ইউরোপ জুড়ে তারুণ্যের বিক্ষোভ
শুভনীল চৌধুরী
প্রায় গোটা ইউরোপে ছাত্ররা রাজপথে। প্রতিবাদে মুখরিত প্যারিস থেকে বেলগ্রেড। ইতিমধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সার্বিয়ায় ১৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট থাকা আলেকজান্দার ভুচিক। বেলগ্রেডের রাস্তায় মানুষের ঢল, মানুষের উৎসব। ফ্রান্সে চলছে আন্দোলন, যা দিন কয়েক আগে হিংসাত্মক চেহারা নেয়। লাখো মানুষ রাস্তায়। আলবানিয়াতে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাণ্ডারীদের। তুলছে পালটে দেওয়ার স্লোগান। সোচ্চারে জানান দিচ্ছে, যে ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে, তার পরিবর্তন চায় তারা। কেন তারা রাস্তায় নেমে এত বড় গণআন্দোলন গড়ে তুলছে একটার পর একটা দেশে?
প্রত্যেকটি দেশের কার্যকারণ সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। প্রথমত, যে জেন-জি-র কথা এখন রাজনৈতিক ভাষ্যে সর্বত্র শোনা যাচ্ছে এবং আলোচিত হচ্ছে, তাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। যে ১৯৯৭ সালে জন্ম গ্রহণ করেছে, সে ১০ বছর পেরতে না পেরতে সম্মুখীন হয়েছে বিশ্ব অর্থব্যবস্থার এক ভয়াল সংকটের (সন ২০০৮)। এই সংকটের সময় গোটা পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছিল। কোনওরকমে নানান উপায়ে পুঁজিবাদ খাদের কিনার থেকে নিজেকে টেনে তোলে। আবার জেন-জি'দের যখন ২০-২১ বছর বয়স, তারা কলেজে, তাদের সম্মুখীন হতে হয় আরও একটি সংকটের: করোনা ভাইরাস ও তদজনিত লকডাউন। এর ফলে তাদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, তাদের বাবা-মায়েদের চাকরি যায় এবং গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে গোটা পৃথিবী। আবার তারা যখন বর্তমানে চাকরির সন্ধান করছে বা পড়াশোনা, তখন দিবারাত্রি শুনতে হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে আগামী দিনে চাকরি কমবে এবং আর্থিক বৈষম্য বাড়বে। তৈরি হচ্ছে এক গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তা। এই সব কিছুর পাশাপাশি ভুলে গেলে চলবে না যে বিশ্ব উষ্ণায়নের সংকট তীব্রতর হচ্ছে এবং আজকের যুব তথা আগামী প্রজন্ম যে পৃথিবীটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে তা এক উষ্ণ পৃথিবী যেখানে দিবারাত্রি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে।
যারা মনে করেন যে জেন-জি স্বার্থান্বেষী বা তাদের রাজনৈতিক বোধের অভাব রয়েছে তারা আসলে ধরতে পারছেন না যে এই একটি প্রজন্ম বিগত ৩০ বছরে যতরকম সংকটের সম্মুখীন হয়েছে তা এর আগে খুব কম প্রজন্ম একসাথে পেয়েছে। হ্যাঁ, ১৯১৪-১৯৪৫ সাল ছিল এক গভীর সংকটকাল যখন আর্থিক মন্দা, বিশ্বযুদ্ধ, ঠাণ্ডা লড়াই পৃথিবীকে খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল। ভুলে গেলে চলবে না, সেই সংকটের আবর্তেই জন্ম নিয়েছিল নতুন আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং ইউরোপ জুড়ে কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা। ১৯১৪-১৯৪৫ সালের পরে অন্তত ১৯৭০ সাল অবধি সমস্ত স্তরে ছিল মানুষের অগ্রগতির সময়। সেই অগ্রগতির সূত্রপাত ঘটেছিল সংকটকালের মধ্যে জন্ম নেওয়া বিবিধ আন্দোলনের মাধ্যমে। বর্তমানে জেন-জির বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ কী সেইরকমই কোনও ক্রান্তিকালের সলতে পাকাচ্ছে? এর উত্তর সময়ের গর্ভে।
এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করবেন আগামী দিনের ইতিহাসবিদ। আমরা আপাতত যেটা বুঝছি তা হল, এই যে বিবিধ রকমের সংকটের মধ্য দিয়ে জেন-জির বড় হয়ে ওঠা, তাই তাদের অস্থিরতা ও ক্ষোভের যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। তাদের বাবা-মায়েদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল ১৯৭০ পরবর্তী আবর্তে, যখন দুনিয়া জুড়ে নব-উদারবাদ প্রচারিত হয়ে চলেছে, বিশ্বায়নের বিজয় পতাকা একের পর এক দেশে উড়েছে। সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে বলা হয়েছিল, ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে। উদারপন্থী পুঁজিবাদ ব্যতিরেকে অন্য সমস্ত সমাজব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটেছে, অতএব, ইতিহাসের স্রোত এখন একমুখীন—প্রগতি এবং প্রগতি, যার অপর নাম বিশ্বায়ন। ২০০৮ সালের সংকট দেখিয়ে দিল যে এই ধারণা ভ্রান্ত ছিল। পুঁজিবাদের রথের চাকা আবারও গাড্ডায় পড়ে। আমেরিকাতে সেই চাকাকে তোলার জন্য সাহায্য নিতে হয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের। ইউরোপে কিছুটা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরে ব্যাঙ্ক কর্তারা তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে একের পর এক দেশে বাজেট ঘাটতি কম করার নীতি প্রচলন করেন। ব্যয় সংকোচের নামে মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়া অর্থ ক্রমশ কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলত, সামাজিক গণতন্ত্রের যে মডেলের জন্য ইউরোপ গর্ব বোধ করত তা সংকুচিত হতে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয় কমতে থাকে। বাবা-মায়েদের বোঝানো হয়েছিল, বিশ্বায়নের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাদের প্রগতির শিখর চূড়ায়। দেখা গেল, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ব্যতিরেকে সেই শিখর অধিকাংশের কাছে অধরাই থেকে গেল। বাড়তে থাকল আর্থিক বৈষম্য, কমতে থাকল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সরকারি ব্যয়।
এ হেন পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রজন্ম বুঝতে পারল যে তাদের বাবা-মায়ের দুনিয়া যে প্রতিশ্রুতিকে সত্যি বলে ভাবতে শিখেছিল তা আসলে এক মস্ত ভুলে পরিণতি পেয়েছে। ভাবা হয়েছিল যে শিক্ষা মুক্তি না আনুক চাকরি আনবে। কিন্তু দেখা গেল যে ফ্রান্সের মতো দেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি। স্কুলে শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে, ক্লাসে ছাত্রদের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার খরচ বেড়েছে কিন্তু গুণগত মান কমেছে। অতএব, স্কুল ছাত্ররা শিক্ষার উন্নতির দাবিতে ফ্রান্সে আন্দোলন শুরু করল যা শীঘ্রই এক গণআন্দোলনের চেহারা নিল। বাড়তে থাকা মূল্যবৃদ্ধি, কমতে থাকা মজুরি, বাড়তে থাকা বেকারত্ব ও শিক্ষার মানের হ্রাসের বিরুদ্ধে লাখো লাখো মানুষ ফ্রান্সের রাস্তায় নেমে এল। তৈরি হল ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণআন্দোলন।
সার্বিয়ায় ভুচিক যে সরকার চালিয়েছেন তা ধনীদের ধনী করেছে এবং গরিবদের আরও গরিব। মিডিয়াকে সরকারের ভৃত্যে পরিণত করে লাগাতার ভুচিকের পক্ষে প্রচার চালিয়ে সরকারের সমস্ত অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে একটি ট্রেন স্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়ে ১৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়। একে কেন্দ্র করেই প্রথম আন্দোলন দানা বাঁধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। ফ্রান্সের সঙ্গে সার্বিয়ার তফাত এখানেই। ফ্রান্সে আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছে স্কুল পড়ুয়ারা, সার্বিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। ২০২৪ সাল থেকে নানান গণতান্ত্রিক ও অহিংস পদ্ধতির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে এই বছরে এসে ভুচিক সরকারের পতন হয় ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করা ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ প্রার্থীদের কাছে। এই জয় সার্বিয়া তথা ইউরোপে গণআন্দোলনের শক্তিতে নতুন প্রাণ সঞ্চয় করেছে।
এই সমস্ত আন্দোলনের ফলে এটা পরিষ্কার, যে বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে কায়েম রয়েছে তার প্রতি বর্তমান জেন-জির বিশ্বাসে প্রবল ফাটল ধরেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এই মুহূর্তে বিশ্বায়নের পতন অবশ্যম্ভাবী অথবা ফ্রান্সের মতো দেশে বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসবে। কারণ দক্ষিণপন্থী শক্তি, বিশেষ করে ইউরোপের অভিবাসন বিরোধী এবং পরিযায়ী শ্রমিক বিরোধী শক্তিরাও যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। ফ্রান্সের আন্দোলন ও হিংসার পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে প্যারিস একটি মুসলমানদের শহর হয়ে যাচ্ছে এবং অভিবাসনকে কেন্দ্র করে ইউরোপ তথা ফ্রান্সের নরম নীতি এই আন্দোলনের জন্য দায়ী। সত্য এই যে, এই আন্দোলনে অনেক বেশি সংখ্যায় সাদা চামড়ার ফরাসিদের দেখা গেছে এবং আন্দোলনের মূল দাবির সঙ্গে অভিবাসনের কোনও সম্পর্ক নেই। তবু দক্ষিণপন্থীরা এই দায় অভিবাসীদের উপর চাপাতে চাইছে। জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, ফ্রান্সের উগ্র দক্ষিণপন্থী লে-পেনের প্রতি এই আন্দোলনের পরে সমর্থন বেড়েছে। আবার বামপন্থীদের প্রতিও সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু দক্ষিণপন্থার পরাজয় এখনও হয়নি। এর জন্য এখনও অনেক পথ চলতে হবে, অনেক পরিশ্রম করতে হবে।
ফ্রান্স-আলবানিয়া-সার্বিয়ার অভিঘাত ভারতের রাজনীতিতেও এসে পড়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি তথা জেন-জির আন্দোলনের মধ্যে আরএসএস সরসঙ্ঘচালক এখন বিদেশি হাতের গন্ধ পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে মোদী সরকার শক্ত হাতে দমন না করলে দিল্লিতে নাকি প্যারিস বা মার্সেইয়ের মতো হিংসা হবে। আমরা চোখের সামনে দেখলাম, দিল্লিতে পুলিশ প্রায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করে নিরপরাধ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের জেলে ভরছে, তাদের মারা হচ্ছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের মনে রাখা দরকার, ভগৎ সিং ফাঁসিতে চড়েছিলেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে, ক্ষুদিরাম ১৮ বছরে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তৎকালীন যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। তারও পরবর্তী পর্যায়ে, জরুরি অবস্থার সময় যারা আন্দোলন করেছিলেন তারা সবাই তরুণ ছিলেন-- লালু-নীতিশ থেকে শুরু করে সীতারাম ইয়েচুরি সবাই তাদের তারুণ্যে আন্দোলনের মাধ্যমে পরাজিত করেছিলেন তৎকালীন শাসককে। আবার রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিজেপি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চালিকা শক্তিও ছিল ভারতের তরুণ সমাজই। আবার আজ বিজেপি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হচ্ছে আজকের তরুণ সমাজ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আরএসএস-বিজেপির বোঝা উচিত যে তরুণরাই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি, বৃদ্ধরা নয়।
তরুণরা আরও বেশিদিন পৃথিবীতে থাকবে। তাদের ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে তার দায়িত্ব তারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে চাইছে। কারণ, যে বৃদ্ধতন্ত্র ভারত থেকে শুরু করে আমেরিকা অবধি রাজত্ব করছে তারা হিংসা ও পরমত অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে গোটা পৃথিবীর শান্তিকে ব্যাহত করছে। যে ব্যবস্থা একদা তরুণ এবং বর্তমান বৃদ্ধরা বানিয়েছিলেন, তা আজকের তরুণদের স্বপ্নগুলিকে বাস্তবায়িত করতে অপারগ। তাই দেশে দেশে তরুণরা ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছে।






