নীট দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো
প্রশান্ত ভট্টাচার্য
কোথাও চাকরি তো কোথাও ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি। 'ডবল ইঞ্জিন' সরকারের জমানাতেও... হয়েই চলে।.২০২৪'এর পর ২০২৬। নির্দিষ্ট করে বললে, ঠেকানোর সদিচ্ছাই নেই। নইলে এসব 'করিয়ানরা' সরকার বাহাদুরের বদান্যতায় প্রাইজ পোস্টিং পান! এই তো অচ্ছে দিন!
এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁসে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের স্নাতক স্তরের ডাক্তারির প্রবেশিক পরীক্ষা নীট (ইউজি) হয়েছিল গত ৩ মে। ৯ দিন কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশ জুড়ে চলতি বছরের নীট (ইউজি) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মোদী সরকারের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা বাতিলের কথা ঘোষণা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)।
কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের ভার সিবিআইকে দিয়েছে। সিবিআই তদন্তও শুরু করে দিয়েছে। যারা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে বিজেপির এক নেতাও আছে। যদিও বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দেওয়াটাই এখন প্রশাসনিক দস্তুর। বিজেপি যে জড়িত, এটা আমার কষ্টকল্পিত নয়, রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত এক্স-এ একটি পোস্টে দাবি করেছেন, 'নীট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত দীনেশ বিনওয়াল ভারতীয় জনতা পার্টির একজন কর্মকর্তা।' গেহলত অভিযুক্তের একটি পোস্টারের ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে জয়পুর গ্রামীণ এলাকার বিজেওয়াইএম-এর জেলা সম্পাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি মুকেশ দধিচ বলেছেন, দলে বিনওয়ালের কোনও পদ নেই।
এবার নীট (ইউজি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের এপিসেন্টার রাজস্থান। বিজেপি শাসিত রাজস্থান। যেখানে বিরোধীদের ট্যাঁফোঁ করতে দেওয়া হয় না। আমি নিশ্চিত, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত হইচই না করলে আরও অনেক কিছুর মতো এই কেলেঙ্কারিও চাপা পড়ে যেত। এতদিনে হয়তো প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলও প্রকাশ পেয়ে যেত; কেননা, ৩ মে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা উঠে এসেছিল কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। বাংলা জয়ের গর্বে বলীয়ান বিজেপি সেই বিজয়বার্তা সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার ধামাকায় নীট কেলেঙ্কারি চাপা দিয়ে ফেলেছিল প্রায়। তবে শেষরক্ষা হল না। পরীক্ষার ৮ দিন পর ১১ মে এনটিএ জানিয়েছে, পরীক্ষা বাতিল আর ১২ মে জানিয়েছে, ফের নীট (ইউজি) পরীক্ষা কবে তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। কবে অ্যাডমিট কার্ড পাওয়া যাবে ও পরীক্ষার সময়সূচিও জানিয়ে দেওয়া হবে। নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। নতুন করে পরীক্ষার ফি-ও দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। কী মহানুভবতা!
লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী যথার্থই নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসে কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় তোপ দেগে এক্স-হ্যান্ডেলে রাহুল লেখেন, 'নীট ২০২৬ সালের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। ২২ লাখের বেশি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নকে দুর্নীতিগ্রস্ত বিজেপি সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাবারা তাঁদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঋণ নিয়েছেন, মায়েরা তাঁদের গয়না বেচে দিয়েছেন। লাখ লাখ বাচ্চারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেছে। বদলে কী পেল তারা? প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারের গাফিলতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগঠিত অপরাধ। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রত্যেকবার পেপার মাফিয়ারা বেঁচে যায় আর সৎ পড়ুয়ারা সাজা পায়। ফের লাখ লাখ পড়ুয়াকে মানসিক চাপ, আর্থিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। যদি কারও ভাগ্য কঠোর পরিশ্রমের বদলে অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাদের যোগাযোগ কতটা তার উপর নির্ভর করে, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? প্রধানমন্ত্রীর 'অমৃতকাল' দেশের জন্য বিষ কালে পরিণত হয়েছে।'
সর্বভারতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও স্বচ্ছতা আজ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে সিবিআই'এর প্রধান কাজটিই হবে, এই দুর্নীতির মাথাদের বাঁচানো। অতীতে বহু তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআই এই কাজটাই করে এসেছে। আর লক্ষ করবেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এ ব্যাপারে কোনওরকম হইচই করছে না। টিভির পর্দায় কোনও চিৎকারজীবী বলবে না, 'দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? যুব সম্প্রদায়ের তো চাকরি নেই। ভারতের বেকারত্বর হার সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। ডাক্তারি কোর্সে পড়তে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েরা টাকা খরচ করছে। এবছর নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। কেন্দ্রীয় সরকার কী বলছে? ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি কি প্রশ্নপত্র নিলামে চড়িয়ে দিল?' কেউ দাবি করবে না, কেন্দ্রকে এর জবাব দিতে হবে। খোলসা করতে হবে, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, থাকলে সেই পৃষ্ঠপোষক কারা?
নীট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে গোটা দেশে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। বেনজির অনিয়মের অভিযোগে যখন লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, দেশ জুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। খাস রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই প্রথম নয়। নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশ জুড়ে শোরগোল পড়েছিল। সে সময় অভিযোগ ওঠে, ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের ওয়েসিস স্কুল থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ওই স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মীকে গ্রেফতার করে সিবিআই। সিবিআই নীটের বেশ কিছু আধপোড়া প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছিল। সেই প্রশ্নপত্র খতিয়ে দেখার পর ঠিক কোন কেন্দ্র থেকে ফাঁস হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সিবিআই তখন দাবি করেছিল, পঙ্কজ কুমার ওরফে আদিত্য ওরফে সাহিল নামে এক যুবকের সঙ্গে মিলিত ভাবে ওয়েসিস স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মী প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। এবারও তদন্তর মতিগতি দেখে ২০২৪ সালের কথাই মনে পড়ছে।
রিসাইকল অফ মেমোরি যেন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত। আর এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে বেশ কিছু 'ভদ্রবিত্ত' মানুষের নাম। যেমন মনে পড়ছে সুবোধ কুমার সিংয়ের কথা। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র প্রাক্তন এই প্রধানকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও বিস্ময়কর মোড় নিয়েছে। ১৯৯৭ ব্যাচের ছত্তিশগড় ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার সুবোধ কুমার সিং। আইআইটি রুরকির মতো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর ইগনু থেকে এমবিএ করা এই আধিকারিক এক সময় প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খনিজ সম্পদ নিলামে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে সাফল্যের জন্য তিনি জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে পুরেছিলেন। ২৯ বছরের কেরিয়ারে ৩০টির বেশি সম্মানীয় পদে কাজ করেছেন। মোদী জমানায় তাঁর কেরিয়ার গ্রাফ দেখবার মতো। ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি এনটিএ-র ডিরেক্টর জেনারেল পদে আসেন। আর তিনি যখন এই দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই যেন দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর কার্যকালেই ভারতের কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষামূলক কেলেঙ্কারিগুলো দানা বাঁধে। ২০২৪ সালের নীট-ইউজি এবং ইউজিসি-নেট পরীক্ষার সময় যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। নীট পরীক্ষায় দেড় হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীকে বিতর্কিতভাবে 'গ্রেস মার্কস' দেওয়া, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নেট পরীক্ষা বাতিল করা এবং বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রের জাল বিস্তার— সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনটিএ তখন কেবল অস্বীকারের রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে সেই বছরের জুন মাসে মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রক স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এটি একটি 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা'। চাপের মুখে ২০২৪ সালের ২২ জুন সুবোধ কুমার সিংকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে 'কম্পালসরি ওয়েট'-এ পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা হয়, লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে হয়তো কঠোর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে মোদী সরকার যেন স্বচ্ছতার পথে হাঁটল। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুলে যায় বা জানেই না, আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা এক জটিল সমীকরণ নিয়ে চলে। তাই সুবোধের ওই অপসারণটি আদৌ কোনও শাস্তি ছিল না, ছিল আইওয়াশ। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীনই ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছাত্র ও অভিভাবক মহলে এটি 'শাস্তির বদলে পুরস্কার' হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। শুধু ওইটুকুই নয়, ২০২৪ সালের শেষে সুবোধ কুমার সিং কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন ছেড়ে তাঁর পুরনো ক্যাডার ছত্তিশগড়ে ফিরে যান। সেখানে তখন বিজেপির নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মোদী-শাহর আস্থাভাজন বিষ্ণু দেও সাই। সেই সরকার গঠন হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি 'মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব' (Principal Secretary) পদে বসানো হয়। প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এই পদটি কতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন তা নিশ্চয়ই পাঠককে বলে দিতে হবে না। শুধু এটুকুই নয়, সুবোধ সিংয়ের অগ্রগতি চলছেই। ২০২৬ সালে তাঁর পুরস্কারের বহর আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের ৬ মে এক সরকারি নির্দেশে তাঁকে ছত্তিশগড় রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভেবে দেখুন, ঠিক কোন সময় তাঁর ঘাড়ে এই বিশেষ দায়িত্ব বর্তাচ্ছে! যখন ২০২৬ সালেও নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে দেশ উত্তাল, সেখানে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানের এমন লাগামহীন উন্নতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, গেরুয়া ভারত কোন রসাতল অভিমুখী। সুবোধ সিং নাম্নী এই আধিকারিকের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ ছিল, আজ তিনি একটি গোটা রাজ্যের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বাজেট আর নীতি নির্ধারণের সর্বেসর্বা। যেখানে এটা ২০২৪-এর দুর্নীতির ফসল, সেখানে ২০২৬ সালের এই নতুন পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুবোধ কুমার সিংয়ের পদোন্নতি এক অশুভ সংকেত বহন করছে।
মনে রাখবেন, পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ভারতে অন্তত ১৫টি বড় সরকারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ কোটি পরীক্ষার্থী।






