গণতন্ত্র নির্বাচন পরিধির বাইরে বিস্তৃত
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-এর যন্তর মন্তর আন্দোলনকে সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। পরবর্তীকালে ইতিহাস এর নেতৃত্বের চরিত্র কিংবা প্রতিটি নির্দিষ্ট দাবির যৌক্তিকতা কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায় যে, আন্দোলনটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মধ্যেকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর তাৎপর্য কেবল একজন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা সরকারের আলোচনায় বসার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর বৃহত্তর তাৎপর্য নিহিত আছে এই বিষয়টিতে যে, কীভাবে প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে উঠে আসা একটি উদ্যোগ জনমতকে সংহত করে নীতি নির্ধারণের স্তর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারল।
বিগত কয়েক দশকে ভারতে বড় আন্দোলন বলতে সাধারণত রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন বা প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বকেই বোঝানো হত। কিন্তু CJP-র ক্ষেত্রে সেই কাঠামো অনুপস্থিত ছিল। সূচনাটা হয়েছিল ডিজিটাল পরিসরে। পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ এবং ব্যঙ্গ প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখান থেকে সেই অসন্তোষ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় শারীরিক জমায়েতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রদের সমাবেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে বাধ্য করে। সোনম ওয়াংচুক'কে জোরজবরদস্তি যন্তর মন্তর থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে ছাত্রদের উপর পুলিশের ব্যাপক লাঠিচার্জের ফলে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে এবং যন্তর মন্তরে জনতার ঢল নামে, তারই ফলশ্রুতিতে অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। বর্তমান সরকারের আমলে জনচাপের মুখে মন্ত্রী স্তরে এই ধরনের পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে বিরল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরীক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেয় এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আইন মোতাবেক পদক্ষেপের কথা বলে। এই প্রেক্ষাপটেই আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।
আমরা জানি, উদার গণতন্ত্রের বৈধতা শুধুমাত্র নিয়ম ভিত্তিক নির্বাচনের উপর নির্ভর করে না। নির্বাচন হল বৈধতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু বৈধতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জবাবদিহিতা। এই জবাবদিহিতা আসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সক্রিয় বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। এই অর্থে প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের ব্যত্যয় হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং এটি গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত স্ব-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার একটি অংশ। বিশ্ব ইতিহাসে বহু সংস্কারই সম্ভব হয়েছে। কারণ, নাগরিক সমাজ যখন দেখেছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে তখন তারা সম্মিলিতভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। CJP-র আন্দোলন সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি। এটি প্রমাণ করেছে, ভারতের মতো একটি বৃহৎ এবং জটিল গণতন্ত্রেও জনমত নীতি এবং শাসনকে প্রভাবিত করা যায়।
এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যুব অংশগ্রহণের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনা। গত এক দশকে রাজনৈতিক ভাষ্যে একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ ছিল যে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের অংশগ্রহণ মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ এবং তা বাস্তব রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয় না। যন্তর মন্তরের অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট-ভিত্তিক আলোচনা এবং ব্যঙ্গ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের উপস্থিতিতে। অংশগ্রহণকারীরা গরম ও রোদ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি সত্ত্বেও টানা অবস্থান বজায় রাখেন। এই প্রক্রিয়া দেখিয়ে দেয় যে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কেবল বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করে না, বরং তা বাস্তব রাজনৈতিক সংহতির একটি অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে পারে। NEET-এর অনিয়ম সরাসরি লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করেছিল। সেই কারণেই বহু তরুণ, যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক আন্দোলনে ছিল না, তারাও এই উদ্যোগে যুক্ত হন।
ভারতে আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার তাৎপর্য ছিল ভিন্ন। একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং শিল্পের ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই আবহে পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে তা শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্যা নয়, সামাজিক গতিশীলতার যে প্রধান মাধ্যমগুলি আছে তার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন। কারণ, ভারতে বহু পরিবারের কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই হল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও পেশাগত উন্নতির প্রধান পথ।
এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জবাবদিহিতার উপর জোর দেওয়া। সাধারণত কোনও সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ভবিষ্যতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। কিন্তু এখানে আন্দোলনকারীরা দাবি তোলেন যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। জনবিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত লাগলে শুধুমাত্র নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও সামনে এসে দায় স্বীকার করতে হতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রীর দায়বদ্ধতা একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রীতি। এখানে সরাসরি ব্যক্তিগত অসদাচরণ প্রমাণিত না হলেও দফতরের ব্যর্থতার দায় মন্ত্রীকে নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে CJP-র দাবি ভারতীয় রাজনীতিতে সেই রীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে ইঙ্গিত করে।
সংগঠনের কাঠামোর দিক থেকেও এই আন্দোলন ছিল ভিন্ন। পূর্ববর্তী বহু বড় আন্দোলন কোনও জাতীয় রাজনৈতিক দল বা একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। CJP-র ক্ষেত্রে সেই কেন্দ্রীয়তা ছিল না। এর শক্তির উৎস ছিল বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক। স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্র, পেশাজীবী, স্বাধীন কর্মী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা যোগাযোগই ছিল মূল ভিত্তি। অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে কর্মসূচি রূপায়ণ, সবই হয়েছে অপেক্ষাকৃত অ-শ্রেণিবদ্ধ পদ্ধতিতে। এটি ডিজিটাল যুগের নাগরিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ধরনের কাঠামোর সুবিধা হল, এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বেশি এবং নেতৃত্বের উপর নির্ভরতা কম থাকে। তবে এর অসুবিধা হল, দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক স্থিতি বজায় রাখা এবং একটি সুসংহত নীতিগত রূপরেখা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বললে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর এর প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। বহু প্রথমবারের অংশগ্রহণকারীর জন্য এই আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ। আলোচনা, বিক্ষোভ, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপ এবং আইনি প্রক্রিয়া— এই সমস্ত অভিজ্ঞতা তাদের নাগরিক চেতনাকে গঠন করেছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা দেখায় যে কম বয়সে নাগরিক অংশগ্রহণ পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায়। সেই যুক্তি মেনে নিলে বলা যায়, CJP-র প্রকৃত উত্তরাধিকার এমন একটি প্রজন্মের উত্থান যারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে ইতিহাস বলে যে, অনেক সফল আন্দোলনই প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের পর গতিশীলতা হারায়। এর কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, নেতৃত্বের সংকট, আদর্শগত বিভাজন অথবা জনসাধারণের মনোযোগের অভাব। রাজপথের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে না পারলে আন্দোলনের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। এর জন্য প্রয়োজন টেঁকসই নীতি প্রস্তাব, সাংগঠনিক তদারকি এবং নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ। CJP এই পথে কতটা অগ্রসর হতে পারবে তা এখনও সময়ের অপেক্ষা।
সরকারের জন্যও এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। নির্বাচনী বিজয় গণতান্ত্রিক বৈধতার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়। শাসন পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, সংবেদনশীলতা এবং জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হয়। যখন প্রতিষ্ঠানগুলি নাগরিকদের উদ্বেগকে সময়মতো সম্বোধন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অসন্তোষ জমতে থাকে। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সেই জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। এই অর্থে CJP-কে শুধুমাত্র একজন মন্ত্রী বা একটি পরীক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে বিষয়টিকে সরলীকরণ করা হবে। বরং এটি ছিল ন্যায্যতা, সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, CJP-র যন্তর মন্তর আন্দোলন ভারতীয় গণতন্ত্রের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, যদিও সেটি প্রতীকীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ; এর বড় অবদান হল এটি পুনরায় প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত পরিবেশেও শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিবাদ শাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নির্বাচনের গণ্ডির বাইরে বিস্তৃত। তরুণ নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনে তারা সংগঠিত হতে পারে। আর কোনও সরকারই টানা শান্তিপূর্ণ জন-আন্দোলনকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। এটি জেপি আন্দোলন, ২০১১-এর দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন বা ২০১৯-২০'র কৃষক আন্দোলনের মতো যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা তা নির্ভর করছে পরবর্তী বছরগুলিতে নীতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ার উপর। আপাতত এটি সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে যুব-নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল যার চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনও বাকি।




