ধর্মেন্দ্র প্রধান যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বললেন...
অরূপ বৈশ্য
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এক আকস্মিক ও বিস্ময়কর ফেনোমেনন। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম দল বিজেপিকে মোকাবিলা করতে ভারতের তাবৎ বিরোধী দল সমূহ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন জন্ম নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইন্সটাগ্রামে বিজেপির অনুসরণকারী সংখ্যাকে বহু পেছনে ফেলে সিজেপি ২২+ মিলিয়ন অনুরাগীর সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে। আজকের ঘটনাবহুল বিশ্ব আকস্মিকতায় ভরপুর, কোনও কিছুই যেন আগে থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে না।
আরশোলারা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
যা শুরু হয়েছিল অনলাইন তীর্যক কৌতুক হিসাবে, তা আছড়ে পড়ল রাজধানী দিল্লির রাজপথে। যন্তর মন্তরের রাজপথে অবস্থানরত হাজার হাজার বিক্ষোভকারীদের ঘোষণা, 'আমরা এখানেই আছি, যতক্ষণ না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করছেন।'
আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থার বিষাক্ত চাপে ছাত্র-সমাজের অবদমিত ইগো এখন দিশেহারা। বিশিষ্ট বিশ্লেষক প্রতাপ ভানু মেহতা সংবাদপত্র কলামে লিখেছেন, আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থা শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, অসামান্য ভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক হাতিয়ার, যেখানে কী এবং কেন প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই; বিষাক্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থে 'হয় করো, নয়তো মরো'। ফলে, চূড়ান্ত হতাশা ও ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরীভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমে সফল। সে জন্য ককরোচ বিদ্রোহের পেছনে নির্দ্দিষ্ট কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজা বৃথা। শত হিসাব করে বিরোধী দলগুলি যখন দাঁত ফোটাতে ব্যর্থ, তখন নিস্তরঙ্গ জলে ঢেউ তুলেছে ককরোচি ফেনোমেনন।
জেন-জি’র আসল পরিচয়
বলা হয়, ১৯৯৭ থেকে ২০১২-এর মধ্যে যারা জন্ম নিয়েছে তারা জেন-জি এবং ২০১৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম জেন-আলফা। জেন-জি’রা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের দুনিয়ায় প্রথম প্রজন্ম, আর জেন-আলফারা 'মিলেনিয়াল শিশু' যারা অগমেন্টেড রিয়্যালিটি বা ভার্চুয়াল উপাদান উদ্ভূত বর্ধিত বাস্তবতা ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ার বাসিন্দা। 'মিলেনিয়াল শিশু' হচ্ছে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে জন্ম নেওয়া জেনারেশন বা জেন-ওয়াইয়ের সন্তান। স্পষ্টতই এই ধরনের সংজ্ঞা বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার এক বুর্জোয়া পদ্ধতি।
১৯৮০ থেকে ১৯৯০-- এই সময়ের মধ্যে নয়া-উদারবাদী ওয়াশিংটন কনসেনশাস বিশ্বব্যাপী জাঁকিয়ে বসেছে। নতুন প্রযুক্তি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অক্ষম তো বটেই, পুরনো কর্মসংস্থানকেও ছাঁটাই করতে উদ্যত। অতি-উৎপাদনের সঙ্কটে জর্জরিত ও হতাশাগ্রস্ত বিশ্ব-ব্যবস্থাকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে সার্ভিস ও ফিনান্সে দেদার বিনিয়োগে একাংশ নতুন ধনকুবেরদের অফুরন্ত মুনাফা। সার্ভিস সেক্টরে নতুন প্রযুক্তি ও ফিনান্স বাজারে নতুন হাতিয়ার এই বিনিয়োগের সহযোগী শক্তি। পুঁজির কাঠামো ও কার্যপ্রণালীগত বিন্যাস বদলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চরিত্র বদল ঘটল শ্রমিকেরও। পুরনো শ্রমিকের জায়গা নিল নতুন শ্রমিক। এই শ্রমিকরা শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, এদের কাজের ধরন, কর্মস্থল ও সামাজিক পরিসর, জীবনধারা ও জীবনবোধ, আচরণ ও মেজাজ সবকিছুই ভিন্ন। এই নতুন শ্রমজীবীদের কালেক্টিভ সাপ্রেসড ইগো কখন কোথায় কীভাবে বিস্ফারিত হয় তার পূর্বানুমান অসম্ভব না হলেও দুরূহ। ছাত্রদের আচরণ শ্রেণি-উৎস দিয়ে নির্ধারিত, সামগ্রিক সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাত্রদের আচরণে পরিবর্তন হয়, কারণ তারা সরাসরি কোনও উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত নয়– এই নিয়মের কোনও ব্যত্যয় আধুনিক বিশ্বে ঘটেনি। কিন্তু এই নতুন শ্রমজীবীরা শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, সব বিচারেই এরা নতুন। বিশ্বের যে কোনও সামাজিক বিস্ফোরণের ঘটনায় কখনও দৃশ্যমান বা কখনও ফল্গুধারার মতো এরা এক অদৃশ্য কারিগর, অথচ তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ব-পরিকল্পনার কোনও হদিশ পাওয়া দুষ্কর।
নব প্রজন্মের ভারতীয় স্বরূপ
নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে মন্দির-মসজিদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বিজেপি’র উত্থান ও ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠান, তারপরই দেখা যায় সঙ্ঘ-রাজনীতির দ্রুত সামাজিক বিস্তৃতি। তাকে প্রতিহত করার সমস্ত বৈচিত্র্যবাদী বিরোধী প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ধরাশায়ী হয়েছে। দক্ষিণে আঞ্চলিক বুর্জোয়াদের এক উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে বৈচিত্র্যবাদ খানিকটা এখনও টিঁকে আছে। কিন্তু কেন্দ্রীভূত অর্থনীতি এবং নতুন জন্ম নেওয়া মধ্যশ্রেণি এক বিকৃত জাতীয় সমসত্তার রাজনীতিকে দ্রুত প্রাধান্যের জায়গায় নিয়ে আসছে, যাকে বৈচিত্র্যবাদ দিয়ে প্রতিহত করা অসম্ভব। অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভবন যেভাবে পুরনো আঞ্চলিক ও জনগোষ্ঠীয় বুর্জোয়া শ্রেণিশক্তির মেরুদণ্ড দ্রুত ভেঙে দিচ্ছে, তেমনই রেন্ট-শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে এক নতুন জনগোষ্ঠীয় মধ্যশ্রেণির জন্ম দিচ্ছে যাদের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনও স্বার্থের সম্পর্ক নেই, আছে নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক এবং এই শ্রেণি বিকৃত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথ ধরে জাতীয় সমসত্তার রাজনীতিতে সামিল হয়ে যাচ্ছে। এই সমসত্তা 'উইদারিং অ্যাওয়ে অব আইডেন্টিটি' বা পরিচিতির বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া নয়, সম্পূর্ণ অধীনতার প্রক্রিয়া। এই অধীনতায় আত্মস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুধু সাংস্কৃতিক নয়, মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, ফলে সামগ্রিক। সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় জনগোষ্ঠীয় স্তরে সেটা এক নতুন ধরনের পুনরুজ্জীবনবাদ যার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তি ঘটে সনাতনী ভারতে – আর সে জন্যই তথাকথিত আর্যভূমি বা গোবলয়ের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারতের বৈচিত্র্যময় জনজাতি বা আধা-জনজাতিয় সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীরও সামিল হতে কোনও আপাত অসুবিধা হচ্ছে না।
উপরিসৌধে এই অধীনতা সম্মতিসূচক হলেও, অধীনতার নিয়ম অনুযায়ীই তা একইসঙ্গে অবদমনকেও সূচিত করে। আর সেই সার্বিক অবদমনের শিকার এই নব্য শ্রমজীবী নতুন প্রজন্ম-- শ্রমিক হিসাবে কাজের পরিসরে, নাগরিক হিসাবে সামাজিক পরিসরে, পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামোয় শ্রমিক-পরিবারের নারী সদস্য হিসাবে। ফলে, প্রতিরোধের শক্তি এই নব প্রজন্মেরই আছে, যাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে ছাত্রসমাজের গরিষ্ঠাংশ। মধ্যবিত্তরা যে কবেই বৈচিত্র্যকে ধারণ করার প্রাণশক্তি হারিয়েছে তা বহু আগেই বোঝা উচিত ছিল আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক সমাজের।
সমসত্তার রাজনীতি ও প্রতিস্পর্ধী শক্তি
বিরোধী রাজনীতির অগভীর উপলব্ধির জন্যই, রাষ্ট্র ও নাগরিক কিংবা ভোটারের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের জন্য নেওয়া একের পর এক পদক্ষেপে বিজেপি সাফল্য পাচ্ছে, প্রতিটি সাফল্য জনগণকে সঙ্ঘ রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করছে। বিকৃত সমসত্তার রাজনীতির যে বাস্তবতা, তার গর্ভে রয়েছে আধুনিক শ্রেণি হিসাবে আবির্ভূত নতুন মধ্যশ্রেণি ও শ্রমজীবী শ্রেণি। ফলে, প্রতিস্পর্ধী শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এমন এক শ্রমজীবী শ্রেণি যাদের সামূহিক আচরণের কোনও পূর্ব-নির্ধারিত প্রক্রিয়া জানা নেই। আবার ভারতীয় বাস্তবতায় জনগোষ্ঠীয় সীমারেখা একেবারে মুছে যায়নি, বরং পরিচিতি নতুন গণতান্ত্রিক অন্তর্বস্তুকে ধারণ করতে সক্ষম আত্মশক্তির বিকাশের জন্য অপেক্ষা করে আছে। অসমে জুবিন-আবেগ কিংবা বিহারের এসআইআর'এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের স্পৃহা সেই আত্মশক্তিকে চিহ্নিত করে। কিন্তু তাদের ইচ্ছা ও চাহিদাকে বুঝতে অক্ষম রাজনীতি তাদেরকে হতাশ করছে ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করছে। জুবিনের মৃত্যুর ন্যায়বিচারের দাবিতে লাখ লাখ এ ধরনের শ্রমজীবী নতুন প্রজন্মের যুবসমাজের যে রাজপথে ঢল নেমেছিল, তা আসলে তাদের হৃদয়ের অবদমিত ইচ্ছার সামূহিক বহিঃপ্রকাশ, যেখানে অন্তর্নিহিত ছিল তাদের নিজস্ব ন্যায়বিচারের সুপ্ত বাসনা। বিহারের এসআইআর'এ শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল পরিযায়ী শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা, হয়ে উঠেছিল বেনাগরিক হওয়ার বিপন্নতার উদ্বেগে অস্থির। আস্থা রেখেছিল বিরোধীদের উপর, কারণ বিরোধীরা দাবি করেছিল 'ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করা যাবে না'। কিন্ত ক্ষণিকের আবেগে বিদ্রোহে জ্বলে ওঠা তাদের চরিত্রের বিপরীতে বাস্তবে ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিরোধীদের ভূমিকায় তাদের অবদমিত সত্তা নিরুপায় আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
ককরোচ ফেনোমেনন ও গণতন্ত্র
ককরোচ ফেনোমেননে ছাত্ররা গণতন্ত্রের মশাল হাতে নিয়েছে। তিয়েনানমেন চত্বরে ১৯৮৯ সালে ছাত্ররা গণতন্ত্রের জন্য সমাবেশিত হয়েছিল। ছাত্রদের আন্দোলনের সেই সুযোগে সেখানে সমাবেশ ঘটে চিনের শ্রমিকদেরও। চিনের শাসক গুলি চালালে নিহত হয় বিক্ষোভকারী ছাত্ররা, তখন ছাত্ররা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু জমি আঁকড়ে পড়ে থাকা শ্রমিকদের উপর পরবর্তী দীর্ঘসময় বর্বরোচিত অত্যাচার হয়, বিক্ষোভ ব্যর্থ হয়। সেই শ্রমিকরা সামিল হয়েছিল ইউনিয়নের জন্ম দিয়ে। বিক্ষোভে সামিল হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল বোধগম্য ও সচেতন। এই বিদ্রোহ দমনের ফলে শাসনের একনায়কতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়।
দিল্লির চলমান ছাত্র আন্দোলনে সামিল হচ্ছে সেই নব্য শ্রমিকরা। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কীভাবে এবং কোন অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষায় মত বিনিময় করছে সেটা কোনও সংগঠিত ইউনিয়ন প্রক্রিয়া দ্বারা নির্ধারিত নয়। কিন্তু গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে বা প্রসারিত করতে এই প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে এক 'ঈশ্বর প্রদত্ত' মুহূর্ত। অথচ আমাদের বিরোধী রাজনীতি তাতে এককাট্টা হয়ে সামিল হতে, অন্তত 'ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই' এই আশু দাবিতে আন্দোলনের বিজয় অর্জনের পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে দোদুল্যমান (অথচ, এই আশু দাবিটি যদি অর্জিত হয় তবে ভারতীয় রাজনীতি কিন্তু এক মোড় ঘোরানো পথে এগোতে থাকবে)। কেউ কেউ সামিল হচ্ছে নিজেদের সাংগঠনিক ফায়দা তোলার মানসিকতায়। তবে আশার কথা এই যে, বিভিন্ন সামাজিক ক্যাটাগরির সংগঠন ধীরে ধীরে এই আন্দোলনে সামিল হচ্ছে।
স্থানকালের নিরিখে বর্তমান ভারত আর ১৯৮৯-এর চিন এক নয়। বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারতীয় সমাজ ও তার বিকাশের পথও ভিন্ন। নয়া-উদারবাদ ব্যর্থ হয়ে সমগ্র বিশ্ব এক অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে এগোনোর মাধ্যমে কিংবা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগে যদি আন্দোলন ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও একনায়কতন্ত্রের প্রবণতা সাময়িকভাবে হলেও আরও শক্তি সঞ্চয় করবে। আশা করা যায়, গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধী শিবিরের বোধোদয় হবে।



