Monday, 6 November 2017

ও বাংলা একাদেমির কত্তারা!

অন্ধজনে দেহ আলো
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

কলেজ স্কোয়ারে 'লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চ' আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন মেলা



এটাই হয়তো হওয়ার ছিল। নন্দন চত্বরের লিটল ম্যাগাজিন মেলার সঙ্গে তিন বছর আগে জুড়লো ‘সাহিত্য উৎসব’ ট্যাগ। এ বছরের (২০১৭) মেলায় এক অংশকে পাঠানো হল রাস্তা পার করে মোহরকুঞ্জে। শুধু টেবিলগুলো বাদে বাংলা একাদেমির লিটল ম্যাগাজিন মেলার গাত্র থেকে লিটল ম্যাগাজিনকুলই খসে পড়ল। পাত পেড়ে বসলেন সাহিত্যের বড় অঙ্গনের কুশীলবেরা। তাঁদের বাজার ও খ্যাতি নিভু নিভু, পাঠকও নাকি কমে যাচ্ছেন, অতএব সওয়ার হও লিটল ম্যাগাজিনের ঘাড়ে। বেশ তো! কিন্তু ঘাড়ে চেপে বসে ঘাড়টাই মটকাতে চাইলে তো বাপু তোমাদেরও কিছু থাকে না।

সে যাক গে। মোদ্দা কথা, নন্দন প্রাঙ্গণে লিটল ম্যাগাজিন মেলা আর না। কাউকে না জানিয়ে, গোপনে, প্রায় ষড়যন্ত্র করে বাংলা একাদেমির কত্তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন বলে দুর্জনেরা বলছেন। কারণ, লিটল ম্যাগাজিন বড় বেয়ারা। তারা বাজারি সাহিত্যিকদের পাত্তাই দেয় না। ক্ষমতার লোকেদেরও নয়। আর বাজারি সাহিত্যর এখন যেহেতু সাড়ে বারোটা অবস্থা তাই তাদের উপায় দুটি – এক, লিটল ম্যাগাজিনের আশ্রয়ে যদি কিছু করা যায়; দুই, নচেৎ, লিটল ম্যাগাজিনেরই বারোটা বাজাও যাতে পড়াশোনার পরিসরে শূন্যতা তৈরি হয়, তখন আবার তেনাদের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। তো, তাঁরা দ্বিতীয় পথটিকেই সাব্যস্ত করেছেন। ভাগাও লিটল বংশোদ্ভবদের ওকাকুরায়।

সে না হয় হল। স্বাভাবিক, পাঠকেরা খুব বিপদে পড়বেন। লিটল ম্যাগাজিনের আর কী! তারা তো পুরুলিয়া থেকে কুচবিহার সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন। প্রায় সমস্ত জেলায় এখন লিটল ম্যাগাজিন মেলা। বইমেলা উঠে যাচ্ছে, তার জায়গা নিচ্ছে লিটল ম্যাগাজিন মেলা। কিন্তু কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে মূলত পাঠকের যাতায়াতের সুবিধার জন্য যে লিটল ম্যাগাজিন মেলাটা গত ১৯ বছর ধরে নন্দন চত্বরে হয়ে আসছে, তাকে আপনারা মানে বাংলা একাদেমি এইরকম নিষ্ঠুরভাবে গলা টিপে মারবেন তা সত্যি কেউ ভাবতেও পারেনি। আসলে, আপনারা ভাবছেন, পাঠকদের ব্যারিকেড করে দিতে পারলেই আপনাদের উদ্দেশ্য সফল হবে, লিটল ম্যাগাজিন মুখ থুবড়ে পড়বে।

ও মশাইরা, আপনারা লিটল ম্যাগাজিন থেকে এখনও কয়েক যোজন পিছনে। আপনাদের হাতে পুলিশ আছে, আইন আছে, পয়সা আছে কিন্তু পাঠক নেই। আমাদের পাঠক আছে, আমরা সেখানেই জিতে গেছি। আপনারা মারতে পারেন কিন্তু অমরত্ব কেড়ে নিতে পারেন না। আপনারা ব্যারিকেড তৈরি করুন, আমাদের আটকান। আমাদের লেখা ও পত্রগুলি সব অদৃশ্য পরমাণু শক্তির মতো আপনাদের অলক্ষে পাঠকের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে পৌঁছে যাবে অনিবার। কারণ, আপনারা জানেন না যে আপনারা অন্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, সেই আমাদের সৌভাগ্য।    

Wednesday, 1 November 2017

বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন?

যেতে পারি কিন্তু কেন যাব
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


গত বছর থেকেই শোনা যাচ্ছিল, ২০১৮ সালের কলকাতা বইমেলা মিলনমেলা প্রাঙ্গণে হবে না। খোলসা করে তেমন ভাবে কেউ কিছু না বললেও আকারে-ইঙ্গিতে বেশ স্পষ্ট ছিল। অবশেষে তা স্পষ্ট হল। গত বেশ কয়েক বছর ধরে কলকাতা বইমেলায় প্রতিটি দিন ‘একক মাত্রা’র টেবিলে বসে বসে পর্যবেক্ষণ করতাম মেলার হাল-হদিশ। উঠে বেরিয়ে, চক্কর মেরেও দেখে নিতাম, চেখে দেখতাম কী চলছে চারপাশে। সে এক কেলোর কীর্তি!

আমরা যারা লিটল ম্যাগাজিন করি তাদের দুর্ভোগ ছিল পোয়াবারো। দরখাস্ত জমা দেওয়ার দিন থেকে মেলা শুরুর দিন পর্যন্ত এক গভীর আশঙ্কা, কড়া ধমক, কর্তাদের উন্নাসিকতা ও লাল চোখ দেখতে দেখতে মেলা প্রাঙ্গণে এসে তবে বোঝা যেত যে আমরা অবশেষে এবারে জায়গা পেয়েছি। বিনি পয়সার ভোজ তো! তাই গুটিয়ে বসে থাকুন, নট নড়নচড়ন নট কিচ্চু!

লিটল ম্যাগাজিনের টেন্ট হল এক কোণে তো পিছনে টিভি চ্যানেলের ডিজে বক্স আর তার ত্রাহি মধুসূদন আওয়াজ। ঠেসাঠেসি, এর ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে, একে মাড়িয়ে তাকে মাড়িয়ে উদ্বাস্তু শিবিরের করুণ আস্তানা। টেন্টের একপাশে পুলিশ মোতায়েন, কারণ এই লিটল ম্যাগাজিনওয়ালারাই গণ্ডগোল পাকায় সবচেয়ে বেশি। তা সেই উদ্বাস্তু শিবির থেকে বেরলেই আপনার চোখে পড়বে সরষের তেল, সোনার গহনা, টিভি চ্যানেল আর হরেকরকম্বা সব স্টল যেখানে আপনার মাসের বরাদ্দগুলো জুটে যেতে পারে। সে এক ‘এনজয় গুরু মেলা’। আমার প্রস্তাব ছিল একটি ‘বিনোদন মেলা’ হোক যেখানে সংসারের টুকিটাকি থেকে সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকা সব পাওয়া যাবে (সঙ্গে কিছু বইও)। তো তা হল না, বইমেলা সেই মর্যাদা পেল। সেলেব গন্ধে, পণ্য আকুলতায়, রসনা তৃপ্তিতে বইমেলা থিকথিক। লেখালিখি ও পাঠের সঙ্গে বইমেলা তার নাড়ির যোগ হারাল।

লিটল ম্যাগাজিন তো সেই নাড়ির যোগ। নীরব সাধনা। মেধা, পরিশ্রম ও সময়ের এক আকুল নিবিড় গ্রন্থি। বইমেলায় থাকা মানে তার অশেষ যন্ত্রণা। কোনও পাঠক টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছেন, কর্ণকুহরে ক্রমাগত ঢুকছে জগঝম্প তাল আর বিকট চীৎকার। কিছু বলতে চাইছেন তো শোনার উপায় নেই। বহু লিটল ম্যাগাজিন তাদের সারা বছরের পত্রিকাগুলি নিয়ে অপেক্ষা করতেন এই বইমেলার জন্যই। কেউ কেউ বইমেলা উপলক্ষেই বের করতেন তাদের পরিশ্রম জাত সংখ্যাগুলি। তালেগোলে, ঝংকারে, উল্লাসে সব যেন মাটি। ভিআইপি’রা আসবেন, তাই আপনি, এই গেট নয়, ওই গেট দিয়ে আসুন। ক্রমশ মেলাটাই হয়ে দাঁড়াল এক বিকট উল্লাস! আপনি তো লিটল ম্যাগাজিন, আপনার টেবিলে বই কেন? তাহলে মশাই, বইমেলায় সরষের তেল কেন? কেউ কেউ তার মধ্যেই খুঁজে নিলেন তাঁদের প্রিয় বই ও লিটল ম্যাগাজিনগুলি, কিন্তু সে এক যুদ্ধের মতো।

যারা নিবিড় পাঠক, আজ তাঁদের বড় অংশটাই লিটল ম্যাগাজিন ও তাদের প্রকাশনার পাঠক। এঁরাই তাঁদের পছন্দের বইগুলি খোঁজেন ও কেনেন। অনেকে অবশ্য বাধ্যত পাঠ্যবই ও তার রেফারেন্সের খোঁজ করেন। সে বাদে আজ বাংলা ভাষার নিবিড় পাঠক তো লিটল ম্যাগাজিনেরই পাঠক। তার কী দায় পড়েছে ‘এনজয় গুরু মেলায়’ এসে সময় ও মননের ক্ষতি করার?

তাই, আমরা লিটল ম্যাগাজিনওয়ালারা, বরং বিদায় নিই এই প্রাঙ্গণ থেকে। এখন লিটল ম্যাগাজিনের যুগ। চারপাশে, জেলায় জেলায়, অজস্র লিটল ম্যাগাজিন মেলাই আজকের বাস্তবতা। সেই হোক আমাদের আশ্রয়।   

Tuesday, 24 October 2017

ডেঙ্গি নেই মানে ডেঙ্গি নেই!!

শতং বদ মা লিখ
অরুণাভ বিশ্বাস


— তাকে তুমি যে নামেই ডাক সে নেই এই বাংলায়। কি নাম তার জানতে চেও না।
— কোথায় থাকতে পারে?
— এই ধর ৩৫°উ অক্ষাংশ থেকে ৩৫°দ অক্ষাংশের মধ‍্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০০ফিট উচ্চতার মধ‍্যে।
— আমাদের রাজ‍্যের সবটাই তো প্রায় তাই।
— তো? বলছি না সে নেই। আমি বলছি নেই, মানে সে নেই।
— আরে বাবা, কে সে বলবে তো।
— তার অনেক নাম। দাস ব‍্যবসার রমরমার যুগে সে যখন সুদূর আফ্রিকা থেকে দাসবাহিত হয়ে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে এসে পৌঁছল তখন সেখানকার বাসিন্দারা আফ্রিকার সোয়াহিলি উপজাতির ভাষা ধার করে তার নাম দিয়েছিল ডিঙ্গা (Ka-dinga pepo ~ দুষ্ট আত্মা দ্বারা সৃষ্ট রোগ)। তারপর তো ১৮২৮এর পর থেকে সাহেবদের দেখাদেখি আমরা একে ডেঙ্গু নামে ডাকতে শিখলাম। কিছুদিন হল এটাও জেনে ফেলেছি ঠিক নাম নাকি ডেঙ্গি। ওদিকে আবার সেই ১৭৮০ সালের ফিলাডেলফিয়ার মড়কের উপর ১৭৮৯ সালের এক রিপোর্টে মার্কিন সাহেব Benjamin Rush রসিকতা করে তার নাম রাখলেন হাড়-ভাঙ্গা জ্বর (break-bone fever)। এ নামটা এখনও চলে।
— বাপ্‌ রে, নাম শুনেই ভয় পাচ্ছি, পালাই।
— আরে পালাবে কোথায়? ঐ যে বললাম ৩৫°উ থেকে ৩৫°দ অক্ষাংশের বাইরে পালাতে পারলে যাও।
— কেন বল দেখি?
— আরে এটাও জানো না! সেই ১৯০৫ সালে T L Bancroft প্রমাণ করেছিলেন Aedes aegypti  বা স্ত্রী-এডিশ মশার কামড়ে এই রোগ ছড়ায় আর এই মশা পৃথিবীর মধ‍্যে প্রধানত ক্রান্তীয় বিষুবীয় অঞ্চলেই দেখা যায়।
— যা বলছেন তাতে তো এ রাজ‍্যে ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।
— একদম তা নয় হে বাচাল ছোকরা। আমাদের রাজ‍্যে এডিশ মশা নেই কারণ আমাদের রাজ‍্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০০ ফিটের বেশি উঁচুতে হিমালয়ের কোলে ৩৫°উ অক্ষাংশের উত্তরে এবং ৩৫°দ অক্ষাংশের দক্ষিণে অবস্থান করে। তাই ডেঙ্গিটা এ রাজ‍্যে হবেটা কী করে শুনি?
ডেঙ্গির বাহক এডিশ ইজিপ্টাই মশা


এডিশ ইজিপ্টাই মশার পৃথিবী ব‍্যাপী বিচরণ ক্ষেত্র

সুধী পাঠক এতদূর পড়ে নিশ্চয়ই আমার ভূগোলের তথ‍্যজ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। আসলে আপনাদের‌ ঝটকা দেওয়াটা আমার উদ্দেশ‍্য নয়। কিন্তু যখন দেখি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব যে অবশ‍্যম্ভাবী সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ‍্য জেনেও রাজ‍্যের স্বাস্থ্য দফতর হাত গুটিয়ে বসেছিল তখন বিশ্বাস করুন নিজের‌ই ঝটকা লেগে যায়। ব‍্যাপারটা তথ‍্য দিয়েই বোঝানো যাক। তথ‍্য নিছক তথ‍্য তো নয়!

গত ২ জুলাই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা বিবৃতি দিয়েছিলেন যে ঐদিন পর্যন্ত ২০১৭ সালে সারা দেশে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ‍্যা ১৮৭০০র বেশি, যার মধ‍্যে কেরালা (৯১০৪) তামিলনাড়ু (৪১৭৪) এবং কর্ণাটক (১৯৪৫) শীর্ষ তিনটি রাজ‍্য। অন‍্যদিকে তুলনায় কম আক্রান্ত গুজরাট (৬১৬), অন্ধ্রপ্রদেশ (৬০৬) এবং পশ্চিমবঙ্গ (৪৬৯)। স্বয়ং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই বয়ান হয়তো এরাজ‍্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তাদের আত্মতুষ্টি এনে দিয়েছিল এবং তাঁরা ভূগোলের ক্লাস নাইনের জ্ঞান বিস্মৃত হয়েছিলেন। যার নিদারুণ ফল ভুগতে হল এ রাজ‍্যবাসীকে এবং কেন্দ্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সরকারি ওয়েবসাইট ঘোষণা করে বসল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশের ডেঙ্গি আক্রান্তের মোট সংখ‍্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম সারিতেই অবস্থান করছে -- মোট ২৭৮৭৯ জন রুগীর ৫৬৩৯ জন‌ই এরাজ‍্যের। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, এই দুই মাসের মধ‍্যেই এ রাজ‍্যে এমন কী ঘটে গেল যে পরিসংখ্যানের এই লাফ। একটু ঠাহর করলেই বোঝা যাবে জুলাইয়ের একেবারে শুরুতেই যে পরিসংখ‍্যান দেখানো হয়েছিল তখন যে রাজ‍্যগুলি ডেঙ্গিতে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল (কেরালা তামিলনাড়ু কর্ণাটক) সে সব রাজ‍্যে দঃ-পঃ মৌসুমী বায়ু আগে সক্রিয় হয় এবং বর্ষা আগে আসে। তাই ঐ রাজ‍্যগুলিতে ডেঙ্গির প্রকোপ আগে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরে দঃ-পঃ মৌসুমী বায়ু এ রাজ‍্যেও সক্রিয় হলে এখানেও ডেঙ্গির বাড়াবাড়ি হয়েছে। কিন্তু ভূগোলের এই সামান‍্য জ্ঞান যখন জানাই ছিল তাহলে প্রশ্ন উঠবে প্রধানত মরসুমী এই রোগ ঠেকাতে রাজ‍্যের পুরসভাগুলি ও জনস্বাস্থ‍্য দফতর আগাম সাবধানতা নেয়নি কেন? জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই আগাম সাবধানতা এবং সেই সাথে আক্রান্ত রুগীর চিকিৎসা নিয়ে কোনো রকম আগাম চিন্তাভাবনা বা পরিকাঠামো নির্মাণ কোনোটাতেই যে রাজ‍্য সরকার আগ্ৰহ দেখায়নি সেই অভিযোগ সহজে এড়ানোর উপায় নেই। কারণ আবার সেই পরিসংখ‍্যান। পূর্বোক্ত ঐ ওয়েবসাইটটিতে আর‌ও একটি তথ‍্য দেওয়া হয়েছিল। গত ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত এই বছরে এদেশে ডেঙ্গিতে মৃত ৬০ জনের মধ‍্যে এ রাজ‍্যর‌ই ২৩ জন এবং তা ভারতের সবকটি রাজ‍্যের মধ‍্যে সর্বাধিক। অন‍্যদিকে ঐ এক‌ই সময়ে কেরালা ও ওড়িশায় মৃতের সংখ‍্যা মাত্র ৯ করে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ডেঙ্গি মোকাবিলায় এ রাজ‍্যের আম‌ও গেছে ছালাও গেছে। যে পশ্চিমবঙ্গ জুলাইয়ের শুরুতে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ‍্যার বিচারে কেরালার ১৯গুণের‌ও কম ছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গ‌ই দুমাসের মাথায় শুধু ডেঙ্গিতে আক্রান্তের বিচারে প্রথম সারিতেই নয় মৃতের বিচারেও কেরালার সাড়ে ৬ গুণ এগিয়ে দেশের মধ‍্যে সেরা হয়ে বসে আছে। জুলাইয়ের শুরুতে আক্রান্তের বিচারে প্রথমে থেকেও কেরালা আগস্টের শেষে মৃত‍্যুহারকে কমাতে পেরেছে। পশ্চিমবঙ্গ কোনোটাই কমাতে পারে নি। অথচ এই দুমাসে কেরালায় কম বৃষ্টিপাত হয়েছে বা চারিদিকে কম জল জমা হয়েছে এমন তো আর নয়! অর্থাৎ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মশা নিধন ও নিকাশি সংস্কার করে রোগের প্রকোপ কমানো এবং চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে আক্রান্ত রুগীর মৃত‍্যুহারকে কমানো কোনোটাই এ রাজ‍্যের সরকার সময়মতো যে করে উঠতে পারেনি তা বেআব্রু হয়ে গেছে। এমনকি যেহেতু মহামারীর আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবকে সরকার স্বীকার করে নেয়নি সেহেতু ডেঙ্গি প্রতিরোধে সচেতনতা প্রসারের কাজ‌ও এ রাজ‍্যে বিশেষ চোখে পড়ছে না। তাই সরকারি অবহেলার সাথে জনসাধারণ ইচ্ছামতো ওষুধ কিনে খেয়ে, পুরোপুরি সুস্থ হ‌ওয়ার আগে কাজে বেরিয়ে এবং জমা জল রোধে নাগরিক কর্তব‍্য সম্পর্কে পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে পরিস্থিতি আর‌ও জটিল করে তুলছে। কিন্তু তাতে কী? ডেঙ্গি রুগীর বা ডেঙ্গিতে মৃতের ক্রমবর্ধমান সংখ‍্যা নিয়ন্ত্রণ করার অন‍্য উপায় রাজ‍্য সরকারের জানা আছে।

উপায়টি খুবই সহজ — যাকে বলে আক্ষরিক অর্থে সংখ‍্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা। অত‌এব যত পার ডেঙ্গির প্রকোপ কম করে দেখাও। তাই প্রবীণ চিকিৎসকদের অনেকের‌ই অভিযোগ বেসরকারি প‍্যাথোলজিকাল ল‍্যাবরেটরিগুলিকে ভয় দেখানো হচ্ছে মেডিকেল রিপোর্টে যাতে ডেঙ্গি না লেখে, ডাক্তাররাও ডেথ সার্টিফিকেটে ডেঙ্গি লিখতে ভয় পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের বাঁচার উপায় হল FUO — এটি কল্পবিজ্ঞানের UFO (unidentified flying object) বা উড়ন্ত চাকীর অক্ষর বিভ্রাট নয়। এটি হল Fever of Unknown Origin যাতে আক্রান্ত একজন রুগী হলেন UFU (Unidentified Fever Unit)। এই FUO হল আমাদের বহু দিনের চেনা 'অজানা জ্বর'। কত চেনা অথচ নামেই অজানা! ১৯৬১ সালে Petersdorf এবং Beeson প্রবর্তিত এই পরিভাষাটিকে এ রাজ‍্যের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন স্বাস্থ্য অধিকর্তারা অধস্তন ডাক্তারদের সেই বাম আমল থেকেই পাখি পড়ানো মতো আয়ত্ত করিয়ে আসছেন। কিন্তু হায়, পরিবর্তনের পরেও সেই ট্র‍্যাডিশন আজ‌ও চলছে! ইদানিং আবার FUO না লিখে গালভরা মেডিকেল টার্ম লেখার চল হয়েছে। কিছু তো পরিবর্তন হল! কাজেই সংবাদপত্রের পাতায় অনেক কিছুই পড়া গেলেও, শোকার্ত বাবা-মার হাহাকার শুনতে পেলেও, অসহায় ডাক্তারদের আফশোস দেখলেও, হে সুধী পাঠক, শতং বদ ডেঙ্গি মা লিখ। লিখলেই তা পরিসংখ‍্যান। আর ডেঙ্গির পরিসংখ‍্যান এ রাজ‍্যে ৩১শে আগস্টের ঐ টনক নড়ানো পরিসংখ্যানের পর থেকে কার্যত নিষিদ্ধ। তাই নিষিদ্ধ ব‍্যাপারে আমি আর কথা বাড়ালাম না। গদ‍্যকারের যদি দশ পাতা লাগে, পদ‍্যকারের লাগে দশ লাইন — এই আপ্তবাক‍্য মাথায় করে ডাক্তার তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্যের অনবদ‍্য ছড়াটি তুলে দিয়ে ক্ষান্ত হলাম।


।ডে...।

অজানা রোগে ভুগছে শহর, গঞ্জ গাঁ ও পরগণা,
হাসপাতালে বেড়েছে ভিড় না হোক ধরো চারগুনা।
টেস্ট করালেই ডাক্তারেরা চমকে বলেন ‘পজিটিভ!’
কোন সে রোগের প্রশ্ন হলেই মাথা নাড়েন, কাটেন জিভ।
চেপে ধরলে চাপা গলায় বলেন ‘সওয়াল নোকরি কা,
নাম বলাতে বারন আছে, দোহাই অনুচক্রিকার।
বরঞ্চ নিন রিকুইজিশান, ব্লাড ব্যাঙ্কে যান ছুটে,
রোগ গিয়েছে অনেক গভীর, টান পড়েছে প্লেটলেটে।'
চমকে বলি 'ওমা সেকি, তার মানে তো এটাই ডে...।'
অমনি শুনি ধমক আসে, ‘অ্যাই ব্যাটা তুই বলার কে?’
ঘুরেই দেখি দাঁড়িয়ে আছেন পাড়ার কিছু বোম্বেটে
(তফাত এঁরা করতে পারেন প্লেটলেটে আর কাটলেটে)
আমার কাছে এসে বলেন '‘ডে’ বলেছিস ওটাই ব্যাস।
আগ বাড়িয়ে ধরে নেওয়া , বড্ড তোদের বদভ্যাস!
পজিটিভ তো কি হয়েছে, ওটা হলেই সব নাকি?
এসব শুধু ল্যাবরটারির মিথ্যে কথা আর ফাঁকি।
‘ডে’ দিয়ে শুরু কোনো অসুখ নিষিদ্ধ এই রাজ্যতে,
এত করে বোঝাই তোদের, আনিস না তা গ্রাহ্যতে!'
আমি বলি করজোরে , ‘এসব জটিল ডাক্তারি,
আপনারা কোন কেতাব পড়ে পেলেন এত খোঁজ তারই?’
বোম্বেটেরা ধমকে বলেন ‘ডাক্তারি আর জটিল কই?
সাতখানা দিন সময় দিলে ইচ্ছে যেটা তা শিখবই।
প্লেটলেট তোর যতই লাগুক , পজিটিভ হোক আই জি এম,
নামটি বলার করবে সাহস নেই রে কারো সে এলেম।’
আমি বলি ‘শিক্ষে পেলেম, এবার করুন অনুমতি,
প্রিয়জনের হালত খারাপ, ব্যাঙ্কে ছুটি দ্রুতগতি।’
ওরা বলেন , ‘যা ছোট গিয়ে , একটা কথাই মাথায় রেখে,
জ্বরজ্বালাতে এ রাজ্যতে ভুলেও যেন বলিস না ‘ডে...' !’

আর্যতীর্থ

Saturday, 30 September 2017

নিউটন - এক অকথিত কাহিনি



নির্বাচনী মসকরা ও বর্বরতার কথা
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


নূতন কুমার। বাবার দেওয়া নাম। বড় হয়ে নূ’কে পালটে করলেন ‘নিউ’ আর ‘তন’কে ‘টন’- নিউটন। সেই থেকে তিনি নিউটন কুমার। সরকারি চাকরি পাওয়ার পর বাবা-মা নিয়ে গেলেন পাত্রী দেখাতে। গিয়ে দেখেন পাত্রীর বয়স ষোল। বেঁকে বসলেন, নাবালিকা বিয়ে করবেন না। এ হেন নিউটন কুমার এবার চলেছেন দণ্ডকারণ্যের মাওবাদী অঞ্চলে লোকসভা নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে।

গল্পটা বলে দিলে ছবি দেখার উত্তেজনাটাই মাটি হবে। বলার এইটুকুই, যে গ্রামের স্কুলে নিউটন অবশেষে পৌঁছলেন ভোট নিতে, সেই গ্রাম ও স্কুল তখন ভগ্নস্তূপ। গ্রামের মানুষেরা আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি রিলিফ ক্যাম্পে আর স্কুলটি পড়ে আছে ভাঙ্গাচোড়া চেহারা নিয়ে। কেন? নিউটনের করা এই প্রশ্নে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসারের উত্তর, ও নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন, আপনি ডিউটিতে এসেছেন আমরাও ডিউটি করছি। সঙ্গে থাকা স্থানীয় মেয়েটি জানিয়ে দিল, এখানে খনির কাজ হবে, তাই মাওবাদী দমনের নাম করে নিরাপত্তারক্ষীরা গ্রামটিকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ভোট পর্বের আয়োজন শুরু হয়। বেলা গড়ায়। একটি মানুষকেও দেখা যায় না ভোট দিতে আসতে। ওদিকে ডিআইজি ফোনে জানান দেন, বিদেশি এক টেলিভিশন crewকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আসছেন মাওবাদী অঞ্চলে নির্বাচনী পর্ব কত শান্তিপূর্ণ ভাবে হচ্ছে তা দেখাতে। আধা-সামরিক বাহিনী নেমে পড়ে তৎক্ষণাৎ। বন্দুকের ডগায় ভোটার ধরে আনতে। বাকীটা দেখে নিন ছবিতে।

সরকারি অফিসের এক সামান্য কেরানি নিউটন তাঁর স্বাভাবিক ডিউটির খাতিরেই বিধি অনুযায়ী যে ভাবে নির্বাচন সমাধা করার কথা, সে ভাবেই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতীয় নির্বাচনী মসকরার বীভৎস মজা এই যে, তা বাস্তবের মাটির সঙ্গে একেবারেই মেলে না। পদাধিকারীরাও চান না তা মিলুক। তাই যা হবার তাই হল। লাঞ্ছিত, প্রহৃত নিউটন অবশেষে প্রাণে বেঁচে ফিরলেন। মাঝখানে ঘটে গেল যা ঘটে, যা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে।

অমিত মুসকারা পরিচালিত ‘নিউটন’ ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার এই করুণ ও হাস্যকর চিত্রটি দ্ব্যর্থহীন ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছে। নিউটনের ভূমিকায় রাজকুমার রাও অনবদ্য অভিনয়ে এক সাধারণ মানুষের ভেতরের যন্ত্রণা ও কিছু করার তাগিদকে তুলনারহিত ভাবে পেশ করেছেন।

এই ছবিটি থেকে যাবে বালকের সেই দ্বিধাহীন প্রশ্নবাণের মতোঃ রাজা তোর কাপড় কোথায়?

Tuesday, 26 September 2017

ডাক্তারদের আবেদন

West Bengal Doctors' Forum Leaflet for the People of West Bengal

ডাক্তারদের কাছ থেকে খোলা চিঠি

সংবাদপত্রের খবর, বিগত সাত-আট মাসে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসকের ওপর শারীরিক আক্রমণের সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। অবশ্য অধিকাংশ নিগ্রহ খবরের কাগজ-টিভিতে আসেনা, তাদের ধরলে অবস্থা আরও অনেক খারাপ, এক বছর আগের তুলনায় তিনগুণ তো বটেই।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম আপনাকে শুধু দেখাতে চাইছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ঠিক কতটা লাভ হল।

এবছর ফেব্রুয়ারিতে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তাদের খুব ধমকালেন, টিভিতে তা সরাসরি সম্প্রচার হল। বেসরকারি হাসপাতালের ত্রুটি তাতে কতটা কমল সে ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রক কোনো পরিসংখ্যান পেশ করে নি, কিন্তু সেদিন থেকে আজ ডাক্তারদের ওপর আক্রমণ ঘটেই চলছে। শুধু বেসরকারি ডাক্তাররা মার খাচ্ছেন তা নয়, সরকারি ডাক্তাররা সংখ্যার বিচারে বেশিবার আক্রান্ত হয়েছেন।

কারা মারছেন ডাক্তারদের? ক্ষুদ্ধ রোগী নেই যে তা নয়, কিন্তু প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের ন্যায্য বা অন্যায্য বিক্ষোভের পর যখন ভাঙ্গচুর মারধোর শুরু হচ্ছে তখন রাশ চলে যাচ্ছে অন্য লোকেদের হাতে। আর আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রোগীরাও—সেদিন জোকা-র সরকারি হাসপাতালে রোগীমৃত্যুর পরে একদল আক্রমণকারী আইসিইউ-তে চড়াও হয়ে এক বয়স্কা রোগিণীর অক্সিজেন-স্যালাইন খুলে তাঁকে মেরে ফেললেন। অতএব ডাক্তারের ওপরে রোগী ক্ষেপে গেছে, কেবল এমনটা নয়। একবার ভাঙ্গচুর শুরু হলে গুণ্ডা আর রাজনীতিতে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে আগ্রহীরা আসছেন, তোলাবাজরাও বাদ নেই। বর্বর আক্রমণ হচ্ছে ডাক্তার-নার্স থেকে অন্য রোগীদের ওপরেও। সরকারি জিনিসপত্রের ক্ষতি হচ্ছে, সরকারি কর্মীরা কাজে বাধা পাচ্ছেন, রোগীরা হয়রান হচ্ছেন—সরকার ফিরে দেখছেনও না্। বেসরকারি হাসপাতাল হোক আর সরকারি, অপরাধীরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের নামে কেস নিচ্ছে না, নিলেও ধরছে না। সন্দেহ হয়, প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে কী নির্দেশ আছে? অন্যদিকে, বড় মিডিয়া দিনের পর দিন অপরাধীদের হিরো বানিয়ে দিচ্ছে, আর ডাক্তারদের ভিলেন।

এর ফল ফলতে শুরু করেছে। কিছু ডাক্তার চাকরি ছেড়েছেন, কিছু ডাক্তার বিশেষ দায়িত্ব ছেড়েছেন। আজ ডাক্তারদের জন্য সরকারি চাকরি দেবার বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া কম, চাকরিতে যোগদান আরও কম। সরকারি স্বাস্থ্যপরিষেবায় ডাক্তারের অভাব চিরকালের, কিন্তু এবার তা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার উপক্রম। সরকার বয়স্ক ও রোগগ্রস্ত ডাক্তারদের রিটায়ার না করিয়ে আর বন্ড দিয়ে সদ্য-পাশকরা ডাক্তারদের তিনবছর গ্রামে পাঠিয়ে ডাক্তারের অভাব কমিয়ে দেখাচ্ছেন। কিন্তু এঁদের দিয়ে দায়ঠেলা হয়, মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজটা দায়ঠেলা করে হয় না।

কিন্তু এ হল সমস্যার চূড়া, আরও গভীরে তার ডালপালা, শিকড়। আসল কথাটা হল, ডাক্তার এখন চিকিৎসা করতেই ভয় পাচ্ছেন। মনোযোগ না দিয়ে রোগী ঠিকভাবে দেখা যায় না। এতদিন বেশ কিছু ডাক্তার ছিলেন যাঁরা পয়সাটাকেই মুখ্য করে দেখতেন, রোগীর কাছ থেকে কেমন করে পয়সা হাতানো যায় তাই ভাবতেন। তাঁরা ডাক্তারি পেশাটাকেই জনমানসে অনেক হেয় করেছেন। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে সবথেকে রোগীদরদী ডাক্তারও রোগী দেখার সময় পুরো মনোযোগ সেদিকে দিতে পারছেন না; ভাবছেন, কী করলে আক্রমণ আসবে না, প্রেসক্রিপশনে কী লিখলে পরে রোগীর শুভার্থী-ভোটপ্রার্থী হঠাৎ-আপনেরা তাঁর দরজায় হানা দেবে না, আদালতে কোন কথাটা মান্য হবে। এমন পরিবেশে ভাল চিকিৎসা অসম্ভব। রাতবিরেতে শহরে-মফস্বলে ডাক্তার আর বাড়ি গিয়ে রোগী দেখছেন না, কেন না যথাসাধ্য চেষ্টার পরও যদি খারাপ কিছু ঘটে তবে রোগীর বাড়ির লোক হয়তো ছেড়ে দেবেন, কিন্তু পাড়ার দাদারা ছাড়বেন না—জনদরদী সাজার সহজ রাস্তা এখন ডাক্তার পেটানো, আর পুলিশ এব্যাপারে ঠুঁটো জগন্নাথ।

টাকাকড়ি যত বেশি মানুষের মূল্যবিচারের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে, লোকের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেবা করার মতো ডাক্তার ততো কমেছে। তারপর এল ডাক্তারের জন্য ক্রেতাসুরক্ষা আইন, বাড়ল চিকিৎসা-গাফিলতির মোকদ্দমা। ডাক্তারকে বাধ্য হয়েই সতর্ক হতে হল। সামান্য উপকরণে রোগীর সাধ্যমত চিকিৎসা করার দায় নেওয়া আর সম্ভব হল না। বিজ্ঞানের নিয়মেই সব রোগী ভাল হবে না, তাঁরা যদি আদালতে অভিযোগ করেন তো ডাক্তার রোগীর কথা ভেবে কম পয়সায় চিকিৎসা করিয়েছেন এমন কথা জজসাহেব মানবেন না। শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত চিকিৎসা না-করানোর অভিযোগে ডাক্তারের সাজা হবে। ফলে ডাক্তারদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করিয়ে, দামী ওষুধ না দিয়ে, চিকিৎসার উপায় রইল না। আর সাধারণ লোক ভাবলেন, নির্ঘাত ল্যাবরেটরির কমিশন খেয়ে বেশি পরীক্ষা করছে, ওষুধ কোম্পানির পয়সা নিয়ে দামি ওষুধ লিখছে! যেহেতু কিছু ডাক্তার (যাদের অনেকেই ভূয়ো ডাক্তার বলে ধরাও পড়েছেন) এসব করেন, সেহেতু গোটা পেশাটাই কালিমালিপ্ত হল। এভাবে রোগী আর ডাক্তার—উভয়েরই ক্ষতি বেড়ে চলল, পাল্লা দিয়ে বাড়ল অবিশ্বাস।

কেন এমন হল?  এর উত্তর পেতে গেলে গত আড়াই-তিন দশকের খবরের কাগজের পাতাগুলো উলটে দেখতে হবে। ১৯৯০ সালেও কলকাতায় বড় কর্পোরেট হাসপাতাল ছিল না বললেই চলে। সেই সময় সমস্ত খবরের কাগজ সরকারি হাসপাতালগুলোর দোষ দেখাতে উঠেপড়ে লাগল। নোংরা, পরিষেবা খারাপ, ব্যবহার খারাপ। এর পুরোটা অসত্য, তা নয়। সরকার এব্যাপারে কিছু করলে, দোষ শোধরাত। কিন্তু তা হল না। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ কষ্ট করেও নার্সিং হোমে যাওয়া অভ্যাস করে ফেললেন, একটু পয়সাওলারা গেলেন চেন্নাই-মুম্বাই-দিল্লী, আর বড়লোকেদের জন্য অল্প কিছু দামী জায়গা তো ছিলই। ক্রমে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলে সামাজিক মর্যাদাহানি হতে শুরু করল। ততদিনে একে একে অনেকগুলো বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতাল এসে গেছে কলকাতায়। এবার লোকে যেন বুঝে গেল, সরকারি হাসপাতাল মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। ঝাঁ-চকচকে হাসপাতালগুলো কোনো কাজ করেনি, কেবল পয়সা নিয়েছে, তাও নয়। কিন্তু অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যও যে মানুষের পাওনা একটা দাবি, তা না মেটানোর সংকটবোধ আর মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্তের মননে ঠাঁই পেল না। প্রাইভেট স্কুল আর প্রাইভেট হাসপাতালের রমরমাতে অধিকার-এর ব্যাপারটা হারিয়ে গেল।

পড়ে রইলেন গ্রাম-মফস্বলের মানুষ এবং শহরের হতদরিদ্রজন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বর্তমানে কী পারে আর কী পারে না, কতটা চিকিৎসা পরিষেবা কোথায় পাওয়া সম্ভব, সেটা তাঁরা জানেন না। ফলে এঁদের দিয়ে ডাক্তারের মুখে বিষ্ঠা মাখানো মারধর করানো সম্ভব, কিন্তু যথার্থ পরিষেবার জন্য চিন্তা করে দাবী রাখা বা আন্দোলন করা প্রায় অসম্ভব। আর এঁদের পাশে শহুরে মধ্যবিত্তের দাঁড়ানোর বাস্তবভূমি নেই, কেননা তাঁরা সরকারি পরিষেবা নেন না, তা নিয়ে তেমন ভাবিত নন। অন্যদিকে সরকারি চিকিৎসকদের হয় আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা হয়েছে বা করার চেষ্টা হয়েছে, অথবা তাড়ানো হয়েছে।

আমাদের স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারের কথা বলেন সব দল, অথচ ক্ষমতায় গেলে সেসব অধিকার দেন না। তাঁদের একটা আড়াল চাই। ভারতে ধনীদের সেবা করতে চাইলেও দরিদ্র ও সাধারণ মধ্যবিত্তের ভোটেই জিততে হয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দায়িত্ব সরকারের কাঁধ থেকে নামাতে চাইলে, সেখানে গোপনে বড় ব্যবসাদারদের লাভের পুরো সুযোগ করে দিতে চাইলে, আর সেটা করতে গিয়ে মানুষের ক্ষোভের মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইলে মানুষের চোখের সামনে একটা কাকতাড়ুয়া-শ্রেণীশত্রু খাড়া করতে হয়। ডাক্তার সেই কাকতাড়ুয়া, কেন না তাকেই চিকিৎসাক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে দেখা যায়। আর ডাক্তারই সেই শ্রেণীশত্রু, কেন না এই গরীবের দেশে সে তুলনায় অবস্থাপন্ন। অতএব অসুর নির্মাণ, হাতে খড়্গ, গলায় স্টেথোস্কোপ, পেশায় রক্তচোষা।

কিছু ক্ষমতাবান ও ক্ষমতালিপ্সু মানুষ ও দল কাকতাড়ুয়া-শ্রেণীশত্রুর ওপর মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে, ডাক্তারের চিকিৎসার ভুল-ঠিক বিচার করছে তারা, হাতেগরম শাস্তি দিচ্ছে, মানুষ খুশি হছেন, বা আতঙ্কে নিশ্চুপ। ক্ষমতাধরদের হিসেব সোজা। মানুষকে স্বাস্থ্যের অধিকার দেওয়া কঠিন কাজ, কিন্তু মানুষ সেটাই চায়। অতএব বানিয়ে দাও হাসপাতাল-ইমারত, টিভি-তে খবরের কাগজে ঘোষণা করে দাও চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, রোগী বুকে বড় আশা নিয়ে যাক হাসপাতালে। হাসপাতালের দেওয়াল জুড়ে লিখে রাখো, সকল ব্যবস্থা আছে। ডাক্তারের মুখ থেকে সে যেন প্রথম শোনে, বেড নেই, ওষুধ নেই, ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের ইত্যাদিও খুব কম। সে নিজের মতো করে বুঝে নেবে সরকারের দোষ নয়, ডাক্তারের দোষ। আর রোগী যদি নাও বোঝে, আশেপাশে শুভার্থী-ভোটপ্রার্থীরা আছেন, তাঁরা গলার জোরে বা গায়ের জোরে রোগীর জন্য বেড আদায় করবেন, তাঁর সঙ্গে সুরে সুর না মিলিয়ে অসহায় রোগী করবেই বা কী?

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম মনে করে ডাক্তার ও রোগীর স্বার্থ এক ও অভিন্ন—রোগকে প্রতিরোধ করা, রোগ হলে তাকে সারানো, সারাতে না পারলে যতটা সম্ভব আরাম দেওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও সবকিছু নিশ্চিত করে বলে দিতে পারে না। তাই ডাক্তারকে বিশ্বাস না করে রোগীর উপায় নেই। অপরপক্ষে, ডাক্তারেরও রোগীকে সারানোর সাধ্যমতো চেষ্টা না করে উপায় নেই, নইলে সে নিজের কাছেই প্রত্যহ মরে যাবে, প্রত্যহ অর্থহীন এক জীবন টেনে নেবার গ্লানিতে তার দমবন্ধ হয়ে আসবে।

ডাক্তারকে আপনারাই বাঁচাতে পারেন। কেবল শারীরিক আক্রমণের হাত থেকে নয়, তার ডাক্তারিবিদ্যাকে নিছক টাকা রোজগারের এক যন্ত্র হয়ে ওঠার হাত থেকে।

তাই জেলায় জেলায় রোগী, তাঁর পরিজন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হোন। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী নিগ্রহ বন্ধ করা ও সুচিকিৎসা পাবার দাবিতে জনমত গড়ে তুলুন।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম,‌ ২৪৫, রামকৃষ্ণ রোড, নব ব্যারাকপুর, কলকাতা ৭০০ ১৩১'এর তরফে ডা. অর্জুন দাশগুপ্ত কর্তৃক প্রকাশিত

Monday, 18 September 2017

তর্কপটু ভাঙড়



গ্রামবাসীদের প্রশ্নে পাওয়ার গ্রিড কর্তারা দিশেহারা
তুষার চক্রবর্তী
 
ভাঙ্গড়ের সভার একাংশ

যে কাজ শুরু করার কথা প্রকল্প হাতে নেবার আগে, অনেক বিপর্যয়ের পর অবশেষে পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার কর্তাব্যক্তিরা থমকে যাওয়া সেই প্রকল্প নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনার সোজা রাস্তায় পা রাখলেন গত শনিবার (১৬/৯/২০১৭)l পাওয়ার গ্রিড সংক্রান্ত এই বিশেষ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হল পোলেরহাট হাই স্কুলেl গ্রামবাসীদের স্বসংগঠিত 'জমি জীবিকা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটি'র সঙ্গে ১২ সেপ্টেম্বর বারুইপুর জেলার পুলিশ সুপারের মিটিংএ, পুলিশ সুপারের তত্বাবধানে ও জেলা পরিষদের সদস্য কাইজার আহমেদের আয়োজনে এই আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়l সভায় গ্রামবাসীদের জন্যে ২০০টি গেটপাস ছাপানো হয় যার অর্ধেক কাইজার নিজের অনুগতদের মধ্যে বিলি করেন ও বাকী অর্ধেক জমি রক্ষা কমিটির হাতে দেওয়া হয়l কিন্তু, এই সভার সব চাইতে লক্ষণীয় দিক হল এই যে তা সত্বেও সভায় গ্রামবাসীদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বিভাজন দেখা যায়নিl ভরাট সভা একযোগে জমি রক্ষা কমিটির আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের প্রতিটি বক্তব্য বিপুলভাবে করতালি দিয়ে সমর্থন করেন ও পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষকে বারংবার বেআইনি কাজের অভিযোগে জর্জরিত করেনl আর পাওয়ার গ্রিড কর্তাদের যোগাড় করা দুজন বিশেষজ্ঞ এ সব দেখে কোনও কথা না বলে সভা থেকে চুপি চুপি মাঝপথে পালিয়ে যানl

সভায় পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশনের  তরফে ছিলেন মোট ১১ জন, যাদের ৭ জন নিজেদের পরিচয় দেনl এঁদের নেতৃত্ব দেন এস কে লাহিড়িl কলকাতা ছাড়াও দিল্লি থেকেও এঁদের কয়েকজন এসেছিলেনl সম্পূর্ণ সভার কাজ পাওয়ার গ্রিডের তরফে ভিডিও রেকর্ড করা হয়l পাওয়ার গ্রিডের আমন্ত্রণে শিবপুর ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক নির্বাক শ্রোতা হিসেবে সভায় প্রথম দিকে ছিলেন  এবং গ্রামবাসীদের প্রশ্নে পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষ যখন দিশেহারা হচ্ছেন, তখন তাঁরা সেমিনার ত্যাগ করেনl একটি সংবাদপত্রে তাঁদের নাম করে যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে তার কোনও বাস্তব অস্তিত্ব সভার রেকর্ডিং'এ তাই পাওয়া যাবে নাl

জমি রক্ষা কমিটির তরফে সভায় যোগ দেন বিজ্ঞানী নিশা বিশ্বাস, জীববিজ্ঞানী তুষার চক্রবর্তী, যাদবপুরের মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জীব আচার্য, কম্পুটার সায়েন্সের ছাত্র প্রিয়ম বসু ও ভাঙড় সংহতি কমিটির সভাপতি শংকর দাসl প্রিয়ম বসু এঁদের তরফ থেকে পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষের বেআইনি কাজের তালিকা পেশ করা শুরু করতেই গ্রামবাসীদের পূর্ণ সমর্থন দেখে উদ্বিগ্ন কাইজার পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষের কাছে উঠে আসা প্রশ্নের একে একে জবাব চাইতে শুরু করেনl সম্ভবত, মতলব ছিল পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিয়ে অবস্থা বাগে আনাl কিন্তু, পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষ সাফাই গাইতে গিয়ে আরও বিপদে পড়ে যানl শেয়ার বাজারে শেয়ার বিক্রি করতে গিয়ে SEBI'র কাছে দেওয়া নথিতে পাওয়ার গ্রিড যে সব আশংকা ও ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে, তার ব্যখ্যা দিতে গিয়ে হাস্যকরভাবে আমতা আমতা করে বলে ফেলেন যে 'সরকার আমাদের ওসব লিখতে বলে, তাই ওগুলো আমাদের লিখতে হয়l' IFC'র আন্তর্জাতিক নিয়মে যে জলাভূমির ওপরে ট্রান্সমিশন লাইন টানার নিষেধ আছে, অথচ এখানে একাধিক জলাভূমির ওপর দিয়ে লাইন টানা হয়েছে সেই অপরাধ তারা মেনে নিতে বাধ্য হনl ইটভাটার ৫০০ মিটারের মধ্যে লাইন টানার নিষেধ আইনে থাকা সত্বেও তাঁরা কেন একেবারে ইটভাটার ওপর দিয়েই লাইন টেনেছেন তার উত্তরে তাঁরা নতুন প্রযুক্তির যুক্তি দিতে ব্যগ্র হয়ে ওঠেন, কিন্তু সেই যুক্তি যাই হোক, আইন না ভেঙ্গে দরকার হলে আগে যে আইন বদলাতে হবে সে কথা গ্রামবাসীরা সমস্বরে মনে করিয়ে দিলে তাঁরা দিশেহারা হয়ে যানl বসতবাড়ি এমনকি প্রাথমিক স্কুলের ওপর দিয়ে বেআইনি ভাবে কেন  লাইন টানা হয়েছে এর জবাব দিতেও তাঁরা ব্যর্থ হনl এমনকি এর জন্যে লাইনের দু' পাশে আইনগত ভাবে যে ছাড় দেবার কথা সেই ৪৬ মিটার ROW'এর (right of way) প্রশ্ন উঠলে তাঁরা ৩০ মিনিট ধরে বিষয়টি না বোঝার ভান করে কালক্ষেপ করা শুরু করে দেন; যা গ্রামবাসীরা ধরে ফেলেনl গ্রামবাসীরা পাওয়ার গ্রিডের সরকারি বিবৃতিতে এর নাম 'রাজারহাট প্রকল্প' এবং কোনও নথিতে ভাঙড় উল্লেখিত না থাকার অসংগতির জবাব চাইলে কর্তৃপক্ষ দিল্লির কাছে 'যা রাজারহাট তাই ভাঙড়' বলে আরও বিপদে পড়ে যানl আসলে, রাজারহাট অ্যাকশন এরিয়া ৩ যে পাওয়ার গ্রিডের জন্যে ধার্য ছিল সেই ঘোষণা ও সাইনবোর্ড ভাঙড় এলাকাবাসী দেখেছেনl তৃণমূল সরকার ক্ষমতায়  আসার পরে যার পরিবর্তন ঘটেছে এদের  চোখের সামনেl দিল্লির অজ্ঞতা দেখিয়ে সেই অপ্রিয় সত্যকে ঢাকার চেষ্টা তাই মাঠে মারা যায়l
সভার শেষ দিকে
সময় তখন প্রায় পাঁচটাl পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষ পালাতে চাইছেনl বিতর্ক যে শুরু হয়েছে তার ইতিবাচক দিক মেনে ও পাওয়ার গ্রিড যেন আরও দক্ষতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ এনে ও প্রশ্ন না এড়িয়ে অনতিবিলম্বে ঠিক ঠিক জবাব দেন সেই আশা রেখে কাইজার আহমেদ সভা শেষ করে দেনl সভায় পাওয়ার গ্রিডের পরাজয়ে কার্যত বিপুল বিরক্তি তিনি চোখে মুখে প্রকাশ করে ফেলেনl  

তর্কে নেমে গ্রামবাসীরা যে কথাটা সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন তা হল, এলাকায় না এসে, উদ্বিগ্ন গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলে যারা বাড়িতে বা দফতরে বসে প্রকল্পের ফলে ক্ষতি হবে কী হবে না সেই বিধান দেবেন, তাঁদের কথা তাঁরা কখনই মানবেন নাl কলকাতা হাইকোর্ট অন্যায়ভাবে UAPA ধারা প্রয়োগ ও কর্তব্যে গাফিলতির জন্যে নিম্ন আদালতের বিচারকদের তিরস্কার করেছিলl পুলিশ সুপার কয়েকদিন আগে স্বীকার করেছেন যে গ্রামবাসীদের আন্দোলন গণতান্ত্রিক, অথচ তা নাকি বে-আইনিl বোঝা গেল, তিনি প্রবাদপ্রতিম সোনার পাথরবাটির সমঝদার! আর, গ্রামবাসীরা এককাট্টা হয়ে যেভাবে আজ তর্কের নামে বিভাজনের পাশা উল্টে দিয়ে পাওয়ার্ গ্রিড কর্তাদের খাবি খাওয়ালেন, আশা করি তা থেকে শিক্ষা নেবে এ রাজ্যের  সরকারl সভা শেষে, গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এটাই জানলাম যে তাঁরা আশা করছেন, এবার অন্তত মুখ্যমন্ত্রী প্রকল্পকে ভাঙড় থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেবার নির্দেশ দেবেনl