Friday, 15 May 2026

পরীক্ষার স্বচ্ছতা রসাতলে

নীট দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



কোথাও চাকরি তো কোথাও ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি। 'ডবল ইঞ্জিন' সরকারের জমানাতেও... হয়েই চলে।.২০২৪'এর পর ২০২৬। নির্দিষ্ট করে বললে, ঠেকানোর সদিচ্ছাই নেই। নইলে এসব 'করিয়ানরা' সরকার বাহাদুরের বদান্যতায় প্রাইজ পোস্টিং পান! এই তো অচ্ছে দিন! 

এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁসে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের স্নাতক স্তরের ডাক্তারির প্রবেশিক পরীক্ষা নীট (ইউজি) হয়েছিল গত ৩ মে। ৯ দিন কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশ জুড়ে চলতি বছরের নীট (ইউজি) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মোদী সরকারের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা বাতিলের কথা ঘোষণা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। 

কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের ভার সিবিআইকে দিয়েছে। সিবিআই তদন্তও শুরু করে দিয়েছে। যারা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে বিজেপির এক নেতাও আছে। যদিও বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দেওয়াটাই এখন প্রশাসনিক দস্তুর। বিজেপি যে জড়িত, এটা আমার কষ্টকল্পিত নয়, রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত এক্স-এ একটি পোস্টে দাবি করেছেন, 'নীট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত দীনেশ বিনওয়াল ভারতীয় জনতা পার্টির একজন কর্মকর্তা।' গেহলত অভিযুক্তের একটি পোস্টারের ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে জয়পুর গ্রামীণ এলাকার বিজেওয়াইএম-এর জেলা সম্পাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি মুকেশ দধিচ বলেছেন, দলে বিনওয়ালের কোনও পদ নেই। 

এবার নীট (ইউজি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের এপিসেন্টার রাজস্থান। বিজেপি শাসিত রাজস্থান। যেখানে বিরোধীদের ট্যাঁফোঁ করতে দেওয়া হয় না। আমি নিশ্চিত, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত হইচই না করলে আরও অনেক কিছুর মতো এই কেলেঙ্কারিও চাপা পড়ে যেত। এতদিনে হয়তো প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলও প্রকাশ পেয়ে যেত; কেননা, ৩ মে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা উঠে এসেছিল কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। বাংলা জয়ের গর্বে বলীয়ান বিজেপি সেই বিজয়বার্তা সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার ধামাকায় নীট কেলেঙ্কারি চাপা দিয়ে ফেলেছিল প্রায়। তবে শেষরক্ষা হল না। পরীক্ষার ৮ দিন পর ১১ মে এনটিএ জানিয়েছে, পরীক্ষা বাতিল আর ১২ মে জানিয়েছে, ফের নীট (ইউজি) পরীক্ষা কবে তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। কবে অ্যাডমিট কার্ড পাওয়া যাবে ও পরীক্ষার সময়সূচিও জানিয়ে দেওয়া হবে। নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। নতুন করে পরীক্ষার ফি-ও দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। কী মহানুভবতা! 

লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী যথার্থই নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসে কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় তোপ দেগে এক্স-হ্যান্ডেলে রাহুল লেখেন, 'নীট ২০২৬ সালের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। ২২ লাখের বেশি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নকে দুর্নীতিগ্রস্ত বিজেপি সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাবারা তাঁদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঋণ নিয়েছেন, মায়েরা তাঁদের গয়না বেচে দিয়েছেন। লাখ লাখ বাচ্চারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেছে। বদলে কী পেল তারা? প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারের গাফিলতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগঠিত অপরাধ। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রত্যেকবার পেপার মাফিয়ারা বেঁচে যায় আর সৎ পড়ুয়ারা সাজা পায়। ফের লাখ লাখ পড়ুয়াকে মানসিক চাপ, আর্থিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। যদি কারও ভাগ্য কঠোর পরিশ্রমের বদলে অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাদের যোগাযোগ কতটা তার উপর নির্ভর করে, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? প্রধানমন্ত্রীর 'অমৃতকাল' দেশের জন্য বিষ কালে পরিণত হয়েছে।'  

সর্বভারতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও স্বচ্ছতা আজ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে সিবিআই'এর প্রধান কাজটিই হবে, এই দুর্নীতির মাথাদের বাঁচানো। অতীতে বহু তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআই এই কাজটাই করে এসেছে। আর লক্ষ করবেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এ ব্যাপারে কোনওরকম হইচই করছে না। টিভির পর্দায় কোনও চিৎকারজীবী বলবে না, 'দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? যুব সম্প্রদায়ের তো চাকরি নেই। ভারতের বেকারত্বর হার সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। ডাক্তারি কোর্সে পড়তে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েরা টাকা খরচ করছে। এবছর নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। কেন্দ্রীয় সরকার কী বলছে? ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি কি প্রশ্নপত্র নিলামে চড়িয়ে দিল?' কেউ দাবি করবে না, কেন্দ্রকে এর জবাব দিতে হবে। খোলসা করতে হবে, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, থাকলে সেই পৃষ্ঠপোষক কারা? 

নীট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে গোটা দেশে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। বেনজির অনিয়মের অভিযোগে যখন লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন  ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, দেশ জুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। খাস রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই প্রথম নয়। নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশ জুড়ে শোরগোল পড়েছিল। সে সময় অভিযোগ ওঠে, ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের ওয়েসিস স্কুল থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ওই স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মীকে গ্রেফতার করে সিবিআই। সিবিআই নীটের বেশ কিছু আধপোড়া প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছিল। সেই প্রশ্নপত্র খতিয়ে দেখার পর ঠিক কোন কেন্দ্র থেকে ফাঁস হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সিবিআই তখন দাবি করেছিল, পঙ্কজ কুমার ওরফে আদিত্য ওরফে সাহিল নামে এক যুবকের সঙ্গে মিলিত ভাবে ওয়েসিস স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মী প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। এবারও তদন্তর মতিগতি দেখে ২০২৪ সালের কথাই মনে পড়ছে। 

রিসাইকল অফ মেমোরি যেন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত। আর এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে বেশ কিছু 'ভদ্রবিত্ত' মানুষের নাম। যেমন মনে পড়ছে সুবোধ কুমার সিংয়ের কথা। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র প্রাক্তন এই প্রধানকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও বিস্ময়কর মোড় নিয়েছে। ১৯৯৭ ব্যাচের ছত্তিশগড় ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার সুবোধ কুমার সিং। আইআইটি রুরকির মতো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর ইগনু থেকে এমবিএ করা এই আধিকারিক এক সময় প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খনিজ সম্পদ নিলামে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে সাফল্যের জন্য তিনি জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে পুরেছিলেন। ২৯ বছরের কেরিয়ারে ৩০টির বেশি সম্মানীয় পদে কাজ করেছেন। মোদী জমানায় তাঁর কেরিয়ার গ্রাফ দেখবার মতো। ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি এনটিএ-র ডিরেক্টর জেনারেল পদে আসেন। আর তিনি যখন এই দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই যেন দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর কার্যকালেই ভারতের কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষামূলক কেলেঙ্কারিগুলো দানা বাঁধে। ২০২৪ সালের নীট-ইউজি এবং ইউজিসি-নেট পরীক্ষার সময় যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। নীট পরীক্ষায় দেড় হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীকে বিতর্কিতভাবে 'গ্রেস মার্কস' দেওয়া, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নেট পরীক্ষা বাতিল করা এবং বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রের জাল বিস্তার— সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনটিএ তখন কেবল অস্বীকারের রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে সেই বছরের জুন মাসে মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রক স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এটি একটি 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা'। চাপের মুখে ২০২৪ সালের ২২ জুন সুবোধ কুমার সিংকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে 'কম্পালসরি ওয়েট'-এ পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা হয়, লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে হয়তো কঠোর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে মোদী সরকার যেন স্বচ্ছতার পথে হাঁটল। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুলে যায় বা জানেই না, আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা এক জটিল সমীকরণ নিয়ে চলে। তাই সুবোধের ওই অপসারণটি আদৌ কোনও শাস্তি ছিল না, ছিল আইওয়াশ। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীনই ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছাত্র ও অভিভাবক মহলে এটি 'শাস্তির বদলে পুরস্কার' হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। শুধু ওইটুকুই নয়, ২০২৪ সালের শেষে সুবোধ কুমার সিং কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন ছেড়ে তাঁর পুরনো ক্যাডার ছত্তিশগড়ে ফিরে যান। সেখানে তখন বিজেপির নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মোদী-শাহর আস্থাভাজন বিষ্ণু দেও সাই। সেই সরকার গঠন হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি 'মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব' (Principal Secretary) পদে বসানো হয়। প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এই পদটি কতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন তা নিশ্চয়ই পাঠককে বলে দিতে হবে না। শুধু এটুকুই নয়, সুবোধ সিংয়ের অগ্রগতি চলছেই। ২০২৬ সালে তাঁর পুরস্কারের বহর আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের ৬ মে এক সরকারি নির্দেশে তাঁকে ছত্তিশগড় রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভেবে দেখুন, ঠিক কোন সময় তাঁর ঘাড়ে এই বিশেষ দায়িত্ব বর্তাচ্ছে! যখন ২০২৬ সালেও নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে দেশ উত্তাল, সেখানে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানের এমন লাগামহীন উন্নতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, গেরুয়া ভারত কোন রসাতল অভিমুখী। সুবোধ সিং নাম্নী এই আধিকারিকের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ ছিল, আজ তিনি একটি গোটা রাজ্যের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বাজেট আর নীতি নির্ধারণের সর্বেসর্বা। যেখানে এটা ২০২৪-এর দুর্নীতির ফসল, সেখানে ২০২৬ সালের এই নতুন পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুবোধ কুমার সিংয়ের পদোন্নতি এক অশুভ সংকেত বহন করছে। 

মনে রাখবেন, পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ভারতে অন্তত ১৫টি বড় সরকারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ কোটি পরীক্ষার্থী।


Saturday, 9 May 2026

এবারের ২৫ বৈশাখ

'তাসের দেশ' ও সেই পদযাত্রা

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'তাসের দেশ' লিখেছিলেন। উৎসর্গ করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। শতবর্ষ পানে অগ্রসরমান এই নৃত্যনাট্যটি এবারের ২৫ বৈশাখে তাসের দল'কে মনে করাতে পারে। 

২০১২ সালের ২৫ বৈশাখের আশপাশে 'একক মাত্রা' একটি অনবদ্য সংখ্যা প্রকাশ করেছিল যার প্রচ্ছদ বিষয় ছিল 'অন্য রবীন্দ্রনাথ'। বৈচিত্র্য ও গভীরতার গুণে সেই সংখ্যার এত কদর হয়েছিল যে তার আর অবশিষ্ট কপি পড়ে নেই। সেবার ছিল কবিগুরুর সার্ধশতবর্ষ কাল।

তিনি এইভাবেই বারে বারে ফিরে আসেন।

এবারের ২৫ বৈশাখ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বাংলা ৩০ আশ্বিন, ১৩১২) দিনটিকেও মনে করাতে পারে। কারণ, বাংলার অগুনতি মানুষ আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩, ৯ মে ২০২৬) ১৬ অক্টোবর দিনটিকে স্মরণ করে আবারও হাঁটার প্রস্তুতি নিয়েছেন সেই পথ ধরে যে পথে তিনি গঙ্গার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো ছুঁয়ে পৌঁছেছিলেন নাখোদা মসজিদ অবধি। তাঁর অপার কর্মসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ তো ব্যাপ্ত ও সর্বজনীন; মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার সমস্ত আবেদনেই তিনি আছেন। ১৬ অক্টোবর (১৯০৫) ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিন। সেই দিনটিকে তিনি এক অনন্য প্রতিবাদী রূপ দেন। ডাক দেন 'অরন্ধন' ও 'রাখিবন্ধন' উৎসব পালনের। সেদিন ঘরে ঘরে উনুন জ্বলবে না এবং একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে এই বার্তা দেওয়া হবে যে, ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশ ভাগ করলেও বাঙালির হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করতে পারবে না।

সেদিন ভোরে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাবেশ গঙ্গার জগন্নাথ ঘাটে (মতান্তরে, বাগবাজার বা সংলগ্ন কোনও ঘাট) সমবেত হয়। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল গঙ্গাস্নানের মধ্য দিয়ে। সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল উক্ত ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে। স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে রবীন্দ্রনাথ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। যখন মিছিল শুরু করেন, তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারণ ধুতি, গায়ে চাদর এবং পায়ে কোনও জুতো ছিল না। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তাঁরই রচিত সেই কালজয়ী গান: 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।'

মিছিল উত্তর কলকাতার বিভিন্ন গলি ও প্রধান রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে সামনে হেঁটে একেকজন পথচারী, রিকশাচালক এবং সাধারণ মানুষের হাতে রাখি বেঁধে দিচ্ছিলেন। কোনও ভেদাভেদ নেই, সবার লক্ষ্য একটাই, অখণ্ড বাংলা। মিছিল চিৎপুর রোড হয়ে নাখোদা মসজিদের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাপথের সবচেয়ে আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল যখন মিছিলটি চিৎপুর রোডের নাখোদা মসজিদের সামনে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন চিত্তে মসজিদের ভেতরে এবং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম মৌলবি ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের দিকে এগিয়ে যান। প্রথা ভেঙে তাঁদের কবজিতে রাখি বেঁধে দেন। এই অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মিছিল যখন এগোচ্ছিল, তখন কেবল পুরুষরাই নন, বাড়ির অন্দরমহল থেকে মহিলারাও জানলা ও বারান্দা দিয়ে উলুধ্বনি দিচ্ছিলেন এবং শাঁখ বাজাচ্ছিলেন। অনেকেই রাস্তার ওপর নেমে এসে মিছিলে যোগদান করেন। জনশ্রুতি আছে, স্বদেশি তহবিলের জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের যথাসর্বস্ব দান করছিলেন। এমনকি রাস্তার ধারের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— যারা হয়তো জানতেনও না যে রবীন্দ্রনাথ কে— তাঁরাও কবির বাড়িয়ে দেওয়া হাতের রাখি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন। মিছিলটি যখন একটি আস্তাবলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে কর্মরত সহিসদের দেখে রবীন্দ্রনাথ থমকে দাঁড়ান, নিজ হাতে তাদের হাতেও রাখি বেঁধে দেন।

পদযাত্রার শেষে সেই উত্তাল জনসমুদ্র এসে জমায়েত হয় আপার সার্কুলার রোডে (বর্তমান আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) অবস্থিত ফেডারেশন হল প্রাঙ্গণে। সেখানে আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্বে এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আনন্দমোহন বসু উপস্থিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ 'বিজয় সম্মিলনী'র গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং বাংলার অখণ্ডতার শপথ নেন। তিনি তো কেবল নিভৃতচারী কবি নন, বরং জাতির দুর্দিনে একজন দক্ষ সেনাপতি ও পথপ্রদর্শক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেদিন পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, সেদিন মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা এবং ঐক্য তিনি দেখেছিলেন, তা কলকাতার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। সমগ্র শহরটি যেন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিল।

আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩) আবারও সেই একই পথ ধরে হাঁটবেন শয়ে শয়ে মানুষ। তেমনই ভেবেছেন ও প্রস্তুতিও নিয়েছেন। অন্তত ১২০ বছর পর। হয়তো গাইবেন 'বাংলার মাটি বাংলার জল...'। 



 


Friday, 1 May 2026

ঘরবন্দী শ্রম

নারীর শ্রম আজও অদৃশ্য কেন? 

কৌশিকী ব্যানার্জী



ভারতের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার যে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্ন ও ক্রমহ্রাসমান, তা নিয়ে চর্চা বহুদিনের। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও প্রজনন হারে হ্রাসের ফলে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ বিষয়ে ক্লাউদিয়া গোল্ডিন-এর (১৯৯৫) একটি বিখ্যাত তত্ত্ব ‘feminization-U hypothesis’-এর কথা বলতেই হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের সম্পর্কটি একটি U-আকৃতির বিন্যাস অনুসরণ করে। অর্থাৎ, অর্থনীতি যখন কৃষি থেকে শিল্প খাতে (নিম্ন থেকে মধ্যম আয়) রূপান্তরিত হয়, তখন নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ (Female Labour Force Participation) প্রাথমিকভাবে হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে শিক্ষার স্তর, সেবা খাত ও মজুরি বৃদ্ধির সাথে সাথে (উচ্চ আয়) তা আবার বৃদ্ধি পায়। তবে ভারত এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম, এখানে সম্পর্কটি উল্টো-U আকৃতির। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ বৃদ্ধি, নিম্ন প্রজনন হার এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার হতাশাজনকভাবে নিম্নমুখী ও হ্রাসমান। কৃষিক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হ্রাস, যার সাথে অন্য খাতে কর্মসংস্থানের আনুপাতিক বৃদ্ধি না ঘটা, শিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির দুষ্প্রাপ্যতা এবং কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য সুগম রাস্তা ও গণপরিবহনের অভাবকেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন। 

গ্রামীণ ভারতে এ ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়েছে: NSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; অন্যদিকে, শহুরে ভারতে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ। কারণস্বরূপ: 'আয় প্রভাব', অর্থাৎ, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির কারণে নারীদের কর্মজগৎ থেকে সরে দাঁড়ানো, কিংবা শিক্ষার হারবৃদ্ধির ফলে কর্মজগতে দেরিতে প্রবেশ বা কর্মস্থল, পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানি ও অপরাধ এবং সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব। কিন্তু, অশ্বিনী দেশপাণ্ডে ও জিতেন্দ্র সিং'এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে পতনের মূল কারণ, গ্রামীণ নারী, বিশেষ করে গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার হ্রাস পাওয়া। অবশ্য এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, জনসংখ্যার অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি পরিবারগুলোর আয় অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিংবা, নারীদের অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের ওপর যৌন অপরাধের হার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে তাদের কর্মে যোগদানের হার কম কেন?

আর একটি পরিসংখ্যান দিলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে। ২০২৬ সাল অবধি ভারতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের (NEET) বাইরে থাকা মহিলাদের হার অত্যন্ত বেশি: ৩৯ থেকে ৪৪ শতাংশ। এর অর্থ, প্রতি ১০ জন তরুণীর মধ্যে ৪ জনেরও বেশি কর্মশক্তি বা শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠবে, এরা কোথায় রয়েছেন? এঁরা কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই গৃহস্থালি কাজে নিযুক্ত, যাকে বলে অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রম, যা জিডিপির হিসাব বহির্ভূত। এই মহিলারা পারিবারিক ব্যবসা, পশুপালন, কৃষিকাজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য করা হয় না, বরং তাঁদের ‘অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ হিসেবেই তালিকাভুক্ত করা হয়। জাতীয় সমীক্ষাগুলিতে বলা হয়েছে, কাজ যদি নারীদের নিজেদের বাড়িতে কিংবা বাড়ির কাছাকাছি সহজলভ্য হয়, তবে তারা করতে আগ্রহী।

দেশপাণ্ডে তাঁর আর একটি গবেষণাপত্রে এইসব অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রমে নিযুক্ত মহিলাদের কর্মকাণ্ডকে ‘ব্যয় সাশ্রয়ী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা বলেছেন। কারণ, তাঁদের অবেতন শ্রম পরিবারের শ্রমব্যয় হ্রাস করছে। কিন্তু তাঁদের এই কাজ প্রচলিত অর্থনৈতিক উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃত নয়। শুধু পারিবারিক ব্যবসা বা কৃষিকাজ নয়, এরা অবেতনভোগী পরিচর্যা ও বিভিন্ন সাংসারিক কাজেও যুক্ত, যার অন্তর্ভুক্ত শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাপ্তবয়স্ক এবং অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা প্রদান, যেমন, খাওয়ানো, প্রাত্যহিক জীবনযাপনের কাজে সহায়তা করা, চিকিৎসার প্রয়োজনে পাশে থাকা এবং পরিচর্যা-সংক্রান্ত অন্য যে কোনও প্রয়োজন মেটানো। জনসংখ্যার বার্ধক্য ও ‘demographic dividend’ হ্রাসের ফলে আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব জুড়ে অবৈতনিক সেবা কাজের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি বা বাজার-ভিত্তিক সেবা অবকাঠামো ও পরিষেবার অভাব সম্ভবত নারীদের ওপর সেবাদানের বোঝা বৃদ্ধি করবে এবং পরিবার ও শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্যের দুষ্টচক্রকে আরও সুদৃঢ় করবে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোকে ব্যাহত করে। 

ভারতের ক্ষেত্রে অর্থনীতি বিরাট ক্ষতির মুখে। কারণ, এই মুহূর্তে দেশে সর্বাধিক কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে খুব কমসংখ্যক মহিলা ফর্মাল সেক্টরে স্থায়ী মজুরিভিত্তিতে কর্মরত। বেতনভুক ও অবৈতনিক— উভয় প্রকারের কাজের ক্ষেত্রেই ভারতে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্রা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। এখানে শক্তিশালী পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যাপক প্রচলন। টাইম ইউজ সার্ভে (Time Use Survey) বলছে, ভারতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে দ্বিগুন সময় 'অবৈতনিক সেবা কাজে' এবং তিন গুন বেশি সময় 'অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে' ব্যয় করেন। অধিকন্তু, ভারতে অবৈতনিক সেবা কাজের বোঝা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর (৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব) সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে হিসেব করা হয়েছে, যা বিশ্ব গড়ের চেয়ে ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তাছাড়া, ৮৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের সংখ্যা— যাদের সাধারণত অত্যন্ত উচ্চমাত্রার প্রত্যক্ষ সেবার প্রয়োজন হয়— ২০৫০ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। 

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট জার্নাল'এ ২০২৪-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ভারতে অবেতনভুক্ত পরিচর্যা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকট লিঙ্গ বৈষম্যকে তুলে ধরা হয়েছে। গড় সময়ের অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিদিন পরিচর্যার কাজে এক ঘণ্টা বেশি ব্যয় করলে নারীরা তাদের মোট কর্মসংস্থানজনিত সময় ১.১৩ ঘণ্টা কমিয়ে দেন; পক্ষান্তরে পুরুষেরা এই সময় কমান মাত্র ১৬ মিনিট (যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যহীন)। নারী এবং পুরুষেরা তাদের স্ব-কর্মসংস্থানজনিত (self-employment) সময় যথাক্রমে ১৮ মিনিট এবং ১.২ মিনিট কমিয়ে দেন। এমনকি কর্মরত মহিলারাও দৈনিক ৩.৫ থেকে ৪.৮ ঘন্টা গার্হস্থ্য শ্রম দিয়ে থাকেন যার এক-চতুর্থাংশ সময় পুরুষরা দেন। ভারতে কোভিড মহামারির সময় নারীদের ওপর গৃহস্থালি কাজের বোঝা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ভারতে যে সব মেয়েরা পরিচর্যা কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের অন্যান্য সাংসারিক কাজেও নিযুক্ত করে দেওয়া হয়। কারণ, পরিবারের অসুস্থ বা নির্ভরশীল সদস্যদের এমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন হতে পারে যার প্রস্তুতির জন্য রান্নাবান্নায় অধিক সময় ব্যয় করতে হয়; কিংবা তাদের বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত চাহিদার কারণে ঘর পরিষ্কার ও কাপড় ধোয়ার কাজেও সময় ব্যয় করতে হতে পারে। ঘরোয়া কাজে এই বৈষম্য উন্নত দেশেও রয়েছে, যাকে ‘মাতৃত্বের দণ্ড’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আবার এর বিপরীত মতও রয়েছে যেখানে অবেতনভোগী পরিচর্যা কাজ সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি এবং দৈনিক ও আন্তঃপ্রজন্মগত ভিত্তিতে শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সমষ্টিগত অর্থনীতির সচলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে সেবা প্রদানের ফলে সেবা প্রদানকারীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বোঝা চাপতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, নিজের যত্ন নেওয়ার সময়ের অভাব, বিনোদনের অভাব, যা মানসিক চাপ বৃদ্ধি ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকি, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিম্নমান এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ; আর এসবই ঘটে ‘সময়  দারিদ্র্যে'র (time-poverty) দরুণ। এগুলো পরোক্ষভাবে বিরাট সামাজিক ব্যয় হয়ে দাঁড়ায়, যা মূলত মানব সক্ষমতা থেকে বঞ্চনা এবং শ্রমশক্তির স্বল্প ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়; আর এর ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বা ফলাফলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

বর্তমান ভারতে কয়েক কোটি অবেতনভুক্ত মহিলা শ্রমিক রয়েছে। এদের কাজের মূল্যায়ন বা অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে এলসনের (২০১৭) 3R Strategy- ‘Recognize, Reduce, Redistribute’ প্রয়োজন। তাছাড়া, লিঙ্গ-ভিত্তিক গতানুগতিক ধারণাগুলোকে বর্জন করে নারীদের ক্ষমতায়ন, গণপরিবহন থেকে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদান, সবেতন পরিচর্যা ছুটি, বাজারপ্রদত্ত সেবা পরিকাঠামো ও পরিষেবা, মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান কর্মক্ষেত্রে যোগদানের হার বাড়াতে পারে। মেয়েদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানসিকতার অনেক বদল হয়েছে। এবার লিঙ্গপ্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসে অবৈতনিক সেবা ও ঘরোয়া কাজের দুষ্টচক্র থেকে মেয়েদের বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়ে আলোচনা এতই কম যে তা স্বাধীনতার এত বছর পরেও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।


Tuesday, 21 April 2026

ইতিহাসে চোখ রাখুন

যখন স্বৈরাচারীর পতন আসন্ন

মালবিকা মিত্র



নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতন সম্পর্কে ঐতিহাসিক মার্খহ্যামের দুটি মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য-- Hitherto Napoleon Bonaparte fought the kings, but after 1806 he faced the nations.। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ, ইউরোপের রাজশক্তিগুলি যে বিপুল পরিমাণে জাতিসত্তাগুলিকে দমন করে রেখেছিল তাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ। নেপোলিয়ন এই জাতিসত্তাগুলির সামনে মুক্তিদাতা ও ত্রাতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা আশা করেছিলেন, নেপোলিয়ন তাঁদের মুক্ত করে রাজশক্তির পীড়নের নাগপাশ ছিন্ন করবেন। ফলে, নেপোলিয়ন গণ সমর্থন লাভে সক্ষম হয়েছিলেন। নেপোলিয়ন যখন এক একজন রাজার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাচ্ছেন, সেখানকার প্রজারা নেপোলিয়নকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে স্বাগত জানিয়েছেন। এটাই ছিল নেপোলিয়নের সাফল্যের চাবিকাঠি। 

কিন্তু নেপোলিয়ান যখন স্পেন অভিযানে গেলেন, স্পেনের জনগণের বিপুল সমর্থন অর্জন করলেন, তারপর তাঁরা হতবাক হয়ে দেখলেন, নেপোলিয়ন তাঁর ভাই জোসেফ'কে স্পেনের শূন্য সিংহাসনে বসালেন। স্পেনের জনগণের আশা ছিল, তাদের পছন্দের ফার্ডিন্যান্ড'কে নেপোলিয়ন ক্ষমতায় বসাবেন। এরপরে স্পেনের মাটিতে শুরু হয়েছিল জাতীয় প্রতিরোধ, যা নেপোলিয়নের ভাষায় 'স্প্যানিশ আলসার'। এই ক্ষত আর নিরাময় হয়নি। বরং ইউরোপের দেশে দেশে জাতিগুলি নেপোলিয়নকে ত্রাতার আসন থেকে অপসৃত করে। সর্বত্র নেপোলিয়ান বিরোধী প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। এই জাতীয় প্রতিরোধের সামনে নেপোলিয়নকে পরাজয় মেনে নিতে হয়। সেই কারণেই ঐতিহাসিক মার্খহ্যাম অমন উক্তি করেছেন। 

ইতিহাসকে স্মরণে রেখে আসুন, আমরা একটু সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকাই। এর আগেও ভারতীয় রাজনীতিতে বিহারের নালন্দা জেলার চাকুরির পরীক্ষার্থী মহারাষ্ট্রে গিয়ে অত্যাচারিত ও নিহত হয়েছে। তার জন্য বিহারে ট্রেন পুড়েছিল। অসমে বাঙালিরা অত্যাচারিত হয়েছে। কিন্তু খোলামেলা ভাবে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের ভাষায় 'ডাবল ইঞ্জিন' রাজ্যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা এর আগে দেখা যায়নি। বিজেপির শীর্ষ নেতা মোদী থেকে শুরু করে মাঝারি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গী, সকলেই চিঁড়ে খাওয়া, বাংলায় কথা বলা, লুঙ্গি-পাজামা পরিধান দেখে চিহ্নিতকরণ, এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের একটা আখ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন। সেই আখ্যান পল্লবিত হয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে শারীরিক পীড়ণ, বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ, হত্যা, এমনকি জবরদস্তি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া সহ সমস্ত রকম অত্যাচার শুরু হল। এক কথায়, বাংলা মানে বাংলাদেশ, অর্থাৎ বিদেশি। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিজেপি ও আরএসএস। 

এই প্রয়াসের বর্ধিত সংস্করণ হিসেবে বাংলায় একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচনী তালিকায় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হল (এসআইআর)। যেখানে নিবন্ধনের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট ভাবে বাঙালি ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রকাশ্য জেহাদ ঘোষিত হল। দেড় কোটি বাঙালির নাম বাদ দেওয়া হবে এমন আস্ফালনও শোনা গেল। বাস্তবে সেই আস্ফালনের মর্যাদা রক্ষার্থেই নানা ছলচাতুরির সঙ্গে প্রায় এক কোটি ঊনপঞ্চাশ লক্ষ নামকে চিহ্নিত করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত মানুষের গণ অসন্তোষ রাজপথকে মুখরিত করে। মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত উপস্থিত হয়ে দেড় কোটি সংখ্যাটাকে কমিয়ে এনে পঁয়ত্রিশ লক্ষের কাছাকাছি দাঁড় করান। আশা করা যায়, আরও বেশ কিছু মানুষকে তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। 

এসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি চেতনায় ও মননে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি ও তাদের আঞ্চলিক রাজাকার বাহিনী এবং পদলেহী নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে একটা অপর পক্ষের ধারণা জন্ম নিল। এই ঘটনা হিন্দি বলয়ের নেতাদের গ্রহণযোগ্যতাকে বাংলায় আরও তলানিতে নিয়ে গেল। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যের মানুষের একাংশ রাজ্য সরকার ও ক্ষমতাসীন তৃণমূল দলের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপিকে পরিত্রাতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৪-১৫ শতাংশ ভোট থেকে বিজেপির ভোট রাতারাতি ৩৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। কিন্তু বর্তমানে বিজেপির বাংলা ও বাঙালি বিরোধী জেহাদ সেই সমর্থনকে নিশ্চিতভাবে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলায় এবারের লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, এবারের লড়াই বাঙালি জাতি বনাম বিজেপি। এবারের নির্বাচনে বিজেপি যদি ২০ শতাংশ বা তার আশপাশ জনসমর্থন লাভ করে, আমি অবাক হব না। অন্যদিকে বাম জোট ও অন্যান্য শক্তিগুলি যদি ২৫-৩০ শতাংশ ভোট পায় তাহলেও আমি বিস্মিত হব না। আমি মনে প্রাণে চাই বাঙালির কাছে তৃণমূলের বিকল্প হয়ে উঠুক বাম শক্তি। এটা ইতিহাসের শিক্ষা। 

ইতিহাসের শিক্ষা কতটা নির্ভুল তার জলজ্যান্ত দ্বিতীয় প্রমাণ দেখান ঐতিহাসিক মার্খহ্যাম। তাঁর ওই রচনাতেই নেপোলিয়নের পতন সম্পর্কে লেখেন: Napoleon Bonaparte only succeeded because the major European powers were not united, but after 1806 the fourth coalition was in reality.। ইতিপূর্বে ফ্রান্সের উত্থানের বিরুদ্ধে ইউরোপের রাজশক্তিগুলি তিন তিনবার জোটবদ্ধ হয়েও পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্বে সেই জোট ভেঙে যায়। অস্ট্রিয়ার হাবসবার্গ সাম্রাজ্য, রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্য, প্রাশিয়া সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-- এই চার সাম্রাজ্য ছাড়াও ছিল আরও কিছু ছোট রাজশক্তি; সার্ডিনিয়া পিয়েডমন্ট, স্পেন, পর্তুগাল, পোপের সাম্রাজ্য, ডেনমার্ক, কিছু স্বাধীন জার্মান রাজ্য, নেপলস সিসিলি ইত্যাদি। এরা পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ছত্রভঙ্গ ছিল। কখনই জোটবদ্ধ দৃঢ় ভিত্তি হয়নি। 

কিন্তু ১৮০৬ সালে স্পেনের প্রতিরোধ সংগ্রাম এবং সেই সঙ্গে নেপোলিয়নের আটলান্টিক মহাসাগরে ইংল্যান্ডকে মহাদেশীয় অবরোধ ঘোষণা, এই অবরোধে ইউরোপের রাজশক্তিগুলিকে যোগদান করতে বাধ্য করা, এইসব মিলিয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ছোট বড় রাজশক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়। এই সময়েই চতুর্থ কোয়ালিশন জন্ম নেয়। এই চতুর্থ শক্তি জোটের হাতেই নেপোলিয়নের অন্তিম পরাজয় সূচিত হয়। একটির পর একটি যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয় এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অপরাজেয় কল্পকাহিনী ভাঙতে শুরু করে। স্পেনের ভিত্তোরিয়া ও ভিমিয়ারের যুদ্ধ থেকেই এই পতনের শুরু। 

INDIA ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA জোটকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে গঠিত ভারতীয় বিরোধী দলগুলোর একটি বড় বহুদলীয় জোট। কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে তৃণমূল কংগ্রেস, আপ, ডিএমকে, জেডিইউ, আরজেডি সহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ক্ষমতাসীন এনডিএ বিরোধী এই জোটের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব ও আঞ্চলিক স্তরে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এইসব বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের ফলে জোট কিছুতেই সুদৃঢ় হচ্ছিল না। কথায় বলে, ম্যান প্রোপোজেস অ্যানড গড ডিসপোজেস। ২০২৩ সালে পাশ হয়েছিল একটি মহিলা সংরক্ষণ বিল; যে বিলে সংসদে সমস্ত দল সমর্থন জানিয়েছিল, কেবলমাত্র আসাউদ্দিন ওয়াইসির দুজন সাংসদ ছাড়া। ওই বিলে সংসদে মোট সদস্যদের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু সরকার সেই বিল তখন কার্যকর করেনি। কারণ, পুরুষ প্রধান আরএসএস ও বিজেপি দল কখনই সংসদের নিজেদের আসন স্বেচ্ছায় মহিলাদের ছেড়ে দিতে চাইবে না। উল্লেখযোগ্য যে, কংগ্রেস তৃণমূল ডিএমকে এই সমস্ত দলে মহিলা সাংসদদের যে শতকরা হার তার তুলনায় বিজেপি সাংসদদের মধ্যে মহিলা সংসদের শতকরা হার সর্বনিম্ন। স্পষ্টই বোঝা যায়, মনুবাদী পুরুষতান্ত্রিক বিজেপি, সংসদে মহিলাদের সংরক্ষণ আইন পাস হলেও তা প্রচলন করতে চায় না। কারণ, সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বর্তমান সাংসদকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে মহিলাদের জন্য। 

আজ তিন বছর বাদে তাই নতুন করে ওই মহিলা সংরক্ষণ বিলে সংশোধনী আনা হল। এমন ভাবে এটি পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, এই সংরক্ষণ বিল ২০৩৪ সালের আগে কোনওভাবে চালু করা সম্ভব নয়। ঠিক এমন একটা সময়ে এই বিলের প্রয়োজনীয়তা ও তড়িঘড়ি সংসদের বিশেষ অধিবেশন কেন, একটু বুঝে নিই:

১) সকলের স্মরণে থাকবে, ২০২৪ সালে সরকার ব্যাপক দুর্নীতির সাথে যুক্ত নীট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছিল লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন। অনেকটা বিবাহ অনুষ্ঠানের সঙ্গে উপনয়নটা সেরে ফেলা, যাতে একটা খরচ বেঁচে যায়। আজ ঠিক সেই ছকেই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলি ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে লোকসভায় বিশেষ অধিবেশন ডেকে এই বিল তড়িঘড়ি আনা হল যা কার্যকর হবে ২০৩৪ সালে। উদ্দেশ্য ছিল, বিরোধীহীন লোকসভায় বিলটি পাস করে আসন্ন নির্বাচনগুলিতে মহিলা সংরক্ষণের ঢক্কানিনাদে সস্তায় বাজিমাত করা। 

২) কিন্তু হাজারও ব্যস্ততা সত্ত্বেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ম্যান্ডেট দিয়ে, হুইপ জারি করে, সাংসদদের সংসদের অধিবেশনে হাজির করে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই প্রথম একটি বিলের সার্বিক বিরোধিতা করে। দাবি করে, ইতিপূর্বে পাশ হওয়া সংরক্ষণ বিলটি হয় এখনই চালু করতে হবে যা আগামী ২০২৯'এর লোকসভা নির্বাচনে কার্যকর হবে। অন্যথায়, সংশোধনীকে তারা সমর্থন করবে না। অবশেষে বিলটির সংশোধনী আটকে যায়। 

৩) লক্ষ্য করুন, বিলটি পার্লামেন্টে পাশ হলে একদিকে নরেন্দ্র মোদি বুক ফুলিয়ে মহিলা সংরক্ষণের অন্যতম প্রাণপুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রজেক্ট করতেন। আটকে যাওয়ার পরেও একই ভঙ্গিতে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন -- তিনি মহিলাদের জন্য কত চিন্তাগ্রস্ত এবং বিরোধীরা কীভাবে মহিলা ক্ষমতায়ন চায় না! সংশোধনী পাস হলেও লাভ, না হলেও লাভ। অসম্ভব সুন্দর সুপরিকল্পিত টাইমিং। 

৪) সাম্প্রতিক এপস্টিন ফাইলে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্যের নাম যুক্ত আছে, এমনকি মোদীর দিকেও আঙ্গুল উঠেছে। তদুপরি বোঝার ওপর শাকের আঁটি সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ও মধু কিশওয়ার খোদ মোদিজীর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। এই পরিস্থিতিতে মহিলা সংরক্ষণ বিল এনে নিজেকে দেশের সর্বোচ্চ নারীবাদী হিসেবে  প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিল এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য। 

বিরোধীদের এই সাফল্য মোদি বিরোধী লড়াইয়ের পালে বাড়তি হাওয়া জোগাবেই। পরিস্থিতি অনুধাবন করে মোদীজি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ হিসেবে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ একটা দলীয় নির্বাচনী প্রচারের বক্তব্য রাখলেন। জাতির উদ্দেশ্যে সরকারি ভাষণে তিনি ৫৮ বার জাতীয় কংগ্রেসকে এবং দশবার তৃণমূল আর বহুবার তামিলনাড়ুর ডিএমকে দলকে সরাসরি গালমন্দ করলেন। দাসানুদাস নির্বাচন কমিশন এই বক্তব্যে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনবে না জানা কথা। কিন্তু মোদী নির্লজ্জের মতো নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করলেন, এটা দেশবাসী দেখল।

কেমন যেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ইতিহাসের একটা পুনরাবৃত্তির গন্ধ পাচ্ছি মনে হয়।  আমি ইতিহাসের ছাত্র, ইতিহাসে প্রবলভাবে আস্থাবান। সদা স্মরণে রাখি, কিছু মানুষকে কিছুকালের জন্য বোকা বানানো যায়, সব মানুষকে চিরকালের জন্য বোকা বানানো যায় না। ঘটনার গতিপ্রকৃতি যেন তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আপনি কী বলেন?


Friday, 17 April 2026

একটি রগরগে গল্প নয়

ফুলটুসি আরও পড়বে, লিখবে, বলবে

শুক্তিসিতা



ফুলটুসি। অ্যাসিডে আক্রান্ত একটি কুড়ি বছরের মেয়ে। হাসপাতাল, পুলিশ ফাইল, বেদনার্ত গোঙানি সব পেরিয়েও বাপ-মা ঠাওরালেন নিশ্চয় বাবলুকে টুসি কিছু প্রশ্রয় দিয়েছিল, নইলে এইভাবে...। এই কুরূপা মেয়ের আর বিয়ে হবে কোনওদিন? পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে। জ্বালা কমেনি, ব্যথাও কমেনি একটুও। অ্যাসিড ওর গলা, ডান দিকের কানের ওপর পড়েছিল। ফুলটুসি এখন কানে কম শুনছে। ঠোঁট দুটো এমনভাবে ঝুলে গেছে যে ও আর ভালো করে খেতে পারে না। ফুলটুসির সেকেন্ড ইয়ারটা আর থার্ড ইয়ার হবে না। ফুলটুসির ডান চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবু একটা চোখ দিয়ে ও পড়তে চেয়েছিল। না, হবে না। লোকলজ্জার নিদারুণ চাপ ওর গোটা পরিবারকে পিষে ফেলছে। বাবার মুদির দোকানটা ভালোই চলত। এখন বাবা একবেলা খোলেন। মায়ের চোখের জলে সারাটা বাড়ি যেন সপ্‌সপ্ করে।

ক্ষতিপূরণের ক’টা টাকা পাবার জন্য ফুলটুসির বাবাকে খুব দৌড়োদৌড়ি করতে হচ্ছে। ফুলটুসির সেজ পিসেমশাই ডাক্তার। সেদিন ফোনে মাকে বলছিলেন, 'প্লাসটিক সার্জারি করিয়ে নিন না বৌদি, বিশ লাখ টাকার মতো পড়বে।' মা আর কিছু উত্তর দেননি।

এই সামান্য কাহিনী পশ্চিমবাংলায় অজ্ঞাত নয়, অশ্রুতও নয়। একটি লিঙ্গ আগ্রাসনের গল্প। কিন্তু তেমন রগরগেও নয়। অথচ কেউ যেন প্রশ্নচিহ্নের পেরেক বসিয়ে গেল সামনে। শরৎচন্দ্র মহাশয়ের ‘অরক্ষণীয়া’র সঙ্গে আংশিক মিলের পরও একজন একটি আশ্চর্য কিস্সা শোনালো যে একজন ফর্সা দুধে আলতা সুন্দরী কিশোরী চরম অবসাদে ভুগছে কারণ তাকে কেউ ভালোবাসে না; কেউ তার সখী নয়। সবাই তাকে ঈর্ষা অথবা ঘৃণা করে। অথচ বছরে ৪৫ কোটি ডলারের বাণিজ্য করে ফেলছে ফর্সা হবার ক্রিম। আমাদের বাল্যকাল জুড়ে স্নো হোয়াইটের বিপন্ন বিমাতা, এই রূপকথা বপন করেছে যে আয়না থেকে সমাজের চোখ তাকে দেখে আর ক্রমাগত কুৎসিত প্রতিপন্ন করে আর কোনও এক নগণ্য ফর্সা মেয়েকে সেরা সুন্দরীর শিরোপা দিয়ে দেয়। না, এটি শুধু বর্ণবৈষম্যবাদের গল্প নয় যে। গোটা নারীত্ব যাকে সিমোন দ্য বোভোয়া মনে করেন একটা আরোপিত সত্তা বহনের অভিযাত্রা— তাকে একটি বাধ্যত সামাজিক সত্তা হতে হয় বলেই তার ওপর রূপসী হবার, নিখুঁত হবার দায় এসে পড়ে। তন্বী হবার জন্য শত শত মেয়ে মার্কিন মুলুকে অ্যানারোক্সিয়া নার্ভোসারোগের শিকার হয় স্রেফ ক্ষুধার্ত থেকে; এমনকি মারাও যায়। আর এই গরিব দেশে রাস্তাঘাটে একটি সামান্য শৌচাগারের অভাবে মূত্রনালীতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে কত হাজার মহিলা। না, রাষ্ট্র এ সব ভাববে পরে। 

রাষ্ট্রও মেয়েদের বোঝাবে যে পিল খেয়ে নাও; গর্ভ নিরোধ করো; তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষমতায়িত হও। পিল খাওয়ার গোপন পন্থাটি স্বামী/শ্বশুরবাড়ি জানতে পারে না ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না, দম্পতি কেন একত্রে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বা পুরুষটি কেন নিজে পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব নেয় না।

ফুলটুসি তো বাবলুকে বলেছিল, বিয়ের আগে শরীরী সম্পর্কে গেলে সমস্যা হতে পারে, বরং কিছু ব্যবস্থা নিয়ে... বাবলু রাজি হয়নি। তাই ফুলটুসির গাল, ঠোঁট, চুল, গলা ঝলসে গেল।

আচ্ছা, যশোদার গর্ভে যে কন্যা জন্মে মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত হয়ে বাঁচাতে গেল কৃষ্ণ অবতারকে, পাশবিক শক্তির দুর্দান্ত বজ্রমুষ্টি ভেদ করে তো সে মিলিয়ে যায় আকাশে! আসলে পুরাণ খোলসা করে বলে না, সেই শিশুকন্যাটিকেও কংস হয়তো পাথরে ঠুকে হত্যা করেছিল। আগের সাতটি শিশুর মতো। ঈশ্বরের জন্য ঈশ্বরী বলি হয়ে গেল নিশ্চুপে। এও কি এক 'যৌনতার রাজনীতি’ নয়? হয়তো নিরস্তিত্বতার রাজনীতি। মণিপুরে থাংজাম মনোরমার স্তন ও যোনিদেশে গুলিবিদ্ধ করে ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট করা হয়। প্রতিবাদী নারী'রা নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উত্তর এটাই। তবুও এই দশকে আর কি কোনও নারী প্রতিবাদীকেই মনে পড়ে? এখনও ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর ভাইদের দলে প্রীতিলতা, দুকড়িবালা, বীণা দাস, ননীবালার মতো বোনেদের মনে পড়ে না। সমাজ বদলের স্বপ্নে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরোধিতায় কর্পোরেট লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যে মেয়েরা পথে নেমেছেন বারবার, তেভাগা আন্দোলনের বুধনি ওরাওঁনি, জৈবন বিবি, সাবেরা খাতুন, দুলি কিস্কু। নকশালবাড়ি আন্দোলনে কুনী টুডু, জয়া মিত্র, মেরী টাইটলার। কারওকেই না। 

ফুলটুসি কলেজে কোনওদিন রাজনীতি করেনি। বাবার বারণ ছিল। বাবলুরও। কিন্তু ফুলটুসি সত্যি রাজনীতির স্বপ্ন দেখত। ছাত্রছাত্রীদের হস্টেলের সমস্যা, অধ্যাপকদের নিয়মিত হাজিরা, অথবা ‘নতুন শিক্ষানীতি’ এইসব। সবই খোয়াব হয়ে রইল। আচ্ছা ওর জীবনে এই যে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিগ্রহ হল, তার জবাব চাইবে কে? কোন রাজনৈতিকতা?

১৯৫২ সালে ভারতের সংসদে ৩৯ জন বুদ্ধিমতী, সপ্রতিভ, উচ্চাশী মহিলা সংসদ সভা আলো করেছিলেন। সর্বমোট সাংসদের ৫.৫ শতাংশ, অথচ সেই সময়ে মার্কিন দেশে ১.৭ শতাংশ আর যুক্তরাজ্যে ১.১ শতাংশ মহিলা সংসদের অধিকার পেয়েছিলেন। আর এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তথাকথিত প্রগতিশীল বাম দলগুলিকে কখনওই দেখা যায়নি মহিলা নেত্রীদের জেলা সভাপতি/সচিব পদে অধিষ্ঠিত করতে। এমনকি গৃহশ্রমের বেলাতেও যখন ১৯৭০'এর পরই প্রথম কথা উঠল যে মেয়েদের গৃহশ্রমের স্বীকৃতি তথা রোজগারের ব্যবস্থার কথা, তখনও কিন্তু কম্যুনিস্টরা বলেছিলেন, এতে গৃহশ্রমের প্রাতিষ্ঠানিকতা মান্যতা পাবে। নারীমুক্তি সুদূর পরাহত হয়ে যাবে তো! অথচ সমাজতন্ত্রীরা বিস্মৃত হলেন গৃহশ্রম শুধু শ্রমিক উৎপাদনই করে না শ্রমিকের কর্মশক্তিরও জোগান দেয়, ফলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’ ফাঁকিতে গৃহশ্রমিকরাও বস্তুত ইউনিয়নবিহীন অবস্থানে বাধ্যত নৈঃশব্দ্যের পর্দার পিছনে অপসৃত হন।

এমন আজব দিনও আসতে পারে গৃহশ্রমের মজুরি একেবারে শ্রম আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়ে গেল। অমনি সব পুরুষেরা পিলপিল করে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হ্যাঁ এমনটাই হয়। যখন ছত্তিশগড়ে লৌহখনিতে বা অন্ধ্রপ্রদেশে তামাক শিল্পে প্রযুক্তি প্রবেশ করল, তখন রাতারাতি মেয়েরা ছাঁটাই হয়ে গেলেন।

মেয়েরা অবিশ্যি পরিবারের জন্য নিত্য বাসে, অটোয়, ট্রেনে বাইরেও কাজ করতে যাচ্ছেন। 'চুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে/ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি রাত থাকতে ওঠে।' তারপর লালগোলা/বনগাঁর ট্রেনে চাল তোলেন বস্তা করে। কোভিড শুরুর বেলা এঁরা ‘Superspreader’ ছিলেন; অচ্ছুৎ। কিন্তু বেশিদিন চলল না। গৃহ পরিচারিকা না এলে যেমন Work from home নিরুপদ্রবে করা যায় না, তেমনই মাসি-পিসি রেল গার্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে চাল শহরে না নিয়ে এলে কী খাবে শহুরে বাবুরা? 

ফুলটুসি এখন একটা চোখে দেখে। তবু কাগজ পড়ে নিয়মিত। বইও পড়ে। থেরীগাথা পড়ছিল। বুদ্ধদেবের প্রতি মেয়েদের অভিমান আছে বৈকি। গোড়ায় তিনি মা গৌতমীকেও সঙ্ঘারামে ঢোকার অনুমতি দেননি। আবার অগ্রশ্রাবিকা উৎপলবর্ণা ধর্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও আশ্রমে স্থান দিয়েছিলেন। সন্তানহীনাকে পরিত্যাগ করতে মানা করেছিলেন তাঁদের স্বামীদের। ফুলটুসি কি পরিত্যাজ্য? না। ফুলটুসি এখন এক চোখ দিয়ে প্রুফ দেখার কাজ শিখেছে। 

ফুলটুসি গল্পগুচ্ছ পড়ছিল রোববার দুপুরবেলা। ‘মণিহারা’ আর ‘কঙ্কাল’ পড়বার পর ওর মনে হচ্ছিল সে যুগের মেয়েদের যখন জীবনটা বেঁচে থাকতেই অন্ধকার, তাই বিদ্রোহ কি মৃত্যুতেই শুরু হতে চাইছিল? যেমন গৃহপ্রাণা মণিমালিকা অন্ধকার মৃত্যুদেশ পেরিয়ে এসে ফণিভূষণের চৈতন্যের কাছে তার সম্পদের হিসাব চাইছে? অথবা ‘কঙ্কাল’-এর বিধবা মেয়েটি কিছুতেই দাদার ডাক্তার বন্ধুকে ভুলতে পারে না বলেই শীতল অস্থিপঞ্জর থেকে স্বরক্ষেপণ করতে চায় নবাগত যুবকের বুকে? উচ্চারণ করতে চায় তার অবহেলিত অনুচ্চারিত প্রেম? তাহলে ‘জীবিত ও মৃত’র কাদম্বিনী যে ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’? আসলে ওই মিথ্যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাদম্বিনী ভেঙে ফেলেছিল সব উল্লম্ব সম্পর্কের শিকল। সেই ভাঙনের অভিঘাত তার পরিবার ও সমাজ সহ্য করতে পারেনি বলে সে মৃত্যুবরণ করে সমাজকে মুক্তি দিয়ে গেল। তাহলে নারীমুক্তির বর্তমান ব্যাকরণটা কী? 

আজকাল ‘সহজিয়া’ দলের দুই দাদা আর দিদি আসেন ফুলটুসির কাছে। ‘সহজিয়া’ কাজ করে অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের পুনর্বাসন, আর্থিক সশক্তিকরণ নিয়ে। তাদেরই কি জিজ্ঞেস করবে এই ‘নারীমুক্তির সংজ্ঞা’? টিভিতেই কি ফুলটুসি দেখেছিল ইরানি-মার্কিনি সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ'কে? যিনি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর উল্লসিত সকালটাকে উদ্‌যাপন করছিলেন ইরানের হিজাব-বিরোধী মেয়েদের জন্য? ফুলটুসিও কি উল্লসিত হবে? ফুলটুসির বাবা কাগজে ভোটের খবর পড়েন। ওর ভাই ফোনে যুদ্ধ দেখে। দুটোই যুদ্ধ। তখন ফুলটুসিকে অনেকদিন আগে ওর কলেজের প্রোফেসর বলেছিলেন PWAG (Peace Women Across the Globe)-র কথা, যাঁরা ২০০৫-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার জন্য মনোনীতও হয়েছিল। কিন্তু পায়নি। ভূ-রাজনীতির নানা তত্ত্ব। অর্থনীতি, শস্ত্রনীতি এমনকি বেচারা ভূতত্ত্বও। ফুলটুসি বোঝে না। বুঝতে চেয়েছে কী?

না, কারণ ফুলটুসি জানে, তার ঐ দুনিয়া-জোড়া সংঘটনার সাধ্যি নেই ফুলটুসির ব্যথা কমায়, জ্বালা থামায়, ওর বুকের ওপর শান্তিজল ছেটায়। নাইট্রিক অ্যাসিড তো থাকার কথা ছিল শিল্প তালুকে, কারখানায়। সেটা খোলা বাজারে পাওয়া গেল বলেই না বাবলু সেটা ঢেলে দিল ফুলটুসির শরীরে! সম্পর্কের গর্ভের অন্ধকারে যে হিংসার মৌল লুকিয়ে থাকে, সে তো মোটেও ‘রেয়ার আর্থ’ মৌল নয়। তাহলে তো ‘সহজিয়া’র কাছে এত আর্তনাদ জমা পড়ত না (অ্যাসিড হিংসার ঘটনায় ভারতের মধ্যে এখন প্রথম বাংলা)। 

আজ ‘সহজিয়া’ দলের অনিন্দিতাদি আসবে। ওর প্রুফগুলো নিয়ে যাবে। আর ওর পাওনা টাকাও দিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহে ফুলটুসি প্রেসে যাবে। ওখানে গেলে আরও কাজ পাবে। না, ওড়না পরে নয়। সবাই দেখুক আসল ‘বাবলু’কে। নকল বাবলু নিখোঁজ। ফুলটুসি আরও পড়বে। লিখবে, বলবে। যাতে বাবলুরা সবাই 'নিখোঁজ'ই থাকে। এই সমাজের জন্য। সেদিন সব যুদ্ধ বন্ধ হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অনিরুদ্ধ রাহা ও অপরাজিতা গাঙ্গুলী বোস, ‘আলোক’ ফাউন্ডেশন।


Tuesday, 14 April 2026

ষোড়শ অর্থ কমিশনের বৈষম্য!

কেন্দ্রের হাতেই অধিক ক্ষমতা?

রাজীব ভট্টাচার্য



১৯৫১ সালে অর্থ কমিশনের শুরু থেকে সংবিধান স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন ও ব্যয়ভার নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে বিভাজন, তা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেয়ারম্যান ডঃ অরবিন্দ পানাগড়িয়ার নেতৃত্বে গঠিত ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পার্লামেন্টে পেশ করা হয়। এই রিপোর্টের সুপারিশগুলি পাঁচ বছরের (২০২৬-৩১) জন্য ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে লাগু হল। ভারতীয় সংবিধানে রাজস্ব ক্ষমতার বিভাজন বলতে ত্রিস্তরীয় কাঠামোতে (কেন্দ্র, রাজ্য ও স্থানীয়) সরকারের কর ধার্য করা, ব্যয়ভার ও তহবিল বরাদ্দের বন্টনকে বোঝানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে আর্থিক, রাজস্ব ও ব্যয় বন্টনের সাংবিধানিক বিভাজনকে রাজস্ব যুক্তরাষ্ট্রীয়তা (Fiscal Federalism) বলে। 

ভারতবর্ষে রাজস্বের সাংবিধানিক বিভাজনে অপেক্ষাকৃত উচ্চ প্লবমান (bouyant) রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, ব্যক্তিগত আয়কর, কোম্পানি বা কর্পোরেট কর ও বহিঃ শুল্ক) রয়েছে কেন্দ্রের হাতে, অথচ, রাজ্যগুলির হাতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত নিম্ন প্লবমান রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, দ্রব্য কর, ভূমি রাজস্ব, পেট্রো পণ্য বিক্রয়লব্ধ কর এবং অ্যালকোহল যুক্ত পানীয়র উপর কর)। এছাড়া রাজ্যগুলির উপরে রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে (যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি) ব্যয়ভারের বাধ্যবাধকতা। এই ধরনের বিভাজন আসলে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে  উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার (vertical fiscal imbalance) জন্ম দেয়। এই ভারসাম্যহীনতা মূলত তিনটি উপায়ে দূর করা যেতে পারে: (ক) কিছু উচ্চ প্লবমান করের উৎস কেন্দ্রের থেকে রাজ্যের হাতে স্থানান্তরিত করা; (খ) রাজ্যের উপর থেকে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যয়ভার লাঘব করা ও (গ) সাংবিধানিক পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত কিছু কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেন্দ্র থেকে রাজ্যে হস্তান্তরিত করা। এগুলির মধ্যে তৃতীয়টি হল সর্বাপেক্ষা যুক্তিগ্রাহ্য পদ্ধতি। ভারতবর্ষে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংবিধানের ২৮০ ধারায় অর্থ কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। এই কমিশন মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে তাদের সুপারিশ দেয়:

(ক) কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্বের বিভাজন এবং রাজ্যগুলির নিজেদের মধ্যে রাজস্বের অংশ বিভাজন;

(খ) সাহায্য অনুদান (grant-in-aid) নীতি নির্ধারণ করা; 

(গ) গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে অতিরিক্ত সম্পদ প্রদানের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের সুপারিশগুলিকে পর্যালোচনা করা ও তার যথোপযুক্ত অনুমোদন দেওয়া; 

(ঘ) পৌরসভাগুলিকে অতিরিক্ত অর্থ সাহায্যের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলির সঠিক বাস্তবায়ন করা; 

(ঙ) অন্যান্য কোনও বিষয় যেটি সুস্থ ও মজবুত অর্থায়নের ব্যাপারে জরুরি, তার রূপায়ণ করা।

পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের মতোই ষোড়শ অর্থ কমিশনও রাজ্যগুলির জন্য ৪১ শতাংশ শেয়ার (করের ৪০ শতাংশ এবং কর ছাড়ের ১ শতাংশ) ভাগের উল্লম্ব বিভাজন বহাল রেখেছে, যদিও অনেক রাজ্যের তরফেই নিট আয়ের (net proceeds) ৫০ শতাংশ শেয়ার চাওয়া হয়েছিল। উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে তিনটি মূল বিষয় ষোড়শ অর্থ কমিশনের সামনে বিচার্য ছিল: 

(ক) সারচার্জ ও সেস্'এর ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি সত্ত্বেও মোট রাজস্ব আয়ের কম শতাংশ হস্তান্তরিত হওয়া; 

(খ) কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা করে (GST) আধাআধি বন্টনের ফলে মূল্য সংযোজন করের (value-added tax) জমানা (যেখানে রাজ্যের অংশ ছিল ১৪.৫ শতাংশ) থেকে পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) আমলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশ;

(গ) বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত পরিকল্পনায় (central government sponsored scheme) রাজ্যের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। 

রাজ্যগুলির মধ্যে কেন্দ্রীয় রাজস্ব সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য অর্থ কমিশন নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড বিভিন্ন আনুপাতিক গুরুত্ব সমেত স্থির করে দিয়েছে। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল মাথাপিছু আয়ের দূরত্ব (সহজ কথায়, একটি অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের সাথে সর্বাপেক্ষা বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের অথবা প্রথম তিনটি সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের গড়ের মধ্যে দূরত্ব)। রাজ্যগুলির মধ্যে সমতা বজায় রাখতে মাথাপিছু আয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলিকে বেশি পরিমাণ রাজস্ব বন্টনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল জনসংখ্যা, যে ক্ষেত্রে রাজস্ব বন্টনের সময় একটি রাজ্যের মোট জনসংখ্যায় (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) তার অংশ কত সেটি বিচার করা হয়। তৃতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয়টি, জনসংখ্যার বিবর্তনের কর্মক্ষমতা (demographic performance)। ষোড়শ অর্থ কমিশন এই জনসংখ্যা বিবর্তনের পরিমাপের ক্ষেত্রে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সংজ্ঞার পরিবর্তন করেছে। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোট প্রজনন হারকে (total fertility rate) সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ষোড়শ অর্থ কমিশন এই সূচকটিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, মোট প্রজনন হারের পরিবর্তে। চতুর্থ যে বিষয়টি ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে গুরুত্ব পেয়েছে তা হল রাজ্যের মোট বনাঞ্চলের শেয়ার এবং ২০১৫ থেকে ২০২৩'এর মধ্যে বন এলাকার প্রসার। পঞ্চম যে বিষয়টি এই কমিশনের রিপোর্টে প্রথম চালু করা হয়েছে তা হল, জাতীয় জিডিপি'তে রাজ্যের অংশ। রাজ্যগুলির মধ্যে অনুভূমিক রাজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখতে দুটি মূল বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই দুটি বিষয় হল জনসংখ্যা এবং রাজস্ব ক্ষমতা (যা পরিমাপ করা হয় রাজ্যের মাথাপিছু আয় দ্বারা)। অর্থাৎ, রাজ্যগুলির মধ্যে সাম্য বজায় রেখে রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে দুটি মূল বিষয় হল জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয় দূরত্ব। ষোড়শ অর্থ কমিশনে এই দুটি সাম্য নির্ধারণকারী বিষয়ের উপর যে গুরুত্ব তা হল ৬০ শতাংশ, যা পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সমান হলেও তার পূর্ববর্তী কমিশনগুলির তুলনায় অনেকটাই কম। 

রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার যে তত্ত্ব (মাথাপিছু আয়ের সাথে রাজস্ব প্রাপ্তির যে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক, অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের মোট রাজস্বের বেশি অংশ প্রাপ্ত হওয়া) সাধারণভাবে পেশ করা হয় তা বর্তমান অর্থ কমিশনের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলা যেতে পারে। একটু বিশদে তথ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, রাজস্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির লাভ হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির তুলনামূলকভাবে ক্ষতি হয়েছে। এই তথ্য রাজস্ব বন্টনের প্রগতিশীলতার তত্ত্বের বিপরীত। 

এই ষোড়শ অর্থ কমিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল পূর্ববর্তী অর্থ কমিশনের সুপারিশের তুলনায় সাহায্য অনুদান নীতির (grant-in-aid) পরিবর্তন। এই কমিশন ৯. ৪৭ লক্ষ কোটি টাকা ৫ বছরের জন্য সাহায্য অনুদান খাতে প্রদান করেছে। এই অনুদানের দুটি অংশ: (ক) প্রথমটি শহর ও গ্রামের স্থানীয় সংস্থাগুলির জন্য ও (খ) দ্বিতীয় অংশটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের জন্য। কিন্তু পঞ্চদশ অর্থ কমিশনে যে তিনটি অনুদানের উল্লেখ আছে-- রাজস্ব ঘাটতি অনুদান, ক্ষেত্র নির্দিষ্ট অনুদান ও রাজ্য নির্দিষ্ট অনুদান-- সব কটি বর্তমান অর্থ কমিশনের রিপোর্টে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ কথায় বলতে গেলে, এই সাহায্য অনুদান সেই সমস্ত রাজ্যগুলিকে প্রয়োজনে প্রদান করা হত যেগুলি রাজস্ব হস্তান্তর পরবর্তী সময় রেভিনিউ ঘাটতি সমস্যায় জর্জরিত। সংবিধানের ২৭৫(১) ধারা অনুযায়ী, রাজ্য কমিশনের সুপারিশক্রমে পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপালিটিগুলিকে প্রয়োজনে সাহায্য অনুদান প্রদান করা হত। বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে এই ধারাটি রদ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই সুপারিশ কি সংবিধানের আদেশপত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?

বর্তমান কমিশন যথাক্রমে ৪.৪ লক্ষ এবং ৩.৬ লক্ষ কোটি টাকা শহর ও গ্রাম কেন্দ্রিক স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদান বরাদ্দ করেছে। এই অনুদানগুলি প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত: মৌলিক (৮০ শতাংশ) ও কর্মক্ষমতাভিত্তিক (২০ শতাংশ)। এই মৌলিক অনুদানের আবার দুটি অংশ- একটি বদ্ধ (৫০ শতাংশ) অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের (যেমন জীবাণুমুক্তকরণ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প) সাথে যুক্ত আর বাকিটি (৫০ শতাংশ) হল উন্মুক্ত, অর্থাৎ, এই অংশটি কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের সাথে যুক্ত নয়। স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদানের শর্তাবলীতে দুটি পরিবর্তন হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার দুটি পরিস্থিতিতে এই অনুদান বন্ধ করতে পারে: (ক) যদি ৭৫ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত তাদের রেভিনিউ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে অক্ষম হয় এবং (খ) যদি কোনও রাজ্য অর্থ হস্তান্তর নির্ণায়ক মানদণ্ড পূর্ণ করতে সক্ষম না হয়।

ষোড়শ অর্থ কমিশন রাজস্ব ঘাটতির তত্ত্ব স্বীকার করে নিয়েছে এবং তাই রাজ্যগুলির কাছে শূন্য রেভিনিউ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা রাখেনি, যা সংশোধিত রাজস্ব দায়িত্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনার (Fiscal Responsibility and Budget Management, FRBM) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সর্বোপরি বলা চলে যে, এই অর্থ কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আশার আলো প্রদান করলেও তা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন মারফত উল্লম্ব ও অনুভূমিক বৈষম্য কতটা দূর করতে পারবে, এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত।

                                                                   

Sunday, 5 April 2026

অনালোচিত পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির 

যে দিকগুলি আমরা জানি না 

কৌশিকী ব্যানার্জী


 

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি নিয়ে নানাবিধ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার রয়েছে। অথচ, এই রাজ্যের বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করে অর্থনীতির চিত্রটিকে যদি যথাযথ বিন্যস্ত করা যায়, তবে এমন অনেক অনালোচিত দিক উদ্ভাসিত হয় যা বহু সাজানো মিথ্যার ধারণাকে ভেঙে দেয়। সেই সব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম আলোচিত বিষয়গুলিকেই এই নিবন্ধে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গের যথার্থ একটি বাস্তব ও সম্ভাবনাপূর্ণ (কিছু দুর্বলতা সহ) ছবিকে পরিস্ফূট করে।   

পাহাড়, মালভূমি থেকে সমুদ্র-- সব নিয়ে সমগ্র ভারতের পর্যটন মানচিত্রে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ভারত সরকারের পর্যটন দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের পর সব থেকে বেশি বিদেশি পর্যটক আসেন পশ্চিমবঙ্গে (গত ২০২৩-২৪'এ ২.৭১ মিলিয়ন); অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও দেশের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। পূর্ব-ভারত ভ্রমণে সব থেকে বেশি পর্যটক এ রাজ্যেই আসেন, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি পর্যটক মিলিয়ে যা ২১.৮ শতাংশ। দেশের মধ্যে সব থেকে বেশি হোমস্টে পশ্চিমবঙ্গে (৫৩২২)। ২০২৪'এ আমাদের রাজ্য বৈদেশিক পর্যটন থেকে ৩৫.০১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। বলাই বাহুল্য, পর্যটন শিল্প পশ্চিমবঙ্গে হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন ও লজিস্টিক এবং হস্তশিল্প সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে। 

শান্তিনিকেতন ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতে সাংস্কৃতিক পর্যটন এবং গ্রামীণ উদ্যোগ সমূহ, বিশেষত স্থানীয় কারুশিল্পীদের আয় বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের (UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) আয় ২০২৪ সালে ২১.২ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ২৪.৬ কোটি টাকায় পৌঁছয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ধর্মীয় পর্যটনে জোর দেওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যাতেও ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে; ২০২৪ সালের ১.৭৪ লক্ষ থেকে বেড়ে দর্শনার্থীর আগমন ২০২৫ সালে ২.০৮ লক্ষ হয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ যেহেতু অগ্র ও পশ্চাৎ সংযোগ ঘটায় তাই তা রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আতিথেয়তা, পরিবহন, হস্তশিল্প ও খুচরা ব্যবসার মতো সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে এই রাজ্যের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এটি কেবল রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকেই (GDP) বৃদ্ধি করেনি, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির (inclusive growth) অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে। শ্রম-নিবিড় হওয়ার কারণে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট শিল্পসমূহ এই রাজ্যে ২৮ লক্ষেরও অধিক মানুষকে কর্মসংস্থান জুগিয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের এক উল্লেখযোগ্য অংশ। 

তদুপরি, সুন্দরবন, ডুয়ার্স ও পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। হোমস্টে, ইকো-লজ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রকল্পগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউনেস্কো কর্তৃক ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত দুর্গোৎসব বাংলার অর্থনীতির এক বৃহৎ শক্তি। এটি খুচরো বাণিজ্য, আতিথেয়তা, পরিবহন ও হস্তশিল্প— এই ক্ষেত্রগুলোকে সমৃদ্ধ করে তোলে। এমনকি, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। অর্থনীতিবিদ অজিতাভ রায়চৌধুরীর মতে, ২০২৪-র তুলনায় ২০২৫-এ পুজোর সময় ব্যবসায়িক লেনদেনের আর্থিক মূল্য অন্তত ৮-১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গাপুজোর সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড পরিমাণে বিদেশি পর্যটক আসেন, মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে। একটি ভ্রমণ সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ সালে ২৭ লাখ থেকে বেড়ে এ পর্যন্ত রাজ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন সংখ্যা ৩২ লাখে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, হাজার হাজার কোটি মূল্যের ব্যবসা বাণিজ্য হয় এই উৎসবকে ঘিরে। 

উপরন্তু, দেশিক বাণিজ্যের বিষয়ে নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বাণিজ্য, রফতানি ও রিয়েল এস্টেট বিগত এক দশকে জিডিপিতে সর্বাধিক মূল্য সংযোজন করেছে। ভারতের রফতানি ক্ষেত্রে এ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ অর্থ বছরে রাজ্য থেকে মোট রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২.৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত দশ বছরে দ্বিগুন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, সামুদ্রিক পণ্য, ভেষজ খাদ্যপণ্য, চর্মদ্রব্য এবং রত্ন ও অলঙ্কারের মতো পণ্যসমূহ রফতানি করা হয়। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী রাজ্য এবং বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত ‘দার্জিলিং চা’-এর উৎপত্তিস্থল। মিনিস্ট্রি অফ কমার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা বন্দর দিয়ে সব থেকে বেশি চা রফতানি হয় এবং দার্জিলিং'এর চায়ের মূল গন্তব্যস্থল মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে, ভারত জুড়ে পশ্চিমবঙ্গই চালের বৃহত্তম উৎপাদক। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রাজ্যে চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৪৯ মিলিয়ন টন।

ইকোনমিক সার্ভে (২০২৪-২৫) বলছে, এখনও পশ্চিমবঙ্গের ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় অসংগঠিত ক্ষেত্রে যার মধ্যে সব থেকে বেশি হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। NSS 73rd রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ৮.৮৭ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে যার ৩২.৭ শতাংশ অর্থাৎ ২.৯০ মিলিয়ন মহিলা দ্বারা পরিচালিত, যদিও কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদানের হার অত্যন্ত কম। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরেই তার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য সুপরিচিত। বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির মন্দির থেকে শুরু করে নকশি কাঁথার নিপুণ কারুকাজ, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত। দার্জিলিং চা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। পশ্চিমবঙ্গের পাটকলগুলো ২.৫ লক্ষেরও বেশি শ্রমিককে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান প্রদান করে এবং প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষক পরিবারকে সহায়তা জোগায়। এই শিল্পের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হল প্রথাগত চটের বস্তা। এছাড়া, ব্যাগ ও সাজসজ্জার সামগ্রীর মতো বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্যের চাহিদাও বর্তমানে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

মালদা জেলা, যাকে বাংলার 'আমের রাজধানী' বলা হয়, সেখানে ২০০টিরও বেশি জাতের আম উৎপাদিত হয়। এখানকার সুপ্রসিদ্ধ জাতগুলো— ফজলি, লক্ষ্মণভোগ এবং হিমসাগর— 'জিআই' (GI) তকমাযুক্ত। এই অঞ্চলের প্রায় ৪.৫ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০,০০০ আমচাষি রয়েছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, বাংলার সামুদ্রিক খাদ্য রফতানি ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৯.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত। তাছাড়া, গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজের সন্ধানে বহু মানুষ চলে যাওয়ায় দক্ষ কৃষকের অভাবেও উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে। এমনকি, বিদেশে রফতানির অনেক উচ্চ মানদণ্ড থাকায় অনেক সময় এসব কৃষিজ ও সামুদ্রিক পণ্য মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হওয়ায় চাষিদের প্রচুর ক্ষতি হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ রেশম শিল্পের উৎপাদন ২,১০০ মেট্রিক টনের বেশি হলেও, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ৩.০৩ লক্ষ থেকে কমে ২.১১ লক্ষে নেমে এসেছে। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল বাজার থাকা সত্ত্বেও এই শিল্পে মজুরি অত্যন্ত কম, তুলনায় সস্তা পাওয়ারলুম-এর পোশাক এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের অনিশ্চয়তার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুবক-যুবতীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। 

অবশ্য, এই সমস্ত ক্ষেত্রগুলি ক্ষুদ্র শিল্প হওয়ায় ‘স্বল্প উৎপাদনশীলতার ফাঁদে’ পড়ে জর্জরিত। বাংলার ৯৯ শতাংশ MSME-ই 'ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র' (Micro) প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার দ্বারা পরিচালিত, এখানে পেশাদার কর্মী নিয়োগ করার মতো পুঁজির অভাব আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় 'ইকোনমিকস অফ স্কেল'এর সুবিধা থাকে না। ফলস্বরূপ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তারা সস্তা কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল আর এর ফলে কর্মীদের মজুরি কেবল ন্যূনতম জীবনধারণের স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অনিবন্ধিত খাতের উদ্যোগসমূহের বার্ষিক জরিপ (ASUSE) ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলার অসংগঠিত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মী প্রতি সংযোজিত ভ্যালু অ্যাডেড গুজরাত বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শুধু তাই নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিতে সারা বছর ধরে কর্মসংস্থান হয় না। প্রসঙ্গত, বানতলার লেদার কমপ্লেক্স কিংবা শিলিগুড়ি চা-শিল্প প্রভূত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলার হেতু তারা কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী কাজের নিশ্চয়তা বা চুক্তি প্রদান করতে পারে না। ফলে, এখানকার কাজগুলো কেবলই 'দৈনিক মজুরি' ভিত্তিক হয়ে থাকে, যেখানে কর্মীদের বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ থেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এবং নিরাপত্তার মান বেশ নিম্ন। অপরদিকে, উত্তরবঙ্গে ক্ষুদ্র চা-চাষি, যারা বর্তমানে রাজ্যের মোট চা উৎপাদনের ৫৫ শতাংশেরও বেশি জোগান দেন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র চা-চাষিরই নিজস্ব কোনও কারখানা নেই; তারা বাগানের কাঁচা চা পাতাগুলো 'বট লিফ ফ্যাক্টরি' (BLFs) বা পাতা-ক্রেতা কারখানাগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নিম্নমানের চায়ের অতিরিক্ত জোগান এবং বিদেশ থেকে আসা সস্তা চায়ের (যেমন নেপালের চা) তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে চায়ের বাজার দর ব্যাপকভাবে ধসে পড়ে। তাছাড়া ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে চায়ের জন্য কোনও 'ন্যূনতম সহায়ক মূল্য' (MSP) নির্ধারণ না হওয়ায় বর্তমানে এই শিল্পক্ষেত্রে এক ধরনের 'সংকটকালীন শ্রম পরিস্থিতি' বিরাজ করছে। আর কোনও উপার্জনের বিকল্প পথ না থাকায় শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সময়ে কর্মক্ষেত্রের সব থেকে বড় দুশ্চিন্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যা রুটিনমাফিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলোতে মানব শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠছে। যেমন, কোডিং, ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ নির্ভর করে অ-রুটিন কায়িক শ্রমের ওপর যা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাশ্রয়ী সক্ষমতার আওতার বাইরে। পশ্চিমবঙ্গে হস্তনির্মিত বস্ত্রশিল্প (তাঁত/জামদানি), মৃৎশিল্প (কুমোরটুলি) এবং হকার বা ফেরিওয়ালাদের কাজে ‘সামাজিক বুদ্ধিমত্তা’র প্রয়োজন, তাই এরা হয়তো রোবটের কারণে চাকরি হারাবে না, কিন্তু তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমশ হারাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত শিল্পগুলো ‘ম্যানুয়াল’ বা প্রথাগত পদ্ধতিতেই রয়ে যাওয়ায়, বিশ্ব বাজারে তুলনায় সস্তা পণ্যের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে; যার ফলে সেখানে ‘চাকরিচ্যুতি’র পরিবর্তে ‘বাজার থেকে ছিটকে পড়ার’ (market displacement) ঘটনাই বেশি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যান্য রাজ্যগুলি (যেমন, তামিলনাড়ু বা গুজরাত) উৎপাদন খরচ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছে, এ রাজ্যে সেখানে ‘উৎপাদনশীলতার ব্যবধান’ থেকে যাচ্ছে। 

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পে শ্রম-নিবিড় কাজের সুযোগ থাকলেও নিম্ন মজুরি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্যতীত কর্মী নিয়োগ, digitisation-এর অভাবে অভিবাসন বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, দক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ‘brain drain’ হচ্ছে। তাই  উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে (সচেনতনভাবে যাতে কর্মী অপসারণ না হয়) না জোর দেওয়া এবং পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধি, কর্মীদের সামাজিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান, ক্ষুদ্র ব্যব্যসায়ীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। 

সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসী ভূমিকা, আজকের বড় বড় আধুনিক শিল্পের যথেষ্ট কর্মসংস্থান প্রদানের অক্ষমতা ও সাবেক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের দিন ফুরিয়ে আসায়, একটি রাজ্য বা দেশকে আজ যে সৃজনশীল অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে চলার পথ নির্মাণ করে নিতে হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেছে বটে, কিন্তু আরও বহু সংশোধন ও নতুন উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে।