যা পেলাম তা দুর্লভ
কৃশাণু মিত্র
কী পাইনি তার হিসাব আজ মেলাব না। ককরোচ আন্দোলন এই দিশাহারা সময়কে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই বরং কী কী পাওয়া গেল, তা খতিয়ে দেখি।
১) নতুন সময়ের নেতৃত্ব
আমরা তথাকথিত সবজান্তারা আলোচনা সভায়, মিছিলে, গণসংগঠনে যাদের মুখ দেখি, তাদের বাইরেও যে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রয়েছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমরা ভেবেছিলাম, সমাজের দায়িত্ব বোধহয় কেবল আমাদেরই। আর ওরা? ওরা নাকি মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত! অথচ প্রযুক্তির ব্যবহার করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া, গোদি মিডিয়াকে ছাপিয়ে ও আইটি সেলের প্রোপাগান্ডাকে কার্যত গুনতিতে নস্যাৎ করে ভারতবাসীর মন জয় করে নেওয়ার কাজ তারাই করে দেখাল।
২) পেলাম লক্ষ লক্ষ সাংবাদিক
যারা স্পনসর্ড গোদি মিডিয়াকে গণতান্ত্রিক পথেই বাণপ্রস্থে পাঠিয়ে দিতে পারে। গোদি মিডিয়া যখন কদর্য ভাষ্যে সমাজে বপন করছে কূট বিষ, তখন এই লক্ষ লক্ষ তরুণ তাদের মোবাইলে, কম্পিউটারে নির্মাণ করছে রিল, মিম আর নবতর ভাষ্য ও স্বপ্ন। এরাই প্রকৃত সাংবাদিক ও মিডিয়া।
৩) শিখলাম সাংস্কৃতিক লড়াই
মজে যাওয়া খাত ভরে উঠল নতুন প্লাবনে। বিহার ও যন্তর মন্তরের ব্যঙ্গাত্মক গান আজ মনের মণিকোঠায় হিল্লোল তোলে। রঙ্গ-তামাশাও যে প্রতিবাদের পথ হতে পারে, তা আমরা ভাবিনি। যখন কোনও পড়ুয়া পুলিশকে গিয়ে বলে, 'আমায় ডান্ডা মারো', তখন বিশ্বের মানুষের বুক রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। 'দেওয়ালে দেওয়ালে' নয়, প্রযুক্তির হাত ধরে সবুজের বার্তা পৌঁছে যায় আপামর জনসাধারণের ঘরে ঘরে। মিম, কার্টুন, কবিতা, রিল— নিরন্তর তৈরি হতে থাকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের সৃজনশীল সত্তাকে মিলিয়ে। যাকে বয়স্করা সর্বনাশ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, নবীনরা তাকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করে তুলল। রাষ্ট্রকে নিয়ে এমন মশকরা আমরা কস্মিনকালেও দেখিনি। আমরা জানতাম, রাষ্ট্র মানেই লেফট-রাইট; তার সঙ্গে যুদ্ধ মানেই 'লেফ্টিও রাইট' (আমার কাছে যার অর্থ, বামেদের বহু ব্যবহৃত অথচ বিফল পথ)। ইংল্যান্ড প্রবাসী এক পুত্র মুম্বই থেকে তার বাবা-মাকে যন্তর মন্তরে পাঠিয়েছে এই বলে— 'বাবা, তুমি আমার হয়ে পুলিশের কাছে একটা ডান্ডা খেয়ে এসো।'
৪) ঘুচে গেল নারী-পুরুষের বিভেদ
অগণিত তরুণ-তরুণীর সমাবেশ যেখানে নারীশক্তির কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারত, সেখানে নারীরা ছিলেন নির্ভয়। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তার কারণ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারীদের মানসিকতা, নাগরিক ও GenZ জমায়েত নয়— এমন উপলব্ধিও সামনে এসেছে। প্রতিবাদ আর নারীমুক্তি পাশাপাশি হেঁটেছে। মেয়েরা কেবল সংসার করবে, লেখাপড়া করবে না— এই মনুবাদী, তালিবানী রাষ্ট্র-ন্যারেটিভ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আগ্রাসনে ভেঙে পড়েছে। কন্যাসমা একজন যখন হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট নিয়ে বলে, 'পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক করে, আমার ন্যাপকিন নয়', তখন পরিবারের মনুবাদী একনায়কত্ব খানখান হয়ে যায়। আমি এই প্রজন্মকে, এই কন্যাকে প্রণাম করি। এই প্রজন্ম পরিবারের ভীত-সন্ত্রস্ত জ্যেষ্ঠদেরও শিক্ষা দিতে পেরেছে।
৫) ধর্ম যখন ভাই-ভাই
জুনেইদ ভাই ও তাঁর সঙ্গীরা দেখিয়েছেন কাকে বলে মানবধর্মী উৎসব। ককরোচদের ধর্ম নিরপেক্ষ মানসিকতা ও শিখ সম্প্রদায়ের পাগড়ি দান রবীন্দ্রনাথের ‘মহামানবের সাগরতীরে’ যেন ভারতবাসীকে হাজির করেছে। গরু-গোবর, হনুমান কিংবা হিন্দুত্ববাদী বহু ন্যারেটিভ মুহূর্তেই খসে পড়েছে। এক প্রতিবাদী জনৈক RAF জওয়ানকে বলছে, 'আমি পাকিস্তানি, আমাকে গুলি করো।' ভোটের রাজনীতির জন্য রাষ্ট্র যে সব উপাদানকে ব্যবহার করেছে, পড়ুয়ারা তা ওলটপালট করে দিয়েছে। রাষ্ট্রকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে।
৬) মেটামরফোসিস
'আরশোলারা কি এক জায়গায় হতে পারে না?' অভিজিৎ দিপকে'র এই আকাঙ্ক্ষা থেকে ককরোচদের যে উত্থান এবং অভিজিতের দেশে ফিরে আসা, যেন কাফকার 'মেটামরফোসিস'। সোনম ওয়াংচুক যেন পেট্রোল চালিত ইঞ্জিনের স্পার্ক প্লাগ। 'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে…'— জ্বলে উঠল আকাশ-বাতাস, গান্ধীর পথে। যেখানে বস্তু পোড়ে না, পোড়ে প্রতিটি মানুষের মন। আত্মদহন পরশমণি হয়ে ভুল-ঠিক চেনার পথ দেখিয়ে দেয়।
৭) আন্দোলনের পথ
আন্দোলনের ধারার যে পরিচিত রূপ দেখা যায়— ধরা যাক জঙ্গলের লড়াই— সেখানে কত বীর শহিদ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যদি ভগৎ সিং কিংবা তাঁর সমসাময়িক স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের কথাও ভাবি (যদিও সেই যুগে মিডিয়া আজকের মতো সর্বব্যাপী ছিল না), তাহলে দেখব, অনশন এমন একটি পথ যা বিপথগামী সমাজ মানসে আত্মদহনের কাজ করে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের অবস্থান পরিবর্তন করে অনশন। এই পর্যায়টি আদতে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যে বাচ্চারা অনশনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রণাম করে বলি—
'জয়তু নতুন প্রজন্ম। অনেক শেখালে।'




