Wednesday, 20 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি (২)

কল্যাণমুখী ব্যয়ও অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়

অচিন চক্রবর্তী



(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে ছিল রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে রইল বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক

 দ্বিতীয় অংশ 


দুর্নীতির রকমফের

যে সমস্যাটি এ রাজ্যের জনপরিসর অনেকটাই দখল করে রেখেছে বেশ কিছুকাল তা হল দুর্নীতি। সামাজিক মাধ্যমে এ ওকে তুলোধোনা করেছে দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে না বলে। দুর্নীতি নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের সরব হওয়া না হওয়ার অপেক্ষায় অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। অ-ভাজপা রাজ্যগুলিতে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় রাজ্যের ক্ষমতাশীল দলকে বিপাকে ফেলতে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে বদলি, সর্বত্র যেরকম আর্থিক লেনদেনের কথা জানা গেছে তা নিয়ে মানুষ যে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ তা বলা যায়। দুর্নীতি যেহেতু অগণিত কাজের মধ্যে দিয়ে হয়, এবং দুর্নীতি কেউ চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে করে না, ফলে দুর্নীতির তথ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু দেশে দেশে দুর্নীতির আন্দাজ দিতে ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো সংস্থা কিছু বিশেষ ধরনের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। এই পরিসংখ্যান আদতে দুর্নীতির ব্যাপ্তি নিয়ে মানুষজনের কী উপলব্ধি তাকে ধরার চেষ্টা করে। মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে যদি বাস্তবের সম্পর্ক নাও থাকে তাহলেও এই তথ্যের গুরুত্ব আছে অর্থনীতিতে, কারণ মানুষ ধারণার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার যদি ধারণা হয়ে থাকে কোনও দেশে দুর্নীতি খুব বেশি, যদিও বাস্তবে তা নয়, আমি সেখানে বিনিয়োগ করব না হয়তো। বোঝাই যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতাও হয় বিভিন্ন। ব্যবসায়ীর কাছে এক রকম, সরকারি আধিকারিকের কাছে এক রকম, সাধারণ একজন পরিষেবা গ্রাহকের কাছে আর এক রকম। মানুষ যে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধাভোগী সেগুলি সম্পর্কে, কিংবা যে সব সরকারি আধিকারিকদের তাঁরা ভাল ব্যবহার করতে দেখেছেন সামনে থেকে তাঁদের সম্পর্কে, ভাল ধারণা পোষণ করে থাকেন। দুর্নীতি থাকলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। 

তাহলে প্রশ্ন, পূর্ববর্তী শাসক দলের বিরুদ্ধে এই যে এত দুর্নীতির প্রমাণ তুলে আনল তদন্তকারী সংস্থাগুলি, অধিকাংশ মানুষ যদি ক্ষুব্ধ হন তা নিয়ে, তার প্রভাব পড়েছে হয়তো নির্বাচনের ফলে। অর্থনীতিতে দুর্নীতির দীর্ঘকালীন প্রভাব কেমন হতে পারে? তা যতটা নির্ভর করে দুর্নীতির প্রকৃতির উপর, দুর্নীতির বহরের উপর ততটা নয়। ধরা যাক যে বস্তুটি আইনত প্রাপ্য নয় সেটি কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী এমএলএ, ছোট বড় সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিকের থেকে অর্থের বিনিময়ে পেলেন। যেমন অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকের চাকরি, যে ‘শিক্ষক’ চাকরির যোগ্য নন। আর এক ধরনের দুর্নীতি হতে পারে, যেখানে আইনত প্রাপ্য বস্তুটি পেতেই আমাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যেমন আমি কলেজ সার্ভিস কমিশন দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি আমার মেধার নিরিখে। এবার আমি যখন কলেজে যোগ দিলাম, আমার বেতনক্রম স্থির করতে যে ফাইল যাবে বিকাশ ভবনে, তা যাবে না যদি না আমি কিছু অর্থ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে দিই। এ কাজটি করার কথা যদিও কলেজেরই। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে এমন অজস্র ‘পেয়ে থাকি’র সম্মুখীন হয়তো আমাদের সবাইকেই হতে হয়েছে – পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে জমির মিউটেশন। এতে আমরা আর অবাক হই না। কিন্তু এখানে ইচ্ছে করেই এমন একটি দৃষ্টান্ত দিলাম যা এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের, এবং যা সত্যি বলে জানি। 

ঘুষ নেওয়া এবং দেওয়া এ দুটি কর্মই এ দেশে অপরাধ বলে গণ্য হয়। অথচ উপরে দৃষ্টান্ত সহ যে দুই ধরনের ঘুষের কথা বললাম, আইনের চোখে তারা সমান। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, দ্বিতীয় ধরনের দুর্নীতি আইনের একটু এদিক ওদিক করেই অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। যিনি ঘুষ দিয়েছেন তাঁকে অপরাধী না করে যিনি নিয়েছেন তাঁকে যদি শনাক্ত করায় উৎসাহিত করা যায় তাহলে দুর্নীতি কমতে পারে। কিন্তু প্রথম ধরনের দুর্নীতি, যা থেকে দু' পক্ষই লাভ করছে, যা আইনত তাদের প্রাপ্য নয়, এ ধরনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বেজায় কঠিন, কারণ কোনও পক্ষেরই একে প্রকাশ্যে আনার কোনও ইনসেন্টিভ নেই।    

অর্থের বিনিময়ে চাকরি এবং তার সঙ্গে জড়িত সমস্যাগুলি শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্ভবত সব থেকে বেশি প্রভাবিত করেছে। অপরাধের তদন্ত থেকে কোর্টকাছারির ব্যাপার স্যাপার সমাজমাধ্যমে যেভাবে জায়গা করে নেয়, বহু ছেলেমেয়ে যে শিক্ষা বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে সেই গভীর সমস্যাটির দিকে আলোকপাত হয় না। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় শিক্ষার রূঢ় সত্যটি হল, কোভিডের ধাক্কার আগেও এ রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছতে পারে নি, অন্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। তার সঙ্গে যদি অতিমারির ক্ষতিকে একত্রে দেখি তাহলে সংকটের গভীরতার প্রকৃত ছবিটি পাওয়া যাবে। কোভিডের আগেও প্রতি বছর ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ যে শিক্ষার অঙ্গন থেকে অকালে বিদায় নিচ্ছিল – এই জরুরি কথাটি অনুধাবন প্রয়োজন।  

শিক্ষার কেন্দ্রীয় ভূমিকা 

পশ্চিমবঙ্গবাসীদের মধ্যে উচ্চ-প্রাথমিক থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করছে কতজন, তার পরিসংখ্যান থেকে কিছু প্রবণতা লক্ষ করা যায় যা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল এবং আছে। কিন্তু তা আলোচনায় আসে নি তেমন। আমাদের দুর্ভাগ্য, শিক্ষক নিয়োগ বা তাঁদের বদলি-সংক্রান্ত খবর সংবাদ-পরিসরকে যতটা সরগরম রাখে, শিক্ষা ও শিক্ষণ ততটা নয়, শিক্ষার সর্বজনীনতা তো নয়ই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সর্বজনীনতার দিকে অগ্রগতি যেভাবেই মাপা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে এর শম্বুকগতি নজর এড়াবে না। এখানে বলে রাখা উচিত, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি প্রায় সম্পূর্ণতা ছুঁয়ে ফেলেছে বেশ কিছুকাল আগেই, অন্য সব রাজ্যের মতোই। এ রাজ্যের যে কোনও অঞ্চলের যে কোনও প্রাথমিক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি বা ভর্তি হলেও পঞ্চম শ্রেণির আগে ছেড়ে দিয়েছে এমন শিশু এখন এ রাজ্যে প্রায় নেই বললেই চলে, আর তার সমর্থন পাওয়া যায় অ্যানুয়াল সার্ভে অব এডুকেশন রিপোর্ট (সংক্ষেপে ‘এসার’) থেকেও, যা নিয়ে খবর হয়। আর এখান থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়-শিক্ষা নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত সন্তুষ্টিরও জন্ম দেয়। চাপা পড়ে যায় অন্য সত্যটি, যা হল এ রাজ্যে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের সংখ্যা কমেছে অতি ধীরে, অধিকাংশ রাজ্য বা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায়।    

জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (সংক্ষেপে, এনএসএস) পরিসংখ্যানকে যথেষ্ট নির্ভরশীল সূত্র বলেই ওয়াকিবহাল মহল জানে। ২০১৭-১৮ সালে করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ৩৩.৫ শতাংশের মাধ্যমিক বা উচ্চতর ডিগ্রি আছে; যা শুধু সর্বভারতীয় গড়ের থেকে কম তাই নয়, যে কোনও রাজ্যের থেকে নীচে। যে কোনও রাজ্যের থেকে? বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের থেকেও? হ্যাঁ, তাই। তবে এর মধ্যেই কিঞ্চিৎ আলোর রেখা আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে খানকয়েক রাজ্য পাচ্ছি যারা এ বাবদে পশ্চিমবঙ্গের নীচে। অর্থাৎ, শিক্ষিতের হারে মহিলা ও পুরুষের বৈষম্য এ রাজ্যে অন্য বেশ কিছু রাজ্যের তুলনায় কম। একে নারী শিক্ষার অতিমাত্রিক অগ্রগতি হিসেবে দেখব না পুরুষদের শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে পড়া বলব?

পনেরো-ঊর্ধ্ব সবাইকে হিসেবে ধরলে ষাট-সত্তর-আশি বছর বয়স্কও সবাই থাকছেন তার মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, সে তো দূর অতীতের কথা, বহুকাল আগেই তাঁরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার বয়স ফেলে এসেছেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা কেমন করছে সেটা বলুন। ধরা যাক উচ্চমাধ্যমিকের কথা। একাদশ বা দ্বাদশে যত ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত আছে সেই সংখ্যাকে রাজ্যে ১৬-১৭ বয়সীদের মোট সংখ্যার শতাংশ হিসেবে দেখলে যা পাব তাকে বলে ‘গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও’, সংক্ষেপে জিইআর। পূর্বে উল্লেখিত এনএসএস-এর তথ্য থেকেই পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকে জিইআর ৫৪.৪ শতাংশ। আর গোটা দেশে? ৭০.৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যামিক-পরবর্তী স্তরেও মোটামুটি একই চিত্র – সর্বভারতীয় জিইআর পশ্চিমবঙ্গের জিইআর-এর তুলনায় অনেকটাই বেশি। এনএসএস সমীক্ষা নিয়ে সন্দেহ থাকলে অন্য সূত্রও দেখে নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ২০১৯-২০-র অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন  দেখাচ্ছে, সমগ্র ভারতে উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের জিইআর যেখানে ২৬.৯ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে তা ২০.৩ শতাংশ, নীচের দিক থেকে চার নম্বরে। 

শিক্ষা-সক্ষমতার পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা কোথাও কোথাও এগিয়ে থাকলেও (এসার-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যা নিয়ে খবরও হয়েছে) তার প্রকৃত কারণ সম্ভবত অন্য, সংখ্যাতত্ত্বের অতি সরল অঙ্ক। অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী, বিশেষত আর্থ-সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়েরা শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মাঝপথে। তাই বাকিদের শিক্ষা-সক্ষমতার গড় কিছুটা বেশি হওয়ার কথা, যেহেতু যারা বাইরে রইল তাদের সক্ষমতা সামগ্রিক গড়ের থেকে কম হবেই। অর্থাৎ, শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি যত সম্পূর্ণতার দিকে যাবে সামগ্রিক সক্ষমতার গড় মান প্রথমদিকে খানিকটা কমতেই পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ রেখে গড় মানের উচ্চতা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা নির্বুদ্ধিতা।  

মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেই ছেলেরা সরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষভাবে এ এক গভীর সামাজিক সমস্যা। শিক্ষার স্বল্পতার কারণে কাজের বাজারের শ্রেণি বিন্যাসে তাদের জায়গা হচ্ছে নীচের দিকে। যদি ধরে নিই, দারিদ্রের জন্যে শিক্ষা বেশি দূর এগোচ্ছে না (যা পুরোপুরি সত্যি নয়), আবার শিক্ষা অসম্পূর্ণ বলে কাজের বাজারে সুবিধা হচ্ছে না, যার ফলে দারিদ্রমুক্তিও হচ্ছে না – এরকম একটা দুষ্টচক্রের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে কোনও সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে গেলে প্রথম কর্তব্যটি হল, সমস্যাটি যে আছে তা যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করা। লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে অভ্যস্ত ভাবনায় মেয়েদের শিক্ষার কথাই অগ্রাধিকার পায়, কারণ শিক্ষা যে সক্ষমতা দেয় তা জীবনের অন্য মাত্রাগুলিকেও টেনে তোলে নারী-পুরুষের মধ্যে সুযোগের সমতা অভিমুখে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই সাইকেল বিতরণ থেকে কন্যাশ্রী প্রকল্পের লক্ষ্য হয় মেয়েরা। সেখানে ভুল নেই। কিন্তু ছেলেরা অধিক সংখ্যায় বিদ্যালয়-ছুট হওয়ার ফলে মেয়েদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে, এও কাম্য হতে পারে না। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণগুলি মেয়েদের আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেকটাই আলাদা।

কারণের কথায় অনেকেই বলেন, শিক্ষার সুফল যদি কেউ ভবিষ্যৎ যাপনে দেখতে না পায় তাহলে পড়বে কেন? ‘লাভ’ কী? কথাটি বিভ্রান্তিকর। পড়ে একেবারেই লাভ নেই, এ কথা কোনও মা-বাবাই মনে করেন না। যে কোনও ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকেই তা স্পষ্ট। তাহলে? লাভের হিসেবটিকে যদি ‘নীট লাভ’ ধরে দেখি – অর্থাৎ, শুধু সম্ভাব্য প্রাপ্তির দিকে না দেখে ব্যয়কেও হিসেবে ধরি তাহলে সমস্যাটির গোড়ায় পৌঁছনো যায়। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যিটা হল, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষা-অর্জন এমন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে তা অনেক পরিবারের হিসেবে শিক্ষার সম্ভাব্য প্রাপ্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তার কারণ প্রাইভেট টিউশন। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচ যে শূন্য শুধু তাই নয়, মিড-ডে মিল থেকে সাইকেল এমন বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্তির দিকটিকেও বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শুধু প্রাইভেট টিউশনের ব্যয়ভার যাবতীয় ভর্তুকির প্রভাবকে একেবারেই চাপা দিয়ে দিচ্ছে। প্রাইভেট টিউশন কি অন্য রাজ্যে নেই? আছে, তবে এ রাজ্যের মতো সর্বাত্মক নয়। টিউশন না দিতে পারলে পড়া চালিয়ে যাওয়ার মানে হয় না – এমন ভাবনা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। 

বেপথু কল্যাণকামিতা?

জনকল্যাণ বলতে যা বোঝায় তা যে রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে সে বাবদে বিশেষ মতভেদ নেই বোধহয়। কিন্তু কোন নীতিটি আদতে জনকল্যাণের লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে আর কোনটির পিছনে রয়েছে স্রেফ রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য তা নিয়েই যত কূটকচাল। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে নীতিতে জনকল্যাণের সম্ভাবনা নেই তা থেকে রাজনৈতিক লাভই বা হবে কীভাবে? নির্বাচকরা কী দেখে ভোট দেবেন? তাছাড়া সরকার যাঁরা চালান তাঁরা এমন নীতি নিতে যাবেনই বা কেন যা থেকে রাজনৈতিক লাভ নেই? তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ইস্তাহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মেনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করেছিল। ব্যাপ্তি এবং প্রভাবের দিক থেকে দেখলে প্রকল্পটির গুরুত্ব যদিও কম নয়, এর ভালমন্দ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা তেমন দেখি নি। যা দেখেছি তা এক অতি সরলমনা অবস্থান – রাজকোষ উজাড় করে দানখয়রাতি করে সরকার দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে; অথবা প্রকৃত উন্নয়নের দিকে না গিয়ে রাজ্যবাসীকে ভিক্ষাজীবীতে পরিণত করছে। 

একদিকে বড় শিল্প, বড় বিনিয়োগ, আর্থনীতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আর অন্যদিকে ব্যয়বহুল সরাসরি কল্যাণমূলক প্রকল্প – এই দুইয়ের মধ্যে পাল্লাটা কোনদিকে ঝুঁকবে তা নিয়ে বিতর্ক উন্নয়ন চর্চায় নতুন নয়। এর সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসাও সম্ভব নয়। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি যে মূলত দ্বন্দ্বমূলক নয় তা চর্চার জগতে মোটামুটি স্বীকৃত। বস্তুত, উন্নয়নশীল দেশে এই কল্যাণমূলক ব্যয়ের পথ ধরে যে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব তাও স্বীকৃত। তাই শেষমেশ প্রশ্নটা দাঁড়ায়, কোন ধরনের কল্যাণমূলক প্রকল্প অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে কতটা পোক্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, মহিলাদের হাতে খরচ করার ক্ষমতা থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি বাড়ে, যা মানবোন্নয়নের মধ্যে দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে। হাতের কাছেই উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের মধ্যে অর্থকরী কাজে যোগদানের হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। তাই সরাসরি নগদ হস্তান্তরে যে এ রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মহিলার হাতে অল্প হলেও কিছু টাকা আসছে তার সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কোন দল এর থেকে কী ফায়দা ওঠালো সে প্রশ্ন তাই অবান্তর হয়ে যায়।     

তবু প্রশ্ন থেকে যায়। নগদ হস্তান্তর না মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবা প্রদান? যেমন স্বাস্থ্য বা শিক্ষা। কোন কোলে বাজেটের ঝোলটুকু বেশি টানা উচিত? প্রযুক্তির সুবিধার কারণে এখন প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি মানুষের কাছে নগদ পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পকে বলা যায় ‘নাগালে ঝুলন্ত ফল’। তাই রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকারও নাম বদলে (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার) টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে একে চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানুষের কাছে শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার শর্টকাট নেই। বরাদ্দ অর্থকে পরিষেবায় রূপান্তর ও তা গ্রহীতার কাছে পৌঁছনোর পথটি দীর্ঘ ও জটিল, কারণ এই প্রক্রিয়াটিতে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে ব্যবস্থাপনা আর বিপুল সংখ্যক মানুষ যাঁরা পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত। তাই আশঙ্কা হয়, নাগালে ঝুলন্ত ফলের আকর্ষণে অন্য পরিষেবার ব্যবস্থাপনার দিকটি আড়ালে না চলে যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কারক ভূমিকাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যা একজন মহিলাকে করণ-সক্ষমতা (এজেন্সি ফ্রিডম) দিতে পারে। এরকম প্রকল্পের সঙ্গে দাতা-গ্রহীতার অনুষঙ্গটি লেপটে থাকলেও করণ-সক্ষমতা যে ঘটেছে তার প্রমাণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের অনেকেই ভোটটি দিয়েছেন নিজের পছন্দমতো। প্রকল্পের কারক ভূমিকাটি পূর্ণ বিকশিত হতে পারত যদি এর পরিপূরক মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবাগুলিরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটত। 

উৎপাদন পরিকাঠামো না সরাসরি কল্যাণমুখী ব্যয় – কেরলে গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের দশকে এ নিয়ে তীব্র তর্ক চলেছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রভূত উন্নতির কারণে কেরল তার আগেই বিশ্বের নজর কেড়ে ফেলেছে। তখন চিন্তা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন তেমন বাড়ছে না, অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়েই চলেছে। এই উন্নয়নের ‘মডেল’ কি সাসটেনেবল? অনেক উদ্বেগের দিন পেরিয়ে এই শতকের গোড়ায় এসে দেখা গেল, সে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার মন্দ নয়। একে বলা যায় মানবোন্নয়নের ‘উৎকর্ষ চক্র’। দারিদ্রের দুষ্টচক্রের বিপরীত। অর্থাৎ, মানব উন্নয়নে অতীতের মনোযোগের ফলে ভবিষ্যতে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব হল, যা থেকে আরও মানব উন্নয়ন সম্ভব, যা থেকে আবার বৃদ্ধি। অনেকেই মানলেন, আবার অনেকে বললেন বড় শিল্প না হলে সংকট কাটবে না অত সহজে। কিন্তু এই বিতর্ক থেকে যা উঠে এল তা হল, কল্যাণমুখী ব্যয়ও এক চক্কর ঘুরে অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়, আর সেখানে বড় শিল্প থাকতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সেই ব্যয় হতেই হবে সেই সব ক্ষেত্রে যা সরাসরি মানবোন্নয়ন ঘটাতে পারে। 

পশ্চিমবঙ্গকে এই উৎকর্ষ চক্রে সামিল করতে গেলে শিক্ষার প্রতি নিদারুণ অবহেলা থেকে সরে আসতেই হবে। 

শেষ...
প্রথম অংশের লিঙ্ক:


Tuesday, 19 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি (১)

একটি নির্মোহ মূল্যায়ন

অচিন চক্রবর্তী



(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে থাকছে রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে থাকবে বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক

প্রথম অংশ 


পশ্চিমবঙ্গের আর্থনীতিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের অবস্থা নিয়ে অনেক মানুষকেই নিরন্তর উদ্বেগ ও হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা যাচ্ছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের কারণগুলির মধ্যে রাজ্যের অর্থনীতির অনগ্রসরতাকে অন্যতম বলে মনে করেছেন অনেকেই। জনপরিসরে আলোচনায় সাধারণত যে বিষয়গুলি প্রতিনিয়ত উঠে আসত তার তালিকাটি মোটামুটি এ রকম: 

এক) শিল্প হচ্ছে না, ফলত কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বেকারত্ব ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, কাজের খোঁজে মানুষ বাধ্য হচ্ছে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে; 

দুই) মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি অর্থনীতি ও সমাজের নিদারুণ ক্ষতি করছে; 

তিন) সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে-- একদিকে স্কুলছুট বাড়ছে অন্যদিকে যাঁদের আর্থিক ক্ষমতা আছে তাঁরা ছেলেমেয়েদের বাইরে পাঠাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার জন্যে; 

চার) অর্থনীতির সুস্থায়ী উন্নতি ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার তাৎক্ষণিক ‘জনমোহিনী’ নীতির আশ্রয় নিচ্ছে। 

উন্নয়নের যে আখ্যান এই ক্রমবর্ধমান তালিকা থেকে উঠে আসে তাতে ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যের ছাপ এতটাই প্রকট যে বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকার পথে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু একটি দেশের অঙ্গরাজ্য, স্বভাবতই জানতে ইচ্ছা করে আপেক্ষিক বিচারে পশ্চিমবঙ্গ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেই মূল্যায়নে ঢুকতে গেলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার বিকল্প নেই, যদিও যে কোনও বর্ণনায় বর্ণনাকারীর অল্পবিস্তর নিজস্ব চয়নের সম্ভাবনা থাকেই। ফলে, গেলাসটি অর্ধেক খালি না অর্ধেক ভর্তি সে তর্কের অবকাশ রয়ে যায় সদাই। 

মাথাপিছু আয় ও কৃষির কথা

“বর্বর প্রাচুর্য বলিতে যা বুঝায়, তাহার জাজ্বল্যমান চিত্র দেখিলাম রাসবিহারীর সংসারে। যথেষ্ট দুধ, যথেষ্ট গম, যথেষ্ট ভুট্টা, যথেষ্ট বিকানীর মিছরী, যথেষ্ট মান, যথেষ্ট লাঠিসোঁটা। কিন্তু কি উদ্দেশ্যে? ঘরে একখানা ভাল ছবি নাই, ভাল বই নাই, ভাল কৌচ-কেদারা দূরের কথা, ভাল তাকিয়া-বালিস-সাজানো বিছানাও নাই। দেওয়ালে চুনের দাগ, পানের দাগ, বাড়ীর পিছনের নর্দমা অতি কদর্য নোংরা জল ও আবর্জনায় বোজানো, গৃহ-স্থাপত্য অতি কুশ্রী। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে না, নিজেদের পরিচ্ছদ ও জুতা অত্যন্ত মোটা ও আধময়লা। গত বৎসর বসন্ত রোগে বাড়ীর তিন-চারটি ছেলেমেয়ে এক মাসের মধ্যে মারা গিয়াছে। এ বর্বর প্রাচুর্য তবে কোন্‌ কাজে লাগে? নিরীহ গাঙ্গোতা প্রজা ঠেঙাইয়া এ প্রাচুর্য অর্জন করার ফলে কাহার কি সুবিধা হইতেছে? অবশ্য রাসবিহারী সিং-এর মান বাড়িতেছে।" (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আরণ্যক, বানান অপরিবর্তিত)।

প্রাচুর্য নয়, তা ‘কোন্‌ কাজে লাগে’ সেটি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রার মান নিয়ে এই যে প্রশ্ন তুলেছেন বিভূতিভূষণ, অমর্ত্য সেনের প্রশ্নটিও অনেকটা সে রকমই। একজন মানুষ কেমন আছেন তা কোন কোন সূচকে বিচার করতে হবে, সে বাবদে সহমত হওয়া মুশকিল। এখানে দেখছি লেখক বিভূতিভূষণের মাপকাঠিটি রাসবিহারী সিং-এর মাপকাঠি থেকে একেবারেই আলাদা। শুধু তাই নয়, লেখকের মূল্যায়নে প্রচ্ছন্ন যে ইঙ্গিতটি পাচ্ছি তা হল, নিরপেক্ষ বিচারে তাঁর অবস্থানটিই উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু দুজন ব্যক্তির মূল্যায়নের মাপকাঠি যদি এতটাই আলাদা হয়, তাহলে কার বিচারটি নেব? রাসবিহারী সিং-এর বিচারে সবার উপরে ‘মান’, অর্থাৎ স্টেটাস। দুধ, গম, ভুট্টা, বিকানীর মিছরীর প্রাচুর্যর নিরিখে যে মান তাকে আবার বিভূতিভূষণ বলছেন ‘বর্বর’। আধুনিক কালে দেশের ধনীতম ব্যক্তির সীমাহীন প্রাচুর্যকে কেউ বর্বর বলছেন শুনি নি। পার্থক্যটি বোধহয় ওই একদিকে ‘নিরীহ-প্রজা-ঠেঙ্গানো’ আর অন্যদিকে শিল্পের কাণ্ডারি বিশেষণে, যদিও শিল্পের তথা উন্নয়নের ‘প্রয়োজনে’ মানুষকে উৎখাত করে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নেওয়ার সঙ্গে নিরীহ-প্রজা-ঠেঙ্গানো রাসবিহারী সিং-এর পার্থক্য সামান্যই। দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী মনে করিয়ে দেন মহাভারতে ভীষ্ম প্রাচুর্যের প্রদর্শনকে ‘নৃশংস’ বলেছেন, যা তিনি প্রয়োগ করতে চান মুকেশ আম্বানির ২৭ তলা বাড়ি এবং বেড়ে চলা বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রসঙ্গে। যুধিষ্ঠির ভীষ্মের কাছে জানতে চান, নৃশংস কাকে বলব? ভীষ্মের উত্তর, “যে উত্তম ভোজ্য, পেয়, লেহ্য আরও দামি দামি ভোগ্যদ্রব্য (না খেয়ে) চেয়ে থাকা মানুষদের মধ্যে বসে উপভোগ করে খায়, তাকেই নৃশংস বলা উচিত।" বিত্তের কুৎসিত প্রদর্শনকে ভীষ্ম বলছেন নৃশংস (ভাত কাপড়ের ভাবনা এবং কয়েকটি আটপৌরে দার্শনিক প্রয়াস)।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার আর্থনীতিক প্রগতির প্রাথমিক সূচক। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, ভারত সরকারের ভাষ্যে কিন্তু বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় আমরা পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে চলেছি, যা আসলে কিছুই বোঝায় না, যতক্ষণ না তাকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করছি। দেখা যাক নিকট অতীতে পশ্চিমবঙ্গে এই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার কী রকম হয়েছে। মৈত্রীশ ঘটক এবং তাঁর সহযোগীরা বেশ কিছুকাল ধরে এই পরিসংখ্যানের গভীরে ডুব দিয়ে সত্যিটা তুলে এনেছেন। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে মোটামুটি ২০০৫ থেকে। ১৯৯০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার ভারতের তুলনায় বেশি ছিল। বর্তমান শতকের প্রথম দশকের সঙ্গে দ্বিতীয় দশকের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, ভারতের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক দূরত্ব কিছুটা বেড়েছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে দেখছি, ২০২২-২৩-এ পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু বার্ষিক আয় হয়েছে ১,৪১,৩৭৩ টাকা, যেখানে মাঝারি ও বড় মিলিয়ে অন্তত দশটি রাজ্যে মাথাপিছু আয় দু লক্ষ টাকার বেশি। এখান থেকে অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়ার কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়। 

যদি তিনটি মূল ক্ষেত্রের বৃদ্ধির দিকে আলাদাভাবে নজর দিই, দেখব, পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধি ভারতের তুলনায় গত তিন দশকেই বেশি হয়েছে, কিন্তু শিল্প ও সেবা সম্পর্কে তা বলা যায় না। যেমন, ১৯৯০-এর দশকে তিন ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার ভারতের তুলনায় বেশি হয়েছিল। তারপর এই শতকের প্রথম দশকে শিল্পক্ষেত্রের বৃদ্ধির হার আপেক্ষিকভাবে কম হল, কিন্তু সাম্প্রতিকতম দশকে শিল্প ও সেবা উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ বৃদ্ধির হারে পিছিয়ে পড়েছে। 

একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে আছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিকতম দশকে (বলা ভাল, ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮-র মধ্যে) আবার দেখা যাচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু ভোগব্যয়ের বৃদ্ধির হারে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। বস্তুত এই সময়কালে সারা ভারতে মাথাপিছু ভোগব্যয় কিছুটা কমেছে, যা অভূতপূর্ব! সাড়ে চার দশকের মধ্যে সেই প্রথম গড়পড়তা ভারতীয় পরিবারে মাথাপিছু ব্যয় কমল, আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়ল। এই মাথাপিছু ভোগব্যয়কে জীবনযাত্রার গড়পড়তা মান হিসাবে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে কৃষি উৎপাদন ভাল হওয়ার সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার মধ্যে এখানে একটি আপাত সম্পর্কের ইঙ্গিত থাকলেও মনে হয় প্রকৃত সম্পর্কটি ক্ষীণ। কারণ, জাতীয় নমুনা সমীক্ষা থেকে আবার এও দেখা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে একটি ‘কৃষক’ পরিবারের আয়ের অনেকটাই আসে কৃষির বাইরে থেকে। তাই বলা যায়, এ রাজ্যে কৃষি আপেক্ষিকভাবে উৎপাদনশীল হলেও কৃষকদের তা থেকে পর্যাপ্ত আয় হয় না। তাহলে ধরে নিতে হবে কৃষির বাইরে বিবিধ কাজ থেকে আয়ের সংস্থান হচ্ছে। যদিও গড় ভোগব্যয় বেশি হারে বৃদ্ধি থেকে সরাসরি বলা যায় না দারিদ্র বেশি হারে কমেছে, দুইয়ের মধ্যে খানিক সম্পর্ক পাওয়া যায়। আবার পরিবারে অর্থাগম এবং ভোগ্যদ্রব্যের উপরে তার ব্যয়ের পরিমাণ জানা থাকলেই বলে দেওয়া যাবে না পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রার মান কেমন। ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি মিটছে কি না তা আলাদা করে জানা দরকার। কারণ, কেনার ক্ষমতা ছাড়া অন্যভাবেও মিটতে পারে সেগুলি। যেমন, পানীয় জল, শিক্ষা, বা স্বাস্থ্যসেবা। দুটি পরিবারের মাথা পিছু ব্যয় সমান হলেও স্বাস্থ্যসেবা উপলব্ধের সুযোগ তাদের সমান নাও হতে পারে। তাই দারিদ্রের মাপজোক নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁদের একদল অর্থাভাবজনিত দারিদ্রের পরিবর্তে বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচকের পক্ষে সওয়াল করেন। মাত্রাগুলি হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার অন্যান্য আবশ্যিক বিষয়। সম্প্রতি নীতি আয়োগ একটি বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক ব্যবহার করে দেখিয়েছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২১-এর মধ্যে ভারতবর্ষে দারিদ্রমুক্তি হয়েছে সাড়ে তেরো কোটি মানুষের। আবার সেই একই সূচক অনুসারে দেখছি, ২০১৯-২১-এ গুজরাত আর পশ্চিমবঙ্গের বহুমাত্রিক দারিদ্র প্রায় সমান – যথাক্রমে ১১.৬৬ শতাংশ আর ১১.৮৯ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ২০১৫-১৬ থেকে বহুমাত্রিক দারিদ্র কমেছেও বেশি পশ্চিমবঙ্গে, যদিও গুজরাতের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণেরও বেশি! এই চমকপ্রদ বৈপরীত্যকে উল্লেখ করতেই হয়। 

শিল্পের ভূত ভবিষ্যৎ

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প যে একেবারেই হয় নি তা কিন্তু নয়। তবে আপেক্ষিক বিচারে সেই পিছিয়ে পড়ার গল্প। কেন্দ্রীয় শিল্প মন্ত্রকের তথ্য অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২০-র মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ১৩৮টি বড় শিল্প স্থাপিত হয়েছে। একই সময়কালে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা – এই আটটি রাজ্যের প্রত্যেকটিতে এর থেকে বেশি শিল্প হয়েছে। এই তথ্য দেখলে উদ্বেগ স্বাভাবিক। শিল্পে বড় বিনিয়োগের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ অনেক রাজ্য থেকে পিছিয়ে আছে। কিন্তু ভুললে চলবে না, ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের হিসেব এর মধ্যে নেই। সে হিসেব সহজে পাওয়াও যায় না। আর সে জন্যেই হয়তো যাবতীয় আলোচনা সমালোচনা টাটা থেকে তেলেভাজার আখ্যান-এ আটকে থাকে। সর্বশেষ যে তথ্য পাচ্ছি তা ২০১৫-১৬-র জাতীয় নমুনা সমীক্ষা থেকে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংখ্যা সে সময়ে ছিল প্রায় ৮৯ লক্ষ, যা সর্বোচ্চে থাকা উত্তরপ্রদেশের থেকে মাত্র এক লক্ষ কম। দেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ১৪ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। ২০১২ থেকে ২০২০-র মধ্যে শিল্পক্ষেত্রে যে ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি হতে দেখা যাচ্ছে তার অনেকটাই যে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে এসেছে তা আন্দাজ করা যায়। আর যে শিল্পক্ষেত্রে প্রায় এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষ নিযুক্ত তাকে উড়িয়েই বা দিই কী করে! 

কিন্তু সমস্যাটি কর্মে নিযুক্তির সংখ্যা থেকেও তার মর্মবস্তু নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প উৎপাদনের একটি প্রধান সমস্যা শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম, যার কারণ পুঁজির নিযুক্তি কম। একজন গড়পড়তা কর্মী যতটা মূল্য যোগ করে মোট উৎপাদনমূল্যে, যাকে বলে ‘ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কার’, সেই নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় গড় থেকে পিছিয়ে আছে। এই ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কারের হিসেবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কম হলে শ্রমিকদের আয় তেমন বাড়তে পারে না। যদিও এটি বেশি হলে যে শ্রমিকের মজুরি বেশি হবেই তার নিশ্চয়তা নেই; শেষমেশ তা নির্ভর করে পুঁজির মালিকের সঙ্গে দর কষাকষিতে শ্রমিকরা কতটা সফল হচ্ছে তার উপর, আর তাকে সীমায়িত করে রাখে ওই ভ্যালু অ্যাডেড পার ওয়ার্কার। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা যে অন্য রাজ্যের তুলনায় বেশি তা নয়, এ রাজ্যে শ্রমিকের আয় অপেক্ষাকৃত কম।          

ক্রমশ...

দ্বিতীয় অংশের লিঙ্ক:

https://ekakmatra2013.blogspot.com/2026/05/blog-post_20.html



Friday, 15 May 2026

পরীক্ষার স্বচ্ছতা রসাতলে

নীট দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



কোথাও চাকরি তো কোথাও ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি। 'ডবল ইঞ্জিন' সরকারের জমানাতেও... হয়েই চলে।.২০২৪'এর পর ২০২৬। নির্দিষ্ট করে বললে, ঠেকানোর সদিচ্ছাই নেই। নইলে এসব 'করিয়ানরা' সরকার বাহাদুরের বদান্যতায় প্রাইজ পোস্টিং পান! এই তো অচ্ছে দিন! 

এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁসে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের স্নাতক স্তরের ডাক্তারির প্রবেশিক পরীক্ষা নীট (ইউজি) হয়েছিল গত ৩ মে। ৯ দিন কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশ জুড়ে চলতি বছরের নীট (ইউজি) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মোদী সরকারের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা বাতিলের কথা ঘোষণা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। 

কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের ভার সিবিআইকে দিয়েছে। সিবিআই তদন্তও শুরু করে দিয়েছে। যারা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে বিজেপির এক নেতাও আছে। যদিও বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দেওয়াটাই এখন প্রশাসনিক দস্তুর। বিজেপি যে জড়িত, এটা আমার কষ্টকল্পিত নয়, রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত এক্স-এ একটি পোস্টে দাবি করেছেন, 'নীট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত দীনেশ বিনওয়াল ভারতীয় জনতা পার্টির একজন কর্মকর্তা।' গেহলত অভিযুক্তের একটি পোস্টারের ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে জয়পুর গ্রামীণ এলাকার বিজেওয়াইএম-এর জেলা সম্পাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি মুকেশ দধিচ বলেছেন, দলে বিনওয়ালের কোনও পদ নেই। 

এবার নীট (ইউজি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের এপিসেন্টার রাজস্থান। বিজেপি শাসিত রাজস্থান। যেখানে বিরোধীদের ট্যাঁফোঁ করতে দেওয়া হয় না। আমি নিশ্চিত, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলত হইচই না করলে আরও অনেক কিছুর মতো এই কেলেঙ্কারিও চাপা পড়ে যেত। এতদিনে হয়তো প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলও প্রকাশ পেয়ে যেত; কেননা, ৩ মে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা উঠে এসেছিল কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। বাংলা জয়ের গর্বে বলীয়ান বিজেপি সেই বিজয়বার্তা সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার ধামাকায় নীট কেলেঙ্কারি চাপা দিয়ে ফেলেছিল প্রায়। তবে শেষরক্ষা হল না। পরীক্ষার ৮ দিন পর ১১ মে এনটিএ জানিয়েছে, পরীক্ষা বাতিল আর ১২ মে জানিয়েছে, ফের নীট (ইউজি) পরীক্ষা কবে তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। কবে অ্যাডমিট কার্ড পাওয়া যাবে ও পরীক্ষার সময়সূচিও জানিয়ে দেওয়া হবে। নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। নতুন করে পরীক্ষার ফি-ও দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। কী মহানুভবতা! 

লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী যথার্থই নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসে কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় তোপ দেগে এক্স-হ্যান্ডেলে রাহুল লেখেন, 'নীট ২০২৬ সালের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। ২২ লাখের বেশি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নকে দুর্নীতিগ্রস্ত বিজেপি সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাবারা তাঁদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঋণ নিয়েছেন, মায়েরা তাঁদের গয়না বেচে দিয়েছেন। লাখ লাখ বাচ্চারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেছে। বদলে কী পেল তারা? প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারের গাফিলতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগঠিত অপরাধ। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রত্যেকবার পেপার মাফিয়ারা বেঁচে যায় আর সৎ পড়ুয়ারা সাজা পায়। ফের লাখ লাখ পড়ুয়াকে মানসিক চাপ, আর্থিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। যদি কারও ভাগ্য কঠোর পরিশ্রমের বদলে অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাদের যোগাযোগ কতটা তার উপর নির্ভর করে, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? প্রধানমন্ত্রীর 'অমৃতকাল' দেশের জন্য বিষ কালে পরিণত হয়েছে।'  

সর্বভারতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও স্বচ্ছতা আজ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে সিবিআই'এর প্রধান কাজটিই হবে, এই দুর্নীতির মাথাদের বাঁচানো। অতীতে বহু তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআই এই কাজটাই করে এসেছে। আর লক্ষ করবেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এ ব্যাপারে কোনওরকম হইচই করছে না। টিভির পর্দায় কোনও চিৎকারজীবী বলবে না, 'দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? যুব সম্প্রদায়ের তো চাকরি নেই। ভারতের বেকারত্বর হার সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। ডাক্তারি কোর্সে পড়তে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েরা টাকা খরচ করছে। এবছর নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। কেন্দ্রীয় সরকার কী বলছে? ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি কি প্রশ্নপত্র নিলামে চড়িয়ে দিল?' কেউ দাবি করবে না, কেন্দ্রকে এর জবাব দিতে হবে। খোলসা করতে হবে, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, থাকলে সেই পৃষ্ঠপোষক কারা? 

নীট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে গোটা দেশে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। বেনজির অনিয়মের অভিযোগে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন  ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, দেশ জুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। খাস রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই প্রথম নয়। নীটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশ জুড়ে শোরগোল পড়েছিল। সে সময় অভিযোগ ওঠে, ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের ওয়েসিস স্কুল থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ওই স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মীকে গ্রেফতার করে সিবিআই। সিবিআই নীটের বেশ কিছু আধপোড়া প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছিল। সেই প্রশ্নপত্র খতিয়ে দেখার পর ঠিক কোন কেন্দ্র থেকে ফাঁস হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সিবিআই তখন দাবি করেছিল, পঙ্কজ কুমার ওরফে আদিত্য ওরফে সাহিল নামে এক যুবকের সঙ্গে মিলিত ভাবে ওয়েসিস স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ ও এক কর্মী প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। এবারও তদন্তর মতিগতি দেখে ২০২৪ সালের কথাই মনে পড়ছে। 

রিসাইকল অফ মেমোরি যেন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত। আর এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে বেশ কিছু 'ভদ্রবিত্ত' মানুষের নাম। যেমন মনে পড়ছে সুবোধ কুমার সিংয়ের কথা। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র প্রাক্তন এই প্রধানকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও বিস্ময়কর মোড় নিয়েছে। ১৯৯৭ ব্যাচের ছত্তিশগড় ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার সুবোধ কুমার সিং। আইআইটি রুরকির মতো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর ইগনু থেকে এমবিএ করা এই আধিকারিক এক সময় প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খনিজ সম্পদ নিলামে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে সাফল্যের জন্য তিনি জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে পুরেছিলেন। ২৯ বছরের কেরিয়ারে ৩০টির বেশি সম্মানীয় পদে কাজ করেছেন। মোদী জমানায় তাঁর কেরিয়ার গ্রাফ দেখবার মতো। ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি এনটিএ-র ডিরেক্টর জেনারেল পদে আসেন। আর তিনি যখন এই দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই যেন দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর কার্যকালেই ভারতের কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষামূলক কেলেঙ্কারিগুলো দানা বাঁধে। ২০২৪ সালের নীট-ইউজি এবং ইউজিসি-নেট পরীক্ষার সময় যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। নীট পরীক্ষায় দেড় হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীকে বিতর্কিতভাবে 'গ্রেস মার্কস' দেওয়া, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নেট পরীক্ষা বাতিল করা এবং বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রের জাল বিস্তার— সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনটিএ তখন কেবল অস্বীকারের রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে সেই বছরের জুন মাসে মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রক স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এটি একটি 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা'। চাপের মুখে ২০২৪ সালের ২২ জুন সুবোধ কুমার সিংকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে 'কম্পালসরি ওয়েট'-এ পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা হয়, লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে হয়তো কঠোর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে মোদী সরকার যেন স্বচ্ছতার পথে হাঁটল। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুলে যায় বা জানেই না, আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা এক জটিল সমীকরণ নিয়ে চলে। তাই সুবোধের ওই অপসারণটি আদৌ কোনও শাস্তি ছিল না, ছিল আইওয়াশ। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীনই ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছাত্র ও অভিভাবক মহলে এটি 'শাস্তির বদলে পুরস্কার' হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। শুধু ওইটুকুই নয়, ২০২৪ সালের শেষে সুবোধ কুমার সিং কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন ছেড়ে তাঁর পুরনো ক্যাডার ছত্তিশগড়ে ফিরে যান। সেখানে তখন বিজেপির নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মোদী-শাহর আস্থাভাজন বিষ্ণু দেও সাই। সেই সরকার গঠন হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি 'মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব' (Principal Secretary) পদে বসানো হয়। প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এই পদটি কতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন তা নিশ্চয়ই পাঠককে বলে দিতে হবে না। শুধু এটুকুই নয়, সুবোধ সিংয়ের অগ্রগতি চলছেই। ২০২৬ সালে তাঁর পুরস্কারের বহর আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের ৬ মে এক সরকারি নির্দেশে তাঁকে ছত্তিশগড় রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভেবে দেখুন, ঠিক কোন সময় তাঁর ঘাড়ে এই বিশেষ দায়িত্ব বর্তাচ্ছে! যখন ২০২৬ সালেও নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে দেশ উত্তাল, সেখানে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানের এমন লাগামহীন উন্নতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, গেরুয়া ভারত কোন রসাতল অভিমুখী। সুবোধ সিং নাম্নী এই আধিকারিকের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ ছিল, আজ তিনি একটি গোটা রাজ্যের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বাজেট আর নীতি নির্ধারণের সর্বেসর্বা। যেখানে এটা ২০২৪-এর দুর্নীতির ফসল, সেখানে ২০২৬ সালের এই নতুন পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুবোধ কুমার সিংয়ের পদোন্নতি এক অশুভ সংকেত বহন করছে। 

মনে রাখবেন, পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ভারতে অন্তত ১৫টি বড় সরকারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ কোটি পরীক্ষার্থী।


Saturday, 9 May 2026

এবারের ২৫ বৈশাখ

'তাসের দেশ' ও সেই পদযাত্রা

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'তাসের দেশ' লিখেছিলেন। উৎসর্গ করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। শতবর্ষ পানে অগ্রসরমান এই নৃত্যনাট্যটি এবারের ২৫ বৈশাখে তাসের দল'কে মনে করাতে পারে। 

২০১২ সালের ২৫ বৈশাখের আশপাশে 'একক মাত্রা' একটি অনবদ্য সংখ্যা প্রকাশ করেছিল যার প্রচ্ছদ বিষয় ছিল 'অন্য রবীন্দ্রনাথ'। বৈচিত্র্য ও গভীরতার গুণে সেই সংখ্যার এত কদর হয়েছিল যে তার আর অবশিষ্ট কপি পড়ে নেই। সেবার ছিল কবিগুরুর সার্ধশতবর্ষ কাল।

তিনি এইভাবেই বারে বারে ফিরে আসেন।

এবারের ২৫ বৈশাখ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বাংলা ৩০ আশ্বিন, ১৩১২) দিনটিকেও মনে করাতে পারে। কারণ, বাংলার অগুনতি মানুষ আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩, ৯ মে ২০২৬) ১৬ অক্টোবর দিনটিকে স্মরণ করে আবারও হাঁটার প্রস্তুতি নিয়েছেন সেই পথ ধরে যে পথে তিনি গঙ্গার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো ছুঁয়ে পৌঁছেছিলেন নাখোদা মসজিদ অবধি। তাঁর অপার কর্মসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ তো ব্যাপ্ত ও সর্বজনীন; মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার সমস্ত আবেদনেই তিনি আছেন। ১৬ অক্টোবর (১৯০৫) ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিন। সেই দিনটিকে তিনি এক অনন্য প্রতিবাদী রূপ দেন। ডাক দেন 'অরন্ধন' ও 'রাখিবন্ধন' উৎসব পালনের। সেদিন ঘরে ঘরে উনুন জ্বলবে না এবং একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে এই বার্তা দেওয়া হবে যে, ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশ ভাগ করলেও বাঙালির হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করতে পারবে না।

সেদিন ভোরে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাবেশ গঙ্গার জগন্নাথ ঘাটে (মতান্তরে, বাগবাজার বা সংলগ্ন কোনও ঘাট) সমবেত হয়। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল গঙ্গাস্নানের মধ্য দিয়ে। সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল উক্ত ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে। স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে রবীন্দ্রনাথ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। যখন মিছিল শুরু করেন, তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারণ ধুতি, গায়ে চাদর এবং পায়ে কোনও জুতো ছিল না। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তাঁরই রচিত সেই কালজয়ী গান: 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।'

মিছিল উত্তর কলকাতার বিভিন্ন গলি ও প্রধান রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে সামনে হেঁটে একেকজন পথচারী, রিকশাচালক এবং সাধারণ মানুষের হাতে রাখি বেঁধে দিচ্ছিলেন। কোনও ভেদাভেদ নেই, সবার লক্ষ্য একটাই, অখণ্ড বাংলা। মিছিল চিৎপুর রোড হয়ে নাখোদা মসজিদের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাপথের সবচেয়ে আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল যখন মিছিলটি চিৎপুর রোডের নাখোদা মসজিদের সামনে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন চিত্তে মসজিদের ভেতরে এবং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম মৌলবি ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের দিকে এগিয়ে যান। প্রথা ভেঙে তাঁদের কবজিতে রাখি বেঁধে দেন। এই অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মিছিল যখন এগোচ্ছিল, তখন কেবল পুরুষরাই নন, বাড়ির অন্দরমহল থেকে মহিলারাও জানলা ও বারান্দা দিয়ে উলুধ্বনি দিচ্ছিলেন এবং শাঁখ বাজাচ্ছিলেন। অনেকেই রাস্তার ওপর নেমে এসে মিছিলে যোগদান করেন। জনশ্রুতি আছে, স্বদেশি তহবিলের জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের যথাসর্বস্ব দান করছিলেন। এমনকি রাস্তার ধারের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— যারা হয়তো জানতেনও না যে রবীন্দ্রনাথ কে— তাঁরাও কবির বাড়িয়ে দেওয়া হাতের রাখি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন। মিছিলটি যখন একটি আস্তাবলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে কর্মরত সহিসদের দেখে রবীন্দ্রনাথ থমকে দাঁড়ান, নিজ হাতে তাদের হাতেও রাখি বেঁধে দেন।

পদযাত্রার শেষে সেই উত্তাল জনসমুদ্র এসে জমায়েত হয় আপার সার্কুলার রোডে (বর্তমান আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) অবস্থিত ফেডারেশন হল প্রাঙ্গণে। সেখানে আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্বে এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আনন্দমোহন বসু উপস্থিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ 'বিজয় সম্মিলনী'র গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং বাংলার অখণ্ডতার শপথ নেন। তিনি তো কেবল নিভৃতচারী কবি নন, বরং জাতির দুর্দিনে একজন দক্ষ সেনাপতি ও পথপ্রদর্শক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেদিন পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, সেদিন মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা এবং ঐক্য তিনি দেখেছিলেন, তা কলকাতার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। সমগ্র শহরটি যেন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিল।

আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩) আবারও সেই একই পথ ধরে হাঁটবেন শয়ে শয়ে মানুষ। তেমনই ভেবেছেন ও প্রস্তুতিও নিয়েছেন। অন্তত ১২০ বছর পর। হয়তো গাইবেন 'বাংলার মাটি বাংলার জল...'। 



 


Friday, 1 May 2026

ঘরবন্দী শ্রম

নারীর শ্রম আজও অদৃশ্য কেন? 

কৌশিকী ব্যানার্জী



ভারতের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার যে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্ন ও ক্রমহ্রাসমান, তা নিয়ে চর্চা বহুদিনের। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও প্রজনন হারে হ্রাসের ফলে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ বিষয়ে ক্লাউদিয়া গোল্ডিন-এর (১৯৯৫) একটি বিখ্যাত তত্ত্ব ‘feminization-U hypothesis’-এর কথা বলতেই হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের সম্পর্কটি একটি U-আকৃতির বিন্যাস অনুসরণ করে। অর্থাৎ, অর্থনীতি যখন কৃষি থেকে শিল্প খাতে (নিম্ন থেকে মধ্যম আয়) রূপান্তরিত হয়, তখন নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ (Female Labour Force Participation) প্রাথমিকভাবে হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে শিক্ষার স্তর, সেবা খাত ও মজুরি বৃদ্ধির সাথে সাথে (উচ্চ আয়) তা আবার বৃদ্ধি পায়। তবে ভারত এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম, এখানে সম্পর্কটি উল্টো-U আকৃতির। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ বৃদ্ধি, নিম্ন প্রজনন হার এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার হতাশাজনকভাবে নিম্নমুখী ও হ্রাসমান। কৃষিক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হ্রাস, যার সাথে অন্য খাতে কর্মসংস্থানের আনুপাতিক বৃদ্ধি না ঘটা, শিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির দুষ্প্রাপ্যতা এবং কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য সুগম রাস্তা ও গণপরিবহনের অভাবকেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন। 

গ্রামীণ ভারতে এ ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়েছে: NSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; অন্যদিকে, শহুরে ভারতে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ। কারণস্বরূপ: 'আয় প্রভাব', অর্থাৎ, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির কারণে নারীদের কর্মজগৎ থেকে সরে দাঁড়ানো, কিংবা শিক্ষার হারবৃদ্ধির ফলে কর্মজগতে দেরিতে প্রবেশ বা কর্মস্থল, পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানি ও অপরাধ এবং সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব। কিন্তু, অশ্বিনী দেশপাণ্ডে ও জিতেন্দ্র সিং'এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে পতনের মূল কারণ, গ্রামীণ নারী, বিশেষ করে গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার হ্রাস পাওয়া। অবশ্য এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, জনসংখ্যার অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি পরিবারগুলোর আয় অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিংবা, নারীদের অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের ওপর যৌন অপরাধের হার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে তাদের কর্মে যোগদানের হার কম কেন?

আর একটি পরিসংখ্যান দিলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে। ২০২৬ সাল অবধি ভারতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের (NEET) বাইরে থাকা মহিলাদের হার অত্যন্ত বেশি: ৩৯ থেকে ৪৪ শতাংশ। এর অর্থ, প্রতি ১০ জন তরুণীর মধ্যে ৪ জনেরও বেশি কর্মশক্তি বা শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠবে, এরা কোথায় রয়েছেন? এঁরা কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই গৃহস্থালি কাজে নিযুক্ত, যাকে বলে অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রম, যা জিডিপির হিসাব বহির্ভূত। এই মহিলারা পারিবারিক ব্যবসা, পশুপালন, কৃষিকাজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য করা হয় না, বরং তাঁদের ‘অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ হিসেবেই তালিকাভুক্ত করা হয়। জাতীয় সমীক্ষাগুলিতে বলা হয়েছে, কাজ যদি নারীদের নিজেদের বাড়িতে কিংবা বাড়ির কাছাকাছি সহজলভ্য হয়, তবে তারা করতে আগ্রহী।

দেশপাণ্ডে তাঁর আর একটি গবেষণাপত্রে এইসব অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রমে নিযুক্ত মহিলাদের কর্মকাণ্ডকে ‘ব্যয় সাশ্রয়ী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা বলেছেন। কারণ, তাঁদের অবেতন শ্রম পরিবারের শ্রমব্যয় হ্রাস করছে। কিন্তু তাঁদের এই কাজ প্রচলিত অর্থনৈতিক উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃত নয়। শুধু পারিবারিক ব্যবসা বা কৃষিকাজ নয়, এরা অবেতনভোগী পরিচর্যা ও বিভিন্ন সাংসারিক কাজেও যুক্ত, যার অন্তর্ভুক্ত শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাপ্তবয়স্ক এবং অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা প্রদান, যেমন, খাওয়ানো, প্রাত্যহিক জীবনযাপনের কাজে সহায়তা করা, চিকিৎসার প্রয়োজনে পাশে থাকা এবং পরিচর্যা-সংক্রান্ত অন্য যে কোনও প্রয়োজন মেটানো। জনসংখ্যার বার্ধক্য ও ‘demographic dividend’ হ্রাসের ফলে আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব জুড়ে অবৈতনিক সেবা কাজের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি বা বাজার-ভিত্তিক সেবা অবকাঠামো ও পরিষেবার অভাব সম্ভবত নারীদের ওপর সেবাদানের বোঝা বৃদ্ধি করবে এবং পরিবার ও শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্যের দুষ্টচক্রকে আরও সুদৃঢ় করবে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোকে ব্যাহত করে। 

ভারতের ক্ষেত্রে অর্থনীতি বিরাট ক্ষতির মুখে। কারণ, এই মুহূর্তে দেশে সর্বাধিক কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে খুব কমসংখ্যক মহিলা ফর্মাল সেক্টরে স্থায়ী মজুরিভিত্তিতে কর্মরত। বেতনভুক ও অবৈতনিক— উভয় প্রকারের কাজের ক্ষেত্রেই ভারতে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্রা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। এখানে শক্তিশালী পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যাপক প্রচলন। টাইম ইউজ সার্ভে (Time Use Survey) বলছে, ভারতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে দ্বিগুন সময় 'অবৈতনিক সেবা কাজে' এবং তিন গুন বেশি সময় 'অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে' ব্যয় করেন। অধিকন্তু, ভারতে অবৈতনিক সেবা কাজের বোঝা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর (৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব) সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে হিসেব করা হয়েছে, যা বিশ্ব গড়ের চেয়ে ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তাছাড়া, ৮৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের সংখ্যা— যাদের সাধারণত অত্যন্ত উচ্চমাত্রার প্রত্যক্ষ সেবার প্রয়োজন হয়— ২০৫০ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। 

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট জার্নাল'এ ২০২৪-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ভারতে অবেতনভুক্ত পরিচর্যা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকট লিঙ্গ বৈষম্যকে তুলে ধরা হয়েছে। গড় সময়ের অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিদিন পরিচর্যার কাজে এক ঘণ্টা বেশি ব্যয় করলে নারীরা তাদের মোট কর্মসংস্থানজনিত সময় ১.১৩ ঘণ্টা কমিয়ে দেন; পক্ষান্তরে পুরুষেরা এই সময় কমান মাত্র ১৬ মিনিট (যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যহীন)। নারী এবং পুরুষেরা তাদের স্ব-কর্মসংস্থানজনিত (self-employment) সময় যথাক্রমে ১৮ মিনিট এবং ১.২ মিনিট কমিয়ে দেন। এমনকি কর্মরত মহিলারাও দৈনিক ৩.৫ থেকে ৪.৮ ঘন্টা গার্হস্থ্য শ্রম দিয়ে থাকেন যার এক-চতুর্থাংশ সময় পুরুষরা দেন। ভারতে কোভিড মহামারির সময় নারীদের ওপর গৃহস্থালি কাজের বোঝা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ভারতে যে সব মেয়েরা পরিচর্যা কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের অন্যান্য সাংসারিক কাজেও নিযুক্ত করে দেওয়া হয়। কারণ, পরিবারের অসুস্থ বা নির্ভরশীল সদস্যদের এমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন হতে পারে যার প্রস্তুতির জন্য রান্নাবান্নায় অধিক সময় ব্যয় করতে হয়; কিংবা তাদের বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত চাহিদার কারণে ঘর পরিষ্কার ও কাপড় ধোয়ার কাজেও সময় ব্যয় করতে হতে পারে। ঘরোয়া কাজে এই বৈষম্য উন্নত দেশেও রয়েছে, যাকে ‘মাতৃত্বের দণ্ড’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আবার এর বিপরীত মতও রয়েছে যেখানে অবেতনভোগী পরিচর্যা কাজ সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি এবং দৈনিক ও আন্তঃপ্রজন্মগত ভিত্তিতে শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সমষ্টিগত অর্থনীতির সচলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে সেবা প্রদানের ফলে সেবা প্রদানকারীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বোঝা চাপতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, নিজের যত্ন নেওয়ার সময়ের অভাব, বিনোদনের অভাব, যা মানসিক চাপ বৃদ্ধি ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকি, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিম্নমান এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ; আর এসবই ঘটে ‘সময়  দারিদ্র্যে'র (time-poverty) দরুণ। এগুলো পরোক্ষভাবে বিরাট সামাজিক ব্যয় হয়ে দাঁড়ায়, যা মূলত মানব সক্ষমতা থেকে বঞ্চনা এবং শ্রমশক্তির স্বল্প ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়; আর এর ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বা ফলাফলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

বর্তমান ভারতে কয়েক কোটি অবেতনভুক্ত মহিলা শ্রমিক রয়েছে। এদের কাজের মূল্যায়ন বা অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে এলসনের (২০১৭) 3R Strategy- ‘Recognize, Reduce, Redistribute’ প্রয়োজন। তাছাড়া, লিঙ্গ-ভিত্তিক গতানুগতিক ধারণাগুলোকে বর্জন করে নারীদের ক্ষমতায়ন, গণপরিবহন থেকে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদান, সবেতন পরিচর্যা ছুটি, বাজারপ্রদত্ত সেবা পরিকাঠামো ও পরিষেবা, মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান কর্মক্ষেত্রে যোগদানের হার বাড়াতে পারে। মেয়েদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানসিকতার অনেক বদল হয়েছে। এবার লিঙ্গপ্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসে অবৈতনিক সেবা ও ঘরোয়া কাজের দুষ্টচক্র থেকে মেয়েদের বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়ে আলোচনা এতই কম যে তা স্বাধীনতার এত বছর পরেও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।


Tuesday, 21 April 2026

ইতিহাসে চোখ রাখুন

যখন স্বৈরাচারীর পতন আসন্ন

মালবিকা মিত্র



নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতন সম্পর্কে ঐতিহাসিক মার্খহ্যামের দুটি মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য-- Hitherto Napoleon Bonaparte fought the kings, but after 1806 he faced the nations.। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ, ইউরোপের রাজশক্তিগুলি যে বিপুল পরিমাণে জাতিসত্তাগুলিকে দমন করে রেখেছিল তাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ। নেপোলিয়ন এই জাতিসত্তাগুলির সামনে মুক্তিদাতা ও ত্রাতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা আশা করেছিলেন, নেপোলিয়ন তাঁদের মুক্ত করে রাজশক্তির পীড়নের নাগপাশ ছিন্ন করবেন। ফলে, নেপোলিয়ন গণ সমর্থন লাভে সক্ষম হয়েছিলেন। নেপোলিয়ন যখন এক একজন রাজার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাচ্ছেন, সেখানকার প্রজারা নেপোলিয়নকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে স্বাগত জানিয়েছেন। এটাই ছিল নেপোলিয়নের সাফল্যের চাবিকাঠি। 

কিন্তু নেপোলিয়ান যখন স্পেন অভিযানে গেলেন, স্পেনের জনগণের বিপুল সমর্থন অর্জন করলেন, তারপর তাঁরা হতবাক হয়ে দেখলেন, নেপোলিয়ন তাঁর ভাই জোসেফ'কে স্পেনের শূন্য সিংহাসনে বসালেন। স্পেনের জনগণের আশা ছিল, তাদের পছন্দের ফার্ডিন্যান্ড'কে নেপোলিয়ন ক্ষমতায় বসাবেন। এরপরে স্পেনের মাটিতে শুরু হয়েছিল জাতীয় প্রতিরোধ, যা নেপোলিয়নের ভাষায় 'স্প্যানিশ আলসার'। এই ক্ষত আর নিরাময় হয়নি। বরং ইউরোপের দেশে দেশে জাতিগুলি নেপোলিয়নকে ত্রাতার আসন থেকে অপসৃত করে। সর্বত্র নেপোলিয়ান বিরোধী প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। এই জাতীয় প্রতিরোধের সামনে নেপোলিয়নকে পরাজয় মেনে নিতে হয়। সেই কারণেই ঐতিহাসিক মার্খহ্যাম অমন উক্তি করেছেন। 

ইতিহাসকে স্মরণে রেখে আসুন, আমরা একটু সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকাই। এর আগেও ভারতীয় রাজনীতিতে বিহারের নালন্দা জেলার চাকুরির পরীক্ষার্থী মহারাষ্ট্রে গিয়ে অত্যাচারিত ও নিহত হয়েছে। তার জন্য বিহারে ট্রেন পুড়েছিল। অসমে বাঙালিরা অত্যাচারিত হয়েছে। কিন্তু খোলামেলা ভাবে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের ভাষায় 'ডাবল ইঞ্জিন' রাজ্যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা এর আগে দেখা যায়নি। বিজেপির শীর্ষ নেতা মোদী থেকে শুরু করে মাঝারি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গী, সকলেই চিঁড়ে খাওয়া, বাংলায় কথা বলা, লুঙ্গি-পাজামা পরিধান দেখে চিহ্নিতকরণ, এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের একটা আখ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন। সেই আখ্যান পল্লবিত হয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে শারীরিক পীড়ণ, বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ, হত্যা, এমনকি জবরদস্তি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া সহ সমস্ত রকম অত্যাচার শুরু হল। এক কথায়, বাংলা মানে বাংলাদেশ, অর্থাৎ বিদেশি। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিজেপি ও আরএসএস। 

এই প্রয়াসের বর্ধিত সংস্করণ হিসেবে বাংলায় একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচনী তালিকায় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হল (এসআইআর)। যেখানে নিবন্ধনের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট ভাবে বাঙালি ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রকাশ্য জেহাদ ঘোষিত হল। দেড় কোটি বাঙালির নাম বাদ দেওয়া হবে এমন আস্ফালনও শোনা গেল। বাস্তবে সেই আস্ফালনের মর্যাদা রক্ষার্থেই নানা ছলচাতুরির সঙ্গে প্রায় এক কোটি ঊনপঞ্চাশ লক্ষ নামকে চিহ্নিত করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত মানুষের গণ অসন্তোষ রাজপথকে মুখরিত করে। মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত উপস্থিত হয়ে দেড় কোটি সংখ্যাটাকে কমিয়ে এনে পঁয়ত্রিশ লক্ষের কাছাকাছি দাঁড় করান। আশা করা যায়, আরও বেশ কিছু মানুষকে তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। 

এসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি চেতনায় ও মননে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি ও তাদের আঞ্চলিক রাজাকার বাহিনী এবং পদলেহী নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে একটা অপর পক্ষের ধারণা জন্ম নিল। এই ঘটনা হিন্দি বলয়ের নেতাদের গ্রহণযোগ্যতাকে বাংলায় আরও তলানিতে নিয়ে গেল। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যের মানুষের একাংশ রাজ্য সরকার ও ক্ষমতাসীন তৃণমূল দলের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপিকে পরিত্রাতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৪-১৫ শতাংশ ভোট থেকে বিজেপির ভোট রাতারাতি ৩৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। কিন্তু বর্তমানে বিজেপির বাংলা ও বাঙালি বিরোধী জেহাদ সেই সমর্থনকে নিশ্চিতভাবে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলায় এবারের লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, এবারের লড়াই বাঙালি জাতি বনাম বিজেপি। এবারের নির্বাচনে বিজেপি যদি ২০ শতাংশ বা তার আশপাশ জনসমর্থন লাভ করে, আমি অবাক হব না। অন্যদিকে বাম জোট ও অন্যান্য শক্তিগুলি যদি ২৫-৩০ শতাংশ ভোট পায় তাহলেও আমি বিস্মিত হব না। আমি মনে প্রাণে চাই বাঙালির কাছে তৃণমূলের বিকল্প হয়ে উঠুক বাম শক্তি। এটা ইতিহাসের শিক্ষা। 

ইতিহাসের শিক্ষা কতটা নির্ভুল তার জলজ্যান্ত দ্বিতীয় প্রমাণ দেখান ঐতিহাসিক মার্খহ্যাম। তাঁর ওই রচনাতেই নেপোলিয়নের পতন সম্পর্কে লেখেন: Napoleon Bonaparte only succeeded because the major European powers were not united, but after 1806 the fourth coalition was in reality.। ইতিপূর্বে ফ্রান্সের উত্থানের বিরুদ্ধে ইউরোপের রাজশক্তিগুলি তিন তিনবার জোটবদ্ধ হয়েও পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্বে সেই জোট ভেঙে যায়। অস্ট্রিয়ার হাবসবার্গ সাম্রাজ্য, রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্য, প্রাশিয়া সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-- এই চার সাম্রাজ্য ছাড়াও ছিল আরও কিছু ছোট রাজশক্তি; সার্ডিনিয়া পিয়েডমন্ট, স্পেন, পর্তুগাল, পোপের সাম্রাজ্য, ডেনমার্ক, কিছু স্বাধীন জার্মান রাজ্য, নেপলস সিসিলি ইত্যাদি। এরা পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ছত্রভঙ্গ ছিল। কখনই জোটবদ্ধ দৃঢ় ভিত্তি হয়নি। 

কিন্তু ১৮০৬ সালে স্পেনের প্রতিরোধ সংগ্রাম এবং সেই সঙ্গে নেপোলিয়নের আটলান্টিক মহাসাগরে ইংল্যান্ডকে মহাদেশীয় অবরোধ ঘোষণা, এই অবরোধে ইউরোপের রাজশক্তিগুলিকে যোগদান করতে বাধ্য করা, এইসব মিলিয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ছোট বড় রাজশক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়। এই সময়েই চতুর্থ কোয়ালিশন জন্ম নেয়। এই চতুর্থ শক্তি জোটের হাতেই নেপোলিয়নের অন্তিম পরাজয় সূচিত হয়। একটির পর একটি যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয় এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অপরাজেয় কল্পকাহিনী ভাঙতে শুরু করে। স্পেনের ভিত্তোরিয়া ও ভিমিয়ারের যুদ্ধ থেকেই এই পতনের শুরু। 

INDIA ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA জোটকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে গঠিত ভারতীয় বিরোধী দলগুলোর একটি বড় বহুদলীয় জোট। কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে তৃণমূল কংগ্রেস, আপ, ডিএমকে, জেডিইউ, আরজেডি সহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ক্ষমতাসীন এনডিএ বিরোধী এই জোটের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব ও আঞ্চলিক স্তরে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এইসব বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের ফলে জোট কিছুতেই সুদৃঢ় হচ্ছিল না। কথায় বলে, ম্যান প্রোপোজেস অ্যানড গড ডিসপোজেস। ২০২৩ সালে পাশ হয়েছিল একটি মহিলা সংরক্ষণ বিল; যে বিলে সংসদে সমস্ত দল সমর্থন জানিয়েছিল, কেবলমাত্র আসাউদ্দিন ওয়াইসির দুজন সাংসদ ছাড়া। ওই বিলে সংসদে মোট সদস্যদের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু সরকার সেই বিল তখন কার্যকর করেনি। কারণ, পুরুষ প্রধান আরএসএস ও বিজেপি দল কখনই সংসদের নিজেদের আসন স্বেচ্ছায় মহিলাদের ছেড়ে দিতে চাইবে না। উল্লেখযোগ্য যে, কংগ্রেস তৃণমূল ডিএমকে এই সমস্ত দলে মহিলা সাংসদদের যে শতকরা হার তার তুলনায় বিজেপি সাংসদদের মধ্যে মহিলা সংসদের শতকরা হার সর্বনিম্ন। স্পষ্টই বোঝা যায়, মনুবাদী পুরুষতান্ত্রিক বিজেপি, সংসদে মহিলাদের সংরক্ষণ আইন পাস হলেও তা প্রচলন করতে চায় না। কারণ, সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বর্তমান সাংসদকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে মহিলাদের জন্য। 

আজ তিন বছর বাদে তাই নতুন করে ওই মহিলা সংরক্ষণ বিলে সংশোধনী আনা হল। এমন ভাবে এটি পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, এই সংরক্ষণ বিল ২০৩৪ সালের আগে কোনওভাবে চালু করা সম্ভব নয়। ঠিক এমন একটা সময়ে এই বিলের প্রয়োজনীয়তা ও তড়িঘড়ি সংসদের বিশেষ অধিবেশন কেন, একটু বুঝে নিই:

১) সকলের স্মরণে থাকবে, ২০২৪ সালে সরকার ব্যাপক দুর্নীতির সাথে যুক্ত নীট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছিল লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন। অনেকটা বিবাহ অনুষ্ঠানের সঙ্গে উপনয়নটা সেরে ফেলা, যাতে একটা খরচ বেঁচে যায়। আজ ঠিক সেই ছকেই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলি ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে লোকসভায় বিশেষ অধিবেশন ডেকে এই বিল তড়িঘড়ি আনা হল যা কার্যকর হবে ২০৩৪ সালে। উদ্দেশ্য ছিল, বিরোধীহীন লোকসভায় বিলটি পাস করে আসন্ন নির্বাচনগুলিতে মহিলা সংরক্ষণের ঢক্কানিনাদে সস্তায় বাজিমাত করা। 

২) কিন্তু হাজারও ব্যস্ততা সত্ত্বেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ম্যান্ডেট দিয়ে, হুইপ জারি করে, সাংসদদের সংসদের অধিবেশনে হাজির করে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই প্রথম একটি বিলের সার্বিক বিরোধিতা করে। দাবি করে, ইতিপূর্বে পাশ হওয়া সংরক্ষণ বিলটি হয় এখনই চালু করতে হবে যা আগামী ২০২৯'এর লোকসভা নির্বাচনে কার্যকর হবে। অন্যথায়, সংশোধনীকে তারা সমর্থন করবে না। অবশেষে বিলটির সংশোধনী আটকে যায়। 

৩) লক্ষ্য করুন, বিলটি পার্লামেন্টে পাশ হলে একদিকে নরেন্দ্র মোদি বুক ফুলিয়ে মহিলা সংরক্ষণের অন্যতম প্রাণপুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রজেক্ট করতেন। আটকে যাওয়ার পরেও একই ভঙ্গিতে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন -- তিনি মহিলাদের জন্য কত চিন্তাগ্রস্ত এবং বিরোধীরা কীভাবে মহিলা ক্ষমতায়ন চায় না! সংশোধনী পাস হলেও লাভ, না হলেও লাভ। অসম্ভব সুন্দর সুপরিকল্পিত টাইমিং। 

৪) সাম্প্রতিক এপস্টিন ফাইলে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্যের নাম যুক্ত আছে, এমনকি মোদীর দিকেও আঙ্গুল উঠেছে। তদুপরি বোঝার ওপর শাকের আঁটি সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ও মধু কিশওয়ার খোদ মোদিজীর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। এই পরিস্থিতিতে মহিলা সংরক্ষণ বিল এনে নিজেকে দেশের সর্বোচ্চ নারীবাদী হিসেবে  প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিল এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য। 

বিরোধীদের এই সাফল্য মোদি বিরোধী লড়াইয়ের পালে বাড়তি হাওয়া জোগাবেই। পরিস্থিতি অনুধাবন করে মোদীজি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ হিসেবে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ একটা দলীয় নির্বাচনী প্রচারের বক্তব্য রাখলেন। জাতির উদ্দেশ্যে সরকারি ভাষণে তিনি ৫৮ বার জাতীয় কংগ্রেসকে এবং দশবার তৃণমূল আর বহুবার তামিলনাড়ুর ডিএমকে দলকে সরাসরি গালমন্দ করলেন। দাসানুদাস নির্বাচন কমিশন এই বক্তব্যে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনবে না জানা কথা। কিন্তু মোদী নির্লজ্জের মতো নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করলেন, এটা দেশবাসী দেখল।

কেমন যেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ইতিহাসের একটা পুনরাবৃত্তির গন্ধ পাচ্ছি মনে হয়।  আমি ইতিহাসের ছাত্র, ইতিহাসে প্রবলভাবে আস্থাবান। সদা স্মরণে রাখি, কিছু মানুষকে কিছুকালের জন্য বোকা বানানো যায়, সব মানুষকে চিরকালের জন্য বোকা বানানো যায় না। ঘটনার গতিপ্রকৃতি যেন তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আপনি কী বলেন?


Friday, 17 April 2026

একটি রগরগে গল্প নয়

ফুলটুসি আরও পড়বে, লিখবে, বলবে

শুক্তিসিতা



ফুলটুসি। অ্যাসিডে আক্রান্ত একটি কুড়ি বছরের মেয়ে। হাসপাতাল, পুলিশ ফাইল, বেদনার্ত গোঙানি সব পেরিয়েও বাপ-মা ঠাওরালেন নিশ্চয় বাবলুকে টুসি কিছু প্রশ্রয় দিয়েছিল, নইলে এইভাবে...। এই কুরূপা মেয়ের আর বিয়ে হবে কোনওদিন? পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে। জ্বালা কমেনি, ব্যথাও কমেনি একটুও। অ্যাসিড ওর গলা, ডান দিকের কানের ওপর পড়েছিল। ফুলটুসি এখন কানে কম শুনছে। ঠোঁট দুটো এমনভাবে ঝুলে গেছে যে ও আর ভালো করে খেতে পারে না। ফুলটুসির সেকেন্ড ইয়ারটা আর থার্ড ইয়ার হবে না। ফুলটুসির ডান চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবু একটা চোখ দিয়ে ও পড়তে চেয়েছিল। না, হবে না। লোকলজ্জার নিদারুণ চাপ ওর গোটা পরিবারকে পিষে ফেলছে। বাবার মুদির দোকানটা ভালোই চলত। এখন বাবা একবেলা খোলেন। মায়ের চোখের জলে সারাটা বাড়ি যেন সপ্‌সপ্ করে।

ক্ষতিপূরণের ক’টা টাকা পাবার জন্য ফুলটুসির বাবাকে খুব দৌড়োদৌড়ি করতে হচ্ছে। ফুলটুসির সেজ পিসেমশাই ডাক্তার। সেদিন ফোনে মাকে বলছিলেন, 'প্লাসটিক সার্জারি করিয়ে নিন না বৌদি, বিশ লাখ টাকার মতো পড়বে।' মা আর কিছু উত্তর দেননি।

এই সামান্য কাহিনী পশ্চিমবাংলায় অজ্ঞাত নয়, অশ্রুতও নয়। একটি লিঙ্গ আগ্রাসনের গল্প। কিন্তু তেমন রগরগেও নয়। অথচ কেউ যেন প্রশ্নচিহ্নের পেরেক বসিয়ে গেল সামনে। শরৎচন্দ্র মহাশয়ের ‘অরক্ষণীয়া’র সঙ্গে আংশিক মিলের পরও একজন একটি আশ্চর্য কিস্সা শোনালো যে একজন ফর্সা দুধে আলতা সুন্দরী কিশোরী চরম অবসাদে ভুগছে কারণ তাকে কেউ ভালোবাসে না; কেউ তার সখী নয়। সবাই তাকে ঈর্ষা অথবা ঘৃণা করে। অথচ বছরে ৪৫ কোটি ডলারের বাণিজ্য করে ফেলছে ফর্সা হবার ক্রিম। আমাদের বাল্যকাল জুড়ে স্নো হোয়াইটের বিপন্ন বিমাতা, এই রূপকথা বপন করেছে যে আয়না থেকে সমাজের চোখ তাকে দেখে আর ক্রমাগত কুৎসিত প্রতিপন্ন করে আর কোনও এক নগণ্য ফর্সা মেয়েকে সেরা সুন্দরীর শিরোপা দিয়ে দেয়। না, এটি শুধু বর্ণবৈষম্যবাদের গল্প নয় যে। গোটা নারীত্ব যাকে সিমোন দ্য বোভোয়া মনে করেন একটা আরোপিত সত্তা বহনের অভিযাত্রা— তাকে একটি বাধ্যত সামাজিক সত্তা হতে হয় বলেই তার ওপর রূপসী হবার, নিখুঁত হবার দায় এসে পড়ে। তন্বী হবার জন্য শত শত মেয়ে মার্কিন মুলুকে অ্যানারোক্সিয়া নার্ভোসারোগের শিকার হয় স্রেফ ক্ষুধার্ত থেকে; এমনকি মারাও যায়। আর এই গরিব দেশে রাস্তাঘাটে একটি সামান্য শৌচাগারের অভাবে মূত্রনালীতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে কত হাজার মহিলা। না, রাষ্ট্র এ সব ভাববে পরে। 

রাষ্ট্রও মেয়েদের বোঝাবে যে পিল খেয়ে নাও; গর্ভ নিরোধ করো; তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষমতায়িত হও। পিল খাওয়ার গোপন পন্থাটি স্বামী/শ্বশুরবাড়ি জানতে পারে না ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না, দম্পতি কেন একত্রে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বা পুরুষটি কেন নিজে পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব নেয় না।

ফুলটুসি তো বাবলুকে বলেছিল, বিয়ের আগে শরীরী সম্পর্কে গেলে সমস্যা হতে পারে, বরং কিছু ব্যবস্থা নিয়ে... বাবলু রাজি হয়নি। তাই ফুলটুসির গাল, ঠোঁট, চুল, গলা ঝলসে গেল।

আচ্ছা, যশোদার গর্ভে যে কন্যা জন্মে মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত হয়ে বাঁচাতে গেল কৃষ্ণ অবতারকে, পাশবিক শক্তির দুর্দান্ত বজ্রমুষ্টি ভেদ করে তো সে মিলিয়ে যায় আকাশে! আসলে পুরাণ খোলসা করে বলে না, সেই শিশুকন্যাটিকেও কংস হয়তো পাথরে ঠুকে হত্যা করেছিল। আগের সাতটি শিশুর মতো। ঈশ্বরের জন্য ঈশ্বরী বলি হয়ে গেল নিশ্চুপে। এও কি এক 'যৌনতার রাজনীতি’ নয়? হয়তো নিরস্তিত্বতার রাজনীতি। মণিপুরে থাংজাম মনোরমার স্তন ও যোনিদেশে গুলিবিদ্ধ করে ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট করা হয়। প্রতিবাদী নারী'রা নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উত্তর এটাই। তবুও এই দশকে আর কি কোনও নারী প্রতিবাদীকেই মনে পড়ে? এখনও ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর ভাইদের দলে প্রীতিলতা, দুকড়িবালা, বীণা দাস, ননীবালার মতো বোনেদের মনে পড়ে না। সমাজ বদলের স্বপ্নে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরোধিতায় কর্পোরেট লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যে মেয়েরা পথে নেমেছেন বারবার, তেভাগা আন্দোলনের বুধনি ওরাওঁনি, জৈবন বিবি, সাবেরা খাতুন, দুলি কিস্কু। নকশালবাড়ি আন্দোলনে কুনী টুডু, জয়া মিত্র, মেরী টাইটলার। কারওকেই না। 

ফুলটুসি কলেজে কোনওদিন রাজনীতি করেনি। বাবার বারণ ছিল। বাবলুরও। কিন্তু ফুলটুসি সত্যি রাজনীতির স্বপ্ন দেখত। ছাত্রছাত্রীদের হস্টেলের সমস্যা, অধ্যাপকদের নিয়মিত হাজিরা, অথবা ‘নতুন শিক্ষানীতি’ এইসব। সবই খোয়াব হয়ে রইল। আচ্ছা ওর জীবনে এই যে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিগ্রহ হল, তার জবাব চাইবে কে? কোন রাজনৈতিকতা?

১৯৫২ সালে ভারতের সংসদে ৩৯ জন বুদ্ধিমতী, সপ্রতিভ, উচ্চাশী মহিলা সংসদ সভা আলো করেছিলেন। সর্বমোট সাংসদের ৫.৫ শতাংশ, অথচ সেই সময়ে মার্কিন দেশে ১.৭ শতাংশ আর যুক্তরাজ্যে ১.১ শতাংশ মহিলা সংসদের অধিকার পেয়েছিলেন। আর এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তথাকথিত প্রগতিশীল বাম দলগুলিকে কখনওই দেখা যায়নি মহিলা নেত্রীদের জেলা সভাপতি/সচিব পদে অধিষ্ঠিত করতে। এমনকি গৃহশ্রমের বেলাতেও যখন ১৯৭০'এর পরই প্রথম কথা উঠল যে মেয়েদের গৃহশ্রমের স্বীকৃতি তথা রোজগারের ব্যবস্থার কথা, তখনও কিন্তু কম্যুনিস্টরা বলেছিলেন, এতে গৃহশ্রমের প্রাতিষ্ঠানিকতা মান্যতা পাবে। নারীমুক্তি সুদূর পরাহত হয়ে যাবে তো! অথচ সমাজতন্ত্রীরা বিস্মৃত হলেন গৃহশ্রম শুধু শ্রমিক উৎপাদনই করে না শ্রমিকের কর্মশক্তিরও জোগান দেয়, ফলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’ ফাঁকিতে গৃহশ্রমিকরাও বস্তুত ইউনিয়নবিহীন অবস্থানে বাধ্যত নৈঃশব্দ্যের পর্দার পিছনে অপসৃত হন।

এমন আজব দিনও আসতে পারে গৃহশ্রমের মজুরি একেবারে শ্রম আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়ে গেল। অমনি সব পুরুষেরা পিলপিল করে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হ্যাঁ এমনটাই হয়। যখন ছত্তিশগড়ে লৌহখনিতে বা অন্ধ্রপ্রদেশে তামাক শিল্পে প্রযুক্তি প্রবেশ করল, তখন রাতারাতি মেয়েরা ছাঁটাই হয়ে গেলেন।

মেয়েরা অবিশ্যি পরিবারের জন্য নিত্য বাসে, অটোয়, ট্রেনে বাইরেও কাজ করতে যাচ্ছেন। 'চুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে/ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি রাত থাকতে ওঠে।' তারপর লালগোলা/বনগাঁর ট্রেনে চাল তোলেন বস্তা করে। কোভিড শুরুর বেলা এঁরা ‘Superspreader’ ছিলেন; অচ্ছুৎ। কিন্তু বেশিদিন চলল না। গৃহ পরিচারিকা না এলে যেমন Work from home নিরুপদ্রবে করা যায় না, তেমনই মাসি-পিসি রেল গার্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে চাল শহরে না নিয়ে এলে কী খাবে শহুরে বাবুরা? 

ফুলটুসি এখন একটা চোখে দেখে। তবু কাগজ পড়ে নিয়মিত। বইও পড়ে। থেরীগাথা পড়ছিল। বুদ্ধদেবের প্রতি মেয়েদের অভিমান আছে বৈকি। গোড়ায় তিনি মা গৌতমীকেও সঙ্ঘারামে ঢোকার অনুমতি দেননি। আবার অগ্রশ্রাবিকা উৎপলবর্ণা ধর্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও আশ্রমে স্থান দিয়েছিলেন। সন্তানহীনাকে পরিত্যাগ করতে মানা করেছিলেন তাঁদের স্বামীদের। ফুলটুসি কি পরিত্যাজ্য? না। ফুলটুসি এখন এক চোখ দিয়ে প্রুফ দেখার কাজ শিখেছে। 

ফুলটুসি গল্পগুচ্ছ পড়ছিল রোববার দুপুরবেলা। ‘মণিহারা’ আর ‘কঙ্কাল’ পড়বার পর ওর মনে হচ্ছিল সে যুগের মেয়েদের যখন জীবনটা বেঁচে থাকতেই অন্ধকার, তাই বিদ্রোহ কি মৃত্যুতেই শুরু হতে চাইছিল? যেমন গৃহপ্রাণা মণিমালিকা অন্ধকার মৃত্যুদেশ পেরিয়ে এসে ফণিভূষণের চৈতন্যের কাছে তার সম্পদের হিসাব চাইছে? অথবা ‘কঙ্কাল’-এর বিধবা মেয়েটি কিছুতেই দাদার ডাক্তার বন্ধুকে ভুলতে পারে না বলেই শীতল অস্থিপঞ্জর থেকে স্বরক্ষেপণ করতে চায় নবাগত যুবকের বুকে? উচ্চারণ করতে চায় তার অবহেলিত অনুচ্চারিত প্রেম? তাহলে ‘জীবিত ও মৃত’র কাদম্বিনী যে ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’? আসলে ওই মিথ্যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাদম্বিনী ভেঙে ফেলেছিল সব উল্লম্ব সম্পর্কের শিকল। সেই ভাঙনের অভিঘাত তার পরিবার ও সমাজ সহ্য করতে পারেনি বলে সে মৃত্যুবরণ করে সমাজকে মুক্তি দিয়ে গেল। তাহলে নারীমুক্তির বর্তমান ব্যাকরণটা কী? 

আজকাল ‘সহজিয়া’ দলের দুই দাদা আর দিদি আসেন ফুলটুসির কাছে। ‘সহজিয়া’ কাজ করে অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের পুনর্বাসন, আর্থিক সশক্তিকরণ নিয়ে। তাদেরই কি জিজ্ঞেস করবে এই ‘নারীমুক্তির সংজ্ঞা’? টিভিতেই কি ফুলটুসি দেখেছিল ইরানি-মার্কিনি সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ'কে? যিনি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর উল্লসিত সকালটাকে উদ্‌যাপন করছিলেন ইরানের হিজাব-বিরোধী মেয়েদের জন্য? ফুলটুসিও কি উল্লসিত হবে? ফুলটুসির বাবা কাগজে ভোটের খবর পড়েন। ওর ভাই ফোনে যুদ্ধ দেখে। দুটোই যুদ্ধ। তখন ফুলটুসিকে অনেকদিন আগে ওর কলেজের প্রোফেসর বলেছিলেন PWAG (Peace Women Across the Globe)-র কথা, যাঁরা ২০০৫-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার জন্য মনোনীতও হয়েছিল। কিন্তু পায়নি। ভূ-রাজনীতির নানা তত্ত্ব। অর্থনীতি, শস্ত্রনীতি এমনকি বেচারা ভূতত্ত্বও। ফুলটুসি বোঝে না। বুঝতে চেয়েছে কী?

না, কারণ ফুলটুসি জানে, তার ঐ দুনিয়া-জোড়া সংঘটনার সাধ্যি নেই ফুলটুসির ব্যথা কমায়, জ্বালা থামায়, ওর বুকের ওপর শান্তিজল ছেটায়। নাইট্রিক অ্যাসিড তো থাকার কথা ছিল শিল্প তালুকে, কারখানায়। সেটা খোলা বাজারে পাওয়া গেল বলেই না বাবলু সেটা ঢেলে দিল ফুলটুসির শরীরে! সম্পর্কের গর্ভের অন্ধকারে যে হিংসার মৌল লুকিয়ে থাকে, সে তো মোটেও ‘রেয়ার আর্থ’ মৌল নয়। তাহলে তো ‘সহজিয়া’র কাছে এত আর্তনাদ জমা পড়ত না (অ্যাসিড হিংসার ঘটনায় ভারতের মধ্যে এখন প্রথম বাংলা)। 

আজ ‘সহজিয়া’ দলের অনিন্দিতাদি আসবে। ওর প্রুফগুলো নিয়ে যাবে। আর ওর পাওনা টাকাও দিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহে ফুলটুসি প্রেসে যাবে। ওখানে গেলে আরও কাজ পাবে। না, ওড়না পরে নয়। সবাই দেখুক আসল ‘বাবলু’কে। নকল বাবলু নিখোঁজ। ফুলটুসি আরও পড়বে। লিখবে, বলবে। যাতে বাবলুরা সবাই 'নিখোঁজ'ই থাকে। এই সমাজের জন্য। সেদিন সব যুদ্ধ বন্ধ হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অনিরুদ্ধ রাহা ও অপরাজিতা গাঙ্গুলী বোস, ‘আলোক’ ফাউন্ডেশন।