Sunday, 19 July 2026

রাত পোহালেই ২০ জুলাই

সন্ধিক্ষণের উপান্তে দাঁড়িয়ে দেশ

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



সাদা অ্যাপ্রন পরে ডাক্তার সেজে পুলিশের দল আশপাশের সবাইকে জোরজবরদস্তি সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে মঞ্চে উঠে পড়ল, তারপর সাদা বিছানার চাদর দিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলে শীর্ণ, দুর্বল, অভুক্ত সোনম ওয়াংচুক’কে (তাঁর অশক্ত প্রতিবাদ সত্ত্বেও) প্রায় চ্যাংদোলা করে দণ্ডায়মান আম্বুলেন্সে তুলে চম্পট দিল। এইভাবেই ভেবেছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই’ আন্দোলনকে দুরমুশ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু কোথায় কী! কথায় বলে, ‘শাসক যত মারে/ জনতা তত বাড়ে’। সোনমজী’র অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই চারিদিক থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এসে ছেয়ে ফেলল যন্তর মন্তর প্রান্তর।

মাস দুয়েক আগে প্রধান বিচারপতির ‘আরশোলা’ মূলক একটি চিহ্নিতকরণকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে মিম ও তির্যক-মন্তব্যের ঢেউ উঠেছিল, তারই অভিঘাতে ইন্সটাগ্রামে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রারম্ভকে বহু মানুষই ততটা সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু যখন তা সত্যিই অন্তত ২.৫ কোটি ফলোয়ার সহ ছাত্র-যুবসমাজের এক তীব্র যন্ত্রণা ও আর্তিকে প্রতিনিধিত্ব করল, ‘আমিও এক আরশোলা’ প্রতিধ্বনি যখন নিজেকেও গ্লানিবিদ্ধ করল, তখন আর পিছনে তাকানোর অবকাশ ছিল না। চকিতে সব যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এই চলমানতার অন্যতম মুখ্য উদ্যোক্তা তরুণ তুর্কি অভিজিৎ দিপকে তাঁর আমেরিকার মসৃণ জীবনের সমস্ত আয়েসকে বিসর্জন দিয়ে দেশে ফিরে এলেন এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পানে নিজেকে অবলীলায় নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে রইলেন আশুতোষ রাঙ্কে ও সৌরভ দাস। পরে আরও কিছু উজ্জ্বল মুখ। এরপরের ঘটনাবলী আমরা জানি; যেন এক লহমায় বদলে যেতে বসল দেশের নকশা। যে একতরফা বয়ানের বুলডোজার দেশকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল, প্রশ্ন উঠছিল আদৌ আর আমরা পবিত্র সংবিধানের রক্ষাকবচ ফিরে পাব কিনা, বিরোধী পক্ষ বলেও কিছু থাকবে কিনা, ঠিক সেই অমানিশা মুহূর্তে যুবসমাজ যেন ধারণ করল গত এক দশকে আমাদের যাবতীয় ব্যর্থতার নৈরাশ্যকে, নির্মাণ করতে চাইল এক নতুন চলার পথ। শাসকও কিছুটা বুঝল, যা হচ্ছে তা তাদের পক্ষে মোটে ভালো নয়। ফলে, তারা গোপনে কিছু ভয়-ভীতি দেখানো, ছ্যাঁচড়াদের মতো আরশোলাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা অথবা প্রভাব খাটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া, আরও কত কী করল! কিন্তু এতে যখন চিঁড়ে ভিজল না, তখন ঠিক আছে, দেখা যাক এদের দৌড় কতটা গোছের মনোভাব নিল।

এইভাবে খুব অল্পদিনেই গড়াতে গড়াতে এই মুহূর্তে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি এক সন্ধিক্ষণের উপান্তে। ২০ জুলাই সকাল ন’টায় আরশোলাদের নেতৃত্বে যন্তর মন্তর থেকে শুরু হবে সংসদ অভিযান। সোনমজী’কে পুলিশ তুলে নিয়ে গেলেও তিনি সফদরজং হাসপাতালে এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এক লিখিত বার্তায় চলমান এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সংসদ অভিযানের সার্বিক সাফল্য চেয়েছেন। পাশাপাশি, আইসা’র তরফে নেহা, আমিন, মনীশ ও এসএফআই’এর ঐশী সহ মোট ২১ জন ছাত্র-যুবদের যন্তর মন্তরে অনশন চলছে। আইসা’র অনশন ২১ দিনে পড়েছে বলে খবর। নাগপুর, পুনে, পাটনা, লক্ষ্ণৌ, কলকাতা, শান্তিনিকেতন, সোলান, হায়দ্রাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন শহরেও শুরু হয়ে গেছে ছাত্রদের বিক্ষোভ জমায়েত ও মিছিল বা প্রতীকী অনশন-অবস্থান। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন আমজনতাও। একই সঙ্গে দলে দলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যন্তর মন্তরে এসে হাজির হচ্ছেন ছাত্র-যুব সহ বিভিন্ন বয়সের নাগরিক। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু মানুষ চলেছেন দিল্লি অভিমুখে। 

অনেকদিন পর জাতীয় স্তরে এক গণ আন্দোলন যেন অবয়ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতেই বহু মানুষের মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫’এ জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে ‘সর্বাত্মক বিপ্লব’এর কথা, অথবা, ২০১১-১২ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না হাজারের ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতের ছবি, কিংবা ২০২০-২১ সালে দিল্লি সীমান্তে মাসের পর মাস লক্ষাধিক কৃষকদের অবস্থান। তবে এবারের গণ উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা খানিকটা ভিন্ন। যদিও আন্দোলনটা শুরু হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে এবং ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে কিন্তু সমাজের বিভিন্ন অংশের জড়িয়ে পড়াটা এতটাই বাস্তব যে তা যন্তর মন্তরে জমায়েতের চরিত্র দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। যদি শিক্ষার্থী মেয়েরা এই আন্দোলনে আসছেন তো তাঁদের মায়েরাও জুড়ে যাচ্ছেন; যদি আইটি সেক্টরের তরুণ দল অফিস শেষে এখানে এসে গলা মেলাচ্ছেন তো নয়ডার শ্রমিকেরাও বাদ যাচ্ছেন না; হরিয়ানা-পঞ্জাব থেকে যদি কিষাণেরা আসছেন তো দিল্লি-ইউপি’র বেকার যুবকেরাও বাদ থাকছেন না। কারণ, দেশের সার্বিক অবক্ষয় এমন স্তরে পৌঁছেছে যেখানে মন্দিরের প্রণামী চুরি থেকে বুলডোজার দিয়ে গরিবের ঘর ভাঙা, হেঁসেলে আগুন, দলিত, সংখ্যালঘুদের উপর একচেটিয়া নৃশংস আক্রমণ, দেশের মানুষের কর্মহীনতা থেকে নিম্ন আয়, শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বত্র দুর্নীতি থেকে ছাত্রদের ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ-- সব ইস্যুগুলিই এক মালার মতো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু অপেক্ষা ছিল এক স্ফুলিঙ্গের। আর সেই সুবাদেই এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে ‘ককরোচ’দের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া ও তাদের জোটবদ্ধতা, যন্তর মন্তরে ধৈর্য ধরে লাগাতার বসে থাকা, সোনম ওয়াংচুকের অনশন, তাঁকে নির্দয় ভাবে পুলিশ কর্তৃক অপহরণ, শাসকের লাগাতার ঔদ্ধত্য, এসআইআর, সংবিধানের অমান্যতা, গণতন্ত্রের সলিল সমাধি সহ জমে ওঠা নানান বঞ্চনা ও অত্যাচার দেশ জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তাতে কোনও একদিন এমনতর প্রতিরোধক জনপ্লাবন তৈরি হওয়া অনিবার্য ছিল। তাইই হয়েছে।

গোদি মিডিয়ার উপেক্ষা ও গালিগালাজকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, কাতারে কাতারে মানুষ পুলিশি নিরাপত্তার তিন বলয় পেরিয়ে গতকাল (১৮ জুলাই) থেকে যন্তর মন্তর চত্বর ভরিয়ে তুলছে। যারা আসছেন, প্রতিজন দু’ দুবার সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরবন্দী হচ্ছেন, মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে তাঁদের প্রবেশ করতে হচ্ছে, তারপরে পুলিশ আবার জনে জনে শরীরী তল্লাশি নিয়ে তবে ছাড়ছে। যেন ভিন দেশের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপার হচ্ছে। এই ভয় কীসের? কেন? তবুও, পুলিশের রেকর্ডে নজরবন্দী হয়েও নির্ভয়ে, দ্বিধাহীন চিত্তে তরুণ থেকে বয়স্কজনেরা এই মহাসম্মেলনে ভীড় করছেন। এইখানেই এই আন্দোলনের সব থেকে বড় হিম্মৎ। অনেক দিন পর দেশের মানুষের কন্ঠস্বর ও দাবি সমস্ত ভয়-ভীতিকে চুরমার করে খোলামেলা আন্দোলিত হতে চাইছে। ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত বিরোধী দলের নেতারা একে একে মঞ্চে এসে বক্তব্য রেখে গেছেন।

খেয়াল করুন, সময়ানুযায়ী আজ ১৯ জুলাই রাতে (ঘড়ি মোতাবেক ২০ জুলাই 12:30 am) বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। সারা বিশ্ব জুড়ে এই উন্মাদনার (বিশেষ করে তরুণদের) মাঝে দেশের GenZদের এক বড় অংশ কিন্তু সেই ফুটবল মাতোয়ারা খানিকটা ছেড়ে (এটা কিন্তু কম কথা নয়) আমাদের এই মহা দুর্দিনে এক অন্যতর শপথ নিয়েছেন: দায়বদ্ধতা। হ্যাঁ, দেশের নেতা-মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতা রাখতে হবে। যদি তাদের বা দফতরের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অংশগ্রহণে দেশ-বিরোধী বা জনগণ-বিরোধী কোনও অপকর্ম হয়ে থাকে, তাহলে সেই মন্ত্রী ও আধিকারিকদের দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাদের বিদায় দিতে হবে। পাশাপাশি এ কথাও উঠেছে, দেশের সংবিধানের শপথ-- ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে লঙ্ঘন করা যাবে না। উত্তরপ্রদেশের দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০ জুলাই লক্ষাধিক মানুষের ঐতিহাসিক সংসদ যাত্রা এক নতুন ভারত নির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। ২১ জুলাই থেকে দেশ বদলাতে থাকবে— অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে পুনরায় তার যাত্রা শুরু হবে।

রাত পোহালেই ২০ জুলাই। আমরা জানি না, রাতে শাসকের কী পরিকল্পনা আছে। অথবা, রাতটুকু নির্বিঘ্নে কেটে গেলেও কাল সকালে কী প্রতীক্ষা করছে। এই মুহূর্তে সোনম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দিপকে, নেহা, আমিন, মনীশ প্রত্যেকে জীবন-সংশয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। সংসদ অভিযান কীভাবে দেশের বর্তমান ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে মোড় ঘোরাতে পারে তা দেখার; কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব থেকে নয়, সঙ্গে এসে মিলেমিশে। এই এখন চলার পথ।  


Friday, 17 July 2026

মানুষ আসলে 'অভিবাসী'

'নথি'র চেয়ে মানুষ বড় 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



আজ আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলব তা শুধু রাজনীতির নয়, সিনেমারও। কারণ, সিনেমা মানেই তো বিষয়কে ফ্রেমে বাঁধা। আর রাষ্ট্রও আজকাল মানুষকে নথিতে বাঁধছে। দুটো প্রক্রিয়াই আসলে একই প্রশ্ন করে: কাকে দেখা হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে!

রাষ্ট্রের প্রধান কাজ এখন দুটো। এক, মানুষকে নথিতে বেঁধে ফেলা, আর দুই, ক্ষমতাকে রোজকার ভাষার অংশ করে দেওয়া। প্রথমটা দেখা যায় ফাইলে, দ্বিতীয়টা দেখা যায় সংলাপে বা ব্যবহারিক ভাষার কালচারে। তখনই রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়। নীতি-আদর্শের তর্ক কমে। জায়গা নেয় সন্দেহ আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। ভারতবর্ষে গত কয়েক বছরে এই বিষক্রিয়া আমরা দুই দিকেই দেখছি। শাসক ক্ষমতার জোরে অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে বিরোধীদের বাঁধছে। আর বিরোধীরাও তাদের কৌলিন্য হারিয়ে সেই একই দুর্নীতির যন্ত্র হয়ে উঠছে। ফলে, কোথাও ক্ষমতায় তারা ছোট অংশ পেলেও, সেখানেও একই ক্ষয় শুরু হয়, যার খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। ভোটের সময় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এই ক্ষয় নিয়ে নিরুত্তাপ। এটাই নয়া-ফ্যাসিজমের সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের খোলস থাকে, অন্দরে মানুষের জায়গা ছোট হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই আসে ভোটার তালিকার সংশোধনের কথা। আগে যা ছিল নিয়মিত সংশোধন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাসের পর মাস ধরে যাচাই; আর আইন মোতাবেক, বিশেষ নিবিড় সংশোধন হত সেই সব এলাকায় যা হয়তো দাঙ্গা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বস্ত। ২০২৫-এর অক্টোবরে যখন দেশ জুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হল, প্রশ্ন উঠল: রুটিন কাজে 'জরুরি' পদ্ধতি কেন?

বিহারে ভোটার তালিকার খসড়া থেকেই প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গেল। কারণ, মৃত্যু, স্থানান্তর, ডুপ্লিকেট। চূড়ান্ত তালিকায় সংখ্যা কমল। কিন্তু এক মাস সময় আর কাগজের শর্ত নিয়ে আপত্তি উঠল। কর্নাটক-তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভোটাধিকার খর্বের আশঙ্কায় প্রতিবাদ করলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও  তাই বললেন। সিপিআইএম নেতৃবৃন্দ বাংলাভাষী মানেই সন্দেহ করা যাবে না, বললেন। কেন্দ্র সরকার  বলল, এটা শুদ্ধিকরণ। একই বয়ান নির্বাচন কমিশনেরও।

এখানেই রাজনীতির আসল খেলা। যখন লক্ষ লক্ষ নাম 'বিচারাধীন' ফাইলে পড়ে, তখন সেটা 'শুদ্ধি' নাকি 'বাদ'? এরই ফাঁক দিয়ে রাজনৈতিক বয়ানে ঢোকে 'অনুপ্রবেশকারী', 'রোহিঙ্গা'। এগুলো আইনি শব্দ নয়, লেবেল; যা লাগিয়ে দিলে মানুষটা আর নাগরিক থাকে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ বলছে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে আটকায় কাগজে। জন্মের শংসাপত্র, স্কুলের রেকর্ড, জমির দলিল সবার কাছে নেই। ADR (Association for Democratic Reforms)-এর পর্যবেক্ষণ, বিশেষ এসআইআর'এ আধার গ্রাহ্য নয়। অথচ কোটি মানুষের কাছে আধারই একমাত্র পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭-এর পর আসা উদ্বাস্তু, মতুয়া সম্প্রদায়, আন্দামান-ছত্তিশগড়ে পুনর্বাসিত মানুষের ফাইল এই বিতর্কের মধ্যেই পড়ে। তাদের পূর্বপুরুষ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই ঘর ছেড়েছিলেন। দেশভাগের সেই যন্ত্রণা বাঙালির যৌথ স্মৃতি। এখন সেই রাষ্ট্রই যদি বলে, 'প্রমাণ করো তুমি এ দেশের', তাহলে সেই স্মৃতি অস্বীকৃত হয়।

মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট ১৯৩৫ সালে 'সভ্যতার কাহিনি' প্রথম খণ্ডে লিখেছিলেন, সভ্যতার শুরুই হয়েছে মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমনের মধ্য দিয়ে। পোলিশ-ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ট বাউম্যান ১৯৯৮ সালে 'বিশ্বায়ন: মানবিক পরিণতি' বইতে বলেন, 'আধুনিক মানুষ স্থির নাগরিক নয়, সে পর্যটক ও উদ্বাস্তুর মাঝামাঝি'। ইতিহাসবিদ,দার্শনিক ও সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সঈদ ২০০০ সালে 'রিফ্লেকশনস্ অন এক্সাইল' প্রবন্ধে  বলেন, 'নির্বাসন শুধু জায়গা বদল নয়, রাজনৈতিক অবস্থা। নির্বাসিত মানুষ নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না।' 

১৯৪৭ ছিল আমাদের দেশে উপমহাদেশের বৃহত্তম গণ-অভিবাসন। তাই কাউকে 'বহিরাগত' বলা মানে সেই স্মৃতিকে মুছে দেওয়া। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ২০০৪ সালে 'পলিটিক্স অফ দ্য গভার্ন্ড' বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে একে বলেছিলেন 'রাজনৈতিক সমাজ'। তাঁর মতে, ভারতে মানুষ শুধু ভোটার নয়। তাদের পাড়া আছে, জীবিকা আছে। রাষ্ট্র যখন বারবার কাগজ চায়, সেই জীবনটাই যেন অবৈধ হয়ে যায়। সবই 'ক্ষমতা'র রূপ! ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ১৯৭৬ সালে 'যৌনতার ইতিহাস'এর প্রথম খণ্ডের পঞ্চম অংশে 'বায়োপাওয়ার' বা জৈব-ক্ষমতার কথা বলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপ বদলেছে। প্রাচীন সার্বভৌম শক্তির কাজ ছিল 'মৃত্যু অথবা বাঁচতে দেওয়া', কিন্তু বায়োপাওয়ারের মূল লক্ষ্য হল, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, জন্মহার, মৃত্যুহার ও আয়ুষ্কালের মতো বিষয়গুলোকে তদারকি করে জীবনকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও লালনপালন করা । রাষ্ট্র যখন পুরো মানবজীবনকে নিজের রাজনৈতিক কৌশলের অধীনে নিয়ে আসে, তখন তাকেই বায়োপাওয়ার বা জৈব-ক্ষমতা বলা হয়। তাই আদমশুমারি, স্বাস্থ্য, ভোটার তালিকা, ডেটা দিয়ে ঠিক হয় কে ভোট দেবে, কে ভাতা পাবে, কে সন্দেহজনক— সব ঠিক হয় অফিস ঘরে। ইতালিয়ান চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি ১৯২৯-৩৫ সালে জেলে বসে 'জেলখানার ডায়েরি'-এর ১২ ও ১৩ নম্বর নোটবুকে লেখেন, আধিপত্য টেঁকে সম্মতিতে। ভয় আর বিভাজনকে যখন 'জাতীয় স্বার্থ' বলা হয়, মানুষ নিজেই শৃঙ্খল পরে।

এই নথি ও ক্ষমতার সম্পর্কটা আমরা সবচেয়ে ভালো বুঝি গল্পে। সিনেমাই রাষ্ট্রের মুখটা সবচেয়ে স্পষ্ট করে দেখায়। তাই আমি চারটে ছবি রাখছি। চার মহাদেশ, চার সময়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র কি মানুষকে রক্ষা করছে, না পরিচালনা করছে?

ডারসু উজালা, আকিরা কুরোসাওয়া, ১৯৭৫

ডারসু সাইবেরিয়া জঙ্গলের শিকারি। তার পাসপোর্ট নেই। প্রকৃতিই তার আইন। শহরের অফিসার তাকে সভ্য করতে চায়। পারে না। ডারসু শহরের নিয়মে টেঁকে না। এই ছবি বলে, রাষ্ট্র যখন সবকিছু মাপতে চায়, স্বাধীন অস্তিত্বই বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।

অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম, কোস্তা গাভরাস, ২০১৯ 

২০১৫-র গ্রিস। গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ বলল 'না'। কিন্তু সরকার সেই 'না'-কেই মানল না। কারণ, আন্তর্জাতিক অর্থের কাঠামো অন্য কথা বলছিল। 'না' টা কী ছিল?

২০১৫ সালের ৫ জুলাই গ্রিসে একটা গণভোট হয়েছিল। গণভোটের প্রশ্ন ছিল: 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক আর আইএমএফ যে কঠোর ঋণ শর্ত দিচ্ছে, গ্রিস কি সেটা মেনে নেবে?' সেই শর্তগুলো ছিল: পেনশন কমানো, ট্যাক্স বাড়ানো, সরকারি চাকরি ছাঁটাই। গ্রিসের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস মানুষকে বললেন: 'এই শর্তে না বলুন'। ফলাফল কী হল? ৬২ শতাংশ মানুষ ভোট দিল 'না'। অর্থাৎ, তারা বলল, আমরা এই কঠোরতা মানব না। কিন্তু তার এক সপ্তাহের মধ্যেই কী ঘটল? সিপ্রাস সরকার সেই 'না'কে অগ্রাহ্য করে ইউরোপের কাছ থেকে আরও কঠোর শর্তেই ঋণ নিল। মানুষের ভোটের রায়কে বাঁচানোর জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা বাঁচাতে হল।

কস্তা গাভরাস দেখাচ্ছেন, গণতন্ত্রে মানুষের রায় থাকলেও আসল ক্ষমতা থাকে আন্তর্জাতিক অর্থ, ব্যাংক আর ঋণের কাঠামোর হাতে। মানুষ বলল 'না', কিন্তু সিস্টেম বলল 'হ্যাঁ' করতেই হবে। গণতান্ত্রিক রায় কীভাবে কাঠামোর কাছে হারে, এই ছবি তার দলিল।

প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্যজিৎ রায়, ১৯৭০ 

কলকাতার শিক্ষিত, বেকার ছেলে সিদ্ধার্থের ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রশ্ন তার জীবনের সঙ্গে মেলে না। সে উত্তর দিতে পারে না, কারণ, ব্যবস্থাটাই তার ভাষা বোঝে না। ৫৫ বছর আগের ছবি। নিয়মের সঙ্গে না মিললেই মানুষ অপ্রাসঙ্গিক।

আই, ড্যানিয়েল ব্লেক, কেন লোচ, ২০১৬

ব্রিটেনের ছুতোর। অসুস্থ। সরকারি ভাতার অনলাইন ফর্ম ভরতে পারে না। নিয়মের জটে সে অস্তিত্বহীন। কাউন্টারে কেউ তাকে মানুষ দেখে না, দেখে ফাইল। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের লাইনের সঙ্গে এই ড্যানিয়েলের ফারাক কতটুকু?

চারটে ছবি একই কথা বলছে। 'নথি' না থাকলে রাষ্ট্র দেখে না। কাঠামো না মানলে গণতন্ত্র টেঁকে না। মানুষ যখন 'সংখ্যা' হয়ে যায়, রাজনীতির মৃত্যু ঘটে। বিশ্ব জুড়েও একই ছবি। সব জায়গায় নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ। এর থেকে বেরনোর পথ নিয়ে যদি ভাবতে হয় তবে প্রথমেই আসে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার কথা। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ না হলে নিয়মই নাগরিক দমনের অস্ত্র। দুই, নাগরিকত্ব কাগজ নয়, মর্যাদার প্রশ্ন। তিন পুরুষ ধরে যে মাটিতে আছে তাকে বারবার প্রমাণ দিতে বলা যায় না। তিন, রাজনীতির ভাষ্য ফেরানো। 'ওরা বনাম আমরা' নয়, গণতন্ত্রের শক্তি তর্কে, ফ্যাসিবাদের শক্তি নীরবতায়। আজকের সংকট নৈরাজ্যের নয়। এটা দমন-ভাষার এক ঠাণ্ডা অথচ নতুন শৃঙ্খলা। এখানে নাগরিক মানে ডেটা, ভোটার মানে সংখ্যা, প্রতিবাদ মানে কেস ফাইল। মানুষের কান্না, রাগ, স্বপ্ন— এগুলোর জন্য কলাম নেই।

'ডারসু' শেখায় সম্পর্ক। 'অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম' দেখায় কাঠামোর নিষ্ঠুরতা। 'প্রতিদ্বন্দ্বী' বলে বঞ্চনা। ড্যানিয়েল ব্লেক দেখায় রাষ্ট্রের স্বার্থপর উদাসীনতা। তাই, যখন 'নথি'র চেয়ে মানুষ বড় হবে তখনই মুক্তি। কারণ, মানুষ আসলে 'অভিবাসী'। আর গণতন্ত্রের মালিকও মানুষই। 'নথি' নয়।


Monday, 13 July 2026

বদলাচ্ছে না, বদলে গেছে!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রলয়ে অর্থনৈতিক মহাবিপ্লব

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক মানব ইতিহাসের তীব্রতম অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সাক্ষী। ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প, খনিজ সম্পদ বা স্পর্শক উৎপাদন খাতকে বহু পিছনে ফেলে প্রধান পরিসরটি দখল করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক শিল্প। চলতি আর্থিক বছরগুলির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিমাণ বার্ষিক ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি স্পর্শ করেছে। এনভিডিয়া (Nvidia), মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic)’এর মতো প্রযুক্তি দৈত্যদের সম্মিলিত বাজার মূল্য বিশ্বের প্রধান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর জিডিপি’কেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা ও জেনারেটিভ এআই মডেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম মাত্র কয়েক বছরে কয়েকশো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে পুঁজির এই তীব্র সমাগম প্রমাণ করে যে, ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একমাত্র লাভজনক পরিসর হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বুঝছে। এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন এ তাবৎকালের অর্থনীতির সমস্ত ধ্রুপদী ভাবনা, শ্রম-পুঁজি সমীকরণ ও প্রথাগত বৃদ্ধি-মডেলকে সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল করে দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ শুধু যান্ত্রিক ক্রিয়ামাত্র নয়, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীল ও প্রশাসনিক কাজের ভারও নিখুঁতভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। ব্যাঙ্কিং, আইনি পরামর্শ, কোডিং, কনটেন্ট তৈরি, গ্রাহক সেবা থেকে শুরু করে জটিল চিকিৎসা বিশ্লেষণের সিংহভাগই এখন এআই-এজেন্ট দ্বারা পরিচালিত। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষ রাতারাতি কাজ হারাচ্ছে। কারণ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মানবসম্পদের পেছনে ব্যয় সংকোচন হেতু অতি-উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগে মেতে উঠেছে। অবশ্য পাশাপাশি, এই ধ্বংসস্তূপের ওপর কিছু নতুন কাজেরও সৃষ্টি হচ্ছে, তবে তা কোনও স্থায়ী বা স্থিতিশীল কর্মসংস্থান নয়। এই নতুন কাজগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়ক— যেমন, 'প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং', 'ডেটা অ্যানোটেশন' বা নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের ত্রুটি সংশোধন (Debugging) ইত্যাদি। এই কাজগুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত (Highly Specialised) এবং বিশেষ মেধার দাবিদার হলেও এগুলোর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্যই— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত দ্রুত নিজেকে উন্নত করছে, এই সহায়ক কাজগুলোর প্রয়োজনীয়তাও তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে, নতুন সৃষ্টি হওয়া কর্মসংস্থান কর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী চাকুরির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ।

কাজের বাজারের এই তীব্র রূপান্তর শ্রমের ভুবনকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর করে তুলেছে। আজ যে দক্ষতা অর্জনের জন্য একজন তরুণ কয়েক বছর ব্যয় করছে, শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই সেই দক্ষতাটি নবতর প্রযুক্তির কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। সব কিছু এত ক্ষিপ্র গতিতে ও আকস্মিকভাবে ঘটছে যে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চলতে পারছে না। কারণ, আমাদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিল্প বিপ্লবের যুগের সমগোত্রীয় শ্রমিক ও কর্মী তৈরির ছাঁচে গঠিত। চার বছরের একটি ডিগ্রি বা প্রথাগত পাঠক্রম আজ বাজারের তাৎক্ষণিক চাহিদার তুলনায় প্রায় এক দশক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে গতিতে তাদের সিলেবাস পরিবর্তন করে, প্রযুক্তি তার চেয়ে হাজার গুণ দ্রুত গতিতে বিবর্তিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে এবং ডিগ্রিধারী লাখ লাখ তরুণ এক চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পতিত হচ্ছে, যা শ্রমের বাজারে এক গভীর শূন্যতা ও কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে।

কাজের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ভিত্তির এই আকস্মিক ভাঙন কেবল বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়ছে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও। কাজের অভাব মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং সমাজে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একদিকে মুষ্টিমেয় প্রযুক্তি-পুঁজির মালিকদের উপচে পড়া সম্পদ, অন্যদিকে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎহীনতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক গভীর হতাশা, বিষাদগ্রস্ততা ও আত্মঘাতী প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। সমাজে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে, ডিজিটাল অপরাধ ও পারিবারিক হিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ এক গভীর নৈরাজ্যের মুখোমুখি, যেখানে পুরনো সামাজিক নিয়মগুলো ভেঙে পড়ছে কিন্তু কোনও নতুন সুসংহত সামাজিক ভরসা গড়ে উঠছে না। এই আচম্বিত ও অযাচিত নতুন সমস্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও দিশেহারা।

আমরা দেখেছি, যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্বের সংকটে ভোগে এবং অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন অবচেতনভাবেই তাদের মনে এক ধরনের আদিম ভয় ও অতি-রক্ষণশীল মানসিকতা জন্ম নেয়। এই সামগ্রিক আবহে মানুষ নিজের দুর্দশার প্রকৃত কারণ বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ত্রুটিকে না বুঝে বোধবুদ্ধি হারিয়ে তাৎক্ষণিক ফল লাভের আশায় অযৌক্তিক ভাবনার ফাঁদে পড়ে প্রায়-পাগলদশায় নিমজ্জিত হয়। ফলে, এক বড় অংশের মানুষ মনে করতে থাকে যে, তার এই চরম সংকটের জন্য তার চারপাশের অন্য কোনও ‘অচেনা’ পরিসরের মানুষেরাই দায়ী— যেমন, অভিবাসী শ্রমিক, ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ বা প্রান্তিক জাতির লোকজন। তারা মনে করে, এই 'অন্যরা' এসে তাদের যাপনে ও রুটি-রুজিতে ভাগ বসাচ্ছে। আর এই তীব্র নৈরাশ্য থেকে উদগত মনস্তাত্ত্বিক ভয়, অন্ধ ক্ষোভ ও পারস্পরিক ঘৃণাকেই সুচতুরভাবে কাজে লাগিয়ে দেশে দেশে শক্তিশালী হচ্ছে ফ্যাসিস্ট ও উগ্র-মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলি। তারা সুচতুর ভাবে এই অসহায়তা ও বিভাজন ভাবনাকে চাগিয়ে তুলছে (সোশ্যাল মিডিয়ার ফেক খবর ও মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার পক্ষপাতদুষ্টতায় যা সম্ভবও হচ্ছে) এবং বর্ণবাদী, ধর্মবাদী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করছে। এই ঘৃণার রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা ক্ষমতা দখল করে (বেশ কিছু দেশে করেওছে) বিদ্বেষ ও বিভাজন-কেন্দ্রিক এক স্থায়ী মতান্ধ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা প্রকৃত সংকটকে আড়াল করে সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণকে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

তাই বলে বিশ্ব তো এভাবে একবগগা হানাহানির নিয়মে দিনের পর দিন চলতে পারে না। অতএব, এই মহাসংকট থেকে নিষ্কৃতির কিছু বাস্তবোচিত রাস্তাও নির্মিত হচ্ছে। যখন দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগুয়ান প্রলয়ে বিপুল ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা প্রকারান্তরে বিলীন, তখন পথ হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জারিত সুবিশাল উদ্বৃত্তের ওপর শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে সুনিশ্চিত করা। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবশ্যম্ভাবী প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে কোনওভাবেই অস্বীকার না করে, বরং তাকে সানন্দে স্বাগত জানিয়ে, তার দ্বারা উৎসারিত যে বিপুল উৎপাদনশীলতা ও উপচে পড়া উদ্বৃত্ত-প্রবাহ, তার উপর যদি সর্বসাধারণের আইনি অধিকার কায়েম করা যায়, তবে মানুষকে আর বেঁচে থাকার জন্য বাধ্যত দৈনিক ৮-১৬ ঘণ্টা মজুরি-দাসত্ব করতে হয় না। সেই সুবাদে সূত্রপাত গোছের একটি উপায় হিসেবে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে এই আইনি অধিকার প্রণয়ন করার চল হয়েছে— যেমন, ব্রাজিলে ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’, মেক্সিকো’তে ‘প্রোগ্রেসা’ অথবা, আলাস্কা’তে ‘পার্মানেন্ট ফান্ড ডিভিডেন্ড’, এমনকি ইরান, কেনিয়া, লাইবেরিয়াতেও এমন নানাবিধ প্রকল্প বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সবিশেষ উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘যুবসাথী’ ইত্যাদি এবং তামিলনাড়ুতেও এই ধরনের নগদ হস্তান্তরের প্রকল্প বিশ্বের মর্যাদা কুড়িয়েছে ও অনুসরণযোগ্য পথ হিসেবে গ্রহণীয় হয়েছে; যদিচ, ইদানীং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের’ নাম পরিবর্তন ও উপভোক্তাদের তালিকা কাটছাঁটের ফলে এই প্রকল্পটি আপাতত সর্বজনীন চরিত্র হারিয়ে কিছুটা বিশ বাঁও জলে এবং পরিণতিস্বরূপ জেলায় জেলায় চলছে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ। বহু দেশে অবশ্য এখনও নগদ হস্তান্তরের প্রকল্প চালু না হলেও বিভিন্ন সরকারি পরিষেবার মাধ্যমেও মানুষের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ (প্রকারান্তরে, আয় বৃদ্ধি) বেশ স্পষ্ট। নিউ ইয়র্ক শহরের কর্পোরেশন এমনতর পরিষেবার জন্য যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

বলাই বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও বিশ্বের অন্যত্র, এই যে নগদ হস্তান্তরের উদ্যোগগুলিকে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)’এর পাইলট প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা হয়, সেগুলো আসলে ভবিষ্যতের 'Universal High Income' (UHI) বা সর্বজনীন উচ্চ আয়ের প্রাথমিক ভ্রূণ বা ল্যাবরেটরি টেস্ট। আগেই বলেছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ যখন উৎপাদন ব্যবস্থাকে মানুষের শ্রম ব্যতিরেকেই 'অতি-উৎপাদনশীল' করে তুলবে, রাষ্ট্রের উদ্বৃত্তের পরিমাণ হবে কল্পনাতীত। তাই বলাই যায়, আজকের এই কল্যাণমুখি নগদ হস্তান্তরের প্রকল্পগুলো কোনও সাময়িক দয়া বা খয়রাতি নয়, বরং মজুরি-দাসত্ব থেকে মুক্তিস্বরূপ 'সর্বজনীন উচ্চ আয়ের' যুগে পদার্পণ করার প্রথম সোপান।

প্রশ্ন হল, এই অকল্পনীয় প্রযুক্তিগত তথা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাতে কেকের ভাগ নিয়ে ধর্ম-বর্ণ-জাতি ভিত্তিক বিদ্বেষমূলক রাজনীতির ঘৃণ্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে তৎপ্রসূত রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিসরে আমজনতাকে স্বস্তির আয় জোগানো— কোনটা পথ? প্রথম পথটি ফ্যাসিস্ট ও মতান্ধদের, যারা চায় ভিন্ন গোষ্ঠীর নির্মূলিকরণ, দ্বিতীয় পথটি গণতান্ত্রিক সমাজবাদের যারা সকল বৈচিত্র্যকে ধারণ করে এক উদার সমাজবাদী অর্থনীতি নির্মাণে ব্রতী। 

যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জারিত অফুরন্ত উদ্বৃত্তের ওপর ভিত্তি করে সমাজ মানুষের মানসম্পন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রার সর্বাত্মক ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারবে, মানুষ তখন কেবল জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বা ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্যত কোনও অসহায় যন্ত্রের মতো কাজ করবে না। কাজ হবে ব্যক্তির সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছাধীন, সৃজনশীল ও আত্মবিকাশের মাধ্যম। মানুষের তখন আর জীবনধারণের দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রজনী যাপনের কোনও কারণ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজনৈতিক অর্থনীতি এই ধারণাকে পূর্ণাঙ্গ রূপে বাস্তবায়িত করতে পারে।


Sunday, 5 July 2026

ফিরে দেখা: চলচ্চিত্র উৎসব

সিনেমার খোলা জানালা বন্ধ?

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



এই লেখাটা আজ ২০২৬-এর জুলাই মাসে বসে লিখতে হচ্ছে। কারণ, ২০২৫-এর নভেম্বরে হয়ে যাওয়া ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আজ হঠাৎ করেই একটা দলিল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে কলকাতা কি আবার এমন একটা জানালা খুলে রাখতে পারবে, যেখান দিয়ে গোটা দুনিয়ার যন্ত্রণা, প্রতিরোধ আর স্বপ্ন এসে আমাদের ঘরে ঢোকে?

বইমেলা আর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল— এই দুই উৎসবের হাত ধরেই কলকাতা গত কয়েক দশক ধরে চিনেছে পৃথিবীকে। মরুভূমির বেদুইন থেকে আমাজনের আদিবাসী, বসনিয়ার উদ্বাস্তু থেকে মণিপুরের কান্না— সব ভাষা, সব ধর্ম, সব লড়াইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় এই দুই আঙিনাতেই। সিনেমা শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল নাগরিক শিক্ষার পাঠশালা। আমরা শিখেছি সহাবস্থান কাকে বলে, মানুষের অধিকার কেন জরুরি, রাষ্ট্র যখন খাঁচা হয়ে ওঠে তখন শিল্প কীভাবে তালা ভাঙে।

আজ বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। নতুন ক্ষমতা-কাঠামোয় সংস্কৃতি কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যে শহর দেশভাগের ছেঁড়া শিকড়ের গল্প দেখিয়ে কেঁদেছে, যে শহর মানবিকতার আলোয় পথ চিনেছে, সেই শহর কি আগামী দিনেও অভিবাসী মানুষ, উদ্বাস্তু পরিবার, দলিত কণ্ঠস্বর, আদিবাসী অধিকার, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের পাশে একইভাবে দাঁড়াতে পারবে? শোষণের বিরুদ্ধে মানবাধিকারের পক্ষে যে-স্বর কলকাতা এতদিন তুলেছে, সেই স্বর কি আগের মতোই মর্যাদা পাবে? তাই যখন চারপাশে দেওয়াল উঠছে, তখন ২০২৫-এর নভেম্বরে দেখা সেই ছবিগুলোর কথাই বারবার ফিরে আসছে। কারণ সেগুলো প্রমাণ করেছিল— উচ্ছেদ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা আর কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও পৃথিবী জুড়ে একটা ঐকতান বাজছে। সিনেমা সেই ঐকতানেরই নাম।

৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলেছিল ৬ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর (২০২৫) পর্যন্ত। ৩৯টি দেশের ২১৫টি ছবি দেখানো হয়েছিল ২১টি প্রেক্ষাগৃহে। উৎসব কর্তৃপক্ষ নতুন বিভাগ ‘Beyond Borders’ চালু করেছিল, যেখানে মূল থিম ছিল বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন। পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত, লোভে ঢাকা যুগে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তবু সিনেমা বিশৃঙ্খলার মধ্যে আলোর দিশারি হয়ে জ্বলছে— এই বার্তাই উৎসবের রাজনৈতিক অভিমুখ স্পষ্ট করে দেয়।



এই প্রেক্ষাপটে প্যালেস্টাইনের ছবিগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। ‘Palestine 36’ ছিল প্যালেস্টাইনের অস্কারে পাঠানো অফিসিয়াল ছবি। ১৯৩৬-১৯৩৯ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্যালেস্টিনি বিদ্রোহের পটভূমিতে তৈরি এই ছবি দেখায়, ১৯১৭-এর বালফোর ঘোষণার পর কীভাবে ভূমি-হারানো মানুষের দুর্দশা শুরু হয়। ছবিতে ব্রিটিশ দমননীতি, জমি দখল আর স্থানীয়দের বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া স্পষ্ট। উপনিবেশবাদ কীভাবে ‘আমরা-ওরা’ বিভাজন তৈরি করে রাষ্ট্রীয় হিংসার বৈধতা দেয়, সেই ইতিহাসকে ছবিটি সামনে আনে। রশিদ মাশারাবির ‘Songe’এও দখলদারিত্ব ও নির্বাসনের যন্ত্রণা উঠে আসে। লেবাননের 'Tales of the Wounded Land' ২০২৩-২৪ সালের বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নাবাতিয়েহ অঞ্চলের দলিল। পরিচালক দেখান, ভাঙা দেওয়াল শুধু ইঁট-কাঠ নয়, আঘাত আর স্মৃতির ভাষা।

উদ্বাস্তু সংকটের আরেক দলিল কাজাখস্তানের ‘Entrapment’। ছবিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আগ্রাসনের আশঙ্কায় সোভিয়েত অঞ্চল থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে। রেল স্টেশনে ছোট্ট মেয়ে ল্যাম্পপোস্ট ধরে মাকে খুঁজছে— এই একটা দৃশ্যই বাস্তুচ্যুতির সমস্ত আবেগ ধরে রাখে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কীভাবে সাধারণ মানুষকে অসহায় করে, তা এখানে নির্মমভাবে ফুটে ওঠে।

ইরানের ‘Scarecrow’ স্বৈরতন্ত্রের সাংস্কৃতিক চেহারা তুলে ধরে। ছবিতে এক মেয়ের শিল্পীসত্তাকে পরিবার দমিয়ে রাখে। দূর দেশে ‘স্কেয়ারক্রো’ সেজে অভিনয় করা তার দমিত ইচ্ছারই রূপক। রাষ্ট্র ও পরিবারের দ্বৈত নিপীড়নের মধ্যে নারীর পরিচয় সংকট এখানে স্পষ্ট। ভিন্ন স্বরকে চুপ করিয়ে দেওয়ার এই কৌশলই নয়া ফ্যাসিবাদের ভাষা।

শ্রীলঙ্কার ‘Riverstone’ রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দলিল। রোড মুভিতে তিন পুলিশ অফিসার উপরমহলের আদেশে এক সন্দেহভাজনকে হত্যা করে। আইন যখন ক্ষমতার হাতে বন্দী, নাগরিকের নিরাপত্তা তখন শব্দমাত্র। জার্মানি-ইতালি-অস্ট্রিয়ার যৌথ প্রযোজনা ‘A Land Within’ দেখায়, ইতালীয় প্রশাসনের অধীনে দক্ষিণ টাইরলের জার্মান-ভাষী সংখ্যালঘুরা কীভাবে জাতিগত দমনের শিকার। ইতিহাসের উত্তাল মুহূর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

ভারতের ছবিগুলোও কম সাহসী নয়। ‘Pinjar’ কলকাতায় মুসলিমদের ভাড়া বাড়ির বৈষম্য নিয়ে। কোভিডের সময় এক মুসলিম পরিবারকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। ছবিতে বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর কাজের লোক গোবর-জল দিয়ে উঠোন ধোয়। খাঁচার পাখি এখানে কুসংস্কার আর সামন্ততন্ত্রে বন্দী আত্মার প্রতীক। কর্পোরেট শহরের বুকে এই ধর্মীয় অস্পৃশ্যতা নীরব ফ্যাসিবাদ ছাড়া কিছু নয়। ‘White Snow’ সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াই। কার্গিলের এক শর্ট ফিল্ম ধর্মীয় নেতারা নিষিদ্ধ করেন প্রসব-পরবর্তী রক্ত দেখানোর অপরাধে। ছবিতে এক মা নিষিদ্ধ ডিভিডি আর টিভি নিয়ে ইয়াকের পিঠে চেপে উপত্যকায় ঘোরেন। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের যৌথ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এ এক মায়ের শিল্প-বিদ্রোহ।

গুয়াতেমালার ‘Mountains of Fire’ কর্পোরেট-রাষ্ট্র আঁতাতের গল্প। ছবিতে দুই আগ্নেয়গিরি-বিশেষজ্ঞ আদিবাসী গ্রামে গিয়ে দেখেন, সরকার কীভাবে প্রান্তিক মানুষকে অবহেলা করছে। উন্নয়নের নামে জমি থেকে উৎখাত, বিশ্বাসকে অসম্মান— এটাই কর্পোরেট আধিপত্যের নতুন চেহারা।


'কোমলগান্ধার'

উৎসবের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অংশ ছিল এক কিংবদন্তি পরিচালকের শতবর্ষ উদযাপন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’— এই ছবিগুলো দেশভাগ আর শিকড়-ছেঁড়া মানুষের মহাকাব্য। ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বে ১২.৩২ কোটি মানুষ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত। সেই কারণেই এই ছবিগুলো আজও জরুরি। ‘Beyond Borders’ বিভাগে মিশরের ‘The Brink of Dreams’ আর সুদানের ‘Madaniya’ দেখিয়েছে, তরুণরা রাস্তার থিয়েটার আর অনলাইন জোটে কীভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। এগুলো কোটি কোটি মানুষের শিকড়হীন জীবনের যন্ত্রণা ও আশার অন্বেষণ এবং বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের শক্তিশালী আখ্যান। পোল্যান্ড ছিল এবারের ফোকাস কান্ট্রি। ১৯টি পোলিশ ছবি দেখানো হয়। পরিবেশ নিয়ে চারটি আন্তর্জাতিক ছবিও ছিল। সত্যজিৎ রায়ের উক্তি দিয়ে ‘Beyond Borders’ বিভাগ শুরু হয়েছিল: 'তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল!'।

এইসব ছবি একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, ফ্যাসিবাদ এখন আর শুধু বুটের আওয়াজ নয়। কখনও তা উচ্ছেদের নোটিশ, কখনও তা নোটিশ না দিয়েও রাতারাতি উচ্ছেদ, কখনও ভাড়া বাড়ির বৈষম্য, কখনও সিনেমায় সেন্সরশিপের কাঁচি, কখনও উন্নয়নের বুলডোজার। ৩১তম কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সেই অদৃশ্য খাঁচাগুলোকেই দৃশ্যমান করেছিল। আজ ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশ্ন একটাই— এই জানালাটা খোলা থাকবে তো? সিনেমা যদি প্রতিরোধের ভাষা হয়, তবে সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদেরই। কারণ, দেওয়াল তোলা সহজ, জানালা খোলা রাখাটাই কঠিন। আর কলকাতা যদি সেই কঠিন কাজটাই ভুলে যায়, তবে 'কী কী ভুলে যেতে হবে আর কী কী ভাবে বাধ্য থাকতে হবে'-- এই ব্রাকেটে যেন নাগরিক অধিকার আন্দোলন বদ্ধ না থাকে। 


Saturday, 27 June 2026

এই আশু দাবিতে জয় জরুরি

ধর্মেন্দ্র প্রধান যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বললেন...

অরূপ বৈশ্য



ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এক আকস্মিক ও বিস্ময়কর ফেনোমেনন। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম দল বিজেপিকে মোকাবিলা করতে ভারতের তাবৎ বিরোধী দল সমূহ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন জন্ম নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইন্সটাগ্রামে বিজেপির অনুসরণকারী সংখ্যাকে বহু পেছনে ফেলে সিজেপি ২২+ মিলিয়ন অনুরাগীর সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে। আজকের ঘটনাবহুল বিশ্ব আকস্মিকতায় ভরপুর, কোনও কিছুই যেন আগে থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে না।

আরশোলারা ও শিক্ষা ব্যবস্থা

যা শুরু হয়েছিল অনলাইন তীর্যক কৌতুক হিসাবে, তা আছড়ে পড়ল রাজধানী দিল্লির রাজপথে। যন্তর মন্তরের রাজপথে অবস্থানরত হাজার হাজার বিক্ষোভকারীদের ঘোষণা, 'আমরা এখানেই আছি, যতক্ষণ না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করছেন।' 

আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থার বিষাক্ত চাপে ছাত্র-সমাজের অবদমিত ইগো এখন দিশেহারা। বিশিষ্ট বিশ্লেষক প্রতাপ ভানু মেহতা সংবাদপত্র কলামে লিখেছেন, আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থা শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, অসামান্য ভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক হাতিয়ার, যেখানে কী এবং কেন প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই; বিষাক্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থে 'হয় করো, নয়তো মরো'। ফলে, চূড়ান্ত হতাশা ও ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরীভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমে সফল। সে জন্য ককরোচ বিদ্রোহের পেছনে নির্দ্দিষ্ট কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজা বৃথা। শত হিসাব করে বিরোধী দলগুলি যখন দাঁত ফোটাতে ব্যর্থ, তখন নিস্তরঙ্গ জলে ঢেউ তুলেছে ককরোচি ফেনোমেনন। 

জেন-জি’র আসল পরিচয়

বলা হয়, ১৯৯৭ থেকে ২০১২-এর মধ্যে যারা জন্ম নিয়েছে তারা জেন-জি এবং ২০১৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম জেন-আলফা। জেন-জি’রা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের দুনিয়ায় প্রথম প্রজন্ম, আর জেন-আলফারা 'মিলেনিয়াল শিশু' যারা অগমেন্টেড রিয়্যালিটি বা ভার্চুয়াল উপাদান উদ্ভূত বর্ধিত বাস্তবতা ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ার বাসিন্দা। 'মিলেনিয়াল শিশু' হচ্ছে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে জন্ম নেওয়া জেনারেশন বা জেন-ওয়াইয়ের সন্তান। স্পষ্টতই এই ধরনের সংজ্ঞা বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার এক বুর্জোয়া পদ্ধতি। 

১৯৮০ থেকে ১৯৯০-- এই সময়ের মধ্যে নয়া-উদারবাদী ওয়াশিংটন কনসেনশাস বিশ্বব্যাপী জাঁকিয়ে বসেছে। নতুন প্রযুক্তি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অক্ষম তো বটেই, পুরনো কর্মসংস্থানকেও ছাঁটাই করতে উদ্যত। অতি-উৎপাদনের সঙ্কটে জর্জরিত ও হতাশাগ্রস্ত বিশ্ব-ব্যবস্থাকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে সার্ভিস ও ফিনান্সে দেদার বিনিয়োগে একাংশ নতুন ধনকুবেরদের অফুরন্ত মুনাফা। সার্ভিস সেক্টরে নতুন প্রযুক্তি ও ফিনান্স বাজারে নতুন হাতিয়ার এই বিনিয়োগের সহযোগী শক্তি। পুঁজির কাঠামো ও কার্যপ্রণালীগত বিন্যাস বদলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চরিত্র বদল ঘটল শ্রমিকেরও। পুরনো শ্রমিকের জায়গা নিল নতুন শ্রমিক। এই শ্রমিকরা শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, এদের কাজের ধরন, কর্মস্থল ও সামাজিক পরিসর, জীবনধারা ও জীবনবোধ, আচরণ ও মেজাজ সবকিছুই ভিন্ন। এই নতুন শ্রমজীবীদের কালেক্টিভ সাপ্রেসড ইগো কখন কোথায় কীভাবে বিস্ফারিত হয় তার পূর্বানুমান অসম্ভব না হলেও দুরূহ। ছাত্রদের আচরণ শ্রেণি-উৎস দিয়ে নির্ধারিত, সামগ্রিক সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাত্রদের আচরণে পরিবর্তন হয়, কারণ তারা সরাসরি কোনও উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত নয়– এই নিয়মের কোনও ব্যত্যয় আধুনিক বিশ্বে ঘটেনি। কিন্তু এই নতুন শ্রমজীবীরা শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, সব বিচারেই এরা নতুন। বিশ্বের যে কোনও সামাজিক বিস্ফোরণের ঘটনায় কখনও দৃশ্যমান বা কখনও ফল্গুধারার মতো এরা এক অদৃশ্য কারিগর, অথচ তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ব-পরিকল্পনার কোনও হদিশ পাওয়া দুষ্কর।

নব প্রজন্মের ভারতীয় স্বরূপ

নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে মন্দির-মসজিদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বিজেপি’র উত্থান ও ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠান, তারপরই দেখা যায় সঙ্ঘ-রাজনীতির দ্রুত সামাজিক বিস্তৃতি। তাকে প্রতিহত করার সমস্ত বৈচিত্র্যবাদী বিরোধী প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ধরাশায়ী হয়েছে। দক্ষিণে আঞ্চলিক বুর্জোয়াদের এক উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে বৈচিত্র্যবাদ খানিকটা এখনও টিঁকে আছে। কিন্তু কেন্দ্রীভূত অর্থনীতি এবং নতুন জন্ম নেওয়া মধ্যশ্রেণি এক বিকৃত জাতীয় সমসত্তার রাজনীতিকে দ্রুত প্রাধান্যের জায়গায় নিয়ে আসছে, যাকে বৈচিত্র্যবাদ দিয়ে প্রতিহত করা অসম্ভব। অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভবন যেভাবে পুরনো আঞ্চলিক ও জনগোষ্ঠীয় বুর্জোয়া শ্রেণিশক্তির মেরুদণ্ড দ্রুত ভেঙে দিচ্ছে, তেমনই রেন্ট-শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে এক নতুন জনগোষ্ঠীয় মধ্যশ্রেণির জন্ম দিচ্ছে যাদের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনও স্বার্থের সম্পর্ক নেই, আছে নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক এবং এই শ্রেণি বিকৃত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথ ধরে জাতীয় সমসত্তার রাজনীতিতে সামিল হয়ে যাচ্ছে। এই সমসত্তা 'উইদারিং অ্যাওয়ে অব আইডেন্টিটি' বা পরিচিতির বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া নয়, সম্পূর্ণ অধীনতার প্রক্রিয়া। এই অধীনতায় আত্মস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুধু সাংস্কৃতিক নয়, মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, ফলে সামগ্রিক। সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় জনগোষ্ঠীয় স্তরে সেটা এক নতুন ধরনের পুনরুজ্জীবনবাদ যার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তি ঘটে সনাতনী ভারতে – আর সে জন্যই তথাকথিত আর্যভূমি বা গোবলয়ের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারতের বৈচিত্র্যময় জনজাতি বা আধা-জনজাতিয় সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীরও সামিল হতে কোনও আপাত অসুবিধা হচ্ছে না।

উপরিসৌধে এই অধীনতা সম্মতিসূচক হলেও, অধীনতার নিয়ম অনুযায়ীই তা একইসঙ্গে অবদমনকেও সূচিত করে। আর সেই সার্বিক অবদমনের শিকার এই নব্য শ্রমজীবী নতুন প্রজন্ম-- শ্রমিক হিসাবে কাজের পরিসরে, নাগরিক হিসাবে সামাজিক পরিসরে, পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামোয় শ্রমিক-পরিবারের নারী সদস্য হিসাবে। ফলে, প্রতিরোধের শক্তি এই নব প্রজন্মেরই আছে, যাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে ছাত্রসমাজের গরিষ্ঠাংশ। মধ্যবিত্তরা যে কবেই বৈচিত্র্যকে ধারণ করার প্রাণশক্তি হারিয়েছে তা বহু আগেই বোঝা উচিত ছিল আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক সমাজের। 

সমসত্তার রাজনীতি ও প্রতিস্পর্ধী শক্তি 

বিরোধী রাজনীতির অগভীর উপলব্ধির জন্যই, রাষ্ট্র ও নাগরিক কিংবা ভোটারের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের জন্য নেওয়া একের পর এক পদক্ষেপে বিজেপি সাফল্য পাচ্ছে, প্রতিটি সাফল্য জনগণকে সঙ্ঘ রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করছে। বিকৃত সমসত্তার রাজনীতির যে বাস্তবতা, তার গর্ভে রয়েছে আধুনিক শ্রেণি হিসাবে আবির্ভূত নতুন মধ্যশ্রেণি ও শ্রমজীবী শ্রেণি। ফলে, প্রতিস্পর্ধী শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এমন এক শ্রমজীবী শ্রেণি যাদের সামূহিক আচরণের কোনও পূর্ব-নির্ধারিত প্রক্রিয়া জানা নেই। আবার ভারতীয় বাস্তবতায় জনগোষ্ঠীয় সীমারেখা একেবারে মুছে যায়নি, বরং পরিচিতি নতুন গণতান্ত্রিক অন্তর্বস্তুকে ধারণ করতে সক্ষম আত্মশক্তির বিকাশের জন্য অপেক্ষা করে আছে। অসমে জুবিন-আবেগ কিংবা বিহারের এসআইআর'এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের স্পৃহা সেই আত্মশক্তিকে চিহ্নিত করে। কিন্তু তাদের ইচ্ছা ও চাহিদাকে বুঝতে অক্ষম রাজনীতি তাদেরকে হতাশ করছে ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করছে। জুবিনের মৃত্যুর ন্যায়বিচারের দাবিতে লাখ লাখ এ ধরনের শ্রমজীবী নতুন প্রজন্মের যুবসমাজের যে রাজপথে ঢল নেমেছিল, তা আসলে তাদের হৃদয়ের অবদমিত ইচ্ছার সামূহিক বহিঃপ্রকাশ, যেখানে অন্তর্নিহিত ছিল তাদের নিজস্ব ন্যায়বিচারের সুপ্ত বাসনা। বিহারের এসআইআর'এ শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল পরিযায়ী শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা, হয়ে উঠেছিল বেনাগরিক হওয়ার বিপন্নতার উদ্বেগে অস্থির। আস্থা রেখেছিল বিরোধীদের উপর, কারণ বিরোধীরা দাবি করেছিল 'ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করা যাবে না'। কিন্ত ক্ষণিকের আবেগে বিদ্রোহে জ্বলে ওঠা তাদের চরিত্রের বিপরীতে বাস্তবে ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিরোধীদের ভূমিকায় তাদের অবদমিত সত্তা নিরুপায় আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। 

ককরোচ ফেনোমেনন ও গণতন্ত্র

ককরোচ ফেনোমেননে ছাত্ররা গণতন্ত্রের মশাল হাতে নিয়েছে। তিয়েনানমেন চত্বরে ১৯৮৯ সালে ছাত্ররা গণতন্ত্রের জন্য সমাবেশিত হয়েছিল। ছাত্রদের আন্দোলনের সেই সুযোগে সেখানে সমাবেশ ঘটে চিনের শ্রমিকদেরও। চিনের শাসক গুলি চালালে নিহত হয় বিক্ষোভকারী ছাত্ররা, তখন ছাত্ররা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু জমি আঁকড়ে পড়ে থাকা শ্রমিকদের উপর পরবর্তী দীর্ঘসময় বর্বরোচিত অত্যাচার হয়, বিক্ষোভ ব্যর্থ হয়। সেই শ্রমিকরা সামিল হয়েছিল ইউনিয়নের জন্ম দিয়ে। বিক্ষোভে সামিল হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল বোধগম্য ও সচেতন। এই বিদ্রোহ দমনের ফলে শাসনের একনায়কতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়। 

দিল্লির চলমান ছাত্র আন্দোলনে সামিল হচ্ছে সেই নব্য শ্রমিকরা। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কীভাবে এবং কোন অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষায় মত বিনিময় করছে সেটা কোনও সংগঠিত ইউনিয়ন প্রক্রিয়া দ্বারা নির্ধারিত নয়। কিন্তু গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে বা প্রসারিত করতে এই প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে এক 'ঈশ্বর প্রদত্ত' মুহূর্ত। অথচ আমাদের বিরোধী রাজনীতি তাতে এককাট্টা হয়ে সামিল হতে, অন্তত 'ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই' এই আশু দাবিতে আন্দোলনের বিজয় অর্জনের পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে দোদুল্যমান (অথচ, এই আশু দাবিটি যদি অর্জিত হয় তবে ভারতীয় রাজনীতি কিন্তু এক মোড় ঘোরানো পথে এগোতে থাকবে)। কেউ কেউ সামিল হচ্ছে নিজেদের সাংগঠনিক ফায়দা তোলার মানসিকতায়। তবে আশার কথা এই যে, বিভিন্ন সামাজিক ক্যাটাগরির সংগঠন ধীরে ধীরে এই আন্দোলনে সামিল হচ্ছে। 

স্থানকালের নিরিখে বর্তমান ভারত আর ১৯৮৯-এর চিন এক নয়। বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারতীয় সমাজ ও তার বিকাশের পথও ভিন্ন। নয়া-উদারবাদ ব্যর্থ হয়ে সমগ্র বিশ্ব এক অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে এগোনোর মাধ্যমে কিংবা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগে যদি আন্দোলন ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও একনায়কতন্ত্রের প্রবণতা সাময়িকভাবে হলেও আরও শক্তি সঞ্চয় করবে। আশা করা যায়, গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধী শিবিরের বোধোদয় হবে।


Wednesday, 24 June 2026

আত্মপরিচয়ের খোঁজে

'হিন্দু' পরিচয়ের ঐতিহাসিক বিবর্তন

পার্থসারথী চৌধুরী



গত এক দশক ধরে ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির অঙ্গনে 'হিন্দুত্বের' নামে যে ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান, তার নিশ্চিত এক ঐতিহাসিক পট-বিবর্তন আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, যা ঘটছে, যা চলছে তা যুক্তিসিদ্ধ ও অবধারিত। এর মধ্যে ঐতিহাসিকতা ও মিথ্যাচার দুইই আছে। 'হিন্দু' শব্দটি নিজেই এক জটিল ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের রূপ। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, উপনিষদ-- কোথাওই 'হিন্দু' শব্দের কোনও উল্লেখ নেই। তাহলে শব্দটি এল কোথা থেকে? কেনই বা? 'গীতা'য় শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম ও অধর্মের কথা বলছেন ('হিন্দু' নয়)। এই 'ধর্ম' বলতে কী বোঝানো হয়েছিল? 

মধ্যযুগেও বেশি প্রচলিত ছিল 'সনাতন ধর্ম', 'বৈদিক ধর্ম' বা 'বৈষ্ণব', 'শাক্ত' এই পরিচিতিগুলিই। বরং, 'হিন্দু' শব্দটি (যার উদ্ভব আরও কয়েক শতক আগে) তখনও মূলত ভৌগোলিক ও জাতিগত পরিচয় হিসেবেই ব্যবহৃত হত। এই পরিচয় সূত্রেই সে সময়কার তুর্কি, আফগান বা মোগল, যাদের তৎকালীন সাহিত্যে 'যবন' বা 'ম্লেচ্ছ' বলা হত, তাদের থেকে বাকীদের আলাদা করতেই 'হিন্দু' শব্দের ব্যবহার। অর্থাৎ, 'হিন্দু' শব্দের প্রচলনের মধ্যে স্থানীয়দের পরিচিতির ব্যাপারটাই মূলত সিদ্ধ ছিল; সে অর্থে বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্যরা যারা 'সনাতন ধর্মের' কেউ নন, তারাও 'হিন্দু'দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরে, ইংরেজ শাসনে যখন বিদেশি ও দেশি এই দুই সত্তাই বেশ প্রকট ভাবে এক তুমুল বৈপরীত্যের স্মারক হয়ে উঠল, তখন 'হিন্দু' শব্দটির তাৎপর্য যেন অনেকের কাছেই নানা কারণে আরও মূর্ত ও প্রাসঙ্গিক হল। এর মধ্যে বিদেশি অধীনতার গ্লানিও বেশ জোরালো ভাবে ছিল। ১৮৫৭'র মহাবিদ্রোহের অবসানের পর দেশব্যাপী সরাসরি ইংল্যান্ডশ্বরীর শাসন কায়েম হওয়ায় এই 'আমরা'-'ওরা'র বাস্তবতাও বেশ পেকে উঠেছিল। ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'আর্য সমাজ'এর মতো সংগঠনগুলো হিন্দুদের আর্যদের বংশধর এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি হিসেবে দেখাতে চাইল। এই আখ্যানটি পরবর্তীকালের হিন্দু সংস্কারকদের হাতে একটি পুনরুজ্জীবনবাদী মতাদর্শ তুলে দিয়েছিল, যাতে তারা সমসাময়িক পাশ্চাত্যের আধিপত্য ও অহঙ্কারকে মোকাবিলা করতে পারে। স্বামী বিবেকানন্দের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তাঁর ঐতিহাসিক ১৮৯৩ সালের বক্তৃতায় ভারতকে গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার দেশ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার সঙ্গে এর বৈপরীত্য তুলে ধরে এক আধুনিক রূপান্তরে নিয়ে যেতে সচেষ্ট ছিলেন। সেই রূপান্তর প্রচেষ্টায় জাতীয়তাবাদের বীজ সুপ্ত ছিল যা পরে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রাজনৈতিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে 'হিন্দু' (অন্য অর্থে, 'বৈদিক' বা 'সনাতন') উপাদানগুলি প্রকটিত হতে থাকলে ইসলাম-বিরোধী কিছু প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ১৯১৯ সালের খিলাফত আন্দোলনের সময় ভারতীয় মুসলমানদের প্যান-ইসলামি সংহতি ওই সনাতনী মতাদর্শকে আরও উসকে দেয়, যার ফলস্বরূপ এমনকি হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং 'হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের' মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। ঔপনিবেশিক তকমা দ্বারা 'ক্ষুদ্র জাতি' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বোঝা এবং জাতিভেদ প্রথার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া হিন্দুরা এক হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে; জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা 'মরণশীল জাতি'তে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করতে থাকে।

এই মতাদর্শগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভি ডি সাভারকর তাঁর ১৯৩২ সালের 'হিন্দুত্ব: হু ইজ আ হিন্দু?' বইয়ে একটি কট্টর জাতীয়তাবাদী দর্শনের কথা তুলে ধরেন। সাভারকর আর্য সমাজের জাতিগত আখ্যানকে অগ্রাধিকার দিয়ে দাবি করেন যে, ভারতের হিন্দুদের ('হিন্দু' শব্দটিকে তিনি প্রায় অধিকার করে নেন এবং কালক্রমে তার অর্থকেও সংকীর্ণ করে ফেলেন) শরীরে এখনও বৈদিক রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি ভারতকে কেবল একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এক পবিত্র ভূমি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি সংস্কৃতকে 'সকল ভাষার জননী' হিসেবে ঘোষণা করে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে চান। তিনি স্পষ্টভাবে মুসলমানদের বাহ্যিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন; তাঁর অভিযোগ ছিল, তাদের প্রাথমিক আনুগত্য ভারত নয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করা, যেখানে তিনি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ধর্মকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। আগেই বলেছি, 'হিন্দু', 'হিন্দুত্ব' ও 'হিন্দুস্তান' শব্দগুলোর আদি অর্থে কোনও ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে, এই পদগুলোর ব্যুৎপত্তিগত মূল নিহিত রয়েছে সিন্ধু (Indus) নদীর মধ্যে। প্রাচীন পারসিকরা স্বাভাবিকভাবেই 'S' (স) অক্ষরটিকে 'H' (হ) হিসেবে উচ্চারণ করত, যা 'সিন্ধু'কে 'হিন্দু'তে রূপান্তরিত করেছিল। একইভাবে, গ্রিকরা এটিকে 'ইন্দু' উচ্চারণ করত, যা শেষ পর্যন্ত 'ইন্ডিয়া' (India) শব্দের জন্ম দেয়। ফলস্বরূপ, সিন্ধু নদীর তীরে বসবাসকারী অধিবাসীদের ভৌগোলিকভাবে হিন্দু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

'হিন্দুস্তান' বলতে সংকীর্ণভাবে উত্তর ভারতকে বোঝাত, যে অঞ্চলটি পূর্বে 'আর্যাবর্ত' নামে পরিচিত ছিল। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের সর্বজনীনভাবে 'হিন্দুস্তানি' বলা হত। এই ধর্মনিরপেক্ষ, আঞ্চলিক ব্যবহার ইতিহাস জুড়েই স্পষ্ট। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ক্ষমতাশালী মুসলিম সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় গর্বের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে 'হিন্দুস্তানি দল' হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই দলের প্রভাবশালী মুসলিম সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে নিজেদের 'হিন্দুস্তানি' বলে উল্লেখ করতেন। তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দেশি বনাম বিদেশির পার্থক্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হত, যারা 'তুরানি দল' নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ধর্মের নেতারা 'হিন্দুস্তানি' শব্দটিকে কঠোরভাবে ভারতীয় অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান আরও জোরদার বলেন যে, 'হিন্দু' শব্দটি আদিতে আঞ্চলিক তাৎপর্য বহন করত, যা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আর্য সহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ এবং এর বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, প্রাচীন ভারত পরম ধর্মীয় সহনশীলতার এক কল্পরাজ্য ছিল। বৈদিক আর্যদের আগমন ছিল আগ্রাসী সংঘাতের দ্বারা চিহ্নিত। আদিবাসী অধিবাসীরা— কালো চামড়ার মানুষ যারা 'পুর' নামক প্রাচীর ঘেরা শহুরে বসতিতে বাস করত— আর্যদের হাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন হয়েছিল। আর্যরা হিংসাত্মকভাবে এই শহরগুলোকে ধ্বংস করে গর্ববোধ করেছিল এবং তাদের যুদ্ধদেবতা ইন্দ্রকে 'পুরন্দর' বা দূর্গ ধ্বংসকারী হিসেবে ভূষিত করা হয়েছিল। অনেক আদিবাসী তাদের বিশ্বাস রক্ষার্থে দুর্গম অঞ্চলে পালিয়ে গেলেও, যারা পিছনে রয়ে গিয়েছিল তাদের চাকর বা 'দাস' হিসেবে পরাধীন করা হয়েছিল। তবে, সামরিক বিজয় মানেই সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক নির্মূল ছিল না। আর্যরা বুঝতে পেরেছিল যে, আদিবাসী ধর্মগুলোকে সম্পূর্ণরূপে সমূলে উৎপাটিত করা অসম্ভব। ফলস্বরূপ, সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের একটি ধীর প্রক্রিয়া ঘটেছিল। বৈদিক আর্যরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ ও আত্তীকরণ করেছিল। ফলে, একটি মিশ্র ধর্মের সৃষ্টি হয় যেখানে সংস্কৃতভাষী আর্যরা নিরঙ্কুশ একচেটিয়া আধিপত্য বজায় না রেখেই নেতৃত্ব প্রদান করেছিল।

এই আত্তীকরণ সত্ত্বেও কঠোর বৈষম্য অব্যাহত ছিল। রামায়ণের একটি বিখ্যাত বিবরণে বলা হয়েছে যে, কেবল উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষিত আধ্যাত্মিক তপস্যা অনুশীলনের কারণে রামচন্দ্র শম্বুক নামক এক শূদ্র তপস্বীর মস্তক ছিন্ন করেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ আর্য সমাজের অভ্যন্তরে এই ধরনের বহু বৈষম্যমূলক বিচারের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত করে যে, বাংলার বৌদ্ধরা এবং তামিল অঞ্চলের জৈনরা মারাত্মক ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার হয়েছিলেন। নালন্দা ও সোমপুরার মতো প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলো আদিবাসী আক্রমণকারী ও লুঠেরাদের আতঙ্কে পরিখা ও বিশাল দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল, যা বুঝিয়ে দেয় ইসলামি আক্রমণের অনেক আগেই অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় কলহ বিদ্যমান ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্প্রসারণশীল আর্য ধর্ম বিভিন্ন অনার্য আচার-অনুষ্ঠান এবং বৌদ্ধ উপাদানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, যা শেষ পর্যন্ত কঠোর, শাস্ত্র-আবদ্ধ ধর্মের পরিবর্তে একটি বিস্তৃত মানসিকতায় বিবর্তিত হয়।

প্রাচীন ভারতের উচ্চমাত্রায় সংশ্লেষিত ঐতিহ্যগুলোর বিপরীতে ইসলাম এই উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল এক নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা এবং বাধ্যতামূলক শাস্ত্র সম্বলিত চূড়ান্ত এক কাঠামোগত ধর্ম হিসেবে। তবে, উত্তর ভারতে ইসলামের প্রাথমিক অনুপ্রবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ, যার নেতৃত্বে ছিলেন নিরস্ত্র সুফি সাধক ও মুসলিম বণিকেরা, যারা সশস্ত্র অভিযান শুরু হওয়ার অনেক আগেই সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। 'এক হাতে কোরান ও অন্য হাতে তলোয়ার'এর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল বলে যে প্রচলিত তত্ত্ব রয়েছে, আমি তার তীব্র সমালোচনা করছি। জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণই যদি প্রাথমিক পদ্ধতি হত, তবে যৌক্তিকভাবে মুসলিম জনসংখ্যা দিল্লি ও আগ্রার আশেপাশে কেন্দ্রীভূত থাকত, যা ছিল মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র। এর পরিবর্তে সিন্ধু, কেরালা ও বাংলার মতো দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইসলামের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, যা হিন্দু-মুসলিম বিভাজন থেকে লাভবান হওয়া ব্যক্তিদের প্রচারিত হিংসাত্মক ধর্মান্তরকরণ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে। বরং স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, 'ভারতে মুসলিম বিজয় নির্যাতিত গরিব মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিল। ... তারা জমিদারদের আর পুরোহিতদের কবল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল।' 

ইসলামের আগমনের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদ, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, বৈষ্ণববাদ ও শৈববাদ সহ বহু স্বতন্ত্র বিশ্বাসের অস্তিত্ব ছিল। তবে একক কোনও 'হিন্দু' ধর্মের অস্তিত্ব ছিল না। প্রাচীন ভারতীয়দের মধ্যে একটি 'আর্যাবর্ত চেতনা' বিরাজ করত, যা ছিল এমন এক অটুট বিশ্বাস যে তাদের ভূমি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনন্য, অভ্রান্ত ও শ্রেষ্ঠ। দু' হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত তার মূল সভ্যতার ভিত্তি মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করেই কুষাণ, গ্রিক ও হুনদের মতো বিদেশি আক্রমণকারীদের রক্ত ও সংস্কৃতিকে সফলভাবে আত্তীকরণ করেছিল। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা গজনীর মাহমুদের দ্বারা বলপূর্বক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সোমনাথের মতো মন্দির ধ্বংস করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থাকে চূর্ণ করে মাহমুদ প্রাচীন ভারতীয় শক্তির অহঙ্কার ও নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এই ধ্বংসযজ্ঞ অজান্তেই ভারতীয়দের তাদের বিচ্ছিন্ন চেতনা থেকে মুক্ত করেছিল, যা এক নতুন ধর্মীয় পরিচয়ের জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত ছিল। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারতীয়রা এমন এক বিদেশি ধর্মের মুখোমুখি হয় যাকে তারা সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। ইসলামের বিজয় যাত্রার সামনে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এক গভীর পরিবর্তন শুরু করে: তারা তাদের উৎসব, সামাজিক আচরণ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চায়। নিজেদের কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তারা তাদের ভৌগোলিক পরিচয়কে— 'হিন্দু'— একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে রূপান্তরিত করে।

আগত বিদেশি ধর্মতত্ত্ব থেকে স্থানীয় মতবাদগুলোকে আলাদা করতে ইসলাম-পূর্ব সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ব্যবস্থাকে তড়িঘড়ি করে 'হিন্দু' ধর্মের ছাতার নিচে আবদ্ধ করা হয়েছিল। ঠিক যেভাবে বিদেশি রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীকালে ঐক্যবদ্ধ 'ভারতীয়' পরিচয়ের জন্ম হয়েছিল, তেমনি বিদেশি ধর্মীয় প্রচারের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে 'হিন্দু' ধর্মীয় চেতনার উদ্ভব ঘটেছিল। ফলস্বরূপ, 'হিন্দু ধর্মের' জন্মের জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করাটাই ছিল এই উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম উল্লেখযোগ্য অবদান। হিন্দুত্ব সংজ্ঞায়িতকারী আধ্যাত্মিক উপাদানগুলো প্রাচীন হলেও, হিন্দু পরিচয়ের সমষ্টিগত উপলব্ধি এবং সংজ্ঞা মৌলিকভাবে মধ্যযুগের ঘটনাবলীর দ্বারাই রূপ পেয়েছিল। কিন্তু এই আধুনিক সময়ে তার পুনঃউন্মোচন এক অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাতের জন্ম দিয়েছে, যার ভবিষ্যৎ আশঙ্কাপূর্ণ।


Tuesday, 16 June 2026

'দ্য ট্যাপ কোড'

'রাজার কাছে খবর ছোটে...'

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৪০ সালে প্রকাশিত আর্থার কোয়েসলার'এর বিখ্যাত মাস্টারপিস উপন্যাস 'ডার্কনেস অ্যাট নুন' (Darkness at Noon)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী অংশ ছিল 'দ্য ট্যাপ কোড'। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রুব্যাশভ যখন একাকী কারাকক্ষে বন্দী, তিনি তাঁর পাশের সেলের বন্দীর (যার কোড নাম '৪৪২ নম্বর সেল') সঙ্গে দেয়ালে টোকা মেরে যোগাযোগ রাখতেন। এই যোগাযোগের জন্য উভয়েই একটি গ্রিড পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। ইংরেজি বর্ণমালাকে (A থেকে Z) একটি ৫×৫ গ্রিডে সাজানো হত (সাধারণত I এবং J-কে একই ঘরে রাখা হত)। প্রথম দফায় টোকা মেরে বোঝানো হত বর্ণটি কত নম্বর সারিতে (Row) আছে, আর দ্বিতীয় দফার টোকায় সেটি কত নম্বর স্তম্ভে (Column) আছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ 'B' লিখতে চায়, তবে সে প্রথমে ১ বার টোকা দেবে (১ নম্বর সারি), তারপর একটু থেমে ২ বার টোকা দেবে (২ নম্বর স্তম্ভ)। 

বাস্তবে, মুসোলিনির সময় ইতালির রাজবন্দীরাও গ্রিডভিত্তিক ট্যাপ কোড ব্যবহার করতেন। ইতালিয় বর্ণমালার জন্য তারা গ্রিডটি কিছুটা বদলে নিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে 'গ্রেট পার্জ'এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখা কোয়েসলার'এর উপন্যাসে বা বাস্তবে এই দেয়ালে টোকা মারা শব্দগুচ্ছ শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, বরং চরম একাকীত্ব ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন মানুষের বেঁচে থাকা ও একে অপরের পাশে থাকার এক অদ্ভুত মানবিক দলিল হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মানুষের আদিম মানবিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই— যেখানে প্রতিটি টোকার শব্দ বলত, 'আমি এখনও বেঁচে আছি, তুমি একা নও।'

আজ চারপাশ যখন স্তব্ধ হয়ে আসছে, সোশ্যাল মিডিয়া অথবা প্রকাশ্য সভায় কিংবা 'বন্ধু' মহলেও কারও কোনও একটি সমালোচনামূলক উক্তি বা চলমান ঘটনাবলী সম্পর্কে 'মূলধারা' প্রচারিত মতামতের বিরোধী সামান্য ভিন্ন মত কেউ পোষণ করলেই শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী বা পাড়া-প্রতিবেশীদের এক অংশও সবলে তার ওপরে নৃশংস ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তখন প্রতিটি টোকার শব্দ গভীরভাবে অর্থবহ। এই ঝাঁপিয়ে পড়াটা কেবলমাত্র শারীরিক নয়, তীব্র ভাবে মানসিকও। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রাবাসের র‍্যাগিং'এর মতো। আগে আমরা দেখেছি, শাসক-বিরোধী কোনও মতামত প্রকাশে রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসক দলের মাস্তান ও মাতব্বরেরা মূলত বিরোধী দলের কর্মী বা সমর্থকদের উপর হামলা করত। তা নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা হত, তুমুল চাপানউতোর চলত, মিডিয়া ইত্যাদিতেও সোরগোল উঠত, তারপর তার ভয়াবহতা অথবা অভিঘাতে হয়তো কিছু প্রলেপ পড়ত। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা একতরফা। আপনার কোথাও যাওয়ার নেই, কাওকে কিছু বলার নেই, কোনওভাবে বলতে পারলেও কারও শোনার সাহসটুকু নেই, মিডিয়া বলেও কিছু নেই, আদালতও প্রায়-বধির (যদি বা আদালত কিছু বলেও তা মানারও কোনও দরকার নেই)। ভবিষ্যতে হয়তো বিরোধী দল বলেও কিছু থাকবে না। এমন একটি সময়ের গর্ভে পৌঁছনো বোধকরি আবশ্যিক ছিল। না হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষ চেনার পাঠ অসমাপ্ত থেকে যেত।

ছোটবেলায় দেখতাম, ছিঁচকে চোর ধরার জন্য পাড়ার দাদা-কাকুরা দল বেঁধে 'নাইট গার্ড' বা রাতপাহারা দিত। 'ধরা যাক দু-একটি ইঁদুর এবার'এর মতো মাঝেসাঝে তেমন ছিঁচকে কেউ ধরাও পড়ত। একবার তেমন এক চোর ধরা পড়ার খবর শুনে সক্কালবেলা উঠে দৌড়ে গিয়ে দেখি, একটি ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পাড়ার ওই ভদ্দর দাদা-কাকুরা তাকে নৃশংস ভাবে মারছে। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। চোরটির মুখচোখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, সে আকুল নয়নে গলা ছেড়ে চীৎকার করছে, আর এক একজন পালা করে কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ লাথি মেরে, কেউ ঘুষিতে তাকে ছিন্নভিন্ন করছে। এখনও মনে আছে, পাড়ার সব থেকে গোবেচারা, নিরীহ, স্বল্পবাক, ভিতু লোকগুলি তাকে সব থেকে নৃশংস উপায়ে মারছে। জীবনে প্রথম ও শেষ দেখা এই দৃশ্যকল্প আমি বড়জোর মিনিট খানেক কি দেড়েক দেখতে পেরেছিলাম, তারপর এক ছুটে বাড়ি এসে বাথরুমে ঢুকে কেঁদে ফেলি। কিন্তু মন থেকে সে স্মৃতি আজও মুছতে পারিনি। বার বার মনে হয়েছে, ছিঁচকে চুরির শাস্তি তো অমন কঠোর হতে পারে না। আর ওই 'কাকু'টাই বা কীভাবে অমন ভয়ঙ্কর হয়ে চোরটাকে নির্দয় ভাবে মারতে পারছে। তা কি নিছকই সম্পত্তি চুরির আশঙ্কা থেকে নাকি তার অনেকের বিরুদ্ধে অনেক কিছু প্রতিশোধ নেওয়ার ছিল, সেই অশক্ত ও হীনম্মন্য মনের সে সাধ্যি যখন নেই, তখন যাকে হাতের কাছে পাওয়া গেল, তাকেই না হয়...। 

আজ চারপাশে যেন সেই দৃশ্যের মেলা। হঠাৎ করে একপাল মুখচোরা, আপাত নিরীহ কিছু চেনা জন যেন অতীব হিংস্র হয়ে উঠেছে; ছোটবেলায় দেখা সেই গোবেচারা কাকু-দাদাগুলির মতোই, যারা কারও সাতেপাঁচে থাকত না, কোনও বিপদে-আপদেও তাদের পাওয়া যেত না, স্বার্থগন্ধ লালায়িত সেই মানুষগুলো চরে বেড়াত নানাবিধ সুযোগের সন্ধানে আর চুপিচুপি এর-ওর কান ভাঙ্গিয়ে রোপণ করত বিষ ও প্রতিহিংসা। জিঘাংসাই যখন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রনীতি, তখন এই লোকগুলিই ক্ষমতার আধার হয়ে বিষবাষ্পে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। এক সর্বগ্রাসী হিংস্র সমাজের নির্মাণ হতে থাকে। আমরা দগ্ধ হই। আমাদের শব্দমালা হারিয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই মেটাফোরে। তৈরি হয় ট্যাপ কোড। নির্মিত হয় এসোপিয় ভাষা। ১৯২২ সালে 'ধূমকেতু' পত্রিকায় নজরুল লেখেন 'আনন্দময়ীর আগমনে'। তবুও তিনি ছাড় পান না। ইংরেজরা তাঁকে বন্দী করে। পরে রবীন্দ্রনাথ লিখবেন 'তাসের দেশ'। পাশাপাশি, ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের বন্দীরা পাহাড়ি বা আঞ্চলিক উপভাষা (যেমন, সিসিলিয়ান বা নেপোলিটান ডায়ালেক্ট) ব্যবহার করতেন, যা উত্তর ইতালির ফ্যাসিবাদী প্রহরীরা সহজে বুঝতে পারত না। অন্যদিকে, হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের (যেমন, আউশভিৎস, বুখেনভাল্ড) নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্রতার কারণে সেখানে বেঁচে থাকা ও প্রতিরোধের জন্য বন্দীরা অদ্ভুত সব ভাষা তৈরি করেন। ল্যাগার-জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বন্দীরা থাকতেন। তাঁরা জার্মান, পোলিশ, ইয়াইডিশ (Yiddish) শব্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র ‘ক্যাম্প ল্যাঙ্গুয়েজ’ তৈরি করেন। প্রহরীরা এই ভাষা বুঝত না, ফলে বন্দীরা প্রতিরোধের গোপন বার্তা আদান-প্রদান করতেন।

আর এইভাবেই তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক দলিল ও সাহিত্যসম্ভারও। যেমন:

১) আন্তোনিও গ্রামশির 'প্রিজন নোটবুকস': ইতালির বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি মুসোলিনির কারাগারে প্রায় ১১ বছর বন্দী ছিলেন। কারাগারে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘প্রিজন নোটবুকস’ লেখেন। ফ্যাসিবাদী সেন্সরশিপ এড়াতে তিনি খাতার পাতায় সরাসরি 'মার্কসবাদ', 'লেনিন' বা 'শ্রেণি সংগ্রাম' শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। পরিবর্তে তিনি ছদ্মনাম বা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতেন। যেমন, কার্ল মার্কস'কে তিনি লিখতেন 'দ্য ফাউন্ডার'।

২) প্রিমো লেভির 'ইফ দিস ইজ আ ম্যান': নাৎসি আউশভিৎস ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা ইতালিয় লেখক প্রিমো লেভি তাঁর এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে ক্যাম্পের ভেতরের সেই গোপন ভাষা ও যোগাযোগের কথা বিস্তারিত লিখেছেন, কীভাবে শব্দের সামান্য হেরফের করে বা চোখের ইশারায় একে অপরকে প্রহরীদের চাবুক বা গ্যাস চেম্বার থেকে বাঁচানো হত।

৩) হান্স ফালাডা'র 'এভরি ম্যান ডাইস অ্যালোন': নাৎসি জার্মানির পটভূমিতে লেখা এই বিখ্যাত উপন্যাসে (যা বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত) আমরা পাই, কীভাবে এক সাধারণ দম্পতি হিটলারের বিরুদ্ধে পোস্টকার্ডে গোপন বার্তা লিখে বার্লিনের আনাচে-কানাচে ফেলে রেখে এক নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন; যা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যোগাযোগের এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল।

অতএব, 'অচলায়তন'এর বিরুদ্ধে দর্ভক ও শোনপাংশুদের নিয়ে আচার্য এসে পড়েন, অথবা, 'তাসের দেশ'এর রুইতন ও হর্তনের অধীন অন্ধভক্ত টেক্কা, গোলাম, সাহেবদের রাজত্বও ভেঙে পড়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত  'চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়/ এদিক ওদিক ডাইনে বাঁয়,/ রাজার কাছে খবর ছোটে,/ পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,/ দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়-/ একুশ হাতা জল গেলায়।' (একুশে আইন, সুকুমার রায়)।