কল্যাণমুখী ব্যয়ও অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়
অচিন চক্রবর্তী
(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে ছিল রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে রইল বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক।)
দ্বিতীয় অংশ
দুর্নীতির রকমফের
যে সমস্যাটি এ রাজ্যের জনপরিসর অনেকটাই দখল করে রেখেছে বেশ কিছুকাল তা হল দুর্নীতি। সামাজিক মাধ্যমে এ ওকে তুলোধোনা করেছে দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে না বলে। দুর্নীতি নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের সরব হওয়া না হওয়ার অপেক্ষায় অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। অ-ভাজপা রাজ্যগুলিতে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় রাজ্যের ক্ষমতাশীল দলকে বিপাকে ফেলতে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে বদলি, সর্বত্র যেরকম আর্থিক লেনদেনের কথা জানা গেছে তা নিয়ে মানুষ যে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ তা বলা যায়। দুর্নীতি যেহেতু অগণিত কাজের মধ্যে দিয়ে হয়, এবং দুর্নীতি কেউ চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে করে না, ফলে দুর্নীতির তথ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু দেশে দেশে দুর্নীতির আন্দাজ দিতে ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো সংস্থা কিছু বিশেষ ধরনের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। এই পরিসংখ্যান আদতে দুর্নীতির ব্যাপ্তি নিয়ে মানুষজনের কী উপলব্ধি তাকে ধরার চেষ্টা করে। মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে যদি বাস্তবের সম্পর্ক নাও থাকে তাহলেও এই তথ্যের গুরুত্ব আছে অর্থনীতিতে, কারণ মানুষ ধারণার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার যদি ধারণা হয়ে থাকে কোনও দেশে দুর্নীতি খুব বেশি, যদিও বাস্তবে তা নয়, আমি সেখানে বিনিয়োগ করব না হয়তো। বোঝাই যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতাও হয় বিভিন্ন। ব্যবসায়ীর কাছে এক রকম, সরকারি আধিকারিকের কাছে এক রকম, সাধারণ একজন পরিষেবা গ্রাহকের কাছে আর এক রকম। মানুষ যে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধাভোগী সেগুলি সম্পর্কে, কিংবা যে সব সরকারি আধিকারিকদের তাঁরা ভাল ব্যবহার করতে দেখেছেন সামনে থেকে তাঁদের সম্পর্কে, ভাল ধারণা পোষণ করে থাকেন। দুর্নীতি থাকলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।
তাহলে প্রশ্ন, পূর্ববর্তী শাসক দলের বিরুদ্ধে এই যে এত দুর্নীতির প্রমাণ তুলে আনল তদন্তকারী সংস্থাগুলি, অধিকাংশ মানুষ যদি ক্ষুব্ধ হন তা নিয়ে, তার প্রভাব পড়েছে হয়তো নির্বাচনের ফলে। অর্থনীতিতে দুর্নীতির দীর্ঘকালীন প্রভাব কেমন হতে পারে? তা যতটা নির্ভর করে দুর্নীতির প্রকৃতির উপর, দুর্নীতির বহরের উপর ততটা নয়। ধরা যাক যে বস্তুটি আইনত প্রাপ্য নয় সেটি কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী এমএলএ, ছোট বড় সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিকের থেকে অর্থের বিনিময়ে পেলেন। যেমন অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকের চাকরি, যে ‘শিক্ষক’ চাকরির যোগ্য নন। আর এক ধরনের দুর্নীতি হতে পারে, যেখানে আইনত প্রাপ্য বস্তুটি পেতেই আমাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যেমন আমি কলেজ সার্ভিস কমিশন দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি আমার মেধার নিরিখে। এবার আমি যখন কলেজে যোগ দিলাম, আমার বেতনক্রম স্থির করতে যে ফাইল যাবে বিকাশ ভবনে, তা যাবে না যদি না আমি কিছু অর্থ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে দিই। এ কাজটি করার কথা যদিও কলেজেরই। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে এমন অজস্র ‘পেয়ে থাকি’র সম্মুখীন হয়তো আমাদের সবাইকেই হতে হয়েছে – পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে জমির মিউটেশন। এতে আমরা আর অবাক হই না। কিন্তু এখানে ইচ্ছে করেই এমন একটি দৃষ্টান্ত দিলাম যা এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের, এবং যা সত্যি বলে জানি।
ঘুষ নেওয়া এবং দেওয়া এ দুটি কর্মই এ দেশে অপরাধ বলে গণ্য হয়। অথচ উপরে দৃষ্টান্ত সহ যে দুই ধরনের ঘুষের কথা বললাম, আইনের চোখে তারা সমান। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, দ্বিতীয় ধরনের দুর্নীতি আইনের একটু এদিক ওদিক করেই অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। যিনি ঘুষ দিয়েছেন তাঁকে অপরাধী না করে যিনি নিয়েছেন তাঁকে যদি শনাক্ত করায় উৎসাহিত করা যায় তাহলে দুর্নীতি কমতে পারে। কিন্তু প্রথম ধরনের দুর্নীতি, যা থেকে দু' পক্ষই লাভ করছে, যা আইনত তাদের প্রাপ্য নয়, এ ধরনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বেজায় কঠিন, কারণ কোনও পক্ষেরই একে প্রকাশ্যে আনার কোনও ইনসেন্টিভ নেই।
অর্থের বিনিময়ে চাকরি এবং তার সঙ্গে জড়িত সমস্যাগুলি শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্ভবত সব থেকে বেশি প্রভাবিত করেছে। অপরাধের তদন্ত থেকে কোর্টকাছারির ব্যাপার স্যাপার সমাজমাধ্যমে যেভাবে জায়গা করে নেয়, বহু ছেলেমেয়ে যে শিক্ষা বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে সেই গভীর সমস্যাটির দিকে আলোকপাত হয় না। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় শিক্ষার রূঢ় সত্যটি হল, কোভিডের ধাক্কার আগেও এ রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছতে পারে নি, অন্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। তার সঙ্গে যদি অতিমারির ক্ষতিকে একত্রে দেখি তাহলে সংকটের গভীরতার প্রকৃত ছবিটি পাওয়া যাবে। কোভিডের আগেও প্রতি বছর ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ যে শিক্ষার অঙ্গন থেকে অকালে বিদায় নিচ্ছিল – এই জরুরি কথাটি অনুধাবন প্রয়োজন।
শিক্ষার কেন্দ্রীয় ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গবাসীদের মধ্যে উচ্চ-প্রাথমিক থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করছে কতজন, তার পরিসংখ্যান থেকে কিছু প্রবণতা লক্ষ করা যায় যা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল এবং আছে। কিন্তু তা আলোচনায় আসে নি তেমন। আমাদের দুর্ভাগ্য, শিক্ষক নিয়োগ বা তাঁদের বদলি-সংক্রান্ত খবর সংবাদ-পরিসরকে যতটা সরগরম রাখে, শিক্ষা ও শিক্ষণ ততটা নয়, শিক্ষার সর্বজনীনতা তো নয়ই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সর্বজনীনতার দিকে অগ্রগতি যেভাবেই মাপা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে এর শম্বুকগতি নজর এড়াবে না। এখানে বলে রাখা উচিত, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি প্রায় সম্পূর্ণতা ছুঁয়ে ফেলেছে বেশ কিছুকাল আগেই, অন্য সব রাজ্যের মতোই। এ রাজ্যের যে কোনও অঞ্চলের যে কোনও প্রাথমিক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি বা ভর্তি হলেও পঞ্চম শ্রেণির আগে ছেড়ে দিয়েছে এমন শিশু এখন এ রাজ্যে প্রায় নেই বললেই চলে, আর তার সমর্থন পাওয়া যায় অ্যানুয়াল সার্ভে অব এডুকেশন রিপোর্ট (সংক্ষেপে ‘এসার’) থেকেও, যা নিয়ে খবর হয়। আর এখান থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়-শিক্ষা নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত সন্তুষ্টিরও জন্ম দেয়। চাপা পড়ে যায় অন্য সত্যটি, যা হল এ রাজ্যে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের সংখ্যা কমেছে অতি ধীরে, অধিকাংশ রাজ্য বা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায়।
জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (সংক্ষেপে, এনএসএস) পরিসংখ্যানকে যথেষ্ট নির্ভরশীল সূত্র বলেই ওয়াকিবহাল মহল জানে। ২০১৭-১৮ সালে করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ৩৩.৫ শতাংশের মাধ্যমিক বা উচ্চতর ডিগ্রি আছে; যা শুধু সর্বভারতীয় গড়ের থেকে কম তাই নয়, যে কোনও রাজ্যের থেকে নীচে। যে কোনও রাজ্যের থেকে? বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের থেকেও? হ্যাঁ, তাই। তবে এর মধ্যেই কিঞ্চিৎ আলোর রেখা আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে খানকয়েক রাজ্য পাচ্ছি যারা এ বাবদে পশ্চিমবঙ্গের নীচে। অর্থাৎ, শিক্ষিতের হারে মহিলা ও পুরুষের বৈষম্য এ রাজ্যে অন্য বেশ কিছু রাজ্যের তুলনায় কম। একে নারী শিক্ষার অতিমাত্রিক অগ্রগতি হিসেবে দেখব না পুরুষদের শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে পড়া বলব?
পনেরো-ঊর্ধ্ব সবাইকে হিসেবে ধরলে ষাট-সত্তর-আশি বছর বয়স্কও সবাই থাকছেন তার মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, সে তো দূর অতীতের কথা, বহুকাল আগেই তাঁরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার বয়স ফেলে এসেছেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা কেমন করছে সেটা বলুন। ধরা যাক উচ্চমাধ্যমিকের কথা। একাদশ বা দ্বাদশে যত ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত আছে সেই সংখ্যাকে রাজ্যে ১৬-১৭ বয়সীদের মোট সংখ্যার শতাংশ হিসেবে দেখলে যা পাব তাকে বলে ‘গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও’, সংক্ষেপে জিইআর। পূর্বে উল্লেখিত এনএসএস-এর তথ্য থেকেই পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকে জিইআর ৫৪.৪ শতাংশ। আর গোটা দেশে? ৭০.৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যামিক-পরবর্তী স্তরেও মোটামুটি একই চিত্র – সর্বভারতীয় জিইআর পশ্চিমবঙ্গের জিইআর-এর তুলনায় অনেকটাই বেশি। এনএসএস সমীক্ষা নিয়ে সন্দেহ থাকলে অন্য সূত্রও দেখে নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ২০১৯-২০-র অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন দেখাচ্ছে, সমগ্র ভারতে উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের জিইআর যেখানে ২৬.৯ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে তা ২০.৩ শতাংশ, নীচের দিক থেকে চার নম্বরে।
শিক্ষা-সক্ষমতার পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা কোথাও কোথাও এগিয়ে থাকলেও (এসার-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যা নিয়ে খবরও হয়েছে) তার প্রকৃত কারণ সম্ভবত অন্য, সংখ্যাতত্ত্বের অতি সরল অঙ্ক। অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী, বিশেষত আর্থ-সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়েরা শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মাঝপথে। তাই বাকিদের শিক্ষা-সক্ষমতার গড় কিছুটা বেশি হওয়ার কথা, যেহেতু যারা বাইরে রইল তাদের সক্ষমতা সামগ্রিক গড়ের থেকে কম হবেই। অর্থাৎ, শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি যত সম্পূর্ণতার দিকে যাবে সামগ্রিক সক্ষমতার গড় মান প্রথমদিকে খানিকটা কমতেই পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ রেখে গড় মানের উচ্চতা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা নির্বুদ্ধিতা।
মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেই ছেলেরা সরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষভাবে এ এক গভীর সামাজিক সমস্যা। শিক্ষার স্বল্পতার কারণে কাজের বাজারের শ্রেণি বিন্যাসে তাদের জায়গা হচ্ছে নীচের দিকে। যদি ধরে নিই, দারিদ্রের জন্যে শিক্ষা বেশি দূর এগোচ্ছে না (যা পুরোপুরি সত্যি নয়), আবার শিক্ষা অসম্পূর্ণ বলে কাজের বাজারে সুবিধা হচ্ছে না, যার ফলে দারিদ্রমুক্তিও হচ্ছে না – এরকম একটা দুষ্টচক্রের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে কোনও সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে গেলে প্রথম কর্তব্যটি হল, সমস্যাটি যে আছে তা যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করা। লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে অভ্যস্ত ভাবনায় মেয়েদের শিক্ষার কথাই অগ্রাধিকার পায়, কারণ শিক্ষা যে সক্ষমতা দেয় তা জীবনের অন্য মাত্রাগুলিকেও টেনে তোলে নারী-পুরুষের মধ্যে সুযোগের সমতা অভিমুখে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই সাইকেল বিতরণ থেকে কন্যাশ্রী প্রকল্পের লক্ষ্য হয় মেয়েরা। সেখানে ভুল নেই। কিন্তু ছেলেরা অধিক সংখ্যায় বিদ্যালয়-ছুট হওয়ার ফলে মেয়েদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে, এও কাম্য হতে পারে না। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণগুলি মেয়েদের আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেকটাই আলাদা।
কারণের কথায় অনেকেই বলেন, শিক্ষার সুফল যদি কেউ ভবিষ্যৎ যাপনে দেখতে না পায় তাহলে পড়বে কেন? ‘লাভ’ কী? কথাটি বিভ্রান্তিকর। পড়ে একেবারেই লাভ নেই, এ কথা কোনও মা-বাবাই মনে করেন না। যে কোনও ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকেই তা স্পষ্ট। তাহলে? লাভের হিসেবটিকে যদি ‘নীট লাভ’ ধরে দেখি – অর্থাৎ, শুধু সম্ভাব্য প্রাপ্তির দিকে না দেখে ব্যয়কেও হিসেবে ধরি তাহলে সমস্যাটির গোড়ায় পৌঁছনো যায়। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যিটা হল, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষা-অর্জন এমন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে তা অনেক পরিবারের হিসেবে শিক্ষার সম্ভাব্য প্রাপ্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তার কারণ প্রাইভেট টিউশন। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচ যে শূন্য শুধু তাই নয়, মিড-ডে মিল থেকে সাইকেল এমন বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্তির দিকটিকেও বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শুধু প্রাইভেট টিউশনের ব্যয়ভার যাবতীয় ভর্তুকির প্রভাবকে একেবারেই চাপা দিয়ে দিচ্ছে। প্রাইভেট টিউশন কি অন্য রাজ্যে নেই? আছে, তবে এ রাজ্যের মতো সর্বাত্মক নয়। টিউশন না দিতে পারলে পড়া চালিয়ে যাওয়ার মানে হয় না – এমন ভাবনা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না।
বেপথু কল্যাণকামিতা?
জনকল্যাণ বলতে যা বোঝায় তা যে রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে সে বাবদে বিশেষ মতভেদ নেই বোধহয়। কিন্তু কোন নীতিটি আদতে জনকল্যাণের লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে আর কোনটির পিছনে রয়েছে স্রেফ রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য তা নিয়েই যত কূটকচাল। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে নীতিতে জনকল্যাণের সম্ভাবনা নেই তা থেকে রাজনৈতিক লাভই বা হবে কীভাবে? নির্বাচকরা কী দেখে ভোট দেবেন? তাছাড়া সরকার যাঁরা চালান তাঁরা এমন নীতি নিতে যাবেনই বা কেন যা থেকে রাজনৈতিক লাভ নেই? তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ইস্তাহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মেনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করেছিল। ব্যাপ্তি এবং প্রভাবের দিক থেকে দেখলে প্রকল্পটির গুরুত্ব যদিও কম নয়, এর ভালমন্দ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা তেমন দেখি নি। যা দেখেছি তা এক অতি সরলমনা অবস্থান – রাজকোষ উজাড় করে দানখয়রাতি করে সরকার দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে; অথবা প্রকৃত উন্নয়নের দিকে না গিয়ে রাজ্যবাসীকে ভিক্ষাজীবীতে পরিণত করছে।
একদিকে বড় শিল্প, বড় বিনিয়োগ, আর্থনীতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আর অন্যদিকে ব্যয়বহুল সরাসরি কল্যাণমূলক প্রকল্প – এই দুইয়ের মধ্যে পাল্লাটা কোনদিকে ঝুঁকবে তা নিয়ে বিতর্ক উন্নয়ন চর্চায় নতুন নয়। এর সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসাও সম্ভব নয়। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি যে মূলত দ্বন্দ্বমূলক নয় তা চর্চার জগতে মোটামুটি স্বীকৃত। বস্তুত, উন্নয়নশীল দেশে এই কল্যাণমূলক ব্যয়ের পথ ধরে যে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব তাও স্বীকৃত। তাই শেষমেশ প্রশ্নটা দাঁড়ায়, কোন ধরনের কল্যাণমূলক প্রকল্প অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে কতটা পোক্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, মহিলাদের হাতে খরচ করার ক্ষমতা থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি বাড়ে, যা মানবোন্নয়নের মধ্যে দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে। হাতের কাছেই উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের মধ্যে অর্থকরী কাজে যোগদানের হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। তাই সরাসরি নগদ হস্তান্তরে যে এ রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মহিলার হাতে অল্প হলেও কিছু টাকা আসছে তার সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কোন দল এর থেকে কী ফায়দা ওঠালো সে প্রশ্ন তাই অবান্তর হয়ে যায়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। নগদ হস্তান্তর না মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবা প্রদান? যেমন স্বাস্থ্য বা শিক্ষা। কোন কোলে বাজেটের ঝোলটুকু বেশি টানা উচিত? প্রযুক্তির সুবিধার কারণে এখন প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি মানুষের কাছে নগদ পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পকে বলা যায় ‘নাগালে ঝুলন্ত ফল’। তাই রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকারও নাম বদলে (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার) টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে একে চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানুষের কাছে শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার শর্টকাট নেই। বরাদ্দ অর্থকে পরিষেবায় রূপান্তর ও তা গ্রহীতার কাছে পৌঁছনোর পথটি দীর্ঘ ও জটিল, কারণ এই প্রক্রিয়াটিতে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে ব্যবস্থাপনা আর বিপুল সংখ্যক মানুষ যাঁরা পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত। তাই আশঙ্কা হয়, নাগালে ঝুলন্ত ফলের আকর্ষণে অন্য পরিষেবার ব্যবস্থাপনার দিকটি আড়ালে না চলে যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কারক ভূমিকাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যা একজন মহিলাকে করণ-সক্ষমতা (এজেন্সি ফ্রিডম) দিতে পারে। এরকম প্রকল্পের সঙ্গে দাতা-গ্রহীতার অনুষঙ্গটি লেপটে থাকলেও করণ-সক্ষমতা যে ঘটেছে তার প্রমাণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের অনেকেই ভোটটি দিয়েছেন নিজের পছন্দমতো। প্রকল্পের কারক ভূমিকাটি পূর্ণ বিকশিত হতে পারত যদি এর পরিপূরক মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবাগুলিরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটত।
উৎপাদন পরিকাঠামো না সরাসরি কল্যাণমুখী ব্যয় – কেরলে গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের দশকে এ নিয়ে তীব্র তর্ক চলেছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রভূত উন্নতির কারণে কেরল তার আগেই বিশ্বের নজর কেড়ে ফেলেছে। তখন চিন্তা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন তেমন বাড়ছে না, অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়েই চলেছে। এই উন্নয়নের ‘মডেল’ কি সাসটেনেবল? অনেক উদ্বেগের দিন পেরিয়ে এই শতকের গোড়ায় এসে দেখা গেল, সে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার মন্দ নয়। একে বলা যায় মানবোন্নয়নের ‘উৎকর্ষ চক্র’। দারিদ্রের দুষ্টচক্রের বিপরীত। অর্থাৎ, মানব উন্নয়নে অতীতের মনোযোগের ফলে ভবিষ্যতে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব হল, যা থেকে আরও মানব উন্নয়ন সম্ভব, যা থেকে আবার বৃদ্ধি। অনেকেই মানলেন, আবার অনেকে বললেন বড় শিল্প না হলে সংকট কাটবে না অত সহজে। কিন্তু এই বিতর্ক থেকে যা উঠে এল তা হল, কল্যাণমুখী ব্যয়ও এক চক্কর ঘুরে অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়, আর সেখানে বড় শিল্প থাকতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সেই ব্যয় হতেই হবে সেই সব ক্ষেত্রে যা সরাসরি মানবোন্নয়ন ঘটাতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গকে এই উৎকর্ষ চক্রে সামিল করতে গেলে শিক্ষার প্রতি নিদারুণ অবহেলা থেকে সরে আসতেই হবে।







