ফুলটুসি আরও পড়বে, লিখবে, বলবে
শুক্তিসিতা
ফুলটুসি। অ্যাসিডে আক্রান্ত একটি কুড়ি বছরের মেয়ে। হাসপাতাল, পুলিশ ফাইল, বেদনার্ত গোঙানি সব পেরিয়েও বাপ-মা ঠাওরালেন নিশ্চয় বাবলুকে টুসি কিছু প্রশ্রয় দিয়েছিল, নইলে এইভাবে...। এই কুরূপা মেয়ের আর বিয়ে হবে কোনওদিন? পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে। জ্বালা কমেনি, ব্যথাও কমেনি একটুও। অ্যাসিড ওর গলা, ডান দিকের কানের ওপর পড়েছিল। ফুলটুসি এখন কানে কম শুনছে। ঠোঁট দুটো এমনভাবে ঝুলে গেছে যে ও আর ভালো করে খেতে পারে না। ফুলটুসির সেকেন্ড ইয়ারটা আর থার্ড ইয়ার হবে না। ফুলটুসির ডান চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবু একটা চোখ দিয়ে ও পড়তে চেয়েছিল। না, হবে না। লোকলজ্জার নিদারুণ চাপ ওর গোটা পরিবারকে পিষে ফেলছে। বাবার মুদির দোকানটা ভালোই চলত। এখন বাবা একবেলা খোলেন। মায়ের চোখের জলে সারাটা বাড়ি যেন সপ্সপ্ করে।
ক্ষতিপূরণের ক’টা টাকা পাবার জন্য ফুলটুসির বাবাকে খুব দৌড়োদৌড়ি করতে হচ্ছে। ফুলটুসির সেজ পিসেমশাই ডাক্তার। সেদিন ফোনে মাকে বলছিলেন, 'প্লাসটিক সার্জারি করিয়ে নিন না বৌদি, বিশ লাখ টাকার মতো পড়বে।' মা আর কিছু উত্তর দেননি।
এই সামান্য কাহিনী পশ্চিমবাংলায় অজ্ঞাত নয়, অশ্রুতও নয়। একটি লিঙ্গ আগ্রাসনের গল্প। কিন্তু তেমন রগরগেও নয়। অথচ কেউ যেন প্রশ্নচিহ্নের পেরেক বসিয়ে গেল সামনে। শরৎচন্দ্র মহাশয়ের ‘অরক্ষণীয়া’র সঙ্গে আংশিক মিলের পরও একজন একটি আশ্চর্য কিস্সা শোনালো যে একজন ফর্সা দুধে আলতা সুন্দরী কিশোরী চরম অবসাদে ভুগছে কারণ তাকে কেউ ভালোবাসে না; কেউ তার সখী নয়। সবাই তাকে ঈর্ষা অথবা ঘৃণা করে। অথচ বছরে ৪৫ কোটি ডলারের বাণিজ্য করে ফেলছে ফর্সা হবার ক্রিম। আমাদের বাল্যকাল জুড়ে স্নো হোয়াইটের বিপন্ন বিমাতা, এই রূপকথা বপন করেছে যে আয়না থেকে সমাজের চোখ তাকে দেখে আর ক্রমাগত কুৎসিত প্রতিপন্ন করে আর কোনও এক নগণ্য ফর্সা মেয়েকে সেরা সুন্দরীর শিরোপা দিয়ে দেয়। না, এটি শুধু বর্ণবৈষম্যবাদের গল্প নয় যে। গোটা নারীত্ব যাকে সিমোন দ্য বোভোয়া মনে করেন একটা আরোপিত সত্তা বহনের অভিযাত্রা— তাকে একটি বাধ্যত সামাজিক সত্তা হতে হয় বলেই তার ওপর রূপসী হবার, নিখুঁত হবার দায় এসে পড়ে। তন্বী হবার জন্য শত শত মেয়ে মার্কিন মুলুকে অ্যানারোক্সিয়া নার্ভোসারোগের শিকার হয় স্রেফ ক্ষুধার্ত থেকে; এমনকি মারাও যায়। আর এই গরিব দেশে রাস্তাঘাটে একটি সামান্য শৌচাগারের অভাবে মূত্রনালীতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে কত হাজার মহিলা। না, রাষ্ট্র এ সব ভাববে পরে।
রাষ্ট্রও মেয়েদের বোঝাবে যে পিল খেয়ে নাও; গর্ভ নিরোধ করো; তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষমতায়িত হও। পিল খাওয়ার গোপন পন্থাটি স্বামী/শ্বশুরবাড়ি জানতে পারে না ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না, দম্পতি কেন একত্রে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বা পুরুষটি কেন নিজে পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব নেয় না।
ফুলটুসি তো বাবলুকে বলেছিল, বিয়ের আগে শরীরী সম্পর্কে গেলে সমস্যা হতে পারে, বরং কিছু ব্যবস্থা নিয়ে... বাবলু রাজি হয়নি। তাই ফুলটুসির গাল, ঠোঁট, চুল, গলা ঝলসে গেল।
আচ্ছা, যশোদার গর্ভে যে কন্যা জন্মে মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত হয়ে বাঁচাতে গেল কৃষ্ণ অবতারকে, পাশবিক শক্তির দুর্দান্ত বজ্রমুষ্টি ভেদ করে তো সে মিলিয়ে যায় আকাশে! আসলে পুরাণ খোলসা করে বলে না, সেই শিশুকন্যাটিকেও কংস হয়তো পাথরে ঠুকে হত্যা করেছিল। আগের সাতটি শিশুর মতো। ঈশ্বরের জন্য ঈশ্বরী বলি হয়ে গেল নিশ্চুপে। এও কি এক 'যৌনতার রাজনীতি’ নয়? হয়তো নিরস্তিত্বতার রাজনীতি। মণিপুরে থাংজাম মনোরমার স্তন ও যোনিদেশে গুলিবিদ্ধ করে ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট করা হয়। প্রতিবাদী নারী'রা নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উত্তর এটাই। তবুও এই দশকে আর কি কোনও নারী প্রতিবাদীকেই মনে পড়ে? এখনও ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর ভাইদের দলে প্রীতিলতা, দুকড়িবালা, বীণা দাস, ননীবালার মতো বোনেদের মনে পড়ে না। সমাজ বদলের স্বপ্নে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরোধিতায় কর্পোরেট লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যে মেয়েরা পথে নেমেছেন বারবার, তেভাগা আন্দোলনের বুধনি ওরাওঁনি, জৈবন বিবি, সাবেরা খাতুন, দুলি কিস্কু। নকশালবাড়ি আন্দোলনে কুনী টুডু, জয়া মিত্র, মেরী টাইটলার। কারওকেই না।
ফুলটুসি কলেজে কোনওদিন রাজনীতি করেনি। বাবার বারণ ছিল। বাবলুরও। কিন্তু ফুলটুসি সত্যি রাজনীতির স্বপ্ন দেখত। ছাত্রছাত্রীদের হস্টেলের সমস্যা, অধ্যাপকদের নিয়মিত হাজিরা, অথবা ‘নতুন শিক্ষানীতি’ এইসব। সবই খোয়াব হয়ে রইল। আচ্ছা ওর জীবনে এই যে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিগ্রহ হল, তার জবাব চাইবে কে? কোন রাজনৈতিকতা?
১৯৫২ সালে ভারতের সংসদে ৩৯ জন বুদ্ধিমতী, সপ্রতিভ, উচ্চাশী মহিলা সংসদ সভা আলো করেছিলেন। সর্বমোট সাংসদের ৫.৫ শতাংশ, অথচ সেই সময়ে মার্কিন দেশে ১.৭ শতাংশ আর যুক্তরাজ্যে ১.১ শতাংশ মহিলা সংসদের অধিকার পেয়েছিলেন। আর এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তথাকথিত প্রগতিশীল বাম দলগুলিকে কখনওই দেখা যায়নি মহিলা নেত্রীদের জেলা সভাপতি/সচিব পদে অধিষ্ঠিত করতে। এমনকি গৃহশ্রমের বেলাতেও যখন ১৯৭০'এর পরই প্রথম কথা উঠল যে মেয়েদের গৃহশ্রমের স্বীকৃতি তথা রোজগারের ব্যবস্থার কথা, তখনও কিন্তু কম্যুনিস্টরা বলেছিলেন, এতে গৃহশ্রমের প্রাতিষ্ঠানিকতা মান্যতা পাবে। নারীমুক্তি সুদূর পরাহত হয়ে যাবে তো! অথচ সমাজতন্ত্রীরা বিস্মৃত হলেন গৃহশ্রম শুধু শ্রমিক উৎপাদনই করে না শ্রমিকের কর্মশক্তিরও জোগান দেয়, ফলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’ ফাঁকিতে গৃহশ্রমিকরাও বস্তুত ইউনিয়নবিহীন অবস্থানে বাধ্যত নৈঃশব্দ্যের পর্দার পিছনে অপসৃত হন।
এমন আজব দিনও আসতে পারে গৃহশ্রমের মজুরি একেবারে শ্রম আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়ে গেল। অমনি সব পুরুষেরা পিলপিল করে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হ্যাঁ এমনটাই হয়। যখন ছত্তিশগড়ে লৌহখনিতে বা অন্ধ্রপ্রদেশে তামাক শিল্পে প্রযুক্তি প্রবেশ করল, তখন রাতারাতি মেয়েরা ছাঁটাই হয়ে গেলেন।
মেয়েরা অবিশ্যি পরিবারের জন্য নিত্য বাসে, অটোয়, ট্রেনে বাইরেও কাজ করতে যাচ্ছেন। 'চুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে/ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি রাত থাকতে ওঠে।' তারপর লালগোলা/বনগাঁর ট্রেনে চাল তোলেন বস্তা করে। কোভিড শুরুর বেলা এঁরা ‘Superspreader’ ছিলেন; অচ্ছুৎ। কিন্তু বেশিদিন চলল না। গৃহ পরিচারিকা না এলে যেমন Work from home নিরুপদ্রবে করা যায় না, তেমনই মাসি-পিসি রেল গার্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে চাল শহরে না নিয়ে এলে কী খাবে শহুরে বাবুরা?
ফুলটুসি এখন একটা চোখে দেখে। তবু কাগজ পড়ে নিয়মিত। বইও পড়ে। থেরীগাথা পড়ছিল। বুদ্ধদেবের প্রতি মেয়েদের অভিমান আছে বৈকি। গোড়ায় তিনি মা গৌতমীকেও সঙ্ঘারামে ঢোকার অনুমতি দেননি। আবার অগ্রশ্রাবিকা উৎপলবর্ণা ধর্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও আশ্রমে স্থান দিয়েছিলেন। সন্তানহীনাকে পরিত্যাগ করতে মানা করেছিলেন তাঁদের স্বামীদের। ফুলটুসি কি পরিত্যাজ্য? না। ফুলটুসি এখন এক চোখ দিয়ে প্রুফ দেখার কাজ শিখেছে।
ফুলটুসি গল্পগুচ্ছ পড়ছিল রোববার দুপুরবেলা। ‘মণিহারা’ আর ‘কঙ্কাল’ পড়বার পর ওর মনে হচ্ছিল সে যুগের মেয়েদের যখন জীবনটা বেঁচে থাকতেই অন্ধকার, তাই বিদ্রোহ কি মৃত্যুতেই শুরু হতে চাইছিল? যেমন গৃহপ্রাণা মণিমালিকা অন্ধকার মৃত্যুদেশ পেরিয়ে এসে ফণিভূষণের চৈতন্যের কাছে তার সম্পদের হিসাব চাইছে? অথবা ‘কঙ্কাল’-এর বিধবা মেয়েটি কিছুতেই দাদার ডাক্তার বন্ধুকে ভুলতে পারে না বলেই শীতল অস্থিপঞ্জর থেকে স্বরক্ষেপণ করতে চায় নবাগত যুবকের বুকে? উচ্চারণ করতে চায় তার অবহেলিত অনুচ্চারিত প্রেম? তাহলে ‘জীবিত ও মৃত’র কাদম্বিনী যে ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’? আসলে ওই মিথ্যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাদম্বিনী ভেঙে ফেলেছিল সব উল্লম্ব সম্পর্কের শিকল। সেই ভাঙনের অভিঘাত তার পরিবার ও সমাজ সহ্য করতে পারেনি বলে সে মৃত্যুবরণ করে সমাজকে মুক্তি দিয়ে গেল। তাহলে নারীমুক্তির বর্তমান ব্যাকরণটা কী?
আজকাল ‘সহজিয়া’ দলের দুই দাদা আর দিদি আসেন ফুলটুসির কাছে। ‘সহজিয়া’ কাজ করে অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের পুনর্বাসন, আর্থিক সশক্তিকরণ নিয়ে। তাদেরই কি জিজ্ঞেস করবে এই ‘নারীমুক্তির সংজ্ঞা’? টিভিতেই কি ফুলটুসি দেখেছিল ইরানি-মার্কিনি সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ'কে? যিনি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর উল্লসিত সকালটাকে উদ্যাপন করছিলেন ইরানের হিজাব-বিরোধী মেয়েদের জন্য? ফুলটুসিও কি উল্লসিত হবে? ফুলটুসির বাবা কাগজে ভোটের খবর পড়েন। ওর ভাই ফোনে যুদ্ধ দেখে। দুটোই যুদ্ধ। তখন ফুলটুসিকে অনেকদিন আগে ওর কলেজের প্রোফেসর বলেছিলেন PWAG (Peace Women Across the Globe)-র কথা, যাঁরা ২০০৫-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার জন্য মনোনীতও হয়েছিল। কিন্তু পায়নি। ভূ-রাজনীতির নানা তত্ত্ব। অর্থনীতি, শস্ত্রনীতি এমনকি বেচারা ভূতত্ত্বও। ফুলটুসি বোঝে না। বুঝতে চেয়েছে কী?
না, কারণ ফুলটুসি জানে, তার ঐ দুনিয়া-জোড়া সংঘটনার সাধ্যি নেই ফুলটুসির ব্যথা কমায়, জ্বালা থামায়, ওর বুকের ওপর শান্তিজল ছেটায়। নাইট্রিক অ্যাসিড তো থাকার কথা ছিল শিল্প তালুকে, কারখানায়। সেটা খোলা বাজারে পাওয়া গেল বলেই না বাবলু সেটা ঢেলে দিল ফুলটুসির শরীরে! সম্পর্কের গর্ভের অন্ধকারে যে হিংসার মৌল লুকিয়ে থাকে, সে তো মোটেও ‘রেয়ার আর্থ’ মৌল নয়। তাহলে তো ‘সহজিয়া’র কাছে এত আর্তনাদ জমা পড়ত না (অ্যাসিড হিংসার ঘটনায় ভারতের মধ্যে এখন প্রথম বাংলা)।
আজ ‘সহজিয়া’ দলের অনিন্দিতাদি আসবে। ওর প্রুফগুলো নিয়ে যাবে। আর ওর পাওনা টাকাও দিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহে ফুলটুসি প্রেসে যাবে। ওখানে গেলে আরও কাজ পাবে। না, ওড়না পরে নয়। সবাই দেখুক আসল ‘বাবলু’কে। নকল বাবলু নিখোঁজ। ফুলটুসি আরও পড়বে। লিখবে, বলবে। যাতে বাবলুরা সবাই 'নিখোঁজ'ই থাকে। এই সমাজের জন্য। সেদিন সব যুদ্ধ বন্ধ হবে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অনিরুদ্ধ রাহা ও অপরাজিতা গাঙ্গুলী বোস, ‘আলোক’ ফাউন্ডেশন।




