Friday, 10 April 2020

জনস্বাস্থ্যের প্রারম্ভ

ঔপনিবেশিক ভারতে ম্যালেরিয়া মহামারীর ইতিহাস 
ও জনস্বাস্থ্যের প্রারম্ভ
সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনায়: উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায় 

১.

ঔপনিবেশিক ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ম্যালেরিয়া একটি বহু আলোচিত ব্যাধি। তার কারণ প্রসঙ্গে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই পরিবেশের কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গোটা বঙ্গদেশে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরে কলেরা ও ম্যালেরিয়া অসুখ দুটি মহামারীর রূপ নিয়েছিল যা বাংলা সম্পর্কে ঔপনিবেশিক মহলে একটা নেতিবাচক ধারণা গড়ে তুলেছিল। ১৮৩০'এর দশকে F P Strong অসুখের সেই সময়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা অর্থাৎ পচা জিনিস থেকে নির্গত বায়ু দায়ী (miasma) বলে ধরা হত। সে সময়ে এটি ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছিলেন অনেক চিন্তকই। ১৮৪০ সালে James Taylor'এর লেখা থেকেও পাওয়া যায় যে তখন ম্যালেরিয়ার পরিবেশগত কারণের উপর খুব জোর দেওয়া হয়েছিল। সেই বছরেই সেপ্টেম্বরে বাৎসরিক বন্যা যেই কমে যায় তখন ম্যালেরিয়া দেখা দেয় এবং নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত তার তীব্রতা বজায় থাকে। কিছু কিছু এলাকা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে জনসাধারণ বহুদিন ধরে জ্বরে ভোগে ।

Twining এর মতে, উত্তর ভারতের জনসাধারণ যথেষ্ট শক্তিশালী ও পরিশ্রমী জাতি এবং সেই তুলনায় বাঙালিরা দুর্বল যার কারণ অংশত তাদের প্রধান খাদ্য চাল, এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া। ১৮৫০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশে দেখা দিল 'বর্ধমান জ্বর' যা সম্ভবত ম্যালেরিয়া মহামারী, যার প্রকোপে বহু জেলার অনেক জনসাধারণ মারা যায়। ম্যালেরিয়া অসুখের প্রকোপের একটি সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা তাই ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন।

বাংলার প্রাদেশিক স্যানিটারি কমিশনারদের রিপোর্টে ১৮৭১-১৮৭২ থেকে  প্রত্যেক দশকের আদমশুমারিতে ম্যালেরিয়ার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হত। ম্যালেরিয়া যে শুধু মৃত্যু ডেকে এনেছিল তাই নয়, এটি ছিল অন্য অনেক অর্থে ক্ষতিকারক। এই অসুখে ভুগে রোগী হয়ে পড়ত খুব দুর্বল, কর্মক্ষমতা হ্রাস পেত এবং এর দ্বারা ঔপনিবেশিক আদর্শ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের পুরুষ ও যুদ্ধবাজ জাতি এবং নারীসুলভ কমনীয় বাঙালি জাতির মধ্যে যে বিভাজন-মিথ আগেই করা হয়েছিল তা আরও সমর্থন অর্জন করেছিল। এই তত্ত্বের বিশ্লেষণ  থেকে বোঝা যেত ঔপনিবেশিক ভাবনায় চিকিৎসাবিজ্ঞান কিভাবে জাতিতত্ত্বকে প্রভাবিত করেছিল এবং বাঙালিরা নিজেদের শারীরিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার ব্যাখ্যায় এই ধরনের বিশ্লেষণের শরণাপন্ন হত। ১৮৮৯-এ  বাংলার স্যানিটারি কমিশনারের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের সমগ্র মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের কারণ ছিল ম্যালেরিয়া জ্বর যা বছরে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল।

২.

ম্যালেরিয়া রোগের ইতিহাসের অন্য একটি দিক ছিল ম্যালেরিয়ার কারণ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের উপায়ের  সন্ধানের জন্য গবেষণা। এই গবেষণালব্ধ ফলাফলকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা ১৮৫০-এর দশকে
T E Dempster বলে একজন অফিসার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ম্যালেরিয়া সম্পর্কে বোঝেন যে, এই রোগটা আসে খালের মাধ্যমে যে জলসেচ ব্যবস্থা আছে, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। 'spleen index' অর্থাৎ প্লীহার অবস্থাকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বোঝার নির্ভরযোগ্য সূচক বলে তিনিই কিন্তু প্রথম দেখিয়েছিলেন।

ম্যালেরিয়া মহামারীর কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকারের তরফ থেকে ১৮৬৩ সালে বাংলাদেশে একটি তদন্ত কমিটি স্থাপন করা হয়েছিল। এর ভারতীয় সদস্য রাজা দিগম্বর মিত্র রেলপথ নির্মাণ এবং রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ - এগুলির সাথে সাথেই  ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বা এর মধ্যে যোগাযোগ আছে বলে  দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

স্যার রোনাল্ড রস্ কর্তৃক ম্যালেরিয়া বাহক মশার বিষয়ে আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত ম্যালেরিয়া দমনের দুটি পন্থা ছিল - জলাভূমি প্রভৃতির ক্ষেত্রে উন্নতি গ্রহণ এবং প্রতিষেধক ওষুধ যেমন সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে প্রস্তুত কুইনাইন প্রয়োগ। ১৯০০ সাল নাগাদ ভারতের বড় বড় শহরে নিকাশি ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল। কুইনাইন পাউডার সরকারি চিকিৎসা বিভাগে বন্টন করা হত ও সেখান থেকে অন্যান্যদের কাছে পৌঁছত। এটা খুব ইন্টারেস্টিং যে কুইনাইনকে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র (tool of Empire)মনে করা হত সেই সময়ে। অবশ্য এটি সবসময় খুব সফল অস্ত্র ছিল না এবং ওষুধ হিসেবে এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছিল। আমাদের বর্তমানে কলকাতার পিজি হাসপাতালেই স্যার রোনাল্ড রস তাঁর পুরো গবেষণাটি চালিয়েছিলেন। রোনাল্ড রস অ্যানোফিলিস (anopheles) মশাকে  ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু বাহক বলে চিহ্নিত করার পরে জনস্বাস্থ্য নীতির ক্ষেত্রে একেবারে নতুন প্রতিক্রিয়া দেখা দিল । রোনাল্ড রস ও তার অনুগামীরা ম্যালেরিয়ার মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য 'mosquito brigade' গঠন ও 'নিকাশি ব্যবস্থা'র উন্নতি, জলাভূমি সাফাই ইত্যাদির ওপর জোর দিয়েছিলেন। অনেক ব্রিটিশ মেডিক্যাল অফিসার কুইনাইন প্রয়োগের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। ১৯১১ সালে ভারত সরকারের স্যানিটারি কমিশনার নিযুক্ত হলেন C P Lukisd - তিনি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি বিধানের উপরেই জোর দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন রোনাল্ড রসের ভক্ত ও তাঁর অনুসারী।

৩.

১৯০৯ সালের অক্টোবরে সিমলাতে ইম্পেরিয়াল ম্যালেরিয়া কনফারেন্স হয়। এরপরেই স্থাপিত হল সেন্ট্রাল ম্যালেরিয়া কমিটি। এছাড়া Pasudism নামে একটা নতুন জার্নাল ছাপানো শুরু হয়েছিল । কনফারেন্সের পরে ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সুদুরপ্রসারী কোনও গবেষণাকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল অফিসারদের পরিচিতি করানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের সুবিধা হয়েছিল।

১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিসার্চ ফান্ড এসোসিয়েশন-এর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম ছিল ম্যালেরিয়াকে ঘিরে। এই সময়ে ঔপনিবেশিক সরকারের উন্নতির বাধাস্বরূপ ছিল ম্যালেরিয়া ব্যাধি। ঐ IRFA-এর তরফ থেকে ম্যালেরিয়া নিবারণ তদারকের জন্য প্রথম বছরে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা স্থানীয় সরকারগুলিকে প্রদান করা হয়েছিল। বাংলাদেশে C A Bentley সাহেব তখন স্যানিটারি অধিকর্তা ও জনস্বাস্থ্য অধিকর্তা। তাঁর মতে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব-এর জন্য দায়ী ছিল নদী ব্যবস্থার অবনতি ও সেচ ব্যবস্থার প্রতিকূলতা । রেলপথ নির্মাণের জন্য যেখানে সেখানে বাঁধ দেওয়ার ফলে জলনিকাশি ব্যবস্থা মার খাচ্ছিল, ফলে জমা জলে ম্যালেরিয়ার জীবাণু বৃদ্ধি পাচ্ছিল।ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষির, প্রচুর স্বাস্থ্যের অবনতি হত সাধারণ মানুষের। এবং, গ্রামগুলির জনসাধারণ প্রায়ই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হত। তাঁর মতে অবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজন ইতালির অনুসরণে পরিকল্পনা গ্রহণ অর্থাৎ মাটির উপরিভাগের জমা জল নিষ্কাশন এর সুবন্দোবস্ত করা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা স্থানীয় আবহাওয়ার উপযোগী চাষ ও কৃষকদের সমৃদ্ধি বৃদ্ধির মাধ্যমে একই সঙ্গে কৃষিব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি।

অনেকের মতে, ঔপনিবেশিক আমলের ম্যালেরিয়া ছিল মানুষের তৈরি করা ম্যালেরিয়া। অর্থাৎ, রাস্তাঘাট ও রেলপথ নির্মাণ এবং নদীপথে বাঁধ নির্মাণ প্রভৃতি তথাকথিত উন্নতিমূলক কার্যকলাপের ফলে প্রথাগত জল নিকাশি ব্যবস্থার শেষ অবস্থা ও কৃষি ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয় যার সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের অবনতি তথা ম্যালেরিয়া প্রকোপ বৃদ্ধি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অতএব এখনকার সমস্যার সঙ্গে তখনকার সমস্যাতে একটা ব্যাপার তো প্রায় একই। সেটি হল আধুনিক সভ্যতা যত এগোবে বা প্রকৃতিনিধন যত হবে ততই কিন্তু বীজাণু রোগের প্রাবল্য  বাড়বে এবং একইসঙ্গে প্রতিষেধক ওষুধও চালু হবে - ক্যাপিটালিজম সবটাকে ঢুকিয়ে নেবে তার আলেখ্যে আর মাঝখানে বেশ কিছু মানুষ মহামারীতে মারা যাবে। যে কোনও সমাজ ব্যবস্থাতেই।

৪.

ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে জনস্বাস্থ্য নীতির খুব সামান্য সূত্রপাত হয়েছিল বলা চলে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ডিসপেনসারি ও হাসপাতালের স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি বসন্তরোগ, ম্যালেরিয়া, কলেরা ও অন্যান্য ব্যাধির প্রতিষেধক টিকা প্রদানের কেন্দ্রস্থল ছিল। ১৮৫৭-র  পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকারের শাসন শুরু হবার পরে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ১৮৫৮ সালে 'Royal Commission on the Sanitary State of The Army in India' নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৮৬৩-র রিপোর্টে এই কমিশন ইউরোপিয়দের বাসস্থানের (সৈন্য ছাউনি ও বেসামরিক অঞ্চল) সুনির্দিষ্টকরণ, India Office Medical Board-এর সভাপতি এবং কমিশনের সদস্য J T Martin-এর নির্ধারিত ভূতাত্ত্বিক নীতিসমূহ অনুযায়ী তার সংগঠন এবং ব্রিটেনের স্বাস্থ্য আইন ও নির্দেশ অনুযায়ী এই অঞ্চলগুলির শাসনতান্ত্রিক পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল। এই অনুযায়ী Military Cantonments Act,1864 অনুসারে নতুন নিয়োজিত ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ সেনাছাউনিগুলিকে আরও প্রশস্ত করে বানাতে শুরু করে।

সৈন্যদের মধ্যে সিফিলিস প্রভৃতি যৌনব্যাধির প্রকোপ ছিল খুব বেশি এবং তা দমনের উদ্দেশ্যে Cantonment Act এর বলে পতিতালয়গুলির নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক তদন্ত ও দেখাশুনা করা হত। ১৮৬৮ তে প্রবর্তিত হলো Indian Contagious Diseases Act কিন্তু ১৮৮৮-তেই এই আইন রদ করা হয় তবে পতিতালয়ের অধিবাসীদের স্বাস্থ্য বিভাগীয় নজরদারি বন্ধ হয়নি এবং নতুন প্রবর্তিত Military Cantonment, 1864 দ্বারা তা চালু থাকে। ১৮৯৫-এ প্রবর্তিত আইনে স্বাস্থ্য বিভাগীয় নজরদারি ইত্যাদি বন্ধ থাকে কিন্তু ১৮৯৭'এ তার ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। Epidemic Diseases Act ,1897 এমন একটি আইন ছিল যা প্রাদেশিক সরকারের হাতে বহু ক্ষমতা প্রদান করেছিল।

১৮৮০ সালের Compulsory Vaccination Act প্রাদেশিক সরকারগুলিকে কিছু শহর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে  ৬ বছরের চেয়ে বড় শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক টীকাপ্রদান চালু করেছিল । তবে অনেক জায়গায় এই আইন প্রবর্তন করা হয়নি এবং ১৯০৬ সালে শুধু ৪৪১টি শহর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে এটি চালু ছিল যা ব্রিটিশ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা ৭ ভাগের উপস্থিতিকে প্রতিনিধিত্ব করত।
আগেই বলে বলেছি ডিসপেনসারির ভূমিকার কথা। ১৮৭০ সাল থেকে ব্যয় সংক্ষেপ করার জন্য ঔপনিবেশিক সরকার ডিসপেনসারির খরচ চালানোর থেকে দূরে সরে থাকছিল এবং স্থানীয়ভাবে এগুলির ব্যয় নির্বাহের ওপর জোর দিয়েছিল। বাংলার সরকারের মতে: 'the utility of dispensaries has now become so fully acknowledged that there is no necessity for the state to offer assistance to such an extent as when the movement was recent...  The accumulation of balances further shows that there is no difficulty in obtaining locally even mere money that suffices to meet the wants of there institutions as ar present conducted.'

১৮৬৭ সালে বাংলাদেশে ৬১টি ডিসপেনসারি চালু ছিল। ১৯০০ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৫০০। মহিলাদের প্রতিষেধক টীকাদান ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডিসপেনসারিগুলি ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৬৯ সালে বেরেলি জেলায় ডিসপেনসারির তত্ত্বাবধায়ক-এর মতে মহিলাদের সেখানে আসার জন্য রাজি করানোর ব্যাপারে তার এবং অন্যান্য কর্মচারীদের খুব অসুবিধে হয়েছে। ১৮৭১ সালে বাংলাদেশে যারা ডিসপেনসারিতে চিকিৎসার জন্য এসেছিল তাদের মধ্যে শতকরা ১৮ ভাগ ছিল মহিলা। ১৯০০ সালে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলি ইন্সপেক্টর জেনারেল বলেছিলেন যে বাংলাদেশের অধিকাংশ ডিসপেনসারি এখন 'been improved... in connection with the privacy of women. In all places the object has been to have a separate delivery window for females, which shall open, if possible, into a separate waiting room for that sex. Privacy for women has been held by me to be a most important condition of success.'

ডিসপেনসারির বাইরে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে সরকারের ভূমিকা প্রধানত সীমিত ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যচর্চা বিষয়ক বইপত্র বিতরণের মধ্যে।  J M Cunningham এর 'Sanitary Primer' বইটি বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছিল এবং ভারতীয় বিদ্যালয়গুলির নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তক ছিল। ১৮৮৭'তে এই বইটির পরিবর্তে খ্রীষ্টান মিশনারিদের সংগঠন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ 'The way to health' পাঠ্যপুস্তক নির্বাচিত হয়েছিল।


৫.

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অথবা ১৮৫০ সালের পরে কিছুটা শিল্পায়ন আরম্ভ হলে শিল্পাঞ্চলগুলিকে কেন্দ্র করে জনবসতি বাড়তে থাকে এবং বহু রেললাইন, সড়ক, জলাধার, বাঁধ নির্মাণের ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভীষণ অবনতি ঘটতে থাকে। ইতিমধ্যে সরকার কেবলমাত্র মিলিটারিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে কলেরার প্রকোপ কমাতে সক্ষম হলেও গ্রামাঞ্চলে ম্যালেরিয়া, কলেরা ও কালাজ্বরের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়নি। কারণ, তৎকালীন সমাজে বিভিন্ন ঘটনার তথ্যপঞ্জী হিসেব কষে তা অনুসারে ১৮৭১-৮১ সালের মধ্যে বাংলায় লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণত্যাগ করে। এর মধ্যে মেদিনীপুর বর্ধমানের মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৮৫ হাজার ও দেড় লক্ষ। বাধ্য হয়ে সরকার ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে শহর ও শহরতলি, মেলা ও জনবহুল এলাকাগুলিতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলিতে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ করা, জলনিকাশির ব্যবস্থা করা,  স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা, বিশোধক  রাসায়নিক সরবরাহ শুরু করে। কিন্তু পরিস্থিতির আদৌ বিশেষ উন্নতি ঘটেনি তেমন।
বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে(১৯২০ ও তারপর) জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজকর্মের দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে চলে যায় এবং ১৯২০ সালে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জনস্বাস্থ্য বিভাগ খোলা হয়েছিল। এ কথা অনস্বীকার্য যে পশ্চিমী চিকিৎসাবিজ্ঞান নগর বা শহরের বিত্তশালীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, গ্রামের লোকজন বা শহরের দরিদ্র সম্প্রদায়ের কাছে ঔপনিবেশিক পর্বে তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো সম্প্রসারিত তেমন হয়ে ওঠেনি।


সহায়ক রেফারেন্স:
-------------------------
১) David Arnold, Colonizing the Body, State Medicine and Epidemic Disease in Nineteenth Century India, Oxford University Press, Delhi edn, 1993;
২) Poonam Bala, Imperialism and Medicine in Bengal : A Socio-Historical Perspective, Sage Publications, New Delhi, 1991;
৩) Mark Harrison. Public Health in British India: Anglo Indian Preventive Medicine 1859-1914, Cambridge University Press, Foundation Book, New Delhi, 1994;
৪) David Arnold, The New Cambridge History of India;  Science, Technology and Medicine in Colonial India, Cambridge University Press, 2000 (pdf copy).
 

Wednesday, 11 March 2020

করোনা'র সত্যি মিথ্যে

করোনা_কথা
ডাঃ সব্যসাচী সেনগুপ্ত
এই মুহূর্তের দুনিয়া কাঁপানো ঘটনাটার শুরুয়াৎ হয়েছিল ২০১৯-এর নিউ ইয়ার্স ইভ-এ। অর্থাৎ, দিনটা ছিল, দু হাজার উনিশ সালের ক্যালেন্ডারের শেষ দিনটি।

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯।

চিন দেশের উহ্হান ( Wuhan) শহরের মিউনিসিপাল হেল্থ কর্পোরেশন ঘোষণা করল একটি নতুন তথ্য। ২৭ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে হঠাৎ করে, যাঁরা নিউমোনিয়া জাতীয় রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এবং যাঁদের নিউমোনিয়া রোগটি ঠিক কোন্ জীবাণুর কারণে হয়েছে, এখনও ধরা যায়নি। এঁদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

তথ্যটি চমকপ্রদ। তবে তার চাইতেও চমকপ্রদ হল, আরেকখানি লেজুড় ইনফর্মেশন। এই সাতাশ জনের প্রায় সকলেই উঁহ্হানের সী ফুড হোলসেল মার্কেটের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত। হয় তাঁরা সেখানে কাজ করেন, না হয় তাঁরা সেই মার্কেটের খরিদ্দার, আর নয়তো এইরকম কোনও মানুষের আত্মীয় পরিজন। এ কয়টি তথ্য স্বাস্থ্য বিশারদদের কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। হোক না রোগীর সংখ্যা মোটে সাতাশ। কিন্তু, ১) তাঁদের রোগের জীবাণুটিকে এখনো চেনা যায়নি; ২) সক্কলেই একটি কমন লিংক/সোর্স দেখাচ্ছেন ( সী ফুড হোলসেল মার্কেট)।
পদক্ষেপ নেওয়া হল তড়িঘড়ি। নতুন বছরের প্রথম দিনেই তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হল মার্কেটটিতে। 'আইসোলেশন' অর্থাৎ জনগণের থেকে আলাদা করে দেওয়া হল সাতাশ জনকেই। রাখা হল হাসপাতালের স্পেশাল ওয়ার্ডে। এবং তারই সাথে জোরদার ভাবে খোঁজ শুরু হল, এই জাতীয় আর কোনও নতুন রোগীর সন্ধান পাওয়া যায় কি না।

সন্ধান মিলল দ্রুত। পাঁচই জানুয়ারির হিসাব বলছে, আরও বত্রিশ জনের খোঁজ পাওয়া গেছে। যাঁদের রোগের উপসর্গ (কাশি, জ্বর, নিঃশ্বাসের কষ্ট) শুরু হয়েছে ১২ থেকে ২৯শে ডিসেম্বর ২০১৯ নাগাদ। অর্থাৎ, এই রোগীরা এতদিন ঘাপটি মেরে বাড়িতে বসেছিলেন। মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৩২+২৭=৫৯। যাঁদের কারওরই রোগের জীবাণুটি ধরা যাচ্ছে না এখনও। এবং এই ছয়দিনে স্বাস্থ্যকর্মীরা মোটামুটি নিশ্চিত যে, এটি অজানা, অদেখা কোনও ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার কান্ড।

প্রথম জয় এল নয় তারিখে। ৯ জানুয়ারি, ২০২০। সিডিসি ( সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) সারা পৃথিবীর সামনে ঘোষণা করল, ৫৯ জনের মধ্যে ১৫ জনের শরীরে পাওয়া গেছে নতুন প্রজাতির করোনা ভাইরাস (2019 -nCoV )। ২০১৯ নোভেল করোনা ভাইরাস। দশই জানুয়ারি- যে ভাইরাসের 'জিনোম সিকুয়েন্স' তুলে ধরা হল সমগ্র বিশ্বের সামনে। আর সমস্ত স্বাস্থ্যবোদ্ধারা অবাক হয়ে দেখলেন নতুন শত্রুর খোলনলচে।

এর ঠিক একদিনের মাথায় ঘটল প্রথম পরাজয়। প্রথম মৃত্যু ঘটল এই নতুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। তারপর ষোলই জানুয়ারি, আরও একজনের। এবং শেষ খবর পাওয়া অবধি, এই রোগ আর শুধু চিনের উঁহ্হান শহরে সীমিত নেই। সারা পৃথিবী জুড়ে মোট এক লক্ষ দু হাজার একশো বত্রিশ জন আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ভাইরাসে। ভারতবর্ষে ৩১ জন (ব্লগে লেখাটি প্রকাশের সময় ৫২)। বারোই জানুয়ারিতে নামকরণ করা হয়েছে যে ভাইরাসের --
SARS-CoV-2। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনা ভাইরাস ২।

কেন ২? কেন ১ নয়? সে সবে আসছি পরে।

দুই

বিশ্বজিৎদা আমার বড্ড প্রিয় একজন মানুষ। ডঃ বিশ্বজিৎ রায়। প্রথমত, এরকম টগবগে, চনমনে, উৎসাহী, কর্মোদ্যমী মানুষ আমি খুব একটা দেখিনি। দ্বিতীয়ত, এই ভদ্রলোকই আমাকে এক প্রকার জোর করে তুলে এনেছিলেন জলপাইগুড়ি টিবি হাসপাতালে। প্রায় তিন বছরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একঘেয়ে জীবন ফেলে, শহর জলপাইগুড়ির স্বাদ চাখবার সুযোগ মিলেছিল আমার।

সময়টা তখন দু হাজার দশের শেষাশেষি। এক হাড় কাঁপানো ঠান্ডার সন্ধ্যাতে সাপ্টিবাড়ি প্রাইমারি হেলথ সেন্টার সংলগ্ন কোয়ার্টারের বারান্দাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। সামনের মাঠে ঠাসা কুয়াশা। কুয়াশা আমার ওই ব্যালকনিতেও। কপাল, ঠোঁট, নাকের আগা আর হাতের আঙুল ভিজে ভিজে যাচ্ছে হিমশীতল কুয়াশা পরশে। বাদবাকি অংশ গরম জামা কাপড়ে ঢাকা। সহসা, চরাচর ব্যাপী নিস্তব্ধতা খানখান করে বিচ্ছিরি শব্দে আর্তনাদ করে উঠল আমার নোকিয়া (মডেল নাম্বার ২৩০০) । চমকে উঠে, চায়ের কাপ মাটিতে নামিয়ে, পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে আবিষ্কার করলাম, আমার হাতগুলো অবশ হয়ে গেছে প্রায় পুরোপুরিই। আর ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্ক্রিনে ব্লিংক করছে: ডিটিও। অর্থাৎ, ডিস্ট্রিক্ট টিবি অফিসার।

পরবর্তী কথোপকথনটা ছিল নিম্নরূপ:

- সব্যসাচী...
- হ্যাঁ বলুন স্যার।
- তোকে ভাবছি সদরে তুলে নিয়ে আসব। টিবি হাসপাতালে।
- স্... সদরে? জলপাইগুড়ি?
- হুম! মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবির জন্য এই হাসপাতালটা সিলেক্ট হয়েছে। নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজেই হওয়ার কথা ছিল। শিলিগুড়িতে। ওদের মুখের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি আমি। ইট উইল বি অ্যান অনার অ্যান্ড প্রাইড ফর জলপাইগুড়ি। অ্যান্ড... আই ওয়ান্ট ইউ দেয়ার। তোকে চাই আমার এখানে।
- জ্.. জলপাইগুড়ি টাউন? সো... সত্যি বলছেন? স্যার?
- হুম। সিএমওএইচ-এর সাথে কথা হয়ে গেছে। বণিক স্যার তোকে চেনেন। খোঁজ খবর রাখি আমরা সবাই। ইউ আর দা ম্যান। চলে আয়। অর্ডার হাতে পাবি শিগগিরই।
- স্যার...
- অনেক আশা নিয়ে তুলে আনছি সব্যসাচী। আমার নাক কাটাস না। চাপ আছে। প্রচুর চাপ আছে কাজের এখানে। নতুন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তোলা চাট্টিখানি কথা না কিন্তু! রাজি আছিস?
- হ্যাঁ.. হ্যাঁ স্যার
- গুড। চেপে রাখ খবরটা। কেউ কাঠি করতে পারে। রাখছি। বাই।

এর ঠিক দেড় মাসের মাথায় জলপাইগুড়ির রাণী অশ্রুমতী টিবি হাসপাতালের দায়িত্ব নিই আমি। একা। সিঙ্গল হ্যান্ডেড। পশ্চিমবঙ্গে তখন সদ্য শুরু হয়েছে মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবির চিকিৎসা। দক্ষিণে যাদবপুর কেএসরয় হাসপাতালে। আর উত্তরে, এই আমার এখানে। নির্দিষ্ট কোনও গাইডলাইন তৈরি হয়নি তখনও এমডিআর টিবির চিকিৎসার। যেটুকু যা আছে, সবটাই ফ্লেক্সিবেল। নমনীয়। পরিস্থিতি বুঝে পরিবর্তন ঘটানোর সুযোগ আছে চিকিৎসা পদ্ধতির। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সমগ্র ভারতবর্ষ তখনও শিখছে এ রোগের চিকিৎসা। শিখছে, এবং আবারও নতুন করে শিখছে, দৈনিক নিত্য নতুন 'কেস স্টাডি' করে। সেই যুদ্ধের প্রথম দফা থেকে যোগদান করলাম আমিও।

যেহেতু তখন জাস্ট শুরুয়াৎ, সেইহেতু বিবিধ প্রশ্ন আর বহুবিধ অজানা ভয় কাজ করত আমাদের মনে। বিশেষত, রোগটি যখন প্রাণঘাতী। বিশেষত, রোগটি যখন সংক্রামক। ছড়িয়ে যায় একজনের থেকে অন্যজনের মধ্যে।
আর ঠিক এইরকম একটা সময়েই ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন (WHO) আর ইউনাইটেড স্টেটস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (USFDA)-এর যৌথ উদ্যোগে একটা ভিজিট কাম ট্রেনিং হল আমার হাসপাতালে। যাঁরা এসেছিলেন এবং যাঁরা ট্রেনিং দিয়েছিলেন, সকলেই 'এয়ারবোর্ন ইনফেকশন কন্ট্রোল'/ 'বাতাসে ছড়িয়ে পড়া অর্থাৎ বায়ুবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ' দফতরের আন্তর্জাতিক দিকপাল। প্রথম ট্রেনিংটা পেলাম হাসপাতালেই। আর দ্বিতীয়টার জন্য যেতে হল কলকাতা। সেইবারেই প্রথম ফাইভ স্টার হোটেলে থাকবার সুযোগ পাই আমি। বদান্যতায় ওই WHO এবং USFDA।
যা শিখেছিলাম ঠিক তাই তাই দরকার এই করোনা ভাইরাস আটকাতে হলেও। বস্তুত, যে কোনও রোগ, যা হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, সে রোগ টিবি হোক বা করোনা, নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি একই।

আমরা সে সব মেনে চলি না। আমরা... সেসবেরই মূল্য চোকাচ্ছি।

তিন

ট্রেনিং-এর মূল বক্তব্য ছিল খুব সিম্পল। ভালো করে মন দিয়ে পড়বেন। এই কয়টি মেনে চললেই আপনাদের 'অধুনা আতঙ্ক' করোনা ভাইরাস তো নিয়ন্ত্রিত হবেই, সাথে সাথে থেমে যাবে টিবি রোগও।

জানেন কি যে, করোনা ভাইরাসে এ যাবৎ সব মিলিয়ে মারা গেছেন ৩৪৮৮ জন?  আর টিবি রোগে প্রতিদিন, প্রত্যেকটি দিন মারা যান প্রায় ৪৩২০ জন ?

আসুন, নিয়মগুলি বলি।

১) হাঁচি বা কাশির সময়, তালু নয়, বাহু ঢেকে হাঁচুন/ কাশুন (নিচে ছবি দ্রষ্টব্য), দৈনন্দিন কাজের সময় করতল বারবার ব্যবহার হয়, তাতে সংক্রমণ ছড়ায়।


২) হ্যান্ডশেক পরিত্যাগ করে, মেক ইন ইন্ডিয়া এবং সত্যজিৎ খ্যাত 'কেমন আছেন নমস্কার' করুন।

৩) যেখানে সেখানে কফ থুথু ফেলা বন্ধ করুন।

৪) কথায় কথায় নাকে মুখে কিংবা চোখে হাত দেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। এতে ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

৫) খামোখা সিঁড়ির হাতল ধরে ওঠা নামা করবেন না।

৬) সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে লাভ নেই খুব একটা। এমনকি N 95 জাতীয় মাস্ক পরেও নয়। কারণ, যদি সঠিক পদ্ধতিতে আপনি N 95 পরেন, অর্থাৎ টেনে ব্যান্ড বেঁধে এবং নাকের ব্রিজ চেপে, তবে এই মাস্ক পরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। দম আটকে আসে। দ্বিতীয়ত, এই মাস্ক পরলেও সংক্রমণ আটকানোর সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ। টিবি কিংবা করোনা 'ড্রপলেট'এর মাধ্যমে ছড়ায়। সেই ড্রপলেট আটকাতে হলে বরং উল্টে, যারা হাঁচি বা কাশিতে ভুগছেন, মাস্ক পরা উচিত তাঁদেরই। সেটা সাধারণ সার্জিকাল মাস্ক হলেও চলবে।

৭) চেষ্টা করুন খোলামেলা আবহাওয়ায় থাকতে। বিশেষত, যাঁরা স্বাস্থ্যকর্মী। যাঁদের প্রতিনিয়ত দেখতে হয় হাঁচি কাশিওয়ালা রোগীদের। এয়ার কন্ডিশন্ড চেম্বার এড়িয়ে চলুন। দরজা জানালা হোক খোলামেলা। বাতাস যেন চলাচল করতে পারে এপাশ থেকে ওপাশে। তথ্য বলছে, কোনও ঘরের বাতাস যদি প্রতি ঘন্টায় দশ থেকে পনেরো বার ফ্রেশ হাওয়া দিয়ে রিপ্লেসড হয়, তবে সেই ঘরে বাতাস বাহিত রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। আর তার জন্য চাই খোলামেলা আবহাওয়া। এই একই নিয়ম মেনে চলুন যাঁরা বদ্ধ কামরায় কাজ করেন। আপনার রুমটিতে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিন। এখনই। আজ্ঞে হ্যাঁ। এই ক্ষণেই। দেখুন, আলমারি বা কোনও চেয়ার টেবিল জানালা ব্লক করছে কিনা। করলে, সেগুলো সরিয়ে অন্যত্র রাখুন। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা যত আধুনিক হচ্ছি, ততই আমাদের এসি প্রীতি বাড়ছে। যদি সম্ভব হয়, সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করে এসি হঠিয়ে জানালা দরজা খুলে রাখার চেষ্টা করুন। এতে গরম লাগবে। ঠান্ডাও। তবে, প্রাণে বেঁচে যাবেন। করোনা ভাইরাস তো নস্যি বিষয় দাদা। টিবিতে মরে যাবেন নয়তো।

৮) খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নিন সাবান দিয়ে কচলে কচলে। অন্তত কুড়ি সেকেন্ড ঘড়ি ধরে। যদি সাবান না থাকে 'হ্যান্ড স্যানিটাইজার' ব্যবহার করতে পারেন। তবে দেখে নেবেন তাতে যেন মিনিমাম ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল থাকে।

৯) মোটামুটি ৪০ বছরের পর থেকে বছরে একবার করে সুগার টেস্ট করান। সুগার নরমাল হলে কেয়াব্বাত! চলুন ফাটিয়ে মস্তি করি। কিন্তু সুগার/ডায়াবেটিস ধরা পড়ে যদি, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ডায়াবেটিস নিঃশব্দ ঘাতক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে বেশ দেরিতে। এবং ডায়াবেটিস রোগীদের শুধু করোনা কেন, যে কোনও সংক্রামক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

১০) (এটা ট্রেনিং-এ ছিল না। আমি জুড়েছি। বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে) এইটি, সম্ভবত বর্তমান দুনিয়াতে, সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের একটা। তাই শেষ পাতে দিলাম। নলেন গুড়ের টাটকা মিষ্টি লাস্টেই দেওয়া নিয়ম। হোয়াটসঅ্যাপে বা মেসেঞ্জারে অনেক মেসেজ পাবেন। করোনা বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে। সেইটে চারপাশে 'ফরোয়ার্ড' করে দেওয়ার আগে একটু খতিয়ে দেখুন। জেনে নিন বিষয়টা গুজব কিনা। ঠিক যেমন গুজব ছড়ায় দাঙ্গা নিয়ে। কিংবা ইউনিসেফ-এর নামে যেসব গুজব ছড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস ঘটিত।


চার

দু হাজার দুই-তিন সালে ঠিক এইরকমই একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেটিরও শুরুয়াৎ চিন দেশে। অনেকেই তাকে চেনেন সার্স নামে। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম (SARS)। মজার বিষয় একটাই। প্রায় সকল সাধারণ জনতাই ভুলে মেরে দিয়েছেন যে, এই সার্স রোগটিও হয়েছিল করোনা ভাইরাসের কারণেই। তবে সেই ভাইরাসের 'জিনোম'-এর গঠন (খোলনলচে) ছিল কিছুটা আলাদা। এই ভাইরাসটি ছড়িয়েছিল বাদুড়ের মাধ্যমে। বাদুড় থেকে রোগ ছড়ায় ভাম জাতীয় বিড়ালে। তারপর সেখান থেকে অন্যান্য জীব জন্তুতে। যেমন বীভার বা রেকুন। চিনে বীভার এবং রেকুন নামের প্রাণীরা খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সেখান থেকেই ছড়িয়ে যায় মানুষের মধ্যে। ছড়ায়, এই সব প্রাণীদের কাটাকুটি করতেন যাঁরা, সেইসব কসাইদের মাধ্যমে। মাংসের মাধ্যমে নয়। হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়াত এই রোগ। এই করোনা ভাইরাসের নাম দেওয়া হয়েছিল SARS-CoV-1। এ যাত্রায় তাই নাম দেওয়া হলো SARS-CoV-2। কারণ, এই করোনা ভাইরাসের গঠন পূর্বতন ভাইরাসের থেকে পৃথক।

দয়া করে চিন দেশকে গালি দিতে বসবেন না। চিৎকার শুরু করবেন না, 'শালারা যা খুশি খায়।' মাথায় রাখবেন আপনাদের প্রিয় গরু/ গাউমাতা-র শরীরেও টিবি ব্যাকটেরিয়া (অ্যাটিপিক্যাল) বসবাস করে।

পাঁচ

কতকগুলি প্রশ্নোত্তর সেরে নেওয়া যাক শেষপাতে।

প্রঃ কী ভাবে এই রোগ ছড়ায়? মানুষ থেকে মানুষে?

উঃ যে যা খুশী বক্কা মারুক, এ রোগের মোড অফ ট্রান্সমিশন (ছড়ানোর পদ্ধতি) সঠিক ভাবে জানা যায়নি এখনও। যথেষ্ট তথ্য নেই। তবে, এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য থেকে অনুমান করা হচ্ছে, এই রোগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে। আর তাই, উপরিউক্ত নিয়মগুলি মেনে চলুন।

প্রঃ এ রোগে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা কতখানি?

উঃ সে বিষয়ে মন্তব্য করার মতো যথেষ্ট তথ্যও এখনও হাতে আসেনি। এটা বিজ্ঞান। এটা স্ট্যাটিসটিক্স। যা খুশি একটা বকে দিলেই হল না হোয়াটসঅ্যাপে।

প্রঃ তাহলে কি এ রোগে লোক মরে না?

উঃ অবশ্যই মরে। তবে এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে যে, এটি ২০০৩-এর করোনা ভাইরাসের থেকে কম ক্ষতিকর। এই করোনা ভাইরাসে মরে সাধারণত বুড়ো বুড়িরাই। মরে প্রধানত তারাই, যাদের ইমিউনিটি কম। এগারোই জানুয়ারি যিনি মারা গিয়েছিলেন তাঁর বয়স ছিল একষট্টি বছর। ভদ্রলোকের ক্যানসারও ছিল। ষোলই জানুয়ারি যিনি মারা গিয়েছিলেন তাঁর বয়স ছিল ঊনষাট বছর। এই ভদ্রলোকের সম্ভবত টিবিও ছিল।

প্রঃ কতদিন সময় লাগে এই রোগটি হতে?/ ইনকিউবেশন পিরিয়ড কত?

উঃ এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দুই থেকে চৌদ্দ দিন।

প্রঃ তেরই ফেব্রুয়ারি এবং তার পর থেকে হঠাৎ করে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেল কেন? তার মানে কি আমরা হেরে যাচ্ছি?

উঃ আজ্ঞে না। এ কথা সত্যি যে তেরই ফেব্রুয়ারিতে ১৫১৪১ জনের নতুন সন্ধান পাওয়া গেছে। যেটা আশ্চর্যই বটে। তবে তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এর আগে স্রেফ ল্যাবরেটারিতে যাঁদের নমুনাতে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে, তাঁদেরই রোগী ধরা হত। তেরই জানুয়ারি থেকে যে কোনও নিউমোনিয়া রোগীকেই সম্ভাব্য করোনা ধরা হচ্ছে চিন দেশে। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'চেঞ্জ অফ কেস ডেফিনেশন'। এই 'কেস ডেফিনেশন'-এর আরও একবার পরিবর্তন হয় ২০শে ফেব্রুয়ারি। ফলত, সেইদিন রোগীর সংখ্যা কমে যায় ফট করে। এসব মেডিক্যাল কচকচি। এসবের উপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত/ উল্লসিত হওয়া অনেকটা ফ্লাইটে বসে 'প্লেনটা খুব জোরে উড়ছে মনে হচ্ছে' বলার মতো। অর্থাৎ, বালখিল্য।

প্রঃ এই রোগ আটকে দেওয়ার কি কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে?

উঃ জি নেহি হুজুর। আজ্ঞে না সাহিবাঁ। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে আপনি অনেক গুজবই পাবেন। যথা, গরুর পেচ্ছাপ খেলে/আয়ুষ বা হোমিওপ্যাথি আবিষ্কৃত বড়ি খেলে, করোনা ভাইরাসের মূর্তি বানিয়ে পূজা করলে (সৌজন্যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ), তেলাপিয়া মাছ বা মুরগি না খেলে, চায়নার আবির না মাখলে করোনা হবে না। এগুলো সবই... আই রিপিট সবই... ঢপের চপ।

প্রঃ মাংস খাওয়া কি এ সময়ে বিপজ্জনক?

উঃ না। যদি রান্না করে মাংস খান, কোনও বিপদের সম্ভাবনা নেই। চাইলে আমাকে নেমন্তন্নও করতে পারেন। তবে হ্যাঁ, রান্না সুসিদ্ধ, সুপক্ক হওয়া চাই। আধাখ্যাঁচড়া রান্না হওয়া মাংস যাঁরা খান সাহেবি কেতাতে, তাঁদের শুধু এখনই নয় ভবিষ্যতেও বহুবিধ রোগ হতে পারে। এ মুহূর্তে পাওয়া তথ্য মোতাবেক, কাঁচা মাংস নিয়ে নাড়াঘাঁটা, যেমন ম্যারিনেশন/ নুন হলুদ মাখিয়ে রাখা অথবা মাংস ধোয়া, এসবে করোনা ছড়াচ্ছে কিনা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু নিশ্চিত তথ্য যে, কাঁচা মাংস নাড়া ঘাঁটার পর যদি ভালো করে সাবান জল দিয়ে হাত ধুয়ে নেন, তবে আজ আপনার করোনাও হবে না, ভবিষ্যতেও অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাবেন।

মোটমাট কথা, শুধু আজকের জন্য নয়, সারা জীবনের জন্য এগুলো মেনে চলুন। এগুলো 'সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি'।

প্রঃ দশ সেকেন্ড নিঃশ্বাস ( পড়ুন প্রশ্বাস) আটকে রাখতে পারেন না যাঁরা, তাঁরাই কি এ রোগে আক্রান্ত?

উঃ দাদারা/ দিদিরা, হাসাবেন না। হাসাতে হলে কমেডি সার্কাস দেখুন।

প্রঃ হাঁচি বা কাশি হলে কি ভয়ের ব্যাপার?

উঃ না। ভারতবর্ষে করোনা এখনও সেভাবে হয়নি কিছুই। মহামারী/ এপিডেমিক তো দূরের কথা! তবে হ্যাঁ! হাঁচি, কাশি, জ্বর হলে ডাক্তারের কাছে যান। বাকিটা উনিই বুঝে নেবেন। প্রয়োজনে 01123978046 নাম্বারে ফোন করবেন। এটা ন্যাশানাল করোনা হেল্পলাইন নাম্বার।


ছয়

সেবার ওই কলকাতার পাঁচতারা হোটেলের 'এয়ার বোর্ন ইনফেকশন কন্ট্রোল' সেমিনার থেকে ফিরে আসা ইস্তক আমি আমূল বদলে গেছি। আমি সেই ২০১১ থেকেই মুখ ঢেকে হাঁচি কাশি। অন্যদের শেখাই। রাস্তায় কেউ থুতু ফেললে খিস্তাই। কর্মক্ষেত্রের দরজা জানালা খোলামেলা রাখি। ইনফ্যাক্ট SARS-CoV-2 পয়দা হওয়ার ঢের ঢের আগে থেকেই আমি এ বিষয়ে নাগাড়ে লিখে যাচ্ছি।

একটা গোপন কথা বলে যাই। আমার হাসপাতালের প্রতিটি দরজা জানালা খুলিয়ে রাখি আমি দিনরাত। প্রতিদিন বুঝিয়ে বুঝিয়ে এইটেই এখন জলপাইগুড়ি টিবি হাসপাতালের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই, আমি আর ওই বিশ্বজিৎদা ( তৎকালীন ডিটিও) মিলে ষড় করে, সরকারকে দিয়ে গরম মোজা আর মাঙ্কিটুপি কিনিয়েছিলাম। শীতের রাতের খোলা জানালায় পেশেন্টরা কষ্ট পাবে বলে।

এ হাসপাতাল বাদেও অন্যত্র মাঝে মাঝে এমার্জেন্সি ডিউটি করতে হয় আমায়। আমি ভারী আশ্চর্য হয়ে দেখি, সে সব জায়গাতে রাতের বেলা সব জানালা দরজা বন্ধ করে রোগীরা এবং সিস্টাররা বসে থাকে। আতঙ্কিত হয়ে শুধিয়েওছি আমি সিস্টার বা সে হাসপাতালের ডাক্তারদের বহুবার। সবাই মাছি নাড়ার মতো হাত করে বলেছে, 'ধুর... এরা বললে শোনে না।' তো, সারা দুনিয়া বদলানো তো আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়! তবে অন্য কোনও হাসপাতালের ওয়ার্ডে গেলেই আমি আগে জানালা খোলাই। রোগীরা গড়িমসি করলে, খিস্তি মারি টেনে। এসব, আমার রক্তে মিশে গেছে।

সাত

লেখাটা এবার শেষ করব। ভালোই হল। সাতটা চ্যাপ্টার হল। পোয়েটিক জাস্টিস। কারণ, এই করোনা ভাইরাসটি এ যাবৎ পাওয়া সাত নম্বর করোনা ভাইরাস, যেটি মানুষকে আক্রমণ করেছে।

যাক সে কথা। এ লেখা লিখতে লিখতেই ফোন করেছিলাম এক WHO উপদেষ্টাকে। অনিকেত চৌধুরী। তো হাসছিলাম আমি ফোনে, 'অনিকেত, এতদিন ধরে আমরা বলে আসছি। কেউ শুনছে না। ভাগ্যিস করোনা এল। তাই লোকে হাঁচি কাশিতে মুখ ঢাকার কথা শুনছে। অন্তত কিছুদিন হলেও টিবি ইনফেকশন কম ছড়াবে। বলো? জয় করোনা মাইয়া কি।'
অনিকেতও হাসল। বলল, 'প্রিসাইজলি! মাই পয়েন্ট..'

প্রতি কুড়ি সেকেন্ডে একজন টিবি রোগী মারা যায় এ পৃথিবীতে। সারাদিনে প্রায় সাড়ে চার হাজার। ভারতবর্ষের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষের শরীরে টিবির জীবাণু আছে। সে জীবাণু অপেক্ষা করছে ঘাপটি মেরে। ইমিউনিটি এতটুকু কমলেই, সুগার বা ক্যানসার হলেই তেড়েফুঁড়ে উঠবে। তবুও কারও হেলদোল নেই। সব্বাই সেই একই বুলি আউড়ে যাচ্ছে, 'ধোর শালা! টিবি হয় রিকশাওয়ালাদের।' আর টিবি বেড়ে চলেছে। এমন ভাবে বাড়ছে যে, যদি এই রেট বজায় থাকে, তবে আপনাদের সব্বার নাতি নাতনির টিবি হবে।

হাতজোড় করে বলছি, তিন নম্বর চ্যাপ্টারে বর্ণিত সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন সারা জীবন। শেখান সব্বাইকে ঘাড় ধরে। প্রয়োজনে ঝগড়া করুন। যে মানুষ প্রতিদিন দরজায় তালা দিয়ে বাইরে যায়, তার চোরের ভয় নেই। আর আপনারা যেটা করছেন সেটা হল কতকটা এইরকম--  পাড়ায় নতুন চোর এসেছে! এবার তাহলে ক'টা দিন দরজায় তালা দিই।

ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

৮ মার্চ ২০২০।

তথ্য ঋণ: WHO

[একাধিকবার নিজের নাম উল্লেখ করেছি আমি। যেটা এর আগে কখনও করিনি। আজ করলাম। একটাই কারণ। এ লেখার সমস্ত দায়ভার আমার]

Friday, 6 March 2020

মুদ্রা যখন ডিজিটাল

ডিজিটাল জগৎ ও তার মুদ্রা
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

(দেশের শীর্ষ আদালত ক্রিপটোকারেন্সির ওপর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে। প্রচলতি মুদ্রার পাশাপাশি ডিজিটাল মুদ্রাও এবার হয়ে উঠবে যাপনের অঙ্গ। মুদ্রার ধারণাই এবার পাল্টাতে চলেছে ব্লকচেন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্বিক আলোকে। সদ্য প্রকাশিত 'আশায় বাঁচে চাষা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও একুশ শতকের রাজনৈতিক অর্থনীতি' গ্রন্থে এ নিয়ে আলোচনার কিছু অংশ এখানে দেওয়া হল।)
  
আরও একটি প্রবণতা বহু কিছুর ঝুঁটি ধরে নাড়া দিতে চলেছে। তা হল সোশ্যাল মানি বা ‘সামাজিক মুদ্রা’র ধারণা। এতদিন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার কথা আলোচনা করেছি। এখন উঠে আসছে সোশ্যাল মানি নামক এমন এক আর্থ-সামাজিক ধারণা যা ইতোমধ্যে বাস্তব রূপও ধারণ করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি-র একটা ধারণা আমরা পেয়েছি। বিটকয়েন-এর কথাও শুনেছি। এও শোনা যাচ্ছে, ফেসবুক অনতিবিলম্বেই আনতে চলেছে লিবরা নামক এক ডিজিটাল মুদ্রা। এর বাস্তব প্রভাব ও প্রতিপত্তি কী হবে তা দেখার আছে অবশ্যই। অবশ্য, বাঘা বাঘা কর্পোরেটরা এই লিবরা-র আগমনের পিছনে দাঁড়িয়েছে। যেমন, পেপাল, উবের, ভিসা, মাস্টারকার্ড, এমনকি ভোডাফোন-ও। কিন্তু সোশ্যাল মানি-র ধারণা কিছুটা ভিন্ন। যেমন যুগ পরম্পরায় মিডিয়ার ধারণা বদলেছে- যা আগে ছিল মালিকানা নিয়ন্ত্রণাধীন ও ওপর থেকে নির্গত এক প্রক্রিয়া, এখন এসে দাঁড়িয়েছে পরস্পর-মুখি, খোলামেলা, অংশীদারিত্ব অবয়বে, যাকে আমরা বলি সোশ্যাল মিডিয়া- ঠিক একইভাবে লক্ষ লক্ষ মুক্ত মুদ্রা অচিরেই আমাদের স্মার্ট ফোন জুড়ে চলাফেরা করবে। মুদ্রাও হয়ে উঠবে সোশ্যাল, সামাজিক। বলা হচ্ছে, এই ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা সরকারি বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কব্জা মুক্ত এমন এক অস্তিত্ব যা বিবিধ বাজার ও সামাজিক কৌমের ওপর ভরসা রেখেই চলাচল করবে। দাবি, স্মার্ট ফোন ও নেট দুনিয়া মারফত এই মুদ্রা শুধু লেনদেনকে সহজতর করবে না, বরং ব্যক্তি ও নানাবিধ সামাজিক গোষ্ঠীকে নানান ভাবে সক্ষম করে তুলবে। নানা ধরনের অ্যাপ ও যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে মানুষে মানুষে সংযোগ রাষ্ট্র, জাতি ও দূরত্বের বাধাকে অতিক্রম করে সর্বব্যাপী হয়ে উঠছে, তাতে খুব স্বাভাবিক, এই ধরনের বহু সামাজিক উদ্যোগ ও প্রয়াসের বাস্তব আখ্যান তৈরি হবে। ইতিমধ্যেই এই ধরনের স্থানীয় মুদ্রা, নানান উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সচল আছে। যেমন, জার্মানিতে চলে Chiemgauer- যা স্থানীয় উদ্যোগপতিদের দ্বারা স্থানীয় ভিত্তিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে। জাপানে চালু আছে Fureai Kippu, যা এক ধরনের সহমর্মিতামূলক মুদ্রা বয়স্ক নাগরিকদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে।১০  

মুদ্রার প্রচলন ও তার ওপর আস্থা নির্ভর করে মানুষের পরস্পরমুখি সম্পর্ক ও লেনদেনের ওপর। নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ সীমান্তে উভয় দেশগুলিতেই সীমানা পেরিয়েও প্রতিবেশী বিদেশি দেশগুলির মুদ্রা কার্যকরী ভাবে বেশ সচল ও কার্যকর। এর কারণ, মানুষ তার লেনদেনের সুবিধার্থে ও পরস্পর-বাণিজ্যিক স্বার্থে এক ধরনের আস্থাকে ভরসা করেই এমত লেনদেনে সহমত হয়েছে। ঠিক একইভাবে বহু জায়গায় সামাজিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে নানাবিধ বিনিময় মাধ্যম বেশ চালুও আছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এক সর্বব্যাপী সংযোগ ও বিনিময় এই ধরনের সামাজিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোনও মুদ্রাকে যে নির্মাণ করে নিচ্ছে বা নেবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। মিডিয়া যদি সোশ্যাল হয়ে উঠতে পারে, মুদ্রাও অচিরে সেই পথেই এগোবে। আর তা হবে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তা শুধু রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের খবরদারিকেই ভাঙ্গবে না, রাষ্টের বিকল্প হিসেবে নেট দুনিয়াকে কেন্দ্র করে নব-উত্থিত কেন্দ্রীয় টেক-দৈত্যদের প্রভাবও হয়তো খর্ব করবে।  

কিন্তু এই সমস্ত প্রয়াসগুলি ও তাদের সম্ভাবনাসমূহ নির্ভর করছে কিছু জটিল আধারের ওপর যার ভবিষ্যৎ চলাচল সম্পর্কে অত নিশ্চিত করে বলাটা বেশ কষ্টসাধ্য। আমরা যত কিছু সম্ভাবনাময় উপাদানের কথা বলছি অথবা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি আগামী গতিময় পথকে, আমাদের বুঝতে হবে, এই সামগ্রিক উদ্যোগগুলি কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে এমন এক আধারের ওপর যার ভিত্তি হল বড় পুঁজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি। এই আধার হল আসলে এক সুবিস্তৃত যোগাযোগের ভূমি বা বলা ভাল, এক অন্তহীন সামাজিক বাজার যেখানে অযূত ক্রেতা বা মানুষ এসে ভীড় করেছে। এ তাবৎ এত বড় ভূমি এখনও পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাস, দেখা তো দূর অস্ত, কল্পনা পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি। গত দু-এক দশকের সমস্ত প্রয়াস ও কর্মোদ্যোগ কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে ওই কতিপয় বিশালাকার প্রাযুক্তিক-দৈত্য নির্মিত এক অতিকায় বাজারের ওপর ভর করেই। সে আমরা তাকে সোশ্যাল মিডিয়াই বলি বা অন্যথায় অন্য কোনও বিনিময়ের প্ল্যাটফর্মআমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার আদিগন্ত প্ল্যাটফর্ম তো এখনও ট্যুইটার, ফেসবুক, লিঙ্কডিন বা হোয়াটসআপ, আর বিনিময়ের অন্যতম দোকানদারি অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, তথ্য ঘাঁটার পরিসর গুগল বা উইকিপিডিয়ানিজেদের যা কিছু, তা এদের ওপর ভর করেই। অথবা, কিছু অ্যাপ, যা নির্দিষ্ট কিছু কাজ ও উদ্যোগের সম্ভাবনা বা কার্যক্রম তৈরি করে। এই সবের ওপর সওয়ারী হয়েই তবে না ভুবন জয়ের চিন্তা। তাই কেউ কেউ বলেন, যতই বাঘের পিঠে চাপুন না কেন, এর একটা অন্যদিকও আছে। তা হল, দৈত্য যত বড় হয় তার খুঁটিনাটি নজর তত সঙ্কুচিত হয়। তাই আপনি যদি এদের ঘাড়ে চড়েও বেড়ান কি দু-পাইস কামিয়েও ফেলেন, এদের কিচ্ছুটি যায় আসে না; আর আপনি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খোঁজের আপনার প্রয়োজনটাই বা কী? কিন্তু সম্ভবত, এই কথাটি আজকের যুগে বলা যাবে না। কারণ, খুঁটিনাটি নজর করার জন্য দৈত্যের আছে সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যারা আপন নিয়মেই খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজ করে চলে, অর্থাৎ, নজরদারি চালাতে পারে। তবুও প্রশ্নটা অন্যত্র। আরও একটু জটিল মাত্রায়। হয়তো, দৈত্য বহু কিছুকে জেনে-বুঝেও উপেক্ষা করতে পারে। কারণ, তার অন্য এক অভিলাষ রয়েছে। সে অভিলাষ হল, বিশ্বের যাবতীয় যা কিছু, বিশেষত তথ্য, তাকে নিজের আওতায় আনা, পর্যবেক্ষণে রাখা, বিশ্লেষণ করা ও তার রকমফের ফলাফলকে নিজের কাজে লাগানো বা তা নিয়ে লাগাতার এদিক-ওদিক বাণিজ্য করা এই তার আধিপত্য-বিস্তারের প্রধান সড়ক। তাই তার পক্ষে আবার কোনও কিছুকেই উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। সে অনায়াসে গিলে ফেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোট কারবারীদের।

Monday, 2 March 2020

মধ্যবিত্ত ও সোশ্যাল মিডিয়া

ধর্ম ভেদাভেদ বিষবাষ্পে মধ্যবিত্ত আমরা কেউ কেউ ও সোশ্যাল মিডিয়া
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়

বড় বড় রাজনৈতিক চালের ও জালের  খপ্পড়ে আমরা যারা আদার ব্যাপারী তারা পড়ব কেন! আরএসএস কী বলছে বা তাদের সামনের ও দূরের অ্যাজেন্ডা কী এটার জন্য আমাদের কোনও চুঁনোপুঁটির কাছে কেন নির্ভর করতে হবে বা কেন ওইদিকে যাব বা মন দেব। দরকারে তাদের কোনও তাত্ত্বিক লোকের কাছে যাব, তাদের কোনও লেখাপত্তর বই পত্রিকা সংগ্রহ করে নিজে জ্ঞান নেব। ইংরেজিতে ফটর্-ফটর্ শিখতে গেলে প্রজাতন্ত্রী টিভির বক্কাবাজি-ধমকবাজি  শুনব, মাওবাদীদের কথা জানতে গেলে তাদের পত্র-পত্রিকার খোঁজ করব, ইসলামী জেহাদিদের কথা কী তা জানতে হলে খোঁজ নেব কোথাও কোনও লাইব্রেরিতে তাদের কোনও পত্র-পত্রিকা থাকলে।

তো, আমরা এইসব গুরুত্বপূর্ণ লোকজন নিজেদের  মধ্যে কেন এইগুলো নিয়ে থোড়-বড়ি-খাড়া নিয়ে ঠ্যাসাঠ্যেসি করব বা ভার্চুয়াল দাঙ্গাসম দূষণ চালাব? আমরা তো কারও কোনও কাজেও লাগছি না। শুধুই খাবারের পরে মুখশুদ্দির জন্য এসব করা? নাকি কোনও স্বার্থ আছে!  তো, এবার তাহলে আমরা কী করব! সোশ্যাল মিডিয়াকে সুবিধা করে আমরা আমাদের বদামি ও ইতরামি করেই যাব, করেই যাব, করেই যাব।

কিন্তু মশাই!! সবাই সব জানতে পারছে, বুঝতে পারছে। প্রথম প্রথম বোঝা যেত না। এখন বোঝা যাচ্ছে। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে অনেকেই আমরা দুনিয়াটাকে এক্সট্রাপোলেট করি। আমরা ঝগড়া করি, বা, তবু সম্পর্ক রাখি- অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণ বা স্বার্থ‌ে।  কিন্তু এই ব্যক্তিগত প্যারামিটারটা কয়েকজনের। স্বতঃস্বারিত নয়। তাই সেটাকে তারা সার্বজনীন করার চেষ্টা করে, কিন্তু এই অ্যাজেন্ডার কথাটা মুখে বলে না। এখন হয় কী, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের ব্যবহার-ঘর্ষণে এগুলো আস্তে আস্তে উপরিতলে উঠে আসে। আসতে হবেই।
ধরুন একজন বামপার্টি ভোটদানকারী মনস্ক কোনও মানুষ। সে বামপ্রেমী, জ্যোতি বসু প্রেমী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সদ্চরিত্র বলে স্বস্তি লাভ করেন। কিন্তু মুসলমান বিদ্বেষী। কোনও ক্ষমতাবান মুসলমান বলে নয়, সে গরিব মুসলমান হলেও। রঙের মিস্তিরি, রাজ মিস্তিরি হলেও। কেন? কারণ হিসেবে ভাবতে গেলে তখন অনেক কারণ পাবেন হয়তো। যেমন -
১) তারা (মুসলমানেরা)পূর্ববঙ্গে জোর করে হিন্দু নিধন করে বাদবাকি হিন্দু মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তু করে এ দেশে পাঠিয়েছে (অথচ, অদ্ভূত দেখুন -  এই দেশের এপার বাংলার আদি বাঙালিও এমন আছেন যারা হিন্দু হলেও বাঙাল বিদ্বেষী। কেন এই মানসিকতা? যেহেতু বাঙালেরা খ্যেদানি খেয়ে এ দেশে এসে এখানে ওখানে জোর করে বেআইনি কলোনি করে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং এ দেশের সম্পদে ভাগ বসিয়েছে, এদেশীয় ঘটিরা তাই(!) অবদমিত ও বিরক্ত হয়েছে- এই বয়ান)
২) জোর করে মুসলমানেরা ধর্মান্তরিত করেছে।
৩) তারা মন্দির ধ্বংস করেছে .... এইসব...

আর এ দেশের মুসলমানেরা কেন অপছন্দের হিন্দুদের কাছে? সাধারণ বয়ানগুলো কী কী!
যেমন -
১) তারা নোংরা। গা দিয়ে বোঁটকা গন্ধ বেরোয়।
২) তারা বিছানায় বসে ভাত খায়, এঁটো মানে না।
৩) তারা আইন মানে না - একটা বাইকে বা স্কুটারে চারজন যায়, হেলমেট পরে না।
৪) ইন্ডিয়া হারলে রাজাবাজারে বা খিদিরপুরে বা মেটিয়াবুরুজে পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ ওড়ায়
৫) ওরা গরু খায়।

যেটা বলতে মুখে বাধে ও মনে মনে পোষণ করা হয় তা হল, ওরা গরিব। ওরা অশিক্ষিত। ওদের মাথা মোটা।  ওরা দুর্বৃত্ত। ওরা দুর্বিনীত। ওরা দাঙ্গাবাজ। আস্তে আস্তে এই কথাটা ঘুরপাক খায় ও নির্মাণ হয় যে ইসলাম ধর্মটাই হিংসার।
স্বাভাবিকভাবেই একটা এইরকম সংস্কৃতি বা এইরকম দীক্ষায় নিপাট ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাম ভোটার মানুষকেও এইসব সুড়সুড়িগুলো দিয়ে কাৎ করে দেওয়াটা  কঠিন ব্যাপার নয় যদি তারা তথ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত না হয়ে থাকেন। তারপর তো আছেই বামপার্টির ভক্ত বলে সরকারি পার্টির সায় নেই বলে লোকাল স্তরীয় খাবলাখাবলি লড়াই ও আক্রোশ ও বামেদের নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করে ভোটব্যাঙ্ক খুইয়ে ধাঁ। এ যেন এক মেটান্যারেটিভ মহাদার্শনিক সিদ্ধান্ত ও 'দ্যাখ কেমন লাগে' প্র্যাকটিশ- এখানেই হিন্দুত্ববাদীদের ইউএসপি। না হলে যেখানে তারা পোলিং এজেন্টই দিতে পারে না, যেখানে তাদের সংগঠন নেই সেখানে তারা এতগুলো সিটে জিতে গেল কী করে? মূল ক্ষেত্রটা এটাই। এই সুড়সুড়িটাই (সুবিধা ) ধর্ম নিয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে ধর্মীয় নামি রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে। আসলে মূল কারণ কিন্তু ক্ষমতা। আর ধর্ম জিগির কিন্তু কৌশল। তাদের তাই সব থেকে বড় শত্রু কে? সেক্যুলার ও বামেরা। স্বাভাবিক ভাবেই। আবার দেখুন এই সেক্যুলার ও বামেরাও কম ভেজালের নয় - তার জন্যই তো তারা হিন্দু হিন্দু হিন্দু হিন্দু করে করেকম্মে খাচ্ছে। এই তো ব্যাপার !

আবার প্রথম কথায় আসি। আমরা এদের বা এইসব রাজনৈতিক দলগুলো বা তাদের স্বার্থের অ্যাজেন্ডা নিয়ে কেন চলব? কাদের কে বোঝাচ্ছি? বার্নাড শ বলেছিলেন,  কোন অ্যাডাল্টকে কখনও কনভিন্স করা যায় না। আমি মানবিক, বন্ধুবৎসল হব আর কিছু লোকের রাজনৈতিক বিরুদ্ধ মতবাদের জন‍্য তাকে যতটা পারি গালাগালি দেব, ভিন্নধর্মীদের সব সময় দোষ খুঁজব, নিরীহ মানুষকে নির্যাতন করার জন্য যারা তাল খুঁজব, তবুও কাউকে শান্তি দেব না।

ডেলিবারেটলি যারা জাতধর্ম ভেদাভেদ তুলে অশ্লীল কথা বলেন, তারা নিজেরা নিজেদের বাড়ীতেও সেই সম্মানটুকু রাখেন কি অন্যদের প্রতি? এটাকেই বলে ভ্যয়ারিস্টিক অ্যাটিটিউড। ম্যেসোসিস্টিক এ্যটিটিউড।

তাই ঠিক করুন এসবের মধ্যে পা না বাড়ানো। কোনও উস্কানি নয়। ভার্চুয়ালিটিরও এক কৃত্রিম দাঙ্গাক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে একদম না উস্কানো। এটাই মনে মনে ঠিক করুন।

পাঁচশ বছর আগে কোন মুসলমান সম্রাট কটা মন্দির ধ্বংস করেছে বলে বা অশোক কলিঙ্গযুদ্ধে কতো মানুষকে খুন করেছে বলে আমি আমার পাশের পাড়ার শান্তপ্রিয় কতকগুলো মুসলমান সহনাগরিকদের নমাজ পড়ার জায়গাটা 'জয় শ্রীরাম' বলে ধ্বংস করতে পারি না।

একটা কথা। এগুলো নিয়ে আলোচনা হতে দিতে চান না কেন ?
১) ভারতবর্ষে কত শতাংশ মুসলমান আছে? ২০১১ আদমশুমারি কী বলে?
২)কত শতাংশ মুসলমান কর্মসংস্থান ও ব্যবসা বৃত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত তার জনসংখ্যার অনুপাতে? এত কম কেন ? কে দায়ী তার জন্য?

শেষ করি একটি কবিতার খন্ডাংশ সংযোজন করে -

'ধোঁয়ায় ঢাকা বসন্ত আজ
গাইছে না কেউ প্রেমের গান

মানুষ থেকে পাল্টে সবাই
হিন্দু কিংবা মুসলমান।'

Tuesday, 11 February 2020

অভূতপূর্ব জয়!

দিল্লিবাসীকে অন্তরের অভিনন্দন
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
ওদের শেষ অস্ত্র ছিল দাঙ্গা। সে কথা দু’ একটা সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে জানিয়েওছিলাম। শাহিনবাগে দুর্বৃত্ত পাঠিয়ে বারবার গুলি চালিয়ে যদি ‘দুর্ঘটনাবশত’ দু-একজনকে মেরে দেওয়া যায় আর সে ঘটনার যদি পালটা হিংসা-প্রতিক্রিয়া হয় তাহলে দাঙ্গা ছিল অবধারিত। এও বলেছিলাম, যদি দাঁতে দাঁত চেপে দিল্লির শ্রমজীবী মানুষ ও প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই প্রয়াস রুখে দিতে পারেন তাহলে আপ’এর সর্বব্যাপ্ত জয় কেউ রুখতে পারবে না। সে কথা রাখা গিয়েছে। সমস্ত মিথ্যাচার ও নিষ্ঠুর বিভাজনের রাজনীতিকে পর্যদুস্ত করে দিল্লির মানুষ দু হাতে ঐক্য ও প্রগতির পথে রায় দিয়েছেন। বিকৃত হিন্দুত্বের যে রথ সারা দেশে ছুটছিল তা বহু রাজ্যে আটকে পড়লেও দিল্লিতে একেবারে ভূলুন্ঠিত হয়েছে। ২০০-র ওপর সাংসদ, অর্ধশতক মন্ত্রী, প্রায় সমস্ত শীর্ষ নেতাদের অলিগলিতে নামিয়ে, তার ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪২টি রোডশো ও জনসভা, প্রধানমন্ত্রীর ডজনখানেক সভা - এই সার্বিক প্রয়াসও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনকি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে 'নকশাল', 'সন্ত্রাসবাদী' ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে ও দিল্লির নির্বাচনকে 'ভারত বনাম পাকিস্তান' এই অভিধায় ভূষিত করেও কিচ্ছুটি নড়ানো যায়নি। বরং, জনতা উগ্রবাদীদের মুখে আরও বেশি ঝামা ঘষে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এই রায় তাই একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই রায়ের বয়ান ধরেই ভারতবর্ষের ইতিহাস এবার অন্য পথে এগোবে। এই রায় বিভাজনকারী দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে বিজলী, পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঐক্য ও সুশাসনের পক্ষে রায়।

এ দেশে বিজেপি’র উত্থান কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তথাকথিত উদারবাদী ও ভেক গণতন্ত্রীদের দুরাচার ও ব্যর্থতা মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় ও ব্যতিব্যস্ত করেছিল। সেই অনাচারের ফাঁক দিয়েই লৌহবর্মের আড়ালে নির্মাণ করা হয়েছিল এমন এক পুরুষমানব ও কল্পিত শত্রুর (মুসলমান) আশঙ্কামূলক অবয়ব, যে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে সেই পুরুষমানবের অনিবার যুদ্ধই যেন হবে রাজনীতির অক্ষ ও সমস্ত মুশকিল আসানের যাদুমন্ত্র; যার অন্তিমে আসবে ‘আচ্ছে দিন’। অলীক সেই যুদ্ধ শেষেই নির্বাপণ হবে দারিদ্র, অবিচার ও গ্লানির যাবতীয় ক্লেশ। সে আশ্বাসে আপাত বিশ্বাস রেখেছিলেন দেশের এক বড় অংশের মানুষ। তা ব্যতিক্রমী কিছু নয়। কারণ, তার আগে এক নচ্ছাড়তন্ত্র দেশ ও মানুষকে কম ভোগায়নি।

অর্থনৈতিক দুর্ভোগকে বাদ দিলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে এই নচ্ছাড়তন্ত্র প্রগতি ও ঐক্যকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে নিমজ্জিত করেছিল। নানা রূপে, নানা ভাবে। ধর্মীয় মৌলবাদের বিচারে ইসলামীয় মৌলবাদকে হাল্কা করে দেখেছিল, বিবর্ণ বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া ধর্মীয় বিবাদকে উন্মত্ততায় পৌঁছতে ও হিন্দু মৌলবাদী শক্তিকে সংহত হতে সহারা দিয়েছিল, সংরক্ষণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উত্তর ভারত ও বিহারে 'যাদবতন্ত্র'এর মাফিয়ারাজ কায়েম করেছিল, পশ্চিমি একাডেমিক শিক্ষার দম্ভে সাধারণের জ্ঞানগৌরবকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার রীতি চালু করেছিল, পশ্চিমবঙ্গে এক নিষ্ঠুর পার্টিতন্ত্র মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করছিল; সর্বোপরি, এক ভয়ঙ্কর আমলাকুল-রাজনীতিবিদ'এর জোটে প্রশাসনের এক নিষ্ঠুর অবয়ব ও কার্যপ্রণালী সমাজের ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপে বসেছিল। এছাড়াও ছিল আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ভরপুর এক রাজনৈতিক শ্রেণির রমরমা যারা সাধারণজনকে কুকুর-বিড়ালের দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। স্বভাবতই এই অনাচারের বিরুদ্ধে সমাজ জুড়ে ক্ষোভ ধূমায়িত হয়েছে।
কিন্তু আজ আশার জায়গা হল, যে নচ্ছাড়তন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জায়গা করে নিল সর্বগ্রাসী নিষ্ঠুর বিভাজনের রাজনীতি, দেশ জুড়ে এক দমবন্ধ, ভয়ঙ্কর পরিসর নির্মাণ করে চলল ও ভেবে রেখেছিল সেইভাবেই তা চলবে, তা যে ভারতবর্ষের মাটিতে অত আয়েসে হওয়ার নয় সে কাণ্ডজ্ঞান তাদের ছিল না। অবশ্য থাকার কথাও নয়। কারণ, ভারতবর্ষের আত্মা অমন স্থূল হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে নেই (যদিও ধূর্ত ক্ষমতালিপ্স রাজনীতির অনুশাসনে হিন্দু-মুসলমানের হিংস্র দ্বৈরথ আমরা সময়বিশেষে প্রত্যক্ষ করেছি)। সেই ভারত আত্মাই যখন বুঝেছে, দৈনন্দিন সহবাসের প্রতি ছত্রে লেপে দেওয়া হচ্ছে উন্মত্ত হিংসা আর ঘৃণা, তখন তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর তার উদ্ভাসন হয়েছে ছাত্র-যুবদের হাত ধরে। শুধু কি তাই? পর্দানসীন নিতান্ত আটপৌরে মহিলারাও রাস্তায় এসে বসেছেন দিনের পর দিন। শাহিনবাগ এক উদাত্ত উচ্চারণে প্রতিভাত হয়েছে। এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে বোঝার সাধ্য শাসকের নেই।

তাহলে এতসবের পরে অন্তিমে আমরা কি আবারও ব্যাক টু স্কোয়ার ওয়ান? হবুচন্দ্রকে সরিয়ে আবার কি সেই গবুচন্দ্র? একেবারেই নয়। এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের (শীর্ণ হলেও) প্রাণশক্তি নিহিত। অর্থাৎ, আমাদের প্রতিটি সংকটেই আমরা পেয়েছি কিছু উত্তরণের দিশাও। আর তা প্রতিটি দিনাবসানে প্রকটতর হয়েছে। তাহলে এবার আমাদের প্রাপ্তি কী? তা হল, উত্থিত এক অনন্য স্বাধীন নাগরিক সমাজের নির্মাণ। এমন এক নাগরিক সমাজ যা রাজনৈতিক দল ও শাসককে প্রতি পদে সবক শেখাতে সক্ষম; যা কোনও ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী বা বুদ্ধিজীবীকুল অথবা এলিট শ্রেণির ধামাধরা একবগগা, অলস, অক্ষম পরিসর নয়; যা সমস্ত অন্যায়কে একযোগে প্রতিহত করার মন্ত্র জানে। অতএব, প্রাপ্তি এও, আগামী সমস্ত শাসকের বয়ানে অবশ্যম্ভাবী বিবিধ পরিবর্তন। কিন্তু সেই পরিবর্তনগুলি আশ্বস্তপ্রদ নাও হতে পারে যদি নাগরিক সমাজ তাদের অর্জিত ঐক্য ও স্বাধীন চেতনাকে হারিয়ে ফেলে। তাই, দল-মত নির্বিশেষে নাগরিক সমাজ পথে নেমে যে বয়ান নির্মাণ করেছে তাকে নিত্য উড্ডীন রাখতে হবে। যার মন্ত্র রয়েছে আজাদ হিন্দ বাহিনী উচ্চারিত ‘ইত্তেহাদ’ (ঐক্য)’এর বীজে। নচ্ছাড়তন্ত্র ও ধর্মীয় বিভাজনের উন্মত্ততা- দুইয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের সজাগ প্রহরা।

ঝাড়খণ্ডের পর দিল্লির নির্বাচনও কুৎসিত সিএএ-এনআরসি'র বিরুদ্ধে প্রবল রায়। এবার বিহার। একে একে চলুক বিভাজন রাজনীতির পতন অভিসার।  

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
(যে অভিনন্দন নির্বাচন হওয়ার আগেই দিল্লিবাসীকে জানানোর জন্য লেখা হয়েছিল তাঁদের ওপর অগাধ ভরসা রেখে)
   



Thursday, 30 January 2020

স্বাস্থ্যের অসুখ

২০ শতাংশ চিকিৎসককে দূষিত করো...
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
 
'In the U.S., healthcare is now strictly a business term. Healthcare organizes doctors and patients into a system where that relationship can be financially exploited and as much money extracted as often as possible by hospitals, clinics, health insurers, the pharmaceutical industry, and medical device manufacturers.' (In the U.S. “Healthcare” Is Now Strictly a Business Term
Mar 13, 2018

উপনিবেশিক বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ইতিপূর্বে বহু গবেষণা হলেও সেগুলিতে রোগী ও চিকিৎসকের মানসিক সম্পর্কগুলির টানাপোড়েনের উপর আলোকপাত করা হয়নি বা হয় না। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সামাজিক ইতিহাস রচনায় এই দিকটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিচিতির সাহিত্য থেকে তথ্য উপাদান সংগ্রহ করে সমগ্র ব্যাপারটির উপর বিশেষ আলোকপাত করা দরকার।

প্রথমে দরকার অসুস্থ মানুষের চোখ দিয়ে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাটিকে দেখা। সেই দেখায় এসে যাবে অসুখের ভয়াবহতা, অসুস্থ মানুষটিকে ঘিরে থাকা  সমস্ত মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন। আবার একই ভাবে বিষয়টি চিকিৎসকের চোখ দিয়েও দেখা দরকার। এই ঘরানাটি যে একেবারেই ছিল না তা নয়। ইনভেস্টিগেশন ও এভিডেন্স বেইসড মেডিসিনে উত্তরোত্তর উক্ত ব্যাপারটি মার খেয়েছে। প্যারাডাইম শিফট হয়েছে। বেসরকারি কর্পোরেট চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে সরকারি কাঠামোতেও। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল মন্ত্র ছিল আপনি অসুস্থ হবেন না। বেসরকারি ব্যবস্থায় বলা হয়ে থাকে: দয়া করে অসুস্থ হোন, আসুন এক ছাদের তলায় সব কিছুই পাবেন - একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ। তাই রোগীর প্রয়োজনের আগেও খরচ ও মুনাফা তুলতে হবে বলে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট লিখতেই হবে। অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করতে হবে, যাকে বলতে পারি অতি চিকিৎসা। চিকিৎসক যাতে সে সব লেখেন তার জন্য কমিশন নামক লোভের হাতছানি ছড়াতে হবে। চ্যালেঞ্জ করলেও ব্যাপারটাতে বেনিফিট অব ডাউট রোগী পাবেন না। কারণ, কনসিউমার প্রোটেকশন অ্যাক্ট'এর জন্য ক্লিনিক্যাল আই নামক 'নিশ্চিতি নেই' দর্শনটিকে কেন ঘাঁটব? এই যুক্তিতে সর্বদাই রোগী পিছনে আগে চিকিৎসক বলব না, বলব আগে হল ব্যবসা । কাজে কাজেই বিজ্ঞান ও নৈতিকতা এবং বিজ্ঞান বনাম নৈতিকতা - এই আলোচনাটি জরুরি। Health is wealth কথাটির মানেটা হয়ে গেল How 'health' is making wealth। Pharmaceutical Marketing'এ Paritos' Law বলে এক বিধান আছে। তা বলে, Pollute 20% doctors, 80% will follow।

যে দেশে বেসরকারি লোকজন (৮৫ শতাংশ) নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা ওষুধের দাম নির্ধারণ করে (সংস্থাটির নাম: National Pharmaceutical Pricing Authority বা NPPA) সেই দেশে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার কথা আর কি বলব!

Sunday, 26 January 2020

সীমানা ছাড়িয়ে

দুই বাংলার মিলনমেলা
সঞ্জয় মজুমদার
২৪ জানুয়ারি ২০২০ ইন্দুমতি সভাগৃহে দুই বাংলার মিলনমেলা, কবিতার ছন্দে

জড়োয়ার ঝুমকো থেকে একটা নয়, অনেকগুলো মতি খসে পড়ল ৯ই মাঘ ১৪২৬-এর  সন্ধ্যায় যাদবপুরে, টেগোর সোসাইটি কলকাতা ও বাহার মিউজিকের যৌথ প্রযোজনায়, কবিতার রাখিবন্ধনে, দুই বাংলার যুগলবন্দীতে। অনিন্দ্যদার ঐকান্তিক ইচ্ছায়, 'একক মাত্রা'র পক্ষ থেকে আমি আর অরুণাভ কুড়িয়েও নিয়েছি সেইসব মণিমুক্ত, যতটা পেরেছি। শ্রদ্ধেয় পঙ্কজ সাহা এবং আমাদের কাছের মানুষ, প্রাণের মানুষ বিধান চন্দ্র পালের স্মরণীয় উপস্থাপনায় ২৪ জানুয়ারি অমাবস্যার সন্ধ্যায় ইন্দুমতি সভাগৃহে যেন মতির ছড়াছড়ি।

সাহিত্যচিন্তায়, মননে, লেখনিতে, পরিবেশনায় কবি ও আবৃত্তিকার, সমাজসেবী এবং পরিবেশকর্মী বিধান চন্দ্র পালের অনস্বীকার্য প্রতিভার সার্থক স্ফুরণ হল এই শীতের সাঁঝবেলায়। কবিতায় দুই বাংলার মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে, মঞ্চে উপবিষ্ট দুই বাংলার বিদগ্ধজনেদের বিশ্লেষণাত্মক বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের জন্য গাঁথা ছিল বিধানবাবুর মন ছুঁয়ে যাওয়া একগুচ্ছ কবিতার মালা, যা পূর্ণতা পেল, আরও উপভোগ্য হয়ে উঠল সভায় উপস্থিত এক ঝাঁক সম্ভাবনাময় আবৃত্তিকারের  অনবদ্য বাচনভঙ্গিতে। কবি তাঁর মনের এবং ভাবের গর্ভজাত আবেগের যথাযথ পরিস্ফুটনের শব্দ খুঁজে চয়ন করেন, আর আবৃত্তিকার, বাচিকশিল্পী শ্রুতিমাধ্যমে ছন্দবদ্ধ শব্দমালাকে সঠিক অনুপাতের স্বরক্ষেপে শ্রোতার মননে কবিতার অন্তর্নিহিত বোধের জন্ম দেন। বিধান চন্দ্র পালের স্বরচিত 'নারীকাব্য' এবং 'আবার জেগে উঠবে মানুষ' শিরোনামের দুইটি কমপ্যাক্ট ডিস্কে বন্দী চল্লিশটি কবিতার শ্রুতিসঙ্কলনে ঠিক এই চিন্তারই অনুশীলন করা হয়েছে।

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব পঙ্কজ সাহা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অবকাশ নেই। তবে, তাঁর কবিসত্তার পুনঃপ্রকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করলাম এই অনুষ্ঠানে, সৌম্যেন অধিকারী ও সংযুক্তা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ও পঙ্কজ সাহার কবিতা নিয়ে 'মানুষকে মানুষের কথা বলতে দাও' শীর্ষক কমপ্যাক্ট ডিস্কের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। ১৯৭৫-এর ৯ অগাস্ট কলকাতা দূরদর্শনের জন্মলগ্ন থেকে এই মানুষটি আপামর বাঙালির অত্যন্ত পরিচিত মুখ। দুই বাংলার সংস্কৃতিক মেলবন্ধনের নিরলস প্রচেষ্টায় পঙ্কজ সাহার অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই মঞ্চেও তার ব্যতিক্রম হল না। কিছু অনিবার্য কারণবশত, বিলম্বিত লয়ে চলতে থাকলেও অনুষ্ঠান সঞ্চালনার সহজাত এবং স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমা ছিল অটুট, প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য আর গভীরতায় পূর্ণ।

অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণটি ছিল পঙ্কজ সাহার সুদীর্ঘ বর্ণময় কর্মজীবনের অমূল্য রতনে পূর্ণ, যার উজ্জ্বলতমটি অবশ্যই বাংলা ভাষাকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের অন্তহীন আবেগ আর আপসহীন সংগ্রাম, ২১ ফেব্রুয়ারি যার সোনার ফসল। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য ওপার বাংলার মানুষের অবিস্মরণীয় ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা, গর্বের ঘটনা, আর সেই গর্বের প্রতিফলিত আলোকে আমরা এপার বাংলার মানুষেরাও নিঃসংকোচে আলোকিত। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি, কূটনীতি, দেশকালের সীমানা সমস্ত কিছু ছাপিয়ে একটা ভাষা কীভাবে সুদৃঢ় একতার বন্ধন হতে পারে, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

স্বাগত ভাষণের আর একটি পর্যায়ে পঙ্কজ সাহা তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিচারণায় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙিনায় বহু গুণী ও বিদগ্ধ মানুষের সান্নিধ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে যেমন আছেন শম্ভু মিত্র, বিষ্ণু দে তেমনি, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো উজ্জল জ্যোতিষ্কদের আনাগোনা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইসিসিআর-এর অধিকর্তা গৌতম দে মহাশয়। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনধারার মেলবন্ধন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক তাঁর বক্তব্যে উঠে এল। পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রায় সব ধরনের ঘটনাবলীর ধারাবাহিক তথ্য পূর্ববঙ্গের নাগরিকদের কাছে নিয়মিত পৌঁছলেও বিপরীত স্রোত কিন্তু খুবই অনিয়মিত। ওপার বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির অগ্রগতি এবং ধারাবাহিকতার  বেশিরভাগ তথ্য পশ্চিমবাংলার মানুষজনের কাছে পৌঁছয় না। এটা সত্যিই আঘাত পাওয়ার মতো বিষয়। বাংলাদেশের সংবেদনশীল মানুষজনের কাছে এ এক যুক্তিযুক্ত অভিমান। মূল সমস্যার জায়গাগুলো অবশ্যই প্রশাসনিক গেরোয় আটকে আছে। ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই দুই দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের নিয়মিত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে পরিপন্থী, সেটা স্পষ্ট। কারণ প্রযুক্তির বিশ্বায়নের যুগে যোগাযোগ কোনও সমস্যাই নয়।

কথা প্রসঙ্গে তিনি দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত চলচ্চিত্র বা কোন সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের নিয়ম-নীতির অসুবিধার কথা উল্লেখ করেন। এটা যত দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারব আমরা, ততই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। তবে, দুই দেশের প্রশাসনিক স্তরের উপরেই সব দায় গৌতম দে চাপিয়েছেন এমনটা কিন্তু একেবারেই নয়। এপার বাংলার মানুষের কষ্টদায়ক উদাসীনতাও এর কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রশাসনিক সমাধান এবং প্রযুক্তি তখনই কাজে আসবে যখন মানুষ থাকে ভেতর থেকে চাইবে। মঞ্চে উপবিষ্ট জামাল হোসেন এবং নান্টু রায় মহাশয়ও দুই বাংলার নিয়মিত সাংস্কৃতিক যোগাযোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শ্রদ্ধেয় জামাল ভাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

অশীতিপর গোলাম মুরশিদের জীবন ও কাজকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করার অবকাশ এখানে নেই। ১৯৮২তে বাংলা আকাদেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপককই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। পুরস্কারের সঙ্কীর্ণতায় গোলাম মুরশিদকে ধরা যায় না। সুদীর্ঘ সময় ধরে শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বহুধা বিস্তৃত কাজকর্মের মাধ্যমে তিনি নিজেই আজ একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লেখার মধ্যে অবশ্যই বলতে হবে- 'কালাপানির হাতছানি: বিলেতে বাঙালির ইতিহাস', 'মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস', 'বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান', 'কালান্তরে বাংলা গদ্য', 'The Reluctant Debutante', 'Lured by Hope', 'The Heart of the Rebel Poet', ইত্যাদির কথা। বয়স যে একটা সংখ্যা মাত্র, তা তাঁকে সামনাসামনি না দেখলে, তাঁর কথা না শুনলে, চিন্তাভাবনায় জারিত না হলে বিশ্বাস করা কঠিন।  সংক্ষিপ্ত ভাষণে বিধান চন্দ্র পালের এই শুভ উদ্যোগের যথাযথ প্রসংশা করেন এবং ভবিষ্যতেও এই ভাবনাচিন্তা এবং কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা দুই বাংলাতেই জারি থাকবে সেই আশাও রাখেন।

গদ্যপদ্য, আবৃত্তি, বাচিক শিল্প, দুই বাংলার মেলবন্ধন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে আমরা যখন ভাবাবেগে আবিষ্ট ঠিক তখনই প্রখ্যাত লেখক, সাহিত্য সমালোচক, এবং অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তীর ভাষণের সারাংশ যেন ভরা আদালতে, বাস্তববোধের হাতুড়ি ঠুকে, অর্ডার অর্ডার বলে উঠল। ১৯৪০ থেকে ২০২০ অবধি, ইতিহাসের স্রোত বেয়ে, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় মেরুকরণের আতস কাঁচের নীচে দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের ভাবনাচিন্তা ও প্রতিক্রিয়ার যথার্থ কারণ অনুসন্ধান করলেন বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে। শিল্পসৃষ্টি, তা সে যে মাধ্যমেই হোক না কেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিতের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে, প্রভাবিত হয়- এই সত্যটুকু স্বল্প সময়ে, সহজ ভাবে বুঝিয়ে দিলেন। সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

সভার শেষ পর্বে আমরা পেলাম অধ্যাপক ও গবেষক পিনাকেশ সরকারকে। পিনাকেশবাবুর বলার ধরন, গলার স্বর অতি সুন্দর। কবিতা তাঁর গবেষণার অন্যতম স্থান। কবি ও কবিতার চলন-বলনকে বিভিন্ন সময়ের আঙ্গিকে ধরার চেষ্টা করলেন। কবিতা বলার ধরনে অকারণ নাটকীয়তার, অকারণ আরোপিত আবেগের, দৃষ্টি-আকর্ষণীয় ভঙ্গিমার তিনি বিরোধী। কবিতার মূল সুর থেকে শ্রোতাদের তা বিভ্রান্ত করে। আবৃত্তিকারের সহজ-সরল ভঙ্গিমা, নিয়ন্ত্রিত আবেগের এবং স্বরক্ষেপের পক্ষেই সওয়াল করলেন। আবৃত্তিকে শিল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিনাকেশ সরকারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশ উঠতি বাচিক শিল্পীদের যথেষ্ট ভাবাবে এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে বলেই বিশ্বাস। শুধু বক্তব্যেই তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর গম্ভীর ও শ্রুতিমধুর কন্ঠে উচ্চারিত পঙ্কজ সাহার একটি কবিতা দিয়েই অনুষ্ঠানের মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়।

অনুষ্ঠান পরিচালনায় পঙ্কজ সাহার সাথে ওপার বাংলার ডালিয়া দাসের স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাঞ্জল সহযোগিতা বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। ডালিয়া দাস নিজেও একজন দক্ষ বাচিক শিল্পী। আবৃত্তিকারদের মধ্যে আরও যাঁরা বিধান চন্দ্র পালের কবিতা পাঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের আনন্দ দিলেন- সর্বাণী রায় চৌধুরী, সুজয় রায় চৌধুরী, শ্রীজা চন্দ, দীপক সেনগুপ্ত, তাপস চৌধুরী, শিখা বিশ্বাস, রত্না দাশগুপ্ত, জয়ন্ত ঘোষ, অভিরূপা ভাদুড়ি, রৌহিন বন্দোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও 'একা নই' নামে শনিবারের বৈঠকের একটি বিশেষ প্রকাশনাও আত্মপ্রকাশ করল আজকের অনুষ্ঠানে যার সম্পাদক বিধান চন্দ্র পাল, বিশেষ উপদেষ্টা পঙ্কজ সাহা এবং প্রকাশক ইনস্টিটিউট অফ অডিও ভিসুয়াল।

অনুষ্ঠানে বা সভায় অংশগ্রহণ শুধুমাত্র কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তার নেপথ্যে দীর্ঘসময়ের লালিত-পালিত চিন্তাভাবনার প্রকাশ থাকে। দুই বাংলার বিশেষ কিছু মানুষের উদ্যোগে, অক্লান্ত পরিশ্রমে, ২৪শে জানুয়ারি ২০২০ শুক্রবারের সন্ধ্যায় শুধুই যে দুই বাংলার কবিতার রাখিবন্ধন হল তাই নয়, বিগত ষোল সতেরো বছর ধরে 'একক মাত্রা'র আড্ডায় সংকীর্ণ রাজনীতির সীমানাকে নস্যাৎ করে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দুই বাংলার চিন্তাভাবনার জগৎকে কাছাকাছি রাখার, পাশাপাশি রাখার, বেঁধে-বেঁধে রাখার ভবিষ্যতের অঙ্গীকার আরও জোরদার হল। ২০১৯-এর 'একক মাত্রা'র জুলাই মাসের 'ফিরে দেখা' সংখ্যায় বিধান চন্দ্র পাল মহাশয়ের প্রচ্ছদ নিবন্ধ এই 'নিরবচ্ছিন্ন পথচলা'রই স্মারক। একক মাত্রার 'বাঙালির আত্মপরিচয়', 'গ্রামবাংলা', 'উত্তরবঙ্গের কথা',  'আঞ্চলিকতার বহুরূপ', 'অন্য রবীন্দ্রনাথ', 'সীমান্ত দেশ' সংখ্যাগুলিতে দুই বাংলাকে অভিন্নহৃদয় হিসেবে তুলে ধরার সৎ প্রচেষ্টা অবশ্যই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।