Thursday, 20 August 2020

বদলে যাওয়া দুনিয়া

 উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের দিন কি শেষ!

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 
 
 

এই ভয়ঙ্কর অতিমারি সময়েও রাজনৈতিক সংঘর্ষে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে বাংলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল ও শহরতলি। যখন এ লেখা লিখতে বসেছি, ভারতে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ২৯ লক্ষ ছুঁইছুঁই। আমেরিকা, ব্রাজিল ও ভারত – এই তিনটি দেশ যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন তিন অতি রক্ষণশীল ও উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি – কোভিড আক্রান্তে বিশ্বে শীর্ষে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, এই তিন রাষ্ট্রপ্রধানই কোভিড নিয়ে হয় তুকতাক, নয়তো তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা মাস্তানি দেখিয়ে এ মহামারিকে নিজ নিজ দেশে ভয়ঙ্কর অবস্থায় নিয়ে গেছেন। এমতাবস্থায়, এ রাজ্যে দুই আপাত প্রধান দল তৃণমূল ও বিজেপি এলাকা দখলে ‘মারি ও মরি’ হুঙ্কারে খুনোখুনিতে মেতে উঠেছে। এর সঙ্গে রয়েছে অন্তর্দলীয় গোষ্ঠী লড়াইও। আসন্ন ২০২১’এর বিধানসভা লড়াইয়ের মহড়া অতএব শুরু হয়ে গিয়েছে। আর সংসদীয় নির্বাচনে এই রক্তপাতের অভিশাপ দীর্ঘদিন শুধু এ রাজ্যেরই অভিশপ্ত ভূষণ। এতে নতুন-পুরনো সব দলেরই হাত পাকানো আছে।

 

এ কথা সুবিদিত, এ রাজ্যকে বিজেপি এবারে পাখির চোখ করেছে। গত বছর লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন প্রাপ্তি তাদের সে আশাতে আরও ইন্ধন জুগিয়েছে। যদি ধরেও নেওয়া যায়, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিত ও চয়ন সম্পূর্ণতই আলাদা, তৎসত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী যে তৃণমূল ও বিজেপি, তা নিয়ে সম্ভবত বেশি তর্ক-বিতর্ক উঠছে না। কিন্তু প্রশ্নটা ঈষৎ অন্যত্র। তা হল, পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপি কেন পাখির চোখ করল? তারা এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলের জন্য কেন এত মরীয়া? যদিওবা ২০১৯’এর লোকসভা নির্বাচনে জেতার পর মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও ঝাড়খণ্ড বিধানসভায়, বিশেষত দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডে বিজেপি বিপুল ভোটে হেরেছে! আগামী নিকটে বিহারেও হারার সম্ভাবনা প্রচুর। সে অর্থে তো পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আশা আরও দূরবর্তী। কিন্তু তবুও, বিহারে যদি বা হেরেও যায়, পশ্চিমবঙ্গে তাদের যে করে হোক জিততেই হবে। আর এই বেপরোয়া ও একমুখি মনোভাবের জন্য পশ্চিমবঙ্গ ক্রমেই হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত বধ্যভূমি। আগামী দিন যে আরও ভয়ঙ্কর তা সহজেই অনুমেয়।

 

কিন্তু কেন? কীসের তাড়নায় এক অযাচিত অসম্ভবকে সম্ভব করতে বিজেপি গোটা দেশের সাংগঠনিক শক্তিকে এ রাজ্যে নামাতে চলেছে, যথেচ্ছ অর্থ খরচ করছে ও পেশীশক্তি ব্যবহারেও অকপট? এর পেছনের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভীষ্টকে তাই বুঝতে হবে।

 

পশ্চিমবঙ্গ হল এমন এক রাজ্য যার আলো-বাতাস-হাওয়ায় সজীব সজল মুক্ত বাতায়ন। যে রাজ্য এ দেশে শুধু বামপন্থার সার্বিক উত্থানকে সম্ভব করেনি, ধর্মাচরণ ও ধর্মমতেও এক উদার ও সহনশীল বাতাবরণ নির্মাণ করেছে ও তাকে নিয়ত রক্ষার প্রয়াস রেখেছে, পশ্চিমি ভাবধারার বহু ইতিবাচক ও সদর্থক ভাবনাচিন্তাকে ধারণ করেছে, জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম নেতৃত্বকারী ভূমিকা রেখেছে ও গত দুশো বছরে আরও বহু কৃতি সন্তানের জন্ম দিয়েছে যারা এ দেশ ও বিদেশে যুগান্তকারী কাজ ও চিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ এক বিরল কৃতিত্ব। আর এই কৃতিত্বের মধ্যেই সুপ্ত হয়ে আছে এক উদার, ব্যাপ্ত, বিশ্ব-ভাবনা যা রবীন্দ্রনাথ, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব, বিদ্যাসাগর, সুভাষচন্দ্র বসু, নজরুল, লালন, বাউল ও সুফি সাধকেরা এবং আরও নানান ধারা ও ব্যক্তিত্বের পরম্পরায় এ বাংলার মাটিতে গভীর শিকড়ে প্রোথিত হয়ে আছে। এই গোটা বুননটি বাংলার মাটিকে এমন এক ঔদার্য ও মুক্ত চিন্তার রসদ জুগিয়েছে যে তাকে মুছে ফেলা বা বিস্মৃত হওয়া অতীব কষ্টকর। সংঘ পরিবার ও বিজেপি এই পরমতম ঐতিহ্যের বিস্মৃতির প্রায়-অসাধ্য কাজটিকে সম্পন্ন করার ভয়ঙ্কর উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ, তারা জানে, বাংলার এই প্রাণবায়ু ও মুক্ত সজীবতাকে যদি কিয়ৎকালের জন্যও ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে তাদের প্রাচীনপন্থী, অন্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে মতাদর্শগত ভাবে মোকাবিলা করার মতো আর তেমন জোরালো আয়ুধ হয়তো সারা দেশেই আর থাকবে না। তাই এ এক তীব্র মতাদর্শগত যুদ্ধ: অন্ধত্ব বনাম ঔদার্য, কুসংস্কার বনাম অনুসন্ধিৎসা, উগ্র জাতীয়তাবাদ বনাম বিশ্ব মানবিকতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম যত মত তত পথ।

 

কিন্তু এখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়েরও কতকগুলি দিক আছে। যেমন, বর্তমান রাজ্য সরকার ও শাসক দলের কার্যকলাপে স্বৈরাচারী প্রবণতা যথেষ্ট কার্যকরী ও দৃশ্যমান যা বহু সাধারণ মানুষের মধ্যে নানাবিধ ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আমফান ও কোভিড বিপর্যয়ে তার গণ বহিঃপ্রকাশ রাজ্য জুড়ে বহু অঞ্চলে দেখাও গেল। তাই, শাসক দলের বিরুদ্ধে যে অভাব-অভিযোগ তার সুযোগ বিরোধী পক্ষের দিকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আর এই অসন্তোষকে বিজেপি যে হাতিয়ার করবে তা বলাই বাহুল্য। সে দিক থেকে নিশ্চয়ই আগামী নির্বাচনে বিজেপি কিছু ফসল ঘরে তুলবে। কিন্তু এই বঞ্চনার অভিযোগ রাজ্য জুড়ে সার্বিক প্রবণতা কিনা, সে হদিশের পরীক্ষাও ২১’এর ভোটে নির্ধারিত হবে। আর এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিশিয়েই বিজেপি আশায় বুক বাঁধার চেষ্টা করে চলেছে। আর তাই এই শঙ্কাও অমূলক নয় যে, উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের মিশেলে আবার বহু কিছু ঘেঁটেও যেতে পারে। অর্থাৎ, শাসক দল ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভগুলি, হয়তো দেখা গেল, আপাত ভাবে খানিক চাপা পড়ে গেল, বরং উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিপ্রতীপে শান্তি ও উদার পরিবেশে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাটাই বড় হয়ে ধরা দিল।

 

২০০৮-০৯ সালের সাব-প্রাইম সংকট ও বিশ্বের আর্থিক মন্দায় সামগ্রিক ভাবে উদারবাদী ও বিশ্বায়ন-প্রসূত রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে এক সামগ্রিক ধাক্কা অনুভূত হয়। সেই ছন্নছাড়া বিপন্ন পরিবেশে অনেকেই মনে করতে থাকেন, বিশ্বায়নের ফলেই এই সংকট। অতএব, রক্ষণশীলতা, জাতীয়তাবাদ, ‘দেশিয়’ পণ্যের বাসনা, সীমান্ত প্রাচীর – এইসব অনুষঙ্গগুলি বর্ণবাদী, ধর্মবাদী, জাতিবাদী বিভিন্ন ধরনের শক্তিগুলির হাতিয়ার হয়ে ওঠে ও উত্থিত সংকটের সুযোগে বিশ্বের বহু দেশে এরা ক্ষমতায় আরোহন করে। আমেরিকা, ব্রাজিল, ইউকে, ফ্রান্স, তুরস্ক ও ভারত সহ আরও বহু দেশে অনুরূপ ঘটনা দেখা যায়। বর্তমান এই দশকটা তাই সে অর্থে ছিল একইসাথে রক্ষণশীল ও উগ্র জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ও পতনের যুগলবন্দী; যদি প্রথম অর্ধ হয়ে থাকে পটভূমি নির্মাণ সহ তার উত্থানকাল, তাহলে দ্বিতীয় অর্ধ হল তার অধোগামিতার আরেক পটভূমি রচনার পর্যায়কাল, ফলত, পতনপর্বের শুরু। সে বাদে এই সময়কে বলা যায় এক যুগ সন্ধিক্ষণ, এক উত্তরণকাল পর্ব: যখন উদারবাদীদের সাময়িক পতন ও রক্ষণশীলদের আপাত উত্থানে তথ্য প্রযুক্তি তার বিকাশের প্রায় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে চালকের আসনে অধিষ্ঠিত করছে। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে রাজনীতিকদের ভাষা ও নীতির তেমন কোনও গুরুত্ব নেই। কারণ, রাজনৈতিক-অর্থনীতির হাল যেহেতু ক্রমেই চলে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারই হাতে, তাই রাজনীতিকদের গরম গরম কথায় তার কিছু যায় আসে না; সে নিশ্চিত, তার অ্যালগরিদমের আঙ্গিকেই বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির পরিসর চলতে থাকবে। দেশ, ব্র্যান্ড, নেতা, নীতিকথার সে পরোয়া করে না। তার মধ্যে পোরা সূত্রাবলী ও তার আঙ্কিক সমাক্রান্তেই তার অক্লান্ত গতি।

 

এ হেন বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাই কারও নিস্তার নেই। জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উগ্রতা, বর্ণবাদ – এসবের আজ কোনও মূল্যই নেই আর। কতিপয় নেতা ও কিছু সাধারণ মানুষের মননে, মস্তিষ্কে এমন কিছু ধারণা থেকে যাবে মাত্র, তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা ও কিছু কিছু রক্তপাতও হয়তো হবে কিন্তু অচিরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নব-নির্মিত অপার ভুবনের যে বাধ্যবাধকতা, সেই নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতির পাদপ্রদীপেই আত্মবলিদান দেওয়া ছাড়া উগ্রপন্থীদের আর কোনও উপায়ও থাকবে না। কারণ, তারাও তো চায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে আর তা সময়ের প্রাসঙ্গিকতাকে অনুধাবন করেই। সেটা ট্রাম্প, বোলসোনারো, মোদি প্রমুখেরা অবশ্যই বুঝে গেছেন।

 

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, আমাদের দেশে ও রাজ্যেও, তাই এক নতুন উত্তরণের সম্ভাবনা প্রবল। সেই উত্তরণের সঙ্গে প্রাচীনপন্থী, উগ্র ধর্মীয় ভাবাবেগ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাই কোভিডের ভয়াবহতা ও নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাতে ধর্মীয় অনাচার ব্যতীত আর আছেটাই বা কী!        

Wednesday, 19 August 2020

প্রবঞ্চনার রাজনীতি

ফেসবুকের ছলচাতুরি

সোমনাথ গুহ

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না ফেসবুকের। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ জমা হয়ে রয়েছে এই সংস্থার বিরুদ্ধে। ভুয়ো খবর ছড়ানো, হিংসা উদ্রেক করা পোস্ট না সরানো, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ ইত্যাদি নানা নালিশ বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। কয়েক দিন আগে আমেরিকার ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’এর একটি প্রতিবেদন সাড়া ফেলে দিয়েছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক মহলে। অভিযোগ গুরুতর। ফেসবুক নাকি ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে শাসক দল বিজেপির প্রতি গত কয়েক বছর ধরে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে। সংস্থার কর্মীদের অভিযোগ, শাসক দলের তিনজন নেতার হিংসাত্মক ঘৃণা-প্রচার সত্ত্বেও ফেসবুক থেকে তাঁদের বহিষ্কারের কোনও পদক্ষেপ নেওয়া দূরের কথা, তাঁদের বক্তব্য ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়েও ফেলা হয়নি। রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে অত্যন্ত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার জন্য তেলেঙ্গানার একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই কর্মীরা মনে করেন, এই ধরনের মন্তব্য বিস্ফোরক যা বাস্তব জীবনে হিংসা সৃষ্টি করতে পারে। একই অভিযোগের কারণে আমেরিকায় রেডিও উপস্থাপক অ্যালেক্স জোন্স, ‘নেশন অফ ইসলাম’এর নেতা লুই ফারাখান, শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্য রিচার্ড স্পেন্সার এবং কতিপয় উগ্র শ্বেতাঙ্গ সংগঠনকে ফেসবুক থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে।

আরেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ‘করোনা-জিহাদ’, ‘লাভ-জিহাদ’ ইত্যাদি উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত শব্দবন্ধ প্রচার করার জন্য ধারাবাহিক ভাবে ফেসবুককে ব্যবহার করেছেন। দিল্লি দাঙ্গার নেপথ্যের কারণ হিসাবে একজন বিজেপি নেতার উস্কানিমূলক বক্তব্য ও হুমকিকে দায়ী করা হয়। অভিযোগ, পূর্ব দিল্লিতে আয়োজিত ওনার সভার পরেই অঞ্চলে ব্যাপক হিংসা ও লুঠতরাজ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ফেসবুক এঁদের কারও বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এছাড়াও অভিযোগ, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করতে ফেসবুক উল্লেখজনক ভূমিকা নিয়েছে। সংস্থার এক প্রাক্তনী ও কর্মীরা এর জন্য ভারতে ফেসবুকের পাবলিক পলিসির উচ্চতম আধিকারিক আঁখি দাসের দিকে আঙুল তুলেছেন। ওনার সঙ্গে শাসক দলের ঘনিষ্ঠতা সুবিদিত। তিনি নাকি এই নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন কারণ শাসক দলের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ ভারতে ফেসবুকের ব্যবসা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হানিকর হবে। মনে রাখা ভালো, ব্যবহারকারীর সংখ্যার হিসাবে (৩০ কোটি) ভারত ফেসবুকের সবচেয়ে বড় বাজার। সম্প্রতি এই সংস্থা জিও নেটওয়ার্কে ৫.৭ বিলিয়ান ডলার বিনিয়োগ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হোয়াটস অ্যাপ পেমেন্ট চালু করার প্রস্তাব দু' বছর ধরে পড়ে আছে। সুতরাং, ব্যবসায়িক স্বার্থ যে ফেসবুকের পায়ে বেড়ি পড়িয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।   

ফেসবুকের বদনাম শুরু মূলত ২০১৬ সালে আমেরিকার নির্বাচনের পর থেকে। অভিযোগ ‘ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা’ নামক সংস্থা ফেসবুকে বহু লক্ষ ভুয়ো প্রতিকৃতি তৈরি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিততে সাহায্য করে। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার মালিক রবার্ট মার্সার ট্রাম্পের নির্বাচন তহবিলে অন্যতম বিনিয়োগকারী। আমেরিকার সেনেটের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ট্রাম্পকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেতানোর এই পরিকল্পনায় রাশিয়ারও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বলাই বাহুল্য, ফেসবুক ট্রাম্পের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট এটা প্রমাণিত হয়েছে। সংস্থার কর্মীরা যখন বিভাজনকারী মন্তব্যে রাশ টানার চেষ্টা করেছে, ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম তাতে বাধা দিয়েছে। ট্রাম্প যখন হুমকি দিয়েছেন প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের গুলি করা হতে পারে তখন সমালোচনার ঝড় ওঠা সত্ত্বেও ফেসবুক সেই মন্তব্য সরিয়ে দেয়নি। একই ভাবে আমাদের দেশে ফেসবুকের অ্যালগরিদম বিজেপি বিরোধী পোস্ট বাতিল করেছে। এই সব কারণে কিছু বিখ্যাত কোম্পানি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করেছে।

বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী ফেসবুক তার নীতি নিয়মাবলী ঠিক করে। যেমন জার্মানিতে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের ক্ষেত্রে সংস্থার মনোভাব আমেরিকার থেকে অনেক কড়া। সিঙ্গাপুরে সেখানকার সরকার যদি কোনও ভুয়ো খবর নজরে আনে তাহলে সংস্থা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনী প্রচারের ব্যবস্থা করে। ভিয়েতনামে সরকারের চাপে বিক্ষুব্ধদের রাজনৈতিক প্রচারে বাধা সৃষ্টি করে আবার তার পরিবর্তে ফেসবুকের স্থানীয় সার্ভারে যে বিঘ্ন ঘটানো হত সেটার মোকাবিলা করে

‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’এ ভারত সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তেলেঙ্গানার জনপ্রতিনিধির কিছু মন্তব্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক দ্বারা অনুমোদিত কোনও একাউন্ট তিনি খুলতে পারবেন না। করোনা-জিহাদ নিয়ে যিনি প্রচার করেছিলেন তাঁর টুইটার একাউন্ট মুলতুবি রাখা হয়েছিল। ফেসবুকে তাঁর একাউন্ট এখনও চালু যদিও কিছু মন্তব্য মুছে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির নেতা যাঁর বক্তব্যের ফলে দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল বলে অভিযোগ, তাঁকে নিয়ে ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকেরবার্গ নিজে একটি সভায় উষ্মা প্রকাশ করেন যার ফলে সেই পোস্ট এবং ভিডিও মুছে ফেলা হয়। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য যে, শুধু ওই মন্তব্যের কারণে ওই নেতার ফেসবুক পাতায় অংশগ্রহণ লাখ দুয়েক থেকে এক লাফে পঁচিশ লাখ পেরিয়ে যায়।  

মার্ক জাকারবার্গ ধোয়া তুলসিপাতা নন। আর সব ধনকুবের, অতিকায় কর্পোরেটের মতো তাঁরও লক্ষ্য মুনাফা, আরও মুনাফা। ঠিক এই কারণেই তাঁর সংস্থা ইদানিং যে সব কলঙ্কে জর্জরিত হয়েছে তা 'তিনি প্রশমিত করতে চান'। ২০১৯'এর এপ্রিল মাসে য়ুভাল নোয়া হারারির সঙ্গে একটি কথোপকথনে তিনি কর্তৃত্ববাদী সরকারের সাথে ব্যবসা করার নানা অসুবিধার কথা ব্যক্ত করেছেন। এই সব সরকার তাদের দেশের মানুষের তথ্যসম্ভারের নাগাল পেতে চায়; তারা গোপনীয়তা সংক্রান্ত নিয়মাবলী একেবারেই মানতে চায় না; কিছু দেশে অত্যন্ত কড়া সেন্সরশিপ আইন। সম্প্রতি মার্কিন হাউস জুডিসিয়ারি কমিটির অ্যান্টি-ট্রাস্ট সাব-কমিটির শুনানিতে তিনি স্বীকার করেছেন, ভুয়ো খবর আটকানোর জন্য তাদের নিয়মকানুনে অনেক ফাঁক আছে। তিনি বলেন, ভুয়ো খবর, ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা, ঘৃণা-প্রচার, হিংসা-উদ্রেককারী মন্তব্য এইসব রোধ করার জন্য তাঁর সংস্থা অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছে। জাকারবার্গ মনে করেন যে হিংসা, উগ্রবাদী মন্তব্য, কার্যকলাপ এই সব রোধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তাই তিনি বড়াই করেন তাঁর সংস্থার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ ছোট উদ্যোগপতিদের তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। হারারি তাঁকে মনে করিয়ে দেন, নাৎসি জার্মানিতে শিক্ষিত জার্মানরাই হিটলারকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁর নিজের দেশ ইজরায়েলে নাগরিকদের যে ভাবে নজরবন্দি রাখা হয় তার জুড়ি মেলা ভার। তারা এই প্রযুক্তি অন্যান্য দেশে রফতানি করে অথচ ইজরায়েল বিশ্বের একটি অন্যতম উন্নত দেশ।

বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এমন একটা তরবারি যা দু দিকেই কাটে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য গড়ে তোলা যেমন সহজ ঠিক তেমনই হিংসা, বিদ্বেষ, বিভাজন ছড়ানোও একই ভাবে সহজ। ঘটনা হচ্ছে, যারা হিংসা, অরাজকতা ছড়াতে চায় তারা অনেক বেশি সংঘটিত, তাদের বিপুল কর্মী বাহিনী আছে যারা ভুয়ো খবর, ফটোশপ করা ছবি, ভিডিও ইত্যাদি প্রচার করাতে অনেক বেশি দক্ষ। তাদের নেতানেত্রী, সংগঠনের অনুসরণকারীর সংখ্যা বিরোধীদের চেয়ে বহু গুণ বেশি। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ নির্বাচনও আজ বিপন্ন। নব্য প্রযুক্তির সাহায্যে ভোটদান প্রক্রিয়ায় অন্তর্ঘাত করা সম্ভব, যা ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উল্লম্ফন যেমন মানব সভ্যতার কাছে এক আশীর্বাদ তেমনই এই একই প্রযুক্তি বিশ্ব জুড়ে কর্তৃত্ববাদের আগমনকেও ত্বরান্বিত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ফেসবুক, টুইটার, গুগল, অ্যাপেলের মতো তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের মহারথীদের ভূমিকা অপরিসীম। ইতিহাস তাঁদের কী ভাবে মনে রাখবে: তাঁরা যে প্রযুক্তিকে বিশ্বব্যাপী বিচ্ছুরণে সাহায্য করেছে তা কি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে কর্তৃত্ববাদের ধাত্রী হিসাবে প্রতিপন্ন হবে? 

 

Wednesday, 12 August 2020

অশনি সঙ্কেত স্পষ্ট

নয়া শিক্ষানীতিতে স্কুল শিক্ষা

সুমনকল‍্যাণ মৌলিক

 

পরিবর্তন জীবনের ধর্ম। তাই দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে সারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার 'ভোল' পাল্টানোর লক্ষ্যে যে নয়া শিক্ষা নীতি দেশবাসীর কাছে পেশ করা হয়েছে তা নিয়ে সর্বস্তরে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। যদিও এই 'যুগান্তকারী' শিক্ষানীতি পেশ করার সময় যে ভাবে রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে (অথচ এখনও পর্যন্ত শিক্ষা সংবিধানের যুগ্ম তালিকায় আছে), সংসদে পেশ না করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সম্মতি দেওয়া হয়েছে, তাতে শিক্ষানীতির 'গণতান্ত্রিক' চরিত্রটি যে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই শিক্ষানীতি এক বহু স্তরীয় নথি যা প্রাক-প্রাথমিক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষার রূপরেখাকে নির্দিষ্ট করেছে। আমরা বর্তমান নিবন্ধে আলোচনা স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখছি।

শুরুতেই নতুন শিক্ষানীতিতে স্কুল শিক্ষা নিয়ে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো করা হয়েছে তা দেখে নেওয়া যাক:

১) স্কুলের আগে তিন বছরের প্রাক স্কুল শিক্ষা;

২) প্রচলিত ১০+২ এর বদলে ৫+৩+৩+৪ ব্যবস্থা;

৩) পঞ্চম শ্রেণি (সম্ভব হলে অষ্টম) পর্যন্ত মাতৃভাষায়/ স্থানীয় ভাষায় ক্লাসে পড়ানো, তবে বিষয় হিসাবে ইংরেজি থাকছেই;

৪) তৃতীয় থেকে পঞ্চম প্রস্তুতি পর্ব;

৫) ষষ্ঠ থেকে অষ্টম মাঝারি পর্বের শিক্ষা;

৬) নবম থেকে দ্বাদশ  চারটি সেমিস্টার ভিত্তিক একটি পরীক্ষা;

৭) তৃতীয় পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বিশেষ পরীক্ষা;

৮) অনেক বেশি ও বিভিন্ন রকম বিষয় একসাথে পড়ার সুযোগ;

৯) ২০৩০'এর মধ্যে সকলকে স্কুলে টেনে আনা;

১০) ২ কোটি স্কুলছুটকে শিক্ষার আঙিনায় ফিরিয়ে আনা।

এই সুপারিশগুলো এবং সার্বিকভাবে দলিলটিতে স্কুল শিক্ষার ভবিষ্যতের ছবিটা যেভাবে আঁকা হয়েছে তা আমরা পয়েন্ট ভিত্তিক আলোচনা করব।

প্রথমত, আশা করি এই কথাটির সঙ্গে কেউ দ্বিমত হবেন না যে শিক্ষার সর্বজনীকরণ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নির্ধারণে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯)। এই আইনের মাধ্যমে প্রজাতান্ত্রিক ভারতে সর্বপ্রথম শিক্ষার অধিকার আইনি ন্যায্যতা পায়। সেই আইনে বলা হয়েছিল, শিশুর বাসস্থানের এক কিলোমিটারের ব্যাসার্ধের মধ্যে অবশ্যই একটি প্রাথমিক স্কুল থাকবে। কিন্তু প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম সেই স্কুলগুলিকে দূরের  স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত করে স্কুল কমপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না, তা অনুসন্ধান না করে এই বিদ্যালয়গুলি বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ শিক্ষার সংকোচন; এবং এই শিক্ষানীতির ঘোষণা ২০৩০'এর মধ্যে সকল শিশুর জন্য শিক্ষাদানের ব্যবস্থার তা সম্পূর্ণ বিরোধী। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, ঝাড়খণ্ডে বিগত বিজেপি সরকার বস্টন কনসালটেন্সি নামে এক বহুজাতিক সংস্থার পরামর্শে ৬০০০ প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুল বন্ধ করে ছাত্র-ছাত্রীদের অন্য স্কুলে জুড়ে দিয়েছে, যার ফলে সে রাজ্যে ড্রপ-আউটের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। রাজস্থানেও ৩০ শতাংশ স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ে গিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে স্কুলের আগে তিন বছরের প্রাক-স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা অবশ্যই শিশু মনস্তত্ত্বের বিরোধী। শিক্ষাবিদরা বহু আগেই বলেছেন যে শিশু ৫-৬ বছর বয়স হলে তবেই স্কুলে যাবে। এরপরেও সরকার যদি জোর করে প্রাক-স্কুল শিক্ষাকে প্রাথমিক স্কুলের সাথে যুক্ত করে তাহলে সেই শিক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? এমনিতেই সরকার পরিচালিত স্কুলগুলোতে শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং স্কুল পিছু অন্তত নতুন তিনটি শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন। সেই অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে? বলা হচ্ছে, চার মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের এই কাজ করানো হবে যা বাস্তবত অসম্ভব। এতদিন পর্যন্ত শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি ও যত্নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা। কিন্তু সরকার তাদের মাইনে বাড়ানো তো দূরে থাক, তাদের সরকারি ক্যাজুয়াল কর্মীর স্বীকৃতিটুকু দেয়নি। ফলে, আজও তারা সরকার নির্ধারিত বেতনটুকুও পায় না। এর মধ্যে তাদের জন্য নতুন ভূমিকা পুষ্টি প্রকল্পকে যেমন দুর্বল করবে তেমনি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে। এমনিতেই আজ (বিশেষত শহরাঞ্চলে) নিম্ন মধ্যবিত্তরাও প্রাইভেট স্কুলমুখি। নতুন নীতির ফলে জোয়ার আসবে বেসরকারি প্রি-স্কুল বাণিজ্যে। বণিক সভাগুলির মতে, ২০১৬ সাল থেকে বার্ষিক ৩০ শতাংশ হারে বাড়তে থাকা প্রি-স্কুলের ব্যবসা নয়া নীতির দৌলতে এক লাফে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির মুখ দেখবে।

তৃতীয়ত, এতদিন পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল এবং সে ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট বয়স থেকে সেই শিক্ষা শুরু করা যেত (অষ্টম ও দশম)। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা নীতিতে এই বিভাজন তুলে দিয়ে শিক্ষায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য (application based learning) সবাইকে একই শিক্ষাক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে যতই চটকদার শোনাক না কেন, বাস্তবত দেখা যাচ্ছে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে (শিক্ষার্থীর বয়স যখন ১১) ভোকেশনাল কোর্সে (কার্পেন্ট্রি, ইলেকট্রিক বা মেটাল ওয়ার্ক, গার্ডেনিং) শিক্ষানবিশি শুরু হবে। এর পরিষ্কার লক্ষ্য, কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে কম পয়সার অর্ধদক্ষ শ্রমিক তৈরি করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও প্রশ্নটা আজকের ভারতবর্ষের নিরিখে বিচার করা উচিত। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৫৩ বছরে বেকারি বর্তমান জমানায় সর্বোচ্চ। সোজা কথায়, চাকরির সংখ্যার চেয়ে কর্মক্ষম হাতের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এই সময়ে গরিব, সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিগুলিকে উচ্চশিক্ষার জন্য নিরুৎসাহিত করে তাদের শ্রমের বাজারে ছেড়ে দেওয়াই এই শিক্ষানীতির প্রকৃত লক্ষ্য।

চতুর্থত, একই ভাবে বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনও 'কঠিন' নিয়ম থাকবে না। অর্থাৎ, কোনও শিক্ষার্থী পদার্থবিদ্যার সঙ্গে কত্থক নাচও বিষয় নির্বাচন করতে পারবে। এর বাস্তবিক প্রয়োগ কী? উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক স্তরে ২০১৩ সালে এই কোর্স চালু করেছিল। কিন্তু দেখা যায়,  ফাউন্ডেশন কোর্স করতে এতটা সময় চলে যাচ্ছে যে কোনও বিষয়েই নিবিড় পাঠ সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তার কোনও প্রায়োগিক মূল্য পাচ্ছে না। ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই সেই কোর্স উঠে যায়। স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই বিপর্যয় ঘটবে।

পঞ্চমত, এই শিক্ষানীতিতে এক সংহত মূল্যায়ন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বোর্ডের পরীক্ষার গুরুত্ব কমানো। এই শিক্ষানীতির ফলে সারা দেশেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বলে আর কিছু থাকবে না, তার বদলে চারটি সেমিস্টার ভিত্তিক একটি পরীক্ষা হবে। আসলে, এই প্রস্তাবটি দ্বিচারিতাপূর্ণ ও এক কেন্দ্রিক। পরীক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন পদ্ধতির কেন্দ্রীকরণের জন্য একটি নীতি তৈরি হবে যার নাম PARAKH (Performance Assessment, Review and Analysis of Knowledge for Holistic Development)। আর সেই মূল্যায়ন পদ্ধতি মেনে তৃতীয়, পঞ্চম, অষ্টম, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে মড্যুলার ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হবে। এর পিছনে দুটো উদ্দেশ্য আছে। একটি হল, ভারতের মতো বহু ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির দেশে রাজ্য স্তরের বোর্ডগুলি সেই রাজ্যের বৈশিষ্ট্য সমূহ মাথায় রেখে যে ভাবে পাঠ্যক্রম তৈরি, পরীক্ষা পরিচালনা করছিল, তাকে ধ্বংস করে সংঘ পরিবারের দাবি মেনে 'এক দেশ, এক শিক্ষা' চালু করা। দ্বিতীয়টি হল, ড্রপ-আউটের সংখ্যাকে লুকিয়ে রাখা। 'অল ইন্ডিয়া ফোরাম ফর রাইট টু এডুকেশন' প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে যত শিক্ষার্থী অ্যাডমিশন নেয়  তার মধ্যে আদিবাসীদের ৬ শতাংশ, তপশিলি জাতিদের ৮ শতাংশ, ওবিসিদের ১০ শতাংশ ও সংখ্যালঘুদের ৯ শতাংশ দ্বাদশ শ্রেণিতে আসে। বাকিরা মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়। এই বিশাল সংখ্যক ড্রপআউট'দের লুকোবার জন্য 'Entry', 'Exit', 'Flexibility' প্রভৃতি শব্দের আড়ালে ড্রপ-আউটকে ন্যায্যতা দেওয়া হবে।

ষষ্ঠত, আমাদের আশঙ্কাকে সত্যি করে এই শিক্ষানীতিতে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোভিড পর্বে আমরা দেখেছি, অনলাইন শিক্ষা কীভাবে বৈষম্যের নয়া হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার ও ডেটা কেনার পয়সা না থাকার কারণে কীভাবে হাজার হাজার শিক্ষার্থী  শিক্ষার আঙিনার বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০১৭-১৮ সালের নমুনা সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় ছাত্রদের মাত্র ৮ শতাংশের বাড়িতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ফলে, এই শিক্ষানীতি গরিব শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকারকে লঙ্ঘিত করবে।

সপ্তমত, নয়া শিক্ষানীতির আরেকটি চালাকির দিক হল তার ভাষা নীতি। কুশলী বাক্য প্রয়োগে প্রথমেই বলা হয়েছে বহুভাষিকতাই ভারতবর্ষের শক্তি। প্রস্তাবে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ভারতীয় এলিটরা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করেন। তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে চাকরি ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রান্তিক করে রেখেছেন। তাই ভাষাগতভাবে এই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ভারতের ভূমিজ ভাষাগুলিকে তাদের প্রাপ্য পরিসর ফিরিয়ে দেওয়া। এতে বলা হয়েছে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষাই হবে শিক্ষাদানের মাধ্যম। কিন্তু এ কথা বলা নেই যে সিবিএসই/ আইসিএসই স্কুলগুলোতে বাচ্চারা যে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে তার কী হবে! ষষ্ঠ থেকে আসবে ত্রি-ভাষা সূত্র। ফলে, প্রকৃত অর্থে হিন্দি ও ইংরেজি শেখাটা প্রতিটি ভারতীয়র জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াল। অন্যদিকে, ধ্রুপদী ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেখানে সর্বপ্রথমে আছে সংস্কৃত যার স্কুল স্তরে ও সামাজিক জীবনে প্রয়োজনীয়তা প্রায় শূন্য। ফলে, কার্যক্ষেত্রে ইংরেজির তুলনামূলক আধিপত্য থাকবে, আবার হিন্দিকে গোটা দেশের উপর চাপিয়েও দেওয়া যাবে। স্কুল স্তরে প্রাকৃত, পালি প্রভৃতি ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষা হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যারা বর্তমানে প্রায় অচল, অথচ কোথাও তালিকায় বাংলা ভাষার নাম নেই। এই হিন্দি আধিপত্যবাদ আজ অবশ্যই 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান' অনুসারী।

অষ্টমত, এই শিক্ষানীতিতে আগেরবারের মতো যথারীতি শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে টাকার জোগাড় হবে সে ব্যাপারে সরকার যথারীতি নীরব। বেঙ্গালুরুর 'সেন্টার ফর বাজেট অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ'এর পক্ষ থেকে জোৎস্না ঝা ও মধুসূদন রাও কৃত সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বাজেটে (২০১৪-১৫) শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল জিডিপি'র ০.৫৩ শতাংশ, ২০১৭-১৮'এ ০.৪৮ শতাংশ, ২০১৯-২০'তে ০.৪৫ শতাংশ এবং ২০২০-২১'এ ০.৪৪ শতাংশ। এর সঙ্গে রাজ্যের ব্যয় বরাদ্দ যুক্ত করা হলেও তা জিডিপি'র ৪ শতাংশের বেশি হবে না। ফলে, আরও বেশি বিদেশি পুঁজির প্রবেশের পথ প্রশস্ত হবে। বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে।

১৯৬৬ সালে কোঠারি কমিশন তার ঐতিহাসিক সুপারিশে সারা দেশ জুড়ে একই মানের 'কমন স্কুল সিস্টেম'এর কথা বলে। এই ভাবনার অর্থ, পরিকাঠামো, পঠনপাঠনের মান সারা দেশে একইরকম হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি বরং উপর্যুপরি সরকারগুলোর পরিকল্পিত ঔদাসিন্য, শিক্ষা ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ভাবে ব্যয়বরাদ্দ হ্রাস এবং নব্বইয়ের দশকে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাতে ব্যাপক বেসরকারিকরণ আদতে শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। ফলে, আজ ধনী ও দরিদ্রদের জন্য দু' ধরনের শিক্ষা পদ্ধতির কুৎসিত সহাবস্থান। নরেন্দ্র মোদি'দের নয়া শিক্ষানীতি স্কুল শিক্ষায় সেই বিভাজনকে আরও তীব্র করবে, তা বলাই বাহুল্য।

 

Monday, 10 August 2020

'রিভেঞ্জ অফ নেচার'

প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীই পথ

বিধান চন্দ্র পাল

 
ক্রেটাসিয়াস যুগের কথা আমরা অনেকেই জানি। সময়টা ৬৫০ থেকে ১৩৬০ লাখ বছর আগে। সেই যুগে পৃথিবীতে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল পৃথিবীর সর্বকালের বৃহত্তম প্রাণী ডাইনোসর। যদিও এই বিলুপ্তির নির্ভরযোগ্য কারণ এখনও মানুষের অজানা। তবে বিজ্ঞানীরা অন্তত নিশ্চিত করেছেন যে, পরিবেশ প্রতিকূলতার কারণেই আসলে ডাইনোসর পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। পরিবেশের বিপর্যয় মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণী সবাইকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। তাহলে দীর্ঘকাল ধরে একটু একটু করে পরিবেশ বিপন্ন করে তোলার ফলই কি করোনা ভাইরাস? 
 
‘পরিবেশ’ বিষয়টির আসলে ব্যাপকতা রয়েছে। পৃথিবীর সব কিছুই প্রকৃত অর্থে পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ওজোন স্তর পর্যন্ত উঁচুতে থাকা আলো, বাতাস, পানি, শব্দ, মাটি, বন, পাহাড়, নদ-নদী, সমুদ্র, মানুষের তৈরি করা বৈচিত্র্যময় সব অবকাঠামো এবং সম্পূর্ণ উদ্ভিদ ও জীবজগৎ। সব কিছু মিলেই আসলে প্রাকৃতিক পরিবেশ। পানি, বাতাস, মাটি ইত্যাদি জড় পরিবেশের আওতায় পড়ে; আর জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদ এগুলো স্বাভাবিকভাবেই জীব পরিবেশের আওতাধীন। পরিবেশের অবশ্য অরেকটি রূপও আছে। সেটি হল সামাজিক। সামাজিক পরিবেশের আওতায় পড়ে পারস্পরিক সম্পর্ক। মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও পরিবেশকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেমন: কৃষিক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবের সূচনা, যার মাধ্যমে ষাটের দশকে বিশ্বে প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়াস চালানো হয়েছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি, অদক্ষতা সহ নানা কারণে এই বিপ্লবের ফলে সামাজিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়েছিল। 
 
পরিবেশ ও প্রকৃতিকে এমনভাবে কখনই জয় করা ঠিক নয় যাতে তা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। কেননা মানুষ কিন্তু একদিকে সামাজিক জীব, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, সৃষ্টির শুরু থেকেই আসলে মানুষ পরিবেশকে জয় করেছে, উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার করতে শিখেছে। মানুষ প্রতিনিয়ত স্ব স্ব অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে প্রয়াসী। কিন্তু উন্নয়ন এবং প্রকৃতিকে জয় করার এই কাজটি যদি প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না করা হয়, তাহলে মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে বাধ্য। 
 
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে সার্স, মার্স, নিপাহ, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো কত নতুন রোগ-ই তো আমরা দেখেছি। আর সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সবাই ভুক্তভোগী করোনা ভাইরাস বা কভিড-১৯ নিয়ে। একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই ভাইরাসগুলির অধিকাংশই কিন্তু পশু-পাখির দেহ থেকে মানুষের দেহে ছড়িয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ ও গবাদিপশু সংক্রান্ত গবেষণা ইন্সটিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতি এও বলা হয়েছে, এসব ভাইরাস মানবদেহে আসে প্রাকৃতিক পরিবেশে হস্তক্ষেপের কারণে। এসব হস্তক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জমির ক্ষতিসাধন, বন্যপ্রাণীর ব্যবহার, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ুর পরিবর্তন। (সূত্র: বিবিসি ৭ জুলাই, ২০২০)। 
 
প্রসঙ্গত আমরা জানি, সার্স, সিভেট, নিপাহ ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। মার্স ভাইরাস উট থেকে, সোয়াইন ফ্লু শূকর থেকে এবং বার্ড ফ্লু মুরগি বা পাখির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। ফলে, পরিবেশবাদী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এটা জোর দিয়েই বলেছেন যে, প্রকৃতি হরণ ও হননের ফলে যে পরিবেশ বিপর্যস্ততা তার ফলে বন্যপ্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসায় এসব বিপত্তি হয়েছে। সর্বশেষ কভিড-১৯'ও প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাত্রারই প্রভাব। পরিবেশের প্রতি এই ধ্বংসাত্মক মনোভাব আমাদের অস্তিত্বকেই আজ বিপন্ন করে তুলছে। প্রসঙ্গত, আমরা সবাই জানি যে, কভিড-১৯ চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে কাঁচা মাংসের বাজারের কর্মীর মাধ্যমে প্রথম ছড়ায়। যেখানে প্রচুর বন্যপ্রাণীর কাঁচা মাংস বিক্রি হত। ফলে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, যখন মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশকে যথেচ্ছভাবে লুণ্ঠন ও ধ্বংস করে তখনই এসব প্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসে, আর তখনই অন্যান্য অনেক সমস্যার পাশাপাশি নানা রকমের রোগেরও সৃষ্টি হয়। কভিড-১৯ যার মধ্যে অন্যতম। 
 
প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা বেসরকারি সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার'এর এক সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, প্রকৃতিতে এখন কত প্রজাতির প্রাণী বেঁচে আছে এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই মানুষের। যে কারণে ঠিক কত প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট হিসাবে দেওয়া কঠিন (সূত্র: বিবিসি ২৮ নভেম্বর, ২০১৯)। এছাড়া জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল। পৃথিবী থেকে যদি এভাবে দ্রুত বনাঞ্চল ধ্বংস হতে থাকে তাহলে তার পরিণাম সত্যিই ভয়াবহ হতে বাধ্য। প্রসঙ্গত, আমাদের দেশের মোট আয়তনের তুলনায় যেটুকু বনভূমি রয়েছে তা অনেক কম। প্রতি বছর বন্যা ও খরার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে। দখল, দূষণ সহ বিভিন্ন কারণে নদীপ্রবাহের গতি স্বাভাবিক না থাকায় কৃষি কাজ সহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে অনেক সাধ আর স্বপ্ন। এর সাথে এখন ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের এবং নতুন নতুন রোগব্যাধি। আর এ সব কিছুর ফলে উন্নয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে। সে কারণে পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন হওয়া সবার জন্যে অপরিহার্য। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই দেশের পরিবেশগত সমস্যা এবং এসব সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা প্রয়োজন। একই সাথে সেগুলো আমাদের অনুভূতি ও উপলব্ধিতেও আনা দরকার। তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে মানুষের কাজে লাগানোর পরেও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে। 
 
পরিশেষে বলতে হয়, দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও পরিবেশ এত বেশি অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত যে, দারিদ্র্য দূরীকরণ, উন্নয়ন সংগঠন ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি আসলে একইসঙ্গে চিন্তা করা দরকার। যদি আমরা সেভাবে চিন্তা না করি কিংবা এড়িয়ে যাই তাহলে একের পর এক পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণীর মতো ‘জুনটিক রোগ’ (সূত্র: বিবিসি ৭ জুলাই, ২০২০) থেকে আমরা কখনই মুক্ত হতে পারব না। 
 
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য কি দেয়নি আমাদের? বেঁচে থাকার উপাদান, ভালো লাগা ও ভালো থাকার উপাদান। সব কিছু যেন উজাড় করে দিয়েছে আমাদের। তাই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাটা এখন সময়ের দাবি। আর এই আঙ্গিকটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় রেখে দেশব্যাপী নতুন একটি জাতীয় শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করে সবাই মিলে একযোগে সে লক্ষ্যে এখনই কাজ শুরু উচিত বলেও আমি মনে করি। 
 
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (গত ২৯ এপ্রিল, ২০২০) বিশ্বনেতাদের প্রতি একটি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, 'করোনা পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।' সেদিকটিতে গুরুত্ব দেবার সময় এখনই। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে 'রিভেঞ্জ অফ নেচার'। প্রকৃতি কখনই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না, নেতিবাচক হয় না। তাহলে এই প্রবাদটা কেন ব্যবহৃত হয়? কারণ, প্রকৃতিও মানুষের মতো প্রাণের দাবি রাখে। সহনশীলতা ও সম্প্রীতিবোধের মাত্রা হয়তো তারও আছে। তাই সময়ের প্রয়োজনে কিংবা তাগিদে তাকেও কখনও কখনও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে হয়। দেড়শো বছর আগে বলা ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলস কিংবা একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথের বলা প্রকৃতির প্রতিশোধের কথাটা ইতিহাসে যেন বারবারই সত্যি হয়েছে। আর সেই সত্যি আমরা চাই না। আসুন, এবার আমরা কভিড-১৯ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে প্রকৃত অর্থেই সুন্দর এক মৈত্রীর বন্ধন রচনা করি।

 

ভাড়াটে দৈনিক বনাম সামাজিক মাধ্যম

অচলায়তনের ভাঙা জানালা দিয়ে

মধুময় পাল

 

খবর আসছিল ফোনে৷ এবং কিছুটা সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ কাগজ বাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে করোনা আতঙ্কে৷ টিভি-র সামনে বসা যায় না৷ মাথা ঝিমঝিম করে, শরীর খারাপ লাগে৷ কোথাও বেরিয়ে খবর নেব এমন উপায় নেই৷ অদ্ভুত এক অচলাবস্থা তৈরি করা হয়েছে৷ আমরা যারা ট্রেন-বাসের ভরসায় বরাবর চলাচল করেছি, তাদের পক্ষে নিজের এলাকাটুকুর বাইরে যাবার সুযোগ নেই৷ এক ভয়াবহ আতঙ্কের বাতাস ঘিরে ফেলেছে আমাদের৷ বাড়ির বাইরে বেরোনো বিপদ৷ অহরহ কানের কাছে রাষ্ট্র বলছে৷ আত্মীয়ের কণ্ঠস্বরও ভয়ে কাঁপে, বেরোবেন না৷ এই বয়সের লোকজন সহজে আক্রান্ত হচ্ছে৷ গণ-পরিবহন বিপজ্জনক, সে কথাও রটানো হচ্ছে ফিসফাসে৷ উন্মাদের পাঠশালা খুলে বসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রায় প্রতিটি চ্যানেল৷ আজ বলা হচ্ছে, করোনা বাতাসে ওড়ে না৷ কাল বলা হচ্ছে, বাতাসে উড়ছে৷ আজ বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস৷ কাল বলা হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়া৷ একই সঙ্গে মারণ ও মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত এই সময়ে উদভ্রান্ত ও উপার্জনচ্যুত মানুষ কোন গভীর অবসাদে বিধ্বস্ত হতে পারে ভাবা যায় না৷ বলা হচ্ছে, করোনার চিকিৎসা নেই৷ অথচ বেসরকারি হাসপাতালে পাঁচ-সাত লাখের প্যাকেজ৷ তাহলে অসমর্থ মানুষের অসহায় মৃত্যুই একমাত্র ভবিতব্য? এই আতঙ্ক, এই অচলাবস্থা কতটা স্বাভাবিক ও যথার্থ, এর পেছনে চক্রান্ত আছে কিনা, তা কিছুকাল পরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ এখনই অনেকে সন্দেহজনক গন্ধ পাচ্ছেন৷           

যে খবর আসছিল, তার সবটাই করোনা সংক্রান্ত৷ এক, রাতের অন্ধকারে লাশ গায়েব৷ পুড়িয়ে দেওয়া বা পুঁতে ফেলা হচ্ছে৷ মৃত্যুর ঠিকঠাক হিসেব দিলে প্রশাসনের রামকোপে পড়তে হচ্ছে দায়িত্বশীল আধিকারিককে৷ দুই, মৃতের দেহের খোঁজ পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরাও৷ তিন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার চরম অব্যবস্থা৷ চার, বেসরকারি হাসপাতালে বিল হচ্ছে লাখ লাখ টাকা৷ পাঁচ, টেস্টে বিভ্রান্তি৷ প্রথমে বলা হল, পজিটিভ৷ পরে বলা হল, নেগেটিভ৷ কিংবা উলটোটা৷ ছয়, পাড়ায় পাড়ায় ডাক্তারদের চেম্বার তথা গদি বন্ধ৷ ব্যতিক্রম আছে৷ সেলাম জানাই সেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যাঁরা ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে সেবা করেছেন নিজেদের পরিবারের বিপন্নতার ভাবনা সরিয়ে রেখে৷ সাত, বিভিন্ন মহল্লায় রোগের খবর চাপা দেওয়া হচ্ছে৷ নেতৃত্বে শাসক দলের নেতারা৷ আট, কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে নৈরাজ্য৷ চিকিৎসা নেই, খাবার নেই, সেই সঙ্গে পজিটিভ ও নেগেটিভ পাশাপাশি বিছানায় বা মেঝেয়৷ নয়, মৃতদেহ টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অমানবিক কুৎসিত কদর্য আচরণে৷ দশ, যথাযথ প্রতিরোধী পোশাকের অভাবে রোগাক্রান্ত হচ্ছেন সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীরা৷

ফোনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা এসব জানাচ্ছেন, কোনও দলীয় বা ধর্মীয় প্ররোচনা তাঁদের নেই, হলফ করে বলতে পারি৷ কিছু চ্যানেল সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে কোনও কোনও দলের ভাড়া খাটছে, এটা ঘটনা, তাঁদের এড়িয়েই আমার প্রতিবেদন বা সন্ধান৷ করোনা বা লকডাউনের অচলায়তনের ভাঙা জানালায় বসে এটুকু স্পষ্ট দেখা গিয়েছে যে, রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে খান খান৷ সুপার স্পেশাল হাসপাতালের আওয়াজসর্বস্ব গল্প ভুস্ হয়ে গিয়েছে এক ঝটকায়৷ পরিত্রাণহীন দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত প্রতিটি গরিব রাজ্যবাসী৷ চলছে গোমূত্র থেকে যাগযজ্ঞ থেকে তালিয়া-থালিয়া থেকে কসমেটিকস বুজরুকি৷ যাদের সামর্থ্য আছে তারা কালোবাজারে কিনছে বিজ্ঞাপনের স্যানিটাইজার, অক্সিমিটার, যাবতীয় ভিটামিন, ঘরে মজুত করছে অক্সিজেন সিলিন্ডার৷ সরকারের অকর্মণ্যতা চাপা দিতেই মৃতদেহ গায়েব ও মৃত্যুর সংখ্যা গোপন৷ অদূরেই ভোট৷ মৃতদেহ নিয়ে খেলতে পারে বিরোধীরা! একটা কথা এখানে বলে রাখা দরকার, এই খান খান দশা বর্তমান সরকারের একক কৃতিত্ব নয়, পূর্বসূরিরা আছেন সগৌরবে!

এভাবে কি চাপা দেওয়া যায়? লুকোনো যায়?

১৯৪২-এর ১৬ ও ১৭ অক্টোবর মহাপ্রলয়ে বিধ্বস্ত হয় মেদিনীপুরের হাজার বর্গমাইলেরও বেশি এলাকা৷ ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসন খবর চেপে দেয়৷ সংবাদমাধ্যমকে সেনসর করে৷ দুর্গত এলাকায় বাইরের কাউকে বিনা অনুমতিতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি৷ ঝড়-বন্যায় তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি বলে দায় সেরেছে সরকারি বিবৃতি৷ মেদিনীপুরের সর্বনাশের খবর প্রথম ছাপা হয় ৩ নভেম্বর৷ ঘটনার দু' সপ্তাহ পরে৷ এই সর্বনাশ পঞ্চাশের মন্বন্তরের একটি কারণ৷ সেদিনের বাংলার শাসকরা যদি একটু মানবিক হতে পারত, রার্ষ্ট্রের স্বাভাবিক মিথ্যাচার সরিয়ে রাখতে পারত, অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হত৷

মহাপ্রলয়ে বিধ্বস্ত মেদিনীপুরে বিস্তীর্ণ জনপদের ছবি আঁকেন চিত্তপ্রসাদ৷ পথে পথে ঘুরে৷ লেখেন ‘হাংরি বেঙ্গল’৷ পুস্তিকাকারে ছাপা হয় লেখা ও কিছু ছবি৷ ভিন রাজ্যগুলিও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকৃত অবস্থা যেন জানতে পারে, তাই ইংরেজিতে লেখা৷ ৫০০০ কপি ছাপা হয়েছিল৷ বহু মানুষকে জানানোর লক্ষ্য নিয়ে৷ খবর পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে সব কপি৷ দু-চারটে রক্ষা পেয়েছিল কোনওক্রমে৷ বাজেয়াপ্ত করেও চাপা দেওয়া যায়নি মৃতদেহ আর বিপন্ন মানুষে সমাকীর্ণ মেদিনীপুরের খবর৷

পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক বিমল রায়৷ নিউ থিয়েটার্স-এর ব্যানারে৷ জানা যায়, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সহ ছ-টি ভাষায় ডাবিং হয়৷ উদ্দেশ্য, অন্য রাজ্যের মানুষকে বিপন্ন বাংলার কথা জানিয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করা৷ প্রশাসন জানতে পেরে ফিল্ম নষ্ট করে দেয়৷ তাদের যুক্তি হয়তো এরকম ছিল, এ ছবি দেখানো হলে দেশে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে৷ এত কিছু করেও চাপা দেওয়া যায়নি৷ লন্ডনের আর্কাইভ থেকে উদ্ধার হয়েছে সেই তথ্যচিত্রের ৫০টি স্থিরচিত্র৷ হিন্দিতে নাম ছিল ‘বঙ্গাল কো মদদ দো’৷ আজ থেকে সাতাত্তর বছর আগে যা সম্ভব হয়নি, এখন তা সম্ভব করার চেষ্টা ক্ষমতার অপচয় ছাড়া কিছু নয়৷ নেট-সংযোগ বন্ধ করেও সম্ভব নয়৷

পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় বাংলা এক সাংবাদিককে পেয়েছিল৷ “দি স্টেটসম্যান’-এর সম্পাদক ইয়ান স্টিফেন্স৷ সাহেব মানুষ৷ কাগজটিও সাহেবদের৷ তারা সাহেবদের স্বার্থ দেখবেন, এটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু তেমনটা হয়নি৷ ১৯৪৩-এর মার্চ মাস থেকে স্টেটসম্যান নিয়মিত দুর্ভিক্ষের খবর ছাপতে থাকে৷ তাতে লন্ডন বা দিল্লি বা কলকাতা বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করেনি৷ লন্ডনে ভারত সচিব আমেরি, দিল্লিতে গভর্নর জেনারেল লিনলিথগো এবং বাংলার গভর্নর জন হার্বার্ট ক্ষুধায় মৃত্যুর কথা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে গিয়েছেন৷ ইয়ান স্টিফেন্স স্মৃতিকথায় লিখেছেন: People were now dying all around. The city's mortality figure had become appalling, as also reports from the surrounding countryside. (Monsoon Morning)। ১৩ আগস্ট ১৯৪৩ সাংবাদিক ওয়ার্ডসওয়ার্থ (পুরো নামটা বলেননি ইয়ান স্টিফেন্স) ‘…wrote a moving piece on this, stressing particularly the plight of lost or parentless children’, তাতেও হেলদোল নেই প্রশাসনের৷ অগত্যা ২২ ও ২৯ আগস্ট, পরপর দুটো রবিবার, কলকাতার পথে পথে পড়ে থাকা অনাহারে মৃত ও অর্ধমৃতদের পাতাজোড়া ছবি ছেপে দিলেন ইয়ান স্টিফেন্স৷ যুদ্ধ চলছে, ব্রিটেন লড়ছে৷ এই পরিস্থিতিতে যে কোনওরকম শাস্তি হতে পারত তাঁর৷ ভয় পাননি৷ একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ করেছিলেন তিনি৷ লন্ডনের টনক নড়েছিল ওই মর্মন্তুদ ছবির আঘাতে৷ ইয়ান স্টিফেন্স সম্পাদক ছিলেন দশ বছর (১৯৪২ থেকে ১৯৫১)।

এই মুহূর্তে স্টিফেন্সের কথা মনে পড়ে৷ সরকারের মুখপাত্র হতে দেননি তাঁর কাগজকে৷ আজ বাংলায় বাণিজ্যিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে ভাড়াটে মনে হয়৷ এতে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তো কমেছেই, প্রয়োজনীয়তাও কমেছে৷ সরকারের তথ্য গোপনের খেলায় সংবাদমাধ্যম যদি শাকরেদ হয়, বুঝতে হবে সময়টা খুব খুব খারাপ৷ জায়গাটা নিচ্ছে, নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম৷