'সস্তা ভালো দামিও ভালো'
মালবিকা মিত্র
দেশকালের যাত্রাপথটি বোধকরি আঁধারে পথ হারিয়েছে। আর, একবার দিকভ্রান্ত হলে তখন সত্য মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সব গোলেমালে হরিবোল হতে বাধ্য। ভাবুন না, আমার বন্ধুর সন্তান এক নামী কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত। খবরের কাগজে দেখলাম, সেই সংস্থায় ১৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই হবে। আমি একটু চিন্তিত, ফোন করে জানতে চাইলাম সঠিক ব্যাপারটা। সে বলল, মানি, তোমরা এসব চাপ নিও না। এদের কাজ যাওয়াই উচিত। এদের একাংশ উঁচুতে মাথায় বসে আছে, কোম্পানির কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। আর দ্বিতীয় কথা হল, এক্সেস স্টাফ, যাদের কমানো উচিত। এদের কাউকে দিয়ে কাজ হয় না। আমাদের এ নিয়ে চিন্তা নেই, তোমরাও চিন্তা করো না।'
অবাক লাগল, ১৯ হাজারের কর্মচ্যুতি আর কেমন নির্বিবাদে কর্তাদের মতো যুক্তি দেখাচ্ছে একজন কর্মচারী। এত আনুগত্য কোম্পানির প্রতি? আমাকে ব্যথিত করেছিল। যখন গভীরভাবে ভাবতে গিয়েছি, বন্ধুর সন্তানের এ হেন আচরণের যুক্তিপূর্ণ এক ব্যাখ্যাও পেয়েছি। যেমন,
এক: জনৈক ঘটক পাত্রীর বাবা-মা'কে বলছে-- খুব ভালো পরিবার, পাত্রের আগে পরে কোনও ভাইবোন নেই। কিছুদিন আগে মা মারা গেছে, ফলে শাশুড়ির ঝামেলাও নেই। একমাত্র ছেলে মানে যা কিছু বিষয় আশয় সবই তো তারই। পরিবারের চার চাকার গাড়ি আছে। ছেলে নিজেদের গাড়িতেই অফিস যায়। ড্রাইভার আছে, গাড়ি দরকার মতো ফেরত পাঠিয়ে দেয়। মেয়ে আমাদের ঘুরবে ফিরবে, আনন্দ করবে, বুড়োবুড়ির ঝামেলাও নেই। বাবাও বেশ সক্ষম শক্তপোক্ত। বুঝলাম, এটার নাম ভালো পরিবার। পারিবারিক দায়দায়িত্ব না থাকার নাম ভালো পরিবার। নির্ভরশীল বুড়োবুড়ি না থাকার নাম ভালো পরিবার। এটা হল এই যুগের একটি নমুনা।
দুই: আমরা ছোটবেলা থেকে হোটেল রেস্তোরাঁ'র বিজ্ঞাপনে দেখতাম লেখা থাকত-- আহারে তৃপ্তি, সম্পূর্ণ ঘরোয়া রান্না। খেয়ে মনে হবে ঘরেই খেলাম। এমনই এক রেস্তোরাঁ'র বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন লিখেছিলাম আমি: 'Come on any day,/ on the way.../ Far from home/ but not away.'। আর এখন রান্নার মশলা থেকে শুরু করে ইউটিউবে রান্নার টিপস দিতে গিয়ে লেখা হয়-- একদম রেস্টুরেন্টের স্টাইলে, ধাবার স্টাইলে, ঘরে বসে রান্না করুন। মা বোন মেয়েকে তাদের মতো করেই ঘরে দেখতাম, রূপোলি পর্দার নায়িকাদের মতো করে নয়। কিন্তু এখন বোধ করি সেই ভেদটা থাকছে না। বাড়ির মেয়ে বউরাও কেমন যেন রূপোলি ঝলমলে হয়ে উঠেছে।
তিন: আমার বান্ধবী একই বিদ্যালয়ে একনাগাড়ে ৩৪ বছর চাকরি করে অবসর নিল। তার সন্তান বুঝতে পারে না, মানুষ কীভাবে একই অফিসে এ ভাবে এত সুদীর্ঘ দিন কাটাতে পারে। পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটেও তো মাঝে একদিন রেস্ট ডে থাকে। এটা টি-টোয়েন্টির যুগ। How is it possible to continue such a boring and dragging life! Disgusting!! হয়তো বা আমাদের সুদীর্ঘ ৪০ বছরের বিবাহিত জীবন দেখেও ওদের এমনই মনে হয় আজকাল।
মনে পড়ে যায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ছোটগল্প 'খাজাঞ্চিবাবু'। একটি কারখানা এবং তার পুরনো খাজাঞ্চির জীবন-জীবিকার পরিবর্তনের করুণ আখ্যান। নতুন ম্যানেজারের আগমনে পুরনো দিনের রীতিনীতি ও কর্মচারীদের আন্তরিকতার কদর হারিয়ে যাওয়ার বাস্তব চিত্র এই গল্প। খাজাঞ্চিবাবু বহু বছরের পুরনো এক অকৃত্রিম, নিষ্ঠাবান ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের মানুষ, যিনি পরিবর্তনের স্রোতে কর্মচ্যুত হলেন। বিদ্যালয়ের নবম দশম শ্রেণীর ক্লাসে এই গল্পের পাঠ নিতে কেন এই প্রজন্মের মধ্যে সাড়া জাগতো না, তা এখন বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারি। বুড়ো খাজাঞ্চিবাবু, হাড় জিরজিরে বুড়ো মহেশ, লড়ঝড়ে সকলের ব্যঙ্গ ও পরিহাসের পাত্র বিমল ও তার জগদ্দল, গোবিন সিংয়ের বেতো বুড়ো ঘোড়া, এসব পড়িয়ে, এসবের পাঠ দিয়ে নতুন প্রজন্মকে কিছুই অনুপ্রাণিত করতে পারিনি। আসলে কবি ঠিকই বলেছিলেন: 'মানুষের হৃদয়কে না জাগালে পরে/ তাকে ভোর পাখি অথবা বসন্তকাল বলে/ আজ তার মানবকে/ কি করে চেনাতে পারে কেউ?'
আসলে জমি তৈরি না করে ওপর ওপর বীজ ছড়িয়েছি শুধু।
রেস্তোরাঁ ধাবা যদি ঘরে ঢুকে পড়ে, রূপোলি পর্দার নায়িকা যদি ঘরে এসে যায়, ঘরটা যদি হোটেল-রিসর্ট'এর সাজে সেজে ওঠে, তখন কোম্পানির কর্মচারীর মুখে কোম্পানির মালিকের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। যাবেই, এটাই স্বাভাবিক। অফিস স্টাফ ওভার-ক্রাউডেড মনে হলে, বাড়িতেও স্বল্প বেতনের কোনও সদস্য বা কর্মক্ষমতাহীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, সবকিছুই মনে হবে ওভার-ক্রাউডেড। এভাবে রেল, ভেল, বিএসএনএল, যেখানে যত মানুষ কাজ হারায় আমাদের আর নাড়া দেয় না, ওভার-ক্রাউডেড যুক্তির কারণে। কেবল নাড়া দেয় তখন, যখন আমি সেই ওভার-ক্রাউডের দলে শামিল হই।
প্রশ্ন করেছি, কেন কোলেটারাল ড্যামেজ সবসময় জনজাতি আদিবাসীর উপর হয়, কেন বস্তিবাসীর ওপর হয়, কেনই বা নিম্নবিত্ত গরিব চাষীর উপর হয়? কখনও কোলাটারাল ড্যামেজে পার্লামেন্ট রাজভবন ভাঙ্গা পড়ে না তো! এই মানসিকতা থেকেই বলা হয়, দেশের শিল্পপতিরা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে যদি পরিশোধ না করে, তা অনাদায়ী ঋণ। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই সমস্ত ঋণকে 'রাইট অফ' করে। এই প্রসঙ্গে আমার ওই বন্ধুর সন্তান বলেছিল, এটা তো যুক্তিসঙ্গত। কারণ, তুমি তো শিল্প করবে না। শিল্প করবে বড় বড় শিল্পপতিরা। তারা ঋণ শোধ করেনি বলে তুমি যদি তাকে নতুন করে ঋণ না দাও তাহলে তো নতুন শিল্প হবে না। যখনই সে ঋণ নিতে যাবে, কম্পিউটারের সিস্টেমে তার পুরনো ঋণ অনাদায়ী দেখাবে। ফলে, তার নতুন ঋণ আটকে যাবে। তাই পুরনো হিসেবপত্র সরিয়ে রাখতে হবে সিস্টেম থেকে। তবেই নতুন ঋণ, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান হবে। কী অসাধারণ যুক্তির প্রয়োগ।
ঠিকই বলছে। ন্যায়-নীতি মূল্যবোধ দিয়ে দুনিয়াকে বিচার করা যাবে না। কিন্তু ওরাই আবার প্রশ্ন তোলে, এই বাংলায় কাজের সুযোগ নেই। সবাই বাইরে চলে যাচ্ছে। ওকেই যখন প্রশ্ন করি, বাইরে যদি এতই কাজের সুযোগ তাহলে সারা ভারতে বেকারত্ব বৃদ্ধির গড় এত উচ্চ হারে থাকে কী করে? আর এই বাংলার বেকারত্বের হার সারা দেশের গড়ের চেয়ে নিচে হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না বন্ধুর ছেলে। এ রাজ্যে এসএসসি থেকে শুরু করে সর্বত্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। সর্বত্র কীভাবে ঘুষ দুর্নীতি চলেছে তা নিয়ে মুখর। কিন্তু ওই আবার কর্পোরেট মহলের ব্যাঙ্কের টাকা চুরি, ইলেক্টোরাল বন্ড আর আমেরিকার লবিইজম মেনে নেয়। বিচিত্র যুক্তির সমাহার। আসলে কি এই যুক্তির পিছনে স্বার্থান্বেষী শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি খুব প্রবল ভাবে কাজ করে?
আসলে, বেশ কয়েক বছর হল, মধ্যবিত্ত বাঙালি যারা নিরুত্তাপ, নিরুপদ্রব, ঝুঁকিমুক্ত জীবন যাপন করত, তারা নন-ব্যাংকিং সেক্টরে অর্থ লগ্নী করে দ্রুত অর্থ উপার্জনে আগ্রহী হল। দেখলাম, এদের কেউ কেউ সারাক্ষণই শেয়ার বাজারের উত্থান পতন নিয়ে চিন্তা করে। শুনেছি, এদের অনেকেই ভুরি ভুরি অর্থ অপচয় করেছে শেয়ার পতনের মধ্য দিয়ে। বলতে শুনেছি, এই মার্কেটে তো ওঠানামা থাকেই। এইটুকু ঝুঁকি মেনে নিতেই হবে। ফলে, সে ঝুঁকি থেকে বাঁচতে আরও বড় ঝুঁকি, তারপর ফাঁকি, আরও বড় ফাঁকি, চুরি-ডাকাতি-স্ক্যাম, দেশ থেকে পলায়ন।
এইভাবেই চলেছে দেশ। যারা অর্থবান অথবা দ্রুত অর্থবান হতে উন্মুখ, তারা বড় বড় ঘোটালা তৈরি করে। সেই ঘোটালার আবার স্তর ও শ্রেণি ভাগ আছে। যারা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য টাকা নেয়, তাদের আবার ব্যাঙ্ক খালি করে দেওয়া চোরেরা পছন্দ করে না। দুর্নীতিরও স্ট্যাটাস আছে। আজকাল উঠতি বাঙালি নব্য ধনীরা যতটা নিয়োগ দুর্নীতি বা ছিঁচকে তোলাবাজি নিয়ে সোচ্চার, ততটাই আবার কর্পোরেট ডাকাতি (যাকে 'স্ক্যাম' বলে আদুরে সম্বোধন করা হয়) নিয়ে ততোধিক নীরব বা গোপন সমর্থক। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি না করেও একটি রাজ্যে রাজ্যপালের হাতে ক্ষমতা অর্পণ, নির্বাচন কমিশন দ্বারা রাতারাতি মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ কমিশনার, জেলা শাসক, সকলকে অপসারণ-- এইসব নব্য ধনীদের চোখে খুবই স্বাভাবিক। আইনক্স, আউটিং, উইকএন্ড, লং-ড্রাইভ, পার্টি সেলিব্রেশন, ধাবা, রিসর্ট, সুইগি, জোমাটো, শপিং মল, আইফোন যখন জীবন জুড়ে, তখন তা জোগানোর অফুরন্ত অর্থ তো আসবে কর্পোরেট স্ক্যামের ভাণ্ডার থেকেই। তাই, স্ক্যাম ভালো, কাটমানি খারাপ। আমরা যারা দুটোকেই পরিত্যাজ্য ভাবি ও ঘৃণা করি, তাদের আবার স্ক্যামওয়ালা'রা পোঁছে না। আর নিম্নবর্গের একাংশ যাদের এগুলির সামর্থ্য নেই, কিন্তু এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত, তারাও এই জীবনের রেপ্লিকা, মানে রাংতার মুকুট পরে তৃপ্ত হতে চায়, সন্তুষ্ট থাকে। অতএব, 'এই দুনিয়ায় সবই ভালো/ সস্তা ভালো দামিও ভালো/ আসল ভালো নকল ভালো।'
সরকারি কোষাগারের অর্থ বেশি বেশি জনকল্যাণে যাবে, নাকি কর্পোরেটের সুযোগ-সুবিধায়-- এই তর্কের আধারেই দেশের যাবতীয় কোলাহল। এই তর্কের পরিণতিতেই নব্য ধনীরা সোচ্চারে কর্পোরেট স্ক্যামের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে, দুর্নীতির গ্রাহ্য ও অগ্রাহ্য বর্গ তৈরি করে। কিন্তু আপামর সাধারণ মানুষের জনকল্যাণ পেলে মস্ত লাভ। আপনি যে বিত্তেরই হোন, যুক্তির নিরিখে আপনি কোনদিকে সে আপনার চয়ন।




