পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির
যে দিকগুলি আমরা জানি না
কৌশিকী ব্যানার্জী
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি নিয়ে নানাবিধ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার রয়েছে। অথচ, এই রাজ্যের বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করে অর্থনীতির চিত্রটিকে যদি যথাযথ বিন্যস্ত করা যায়, তবে এমন অনেক অনালোচিত দিক উদ্ভাসিত হয় যা বহু সাজানো মিথ্যার ধারণাকে ভেঙে দেয়। সেই সব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম আলোচিত বিষয়গুলিকেই এই নিবন্ধে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গের যথার্থ একটি বাস্তব ও সম্ভাবনাপূর্ণ (কিছু দুর্বলতা সহ) ছবিকে পরিস্ফূট করে।
পাহাড়, মালভূমি থেকে সমুদ্র-- সব নিয়ে সমগ্র ভারতের পর্যটন মানচিত্রে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ভারত সরকারের পর্যটন দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের পর সব থেকে বেশি বিদেশি পর্যটক আসেন পশ্চিমবঙ্গে (গত ২০২৩-২৪'এ ২.৭১ মিলিয়ন); অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও দেশের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। পূর্ব-ভারত ভ্রমণে সব থেকে বেশি পর্যটক এ রাজ্যেই আসেন, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি পর্যটক মিলিয়ে যা ২১.৮ শতাংশ। দেশের মধ্যে সব থেকে বেশি হোমস্টে পশ্চিমবঙ্গে (৫৩২২)। ২০২৪'এ আমাদের রাজ্য বৈদেশিক পর্যটন থেকে ৩৫.০১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। বলাই বাহুল্য, পর্যটন শিল্প পশ্চিমবঙ্গে হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন ও লজিস্টিক এবং হস্তশিল্প সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে।
শান্তিনিকেতন ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতে সাংস্কৃতিক পর্যটন এবং গ্রামীণ উদ্যোগ সমূহ, বিশেষত স্থানীয় কারুশিল্পীদের আয় বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের (UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) আয় ২০২৪ সালে ২১.২ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ২৪.৬ কোটি টাকায় পৌঁছয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ধর্মীয় পর্যটনে জোর দেওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যাতেও ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে; ২০২৪ সালের ১.৭৪ লক্ষ থেকে বেড়ে দর্শনার্থীর আগমন ২০২৫ সালে ২.০৮ লক্ষ হয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ যেহেতু অগ্র ও পশ্চাৎ সংযোগ ঘটায় তাই তা রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আতিথেয়তা, পরিবহন, হস্তশিল্প ও খুচরা ব্যবসার মতো সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে এই রাজ্যের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এটি কেবল রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকেই (GDP) বৃদ্ধি করেনি, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির (inclusive growth) অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে। শ্রম-নিবিড় হওয়ার কারণে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট শিল্পসমূহ এই রাজ্যে ২৮ লক্ষেরও অধিক মানুষকে কর্মসংস্থান জুগিয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের এক উল্লেখযোগ্য অংশ।
তদুপরি, সুন্দরবন, ডুয়ার্স ও পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। হোমস্টে, ইকো-লজ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রকল্পগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউনেস্কো কর্তৃক ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত দুর্গোৎসব বাংলার অর্থনীতির এক বৃহৎ শক্তি। এটি খুচরো বাণিজ্য, আতিথেয়তা, পরিবহন ও হস্তশিল্প— এই ক্ষেত্রগুলোকে সমৃদ্ধ করে তোলে। এমনকি, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। অর্থনীতিবিদ অজিতাভ রায়চৌধুরীর মতে, ২০২৪-র তুলনায় ২০২৫-এ পুজোর সময় ব্যবসায়িক লেনদেনের আর্থিক মূল্য অন্তত ৮-১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গাপুজোর সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড পরিমাণে বিদেশি পর্যটক আসেন, মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে। একটি ভ্রমণ সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ সালে ২৭ লাখ থেকে বেড়ে এ পর্যন্ত রাজ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন সংখ্যা ৩২ লাখে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, হাজার হাজার কোটি মূল্যের ব্যবসা বাণিজ্য হয় এই উৎসবকে ঘিরে।
উপরন্তু, দেশিক বাণিজ্যের বিষয়ে নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বাণিজ্য, রফতানি ও রিয়েল এস্টেট বিগত এক দশকে জিডিপিতে সর্বাধিক মূল্য সংযোজন করেছে। ভারতের রফতানি ক্ষেত্রে এ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ অর্থ বছরে রাজ্য থেকে মোট রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২.৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত দশ বছরে দ্বিগুন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, সামুদ্রিক পণ্য, ভেষজ খাদ্যপণ্য, চর্মদ্রব্য এবং রত্ন ও অলঙ্কারের মতো পণ্যসমূহ রফতানি করা হয়। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী রাজ্য এবং বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত ‘দার্জিলিং চা’-এর উৎপত্তিস্থল। মিনিস্ট্রি অফ কমার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা বন্দর দিয়ে সব থেকে বেশি চা রফতানি হয় এবং দার্জিলিং'এর চায়ের মূল গন্তব্যস্থল মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে, ভারত জুড়ে পশ্চিমবঙ্গই চালের বৃহত্তম উৎপাদক। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রাজ্যে চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৪৯ মিলিয়ন টন।
ইকোনমিক সার্ভে (২০২৪-২৫) বলছে, এখনও পশ্চিমবঙ্গের ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় অসংগঠিত ক্ষেত্রে যার মধ্যে সব থেকে বেশি হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। NSS 73rd রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ৮.৮৭ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে যার ৩২.৭ শতাংশ অর্থাৎ ২.৯০ মিলিয়ন মহিলা দ্বারা পরিচালিত, যদিও কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদানের হার অত্যন্ত কম। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরেই তার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য সুপরিচিত। বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির মন্দির থেকে শুরু করে নকশি কাঁথার নিপুণ কারুকাজ, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত। দার্জিলিং চা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। পশ্চিমবঙ্গের পাটকলগুলো ২.৫ লক্ষেরও বেশি শ্রমিককে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান প্রদান করে এবং প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষক পরিবারকে সহায়তা জোগায়। এই শিল্পের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হল প্রথাগত চটের বস্তা। এছাড়া, ব্যাগ ও সাজসজ্জার সামগ্রীর মতো বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্যের চাহিদাও বর্তমানে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মালদা জেলা, যাকে বাংলার 'আমের রাজধানী' বলা হয়, সেখানে ২০০টিরও বেশি জাতের আম উৎপাদিত হয়। এখানকার সুপ্রসিদ্ধ জাতগুলো— ফজলি, লক্ষ্মণভোগ এবং হিমসাগর— 'জিআই' (GI) তকমাযুক্ত। এই অঞ্চলের প্রায় ৪.৫ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০,০০০ আমচাষি রয়েছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, বাংলার সামুদ্রিক খাদ্য রফতানি ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৯.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত। তাছাড়া, গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজের সন্ধানে বহু মানুষ চলে যাওয়ায় দক্ষ কৃষকের অভাবেও উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে। এমনকি, বিদেশে রফতানির অনেক উচ্চ মানদণ্ড থাকায় অনেক সময় এসব কৃষিজ ও সামুদ্রিক পণ্য মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হওয়ায় চাষিদের প্রচুর ক্ষতি হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ রেশম শিল্পের উৎপাদন ২,১০০ মেট্রিক টনের বেশি হলেও, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ৩.০৩ লক্ষ থেকে কমে ২.১১ লক্ষে নেমে এসেছে। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল বাজার থাকা সত্ত্বেও এই শিল্পে মজুরি অত্যন্ত কম, তুলনায় সস্তা পাওয়ারলুম-এর পোশাক এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের অনিশ্চয়তার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুবক-যুবতীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
অবশ্য, এই সমস্ত ক্ষেত্রগুলি ক্ষুদ্র শিল্প হওয়ায় ‘স্বল্প উৎপাদনশীলতার ফাঁদে’ পড়ে জর্জরিত। বাংলার ৯৯ শতাংশ MSME-ই 'ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র' (Micro) প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার দ্বারা পরিচালিত, এখানে পেশাদার কর্মী নিয়োগ করার মতো পুঁজির অভাব আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় 'ইকোনমিকস অফ স্কেল'এর সুবিধা থাকে না। ফলস্বরূপ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তারা সস্তা কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল আর এর ফলে কর্মীদের মজুরি কেবল ন্যূনতম জীবনধারণের স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অনিবন্ধিত খাতের উদ্যোগসমূহের বার্ষিক জরিপ (ASUSE) ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলার অসংগঠিত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মী প্রতি সংযোজিত ভ্যালু অ্যাডেড গুজরাত বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শুধু তাই নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিতে সারা বছর ধরে কর্মসংস্থান হয় না। প্রসঙ্গত, বানতলার লেদার কমপ্লেক্স কিংবা শিলিগুড়ি চা-শিল্প প্রভূত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলার হেতু তারা কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী কাজের নিশ্চয়তা বা চুক্তি প্রদান করতে পারে না। ফলে, এখানকার কাজগুলো কেবলই 'দৈনিক মজুরি' ভিত্তিক হয়ে থাকে, যেখানে কর্মীদের বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ থেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এবং নিরাপত্তার মান বেশ নিম্ন। অপরদিকে, উত্তরবঙ্গে ক্ষুদ্র চা-চাষি, যারা বর্তমানে রাজ্যের মোট চা উৎপাদনের ৫৫ শতাংশেরও বেশি জোগান দেন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র চা-চাষিরই নিজস্ব কোনও কারখানা নেই; তারা বাগানের কাঁচা চা পাতাগুলো 'বট লিফ ফ্যাক্টরি' (BLFs) বা পাতা-ক্রেতা কারখানাগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নিম্নমানের চায়ের অতিরিক্ত জোগান এবং বিদেশ থেকে আসা সস্তা চায়ের (যেমন নেপালের চা) তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে চায়ের বাজার দর ব্যাপকভাবে ধসে পড়ে। তাছাড়া ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে চায়ের জন্য কোনও 'ন্যূনতম সহায়ক মূল্য' (MSP) নির্ধারণ না হওয়ায় বর্তমানে এই শিল্পক্ষেত্রে এক ধরনের 'সংকটকালীন শ্রম পরিস্থিতি' বিরাজ করছে। আর কোনও উপার্জনের বিকল্প পথ না থাকায় শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সময়ে কর্মক্ষেত্রের সব থেকে বড় দুশ্চিন্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যা রুটিনমাফিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলোতে মানব শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠছে। যেমন, কোডিং, ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ নির্ভর করে অ-রুটিন কায়িক শ্রমের ওপর যা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাশ্রয়ী সক্ষমতার আওতার বাইরে। পশ্চিমবঙ্গে হস্তনির্মিত বস্ত্রশিল্প (তাঁত/জামদানি), মৃৎশিল্প (কুমোরটুলি) এবং হকার বা ফেরিওয়ালাদের কাজে ‘সামাজিক বুদ্ধিমত্তা’র প্রয়োজন, তাই এরা হয়তো রোবটের কারণে চাকরি হারাবে না, কিন্তু তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমশ হারাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত শিল্পগুলো ‘ম্যানুয়াল’ বা প্রথাগত পদ্ধতিতেই রয়ে যাওয়ায়, বিশ্ব বাজারে তুলনায় সস্তা পণ্যের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে; যার ফলে সেখানে ‘চাকরিচ্যুতি’র পরিবর্তে ‘বাজার থেকে ছিটকে পড়ার’ (market displacement) ঘটনাই বেশি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যান্য রাজ্যগুলি (যেমন, তামিলনাড়ু বা গুজরাত) উৎপাদন খরচ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছে, এ রাজ্যে সেখানে ‘উৎপাদনশীলতার ব্যবধান’ থেকে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পে শ্রম-নিবিড় কাজের সুযোগ থাকলেও নিম্ন মজুরি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্যতীত কর্মী নিয়োগ, digitisation-এর অভাবে অভিবাসন বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, দক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ‘brain drain’ হচ্ছে। তাই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে (সচেনতনভাবে যাতে কর্মী অপসারণ না হয়) না জোর দেওয়া এবং পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধি, কর্মীদের সামাজিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান, ক্ষুদ্র ব্যব্যসায়ীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসী ভূমিকা, আজকের বড় বড় আধুনিক শিল্পের যথেষ্ট কর্মসংস্থান প্রদানের অক্ষমতা ও সাবেক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের দিন ফুরিয়ে আসায়, একটি রাজ্য বা দেশকে আজ যে সৃজনশীল অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে চলার পথ নির্মাণ করে নিতে হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেছে বটে, কিন্তু আরও বহু সংশোধন ও নতুন উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে।




