যে যেখানে লড়ে যায় আমাদেরই লড়া...
অভিষেক
বর্ষাস্নাত জুলাই। ১৯ তারিখ। হাওড়া স্টেশন। সকাল আটটা পনেরো। পূর্বা এক্সপ্রেস ছেড়ে দিল দিল্লির উদ্দেশ্যে। ১ সপ্তাহ ধরে টিকিট চেষ্টা করেছি, পাইনি। তৎকালে বুকিং পেয়ে গেলাম অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে…
গন্তব্য অবশ্যই দিল্লি। নিট পরীক্ষায় দুর্নীতি বহু ছাত্রের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে ২১ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। আমরা সেই খবর জানি। একটি সর্বভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই তীব্র অনৈতিকতা আমার ওপরেও প্রভাব ফেলেছে অনেকখানি। ঠিক করে ফেলি, দিল্লি যাব, যন্তর-মন্তরে যুক্ত হব আরশোলাদের আন্দোলনের সঙ্গে। সর্বোপরি, সোনম ওয়াংচুক স্যার'এর তত্ত্বাবধানে সিজেপি যে আহ্বান জানিয়েছে দেশের যুবসমাজ সহ সমস্ত শিক্ষানুরাগীদের কাছে, সেখানে যোগদান করব। চলো সংসদ, ২০ জুলাই।
ট্রেন ছাড়ার পর বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা অতিক্রম করে তা ধানবাদে থামল দুপুর ১২টা নাগাদ। এরপর ট্রেন যত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে থেমেছে, যেমন গয়া, রফিগঞ্জ, সাসারাম, মুঘলসরাই, এলাহাবাদ, ইটাওয়া, আলিগর ইত্যাদি সমস্ত স্টেশনে যাত্রী উঠছেন। বহু সংখ্যায়। তাদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ ছাত্রছাত্রী অথবা শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষতিকর শিক্ষানীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব তাদের ওপর পড়েছে। আসন সংরক্ষিত না থাকলেও এঁরা উঠে পড়ছেন এবং অদম্য মনোবল নিয়ে ট্রেনের যে কোনও স্থানে একটু জায়গা পেলেই নিজেকে আঁটিয়ে নিচ্ছেন কোনওক্রমে। প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও পরে তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি। সবার গন্তব্য একই। শিক্ষা ক্ষেত্রে দিল্লি সরকারের কাজকর্মে সবাই তিতিবিরক্ত। সময় যত এগোচ্ছে, হৃদ্যতা বাড়ছে। এরা সবাই কমন হোয়াটসএপ গ্রুপ বানিয়েছেন, যাতে দুরন্ত ভীড়ে প্রিয়জনেরা কাছছাড়া না হয়। আমাকেও সদস্য করলেন সেই গ্রুপের। বেশিরভাগের বয়স কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে।
রাত কাটল। ২০ তারিখ সকাল। সকাল ৬টায় দিল্লি স্টেশনে ঢোকার কথা ট্রেনের। ঢুকল প্রায় সাতটায়। স্টেশন থেকে বেরতে বেরতে দেখি অনুসন্ধান কেন্দ্রে প্রচুর ভীড়। স্টেশনে উপস্থিত মানুষজন একটু চিন্তিত, উদভ্রান্ত। দিল্লিগামী অনেক ট্রেন নাকি বাতিল হয়েছে এবং কিছু ট্রেন সময়ের থেকে দেরিতে চলছে। প্রথমে সন্দেহ হলেও পরে বুঝলাম, সরকার তার খেলা শুরু করে দিয়েছে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা ক্যাব নিয়ে যন্তর মন্তর গেলাম। চালক আমাকে একটু দূরেই নামালেন। রাস্তা ধরে যেতে গিয়ে দেখি, অনেক রাস্তায় লোহার বেষ্টনী ব্যবহার করে যানের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
যন্তর মন্তরে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। আসার পথে দেখেছি, মেট্রো স্টেশনগুলি থেকে কাতারে কাতারে মানুষ বেরিয়ে আসছেন। এক উর্দিধারী পুলিশকর্মী আমার সব কিছু চেক করলেন। আমার ফোনটা চাইলেন। অনেকক্ষণ দেখলেন। যাই হোক, মঞ্চে পৌঁছনোর আগে থেকেই প্রভূত ভিড়। সেখানে পুলিশ প্রহরা বেশি নেই। সাজোসাজো রব। ৯টায় শুরু হবে ঐতিহাসিক 'চলো সংসদ' মার্চ।
শুরু হতে হতে প্রায় সাড়ে ন’টা হল। বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ব্যক্তি তাঁদের বক্তব্য রাখলেন, উপস্থিত থাকলেন, হাটলেন কিছুটা পথ। এরপর দশটা/ সাড়ে দশটা নাগাদ অনেকের মোবাইলে মেসেজ ঢুকতে থাকল– আপনাদের ইন্টারনেট বন্ধ করা হচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা গেল অনেকের মোবাইলে টাওয়ার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। সিগনাল দুর্বল। বোঝা গেল, সরকার শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার করছে। প্রবল ভীড়ের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণ অহিংসক উপায়ে জনতা হেঁটে চলেছে। আশেপাশের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলছি, তাঁদের উৎস জানছি। পঞ্জাব, হিমাচল, ইউপি, বিহার, এমপি, হরিয়ানা, রাজস্থান থেকে দলে দলে মানুষ এসেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁটছেন। অনেকে বলছেন, আজ পুলিশ প্রবল অত্যাচার করবে। ভাবলাম, নাহ্, অতটা বাড়াবাড়ি পুলিশ করবে বলে মনে হয় না। কারণ, ২ দিন আগেই সোনম স্যারকে অপহরণ করে পুলিশ মুখ পুড়িয়েছে, এর মধ্যেই এত তাড়াতাড়ি ওরা এতটা নিষ্ঠুর হবে না। পরে দেখলাম, ওরা নিষ্ঠুর নয় নৃশংস হল। কারণ, এটা দিল্লি পুলিশ।
মাঝখানে খবর এল, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা'কে ডেকে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। মিছিলের মধ্যেই অগোচরে আরএসএস তাদের চর পুঁতে রেখেছে। তারা গুজব ছড়াচ্ছে, অভিযান ফলপ্রসূ আর এগোনোর দরকার নেই, সরকার দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এ যে স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের মিছিল। এরা প্রবল পরাক্রমে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। দিল্লি পুলিশ ৩টে স্তরে নিরাপত্তা বেষ্টনী সাজিয়েছে। প্রথমটি ব্যর্থ হলে লাঠি চালাবে, তারপর টিয়ার গ্যাস এবং সবশেষে শ্যুট অ্যাট দ্য গেট। টিয়ার গ্যাস ও বন্দুক সজ্জিত গাড়ি চলাফেরা করছে একটু দূরে।
যন্তর মন্তর থেকে সংসদ প্রায় ২ কিমি। আমরা সংসদ মার্গ ধরে হাঁটছি। এদিকে রাইসিনা রোড, রাজেন্দ্র প্রসাদ রোডে পিলপিল করে মানুষ জড়ো হচ্ছেন পায়ে পায়ে। সংসদে পৌঁছনোর প্রায় ৩/৪ টি পথ আছে। ভীড় বাড়ছে।
প্রায় সাড়ে বারোটা | এর তার ফোনে শুনতে পাচ্ছি, অনেকে পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করেছে। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি সামনের বিপুল জনতার ভীড় প্রবল গতিবেগে আমাদের দিকে ধাবমান একটা ঢেউএর মতো এসে পড়ছে। কোনওক্রমে ফুটপাথে সরে, তারপরে ফুটপাথের পাশে একটা উচু স্থানে উঠে প্রাণ বাঁচালাম। নচেৎ পদপিষ্ট হতাম হয়তো। বুঝলাম, সামনের দিকে কিছু একটা অশান্তি শুরু হয়েছে। এমনিতেই ভ্যাপসা গরম। ব্যাগে রাখা জল আর খাবার শেষ। রাস্তায় কোনও খাবার বা জল না থাকায় আমি ভীড় ছেড়ে আরও পেছনের দিকে চললাম। সংসদ মার্গ ছেড়ে বেরনোর পথে দেখি পুলিশ সেদিকেও ব্যারিকেড দিচ্ছে। মতিগতি বুঝলাম না। সকাল থেকে ব্রেকফাস্টও হয়নি। ভাবলাম কাছেপিঠে কোথাও একটা কিছু খেয়ে নিয়ে আবার এসে অবস্থানে ফেরা যাবে। আসার পথে শুনলাম দিপকে তাঁর অনশন তুলে নিয়েছেন।
ফিরে এলাম দেড়টা নাগাদ। এসে দেখি অবাক কাণ্ড– ঘটনাস্থলে প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ প্রবল লাঠিবর্ষণ শুরু করেছে নির্মম ভাবে। অনেকে আহত। আমি তো হতভম্ব। কী করব কিছু বোঝার আগেই দেখলাম অল্প দূরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়েছে। একটু বাদেই এলাকা ধোঁয়ায় ভর্তি। আমি কোনওক্রমে নাকে মুখে রুমাল চেপে দ্রুতগতিতে বেরবার পথ খুঁজছি। আবছা দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, র্যাফ লাঠি চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করছে জনতাকে।
পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে অনেকটা পথ পার হয়ে কনট প্লেসে এলাম। এদিকে চোখমুখ জ্বলছে। ব্যাগে একটা ছোট বোতলে স্যালাইন ওয়াটার ছিল। সেটা চোখে দিতে দিতে হাঁটতে থাকলাম। মোবাইল ফোনে চার্জ নেই। গাড়িও বুক করতে পারছি না। অনেকটা হেঁটে একটা দোকানে এসে ফোন চার্জ করলাম। এতক্ষণে ইন্টারনেট কানেকশন এসেছে। নেটে দেখলাম যন্তর মন্তরে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে দিল্লি পুলিশ। বাইরে বৃষ্টি। দোকানের মালিক বললেন, পুলিশ আন্দোলনকারীদের শকুনের মতো খুঁজছে আর পেলেই হেনস্থা করছে। বেরিয়ে গেলাম। কিছুটা হেঁটে আর কিছুটা ভাড়ার বাইকে চেপে এয়ারপোর্ট পৌছলাম।
সারাদিন এত তুলকালামের পর মাথা ভারী। সকালে অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তার থেকেও বেশি আশা নিয়ে দিল্লি ছাড়লাম। আজ স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের যে ঢল দেখলাম দিল্লির রাজপথে, বুঝলাম, ভারতের দুর্বলতাই ভারতের আসল শক্তি: ভারতের দেড়শো কোটি জনগণ…।




