আত্মধ্বংসের কারণ
রাজীব ভট্টাচার্য
আজকের উচ্চ প্রযুক্তির এই পৃথিবীতে ভোগবাদ এবং দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলার পথে 'মানুষের মনোযোগ'কে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানকারী ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির কাছে এই মনোযোগকে দখল করা, বিশ্লেষণ করা ও মুনাফার মাধ্যমে ব্যবসা করাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় বেরলে বা বাসে ট্রামে চড়লেই বোধকরি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন যার হাতে বা পকেটে মোবাইল নামক যন্ত্রটি নেই। তার সঙ্গে হয়তো দু' কানে লাগানো রয়েছে দুটি হেডফোন যাতে রাস্তায় চলতে চলতে অথবা বাস বা ট্রামের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলোর দিকে চোখ গেলেও আসল আকর্ষণ কিন্তু থেকে যায় মোবাইল ফোনে, যেখানে ভেসে ওঠা বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ছবি, বিজ্ঞাপন ও তথ্য গভীরভাবে মনোযোগকে বন্দী করে রাখে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ছাত্রদের মনোযোগের সিংহভাগ কেড়ে নিয়েছে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ। পড়তে পড়তে বেশিরভাগ সময়ই মন চলে যায় হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক কিংবা ইউটিউব'এর বিভিন্ন ছবি, রিল ও ভিডিও'র দিকে। বই খোলা রেখেই বন্ধুকে ইনস্টাগ্রাম বা মেসেঞ্জারে দ্রুত উত্তর পাঠানো ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক চলে আসা ছবি, ভিডিও ও নানাবিধ বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে দ্রুত এক পলকে পেরিয়ে যাওয়া, ছাত্রদের প্রতিনিয়ত সাধারণ অভ্যাসে পরিণতি পেয়েছে। তাই 'মনোযোগ অর্থনীতি' (Attention Economy) হল এমন একটি আধুনিকতম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে বিজ্ঞাপন চালিত সংস্থাগুলি মানুষের সীমিত, দুর্লভ ও মূল্যবান মনোযোগকে তাদের পণ্যের দিকে সর্বাধিক সময় ও মনোযোগ আকর্ষণে আগ্রহী।
মানুষের মনোযোগ বা একাগ্রতা একটি সীমিত সম্পদ যা এই প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলি অ্যালগরিদম'এর মাধ্যমে নিষ্কাশন করে, প্যাকেজিং বা রূপদান করে তাকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনও উপায়ে বিক্রি মারফত অর্থ ও মুনাফা উপার্জন করে। অর্থাৎ, এই ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে মানুষের মনোযোগ ও তার পণ্যকরণ বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির মুখ্য বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে লেনদেনের একটি বিরাট বাজার উন্মোচিত হয়েছে। এই ধরনের বাজার অর্থনীতিতে মানুষের মনোযোগ হল লেনদেনের মুদ্রা এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি দালাল বা ব্রোকারের ভূমিকা পালন করে। এখানকার মূল কৌশলটি হল, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের মঞ্চগুলি বিনামূল্যে পরিষেবা দান করে কিন্তু তারা রাজস্ব উৎপাদন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য যুক্ত ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বিক্রয়ের মাধ্যমে, যেগুলি বিজ্ঞাপন সংস্থার দ্বারা পরিচালিত। তাই প্রায়ই দেখা যায় যে, ইউটিউবে কোনও গান বা তথ্যচিত্র দেখার সময় প্রায়ই বিজ্ঞাপনগুলি আমাদের মনঃসংযোগকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। গুগল বা মেটার মতো বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল সৃষ্টি করেছে মানুষের মনোযোগকে আটক বা বন্দী করা ও ব্যবহারকারীর মনোযোগকে অর্থে রূপান্তরিত করার জন্য।
এই মনোযোগ অর্থনীতির জনক হিসেবে যার নামটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেন অধ্যাপক হারবার্ট আলেকজান্ডার সাইমন। ১৯৭১ সালে নোবেল সম্মানে ভূষিত আমেরিকার এই গবেষকের গবেষণার মূল বিষয় ছিল কম্পিউটার বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও জ্ঞানীয় দর্শন। তিনি বিখ্যাত হন তাঁর 'সীমাবদ্ধ যৌক্তিকতা' বা 'বাউন্ডেড র্যাশনালিটি' নামক কাজের জন্য। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখা বিখ্যাত 'ডিজাইনিং অর্গানাইজেশন ফর ইনফরমেশন রিচ ওয়ার্ল্ড' নিবন্ধে তিনি প্রথম এই মনোযোগ অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেন। ওনার মূল বিষয়বস্তুটি তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল:
১) তথ্যের অতিরিক্ততা ও মনোযোগের সীমাবদ্ধতা;
২) মনোযোগের সর্বোত্তম বন্টন বা ব্যবহার এবং
৩) মূল্যবান মূল্য সৃষ্টি।
অর্থনীতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন তত্ত্বের সঙ্গে মনোযোগ অর্থনীতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। যেমন, অর্থনীতি চর্চার মূল বিষয় হল সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও তার সাথে বেড়ে চলা মানুষের অসীম চাহিদা। মনোযোগ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের মনোযোগ সীমিত কিন্তু তাকে আকর্ষণ করার তথ্যের ভান্ডারটি অসীম। শুধু তাই নয়, অর্থের মতোই মনোযোগ একটি দুর্মূল্য সম্পদ, যা একবার খরচা করলে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। মনোযোগের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ-ব্যয়ের তত্ত্ব রয়েছে যা বলে, যে কোনও একটি বিষয়ের উপর যখন মনোযোগ দেওয়া হয় তখন তা অন্য বিষয়কে বঞ্চিত করে।
এই মনোযোগ অর্থনীতির সাথে নিবিড় ভাবে যুক্ত আচরণগত অর্থনীতি যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও আবেগপ্রবণ বিষয়গুলি নিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলিকে প্রভাবিত করার কথা বলে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই মঞ্চগুলি কোনও পক্ষপাত মুক্ত স্থান নয় বরং এগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত মতাদর্শ, রাজনীতি, ক্ষমতা, সামাজিক বিভাজন বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা। গুগল বা ইউটিউব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সমস্ত মাধ্যমগুলি ব্যক্তিগত সুপারিশ, পরামর্শ বা পছন্দ অনুযায়ী বিষয়গুলিকে উপস্থাপিত করে যার মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই আমাদের মনোযোগকে বেশি সময়ের জন্য আটকে রাখা। ইদানীং জনপ্রিয় একটি শব্দ 'ফোমো'এর (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) ফলশ্রুতি হল, মানুষ ঘনঘন তার হাতে থাকা মোবাইলে সমাজ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের উপর নজর রাখবে যাতে কোনও বিষয় তার হাতছাড়া না হয়। তবে এই 'ফোমো' এখন রূপান্তরিত হয়েছে 'জোমো'তে যার অর্থ 'জয় অফ মিসিং আউট'-- বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দিনের মধ্যে পাঁচ থেকে আট ঘন্টা এই ধরনের সমাজ মাধ্যমের মঞ্চ ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত সামাজিক সংযোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে। তাই আজ বর্তমান প্রজন্মের একাকীত্ব প্রযুক্তিগত জীবনের আকস্মিক উপজাত নয়, বরং তা মনোযোগ অর্থনীতিরই পরিকল্পিত পরিণতি। ভারতবর্ষে ২০২৪ সালের শিক্ষার বার্ষিক অবস্থা রিপোর্ট (এসইআর) অনুযায়ী, ১৪ থেকে ১৬ বছরের ভারতীয় শিশুদের ৮২.২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করে; তার মধ্যে ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করে শিক্ষাক্ষেত্রে কিন্তু ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের জন্য। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের দোষ দিলে বিষয়টির গভীরতা একটু হালকা করে দেখা হবে। কারণ, এই ধরনের সমাজ মাধ্যমে মানুষের মনোযোগকে আটকে রাখার জন্য এই মঞ্চগুলি আমাদের সামনে উপস্থাপিত করছে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রকৌশল দল যাদের উচ্চ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই ধরনের মনোযোগ আকর্ষণ করার নকশা তৈরির কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।
এটি বর্তমান প্রজন্মের বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া বা লেখা অথবা কোনও জটিল প্রশ্নের সমাধান মাথা খাটিয়ে বের করা-- এসবের বদলে অনেক সহজ হয়ে গেছে গুগল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তার সমাধান করা। তাই মনোযোগের সংক্ষিপ্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। পড়াশোনা ও সমাজ মাধ্যম-- এই দুটির মধ্যে ঘন ঘন আসা যাওয়ার ফলে স্মৃতিশক্তি ও সূক্ষ্মচিন্তন হ্রাস পেয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে এই ধরনের সামাজিক মাধ্যমের প্রতি আসক্তির কারণেই। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিভিন্ন রকমের ভুল তথ্য ও তার মাধ্যমে আর্থিক লাভ ও বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে প্রতারিত করার পথ। দৃষ্টিশক্তির সমস্যার সাথে সাথে বেড়েছে নানারকম মানসিক সমস্যা। অতিরিক্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উচ্চমাত্রায় দুশ্চিন্তা ঘুমের ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের এবং সাধারণ মানুষের কর্মজীবনের কর্মক্ষমতা ও উৎকর্ষতা দুইই হ্রাস পেয়েছে। তাই এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
মনোযোগ একটি মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য সম্পদ। অতএব, তার সঠিক সংরক্ষণ ও প্রয়োগ ভীষণভাবে জরুরি। এ ক্ষেত্রে কতকগুলি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলে মনোযোগ অর্থনীতির সমস্যাগুলি কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। প্রথমত, একই সঙ্গে বহু রকমের কাজে মনোনিবেশ না করে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাজে সুনির্দিষ্ট সময় মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কাজের সময় এই সামাজিক মাধ্যম বা মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ রাখা অথবা দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময় এই জন্য বেঁধে নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, গভীরভাবে কাজে মনোনিবেশের জন্য মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়ার যে পদ্ধতি তা অবলম্বন করলে অনেক সময় তার সুফল পাওয়া যায়। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর জন্য নানা ভাবে শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নিয়ম-কানুনের পরিবর্তন প্রয়োজন। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম এবং মানসিক সচেতনতা বৃদ্ধি অনেক সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সঠিক কাজে লাগিয়ে কর্মজীবনের উন্নতি করার ক্ষেত্রে এই ধরনের মনোযোগ অর্থনীতি যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা সম্বন্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের বেশি করে অবহিত করা এবং সরকারের মাধ্যমে বিভিন্ন রকম নিয়মকানুন নির্ধারণ করা বিশেষ প্রয়োজন।




