সন্ধিক্ষণের উপান্তে দাঁড়িয়ে দেশ
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
সাদা অ্যাপ্রন পরে ডাক্তার সেজে পুলিশের দল আশপাশের সবাইকে জোরজবরদস্তি সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে মঞ্চে উঠে পড়ল, তারপর সাদা বিছানার চাদর দিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলে শীর্ণ, দুর্বল, অভুক্ত সোনম ওয়াংচুক’কে (তাঁর অশক্ত প্রতিবাদ সত্ত্বেও) প্রায় চ্যাংদোলা করে দণ্ডায়মান আম্বুলেন্সে তুলে চম্পট দিল। এইভাবেই ভেবেছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই’ আন্দোলনকে দুরমুশ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু কোথায় কী! কথায় বলে, ‘শাসক যত মারে/ জনতা তত বাড়ে’। সোনমজী’র অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই চারিদিক থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এসে ছেয়ে ফেলল যন্তর মন্তর প্রান্তর।
মাস দুয়েক আগে প্রধান বিচারপতির ‘আরশোলা’ মূলক একটি চিহ্নিতকরণকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে মিম ও তির্যক-মন্তব্যের ঢেউ উঠেছিল, তারই অভিঘাতে ইন্সটাগ্রামে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রারম্ভকে বহু মানুষই ততটা সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু যখন তা সত্যিই অন্তত ২.৫ কোটি ফলোয়ার সহ ছাত্র-যুবসমাজের এক তীব্র যন্ত্রণা ও আর্তিকে প্রতিনিধিত্ব করল, ‘আমিও এক আরশোলা’ প্রতিধ্বনি যখন নিজেকেও গ্লানিবিদ্ধ করল, তখন আর পিছনে তাকানোর অবকাশ ছিল না। চকিতে সব যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এই চলমানতার অন্যতম মুখ্য উদ্যোক্তা তরুণ তুর্কি অভিজিৎ দিপকে তাঁর আমেরিকার মসৃণ জীবনের সমস্ত আয়েসকে বিসর্জন দিয়ে দেশে ফিরে এলেন এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পানে নিজেকে অবলীলায় নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে রইলেন আশুতোষ রাঙ্কে ও সৌরভ দাস। পরে আরও কিছু উজ্জ্বল মুখ। এরপরের ঘটনাবলী আমরা জানি; যেন এক লহমায় বদলে যেতে বসল দেশের নকশা। যে একতরফা বয়ানের বুলডোজার দেশকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল, প্রশ্ন উঠছিল আদৌ আর আমরা পবিত্র সংবিধানের রক্ষাকবচ ফিরে পাব কিনা, বিরোধী পক্ষ বলেও কিছু থাকবে কিনা, ঠিক সেই অমানিশা মুহূর্তে যুবসমাজ যেন ধারণ করল গত এক দশকে আমাদের যাবতীয় ব্যর্থতার নৈরাশ্যকে, নির্মাণ করতে চাইল এক নতুন চলার পথ। শাসকও কিছুটা বুঝল, যা হচ্ছে তা তাদের পক্ষে মোটে ভালো নয়। ফলে, তারা গোপনে কিছু ভয়-ভীতি দেখানো, ছ্যাঁচড়াদের মতো আরশোলাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা অথবা প্রভাব খাটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া, আরও কত কী করল! কিন্তু এতে যখন চিঁড়ে ভিজল না, তখন ঠিক আছে, দেখা যাক এদের দৌড় কতটা গোছের মনোভাব নিল।
এইভাবে খুব অল্পদিনেই গড়াতে গড়াতে এই মুহূর্তে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি এক সন্ধিক্ষণের উপান্তে। ২০ জুলাই সকাল ন’টায় আরশোলাদের নেতৃত্বে যন্তর মন্তর থেকে শুরু হবে সংসদ অভিযান। সোনমজী’কে পুলিশ তুলে নিয়ে গেলেও তিনি সফদরজং হাসপাতালে এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এক লিখিত বার্তায় চলমান এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সংসদ অভিযানের সার্বিক সাফল্য চেয়েছেন। পাশাপাশি, আইসা’র তরফে নেহা, আমিন, মনীশ ও এসএফআই’এর ঐশী সহ মোট ২১ জন ছাত্র-যুবদের যন্তর মন্তরে অনশন চলছে। আইসা’র অনশন ২১ দিনে পড়েছে বলে খবর। নাগপুর, পুনে, পাটনা, লক্ষ্ণৌ, কলকাতা, শান্তিনিকেতন, সোলান, হায়দ্রাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন শহরেও শুরু হয়ে গেছে ছাত্রদের বিক্ষোভ জমায়েত ও মিছিল বা প্রতীকী অনশন-অবস্থান। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন আমজনতাও। একই সঙ্গে দলে দলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যন্তর মন্তরে এসে হাজির হচ্ছেন ছাত্র-যুব সহ বিভিন্ন বয়সের নাগরিক। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু মানুষ চলেছেন দিল্লি অভিমুখে।
অনেকদিন পর জাতীয় স্তরে এক গণ আন্দোলন যেন অবয়ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতেই বহু মানুষের মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫’এ জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে ‘সর্বাত্মক বিপ্লব’এর কথা, অথবা, ২০১১-১২ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না হাজারের ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতের ছবি, কিংবা ২০২০-২১ সালে দিল্লি সীমান্তে মাসের পর মাস লক্ষাধিক কৃষকদের অবস্থান। তবে এবারের গণ উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা খানিকটা ভিন্ন। যদিও আন্দোলনটা শুরু হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে এবং ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে কিন্তু সমাজের বিভিন্ন অংশের জড়িয়ে পড়াটা এতটাই বাস্তব যে তা যন্তর মন্তরে জমায়েতের চরিত্র দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। যদি শিক্ষার্থী মেয়েরা এই আন্দোলনে আসছেন তো তাঁদের মায়েরাও জুড়ে যাচ্ছেন; যদি আইটি সেক্টরের তরুণ দল অফিস শেষে এখানে এসে গলা মেলাচ্ছেন তো নয়ডার শ্রমিকেরাও বাদ যাচ্ছেন না; হরিয়ানা-পঞ্জাব থেকে যদি কিষাণেরা আসছেন তো দিল্লি-ইউপি’র বেকার যুবকেরাও বাদ থাকছেন না। কারণ, দেশের সার্বিক অবক্ষয় এমন স্তরে পৌঁছেছে যেখানে মন্দিরের প্রণামী চুরি থেকে বুলডোজার দিয়ে গরিবের ঘর ভাঙা, হেঁসেলে আগুন, দলিত, সংখ্যালঘুদের উপর একচেটিয়া নৃশংস আক্রমণ, দেশের মানুষের কর্মহীনতা থেকে নিম্ন আয়, শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বত্র দুর্নীতি থেকে ছাত্রদের ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ-- সব ইস্যুগুলিই এক মালার মতো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু অপেক্ষা ছিল এক স্ফুলিঙ্গের। আর সেই সুবাদেই এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে ‘ককরোচ’দের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া ও তাদের জোটবদ্ধতা, যন্তর মন্তরে ধৈর্য ধরে লাগাতার বসে থাকা, সোনম ওয়াংচুকের অনশন, তাঁকে নির্দয় ভাবে পুলিশ কর্তৃক অপহরণ, শাসকের লাগাতার ঔদ্ধত্য, এসআইআর, সংবিধানের অমান্যতা, গণতন্ত্রের সলিল সমাধি সহ জমে ওঠা নানান বঞ্চনা ও অত্যাচার দেশ জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তাতে কোনও একদিন এমনতর প্রতিরোধক জনপ্লাবন তৈরি হওয়া অনিবার্য ছিল। তাইই হয়েছে।
গোদি মিডিয়ার উপেক্ষা ও গালিগালাজকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, কাতারে কাতারে মানুষ পুলিশি নিরাপত্তার তিন বলয় পেরিয়ে গতকাল (১৮ জুলাই) থেকে যন্তর মন্তর চত্বর ভরিয়ে তুলছে। যারা আসছেন, প্রতিজন দু’ দুবার সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরবন্দী হচ্ছেন, মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে তাঁদের প্রবেশ করতে হচ্ছে, তারপরে পুলিশ আবার জনে জনে শরীরী তল্লাশি নিয়ে তবে ছাড়ছে। যেন ভিন দেশের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপার হচ্ছে। এই ভয় কীসের? কেন? তবুও, পুলিশের রেকর্ডে নজরবন্দী হয়েও নির্ভয়ে, দ্বিধাহীন চিত্তে তরুণ থেকে বয়স্কজনেরা এই মহাসম্মেলনে ভীড় করছেন। এইখানেই এই আন্দোলনের সব থেকে বড় হিম্মৎ। অনেক দিন পর দেশের মানুষের কন্ঠস্বর ও দাবি সমস্ত ভয়-ভীতিকে চুরমার করে খোলামেলা আন্দোলিত হতে চাইছে। ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত বিরোধী দলের নেতারা একে একে মঞ্চে এসে বক্তব্য রেখে গেছেন।
খেয়াল করুন, সময়ানুযায়ী আজ ১৯ জুলাই রাতে (ঘড়ি মোতাবেক ২০ জুলাই 12:30 am) বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। সারা বিশ্ব জুড়ে এই উন্মাদনার (বিশেষ করে তরুণদের) মাঝে দেশের GenZদের এক বড় অংশ কিন্তু সেই ফুটবল মাতোয়ারা খানিকটা ছেড়ে (এটা কিন্তু কম কথা নয়) আমাদের এই মহা দুর্দিনে এক অন্যতর শপথ নিয়েছেন: দায়বদ্ধতা। হ্যাঁ, দেশের নেতা-মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতা রাখতে হবে। যদি তাদের বা দফতরের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অংশগ্রহণে দেশ-বিরোধী বা জনগণ-বিরোধী কোনও অপকর্ম হয়ে থাকে, তাহলে সেই মন্ত্রী ও আধিকারিকদের দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাদের বিদায় দিতে হবে। পাশাপাশি এ কথাও উঠেছে, দেশের সংবিধানের শপথ-- ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে লঙ্ঘন করা যাবে না। উত্তরপ্রদেশের দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০ জুলাই লক্ষাধিক মানুষের ঐতিহাসিক সংসদ যাত্রা এক নতুন ভারত নির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। ২১ জুলাই থেকে দেশ বদলাতে থাকবে— অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে পুনরায় তার যাত্রা শুরু হবে।
রাত পোহালেই ২০ জুলাই। আমরা জানি না, রাতে শাসকের কী পরিকল্পনা আছে। অথবা, রাতটুকু নির্বিঘ্নে কেটে গেলেও কাল সকালে কী প্রতীক্ষা করছে। এই মুহূর্তে সোনম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দিপকে, নেহা, আমিন, মনীশ প্রত্যেকে জীবন-সংশয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। সংসদ অভিযান কীভাবে দেশের বর্তমান ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে মোড় ঘোরাতে পারে তা দেখার; কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব থেকে নয়, সঙ্গে এসে মিলেমিশে। এই এখন চলার পথ।



