Thursday, 20 August 2026

কে পরবাসী নয়?

স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


 

কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।  

ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।  

তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।  

তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ। 

তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে। 

তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ  ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।

এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।

কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক  'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর  ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।

আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।

তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে  ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।

কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত  কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।

আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।


Tuesday, 18 August 2026

নকশাল কয় প্রকার!

দিমাগ তো কাজ করছে...

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



চিদম্বরম যখন বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘নিজেকে একজন দিমাগী নকশাল ভেবে গর্ববোধ করি’, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রে রে করে উঠলেন, ‘চিদম্বরম মোটেও দিমাগী নকশাল নন, উনি বিশুদ্ধ নকশাল।’ ফলে, মোটমাট আমরা এখন পর্যন্ত চার প্রকার নকশাল পাচ্ছি: দিমাগী নকশাল, বিশুদ্ধ নকশাল, আর্বান নকশাল ও হাতিয়ারি নকশাল। এই চার ধরনের নকশালদের হদিশ আমরা গত এক দশক ধরে পেতে পেতে এসেছি। তদুপরি, ‘দিমাগী নকশাল’ নিয়ে তুমুল সোরগোল ওঠায় এক স্বঘোষিত পুরাতত্ত্ববিদ ‘নকশালি ঘাসের’ সন্ধান পেয়েছেন; ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে নদীর তীরে এই নকশালি ঘাস জন্মায়, সেই নদীকে ‘নকশালেশ্বর মহাদেব’ বলা হয়। তাই ‘দিমাগী নকশাল’ হলেন একজন শিবভক্ত…।’ এটা শুনে যোগেন্দ্র যাদব বেশ চমকিত হয়ে তা প্রচারও করে দিয়েছেন।

এখন ‘দিমাগী নকশাল’ যদি শিবভক্ত হন, তাহলে শাসক দলের মহাবিপদ। শিবভক্তদের কীভাবে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে? শিবের রুদ্ররূপ কে না জানে? ভক্তের উপর জুলুম হলে দেবতা কি স্থির থাকবেন? সেইজন্যই ‘বিশুদ্ধ নকশাল’ আরও বিপন্মুক্ত শব্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নকশাল’ শব্দটিরই যদি অমন পৌরাণিক ইতিকথা থাকে, তাহলে সে সব নিয়ে ছেলেখেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়! তবে কেউ বলতেই পারেন, ফেসবুকে কেউ লিখে দিলেই কি তা পুরাণকথা হয়ে যাবে? কোন পুরাণ বা স্মৃতিতে আছে, সে সূত্র কি দিয়েছে? অথবা, এমন কথার কি কোনও লোকজ দৃষ্টান্ত আছে? সে সব জানা যাচ্ছে না। অতএব, সূত্রহীনতার দরুণ এইসব পুরাণগাথার মারপ্যাঁচ আপাতত সরিয়ে রাজনীতির প্রশ্নটিকেই যদি জিইয়ে রাখা যায়, সেখানেও স্ববিরোধ আছে।

মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫ সনের কথা, যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে ‘সর্বাত্মক বিপ্লবের’ ফ্রন্ট, যে ফ্রন্টে একদিকে সামিল হচ্ছে সিপিআই বাদে সমস্ত বাম ও কমিউনিস্ট দল, অন্যদিকে পুরনো কংগ্রেস ও সমাজতন্ত্রী সহ আজকের শাসক দলের পূর্বসূরীরা যাদের ‘ভারতীয় জনসংঘ’ নামে তখন পরিচিতি। এই শেষোক্ত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এরপরে নিজেদের মিলিয়ে দেবে ‘জনতা পার্টি’ নামক একটি নতুন দলে, যে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হবেন ভারতীয় জনসংঘের নেতা নানাজী দেশমুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানী হবেন জাতীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য। আমরা সবাই জানি, জয়প্রকাশ নারায়ণ সে দলের কোনও আনুষ্ঠানিক পদ না নিলেও তিনিই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা ও পথ প্রদর্শক। সেই সময়ে তিনিই, তাঁর সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহে নকশালপন্থীদের যুক্ত হতে প্রকাশ্য সভায় তাঁদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তিকে তাঁর প্রয়োজন। সেদিন জনতা পার্টির নেতারা বা বাঘা বাঘা পূর্বতন জনসংঘীরাও কিন্তু সে কথার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মৃদু আপত্তিও জানাননি। বরং, জনসংঘীদের মূল মেন্টর সংগঠন আরএসএস জরুরি অবস্থার সময় বেআইনি ঘোষিত হলে তাদের ক্যাডার বাহিনী পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থী ও অন্যান্য বাম সংগঠন দ্বারা গঠিত নানারকম সেবামূলক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনেও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ঢুকে পড়ে।

আজ সময় ও পরিস্থিতি পালটেছে। সেই জনতা পার্টি আজ আর নেই। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে পুরনো জনসংঘীরা তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। আরএসএস’এর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু তাদের একটা অংশ তখনও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাম সংগঠনে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে থেকে গেছে। কোনও কোনও প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বাম ঘরানার মিলও ছিল। যেমন, গান্ধীর প্রশ্নে দু’ পক্ষেরই মতামত অনেকটাই এক ছিল। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যেহেতু দেশ জুড়ে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এক উদার আবহ ঐতিহ্যগত ভাবেই বিরাজমান, তাই সে প্রশ্নে আরএসএস উচ্চকিত ভাবে কিছু বলত না; তবে দেশভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ ফাটল দেখা দিয়েছিল, সেখানে ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’— তাদের এই দুই তরফ নির্মাণ মারফত দুই সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একটা সুপ্ত চোরাস্রোত প্রবহমান ছিল। এই চোরাস্রোতে কমবেশি আক্রান্ত ছিল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ ও নিম্নবর্ণদের সেই অংশ যারা দেশভাগের রোষানলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বামপন্থার সার্বিক প্রভাবে এই দুই-তরফের রাজনীতি ততদিন খুব একটা মাথা তুলতে পারেনি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতিই যখন অনেকটা বদলে গেল, বামপন্থীরাও নিজেদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থানে বেশ দুর্বল হল, তখন স্বভাবতই তাদেরও ভেসে যাওয়ার পালা দেখা দিল। বস্তুত, ভোটের হিসেব-নিকেশে তাদেরই একটা বড় অংশ নিজেদের দল ছেড়ে আরএসএস-বিজেপির পিছনে সামিল হয়ে গেল।

তা না হয় হল। কিন্তু তাই বলে চলমান রাজনীতির আপন পরিবর্তনগুলি তো থেমে থাকে না। দেখা গেল, এ তাবৎ সংসদীয় রাজনীতিতে যে সমস্ত নকশালপন্থী শক্তিসমূহ অংশ নিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রস্তাবনার মূল সুরকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছে, তারাই খুব নীতিনিষ্ঠ ভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্তমান শাসক-বিরোধী এমন এক বার্তা নির্মাণ করতে পেরেছে যা অন্যান্য প্রগতিশীল ও সমাজবাদী শক্তির সঙ্গে সাবলীল সংযোগ স্থাপনের দিশা দিতে সক্ষম হয়েছে। সেটা আরও স্পষ্টত দেখা গেল ককরোচ আন্দোলনের গোড়ার দিকে, যখন দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলিই এদের আন্দোলন নিয়ে কিছুটা সন্দিহান, ভাবছে বিজেপি’র বি-টিম কিনা, তখন কিন্তু বিভিন্ন নকশালপন্থী শক্তিগুলি প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের শক্তি, শ্লোগান, দম ও বুদ্ধি জুগিয়েছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াইয়ে রত থেকেছে। বস্তুত পক্ষে, নকশালপন্থী শক্তিসমূহের সামিল হওয়া ও তাদের রাজনৈতিক পরিণতমনস্কতা দেখে অন্যান্য বাম শক্তিও এগিয়ে আসে, এবং বাকী বিরোধী দলগুলিও ভরসা পায়। তারপর তো ইতিহাস, যার পিছনে সর্বোপরি আরশোলাদের নেতৃত্ব, চৈতন্য, বুদ্ধিবৃত্তি, সংযম ও অংশগ্রহণ অতুলনীয়। বলাই বাহুল্য, এক অসামান্য শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোনম ওয়াংচুকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপকতা এতটাই ছড়িয়েছে যে, আরএসএস প্রধানকেও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থাও যেন খানিক সমঝে কথা বলছে। প্রধান বিচারপতি বার কাউন্সিলের সভাপতিকে ধমকে দিয়েছেন, তিনি কেন ছাত্রদের এবং তাঁর মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপারে এসে নাক গলাচ্ছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পট তৈরি হচ্ছে।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ‘দিমাগী নকশালদের’ সন্ধান-ঘোষণা জারি হল। হাতে আম্বেদকর ও ভগৎ সিং’এর ছবি, শ্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভুখমারি সে আজাদী’, যন্তর মন্তরের রাস্তায় হাজার হাজার জনতার মাঝে হাজার হাজার মেয়েদের নিশ্চিন্তে রাত-জাগা, আধপেটা খেয়ে তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে দিন-রাত কাটানো, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসা’র অনশন, পুলিশের ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও মিম বানানো, মা-বাবার অনুশাসনকে তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতেই নেওয়া, পুলিশের লাঠির সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে পড়া, জল কামান চালালে শ্যাম্পু মেখে রেইন ডান্স— দেশ কোনদিন কবে শেষ তরুণ সমাজের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখেছে? যে জাগরণের সামনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহামহিম মন্ত্রী মহাশয়কেও পদত্যাগ করতে হয়? শুধু যন্তর মন্তরে কেন, ঝাড়খণ্ডেও তো শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে হল! এবার তো GenAlpha’রাও পথে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইতিমধ্যেই উত্তাল। আরশোলারা দলে দলে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যায়তনে, বলছে, ‘স্কুল ঠিক করো’। কে রুধিবে এই হড়পা বান?

দিমাগ তো কাজ করছে! জয়প্রকাশ বর্ণিত ‘নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তি’ দেশের ‘গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য’ লাগছে বৈকী! তারা তো দিমাগীই। নকশাল-ভীতি দেখিয়ে কি দিমাগে কার্ফু জারি করা যাবে? ‘নকশাল’ যে প্রকারেরই হোক, অথবা, পুরাতত্ত্ব মতানুযায়ী শিবভক্ত, তার যে রাজনৈতিক অর্থ গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে দেশবাসী বুঝেছে, তা নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আজ সর্বজনীন। নয় কী? নয়তো চিদম্বরম থেকে মহুয়া মৈত্র, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে প্রকাশ রাজ-- সকলেই একযোগে দম্ভ ভরে বলছেন কেন যে, ‘হ্যাঁ আমিও দিমাগী নকশাল।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে লক্ষ লক্ষ ফলোওয়ার নিয়ে কেন গড়ে উঠছে ‘দিমাগী নকশাল পার্টি’? লড়াইটা কি আসলে দিমাগ বনাম অন্ধভক্তির?


Friday, 7 August 2026

বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাট!

অসমাপ্ত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



কৌশিক গাঙ্গুলির 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ছবিটি গত জুলাইয়ে রিলিজ পেয়েছে। ছবিটি একটি দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তার পরিসর ব্যক্তিগত গৃহের দেওয়াল টপকে সমাজ, শ্রেণি ও সিনেমার বাণিজ্যিক ব্যাকরণের দিকে চলে যায়। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য, ছবিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যে কীভাবে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা ও 'অসমাপ্ত দায়'এর রাজনীতি কাজ করে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রা। পেশায় সে একজন শিক্ষিকা। তার কোনও সন্তান নেই। তবে এর জন্য শুভ্রা দায়ী নয়। এর কারণ সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায় (চরিত্রে কৌশিক সেন), শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী ও পেশায় অধ্যাপক। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই দায়ের বোঝা শুভ্রার উপরেই পড়ে। প্রচার হয় শুভ্রাই সন্তান ধারণে অপারগ। সুমনের কোনও দায় নেই। বিচ্ছেদের পর সুমন দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তার স্ত্রী মেঘনা। মেঘনা মুসলমান। এক ছোট্ট কন্যা সন্তান সহ মেঘনাকে বিয়ে করে সুমন। কিন্তু খাতায় কলমে সুমন মেঘনার মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ, একজন শিক্ষিত অধ্যাপক হিসেবে তাকে আভিজাত্যের ভান করতে হয়। মেয়ে ছাড়া যেন তার চলবে না, এমন একটি ভাবমূর্তি তাকে বজায় রাখতে হয়।

আখ্যানের মোড় ঘোরে মেঘনার অসুস্থতায়। জানা যায়, অ্যাডভান্স স্টেজের টিউমার ও ক্যান্সার। গল্পের জটিলতায় অকস্মাৎ শুভ্রার উপর এসে পড়ে একটি নৈতিক দায়। মেঘনার কন্যা সন্তানটি যাতে এই বিপদের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব শুভ্রা অস্বীকার করতে পারে না। এই বিন্দুতেই ছবির শিরোনাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইনত শুভ্রা সুমনের প্রাক্তন, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক ভাবে সে আজও অর্ধাঙ্গিনী। একই সময়ে মেঘনাও সুমনের বর্তমান অর্ধাঙ্গিনী। ফলে, সুমনের জীবনে দুই সময়ের দুই নারী এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ছবির শেষে মেঘনার পরিণতি নির্মম।

'আজও অর্ধাঙ্গিনী' একটি স্পষ্টতই শহুরে মধ্যবিত্তের আখ্যান। এবং এটিই এর সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান। শুভ্রা শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং তার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ভাষা আছে। তার শোক পর্দায় স্থান পাওয়ার সামাজিক পুঁজি আছে। সিনেমা একটি বাণিজ্য। মধ্যবিত্তের সমস্যা সিনেমার এক বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র।

এই প্রসঙ্গেই ২০২৪ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে অভয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মর্তব্য। সে ঘটনার পর শহরে যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, বাইরে থেকে তাকে লিঙ্গ বয়ানের রাজনীতি মনে হলেও আদতে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন। যে সমস্ত গরিব, কাজের মহিলা, প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা রোজ নিগৃহীত হন, তাদের জন্য রাত জাগা হয় না। কিন্তু যখন ঘটনার কেন্দ্রে আসেন একজন শিক্ষিতা, এমডি পাঠরতা ডাক্তার, তখন সেই ঘটনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'ও সেই একই কাঠামোর অনুসারী। শুভ্রার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পর্দায় আসে কারণ সে মধ্যবিত্ত। কৌশিক গাঙ্গুলিদের সিনেমা নিয়ে ব্যবসা করতেই হবে। তাই প্রচলিত ফিকশনাল মেলোড্রামাকে কখনই নন-ফিকশনাল বাস্তবতায় থাকা সমগ্র মেয়েদের আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ছবিটি সেই নিরাপদ বাস্তবতাকেই বেছে নেয় যা মধ্যবিত্ত দর্শক দেখতে অভ্যস্ত। এখানে চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির যন্ত্রণাকেই দৃশ্যমান করে এবং তাকেই রাজনীতি বলে চালায়।

এই আখ্যানটি মেলোড্রামার ব্যাকরণকেও অস্বীকার করে না। মেঘনার ক্যান্সার, দাম্পত্যের ভুল বোঝাবুঝি এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন-- এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যে টুইস্ট আনে। এটি বাণিজ্যিক সিনেমার একটি অবশ্যম্ভাবী শর্ত। শুধুমাত্র দাম্পত্য টানাপোড়েন দিয়ে দু' ঘণ্টার ছবিকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত অসুস্থতা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের মতো আবেগীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মেলোড্রামার ভেতরেই একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও লুকিয়ে আছে। একজন নারী কেন অন্য নারীর সন্তানের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে! এই বাধ্যতা কি ভালোবাসা থেকে আসে, নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারীত্বের সংজ্ঞা থেকে?

ছবির ফর্মগত বৈশিষ্ট্য হল এর অসমাপ্তি। কৌশিক গাঙ্গুলি কোনও চূড়ান্ত মীমাংসায় যাননি। শুভ্রা শেষ পর্যন্ত কী করল, এই প্রশ্নটি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালক লম্বা টেক, স্থির ক্যামেরা ও ন্যূনতম আবহসংগীত ব্যবহার করেছেন। এর ফলে দৃশ্যগুলোতে একটি ডকুমেন্টারিসুলভ বাস্তবতা তৈরি হয়। শুভ্রার নিঃসঙ্গ হাঁটা বা পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে ক্যামেরা তাড়াহুড়ো করে না। এই স্থবিরতাই দর্শকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, প্রথাগত সিনেমা ক্লাইম্যাক্স দেয়। কিন্তু জীবন ক্লাইম্যাক্স দেয় না। জীবন শুধু চলতে থাকে। এখানে ক্যামেরা শুভ্রাকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে না, বরং এক চিন্তাশীল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

সব শেষে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনি কাগজে শেষ হলেও সামাজিক ও মানসিক ভাবে ফুরোয় না। শুভ্রা এবং মেঘনা-- দুজনেই সুমনের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু এই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া তাদের পছন্দ নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা। একজন নারীকে যতক্ষণ না স্ত্রী ও মা-- এই দুই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ততক্ষণ সমাজ তাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করে না। শুভ্রার ক্ষেত্রে এই অসম্পূর্ণতার তকমা আরও নির্মম। কারণ, সন্তান না থাকার দায় তার নয়, তবুও দায় তার ঘাড়েই পড়েছে। অথচ পরিস্থিতির চাপে তাকেই আবার অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কৌশিক গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতির জন্য কোনও উত্তর রাখেননি। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। আর সেই প্রশ্নের নামই 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'। 

সিনেমা করিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলি'রা কিন্তু সবটাই বোঝেন, কিন্তু বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাটের বাইরে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেন না; এটা শুধু শ্রেণি চরিত্র নয়, শহুরে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি।


Thursday, 30 July 2026

প্রজন্মের আর্তনাদ

পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা চাই

সোমা চ্যাটার্জি



গত সপ্তাহে দিল্লীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে সমাজমাধ্যমে যে রিলসের বন্যা বয়ে গেছে, তার সব কটিই মন ছোঁয়া হলেও একটি আমাকে খুব ব্যক্তিগত ভাবে স্পর্শ করেছে। ওই ভিডিওটিতে দেখাচ্ছিল যে, একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কেঁদে কেঁদে হিন্দিতে বলছেন, 'আভি হমারে বাচ্চো কে ভবিষ্যৎ কে লিয়ে হমে ভিখ মাঙ্গনা পারেগা ক্যা?' অর্থাৎ, আমাদের কি এখন নিজেদের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য ভিক্ষে করতে হবে?

CBSE বোর্ডের ক্লাস নাইনের ছাত্রের এক অভিভাবক হিসেবে আমাকে এই কথাটি বিশেষ ভাবে নাড়া দিয়েছে। কারণ, আগামী বছরগুলিতে আসন্ন CBSE পরীক্ষার্থীদের যে উৎকন্ঠা বা উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে তাতে এদের ভবিষ্যতে আশার আলো যে বিশেষ নেই তা বোঝা কঠিন নয় এবং আমাদের মতো অভিভাবকদেরও যে নিজেদের দাবি-দাওয়ার জন্য পথে নামতে হবে না, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। 

কিন্তু কেন এই উদ্বেগ ? 

নতুন শিক্ষানীতি (NEP 2020)'কে সামনে রেখে CBSE যে শিক্ষাপদ্ধতি ও সিলেবাসে বদল আনছে, তা তত্ত্বে ভালো শোনালেও বাস্তবে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। নতুন শিক্ষানীতি, বিভ্রান্তিকর সিলেবাস আর বইহীন ক্লাসরুম-- এই সাঁড়াশি সমস্যায় ছাত্ররা জর্জরিত। পরীক্ষার দু' মাস আগে সিলেবাস বদল, বই নেই, আবার তৃতীয় ভাষাও নিতে হবে-- ক্লাস নাইনের এই চিত্রই আজ সারা দেশে CBSE-র বাস্তব ছবি। 

এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ফাঁক হল, পরিকল্পনা আছে প্রস্তুতি নেই, সবই 'উপর থেকে চাপানো সিদ্ধান্ত, নিচে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনও প্রস্তুতি নেই'। যেমন, শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে এসে বিষয় কমানো বা বাড়ানো, ছাত্র-শিক্ষক কেউ বুঝতে পারছে না কী পড়বে। নীতি আগে বই পরে-- এটাই এই ব্যবস্থার  বড় ত্রুটি। NEP চালুর কথা ঘোষণা হল কিন্তু বই ছাপা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি কিছুই সময় মতো হল না। তাছাড়া স্কুলগুলিতে সব নির্দেশাবলীর তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও যোগাযোগের চরম অভাব। CBSE-এর সার্কুলার স্কুল পর্যন্ত পৌঁছতে অনেক সময় লাগে এবং সব কিছুই অভিভাবক ও ছাত্ররা শেষ মুহূর্তে জানতে পারে। এদিকে মুখে বা নীতিতে এক দেশ, এক সিলেবাস কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এক বই নয়। সরকারি স্কুলে জুলাই-অগস্টে বই পাওয়া যায় অথচ বেসরকারি স্কুলে এপ্রিলেই বই আসছে। কোথা থেকে আসছে তার কোনও উত্তর নেই। বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

আরও বড় গ্যাঁড়াকল হল Competency Based Education-- অর্থাৎ, 'মুখস্থ'বিদ্যা বাদ দিয়ে Competency Based Learning শুরু করো। ভালো কথা, ছাত্ররা প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে  নয়, প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিখবে। Case study, HOTS (Higher Order Thinking Skills)'এর প্রশ্ন বাড়বে। ছাত্ররা 'কেন' এবং 'কীভাবে' শিখবে, শুধু 'কী' নয়। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকরা নিজেরাই এই নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত নন। দু' দিনের অনলাইন ওয়ার্কশপে কি ২০ বছরের পড়ানোর অভ্যাস বদলানো যায়? স্কুলে পর্যাপ্ত ক্লাস হয় না, শিক্ষক-শিক্ষিকারা সব সময়ই ট্রেনিং নিতে ব্যস্ত। প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন বদলালেও বই ও গাইড বই এখনও পুরনো ধাঁচের। যার ফলে ছাত্ররা না পারছে পুরনো নিয়মে পড়তে, না পারছে নতুন নিয়মে ভাবতে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, যাদের বাচ্চারা ক্লাস নাইনে পড়ছে তারাই বিভ্রান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ, এই ক্লাসের ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে এক ত্রিভুজ সংকটে। যেমন,

১) বইয়ের চরম অভাব: নতুন সিলেবাস অনুযায়ী SST-এর চারটি বিষয়কে এক করে নতুন বই আসার কথা ছিল শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই। কিন্তু জুলাই মাস শেষ হয়ে গেল, বাজারে বই নেই। সব স্কুলেই প্রথম নির্ধারক পরীক্ষা (First Periodic Assessment) হয়ে গেছে, গরমের ছুটির সময়েও বই ছিল না, এদিকে স্কুল খুললেই পরীক্ষা। কোনও স্কুল PDF দিচ্ছে, কেউ বলছে ফটোকপি করিয়ে নাও। প্রত্যন্ত বা গ্রামের ছাত্র যাদের ইন্টারনেট নেই সে কী করবে? 

২) ৬ষ্ঠ বিষয়ের বদল: আগে ৫টি মূল বিষয় + ৬ষ্ঠ বিষয় হিসেবে Computer, Sanskrit, Art Education ইত্যাদি ঐচ্ছিক ছিল। এখন অনেক স্কুলে হঠাৎ করে ৬ষ্ঠ বিষয় বদলে দেওয়া হচ্ছে। যে ছাত্র অষ্টম শ্রেণি অবধি Computer পড়েছে, নাইনে এসে তাকে Skill Subject নিতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাতে কলমে কৃষিকাজও শেখানো হবে। কিন্তু জায়গা কোথায়? জমি কে দেবে? তার কোনও নির্দেশিকা নেই। শুধুমাত্র  এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত চারবার ৬ষ্ঠ বদল করেছে CBSE বোর্ড। সুতরাং, ভবিষ্যতের stream selection ঝুঁকির মুখে। ফলে, যে ছাত্র কম্পিউটার নিয়ে ভবিষ্যতে পড়ার স্বপ্ন দেখত, তার স্বপ্নও বিঁশ বাও জলে।

৩) Third Language (তৃতীয় ভাষার) বাধ্যবাধকতা: NEP অনুযায়ী ক্লাস 9-10'এ ৩টি ভাষা বাধ্যতামূলক। হিন্দি, ইংরেজির সঙ্গে এখন তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মানি, বাংলা, উড়িয়া ইত্যাদি নিতে হচ্ছে। সমস্যা হল, অনেক স্কুলে তৃতীয় ভাষার শিক্ষকই নেই। ছাত্ররা ৮ বছর ধরে দুটি ভাষা পড়ে এসে হঠাৎ তৃতীয় একটি নতুন ভাষা কীভাবে রপ্ত করবে? বোর্ডের পরীক্ষায় এই বিষয়ের নম্বর যোগ হবে কিনা, তা নিয়েও স্পষ্টতা নেই। ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই 'দিশেহারা-- পরীক্ষায় কী আসবে? বই তো নেই; তৃতীয় ভাষায় ফেল করলে কী হবে?' এই প্রশ্নেই সবাই জেরবার। 

আরও মারাত্মক হল, পরীক্ষার খাতা অভিভাবকদের দেখতে না দেওয়া। তার ফলে আমাদের বোঝার ক্ষমতা নেই যে নম্বর ঠিক দেওয়া হচ্ছে কিনা বা কোন প্রশ্নের উত্তর কেমন ভাবে লিখে কত নম্বর পাওয়া যাবে। স্কুল বলছে, বোর্ডের নির্দেশ বাচ্চাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে যাতে তারা নিজেদের Assessment নিজেরাই করতে পারে। তা বলে সেটা এই ডামাডোলের মধ্যেই? বই নেই, সিলেবাস বদল, এই অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেই সেটা করতে হবে?

শিক্ষকদের সমস্যা আরও ভয়ঙ্কর। পুরনো বই দিয়ে নতুন সিলেবাস মেলাতে হচ্ছে। নতুন পেডাগগির জন্য workshop-এর চাপও আছে। ফলে, পড়ানোর সময় কম, paper work বেশি, অতএব অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে  দ্বিগুণ কোচিং ফি দিয়ে বাচ্চাকে ভরতি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, স্কুলে যা হচ্ছে তাতে  ভরসা রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্যর কারণে বেশির ভাগ মেধাবী ছাত্রদেরই পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে, অনীহা দেখা দিছে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রতি বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছাত্র এবং অভিভাবক দুজনেই এতকাল বেসরকারি বা প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে সুবিধা হবে বলে মোটা মাইনের বেসরকারি CBSE স্কুলের উপরই ভরসা করে এসেছিলেন। কিন্তু এখন সেখানেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিত্য নতুন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। অনেক ছাত্রই মানসিক অবসাদে ভুগছে। 

NEP 2020-এর লক্ষ্য শিক্ষার কেন্দ্রিকরণ, যাতে গ্লোবাল, যুক্তিবাদী, দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা যায়। কিন্তু রাস্তা যদি গর্তে ভরা হয়, তাহলে গাড়ি যতই ভালো হোক গন্তব্যে পৌঁছবে না। ভারতের মতো বৈচিত্রপূর্ণ  দেশে 'এক শিক্ষানীতি' কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সব আলাদা। তাই কেন্দ্রে বসে এক সিলেবাসে ১৪০ কোটি ছাত্রকে না পড়িয়ে শিক্ষানীতির বিকেন্দ্রিকরণ করলে স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি শিল্প, ভাষা, সংস্কৃতির মধ্যে একটা সুসংহত মেলবন্ধন ঘটবে। যখন প্রতিটি রাজ্য নিজের মতো করে শিক্ষা মডেল বানাবে, তখন হিমাচল-কেরালা-পশ্চিমবঙ্গ একে অপরের থেকে শিখবে। বিকেন্দ্রিকরণ মানে 'ভেঙে দেওয়া' নয়। বরং 'সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগোনো'। সমবায়ী যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ছাঁচে শিক্ষানীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে-- পুরো বিকেন্দ্রিকরণও হবে না আবার কেন্দ্রের দায়িত্বও থাকবে, যেমন NCERT Framework, শিক্ষার ন্যূনতম মান, জাতীয় পরীক্ষা, স্কলারশিপ, শিক্ষক ট্রেনিং, টাকা দেওয়া ও তার যথোপযুক্ত ব্যবহার হছে কিনা তা দেখা ও পরিদর্শন করা।

তবে সবার প্রথমেই দরকার প্রস্তুতি, যাতে ছাত্ররা বই, ভাষা ও সিলেবাসের জাঁতাকলে আটকে না পড়ে। যেমন, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মার্চের মধ্যে বই, সিলেবাস ও নমুনা প্রশ্নপত্র প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা,  মাঝপথে সিলেবাস কাটছাঁট না করা, বই ও শিক্ষকের নিশ্চয়তা স্থাপন, এপ্রিলের মধ্যে প্রতিটি স্কুলে বই পৌঁছে দেওয়া, খালি শিক্ষকের পদ তিন মাসের মধ্যে পূরণ, তৃতীয় ভাষার জন্য শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তা ঐচ্ছিক রাখা, কোচিং মাফিয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। ধাপে ধাপে পরিবর্তন করা যাতে ছাত্ররা দিশেহারা বোধ না করে। প্রতি বছর একটি করে পরিবর্তন আনা। বই ও ডিজিটাল দুটোই পাশাপাশি চলুক, কিন্তু বইয়ের বিকল্প হিসেবে নয়। সর্বোপরি, সিলেবাস ও নীতি তৈরির সময় ছাত্র প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। সার্কুলার নয়, এক মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় CBSE-এর Mentor Teacher নিয়োগ করতে হবে, প্রতিটি ব্লকে দিতে হবে বিনামূল্যে বই।

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে 'উপর থেকে হুকুম, নিচে কে ভুগছে কেউ দেখে না'— এই মানসিকতা থেকেই এই আন্দোলনের উত্থান। NEET পেপার ফাঁসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার পচন— পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং ছাত্রদের প্রতি উদাসীনতা। দেশের পনেরোটি শহরে CJP-র প্রতিবাদের মূল স্লোগান ছিল 'বই দো, শিক্ষক দো, ভবিষ্যৎ বাঁচাও'। শিক্ষা ব্যবসা নয়, আমাদের অধিকার-- এই দাবিতেই প্রতীকীভাবে তারা ছেঁড়া বই, খালি ব্যাগ নিয়ে মিছিল করেছে; বলেছে, 'আমাদের হাতে বই নেই, তাই খালি ব্যাগ নিয়েই স্কুল যাচ্ছি।' 

যখন সিস্টেম ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তাই শেষ কথা। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ তাই একটা প্রজন্মের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। কে বলতে পারে, আমাদের বাচ্চারা যারা আজ  সরকারি শিক্ষানীতির জাঁতাকলে ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারাই আবার কোনদিন ইঁদুরের আন্দোলন সংঘটিত করবে কি না!


Monday, 27 July 2026

যুব-রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

গণতন্ত্র নির্বাচন পরিধির বাইরে বিস্তৃত 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-এর যন্তর মন্তর আন্দোলনকে সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। পরবর্তীকালে ইতিহাস এর নেতৃত্বের চরিত্র কিংবা প্রতিটি নির্দিষ্ট দাবির যৌক্তিকতা কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায় যে, আন্দোলনটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মধ্যেকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর তাৎপর্য কেবল একজন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা সরকারের আলোচনায় বসার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর বৃহত্তর তাৎপর্য নিহিত আছে এই বিষয়টিতে যে, কীভাবে প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে উঠে আসা একটি উদ্যোগ জনমতকে সংহত করে নীতি নির্ধারণের স্তর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারল।

বিগত কয়েক দশকে ভারতে বড় আন্দোলন বলতে সাধারণত রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন বা প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বকেই বোঝানো হত। কিন্তু CJP-র ক্ষেত্রে সেই কাঠামো অনুপস্থিত ছিল। সূচনাটা হয়েছিল ডিজিটাল পরিসরে। পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ এবং ব্যঙ্গ প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখান থেকে সেই অসন্তোষ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় শারীরিক জমায়েতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রদের সমাবেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে বাধ্য করে। সোনম ওয়াংচুক'কে জোরজবরদস্তি যন্তর মন্তর থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে ছাত্রদের উপর পুলিশের ব্যাপক লাঠিচার্জের ফলে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে এবং যন্তর মন্তরে জনতার ঢল নামে, তারই ফলশ্রুতিতে অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। বর্তমান সরকারের আমলে জনচাপের মুখে মন্ত্রী স্তরে এই ধরনের পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে বিরল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরীক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেয় এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আইন মোতাবেক পদক্ষেপের কথা বলে। এই প্রেক্ষাপটেই আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।

আমরা জানি, উদার গণতন্ত্রের বৈধতা শুধুমাত্র নিয়ম ভিত্তিক নির্বাচনের উপর নির্ভর করে না। নির্বাচন হল বৈধতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু বৈধতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জবাবদিহিতা। এই জবাবদিহিতা আসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সক্রিয় বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। এই অর্থে প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের ব্যত্যয় হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং এটি গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত স্ব-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার একটি অংশ। বিশ্ব ইতিহাসে বহু সংস্কারই সম্ভব হয়েছে। কারণ, নাগরিক সমাজ যখন দেখেছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে তখন তারা সম্মিলিতভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। CJP-র আন্দোলন সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি। এটি প্রমাণ করেছে, ভারতের মতো একটি বৃহৎ এবং জটিল গণতন্ত্রেও জনমত নীতি এবং শাসনকে প্রভাবিত করা যায়।

এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যুব অংশগ্রহণের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনা। গত এক দশকে রাজনৈতিক ভাষ্যে একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ ছিল যে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের অংশগ্রহণ মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ এবং তা বাস্তব রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয় না। যন্তর মন্তরের অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট-ভিত্তিক আলোচনা এবং ব্যঙ্গ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের উপস্থিতিতে। অংশগ্রহণকারীরা গরম ও রোদ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি সত্ত্বেও টানা অবস্থান বজায় রাখেন। এই প্রক্রিয়া দেখিয়ে দেয় যে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কেবল বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করে না, বরং তা বাস্তব রাজনৈতিক সংহতির একটি অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে পারে। NEET-এর অনিয়ম সরাসরি লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করেছিল। সেই কারণেই বহু তরুণ, যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক আন্দোলনে ছিল না, তারাও এই উদ্যোগে যুক্ত হন।

ভারতে আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার তাৎপর্য ছিল ভিন্ন। একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং শিল্পের ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই আবহে পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে তা শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্যা নয়, সামাজিক গতিশীলতার যে প্রধান মাধ্যমগুলি আছে তার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন। কারণ, ভারতে বহু পরিবারের কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই হল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও পেশাগত উন্নতির প্রধান পথ।

এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জবাবদিহিতার উপর জোর দেওয়া। সাধারণত কোনও সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ভবিষ্যতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। কিন্তু এখানে আন্দোলনকারীরা দাবি তোলেন যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। জনবিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত লাগলে শুধুমাত্র নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও সামনে এসে দায় স্বীকার করতে হতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রীর দায়বদ্ধতা একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রীতি। এখানে সরাসরি ব্যক্তিগত অসদাচরণ প্রমাণিত না হলেও দফতরের ব্যর্থতার দায় মন্ত্রীকে নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে CJP-র দাবি ভারতীয় রাজনীতিতে সেই রীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে ইঙ্গিত করে।

সংগঠনের কাঠামোর দিক থেকেও এই আন্দোলন ছিল ভিন্ন। পূর্ববর্তী বহু বড় আন্দোলন কোনও জাতীয় রাজনৈতিক দল বা একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। CJP-র ক্ষেত্রে সেই কেন্দ্রীয়তা ছিল না। এর শক্তির উৎস ছিল বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক। স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্র, পেশাজীবী, স্বাধীন কর্মী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা যোগাযোগই ছিল মূল ভিত্তি। অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে কর্মসূচি রূপায়ণ, সবই হয়েছে অপেক্ষাকৃত অ-শ্রেণিবদ্ধ পদ্ধতিতে। এটি ডিজিটাল যুগের নাগরিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ধরনের কাঠামোর সুবিধা হল, এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বেশি এবং নেতৃত্বের উপর নির্ভরতা কম থাকে। তবে এর অসুবিধা হল, দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক স্থিতি বজায় রাখা এবং একটি সুসংহত নীতিগত রূপরেখা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বললে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর এর প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। বহু প্রথমবারের অংশগ্রহণকারীর জন্য এই আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ। আলোচনা, বিক্ষোভ, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপ এবং আইনি প্রক্রিয়া— এই সমস্ত অভিজ্ঞতা তাদের নাগরিক চেতনাকে গঠন করেছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা দেখায় যে কম বয়সে নাগরিক অংশগ্রহণ পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায়। সেই যুক্তি মেনে নিলে বলা যায়, CJP-র প্রকৃত উত্তরাধিকার এমন একটি প্রজন্মের উত্থান যারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে ইতিহাস বলে যে, অনেক সফল আন্দোলনই প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের পর গতিশীলতা হারায়। এর কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, নেতৃত্বের সংকট, আদর্শগত বিভাজন অথবা জনসাধারণের মনোযোগের অভাব। রাজপথের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে না পারলে আন্দোলনের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। এর জন্য প্রয়োজন টেঁকসই নীতি প্রস্তাব, সাংগঠনিক তদারকি এবং নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ। CJP এই পথে কতটা অগ্রসর হতে পারবে তা এখনও সময়ের অপেক্ষা।

সরকারের জন্যও এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। নির্বাচনী বিজয় গণতান্ত্রিক বৈধতার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়। শাসন পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, সংবেদনশীলতা এবং জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হয়। যখন প্রতিষ্ঠানগুলি নাগরিকদের উদ্বেগকে সময়মতো সম্বোধন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অসন্তোষ জমতে থাকে। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সেই জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। এই অর্থে CJP-কে শুধুমাত্র একজন মন্ত্রী বা একটি পরীক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে বিষয়টিকে সরলীকরণ করা হবে। বরং এটি ছিল ন্যায্যতা, সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, CJP-র যন্তর মন্তর আন্দোলন ভারতীয় গণতন্ত্রের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, যদিও সেটি প্রতীকীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ; এর বড় অবদান হল এটি পুনরায় প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত পরিবেশেও শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিবাদ শাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নির্বাচনের গণ্ডির বাইরে বিস্তৃত। তরুণ নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনে তারা সংগঠিত হতে পারে। আর কোনও সরকারই টানা শান্তিপূর্ণ জন-আন্দোলনকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। এটি জেপি আন্দোলন, ২০১১-এর দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন বা ২০১৯-২০'র কৃষক আন্দোলনের মতো যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা তা নির্ভর করছে পরবর্তী বছরগুলিতে নীতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ার উপর। আপাতত এটি সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে যুব-নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল যার চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনও বাকি।


Sunday, 26 July 2026

জয়তু নতুন প্রজন্ম

যা পেলাম  তা দুর্লভ

কৃশাণু মিত্র



কী পাইনি তার হিসাব আজ মেলাব না। ককরোচ আন্দোলন এই দিশাহারা সময়কে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই বরং কী কী পাওয়া গেল, তা খতিয়ে দেখি।

১) নতুন সময়ের নেতৃত্ব

আমরা তথাকথিত সবজান্তারা আলোচনা সভায়, মিছিলে, গণসংগঠনে যাদের মুখ দেখি, তাদের বাইরেও যে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রয়েছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমরা ভেবেছিলাম, সমাজের দায়িত্ব বোধহয় কেবল আমাদেরই। আর ওরা? ওরা নাকি মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত! অথচ প্রযুক্তির ব্যবহার করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া, গোদি মিডিয়াকে ছাপিয়ে ও আইটি সেলের প্রোপাগান্ডাকে কার্যত গুনতিতে নস্যাৎ করে ভারতবাসীর মন জয় করে নেওয়ার কাজ তারাই করে দেখাল।

২) পেলাম লক্ষ লক্ষ সাংবাদিক

যারা স্পনসর্ড গোদি মিডিয়াকে গণতান্ত্রিক পথেই বাণপ্রস্থে পাঠিয়ে দিতে পারে। গোদি মিডিয়া যখন কদর্য ভাষ্যে সমাজে বপন করছে কূট বিষ, তখন এই লক্ষ লক্ষ তরুণ তাদের মোবাইলে, কম্পিউটারে নির্মাণ করছে রিল, মিম আর নবতর ভাষ্য ও স্বপ্ন। এরাই প্রকৃত সাংবাদিক ও মিডিয়া।

৩) শিখলাম সাংস্কৃতিক লড়াই

মজে যাওয়া খাত ভরে উঠল নতুন প্লাবনে। বিহার ও যন্তর মন্তরের ব্যঙ্গাত্মক গান আজ মনের মণিকোঠায় হিল্লোল তোলে। রঙ্গ-তামাশাও যে প্রতিবাদের পথ হতে পারে, তা আমরা ভাবিনি। যখন কোনও পড়ুয়া পুলিশকে গিয়ে বলে, 'আমায় ডান্ডা মারো', তখন বিশ্বের মানুষের বুক রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। 'দেওয়ালে দেওয়ালে' নয়, প্রযুক্তির হাত ধরে সবুজের বার্তা পৌঁছে যায় আপামর জনসাধারণের ঘরে ঘরে। মিম, কার্টুন, কবিতা, রিল— নিরন্তর তৈরি হতে থাকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের সৃজনশীল সত্তাকে মিলিয়ে। যাকে বয়স্করা সর্বনাশ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, নবীনরা তাকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করে তুলল। রাষ্ট্রকে নিয়ে এমন মশকরা আমরা কস্মিনকালেও দেখিনি। আমরা জানতাম, রাষ্ট্র মানেই লেফট-রাইট; তার সঙ্গে যুদ্ধ মানেই 'লেফ্টিও রাইট' (আমার কাছে যার অর্থ, বামেদের বহু ব্যবহৃত অথচ বিফল পথ)। ইংল্যান্ড প্রবাসী এক পুত্র মুম্বই থেকে তার বাবা-মাকে যন্তর মন্তরে পাঠিয়েছে এই বলে— 'বাবা, তুমি আমার হয়ে পুলিশের কাছে একটা ডান্ডা খেয়ে এসো।'

৪) ঘুচে গেল নারী-পুরুষের বিভেদ

অগণিত তরুণ-তরুণীর সমাবেশ যেখানে নারীশক্তির কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারত, সেখানে নারীরা ছিলেন নির্ভয়। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তার কারণ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারীদের মানসিকতা, নাগরিক ও GenZ জমায়েত নয়— এমন উপলব্ধিও সামনে এসেছে। প্রতিবাদ আর নারীমুক্তি পাশাপাশি হেঁটেছে। মেয়েরা কেবল সংসার করবে, লেখাপড়া করবে না— এই মনুবাদী, তালিবানী রাষ্ট্র-ন্যারেটিভ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আগ্রাসনে ভেঙে পড়েছে। কন্যাসমা একজন যখন হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট নিয়ে বলে, 'পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক করে, আমার ন্যাপকিন নয়', তখন পরিবারের মনুবাদী একনায়কত্ব খানখান হয়ে যায়। আমি এই প্রজন্মকে, এই কন্যাকে প্রণাম করি। এই প্রজন্ম পরিবারের ভীত-সন্ত্রস্ত জ্যেষ্ঠদেরও শিক্ষা দিতে পেরেছে।

৫) ধর্ম যখন ভাই-ভাই 

জুনেইদ ভাই ও তাঁর সঙ্গীরা দেখিয়েছেন কাকে বলে মানবধর্মী উৎসব। ককরোচদের ধর্ম নিরপেক্ষ মানসিকতা ও শিখ সম্প্রদায়ের পাগড়ি দান রবীন্দ্রনাথের ‘মহামানবের সাগরতীরে’ যেন ভারতবাসীকে হাজির করেছে। গরু-গোবর, হনুমান কিংবা হিন্দুত্ববাদী বহু ন্যারেটিভ মুহূর্তেই খসে পড়েছে। এক প্রতিবাদী জনৈক RAF জওয়ানকে বলছে, 'আমি পাকিস্তানি, আমাকে গুলি করো।' ভোটের রাজনীতির জন্য রাষ্ট্র যে সব উপাদানকে ব্যবহার করেছে, পড়ুয়ারা তা ওলটপালট করে দিয়েছে। রাষ্ট্রকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে।

৬) মেটামরফোসিস

'আরশোলারা কি এক জায়গায় হতে পারে না?' অভিজিৎ দিপকে'র এই আকাঙ্ক্ষা থেকে ককরোচদের যে উত্থান এবং অভিজিতের দেশে ফিরে আসা, যেন কাফকার 'মেটামরফোসিস'। সোনম ওয়াংচুক যেন পেট্রোল চালিত ইঞ্জিনের স্পার্ক প্লাগ। 'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে…'— জ্বলে উঠল আকাশ-বাতাস, গান্ধীর পথে। যেখানে বস্তু পোড়ে না, পোড়ে প্রতিটি মানুষের মন। আত্মদহন পরশমণি হয়ে ভুল-ঠিক চেনার পথ দেখিয়ে দেয়।

৭) আন্দোলনের পথ

আন্দোলনের ধারার যে পরিচিত রূপ দেখা যায়— ধরা যাক জঙ্গলের লড়াই— সেখানে কত বীর শহিদ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যদি ভগৎ সিং কিংবা তাঁর সমসাময়িক স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের কথাও ভাবি (যদিও সেই যুগে মিডিয়া আজকের মতো সর্বব্যাপী ছিল না), তাহলে দেখব, অনশন এমন একটি পথ যা বিপথগামী সমাজ মানসে আত্মদহনের কাজ করে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের অবস্থান পরিবর্তন করে অনশন। এই পর্যায়টি আদতে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যে বাচ্চারা অনশনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রণাম করে বলি—

'জয়তু নতুন প্রজন্ম। অনেক শেখালে।'


Wednesday, 22 July 2026

২০ জুলাই সারাদিন

যে যেখানে  লড়ে যায় আমাদেরই লড়া...

অভিষেক



বর্ষাস্নাত জুলাই। ১৯ তারিখ। হাওড়া স্টেশন। সকাল আটটা পনেরো। পূর্বা এক্সপ্রেস ছেড়ে দিল দিল্লির উদ্দেশ্যে। ১ সপ্তাহ ধরে টিকিট চেষ্টা করেছি, পাইনি। তৎকালে বুকিং পেয়ে গেলাম অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে…

গন্তব্য অবশ্যই দিল্লি। নিট পরীক্ষায় দুর্নীতি বহু ছাত্রের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে ২১ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। আমরা সেই খবর জানি। একটি সর্বভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই তীব্র অনৈতিকতা আমার ওপরেও প্রভাব ফেলেছে অনেকখানি। ঠিক করে ফেলি, দিল্লি যাব, যন্তর-মন্তরে যুক্ত হব আরশোলাদের আন্দোলনের সঙ্গে। সর্বোপরি, সোনম ওয়াংচুক স্যার'এর তত্ত্বাবধানে সিজেপি যে আহ্বান জানিয়েছে দেশের যুবসমাজ সহ সমস্ত শিক্ষানুরাগীদের কাছে, সেখানে যোগদান করব। চলো সংসদ, ২০ জুলাই।

ট্রেন ছাড়ার পর বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা অতিক্রম করে তা ধানবাদে থামল দুপুর ১২টা নাগাদ। এরপর ট্রেন যত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে থেমেছে, যেমন গয়া, রফিগঞ্জ, সাসারাম, মুঘলসরাই, এলাহাবাদ, ইটাওয়া, আলিগর ইত্যাদি সমস্ত স্টেশনে যাত্রী উঠছেন। বহু সংখ্যায়। তাদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ ছাত্রছাত্রী অথবা শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষতিকর শিক্ষানীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব তাদের ওপর পড়েছে। আসন সংরক্ষিত না থাকলেও এঁরা উঠে পড়ছেন এবং অদম্য মনোবল নিয়ে ট্রেনের যে কোনও স্থানে একটু জায়গা পেলেই নিজেকে আঁটিয়ে নিচ্ছেন কোনওক্রমে। প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও পরে তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি। সবার গন্তব্য একই। শিক্ষা ক্ষেত্রে দিল্লি সরকারের কাজকর্মে সবাই তিতিবিরক্ত। সময় যত এগোচ্ছে, হৃদ্যতা বাড়ছে। এরা সবাই কমন হোয়াটসএপ গ্রুপ বানিয়েছেন, যাতে দুরন্ত ভীড়ে প্রিয়জনেরা কাছছাড়া না হয়। আমাকেও সদস্য করলেন সেই গ্রুপের। বেশিরভাগের বয়স কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে।

রাত কাটল। ২০ তারিখ সকাল। সকাল ৬টায় দিল্লি স্টেশনে ঢোকার কথা ট্রেনের। ঢুকল প্রায় সাতটায়। স্টেশন থেকে বেরতে বেরতে দেখি অনুসন্ধান কেন্দ্রে প্রচুর ভীড়। স্টেশনে উপস্থিত মানুষজন একটু চিন্তিত, উদভ্রান্ত। দিল্লিগামী অনেক ট্রেন নাকি বাতিল হয়েছে এবং কিছু ট্রেন সময়ের থেকে দেরিতে চলছে। প্রথমে সন্দেহ হলেও পরে বুঝলাম, সরকার তার খেলা শুরু করে দিয়েছে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা ক্যাব নিয়ে যন্তর মন্তর গেলাম। চালক আমাকে একটু দূরেই নামালেন। রাস্তা ধরে যেতে গিয়ে দেখি, অনেক রাস্তায় লোহার বেষ্টনী ব্যবহার করে যানের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। 

যন্তর মন্তরে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। আসার পথে দেখেছি, মেট্রো স্টেশনগুলি থেকে কাতারে কাতারে মানুষ বেরিয়ে আসছেন। এক উর্দিধারী পুলিশকর্মী আমার সব কিছু চেক করলেন। আমার ফোনটা চাইলেন। অনেকক্ষণ দেখলেন। যাই হোক, মঞ্চে পৌঁছনোর আগে থেকেই প্রভূত ভিড়। সেখানে পুলিশ প্রহরা বেশি নেই। সাজোসাজো রব। ৯টায় শুরু হবে ঐতিহাসিক 'চলো সংসদ' মার্চ। 



শুরু হতে হতে প্রায় সাড়ে ন’টা হল। বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ব্যক্তি তাঁদের বক্তব্য রাখলেন, উপস্থিত থাকলেন, হাটলেন কিছুটা পথ। এরপর দশটা/ সাড়ে দশটা নাগাদ অনেকের মোবাইলে মেসেজ ঢুকতে থাকল– আপনাদের ইন্টারনেট বন্ধ করা হচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা গেল অনেকের মোবাইলে টাওয়ার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। সিগনাল দুর্বল। বোঝা গেল, সরকার শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার করছে। প্রবল ভীড়ের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণ অহিংসক উপায়ে জনতা হেঁটে চলেছে। আশেপাশের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলছি, তাঁদের উৎস জানছি। পঞ্জাব, হিমাচল, ইউপি, বিহার, এমপি, হরিয়ানা, রাজস্থান থেকে দলে দলে মানুষ এসেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁটছেন। অনেকে বলছেন, আজ পুলিশ প্রবল অত্যাচার করবে। ভাবলাম, নাহ্, অতটা বাড়াবাড়ি পুলিশ করবে বলে মনে হয় না। কারণ, ২ দিন আগেই সোনম স্যারকে অপহরণ করে পুলিশ মুখ পুড়িয়েছে, এর মধ্যেই এত তাড়াতাড়ি ওরা এতটা নিষ্ঠুর হবে না। পরে দেখলাম, ওরা নিষ্ঠুর নয় নৃশংস হল। কারণ, এটা দিল্লি পুলিশ।

মাঝখানে খবর এল, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা'কে ডেকে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। মিছিলের মধ্যেই অগোচরে আরএসএস তাদের চর পুঁতে রেখেছে। তারা গুজব ছড়াচ্ছে, অভিযান ফলপ্রসূ আর এগোনোর দরকার নেই, সরকার দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এ যে স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের মিছিল। এরা প্রবল পরাক্রমে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। দিল্লি পুলিশ ৩টে স্তরে নিরাপত্তা বেষ্টনী সাজিয়েছে। প্রথমটি ব্যর্থ হলে লাঠি চালাবে, তারপর টিয়ার গ্যাস এবং সবশেষে শ্যুট অ্যাট দ্য গেট। টিয়ার গ্যাস ও বন্দুক সজ্জিত গাড়ি চলাফেরা করছে একটু দূরে। 

যন্তর মন্তর থেকে সংসদ প্রায় ২ কিমি। আমরা সংসদ মার্গ ধরে হাঁটছি। এদিকে রাইসিনা রোড, রাজেন্দ্র প্রসাদ রোডে পিলপিল করে মানুষ জড়ো হচ্ছেন পায়ে পায়ে। সংসদে পৌঁছনোর প্রায় ৩/৪ টি পথ আছে। ভীড় বাড়ছে।

প্রায় সাড়ে বারোটা | এর তার ফোনে শুনতে পাচ্ছি, অনেকে পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করেছে। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি সামনের বিপুল জনতার ভীড় প্রবল গতিবেগে আমাদের দিকে ধাবমান একটা ঢেউএর মতো এসে পড়ছে। কোনওক্রমে ফুটপাথে সরে, তারপরে ফুটপাথের পাশে একটা উচু স্থানে উঠে প্রাণ বাঁচালাম। নচেৎ পদপিষ্ট হতাম হয়তো। বুঝলাম, সামনের দিকে কিছু একটা অশান্তি শুরু হয়েছে। এমনিতেই ভ্যাপসা গরম। ব্যাগে রাখা জল আর খাবার শেষ। রাস্তায় কোনও খাবার বা জল না থাকায় আমি ভীড় ছেড়ে আরও পেছনের দিকে চললাম। সংসদ মার্গ ছেড়ে বেরনোর পথে দেখি পুলিশ সেদিকেও ব্যারিকেড দিচ্ছে। মতিগতি বুঝলাম না। সকাল থেকে ব্রেকফাস্টও হয়নি। ভাবলাম কাছেপিঠে কোথাও একটা কিছু খেয়ে নিয়ে আবার এসে অবস্থানে ফেরা যাবে। আসার পথে শুনলাম দিপকে তাঁর অনশন তুলে নিয়েছেন।

ফিরে এলাম দেড়টা নাগাদ। এসে দেখি অবাক কাণ্ড– ঘটনাস্থলে প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ প্রবল লাঠিবর্ষণ শুরু করেছে নির্মম ভাবে। অনেকে আহত। আমি তো হতভম্ব। কী করব কিছু বোঝার আগেই দেখলাম অল্প দূরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়েছে। একটু বাদেই এলাকা ধোঁয়ায় ভর্তি। আমি কোনওক্রমে নাকে মুখে রুমাল চেপে দ্রুতগতিতে বেরবার পথ খুঁজছি। আবছা দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, র‍্যাফ লাঠি চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করছে জনতাকে।

পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে অনেকটা পথ পার হয়ে কনট প্লেসে এলাম। এদিকে চোখমুখ জ্বলছে। ব্যাগে একটা ছোট বোতলে স্যালাইন ওয়াটার ছিল। সেটা চোখে দিতে দিতে হাঁটতে থাকলাম। মোবাইল ফোনে চার্জ নেই। গাড়িও বুক করতে পারছি না। অনেকটা হেঁটে একটা দোকানে এসে ফোন চার্জ করলাম। এতক্ষণে ইন্টারনেট কানেকশন এসেছে। নেটে দেখলাম যন্তর মন্তরে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে দিল্লি পুলিশ। বাইরে বৃষ্টি। দোকানের মালিক বললেন, পুলিশ আন্দোলনকারীদের শকুনের মতো খুঁজছে আর পেলেই হেনস্থা করছে। বেরিয়ে গেলাম। কিছুটা হেঁটে আর কিছুটা ভাড়ার বাইকে চেপে এয়ারপোর্ট পৌছলাম।

সারাদিন এত তুলকালামের পর মাথা ভারী। সকালে অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তার থেকেও বেশি আশা নিয়ে দিল্লি ছাড়লাম। আজ স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের যে ঢল দেখলাম দিল্লির রাজপথে, বুঝলাম, ভারতের দুর্বলতাই ভারতের আসল শক্তি: ভারতের দেড়শো কোটি জনগণ…।