Wednesday, 2 September 2026

উত্তম ১০০ (১)

বাঙালিয়ানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তরাধিকার

বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়


(৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ - ২৪ জুলাই ১৯৮০)


বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজ যখন নিজের চেনা নৈতিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে ফিরছিল, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে মহানায়ক উত্তমকুমারের। আজ বহু দশক পরেও বাঙালির পারিবারিক সৌহার্দ্য, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে কোনও আলোচনায় উত্তমকুমার এক অনন্য ও অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন।

মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ডের আখ্যান

বাঙালিয়ানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান তার মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধ। অভাব বা প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সহজাত চারিত্রিক দৃঢ়তা, তাকে উত্তমকুমার পর্দায় এক মহৎ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সমাজব্যবস্থায় যখন পুঁজিবাদ ও নৈতিক স্খলনের চোরাস্রোত চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা বাঙালির সৎ ও আদর্শবাদী সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

'বিচারক' চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। এই ছবিতে একজন জজের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট, তাঁর নিজের অতীত ভুলের সঙ্গে বর্তমান বিবেকের যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তাকে উত্তম অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার 'থানা থেকে আসছি' ছবিতে এক রহস্যময় তদন্তকারী অফিসারের চরিত্রে তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ অভিনয় সমাজের উচ্চবিত্ত ও কপট শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াপনাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। উত্তমকুমার বাঙালি পুরুষকে শিখিয়েছিলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্থবিত্ত নয়, একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার সততা, নীতিবোধ এবং সোজা মেরুদণ্ডের মধ্যে। তিনি যখন পর্দায় কোনও আদর্শবাদী ডাক্তার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইঞ্জিনিয়ার বা সৎ কেরানির চরিত্রে অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতেন, তখন সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদমিত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠত।

পারিবারিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার যৌথ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, বড়দের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি অপত্য স্নেহ এবং ত্যাগের মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে একটি আদর্শ বাঙালি পরিবার। উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পারিবারিক মূল্যবোধের উদযাপন।

'মৌচাক' ছবিতে ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া এক বড় ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় ছিল অনবদ্য। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না অতি-নাটকীয়তা। গুরুজনদের সামনে তাঁর বিনীত শারীরিক ভাষা, ছোট ভাইদের শাসন করার পাশাপাশি তাদের আগলে রাখার যে নির্ভরতা— তা ছিল চিরাচরিত বাঙালি সমাজব্যবস্থার আসল প্রতিচ্ছবি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা চারপাশকে গ্রাস করছে, পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তমের এই ছবিগুলো আমাদের যৌথ পরিবারের সেই সুবর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ত্যাগই ছিল আনন্দের মূল উৎস।

'মানুষ' হয়ে ওঠার লড়াই

বাঙালির মজ্জাগত মূল্যবোধে ব্যক্তির স্বার্থপরতাকে সবসময় নিকৃষ্ট মনে করা হয়েছে এবং লোককল্যাণ বা পরোপকারকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। উত্তমকুমারের বহু চরিত্র এই মানবিক দর্শনের সার্থক রূপায়ণ।

এই প্রসঙ্গে 'অমানুষ' চলচ্চিত্রের মধুসূদন বা 'মধু' চরিত্রটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও কুৎসায় জর্জরিত হয়ে এক সময়ের সৎ ও আদর্শবাদী জমিদারপুত্র যখন মদ্যপ ও সমাজ-পরিত্যক্ত এক রুক্ষ মানুষে পরিণত হয়, তখনও তার ভেতরের আসল মানবিকতা ও পরোপকারী সত্তাটি মরে যায় না। ঝড়ের রাতে বাঁধ ভেঙে যখন গোটা গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে মধুর সেই মরণপণ লড়াই আসলে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে ফুটিয়ে তোলে। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাইরের খোলসটি যতই মলিন বা রুক্ষ হোক না কেন, মানুষের ভেতরের আসল মূল্যবোধ যদি খাঁটি থাকে তবে সে সমাজকে এক নতুন পথ দেখাতে পারে। একইভাবে 'আনন্দ আশ্রম' বা 'ধন্যি মেয়ে' ছবিতেও তাঁর চরিত্রগুলো ছিল মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর এক একটি জীবন্ত উদাহরণ।

প্রেমের গরিমা

বাঙালির প্রেমের ব্যাকরণ চিরকালই অত্যন্ত মার্জিত, নান্দনিক ও আত্মিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। উত্তমকুমার রূপোলি পর্দায় প্রেমের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন, তাতে শরীরী আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গরিমা ও একাত্মতা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'সাগরিকা' বা 'অগ্নিপরীক্ষা'— প্রতিটি ছবিতেই উত্তমকুমারের চরিত্রগুলো ছিল নারীর প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রেমিক হিসেবে কখনও আগ্রাসী বা অধিকারপ্রমত্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন পরম আশ্রয়দাতা ও ছায়াসঙ্গী। নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই ভুবন ভোলানো মৃদু হাসি, কথা বলার সময় অপরিসীম ভদ্রতা এবং ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য নিজের অহংকার বা সুখ বিসর্জন দেওয়ার অভিব্যক্তি বাঙালি যুবসমাজকে এক গভীর রুচিসম্পন্ন প্রেমের পাঠ দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, প্রেম মানে কেবল অধিকার করা নয়, প্রেম মানে অপর মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়ে আপন করে নেওয়া। এই কারণে তাঁর রোমান্টিক চরিত্রগুলো আজও বাঙালির প্রেমের চিরন্তন ও পরিশীলিত আদর্শ হয়ে রয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বাঙালি মননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্ম, জাতপাত বা সংস্কৃতির কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার যে ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত, উত্তম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চেতনার এক ঐতিহাসিক জয়গান গেয়েছিলেন।

'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' চলচ্চিত্রটি এই ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। একজন পর্তুগিজ সংস্কৃতির মানুষ হয়েও হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি কীভাবে বাংলার মাটি, বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং কবিগানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এক নিপাট বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন— পর্দায় সেই রূপান্তরের কারিগর উত্তম। ভোলানাথ ময়রার সঙ্গে কবিগানের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর মুখাবয়বের সেই ঐশ্বরিক ভক্তি এবং গম্ভীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— 'খ্রিষ্ট আর কৃষ্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই', তখন তা কেবল ছবির সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বাংলার সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর ইশতেহার। তৎকালীন দাঙ্গা-পরবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে অস্থির বাংলার বুকে উত্তমের এই রূপায়ণ এক গভীর সামাজিক ক্ষতে মলম লাগানোর কাজ করেছিল এবং প্রমাণ দিয়েছিল যে বাঙালিয়ানা কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

'নায়ক'-এর আত্মদর্শন

সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও একজন মানুষের নিজের শিকড়, নৈতিকতা এবং বিবেকের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকা উচিত, তার এক মননশীল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে উত্তম মূলত নিজের জীবনেরই এক সমান্তরাল চরিত্র 'অরিন্দম মুখার্জী'-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খ্যাতির চরম চূড়ায় বসে থাকা একজন সুপারস্টারের ভেতরের একাকীত্ব, তাঁর অতীত জীবনের আদর্শচ্যুতির ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের বিবেককে টিকিয়ে রাখার যে ছটফটানি— তা উত্তম যে ভাবে তাঁর চোখের পলক, ঠোঁটের কোণের বিষাদ ও শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ট্রেনের কামরায় এক তরুণী সাংবাদিকের কাছে অভিনয় গুণে নিজের ভেতরের সব গ্লানি, পাপবোধ ও দুর্বলতা উজাড় করে দেওয়ার দৃশ্যটি উন্মোচিত করে, সাফল্য বা গ্ল্যামার মানুষের শেষ কথা হতে পারে না; নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। উত্তমের এই মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বাঙালি সমাজকে এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

কেন আজও উত্তমের বিকল্প নেই?

আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক হাই-টেক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ভাষা ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে চরম যান্ত্রিকতা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও বাঙালির নৈতিক অবচেতনে ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উত্তম আজও এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা। কারণ, উত্তম কেবল সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি কোনও অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির নিজস্ব মূল্যবোধের এক পরম বিশ্বস্ত অভিভাবক।

যখনই বাঙালি সমাজ কোনও নৈতিক সংকটে ভোগে, পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে বা যান্ত্রিকতার ভিড়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরে পেতে চায়, তখনই তারা ফিরে যায় উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের সেই মায়াবী আশ্রয়ে। তাঁর সেই প্রাণখোলা ভুবন ভোলানো হাসি, ধুতি-পাঞ্জাবির আভিজাত্য, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই চিরচেনা রূপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, সততা, পরিবার, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং আত্মমর্যাদাই হল একজন খাঁটি মানুষের আসল পরিচয়। 

যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালিয়ানা তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে, ততদিন বাঙালির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমারের এই অনন্য দৃষ্টান্ত চিরকাল অম্লান ও অতুলনীয় হয়ে থাকবে।


Tuesday, 1 September 2026

ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র

ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


In This World

রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।

এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।

এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'  (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।

রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।

২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।

সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।


Sunday, 30 August 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মসংস্থান

আশা না নিরাশা?

রাজীব ভট্টাচার্য



বিশ্ব শ্রম সংগঠন বা আইএলও'র সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে অনিশ্চয়তা সূচক (যা মূলত আর্থিক ও নীতি নির্ধারণকারী ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল) ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ থেকে অভূতপূর্ব স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে মন্দা ও কোম্পানিতে নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস এবং ভোগব্যয়কে দুর্বল করে দিতে পারে। সর্বোপরি, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাবে ক্ষতির ঝুঁকি শ্রমের বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

উচ্চশিক্ষা উন্নত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশার সম্ভাবনা জাগালেও, তা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই বেকারত্ব হ্রাসে অক্ষম। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারের চাইতে কম। কিন্তু এই চিত্রটি অপেক্ষাকৃত অল্প আয় বা মধ্য আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে একইরকম নয়। এই সমস্ত দেশগুলিতে স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেওয়ার হার যথেষ্টই কম। বর্তমানে এর সঙ্গে জুড়েছে তরুণ প্রজন্মের চাকরিজীবীদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বিশেষ করে প্রথমবার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণকারী উচ্চ দক্ষ পেশার ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসাহের মূল কারণ হল, দ্রুত হারে গণনার খরচ হ্রাস পাওয়া। ফলে, গণনার ক্ষমতা এবং তথ্য সঞ্চয় ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং)। তাছাড়া বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত হারে প্রয়োগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের পথকে প্রশস্ত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় দ্রুত হারে হ্রাস পাওয়াতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করে উচ্চশিক্ষিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বাজারে জোগান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে ।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এসি মোগলু এবং রেস্ট্রেপো (২০১৮) কর্মসংস্থানের বাজারের উপর এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন: 

(ক) স্থানচ্যুতি প্রভাব বা ডিসপ্লেসমেন্ট ইফেক্ট; 

(খ) উৎপাদনশীলতা প্রভাব বা প্রোডাক্টিভিটি এফেক্ট এবং 

(গ) দক্ষতা সম্পূরক প্রভাব বা স্কিল কম্প্লিমেন্টারিটি এফেক্ট। 

স্থানচ্যুতি প্রভাব সরাসরি নতুন প্রযুক্তির শ্রমিক দ্বারা পুরাতন শ্রমিকদের প্রতিস্থাপনকেই বোঝায়। এই প্রভাবের ফলে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় প্রভাবটি এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার ফলে এই দক্ষতায় পারদর্শী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া যা শ্রমের বাজারকে উদ্বুদ্ধ করবে। তৃতীয় প্রভাবটি মানুষ ও যন্ত্রের পরস্পরের প্রতি সম্পূরক সম্পর্কের কথা বোঝায়। এই নতুন প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান প্রতিস্থাপিত না করে যদি তার সম্পূরক হয়ে উঠতে পারে তবে তা নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই তিনটি প্রভাবের মধ্যে প্রথম প্রভাবটি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব দুটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি শেষ দুটি প্রভাব প্রথম প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে।

ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি টিসিএস সম্প্রতি ২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৩,৪৬০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে, যার মূল কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিবিড় প্রয়োগ। ওরাকেল'এর মতো বিশ্ব বিখ্যাত আইটি কোম্পানিও প্রায় ১২,০০০ কর্মীকে ওই একই কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং ইনফোসিস এর মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও।এই কোম্পানিগুলি দক্ষতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ায় গতানুগতিক কাজ, কোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সম্পন্ন করতেই বেশি আগ্রহী। তাই দৈত্যাকার আইটি কোম্পানিগুলি ছাড়াও অ্যামাজন (গত ৬ মাসে ৩০ হাজার), ব্লক (৪০০০'এর বেশি), ড্রপবক্স (৫০০'এর বেশি) কর্মচারী ছাঁটায়ের পথে হেঁটেছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীদের বেকারত্ব তাদের মনোবলে আঘাত হানবে, কোম্পানির প্রতি আনুগত্যকে দুর্বল করবে এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের অবক্ষয় বৃদ্ধি করবে। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'এর মতে, কর্মহীন ইঞ্জিনিয়ার ও দ্রব্য পরিচালনকারীরা দ্রুত নতুন স্বাধীন বিনিয়োগ বা স্বতন্ত্র উদ্যোগে উদ্যোগী হবে। আবার অনেকের মতে, এই বেকারত্বের মূল কারণ সীমিত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা-জোগানের অমিল। যদি ভারতীয় অর্থনীতি এর সঙ্গে নিজেকে মানানসই না করে তুলতে পারে তাহলে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার সাথে সেবার রফতানি হ্রাস পাবে ও শহরাঞ্চলের ব্যয়ের গতিও মন্থর হবে। এর ফলে ভারতবর্ষ সেই পূর্ববর্তী মধ্য-আয় বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। ফলস্বরূপ, ভারতের বেকারত্বের হার এপ্রিল ২০২৫'এ ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৬.৯ শতাংশ এবং জুন মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭.১ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক যুব বেকারত্ব মে মাসে ১৭.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশ।

টেসলা এবং স্পেস এক্স'এর কর্ণধার এলন মাস্ক'এর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজকে একটি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করবে এবং সম্ভবত আমাদের কারওরই সেই অর্থে আর কাজ থাকবে না। এনথ্রপিক'এর সহ প্রতিষ্ঠাতা দাড়িও আমোদেই এর মতে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট কলার কর্মীরা তাদের চাকরি হারাবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা জিওরজিয়েভার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুনামি সারা পৃথিবীতে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকের এক বিরাট অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের (যেমন স্টিম ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ শক্তি দ্বারা যন্ত্র চালিত তাঁত, মোটর যানবাহন, বেতার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট) চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব অনেকাংশেই আলাদা। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যত সংখ্যক কর্মসংস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তার থেকে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তাই স্থায়ী প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ধারণাটি কখনই বাস্তবায়িত হয়নি। 

জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল লক্ষ্য হল, অনিয়মিত জ্ঞানীয় কাজ (non-routine cognitive task) অর্থাৎ প্রতিদিনের বাঁধা-ধরা নিয়মের বাইরে যে সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতার প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের উচ্চ সারির দক্ষতাযুক্ত কাজগুলিকে অতি দ্রুত এবং ব্যাপক আকারে প্রতিস্থাপিত করা ও দ্রুতগতিতে তার উন্নতি করা। অনেকের মতে, এর ফলে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। অতি সম্প্রতি ICRIER (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভারতের দশটি শহরে ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের উপর জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের ধারণা পাওয়া। এই সমীক্ষাটি কিন্তু ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশাল আকারে কর্মসংস্থান হারানোর ধারণার পরিপন্থী। বরং নতুন প্রযুক্তিকে ভিন্ন আকারে ঢেলে সাজানো বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে উন্নততর কাজে নিয়োগেরই নিদর্শন দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে খরচ, প্রতিভার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কারণে।

নীতি আয়োগ'এর সাম্প্রতিকতম একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫'এর মাঝামাঝি প্রায় ৭৮,০০০ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ হারিয়েছেন (প্রায় ৫০০ মানুষ প্রতিদিন)। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছাঁটাই অথবা নতুন কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কারণে আইবিএম, মাইক্রোসফট, সিটি ব্যাংক গ্রুপ, জিপি মরগান, গোল্ডম্যান স্যাক্স'এর মতো সংস্থাগুলি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের মতে, ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, মানব প্রতিনিধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যমণি। শিল্প, সেবা, অর্থ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার বিরাট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মানের যে মডেলগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে নিরাপত্তার দিকটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যাপক কৌশলের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নীতি আয়োগের লক্ষ্য তিনটি মূল স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল- 

(ক) বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় সমস্ত স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত হারে প্রসার;

(খ) ভারতকে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক আকর্ষণীয় পীঠস্থান হিসেবে উন্নীত করা ও 

(গ) বিরাট মাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বা নৈপুূণ্য বৃদ্ধির কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা যার মূল উদ্দেশ্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া। 

তাই এখন দেখার, বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য যে পরিকল্পনাগুলি নেওয়া হয়েছে তার দ্রুত রূপায়ণের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে প্রতিস্থাপক নাকি পরিপূরক কোনও ভূমিকা পালন করে।


Friday, 28 August 2026

আদিত্য কুমারের খোয়াইশ

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।

আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।

সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।

কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন। 

এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।

যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।

তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই। 

বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!


Thursday, 20 August 2026

কে পরবাসী নয়?

স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


 

কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।  

ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।  

তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।  

তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ। 

তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে। 

তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ  ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।

এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।

কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক  'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর  ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।

আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।

তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে  ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।

কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত  কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।

আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।


Tuesday, 18 August 2026

নকশাল কয় প্রকার!

দিমাগ তো কাজ করছে...

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



চিদম্বরম যখন বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘নিজেকে একজন দিমাগী নকশাল ভেবে গর্ববোধ করি’, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রে রে করে উঠলেন, ‘চিদম্বরম মোটেও দিমাগী নকশাল নন, উনি বিশুদ্ধ নকশাল।’ ফলে, মোটমাট আমরা এখন পর্যন্ত চার প্রকার নকশাল পাচ্ছি: দিমাগী নকশাল, বিশুদ্ধ নকশাল, আর্বান নকশাল ও হাতিয়ারি নকশাল। এই চার ধরনের নকশালদের হদিশ আমরা গত এক দশক ধরে পেতে পেতে এসেছি। তদুপরি, ‘দিমাগী নকশাল’ নিয়ে তুমুল সোরগোল ওঠায় এক স্বঘোষিত পুরাতত্ত্ববিদ ‘নকশালি ঘাসের’ সন্ধান পেয়েছেন; ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে নদীর তীরে এই নকশালি ঘাস জন্মায়, সেই নদীকে ‘নকশালেশ্বর মহাদেব’ বলা হয়। তাই ‘দিমাগী নকশাল’ হলেন একজন শিবভক্ত…।’ এটা শুনে যোগেন্দ্র যাদব বেশ চমকিত হয়ে তা প্রচারও করে দিয়েছেন।

এখন ‘দিমাগী নকশাল’ যদি শিবভক্ত হন, তাহলে শাসক দলের মহাবিপদ। শিবভক্তদের কীভাবে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে? শিবের রুদ্ররূপ কে না জানে? ভক্তের উপর জুলুম হলে দেবতা কি স্থির থাকবেন? সেইজন্যই ‘বিশুদ্ধ নকশাল’ আরও বিপন্মুক্ত শব্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নকশাল’ শব্দটিরই যদি অমন পৌরাণিক ইতিকথা থাকে, তাহলে সে সব নিয়ে ছেলেখেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়! তবে কেউ বলতেই পারেন, ফেসবুকে কেউ লিখে দিলেই কি তা পুরাণকথা হয়ে যাবে? কোন পুরাণ বা স্মৃতিতে আছে, সে সূত্র কি দিয়েছে? অথবা, এমন কথার কি কোনও লোকজ দৃষ্টান্ত আছে? সে সব জানা যাচ্ছে না। অতএব, সূত্রহীনতার দরুণ এইসব পুরাণগাথার মারপ্যাঁচ আপাতত সরিয়ে রাজনীতির প্রশ্নটিকেই যদি জিইয়ে রাখা যায়, সেখানেও স্ববিরোধ আছে।

মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫ সনের কথা, যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে ‘সর্বাত্মক বিপ্লবের’ ফ্রন্ট, যে ফ্রন্টে একদিকে সামিল হচ্ছে সিপিআই বাদে সমস্ত বাম ও কমিউনিস্ট দল, অন্যদিকে পুরনো কংগ্রেস ও সমাজতন্ত্রী সহ আজকের শাসক দলের পূর্বসূরীরা যাদের ‘ভারতীয় জনসংঘ’ নামে তখন পরিচিতি। এই শেষোক্ত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এরপরে নিজেদের মিলিয়ে দেবে ‘জনতা পার্টি’ নামক একটি নতুন দলে, যে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হবেন ভারতীয় জনসংঘের নেতা নানাজী দেশমুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানী হবেন জাতীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য। আমরা সবাই জানি, জয়প্রকাশ নারায়ণ সে দলের কোনও আনুষ্ঠানিক পদ না নিলেও তিনিই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা ও পথ প্রদর্শক। সেই সময়ে তিনিই, তাঁর সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহে নকশালপন্থীদের যুক্ত হতে প্রকাশ্য সভায় তাঁদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তিকে তাঁর প্রয়োজন। সেদিন জনতা পার্টির নেতারা বা বাঘা বাঘা পূর্বতন জনসংঘীরাও কিন্তু সে কথার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মৃদু আপত্তিও জানাননি। বরং, জনসংঘীদের মূল মেন্টর সংগঠন আরএসএস জরুরি অবস্থার সময় বেআইনি ঘোষিত হলে তাদের ক্যাডার বাহিনী পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থী ও অন্যান্য বাম সংগঠন দ্বারা গঠিত নানারকম সেবামূলক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনেও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ঢুকে পড়ে।

আজ সময় ও পরিস্থিতি পালটেছে। সেই জনতা পার্টি আজ আর নেই। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে পুরনো জনসংঘীরা তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। আরএসএস’এর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু তাদের একটা অংশ তখনও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাম সংগঠনে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে থেকে গেছে। কোনও কোনও প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বাম ঘরানার মিলও ছিল। যেমন, গান্ধীর প্রশ্নে দু’ পক্ষেরই মতামত অনেকটাই এক ছিল। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যেহেতু দেশ জুড়ে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এক উদার আবহ ঐতিহ্যগত ভাবেই বিরাজমান, তাই সে প্রশ্নে আরএসএস উচ্চকিত ভাবে কিছু বলত না; তবে দেশভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ ফাটল দেখা দিয়েছিল, সেখানে ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’— তাদের এই দুই তরফ নির্মাণ মারফত দুই সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একটা সুপ্ত চোরাস্রোত প্রবহমান ছিল। এই চোরাস্রোতে কমবেশি আক্রান্ত ছিল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ ও নিম্নবর্ণদের সেই অংশ যারা দেশভাগের রোষানলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বামপন্থার সার্বিক প্রভাবে এই দুই-তরফের রাজনীতি ততদিন খুব একটা মাথা তুলতে পারেনি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতিই যখন অনেকটা বদলে গেল, বামপন্থীরাও নিজেদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থানে বেশ দুর্বল হল, তখন স্বভাবতই তাদেরও ভেসে যাওয়ার পালা দেখা দিল। বস্তুত, ভোটের হিসেব-নিকেশে তাদেরই একটা বড় অংশ নিজেদের দল ছেড়ে আরএসএস-বিজেপির পিছনে সামিল হয়ে গেল।

তা না হয় হল। কিন্তু তাই বলে চলমান রাজনীতির আপন পরিবর্তনগুলি তো থেমে থাকে না। দেখা গেল, এ তাবৎ সংসদীয় রাজনীতিতে যে সমস্ত নকশালপন্থী শক্তিসমূহ অংশ নিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রস্তাবনার মূল সুরকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছে, তারাই খুব নীতিনিষ্ঠ ভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্তমান শাসক-বিরোধী এমন এক বার্তা নির্মাণ করতে পেরেছে যা অন্যান্য প্রগতিশীল ও সমাজবাদী শক্তির সঙ্গে সাবলীল সংযোগ স্থাপনের দিশা দিতে সক্ষম হয়েছে। সেটা আরও স্পষ্টত দেখা গেল ককরোচ আন্দোলনের গোড়ার দিকে, যখন দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলিই এদের আন্দোলন নিয়ে কিছুটা সন্দিহান, ভাবছে বিজেপি’র বি-টিম কিনা, তখন কিন্তু বিভিন্ন নকশালপন্থী শক্তিগুলি প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের শক্তি, শ্লোগান, দম ও বুদ্ধি জুগিয়েছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াইয়ে রত থেকেছে। বস্তুত পক্ষে, নকশালপন্থী শক্তিসমূহের সামিল হওয়া ও তাদের রাজনৈতিক পরিণতমনস্কতা দেখে অন্যান্য বাম শক্তিও এগিয়ে আসে, এবং বাকী বিরোধী দলগুলিও ভরসা পায়। তারপর তো ইতিহাস, যার পিছনে সর্বোপরি আরশোলাদের নেতৃত্ব, চৈতন্য, বুদ্ধিবৃত্তি, সংযম ও অংশগ্রহণ অতুলনীয়। বলাই বাহুল্য, এক অসামান্য শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোনম ওয়াংচুকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপকতা এতটাই ছড়িয়েছে যে, আরএসএস প্রধানকেও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থাও যেন খানিক সমঝে কথা বলছে। প্রধান বিচারপতি বার কাউন্সিলের সভাপতিকে ধমকে দিয়েছেন, তিনি কেন ছাত্রদের এবং তাঁর মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপারে এসে নাক গলাচ্ছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পট তৈরি হচ্ছে।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ‘দিমাগী নকশালদের’ সন্ধান-ঘোষণা জারি হল। হাতে আম্বেদকর ও ভগৎ সিং’এর ছবি, শ্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভুখমারি সে আজাদী’, যন্তর মন্তরের রাস্তায় হাজার হাজার জনতার মাঝে হাজার হাজার মেয়েদের নিশ্চিন্তে রাত-জাগা, আধপেটা খেয়ে তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে দিন-রাত কাটানো, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসা’র অনশন, পুলিশের ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও মিম বানানো, মা-বাবার অনুশাসনকে তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতেই নেওয়া, পুলিশের লাঠির সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে পড়া, জল কামান চালালে শ্যাম্পু মেখে রেইন ডান্স— দেশ কোনদিন কবে শেষ তরুণ সমাজের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখেছে? যে জাগরণের সামনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহামহিম মন্ত্রী মহাশয়কেও পদত্যাগ করতে হয়? শুধু যন্তর মন্তরে কেন, ঝাড়খণ্ডেও তো শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে হল! এবার তো GenAlpha’রাও পথে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইতিমধ্যেই উত্তাল। আরশোলারা দলে দলে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যায়তনে, বলছে, ‘স্কুল ঠিক করো’। কে রুধিবে এই হড়পা বান?

দিমাগ তো কাজ করছে! জয়প্রকাশ বর্ণিত ‘নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তি’ দেশের ‘গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য’ লাগছে বৈকী! তারা তো দিমাগীই। নকশাল-ভীতি দেখিয়ে কি দিমাগে কার্ফু জারি করা যাবে? ‘নকশাল’ যে প্রকারেরই হোক, অথবা, পুরাতত্ত্ব মতানুযায়ী শিবভক্ত, তার যে রাজনৈতিক অর্থ গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে দেশবাসী বুঝেছে, তা নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আজ সর্বজনীন। নয় কী? নয়তো চিদম্বরম থেকে মহুয়া মৈত্র, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে প্রকাশ রাজ-- সকলেই একযোগে দম্ভ ভরে বলছেন কেন যে, ‘হ্যাঁ আমিও দিমাগী নকশাল।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে লক্ষ লক্ষ ফলোওয়ার নিয়ে কেন গড়ে উঠছে ‘দিমাগী নকশাল পার্টি’? লড়াইটা কি আসলে দিমাগ বনাম অন্ধভক্তির?


Friday, 7 August 2026

বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাট!

অসমাপ্ত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



কৌশিক গাঙ্গুলির 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ছবিটি গত জুলাইয়ে রিলিজ পেয়েছে। ছবিটি একটি দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তার পরিসর ব্যক্তিগত গৃহের দেওয়াল টপকে সমাজ, শ্রেণি ও সিনেমার বাণিজ্যিক ব্যাকরণের দিকে চলে যায়। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য, ছবিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যে কীভাবে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা ও 'অসমাপ্ত দায়'এর রাজনীতি কাজ করে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রা। পেশায় সে একজন শিক্ষিকা। তার কোনও সন্তান নেই। তবে এর জন্য শুভ্রা দায়ী নয়। এর কারণ সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায় (চরিত্রে কৌশিক সেন), শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী ও পেশায় অধ্যাপক। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই দায়ের বোঝা শুভ্রার উপরেই পড়ে। প্রচার হয় শুভ্রাই সন্তান ধারণে অপারগ। সুমনের কোনও দায় নেই। বিচ্ছেদের পর সুমন দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তার স্ত্রী মেঘনা। মেঘনা মুসলমান। এক ছোট্ট কন্যা সন্তান সহ মেঘনাকে বিয়ে করে সুমন। কিন্তু খাতায় কলমে সুমন মেঘনার মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ, একজন শিক্ষিত অধ্যাপক হিসেবে তাকে আভিজাত্যের ভান করতে হয়। মেয়ে ছাড়া যেন তার চলবে না, এমন একটি ভাবমূর্তি তাকে বজায় রাখতে হয়।

আখ্যানের মোড় ঘোরে মেঘনার অসুস্থতায়। জানা যায়, অ্যাডভান্স স্টেজের টিউমার ও ক্যান্সার। গল্পের জটিলতায় অকস্মাৎ শুভ্রার উপর এসে পড়ে একটি নৈতিক দায়। মেঘনার কন্যা সন্তানটি যাতে এই বিপদের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব শুভ্রা অস্বীকার করতে পারে না। এই বিন্দুতেই ছবির শিরোনাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইনত শুভ্রা সুমনের প্রাক্তন, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক ভাবে সে আজও অর্ধাঙ্গিনী। একই সময়ে মেঘনাও সুমনের বর্তমান অর্ধাঙ্গিনী। ফলে, সুমনের জীবনে দুই সময়ের দুই নারী এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ছবির শেষে মেঘনার পরিণতি নির্মম।

'আজও অর্ধাঙ্গিনী' একটি স্পষ্টতই শহুরে মধ্যবিত্তের আখ্যান। এবং এটিই এর সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান। শুভ্রা শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং তার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ভাষা আছে। তার শোক পর্দায় স্থান পাওয়ার সামাজিক পুঁজি আছে। সিনেমা একটি বাণিজ্য। মধ্যবিত্তের সমস্যা সিনেমার এক বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র।

এই প্রসঙ্গেই ২০২৪ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে অভয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মর্তব্য। সে ঘটনার পর শহরে যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, বাইরে থেকে তাকে লিঙ্গ বয়ানের রাজনীতি মনে হলেও আদতে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন। যে সমস্ত গরিব, কাজের মহিলা, প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা রোজ নিগৃহীত হন, তাদের জন্য রাত জাগা হয় না। কিন্তু যখন ঘটনার কেন্দ্রে আসেন একজন শিক্ষিতা, এমডি পাঠরতা ডাক্তার, তখন সেই ঘটনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'ও সেই একই কাঠামোর অনুসারী। শুভ্রার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পর্দায় আসে কারণ সে মধ্যবিত্ত। কৌশিক গাঙ্গুলিদের সিনেমা নিয়ে ব্যবসা করতেই হবে। তাই প্রচলিত ফিকশনাল মেলোড্রামাকে কখনই নন-ফিকশনাল বাস্তবতায় থাকা সমগ্র মেয়েদের আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ছবিটি সেই নিরাপদ বাস্তবতাকেই বেছে নেয় যা মধ্যবিত্ত দর্শক দেখতে অভ্যস্ত। এখানে চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির যন্ত্রণাকেই দৃশ্যমান করে এবং তাকেই রাজনীতি বলে চালায়।

এই আখ্যানটি মেলোড্রামার ব্যাকরণকেও অস্বীকার করে না। মেঘনার ক্যান্সার, দাম্পত্যের ভুল বোঝাবুঝি এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন-- এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যে টুইস্ট আনে। এটি বাণিজ্যিক সিনেমার একটি অবশ্যম্ভাবী শর্ত। শুধুমাত্র দাম্পত্য টানাপোড়েন দিয়ে দু' ঘণ্টার ছবিকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত অসুস্থতা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের মতো আবেগীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মেলোড্রামার ভেতরেই একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও লুকিয়ে আছে। একজন নারী কেন অন্য নারীর সন্তানের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে! এই বাধ্যতা কি ভালোবাসা থেকে আসে, নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারীত্বের সংজ্ঞা থেকে?

ছবির ফর্মগত বৈশিষ্ট্য হল এর অসমাপ্তি। কৌশিক গাঙ্গুলি কোনও চূড়ান্ত মীমাংসায় যাননি। শুভ্রা শেষ পর্যন্ত কী করল, এই প্রশ্নটি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালক লম্বা টেক, স্থির ক্যামেরা ও ন্যূনতম আবহসংগীত ব্যবহার করেছেন। এর ফলে দৃশ্যগুলোতে একটি ডকুমেন্টারিসুলভ বাস্তবতা তৈরি হয়। শুভ্রার নিঃসঙ্গ হাঁটা বা পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে ক্যামেরা তাড়াহুড়ো করে না। এই স্থবিরতাই দর্শকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, প্রথাগত সিনেমা ক্লাইম্যাক্স দেয়। কিন্তু জীবন ক্লাইম্যাক্স দেয় না। জীবন শুধু চলতে থাকে। এখানে ক্যামেরা শুভ্রাকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে না, বরং এক চিন্তাশীল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

সব শেষে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনি কাগজে শেষ হলেও সামাজিক ও মানসিক ভাবে ফুরোয় না। শুভ্রা এবং মেঘনা-- দুজনেই সুমনের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু এই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া তাদের পছন্দ নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা। একজন নারীকে যতক্ষণ না স্ত্রী ও মা-- এই দুই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ততক্ষণ সমাজ তাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করে না। শুভ্রার ক্ষেত্রে এই অসম্পূর্ণতার তকমা আরও নির্মম। কারণ, সন্তান না থাকার দায় তার নয়, তবুও দায় তার ঘাড়েই পড়েছে। অথচ পরিস্থিতির চাপে তাকেই আবার অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কৌশিক গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতির জন্য কোনও উত্তর রাখেননি। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। আর সেই প্রশ্নের নামই 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'। 

সিনেমা করিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলি'রা কিন্তু সবটাই বোঝেন, কিন্তু বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাটের বাইরে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেন না; এটা শুধু শ্রেণি চরিত্র নয়, শহুরে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি।