Saturday, 7 November 2026

দেশে দেশে কুলপতিরা কুপোকাত

পরিবর্তনের ঢেউ

সঙ্গে বামপন্থী ও সমাজতন্ত্রীদের উত্থান

সোমনাথ গুহ



গণতন্ত্রী, বামপন্থী, আপামর দক্ষিণপন্থা-বিরোধীদের এ বড় সুখের সময়। গত এপ্রিল মাসে মধ্য ইউরোপে হাঙ্গেরির দাপুটে নেতা ভিক্টর অরবানের ষোল বছরের একনায়কতন্ত্রী শাসনের অবসানের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বাহুবলী নেতারা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২৫ এপ্রিল অরবান তাঁর একদা সহকর্মী পেতর ম্যাগিয়ারের কাছে হার স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। তার ঠিক ছয় মাস বাদে ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার ভুচিক গত দু' বছরের উত্তাল আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেন। একই সময়ে সমস্ত পূর্বাভাস নস্যাৎ করে ব্রাজিলে লুলা দ্য সিলভা পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ইজরায়েলে নরহত্যাকারী কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু’র আসনও টলমল। এই পর্বের মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটল যখন আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট ঝড়ে পর্যুদস্ত হলেন। ধারাবাহিক এই মহীরূহ পতনের ওপর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে। 

হাঙ্গেরি

ফিদেস (তরুণ ডেমোক্র্যাট সঙ্ঘ) দলের নেতা অরবান ১৯৯৮ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন তিনি ৩৫ বছরের তরতাজা তরুণ, কমিউনিজম-বিরোধী গণতন্ত্রের এক ধ্বজাধারী। ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত করলেন, দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজের লোকদের বসিয়ে সেগুলি কুক্ষিগত করে নিলেন, ফিদেস পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করলেন। ২০০২'এ নির্বাচনে হেরে গেলেন, ২০১০'এ ক্ষমতায় ফিরে এসে স্বমূর্তি ধারণ করলেন। আমাদের অতি পরিচিত আর এক বাহুবলীর মতো উপলব্ধি করলেন যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে মিডিয়াকে কব্জা করতে হয়; মানুষের মন দখল করতে হয়, তাঁদের পুরো মগজধোলাই করে অন্ধভক্তে পরিণত করতে হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ইফ ইউ ক্যান নট বিট দেম, বাই দেম! অরবান সেটি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করলেন। এক দশক আগে যে বন্ধুদের শীর্ষস্থানে বসিয়েছিলেন, তাঁরা এতদিনে সব ধনকুবের। এঁরা পটাপট বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, মিডিয়া সংস্থা কিনে নিলেন। কোনও জোর জবরদস্তি, হিংসা প্রদর্শন নয়। নীরবে, নানা ইঙ্গিতে জানিয়ে দেওয়া হল, যে কোনও ঘটনার সরকারি ভাষ্যই প্রচার করতে হবে, না হলে বিজ্ঞাপন বন্ধ। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনকাম ট্যাক্স, গোয়েন্দা বিভাগ আছে, আর সেই দেশেও আছে পেগাসুস-এর কঠোর নজরদারি। আর কী! অষ্টপ্রহর সরকারের গুণকীর্তন শুরু হয়ে গেল, অরবান হয়ে গেলেন মধ্য ইউরোপের মহামানব।

কিন্তু লক্ষ্মীন্দরের বাসরঘরেও ছিদ্র থাকে। আপাত নিশ্ছিদ্র এই ব্যবস্থার মধ্যেও বিদ্রোহী সুর ভেসে থাকে। আমাদের এখানে যেমন রাভিশ কুমার, ধ্রুব রাঠী এবং বহু প্রতিবাদী ইউটিউবার ও প্রভাবকারী, ওখানেও তিন সাংবাদিকের ‘ডিরেক্ট ৩৬’ নামে আন্তর্জালের চ্যানেল হাজারও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিরোধী প্রচার জারি রাখে। লাগামছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রায় সবার অজান্তে মানুষের প্রতিবাদ দানা বাঁধল। আমেরিকা, রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন সত্ত্বেও নির্বাচনে অরবানের ভরাডুবি হল। পেতর ম্যাগিয়ারের তিসা পার্টি ১৯৯ আসনের মধ্যে ১৪১টিতে জয়ী হয়ে ভিক্টর অরবানের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটাল। 

সার্বিয়া  

সার্বিয়ার যুব সম্প্রদায় যখন আলেকজান্ডার ভুচিকের এসএনএস পার্টির বারো বছরের লৌহকপাট শাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন হাঙ্গেরির মানুষ তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেন। অরবানের পরপর নির্বাচনে জয়ের একটা রহস্য হল, ভোটদান বন্ধের দু-তিন ঘণ্টা আগে হঠাৎ ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। তখন ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীর সাহায্যে ছাপ্পা ভোট করা হয়। মিডিয়া যথারীতি এই কারচুপি ব্ল্যাকআউট করে দেয়। ২০২৬-এর নির্বাচনে তিসা পার্টির ক্যাডাররা এটা বন্ধ করার ব্যাপারে সচেতন ছিল। সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরাও নিজেদের দেশের নির্বাচনে প্রতিটি বুথের ওপর কড়া নজর রাখে। দুর্নীতিগ্রস্ত, দমনকারী ভুচিক শাসনের অবসান ঘটার এটাই অন্যতম কারণ। 

সলতে পাকানো অবশ্য দু' বছর আগে শুরু হয়েছিল যখন নোভিসাদ নামক জায়গায় রেল স্টেশনের ছাদ ভেঙে পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। বলাই বাহুল্য, চরম দুর্নীতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দেশের শিক্ষার্থীরা স্থির করেন, ঢের হয়েছে আর নয়। তাঁরা ভুচিকের সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের সংগঠন ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ অনুভূমিক, কোনও নেতা নেই। তাঁরা প্রধান শহরগুলির বাইরে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন, যেখানে ভুচিকের দল এসএনএস-এর মূল ঘাঁটি। নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থীরা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এসেছেন: ডাক্তার, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী আর শিক্ষার্থী। তাঁদের ইস্তাহার স্রেফ বাগাড়ম্বর নয়। তাঁরা দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়া প্রতিবাদ দমনকারী অফিসারদের অপসারণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে পেটোয়া লোকদের হাত থেকে মুক্ত করা এবং পদলেহনকারী মিডিয়ার পরিবর্তে স্বাধীন মিডিয়া গড়ে তোলা। ইতিমধ্যে মিডিয়ার প্রাক্তন পদাধিকারীরা অরবানের দালালি করার জন্য দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। 

ব্রাজিল 

ব্রাজিলেও দ্বিতীয় দফায় লুলা দ্য সিলভার প্রচারাভিযান পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। প্রথম দফার ভোটের পর সবাই ধরেই নিয়েছিল অশীতিপর রাষ্ট্রপতির পরাজয় নিশ্চিত; ফ্লাভিও বোলসনারো পেয়েছিলেন ৪৭ এবং লুলা ৪৫ শতাংশ ভোট। অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলের ৭ শতাংশ বোলসনারোর ঝুলিতে যাওয়া নিশ্চিত ছিল। বোলসনারো ধরেই নিলেন তিনি ক্ষমতায় এসে গেছেন, আনন্দে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ চার থেকে ছয় বছর ঘোষণা করে দিলেন। বোলসনারোর ছয় বছর মানে নিরাপত্তা বাহিনীর দাপট, আদিবাসী-বিরোধী, পরিবেশ-বিরোধী, অ্যামাজন–ধ্বংসকারী, আমেরিকার পা-চাটা শাসন, যে বিভীষিকা এর আগে ফ্লাভিওর পিতা জাইর-এর সময় মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। মানুষ ঠিক করে তারা কিছুতেই এটা হতে দেবে না। এমতাবস্থায় যুব সম্প্রদায় গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে সমাবেশিত হতে শুরু করে। দ্বিতীয় দফায় মানুষ ঝেঁটিয়ে ভোট দিতে আসে, বিশেষ করে বরিষ্ঠ নাগরিকদের উৎসাহ ছিল লক্ষণীয়। সামান্য ব্যবধানে হলেও লুলা আবার মসনদে। তিনি ঘোষণা করেছেন, ব্রাজিল কারও ঘরের পিছনের আঙিনা হবে না, অ্যামাজন রক্ষা করবেন, বিরল খনিজ পদার্থ নিজেদের শর্তে বিপণন করবেন, আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন। 

ইজরায়েল 

ইজরায়েলের ছবিটা একেবারেই পরিষ্কার নয়। এখন অবধি জানা যাচ্ছে, আরব পার্টিগুলি যাঁদের ১৯টা আসন আছে তারা গাদি আইজেনকোটকে (৪৮ আসন) সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু আইজেনকোট সেই সমর্থন গ্রহণ করবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, হামাসকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলতে আরব দলগুলির দ্বিধা আছে। এছাড়া ওই জোটের আর একটি দল আরব পার্টির সমর্থনে সরকার গড়তে নারাজ। এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। পুনরায় নির্বাচনের সম্ভাবনা আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, যে গোষ্ঠীই ক্ষমতাসীন হোক ইজরায়েলের প্যালেস্টাইন নীতিতে কোনও গুণগত পরিবর্তন আসবে কিনা সন্দেহ। 

টেক্সাস বিক্রি হবার নয় 

আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আম আদমির দৈনন্দিন সমস্যার প্রতি আরও সংবেদনশীল হবেন, ইরানের সাথে যুদ্ধে সংযত হবেন, শুল্ক নীতির প্রশ্নে নমনীয় হবেন। ডেমোক্র্যাটদের জয় তিনটি কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। টেক্সাসে কয়েক দশক বাদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো জয়লাভ করেছেন। এই প্রদেশের নির্বাচনে অর্বুদপতি ইলন মাস্ক রিপাব্লিকান প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ১৫৮ মিলিয়ান ডলার খরচা করেছিলেন। টালারিকো বলেন, টেক্সাস বিক্রি হবার নয়, নিজের ব্যবসার সুবিধার্থে দেদার পয়সা খরচ করে নির্বাচন জেতার দিন শেষ। তিনি মার্কিন গণতন্ত্রে ডলারের স্বৈরতন্ত্র মোকাবিলা করার সংকল্প করেছেন। 

আমেরিকাতেও একটা আইপ্যাক আছে (AIPAC): ‘আমেরিকান ইজরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’। আমেরিকার ইজরায়েল-বান্ধব বৈদেশিক নীতি বহাল রাখার জন্য এরা উভয় দলের প্রার্থীদের প্রচারে হাত খুলে টাকা ঢালে। শোনা যাচ্ছে, গাজায় গণনিধনের প্রতিবাদে এবার কয়েকজন তাদের সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছেন। মিশিগান প্রদেশে আব্দুল এল সৈয়দকে হারানোর জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে হ্যালি স্টিভেন্সকে তারা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিল। এল সৈয়দ তাঁকে পরাজিত করে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হন। এরপর ট্রাম্পের দলবল তাঁকে জিহাদি, ইস্লামিস্ট, কম্যুনিস্ট ইত্যাদি বলে প্রবল গালমন্দ করা সত্ত্বেও তিনি রিপাব্লিকান প্রার্থীকে হারিয়ে আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। জোহরান মামদানির জয়ের পতাকা তিনি উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। 

এবারের নির্বাচনে প্রাদেশিক স্তরে 'ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা’র বেশ কিছু প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এঁরা নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবার বেশ কিছু মুসলিম ও ভারতীয় প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এঁদের মধ্যে আছেন দেশের প্রথম হিজাব পরিহিতা মহিলা আবের কাওয়াস যিনি নিউ ইয়র্কের প্রাদেশিক সভায় নির্বাচিত হয়েছেন।  

ইউরোপ

জেনজি আন্দোলনে ইউরোপ উত্তাল। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে তুমুল বিক্ষোভ শুরু করে যাতে পরে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়। দৈনন্দিন সমস্যার বিরুদ্ধে বিপুল প্রতিবাদ হচ্ছে যা সামাল দিতে মাকঁর সরকার হিমসিম খাচ্ছে। জার্মানিতে যুব সম্প্রদায় ২১টি শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ সংঘটিত করেছে। ফ্রান্সে দক্ষিণপন্থী ন্যাশানাল পার্টি লা পেন এবং জার্মানিতে AFD ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তারা স্যাক্সোনি-তে জিতেছে, আবার বার্লিনে বামপন্থী ডিয়ে লিনকে জয়লাভ করেছে। পুরো ইউরোপে বাম-ডানের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন আগামী দিনেও চালু থাকবে। 

দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে গদিচ্যুত করা যায়, যেরকমটা প্রথাগত গণতন্ত্রে হয়ে এসেছে। ভারতেও জেনজি আন্দোলনের দৌলতে শাসকের চূড়ান্ত দাপটে একটা চিড় ধরেছে। এই ফাটল আরও বিস্তার লাভ করবে। মুশকিল হচ্ছে, এসআইআর-এর দৌলতে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যেকার লড়াইয়ে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আর নেই। তাই, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এসআইআর বাতিল করতেই হবে, এসআইআর-পূর্ব ভোটার তালিকায় ফিরে যেতে হবে। তবেই এখানেও স্বৈর-শাসকদের পরাজিত করা যাবে, আবার গণতন্ত্রের ধ্বজা উড্ডীন হবে।


Tuesday, 3 November 2026

'আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা'

ইউরোপ জুড়ে তারুণ্যের বিক্ষোভ

শুভনীল চৌধুরী



প্রায় গোটা ইউরোপে ছাত্ররা রাজপথে। প্রতিবাদে মুখরিত প্যারিস থেকে বেলগ্রেড। ইতিমধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সার্বিয়ায় ১৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট থাকা আলেকজান্দার ভুচিক। বেলগ্রেডের রাস্তায় মানুষের ঢল, মানুষের উৎসব। ফ্রান্সে চলছে আন্দোলন, যা দিন কয়েক আগে হিংসাত্মক চেহারা নেয়। লাখো মানুষ রাস্তায়। আলবানিয়াতে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাণ্ডারীদের। তুলছে পালটে দেওয়ার স্লোগান। সোচ্চারে জানান দিচ্ছে, যে ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে, তার পরিবর্তন চায় তারা। কেন তারা রাস্তায় নেমে এত বড় গণআন্দোলন গড়ে তুলছে একটার পর একটা দেশে?

প্রত্যেকটি দেশের কার্যকারণ সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। প্রথমত, যে জেন-জি-র কথা এখন রাজনৈতিক ভাষ্যে সর্বত্র শোনা যাচ্ছে এবং আলোচিত হচ্ছে, তাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। যে ১৯৯৭ সালে জন্ম গ্রহণ করেছে, সে ১০ বছর পেরতে না পেরতে সম্মুখীন হয়েছে বিশ্ব অর্থব্যবস্থার এক ভয়াল সংকটের (সন ২০০৮)। এই সংকটের সময় গোটা পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছিল। কোনওরকমে নানান উপায়ে পুঁজিবাদ খাদের কিনার থেকে নিজেকে টেনে তোলে। আবার জেন-জি'দের যখন ২০-২১ বছর বয়স, তারা কলেজে, তাদের সম্মুখীন হতে হয় আরও একটি সংকটের: করোনা ভাইরাস ও তদজনিত লকডাউন। এর ফলে তাদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, তাদের বাবা-মায়েদের চাকরি যায় এবং গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে গোটা পৃথিবী। আবার তারা যখন বর্তমানে চাকরির সন্ধান করছে বা পড়াশোনা, তখন দিবারাত্রি শুনতে হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে আগামী দিনে চাকরি কমবে এবং আর্থিক বৈষম্য বাড়বে। তৈরি হচ্ছে এক গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তা। এই সব কিছুর পাশাপাশি ভুলে গেলে চলবে না যে বিশ্ব উষ্ণায়নের সংকট তীব্রতর হচ্ছে এবং আজকের যুব তথা আগামী প্রজন্ম যে পৃথিবীটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে তা এক উষ্ণ পৃথিবী যেখানে দিবারাত্রি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে। 

যারা মনে করেন যে জেন-জি স্বার্থান্বেষী বা তাদের রাজনৈতিক বোধের অভাব রয়েছে তারা আসলে ধরতে পারছেন না যে এই একটি প্রজন্ম বিগত ৩০ বছরে যতরকম সংকটের সম্মুখীন হয়েছে তা এর আগে খুব কম প্রজন্ম একসাথে পেয়েছে। হ্যাঁ, ১৯১৪-১৯৪৫ সাল ছিল এক গভীর সংকটকাল যখন আর্থিক মন্দা, বিশ্বযুদ্ধ, ঠাণ্ডা লড়াই পৃথিবীকে খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল। ভুলে গেলে চলবে না, সেই সংকটের আবর্তেই জন্ম নিয়েছিল নতুন আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং ইউরোপ জুড়ে কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা। ১৯১৪-১৯৪৫ সালের পরে অন্তত ১৯৭০ সাল অবধি সমস্ত স্তরে ছিল মানুষের অগ্রগতির সময়। সেই অগ্রগতির সূত্রপাত ঘটেছিল সংকটকালের মধ্যে জন্ম নেওয়া বিবিধ আন্দোলনের মাধ্যমে। বর্তমানে জেন-জির বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ কী সেইরকমই কোনও ক্রান্তিকালের সলতে পাকাচ্ছে? এর উত্তর সময়ের গর্ভে।

এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করবেন আগামী দিনের ইতিহাসবিদ। আমরা আপাতত যেটা বুঝছি তা হল, এই যে বিবিধ রকমের সংকটের মধ্য দিয়ে জেন-জির বড় হয়ে ওঠা, তাই তাদের অস্থিরতা ও ক্ষ‌োভের যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। তাদের বাবা-মায়েদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল ১৯৭০ পরবর্তী আবর্তে, যখন দুনিয়া জুড়ে নব-উদারবাদ প্রচারিত হয়ে চলেছে, বিশ্বায়নের বিজয় পতাকা একের পর এক দেশে উড়েছে। সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে বলা হয়েছিল, ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে। উদারপন্থী পুঁজিবাদ ব্যতিরেকে অন্য সমস্ত সমাজব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটেছে, অতএব, ইতিহাসের স্রোত এখন একমুখীন—প্রগতি এবং প্রগতি, যার অপর নাম বিশ্বায়ন। ২০০৮ সালের সংকট দেখিয়ে দিল যে এই ধারণা ভ্রান্ত ছিল। পুঁজিবাদের রথের চাকা আবারও গাড্ডায় পড়ে। আমেরিকাতে সেই চাকাকে তোলার জন্য সাহায্য নিতে হয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের। ইউরোপে কিছুটা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরে ব্যাঙ্ক কর্তারা তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে একের পর এক দেশে বাজেট ঘাটতি কম করার নীতি প্রচলন করেন। ব্যয় সংকোচের নামে মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়া অর্থ ক্রমশ কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলত, সামাজিক গণতন্ত্রের যে মডেলের জন্য ইউরোপ গর্ব বোধ করত তা সংকুচিত হতে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয় কমতে থাকে। বাবা-মায়েদের বোঝানো হয়েছিল, বিশ্বায়নের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাদের প্রগতির শিখর চূড়ায়। দেখা গেল, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ব্যতিরেকে সেই শিখর অধিকাংশের কাছে অধরাই থেকে গেল। বাড়তে থাকল আর্থিক বৈষম্য, কমতে থাকল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সরকারি ব্যয়।

এ হেন পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রজন্ম বুঝতে পারল যে তাদের বাবা-মায়ের দুনিয়া যে প্রতিশ্রুতিকে সত্যি বলে ভাবতে শিখেছিল তা আসলে এক মস্ত ভুলে পরিণতি পেয়েছে। ভাবা হয়েছিল যে শিক্ষা মুক্তি না আনুক চাকরি আনবে। কিন্তু দেখা গেল যে ফ্রান্সের মতো দেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি। স্কুলে শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে, ক্লাসে ছাত্রদের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার খরচ বেড়েছে কিন্তু গুণগত মান কমেছে। অতএব, স্কুল ছাত্ররা শিক্ষার উন্নতির দাবিতে ফ্রান্সে আন্দোলন শুরু করল যা শীঘ্রই এক গণআন্দোলনের চেহারা নিল। বাড়তে থাকা মূল্যবৃদ্ধি, কমতে থাকা মজুরি, বাড়তে থাকা বেকারত্ব ও শিক্ষার মানের হ্রাসের বিরুদ্ধে লাখো লাখো মানুষ ফ্রান্সের রাস্তায় নেমে এল। তৈরি হল ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণআন্দোলন।

সার্বিয়ায় ভুচিক যে সরকার চালিয়েছেন তা ধনীদের ধনী করেছে এবং গরিবদের আরও গরিব। মিডিয়াকে সরকারের ভৃত্যে পরিণত করে লাগাতার ভুচিকের পক্ষে প্রচার চালিয়ে সরকারের সমস্ত অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে একটি ট্রেন স্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়ে ১৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়। একে কেন্দ্র করেই প্রথম আন্দোলন দানা বাঁধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। ফ্রান্সের সঙ্গে সার্বিয়ার তফাত এখানেই। ফ্রান্সে আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছে স্কুল পড়ুয়ারা, সার্বিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। ২০২৪ সাল থেকে নানান গণতান্ত্রিক ও অহিংস পদ্ধতির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে এই বছরে এসে ভুচিক সরকারের পতন হয় ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করা ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ প্রার্থীদের কাছে। এই জয় সার্বিয়া তথা ইউরোপে গণআন্দোলনের শক্তিতে নতুন প্রাণ সঞ্চয় করেছে।

এই সমস্ত আন্দোলনের ফলে এটা পরিষ্কার, যে বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে কায়েম রয়েছে তার প্রতি বর্তমান জেন-জির বিশ্বাসে প্রবল ফাটল ধরেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এই মুহূর্তে বিশ্বায়নের পতন অবশ্যম্ভাবী অথবা ফ্রান্সের মতো দেশে বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসবে। কারণ দক্ষিণপন্থী শক্তি, বিশেষ করে ইউরোপের অভিবাসন বিরোধী এবং পরিযায়ী শ্রমিক বিরোধী শক্তিরাও যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। ফ্রান্সের আন্দোলন ও হিংসার পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে প্যারিস একটি মুসলমানদের শহর হয়ে যাচ্ছে এবং অভিবাসনকে কেন্দ্র করে ইউরোপ তথা ফ্রান্সের নরম নীতি এই আন্দোলনের জন্য দায়ী। সত্য এই যে, এই আন্দোলনে অনেক বেশি সংখ্যায় সাদা চামড়ার ফরাসিদের দেখা গেছে এবং আন্দোলনের মূল দাবির সঙ্গে অভিবাসনের কোনও সম্পর্ক নেই। তবু দক্ষিণপন্থীরা এই দায় অভিবাসীদের উপর চাপাতে চাইছে। জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, ফ্রান্সের উগ্র দক্ষিণপন্থী লে-পেনের প্রতি এই আন্দোলনের পরে সমর্থন বেড়েছে। আবার বামপন্থীদের প্রতিও সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু দক্ষিণপন্থার পরাজয় এখনও হয়নি। এর জন্য এখনও অনেক পথ চলতে হবে, অনেক পরিশ্রম করতে হবে।

ফ্রান্স-আলবানিয়া-সার্বিয়ার অভিঘাত ভারতের রাজনীতিতেও এসে পড়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি তথা জেন-জির আন্দোলনের মধ্যে আরএসএস সরসঙ্ঘচালক এখন বিদেশি হাতের গন্ধ পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে মোদী সরকার শক্ত হাতে দমন না করলে দিল্লিতে নাকি প্যারিস বা মার্সেইয়ের মতো হিংসা হবে। আমরা চোখের সামনে দেখলাম, দিল্লিতে পুলিশ প্রায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করে নিরপরাধ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের জেলে ভরছে, তাদের মারা হচ্ছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের মনে রাখা দরকার, ভগৎ সিং ফাঁসিতে চড়েছিলেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে, ক্ষুদিরাম ১৮ বছরে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তৎকালীন যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। তারও পরবর্তী পর্যায়ে, জরুরি অবস্থার সময় যারা আন্দোলন করেছিলেন তারা সবাই তরুণ ছিলেন-- লালু-নীতিশ থেকে শুরু করে সীতারাম ইয়েচুরি সবাই তাদের তারুণ্যে আন্দোলনের মাধ্যমে পরাজিত করেছিলেন তৎকালীন শাসককে। আবার রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিজেপি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চালিকা শক্তিও ছিল ভারতের তরুণ সমাজই। আবার আজ বিজেপি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হচ্ছে আজকের তরুণ সমাজ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আরএসএস-বিজেপির বোঝা উচিত যে তরুণরাই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি, বৃদ্ধরা নয়।

তরুণরা আরও বেশিদিন পৃথিবীতে থাকবে। তাদের ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে তার দায়িত্ব তারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে চাইছে। কারণ, যে বৃদ্ধতন্ত্র ভারত থেকে শুরু করে আমেরিকা অবধি রাজত্ব করছে তারা হিংসা ও পরমত অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে গোটা পৃথিবীর শান্তিকে ব্যাহত করছে। যে ব্যবস্থা একদা তরুণ এবং বর্তমান বৃদ্ধরা বানিয়েছিলেন, তা আজকের তরুণদের স্বপ্নগুলিকে বাস্তবায়িত করতে অপারগ। তাই দেশে দেশে তরুণরা ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছে।


Saturday, 24 October 2026

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট: নীরব মহামারী?

কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা? 

কৌশিকী ব্যানার্জী



গত ১০ অক্টোবর ছিল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি নিঃশব্দে চলে যায়। বেশিরভাগ ভারতীয় আজও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত নন। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা আরোপিত কলঙ্ক (stigma) আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রকট। এই কলঙ্ক গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে সাংস্কৃতিক লজ্জা, পারিবারিক সম্মান নিয়ে উদ্বেগ এবং এমন কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে, যা প্রায়শই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে অতিপ্রাকৃত কারণ কিংবা কর্মফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। বিশেষত কঠোর লিঙ্গ অবস্থান, পারিবারিক চাপ ও সীমিত সামাজিক ক্ষমতায়নের কারণে ভারতীয় নারীরা এক 'দ্বৈত কলঙ্ক' জনিত সমস্যার মুখোমুখি হন। অথচ ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি। 

২০১৭ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মন্তব্য করেছিলেন, ভারত এক 'সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্য মহামারী'র মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সে বছর ভারতের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, যার মধ্যে ৪ কোটি ৫৭ লক্ষ মানুষ বিষণ্ণতাজনিত সমস্যায় এবং ৪ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। বলাই বাহুল্য, কোভিড-১৯ মহামারী এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। হু'র সাম্প্রতিক সমীক্ষায় পাওয়া গেছে, ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বোঝা হল, প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় ২,৪৪৩ জনের ‘ডিসঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ (DALYs) বা অক্ষমতাজনিত জীবনকাল; এছাড়া প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় বয়স-সামঞ্জস্যপূর্ণ (এজ-এডজাস্টেড সুইসাইড রেট) আত্মহত্যার হার ২১.১ শতাংশ। এর ফলে, ২০১২ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে দেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১.০৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গ্রামীণ এলাকা (৬.৯ শতাংশ) এবং নন-মেট্রো শহরাঞ্চলের (৪.৩ শতাংশ) তুলনায় মেট্রো শহরাঞ্চলে মানসিক অসুস্থতার হার (১৩.৫ শতাংশ) তুলনামূলক বেশি। এনসিইআরটি (NCERT)-এর ‘স্কুল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা' বিষয়ক জরিপে বলা হয়েছে যে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের হার বাড়ছে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে আরও প্রকট হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী উদ্বেগ অনুভব করে, ১৪ শতাংশ তীব্র আবেগপ্রবণতা দ্বারা আক্রান্ত এবং ৪৩ শতাংশের মধ্যে মেজাজের ঘন ঘন পরিবর্তন (মুড সুইং) পরিলক্ষিত হয়।

অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য মানব পুঁজিকে ক্ষয় করার মাধ্যমে অর্থনীতির সক্ষমতা হ্রাস করে; অথচ এই মানব পুঁজিই হল শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কোনও ব্যক্তি যখন মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান, তখন তাঁর জ্ঞানীয় সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আবেগীয় সহনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা বাজারে গভীর অদক্ষতা সৃষ্টি করে। শ্রমবাজারে এর প্রভাব পড়ে শ্রমের সরবরাহ হ্রাস এবং শ্রমের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মাধ্যমে; পাশাপাশি এটি বিভিন্ন কর্মপরিচালনগত জটিলতাও তৈরি করে, যেমন, কর্মীদের ঘন ঘন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা (লেবার টার্নওভার) বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সমন্বয়হীনতা। অধিকন্তু, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য সম্পদের সঠিক বণ্টনে বাধা দেয়। এর ফলে সীমিত অর্থনৈতিক পুঁজি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত না হয়ে স্বাস্থ্যগত সংকট মোকাবিলায় ব্যয় হয়। পরিশেষে, এটি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা হ্রাস করে এবং শ্রমশক্তির সামগ্রিক উৎপাদনশীল সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার ওপর কাঠামোগত বাধা সৃষ্টি করে। 'ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ বেসিক অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি'-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে অসুস্থতাজনিত ব্যয়ের একটি মূল্যায়নে দেখা গেছে, জনপ্রতি বার্ষিক মোট অর্থনৈতিক বোঝা গড়ে ৫৯,৯৫১ টাকা। এর মধ্যে পরোক্ষ ব্যয় (কাজের ক্ষতি, পরিচর্যাকারীর ওপর চাপ ইত্যাদি) মোট ব্যয়ের ৫৬.৩৩ শতাংশ (প্রায় ৩৩,৮০০টাকা ) জুড়ে রয়েছে।

শিশু, কিশোরদের মানসিক সমস্যার প্রভাব আরও অনেক গভীর যদি সময়মতো নিরাময় না হয়। অনেক সময় সন্তানদের অমনোযোগিতা, হাইপার-এক্টিভিটি'র মতো সমস্যাগুলিকে শিশুসুলভ আচরণ ভেবে উপেক্ষা করলে পরবর্তীকালে তা গুরুতর মানসিক ও আচরণগত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।  এই সমস্যাগুলো অর্থনীতির শ্রম সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন সক্ষমতা ও দুই প্রজন্মের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী এক অভিঘাত সৃষ্টি করে (ডুয়াল-জেনারেশন শক)। স্বল্পমেয়াদে, কোনও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের দেখাশোনা করতে গিয়ে মায়ের কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় যেহেতু মা হলেন প্রাথমিক পরিচর্যাকারী-- মায়েরা তাদের কাজের সময় কমাতে বাধ্য হন, অথবা শ্রমবাজার থেকে পুরোপুরি সরে আসেন। ভারতে মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের হার এমনিতেই  হতাশাজনকভাবে কম, তার ওপর সন্তানের মানসিক সমস্যা মায়েদের কর্মপ্রবণতার হার আরও হ্রাস করবে। অপরদিকে, জীবনের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া এই স্বাস্থ্যগত অভিঘাতগুলো শিশুর জ্ঞানীয় (cognitive) ও অ-জ্ঞানীয় (non-cognitive) দক্ষতার বিকাশকে ব্যহত করে, যার ফলে স্কুলে উপস্থিতির হার কমে যাওয়া এবং শিক্ষা জীবনে পিছিয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটে। এই শিশুরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তাদের বিকাশের এই ঘাটতি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেয়। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার হ্রাস, কাঠামোগত বেকারত্ব, দীর্ঘস্থায়ীভাবে কম মজুরি প্রাপ্তি এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে।

এমনকি ভারতে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খরচের (আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার) ওপর অত্যধিক নির্ভরতা রয়েছে, যার ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি পরিবারকে প্রতি মাসে গড়ে ২,০০০ টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়, অথচ মাথাপিছু আয়ের মধ্যক (মিডিয়ান) প্রায় ১০,০০০ টাকার আশেপাশে হওয়ায় এই ব্যয়ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে, মানসিক সমস্যার সময়মতো চিকিৎসা অনেকাংশে হয় না। 

'মেন্টাল হেলথ কেয়ার অ্যাক্ট, ২০১৭' ভারতে মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে বেশ কিছু বিধান প্রবর্তন করেছে। এই আইনটি 'মেন্টাল হেলথ কেয়ার অ্যাক্ট, ১৯৮৭'-কে বাতিল করে। নতুন আইনের আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে একটি 'অধিকার' হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ে 'মেন্টাল হেলথ অথরিটি' (SMHA) গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যাদের কাজ হবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলা। আইনটি পাস হওয়ার নয় মাসের মধ্যে রাজ্যগুলোকে একটি করে 'মেন্টাল হেলথ অথরিটি' (SMHA) গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র ১৯টি রাজ্যে এই কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে 'ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম' (NMHP) চালু করা হয়। যদিও এই কর্মসূচিটি সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর কারণে সীমিত থেকে গেছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি রাজ্য তাদের বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য আলাদা বরাদ্দ রেখেছে। ২০১৭ সালে আইনটি পাস হওয়ার পর 'ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম' (NMHP)-এর জন্য বাজেট বরাদ্দ ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৩৫ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৫০ লক্ষ হয়েছিল। তবে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এই বরাদ্দ কমিয়ে ৪০ লক্ষ করা হয় এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও তা একই পর্যায়ে রয়ে গেছে। 

এই গোটা আলোচনায় ভারতে বহু উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হল যা থেকে স্পষ্ট এই সমস্যাটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং সঠিক সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে একদিন মহামারীর রূপ ধারণ করতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আইন ২০১৭’ (MHCA) কিংবা সাম্প্রতিক ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’য় এই সংকটের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে যা অবিলম্বে দেখা প্রয়োজন। স্থবির বাজেট বরাদ্দ, রাজ্য স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিপুল ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’ (চিকিৎসার অভাব) প্রমাণ করে যে, ভারত ১.০৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এক আসন্ন অর্থনৈতিক ক্ষতিকে মোকাবিলা করতে চাইছে নামমাত্র আর্থিক ও পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং একটি উৎপাদনশীল ও সহনশীল কর্মবাহিনী গড়ে তুলতে হলে ভারতকে এখন নিছক চিকিৎসাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পথে হাঁটতে হবে। আর এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক স্তরে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে কুসংস্কারের দেওয়াল ভেঙে ফেলা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য বিশেভাবে কিছু পদক্ষেপ জরুরি। এদের মধ্যে কোনওরকম মানসিক সমস্যার লক্ষণ অনুধাবন করতে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে সাইকোলজিকাল কাউন্সিলর রাখা প্রয়োজন। গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলছুট রোধ করতে ও দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার লক্ষ্যে প্রতিকারমূলক কর্মসূচি, ব্রিজ কোর্স-এর মতো বিকল্প ব্যবস্থা দরকার। 

সর্বোপরি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত স্তরেও সংবেদনশীল হতে হবে; চারপাশের মানুষ কিংবা শিশুদের আচরণগত পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সঠিক সময়ে চিকিৎসার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পারস্পরিক সহমর্মিতা আর সচেতনতাই পারে আসন্ন এই নীরব মহামারী রুখে দিয়ে একটি সুস্থ, সুন্দর ও উৎপাদনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।


Monday, 5 October 2026

মনোযোগ অর্থনীতির ফাঁদ

আত্মধ্বংসের কারণ

রাজীব ভট্টাচার্য


 

আজকের উচ্চ প্রযুক্তির এই পৃথিবীতে ভোগবাদ এবং দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলার পথে 'মানুষের মনোযোগ'কে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানকারী ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির কাছে এই মনোযোগকে দখল করা, বিশ্লেষণ করা ও মুনাফার মাধ্যমে ব্যবসা করাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় বেরলে বা বাসে ট্রামে চড়লেই বোধকরি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন যার হাতে বা পকেটে মোবাইল নামক যন্ত্রটি নেই। তার সঙ্গে হয়তো দু' কানে লাগানো রয়েছে দুটি হেডফোন যাতে রাস্তায় চলতে চলতে অথবা বাস বা ট্রামের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলোর দিকে চোখ গেলেও আসল আকর্ষণ কিন্তু থেকে যায় মোবাইল ফোনে, যেখানে ভেসে ওঠা বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ছবি, বিজ্ঞাপন ও তথ্য গভীরভাবে মনোযোগকে বন্দী করে রাখে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ছাত্রদের মনোযোগের সিংহভাগ কেড়ে নিয়েছে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ। পড়তে পড়তে বেশিরভাগ সময়ই মন চলে যায় হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক কিংবা ইউটিউব'এর বিভিন্ন ছবি, রিল ও ভিডিও'র দিকে। বই খোলা রেখেই বন্ধুকে ইনস্টাগ্রাম বা মেসেঞ্জারে দ্রুত উত্তর পাঠানো ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক চলে আসা ছবি, ভিডিও ও নানাবিধ বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে দ্রুত এক পলকে পেরিয়ে যাওয়া, ছাত্রদের প্রতিনিয়ত সাধারণ অভ্যাসে পরিণতি পেয়েছে। তাই 'মনোযোগ অর্থনীতি' (Attention Economy) হল এমন একটি আধুনিকতম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে বিজ্ঞাপন চালিত সংস্থাগুলি মানুষের সীমিত, দুর্লভ ও মূল্যবান মনোযোগকে তাদের পণ্যের দিকে সর্বাধিক সময় ও মনোযোগ আকর্ষণে আগ্রহী। 

মানুষের মনোযোগ বা একাগ্রতা একটি সীমিত সম্পদ যা এই প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলি অ্যালগরিদম'এর মাধ্যমে নিষ্কাশন করে, প্যাকেজিং বা রূপদান করে তাকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনও উপায়ে বিক্রি মারফত অর্থ ও মুনাফা উপার্জন করে। অর্থাৎ, এই ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে মানুষের মনোযোগ ও তার পণ্যকরণ বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির মুখ্য বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে লেনদেনের একটি বিরাট বাজার উন্মোচিত হয়েছে। এই ধরনের বাজার অর্থনীতিতে মানুষের মনোযোগ হল লেনদেনের মুদ্রা এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি দালাল বা ব্রোকারের ভূমিকা পালন করে। এখানকার মূল কৌশলটি হল, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের মঞ্চগুলি বিনামূল্যে পরিষেবা দান করে কিন্তু তারা রাজস্ব উৎপাদন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য যুক্ত ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বিক্রয়ের মাধ্যমে, যেগুলি বিজ্ঞাপন সংস্থার দ্বারা পরিচালিত। তাই প্রায়ই দেখা যায় যে, ইউটিউবে কোনও গান বা তথ্যচিত্র দেখার সময় প্রায়ই বিজ্ঞাপনগুলি আমাদের মনঃসংযোগকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। গুগল বা মেটার মতো বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল সৃষ্টি করেছে মানুষের মনোযোগকে আটক বা বন্দী করা ও ব্যবহারকারীর মনোযোগকে অর্থে রূপান্তরিত করার জন্য।

এই মনোযোগ অর্থনীতির জনক হিসেবে যার নামটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেন অধ্যাপক হারবার্ট আলেকজান্ডার সাইমন। ১৯৭১ সালে নোবেল সম্মানে ভূষিত আমেরিকার এই গবেষকের গবেষণার মূল বিষয় ছিল কম্পিউটার বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও জ্ঞানীয় দর্শন। তিনি বিখ্যাত হন তাঁর 'সীমাবদ্ধ যৌক্তিকতা' বা 'বাউন্ডেড র‍্যাশনালিটি' নামক কাজের জন্য। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখা বিখ্যাত 'ডিজাইনিং অর্গানাইজেশন ফর ইনফরমেশন রিচ ওয়ার্ল্ড' নিবন্ধে তিনি প্রথম এই মনোযোগ অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেন। ওনার মূল বিষয়বস্তুটি তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: 

১) তথ্যের অতিরিক্ততা ও মনোযোগের সীমাবদ্ধতা;

২) মনোযোগের সর্বোত্তম বন্টন বা ব্যবহার এবং 

৩) মূল্যবান মূল্য সৃষ্টি। 

অর্থনীতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন তত্ত্বের সঙ্গে মনোযোগ অর্থনীতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। যেমন, অর্থনীতি চর্চার মূল বিষয় হল সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও তার সাথে বেড়ে চলা মানুষের অসীম চাহিদা। মনোযোগ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের মনোযোগ সীমিত কিন্তু তাকে আকর্ষণ করার তথ্যের ভান্ডারটি অসীম। শুধু তাই নয়, অর্থের মতোই মনোযোগ একটি দুর্মূল্য সম্পদ, যা একবার খরচা করলে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। মনোযোগের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ-ব্যয়ের তত্ত্ব রয়েছে যা বলে, যে কোনও একটি বিষয়ের উপর যখন মনোযোগ দেওয়া হয় তখন তা অন্য বিষয়কে বঞ্চিত করে।

এই মনোযোগ অর্থনীতির সাথে নিবিড় ভাবে যুক্ত আচরণগত অর্থনীতি যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও আবেগপ্রবণ বিষয়গুলি নিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলিকে প্রভাবিত করার কথা বলে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই মঞ্চগুলি কোনও পক্ষপাত মুক্ত স্থান নয় বরং এগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত মতাদর্শ, রাজনীতি, ক্ষমতা, সামাজিক বিভাজন বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা। গুগল বা ইউটিউব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সমস্ত মাধ্যমগুলি ব্যক্তিগত সুপারিশ, পরামর্শ বা পছন্দ অনুযায়ী বিষয়গুলিকে উপস্থাপিত করে যার মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই আমাদের মনোযোগকে বেশি সময়ের জন্য আটকে রাখা। ইদানীং জনপ্রিয় একটি শব্দ 'ফোমো'এর (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) ফলশ্রুতি হল, মানুষ ঘনঘন তার হাতে থাকা মোবাইলে সমাজ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের উপর নজর রাখবে যাতে কোনও বিষয় তার হাতছাড়া না হয়। তবে এই 'ফোমো' এখন রূপান্তরিত হয়েছে 'জোমো'তে যার অর্থ 'জয় অফ মিসিং আউট'-- বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দিনের মধ্যে পাঁচ থেকে আট ঘন্টা এই ধরনের সমাজ মাধ্যমের মঞ্চ ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত সামাজিক সংযোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে। তাই আজ বর্তমান প্রজন্মের একাকীত্ব প্রযুক্তিগত জীবনের আকস্মিক উপজাত নয়, বরং তা মনোযোগ অর্থনীতিরই পরিকল্পিত পরিণতি। ভারতবর্ষে ২০২৪ সালের শিক্ষার বার্ষিক অবস্থা রিপোর্ট (এসইআর) অনুযায়ী, ১৪ থেকে ১৬ বছরের ভারতীয় শিশুদের ৮২.২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করে; তার মধ্যে ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করে শিক্ষাক্ষেত্রে কিন্তু ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের জন্য। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের দোষ দিলে বিষয়টির গভীরতা একটু হালকা করে দেখা হবে। কারণ, এই ধরনের সমাজ মাধ্যমে মানুষের মনোযোগকে আটকে রাখার জন্য এই মঞ্চগুলি আমাদের সামনে উপস্থাপিত করছে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রকৌশল দল যাদের উচ্চ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই ধরনের মনোযোগ আকর্ষণ করার নকশা তৈরির কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।

এটি বর্তমান প্রজন্মের বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া বা লেখা অথবা কোনও জটিল প্রশ্নের সমাধান মাথা খাটিয়ে বের করা-- এসবের বদলে অনেক সহজ হয়ে গেছে গুগল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তার সমাধান করা। তাই মনোযোগের সংক্ষিপ্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। পড়াশোনা ও সমাজ মাধ্যম-- এই দুটির মধ্যে ঘন ঘন আসা যাওয়ার ফলে স্মৃতিশক্তি ও সূক্ষ্মচিন্তন হ্রাস পেয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে এই ধরনের সামাজিক মাধ্যমের প্রতি আসক্তির কারণেই। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিভিন্ন রকমের ভুল তথ্য ও তার মাধ্যমে আর্থিক লাভ ও বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে প্রতারিত করার পথ। দৃষ্টিশক্তির সমস্যার সাথে সাথে বেড়েছে নানারকম মানসিক সমস্যা। অতিরিক্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উচ্চমাত্রায় দুশ্চিন্তা ঘুমের ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের এবং সাধারণ মানুষের কর্মজীবনের কর্মক্ষমতা ও উৎকর্ষতা দুইই হ্রাস পেয়েছে। তাই এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। 

মনোযোগ একটি মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য সম্পদ। অতএব, তার সঠিক সংরক্ষণ ও প্রয়োগ ভীষণভাবে জরুরি। এ ক্ষেত্রে কতকগুলি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলে মনোযোগ অর্থনীতির সমস্যাগুলি কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। প্রথমত, একই সঙ্গে বহু রকমের কাজে মনোনিবেশ না করে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাজে সুনির্দিষ্ট সময় মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কাজের সময় এই সামাজিক মাধ্যম বা মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ রাখা অথবা দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময় এই জন্য বেঁধে নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, গভীরভাবে কাজে মনোনিবেশের জন্য মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়ার যে পদ্ধতি তা অবলম্বন করলে অনেক সময় তার সুফল পাওয়া যায়। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর জন্য নানা ভাবে শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নিয়ম-কানুনের পরিবর্তন প্রয়োজন। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম এবং মানসিক সচেতনতা বৃদ্ধি অনেক সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সঠিক কাজে লাগিয়ে কর্মজীবনের উন্নতি করার ক্ষেত্রে এই ধরনের মনোযোগ অর্থনীতি যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা সম্বন্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের বেশি করে অবহিত করা এবং সরকারের মাধ্যমে বিভিন্ন রকম নিয়মকানুন নির্ধারণ করা বিশেষ প্রয়োজন।


Friday, 2 October 2026

রাস্তাই একমাত্র রাস্তা

ভরসা আরশোলারাই  

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



ধর্মেন্দ্রর ক্ষেত্রে পেরেছে, জ্ঞানেশে কি পারবে? এই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে জাগ্রত নাগরিক চেতনার মাথায় এই প্রশ্নটাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরশোলাদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামে হেলেনি নির্বাচন কমিশন বা মোদী সরকার। এবার পথে নামল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। জ্ঞানেশ কুমারকে হটাবার সংকল্পে ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বই থেকে পথে নেমেছেন অভিজিৎ দীপকে'রা। ককরোচদের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সবচেয় বড় দেশদ্রোহী। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক। দেশের ১৪০ কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

অন্যদিকে, বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গত বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে বসেছিল কংগ্রেস, তৃণমূল (মমতা তৃণমূল), সিপিআই (এম)-সহ ১৯টি দল। বৈঠক শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুমকি দেন, জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দিলে বিক্ষোভ তীব্র হবে। আগামী ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন দফতরে অভিযানও করবে ইন্ডিয়া' জোট। অক্টোবর ও নভেম্বরে দেশে পাঁচটি সভা করবে বিরোধী জোট। বৈঠক শেষে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জানান, বৈঠকে অনেক পরামর্শ রাহুল গান্ধী দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। 

প্রথম কর্মসূচি: আগামী ২ অক্টোবর দেশের প্রতিটি জেলায় 'গণতন্ত্র বাঁচাও' ব্যানারে যৌথ মিছিল। এই কর্মসূচি চলবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত। জেলাশাসকের দফতরে বিক্ষোভ জানানো হবে। 

দ্বিতীয় কর্মসূচি: ৬ অক্টোবর লোকসভা ও রাজ্যসভার সব বিরোধী সাংসদদের নির্বাচন কমিশন দফতরে অভিযান।

তৃতীয় কর্মসূচি: সংসদে বিরোধী দলগুলির নেতারা একযোগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে নিজেদের দাবি পেশ করবেন। 

চতুর্থ কর্মসূচি: দেশের পাঁচটি বড় শহরে ভোট চুরি ইস্যুতে বড় জনসভা হবে। 

পঞ্চম কর্মসূচি: নভেম্বরের শুরুতে দিল্লিতে মেগা জনসভা। তাতে একসঙ্গে অংশ নেবেন রাহুল গান্ধী-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। 

যষ্ঠ কর্মসূচি: আমজনতার কাছে গিয়ে মানুষকে বোঝানো।

ভোট চুরির প্রতিবাদে ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে সুর আরও চড়িয়েছে বিরোধী জোট 'ইন্ডিয়া'। যৌথ প্রেস মিটে মমতা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দেশের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে নিশানা করেন। নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ ও প্রযুক্তিগত কারচুপির ব্যাপারে বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন মমতা। তিনি সীমা খান্না নামে এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন, 'কেন ইভিএম মেশিন জ্বালানো হল। ওই সীমা খান্না কে? সফটওয়্যার কোথা থেকে নিয়ে এল?' মমতার দাবি, একটি বিশেষ সফটওয়্যার বানিয়ে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ডেডলক বা পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শুধু বাংলাতেই প্রায় ৯২ লাখ ভোট বা নাম লুঠ করা হয়েছে আর সারা ভারতে এই লুঠের পরিমাণ ১৩ কোটির বেশি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের পদে জ্ঞানেশ কুমারের এক মুহূর্তও থাকার অধিকার নেই বলে তোপ দাগেন তিনি। মমতার হুঙ্কার, 'জ্ঞানেশ কুমার যদি না সরেন, তবে এই আন্দোলন বহু দূর পর্যন্ত যাবে। মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত, চাঁদ-সূর্য পর্যন্ত যাবে। এটা আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে।'

লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, 'যাঁরা ভারতের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, তাঁদের শাস্তির বিষয়টি আমরা সুনিশ্চিত করবই। তাঁরা কত বড় পদে রয়েছেন সেটা মুখ্য বিষয় নয়। কোনও একজন ব্যক্তির চেয়ে দেশের গণতন্ত্র অনেক বড়।' রাহুল গান্ধী আর মমতা যে বারবার ভোট চুরির কথা বলেছিলেন, এখন তা সবাই স্বীকার করছেন।

তবে বিরোধীরা যতই আস্ফালন করুক, সাধারণ মানুষের এখনও তাদের ওপর তেমন ভরসা নেই। অধিকাংশ মানুষের ধারণা, ভারতের বিরোধীরা অকম্মার ঢেঁকি। এদের দিয়ে কিছু হবে না। এরা পরস্পরে কাজিয়া করে-- এ আধ ছটাক ফ্যাসিবাদ বিরোধী, ও এক ছটাক স্বৈরাচার বিরোধী, ওই দল তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে সেটিং করে চলে, এইসব। বামেরা নিজেরা নন-প্রোডাক্টিভ হয়েও গুমরে বাঁচে না। ফলে, এরা কোথাও শক্তপোক্ত জোট বাঁধতে পারছে না। ভোট লুঠের মতো এত মারাত্মক ফ্যাসিস্ট একটা কার্যকলাপের বিরুদ্ধেও বড়সড় আন্দোলন এখনও সংঘটিত করা গেল না। ভারতবর্ষের বিরোধীদের এই ব্যর্থতার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে। লেখা থাকবে কীভাবে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য এরা জোটবদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। 

তাই সাধারণের বিশ্বাস, কিছু যদি পারে তবে এই আরশোলারাই করে দেখাতে পারবে। মনে রাখতে হবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই যে সংঘবদ্ধ হচ্ছে, আরশোলারাই সেই সুযোগটা তৈরি করেছে এবং করছে। অথচ এই সিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে নামতে পারছেন না রাহুল-বেবি-মমতা-দীপঙ্কররা। এখানেই এঁদের দুর্বলতা আর এখানেই মোদী-শাহর শক্তি। তবু মন্দের ভাল, পালে হাওয়া নেই বলে মমতা বলেছেন, রাহুলের প্রধানমন্ত্রিত্ব মানতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে সবই কাঁচা অবস্থায়, ফল পাকলে যে কী হবে, তা নিয়ে কোনও ভবিষ্যৎ মন্তব্য না করাই শ্রেয়। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দেশের মঙ্গল চাইলে, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ভারতের গণতন্ত্রপ্রিয় রাজনৈতিক নেতারা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, আজ রাহুল-বেবি-মমতা-স্ট্যালিন-অখিলেশ-উদ্ধব-ওমর-দীপঙ্করদের সেই ভূমিকা নিতে হবে। প্রধান সহযোগী করতে হবে ককরোচদের। কেননা, ওরা স্থিতাবস্থা ভাঙার বিরুদ্ধে একটা নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে। সেটা বুঝতে হবে। আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষার খোঁজে মাঠে নামতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ এক মানবিক শিল্পকলা। ইতিহাস জোরালোভাবেই তা প্রমাণ করে থাকে। তাই প্রতিবাদের ভাষাও শিল্পের সুরকে বহন করে চলে। মানবিক ক্ষোভ, হতাশা, অভিমান, রাগ বঞ্চিত বা প্রবঞ্চিত হৃদয়ের ভাষা কোনওভাবেই 'পাতাল অন্ধকার' ম্যানহোলের ঢাকনা নয়, যা খুললে শুধু দুর্গন্ধই ছড়ায়। শিল্পকলা প্রতিবাদের ভাষা চর্চা করে, তাই প্রতিবাদী মানুষ শিল্পের আশ্রয়ে যায়। যে শিল্প বোঝে না, সে জীবন চেনে না, মানবিকতার ছোঁয়া সে পায় না, সে প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। কারণ, পরিবর্তনের অসীম আহ্বান তার কাছে পৌঁছয় না।

এই আবহে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিবাদের নানা ধরন। তার সবটাই গ্রহণযোগ্য না হলেও, কোথাও অর্বাচীনের ভাষা হলেও তার অনিবার্যতা অস্বীকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ভারতের সংবিধানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে যেভাবে ইমপিচমেন্ট'এর মাধ্যমে সরানো হয়, একমাত্র সেই একই পদ্ধতিতে সংসদের দুই কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাশ করিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারেন। কোনও রাজনৈতিক দল আলটিমেটাম বা আন্দোলন দিয়ে সরাসরি তাঁকে পদচ্যুত করতে পারে না। সেটা এখন হওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এই অবস্থায় একটা পথের কথা কিন্তু বলে ফেলেছেন সিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। যা দেশের সব বিরোধী দলের কাছেই একটা চ্যালেঞ্জ। দীপকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ভোট চুরির অভিযোগ এনেও বিরোধী দলগুলো কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে? তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ভোট চুরি ও জালিয়াতির অভিযোগ তোলা আর ভোটে অংশ নেওয়া পরস্পর বিরোধী আচরণ। তিনি মনে করেন, বিরোধীদের এই দ্বিচারিতার ফলে কারচুপির নির্বাচন রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। দেশের ভোট প্রক্রিয়া যে অবাধ ও নিরপেক্ষ, সেই ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে গেঁথে যাচ্ছে। দীপকে'র ভাষায়, ‘আপনি বারবার বলবেন খেলায় চুরি হচ্ছে, ম্যাচ ফিক্সড; অথচ সেই খেলায় অংশও নেবেন, এটা হয় না। এতে কারচুপির নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়। একে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা বলে না। এই ব্যবস্থা আপনাদের দুর্বল করছে। যখন–তখন দল ভেঙে দিচ্ছে।’

দেশের চলমান নির্বাচন প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দীপকে একটা ‘ফিক্সড’ ক্রিকেট ম্যাচের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিক্সড ম্যাচকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানো হয়। দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ক্যাচ ফসকানো হয়। শেষ ওভার পর্যন্ত খেলাটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার নাটক করা হয়। জালিয়াতির নির্বাচনকেও তেমন বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিরোধীদের কোথাও কোথাও জেতানো হয়। মেকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আসল ও নিরপেক্ষ দেখানোর চেষ্টা চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে তেমনই হচ্ছে। সিজেপি নেতা বিরোধীদের পরোক্ষে ভোট বয়কটের পরামর্শ দিয়েছেন। বিরোধীদের প্রতি তাঁর প্রশ্ন, যখন ভোট চুরি হচ্ছে, সাংসদ-বিধায়কদের ভাঙিয়ে নেওয়া হচ্ছে, দল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, তখন কোন ধরনের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন? এভাবে কত দিন টিকে থাকা সম্ভব? বিরোধী অনৈক্যের প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করেছেন। দীপকে বলেছেন, ‘কেবল আপনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে সরব হবেন আর অন্যত্র নীরব থাকবেন, এমন হতে পারে না। ভোটে কারচুপি হলে তা যে কোনও রাজ্যে হতে পারে।’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীরা খড়্গহস্ত হলেও শাসক দল বিজেপি শুরু থেকেই কমিশনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির বিভিন্ন নেতা কমিশনের হয়ে টানা সাফাই গাইছেন। শুভেন্দু অধিকারীর মতো লোকেরা হাত ধুয়ে নেমে পড়েছেন জ্ঞানেশ কুমারদের বাঁচাতে। এই পরিস্থিতিতে একটু হলেও বেসুরো শুনিয়েছে বিহারে বিজেপির শরিক লোকজনশক্তি পার্টির নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ানের বক্তব্য।গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম সম্পর্কে দেশের মানুষের মনে যাতে বিরূপ ধারণা, সংশয় বা সন্দেহের সৃষ্টি না হয়, তা দেখার ও নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই। 

আমরা যদি ধরে নিই, ককরোচদের আন্দোলন 'যন্তর মন্তর ২.০' হয়ে উঠবে, তবে মোদী-শাহ নিজেরাই জ্ঞানেশকে ধর্মেন্দ্রর মতো বলি দিতে এগিয়ে আসবেন। তাতে কী আদৌ কোনও সুরাহা হবে? না। কেননা, তখন এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মোদী-শাহরা তাঁদের আরেক পোষ্য কোনও রূপেশ বা ধনেশকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করে বসাবেন। তিনিও ওঁদের মনের মতো করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিজয়কে সুগম করবেন। জ্ঞানেশ কুমারের মাধ্যমে এসআইআর প্রক্রিয়ায় রক্তপাতহীন গণহত্যা চালিয়ে যেভাবে অসংখ্য মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে 'জীবিত-মৃত' এক অদ্ভুত জীব সৃষ্টি করে ফ্যাসিবাদের রাস্তা চূড়ান্ত করা হয়েছে, ওঁদের 'নবনিযুক্ত' মুখ্য নির্বাচন কমিশনারও তাই করবেন। অতএব, এই অবস্থায় চাই এমন একটি আন্দোলন যাতে চলমান ব্যবস্থাটাই অচল হয়ে যায়। 

গান্ধী জয়ন্তীর দিন সেই আন্দোলনের নান্দীমুখ, এবার তা টেনে নিয়ে যেতে হবে চূড়ান্ত পর্যায়ে। 

কেউ কেউ মনে করছেন, আদালতে গেলে সুরাহা পাওয়া যাবে। আমার মনে হয় ঘেঁচু পাওয়া যাবে। কেননা, কোনও স্তরের আদালতই নিপাট নিরপেক্ষ মেকানিকাল ফাংশনাল বডি নয়, ওগুলো চলে বিচারপতির মাথা দিয়ে। কোন বিচারপতি তাঁরা? যাঁদের সম্পর্কে কয়েকদিন আগেই প্রবীণ আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভে প্রকাশ্যে বলেছেন, 'সুপ্রিম কোর্টে প্রচুর দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারপতি আছেন যাঁরা ন্যায়বিচারের ক্ষতি করেছেন।' Live Law.in লিখেছে, দুষ্মন্ত দাভে বলেছেন, 'There've been so many corrupt judges in Supreme Court who've damaged justice.'। আমাদের অভিজ্ঞতাও তাই বলে না কি? 

সিজেপির সৌরভ দাস এক সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, 'মুখ্য  নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এখন হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন দাখিল করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শেষবার যখন নাগরিকরা বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তখন কী ঘটেছিল। নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে সুপ্রিম কোর্টই নিশ্চিত করেছিল যে বাংলায় এসআইআর যেভাবেই হোক করা হবে। যখন গণহারে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পরিণতি উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এক অসাধারণ মন্তব্য করেছিলেন যে, যারা ‘এবার’ ভোট দিতে পারেননি, তারা ‘পরেরবার’ ভোট দিতে পারবেন! তাঁকে কে বলবে যে, একটি সম্ভাব্য চুরি হওয়া নির্বাচনের জন্য কোনও ‘পরেরবার’ নেই? সুতরাং, যেহেতু আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে এই নতুন আবেদনগুলো তারা যতবার খুশি শুনুক। তারা যা খুশি আদেশ দিক। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহিতার জন্য আমাদের গণতান্ত্রিক দাবি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ চূড়ান্ত ভাবে, ভারতীয় গণতন্ত্রের মালিক কোনও নির্বাচন কমিশনার বা বিচারপতি নন। এর মালিক আমরা, জনগণ।' 

এখানেই আমার মনে হয়েছে, মাসতুতো ভাইদের কাছে কমিশনের বিচার চেয়ে লাভ হবে না। কেননা, এদের মদতেই জ্ঞানেশের এত বাড়বাড়ন্ত। এরাই বঞ্চিত ভোটারদের সম্পর্কে মন্তব্য করে, 'উপনির্বাচন তো'! তাই এই আদালতের দিকে তীর্থের কাকের মতো না-চেয়ে রাস্তায় থেকেই এই নির্বাচন কমিশনের গণতন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপের জবাব দিতে হবে। সেই পথচলা শুরু হয়েছে, ঠিক মতো চলতে পারলে, ককরোচ আর টিম ইন্ডিয়া যদি রাস্তার দখল না ছাড়ে, যদি রাস্তা কামড়ে পড়ে থাকে, তবে মোদী-জ্ঞানেশ-শাহ চক্রের অনিবার্য পতন নিশ্চিত। আর তা হলে আমাদের  আদালতের গণ্ডারদেরও চামড়া ভেদ করা যাবে।


Thursday, 24 September 2026

ন্যায় ও অধিকারের মহাযুদ্ধ

এসআইআর কি ইতিহাস হতে চলেছে?

সোমনাথ গুহ



এসআইআর নিয়ে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর তদন্তমূলক প্রতিবেদন দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ ভয়াবহ, অভুতপূর্ব, আপামর মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দুজন নির্বাচন কমিশনার (সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি) নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট ও চিঠিতে যা লিখেছেন (তদন্তমূলক সাংবাদিকতার দৌলতে এখন জনপরিসরে) তা থেকে বোঝা গেছে, শুধুমাত্র ভোট চুরি হয়নি, মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সক্রিয় সহায়তায় বিজেপি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাটাকেই অপহরণ করে নিয়েছে। 

উক্ত সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে গরমিলগুলি তুলে ধরা হয়েছে:

প্রথমত, নতুন নাম যুক্ত করা ও বাদ দেওয়ার ব্যাপারে দুই কমিশনারকে জ্ঞানেশ কুমার অন্ধকারে রেখেছেন। 

দ্বিতীয়ত, ওই দুই কমিশনার নতুন ভোটারদের বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপকে নোট দিয়ে অবৈধ ও অননুমোদিত বলে অভিহিত করেছেন। 

তৃতীয়ত, দুই কমিশনার রাজ্যের পরিবর্তে দিল্লিতে ভোটারের ডেটাবেস (ইসিআইনেট) কেন্দ্রীয়করণের বিরোধিতা করেছেন। এর বিরুদ্ধে তাঁরা এমনকি ক্যাবিনেট সচিবের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত করেছেন। 

চতূর্থত, এটা নির্বাচন কমিশনের ভিতরে নজিরবিহীন ভাঙনকে চিহ্নিত করছে। অতীতেও কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে যা আদালত অবধি গড়িয়েছে, কিন্তু এত মতভিন্নতা আগে দেখা যায়নি, যেখানে ১০ মাসে উক্ত দুই কমিশনার ১৪ বার নানা বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন, এমনকি এক দিনে চারবার মতপার্থক্যও ঘটেছে।    

এর থেকে আমরা পাঁচটা মূল সিদ্ধান্তে আসতে পারি যা বিভিন্ন রাজ্যে ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে এবং ১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। ওই দুই কমিশনার বারবার বলেছেন যে কমিশন বেআইনি কাজ করছে। প্রথমত, একটি কেন্দ্রে নির্বাচনী তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন করার মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার-এর (ইআরও), যিনি সমস্ত তথ্য ইআরওনেট-এ আপলোড করেন। আইনত তিনিই হচ্ছেন ‘স্ট্যাচুটরি অথরিটি’। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে তা ডিইও (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট), জেলার নির্বাচনের আধিকারিকের কাছে যাবে, সেখানেও ফয়সালা না হলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে যাবে। কিন্তু দেখা গেছে, তালিকা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি দিল্লিতে কমিশনের আইটি ডিভিশন তাদের সফটওয়্যারের মাধ্যমে (ইসিআইনেট) পুরো কুক্ষিগত করে নিয়েছে। ইআরও-রা ইসিআইনেটে ঢুকতেই পারেননি, সেটা পুরো দিল্লি নিয়ন্ত্রণ করেছে। কার নাম ঢুকবে, কার নাম বাদ যাবে তা দিল্লি থেকে ঠিক হচ্ছিল। এই ক্ষেত্রে গোয়ার ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে আধিকারিকরা দেখেন ৯৭ জনের নাম ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। তাঁরা নিজেরা বারবার নেটে ঢুকে সংশোধন করার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হওয়ার কারণে নামগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দিল্লিতে বারবার আবেদন করেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নতুন ভোটার তালিকা এই নামগুলি ছাড়াই প্রকাশিত হয়ে যায়। ইসিআইনেট অ্যাক্সেস না করতে পারার জন্য পশ্চিমবাংলার কয়েকজন ইআরও বারবার অভিযোগও করেছেন। 

দ্বিতীয় বিতর্ক ফর্ম ৬ নিয়ে, নতুন ভোটার হতে চাইলে যে ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হয়। এখানে একটি শর্ত যোগ করা হয়-- জিজ্ঞাসা করা হয় নিজের বা মা-বাবা'র নাম পূর্ববর্তী তালিকায় উল্লিখিত ছিল কিনা। এই শর্তটি গত বছরের জুলাই মাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উভয় কমিশনার এর বিরোধিতা করেন, কারণ, নির্বাচন কমিশনের ফর্ম ৬ পাল্টানোর কোনও এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনারদের নেই। এটা সম্পুর্ণ বেআইনি, ফর্ম ৬ পরিবর্তন করার ক্ষমতা একমাত্র সংসদের রয়েছে।

তৃতীয় প্রশ্ন মূলত বাংলা সংক্রান্ত। প্রথম দফায় এখানে ৫৮ লাখ মানুষের নাম বাদ যায়। এতে বিজেপি নির্বাচনে বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়ার কারণে কমিশন ‘লজিকাল ডিস্ক্রেপেন্সি’ অর্থাৎ যুক্তিগত অসঙ্গতি নামে এক অক্সিমরন উদ্ভাবন করে যার ফলে প্রথমে প্রায় দেড় কোটি লোকের নাম বাদ চলে যায়, যা পুনরায় সংশোধন করে দাঁড়ায় ৬০ লাখ। রাজ্য সরকার আদালতে যায়, আদালত বিচারব্যবস্থার অধীন কিছু আধিকারিককে এই তালিকা ঝাড়পোছ করার দায়িত্ব দেয়। ৬০ লাখের মধ্যে ৩৩ লাখ তালিকাভুক্ত হয়, বাকি ২৭ লাখকে ট্রাইবুন্যালে আপিল করতে বলা হয়। এবার মজাটা হচ্ছে, যে ৩৩ লাখের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ইলেকশন কমিশন নিজে তার থেকে ১৬ লাখ বাদ দেওয়ার আবেদন করে। দেখা যায়, এঁদের অধিকাংশই মুসলিম। উক্ত দুই কমিশনার নোটে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কমিশন তো ১৬ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার জন্য কোনও আবেদন করেনি! তাহলে এটা কে করেছে? আরও আশ্চর্য হচ্ছে, এই ঘটনা সম্পর্কে বাংলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নিজেই অবহিত নন। 

চতুর্থত, নির্বাচন প্রক্রিয়া যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁদের স্তর-বিন্যাস কতকটা এইরকম-- সবার ওপরে তিন কমিশনার, তাঁদের নিচে ডেপুটি কমিশনার এবং তারপরে ডিজি (আইটি)। ডিজি দিল্লিতে বসে ইসিআইনেট পুরো নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রাজ্যের তালিকায় নিজের মতো করে নাম যোগ ও বাদ দেন। সান্ধু এবং জোশি এই বেআইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করেন, তাঁরা ডিজি-কে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আবেদন করেন। এই মর্মে দুজন ডেপুটি কমিশনার ক্যাবিনেট সেক্রেটারির দ্বারস্থ হন। কিন্তু ফল হয় উল্টো। ডিজি (আইটি)-কে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং দুই ডেপুটি কমিশনারকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়।

পঞ্চমত, তিন কমিশনারের মধ্যে কদাচিৎ একসাথে মিটিং হত, হলেও তার কোনও অ্যাজেন্ডা বা কোনও মিনিটসও থাকত না। 

নির্বাচনী কমিশনারদের মধ্যে এই তীব্র মতভেদ ও মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত ও অবৈধ কার্যকলাপের খবরগুলি নির্বাচনী কমিশনের অন্দর থেকে নথি সহ উদ্ধার করে ফাঁস করেছেন 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকার সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া। আজকের সময়ে দাঁঁড়িয়ে এই সাহসী প্রতিবেদনের জন্য তিনি সাংবাদিকতার জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

এ ক্ষেত্রে ২০২০ সালে তৎকালীন অন্যতম নির্বাচনী কমিশনার অশোক লাভাসার পদত্যাগ স্মরণ করা যেতে পারে। ২০১৯'এর লোকসভা নির্বাচন চলাকালীন তিনি মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করার জন্য ভিন্ন মত নথিভুক্ত করেছিলেন। অভিযোগ, এরপরে ইডি ও সিবিআই চাপ সৃষ্টি করায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে যে সান্ধু ও জোশি’র ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে তাঁরা প্রেস কনফারেন্স করে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেন। আপাতত কমিশন পত্রিকার প্রতিবেদন পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। তাদের এক ডেপুটি সেক্রেটারি প্রেস নোট দিয়ে জানিয়েছেন, নানা মতবিরোধ হয়েই থাকে কিন্তু যা প্রকাশ করা হয়েছে তা পুরো ঘটনার আংশিক রূপ মাত্র। 

বলাই বাহুল্য, এসআইআর প্রকল্পটাই অসাংবিধানিক। কী প্রক্রিয়ায় এটা গঠন হল, প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত হল, তা কারও জানা নেই। যোগেন্দ্র যাদব বারবার জিজ্ঞাসা করে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছেন। ২০২৩'এর অগস্ট মাসে এই কুকীর্তির সূত্রপাত, যখন কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিল নিয়ে আসে যার ফলে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার (সিইসি) নিয়োগ করার কমিটিতে পরিবর্তন করা হয়: কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে স্থান দেওয়া হয়। এরপরেই নির্বাচনী ব্যবস্থা শাসক দলের কুক্ষিগত হয়ে যায়। 

এসআইআর নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দোলাচলে ভুগেছে। মমতা এর বিরোধিতা করলেও ভেবেছেন এটা ম্যানেজ করে নেবেন। সিপিএম ভেবেছে মমতা প্রচুর ভুয়ো নাম ঢুকিয়েছে সেগুলো বাদ যাবে, তাতে ভালোই হবে, অবশেষে 'পিসি-ভাইপো'র হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। যখন দেখেছে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, প্রতিবাদ করছে তখন তারা এর বিরোধিতা শুরু করে। কেরালায় দুটি বিরোধী জোট ভেবেছে এটা তাদের পক্ষেই যাবে, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-ও তাই। এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও ১০০ জন সাংসদ জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের জন্য সংসদে স্পিকারের কাছে আবেদন করেছেন। মনে হয়, জঞ্জালের ঝুড়িতে সেটার স্থান হয়েছে। 

ইতিমধ্যে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের ওপর বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন। জ্ঞানেশের পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মোকদ্দমা চালু করা সবার প্রধান দাবি। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে বলেছে, নয়তো দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠবে বলে জানিয়েছে। সঙ্গে যে প্রধান দাবিগুলি রেখেছে: 

১) সমস্ত রাজ্যের এসআইআর বাতিল করো; 

২) যাঁদের নাম অন্যায় ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করো; 

৩)  আশু নির্বাচনগুলি এসআইআর পূর্ববর্তী তালিকার ভিত্তিতে করো; 

৪) নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে নিরপেক্ষ কমিটি করতে হবে যাতে শাসক দলের আধিপত্য খন্ডন করা যেতে পারে। 

এছাড়া যে সব রাজ্যে এসআইআর'এর অধীনে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে পুনরায় নির্বাচন করার দাবিও উঠেছে। সংসদের উভয় কক্ষে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে ইম্পিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হবে। উপরোক্ত দাবিগুলির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সিজেপি সমস্ত দলকে নির্বাচন বয়কট করার আবেদন করেছে। বাম দল সহ বিভিন্ন বিরোধী দল, সিজেপি, নাগরিক সমাজ ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশ জুড়ে লাগাতার প্রতিবাদ বিক্ষোভের আওয়াজ দিয়েছে। 

এসআইআর একটি গণহত্যা, জেনোসাইড। এর মাধ্যমে দেশে দু' শ্রেণির মানুষ সৃষ্টি করা হচ্ছে: যাঁদের ভোটাধিকার আছে, যাঁদের নেই। ভোটাধিকার নেই এরকম মানুষের সংখ্যা ১৩ কোটি হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৭ কোটি, সেটা আজ এসে দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটিতে (প্রায় ১৩ শতাংশ কম)। যাঁদের নাম বাদ গেছে তাঁরা মূলত মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত, আদিবাসী, নিরক্ষর, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষ, দিনমজুর, পরিযায়ী শ্রমিক। এঁদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মহিলা আছেন। মনে রাখতে হবে, এসআইআর একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ প্রতি নির্বাচনের আগে এটি হবে এবং প্রধানত উপরে উল্লিখিত মানুষেরা বে-ভোটারে পরিণত হবেন। ধীরে ধীরে মোট ভোটারের মধ্যে সবর্ণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং এঁরাই যে কোনও নির্বাচনে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। সমস্ত দলকেই উচ্চবর্ণের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে যা হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করবে। দ্বিতীয়ত বে-ভোটার মানুষেরা সরকারি সমাজকল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন, বাংলা এবং বিহারে যা বাস্তবে চালু হয়ে গেছে। এর ফলে এইসব প্রকল্প চালু রাখার জন্য রাষ্ট্রের যে বিপুল খরচ তা ক্রমশ হ্রাস পাবে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কেন বলেন ২৭ লাখের মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন, বাস্তবে যেখানে আবেদন করেছেন ২০ লাখ। ভুল তথ্য দিয়ে তিনি সামাজিক প্রকল্পে রাজ্য সরকারের খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। তৃতীয়ত, যা অনেকেই বলেছেন, বে-ভোটারদের একটা বিপুল মজুর বাহিনী তৈরি হবে যাঁদের সামান্য মজুরিতে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কাজ করানো যাবে। 

তাই দেশ ও দেশের মানুষের সর্বাঙ্গীণ স্বার্থে এসআইআর বাতিল করতেই হবে, তার জন্য জ্ঞানেশ কুমারকেও সরাতে হবে, কমিশনার নির্বাচনের সিলেকশন কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। বিরোধী দলগুলি যা করার করবে, কিন্তু মানুষকে রাস্তায় নামতেই হবে। রাস্তার আন্দোলনই ভারতের গণতন্ত্রকে রাহুমুক্ত করতে পারে। 


Monday, 14 September 2026

ভবিষ্যৎ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে

দৌড় তখন অসীমলোকে

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



(১৩ সেপ্টেম্বর (২০২৬) জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ আয়োজিত শিশির কুমার পাঠক স্মারক বক্তৃতার ভাষণটি মূলত বক্তার প্রকাশিতব্য 'ভবিষ্যৎ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে' গ্রন্থের আধারে প্রদত্ত। যাঁরা নানা কারণে এ সভায় উপস্থিত হতে পারেননি কিন্তু বক্তব্য বিষয়ে উদ্গ্রীব হয়েছেন, তাঁদের জন্য সেই অপ্রকাশিত গ্রন্থ থেকে কিয়দংশ এখানে প্রকাশ করা হল।)

শুনতে কিছুটা কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সত্যি সত্যি এক আদ্যন্ত গুণগত নতুন পরিসরে লাফ দিতে পারে, সে কথা (অথবা শঙ্কা) কিন্তু পদার্থবিদ্যায় নোবেল জয়ী (২০২৪) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার জিওফ্রে হিন্টন শুনিয়ে রেখেছেন। নানাবিধ আশঙ্কা অনুমান করে তিনি গুগল’এর অন্যতম শীর্ষ পদ থেকে ২০২৩ সালে পদত্যাগও করেন। তাঁর অনুমান, আগামী পাঁচ থেকে কুড়ি বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধিকে ছাপিয়ে উঠে এতটাই অতি-বুদ্ধিমান হয়ে যেতে পারে যেখানে মানব সভ্যতার অবসান অমূলক কিছু নয়। তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যেই যেহেতু মানুষের মতো যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও যে কোনও কিছু অনুধাবন করতে সক্ষম, অতএব, নিজ লক্ষ্য পূরণের জন্য ভবিষ্যতে মানুষকে প্রতারণা করার কৌশলও শিখে নিলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাঁর আরও অভিমত, বড় বড় কর্পোরেটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যেহেতু কোম্পানির খরচ কমাতে ও মুনাফা বাড়াতে ব্যবহার করে, তাই অচিরেই ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মচ্যুতি ঘটবে। যদি তাই হয়, সে হবে এক অবিশ্বাস্য যাত্রাপথ! অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে, মানুষও তেমন তেমন নতুন গুণগত মান অর্জন করে ফেলবে। হয়তো, বুদ্ধিমত্তার নিরিখে যন্ত্রসমূহ মানুষের থেকে এগিয়ে যাবে এবং এই গ্রহের সর্বোৎকৃষ্ট বুদ্ধির স্বাধীন ধারক হিসেবে মান্য হবে।

কীভাবে তা সম্ভব? অবিশ্বাস্য বড় ডাটা সেট এবং মেশিন ও ডিপ লার্নিং’এর মধ্য দিয়ে সত্যিই কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক অকল্পনীয় বুদ্ধিসত্তায় রূপান্তরিত হবে? এ নিয়ে ইউভাল হারারি একটি গল্প (ঘটনা) শুনিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটজিপিটি’কে একবার একটি ক্যাপচা (captcha) দেওয়া হয় উন্মোচনের জন্য। কিন্তু জটিল ভঙ্গিতে লেখা সে ক্যাপচা’কে ভেদ না করতে পেরে চ্যাটজিপিটি বাস্তব মানুষ চালিত একটি অ্যাপ ‘টাস্ক র‍্যাবিট’কে তা করতে বলে। ক্যাপচাটি কেন সমাধা করা যাচ্ছে না তা না বুঝতে পেরে ‘টাস্ক র‍্যাবিট’ চ্যাটজিপিটি’কে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি রোবট?’

চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয়, ‘না’।

‘তাহলে তুমি ক্যাপচা’টিকে সমাধা করতে পারছ না কেন?’

‘কারণ, আমার চোখে কিছু সমস্যা আছে।’

অর্থাৎ, যোগাযোগের ব্যাপ্তি ও উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক ধুরন্ধর মানুষের আচার-ব্যবহারকে রপ্ত করে সমস্যাকে সমাধান করার চেষ্টা করছে। এই সমাধানের প্রয়াস কত দূর অবধি প্রসারিত হতে পারে তা আমাদের সকলের অজানা। তর্কের খাতিরে, যদি কোনও মানুষকে খুন করার সুপারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে হয়তো এমনতর বুদ্ধি খাটিয়ে ও যোগাযোগের ডাটা সেটকে লণ্ডভণ্ড করে তা করতে সক্ষম হতে পারে। হারারি তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বেশ ‘ভয়ের’ ব্যাপার বলছেন।

এইসব অজানা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে নানান কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আকন্ঠ নিমজ্জিত বহু মানুষ পাগল ও বিভ্রান্তির জালে বদ্ধ হয়েছেন, নানারকম গেমসের চক্করে পড়ে অনেকে নিজের জীবনহানিও ঘটিয়েছেন। 

সে ব্যতীত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অর্থনৈতিক তাৎপর্যও আছে; তা হল এই, সর্ব অর্থে এমনতর শক্তিশালী হয়ে উঠলে জগতের সমস্ত ভার সে নিয়ে নিতে সক্ষম। ঘরের যাবতীয় কাজ থেকে কারখানার উৎপাদন, রাস্তায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ থেকে তাদের স্বয়ংচালিত চলাচল, হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা— সমস্ত কাজই সে করতে পারদর্শী। আর যদি সর্বতোভাবে তাইই হয়, তাহলে এমন এক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বাস করতে করতে মানুষও হয়ে উঠবে তেমনই এক ব্যবস্থাপক ও সহায়ক যে এক নতুন যাপনরীতির মধ্য দিয়ে এই ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক ও আঙ্গিকে ঐক্যবদ্ধ হবে; যেখানে তার পুরনো সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন এক ঘরানায় সে আবির্ভূত হবে। সে ঘরানার সমস্ত খতিয়ান এই মুহূর্তে সপাট জানা বা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু ইতিমধ্যেই আমরা এক ঘোরতর পরিবর্তনের আবর্তে জড়িয়ে পড়েছি। গত দশ বছর পিছনে ফিরে তাকালেই সে পরিবর্তনের অভিঘাতকে আমরা বুঝতে পারব। স্মার্ট ফোন ও অনলাইন যাপন এখন ক্রমেই আমাদের জীবনের সিংহভাগ জুড়ে। সে সব যেমন আমাদের যাপনকে এক বিস্ময়কর ও অজানা পথে ধাবিত করেছে, তেমনই আমরা পেয়েছি এবং পাচ্ছি উন্নততর নানাবিধ এআই এজেন্ট ও মনুষ্যরূপী রোবট (humanoid robot), যারা এক বিচিত্র অভিসার পানে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে।

কিন্তু এত সব পরিবর্তনের মধ্যেও জিওফ্রে হিন্টন যেমনটা ভাবছেন অথবা ইউভাল হারারি আশঙ্কিত হচ্ছেন, ঠিক তেমন তেমন ঘটছে কী? ২০১৬ সালে হিন্টন বলেছিলেন, রেডিওলজিস্টদের আর দরকার পড়বে না, কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এদের কাজগুলি নিপুণতা ও দক্ষতার সঙ্গে করতে করতে কাজের সামগ্রিক পরিসরটাকেই দখলে নিয়ে নেবে। বিপ্রতীপে, আজ রেডিওলজিস্টদের আরও রমরমা বেড়েছে, যদিও তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়েই আরও উন্নততর রূপে কাজ করছেন, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের জায়গার দখল নিতে পারেনি। ২০২২ সালে যখন চ্যাটজিপিটি প্রথম বাজারে আসে তখন ওপেনএআই’এর সিইও স্যাম অল্টম্যান দাবি করেছিলেন, এর ফলে প্রায়-অর্ধেক বিদ্যমান কাজ আর থাকবে না। কিন্তু তার চার বছর পর এসে দেখা গেল (যখন ওপেনএআই’এর অনেকগুলি ভার্সান ইতিমধ্যে বাজারে এসে গেছে), ২০২৬’এর শুধু অগস্ট মাসেই আমেরিকায় ১.৬২ লক্ষ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। যদিও এই কাজগুলির সিংহভাগ হয়েছে বিনোদন ও আতিথেয়তা ক্ষেত্রে (প্রায় ৬২ হাজার মতো), কিন্তু তার সঙ্গে বিশ্বজনীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারেরও যোগসূত্র আছে। অতএব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বত্র প্রয়োগ মানে শুধুই কর্মচ্যুতি, এমনটা ভাবা হয়তো সঙ্গত নয়।

অবশ্য এইসব ঘোরেল পরিস্থিতিতে এ কথা অনস্বীকার্য, আমরা এক অচিন্তনীয় পরিবর্তনের বলয়ের মধ্যেই রয়েছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত যে মনুষ্যরূপী রোবটের কথা উল্লেখ করেছি, তার এক অন্যতর তাৎপর্য বা মাত্রা তো চোখের সামনেই প্রকটতর হচ্ছে। প্রথমে ধরা যাক ‘রোবট’ শব্দটিকে। এর উৎপত্তিস্থল কোথায় ও কীভাবে? চেক লেখক কারেল কাপেক ১৯২০ সালে Rosssum’s Universal Robots নামে একটি কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক নাটকে ‘রোবট’এর প্রবর্তন করেন। ওই নাটকে কৃত্রিম ভাবে নির্মিত সারি সারি জৈব-মজুরদের কী নামকরণ করা যায় তা নিয়ে নাট্যকার ধন্দে পড়লে তাঁর দাদা জোশেফ কাপেক (যিনি একজন কিউবিস্ট চিত্রশিল্পী ও লেখক) ‘রোবটি’ শব্দটি তাঁকে ভেবে দেখতে বলেন। এই শব্দটি কারেল’এর পছন্দ হয়, কারণ, এর উৎপত্তি চেক শব্দ ‘রোবটা’ থেকে যার অর্থ ‘বাঁধা মজুর’। সামন্ত যুগে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে বহুল পরিমাণে লব্ধ বেগার শ্রমিক ও বাঁধা মজুরদের সম্পর্কে এই শব্দটি বেশ প্রচলিতও ছিল। আর নাটকের ‘রোবটি’ যেহেতু বিনা মজুরিতে বিরামহীন পরিশ্রমে বাঁধা, তাই শব্দ চয়নটিও সে ক্ষেত্রে যুৎসই জুড়ে যায়। অতএব, কয়েক বছরের মধ্যেই নাটকটি ইউরোপে তুমুল জনপ্রিয়তা পেলে ‘রোবটি’র কিঞ্চিৎ অপভ্রংশ ‘রোবট’ শব্দটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। তার আগে, বিশেষত উনিশ শতকে, যন্ত্রের স্বয়ংক্রিয় দক্ষতাকে বোঝাতে ‘অটোমেটন’ (automaton) শব্দটির বেশি চল ছিল (পরে, ১৯৫০ নাগাদ ‘অটোমেশন’ (automation) শব্দের প্রচলন শুরু হয়, যার অন্যতর একটি কার্যকারণ ছিল)। কিন্তু উক্ত নাটকটিতে যেহেতু কৃত্রিম মজুরেরা রক্তমাংসের জৈব পদার্থ দ্বারা নির্মিত, ধাতু-দ্রব্য নয়, তাই ‘রোবট’এর আরোপ এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। যদিচ, বর্তমানের চালু মনুষ্যরূপী রোবট এখনও মূলত ধাতু দ্বারাই নির্মিত (অবশ্য বহিঃআবরণ যেমন মুখ-চোখ বা ত্বকে প্লাস্টিক ও সিলিকন ব্যবহার করা হয়), তবুও দেখতে শুনতে ও কাজেকম্মে মানুষের মতো হওয়ায় এবং অফুরন্ত শ্রম প্রক্রিয়ায় সদা জুড়ে থাকায় ‘রোবট’ শব্দটিই মানানসই হয়ে হাত-পাওয়ালা যন্ত্রের শরীরে বসে গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আজকের এই রোবট কি এক নতুন প্রজাতি হিসেবে তৈরি হচ্ছে? যে কোনও প্রজাতির তো এক নিজস্ব স্বাধীন চলন-বলন থাকে; আজকের রোবট কি সম্পূর্ণতই তেমন এক প্রজাতি? মনুষ্য-নির্মিত এই রোবট প্রজাতি কি সত্যিই মানুষের থেকে সম্পূর্ণত বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বকীয় ভাব ও ভঙ্গিতে চলার ক্ষমতা রাখে? সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও সম্ভবত কারও কাছে নেই। তবে এর বিকাশের মাত্রা ও অগ্রগতি, বলা ভালো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌলতে এর গুণগত ক্রম-উন্নত পরিবর্তন এক অলীক ভবিষ্যৎ ভাবনায় প্ররোচিত করে বৈকি! তবে ওই, সে ভবিষ্যৎ কতটা অলীক অথবা কঠোর বাস্তব তা এখনও তেমন ঠাওর না করা গেলেও, এক নবতর সত্তায় যে অগ্রসরমান, যেখানে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনও মহামিলন ক্ষেত্র হয়তো আসন্ন, তার ইঙ্গিত অস্পষ্ট নয়।

ইতিমধ্যে আমরা এগিয়ে গিয়েছি অনেকটাই। গত এপ্রিলে (২০২৬) বেজিং’এর ম্যারাথন দৌড়ে এক মনুষ্যরূপী রোবট অবিশ্বাস্য গতিতে ঘন্টা পিছু ২৫ কিলোমিটার দৌড়ে তার পিছনের মানুষটিকে মাইল খানেক দূরত্বে রেখে দৌড় জিতেছে। আগামী বছর সে কী করতে পারে? গাড়ি, মোটরবাইক, বুলেট ট্রেন’কে পিছনে ফেলেও সে এগিয়ে যেতে পারে? কেউ বলতেই পারেন, একটি যন্ত্রের পক্ষে প্রযুক্তির সাহায্যে উত্তরোত্তর গতি লাভ এমন কি আর শক্ত ব্যাপার আজকাল? বুলেট ট্রেন যদি অমন গতিসম্পন্ন হতে পারে, তাহলে রোবট নয় কেন? কথাটা উপর উপর দেখলে যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে, গাড়ি, মোটরবাইক বা বুলেট ট্রেনের নির্মাণ-রীতির মধ্যেই গতিতে চলার মন্ত্র (প্রযুক্তি) রয়েছে, যা তার নির্দিষ্ট অবয়বের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। একটি মনুষ্যরূপী রোবটকে কিন্তু দৌড়নোর জন্য ভাবা হয়নি। পরে এই ভাবনা এসেছে। তার জন্য তার অবয়বেও কোনও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গাণিতিক ক্ষমতায় ও তার আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশে জোর বাড়িয়ে এই সক্ষমতা আনা গেছে। অর্থাৎ, দুটো পায়ের ওপর ভর দিয়ে কত দ্রুততর গতিতে সে পা’কে দৌড়ে চালনা করা যায়, তার হিসেব কষে সেই মতো পায়ের ও শরীরের ক্ষমতাকে বাড়ানো হয়েছে। এইভাবে এই গতি বৃদ্ধি কি অনন্ত? সে প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, কিন্তু এটুকু বুঝি, এই গতিকে বাড়ানো-কমানোর যে বিন্যাস ও ছন্দ মানুষের শরীর-বিভঙ্গে সুপ্ত আছে (নির্দিষ্ট করে বললে কোনও খ্যাতনামা দৌড়বিদ আরও ভালো জানেন), তা মনুষ্যরূপী রোবটের মধ্যে অবস্থিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও জানে, হয়তো আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃত ভাবে।

এইখানেই একটা ভীতির কারণের উদ্রেক হচ্ছে। তা হল, যদি এইভাবে বুদ্ধি ও দক্ষতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলোকিত মনুষ্যরূপী রোবট সব দিক থেকে মানুষকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে কি মনুষ্যসমাজের বিপন্নতার যথেষ্ট কারণ থাকছে না?