Friday, 22 January 2021

'পরাক্রম দিবস'এর ভাঁওতাবাজি

নেতাজীর স্বপ্ন: ইত্তেহাদ-ইতমদ-কুরবানি

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


এ বছরের ২৩ জানুয়ারি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু’র ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর প্রারম্ভে দিল্লির সরকার দিনটিকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘পরাক্রম’ শব্দটি শুনলেই কেমন যেন বীর-বিক্রমে যুদ্ধে যাওয়ার আবহ তৈরি হয়ে যায়! ‘হাল্লা চলেছে যুদ্ধে’। হয়তো সেটাই উদ্দেশ্য। নেতাজীর চিন্তাধারা, জীবনাদর্শ ও রাজনীতিকে যদি নিছক পরাক্রমের বাহুল্যে মুড়ে ফেলার প্রচেষ্টা থাকে তাহলে এ ব্যতীত আর কিইবা নামকরণ মাথায় আসে। বলাই বাহুল্য, দিবসের এই নামকরণটি বিজেপি’র রাজনীতির সঙ্গে যথেষ্ট সাযুজ্যপূর্ণ কিন্তু নেতাজীর সঙ্গে নয়। কারণ, বিজেপি’র রাজনীতির সঙ্গে পুরুষালি রণংদেহী লম্ফঝম্ফের যে যোগসূত্রটি বর্তমান, যেখানে আরাধ্য ভগবানের নামশরণ’ও (‘জয়শ্রীরাম’) হয়ে ওঠে এমন এক রণধ্বনি যা অপর বিশ্বাসীকে অনায়াসে কোতল করতে দ্বিধা করে না, তা নেতাজীর রাজনীতি, দর্শন ও মানবিকতাবোধের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।

দিল্লির সরকারে আসীন উগ্র জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতি বিকৃত পরাক্রমের রাজনীতি, তাই তা ধ্বংস ও বিভাজনের রাজনীতি। নেতাজীর রাজনীতি ভালোবাসা ও ঐক্যের রাজনীতি, যেখানে পরাক্রম কোনও জীবনদর্শন নয়, যুদ্ধের ময়দানে ন্যায় ও দেশপ্রেমের প্রকাশ মাত্র। নেতাজীর জীবন আলেখ্য ও বিশ্বাসে শান্তি, দেশপ্রেম ও সহাবস্থানই মূল অন্তর্বস্তু, পরাক্রম নয়। তাই, আজকের দিল্লির সরকার ও নেতাজীর ভাবধারার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী নেতাজীকে আখ্যায়িত করেছিলেন যথাক্রমে ‘দেশনায়ক’ ও ‘দেশপ্রেমিকদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দেশপ্রেমিক’ বলে। সেই শিরোপাদ্বয়েই তাঁর যথার্থ পরিচয়।

তাই বলে নেতাজীর সাহস ও বীরত্বকে কি আমরা স্বীকার করব না? অবশ্যই করব। কিন্তু সেটা তাঁর রাজনীতির মতাদর্শ ও প্রজ্ঞাকে আড়ালে ঠেলে নয়। বুঝতে হবে, নেতাজীর সুগভীর রাজনৈতিক মর্মবস্তুকে বাদ দিয়ে তাঁর যে সামরিক পরাক্রমকে বিচ্ছিন্ন ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে তা ছিল তাঁর দেশপ্রেমিক মতাদর্শের অভিব্যক্তি মাত্র; সেখানেও তিনি অদ্বিতীয়। কিন্তু তাঁকে শুধুমাত্র পরাক্রমশীলতার রজ্জুতে বাঁধলে তাঁর ধী ও চৈতন্যকে আমরা হারিয়ে ফেলব। দিল্লির অধীশ্বরদের সেটাই আসল উদ্দেশ্য। মাথায় ফেট্টি বেঁধে, হাতে অস্ত্র নিয়ে, কপালে তিলক কেটে, মুখে ‘জয়শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলে রাষ্ট্রের সহায়তায় অন্য আরেক দল মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যে যে দৈন্য, বীভৎসতা ও হিংস্রতা, তাতে এক বিকৃত ও ভীরু পরাক্রমশীলতা আছে বটে কিন্তু দেশপ্রেম ও মানবিক চৈতন্যের ছিটেফোঁটাও নেই। তাই চেষ্টা, নিজ রাজনীতির সেই উগ্র মতান্ধতাকে নেতাজীর ওপর আরোপিত পরাক্রমের অভিধা দিয়ে যথার্থ করে তোলা। তাতে এই দাঁড়ায়- তথাকথিত বীরত্বই সব, বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়াই উদ্দেশ্য, পরাক্রমের রণহুঙ্কারে উল্লাসে মেতে ওঠাই মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বিধেয় সেখানে গৌণ মাত্র। এক অর্থে, বীরত্বকে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন করে দেখানো যেখানে নিজেদের গায়ের-জোয়ারিকে বাহবা ও যাথার্থ্য দেওয়া যায়। এর বেশি এগোলে যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে! কারণ, নেতাজীর দেশপ্রেম এবং উগ্র রক্ষণশীলদের তথাকথিত দেশপ্রেমের মধ্যে যে কয়েক কোটি যোজনের দূরত্ব।

যে মোগল আমলকে ‘মুসলমান’দের হাতে পরাধীনতার কাল বলে আরএসএস-বিজেপি সোচ্চারে চীৎকার করে, সেই মোগল আমলের শেষ সম্রাট ও ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বিদ্রোহী জনগণ কর্তৃক স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে স্বীকৃত বাহাদুর শাহ জাফরের রেঙ্গুন সমাধিতে গিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে নেতাজী আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়কের কার্যাবলী শুরু করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি ডাক দিয়েছিলেন: দিল্লি চলো। নেতাজীর এই অনুশীলন ও প্রজ্ঞাকে মানলে দিল্লির আজকের অধীশ্বররা কীভাবে মোগল আমলকে আর পরাধীনতার কাল বলতে পারেন? তাই নেতাজী নয়, তাদের অভিসন্ধি নেতাজীর নামে এক মিথ্যা পরাক্রমের আবরণ নির্মাণ করে আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করা।

সবচেয়ে বড় কথা, নেতাজী কখনই ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, জাতি, লিঙ্গ- কোনও বিভাজনের ভিত্তিকেই মানেননি। তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল এক ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রতীক। এই প্রথম কোনও সেনাবাহিনীতে তৈরি করা হয় সম্পূর্ণ এক মহিলা ব্রিগেড: ঝাঁসির রাণী ব্রিগেড। বোঝাই যায়, এমন এক আধুনিক মানুষের চিন্তার পরিসর ও গভীরতা স্বভাবতই ছিল তাঁর সময়ের থেকেও কয়েক শতক এগিয়ে। তিনি জানতেন, ভারতের মতো বহু ভাষী, বহু জাতি, বহু ধর্মের দেশের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন এমন এক উদার ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের আদর্শ যা বিবিধের মাঝে মিলনকে মহান করে তুলতে পারে। সেই জটিল অথচ জরুরি কাজটিকেই তিনি শিরোধার্য করেছিলেন। কারণ, সেই মিলনই ছিল স্বাধীন ভারতের যাত্রাশুরুর বিন্দু। আর সে কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। সফল হয়েছিলেন বলেই ব্রিটিশের ধূর্ত রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতা অর্জনের মূল লগ্নে হিন্দু-মুসলমানের বীভৎসতম দাঙ্গার পরেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এ দেশে দীর্ঘদিন তার বিষদাঁত বের করতে পারেনি। হয়তো নেতাজী সে সময় দেশে থাকলে আজও সেই সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের বিষমানবগুলিকে দেখা যেত না। এই আক্ষেপ গান্ধীজীরও ছিল যখন দাঙ্গাদীর্ণ স্বাধীনতা লগ্নে তিনি বারবার তাঁর প্রিয় সুভাষের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন।

এ হেন উদার মানবজীবনকে নিছক ‘পরাক্রম’এর মুখোশে ঢেকে দিলে, বলাই বাহুল্য, আজকের নিকৃষ্টতম বিভাজনের রাজনীতি তার পরাক্রমী বাহুবলকে যাথার্থ্য করে তোলার অজুহাত পেয়ে যায়। অথচ খেয়াল করে দেখুন, কী অদ্ভুত বৈপরীত্যে অবস্থিত নেতাজীর দেশপ্রেম-পরাক্রমের আজাদ হিন্দ ফৌজ ও সংঘ পরিবারের বিভাজন-পরাক্রমের হিন্দু রাষ্ট্রের খোয়াব।

‘আর্জি হকুমৎ-ই-আজাদ হিন্দ’ বা সংক্ষেপে ‘আজাদ হিন্দ’ ছিল সিঙ্গাপুরে ২১ অক্টোবর ১৯৪৩ সালে নেতাজী প্রতিষ্ঠিত ভারতের অস্থায়ী সরকার। যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন স্বয়ং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। জাতীয় পতাকা হিসেবে সেই সরকার যা গ্রহণ করে তার সঙ্গে আজকের জাতীয় পতাকার একটিই পার্থক্য: মধ্যিখানে অশোক চক্রের বদলে সেদিন ছিল চরকা। এই সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল: ইত্তেহাদ, ইতমদ ও কুরবানি (বাংলায়: ঐক্য, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগ)। শ্লোগান ছিল: ইনকিলাব জিন্দাবাদ। আজাদ হিন্দ সরকারের সামরিক বাহিনী আজাদ হিন্দ ফৌজের একেকটি ব্রিগেডের তিনি নাম রেখেছিলেন: গান্ধী, নেহেরু, মৌলানা আজাদকে স্মরণ করে। এঁদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাঁদের স্মরণ করতে তাঁর উদার মন বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেনি। আর আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাধ্যক্ষদের নামগুলি শুনলে আজকের মোদি শাসিত ভারত চমকে উঠতে পারে। তাঁরা ছিলেন: গুরুবক্স সিং ধীলো, লক্ষ্মী স্বামীনাথন, শাহনওয়াজ খান, হবিবুর রহমান, প্রেম সেহগল ও আরও অনেকে। এই কথা বলার কারণ, আজ এমন এক ভারতবর্ষ নির্মাণের চেষ্টা চলছে যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে টার্গেট করে তথাকথিত বৃহত্তর হিন্দু সমাজকে এক ছাতার তলায় এনে অন্তত এক হাজার বছর পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নেতাজী ছিলেন এই উদগ্র বিভাজন ও কুসংস্কারের বিপক্ষে। তাঁর আজাদ হিন্দ সরকার ও ফৌজ ছিল বিবিধের মাঝে এক ঐক্যবদ্ধ ভারতের মহান মিলন। যেখানে হিন্দু-শিখ-মুসলমান-পার্সি-খ্রিস্টান, বাঙালি-তামিল-পাঞ্জাবী-মালয়লি সহ সমস্ত মানুষ তাঁদের শতধা বৈচিত্র্যের মধ্যে এক নিবিড় ঐক্য সাধন করেছিলেন।

আর আজকের বিজেপি’র পূর্বসুরী হিন্দু মহাসভার সঙ্গে নেতাজীর যে তীব্র বিরোধ তা তো ইতিহাসের পাতায় ছত্রে ছত্রে নথিবদ্ধ হয়ে আছে। নেতাজী যখন ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন ১৯৪১ সালে ভাগলপুর হিন্দু মহাসভার ২৩তম সম্মেলনে সাভারকার নির্দ্বিধায় হিন্দুদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছেন যুদ্ধে ব্রিটিশ শক্তিকে সাহায্য করার জন্য হিন্দুরা যেন দলে দলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তাঁরই উদ্যোগে সে সময় প্রায় এক লক্ষ হিন্দু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় এবং পরবর্তীকালে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে গ্রেফতার হওয়া আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের বিরুদ্ধে তারা নৃশংস আচরণ করে।

এই ইতিহাসকে আড়ালে রেখে আজ বাংলা দখল করতে মরীয়া দলটি নেতাজীকে আশ্রয় করেছে। নেতাজীর কোনও আদর্শ, বাচন, অঙ্গীকারে তাদের বিশ্বাস নেই। তারা তাই ‘পরাক্রম’কেই শিখণ্ডী করেছে তাদের উন্মত্ত বিভাজনের ধ্বজাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে। বাংলার মানুষ সজাগ আছেন- তাঁদের বাচনে আজাদ হিন্দ সরকারের পরাক্রমী নিনাদ: ইনকিলাব জিন্দবাদ। তাঁদের উদ্দেশ্যও ‘আর্জি হকুমৎ-ই-আজাদ হিন্দ’এর সেই সঙ্কল্প: ইত্তেহাদ-ইতমদ-কুরবানি।

জয় হিন্দ। জয় বাংলা।

       

6 comments:

  1. খুব সুন্দর লিখেছেন। এটা আজ আমাদের সকলের কথা। আমিও একটা লেখা করেছি এই বিষয়ে। সবাই মিলে বলতে হবে। পরাক্রম দিবস নিয়ে রাজ্যের বিজেপি বিরোধী সব দলই মুখ খুলেছেন।

    ReplyDelete
  2. নেতাজির আদর্শ সম্পূর্ণভাবে আরএসএস-এর বিরোধী

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো লাগলো। ইতিহাসের বেশ কিছু ঘটনা আজকের প্রাসঙ্গিকতায় তুলে এনে এই লেখাটি নতুন এক মাত্রা দিয়েছে।

    ReplyDelete
  4. লেখায় প্রকৃত ইতিহাস চেতনাকে তুলে ধরা এবং তাকে আজকের প্রতিক্রিয়ার শক্তির 'পরাক্রম' কায়েমের মোকাবিলায় কাজে লাগানোর চিন্তাশীল প্রয়াস রয়েছে।

    ReplyDelete
  5. আমরা সবাই এসব জানি। আজ এ উগ্রজাতীয়তাবাদী দলটির ক্ষমতায় আসার পিছনে কিন্ত আমরাই দায়ী। দিল্লির সরকার যখন ভোটের নামে ধর্মীয় তোষন করছিল আমরা সবাই চুপ করে থেকেছি। ধর্মীয় কারনে দেশভাগের পর আমরা সেকুলার ভারতে এসেছিলাম। সে ধর্মনিরপেক্ষতা কি বজায় ছিল আমাদের দেশে ? প.বঙ্গে কি ছিল এতদিন ? যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে এতকাল ক্ষমতায় ছিল, আজ তাদের মূল্য চোকাতেই হবে। ইতিহাসের এটাই শিক্ষা। অন্যের দুর্বলতা কখনো আমার শক্তি হতে পারে না।

    ReplyDelete