Friday, 17 April 2026

একটি রগরগে গল্প নয়

ফুলটুসি আরও পড়বে, লিখবে, বলবে

শুক্তিসিতা



ফুলটুসি। অ্যাসিডে আক্রান্ত একটি কুড়ি বছরের মেয়ে। হাসপাতাল, পুলিশ ফাইল, বেদনার্ত গোঙানি সব পেরিয়েও বাপ-মা ঠাওরালেন নিশ্চয় বাবলুকে টুসি কিছু প্রশ্রয় দিয়েছিল, নইলে এইভাবে...। এই কুরূপা মেয়ের আর বিয়ে হবে কোনওদিন? পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে। জ্বালা কমেনি, ব্যথাও কমেনি একটুও। অ্যাসিড ওর গলা, ডান দিকের কানের ওপর পড়েছিল। ফুলটুসি এখন কানে কম শুনছে। ঠোঁট দুটো এমনভাবে ঝুলে গেছে যে ও আর ভালো করে খেতে পারে না। ফুলটুসির সেকেন্ড ইয়ারটা আর থার্ড ইয়ার হবে না। ফুলটুসির ডান চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবু একটা চোখ দিয়ে ও পড়তে চেয়েছিল। না, হবে না। লোকলজ্জার নিদারুণ চাপ ওর গোটা পরিবারকে পিষে ফেলছে। বাবার মুদির দোকানটা ভালোই চলত। এখন বাবা একবেলা খোলেন। মায়ের চোখের জলে সারাটা বাড়ি যেন সপ্‌সপ্ করে।

ক্ষতিপূরণের ক’টা টাকা পাবার জন্য ফুলটুসির বাবাকে খুব দৌড়োদৌড়ি করতে হচ্ছে। ফুলটুসির সেজ পিসেমশাই ডাক্তার। সেদিন ফোনে মাকে বলছিলেন, 'প্লাসটিক সার্জারি করিয়ে নিন না বৌদি, বিশ লাখ টাকার মতো পড়বে।' মা আর কিছু উত্তর দেননি।

এই সামান্য কাহিনী পশ্চিমবাংলায় অজ্ঞাত নয়, অশ্রুতও নয়। একটি লিঙ্গ আগ্রাসনের গল্প। কিন্তু তেমন রগরগেও নয়। অথচ কেউ যেন প্রশ্নচিহ্নের পেরেক বসিয়ে গেল সামনে। শরৎচন্দ্র মহাশয়ের ‘অরক্ষণীয়া’র সঙ্গে আংশিক মিলের পরও একজন একটি আশ্চর্য কিস্সা শোনালো যে একজন ফর্সা দুধে আলতা সুন্দরী কিশোরী চরম অবসাদে ভুগছে কারণ তাকে কেউ ভালোবাসে না; কেউ তার সখী নয়। সবাই তাকে ঈর্ষা অথবা ঘৃণা করে। অথচ বছরে ৪৫ কোটি ডলারের বাণিজ্য করে ফেলছে ফর্সা হবার ক্রিম। আমাদের বাল্যকাল জুড়ে স্নো হোয়াইটের বিপন্ন বিমাতা, এই রূপকথা বপন করেছে যে আয়না থেকে সমাজের চোখ তাকে দেখে আর ক্রমাগত কুৎসিত প্রতিপন্ন করে আর কোনও এক নগণ্য ফর্সা মেয়েকে সেরা সুন্দরীর শিরোপা দিয়ে দেয়। না, এটি শুধু বর্ণবৈষম্যবাদের গল্প নয় যে। গোটা নারীত্ব যাকে সিমোন দ্য বোভোয়া মনে করেন একটা আরোপিত সত্তা বহনের অভিযাত্রা— তাকে একটি বাধ্যত সামাজিক সত্তা হতে হয় বলেই তার ওপর রূপসী হবার, নিখুঁত হবার দায় এসে পড়ে। তন্বী হবার জন্য শত শত মেয়ে মার্কিন মুলুকে অ্যানারোক্সিয়া নার্ভোসারোগের শিকার হয় স্রেফ ক্ষুধার্ত থেকে; এমনকি মারাও যায়। আর এই গরিব দেশে রাস্তাঘাটে একটি সামান্য শৌচাগারের অভাবে মূত্রনালীতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে কত হাজার মহিলা। না, রাষ্ট্র এ সব ভাববে পরে। 

রাষ্ট্রও মেয়েদের বোঝাবে যে পিল খেয়ে নাও; গর্ভ নিরোধ করো; তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষমতায়িত হও। পিল খাওয়ার গোপন পন্থাটি স্বামী/শ্বশুরবাড়ি জানতে পারে না ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না, দম্পতি কেন একত্রে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বা পুরুষটি কেন নিজে পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব নেয় না।

ফুলটুসি তো বাবলুকে বলেছিল, বিয়ের আগে শরীরী সম্পর্কে গেলে সমস্যা হতে পারে, বরং কিছু ব্যবস্থা নিয়ে... বাবলু রাজি হয়নি। তাই ফুলটুসির গাল, ঠোঁট, চুল, গলা ঝলসে গেল।

আচ্ছা, যশোদার গর্ভে যে কন্যা জন্মে মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত হয়ে বাঁচাতে গেল কৃষ্ণ অবতারকে, পাশবিক শক্তির দুর্দান্ত বজ্রমুষ্টি ভেদ করে তো সে মিলিয়ে যায় আকাশে! আসলে পুরাণ খোলসা করে বলে না, সেই শিশুকন্যাটিকেও কংস হয়তো পাথরে ঠুকে হত্যা করেছিল। আগের সাতটি শিশুর মতো। ঈশ্বরের জন্য ঈশ্বরী বলি হয়ে গেল নিশ্চুপে। এও কি এক 'যৌনতার রাজনীতি’ নয়? হয়তো নিরস্তিত্বতার রাজনীতি। মণিপুরে থাংজাম মনোরমার স্তন ও যোনিদেশে গুলিবিদ্ধ করে ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট করা হয়। প্রতিবাদী নারী'রা নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উত্তর এটাই। তবুও এই দশকে আর কি কোনও নারী প্রতিবাদীকেই মনে পড়ে? এখনও ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর ভাইদের দলে প্রীতিলতা, দুকড়িবালা, বীণা দাস, ননীবালার মতো বোনেদের মনে পড়ে না। সমাজ বদলের স্বপ্নে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরোধিতায় কর্পোরেট লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যে মেয়েরা পথে নেমেছেন বারবার, তেভাগা আন্দোলনের বুধনি ওরাওঁনি, জৈবন বিবি, সাবেরা খাতুন, দুলি কিস্কু। নকশালবাড়ি আন্দোলনে কুনী টুডু, জয়া মিত্র, মেরী টাইটলার। কারওকেই না। 

ফুলটুসি কলেজে কোনওদিন রাজনীতি করেনি। বাবার বারণ ছিল। বাবলুরও। কিন্তু ফুলটুসি সত্যি রাজনীতির স্বপ্ন দেখত। ছাত্রছাত্রীদের হস্টেলের সমস্যা, অধ্যাপকদের নিয়মিত হাজিরা, অথবা ‘নতুন শিক্ষানীতি’ এইসব। সবই খোয়াব হয়ে রইল। আচ্ছা ওর জীবনে এই যে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিগ্রহ হল, তার জবাব চাইবে কে? কোন রাজনৈতিকতা?

১৯৫২ সালে ভারতের সংসদে ৩৯ জন বুদ্ধিমতী, সপ্রতিভ, উচ্চাশী মহিলা সংসদ সভা আলো করেছিলেন। সর্বমোট সাংসদের ৫.৫ শতাংশ, অথচ সেই সময়ে মার্কিন দেশে ১.৭ শতাংশ আর যুক্তরাজ্যে ১.১ শতাংশ মহিলা সংসদের অধিকার পেয়েছিলেন। আর এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তথাকথিত প্রগতিশীল বাম দলগুলিকে কখনওই দেখা যায়নি মহিলা নেত্রীদের জেলা সভাপতি/সচিব পদে অধিষ্ঠিত করতে। এমনকি গৃহশ্রমের বেলাতেও যখন ১৯৭০'এর পরই প্রথম কথা উঠল যে মেয়েদের গৃহশ্রমের স্বীকৃতি তথা রোজগারের ব্যবস্থার কথা, তখনও কিন্তু কম্যুনিস্টরা বলেছিলেন, এতে গৃহশ্রমের প্রাতিষ্ঠানিকতা মান্যতা পাবে। নারীমুক্তি সুদূর পরাহত হয়ে যাবে তো! অথচ সমাজতন্ত্রীরা বিস্মৃত হলেন গৃহশ্রম শুধু শ্রমিক উৎপাদনই করে না শ্রমিকের কর্মশক্তিরও জোগান দেয়, ফলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’ ফাঁকিতে গৃহশ্রমিকরাও বস্তুত ইউনিয়নবিহীন অবস্থানে বাধ্যত নৈঃশব্দ্যের পর্দার পিছনে অপসৃত হন।

এমন আজব দিনও আসতে পারে গৃহশ্রমের মজুরি একেবারে শ্রম আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়ে গেল। অমনি সব পুরুষেরা পিলপিল করে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হ্যাঁ এমনটাই হয়। যখন ছত্তিশগড়ে লৌহখনিতে বা অন্ধ্রপ্রদেশে তামাক শিল্পে প্রযুক্তি প্রবেশ করল, তখন রাতারাতি মেয়েরা ছাঁটাই হয়ে গেলেন।

মেয়েরা অবিশ্যি পরিবারের জন্য নিত্য বাসে, অটোয়, ট্রেনে বাইরেও কাজ করতে যাচ্ছেন। 'চুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে/ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি রাত থাকতে ওঠে।' তারপর লালগোলা/বনগাঁর ট্রেনে চাল তোলেন বস্তা করে। কোভিড শুরুর বেলা এঁরা ‘Superspreader’ ছিলেন; অচ্ছুৎ। কিন্তু বেশিদিন চলল না। গৃহ পরিচারিকা না এলে যেমন Work from home নিরুপদ্রবে করা যায় না, তেমনই মাসি-পিসি রেল গার্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে চাল শহরে না নিয়ে এলে কী খাবে শহুরে বাবুরা? 

ফুলটুসি এখন একটা চোখে দেখে। তবু কাগজ পড়ে নিয়মিত। বইও পড়ে। থেরীগাথা পড়ছিল। বুদ্ধদেবের প্রতি মেয়েদের অভিমান আছে বৈকি। গোড়ায় তিনি মা গৌতমীকেও সঙ্ঘারামে ঢোকার অনুমতি দেননি। আবার অগ্রশ্রাবিকা উৎপলবর্ণা ধর্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও আশ্রমে স্থান দিয়েছিলেন। সন্তানহীনাকে পরিত্যাগ করতে মানা করেছিলেন তাঁদের স্বামীদের। ফুলটুসি কি পরিত্যাজ্য? না। ফুলটুসি এখন এক চোখ দিয়ে প্রুফ দেখার কাজ শিখেছে। 

ফুলটুসি গল্পগুচ্ছ পড়ছিল রোববার দুপুরবেলা। ‘মণিহারা’ আর ‘কঙ্কাল’ পড়বার পর ওর মনে হচ্ছিল সে যুগের মেয়েদের যখন জীবনটা বেঁচে থাকতেই অন্ধকার, তাই বিদ্রোহ কি মৃত্যুতেই শুরু হতে চাইছিল? যেমন গৃহপ্রাণা মণিমালিকা অন্ধকার মৃত্যুদেশ পেরিয়ে এসে ফণিভূষণের চৈতন্যের কাছে তার সম্পদের হিসাব চাইছে? অথবা ‘কঙ্কাল’-এর বিধবা মেয়েটি কিছুতেই দাদার ডাক্তার বন্ধুকে ভুলতে পারে না বলেই শীতল অস্থিপঞ্জর থেকে স্বরক্ষেপণ করতে চায় নবাগত যুবকের বুকে? উচ্চারণ করতে চায় তার অবহেলিত অনুচ্চারিত প্রেম? তাহলে ‘জীবিত ও মৃত’র কাদম্বিনী যে ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’? আসলে ওই মিথ্যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাদম্বিনী ভেঙে ফেলেছিল সব উল্লম্ব সম্পর্কের শিকল। সেই ভাঙনের অভিঘাত তার পরিবার ও সমাজ সহ্য করতে পারেনি বলে সে মৃত্যুবরণ করে সমাজকে মুক্তি দিয়ে গেল। তাহলে নারীমুক্তির বর্তমান ব্যাকরণটা কী? 

আজকাল ‘সহজিয়া’ দলের দুই দাদা আর দিদি আসেন ফুলটুসির কাছে। ‘সহজিয়া’ কাজ করে অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের পুনর্বাসন, আর্থিক সশক্তিকরণ নিয়ে। তাদেরই কি জিজ্ঞেস করবে এই ‘নারীমুক্তির সংজ্ঞা’? টিভিতেই কি ফুলটুসি দেখেছিল ইরানি-মার্কিনি সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ'কে? যিনি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর উল্লসিত সকালটাকে উদ্‌যাপন করছিলেন ইরানের হিজাব-বিরোধী মেয়েদের জন্য? ফুলটুসিও কি উল্লসিত হবে? ফুলটুসির বাবা কাগজে ভোটের খবর পড়েন। ওর ভাই ফোনে যুদ্ধ দেখে। দুটোই যুদ্ধ। তখন ফুলটুসিকে অনেকদিন আগে ওর কলেজের প্রোফেসর বলেছিলেন PWAG (Peace Women Across the Globe)-র কথা, যাঁরা ২০০৫-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার জন্য মনোনীতও হয়েছিল। কিন্তু পায়নি। ভূ-রাজনীতির নানা তত্ত্ব। অর্থনীতি, শস্ত্রনীতি এমনকি বেচারা ভূতত্ত্বও। ফুলটুসি বোঝে না। বুঝতে চেয়েছে কী?

না, কারণ ফুলটুসি জানে, তার ঐ দুনিয়া-জোড়া সংঘটনার সাধ্যি নেই ফুলটুসির ব্যথা কমায়, জ্বালা থামায়, ওর বুকের ওপর শান্তিজল ছেটায়। নাইট্রিক অ্যাসিড তো থাকার কথা ছিল শিল্প তালুকে, কারখানায়। সেটা খোলা বাজারে পাওয়া গেল বলেই না বাবলু সেটা ঢেলে দিল ফুলটুসির শরীরে! সম্পর্কের গর্ভের অন্ধকারে যে হিংসার মৌল লুকিয়ে থাকে, সে তো মোটেও ‘রেয়ার আর্থ’ মৌল নয়। তাহলে তো ‘সহজিয়া’র কাছে এত আর্তনাদ জমা পড়ত না (অ্যাসিড হিংসার ঘটনায় ভারতের মধ্যে এখন প্রথম বাংলা)। 

আজ ‘সহজিয়া’ দলের অনিন্দিতাদি আসবে। ওর প্রুফগুলো নিয়ে যাবে। আর ওর পাওনা টাকাও দিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহে ফুলটুসি প্রেসে যাবে। ওখানে গেলে আরও কাজ পাবে। না, ওড়না পরে নয়। সবাই দেখুক আসল ‘বাবলু’কে। নকল বাবলু নিখোঁজ। ফুলটুসি আরও পড়বে। লিখবে, বলবে। যাতে বাবলুরা সবাই 'নিখোঁজ'ই থাকে। এই সমাজের জন্য। সেদিন সব যুদ্ধ বন্ধ হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অনিরুদ্ধ রাহা ও অপরাজিতা গাঙ্গুলী বোস, ‘আলোক’ ফাউন্ডেশন।


Tuesday, 14 April 2026

ষোড়শ অর্থ কমিশনের বৈষম্য!

কেন্দ্রের হাতেই অধিক ক্ষমতা?

রাজীব ভট্টাচার্য



১৯৫১ সালে অর্থ কমিশনের শুরু থেকে সংবিধান স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন ও ব্যয়ভার নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে বিভাজন, তা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেয়ারম্যান ডঃ অরবিন্দ পানাগড়িয়ার নেতৃত্বে গঠিত ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পার্লামেন্টে পেশ করা হয়। এই রিপোর্টের সুপারিশগুলি পাঁচ বছরের (২০২৬-৩১) জন্য ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে লাগু হল। ভারতীয় সংবিধানে রাজস্ব ক্ষমতার বিভাজন বলতে ত্রিস্তরীয় কাঠামোতে (কেন্দ্র, রাজ্য ও স্থানীয়) সরকারের কর ধার্য করা, ব্যয়ভার ও তহবিল বরাদ্দের বন্টনকে বোঝানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে আর্থিক, রাজস্ব ও ব্যয় বন্টনের সাংবিধানিক বিভাজনকে রাজস্ব যুক্তরাষ্ট্রীয়তা (Fiscal Federalism) বলে। 

ভারতবর্ষে রাজস্বের সাংবিধানিক বিভাজনে অপেক্ষাকৃত উচ্চ প্লবমান (bouyant) রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, ব্যক্তিগত আয়কর, কোম্পানি বা কর্পোরেট কর ও বহিঃ শুল্ক) রয়েছে কেন্দ্রের হাতে, অথচ, রাজ্যগুলির হাতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত নিম্ন প্লবমান রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, দ্রব্য কর, ভূমি রাজস্ব, পেট্রো পণ্য বিক্রয়লব্ধ কর এবং অ্যালকোহল যুক্ত পানীয়র উপর কর)। এছাড়া রাজ্যগুলির উপরে রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে (যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি) ব্যয়ভারের বাধ্যবাধকতা। এই ধরনের বিভাজন আসলে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে  উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার (vertical fiscal imbalance) জন্ম দেয়। এই ভারসাম্যহীনতা মূলত তিনটি উপায়ে দূর করা যেতে পারে: (ক) কিছু উচ্চ প্লবমান করের উৎস কেন্দ্রের থেকে রাজ্যের হাতে স্থানান্তরিত করা; (খ) রাজ্যের উপর থেকে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যয়ভার লাঘব করা ও (গ) সাংবিধানিক পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত কিছু কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেন্দ্র থেকে রাজ্যে হস্তান্তরিত করা। এগুলির মধ্যে তৃতীয়টি হল সর্বাপেক্ষা যুক্তিগ্রাহ্য পদ্ধতি। ভারতবর্ষে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংবিধানের ২৮০ ধারায় অর্থ কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। এই কমিশন মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে তাদের সুপারিশ দেয়:

(ক) কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্বের বিভাজন এবং রাজ্যগুলির নিজেদের মধ্যে রাজস্বের অংশ বিভাজন;

(খ) সাহায্য অনুদান (grant-in-aid) নীতি নির্ধারণ করা; 

(গ) গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে অতিরিক্ত সম্পদ প্রদানের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের সুপারিশগুলিকে পর্যালোচনা করা ও তার যথোপযুক্ত অনুমোদন দেওয়া; 

(ঘ) পৌরসভাগুলিকে অতিরিক্ত অর্থ সাহায্যের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলির সঠিক বাস্তবায়ন করা; 

(ঙ) অন্যান্য কোনও বিষয় যেটি সুস্থ ও মজবুত অর্থায়নের ব্যাপারে জরুরি, তার রূপায়ণ করা।

পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের মতোই ষোড়শ অর্থ কমিশনও রাজ্যগুলির জন্য ৪১ শতাংশ শেয়ার (করের ৪০ শতাংশ এবং কর ছাড়ের ১ শতাংশ) ভাগের উল্লম্ব বিভাজন বহাল রেখেছে, যদিও অনেক রাজ্যের তরফেই নিট আয়ের (net proceeds) ৫০ শতাংশ শেয়ার চাওয়া হয়েছিল। উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে তিনটি মূল বিষয় ষোড়শ অর্থ কমিশনের সামনে বিচার্য ছিল: 

(ক) সারচার্জ ও সেস্'এর ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি সত্ত্বেও মোট রাজস্ব আয়ের কম শতাংশ হস্তান্তরিত হওয়া; 

(খ) কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা করে (GST) আধাআধি বন্টনের ফলে মূল্য সংযোজন করের (value-added tax) জমানা (যেখানে রাজ্যের অংশ ছিল ১৪.৫ শতাংশ) থেকে পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) আমলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশ;

(গ) বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত পরিকল্পনায় (central government sponsored scheme) রাজ্যের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। 

রাজ্যগুলির মধ্যে কেন্দ্রীয় রাজস্ব সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য অর্থ কমিশন নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড বিভিন্ন আনুপাতিক গুরুত্ব সমেত স্থির করে দিয়েছে। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল মাথাপিছু আয়ের দূরত্ব (সহজ কথায়, একটি অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের সাথে সর্বাপেক্ষা বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের অথবা প্রথম তিনটি সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের গড়ের মধ্যে দূরত্ব)। রাজ্যগুলির মধ্যে সমতা বজায় রাখতে মাথাপিছু আয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলিকে বেশি পরিমাণ রাজস্ব বন্টনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল জনসংখ্যা, যে ক্ষেত্রে রাজস্ব বন্টনের সময় একটি রাজ্যের মোট জনসংখ্যায় (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) তার অংশ কত সেটি বিচার করা হয়। তৃতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয়টি, জনসংখ্যার বিবর্তনের কর্মক্ষমতা (demographic performance)। ষোড়শ অর্থ কমিশন এই জনসংখ্যা বিবর্তনের পরিমাপের ক্ষেত্রে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সংজ্ঞার পরিবর্তন করেছে। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোট প্রজনন হারকে (total fertility rate) সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ষোড়শ অর্থ কমিশন এই সূচকটিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, মোট প্রজনন হারের পরিবর্তে। চতুর্থ যে বিষয়টি ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে গুরুত্ব পেয়েছে তা হল রাজ্যের মোট বনাঞ্চলের শেয়ার এবং ২০১৫ থেকে ২০২৩'এর মধ্যে বন এলাকার প্রসার। পঞ্চম যে বিষয়টি এই কমিশনের রিপোর্টে প্রথম চালু করা হয়েছে তা হল, জাতীয় জিডিপি'তে রাজ্যের অংশ। রাজ্যগুলির মধ্যে অনুভূমিক রাজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখতে দুটি মূল বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই দুটি বিষয় হল জনসংখ্যা এবং রাজস্ব ক্ষমতা (যা পরিমাপ করা হয় রাজ্যের মাথাপিছু আয় দ্বারা)। অর্থাৎ, রাজ্যগুলির মধ্যে সাম্য বজায় রেখে রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে দুটি মূল বিষয় হল জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয় দূরত্ব। ষোড়শ অর্থ কমিশনে এই দুটি সাম্য নির্ধারণকারী বিষয়ের উপর যে গুরুত্ব তা হল ৬০ শতাংশ, যা পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সমান হলেও তার পূর্ববর্তী কমিশনগুলির তুলনায় অনেকটাই কম। 

রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার যে তত্ত্ব (মাথাপিছু আয়ের সাথে রাজস্ব প্রাপ্তির যে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক, অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের মোট রাজস্বের বেশি অংশ প্রাপ্ত হওয়া) সাধারণভাবে পেশ করা হয় তা বর্তমান অর্থ কমিশনের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলা যেতে পারে। একটু বিশদে তথ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, রাজস্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির লাভ হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির তুলনামূলকভাবে ক্ষতি হয়েছে। এই তথ্য রাজস্ব বন্টনের প্রগতিশীলতার তত্ত্বের বিপরীত। 

এই ষোড়শ অর্থ কমিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল পূর্ববর্তী অর্থ কমিশনের সুপারিশের তুলনায় সাহায্য অনুদান নীতির (grant-in-aid) পরিবর্তন। এই কমিশন ৯. ৪৭ লক্ষ কোটি টাকা ৫ বছরের জন্য সাহায্য অনুদান খাতে প্রদান করেছে। এই অনুদানের দুটি অংশ: (ক) প্রথমটি শহর ও গ্রামের স্থানীয় সংস্থাগুলির জন্য ও (খ) দ্বিতীয় অংশটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের জন্য। কিন্তু পঞ্চদশ অর্থ কমিশনে যে তিনটি অনুদানের উল্লেখ আছে-- রাজস্ব ঘাটতি অনুদান, ক্ষেত্র নির্দিষ্ট অনুদান ও রাজ্য নির্দিষ্ট অনুদান-- সব কটি বর্তমান অর্থ কমিশনের রিপোর্টে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ কথায় বলতে গেলে, এই সাহায্য অনুদান সেই সমস্ত রাজ্যগুলিকে প্রয়োজনে প্রদান করা হত যেগুলি রাজস্ব হস্তান্তর পরবর্তী সময় রেভিনিউ ঘাটতি সমস্যায় জর্জরিত। সংবিধানের ২৭৫(১) ধারা অনুযায়ী, রাজ্য কমিশনের সুপারিশক্রমে পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপালিটিগুলিকে প্রয়োজনে সাহায্য অনুদান প্রদান করা হত। বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে এই ধারাটি রদ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই সুপারিশ কি সংবিধানের আদেশপত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?

বর্তমান কমিশন যথাক্রমে ৪.৪ লক্ষ এবং ৩.৬ লক্ষ কোটি টাকা শহর ও গ্রাম কেন্দ্রিক স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদান বরাদ্দ করেছে। এই অনুদানগুলি প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত: মৌলিক (৮০ শতাংশ) ও কর্মক্ষমতাভিত্তিক (২০ শতাংশ)। এই মৌলিক অনুদানের আবার দুটি অংশ- একটি বদ্ধ (৫০ শতাংশ) অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের (যেমন জীবাণুমুক্তকরণ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প) সাথে যুক্ত আর বাকিটি (৫০ শতাংশ) হল উন্মুক্ত, অর্থাৎ, এই অংশটি কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের সাথে যুক্ত নয়। স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদানের শর্তাবলীতে দুটি পরিবর্তন হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার দুটি পরিস্থিতিতে এই অনুদান বন্ধ করতে পারে: (ক) যদি ৭৫ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত তাদের রেভিনিউ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে অক্ষম হয় এবং (খ) যদি কোনও রাজ্য অর্থ হস্তান্তর নির্ণায়ক মানদণ্ড পূর্ণ করতে সক্ষম না হয়।

ষোড়শ অর্থ কমিশন রাজস্ব ঘাটতির তত্ত্ব স্বীকার করে নিয়েছে এবং তাই রাজ্যগুলির কাছে শূন্য রেভিনিউ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা রাখেনি, যা সংশোধিত রাজস্ব দায়িত্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনার (Fiscal Responsibility and Budget Management, FRBM) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সর্বোপরি বলা চলে যে, এই অর্থ কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আশার আলো প্রদান করলেও তা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন মারফত উল্লম্ব ও অনুভূমিক বৈষম্য কতটা দূর করতে পারবে, এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত।

                                                                   

Sunday, 5 April 2026

অনালোচিত পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির 

যে দিকগুলি আমরা জানি না 

কৌশিকী ব্যানার্জী


 

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি নিয়ে নানাবিধ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার রয়েছে। অথচ, এই রাজ্যের বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করে অর্থনীতির চিত্রটিকে যদি যথাযথ বিন্যস্ত করা যায়, তবে এমন অনেক অনালোচিত দিক উদ্ভাসিত হয় যা বহু সাজানো মিথ্যার ধারণাকে ভেঙে দেয়। সেই সব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম আলোচিত বিষয়গুলিকেই এই নিবন্ধে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গের যথার্থ একটি বাস্তব ও সম্ভাবনাপূর্ণ (কিছু দুর্বলতা সহ) ছবিকে পরিস্ফূট করে।   

পাহাড়, মালভূমি থেকে সমুদ্র-- সব নিয়ে সমগ্র ভারতের পর্যটন মানচিত্রে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ভারত সরকারের পর্যটন দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের পর সব থেকে বেশি বিদেশি পর্যটক আসেন পশ্চিমবঙ্গে (গত ২০২৩-২৪'এ ২.৭১ মিলিয়ন); অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও দেশের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। পূর্ব-ভারত ভ্রমণে সব থেকে বেশি পর্যটক এ রাজ্যেই আসেন, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি পর্যটক মিলিয়ে যা ২১.৮ শতাংশ। দেশের মধ্যে সব থেকে বেশি হোমস্টে পশ্চিমবঙ্গে (৫৩২২)। ২০২৪'এ আমাদের রাজ্য বৈদেশিক পর্যটন থেকে ৩৫.০১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। বলাই বাহুল্য, পর্যটন শিল্প পশ্চিমবঙ্গে হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন ও লজিস্টিক এবং হস্তশিল্প সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে। 

শান্তিনিকেতন ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতে সাংস্কৃতিক পর্যটন এবং গ্রামীণ উদ্যোগ সমূহ, বিশেষত স্থানীয় কারুশিল্পীদের আয় বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের (UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) আয় ২০২৪ সালে ২১.২ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ২৪.৬ কোটি টাকায় পৌঁছয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ধর্মীয় পর্যটনে জোর দেওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যাতেও ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে; ২০২৪ সালের ১.৭৪ লক্ষ থেকে বেড়ে দর্শনার্থীর আগমন ২০২৫ সালে ২.০৮ লক্ষ হয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ যেহেতু অগ্র ও পশ্চাৎ সংযোগ ঘটায় তাই তা রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আতিথেয়তা, পরিবহন, হস্তশিল্প ও খুচরা ব্যবসার মতো সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে এই রাজ্যের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এটি কেবল রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকেই (GDP) বৃদ্ধি করেনি, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির (inclusive growth) অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে। শ্রম-নিবিড় হওয়ার কারণে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট শিল্পসমূহ এই রাজ্যে ২৮ লক্ষেরও অধিক মানুষকে কর্মসংস্থান জুগিয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের এক উল্লেখযোগ্য অংশ। 

তদুপরি, সুন্দরবন, ডুয়ার্স ও পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। হোমস্টে, ইকো-লজ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রকল্পগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউনেস্কো কর্তৃক ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত দুর্গোৎসব বাংলার অর্থনীতির এক বৃহৎ শক্তি। এটি খুচরো বাণিজ্য, আতিথেয়তা, পরিবহন ও হস্তশিল্প— এই ক্ষেত্রগুলোকে সমৃদ্ধ করে তোলে। এমনকি, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। অর্থনীতিবিদ অজিতাভ রায়চৌধুরীর মতে, ২০২৪-র তুলনায় ২০২৫-এ পুজোর সময় ব্যবসায়িক লেনদেনের আর্থিক মূল্য অন্তত ৮-১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গাপুজোর সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড পরিমাণে বিদেশি পর্যটক আসেন, মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে। একটি ভ্রমণ সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ সালে ২৭ লাখ থেকে বেড়ে এ পর্যন্ত রাজ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন সংখ্যা ৩২ লাখে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, হাজার হাজার কোটি মূল্যের ব্যবসা বাণিজ্য হয় এই উৎসবকে ঘিরে। 

উপরন্তু, দেশিক বাণিজ্যের বিষয়ে নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বাণিজ্য, রফতানি ও রিয়েল এস্টেট বিগত এক দশকে জিডিপিতে সর্বাধিক মূল্য সংযোজন করেছে। ভারতের রফতানি ক্ষেত্রে এ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ অর্থ বছরে রাজ্য থেকে মোট রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২.৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত দশ বছরে দ্বিগুন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, সামুদ্রিক পণ্য, ভেষজ খাদ্যপণ্য, চর্মদ্রব্য এবং রত্ন ও অলঙ্কারের মতো পণ্যসমূহ রফতানি করা হয়। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী রাজ্য এবং বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত ‘দার্জিলিং চা’-এর উৎপত্তিস্থল। মিনিস্ট্রি অফ কমার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা বন্দর দিয়ে সব থেকে বেশি চা রফতানি হয় এবং দার্জিলিং'এর চায়ের মূল গন্তব্যস্থল মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে, ভারত জুড়ে পশ্চিমবঙ্গই চালের বৃহত্তম উৎপাদক। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রাজ্যে চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৪৯ মিলিয়ন টন।

ইকোনমিক সার্ভে (২০২৪-২৫) বলছে, এখনও পশ্চিমবঙ্গের ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় অসংগঠিত ক্ষেত্রে যার মধ্যে সব থেকে বেশি হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। NSS 73rd রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ৮.৮৭ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে যার ৩২.৭ শতাংশ অর্থাৎ ২.৯০ মিলিয়ন মহিলা দ্বারা পরিচালিত, যদিও কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদানের হার অত্যন্ত কম। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরেই তার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য সুপরিচিত। বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির মন্দির থেকে শুরু করে নকশি কাঁথার নিপুণ কারুকাজ, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত। দার্জিলিং চা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। পশ্চিমবঙ্গের পাটকলগুলো ২.৫ লক্ষেরও বেশি শ্রমিককে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান প্রদান করে এবং প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষক পরিবারকে সহায়তা জোগায়। এই শিল্পের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হল প্রথাগত চটের বস্তা। এছাড়া, ব্যাগ ও সাজসজ্জার সামগ্রীর মতো বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্যের চাহিদাও বর্তমানে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

মালদা জেলা, যাকে বাংলার 'আমের রাজধানী' বলা হয়, সেখানে ২০০টিরও বেশি জাতের আম উৎপাদিত হয়। এখানকার সুপ্রসিদ্ধ জাতগুলো— ফজলি, লক্ষ্মণভোগ এবং হিমসাগর— 'জিআই' (GI) তকমাযুক্ত। এই অঞ্চলের প্রায় ৪.৫ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০,০০০ আমচাষি রয়েছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, বাংলার সামুদ্রিক খাদ্য রফতানি ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৯.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত। তাছাড়া, গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজের সন্ধানে বহু মানুষ চলে যাওয়ায় দক্ষ কৃষকের অভাবেও উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে। এমনকি, বিদেশে রফতানির অনেক উচ্চ মানদণ্ড থাকায় অনেক সময় এসব কৃষিজ ও সামুদ্রিক পণ্য মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হওয়ায় চাষিদের প্রচুর ক্ষতি হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ রেশম শিল্পের উৎপাদন ২,১০০ মেট্রিক টনের বেশি হলেও, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ৩.০৩ লক্ষ থেকে কমে ২.১১ লক্ষে নেমে এসেছে। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল বাজার থাকা সত্ত্বেও এই শিল্পে মজুরি অত্যন্ত কম, তুলনায় সস্তা পাওয়ারলুম-এর পোশাক এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের অনিশ্চয়তার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুবক-যুবতীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। 

অবশ্য, এই সমস্ত ক্ষেত্রগুলি ক্ষুদ্র শিল্প হওয়ায় ‘স্বল্প উৎপাদনশীলতার ফাঁদে’ পড়ে জর্জরিত। বাংলার ৯৯ শতাংশ MSME-ই 'ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র' (Micro) প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার দ্বারা পরিচালিত, এখানে পেশাদার কর্মী নিয়োগ করার মতো পুঁজির অভাব আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় 'ইকোনমিকস অফ স্কেল'এর সুবিধা থাকে না। ফলস্বরূপ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তারা সস্তা কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল আর এর ফলে কর্মীদের মজুরি কেবল ন্যূনতম জীবনধারণের স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অনিবন্ধিত খাতের উদ্যোগসমূহের বার্ষিক জরিপ (ASUSE) ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলার অসংগঠিত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মী প্রতি সংযোজিত ভ্যালু অ্যাডেড গুজরাত বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শুধু তাই নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিতে সারা বছর ধরে কর্মসংস্থান হয় না। প্রসঙ্গত, বানতলার লেদার কমপ্লেক্স কিংবা শিলিগুড়ি চা-শিল্প প্রভূত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলার হেতু তারা কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী কাজের নিশ্চয়তা বা চুক্তি প্রদান করতে পারে না। ফলে, এখানকার কাজগুলো কেবলই 'দৈনিক মজুরি' ভিত্তিক হয়ে থাকে, যেখানে কর্মীদের বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ থেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এবং নিরাপত্তার মান বেশ নিম্ন। অপরদিকে, উত্তরবঙ্গে ক্ষুদ্র চা-চাষি, যারা বর্তমানে রাজ্যের মোট চা উৎপাদনের ৫৫ শতাংশেরও বেশি জোগান দেন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র চা-চাষিরই নিজস্ব কোনও কারখানা নেই; তারা বাগানের কাঁচা চা পাতাগুলো 'বট লিফ ফ্যাক্টরি' (BLFs) বা পাতা-ক্রেতা কারখানাগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নিম্নমানের চায়ের অতিরিক্ত জোগান এবং বিদেশ থেকে আসা সস্তা চায়ের (যেমন নেপালের চা) তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে চায়ের বাজার দর ব্যাপকভাবে ধসে পড়ে। তাছাড়া ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে চায়ের জন্য কোনও 'ন্যূনতম সহায়ক মূল্য' (MSP) নির্ধারণ না হওয়ায় বর্তমানে এই শিল্পক্ষেত্রে এক ধরনের 'সংকটকালীন শ্রম পরিস্থিতি' বিরাজ করছে। আর কোনও উপার্জনের বিকল্প পথ না থাকায় শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সময়ে কর্মক্ষেত্রের সব থেকে বড় দুশ্চিন্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যা রুটিনমাফিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলোতে মানব শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠছে। যেমন, কোডিং, ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ নির্ভর করে অ-রুটিন কায়িক শ্রমের ওপর যা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাশ্রয়ী সক্ষমতার আওতার বাইরে। পশ্চিমবঙ্গে হস্তনির্মিত বস্ত্রশিল্প (তাঁত/জামদানি), মৃৎশিল্প (কুমোরটুলি) এবং হকার বা ফেরিওয়ালাদের কাজে ‘সামাজিক বুদ্ধিমত্তা’র প্রয়োজন, তাই এরা হয়তো রোবটের কারণে চাকরি হারাবে না, কিন্তু তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমশ হারাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত শিল্পগুলো ‘ম্যানুয়াল’ বা প্রথাগত পদ্ধতিতেই রয়ে যাওয়ায়, বিশ্ব বাজারে তুলনায় সস্তা পণ্যের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে; যার ফলে সেখানে ‘চাকরিচ্যুতি’র পরিবর্তে ‘বাজার থেকে ছিটকে পড়ার’ (market displacement) ঘটনাই বেশি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যান্য রাজ্যগুলি (যেমন, তামিলনাড়ু বা গুজরাত) উৎপাদন খরচ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছে, এ রাজ্যে সেখানে ‘উৎপাদনশীলতার ব্যবধান’ থেকে যাচ্ছে। 

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পে শ্রম-নিবিড় কাজের সুযোগ থাকলেও নিম্ন মজুরি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্যতীত কর্মী নিয়োগ, digitisation-এর অভাবে অভিবাসন বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, দক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ‘brain drain’ হচ্ছে। তাই  উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে (সচেনতনভাবে যাতে কর্মী অপসারণ না হয়) না জোর দেওয়া এবং পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধি, কর্মীদের সামাজিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান, ক্ষুদ্র ব্যব্যসায়ীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। 

সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসী ভূমিকা, আজকের বড় বড় আধুনিক শিল্পের যথেষ্ট কর্মসংস্থান প্রদানের অক্ষমতা ও সাবেক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের দিন ফুরিয়ে আসায়, একটি রাজ্য বা দেশকে আজ যে সৃজনশীল অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে চলার পথ নির্মাণ করে নিতে হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেছে বটে, কিন্তু আরও বহু সংশোধন ও নতুন উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে।    


Saturday, 4 April 2026

নগদের মায়া

প্রকৃত ক্ষমতায়নের সন্ধানে

স্বপ্ননীল বরুয়া



সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে একটি অদ্ভুত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে— কল্যাণমূলক নীতি হতে হবে তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং নির্বাচনী ভাবে লাভজনক। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় উপায় হয়ে উঠেছে সরাসরি নগদ হস্তান্তর— অনুদান, ভাতা, স্টাইপেন্ড বা বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা সরাসরি মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া। প্রথম দৃষ্টিতে এই পদ্ধতি আধুনিক, মানবিক এবং কার্যকর বলে মনে হয়। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে, মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করতে পারে এবং সরকারও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ভাবমূর্তি তৈরি করে। কিন্তু এই চকচকে আবরণের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, আমরা কি উন্নয়নের পরিবর্তে কেবল বণ্টনকেই উন্নয়ন হিসেবে দেখছি?

নগদ হস্তান্তরের এই প্রবণতা শুধু একটি নীতিগত অগ্রাধিকার নয়, বরং রাজনৈতিক চিন্তার এক গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। কল্যাণ এখন একপ্রকার লেনদেন— টাকা দেওয়া হবে, কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করা হবে এবং ভোট নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভাব হল, এর ফলাফল নিয়ে কোনও গভীর চিন্তা নেই। এই অর্থ কি মানুষের জীবনমান স্থায়ীভাবে উন্নত করছে? তাদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা বা আত্মনির্ভরতা বাড়াচ্ছে? তারা কি দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে? এই প্রশ্নগুলো খুব কমই আলোচনায় আসে।

মূল সমস্যা হল, নির্বিচারে নগদ বণ্টন রোগের লক্ষণকে চিকিৎসা করে, মূল কারণকে নয়। দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক বঞ্চনার এক জটিল জাল। মাসিক ভাতা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্যের কাঠামোগত কারণগুলিকে বদলাতে পারে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্ভরতার সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকা রাষ্ট্রের দয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে এটাও সত্য যে, নগদ সহায়তা সম্পূর্ণ ভুল নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা চরম দারিদ্র্যের পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত জরুরি। এটি একটি সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে যাতে মানুষ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত না হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন এটি কল্যাণনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন এটি প্রকৃত উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলিকে পিছনে ঠেলে দেয় এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সহায়তা, শুধু অনুদান নয়। মানুষের পাশে থেকে তাদের সমস্যাগুলি বোঝা, তাদের সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো— এই প্রক্রিয়াই আসল উন্নয়নের ভিত্তি। এটি কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে ততটা আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফলই সবচেয়ে স্থায়ী এবং কার্যকর।

অসমের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যাটি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। অসম একটি বৈচিত্র্যময় সমাজ— ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, বরাক উপত্যকা, পাহাড়ি জেলা, চা বাগান এলাকা, চর অঞ্চল এবং দ্রুত বর্ধনশীল শহুরে কেন্দ্র— প্রতিটি অঞ্চলের সমস্যা আলাদা এবং জটিল। এই বাস্তবতায় একমাত্র নগদ বণ্টনের উপর নির্ভর করা শুধু অপর্যাপ্ত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর। প্রতি বছর বন্যায় অসমের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়, ফসল নষ্ট হয়, জীবিকা ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে নগদ সহায়তা দেওয়া হয় এবং তা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নদী ব্যবস্থাপনা, উঁচু জমিতে পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি। এই পদক্ষেপগুলি ছাড়া নগদ সহায়তা একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যা সমস্যার গভীরে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়।

চর অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বসবাসের স্থানও বদলে যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত। নগদ সহায়তা তাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পারে না। প্রয়োজন সংযোগ— রাস্তা, নৌপথ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং এমন শিক্ষা ও দক্ষতা-উন্নয়ন যা তাদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। চা বাগানের শ্রমিকদের অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। কম মজুরি, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ তাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। মাঝে মাঝে নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও তা স্থায়ী পরিবর্তন আনে না। দরকার শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টি করা, যাতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই অবস্থায় আটকে না থাকে।

গুয়াহাটির মতো শহরে নগদভিত্তিক কল্যাণের সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট। শহরটি জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত পানীয় জল, যানজট এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের সমস্যায় জর্জরিত। এই সমস্যাগুলি ব্যক্তিগত অনুদান দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সুপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। শিক্ষাক্ষেত্রেও একই চিত্র। নতুন স্কুল ভবন, সাইকেল বা বৃত্তি দেওয়া হলেও শিক্ষার গুণগত মান প্রায়ই সন্তোষজনক নয়। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চিন্তা, সৃজনশীলতা ও চরিত্র গঠনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। হাসপাতাল নির্মাণ এবং নতুন প্রকল্প চালু হলেও গ্রামীণ এলাকায় এখনও চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টির উপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

কৃষিক্ষেত্রে নগদ সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও মৌলিক সমস্যাগুলি থেকে যায়। কম উৎপাদনশীলতা, সেচের অভাব, সংরক্ষণ ও বিপণনের সমস্যা কৃষকদের আয় সীমিত করে রাখে। কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাজার সংযোগ প্রদান করা জরুরি।

অসমের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নৈতিক এবং সামাজিক নেতৃত্ব। সমাজের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠনগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ এবং অংশগ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কল্যাণকে একটি যৌথ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে সরকার এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করবে। একই সঙ্গে শিক্ষিত সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে না রেখে চিন্তা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজকে নতুন চিন্তা, উদ্যোগ ও সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

আর্থিক দিক থেকেও এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সম্পদের মধ্যে অতিরিক্ত নগদ বণ্টন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানবসম্পদ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবশেষে, সমাজকে নির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আত্মনির্ভরতার পথে এগোতে হবে। দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনও উন্নয়ন স্থায়ী হতে পারে না। অসমের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সম্পদ বণ্টনের নয়, বরং মানুষের জীবনকে মৌলিকভাবে পরিবর্তনের। এর জন্য দরকার দূরদর্শী নেতৃত্ব, দক্ষ প্রশাসন ও সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক দল এবং ভোটার— উভয়েরই একটি মৌলিক ধারণাগত পরিবর্তন অপরিহার্য। কল্যাণকে তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতায়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। এই পরিবর্তন উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; এটি সমাজ থেকেই উঠে আসতে হবে। বিশেষত শিক্ষিত সমাজ— শিক্ষক, পেশাজীবী, প্রশাসক ও বুদ্ধিজীবীদের এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব নিতে হবে। তারাই জনমত গঠন করবে, জবাবদিহিতা দাবি করবে এবং সমাজকে একটি উচ্চতর মানের দিকে নিয়ে যাবে। তাহলেই কল্যাণ প্রকৃত অর্থে জাতি গঠনের শক্তিতে পরিণত হবে, কেবলমাত্র অর্থ বণ্টনের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে থাকবে না।


Monday, 30 March 2026

অসমের সমীকরণ

বিরোধী জোট পারবে কী?

বাসব রায়



অসমের নির্বাচন ৯ এপ্রিল। জিতবে কে, এই প্রশ্ন সবার। সরাসরি কে জিতবে তার উত্তর না খুঁজে কার জয়ের সম্ভাবনা বেশি তা নিয়ে আলোচনা মনে হয় বেশি ভালো। ২০১৬ সাল থেকে অসমে বিজেপি জোট সরকার চলছে। জোট তিন দলের-- বিজেপি, অসম গণ পরিষদ বা অগপ এবং বড়ো পিপলস ফ্রন্ট বা বিপিএফ।

অসমের হিন্দু বাঙালিরা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে ভোট দিচ্ছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্রে যে দলের সরকার থাকে তাকেই ভোট দেয় অসমের হিন্দু বাঙালিরা। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, অসম আন্দোলনের ভয়। অসমে বাঙালিরা মার খেলে সেটা আটকাবে কোনও সর্বভারতীয় দল, যা অসমের কোনও আঞ্চলিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। কেন্দ্রে কংগ্রেস থাকতে অসমের বাঙালিরা ঢেলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। এখন সেটাই পাচ্ছে বিজেপি। অসমিয়াদের প্রথম পছন্দের দল নিঃসন্দেহে অসম গণ পরিষদ। বিজেপি জোট অসমিয়াদের ভোট‌ও পাচ্ছে।

বড়োল্যান্ডে এগারোটা কেন্দ্র। যদিও সেখানে বড়োভাষী সংখ্যায় কম, কিন্তু স্বশাসিত পরিষদ তাদের‌ই। বিপিএফের জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী ইউপিপিএল। তবে সম্প্রতি বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় ইউপিপিএলের শক্তি কমে গেছে।

ভোট ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকে অসম সরকার ৩২ লক্ষ মহিলাকে ৩২০০ কোটি টাকা বীজ কেনার জন্য দিয়েছে। আবার এ মাসেই অরুণোদয় প্রকল্পে ৪০ লক্ষ মহিলাকে দিয়েছে ৯ হাজার করে মোট ৩৫০০ কোটি টাকা। যার সরল হিসেব হল, অসমের ১২৬ কেন্দ্র পিছু ইতিমধ্যেই বিজেপি খরচ করে ফেলেছে ৫০ কোটি টাকা।

গত কয়েক বছর ধরে অসম সরকার 'অবৈধ দখলদারদের' উচ্ছেদ করে জমি উদ্ধারে নেমেছে। এবং আশ্চর্যের কিছু নয় যে এর অধিকাংশ জমিই খুব কম দামে পেয়েছে আদানি গোষ্ঠী আর খুব কম পরিমাণে পতঞ্জলি গোষ্ঠী। মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে ধারাবি উন্নয়নের জন্য এক লক্ষ কোটি টাকার বরাত পেয়েছিল আদানি গোষ্ঠী। বিজেপি বিরোধী সরকার হলে ওই চুক্তি বাতিল হয়ে যেত বলেই মহারাষ্ট্র নির্বাচনে সবরকম উপায় কাজে লাগিয়েছিল বিজেপি। ফলাফল সবাই জানে। অসমের নির্বাচনেও এক‌ই পরিস্থিতি। আদানি গোষ্ঠী সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। 

অসম গণ পরিষদের ২৬ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মুসলমান। মজার বিষয় হল, অসম আন্দোলনের মূল ভিত্তিই ছিল মুসলমান বিরোধ যাকে 'বঙাল খেদা' আন্দোলনের তকমা পরানো হয়েছিল। তো বলার কথা এটাই যে, এবারের নির্বাচনে অগপ ৫'এর বেশি আসন পেলে আমি অন্তত বিস্মিত হব। কারণ আর কিছুই নয়, অসমে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর মুসলমান অধ্যুষিত আসন ছাড়া হয়েছে অগপ'র জন্য।

খুব দেরি করে হলেও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয়েছে উজান অসমের দুই দলের, যথাক্রমে অসম জাতীয় পরিষদ ও রাইজর দল। উজান অসমে ৪৯ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি জোট পেয়েছিল ৩৯। এবার সেটা কমে ৩০'এ আসতে পারে। ২০২৪ লোকসভা ভোটে অসমের মুসলমানরা ঢেলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। এবার তার অন্যথা হ‌ওয়ার সম্ভাবনা কম। 

অসমের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। বিরোধীদের প্রচারে এটা অন্যতম বড় বিষয়। এ ছাড়া রয়েছে নকল কংগ্রেস বনাম প্রকৃত কংগ্রেস প্রচার। কারণ, অসম বিজেপির প্রায় অর্ধেক প্রার্থী কংগ্রেস থেকে এসেছে। কিন্তু এসব অভিযোগ মানুষ কতটা বিশ্বাস করবে সেটাই বড় প্রশ্ন। দুটি শিবিরেই প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। টিকিট না পেয়ে দু' তরফেই কয়েকটি আসনে নির্দল হিসেবে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

মনোনয়ন পর্বে নাটকের পর নাটক। একেবারে শেষ মুহূর্তে জোট হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে রাইজর দলের, যার প্রধান অখিল গগৈ। এ ছাড়া রয়েছেন অসম জাতীয় পরিষদের লুরিণজ্যোতি গগৈ। বামেরা কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে। কিন্তু নাটক এটা নয়, নাটক অন্যত্র। বর্তমানের ১৮ বিধায়ককে বিজেপি প্রার্থী করেনি। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদ্রোহ প্রকাশ করলেও অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে আলোচনার পর চুপ করেছেন। হাফলংয়ের বিধায়ক তথা অসমের মন্ত্রী নন্দিতা গার্লোসাকে প্রার্থী করেনি বিজেপি। তিনি হুমকি দেন কংগ্রেসে যোগ দেবেন। সাত তাড়াতাড়ি হেলিকপ্টারে করে উড়ে গিয়ে নন্দিতাকে বোঝান হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। হাফলং থেকে আরেক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দেয় কংগ্রেস। মজার বিষয়, পরদিনই হাফলংয়ে নন্দিতা গার্লোসা হয়ে যান কংগ্রেসের প্রার্থী। কংগ্রেসের নগাঁওয়ের সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ দল ছেড়েই অসমের রাজধানী দিশপুরে বিজেপি প্রার্থী হয়ে গেছেন। দিশপুরের বর্তমান বিধায়ক অতুল বরা বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছিলেন। হিমন্ত তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথাবার্তার পর অতুল শান্ত হয়ে যান। 

অসমে কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ভুপেন বরা দল ছেড়েছেন। বিহপুরিয়ায় তিনি ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যান। এবার তাঁকে বিজেপি প্রার্থী করেছে। বর্তমানের বিধায়ক বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছিলেন, হিমন্ত গিয়ে কথা বলার পর এখন চুপ। বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জে কংগ্রেসের বিধায়ক কমলাক্ষ বিজেপিতে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন। কাটিগড়ায় আবার বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন অমরচান্দ। মধ্য গুয়াহাটি কেন্দ্রে আবার অন্যরকম গল্প। বিজেপি'র হয়ে দাঁড়িয়েছেন হিন্দিভাষী বিজয় গুপ্তা। তৃণমূলের পক্ষে বাঙালি অভিজিৎ মজুমদার। কংগ্রেস এই কেন্দ্র ছেড়েছে অসম জাতীয় পরিষদকে। তাদের প্রার্থীই একমাত্র অসমিয়া। নির্বাচন খুব ইন্টারেস্টিং হবে।

এদিকে নির্বাচন কমিশন তার কাজ শুরু করে দিয়েছে-- বরপেটা ও ঢকুয়াখানায় কংগ্রেস প্রার্থীর মনোনয়ন খারিজ করে দিয়েছে। তিতাবর কেন্দ্রে মনোনয়ন বাতিল হয়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থীর। চা-বাগানের ভোট কাটতে অসমের বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে ঝাড়খণ্ডের শাসক দল।

উল্লেখ্য, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ ও বিরোধী জোটের ভোটের ফারাক ছিল মাত্র ০.৮ শতাংশ। যদিও ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে সেই ফারাক বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ শতাংশ। 

এবার কী হয় সেটাই দেখার।


Thursday, 19 March 2026

খোদ বাংলায় বিপন্ন বাঙালি?

হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের আক্রমণে আক্রান্ত বাঙালি

সীমা ঘোষ



প্রায় সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় অসমের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় একটি কলেজে অধ্যাপনা সূত্রে জীবন কাটিয়ে কলকাতায় ফিরেছি মাত্র কিছুদিন হল। এর মধ্যে বহু আসা যাওয়া থাকলেও মাত্র কয়েকদিনের ব্যস্ততায় কলকাতা ক্রমশ দূর থেকে দূরতর দ্বীপ হয়ে থেকেছে, বিশেষত মোবাইল ইন্টারনেটের এই রমরমার আগে পর্যন্ত তো বটেই! কলকাতায় আমার পড়াশোনার পুরনো জায়গার একটা অবশ্যই ন্যাশনাল লাইব্রেরি! নতুন বিল্ডিং'এ লাইব্রেরি চলে যাবার পর বাইরে থেকে দেখে এসেছি, কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি। 

কলকাতার ছন্দে ফিরতে আবার ওখান থেকেই তাই শুরু করি। রিডিং রুমের পুরনো হলুদ হয়ে যাওয়া কার্ডটা খুঁজেপেতে নিয়ে গিয়ে বুঝলাম, ওটা তামাদি হয়ে গেছে, নতুন করে করতে হবে। ভবানী ভবনের দিকের, মানে ঐ আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের দিকের গেট (সম্ভবত ২ নম্বর) দিয়ে ঢুকছি, হিন্দিভাষী সিকিউরিটি পাকড়াও করল, 'কাঁহা জায়েঙ্গে, কিঁউ জায়েঙ্গ?' সামনে একটা জাবদা খাতা খুলে এগিয়ে দিয়ে আমার উদ্দেশ্য বিধেয় সব নথিভুক্ত করা হল। এরপর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নামে যে নতুন বিল্ডিং, ওখানে গিয়ে কার্ড রিনিউ সংক্রান্ত কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে জিজ্ঞাসা করতে তিনিও হিন্দিতে শুরু করলেন। প্রথমটা হোঁচট খেলেও, মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে আমিও আমার বাংলায় প্রয়োজনীয় কথা সারলাম। 

আধার কার্ড আর পাসপোর্ট সাইজ ফটো, সব চাই। অসমে থাকার অভ্যেসে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এনআরসি'র কাগজ সব সঙ্গে থাকে, কিন্তু ফটো মোবাইলে। তো সেদিন বিশেষ কিছু হবে না বুঝে চা খেতে গেলাম। পুরনো সেই ক্যান্টিন এখন নেই, সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে দেয়াল ঘেঁষে একটি গুমটি মার্কা দোকান, যেভাবে ফুটপাথে দোকান তৈরি হয়, সেখানে দেখলাম বেশ কিছু যুবক-যুবতী পিঠে ব্যাগ নিয়ে, না নিয়ে হা হা হো হো করছ। ভাবছি, এত যৌবন জলতরঙ্গ এই মোবাইলের যুগে লাইব্রেরিতে কী করছে? কলতানে কান পেতে বুঝলাম, এদের সিংহভাগ অবাঙালি, আর কোলাহলের ভাষা হিন্দি। তবে, নিজের কৌতূহলকে নিশ্চিন্ত করতে গিয়ে আরও বুঝলাম যে, এদের মধ্যে দু-একজন বাঙালিও আছে, তবে তারাও ঐ পরিবেশে আর বাংলায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না সম্ভবত। 

যাই হোক, পরে একদিন গেলাম নতুন কার্ড করে। একটু ফুরফুরে ভাব নিয়ে রিডিং রুমের দিকে যাচ্ছি, মনে হাজার স্মৃতির আনাগোনা চলছে। ব্যাগপত্র জমা রেখে ঢুকতে যাব, বাঁদিক থেকে এক সিকিউরিটি বললেন, ‘ম্যাডাম ইধার আইয়ে!' চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে গেলাম, ‘খাতে মেঁ এন্ট্রি করিয়ে।’ মানে, আবার নামধাম কার্ডের নাম্বার সব লিখুন। এবার রিডিং রুমে ঢুকতে যাব, আরও এক সিকিউরিটি। ঐ মাত্র দেড়-দু' মিটার দূরে রিডিং রুমের দরজার সামনে বসা, বললেন, 'ম্যাডাম আপকা কার্ড দিখাইয়ে।' দেখালাম, 'অব ঠিক হ্যায়, যাইয়ে।' 

এরপর আরও এক প্রস্থ চেকিং। রিডিং রুমে ঢুকতেই আরেক মহিলা সিকিউরিটি। ঐ এক ভাষা ও এক ভঙ্গিতে সব যাচাই করলেন। ভাবছি, আমি কোনও পাঠক না জেলের কয়েদি, যাকে জেলে ঢোকানোর আগে রীতিমতো খানা তল্লাশি চালাচ্ছে আমাদের গর্বের কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার! আঠারো বছর বয়স থেকে এই লাইব্রেরিতে যাতায়াত করছি। মনে হচ্ছিল না আমি আমার অতি চেনা  শহরের এক পাঠক, নিছক বই পড়ার জন্য জাতীয় গ্রন্থাগারে ঢুকছি। আরও হতাশ হলাম একটা মনের মতো আসন খুঁজে বসতে গিয়ে (সকাল দশটাতেও)। ডিজিটাইজড রিডিং রুমের সমস্ত চেয়ার টেবিল এখন ল্যাপটপ-বান্ধব। সেখানে একটি সিটও প্রায় খালি নেই বললেই চলে। এরা কারা? লোকজন তো বলাবলি করে, এখনকার ছেলেমেয়েরা নাকি পড়াশোনা করে না? এরা সবাই তরুণের দল দেখছি! কৌতূহলী চোখে একটি সিট খোঁজার অছিলায় অনুসন্ধান শুরু করলাম। আড়চোখে দেখে যাই এদের টেবিল। এরা সবাই সেই  গবেষক পাঠক নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে এরা ফ্রি ওয়াইফাই, ফ্রি বিদ্যুতের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মনে হল চাকরির পরীক্ষার পড়াশোনা করছে। আর করবে নাই বা কেন? জাতীয় গ্রন্থাগার এদের জন্য কেরিয়ার কর্নার তৈরি করেছে, খোলা শেলফে এনসাইক্লোপিডিয়া'র বদলে সাজিয়ে রেখেছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার হাজারও বইপত্র। সেখানে ইউজিসি, নেট, ক্যাট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, গেট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, নিট, জেইই, টেট, বেড, ডব্লিউবিসিএস, জেনারেল নলেজ, এসএসসি সংক্রান্ত বহুবিধ বই। মনে হল, জাতীয় গ্রন্থাগার আর গবেষণাগার নয়, উচ্চমানের সর্বসুবিধাযুক্ত একটি আধুনিক কোচিং সেন্টার। অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান পদের দু-একজনের সঙ্গে বাংলা বই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, এরা কোনও বাংলা বই ও বাঙালি লেখকের নামই জানে না। এদের মুখের ভাষা বাংলা বা ইংরেজি নয়, হিন্দি, কারণ সবাই আদতে বিহারের। এদের  অনেকেই গত তিন-চার বছর আগে চাকরিতে বহাল হয়েছেন। দু' এক জনের নাম জানলাম সঞ্জীব কুমার, মণীশ কুমার প্রভৃতি, যাদের ঘর বিহার, থাকে সাঁত্রাগাছি, হাওড়া। আমরা বিহারে চাকরি করতে গেলে আমার ভাষায় কাজ করতে পারব?

বইয়ের ক্যাটালগ লিখে জমা দিলাম। উদাস চিত্তে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছি। যেতে গিয়ে ঘাড় উঁচু করে এই বিখ্যাত গ্রন্থাগারের চারপাশে ঘিরে উঠে যাওয়া সুউচ্চ বহুতলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকাই, সেখানে প্রতিটি তলের বারান্দার নীচের অংশে শ্লোগানের মতো সাঁটা আছে হিন্দিতে লেখা বিখ্যাত মনীষীদের উদ্ধৃতি আর তার মধ্যে বেশিটাই হিন্দির সপক্ষে তাঁদের বিভিন্ন সময়ে করা উক্তি। খুব ইচ্ছে করছিল, আমার উদার বাঙালি বন্ধুদের জন্য এক টুকরো ছবি তুলি। কিন্তু পারব না, ছবি তোলায় কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে।

আমার দিল্লি প্রবাসী কন্যাও প্রথমবার অনেক উৎসাহ নিয়ে জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে দারুণ রকম হোঁচট খায়। ল্যাপটপ নিয়ে রিডিং রুমে ঢুকতে গিয়ে প্রায় জেলখানার কয়েদির মতো চেকিং'এ ও এতটাই  হতাশ হয়ে পড়ে যে দ্বিতীয়বার যাবার ইচ্ছে ঐ দিনই ত্যাগ করে। তবে হিন্দিতে লেখা পোস্টার নিয়ে ও ট্যুইটারে লিখেছিল, যার প্রতিক্রিয়া একদিনে প্রায় আটশো ছাড়িয়ে যায়। বুঝলাম, আমাদের মতো ভুক্তভোগী ক্ষুব্ধ পাঠক কম নেই! আশ্চর্য হলাম, এই ঘটনার দু' দিন পরে গিয়ে দেখি, সেই সব পোস্টার উধাও। জানি না এর সঙ্গে ঐ ট্যুইটার পোস্টের কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা।

শাসক একভাবে তার লক্ষ্য পূর্ণ করে না, কৌশল বদলায়। কোনও রাজ্যকে এখন আর কাটাকাটির দরকার নেই। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সার্কুলার জারিরও প্রয়োজন নেই। তাই, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে সে তার কৌশল বদলাতে শুরু করেছে। বিশ্বভারতীর কথাই ধরুন। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা এখন হিন্দিতে কথা বলে (বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে)! কেন বাঙালিরা হিন্দি বলে? কারণ, ভর্তির সময় প্রথম যার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হয় তিনি তো হিন্দিভাষী! গত তিন-চার বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানে যত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে তাঁদের বেশিরভাগ ইউপি-বিহারের মানুষ। আমার ছেলেকে 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে' গাইতে হয় সংস্কৃতে, বাংলায় নয়। বাংলায় লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এভাবে খোদ কবির প্রতিষ্ঠানেই ব্রাত্য করে তোলা শুরু হয়েছে! বাঙালি অধ্যাপক অনলাইন ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দিতে। কারণ, ক্লাসের একটি ছাত্র হিন্দিভাষী। হিন্দিভাষী কোনও রাজ্যে একটি বাঙালি ছাত্রের জন্য এই বদান্যতা আমরা কল্পনা করতে পারি? অধ্যাপক থেকে কর্মচারী সব ক্ষেত্রে নিযুক্তিতে ধীরে ধীরে হিন্দিভাষীর অগ্রাধিকার যে হচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগে চোখ কান খোলা রাখলেই টের পাওয়া যায়। 

হাওড়া স্টেশনে এখন আর বাংলা বলা যায় না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিটিই, আরপিএফ, চা-বিস্কুটের স্টল, রেস্টুরেন্ট, ফুডকোর্ট কোথাও বাংলা ভাষাভাষী নেই। হাওড়াতে পা রেখে বাঙালি অনুভব করে সে যেন ভিন রাজ্যে ঢুকল। আমরা ভুলে গিয়েছি, মানভূমের বাংলা ভাষা আন্দোলনে হাজার হাজার সত্যাগ্রহী পুরুলিয়া থেকে এই হাওড়া ব্রিজ অতিক্রম করে কলকাতায় পৌঁছেছিল। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের গড়ে তোলা আইএসআই'এর আইন পরিবর্তন করে কব্জা করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। এ নিয়ে বিক্ষোভ প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা জেনেছি। 'উদার বাঙালি' কি চেয়ে চেয়ে দেখবে? 

এ লেখা শেষ করব ভাষা ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতে দীর্ণ অসমের কথা বলে। তিনটি জেলা নিয়ে বরাকের মানুষ বাংলায় কথা বলে। তাই অসম প্রদেশে এসেও আমি কথ্য অসমিয়া শিখতে পারিনি। কিন্তু এখন? কান পাতলেই অসমিয়া শোনা যাচ্ছে। এসপি অফিস, মিউনিসিপ্যালিটি, ব্যাঙ্ক, জেলা শাসকের কার্যালয়ে কর্মচারীরা অসমিয়ায় কথা বলে। এই উপত্যকায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মী পদে স্থানীয়দের ১০০ শতাংশ চাকরি দেবার গ্যারান্টি থাকলেও তা কায়দা করে উপেক্ষা করা হয়েছে, জুটেছে অসমিয়াদের কপালে। বাঙালি বাংলায় লিখবে, বইমেলা করবে, পত্রিকা বের করবে। আর ওদিকে দিল্লির শাসক তার মূল উদ্দেশ্য সফল করতে কৌশলে বাংলা ভাষাটাকেই ঘৃণ্য ও অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে। ওরা বাঙালিকে একটি হাস্যকর অপ্রাসঙ্গিক জাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে দেশের সিংহভাগ সাধারণ অসচেতন মানুষের কাছে। খোদ কলকাতায় বাঙালির ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসকে আক্রমণ করা হচ্ছে। তাদের কাজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হিন্দিভাষী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বাঙালিকে কাজ দেওয়া হবে না ঘোষণা করছে! আর বাঙালিরা প্রাদেশিকতার ছোঁয়াচ লাগার ভয়ে এখনও এসব দেখে চুপ করে বসে আছে!

 

Tuesday, 17 March 2026

দুর্নীতিরও স্ট্যাটাস আছে?

'সস্তা ভালো দামিও ভালো'

মালবিকা মিত্র



দেশকালের যাত্রাপথটি বোধকরি আঁধারে পথ হারিয়েছে। আর, একবার দিকভ্রান্ত হলে তখন সত্য মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সব গোলেমালে হরিবোল হতে বাধ্য। ভাবুন না, আমার বন্ধুর সন্তান এক নামী কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত। খবরের কাগজে দেখলাম, সেই সংস্থায় ১৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই হবে। আমি একটু চিন্তিত, ফোন করে জানতে চাইলাম সঠিক ব্যাপারটা। সে বলল, মানি, তোমরা এসব চাপ নিও না। এদের কাজ যাওয়াই উচিত। এদের একাংশ উঁচুতে মাথায় বসে আছে, কোম্পানির কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। আর দ্বিতীয় কথা হল, এক্সেস স্টাফ, যাদের কমানো উচিত। এদের কাউকে দিয়ে কাজ হয় না। আমাদের এ নিয়ে চিন্তা নেই, তোমরাও চিন্তা করো না।' 

অবাক লাগল, ১৯ হাজারের কর্মচ্যুতি আর কেমন নির্বিবাদে কর্তাদের মতো যুক্তি দেখাচ্ছে একজন কর্মচারী। এত আনুগত্য কোম্পানির প্রতি? আমাকে ব্যথিত করেছিল। যখন গভীরভাবে ভাবতে গিয়েছি, বন্ধুর সন্তানের এ হেন আচরণের যুক্তিপূর্ণ এক ব্যাখ্যাও পেয়েছি। যেমন, 

এক: জনৈক ঘটক পাত্রীর বাবা-মা'কে বলছে-- খুব ভালো পরিবার, পাত্রের আগে পরে কোনও ভাইবোন নেই। কিছুদিন আগে মা মারা গেছে, ফলে শাশুড়ির ঝামেলাও নেই। একমাত্র ছেলে মানে যা কিছু বিষয় আশয় সবই তো তারই। পরিবারের চার চাকার গাড়ি আছে। ছেলে নিজেদের গাড়িতেই অফিস যায়। ড্রাইভার আছে, গাড়ি দরকার মতো ফেরত পাঠিয়ে দেয়। মেয়ে আমাদের ঘুরবে ফিরবে, আনন্দ করবে, বুড়োবুড়ির ঝামেলাও নেই। বাবাও বেশ সক্ষম শক্তপোক্ত। বুঝলাম, এটার নাম ভালো পরিবার। পারিবারিক দায়দায়িত্ব না থাকার নাম ভালো পরিবার। নির্ভরশীল বুড়োবুড়ি না থাকার নাম ভালো পরিবার। এটা হল এই যুগের একটি নমুনা। 

দুই: আমরা ছোটবেলা থেকে হোটেল রেস্তোরাঁ'র বিজ্ঞাপনে দেখতাম লেখা থাকত-- আহারে তৃপ্তি, সম্পূর্ণ ঘরোয়া রান্না। খেয়ে মনে হবে ঘরেই খেলাম। এমনই এক রেস্তোরাঁ'র বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন লিখেছিলাম আমি: 'Come on any day,/ on the way.../ Far from home/ but not away.'। আর এখন রান্নার মশলা থেকে শুরু করে ইউটিউবে রান্নার টিপস দিতে গিয়ে লেখা হয়-- একদম রেস্টুরেন্টের স্টাইলে, ধাবার স্টাইলে, ঘরে বসে রান্না করুন। মা বোন মেয়েকে তাদের মতো করেই ঘরে দেখতাম, রূপোলি পর্দার নায়িকাদের মতো করে নয়। কিন্তু এখন বোধ করি সেই ভেদটা থাকছে না। বাড়ির মেয়ে বউরাও কেমন যেন রূপোলি ঝলমলে হয়ে উঠেছে।

তিন: আমার বান্ধবী একই বিদ্যালয়ে একনাগাড়ে ৩৪ বছর চাকরি করে অবসর নিল। তার সন্তান বুঝতে পারে না, মানুষ কীভাবে একই অফিসে এ ভাবে এত সুদীর্ঘ দিন কাটাতে পারে। পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটেও তো মাঝে একদিন রেস্ট ডে থাকে। এটা টি-টোয়েন্টির যুগ। How is it possible to continue such a boring and dragging life! Disgusting!! হয়তো বা আমাদের সুদীর্ঘ ৪০ বছরের বিবাহিত জীবন দেখেও ওদের এমনই মনে হয় আজকাল। 

মনে পড়ে যায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ছোটগল্প 'খাজাঞ্চিবাবু'। একটি কারখানা এবং তার পুরনো খাজাঞ্চির জীবন-জীবিকার পরিবর্তনের করুণ আখ্যান। নতুন ম্যানেজারের আগমনে পুরনো দিনের রীতিনীতি ও কর্মচারীদের আন্তরিকতার কদর হারিয়ে যাওয়ার বাস্তব চিত্র এই গল্প। খাজাঞ্চিবাবু বহু বছরের পুরনো এক অকৃত্রিম, নিষ্ঠাবান ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের মানুষ, যিনি পরিবর্তনের স্রোতে কর্মচ্যুত হলেন। বিদ্যালয়ের নবম দশম শ্রেণীর ক্লাসে এই গল্পের পাঠ নিতে কেন এই প্রজন্মের মধ্যে  সাড়া জাগতো না, তা এখন বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারি। বুড়ো খাজাঞ্চিবাবু, হাড় জিরজিরে বুড়ো মহেশ, লড়ঝড়ে সকলের ব্যঙ্গ ও পরিহাসের পাত্র বিমল ও তার জগদ্দল, গোবিন সিংয়ের বেতো বুড়ো ঘোড়া, এসব পড়িয়ে, এসবের পাঠ দিয়ে নতুন প্রজন্মকে কিছুই অনুপ্রাণিত করতে পারিনি। আসলে কবি ঠিকই বলেছিলেন: 'মানুষের হৃদয়কে না জাগালে পরে/ তাকে ভোর পাখি অথবা বসন্তকাল বলে/ আজ তার মানবকে/ কি করে চেনাতে পারে কেউ?'

আসলে জমি তৈরি না করে ওপর ওপর বীজ ছড়িয়েছি শুধু। 

রেস্তোরাঁ ধাবা যদি ঘরে ঢুকে পড়ে, রূপোলি পর্দার নায়িকা যদি ঘরে এসে যায়, ঘরটা যদি হোটেল-রিসর্ট'এর সাজে সেজে ওঠে, তখন কোম্পানির কর্মচারীর মুখে কোম্পানির মালিকের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। যাবেই, এটাই স্বাভাবিক। অফিস স্টাফ ওভার-ক্রাউডেড মনে হলে, বাড়িতেও স্বল্প বেতনের কোনও সদস্য বা কর্মক্ষমতাহীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, সবকিছুই মনে হবে ওভার-ক্রাউডেড। এভাবে রেল, ভেল, বিএসএনএল, যেখানে যত মানুষ কাজ হারায় আমাদের আর নাড়া দেয় না, ওভার-ক্রাউডেড যুক্তির কারণে। কেবল নাড়া দেয় তখন, যখন আমি সেই ওভার-ক্রাউডের দলে শামিল হই। 

প্রশ্ন করেছি, কেন কোলেটারাল ড্যামেজ সবসময় জনজাতি আদিবাসীর উপর হয়, কেন বস্তিবাসীর ওপর হয়, কেনই বা নিম্নবিত্ত গরিব চাষীর উপর হয়? কখনও কোলাটারাল ড্যামেজে পার্লামেন্ট রাজভবন ভাঙ্গা পড়ে না তো! এই মানসিকতা থেকেই বলা হয়, দেশের শিল্পপতিরা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে যদি পরিশোধ না করে, তা অনাদায়ী ঋণ। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই সমস্ত ঋণকে 'রাইট অফ' করে। এই প্রসঙ্গে আমার ওই বন্ধুর সন্তান বলেছিল, এটা তো যুক্তিসঙ্গত। কারণ, তুমি তো শিল্প করবে না। শিল্প করবে বড় বড় শিল্পপতিরা। তারা ঋণ শোধ করেনি বলে তুমি যদি তাকে নতুন করে ঋণ না দাও তাহলে তো নতুন শিল্প হবে না। যখনই সে ঋণ নিতে যাবে, কম্পিউটারের সিস্টেমে তার পুরনো ঋণ অনাদায়ী দেখাবে। ফলে, তার নতুন ঋণ আটকে যাবে। তাই পুরনো হিসেবপত্র সরিয়ে রাখতে হবে সিস্টেম থেকে। তবেই নতুন ঋণ, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান হবে। কী অসাধারণ যুক্তির প্রয়োগ। 

ঠিকই বলছে। ন্যায়-নীতি মূল্যবোধ দিয়ে দুনিয়াকে বিচার করা যাবে না। কিন্তু ওরাই আবার প্রশ্ন তোলে, এই বাংলায় কাজের সুযোগ নেই। সবাই বাইরে চলে যাচ্ছে। ওকেই যখন প্রশ্ন করি, বাইরে যদি এতই কাজের সুযোগ তাহলে সারা ভারতে বেকারত্ব বৃদ্ধির গড় এত উচ্চ হারে থাকে কী করে? আর এই বাংলার বেকারত্বের হার সারা দেশের গড়ের চেয়ে নিচে হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না বন্ধুর ছেলে। এ রাজ্যে এসএসসি থেকে শুরু করে সর্বত্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। সর্বত্র কীভাবে ঘুষ দুর্নীতি চলেছে তা নিয়ে মুখর। কিন্তু ওই আবার কর্পোরেট মহলের ব্যাঙ্কের টাকা চুরি, ইলেক্টোরাল বন্ড আর আমেরিকার লবিইজম মেনে নেয়। বিচিত্র যুক্তির সমাহার। আসলে কি এই যুক্তির পিছনে স্বার্থান্বেষী শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি খুব প্রবল ভাবে কাজ করে?

আসলে, বেশ কয়েক বছর হল, মধ্যবিত্ত বাঙালি যারা নিরুত্তাপ, নিরুপদ্রব, ঝুঁকিমুক্ত জীবন যাপন করত, তারা নন-ব্যাংকিং সেক্টরে অর্থ লগ্নী করে দ্রুত অর্থ উপার্জনে আগ্রহী হল। দেখলাম, এদের কেউ কেউ সারাক্ষণই শেয়ার বাজারের উত্থান পতন নিয়ে চিন্তা করে। শুনেছি, এদের অনেকেই ভুরি ভুরি অর্থ অপচয় করেছে শেয়ার পতনের মধ্য দিয়ে। বলতে শুনেছি, এই মার্কেটে তো ওঠানামা থাকেই। এইটুকু ঝুঁকি মেনে নিতেই হবে। ফলে, সে ঝুঁকি থেকে বাঁচতে আরও বড় ঝুঁকি, তারপর ফাঁকি, আরও বড় ফাঁকি, চুরি-ডাকাতি-স্ক্যাম, দেশ থেকে পলায়ন।

এইভাবেই চলেছে দেশ। যারা অর্থবান অথবা দ্রুত অর্থবান হতে উন্মুখ, তারা বড় বড় ঘোটালা তৈরি করে। সেই ঘোটালার আবার স্তর ও শ্রেণি ভাগ আছে। যারা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য টাকা নেয়, তাদের আবার ব্যাঙ্ক খালি করে দেওয়া চোরেরা পছন্দ করে না। দুর্নীতিরও স্ট্যাটাস আছে। আজকাল উঠতি বাঙালি নব্য ধনীরা যতটা নিয়োগ দুর্নীতি বা ছিঁচকে তোলাবাজি নিয়ে সোচ্চার, ততটাই আবার কর্পোরেট ডাকাতি (যাকে 'স্ক্যাম' বলে আদুরে সম্বোধন করা হয়) নিয়ে ততোধিক নীরব বা গোপন সমর্থক। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি না করেও একটি রাজ্যে রাজ্যপালের হাতে ক্ষমতা অর্পণ, নির্বাচন কমিশন দ্বারা রাতারাতি মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ কমিশনার, জেলা শাসক, সকলকে অপসারণ-- এইসব নব্য ধনীদের চোখে খুবই স্বাভাবিক। আইনক্স, আউটিং, উইকএন্ড, লং-ড্রাইভ, পার্টি সেলিব্রেশন, ধাবা, রিসর্ট, সুইগি, জোমাটো, শপিং মল, আইফোন যখন জীবন জুড়ে, তখন তা জোগানোর অফুরন্ত অর্থ তো আসবে কর্পোরেট স্ক্যামের ভাণ্ডার থেকেই। তাই, স্ক্যাম ভালো, কাটমানি খারাপ। আমরা যারা দুটোকেই পরিত্যাজ্য ভাবি ও ঘৃণা করি, তাদের আবার স্ক্যামওয়ালা'রা পোঁছে না। আর নিম্নবর্গের একাংশ যাদের এগুলির সামর্থ্য নেই, কিন্তু এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত, তারাও এই জীবনের রেপ্লিকা, মানে রাংতার মুকুট পরে তৃপ্ত হতে চায়, সন্তুষ্ট থাকে। অতএব, 'এই দুনিয়ায় সবই ভালো/ সস্তা ভালো দামিও ভালো/ আসল ভালো নকল ভালো।'

সরকারি কোষাগারের অর্থ বেশি বেশি জনকল্যাণে যাবে, নাকি কর্পোরেটের সুযোগ-সুবিধায়-- এই তর্কের আধারেই দেশের যাবতীয় কোলাহল। এই তর্কের পরিণতিতেই নব্য ধনীরা সোচ্চারে কর্পোরেট স্ক্যামের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে, দুর্নীতির গ্রাহ্য ও অগ্রাহ্য বর্গ তৈরি করে। কিন্তু আপামর সাধারণ মানুষের জনকল্যাণ পেলে মস্ত লাভ। আপনি যে বিত্তেরই হোন, যুক্তির নিরিখে আপনি কোনদিকে সে আপনার চয়ন।