তা দিতে চাইছেন এবং ২০২৪’এর মধ্যে কোন ধরনের একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা আনতে চলেছেন। কারণ, তাঁরা বুঝে গেছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁদের পরাজয় সুনিশ্চিত। তাই তার আগেই দেশের দখল নিতে তাঁরা এতটাই উদ্গ্রীব।

উপরন্তু, বিষয়টা এমনও নয় যে তা এক আমলার সঙ্গে সরকারের নিছকই এক কর্মগত বিবাদ, বরং প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফে দেশবাসী ও অন্যান্য আমলাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ যে, দেখ, এক সর্বোচ্চ সরকারি আমলাকে আমরা যদি এইভাবে পিষে দিতে পারি, তাহলে তোমরা হাভাতে মানুষজনদের পিঁপড়ের মতো দলে দিতে কী আর এমন কসরত লাগে। তাই, এখন সমস্তটাই দেশ ও দশের বিষয়। ওদের ছড়ানো আতঙ্ক, সন্ত্রাস ও তার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতির বিষয়।

অতএব, ছবিটা খুব পরিষ্কার। পশ্চিমবঙ্গে তাদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া গেলেও তারা নিঃশেষ হয়নি। নির্বাচনে হারের তীব্র হতাশাকে তারা প্রতিশোধের আগুনে ধারণ করে ভয়ঙ্কর প্রকাশে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। তাই, এমনতর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপাতত ঢিলে দেওয়ার কোনও অবকাশই নেই। সারা দেশ জুড়ে এই মনোভাব এখন ক্রমেই সংহত হচ্ছে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গই কেন তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য? গত নির্বাচনেও দেখা গেছে, এই রাজ্যকে জয় করার জন্য তাদের মরীয়া প্রচেষ্টা। করোনার বিপদকে শতগুনে বাড়িয়ে, দেশের সমস্ত কাজ ফেলে, যুগলে মিলে এ রাজ্যে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অর্থ ও পেশিশক্তির অঢেল ব্যবহারে তাদের কোনও খামতি ছিল না। কারণ, তারা জানে (আরএসএস এসব নিয়ে চর্চাও করে), পশ্চিমবঙ্গই হল সেই রাজ্য যেখান থেকে উদারবাদী ও সমন্বয়ের ভাবনা জারিত হয়েছে, যে ভাবনার গর্ভগৃহকে কব্জা না করতে পারলে চিন্তাগত ভাবে দেশের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা সম্ভব নয়। তাই, এ রাজ্যের জল-স্থল-অন্তরীক্ষে তাদের শকুনের দৃষ্টি ও যেনতেন প্রকারেণ তাকে দখলে নেওয়া ও পদদলিত করা তাদের আশু কর্তব্যকর্ম। এমন কি এও শোনা যাচ্ছে (পবন ত্যাগীর মতো আরএসএস মতালম্বী সংবাদিকরা বলে বেড়াচ্ছেন), পশ্চিমবঙ্গকে তারা জোরজবরদস্তি জম্মু ও কাশ্মীরের মতো কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করে তিন টুকরোতে ভেঙে তার দখল নেবে। তাই, পিশাচবৎ যুগলের তরফে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়কে দেওয়ার অভিলাষ শুধু ব্যক্তি আলাপনকে নাস্তানুবাদ করা নয়, ‘ঝিকে মেরে বৌকে শেখানো’র মতো গোটা বাংলাকে হুঁশিয়ারি দেওয়া। আর এইসব চমকানি-ধমকানি-মাস্তানির জন্য তারা নগরকেন্দ্রে বসিয়ে রেখেছে এক নাড়ুগোপালকে (ধন+খড়) যে থেকে থেকে হুইশেল বাজিয়ে তার দিল্লিস্থ প্রভু-যুগলের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছে।

কথায় বলে, হাতি গর্তে পড়লে ইঁদুরও এসে লাথি মারে। এখন হয়েছে কি- এক স্বঘোষিত অকৃতদার, সারদা-নারদা চোর, দীঘা-হলদিয়ার লুঠেরা, সমবায়িকা ব্যাঙ্কের ঠগ- সেও এসে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের এক ট্যুইট করে আবার গর্তে লুকিয়েছে। খুবই স্বাভাবিক, ফ্যাসিবাদীদের যেখানে গঙ্গায় লাশ ভাসাতে কোনও কুন্ঠা নেই, নিঃসঙ্কোচে গণহত্যা করতে হাত কাঁপে না, অক্লেশে গরুর দুধে স্বর্ণপ্রাপ্তির দাবি করে, সেখানে তারা এক কৃতী, অত্যন্ত মেধাবী ও কর্মে পটু একজন মানুষকে মোটে হজম করতে পারবে না। আলাপনের যে মেধা ও ব্যক্তিত্ব, তাঁর যে নেতৃত্বদানকারী সক্ষমতা ও সর্বোপরি এক মানবিক বোধ সম্পন্ন গভীর মন ও প্রজ্ঞা- তার অ আ ক খ সম্পর্কেও এই পিশাচদের বিন্দুবৎ ধারণা নেই। তাই তারা কী বলল (কথায় আছে, পাগলে কী না বলে) তাতে এ রাজ্যের বিবেকমান মানুষজনের কিছুই আসবে যাবে না। কিন্তু যেহেতু ক্ষমতার রাশটা তাদের হাতে, অস্ত্র ভাণ্ডারও তাদের অনুগত সান্ত্রীদের হাতে, তাই এ রাজ্যের মানুষের নির্বিঘ্নে নিদ্রার অবকাশ নেই। উন্মাদের হাতে ট্রিগার থাকলে তা অতীব দুশ্চিন্তার কারণ হয় বৈকি!

কুর্নিশ জানাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে (তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক মতান্তর রেখেও), যিনি এই প্রগাঢ় দুঃসময়ে আমাদের সকল রাজ্যবাসীকে আড়াল দিয়ে নীলকন্ঠের মতো সামনে দাঁড়িয়ে অকুতোভয়ে যে লড়াই দিচ্ছেন, তা সারা দেশ জুড়ে এক নবতর রাজনীতির মাত্রা নির্মাণ করছে। দেশের প্রায় সমস্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলি পরম ভরসায় এই নবনির্মাণের আশপাশে জড়ো হতে শুরু করেছে। এক কাণ্ডজ্ঞানহীন দস্যুদলের হাতে পড়ে আমাদের দেশ যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যে ‘মন কি বাত প্রধানমন্ত্রী’র তালি বাজানো থালি বাজানো কর্মকাণ্ডে দেশ সার্বিক ভাবে এক রসাতলে চলেছে, সেখানে সকলকে আজ এই নবনির্মাণের আকাশতলে এসে একযোগে হাতে হাত মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে। বিপদগ্রস্ত ভারতীয় সংবিধান, বিপন্ন উদারবাদী ধর্মনিরপেক্ষতা, তীব্র সংকটে রুটি-রুজি ও প্রায়-ভঙ্গুর সার্বিক সমন্বয়ের ভাবনাকে আমাদের নিরলস প্রচেষ্টায় বাঁচাতে হবে।

বাংলা ওদের বিদায় দিয়েছে। সারা দেশ ওদের বিদায় দিতে প্রস্তুত হচ্ছে। দিল্লি সীমান্তে কৃষকেরা এখনও বসে রয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কড়া জবাবও ওরা পেয়েছে। এখন ওরা আরও ভয়ঙ্কর পথে এগোবে। তাই, সারা দেশ আজ বাংলার পাশে। বাংলাও আজ সারা দেশের পাশে।