অসমাপ্ত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
কৌশিক গাঙ্গুলির 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ছবিটি গত জুলাইয়ে রিলিজ পেয়েছে। ছবিটি একটি দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তার পরিসর ব্যক্তিগত গৃহের দেওয়াল টপকে সমাজ, শ্রেণি ও সিনেমার বাণিজ্যিক ব্যাকরণের দিকে চলে যায়। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য, ছবিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যে কীভাবে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা ও 'অসমাপ্ত দায়'এর রাজনীতি কাজ করে।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রা। পেশায় সে একজন শিক্ষিকা। তার কোনও সন্তান নেই। তবে এর জন্য শুভ্রা দায়ী নয়। এর কারণ সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায় (চরিত্রে কৌশিক সেন), শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী ও পেশায় অধ্যাপক। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই দায়ের বোঝা শুভ্রার উপরেই পড়ে। প্রচার হয় শুভ্রাই সন্তান ধারণে অপারগ। সুমনের কোনও দায় নেই। বিচ্ছেদের পর সুমন দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তার স্ত্রী মেঘনা। মেঘনা মুসলমান। এক ছোট্ট কন্যা সন্তান সহ মেঘনাকে বিয়ে করে সুমন। কিন্তু খাতায় কলমে সুমন মেঘনার মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ, একজন শিক্ষিত অধ্যাপক হিসেবে তাকে আভিজাত্যের ভান করতে হয়। মেয়ে ছাড়া যেন তার চলবে না, এমন একটি ভাবমূর্তি তাকে বজায় রাখতে হয়।
আখ্যানের মোড় ঘোরে মেঘনার অসুস্থতায়। জানা যায়, অ্যাডভান্স স্টেজের টিউমার ও ক্যান্সার। গল্পের জটিলতায় অকস্মাৎ শুভ্রার উপর এসে পড়ে একটি নৈতিক দায়। মেঘনার কন্যা সন্তানটি যাতে এই বিপদের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব শুভ্রা অস্বীকার করতে পারে না। এই বিন্দুতেই ছবির শিরোনাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইনত শুভ্রা সুমনের প্রাক্তন, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক ভাবে সে আজও অর্ধাঙ্গিনী। একই সময়ে মেঘনাও সুমনের বর্তমান অর্ধাঙ্গিনী। ফলে, সুমনের জীবনে দুই সময়ের দুই নারী এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ছবির শেষে মেঘনার পরিণতি নির্মম।
'আজও অর্ধাঙ্গিনী' একটি স্পষ্টতই শহুরে মধ্যবিত্তের আখ্যান। এবং এটিই এর সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান। শুভ্রা শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং তার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ভাষা আছে। তার শোক পর্দায় স্থান পাওয়ার সামাজিক পুঁজি আছে। সিনেমা একটি বাণিজ্য। মধ্যবিত্তের সমস্যা সিনেমার এক বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র।
এই প্রসঙ্গেই ২০২৪ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে অভয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মর্তব্য। সে ঘটনার পর শহরে যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, বাইরে থেকে তাকে লিঙ্গ বয়ানের রাজনীতি মনে হলেও আদতে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন। যে সমস্ত গরিব, কাজের মহিলা, প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা রোজ নিগৃহীত হন, তাদের জন্য রাত জাগা হয় না। কিন্তু যখন ঘটনার কেন্দ্রে আসেন একজন শিক্ষিতা, এমডি পাঠরতা ডাক্তার, তখন সেই ঘটনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'ও সেই একই কাঠামোর অনুসারী। শুভ্রার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পর্দায় আসে কারণ সে মধ্যবিত্ত। কৌশিক গাঙ্গুলিদের সিনেমা নিয়ে ব্যবসা করতেই হবে। তাই প্রচলিত ফিকশনাল মেলোড্রামাকে কখনই নন-ফিকশনাল বাস্তবতায় থাকা সমগ্র মেয়েদের আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ছবিটি সেই নিরাপদ বাস্তবতাকেই বেছে নেয় যা মধ্যবিত্ত দর্শক দেখতে অভ্যস্ত। এখানে চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির যন্ত্রণাকেই দৃশ্যমান করে এবং তাকেই রাজনীতি বলে চালায়।
এই আখ্যানটি মেলোড্রামার ব্যাকরণকেও অস্বীকার করে না। মেঘনার ক্যান্সার, দাম্পত্যের ভুল বোঝাবুঝি এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন-- এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যে টুইস্ট আনে। এটি বাণিজ্যিক সিনেমার একটি অবশ্যম্ভাবী শর্ত। শুধুমাত্র দাম্পত্য টানাপোড়েন দিয়ে দু' ঘণ্টার ছবিকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত অসুস্থতা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের মতো আবেগীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মেলোড্রামার ভেতরেই একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও লুকিয়ে আছে। একজন নারী কেন অন্য নারীর সন্তানের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে! এই বাধ্যতা কি ভালোবাসা থেকে আসে, নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারীত্বের সংজ্ঞা থেকে?
ছবির ফর্মগত বৈশিষ্ট্য হল এর অসমাপ্তি। কৌশিক গাঙ্গুলি কোনও চূড়ান্ত মীমাংসায় যাননি। শুভ্রা শেষ পর্যন্ত কী করল, এই প্রশ্নটি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালক লম্বা টেক, স্থির ক্যামেরা ও ন্যূনতম আবহসংগীত ব্যবহার করেছেন। এর ফলে দৃশ্যগুলোতে একটি ডকুমেন্টারিসুলভ বাস্তবতা তৈরি হয়। শুভ্রার নিঃসঙ্গ হাঁটা বা পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে ক্যামেরা তাড়াহুড়ো করে না। এই স্থবিরতাই দর্শকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, প্রথাগত সিনেমা ক্লাইম্যাক্স দেয়। কিন্তু জীবন ক্লাইম্যাক্স দেয় না। জীবন শুধু চলতে থাকে। এখানে ক্যামেরা শুভ্রাকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে না, বরং এক চিন্তাশীল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।
সব শেষে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনি কাগজে শেষ হলেও সামাজিক ও মানসিক ভাবে ফুরোয় না। শুভ্রা এবং মেঘনা-- দুজনেই সুমনের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু এই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া তাদের পছন্দ নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা। একজন নারীকে যতক্ষণ না স্ত্রী ও মা-- এই দুই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ততক্ষণ সমাজ তাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করে না। শুভ্রার ক্ষেত্রে এই অসম্পূর্ণতার তকমা আরও নির্মম। কারণ, সন্তান না থাকার দায় তার নয়, তবুও দায় তার ঘাড়েই পড়েছে। অথচ পরিস্থিতির চাপে তাকেই আবার অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কৌশিক গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতির জন্য কোনও উত্তর রাখেননি। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। আর সেই প্রশ্নের নামই 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'।
সিনেমা করিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলি'রা কিন্তু সবটাই বোঝেন, কিন্তু বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাটের বাইরে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেন না; এটা শুধু শ্রেণি চরিত্র নয়, শহুরে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি।



