Saturday, 6 June 2026

এক অমোঘ উত্তরণের পথে?

যন্তর মন্তর এক অভূতপূর্ব সমাবেশ দেখল

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই, কোনও বৃহত্তর গণ দাবি বা ইস্যু’তে রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বে উঠে দেশ বা রাজ্যব্যাপী প্রায়-সর্বাত্মক গণ জাগরণ কিংবা আন্দোলন আগে হয়নি। কিন্তু সেই আন্দোলনগুলির পিছনে বা আহ্বানে থাকতেন এমন কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্ব যাঁদের কোনও দলীয় মোড়কে ফেলাটা ছিল দুষ্কর, সর্বোপরি, তাঁদের এক সার্বিক গ্রহণযোগ্যতাও ছিল। যেমন, জয়প্রকাশ নারায়ণ অথবা আন্না হাজারে— স্বাধীনতার পর যে দুই ব্যক্তিত্ব দেশব্যাপী এক গণ আলোড়ন তুলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাণ্ডারী হয়েছিলেন। ফলে, কার গুড় এসে কোন পিঁপড়ে খেয়ে গেল, সে নানাবিধ উত্তর-বিচার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা করতে পারেন, কিন্তু এমনটা ঘটা যে অসম্ভব কিছু নয়, সে কথাটুকুই বললাম মাত্র।

কিন্তু যে প্রসঙ্গে বলতে চাইলাম, সেখানে অন্য আরেকটি মাত্রা আছে। অভিজিৎ দিপকে বা তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এবং তাঁদের হঠাৎ সৃষ্ট ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আজ থেকে ১৫-২০ দিন আগেও ছিলেন একেবারে অপরিচিত (তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের বিভিন্ন মতামত প্রকাশের কারণে তাঁরা এক অংশের মানুষজনের কাছে অবশ্যই পরিচিত বা জনপ্রিয় ছিলেন)। প্রধান বিচারপতির যুব সমাজের প্রতি ‘ককরোচ’ মন্তব্যে অভিজিতের তির্যক ট্যুইট ও সেই অভিঘাত থেকে তৈরি একটি দল, যে দল আর পাঁচটা দলের মতো একেবারেই নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক একটি জমায়েত হিসেবেই যার আত্মপ্রকাশ। অথচ, সেই দলেরই ডাকে আজ (৬ জুন) দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারে হাজারে মানুষের গণ জমায়েত হয়ে গেল। একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাবি উঠল: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।

প্রাথমিক একটা শঙ্কা ছিল, এই সমাবেশ আদৌ করতে দেওয়া হবে কিনা। দেখা গেল, দিল্লি বিমানবন্দরে সকালে অভিজিৎ নামতেই পুলিশ তাঁকে জানিয়ে দেয়, যন্তর মন্তরে তাঁরা সভা করতে পারবেন। ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে এক চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ যে বিদ্যমান, তার খোঁজ গোয়েন্দা দফতরের কাছে ছিল; উপরন্তু, এই সমাবেশকে ঘিরে যুব সমাজের অভ্যন্তরে যে তুমুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, সে খবরও তারা জানত। ফলে, একপ্রকার জনজোয়ারের চাপে সভাটিকে তারা হতে দিল, পাশাপাশি, বাজিয়েও দেখতে চাইল, সোশ্যাল মিডিয়ার কলরব কতটা বাস্তবে আছড়ে পড়ে। তদুপরি, ঠিক তার আগের দিনই, এই সভাকে নিরুৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী সগর্বে ঘোষণা করলেন দেশের অর্থনৈতিক মজবুতির কথা, যাতে যুব সমাজ তাঁর কথায় বল পায়। কিন্তু ন্যাড়া ক’বার বেলতলায় যায়? ককরোচ জনতা পার্টি আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই শাসকের হিন্দু-মুসলমানের দ্বৈরথের গল্পে তারা ক্লান্ত, দেশের অগ্রগতির গুজবেও তারা পরিশ্রান্ত, নির্বাচন কমিশন সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে কব্জা করে দেশে একনায়কতন্ত্রের আস্ফালনও তারা দেখছে, একের পর এক ক্ষমতার দুর্নীতির চরম ও সর্বগ্রাসী ব্যবস্থাকেও তারা জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করছে, অতএব, দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেছে তখন পথে নামা ছাড়া আর উপায় কী! গত দু-এক বছরে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের GenZ আন্দোলনের টাটকা স্মৃতিও তো শাসককুলকে তাড়া করছে যাতে এমনতর পুনরাবৃত্তি এখানেও না হয়। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই এই নতুনতর GenZ আন্দোলনের বীজ ও উত্থান।

বলাই বাহুল্য, সব মিলিয়ে ৬ জুন যন্তর মন্তরে এক অভূতপূর্ব সভা হল। লোকসমাগমও হল ঐতিহাসিক। কোনও মঞ্চ নেই, মাইক নেই, শুধুই শ্লোগান ও উদ্দীপনা; যদিও পরে সে সবের খানিক বন্দোবস্ত হল। মঞ্চে সোনম ওয়াংচুক’কেও দেখা গেল। তিনি বললেন। আর যা ছিল— তীব্র দাবদাহ (৪৫ ডিগ্রি), জলকষ্ট ও উপস্থিত প্রতি জনের অকল্পনীয় জেদ। কেরালা থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার থেকে তামিলনাড়ু— কোথা থেকে ছেলেমেয়েরা আসেনি! বয়স্ক মানুষেরাও ভীড় করেছেন। এক আলটপকা দলের জন্ম মুহূর্তের আহ্বানে মাত্র ৪-৫ দিনের অবসরে এই অচিন্তনীয় জনসমাবেশ এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে, জমি প্রস্তুত, যথার্থ আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্যে অবিচল থেকে যদি নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করা যায় তবে সত্যি অর্থে মর্মবস্তুগত পরিবর্তন সম্ভব।

গত এক দশকে আমাদের দেশে যে ঘৃণার চাষ হয়ে চলেছে, দেশের মানুষ যে অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন, বিরোধাভাসের সামান্য আঁচটুকু পেলেই যখন মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে, তখন এই অভূতপূর্ব জনজাগরণ সকলের মনে আশা ও আস্থার সঞ্চারক বলে বহুজনের বিশ্বাস। আমরা জানি না, এই যুব অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ কী! আপাতত তাঁরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সাতদিন সময় দেওয়া হচ্ছে— হয় তিনি পদত্যাগ করবেন অথবা প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বরখাস্ত করবেন। নচেৎ, তাঁরা আন্দোলনকে এবারে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সংগঠিত করবেন।

অবশ্য, তাঁদেরও কিছু প্রস্তুতি দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার মিম ও তির্যক পোস্ট থেকে তাঁরা বাস্তব ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। একে অপরকে ভালোমতো চেনাজানা ও সাংগঠনিক কিছু কাঠামোরও প্রয়োজন আছে। সে সব অবলম্বনের কথা তাঁরা ভালোমতোই বোঝেন। অন্যত্রও GenZ আন্দোলন রাতারাতি কোনও যাদুবলে কার্যকরী অবয়ব ও অভিঘাতে পৌঁছয়নি। আমাদের দেশে এই সবে শুরু। আর শাসকের বাড়াবাড়িও অতিক্রম করে গেছে নিয়ন্ত্রণের বেড়া। আজ যন্তর মন্তরে তাই অধিকাংশ আরশোলাদের হাতে ছিল ভারতীয় সংবিধান ও আম্বেদকরের ছবি। উচ্চারণে ছিল ‘জয় হিন্দ’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।

যে নতুন যাত্রাপথের আজ শুরু, তার শেষ হবে এক অমোঘ উত্তরণে।


Tuesday, 26 May 2026

ফুটপাথের অর্থনীতি

অন্তরালে মানবিক বিপর্যয়!

অয়ন মুখোপাধ্যায়



সাম্প্রতিক কালে ভারতের নগরোন্নয়ন ও পুর প্রশাসনের অভিধানে একটি নতুন শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে: ‘বুলডোজার’। একদা যা ছিল কেবলই রাস্তা নির্মাণ বা ভারী পরিকাঠামো গড়ার নিরীহ যন্ত্র, আজ তা রাষ্ট্রশক্তির একচ্ছত্র দাপট, তাৎক্ষণিক বিচার ও প্রান্তিক দমনের এক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষত, মহানগরের রাস্তা ও ফুটপাথ ‘পরিষ্কার’ করার নামে হকার উচ্ছেদের যে হিড়িক দেশ জুড়ে তথা পশ্চিমবাংলায় দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কোনও প্রশাসনিক সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচি নয়; বরং তাকে কেউ কেউ স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৃহৎ অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ ঘোষণা বলছেন। এই 'বুলডোজার সংস্কৃতি' আদতে একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটকে আইনি চাদরে ঢেকে ফেলার এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনা।

নান্দনিকতার নগর বনাম বেঁচে থাকার নগর

যে কোনও আধুনিক শহরের দুটি রূপ থাকে। একটি তার বাহ্যিক অবয়ব— ঝকঝকে বহুতল, চওড়া রাস্তা, ফ্লাইওভার ও শপিং মল। অন্যটি তার প্রাণস্পন্দন— যা সচল থাকে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরে। হকাররা হলেন সেই প্রাণস্পন্দনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উচ্ছেদপন্থীদের প্রধান যুক্তি হল, হকারদের কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, যানজট তৈরি হচ্ছে এবং শহরের নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে। প্রথমাংশে এই যুক্তিকে আংশিক সত্য বলে মেনে নিলেও, দ্বিতীয় অংশটি অত্যন্ত সুবিধাবাদী। ‘নান্দনিকতা’ বা ‘বিউটিফিকেশন’এর যে ধারণা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মননে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইউরোপ-কেন্দ্রিক। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যা ও বেকারত্বের দেশে শহরের সৌন্দর্য কখনই তার দরিদ্রতম নাগরিকদের পেটে লাথি মেরে অর্জিত হতে পারে না।

বুলডোজার দিয়ে যখন একটি হকারের অস্থায়ী দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন কেবল কিছু বাঁশ, প্লাস্টিক বা কাঠ ধ্বংস হয় না; তার সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের অন্তত তিন প্রজন্মের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা। ফুটপাথ যদি পথচারীর অধিকার হয়, তবে জীবনধারণের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)। একটি অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি অধিকারকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলার এই সংস্কৃতি কোনও সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

হকার অর্থনীতি: এক অদৃশ্য স্তম্ভ

হকারদের শুধু ‘জবরদখলকারী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে নগরের অর্থনীতিতে তাদের অবদান কতটা গভীর:

১) হকাররা শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে অত্যন্ত সস্তা দরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেন। শপিং মলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে যে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, ফুটপাথে তা-ই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে;

২) রাষ্ট্র যেখানে কোটি কোটি যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেখানে হকাররা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তারা রাষ্ট্রের ওপর বোঝা না হয়ে, উলটে স্বনির্ভরতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন;

৩) পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনে খুচরো বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখেন।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, হকাররা হলেন শহরের ‘অর্থনৈতিক কুশলী’ (Economic Cushions)। মন্দার সময়েও তারা শহরের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেন না। এই বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রটিকে আইনি স্বীকৃতি ও পরিকাঠামো না দিয়ে বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলার চেষ্টা অর্থনৈতিক আত্মহত্যার সামিল।

২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় আইনকে বুড়ো আঙুল

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো প্রায়শই দেশের প্রচলিত আইনকে লঙ্ঘন করে চালানো হয়। ২০১৪ সালে ভারতের সংসদে অত্যন্ত প্রগতিশীল একটি আইন পাস হয়েছিল— ‘দ্য স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪’। এই আইনের মূল কথাই ছিল:

ক) প্রতিটি পুরসভায় একটি করে টাউন ভেন্ডিং কমিটি (TVC) থাকবে, যেখানে হকারদের নিজেদের প্রতিনিধি থাকবে;

খ) প্রথমে শহরের সমস্ত হকারের সমীক্ষা করতে হবে এবং তাদের পরিচয়পত্র ও ভেন্ডিং সার্টিফিকেট দিতে হবে;

গ) কোনও হকারকে উপযুক্ত বিকল্প জায়গা না দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে না।

আইনের এই স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও ভারতের অধিকাংশ রাজ্য ও পুরসভা এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। কোনও নোটিশ না দিয়ে, কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করে, রাতারাতি পুলিশ ও বুলডোজার নামিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এটি কেবল অমানবিক নয়, সরাসরি দেশের আইনের অবমাননা এবং বিচারব্যবস্থার সমান্তরালে এক স্বৈরাচারী প্রশাসনিক সংস্কৃতি। দেশের শীর্ষ আদালতও এ বিষয়ে কড়া মনোভাব দেখিয়েছে ও নিন্দা করেছে।

বুলডোজার সংস্কৃতির মনস্তত্ত্ব 

বুলডোজার সংস্কৃতি আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এটি জটিল সামাজিক সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে না। এটি বিশ্বাস করে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান ‘অ্যাকশন’এ। যখন কোনও প্রশাসন হকার পুনর্বাসনের মতো জটিল নীতি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বুলডোজার নামিয়ে নিজেদের 'তৎপরতা’ প্রমাণ করতে চায়। এই সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের মধ্যেও এক ধরনের বিকৃত আনন্দ বা ‘স্যাডিজম’ তৈরি করে। তারা ভাবে, শহর রাতারাতি ‘পরিষ্কার’ হয়ে গেল। কিন্তু তারা ভুলে যায়, যে হকারটি আজ উচ্ছেদ হল কাল সে পেটের টানে চুরির পথ বেছে নিতে পারে, বা তার সন্তান শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অপরাধের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। 

বুলডোজার ফুটপাথ পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য বা ক্ষোভকে উপড়ে ফেলতে পারে না; বরং তা সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়।

সমাধানের চার দফা পথ

আমরা কি তবে ফুটপাথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখার পক্ষে সওয়াল করছি? একেবারেই নয়। বিশৃঙ্খলা কোনও সুস্থ শহরের লক্ষণ হতে পারে না। কিন্তু সমাধানের পথ ‘উচ্ছেদ’ নয়, সমাধানের পথ ‘নিয়ন্ত্রণ ও সহাবস্থান’। একটি আধুনিক, সংবেদনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুর প্রশাসন নিম্নলিখিত চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে:

পদক্ষেপ ১) নো-ভেন্ডিং জোন চিহ্নিতকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত মোড় বা হাসপাতালের সামনে ‘হকার মুক্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করা হোক, কিন্তু তার ঠিক পাশেই নির্দিষ্ট গলি বা জায়গায় তাদের বসার অনুমতি দেওয়া হোক।

পদক্ষেপ ২) সময় ও জায়গার বণ্টন। বাস্তবায়নের উপায়: বিদেশের মতো ‘টাইম-শেয়ারিং’ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা ভোরে হকাররা বসবেন, বাকি সময় ফুটপাথ পথচারীদের জন্য সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকবে।

পদক্ষেপ ৩) পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: হকারদের প্লাস্টিকের নোংরা ছাউনির বদলে পুরসভা থেকে নির্দিষ্ট আকারের, পরিবেশবান্ধব ও সুদৃশ্য কিওস্ক (Kiosk) বানিয়ে দেওয়া হোক। এতে শহরের সৌন্দর্যও বজায় থাকবে, হকারদের রুটি ও রুজি বাঁচবে।

পদক্ষেপ ৪) ডিজিটাল নথিভুক্তকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: প্রতিটি হকারকে কিউআর কোড যুক্ত পরিচয়পত্র দেওয়া হোক, যাতে বহিরাগত বা বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায় এবং প্রকৃত হকারদের চিহ্নিত করা সহজ হয়।

মানবিক নগরায়নের ডাক

শহর কোনও জড় বস্তু নয়। ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল আর চওড়া পিচের রাস্তাই শহরের শেষ কথা নয়। শহরের আসল পরিচয় তার মানুষের সহাবস্থানে। হকাররা বহিরাগত শত্রু নন; তারা আমাদেরই সমাজ ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন আমরা মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছি, বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশকে সামান্য দুই ফুট ফুটপাথের জন্য বুলডোজারের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে— এর চেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না।

প্রশাসনকে বুঝতে হবে, বুলডোজার দিয়ে ক্ষমতার প্রদর্শন করা সহজ, কিন্তু দূরদর্শিতা দিয়ে একটি মানবিক শহর গড়ে তোলা কঠিন। আমাদের প্রয়োজন এমন এক ‘স্মার্ট সিটি’ যা কেবল প্রযুক্তিতে উন্নত হবে না, যা হৃদয় ও মননে হবে সংবেদনশীল। হকার উচ্ছেদের এই অন্ধ ও হিংস্র ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ অবিলম্বে বন্ধ হোক। ধ্বংসের রূপক নয়, সৃষ্টি ও সহাবস্থানের জয় হোক আমাদের মহানগরে।


Sunday, 24 May 2026

দেশ জুড়ে কিলবিল আরশোলা

কিছু কি ঘটতে চলেছে!

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ইতিহাসের গলিপথে কে কখন কোন আড়াল থেকে সামনে এসে পড়ে, তা কে জানে! যখন চারপাশে পুঁতিগন্ধময় আবর্জনার স্তূপ জমে ওঠে, সবাক মানুষের কন্ঠস্বরও থাকে অবদমিত, তখন কিলবিল আরশোলার দল হয়তো বেরিয়ে এসে ছেয়ে ফেলে গলি ও রাজপথ। কে জানত, কোটা বিরোধী আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের সে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে সম্বোধন করবেন, গোটা দেশ সেই আবর্জনা ঠেলে এমন ভাবে উঠে দাঁড়াবে যে তা ইতিহাসে 'জুলাই গণ অভ্যুত্থান' পরিচয়ে এক পালাবদলের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। 'রুটি নেই তো কেক খেলেই পারে'-- এই উক্তিও ছিল রাজবাড়ির ক্ষমতার অলিন্দ থেকে উৎসারিত, যার পরিণতিতে বিশ্ব পেয়েছে সাম্য-স্বাধীনতার এক দুর্লভ প্রেরণা ও ধারণা। ইতিহাসে এমনতর বাঁক অযূত। সেই ধারাবাহিকতাতেই আমাদের দেশে যুবদের আজ 'আরশোলা' সম্বোধন, যা শুধুমাত্র উচ্চপদে থাকা এক ব্যক্তির মুখনিঃসৃত তিরস্কার মাত্র নয়, বরং এক পচাগলা ব্যবস্থায় কাতর মানুষজনের প্রতি উদগত এমন এক অপমানজনক উচ্চারণ যা দেশের আগাপাশতলা ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর তারপরেই যেন বিস্ফোরণ।

কোনও অফিস নেই, ফান্ডিং নেই, কোনও পরিকল্পনাও নেই; 'আরশোলা' তিরস্কার শোনার পর ১৬ মে একটি প্রতিস্পর্ধী ট্যুইট: 'সব আরশোলারা এক হলে কেমন হয়।' লিখলেন ৩০ বছরের যুবক অভিজিৎ দিপকে। তারপরই সুনামি। এখন আমরা সবাই জানি, পর পর কী ঘটেছে। মাত্র ৫-৬ দিনে ২ কোটি ২০ লক্ষ ফলোয়ারে ভরপুর 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট'টিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ২০ ঘন্টা লড়ে আজ (২৪ মে) আবার সেটিকে তাঁরা পুনরুদ্ধার করেছেন। বন্ধ করা হয়েছিল ককরোচ পার্টির ওয়েবসাইটও; অল্প কিছু ঘন্টায় আবারও নতুন করে তাঁরা তা বানিয়ে নিয়েছেন, এবার আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও বিস্তৃত। কাদের নির্দেশে ও কারিকুরিতে এই নিষেধাজ্ঞা, তা সকলেই জানেন। 

এতসব বাধা-বিপত্তি, আক্রমণকে প্রতিরোধ করে এখন কোন পথে, কীভাবে এগোবে আরশোলার দল? কিন্তু যে আচম্বিতে এই কাণ্ডটি গত ৬-৭ দিনে ঘটে গেল, তাকে বলা যায়, সবে তো কলি'র সন্ধ্যে। অতিশয় বকবক করা কতিপয় বিজ্ঞজনেরা কিছুটা ভুরু নাচিয়ে বলছেন বটে, একটা নতুন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন বই আর তো কিছু নয়; কিন্তু মাটিতে আরশোলার তীব্র কটূ গন্ধ যেন অন্য কথা বলছে! সেই মোতাবেক অনলাইন স্যাটায়ার বা মিম (Meme) হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এই প্রবণতাটি এখন বাস্তব মাঠের রাজনীতি ও আইনি জটিলতায় ধীরে ধীরে এক সামাজিক রূপ নিচ্ছে। পাঁচটি মূল দাবি নিয়ে তাঁরা সোচ্চার হয়েছেন:

১) কোনও প্রধান বিচারপতিকে অবসর-পরবর্তী পুরস্কার হিসেবে রাজ্যসভার আসন দেওয়া যাবে না;

২) যদি কোনও বৈধ ভোটারকে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে UAPA'র অধীনে ব্যবস্থা নিতে হবে;

৩) মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ চাই;

৪) আদানি ও আম্বানিদের মালিকানাধীন সমস্ত মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে এবং গোদি মিডিয়ার সঞ্চালকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে;

৫) যে কোনও বিধায়ক বা সাংসদ দল বদল করলে তাকে আগামী ২০ বছর কোনও নির্বাচনে প্রার্থী বা সরকারি পদ দেওয়া যাবে না।

ফলে, এইসব দাবি-দাওয়া সহ ককরোচ পার্টির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা দেখে, প্রথম রাতেই, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(A) ধারায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এদের মূল X অ্যাকাউন্টটিকে ভারতের সীমানায় প্রথমে ব্লক বা স্থগিত করে দেয়। এর জবাবে তারা তৎক্ষণাৎ ‘Cockroach is Back’ নামে নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে লড়াই জারি রাখে। কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দিল্লির তরুণ সমর্থকেরা আরশোলার পোশাক পরে যমুনা নদী পরিষ্কার করার মতো প্রতীকী সমাজসেবামূলক নাগরিক প্রতিবাদও গড়ে তোলে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে ককরোচ পার্টির সমর্থকেরা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছে (যাতে এই বিপুল অনলাইন সমর্থনকে বাস্তব ভোটে রূপান্তর করা যায় কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে)। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ থেকে আরশোলায় এই 'মেটামরফোসিস' যেন আবালবৃদ্ধবণিতার মনের ভেতর কোথাও জমাট বেঁধে ফেলেছে। শাসক তাকে যতই ভ্যানিশ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিক না কেন, তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে কোনও রাজনৈতিক অভিঘাতের লক্ষ্যে। 

স্পষ্ট ভাষায় অভিজিৎ জানিয়েছেন, কোনও গোদি মিডিয়াকে তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন না। হন্যে হয়ে ঘুরেও কোনও গোদি মিডিয়া তাঁর টিকি'র নাগালটুকুও পায়নি (ব্যতিক্রম 'ইন্ডিয়া টুডে')। এই মুহূর্তে তাদের প্রধান দাবি: NEET পরীক্ষায় দুর্নীতির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। এই দাবিতে চলছে অনলাইন পিটিশনে সই সংগ্রহের কার্যসূচি। অবশ্য, তাদের ওয়েবসাইটটি হ্যাক হয়ে যাওয়ায়, ৬ লক্ষেরও বেশি স্বাক্ষর সংগৃহীত সে পিটিশনের বর্তমান কী হাল তা এখনও জানা যায়নি। বলাই বাহুল্য, ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) এই ঝড়ের মতো উত্থান ভারতীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে:

১) কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক গালিগালাজকে কীভাবে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপান্তরিত করা যায়, CJP তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আগে ইউরোপ-আমেরিকায় ‘স্যাটায়ার পার্টি’ দেখা গেলেও ভারতে এটিই প্রথম, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা কোনও গম্ভীর ইশতেহার নয়, বরং মিম কালচার;

২) তরুণ প্রজন্মের এই দ্রুত ও বিপুল সাড়া প্রমাণ করে যে তারা দেশের বর্তমান সরকার ও প্রথাগত বিরোধী দল উভয়েরই গৎ বাঁধা রাজনীতি ও প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হারিয়েছে। NEET কেলেঙ্কারি ও কর্মসংস্থানের অভাব সহ বহু অন্যায়-অত্যাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুবসমাজের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তা অতি স্পষ্ট;

৩) ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আজকের রাজনীতিতে যে কোনও ওলটপালট হয়ে যেতে বিশেষ সময় লাগে না। জনতা যেন প্রস্তুত হয়েই থাকে, শুধু শুরু করার মুহুর্তটিকে যথাযথ ভাবে বেছে নিতে হয়;

৪) রাজনীতির চলন শুধুমাত্র আর সাবেক রাজনৈতিক দল বা বিশেষ নেতার ওপর নির্ভর করছে না। যে কোনও মুহূর্তে একটি প্রতিষ্ঠিত বা ক্ষমতাসীন দল সমাজ পরিসর থেকে যেমন মিলিয়ে যেতে পারে, তদুপরি, কোনও অচেনা ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কিংবা নতুন গোষ্ঠী ও দল চকিতে নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে। 

ককরোচ জনতা পার্টি কোনও নিবন্ধিত দল নয়, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এটি প্রথাগত নির্বাচনী দল হয়ে উঠবেও না। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিজেই জানিয়েছেন, তাদের আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল নয়, বরং সিস্টেমের ঘুম ভাঙানো। তবে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নীতি-নির্ধারকদের জন্য এই ‘আরশোলা বাহিনী’ আপাতত একটি কড়া বার্তা দিয়েছে— ভারতের বৃহত্তম জনসংখ্যা বা যুবসমাজকে অবহেলা বা উপহাস করলে, তারা ডিজিটাল স্পেসকে বদলে দিয়ে যে কোনও সময় ক্ষমতার সমীকরণকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এখন পর্যন্ত তারা ডিজিটাল পরিসরকে ওলটপালট করেছে বটে, কিন্তু দেখার, এই আন্দোলন বাস্তবিক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং কতটা ক্ষমতা ধরে। তবে ইতিমধ্যেই অভিজিতের কাছে হুমকি ফোন আসতে শুরু করেছে, তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর মা-বাবা'কেও বিপদে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।  

এক ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা অত সহজে দমবার পাত্র নন। দেখাই যাচ্ছে, একটা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে হাজারটা অ্যাকাউন্ট খুলে যাচ্ছে। কিলবিল করে আরশোলারা সব রাস্তায় নেমে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা প্রচারও শুরু হয়েছে, যেমন, এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অভিযোগ এনেছেন যে, ককরোচ পার্টির ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ারদের অধিকাংশই নাকি পাকিস্তান ও আমেরিকার। অথচ, ইন্সটাগ্রাম অ্যানালিটিক্স থেকে অভিজিৎ দেখিয়েছেন, তাঁদের ফলোয়ারদের ৯৪.৭ শতাংশই হল ভারতের।

এই লেখাটি প্রকাশের মুহূর্তে ককরোচ পার্টির ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৩ মিলিয়ন (২ কোটি ৩০ লক্ষ)। হয়তো, লেখাটি যখন পড়বেন তখন তা ৩ কোটিতে পৌঁছে যাবে। 

Wednesday, 20 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি (২)

কল্যাণমুখী ব্যয়ও অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়

অচিন চক্রবর্তী



(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে ছিল রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে রইল বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক

 দ্বিতীয় অংশ 


দুর্নীতির রকমফের

যে সমস্যাটি এ রাজ্যের জনপরিসর অনেকটাই দখল করে রেখেছে বেশ কিছুকাল তা হল দুর্নীতি। সামাজিক মাধ্যমে এ ওকে তুলোধোনা করেছে দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে না বলে। দুর্নীতি নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের সরব হওয়া না হওয়ার অপেক্ষায় অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। অ-ভাজপা রাজ্যগুলিতে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় রাজ্যের ক্ষমতাশীল দলকে বিপাকে ফেলতে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে বদলি, সর্বত্র যেরকম আর্থিক লেনদেনের কথা জানা গেছে তা নিয়ে মানুষ যে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ তা বলা যায়। দুর্নীতি যেহেতু অগণিত কাজের মধ্যে দিয়ে হয়, এবং দুর্নীতি কেউ চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে করে না, ফলে দুর্নীতির তথ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু দেশে দেশে দুর্নীতির আন্দাজ দিতে ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো সংস্থা কিছু বিশেষ ধরনের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। এই পরিসংখ্যান আদতে দুর্নীতির ব্যাপ্তি নিয়ে মানুষজনের কী উপলব্ধি তাকে ধরার চেষ্টা করে। মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে যদি বাস্তবের সম্পর্ক নাও থাকে তাহলেও এই তথ্যের গুরুত্ব আছে অর্থনীতিতে, কারণ মানুষ ধারণার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার যদি ধারণা হয়ে থাকে কোনও দেশে দুর্নীতি খুব বেশি, যদিও বাস্তবে তা নয়, আমি সেখানে বিনিয়োগ করব না হয়তো। বোঝাই যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতাও হয় বিভিন্ন। ব্যবসায়ীর কাছে এক রকম, সরকারি আধিকারিকের কাছে এক রকম, সাধারণ একজন পরিষেবা গ্রাহকের কাছে আর এক রকম। মানুষ যে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধাভোগী সেগুলি সম্পর্কে, কিংবা যে সব সরকারি আধিকারিকদের তাঁরা ভাল ব্যবহার করতে দেখেছেন সামনে থেকে তাঁদের সম্পর্কে, ভাল ধারণা পোষণ করে থাকেন। দুর্নীতি থাকলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। 

তাহলে প্রশ্ন, পূর্ববর্তী শাসক দলের বিরুদ্ধে এই যে এত দুর্নীতির প্রমাণ তুলে আনল তদন্তকারী সংস্থাগুলি, অধিকাংশ মানুষ যদি ক্ষুব্ধ হন তা নিয়ে, তার প্রভাব পড়েছে হয়তো নির্বাচনের ফলে। অর্থনীতিতে দুর্নীতির দীর্ঘকালীন প্রভাব কেমন হতে পারে? তা যতটা নির্ভর করে দুর্নীতির প্রকৃতির উপর, দুর্নীতির বহরের উপর ততটা নয়। ধরা যাক যে বস্তুটি আইনত প্রাপ্য নয় সেটি কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী এমএলএ, ছোট বড় সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিকের থেকে অর্থের বিনিময়ে পেলেন। যেমন অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকের চাকরি, যে ‘শিক্ষক’ চাকরির যোগ্য নন। আর এক ধরনের দুর্নীতি হতে পারে, যেখানে আইনত প্রাপ্য বস্তুটি পেতেই আমাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যেমন আমি কলেজ সার্ভিস কমিশন দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি আমার মেধার নিরিখে। এবার আমি যখন কলেজে যোগ দিলাম, আমার বেতনক্রম স্থির করতে যে ফাইল যাবে বিকাশ ভবনে, তা যাবে না যদি না আমি কিছু অর্থ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে দিই। এ কাজটি করার কথা যদিও কলেজেরই। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে এমন অজস্র ‘পেয়ে থাকি’র সম্মুখীন হয়তো আমাদের সবাইকেই হতে হয়েছে – পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে জমির মিউটেশন। এতে আমরা আর অবাক হই না। কিন্তু এখানে ইচ্ছে করেই এমন একটি দৃষ্টান্ত দিলাম যা এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের, এবং যা সত্যি বলে জানি। 

ঘুষ নেওয়া এবং দেওয়া এ দুটি কর্মই এ দেশে অপরাধ বলে গণ্য হয়। অথচ উপরে দৃষ্টান্ত সহ যে দুই ধরনের ঘুষের কথা বললাম, আইনের চোখে তারা সমান। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, দ্বিতীয় ধরনের দুর্নীতি আইনের একটু এদিক ওদিক করেই অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। যিনি ঘুষ দিয়েছেন তাঁকে অপরাধী না করে যিনি নিয়েছেন তাঁকে যদি শনাক্ত করায় উৎসাহিত করা যায় তাহলে দুর্নীতি কমতে পারে। কিন্তু প্রথম ধরনের দুর্নীতি, যা থেকে দু' পক্ষই লাভ করছে, যা আইনত তাদের প্রাপ্য নয়, এ ধরনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বেজায় কঠিন, কারণ কোনও পক্ষেরই একে প্রকাশ্যে আনার কোনও ইনসেন্টিভ নেই।    

অর্থের বিনিময়ে চাকরি এবং তার সঙ্গে জড়িত সমস্যাগুলি শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্ভবত সব থেকে বেশি প্রভাবিত করেছে। অপরাধের তদন্ত থেকে কোর্টকাছারির ব্যাপার স্যাপার সমাজমাধ্যমে যেভাবে জায়গা করে নেয়, বহু ছেলেমেয়ে যে শিক্ষা বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে সেই গভীর সমস্যাটির দিকে আলোকপাত হয় না। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় শিক্ষার রূঢ় সত্যটি হল, কোভিডের ধাক্কার আগেও এ রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছতে পারে নি, অন্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। তার সঙ্গে যদি অতিমারির ক্ষতিকে একত্রে দেখি তাহলে সংকটের গভীরতার প্রকৃত ছবিটি পাওয়া যাবে। কোভিডের আগেও প্রতি বছর ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ যে শিক্ষার অঙ্গন থেকে অকালে বিদায় নিচ্ছিল – এই জরুরি কথাটি অনুধাবন প্রয়োজন।  

শিক্ষার কেন্দ্রীয় ভূমিকা 

পশ্চিমবঙ্গবাসীদের মধ্যে উচ্চ-প্রাথমিক থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করছে কতজন, তার পরিসংখ্যান থেকে কিছু প্রবণতা লক্ষ করা যায় যা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল এবং আছে। কিন্তু তা আলোচনায় আসে নি তেমন। আমাদের দুর্ভাগ্য, শিক্ষক নিয়োগ বা তাঁদের বদলি-সংক্রান্ত খবর সংবাদ-পরিসরকে যতটা সরগরম রাখে, শিক্ষা ও শিক্ষণ ততটা নয়, শিক্ষার সর্বজনীনতা তো নয়ই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সর্বজনীনতার দিকে অগ্রগতি যেভাবেই মাপা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে এর শম্বুকগতি নজর এড়াবে না। এখানে বলে রাখা উচিত, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি প্রায় সম্পূর্ণতা ছুঁয়ে ফেলেছে বেশ কিছুকাল আগেই, অন্য সব রাজ্যের মতোই। এ রাজ্যের যে কোনও অঞ্চলের যে কোনও প্রাথমিক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি বা ভর্তি হলেও পঞ্চম শ্রেণির আগে ছেড়ে দিয়েছে এমন শিশু এখন এ রাজ্যে প্রায় নেই বললেই চলে, আর তার সমর্থন পাওয়া যায় অ্যানুয়াল সার্ভে অব এডুকেশন রিপোর্ট (সংক্ষেপে ‘এসার’) থেকেও, যা নিয়ে খবর হয়। আর এখান থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়-শিক্ষা নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত সন্তুষ্টিরও জন্ম দেয়। চাপা পড়ে যায় অন্য সত্যটি, যা হল এ রাজ্যে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের সংখ্যা কমেছে অতি ধীরে, অধিকাংশ রাজ্য বা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায়।    

জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (সংক্ষেপে, এনএসএস) পরিসংখ্যানকে যথেষ্ট নির্ভরশীল সূত্র বলেই ওয়াকিবহাল মহল জানে। ২০১৭-১৮ সালে করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ৩৩.৫ শতাংশের মাধ্যমিক বা উচ্চতর ডিগ্রি আছে; যা শুধু সর্বভারতীয় গড়ের থেকে কম তাই নয়, যে কোনও রাজ্যের থেকে নীচে। যে কোনও রাজ্যের থেকে? বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের থেকেও? হ্যাঁ, তাই। তবে এর মধ্যেই কিঞ্চিৎ আলোর রেখা আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে খানকয়েক রাজ্য পাচ্ছি যারা এ বাবদে পশ্চিমবঙ্গের নীচে। অর্থাৎ, শিক্ষিতের হারে মহিলা ও পুরুষের বৈষম্য এ রাজ্যে অন্য বেশ কিছু রাজ্যের তুলনায় কম। একে নারী শিক্ষার অতিমাত্রিক অগ্রগতি হিসেবে দেখব না পুরুষদের শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে পড়া বলব?

পনেরো-ঊর্ধ্ব সবাইকে হিসেবে ধরলে ষাট-সত্তর-আশি বছর বয়স্কও সবাই থাকছেন তার মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, সে তো দূর অতীতের কথা, বহুকাল আগেই তাঁরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার বয়স ফেলে এসেছেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা কেমন করছে সেটা বলুন। ধরা যাক উচ্চমাধ্যমিকের কথা। একাদশ বা দ্বাদশে যত ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত আছে সেই সংখ্যাকে রাজ্যে ১৬-১৭ বয়সীদের মোট সংখ্যার শতাংশ হিসেবে দেখলে যা পাব তাকে বলে ‘গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও’, সংক্ষেপে জিইআর। পূর্বে উল্লেখিত এনএসএস-এর তথ্য থেকেই পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকে জিইআর ৫৪.৪ শতাংশ। আর গোটা দেশে? ৭০.৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যামিক-পরবর্তী স্তরেও মোটামুটি একই চিত্র – সর্বভারতীয় জিইআর পশ্চিমবঙ্গের জিইআর-এর তুলনায় অনেকটাই বেশি। এনএসএস সমীক্ষা নিয়ে সন্দেহ থাকলে অন্য সূত্রও দেখে নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ২০১৯-২০-র অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন  দেখাচ্ছে, সমগ্র ভারতে উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের জিইআর যেখানে ২৬.৯ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে তা ২০.৩ শতাংশ, নীচের দিক থেকে চার নম্বরে। 

শিক্ষা-সক্ষমতার পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা কোথাও কোথাও এগিয়ে থাকলেও (এসার-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যা নিয়ে খবরও হয়েছে) তার প্রকৃত কারণ সম্ভবত অন্য, সংখ্যাতত্ত্বের অতি সরল অঙ্ক। অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী, বিশেষত আর্থ-সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়েরা শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মাঝপথে। তাই বাকিদের শিক্ষা-সক্ষমতার গড় কিছুটা বেশি হওয়ার কথা, যেহেতু যারা বাইরে রইল তাদের সক্ষমতা সামগ্রিক গড়ের থেকে কম হবেই। অর্থাৎ, শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি যত সম্পূর্ণতার দিকে যাবে সামগ্রিক সক্ষমতার গড় মান প্রথমদিকে খানিকটা কমতেই পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ রেখে গড় মানের উচ্চতা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা নির্বুদ্ধিতা।  

মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেই ছেলেরা সরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষভাবে এ এক গভীর সামাজিক সমস্যা। শিক্ষার স্বল্পতার কারণে কাজের বাজারের শ্রেণি বিন্যাসে তাদের জায়গা হচ্ছে নীচের দিকে। যদি ধরে নিই, দারিদ্রের জন্যে শিক্ষা বেশি দূর এগোচ্ছে না (যা পুরোপুরি সত্যি নয়), আবার শিক্ষা অসম্পূর্ণ বলে কাজের বাজারে সুবিধা হচ্ছে না, যার ফলে দারিদ্রমুক্তিও হচ্ছে না – এরকম একটা দুষ্টচক্রের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে কোনও সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে গেলে প্রথম কর্তব্যটি হল, সমস্যাটি যে আছে তা যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করা। লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে অভ্যস্ত ভাবনায় মেয়েদের শিক্ষার কথাই অগ্রাধিকার পায়, কারণ শিক্ষা যে সক্ষমতা দেয় তা জীবনের অন্য মাত্রাগুলিকেও টেনে তোলে নারী-পুরুষের মধ্যে সুযোগের সমতা অভিমুখে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই সাইকেল বিতরণ থেকে কন্যাশ্রী প্রকল্পের লক্ষ্য হয় মেয়েরা। সেখানে ভুল নেই। কিন্তু ছেলেরা অধিক সংখ্যায় বিদ্যালয়-ছুট হওয়ার ফলে মেয়েদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে, এও কাম্য হতে পারে না। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণগুলি মেয়েদের আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেকটাই আলাদা।

কারণের কথায় অনেকেই বলেন, শিক্ষার সুফল যদি কেউ ভবিষ্যৎ যাপনে দেখতে না পায় তাহলে পড়বে কেন? ‘লাভ’ কী? কথাটি বিভ্রান্তিকর। পড়ে একেবারেই লাভ নেই, এ কথা কোনও মা-বাবাই মনে করেন না। যে কোনও ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকেই তা স্পষ্ট। তাহলে? লাভের হিসেবটিকে যদি ‘নীট লাভ’ ধরে দেখি – অর্থাৎ, শুধু সম্ভাব্য প্রাপ্তির দিকে না দেখে ব্যয়কেও হিসেবে ধরি তাহলে সমস্যাটির গোড়ায় পৌঁছনো যায়। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যিটা হল, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষা-অর্জন এমন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে তা অনেক পরিবারের হিসেবে শিক্ষার সম্ভাব্য প্রাপ্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তার কারণ প্রাইভেট টিউশন। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচ যে শূন্য শুধু তাই নয়, মিড-ডে মিল থেকে সাইকেল এমন বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্তির দিকটিকেও বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শুধু প্রাইভেট টিউশনের ব্যয়ভার যাবতীয় ভর্তুকির প্রভাবকে একেবারেই চাপা দিয়ে দিচ্ছে। প্রাইভেট টিউশন কি অন্য রাজ্যে নেই? আছে, তবে এ রাজ্যের মতো সর্বাত্মক নয়। টিউশন না দিতে পারলে পড়া চালিয়ে যাওয়ার মানে হয় না – এমন ভাবনা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। 

বেপথু কল্যাণকামিতা?

জনকল্যাণ বলতে যা বোঝায় তা যে রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে সে বাবদে বিশেষ মতভেদ নেই বোধহয়। কিন্তু কোন নীতিটি আদতে জনকল্যাণের লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে আর কোনটির পিছনে রয়েছে স্রেফ রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য তা নিয়েই যত কূটকচাল। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে নীতিতে জনকল্যাণের সম্ভাবনা নেই তা থেকে রাজনৈতিক লাভই বা হবে কীভাবে? নির্বাচকরা কী দেখে ভোট দেবেন? তাছাড়া সরকার যাঁরা চালান তাঁরা এমন নীতি নিতে যাবেনই বা কেন যা থেকে রাজনৈতিক লাভ নেই? তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ইস্তাহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মেনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করেছিল। ব্যাপ্তি এবং প্রভাবের দিক থেকে দেখলে প্রকল্পটির গুরুত্ব যদিও কম নয়, এর ভালমন্দ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা তেমন দেখি নি। যা দেখেছি তা এক অতি সরলমনা অবস্থান – রাজকোষ উজাড় করে দানখয়রাতি করে সরকার দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে; অথবা প্রকৃত উন্নয়নের দিকে না গিয়ে রাজ্যবাসীকে ভিক্ষাজীবীতে পরিণত করছে। 

একদিকে বড় শিল্প, বড় বিনিয়োগ, আর্থনীতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আর অন্যদিকে ব্যয়বহুল সরাসরি কল্যাণমূলক প্রকল্প – এই দুইয়ের মধ্যে পাল্লাটা কোনদিকে ঝুঁকবে তা নিয়ে বিতর্ক উন্নয়ন চর্চায় নতুন নয়। এর সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসাও সম্ভব নয়। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি যে মূলত দ্বন্দ্বমূলক নয় তা চর্চার জগতে মোটামুটি স্বীকৃত। বস্তুত, উন্নয়নশীল দেশে এই কল্যাণমূলক ব্যয়ের পথ ধরে যে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব তাও স্বীকৃত। তাই শেষমেশ প্রশ্নটা দাঁড়ায়, কোন ধরনের কল্যাণমূলক প্রকল্প অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে কতটা পোক্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, মহিলাদের হাতে খরচ করার ক্ষমতা থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি বাড়ে, যা মানবোন্নয়নের মধ্যে দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে। হাতের কাছেই উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের মধ্যে অর্থকরী কাজে যোগদানের হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। তাই সরাসরি নগদ হস্তান্তরে যে এ রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মহিলার হাতে অল্প হলেও কিছু টাকা আসছে তার সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কোন দল এর থেকে কী ফায়দা ওঠালো সে প্রশ্ন তাই অবান্তর হয়ে যায়।     

তবু প্রশ্ন থেকে যায়। নগদ হস্তান্তর না মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবা প্রদান? যেমন স্বাস্থ্য বা শিক্ষা। কোন কোলে বাজেটের ঝোলটুকু বেশি টানা উচিত? প্রযুক্তির সুবিধার কারণে এখন প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি মানুষের কাছে নগদ পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পকে বলা যায় ‘নাগালে ঝুলন্ত ফল’। তাই রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকারও নাম বদলে (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার) টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে একে চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানুষের কাছে শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার শর্টকাট নেই। বরাদ্দ অর্থকে পরিষেবায় রূপান্তর ও তা গ্রহীতার কাছে পৌঁছনোর পথটি দীর্ঘ ও জটিল, কারণ এই প্রক্রিয়াটিতে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে ব্যবস্থাপনা আর বিপুল সংখ্যক মানুষ যাঁরা পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত। তাই আশঙ্কা হয়, নাগালে ঝুলন্ত ফলের আকর্ষণে অন্য পরিষেবার ব্যবস্থাপনার দিকটি আড়ালে না চলে যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কারক ভূমিকাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যা একজন মহিলাকে করণ-সক্ষমতা (এজেন্সি ফ্রিডম) দিতে পারে। এরকম প্রকল্পের সঙ্গে দাতা-গ্রহীতার অনুষঙ্গটি লেপটে থাকলেও করণ-সক্ষমতা যে ঘটেছে তার প্রমাণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের অনেকেই ভোটটি দিয়েছেন নিজের পছন্দমতো। প্রকল্পের কারক ভূমিকাটি পূর্ণ বিকশিত হতে পারত যদি এর পরিপূরক মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবাগুলিরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটত। 

উৎপাদন পরিকাঠামো না সরাসরি কল্যাণমুখী ব্যয় – কেরলে গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের দশকে এ নিয়ে তীব্র তর্ক চলেছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রভূত উন্নতির কারণে কেরল তার আগেই বিশ্বের নজর কেড়ে ফেলেছে। তখন চিন্তা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন তেমন বাড়ছে না, অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়েই চলেছে। এই উন্নয়নের ‘মডেল’ কি সাসটেনেবল? অনেক উদ্বেগের দিন পেরিয়ে এই শতকের গোড়ায় এসে দেখা গেল, সে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার মন্দ নয়। একে বলা যায় মানবোন্নয়নের ‘উৎকর্ষ চক্র’। দারিদ্রের দুষ্টচক্রের বিপরীত। অর্থাৎ, মানব উন্নয়নে অতীতের মনোযোগের ফলে ভবিষ্যতে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব হল, যা থেকে আরও মানব উন্নয়ন সম্ভব, যা থেকে আবার বৃদ্ধি। অনেকেই মানলেন, আবার অনেকে বললেন বড় শিল্প না হলে সংকট কাটবে না অত সহজে। কিন্তু এই বিতর্ক থেকে যা উঠে এল তা হল, কল্যাণমুখী ব্যয়ও এক চক্কর ঘুরে অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়, আর সেখানে বড় শিল্প থাকতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সেই ব্যয় হতেই হবে সেই সব ক্ষেত্রে যা সরাসরি মানবোন্নয়ন ঘটাতে পারে। 

পশ্চিমবঙ্গকে এই উৎকর্ষ চক্রে সামিল করতে গেলে শিক্ষার প্রতি নিদারুণ অবহেলা থেকে সরে আসতেই হবে। 

শেষ...
প্রথম অংশের লিঙ্ক:


Tuesday, 19 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি (১)

একটি নির্মোহ মূল্যায়ন

অচিন চক্রবর্তী



(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে থাকছে রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে থাকবে বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক

প্রথম অংশ 


পশ্চিমবঙ্গের আর্থনীতিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের অবস্থা নিয়ে অনেক মানুষকেই নিরন্তর উদ্বেগ ও হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা যাচ্ছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের কারণগুলির মধ্যে রাজ্যের অর্থনীতির অনগ্রসরতাকে অন্যতম বলে মনে করেছেন অনেকেই। জনপরিসরে আলোচনায় সাধারণত যে বিষয়গুলি প্রতিনিয়ত উঠে আসত তার তালিকাটি মোটামুটি এ রকম: 

এক) শিল্প হচ্ছে না, ফলত কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বেকারত্ব ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, কাজের খোঁজে মানুষ বাধ্য হচ্ছে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে; 

দুই) মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি অর্থনীতি ও সমাজের নিদারুণ ক্ষতি করছে; 

তিন) সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে-- একদিকে স্কুলছুট বাড়ছে অন্যদিকে যাঁদের আর্থিক ক্ষমতা আছে তাঁরা ছেলেমেয়েদের বাইরে পাঠাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার জন্যে; 

চার) অর্থনীতির সুস্থায়ী উন্নতি ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার তাৎক্ষণিক ‘জনমোহিনী’ নীতির আশ্রয় নিচ্ছে। 

উন্নয়নের যে আখ্যান এই ক্রমবর্ধমান তালিকা থেকে উঠে আসে তাতে ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যের ছাপ এতটাই প্রকট যে বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকার পথে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু একটি দেশের অঙ্গরাজ্য, স্বভাবতই জানতে ইচ্ছা করে আপেক্ষিক বিচারে পশ্চিমবঙ্গ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেই মূল্যায়নে ঢুকতে গেলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার বিকল্প নেই, যদিও যে কোনও বর্ণনায় বর্ণনাকারীর অল্পবিস্তর নিজস্ব চয়নের সম্ভাবনা থাকেই। ফলে, গেলাসটি অর্ধেক খালি না অর্ধেক ভর্তি সে তর্কের অবকাশ রয়ে যায় সদাই। 

মাথাপিছু আয় ও কৃষির কথা

“বর্বর প্রাচুর্য বলিতে যা বুঝায়, তাহার জাজ্বল্যমান চিত্র দেখিলাম রাসবিহারীর সংসারে। যথেষ্ট দুধ, যথেষ্ট গম, যথেষ্ট ভুট্টা, যথেষ্ট বিকানীর মিছরী, যথেষ্ট মান, যথেষ্ট লাঠিসোঁটা। কিন্তু কি উদ্দেশ্যে? ঘরে একখানা ভাল ছবি নাই, ভাল বই নাই, ভাল কৌচ-কেদারা দূরের কথা, ভাল তাকিয়া-বালিস-সাজানো বিছানাও নাই। দেওয়ালে চুনের দাগ, পানের দাগ, বাড়ীর পিছনের নর্দমা অতি কদর্য নোংরা জল ও আবর্জনায় বোজানো, গৃহ-স্থাপত্য অতি কুশ্রী। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে না, নিজেদের পরিচ্ছদ ও জুতা অত্যন্ত মোটা ও আধময়লা। গত বৎসর বসন্ত রোগে বাড়ীর তিন-চারটি ছেলেমেয়ে এক মাসের মধ্যে মারা গিয়াছে। এ বর্বর প্রাচুর্য তবে কোন্‌ কাজে লাগে? নিরীহ গাঙ্গোতা প্রজা ঠেঙাইয়া এ প্রাচুর্য অর্জন করার ফলে কাহার কি সুবিধা হইতেছে? অবশ্য রাসবিহারী সিং-এর মান বাড়িতেছে।" (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আরণ্যক, বানান অপরিবর্তিত)।

প্রাচুর্য নয়, তা ‘কোন্‌ কাজে লাগে’ সেটি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রার মান নিয়ে এই যে প্রশ্ন তুলেছেন বিভূতিভূষণ, অমর্ত্য সেনের প্রশ্নটিও অনেকটা সে রকমই। একজন মানুষ কেমন আছেন তা কোন কোন সূচকে বিচার করতে হবে, সে বাবদে সহমত হওয়া মুশকিল। এখানে দেখছি লেখক বিভূতিভূষণের মাপকাঠিটি রাসবিহারী সিং-এর মাপকাঠি থেকে একেবারেই আলাদা। শুধু তাই নয়, লেখকের মূল্যায়নে প্রচ্ছন্ন যে ইঙ্গিতটি পাচ্ছি তা হল, নিরপেক্ষ বিচারে তাঁর অবস্থানটিই উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু দুজন ব্যক্তির মূল্যায়নের মাপকাঠি যদি এতটাই আলাদা হয়, তাহলে কার বিচারটি নেব? রাসবিহারী সিং-এর বিচারে সবার উপরে ‘মান’, অর্থাৎ স্টেটাস। দুধ, গম, ভুট্টা, বিকানীর মিছরীর প্রাচুর্যর নিরিখে যে মান তাকে আবার বিভূতিভূষণ বলছেন ‘বর্বর’। আধুনিক কালে দেশের ধনীতম ব্যক্তির সীমাহীন প্রাচুর্যকে কেউ বর্বর বলছেন শুনি নি। পার্থক্যটি বোধহয় ওই একদিকে ‘নিরীহ-প্রজা-ঠেঙ্গানো’ আর অন্যদিকে শিল্পের কাণ্ডারি বিশেষণে, যদিও শিল্পের তথা উন্নয়নের ‘প্রয়োজনে’ মানুষকে উৎখাত করে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নেওয়ার সঙ্গে নিরীহ-প্রজা-ঠেঙ্গানো রাসবিহারী সিং-এর পার্থক্য সামান্যই। দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী মনে করিয়ে দেন মহাভারতে ভীষ্ম প্রাচুর্যের প্রদর্শনকে ‘নৃশংস’ বলেছেন, যা তিনি প্রয়োগ করতে চান মুকেশ আম্বানির ২৭ তলা বাড়ি এবং বেড়ে চলা বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রসঙ্গে। যুধিষ্ঠির ভীষ্মের কাছে জানতে চান, নৃশংস কাকে বলব? ভীষ্মের উত্তর, “যে উত্তম ভোজ্য, পেয়, লেহ্য আরও দামি দামি ভোগ্যদ্রব্য (না খেয়ে) চেয়ে থাকা মানুষদের মধ্যে বসে উপভোগ করে খায়, তাকেই নৃশংস বলা উচিত।" বিত্তের কুৎসিত প্রদর্শনকে ভীষ্ম বলছেন নৃশংস (ভাত কাপড়ের ভাবনা এবং কয়েকটি আটপৌরে দার্শনিক প্রয়াস)।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার আর্থনীতিক প্রগতির প্রাথমিক সূচক। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, ভারত সরকারের ভাষ্যে কিন্তু বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় আমরা পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে চলেছি, যা আসলে কিছুই বোঝায় না, যতক্ষণ না তাকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করছি। দেখা যাক নিকট অতীতে পশ্চিমবঙ্গে এই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার কী রকম হয়েছে। মৈত্রীশ ঘটক এবং তাঁর সহযোগীরা বেশ কিছুকাল ধরে এই পরিসংখ্যানের গভীরে ডুব দিয়ে সত্যিটা তুলে এনেছেন। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে মোটামুটি ২০০৫ থেকে। ১৯৯০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার ভারতের তুলনায় বেশি ছিল। বর্তমান শতকের প্রথম দশকের সঙ্গে দ্বিতীয় দশকের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, ভারতের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক দূরত্ব কিছুটা বেড়েছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে দেখছি, ২০২২-২৩-এ পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু বার্ষিক আয় হয়েছে ১,৪১,৩৭৩ টাকা, যেখানে মাঝারি ও বড় মিলিয়ে অন্তত দশটি রাজ্যে মাথাপিছু আয় দু লক্ষ টাকার বেশি। এখান থেকে অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়ার কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়। 

যদি তিনটি মূল ক্ষেত্রের বৃদ্ধির দিকে আলাদাভাবে নজর দিই, দেখব, পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধি ভারতের তুলনায় গত তিন দশকেই বেশি হয়েছে, কিন্তু শিল্প ও সেবা সম্পর্কে তা বলা যায় না। যেমন, ১৯৯০-এর দশকে তিন ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার ভারতের তুলনায় বেশি হয়েছিল। তারপর এই শতকের প্রথম দশকে শিল্পক্ষেত্রের বৃদ্ধির হার আপেক্ষিকভাবে কম হল, কিন্তু সাম্প্রতিকতম দশকে শিল্প ও সেবা উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ বৃদ্ধির হারে পিছিয়ে পড়েছে। 

একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে আছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিকতম দশকে (বলা ভাল, ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮-র মধ্যে) আবার দেখা যাচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু ভোগব্যয়ের বৃদ্ধির হারে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। বস্তুত এই সময়কালে সারা ভারতে মাথাপিছু ভোগব্যয় কিছুটা কমেছে, যা অভূতপূর্ব! সাড়ে চার দশকের মধ্যে সেই প্রথম গড়পড়তা ভারতীয় পরিবারে মাথাপিছু ব্যয় কমল, আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়ল। এই মাথাপিছু ভোগব্যয়কে জীবনযাত্রার গড়পড়তা মান হিসাবে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে কৃষি উৎপাদন ভাল হওয়ার সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার মধ্যে এখানে একটি আপাত সম্পর্কের ইঙ্গিত থাকলেও মনে হয় প্রকৃত সম্পর্কটি ক্ষীণ। কারণ, জাতীয় নমুনা সমীক্ষা থেকে আবার এও দেখা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে একটি ‘কৃষক’ পরিবারের আয়ের অনেকটাই আসে কৃষির বাইরে থেকে। তাই বলা যায়, এ রাজ্যে কৃষি আপেক্ষিকভাবে উৎপাদনশীল হলেও কৃষকদের তা থেকে পর্যাপ্ত আয় হয় না। তাহলে ধরে নিতে হবে কৃষির বাইরে বিবিধ কাজ থেকে আয়ের সংস্থান হচ্ছে। যদিও গড় ভোগব্যয় বেশি হারে বৃদ্ধি থেকে সরাসরি বলা যায় না দারিদ্র বেশি হারে কমেছে, দুইয়ের মধ্যে খানিক সম্পর্ক পাওয়া যায়। আবার পরিবারে অর্থাগম এবং ভোগ্যদ্রব্যের উপরে তার ব্যয়ের পরিমাণ জানা থাকলেই বলে দেওয়া যাবে না পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রার মান কেমন। ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি মিটছে কি না তা আলাদা করে জানা দরকার। কারণ, কেনার ক্ষমতা ছাড়া অন্যভাবেও মিটতে পারে সেগুলি। যেমন, পানীয় জল, শিক্ষা, বা স্বাস্থ্যসেবা। দুটি পরিবারের মাথা পিছু ব্যয় সমান হলেও স্বাস্থ্যসেবা উপলব্ধের সুযোগ তাদের সমান নাও হতে পারে। তাই দারিদ্রের মাপজোক নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁদের একদল অর্থাভাবজনিত দারিদ্রের পরিবর্তে বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচকের পক্ষে সওয়াল করেন। মাত্রাগুলি হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার অন্যান্য আবশ্যিক বিষয়। সম্প্রতি নীতি আয়োগ একটি বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক ব্যবহার করে দেখিয়েছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২১-এর মধ্যে ভারতবর্ষে দারিদ্রমুক্তি হয়েছে সাড়ে তেরো কোটি মানুষের। আবার সেই একই সূচক অনুসারে দেখছি, ২০১৯-২১-এ গুজরাত আর পশ্চিমবঙ্গের বহুমাত্রিক দারিদ্র প্রায় সমান – যথাক্রমে ১১.৬৬ শতাংশ আর ১১.৮৯ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ২০১৫-১৬ থেকে বহুমাত্রিক দারিদ্র কমেছেও বেশি পশ্চিমবঙ্গে, যদিও গুজরাতের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণেরও বেশি! এই চমকপ্রদ বৈপরীত্যকে উল্লেখ করতেই হয়। 

শিল্পের ভূত ভবিষ্যৎ

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প যে একেবারেই হয় নি তা কিন্তু নয়। তবে আপেক্ষিক বিচারে সেই পিছিয়ে পড়ার গল্প। কেন্দ্রীয় শিল্প মন্ত্রকের তথ্য অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২০-র মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ১৩৮টি বড় শিল্প স্থাপিত হয়েছে। একই সময়কালে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা – এই আটটি রাজ্যের প্রত্যেকটিতে এর থেকে বেশি শিল্প হয়েছে। এই তথ্য দেখলে উদ্বেগ স্বাভাবিক। শিল্পে বড় বিনিয়োগের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ অনেক রাজ্য থেকে পিছিয়ে আছে। কিন্তু ভুললে চলবে না, ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের হিসেব এর মধ্যে নেই। সে হিসেব সহজে পাওয়াও যায় না। আর সে জন্যেই হয়তো যাবতীয় আলোচনা সমালোচনা টাটা থেকে তেলেভাজার আখ্যান-এ আটকে থাকে। সর্বশেষ যে তথ্য পাচ্ছি তা ২০১৫-১৬-র জাতীয় নমুনা সমীক্ষা থেকে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংখ্যা সে সময়ে ছিল প্রায় ৮৯ লক্ষ, যা সর্বোচ্চে থাকা উত্তরপ্রদেশের থেকে মাত্র এক লক্ষ কম। দেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ১৪ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। ২০১২ থেকে ২০২০-র মধ্যে শিল্পক্ষেত্রে যে ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি হতে দেখা যাচ্ছে তার অনেকটাই যে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে এসেছে তা আন্দাজ করা যায়। আর যে শিল্পক্ষেত্রে প্রায় এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষ নিযুক্ত তাকে উড়িয়েই বা দিই কী করে! 

কিন্তু সমস্যাটি কর্মে নিযুক্তির সংখ্যা থেকেও তার মর্মবস্তু নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প উৎপাদনের একটি প্রধান সমস্যা শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম, যার কারণ পুঁজির নিযুক্তি কম। একজন গড়পড়তা কর্মী যতটা মূল্য যোগ করে মোট উৎপাদনমূল্যে, যাকে বলে ‘ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কার’, সেই নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় গড় থেকে পিছিয়ে আছে। এই ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কারের হিসেবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কম হলে শ্রমিকদের আয় তেমন বাড়তে পারে না। যদিও এটি বেশি হলে যে শ্রমিকের মজুরি বেশি হবেই তার নিশ্চয়তা নেই; শেষমেশ তা নির্ভর করে পুঁজির মালিকের সঙ্গে দর কষাকষিতে শ্রমিকরা কতটা সফল হচ্ছে তার উপর, আর তাকে সীমায়িত করে রাখে ওই ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কার। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা যে অন্য রাজ্যের তুলনায় বেশি তা নয়, এ রাজ্যে শ্রমিকের আয় অপেক্ষাকৃত কম।          

ক্রমশ...

দ্বিতীয় অংশের লিঙ্ক:

https://ekakmatra2013.blogspot.com/2026/05/blog-post_20.html



Friday, 15 May 2026

পরীক্ষার স্বচ্ছতা রসাতলে

নীট দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



কোথাও চাকরি তো কোথাও ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি। 'ডবল ইঞ্জিন' সরকারের জমানাতেও... হয়েই চলে।.২০২৪'এর পর ২০২৬। নির্দিষ্ট করে বললে, ঠেকানোর সদিচ্ছাই নেই। নইলে এসব 'করিয়ানরা' সরকার বাহাদুরের বদান্যতায় প্রাইজ পোস্টিং পান! এই তো অচ্ছে দিন! 

এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁসে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের স্নাতক স্তরের ডাক্তারির প্রবেশিক পরীক্ষা নীট (ইউজি) হয়েছিল গত ৩ মে। ৯ দিন কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশ জুড়ে চলতি বছরের নীট (ইউজি) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মোদী সরকারের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা বাতিলের কথা ঘোষণা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। 

কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের ভার সিবিআইকে দিয়েছে। সিবিআই তদন্তও শুরু করে দিয়েছে। যারা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে বিজেপির এক নেতাও আছে। যদিও বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দেওয়াটাই এখন প্রশাসনিক দস্তুর। বিজেপি যে জড়িত, এটা আমার কষ্টকল্পিত নয়, রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত এক্স-এ একটি পোস্টে দাবি করেছেন, 'নীট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত দীনেশ বিনওয়াল ভারতীয় জনতা পার্টির একজন কর্মকর্তা।' গেহলত অভিযুক্তের একটি পোস্টারের ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে জয়পুর গ্রামীণ এলাকার বিজেওয়াইএম-এর জেলা সম্পাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি মুকেশ দধিচ বলেছেন, দলে বিনওয়ালের কোনও পদ নেই। 

এবার নীট (ইউজি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের এপিসেন্টার রাজস্থান। বিজেপি শাসিত রাজস্থান। যেখানে বিরোধীদের ট্যাঁফোঁ করতে দেওয়া হয় না। আমি নিশ্চিত, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত হইচই না করলে আরও অনেক কিছুর মতো এই কেলেঙ্কারিও চাপা পড়ে যেত। এতদিনে হয়তো প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলও প্রকাশ পেয়ে যেত; কেননা, ৩ মে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা উঠে এসেছিল কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। বাংলা জয়ের গর্বে বলীয়ান বিজেপি সেই বিজয়বার্তা সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার ধামাকায় নীট কেলেঙ্কারি চাপা দিয়ে ফেলেছিল প্রায়। তবে শেষরক্ষা হল না। পরীক্ষার ৮ দিন পর ১১ মে এনটিএ জানিয়েছে, পরীক্ষা বাতিল আর ১২ মে জানিয়েছে, ফের নীট (ইউজি) পরীক্ষা কবে তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। কবে অ্যাডমিট কার্ড পাওয়া যাবে ও পরীক্ষার সময়সূচিও জানিয়ে দেওয়া হবে। নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। নতুন করে পরীক্ষার ফি-ও দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। কী মহানুভবতা! 

লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী যথার্থই নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসে কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় তোপ দেগে এক্স-হ্যান্ডেলে রাহুল লেখেন, 'নীট ২০২৬ সালের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। ২২ লাখের বেশি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নকে দুর্নীতিগ্রস্ত বিজেপি সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাবারা তাঁদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঋণ নিয়েছেন, মায়েরা তাঁদের গয়না বেচে দিয়েছেন। লাখ লাখ বাচ্চারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেছে। বদলে কী পেল তারা? প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারের গাফিলতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগঠিত অপরাধ। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রত্যেকবার পেপার মাফিয়ারা বেঁচে যায় আর সৎ পড়ুয়ারা সাজা পায়। ফের লাখ লাখ পড়ুয়াকে মানসিক চাপ, আর্থিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। যদি কারও ভাগ্য কঠোর পরিশ্রমের বদলে অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাদের যোগাযোগ কতটা তার উপর নির্ভর করে, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? প্রধানমন্ত্রীর 'অমৃতকাল' দেশের জন্য বিষ কালে পরিণত হয়েছে।'  

সর্বভারতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও স্বচ্ছতা আজ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে সিবিআই'এর প্রধান কাজটিই হবে, এই দুর্নীতির মাথাদের বাঁচানো। অতীতে বহু তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআই এই কাজটাই করে এসেছে। আর লক্ষ করবেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এ ব্যাপারে কোনওরকম হইচই করছে না। টিভির পর্দায় কোনও চিৎকারজীবী বলবে না, 'দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? যুব সম্প্রদায়ের তো চাকরি নেই। ভারতের বেকারত্বর হার সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। ডাক্তারি কোর্সে পড়তে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েরা টাকা খরচ করছে। এবছর নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। কেন্দ্রীয় সরকার কী বলছে? ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি কি প্রশ্নপত্র নিলামে চড়িয়ে দিল?' কেউ দাবি করবে না, কেন্দ্রকে এর জবাব দিতে হবে। খোলসা করতে হবে, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, থাকলে সেই পৃষ্ঠপোষক কারা? 

নীট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে গোটা দেশে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। বেনজির অনিয়মের অভিযোগে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন  ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, দেশ জুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। খাস রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই প্রথম নয়। নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশ জুড়ে শোরগোল পড়েছিল। সে সময় অভিযোগ ওঠে, ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের ওয়েসিস স্কুল থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ওই স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মীকে গ্রেফতার করে সিবিআই। সিবিআই নীটের বেশ কিছু আধপোড়া প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছিল। সেই প্রশ্নপত্র খতিয়ে দেখার পর ঠিক কোন কেন্দ্র থেকে ফাঁস হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সিবিআই তখন দাবি করেছিল, পঙ্কজ কুমার ওরফে আদিত্য ওরফে সাহিল নামে এক যুবকের সঙ্গে মিলিত ভাবে ওয়েসিস স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মী প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। এবারও তদন্তর মতিগতি দেখে ২০২৪ সালের কথাই মনে পড়ছে। 

রিসাইকল অফ মেমোরি যেন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত। আর এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে বেশ কিছু 'ভদ্রবিত্ত' মানুষের নাম। যেমন মনে পড়ছে সুবোধ কুমার সিংয়ের কথা। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র প্রাক্তন এই প্রধানকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও বিস্ময়কর মোড় নিয়েছে। ১৯৯৭ ব্যাচের ছত্তিশগড় ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার সুবোধ কুমার সিং। আইআইটি রুরকির মতো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর ইগনু থেকে এমবিএ করা এই আধিকারিক এক সময় প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খনিজ সম্পদ নিলামে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে সাফল্যের জন্য তিনি জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে পুরেছিলেন। ২৯ বছরের কেরিয়ারে ৩০টির বেশি সম্মানীয় পদে কাজ করেছেন। মোদী জমানায় তাঁর কেরিয়ার গ্রাফ দেখবার মতো। ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি এনটিএ-র ডিরেক্টর জেনারেল পদে আসেন। আর তিনি যখন এই দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই যেন দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর কার্যকালেই ভারতের কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষামূলক কেলেঙ্কারিগুলো দানা বাঁধে। ২০২৪ সালের নীট-ইউজি এবং ইউজিসি-নেট পরীক্ষার সময় যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। নীট পরীক্ষায় দেড় হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীকে বিতর্কিতভাবে 'গ্রেস মার্কস' দেওয়া, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নেট পরীক্ষা বাতিল করা এবং বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রের জাল বিস্তার— সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনটিএ তখন কেবল অস্বীকারের রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে সেই বছরের জুন মাসে মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রক স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এটি একটি 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা'। চাপের মুখে ২০২৪ সালের ২২ জুন সুবোধ কুমার সিংকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে 'কম্পালসরি ওয়েট'-এ পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা হয়, লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে হয়তো কঠোর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে মোদী সরকার যেন স্বচ্ছতার পথে হাঁটল। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুলে যায় বা জানেই না, আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা এক জটিল সমীকরণ নিয়ে চলে। তাই সুবোধের ওই অপসারণটি আদৌ কোনও শাস্তি ছিল না, ছিল আইওয়াশ। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীনই ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছাত্র ও অভিভাবক মহলে এটি 'শাস্তির বদলে পুরস্কার' হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। শুধু ওইটুকুই নয়, ২০২৪ সালের শেষে সুবোধ কুমার সিং কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন ছেড়ে তাঁর পুরনো ক্যাডার ছত্তিশগড়ে ফিরে যান। সেখানে তখন বিজেপির নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মোদী-শাহর আস্থাভাজন বিষ্ণু দেও সাই। সেই সরকার গঠন হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি 'মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব' (Principal Secretary) পদে বসানো হয়। প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এই পদটি কতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন তা নিশ্চয়ই পাঠককে বলে দিতে হবে না। শুধু এটুকুই নয়, সুবোধ সিংয়ের অগ্রগতি চলছেই। ২০২৬ সালে তাঁর পুরস্কারের বহর আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের ৬ মে এক সরকারি নির্দেশে তাঁকে ছত্তিশগড় রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভেবে দেখুন, ঠিক কোন সময় তাঁর ঘাড়ে এই বিশেষ দায়িত্ব বর্তাচ্ছে! যখন ২০২৬ সালেও নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে দেশ উত্তাল, সেখানে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানের এমন লাগামহীন উন্নতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, গেরুয়া ভারত কোন রসাতল অভিমুখী। সুবোধ সিং নাম্নী এই আধিকারিকের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ ছিল, আজ তিনি একটি গোটা রাজ্যের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বাজেট আর নীতি নির্ধারণের সর্বেসর্বা। যেখানে এটা ২০২৪-এর দুর্নীতির ফসল, সেখানে ২০২৬ সালের এই নতুন পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুবোধ কুমার সিংয়ের পদোন্নতি এক অশুভ সংকেত বহন করছে। 

মনে রাখবেন, পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ভারতে অন্তত ১৫টি বড় সরকারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ কোটি পরীক্ষার্থী।


Saturday, 9 May 2026

এবারের ২৫ বৈশাখ

'তাসের দেশ' ও সেই পদযাত্রা

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'তাসের দেশ' লিখেছিলেন। উৎসর্গ করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। শতবর্ষ পানে অগ্রসরমান এই নৃত্যনাট্যটি এবারের ২৫ বৈশাখে তাসের দল'কে মনে করাতে পারে। 

২০১২ সালের ২৫ বৈশাখের আশপাশে 'একক মাত্রা' একটি অনবদ্য সংখ্যা প্রকাশ করেছিল যার প্রচ্ছদ বিষয় ছিল 'অন্য রবীন্দ্রনাথ'। বৈচিত্র্য ও গভীরতার গুণে সেই সংখ্যার এত কদর হয়েছিল যে তার আর অবশিষ্ট কপি পড়ে নেই। সেবার ছিল কবিগুরুর সার্ধশতবর্ষ কাল।

তিনি এইভাবেই বারে বারে ফিরে আসেন।

এবারের ২৫ বৈশাখ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বাংলা ৩০ আশ্বিন, ১৩১২) দিনটিকেও মনে করাতে পারে। কারণ, বাংলার অগুনতি মানুষ আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩, ৯ মে ২০২৬) ১৬ অক্টোবর দিনটিকে স্মরণ করে আবারও হাঁটার প্রস্তুতি নিয়েছেন সেই পথ ধরে যে পথে তিনি গঙ্গার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো ছুঁয়ে পৌঁছেছিলেন নাখোদা মসজিদ অবধি। তাঁর অপার কর্মসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ তো ব্যাপ্ত ও সর্বজনীন; মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার সমস্ত আবেদনেই তিনি আছেন। ১৬ অক্টোবর (১৯০৫) ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিন। সেই দিনটিকে তিনি এক অনন্য প্রতিবাদী রূপ দেন। ডাক দেন 'অরন্ধন' ও 'রাখিবন্ধন' উৎসব পালনের। সেদিন ঘরে ঘরে উনুন জ্বলবে না এবং একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে এই বার্তা দেওয়া হবে যে, ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশ ভাগ করলেও বাঙালির হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করতে পারবে না।

সেদিন ভোরে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাবেশ গঙ্গার জগন্নাথ ঘাটে (মতান্তরে, বাগবাজার বা সংলগ্ন কোনও ঘাট) সমবেত হয়। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল গঙ্গাস্নানের মধ্য দিয়ে। সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল উক্ত ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে। স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে রবীন্দ্রনাথ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। যখন মিছিল শুরু করেন, তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারণ ধুতি, গায়ে চাদর এবং পায়ে কোনও জুতো ছিল না। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তাঁরই রচিত সেই কালজয়ী গান: 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।'

মিছিল উত্তর কলকাতার বিভিন্ন গলি ও প্রধান রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে সামনে হেঁটে একেকজন পথচারী, রিকশাচালক এবং সাধারণ মানুষের হাতে রাখি বেঁধে দিচ্ছিলেন। কোনও ভেদাভেদ নেই, সবার লক্ষ্য একটাই, অখণ্ড বাংলা। মিছিল চিৎপুর রোড হয়ে নাখোদা মসজিদের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাপথের সবচেয়ে আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল যখন মিছিলটি চিৎপুর রোডের নাখোদা মসজিদের সামনে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন চিত্তে মসজিদের ভেতরে এবং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম মৌলবি ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের দিকে এগিয়ে যান। প্রথা ভেঙে তাঁদের কবজিতে রাখি বেঁধে দেন। এই অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মিছিল যখন এগোচ্ছিল, তখন কেবল পুরুষরাই নন, বাড়ির অন্দরমহল থেকে মহিলারাও জানলা ও বারান্দা দিয়ে উলুধ্বনি দিচ্ছিলেন এবং শাঁখ বাজাচ্ছিলেন। অনেকেই রাস্তার ওপর নেমে এসে মিছিলে যোগদান করেন। জনশ্রুতি আছে, স্বদেশি তহবিলের জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের যথাসর্বস্ব দান করছিলেন। এমনকি রাস্তার ধারের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— যারা হয়তো জানতেনও না যে রবীন্দ্রনাথ কে— তাঁরাও কবির বাড়িয়ে দেওয়া হাতের রাখি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন। মিছিলটি যখন একটি আস্তাবলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে কর্মরত সহিসদের দেখে রবীন্দ্রনাথ থমকে দাঁড়ান, নিজ হাতে তাদের হাতেও রাখি বেঁধে দেন।

পদযাত্রার শেষে সেই উত্তাল জনসমুদ্র এসে জমায়েত হয় আপার সার্কুলার রোডে (বর্তমান আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) অবস্থিত ফেডারেশন হল প্রাঙ্গণে। সেখানে আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্বে এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আনন্দমোহন বসু উপস্থিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ 'বিজয় সম্মিলনী'র গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং বাংলার অখণ্ডতার শপথ নেন। তিনি তো কেবল নিভৃতচারী কবি নন, বরং জাতির দুর্দিনে একজন দক্ষ সেনাপতি ও পথপ্রদর্শক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেদিন পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, সেদিন মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা এবং ঐক্য তিনি দেখেছিলেন, তা কলকাতার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। সমগ্র শহরটি যেন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিল।

আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩) আবারও সেই একই পথ ধরে হাঁটবেন শয়ে শয়ে মানুষ। তেমনই ভেবেছেন ও প্রস্তুতিও নিয়েছেন। অন্তত ১২০ বছর পর। হয়তো গাইবেন 'বাংলার মাটি বাংলার জল...'।