পরিবর্তনের ঢেউ
সঙ্গে বামপন্থী ও সমাজতন্ত্রীদের উত্থান
সোমনাথ গুহ
গণতন্ত্রী, বামপন্থী, আপামর দক্ষিণপন্থা-বিরোধীদের এ বড় সুখের সময়। গত এপ্রিল মাসে মধ্য ইউরোপে হাঙ্গেরির দাপুটে নেতা ভিক্টর অরবানের ষোল বছরের একনায়কতন্ত্রী শাসনের অবসানের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বাহুবলী নেতারা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২৫ এপ্রিল অরবান তাঁর একদা সহকর্মী পেতর ম্যাগিয়ারের কাছে হার স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। তার ঠিক ছয় মাস বাদে ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার ভুচিক গত দু' বছরের উত্তাল আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেন। একই সময়ে সমস্ত পূর্বাভাস নস্যাৎ করে ব্রাজিলে লুলা দ্য সিলভা পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ইজরায়েলে নরহত্যাকারী কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু’র আসনও টলমল। এই পর্বের মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটল যখন আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট ঝড়ে পর্যুদস্ত হলেন। ধারাবাহিক এই মহীরূহ পতনের ওপর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে।
হাঙ্গেরি
ফিদেস (তরুণ ডেমোক্র্যাট সঙ্ঘ) দলের নেতা অরবান ১৯৯৮ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন তিনি ৩৫ বছরের তরতাজা তরুণ, কমিউনিজম-বিরোধী গণতন্ত্রের এক ধ্বজাধারী। ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত করলেন, দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজের লোকদের বসিয়ে সেগুলি কুক্ষিগত করে নিলেন, ফিদেস পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করলেন। ২০০২'এ নির্বাচনে হেরে গেলেন, ২০১০'এ ক্ষমতায় ফিরে এসে স্বমূর্তি ধারণ করলেন। আমাদের অতি পরিচিত আর এক বাহুবলীর মতো উপলব্ধি করলেন যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে মিডিয়াকে কব্জা করতে হয়; মানুষের মন দখল করতে হয়, তাঁদের পুরো মগজধোলাই করে অন্ধভক্তে পরিণত করতে হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ইফ ইউ ক্যান নট বিট দেম, বাই দেম! অরবান সেটি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করলেন। এক দশক আগে যে বন্ধুদের শীর্ষস্থানে বসিয়েছিলেন, তাঁরা এতদিনে সব ধনকুবের। এঁরা পটাপট বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, মিডিয়া সংস্থা কিনে নিলেন। কোনও জোর জবরদস্তি, হিংসা প্রদর্শন নয়। নীরবে, নানা ইঙ্গিতে জানিয়ে দেওয়া হল, যে কোনও ঘটনার সরকারি ভাষ্যই প্রচার করতে হবে, না হলে বিজ্ঞাপন বন্ধ। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনকাম ট্যাক্স, গোয়েন্দা বিভাগ আছে, আর সেই দেশেও আছে পেগাসুস-এর কঠোর নজরদারি। আর কী! অষ্টপ্রহর সরকারের গুণকীর্তন শুরু হয়ে গেল, অরবান হয়ে গেলেন মধ্য ইউরোপের মহামানব।
কিন্তু লক্ষ্মীন্দরের বাসরঘরেও ছিদ্র থাকে। আপাত নিশ্ছিদ্র এই ব্যবস্থার মধ্যেও বিদ্রোহী সুর ভেসে থাকে। আমাদের এখানে যেমন রাভিশ কুমার, ধ্রুব রাঠী এবং বহু প্রতিবাদী ইউটিউবার ও প্রভাবকারী, ওখানেও তিন সাংবাদিকের ‘ডিরেক্ট ৩৬’ নামে আন্তর্জালের চ্যানেল হাজারও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিরোধী প্রচার জারি রাখে। লাগামছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রায় সবার অজান্তে মানুষের প্রতিবাদ দানা বাঁধল। আমেরিকা, রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন সত্ত্বেও নির্বাচনে অরবানের ভরাডুবি হল। পেতর ম্যাগিয়ারের তিসা পার্টি ১৯৯ আসনের মধ্যে ১৪১টিতে জয়ী হয়ে ভিক্টর অরবানের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটাল।
সার্বিয়া
সার্বিয়ার যুব সম্প্রদায় যখন আলেকজান্ডার ভুচিকের এসএনএস পার্টির বারো বছরের লৌহকপাট শাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন হাঙ্গেরির মানুষ তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেন। অরবানের পরপর নির্বাচনে জয়ের একটা রহস্য হল, ভোটদান বন্ধের দু-তিন ঘণ্টা আগে হঠাৎ ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। তখন ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীর সাহায্যে ছাপ্পা ভোট করা হয়। মিডিয়া যথারীতি এই কারচুপি ব্ল্যাকআউট করে দেয়। ২০২৬-এর নির্বাচনে তিসা পার্টির ক্যাডাররা এটা বন্ধ করার ব্যাপারে সচেতন ছিল। সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরাও নিজেদের দেশের নির্বাচনে প্রতিটি বুথের ওপর কড়া নজর রাখে। দুর্নীতিগ্রস্ত, দমনকারী ভুচিক শাসনের অবসান ঘটার এটাই অন্যতম কারণ।
সলতে পাকানো অবশ্য দু' বছর আগে শুরু হয়েছিল যখন নোভিসাদ নামক জায়গায় রেল স্টেশনের ছাদ ভেঙে পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। বলাই বাহুল্য, চরম দুর্নীতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দেশের শিক্ষার্থীরা স্থির করেন, ঢের হয়েছে আর নয়। তাঁরা ভুচিকের সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের সংগঠন ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ অনুভূমিক, কোনও নেতা নেই। তাঁরা প্রধান শহরগুলির বাইরে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন, যেখানে ভুচিকের দল এসএনএস-এর মূল ঘাঁটি। নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থীরা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এসেছেন: ডাক্তার, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী আর শিক্ষার্থী। তাঁদের ইস্তাহার স্রেফ বাগাড়ম্বর নয়। তাঁরা দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়া প্রতিবাদ দমনকারী অফিসারদের অপসারণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে পেটোয়া লোকদের হাত থেকে মুক্ত করা এবং পদলেহনকারী মিডিয়ার পরিবর্তে স্বাধীন মিডিয়া গড়ে তোলা। ইতিমধ্যে মিডিয়ার প্রাক্তন পদাধিকারীরা অরবানের দালালি করার জন্য দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
ব্রাজিল
ব্রাজিলেও দ্বিতীয় দফায় লুলা দ্য সিলভার প্রচারাভিযান পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। প্রথম দফার ভোটের পর সবাই ধরেই নিয়েছিল অশীতিপর রাষ্ট্রপতির পরাজয় নিশ্চিত; ফ্লাভিও বোলসনারো পেয়েছিলেন ৪৭ এবং লুলা ৪৫ শতাংশ ভোট। অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলের ৭ শতাংশ বোলসনারোর ঝুলিতে যাওয়া নিশ্চিত ছিল। বোলসনারো ধরেই নিলেন তিনি ক্ষমতায় এসে গেছেন, আনন্দে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ চার থেকে ছয় বছর ঘোষণা করে দিলেন। বোলসনারোর ছয় বছর মানে নিরাপত্তা বাহিনীর দাপট, আদিবাসী-বিরোধী, পরিবেশ-বিরোধী, অ্যামাজন–ধ্বংসকারী, আমেরিকার পা-চাটা শাসন, যে বিভীষিকা এর আগে ফ্লাভিওর পিতা জাইর-এর সময় মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। মানুষ ঠিক করে তারা কিছুতেই এটা হতে দেবে না। এমতাবস্থায় যুব সম্প্রদায় গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে সমাবেশিত হতে শুরু করে। দ্বিতীয় দফায় মানুষ ঝেঁটিয়ে ভোট দিতে আসে, বিশেষ করে বরিষ্ঠ নাগরিকদের উৎসাহ ছিল লক্ষণীয়। সামান্য ব্যবধানে হলেও লুলা আবার মসনদে। তিনি ঘোষণা করেছেন, ব্রাজিল কারও ঘরের পিছনের আঙিনা হবে না, অ্যামাজন রক্ষা করবেন, বিরল খনিজ পদার্থ নিজেদের শর্তে বিপণন করবেন, আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন।
ইজরায়েল
ইজরায়েলের ছবিটা একেবারেই পরিষ্কার নয়। এখন অবধি জানা যাচ্ছে, আরব পার্টিগুলি যাঁদের ১৯টা আসন আছে তারা গাদি আইজেনকোটকে (৪৮ আসন) সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু আইজেনকোট সেই সমর্থন গ্রহণ করবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, হামাসকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলতে আরব দলগুলির দ্বিধা আছে। এছাড়া ওই জোটের আর একটি দল আরব পার্টির সমর্থনে সরকার গড়তে নারাজ। এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। পুনরায় নির্বাচনের সম্ভাবনা আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, যে গোষ্ঠীই ক্ষমতাসীন হোক ইজরায়েলের প্যালেস্টাইন নীতিতে কোনও গুণগত পরিবর্তন আসবে কিনা সন্দেহ।
টেক্সাস বিক্রি হবার নয়
আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আম আদমির দৈনন্দিন সমস্যার প্রতি আরও সংবেদনশীল হবেন, ইরানের সাথে যুদ্ধে সংযত হবেন, শুল্ক নীতির প্রশ্নে নমনীয় হবেন। ডেমোক্র্যাটদের জয় তিনটি কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। টেক্সাসে কয়েক দশক বাদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো জয়লাভ করেছেন। এই প্রদেশের নির্বাচনে অর্বুদপতি ইলন মাস্ক রিপাব্লিকান প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ১৫৮ মিলিয়ান ডলার খরচা করেছিলেন। টালারিকো বলেন, টেক্সাস বিক্রি হবার নয়, নিজের ব্যবসার সুবিধার্থে দেদার পয়সা খরচ করে নির্বাচন জেতার দিন শেষ। তিনি মার্কিন গণতন্ত্রে ডলারের স্বৈরতন্ত্র মোকাবিলা করার সংকল্প করেছেন।
আমেরিকাতেও একটা আইপ্যাক আছে (AIPAC): ‘আমেরিকান ইজরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’। আমেরিকার ইজরায়েল-বান্ধব বৈদেশিক নীতি বহাল রাখার জন্য এরা উভয় দলের প্রার্থীদের প্রচারে হাত খুলে টাকা ঢালে। শোনা যাচ্ছে, গাজায় গণনিধনের প্রতিবাদে এবার কয়েকজন তাদের সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছেন। মিশিগান প্রদেশে আব্দুল এল সৈয়দকে হারানোর জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে হ্যালি স্টিভেন্সকে তারা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিল। এল সৈয়দ তাঁকে পরাজিত করে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হন। এরপর ট্রাম্পের দলবল তাঁকে জিহাদি, ইস্লামিস্ট, কম্যুনিস্ট ইত্যাদি বলে প্রবল গালমন্দ করা সত্ত্বেও তিনি রিপাব্লিকান প্রার্থীকে হারিয়ে আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। জোহরান মামদানির জয়ের পতাকা তিনি উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।
এবারের নির্বাচনে প্রাদেশিক স্তরে 'ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা’র বেশ কিছু প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এঁরা নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবার বেশ কিছু মুসলিম ও ভারতীয় প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এঁদের মধ্যে আছেন দেশের প্রথম হিজাব পরিহিতা মহিলা আবের কাওয়াস যিনি নিউ ইয়র্কের প্রাদেশিক সভায় নির্বাচিত হয়েছেন।
ইউরোপ
জেনজি আন্দোলনে ইউরোপ উত্তাল। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে তুমুল বিক্ষোভ শুরু করে যাতে পরে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়। দৈনন্দিন সমস্যার বিরুদ্ধে বিপুল প্রতিবাদ হচ্ছে যা সামাল দিতে মাকঁর সরকার হিমসিম খাচ্ছে। জার্মানিতে যুব সম্প্রদায় ২১টি শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ সংঘটিত করেছে। ফ্রান্সে দক্ষিণপন্থী ন্যাশানাল পার্টি লা পেন এবং জার্মানিতে AFD ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তারা স্যাক্সোনি-তে জিতেছে, আবার বার্লিনে বামপন্থী ডিয়ে লিনকে জয়লাভ করেছে। পুরো ইউরোপে বাম-ডানের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন আগামী দিনেও চালু থাকবে।
দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে গদিচ্যুত করা যায়, যেরকমটা প্রথাগত গণতন্ত্রে হয়ে এসেছে। ভারতেও জেনজি আন্দোলনের দৌলতে শাসকের চূড়ান্ত দাপটে একটা চিড় ধরেছে। এই ফাটল আরও বিস্তার লাভ করবে। মুশকিল হচ্ছে, এসআইআর-এর দৌলতে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যেকার লড়াইয়ে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আর নেই। তাই, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এসআইআর বাতিল করতেই হবে, এসআইআর-পূর্ব ভোটার তালিকায় ফিরে যেতে হবে। তবেই এখানেও স্বৈর-শাসকদের পরাজিত করা যাবে, আবার গণতন্ত্রের ধ্বজা উড্ডীন হবে।





