ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
In This World
রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।
এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।
এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা' (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।
ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।
রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।
২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।
সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।




