দিমাগ তো কাজ করছে...
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
চিদম্বরম যখন বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘নিজেকে একজন দিমাগী নকশাল ভেবে গর্ববোধ করি’, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রে রে করে উঠলেন, ‘চিদম্বরম মোটেও দিমাগী নকশাল নন, উনি বিশুদ্ধ নকশাল।’ ফলে, মোটমাট আমরা এখন পর্যন্ত চার প্রকার নকশাল পাচ্ছি: দিমাগী নকশাল, বিশুদ্ধ নকশাল, আর্বান নকশাল ও হাতিয়ারি নকশাল। এই চার ধরনের নকশালদের হদিশ আমরা গত এক দশক ধরে পেতে পেতে এসেছি। তদুপরি, ‘দিমাগী নকশাল’ নিয়ে তুমুল সোরগোল ওঠায় এক স্বঘোষিত পুরাতত্ত্ববিদ ‘নকশালি ঘাসের’ সন্ধান পেয়েছেন; ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে নদীর তীরে এই নকশালি ঘাস জন্মায়, সেই নদীকে ‘নকশালেশ্বর মহাদেব’ বলা হয়। তাই ‘দিমাগী নকশাল’ হলেন একজন শিবভক্ত…।’ এটা শুনে যোগেন্দ্র যাদব বেশ চমকিত হয়ে তা প্রচারও করে দিয়েছেন।
এখন ‘দিমাগী নকশাল’ যদি শিবভক্ত হন, তাহলে শাসক দলের মহাবিপদ। শিবভক্তদের কীভাবে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে? শিবের রুদ্ররূপ কে না জানে? ভক্তের উপর জুলুম হলে দেবতা কি স্থির থাকবেন? সেইজন্যই ‘বিশুদ্ধ নকশাল’ আরও বিপন্মুক্ত শব্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নকশাল’ শব্দটিরই যদি অমন পৌরাণিক ইতিকথা থাকে, তাহলে সে সব নিয়ে ছেলেখেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়! তবে কেউ বলতেই পারেন, ফেসবুকে কেউ লিখে দিলেই কি তা পুরাণকথা হয়ে যাবে? কোন পুরাণ বা স্মৃতিতে আছে, সে সূত্র কি দিয়েছে? অথবা, এমন কথার কি কোনও লোকজ দৃষ্টান্ত আছে? সে সব জানা যাচ্ছে না। অতএব, সূত্রহীনতার দরুণ এইসব পুরাণগাথার মারপ্যাঁচ আপাতত সরিয়ে রাজনীতির প্রশ্নটিকেই যদি জিইয়ে রাখা যায়, সেখানেও স্ববিরোধ আছে।
মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫ সনের কথা, যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে ‘সর্বাত্মক বিপ্লবের’ ফ্রন্ট, যে ফ্রন্টে একদিকে সামিল হচ্ছে সিপিআই বাদে সমস্ত বাম ও কমিউনিস্ট দল, অন্যদিকে পুরনো কংগ্রেস ও সমাজতন্ত্রী সহ আজকের শাসক দলের পূর্বসূরীরা যাদের ‘ভারতীয় জনসংঘ’ নামে তখন পরিচিতি। এই শেষোক্ত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এরপরে নিজেদের মিলিয়ে দেবে ‘জনতা পার্টি’ নামক একটি নতুন দলে, যে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হবেন ভারতীয় জনসংঘের নেতা নানাজী দেশমুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানী হবেন জাতীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য। আমরা সবাই জানি, জয়প্রকাশ নারায়ণ সে দলের কোনও আনুষ্ঠানিক পদ না নিলেও তিনিই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা ও পথ প্রদর্শক। সেই সময়ে তিনিই, তাঁর সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহে নকশালপন্থীদের যুক্ত হতে প্রকাশ্য সভায় তাঁদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তিকে তাঁর প্রয়োজন। সেদিন জনতা পার্টির নেতারা বা বাঘা বাঘা পূর্বতন জনসংঘীরাও কিন্তু সে কথার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মৃদু আপত্তিও জানাননি। বরং, জনসংঘীদের মূল মেন্টর সংগঠন আরএসএস জরুরি অবস্থার সময় বেআইনি ঘোষিত হলে তাদের ক্যাডার বাহিনী পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থী ও অন্যান্য বাম সংগঠন দ্বারা গঠিত নানারকম সেবামূলক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনেও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ঢুকে পড়ে।
আজ সময় ও পরিস্থিতি পালটেছে। সেই জনতা পার্টি আজ আর নেই। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে পুরনো জনসংঘীরা তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। আরএসএস’এর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু তাদের একটা অংশ তখনও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাম সংগঠনে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে থেকে গেছে। কোনও কোনও প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বাম ঘরানার মিলও ছিল। যেমন, গান্ধীর প্রশ্নে দু’ পক্ষেরই মতামত অনেকটাই এক ছিল। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যেহেতু দেশ জুড়ে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এক উদার আবহ ঐতিহ্যগত ভাবেই বিরাজমান, তাই সে প্রশ্নে আরএসএস উচ্চকিত ভাবে কিছু বলত না; তবে দেশভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ ফাটল দেখা দিয়েছিল, সেখানে ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’— তাদের এই দুই তরফ নির্মাণ মারফত দুই সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একটা সুপ্ত চোরাস্রোত প্রবহমান ছিল। এই চোরাস্রোতে কমবেশি আক্রান্ত ছিল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ ও নিম্নবর্ণদের সেই অংশ যারা দেশভাগের রোষানলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বামপন্থার সার্বিক প্রভাবে এই দুই-তরফের রাজনীতি ততদিন খুব একটা মাথা তুলতে পারেনি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতিই যখন অনেকটা বদলে গেল, বামপন্থীরাও নিজেদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থানে বেশ দুর্বল হল, তখন স্বভাবতই তাদেরও ভেসে যাওয়ার পালা দেখা দিল। বস্তুত, ভোটের হিসেব-নিকেশে তাদেরই একটা বড় অংশ নিজেদের দল ছেড়ে আরএসএস-বিজেপির পিছনে সামিল হয়ে গেল।
তা না হয় হল। কিন্তু তাই বলে চলমান রাজনীতির আপন পরিবর্তনগুলি তো থেমে থাকে না। দেখা গেল, এ তাবৎ সংসদীয় রাজনীতিতে যে সমস্ত নকশালপন্থী শক্তিসমূহ অংশ নিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রস্তাবনার মূল সুরকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছে, তারাই খুব নীতিনিষ্ঠ ভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্তমান শাসক-বিরোধী এমন এক বার্তা নির্মাণ করতে পেরেছে যা অন্যান্য প্রগতিশীল ও সমাজবাদী শক্তির সঙ্গে সাবলীল সংযোগ স্থাপনের দিশা দিতে সক্ষম হয়েছে। সেটা আরও স্পষ্টত দেখা গেল ককরোচ আন্দোলনের গোড়ার দিকে, যখন দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলিই এদের আন্দোলন নিয়ে কিছুটা সন্দিহান, ভাবছে বিজেপি’র বি-টিম কিনা, তখন কিন্তু বিভিন্ন নকশালপন্থী শক্তিগুলি প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের শক্তি, শ্লোগান, দম ও বুদ্ধি জুগিয়েছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াইয়ে রত থেকেছে। বস্তুত পক্ষে, নকশালপন্থী শক্তিসমূহের সামিল হওয়া ও তাদের রাজনৈতিক পরিণতমনস্কতা দেখে অন্যান্য বাম শক্তিও এগিয়ে আসে, এবং বাকী বিরোধী দলগুলিও ভরসা পায়। তারপর তো ইতিহাস, যার পিছনে সর্বোপরি আরশোলাদের নেতৃত্ব, চৈতন্য, বুদ্ধিবৃত্তি, সংযম ও অংশগ্রহণ অতুলনীয়। বলাই বাহুল্য, এক অসামান্য শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোনম ওয়াংচুকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপকতা এতটাই ছড়িয়েছে যে, আরএসএস প্রধানকেও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থাও যেন খানিক সমঝে কথা বলছে। প্রধান বিচারপতি বার কাউন্সিলের সভাপতিকে ধমকে দিয়েছেন, তিনি কেন ছাত্রদের এবং তাঁর মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপারে এসে নাক গলাচ্ছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পট তৈরি হচ্ছে।
ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ‘দিমাগী নকশালদের’ সন্ধান-ঘোষণা জারি হল। হাতে আম্বেদকর ও ভগৎ সিং’এর ছবি, শ্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভুখমারি সে আজাদী’, যন্তর মন্তরের রাস্তায় হাজার হাজার জনতার মাঝে হাজার হাজার মেয়েদের নিশ্চিন্তে রাত-জাগা, আধপেটা খেয়ে তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে দিন-রাত কাটানো, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসা’র অনশন, পুলিশের ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও মিম বানানো, মা-বাবার অনুশাসনকে তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতেই নেওয়া, পুলিশের লাঠির সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে পড়া, জল কামান চালালে শ্যাম্পু মেখে রেইন ডান্স— দেশ কোনদিন কবে শেষ তরুণ সমাজের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখেছে? যে জাগরণের সামনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহামহিম মন্ত্রী মহাশয়কেও পদত্যাগ করতে হয়? শুধু যন্তর মন্তরে কেন, ঝাড়খণ্ডেও তো শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে হল! এবার তো GenAlpha’রাও পথে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইতিমধ্যেই উত্তাল। আরশোলারা দলে দলে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যায়তনে, বলছে, ‘স্কুল ঠিক করো’। কে রুধিবে এই হড়পা বান?
দিমাগ তো কাজ করছে! জয়প্রকাশ বর্ণিত ‘নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তি’ দেশের ‘গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য’ লাগছে বৈকী! তারা তো দিমাগীই। নকশাল-ভীতি দেখিয়ে কি দিমাগে কার্ফু জারি করা যাবে? ‘নকশাল’ যে প্রকারেরই হোক, অথবা, পুরাতত্ত্ব মতানুযায়ী শিবভক্ত, তার যে রাজনৈতিক অর্থ গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে দেশবাসী বুঝেছে, তা নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আজ সর্বজনীন। নয় কী? নয়তো চিদম্বরম থেকে মহুয়া মৈত্র, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে প্রকাশ রাজ-- সকলেই একযোগে দম্ভ ভরে বলছেন কেন যে, ‘হ্যাঁ আমিও দিমাগী নকশাল।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে লক্ষ লক্ষ ফলোওয়ার নিয়ে কেন গড়ে উঠছে ‘দিমাগী নকশাল পার্টি’? লড়াইটা কি আসলে দিমাগ বনাম অন্ধভক্তির?



