Thursday, 19 February 2026

প্রতীক উর রহমান: ক্ষোভ নাকি পুনর্জন্ম?

রাজনৈতিক দিশাতেই কি বড় গলদ?

অয়ন মুখোপাধ্যায়



রাগ আছে— এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: এই রাগটা কাদের বিরুদ্ধে? পার্টির বিরুদ্ধে, নাকি পার্টির ভেতরে জমে ওঠা কিছু বিকৃতির বিরুদ্ধে? যে সংগঠন কেবল একটি নির্বাচনযন্ত্র নয়, বরং যে সংগঠনের ইতিহাসের ভেতর রক্ত, ত্যাগ আর মতাদর্শের দীর্ঘ অনুশীলন আছে, তার বিরুদ্ধে রাগ সহজে জন্মায় না। রাগ জন্মায় তখনই যখন প্রত্যাশা ভাঙে। যখন দেখা যায়, আদর্শের জায়গায় ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে, তাত্ত্বিক চর্চার জায়গায় কৌশলী নীরবতা, সাংগঠনিক গণতন্ত্রের নামে গোষ্ঠীসর্বস্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে বাম রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখেছি, গত দুই দশকে পার্টির নেতৃত্বের একাংশ ক্রমশ মতাদর্শিক দৃঢ়তা হারিয়েছে। রাজনৈতিক শিক্ষা কমেছে, তাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। পার্টি ক্লাস কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বহু জায়গায়। কর্মীরা কেবল মিটিং আর মিছিলের যান্ত্রিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ। বিপ্লবী পার্টির যে বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা, যে তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা, যে আত্মসমালোচনার ঐতিহ্য— তা আর দৃশ্যমান নয়। সমালোচনা করলে বা প্রশ্ন তুললেই তাকে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিন্নমতকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে পার্টির ভেতরে সেটাকে চেপে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে, সংগঠন ভেতর থেকে শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।

তবে এই সমস্যাকে নিয়ে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। কারণ, পার্টির চিন্তাভাবনার মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে কিছু গলদ জমেছে। ফলে, সংগঠন ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে বহু মানুষের কাছে। শুধু নৈতিকতার বুলি উচ্চারণ করলে বা সবাইকে বলতে দিলেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে না। বামপন্থার মৌলিক অবস্থান তার শ্রেণি-রাজনীতিতে, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীনতায়, রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র বিশ্লেষণে— এসব জায়গা থেকেই যদি পার্টি সরে আসে, তবে বিভ্রান্তি অনিবার্য। আজ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় জনতা পার্টি-র মতো শক্তির উত্থান এবং তার ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে গৌণ করে দেখা হয়েছে, ফলত, পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটারদের একাংশ সেই ফ্যাসিবাদের পক্ষেই সরে গেছেন। এই মূল রাজনৈতিক অবস্থানগত দুর্বলতার জায়গাতেই ধস নেমেছে। শুধু সাংগঠনিক ত্রুটি নয়, মতাদর্শিক স্খলনই পার্টির কাছে এখন সবচেয়ে বড় সংকট।

আরও একটি প্রশ্ন এখানে উঠে আসে— বর্তমানের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও লড়াইগুলির চরিত্র ও মাত্রা কি এক নতুন রাজনৈতিক সংজ্ঞা তৈরি করছে? উত্তর সম্ভবত, হ্যাঁ। কারণ, আজকের লড়াই কেবল জমি বা মজুরি নিয়ে নয়, পরিচয়, নাগরিকত্ব, সাংবিধানিক অধিকার, পরিবেশ, ডিজিটাল পরিসর— সব কিছুকে ঘিরে। আন্দোলনের ভাষা বদলেছে, সংগঠনের পদ্ধতি বদলেছে, নেতৃত্বের কাঠামো বদলেছে। স্বতঃস্ফূর্ততা ও নেটওয়ার্ক ভিত্তিক প্রতিবাদ অনেক সময় ঐতিহ্যগত পার্টি কাঠামোর বাইরে গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে যদি পুরনো ছকে ফেলা হয় তাহলে বিশ্লেষণ ভ্রান্ত হবে। নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ, তাদের রাজনৈতিক বোধ, তাদের সংগঠনের ধরণ— এসব বুঝতে ব্যর্থ হলে পার্টি ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়বে। বর্তমানে বহু বামপন্থী দল এই কারণেই অপ্রাসঙ্গিকতার সংকটে ভুগছে। সুতরাং সংকট শুধু নেতৃত্বের নয়, সময়কে বোঝার ক্ষেত্রে অক্ষমতারও। প্রতিটি সময় নতুন লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করে, আর সেই সংজ্ঞা নির্মাণে মতাদর্শের পুনঃপাঠ অপরিহার্য।

হালে প্রতীক উরের বক্তব্যে এই দ্বন্দ্বটিই স্পষ্ট হয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এত রাগ কেন পার্টির উপর? তাঁর উত্তর ছিল সরল ও তীব্র: 'এই পার্টির জন্য প্রাণ দিতে বসেছিলাম। অসংখ্য কমরেড প্রাণ দিয়েছেন। রাগ পার্টির উপর নয়। রাগ তাঁদের উপর যারা কর্মীদের চুপ করিয়ে রাখতে চান। হাজার হাজার কর্মী প্রতিদিন সংগঠনের ভেতরেই অপমানিত হন। তাঁদের রাগও পার্টির বিরুদ্ধে নয়, কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে।' এই বক্তব্যের মধ্যে আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় এক কথা আছে যেখানে লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক সততার উচ্চারণ ও প্রশ্ন করার সাহস। কারণ, যে সংগঠনের প্রতি টান নেই, যে সংগঠনকে ভালোবাসে না, তার বিরুদ্ধে কেউ ক্ষুব্ধ হয় না। এখানে রাগ আসলে প্রত্যাশার অন্য নাম। রাগ মানে বিচ্ছেদ নয়, রাগ মানে ভাঙা বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা।

সমস্যাটা আরও প্রকট হয় যখন সংগঠন ধীরে ধীরে মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠে। যখন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নীতি অনুপস্থিত থেকে ব্যক্তি প্রাধান্য পায়। যখন শাখা স্তরের কর্মীর প্রশ্ন বা আবেগকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে রাখা হয়, তখন সেই সংগঠন আর বিপ্লবী থাকে না, সেটি কেবল নির্বাচনী যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। তখন সাংগঠনিক কাজ হয়ে দাঁড়ায় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এখান থেকেই বামপন্থার ক্ষয় শুরু হয়, যার সূত্রপাত সংগঠনের ভেতরেই।

বামপন্থী দলগুলির মধ্যে যে সংগঠন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা এমন নেতৃত্বের হাত ধরে যাঁরা ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেমন জ্যোতি বসু কিংবা বিনয় চৌধুরী— তাঁদের রাজনৈতিক চরিত্রে সংযম, তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ছিল স্পষ্ট। মতবিরোধ ছিল, বিতর্ক ছিল, কিন্তু ভাবনার কেন্দ্রে ছিল মতাদর্শ। আজ যদি সেই ভাবনার কেন্দ্রে অন্তঃসারশূন্যতা দেখা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় পার্টির অভ্যন্তরীণ চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে, সংগঠনের ভিতরের অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসছে। এর দায় কার? এই বিষয়ে কি কখনও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হবে? সত্য কি সামনে আসবে? উত্তর অজানা। ফলে সংগঠনের প্রশ্নে কর্মীদের মনে অসন্তোষ থেকেই যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অসন্তোষকে কি আমরা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করতে পারছি? বাস্তবতা বলছে, পারছি না। কারণ, নির্বাচনের মুখে কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় প্রকাশ্য নেতৃত্ব যদি অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেন, তাহলে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হয়। আত্মসমালোচনা জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে সংগঠনের ভেতরে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে। প্রকাশ্য আত্মপ্রসাদ সংগঠনকে শুদ্ধ করে না, বরং দুর্বল করে। আবার এটাও সত্য, যদি ভেতরে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অসন্তোষ বাইরে বেরবে। তাই সংগঠনের ভেতর এমন এক পরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে মতভেদকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না, বরং মতান্তরের মধ্য দিয়েই নতুন পথ ও নতুন চিন্তার জন্ম হবে।

একটি বিপ্লবী পার্টির বৈশিষ্ট্য কেবল তার ঘোষণাপত্রে নয়, তার কর্মীদের চলাফেরায়, ভাষায়, রাজনৈতিক সচেতনতায় ফুটে ওঠে। যদি সেই চরিত্রই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব কোনও আগ্রহের বিষয় নয়। মানুষের মাথাব্যথা তার রোজগার, অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা নিয়ে। জনগণ দেখতে চায়, পার্টি তাদের জীবনের প্রশ্নে কতটা প্রাসঙ্গিক। সাধারণ মানুষ ব্রাঞ্চ, এরিয়া কমিটি, জেলা কমিটি বা পলিটব্যুরোর জটিল কাঠামো বুঝতে চান না। তারা বোঝেন, কে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, আর কে নয়। একজন কর্মী পার্টি ছেড়ে চলে যেতেই পারেন। কিন্তু যদি হাজার হাজার সৎ কর্মীকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পার্টি ফাঁপা হয়ে যাবে। পার্টি ভাঙে বাইরের আক্রমণে নয়, ভেতরের অবক্ষয়ে। আবার পুনর্জন্মও শুরু হয় ভেতর থেকেই— আত্মসমালোচনার সাহস, মতাদর্শে প্রত্যাবর্তন এবং ব্যক্তির উপর নীতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

রাগ আছে। কারণ, ভালোবাসা আছে। এই সংগঠনের ইতিহাস এখনও মূল্যবান। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়, রাগ কি বিভাজনের হাতিয়ার হবে, নাকি বামপন্থার পুনর্জাগরণের সূর্যোদয় ডেকে আনবে? এর উত্তর হয়তো সময় বলবে। তবে সমস্ত উত্তর নির্ভর করছে তাদের উপর, যারা এখনও নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, যারা পার্টির প্রতি বিশ্বাস হারাননি, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে ভয় পান না। সেই প্রশ্নই এখন পার্টির প্রকৃত শক্তি। 

প্রশ্ন উঠুক, এই মুহূর্তে পার্টির রাজনৈতিক দিশা ও বাস্তব কর্মসূচিতে কি বড়সড় কোনও গলদ আছে? মূল্যায়ন করতে হবে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে কেন ধারাবাহিক ভাবে বাম ভোট বিজেপি'র বাক্সে পড়ে বামপন্থীদের শক্তিকে এতটাই নগণ্য করে দিচ্ছে? তার দায় কি আমাদের রাজনৈতিক দিশাহীনতার মধ্যে লুকিয়ে নেই?  


Tuesday, 17 February 2026

একটি গানের অপমৃত্যু

ইতিহাস নিয়ে চূড়ান্ত কদাচার

প্রবুদ্ধ বাগচী



নিজের মাত্র পনেরো বছর বয়সে (১৮৫৩) বঙ্কিমচন্দ্র ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কবিতা লিখে কুড়ি টাকা মূল্যের একটি পুরস্কার পান। এর বছর তিনেক পরে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ললিতা তথা মানস’ (১৮৫৬)। সেখানে কিশোর বঙ্কিম তার বয়সোচিত আবেগে অদেখা প্রেয়সীর উদ্দেশে লেখেন ‘অঙ্গের চন্দন তুমি, পাখার ব্যজন,/ কুসুমের বাস।/ নয়নের তারা তুমি, শ্রবণেতে শ্রুতি,/ দেহের নিশ্বাস।’ — ওই বয়সের পক্ষে এমন লিবিডো-প্রবণতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে এর পরে ভদ্রলোক আর কবিতা নিয়ে তেমন উৎসাহী থাকেননি। 

তাঁকে আবার কবিতায় পেল চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে। তখন তিনি নামী লেখক, উঁচুস্তরের সরকারি আধিকারিক। সেই সময়েই হাত মক্সো করতে করতে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটি অলস পৃষ্ঠায় লিখলেন ‘বন্দেমাতরম’ কবিতাটি (১৮৭৫) এবং পছন্দ না হওয়ায় সেটিকে ফেলে রাখলেন বাতিল লেখার ঝুড়িতে। ওই লেখা বিদগ্ধ পড়ুয়া ও সাহিত্যমনস্ক বঙ্কিমের পছন্দ হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ, ততদিনে বাংলা কবিতায় এসে গেছেন মধুসূদন দত্ত নামের এক প্রবল প্রতিভাধর কবি, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লেখা হয়ে গেছে এর চোদ্দ বছর আগে, প্রকাশিত হয়েছে মাইকেলের একের পর এক বিদ্যুৎবহ্নি। আনুমানিক ১৮৭৫ সালে নিছক দেশমাতৃকাকে ‘মা’ হিসেবে সম্বোধন করে মূলত তাঁর বন্দনাভাষ্য, বিষয় হিসেবে একেবারেই খেলো। তাও ‘দেশমাতা’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা যাবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ, উনিশ শতকের শেষ পাদে বাংলায় জাতীয়তাবোধের চেতনা ঠিক কতখানি পেকে উঠেছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের যথেষ্ট সংশয়। বঙ্কিম তখন ‘বঙ্গদর্শন’-এর খ্যাত সম্পাদক, যে পত্রিকার গুণেমানে বাংলার মনীষা মুগ্ধ। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ‘ছাপাখানার পণ্ডিত’ বঙ্কিমকে বলেছিলেন, ওই এলেবেলে লেখাটি পত্রিকার ফাঁকা জায়গা ভরানোর পক্ষে ‘মন্দ নয়’। কার্যত তাও করা হয়ে ওঠেনি বঙ্কিমের। পরিবর্তে তিনি এর বছর কয়েক পরে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস প্রকাশের সময় তার দশ নম্বর পরিচ্ছেদে এই কবিতাটা জুড়ে দিলেন (১৮৮২) — যদিও ভবানন্দ ও মহেন্দ্রর কথোপকথনে সেটাকে ‘গান’ বলা হয়েছে। কবিতা ও গান দুটি আলাদা শিল্পমাধ্যম, যে কোনও কবিতাকে গানের সুরে ধরা যায় না। তাছাড়া বঙ্কিম মাঝারি মাপের কবি হলেও সুরকার নন, ওই লেখা সমকালে সুরারোপিত হয়েছে এমন প্রমাণও তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলা উপন্যাসের জনক উপন্যাসের মধ্যে কবিতা জুড়ে দিয়ে কিছুটা চমক তৈরি করতেই পারেন। সচরাচর আখ্যানের মধ্যে গান বা কবিতা থাকে না।  

এইসব আলোচনা থেকে একটা সত্যি উঠে আসে যে, এই বছরটি ‘বন্দেমাতরম’ গানের ১৭৫ বর্ষ আদপেই নয়। কারণ, গান হিসেবে এটিতে প্রথম সুর দেন রবীন্দ্রনাথ (১৮৯৬) ও সেই বছরেই জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এটি গাওয়া হয়, তখন বঙ্কিমচন্দ্র আর জীবিত নেই। তার মানে ‘গান’ হিসেবে এই লেখার বয়স অন্তত আরও একুশ বছর কম। 

‘বন্দেমাতরম’এর বাধ্যতামূলক গায়ন নিয়ে সাম্প্রতিক যে সরকারি ফরমান, মৌলিকভাবেই তা ইতিহাসের তথ্যের সঙ্গে মেলে না। আর সেই সূত্রেই গানের প্রতি বাড়তি ‘শ্রদ্ধা ও সহবত’ দেখানোর কথা বলা হলে সেখানেও গোড়ায় গলদ ও অভিসন্ধি। গলদ এই কারণে যে, দেশের ইতিহাস নিয়ে চূড়ান্ত কদাচার করতে কেন্দ্রের শাসক দলটির জুড়ি মেলা ভার। আর অভিসন্ধি এই কারণে, প্রতিটি ইতিহাস-বিকৃতিকেই তারা তাদের ভেদবুদ্ধির রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। বিগত রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের (২০২১) কাছাকাছি সময়ে তাঁর ‘মন কি বাত’ আসরে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি নাকি ছেলেবেলায় ভোর চারটে থেকে রেডিওয় গুরুদেবের গান শুনতেন। আকাশবাণীর সঙ্গে যারা আশৈশব যুক্ত তাঁরা জানেন, কোনওকালে ভোর চারটেয় আকাশবাণীতে রবীন্দ্রনাথের গান বাজানো হত না, কার্যত তাদের প্রভাতী অধিবেশন শুরুই হত সকাল ছটায়। প্রাকৃত বাংলায় একে বলে 'কাঁচা ঢপ'। 

বাঙালি হিসেবে এটা প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে আমরা খেয়াল করছি, বসন্ত-সমাগমে এই প্রদেশে সর্বস্তরের ভাজপা নেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায় শুধু নয়, নানান বাঙালি মনীষা সম্বন্ধে তাঁদের আবেগ ও উৎসাহ উথলে ওঠে। এটা আসলে তাঁদের একরকম নার্ভাসনেস। বাংলার ঘরে ঘরে যতই তাঁরা ভ্রমরের মতো গুনগুনিয়ে ঘুরে বেড়ান, তাঁদের ডিএনএ'তে বাংলা বিদ্বেষের ডাবল হেলিক্স, ফলে, বাংলার নবজাগৃতির মনীষাদের তাঁরা রীতিমতো সন্দেহের চোখেই দেখেন। স্বাভাবিক, কারণ সঙ্ঘমনস্ক কালো পাথরে উদার চেতনার কোনও খোদিত বর্ণমালা নেই। তাঁদের এক মুখ রাজা রামমোহনকে ‘ব্রিটিশের দালাল’ বলে আর অন্য মুখ বিদ্যাসাগরকে অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে তাঁর প্রস্তরমূর্তি ভেঙে ফেলে। অধুনা মার্কিন দেশবাসী এক কলকাত্তাইয়া সঙ্ঘ-সদস্য বছর কয়েক আগে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, সত্যি সত্যি আরএসএস বাংলার উন্নত অসাম্প্রদায়িক চেতনাবহ হিসেবে বন্দিত মানুষগুলিকে কোন চোখে দেখে থাকেন। কিন্তু ভোট বড় বালাই। তাই তাঁদের এবারের কর্মসূচি একটি গানকে ঘিরে, যে গান বাঙালির দৃপ্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজমন্ত্র হিসেবেই নির্মিত। যে আজাদির লড়াইয়ে তাঁরা কুটো ভেঙে দুটো করেননি, এই গান নিয়ে কথা বলার কোনও নৈতিক অধিকার আরএসএস'এর থাকতেই পারে না। কিন্তু কবে আর তাঁরা নৈতিকতার পাদ্যর্ঘ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন! বরং বাংলার মন জয় করতে বাংলার মহাপুরুষদের জ্যোতির্বলয় নিজেদের শরীরে টেনে ভেক ধরেছেন মহাত্মার। 

‘বন্দেমাতরম’ গানটি নিয়ে তাঁদের এত সক্রিয়তার কারণ কী? কারণ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। গানটির অ-গীত অংশটি নিয়ে একটা পুরনো বিতর্ক ছিল, আজ আর যার কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। কাহিনিটা আমরা সবাই জানি। স্বাধীনতার সুদীর্ঘ লড়াইয়ে এই গানের (মূলত প্রথম স্তবক) একটা আবেদন ছিল এবং ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটি উদ্দীপক স্লোগান হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাভাগ-বিরোধী আন্দোলনের সমকালে বিপিনচন্দ্র পাল ‘বন্দেমাতরম’ শিরোনামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক (১৯০৫) ও পরে দৈনিকপত্র (১৯০৬) প্রকাশ করেন, পরে যার সম্পাদনার দায়িত্বে আসেন অরবিন্দ ঘোষ। সেই কাগজ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে অত্যন্ত অল্প সময়ে তার সব কপি নিঃশেষ হয়ে যেত। এইসব গুরুত্ব মাথায় রেখে গানটিকে ‘জাতীয় গীতি’ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে তার প্রথম দুটি স্তবক যে গাওয়া হবে এটা অনুমোদন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কারণ, এর পরের স্তবকগুলিতে গানের মূল আবেদন সরে গেছে স্পষ্ট হিন্দু পৌত্তলিকতার দিকে। শিল্পগত বিচারে যেমনই হোক, এটা ঠিক, আধা-বাংলা আধা-সংস্কৃতে লেখা গানের প্রথম দুটি স্তবক  উচ্চারণ করতে হিন্দু-মুসলমান কারওরই আপত্তি থাকতে পারে না। কেউ আপত্তি করেছিলেন এমনও নয়। পরাধীন ভারতের শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক মনীষা রবীন্দ্রনাথ তাঁর শৈল্পিক বোধে এটকু বুঝেছিলেন। কিন্তু আজকের ফরমানটি ঠিক এইখানেই কটু গন্ধের উদ্রেক করে।

গত দেড় দশকে ইতিহাসের যা-কিছু বিতর্ক সবকিছুকে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে ভাজপার রাজনৈতিক ভাষ্যে, কার্যত যার কোনও প্রাসঙ্গিকতা আর নেই। ঔরঙজেব কটা মন্দির ভেঙ্গেছেন, শিবাজি কীভাবে মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, অমুকে কী বলেছিলেন, তমুকে কী করেছিলেন, এগুলো অ্যাকাডেমিক চর্চার বিষয় হতেই পারে, আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক চর্চার নয়। এটা আসলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এক চেনা কাঠামো। উত্তর-দক্ষিণ-পুবে-পশ্চিমে তাঁদের একটা ‘অন্য সত্তা’র নির্মাণ না-করলে চলে না। তাই দেশজোড়া বেকারি, মার্কিনীদের অর্থনৈতিক চোখ রাঙানি, প্রতিটি প্রান্তীয় মানুষের জীবিকার অনিশ্চয়তা, কৃষিক্ষেত্রে সংকট, দানবিক শ্রম কোডের তলায় চাপাপড়া শ্রমিক এবং এই রাজ্যে এসআইআর'এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের বেনাগরিক করার সমবায়ী প্রয়াসের ভিতর আচমকা তাঁরা খুঁড়ে বের করেছেন ‘বন্দেমাতরম’ গানের অবশিষ্ট তিনটি স্তবক। ঠিক যেভাবে পাঁচশো বছরের মসজিদের নীচে পাওয়া গিয়েছিল বালক রামকে। এটা একটা পরিচিত নকশা। কারণ, এতদিন বাদে একটা মাঝারি মানের লেখার স্মরণিকা হিসেবে বলা হচ্ছে গোটা গানটাই নাকি সবাইকে গাইতে হবে। হলফ করেই বলা যায়, এই নির্দেশে যারা সীলমোহর দিচ্ছেন তাঁরা নিজেরা পুরোটা পড়েননি ও গাইতেও পারবেন না। কিন্তু একটা দেশজোড়া বিতর্ক ও তক্কাতক্কি তো হবে আর সেই সুযোগে বলা হবে, দেখুন দেশ বিরোধীরা কেমন হল্লা বাঁধিয়েছেন!

দেশপ্রেম বিষয়টা প্রতিটা নাগরিকের কাছে আলাদা আলাদা আর বাইরে থেকে গান শুনিয়ে বা গানের প্রেসক্রিপশন দিয়ে তাকে জাগানো যায় না। সরকারি নির্দেশে যাই লেখা থাকুক, আমরা কেউই নিজেদের দেশপ্রেম পরখ করে নেওয়ার জন্য অবসর সময়ে ‘বন্দেমাতরম’ গাই না। সরকারি অনুষ্ঠানে বিধি মেনে জাতীয় গীতি বা ইদানিং রাজ্য-সঙ্গীত ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হলে তাকে উপযুক্ত সম্মান জানাই। বৃটিশ-বিরোধী সংগ্রামে এই একটি নয় আরও অনেক গানেরই উদ্দীপক ভূমিকা ছিল। তার মানে এই নয় যে বিপ্লবীরা সদা-সর্বদাই গান গাইতেন। পুলিশি চোখকে ফাঁকি দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম সুগঠিত করার জন্য বরং তাঁদের নিঃশব্দেই চলাফেরা করতে হত। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরে তাঁদের তুলনাহীন আত্মত্যাগ, বীর্যবান সাহস ও দীপ্ত প্রতিবাদ এখনও আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের যতটা উদ্দীপ্ত করে রাজনীতির কারবারিদের নয়। গত কয়েক দশকে তাঁরা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন এঁদেরই সামনে রেখে। স্বাধীনতা আন্দোলনে মূলগতভাবে যারা সাম্রাজ্যবাদের শিবিরে ছিলেন এবং স্বাধীন দেশকে ‘উপহার’ দিয়েছেন প্রথম সন্ত্রাসবাদী (নাথুরাম গড্‌সে), তাঁদের কলমের খোঁচায় ‘বন্দেমাতরম’ নিয়ে অতিভক্তি আসলে আমাদের চেনা প্রবাদবাক্যটিকেই স্মরণ করায়। 

গান হিসেবে আমরা যারা রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার বহন করি, তাঁরা জানি ‘বন্দেমাতরম’ গানটির ব্যঞ্জনা যত প্রবলই হোক বাংলার মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ও আরও অনেকের লেখা গানও কী সুতীব্র ও অন্তর্ভেদী ভূমিকা পালন করেছে যার চেহারা আরও শাণিত ও আধুনিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান ও রাষ্ট্রনৈতিক ভাবনা নিয়ে সঙ্ঘীরা আড়ষ্ট থাকেন, কারণ, তাঁর প্রকাশিত বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই ভেদবুদ্ধির ঊর্ধে যে তাঁকে নিয়ে জল ঘোলা করা অসম্ভব। এইখানেই একটি টীকা যোগ করে বলতে চাইব, এই বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকাকে শিথিল করে রেখেছেন। তিনি বাংলা উপন্যাসের পথপ্রদর্শক, তিনি বাংলা গদ্যকে ঈর্ষণীয় উচ্চতায় তুলে এনেছেন, তাঁর সম্পাদিত সাময়িক পত্রে তিনি বেঁধে দিয়েছেন সাহিত্যের সূক্ষ্মতম মীড় আর গমক। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পর সাহিত্যিক থেকে ঋষিতে উত্তরণ আসলে একটি প্রক্রিয়ার অধঃপাত। নিজের কিছু লেখায় তিনি এত বেশি দর্শন-প্রচারক হিসেবে সক্রিয় থেকেছেন যা পরের প্রজন্মের পাঠকের পক্ষে অসোয়াস্তিকর। আজকের এই ‘বন্দেমাতরম’ বিষয়ক বিতর্ক ঘনিয়ে উঠতেই পারে না যদি বঙ্কিম তাঁর লেখায় এই পরিসরটুকু না রাখতেন। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের বাকি অংশ ছেড়ে যদি এই ‘বন্দেমাতরম’ বিষয়ক অধ্যায়টুকুও আমরা পড়ে দেখি, খেয়াল করব, সেখানে গানটিকে সামনে রেখে ভবানন্দ চরিত্রটির মুখে মুসলমানদের সম্পর্কে এমন সব অবমাননাকর মন্তব্য তিনি বসিয়েছেন যা কালের বিচারেও সমীচীন নয় — এই উপন্যাসের সমকালে বাংলায় অর্ধেক জনসংখ্যা মুসলমান ছিলেন। 

দুরাত্মাদের ছলের অভাব হয় না। ইতিহাসের মহানায়করা যদি নিজেদের অবস্থানে বিপজ্জনক ফাঁক রেখে দেন তাহলে সভ্যতার সংকটে তাঁরা যে ভুল ভাবে ব্যবহৃত হতে পারেন, এটা তারই একটা উদাহরণ। মহাপুরুষের উক্তিগুলি কেবল কোলাহল করে না, কখনও কখনও বিষবৃক্ষেরও লালন করে।


Saturday, 14 February 2026

মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার জয়

ন্যারেটিভ বনাম কর্মসূচির রাজনীতি

শাহেদ শুভো



'বিএনপি এমন একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসাবসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে থাকবে', বিএনপি চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ছিল বক্তব্য। এই বক্তব্য দিয়ে শুরু করলাম, কারণ, তাঁর বক্তব্যের নির্দিষ্ট দুটো শব্দ ‘অবিশ্বাসী' ও 'সংশয়বাদী' ব্যবহার করার মতো সাহস অথবা রাজনীতি কিন্তু শেখ হাসিনারও ছিল না! হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে মদিনা সনদের আলোকের বাংলাদেশ অথবা মডেল মসজিদ নির্মাণের ধর্মীয় লেবাসে নিজেকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন! অথচ তারেক রহমান শুরু থেকেই তাঁর রাজনীতি কী হবে, তা জনগণের সামনে হাজির করেছেন। 

বিএনপি'র উদার, গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী রাজনীতির মেনিফেস্টোই কি বিএনপি'কে ২১৫ আসনের বিপুল জয় নিশ্চিত করেছে? জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে ডঃ ইউনুস সাহেবের অন্তর্বর্তী সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা, জামায়াত ইসলাম সহ ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানে মদত দান, জনগণের সামনে তৌহিদী জনতার মব ভায়োলেন্স, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে জামায়াত ইসলামী কর্তৃক পাকিস্থানপন্থীদের বয়ানকে আবার নতুন করে সামনে হাজির করা, অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র নেতৃত্বের একাংশের ক্ষমতায়নের রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নানা লুঠপাট দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়া, এই ছাত্র নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণে মৌলবাদী রাজনীতির ন্যারেটিভ তৈরি করা, বিভিন্ন ইউটিউব ব্লগারদের ন্যারেটিভ হাজির করা এবং সেই ন্যারেটিভে বিশ্বাসী একটা অংশের ভয়ঙ্কর ঘৃণাবাদী রাজনীতি, যে রাজনীতি জাতীয়তাবাদ-পরিচয়বাদের সমন্বয়ে এক মারাত্মক দিকে মোড় নিয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভিতর আতঙ্ক তৈরি, শত শত মাজার ভেঙ্গে ফেলা, কোরান-আল্লাহ ও ধর্ম অবমাননার অজুহাতে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা অথবা শরীয়ত সম্মত কবরের নামে কোনও মানুষকে কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা, ছায়ানটে উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, সাংবাদিকদের আটকে রেখে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা-- ইউনুস সাহেবের শাসনামলে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ এই সব দৃশ্য দেখেছেন আর প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত হয়েছেন। কেউ এর পালটা কথা বলতে গেলে তাকে নানারকম ট্যাগ দিয়ে হত্যাযোগ্য করা হচ্ছিল। 'দিল্লি না ঢাকা'-- এই আধিপত্যবাদ বিরোধিতার আড়ালে এক বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান হাজির করে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ বানানো, অথচ, এরাই সাম্রাজ্যবাদীদের নানা চক্রান্ত ও তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক 'নন-ডিসক্লোজার' চুক্তি বিষয়ে নীরব ছিল, যখন বন্দর রক্ষায় লড়াই করেছে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আর স্থানীয় বন্দরের শ্রমিক নেতারা। 

বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের ভোট বৃদ্ধির পুরো কৃতিত্ব এক শ্রেণির ইউটিউবার ও ব্লগারদের। ভবিষ্যতে ভোটের রাজনীতির বিশ্লেষণে আশা করা যায় এই বিষয়টা কেউ যুক্ত করবেন। প্রশ্ন হল, জামায়াত ইসলামের এই যে আশ্চর্যজনক উত্থান ও তাদের ভোট বৃদ্ধি, তা কি ইসলামপন্থীদের বাড়বাড়ন্তের জন্য? উত্তরে বলা যায়, এটা যেমন পুরোপুরি সত্য নয় আবার এও ঠিক যে, এই জাতীয়তাবাদ-পরিচয়বাদের সঙ্গে যুক্ত ঘৃণাবাদ ইসলামপন্থীদের পক্ষেই ভোটের বাক্সে পড়েছে। ফলে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। বলাই বাহুল্য, সংগঠিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হয়। পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মীয় ঐক্যের আহ্বান এবং হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক ক্ষোভ— এই তিনকে একত্র করে তারা ভোট ব্যাঙ্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। মজার ব্যাপার হল, আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন যা অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি (ছাত্র নেতৃত্ব) চেয়েছিল, কারণ, তাদের ইচ্ছে ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে হাজির হওয়া। সর্বশেষ নির্বাচনে ৬ থেকে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া জামায়াত ইসলাম দলটা জানত, শুধু নিজ শক্তিতে ভোটে গেলে বিরোধী দল হিসেবে তারা উঠে আসতে পারবে না; তাই একদিকে লীগকে ভোট থেকে বিরত রাখা আবার অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে নিজেদের লীগের বন্ধু হিসেবে পেশ করা, কারণ, বিএনপি'র মতো বৃহত্তম সাংগঠনিক শক্তিকে ঠেকাতে গেলে তৃণমূলে লীগের সহযোগিতা চাই। ওদিকে তৃণমূল স্তরে বহু অসহায় লীগ কর্মী নিজেদের আশ্রয়ের জন্য জামায়াত ইসলামের পক্ষে কাজ করেছে। তদুপরি, এই নির্বাচনে অভ্যুত্থান পরর্বতী বাংলাদেশে জামায়াত নিজেদের অভ্যুত্থানের অন্যতম মালিক হিসেবে দেখাতে পেরেছে, যেখানে অন্যান্য প্রগতিশীল শক্তি, বিএনপি'র ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ ব্যস্ত জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ায় এই ইসলামপন্থী রাজনীতির মূল রাজনৈতিক দল জামায়াত ইসলাম ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির জুলাই অভ্যুত্থানকে ৭১'এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এইসব বয়ানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারি'র নির্বাচনে এই মতাদর্শের অংশকে তাদের দিকে টেনে নেওয়া। আবার বৃহত্তর ইসলামিক ঐক্য বানিয়ে ইসলামী চিন্তার ভোটগুলিকে এক জায়গায় নিয়ে আসার প্রয়াসও তারা করেছে। পরবর্তীতে এনসিপি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অলি আহমদ, আক্তারুজ্জামানদের যুক্ত করে জেন-জি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির কিছু ভোট তাদের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাতেও তারা সফল হয়েছে। এখানে এনসিপি রাজনৈতিক ভুল করেছে। তারা যদি একক ভাবে নির্বাচনে লড়ত তাহলে বুঝত তাদের ভোট কত। বরং প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচনে এনসিপি বা জেন-জি ভোটাররা কি জামায়াতের ভোটার ছিল? যদিও এ বিষয়ে ভিন্নমত আছে। এক পক্ষ বলছে, জেন-জির ভোট ইসলামপন্থীদের দিকে গেছে, আবার আরেক অংশ বলছে, জেন-জি যারা এনসিপি'কে ভোট দিয়েছে তারা মূলত এনসিপি ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি আকর্ষিত হয়েই তা দিয়েছে। 

জামায়াত খুব চমৎকার মেটিকুলাস নির্বাচনী ডিজাইন হাজির করলেও তাদের সফল হওয়ার চেষ্টাকে থামিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম শান্তিপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধপন্থী অসাম্প্রদায়িক মানুষেরা। জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার অথবা জুলাই সনদকে মুক্তিযুদ্ধের সমকক্ষ করে একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চাইছিল, সেখানে বিএনপি'র বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগ থাকার পরেও বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে অন্য কোনও অপশন আর ছিল না। পাশাপাশি, তারেক জিয়ার দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন ও মার্টিন লুথার কিং'এর 'আই হ্যাভ এ ড্রিম'এর আদলে 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' তিনি জনপরিসরে হাজির করলেন এবং তাঁর কর্মসূচি ভিত্তিক রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা, সকল সম্প্রদায়ের প্রতি ধর্মীয় স্বাধীনতার আশ্বাস বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁর প্রতি যে আস্থা তৈরি করল তা বিএনপি'র এই বিপুল জয় দেখেই বোঝা যায়। এই নির্বাচন হয়ে উঠল ন্যারেটিভ বনাম কর্মসূচির নির্বাচন। জামায়তের জোট ও তার প্রপাগান্ডিস্ট ব্লগার'রা যখন পরিচয়বাদ এবং ঘৃণা ও নারী বিদ্বেষের রাজনীতি হাজির করল, তার বিপরীতে বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, সামাজিক নিরাপত্তা, বৃক্ষ রোপণের মতো ইস্যুতে জনগণের সামনে পরিপূর্ণ এক রাজনৈতিক ইশতেহার নিয়ে এল। এই বিজয় যতখানি না বিএনপি'র তার চেয়ে বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ, শহুরে প্রগতিশীল অংশ, গ্রামের বস্ত্রশিল্পের সাধারণ কর্মজীবী নারী, মুক্তিযোদ্ধা, কোথাও আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশের (যারা বিএনপির পক্ষে ভোট দিয়েছে)। অন্যদিকে, জেন-জি আর পেরি আর্বান নারীদের একটা বিশাল অংশ জামায়তকে ভোট দিয়েছে ইনসাফ ও জান্নাতের আশায়।

বাংলাদেশের এই নির্বাচন কার্যত মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের জয়। এই জয় ভবিষ্যৎ'কে নিশ্চিত সুশাসন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করবে। মব প্রপাগান্ডিস্ট ব্লগারদের বিরুদ্ধেও এই জয় এক তীব্র প্রতিবাদ। রাজনীতির ন্যারেটিভ কত ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কদায়ক হতে পারে তা বাংলাদেশের নির্বাচনে ধারণা করা গেছে। বিএনপি-সরকার গঠন হবার পর এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হবে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করা আর সুশাসনের ব্যবস্থা করলেই এই ধর্মান্ধ অংশ ব্যালট লড়াইয়ে পিছিয়ে যাবে। আর আওয়ামী লীগকে ফিরে আসতে হবে জুলাই অভ্যুথানে তাদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংস অপরাধকে কবুল করে ও মাফ চেয়ে। তবেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য দেখা যাবে। রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র অপরিহার্য। এই নির্বাচন তাই কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ যেখানে বাংলাদেশ জিতেছে। বাংলাদেশের এই সংসদীয় নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্য একটি 'হ্যাঁ'/ 'না' গণভোট হয়েছে যেখানে 'হ্যাঁ' বিপুল ভাবে জয়যুক্ত হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে জনগণের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত। সংসদীয় রাজনীতির বাইরে জনগণের সরাসরি মতামতকে রাষ্ট্র কাঠামোর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করাটা সাব্যস্ত করছে যে, বাংলাদেশে এখনও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা জীবিত। নির্বাচিত সরকার যদি এই গণরায়ের তাৎপর্য বুঝে সংস্কার, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোয়, তবে নির্বাচন ও গণভোট মিলেই এক নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্যের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। 

এ নিয়ে খুব শিগগির লিখব আশাকরি।


Monday, 9 February 2026

বাণিজ্য লেনদেনের অজানা পরিণতি?

'সব চুক্তির সেরা' না 'সব বোঝার ভার'?

কৌশিকী ব্যানার্জী



সাম্প্রতিককালে ‘ট্রাম্প-ট্যারিফ’/ ‘শুল্কবাণ’ এই শব্দগুলো আমজনতার কাছে অতি পরিচিত। ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে আমেরিকায় আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ, তারপর গত ২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমাজ মাধ্যমে ইন্দো-মার্কিন নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা (যেখানে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ করার কথা বলা হয়) নাটকীয়তার চূড়ান্ত প্রদর্শন বলে অনেকেরই অভিমত। অবশ্য, ৬ ফেব্রুয়ারি দু-দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই ঘোষণাকে সিলমোহর দিয়েছে। তবে এখনও চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও এই চুক্তিকে ‘father of all deals’ (বা, 'সব চুক্তির সেরা') বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে; যদিও বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ভারতবাসীর কাছে এসব নিয়ে মাথাব্যথার সময় কম। তবুও বলতে হয়, এই ভারত-মার্কিন দ্বৈরথের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী।

আমরা জানি, বাড়তি শুল্কের ফলে আমদানিকারী দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায় ঠিকই তবে মূলত আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশল হিসেবে এটি আরোপিত হয় যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় দেশীয় পণ্যের প্রসারে সুবিধা হয়। বলাই বাহুল্য, এটি মুক্ত বাণিজ্যে বাধাস্বরূপ কিন্তু আমদানিকারী দেশে আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে তোলায় দেশের ভোক্তাদের উদ্বৃত্ত হ্রাস পায়, যেহেতু তাদের আগের থেকে বেশি দাম গুনতে হয়। ফলত, এটি মৃত-ভার ক্ষতি (অর্থাৎ, যখন অতিরিক্ত ক্ষতি বা বোঝা শুল্ক থেকে সংগৃহীত মূল্যের চেয়ে বেশি হয়) বাড়িয়ে তোলে। অতীতের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার সময়ে বিভিন্ন দেশ আমদানি-শুল্ক আরোপ করলে সর্বত্র বাণিজ্য-বাধা বেড়ে যায় যা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়, যার অবসান হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। পরে শুল্কের বোঝা বিভিন্ন দেশ কমাতে থাকে ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (গ্যাট) এবং পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির (FTA) প্রসারে সদর্থক ভূমিকা পালন করে। যদিও বিগত দশকে বেশির ভাগ দেশ আবার সংরক্ষণবাদী নীতি অনুসরণ করছে এবং দ্বিপাক্ষিক-চুক্তির প্রবণতা দেখা দিয়েছে।   

এমতাবস্থায় ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মসনদে বসার দিন থেকেই বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক চাপিয়েছেন। মেক্সিকো, কানাডা, চীনের ওপর শুল্ক আরোপ এবং চীনের সঙ্গে শুল্ক-যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গোটা বিশ্বকে ‘Buy American’ নীতি অনুসরণ করাতে চাইছেন তিনি। এতে আমেরিকায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দেশীয় আমেরিকান পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতির (যখন আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য রফতানির চেয়ে অধিক হয়) পরিমাণ হ্রাস এবং সর্বোপরি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কখনও কখনও এই শুল্ককে তিনি হাতিয়ার করছেন চোরাচালান বা অনথিভুক্ত অভিবাসন রুখতে। এর ফলে, জেপি-মরগানের বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন যে, এই শুল্কনীতি ঘরে-বাইরে তীব্র অনিশ্চয়তা সৃষ্টি, শেয়ার বাজারে পতন, এমনকি ১৯৭০-র দশকের Stagflation বা নিশ্চলতা-স্ফীতির (যেখানে  স্তিমিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সহাবস্থান) সম্ভাবনাকেও প্রকট করেছে। 

পাশাপাশি, ‘ট্রাম্প-নীতি’ ভারত-আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্যেও সমূহ প্রভাব ফেলেছে। মূলত, রাশিয়া থেকে সুলভে তেল কেনা ও ইউক্রেন যুদ্ধে পরোক্ষ মদত দেবার অজুহাতে আমেরিকা গত ২৭ অগস্ট ২০২৫-এ ভারতীয় পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশ শুল্ক (১০ শতাংশ বেসলাইন-শুল্ক + ১৫ শতাংশ পারস্পরিক-শুল্ক বা ‘রেসিপ্রোকাল-ট্যারিফ’ + ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক-শুল্ক) ধার্য করে, যা এ পর্যন্ত ছিল ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হার। এইভাবে শক্তি প্রদর্শন করে ভারতকে বৈদেশিক বাণিজ্যে কোণঠাসা করতে চাওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কিন্তু, সংবাদসংস্থা PTI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন বলেন, স্বল্পমেয়াদে এটি সর্বাগ্রে মার্কিন অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, ভারতের রফতানির ওপর এই শুল্কের প্রত্যক্ষ ফল হবে মার্কিন ভোক্তাদের জন্য দাম বৃদ্ধি, যা ভারতীয় পণ্যের চাহিদা কমাবে এবং ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বৃদ্ধিও হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কারণ, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছে ফলে ভারতের উপর সামগ্রিক প্রভাব ততটা তীব্র হবে না, যতটা হতে পারত যদি শুল্ক শুধু ভারতের ওপরই আরোপ করা হত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বরং ভারতের সামনে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক' ঝালিয়ে নেওয়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, দীর্ঘ দু' দশক পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সফল মুক্ত বাণিজ্য, এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, সাউথ এশিয়া, সংযুক্ত আরব আমির শাহীর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, চীন থেকে মোট আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনাও প্রশস্ত।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, মূল্যবান পাথর ও গয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২৯.২ বিলিয়ন USD থাকলেও ৫০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধিতে বস্ত্র, গহনা, চামড়াজাত দ্রব্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ - এই শিল্পগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি, ভারতীয় মুদ্রার ক্রম-অবমূল্যায়ন (যা গত মাসে ৯২ টাকা প্রতি USD দাঁড়ায়) ও শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও মূলধনের বহির্গমন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা গেল, ট্রাম্পের শুল্ক হ্রাসের ঘোষণার পর পরই ভারতীয় মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে যা এখন ৯০ টাকার আশেপাশে এবং সেনসেক্স-নিফটির সূচকও বেড়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় বাজারে আর্থিক অনিশ্চয়তা হয়তো কমবে যা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। 

আমেরিকার এই মত পরিবর্তন আদতে রঘুরাম রাজনের বক্তব্য ও জেপি মরগানের অনুমানকে সঠিক প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প-নীতির ফলে মার্কিন অর্থনীতির খুব একটা উন্নতি তো হয়ইনি উপরন্তু অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক ও বাণিজ্য চুক্তি সফল হলে ভারতের বিপুল বাজার আমেরিকা চিরতরে হারাবে-- এই আশঙ্কায় আমেরিকার মত পরিবর্তন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা অন্যত্র। গত ৬ ফেব্রুয়ারির যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক ধার্য করবে এবং পরিবর্তে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ওপর আরোপিত সমস্ত শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নেবে। ফলে, নতুন ঘোষিত চুক্তি অনুসারে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান জ্বালানি, কৃষি পণ্য, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্য কিনবে যা বেশ উদ্বেগজনক। ভারতে আমদানির বাজারের সিংহভাগ আমেরিকার হস্তগত হবে এবং অন্য দেশের সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ পড়বে প্রশ্নের মুখে। ইতিমধ্যেই এই চুক্তি ভারতীয় কৃষকদের ক্ষোভের কারণ হয়েছে, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি পণ্য ভারতীয় বাজারকে ছেয়ে ফেলবে। খবরে প্রকাশ, ভারতীয় কৃষক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনের পথে। অবশ্য ট্রাম্প এই হুমকিও দিয়ে রেখেছেন যে ভারত বেশি বেগড়বাই করলে আবারও উচ্চ শুল্ক চাপবে। ভারত যেন খেলার পুতুল। প্রধানমন্ত্রীও নির্বিকার।

২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষক জনসংখ্যা মাত্র ১৮.৮ লক্ষ এবং কৃষিপণ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ ভর্তুকিপ্রাপ্ত। সবচেয়ে বড় অংশ ভুট্টা, সয়াবিন, গম, তুলা ও ধানের জন্য বরাদ্দকৃত যা ভারতের কৃষি ভর্তুকির তুলনায় অনেক বেশি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতে কৃষি ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন খরচ লাঘবের জন্য প্রদত্ত এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের মাধ্যমে দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে একটি অসত্য অভিযোগ করে WTO'র কৃষি-চুক্তি (AoA) অনুসারে ভারতকে ফসলের উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে ভর্তুকিকে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করে। বর্তমানে ভারতে ১৪.৬৫ কোটি কার্যকর কৃষি খামার রয়েছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ কর্মশক্তি ও ৬৫ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী। অতএব, নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় ও জীবিকার মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের নিজ দেশের কৃষকদের স্বার্থে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজেদের কৃষিপণ্য ‘ডাম্পিং’ করতে কৃষি-ভর্তুকি ও WTO-র কৃষি-চুক্তিকে (AoA) অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও, অস্বাস্থ্যকর জিনগত উপায়ে পরিবর্তিত মার্কিন ভুট্টা ও অন্যান্য শস্যের ভারতে বাজার দখলের সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে আমেরিকার কাছে তা 'সব চুক্তির সেরা' হলেও সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির চাপে পর্যুদস্ত হয়ে ভারতের কাছে তা ‘Mother of all burdens’ (বা, 'সব বোঝার ভার') হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও যথেষ্ট।


Wednesday, 4 February 2026

আবারও বাংলা

বাংলা ও বাঙালির বাঁচার লড়াই

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



বিজেপি’র আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের নতুন অস্ত্র SIR’এর ধুরন্ধর আক্রমণের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ বিহারের মাটি থেকে উঠেছিল, তাকে বাংলা ও দেশবাসীর পক্ষ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শীর্ষ আদালতে এক কার্যকরী ও নির্ধারক জায়গায় পৌঁছে দিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সুপরিচিত ভঙ্গিতে যে সওয়াল করলেন তা রাজনৈতিক লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই অভিনব ঘটনার সঙ্গে কিছুটা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সালের ১৮ এপ্রিল চম্পারণের মোতিহারি জেলা আদালতে নিজে দাঁড়িয়ে নিজ পক্ষে গান্ধীজীর সওয়াল করার স্মৃতি মনে আসতে পারে। দুই ঘটনার বাস্তবতা আলাদা হলেও প্রেক্ষিত ছিল প্রায় একই, যেখানে জনতার ওপর নেমে আসা একতরফা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, আইনি কূটকচালিকে অতিক্রম করে সর্বস্তরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগ্রগণ্য ভূমিকা দাবি করে।    

দেশ আজ যে কী ভয়ঙ্কর গহ্বরে প্রবেশ করেছে তা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান। আমরা দেখলাম, গত ২ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালতের এক শুনানিতে ভারত সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার মেহতা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দীর্ঘদিন বন্দী দেশের অন্যতম শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক’এর জামিনের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রকারান্তরে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বললেন যে তিনি নাকি GenZ’কে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামার আহ্বানও এখন এ দেশে দেশদ্রোহ! অথচ, ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত রাম রহিম বা আশারাম বাপু দু’ দিন পর পর নিয়মিত দিব্যি জেল থেকে প্যারোলে বেরিয়ে ঘরে-বাইরে আরামে জীবনযাপন সেরে নেয়। অথবা, আমরা এখনও জানি না, এপস্টাইন ফাইলের স্তূপ থেকে মহামহিম মোদি মহারাজের আর কী কী কীর্তি প্রকাশ পাবে এবং সে জন্যও তাঁর আদৌ কোনও বিচার হবে কিনা! অথচ, টানা পাঁচ বছর ধরে ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে এখনও বিনা বিচারে জেলে পচতে হয় শারজিল ও উমর খালিদ’কে।

এই এখন নতুন ভারতবর্ষ।

এই নতুন ভারতবর্ষেই এবার শুরু হয়েছে বাঙালি নিধনযজ্ঞের ব্যাপক প্রস্তুতি ও সূত্রপাত। কতকটা হিটলারের ইহুদি নিধন অথবা একদা দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস বানিয়ে রাখার মতো। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে গত কয়েক মাস ধরে বেছে বেছে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের পুলিশ চূড়ান্ত হেনস্থা করছে, ‘বাংলাদেশি’ বলে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে, অনেককে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক করে ওই দেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অ-বিজেপি রাজ্যগুলিতেও বিজেপি লালিত হিন্দুবাদী সংগঠনগুলি মারফত পরিযায়ী বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে পিটিয়ে মেরেও ফেলা হচ্ছে। এই নিধনযজ্ঞ আরও ফলপ্রসূ হতে পারে যদি দেশ জুড়ে এক ভয়ঙ্কর নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ (অর্থাৎ, এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ওপর ওপর দেখলে মনে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই যেন সব কিছু হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা চরম ফ্যাসিবাদ, যেমন রাশিয়া ও বর্তমানে উক্ত পথে অগ্রসরমান আমেরিকা) চালু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সহ যাবতীয় ক্ষমতা সমূহকে দখল করা যায়। তা কতকটা সফলও হয়েছে।.২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় ফল করার পর বুঝে যায় যে তাদের দিন এবার সমাগত, যদি না ভোটার তালিকায় কিছু বড় ধরনের ঘোটালা পাকিয়ে সব তছনছ করে দলীয় আদর্শ অনুসারী একটি তালিকা তৈরি করা যায়। ইতিমধ্যে সিবিআই-ইডি-আয়কর ইত্যাদি এজেন্সিগুলিকে নিজেদের দাসানুদাস বানাবার পর পরই তারা আইন বদলে নির্বাচন কমিশনকেও নিজেদের তাঁবে নিয়ে এসেছে। এবার আর দেরি কেন! কমিশন যখন হাতের মুঠোয়, কমিশনাররা যখন সব তুরুপের তাস, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভোটার তালিকার খোলনলচে বদলে দেওয়ার ‘মাদারি কা খেল’ তো বাঁ হাতের ব্যাপার। তাই হল! লোকসভা নির্বাচনের পর পরই ভোটার লিস্ট লণ্ডভণ্ড করে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের নামে যা হল তা সাদা বাংলায় ‘প্রহসন’ বৈ আর কিছু নয়। একদিকে বিপুল সংখ্যায় বাদ দেওয়া হল বিজেপি-বিরোধী ভোটারদের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মারফত বুথ ধরে ধরে আগের নির্বাচনে ভোটদানের তথ্যের ম্যাপিং করে), অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিজেপি ভোটারদের ব্যাপক নাম ঢুকিয়ে পালটে দেওয়া হল ভোটার তালিকার মৌলিক চরিত্র। বিজেপি’র রথ ছুটল উর্ধ্বশ্বাসে, নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের ভিত্তিভূমি তৈরি হল।

আর এই সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা বধের পালা! কারণ, বাংলা হল সেই ভূমি যেখান থেকে উদিত হয়েছে সর্বধর্ম সমন্বয় ও উদারতার চেতনা। চৈতন্য ও লালন এখানে হাত ধরাধরি করে এখনও হেঁটে চলেন। ইসলামি সুফিতন্ত্র ও হিন্দুয়ানার ভক্তিযোগ বাংলার আকাশে-বাতাসে চির প্রবহমান। তাই, বাংলাকে ছিন্নভিন্ন এবং বাঙালিদের গৌরব ও অস্মিতাকে ধ্বংস না করতে পারলে নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের অবয়ব নির্মিতি সম্পূর্ণ হয় না। কারণ, বাংলাই সেই প্রতিরোধের শেষ দূর্গ যা সারা দেশকে গত পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তি ও স্বস্তি দিয়ে গেছে। এ কথা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জানে আর সে জন্যই তাদের যাবতীয় অপচেষ্টা।

এই অসহনীয় ও দুর্বিষহ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলার মাটিতে কবরে যাওয়া মীরজাফর-উমিচাঁদের  প্রেতাত্মা ও তাদের উত্তরসূরীরা আবারও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ সেই সরকারবাড়ির ‘ধেড়ে আনন্দ’ ও পূর্ব মেদিনীপুরের জনৈক মেজখোকার যৌথ নেতৃত্বে উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত একপাল খোকাখুকুর দল তাদের জাল ছড়িয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরার খেলায় নেমে পড়েছে। এ লড়াই বাংলায় বরাবরই ছিল। যে ধেড়ে খুকু খুব আপসোস করে বলেন যে বাংলার ‘ডেমোগ্রাফি’ বদলে যাচ্ছে, সব মুসলমানে ছেয়ে গেল গা, নধরকান্তি সঞ্চালক হৈ হৈ করে হাবিবপুর সীমান্তে শ’খানেক লোককে বসে থাকতে দেখে ক্যামেরা তাক করে ফাটা রেকর্ডের মতো বলতে থাকেন যে ওই ওই পালাচ্ছে, লাখে লাখে রোহিঙ্গা পালাচ্ছে, তারা যে বাংলার ওপর আজকের বর্গী আক্রমণে বেজায় খুশি তা বলাই বাহুল্য। এরাই হল বাঙালিদের সেই ক্ষমতাধারী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত উত্তরাধিকার যারা নবদ্বীপে চৈতন্য মহাপ্রভুর নগর সংকীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের হয়ে দালালি করেছিল, লালনের আখড়া ভেঙে দিয়েছিল, বিদেশ থেকে ফেরার পর স্বামী বিবেকানন্দকে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে পরিত্যাগ করেছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ঢিল ছুঁড়ে অপমানে জর্জরিত করে কলকাতা ছাড়া করেছিল, ১৯৩৭ সালে বঙ্গদেশে ফজলুল হকের সরকারকে আখ্যায়িত করেছিল ‘বাংলার মসনদে এখন এক চাষা বসেছে’; এদেরই প্রগাঢ় উত্তরসুরী চন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৪ সালে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে একটি ছাতামাথা বই লিখে বিধবা বিবাহ ও স্ত্রী-শিক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন। আজ সেই এরাই, কেন্দ্রে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী শাসকের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে বাংলায় কবর ফুঁড়ে উঠে আসার চেষ্টা করছে।

SIR তাই মামুলি ভোটার তালিকা সংশোধনের কোনও কার্যক্রম নয়; তা মুসলমান বাঙালি, নমঃশূদ্র বাঙালি, সুফিতন্ত্রে প্রভাবিত বাঙালি, বাউল সাধনায় ধৌত বাঙালি, উদারতার পরশে নবজন্মে রাঙা বাঙালি, বিচিত্র সম্ভারে শ্রমশীল বাঙালি, কবি-লেখক-গায়ক-চিত্রকর ও সৃষ্টিশীল বাঙালি, যাদের গত ৫০০ বছরের অর্জিত সমস্ত সম্মান ও বোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী কৌলিন্য প্রথাকে ফিরিয়ে আনার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা। আমাদের অর্জিত বোধ ইতিহাসের মর্মে লিপিবদ্ধ যেখানে নবাব সিরাজদ্দৌলা গঙ্গার ঘাটে নৌকায় বসে রামপ্রসাদ সেনকে গাইবার অনুরোধ করলে তিনি শোনান, ‘আমায় দাও মা তবিলদারি/ আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’, হিন্দু ব্রাহ্মণেরা চৈতন্যদেবের নগর সংকীর্তন বেআইনি ঘোষণা করলে বাংলার সুলতান হুসেন শাহ চৈতন্যদেবের পাশে এসে দাঁড়ান, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে (১৮৫৭) ব্যারাকপুর ও বহরমপুরে এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ বাঙালি মানুষ যে ঐক্য-সংস্কৃতির পরিচায়ক ছিলেন, তাইই আমাদের গৌরব ও পরম্পরা। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও এই পরম্পরা অটুট আছে বটে কিন্তু বহির্শত্রুর যে তীব্র আক্রমণ ও মরীয়া প্রচেষ্টা বাংলাকে দখলে নেওয়ার, সঙ্গে মীরজাফর-নরেন গোঁসাই, সাভারকার-শ্যামাপ্রসাদের শিষ্যরা, ইডি-সিবিআই’এর ভয়ে কিছু দালাল-সাংবাদিক ও প্রচারক, তাতে আমাদের বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, কিন্তু লড়াইও হয়ে উঠছে সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী।

এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রাজ্যের বাকী সব তথাকথিত বিজেপি বিরোধী দলগুলি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও ‘বিজেপি বনাম তৃণমূল’ এই অঙ্কে ভাবতে গিয়ে কোণঠাসা ও জনবিচ্ছিন্ন, বরং উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত ভাবনার ফাঁদে পড়ে আরও ল্যাজেগোবরে অবস্থা তখন সাধারণ শ্রমজীবী-নিম্নবর্ণ ও আঘাতপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণ কিছু মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে প্রায় প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল যে সহায়তা ও সমর্থন জুগিয়ে গেছে এবং এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে সর্বতোভাবে লড়াইকে এক উচ্চমার্গে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, তা শুধু এ রাজ্যে নয় গোটা দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ফলে, বিজেপি পাড়ায় পাড়ায় বা গ্রামেগঞ্জে লোক তো আর পাচ্ছেই না, বরং বাম ও অন্যান্যদের অবস্থা আরও করুণ দেখাচ্ছে যখন তারা মমতার সার্বিক এই রণংদেহী অবস্থানকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে আরও জনবিচ্ছিন্নতার বিপাকে পড়ছে।

এখন দেখার, সংসদীয়, অসংসদীয় ও ন্যায় বিচারের পথে যে লড়াইয়ের ধারাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল গড়ে তুলেছে তা সারা দেশে মোদি জমানার ‘নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ’এর সার্বিক পরাজয়ের কারণ ও সড়ক হয়ে উঠতে পারে কিনা। ইতিমধ্যেই অখিলেশ যাদব ও ওমর আবদুল্লা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এই লড়াইয়ে মমতার সঙ্গে আছেন। আমরা তাকিয়ে রইলাম আগামী দিনের দিকে।



Thursday, 29 January 2026

রূপকথার দেশ আজ বধ্যভূমি

ইরান আজ উত্তাল কেন?

সোমা চ্যাটার্জি



এক সময়ের বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য। আয়তনেও মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। এ হেন রূপকথার দেশ পারস্য--  বর্তমান ইরান-- আজ গণকবরে পরিণত হয়েছে মাত্র এক মাসের  মধ্যেই।  

জীবনযাত্রার ব্যয় ও অসহনীয় মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিক্ষোভে কার্যত থমকে গেছে ইরানের জনজীবন; স্কুল-কলেজ তালাবন্ধ, বন্ধ ব্যবসা বাণিজ্যও। গত চার দশকে যা কোনওদিন হয়নি, ক্ষমতার মসনদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই প্রথম ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছেন হাজার হাজার মানুষ। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের পতন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির (যা প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে) ফলে ব্যাপক বিক্ষোভের কারণে  ডিসেম্বরের শেষে ইরানে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। তারপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দেশটির ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে সরকার বিরোধী সহিংস আন্দোলনে পরিণতি পায়। বিক্ষুব্ধ মানুষ তেহরানের কিছু সরকারি ভবনে আগুন  লাগিয়ে দেয়। সংবাদপত্রের তথ‍্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই  ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন (যদিও সরকারি মতে সেটি ৫ হাজারের কাছাকাছি)। 

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। এই সংকট মোকাবিলায় তারা দেশ জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগের কোনও সংকটেই তাদেরকে এমনটা করতে দেখা যায়নি। পরিস্থিতি যত এগোচ্ছে, নিহত ও গ্রেফতারের সংখ্যা ততই বাড়ছে। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ‘জিন জিয়ান আজাদি' বা নারী স্বাধীনতার দাবিতে (বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে ইরানীয় প্রতিবাদ) এভাবেই আন্দোলন শুরু হলেও পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ বা নৃশংস ছিল না। ২০২২ সালে 'মাহসা আমিনির' মৃত্যুর সময় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চলে ইরানে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে তখন প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছিল এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু এবার আন্দোলন শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে সেই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লা শাসন শুরু হবার পর থেকে এরকম গণবিদ্রোহ আগে কখনও দেখা যায়নি যেখানে ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত সবাই মিলে একজোটে  লড়াই করছে। যে বিপ্লবের সুচনা হয়েছিল 'Death to High Price' শ্লোগান দিয়ে, তা আজ রূপান্তরিত হয়েছে 'Death to Khamenei' শ্লোগানে।

ইরানের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। গত এক দশকে ইরানের মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়া, তেল রফতানি হ্রাস এবং সরকারি হিসেবেই ৪০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি. (বেসরকারি মতে এটি ৬০-৭০ শতাংশ) প্রভৃতির ফলে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। এর কারণ, ইরানের আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। ইসলামিক শাসন শুরু হবার পর থেকেই ইরান একের পর এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রথম ৮ বছর ধরে চলে ইরান-ইরাক যুদ্ধ, তারপর গাজা নিয়ে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রক্সি যুদ্ধ, এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী যেমন হিজবুল্লা, হামাস'দের সমর্থন, এর সঙ্গে আছে পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞা। তেল থাকলেও বিক্রি করার উপায় নেই, অস্ত্র প্রযুক্তি আমদানি করা গেলেও রফতানির রাস্তা নেই, ফলে ডলার দেশে ঢুকছে না, ফরেন রিজার্ভ ফুরিয়ে গেছে, সরকারি ভর্তুকি কমানো হয়েছে-- এই সবের মাশুল গুনেছে সাধারণ মানুষ তাদের ট্যাক্সের টাকায়। ইরানের ব্যবসায়ী সমাজ যাদের 'বাজারিস' বলা হয়, তারা এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যারা একসময় ইসলামিক শাসনের জন্ম দিয়েছিল, রেজা শাহ পাহালভি'কে ক্ষমতাচ্যুতও করেছিল, তারাও এই বিক্ষোভে সামিল। কারণ, সরকার বাজারে জিনিসের দাম বেঁধে দেওয়ায় তারাও রিয়ালের পতনের ফলে চূড়ান্ত ভুক্তভোগী, ডলারের দাম তাদের চোকাতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ রিয়াল খরচ করে। এছাড়াও ইরানের সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব, কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ (নাবালকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে ইরান আজও বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে), বিদ্যুৎ সংকট, জলের অভাব সব কিছুর বিরুদ্ধেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ইন্ধন জুগিয়েছে এই গণবিপ্লবে। আগেকার বিক্ষোভগুলোর পর সরকার কিছু সামাজিক ছাড় বা ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও এবার সেই আর্থিক ক্ষমতাও সরকারের নেই। 

ইরানের এবারের সংকট শুধু দেশের ভেতরের বিক্ষোভেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাইরের চাপও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনি অভিযোগ করেছেন, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হাত রয়েছে, যা সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, মাত্র সাত মাস আগে ২০২৫'এর জুন মাসে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে টানা ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের Midnight Hammer Operation'এ ইরানের মাটির নিচের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি ধংস করে দেয়। কারণ, ওই মুহূর্তে আমেরিকা ছাড়া অন্য কোনও দেশে এই প্রযুক্তি থাকুক তারা সেটা চায়নি। ওই সংঘাতের সময়েই ইজরায়েলের মিসাইল কিলিং'এ ইরানের বাখতারান মিসাইল বেসে প্রায় ২০০টি মিসাইল লঞ্চার ধংস হয়, যাতে ইরানের সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা সহ কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানীও নিহত হন। পাশাপাশি, ইজরায়েল ইরানের দক্ষিণে ১৪টি প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল উত্তোলন কেন্দ্রও সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস উত্তোলন করা হত। যেহেতু ইরানের বিদেশি মুদ্রার পুরোটাই আসে তেল ও গ্যাস থেকে এবং পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার জন্য ইরানকে কালোবাজারে অনেক কমে ওই তেল বা গ্যাস বিক্রি করতে হয়, এই বিপর্যয় ইরানের  শাসনব্যবস্থাকে স্পষ্টভাবেই দুর্বল করে দেয়। ফলে, সরকার সাধারণের জন্য ভর্তুকি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ইরানের  মতো দেশে যেখানে আর কোনও  শিল্প  কারখানা নেই, সেখানে ওষুধও আমদানি করতে হয় এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেয়। গত বছর যেখানে ১ ডলারের মূল্য ছিল ৭ লাখ রিয়াল, এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১৪ লাখ রিয়াল, অর্থাৎ দ্বিগুণ। এই সব কারণেই ইরানের ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে এবং এটিই ইরানের শাসকদের কাছে শঙ্কার কারণ, যেহেতু ইসলামিক বিপ্লবের সময় এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাত ধরেই আয়াতুল্লারা ক্ষমতায় এসেছিল এবং এই তীব্র সংকটে তাদের সমর্থন না থাকলে ইরানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সম্ভবত সেই কারণেই খামেইনি সরকার স্টারলিঙ্ক'এর স্যাটেলাইট বন্ধ করে দিয়ে দেশে মিলিটারি শাসন চালু করেছে এবং ব্যাপক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্ত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খোলা জায়গায় অস্থায়ী মর্গ, যেখানে কালো ব্যাগে মোড়া অসংখ্য মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা। রাস্তায় আজ শুধু স্লোগান নয়, সংঘর্ষও বাড়ছে, প্রতিবাদকারীদের উপর গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এই অস্থিরতার মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইজরায়েল বার্তা দিচ্ছে, এই লড়াই সরকারের বিরুদ্ধে (খামেইনি), জনগণের বিরুদ্ধে নয়। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের শাসন পরিবর্তনের পক্ষে বলে আসছে। তারাও এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার বার্তা দিচ্ছে খামেইনিকে, বলছে সমঝোতা করে নিতে। ইসলামিক শাসনের সময় ক্ষমতাচ্যুত শাসকের ছেলে যুবরাজ রেজা শাহ পাহলভিও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, 'অতীতে আমেরিকা ইরানের সাথে যে শত্রুতার পরিচয় দিয়েছে (১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকারের বিরোধিতা, ১৯৮৮ সালে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান নামিয়ে নারী-শিশুদের হত্যা এবং ৮ বছরের যুদ্ধে সাদ্দামকে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়া), তারপর ইরানিদের জন্য তাদের দুঃখপ্রকাশ অর্থহীন।' তিনি বলেন, 'ইরানিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে, কোনও বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না।' নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী নারগেস মোহাম্মদি, যিনি এখনও ইরানে কারাবন্দি এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি সহ অনেকেই মনে করেন, পরিবর্তন হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং দেশের ভেতর থেকেই। বাইরের চাপ বা হস্তক্ষেপ ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভাঙার বদলে উল্টোভাবে শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ ব্যক্তিদের আরও একজোট করে দিতে পারে এবং যেভাবে আগের সমস্ত আন্দোলন খামেইনি সরকার প্রতিহত করেছে, এবারও তাই হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেইনিকে তেহরানের একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রশাসন এখন আগের চেয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়েছেন, ইরানকে তার পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। খামেইনির পক্ষে এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া বেশ কঠিন, কারণ, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনই ইরানের ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ হিসেবে পরিচিত। তবে লেবাননের হিজবুল্লাহর দুর্বল হওয়া, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং প্রথমবারের মতো ইজরায়েলের সরাসরি হামলার শিকার হওয়ায় ইরান তার পুরনো নীতি পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য হতে পারে। 

ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ বলেছে, ইরানের পাল্টা হামলারও প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সেনারা।  মধ্যপ্রাচ্যে এবারই সবচেয়ে বড় সেনা ও যুদ্ধাস্ত্র জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র, যার মধ্যে রয়েছে রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং ক্রুজার। এর সঙ্গে আছে ফাইটার স্কোয়াড্রোনস এবং বাড়তি মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এদিকে এই ধরনের চাপের মাঝেও ইরানের শাসকগোষ্ঠী যে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে, তার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবর্তন যে আসছে, তার আভাস মিলছে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোতেও। বিশ্লেষক আলিরেজা আজিজির মতে, ইরান ইতিমধ্যে একটি ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে সামরিক নেতৃত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। 

খামেইনি পরবর্তী সময়ে ইরানে কি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো আমূল কোনও রূপান্তর হবে নাকি রাজপথে জনবিস্ফোরণের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে বিশ্ব রাজনীতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বলছে, ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তন এখন কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা।


Wednesday, 28 January 2026

ইউজিসি বিল ২০২৬: ধর্মান্ধতার সংকট

হিন্দুত্বের রসায়ন বনাম জাতপাতের রূঢ় বাস্তব

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ইউজিসি প্রণীত 'ইক্যুইটি রেগুলেশনস ২০২৬' বা তথাকথিত 'ইউজিসি বিল ২০২৬' হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। উত্তর ভারতের রাজপথ, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির ছাত্র বিক্ষোভ আজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিজেপি যে 'হিন্দুত্ববাদী ঐক্যের' তাসের ঘর তৈরি করেছিল তা জাতপাতের রূঢ় বাস্তবতার সামনে ধসে পড়ার মুখে। এটি এখন বিজেপির জন্য এক স্বখাত সলিলে মরণফাঁদ।

ঐতিহাসিকভাবে বিজেপিকে 'ব্রাহ্মণ-বানিয়া' বা উচ্চবর্ণের দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথাপি, গত এক দশকে মোদী-শাহের নেতৃত্বে বিজেপি অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে এই উচ্চবর্ণের ভিত্তির কোলে দলিত ও ওবিসি ভোটব্যাঙ্ককে এনে ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু ইউজিসি-র নতুন নির্দেশিকা সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সম্ভবত লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির জন্য একতরফা সুরক্ষাকবচ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির যে বিধান এই বিলে রাখা হয়েছে, তাকে উচ্চবর্ণের ছাত্ররা দেখছেন তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। উত্তরপ্রদেশ জুড়ে উচ্চবর্ণের ছাত্রদের তীব্র বিক্ষোভ ও সাবর্ণ নেতাদের রোষ প্রমাণ করছে যে, বিজেপি নিজের প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে নিজেই আজ বন্দি। দলিত ভোট টানার টোপ দিতে গিয়ে তারা এখন নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর উচ্চবর্ণের সমর্থন হারাতে বসেছে।

বিজেপির বর্তমান দশা এখন আক্ষরিক অর্থেই 'শ্যাম রাখি না কুল রাখি'। একদিকে তারা যদি এই বিল কার্যকর করে, তবে উচ্চবর্ণের বিশাল একটি অংশ যারা তাদের দীর্ঘদিনের অটুট ভোটব্যাঙ্ক, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঝুঁকি নেওয়া বিজেপির পক্ষে আত্মঘাতী। অন্যদিকে, যদি বিক্ষোভের চাপে পড়ে কেন্দ্র এই বিল প্রত্যাহার বা সংশোধন করে, তবে সমাজবাদী পার্টি বা কংগ্রেসের মতো বিরোধীরা একে 'দলিত-ওবিসি বিরোধী মানসিকতা' হিসেবে প্রচার করবে। ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে বিজেপি এমন এক গোলকধাঁধায় ঢুকেছে, যেখানে যে কোনও এক পক্ষকে তুষ্ট করা মানেই অন্য পক্ষকে হারানো। এই মেরুকরণ কেবল বাইরে নয়, দলের অন্দরেও প্রবল কম্পন সৃষ্টি করেছে।

বিজেপির এই সংকটে ঘি ঢেলেছেন ধর্মীয় নেতৃত্বের একাংশ। বিশেষ করে জ্যোতিষপীঠের শঙ্করাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীকে নিয়ে বিজেপি আজ গভীর সমস্যায় নিমজ্জিত। মাঘ মেলায় তাঁর স্নানযাত্রাকে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের বাধাদান ও তাঁর শিষ্যদের টিকি ধরে পুলিশের টান দেওয়ার প্রতিবাদে শঙ্করাচার্য টানা ধর্নায় বসে পড়েছেন। তাঁর সমর্থনে সাধু-সন্ত মহলে তু্মুল আলোড়ন উঠেছে শুধু নয়, লক্ষ্ণৌ শহরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট পদত্যাগ পর্যন্ত করেছেন। ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার করতে চেয়েছিল, আজ সেই ধর্মেরই শীর্ষস্থানীয় নেতারা যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ব্র্যান্ড বড়সড় ধাক্কা খায়। এটি প্রমাণ করে যে, স্রেফ মন্দির দিয়ে পেটের ক্ষুধা বা সামাজিক মর্যাদার লড়াই মেটানো যায় না।

কেন এই উভয় সংকট? আসলে, হিন্দু ধর্ম যে ভেতর থেকেই গভীর এক বিভাজিত ব্যবস্থা এবং এর অভ্যন্তরেই হাজার বছরের তীব্র বিদ্বেষমূলক দ্বৈরথ বিদ্যমান— তাকে আড়াল করে বিজেপি ও আরএসএস মিথ্যা ন্যারেটিভের আশ্রয়ে এক কৃত্রিম হিন্দু অস্মিতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের যে প্রয়াস নিয়েছিল তার সঙ্গে ধর্মের যোগ নয়, ছিল রাজনৈতিক ব্যভিচারের সমস্ত অনৈতিক ভাব ও প্রক্রিয়া। তাদের 'হিন্দুত্ববাদ' আসলে এক আরোপিত প্রলেপ, যা দিয়ে তারা জাতিভেদ প্রথার ক্ষতে মলম লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু ইউজিসি বিলকে কেন্দ্র করে উচ্চবর্ণ বনাম নিম্নবর্ণের যে সংঘাত আজ রাস্তায় নেমে এসেছে, তা প্রমাণ করে যে 'হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি' আসলে এক 'প্রহেলিকাময় আত্মহনন'। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় মেরুকরণ করে হিন্দু সমাজের আভ্যন্তরীণ তীব্র সামাজিক বৈষম্যের আদিম ক্ষতকে ঢাকা দেওয়া সম্ভব নয়। বিজেপির বর্তমান অন্তর্দ্বন্দ্ব আসলে সেই রাজনৈতিক দৈন্যদশারই বহিঃপ্রকাশ। দলিতকে আপন করার ভেক ধরা আর উচ্চবর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা— এই দুই বিপরীত মেরুকে এক করার যে অবাস্তব স্বপ্ন বিজেপি ফেরি করে, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ইতিমধ্যেই ইউজিসি-র এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনি ব্যাখ্যা এই বিলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আবেদনকারীদের প্রধান যুক্তি হল, সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সমতার অধিকার) অনুযায়ী সুরক্ষা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু ইউজিসি বিলের ৫.৩ এবং ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী সুরক্ষা কেবল সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করে যে এই বিল 'রিভার্স ডিসক্রিমিনেশন' বা বিপরীত বৈষম্য তৈরি করছে, তবে পুরো বিলটিই বাতিল হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, 'বৈষম্য' শব্দের সংজ্ঞা এতই অস্পষ্ট যে এটি যে কোনও নির্দোষ ছাত্রকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারে। আইনি এই জটিলতা বিজেপি সরকারকে এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে তারা না পারছে বিলটি পুরোপুরি সমর্থন করতে, না পারছে এর আইনি ভিত্তিকে রক্ষা করতে।

উত্তরপ্রদেশের লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রয়াগরাজ এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উচ্চবর্ণের ছাত্ররা কেবল বিক্ষোভ মিছিল নয়, বরং বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোর সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, 'আমরা বিজেপির সমর্থক ছিলাম, কিন্তু আমাদের পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।' লক্ষ্ণৌ ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিজেপির অন্তত ২০ জন জেলা পর্যায়ের নেতা গত এক সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হাইকম্যান্ড ছাত্র সমাজের ক্ষোভ বুঝতে ব্যর্থ। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনা বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ছাত্ররা এখন বিজেপির বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খোঁজার কথা বলছে, যা বিজেপির জন্য অশনি সংকেত। কানপুর, বেনারস, জৌনপুর, দেওরিয়া ও প্রতাপগড়ে 'সাবর্ণ সেনা' ও 'করনি সেনা'র মতো উচ্চবর্ণীয় বাহুবলীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে। মিরাট ও সাহরানপুরেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির নর্থ ক্যাম্পাস ও ইউজিসি'র সদর দফতরের সামনে ছাত্র বিক্ষোভে ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। দলের ভেতরেই যখন 'আমাদের সরকার আমাদের বিরুদ্ধেই আইন করছে'— এই সুর চড়তে শুরু করে তখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী কাঠামোর পতন শুরু হয়েছে। সাংসদ ও বিধায়করাও এখন জনগণের ক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হিন্দুত্বের দ্বন্দ্বমুখর এই হানাহানিই সম্ভবত বিজেপি রাজনীতির একাধিপত্যের ইতি ঘটানোর পথে প্রধান অনুঘটক হবে। ধর্মের কৃত্রিম বন্ধন দিয়ে মানুষের পেটের লড়াই বা সামাজিক মর্যাদার সংঘাতকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এই রূঢ় বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ ধর্মের সংকীর্ণতায় নেই, আছে আধুনিক গণতান্ত্রিক মননের বিকাশে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রলম্বিত সংরক্ষণকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি করা কিংবা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অন্ধ বিরোধিতা করা— দুটোই সমাজের জন্য সমান ঘাতক। প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার কেবল তখনই সম্ভব যখন জাতপাত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আধুনিক গণতান্ত্রিক চৈতন্যের উদয় হবে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে ফানুস বিজেপি উড়িয়েছিল, তা আজ জাতপাতের কাঁটায় বিদীর্ণ।

শ্রমের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সামাজিক মুক্তি প্রাপ্তব্য; ধর্মের জগাখিচুড়ি রাজনীতির মাধ্যমে নয়। বিজেপির বর্তমান দৈন্যদশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে রাজনীতি বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তা শেষ পর্যন্ত নিজেই খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশের রাজপথ থেকে সুপ্রিম কোর্টের এজলাস পর্যন্ত আজ সেই সত্যই ধ্বনিত হচ্ছে— ইউজিসি বিল ২০২৬ বিজেপির জন্য কোনও উপহার নয়, বরং এক ঐতিহাসিক পতনের শুরুর সংকেত।