'নথি'র চেয়ে মানুষ বড়
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলব তা শুধু রাজনীতির নয়, সিনেমারও। কারণ, সিনেমা মানেই তো বিষয়কে ফ্রেমে বাঁধা। আর রাষ্ট্রও আজকাল মানুষকে নথিতে বাঁধছে। দুটো প্রক্রিয়াই আসলে একই প্রশ্ন করে: কাকে দেখা হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে!
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ এখন দুটো। এক, মানুষকে নথিতে বেঁধে ফেলা, আর দুই, ক্ষমতাকে রোজকার ভাষার অংশ করে দেওয়া। প্রথমটা দেখা যায় ফাইলে, দ্বিতীয়টা দেখা যায় সংলাপে বা ব্যবহারিক ভাষার কালচারে। তখনই রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়। নীতি-আদর্শের তর্ক কমে। জায়গা নেয় সন্দেহ আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। ভারতবর্ষে গত কয়েক বছরে এই বিষক্রিয়া আমরা দুই দিকেই দেখছি। শাসক ক্ষমতার জোরে অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে বিরোধীদের বাঁধছে। আর বিরোধীরাও তাদের কৌলিন্য হারিয়ে সেই একই দুর্নীতির যন্ত্র হয়ে উঠছে। ফলে, কোথাও ক্ষমতায় তারা ছোট অংশ পেলেও, সেখানেও একই ক্ষয় শুরু হয়, যার খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। ভোটের সময় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এই ক্ষয় নিয়ে নিরুত্তাপ। এটাই নয়া-ফ্যাসিজমের সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের খোলস থাকে, অন্দরে মানুষের জায়গা ছোট হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই আসে ভোটার তালিকার সংশোধনের কথা। আগে যা ছিল নিয়মিত সংশোধন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাসের পর মাস ধরে যাচাই; আর আইন মোতাবেক, বিশেষ নিবিড় সংশোধন হত সেই সব এলাকায় যা হয়তো দাঙ্গা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বস্ত। ২০২৫-এর অক্টোবরে যখন দেশ জুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হল, প্রশ্ন উঠল: রুটিন কাজে 'জরুরি' পদ্ধতি কেন?
বিহারে ভোটার তালিকার খসড়া থেকেই প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গেল। কারণ, মৃত্যু, স্থানান্তর, ডুপ্লিকেট। চূড়ান্ত তালিকায় সংখ্যা কমল। কিন্তু এক মাস সময় আর কাগজের শর্ত নিয়ে আপত্তি উঠল। কর্নাটক-তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভোটাধিকার খর্বের আশঙ্কায় প্রতিবাদ করলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও তাই বললেন। সিপিআইএম নেতৃবৃন্দ বাংলাভাষী মানেই সন্দেহ করা যাবে না, বললেন। কেন্দ্র সরকার বলল, এটা শুদ্ধিকরণ। একই বয়ান নির্বাচন কমিশনেরও।
এখানেই রাজনীতির আসল খেলা। যখন লক্ষ লক্ষ নাম 'বিচারাধীন' ফাইলে পড়ে, তখন সেটা 'শুদ্ধি' নাকি 'বাদ'? এরই ফাঁক দিয়ে রাজনৈতিক বয়ানে ঢোকে 'অনুপ্রবেশকারী', 'রোহিঙ্গা'। এগুলো আইনি শব্দ নয়, লেবেল; যা লাগিয়ে দিলে মানুষটা আর নাগরিক থাকে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ বলছে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে আটকায় কাগজে। জন্মের শংসাপত্র, স্কুলের রেকর্ড, জমির দলিল সবার কাছে নেই। ADR (Association for Democratic Reforms)-এর পর্যবেক্ষণ, বিশেষ এসআইআর'এ আধার গ্রাহ্য নয়। অথচ কোটি মানুষের কাছে আধারই একমাত্র পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭-এর পর আসা উদ্বাস্তু, মতুয়া সম্প্রদায়, আন্দামান-ছত্তিশগড়ে পুনর্বাসিত মানুষের ফাইল এই বিতর্কের মধ্যেই পড়ে। তাদের পূর্বপুরুষ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই ঘর ছেড়েছিলেন। দেশভাগের সেই যন্ত্রণা বাঙালির যৌথ স্মৃতি। এখন সেই রাষ্ট্রই যদি বলে, 'প্রমাণ করো তুমি এ দেশের', তাহলে সেই স্মৃতি অস্বীকৃত হয়।
মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট ১৯৩৫ সালে 'সভ্যতার কাহিনি' প্রথম খণ্ডে লিখেছিলেন, সভ্যতার শুরুই হয়েছে মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমনের মধ্য দিয়ে। পোলিশ-ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ট বাউম্যান ১৯৯৮ সালে 'বিশ্বায়ন: মানবিক পরিণতি' বইতে বলেন, 'আধুনিক মানুষ স্থির নাগরিক নয়, সে পর্যটক ও উদ্বাস্তুর মাঝামাঝি'। ইতিহাসবিদ,দার্শনিক ও সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সঈদ ২০০০ সালে 'রিফ্লেকশনস্ অন এক্সাইল' প্রবন্ধে বলেন, 'নির্বাসন শুধু জায়গা বদল নয়, রাজনৈতিক অবস্থা। নির্বাসিত মানুষ নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না।'
১৯৪৭ ছিল আমাদের দেশে উপমহাদেশের বৃহত্তম গণ-অভিবাসন। তাই কাউকে 'বহিরাগত' বলা মানে সেই স্মৃতিকে মুছে দেওয়া। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ২০০৪ সালে 'পলিটিক্স অফ দ্য গভার্ন্ড' বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে একে বলেছিলেন 'রাজনৈতিক সমাজ'। তাঁর মতে, ভারতে মানুষ শুধু ভোটার নয়। তাদের পাড়া আছে, জীবিকা আছে। রাষ্ট্র যখন বারবার কাগজ চায়, সেই জীবনটাই যেন অবৈধ হয়ে যায়। সবই 'ক্ষমতা'র রূপ! ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ১৯৭৬ সালে 'যৌনতার ইতিহাস'এর প্রথম খণ্ডের পঞ্চম অংশে 'বায়োপাওয়ার' বা জৈব-ক্ষমতার কথা বলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপ বদলেছে। প্রাচীন সার্বভৌম শক্তির কাজ ছিল 'মৃত্যু অথবা বাঁচতে দেওয়া', কিন্তু বায়োপাওয়ারের মূল লক্ষ্য হল, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, জন্মহার, মৃত্যুহার ও আয়ুষ্কালের মতো বিষয়গুলোকে তদারকি করে জীবনকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও লালনপালন করা । রাষ্ট্র যখন পুরো মানবজীবনকে নিজের রাজনৈতিক কৌশলের অধীনে নিয়ে আসে, তখন তাকেই বায়োপাওয়ার বা জৈব-ক্ষমতা বলা হয়। তাই আদমশুমারি, স্বাস্থ্য, ভোটার তালিকা, ডেটা দিয়ে ঠিক হয় কে ভোট দেবে, কে ভাতা পাবে, কে সন্দেহজনক— সব ঠিক হয় অফিস ঘরে। ইতালিয়ান চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি ১৯২৯-৩৫ সালে জেলে বসে 'জেলখানার ডায়েরি'-এর ১২ ও ১৩ নম্বর নোটবুকে লেখেন, আধিপত্য টেঁকে সম্মতিতে। ভয় আর বিভাজনকে যখন 'জাতীয় স্বার্থ' বলা হয়, মানুষ নিজেই শৃঙ্খল পরে।
এই নথি ও ক্ষমতার সম্পর্কটা আমরা সবচেয়ে ভালো বুঝি গল্পে। সিনেমাই রাষ্ট্রের মুখটা সবচেয়ে স্পষ্ট করে দেখায়। তাই আমি চারটে ছবি রাখছি। চার মহাদেশ, চার সময়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র কি মানুষকে রক্ষা করছে, না পরিচালনা করছে?
ডারসু উজালা, আকিরা কুরোসাওয়া, ১৯৭৫
ডারসু সাইবেরিয়া জঙ্গলের শিকারি। তার পাসপোর্ট নেই। প্রকৃতিই তার আইন। শহরের অফিসার তাকে সভ্য করতে চায়। পারে না। ডারসু শহরের নিয়মে টেঁকে না। এই ছবি বলে, রাষ্ট্র যখন সবকিছু মাপতে চায়, স্বাধীন অস্তিত্বই বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম, কোস্তা গাভরাস, ২০১৯
২০১৫-র গ্রিস। গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ বলল 'না'। কিন্তু সরকার সেই 'না'-কেই মানল না। কারণ, আন্তর্জাতিক অর্থের কাঠামো অন্য কথা বলছিল। 'না' টা কী ছিল?
২০১৫ সালের ৫ জুলাই গ্রিসে একটা গণভোট হয়েছিল। গণভোটের প্রশ্ন ছিল: 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক আর আইএমএফ যে কঠোর ঋণ শর্ত দিচ্ছে, গ্রিস কি সেটা মেনে নেবে?' সেই শর্তগুলো ছিল: পেনশন কমানো, ট্যাক্স বাড়ানো, সরকারি চাকরি ছাঁটাই। গ্রিসের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস মানুষকে বললেন: 'এই শর্তে না বলুন'। ফলাফল কী হল? ৬২ শতাংশ মানুষ ভোট দিল 'না'। অর্থাৎ, তারা বলল, আমরা এই কঠোরতা মানব না। কিন্তু তার এক সপ্তাহের মধ্যেই কী ঘটল? সিপ্রাস সরকার সেই 'না'কে অগ্রাহ্য করে ইউরোপের কাছ থেকে আরও কঠোর শর্তেই ঋণ নিল। মানুষের ভোটের রায়কে বাঁচানোর জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা বাঁচাতে হল।
কস্তা গাভরাস দেখাচ্ছেন, গণতন্ত্রে মানুষের রায় থাকলেও আসল ক্ষমতা থাকে আন্তর্জাতিক অর্থ, ব্যাংক আর ঋণের কাঠামোর হাতে। মানুষ বলল 'না', কিন্তু সিস্টেম বলল 'হ্যাঁ' করতেই হবে। গণতান্ত্রিক রায় কীভাবে কাঠামোর কাছে হারে, এই ছবি তার দলিল।
প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্যজিৎ রায়, ১৯৭০
কলকাতার শিক্ষিত, বেকার ছেলে সিদ্ধার্থের ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রশ্ন তার জীবনের সঙ্গে মেলে না। সে উত্তর দিতে পারে না, কারণ, ব্যবস্থাটাই তার ভাষা বোঝে না। ৫৫ বছর আগের ছবি। নিয়মের সঙ্গে না মিললেই মানুষ অপ্রাসঙ্গিক।
আই, ড্যানিয়েল ব্লেক, কেন লোচ, ২০১৬
ব্রিটেনের ছুতোর। অসুস্থ। সরকারি ভাতার অনলাইন ফর্ম ভরতে পারে না। নিয়মের জটে সে অস্তিত্বহীন। কাউন্টারে কেউ তাকে মানুষ দেখে না, দেখে ফাইল। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের লাইনের সঙ্গে এই ড্যানিয়েলের ফারাক কতটুকু?
চারটে ছবি একই কথা বলছে। 'নথি' না থাকলে রাষ্ট্র দেখে না। কাঠামো না মানলে গণতন্ত্র টেঁকে না। মানুষ যখন 'সংখ্যা' হয়ে যায়, রাজনীতির মৃত্যু ঘটে। বিশ্ব জুড়েও একই ছবি। সব জায়গায় নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ। এর থেকে বেরনোর পথ নিয়ে যদি ভাবতে হয় তবে প্রথমেই আসে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার কথা। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ না হলে নিয়মই নাগরিক দমনের অস্ত্র। দুই, নাগরিকত্ব কাগজ নয়, মর্যাদার প্রশ্ন। তিন পুরুষ ধরে যে মাটিতে আছে তাকে বারবার প্রমাণ দিতে বলা যায় না। তিন, রাজনীতির ভাষ্য ফেরানো। 'ওরা বনাম আমরা' নয়, গণতন্ত্রের শক্তি তর্কে, ফ্যাসিবাদের শক্তি নীরবতায়। আজকের সংকট নৈরাজ্যের নয়। এটা দমন-ভাষার এক ঠাণ্ডা অথচ নতুন শৃঙ্খলা। এখানে নাগরিক মানে ডেটা, ভোটার মানে সংখ্যা, প্রতিবাদ মানে কেস ফাইল। মানুষের কান্না, রাগ, স্বপ্ন— এগুলোর জন্য কলাম নেই।
'ডারসু' শেখায় সম্পর্ক। 'অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম' দেখায় কাঠামোর নিষ্ঠুরতা। 'প্রতিদ্বন্দ্বী' বলে বঞ্চনা। ড্যানিয়েল ব্লেক দেখায় রাষ্ট্রের স্বার্থপর উদাসীনতা। তাই, যখন 'নথি'র চেয়ে মানুষ বড় হবে তখনই মুক্তি। কারণ, মানুষ আসলে 'অভিবাসী'। আর গণতন্ত্রের মালিকও মানুষই। 'নথি' নয়।




