আশা না নিরাশা?
রাজীব ভট্টাচার্য
বিশ্ব শ্রম সংগঠন বা আইএলও'র সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে অনিশ্চয়তা সূচক (যা মূলত আর্থিক ও নীতি নির্ধারণকারী ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল) ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ থেকে অভূতপূর্ব স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে মন্দা ও কোম্পানিতে নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস এবং ভোগব্যয়কে দুর্বল করে দিতে পারে। সর্বোপরি, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাবে ক্ষতির ঝুঁকি শ্রমের বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।
উচ্চশিক্ষা উন্নত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশার সম্ভাবনা জাগালেও, তা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই বেকারত্ব হ্রাসে অক্ষম। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারের চাইতে কম। কিন্তু এই চিত্রটি অপেক্ষাকৃত অল্প আয় বা মধ্য আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে একইরকম নয়। এই সমস্ত দেশগুলিতে স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেওয়ার হার যথেষ্টই কম। বর্তমানে এর সঙ্গে জুড়েছে তরুণ প্রজন্মের চাকরিজীবীদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বিশেষ করে প্রথমবার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণকারী উচ্চ দক্ষ পেশার ক্ষেত্রে।
সাম্প্রতিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসাহের মূল কারণ হল, দ্রুত হারে গণনার খরচ হ্রাস পাওয়া। ফলে, গণনার ক্ষমতা এবং তথ্য সঞ্চয় ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং)। তাছাড়া বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত হারে প্রয়োগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের পথকে প্রশস্ত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় দ্রুত হারে হ্রাস পাওয়াতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করে উচ্চশিক্ষিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বাজারে জোগান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে ।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এসি মোগলু এবং রেস্ট্রেপো (২০১৮) কর্মসংস্থানের বাজারের উপর এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন:
(ক) স্থানচ্যুতি প্রভাব বা ডিসপ্লেসমেন্ট ইফেক্ট;
(খ) উৎপাদনশীলতা প্রভাব বা প্রোডাক্টিভিটি এফেক্ট এবং
(গ) দক্ষতা সম্পূরক প্রভাব বা স্কিল কম্প্লিমেন্টারিটি এফেক্ট।
স্থানচ্যুতি প্রভাব সরাসরি নতুন প্রযুক্তির শ্রমিক দ্বারা পুরাতন শ্রমিকদের প্রতিস্থাপনকেই বোঝায়। এই প্রভাবের ফলে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় প্রভাবটি এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার ফলে এই দক্ষতায় পারদর্শী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া যা শ্রমের বাজারকে উদ্বুদ্ধ করবে। তৃতীয় প্রভাবটি মানুষ ও যন্ত্রের পরস্পরের প্রতি সম্পূরক সম্পর্কের কথা বোঝায়। এই নতুন প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান প্রতিস্থাপিত না করে যদি তার সম্পূরক হয়ে উঠতে পারে তবে তা নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই তিনটি প্রভাবের মধ্যে প্রথম প্রভাবটি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব দুটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি শেষ দুটি প্রভাব প্রথম প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে।
ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি টিসিএস সম্প্রতি ২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৩,৪৬০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে, যার মূল কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিবিড় প্রয়োগ। ওরাকেল'এর মতো বিশ্ব বিখ্যাত আইটি কোম্পানিও প্রায় ১২,০০০ কর্মীকে ওই একই কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং ইনফোসিস এর মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও।এই কোম্পানিগুলি দক্ষতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ায় গতানুগতিক কাজ, কোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সম্পন্ন করতেই বেশি আগ্রহী। তাই দৈত্যাকার আইটি কোম্পানিগুলি ছাড়াও অ্যামাজন (গত ৬ মাসে ৩০ হাজার), ব্লক (৪০০০'এর বেশি), ড্রপবক্স (৫০০'এর বেশি) কর্মচারী ছাঁটায়ের পথে হেঁটেছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীদের বেকারত্ব তাদের মনোবলে আঘাত হানবে, কোম্পানির প্রতি আনুগত্যকে দুর্বল করবে এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের অবক্ষয় বৃদ্ধি করবে। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল'এর মতে, কর্মহীন ইঞ্জিনিয়ার ও দ্রব্য পরিচালনকারীরা দ্রুত নতুন স্বাধীন বিনিয়োগ বা স্বতন্ত্র উদ্যোগে উদ্যোগী হবে। আবার অনেকের মতে, এই বেকারত্বের মূল কারণ সীমিত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা-জোগানের অমিল। যদি ভারতীয় অর্থনীতি এর সঙ্গে নিজেকে মানানসই না করে তুলতে পারে তাহলে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার সাথে সেবার রফতানি হ্রাস পাবে ও শহরাঞ্চলের ব্যয়ের গতিও মন্থর হবে। এর ফলে ভারতবর্ষ সেই পূর্ববর্তী মধ্য-আয় বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। ফলস্বরূপ, ভারতের বেকারত্বের হার এপ্রিল ২০২৫'এ ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৬.৯ শতাংশ এবং জুন মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭.১ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক যুব বেকারত্ব মে মাসে ১৭.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশ।
টেসলা এবং স্পেস এক্স'এর কর্ণধার এলন মাস্ক'এর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজকে একটি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করবে এবং সম্ভবত আমাদের কারওরই সেই অর্থে আর কাজ থাকবে না। এনথ্রপিক'এর সহ প্রতিষ্ঠাতা দাড়িও আমোদেই এর মতে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট কলার কর্মীরা তাদের চাকরি হারাবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা জিওরজিয়েভার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুনামি সারা পৃথিবীতে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকের এক বিরাট অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের (যেমন স্টিম ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ শক্তি দ্বারা যন্ত্র চালিত তাঁত, মোটর যানবাহন, বেতার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট) চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব অনেকাংশেই আলাদা। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যত সংখ্যক কর্মসংস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তার থেকে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তাই স্থায়ী প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ধারণাটি কখনই বাস্তবায়িত হয়নি।
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল লক্ষ্য হল, অনিয়মিত জ্ঞানীয় কাজ (non-routine cognitive task) অর্থাৎ প্রতিদিনের বাঁধা-ধরা নিয়মের বাইরে যে সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতার প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের উচ্চ সারির দক্ষতাযুক্ত কাজগুলিকে অতি দ্রুত এবং ব্যাপক আকারে প্রতিস্থাপিত করা ও দ্রুতগতিতে তার উন্নতি করা। অনেকের মতে, এর ফলে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। অতি সম্প্রতি ICRIER (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভারতের দশটি শহরে ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের উপর জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের ধারণা পাওয়া। এই সমীক্ষাটি কিন্তু ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশাল আকারে কর্মসংস্থান হারানোর ধারণার পরিপন্থী। বরং নতুন প্রযুক্তিকে ভিন্ন আকারে ঢেলে সাজানো বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে উন্নততর কাজে নিয়োগেরই নিদর্শন দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে খরচ, প্রতিভার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কারণে।
নীতি আয়োগ'এর সাম্প্রতিকতম একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫'এর মাঝামাঝি প্রায় ৭৮,০০০ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ হারিয়েছেন (প্রায় ৫০০ মানুষ প্রতিদিন)। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছাঁটাই অথবা নতুন কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কারণে আইবিএম, মাইক্রোসফট, সিটি ব্যাংক গ্রুপ, জিপি মরগান, গোল্ডম্যান স্যাক্স'এর মতো সংস্থাগুলি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের মতে, ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, মানব প্রতিনিধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করতে সক্ষম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যমণি। শিল্প, সেবা, অর্থ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার বিরাট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মানের যে মডেলগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে নিরাপত্তার দিকটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যাপক কৌশলের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নীতি আয়োগের লক্ষ্য তিনটি মূল স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল-
(ক) বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় সমস্ত স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত হারে প্রসার;
(খ) ভারতকে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক আকর্ষণীয় পীঠস্থান হিসেবে উন্নীত করা ও
(গ) বিরাট মাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বা নৈপুূণ্য বৃদ্ধির কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা যার মূল উদ্দেশ্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া।
তাই এখন দেখার, বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য যে পরিকল্পনাগুলি নেওয়া হয়েছে তার দ্রুত রূপায়ণের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে প্রতিস্থাপক নাকি পরিপূরক কোনও ভূমিকা পালন করে।



