Friday, 11 September 2026

স্কুল না বাঁচলে...

দেয়াল নয় ভবিষ্যৎ চাই

সোমা চ্যাটার্জি



কোভিড পরবর্তীকালে ভারতের রাজনীতিতে যে পালাবদল ঘটেছে তার মধ্যে ককরোচ আন্দোলনের ভূমিকা শুধু অনস্বীকার্যই নয়, বলা যায় সবচেয়ে বেশি। কোভিডের আগে ভোট হত জাতপাত, ধর্ম নিয়ে,  আন্দোলন করত কৃষক, শ্রমিক ইউনিয়ন। কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে বাড়ি ফেরার ছবি দেখে সবাই সত্যটা বুঝতে পারল যে সমস্যা ব্রাহ্মণ, দলিত, মুসলিম, বাঙালি বিভাজনে নয়, আসল সমস্যা কাজ নেই, চাকরি নেই, নেই কোনও ভবিষ্যৎ। 

গড়ে উঠল এমন এক অভূতপূর্ব আন্দোলন যেখানে প্রতিবাদীর ভুমিকায় ডিগ্রিধারী বেকার— যার হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু চাকরি নেই। ককরোচ জনতা পার্টি হল সেই নতুন প্রজন্মের প্রথম রাজনৈতিক মঞ্চ যারা শুধুমাত্র মিম বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, নীট পরীক্ষার দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে যন্তরমন্তর'এর ধর্না থেকে পার্লামেন্টকে নাড়িয়ে দিয়েছে, নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে সরকারের; শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে ছেড়েছে, পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে প্রায় ৩০ কোটি জেন জি'র মনে এবং তার আঁচ পড়েছে  পরবর্তী প্রজন্ম জেন আলফা'র মধ্যেও। ককরোচ আন্দোলনের পর জেন আলফা'র বিদ্রোহে স্কুলের বাচ্চারাও নেমেছে রাস্তায়। তাদের স্লোগান 'স্কুল ঠিক করো', নইলে ককরোচরা স্কুল ঠিক করবে । 

এর শুরুটা কিন্তু হয়েছিল অন্য ভাবে । স্বাধীনতা দিবসের আগে গত ১০ অগস্ট ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দেশের স্কুলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও স্বাধীনতার আশি বছর পরেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা নিয়ে একটি ভিডিওতে ঘোষণা করেন যে, তাঁদের নতুন আন্দোলন অভিযান হবে স্কুলগুলির সংস্কার; তিনি সরকারি স্কুলগুলিতে পাঠরত ছাত্র ছাত্রীদের অভিভাবকদেরও এই 'স্কুল ঠিক করো' অভিযানে সামিল হতে আহ্বান জানান। তার আগেই ২৮ জুলাই  উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে সর্বোদয় ইন্টার কলেজিয়েট স্কুলে বিদ্যুৎ নেই, পাখা নেই, বেঞ্চ নেই, জল নেই'এর প্রতিবাদে ১৫০০ ছাত্র স্কুল ইউনিফর্ম পরে ৫-৬ ঘণ্টা ধরে ধর্নায় বসে এবং সেই ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। দেখাদেখি উন্নাও'তেও জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বিদ্যালয়ে খাবারের মান খারাপ, জল নেই, শিক্ষক নেই'এর প্রতিবাদে ছাত্ররা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে। আলিগড়ের ভামোরী খুর্দ জেলাতেও বাচ্চারা ক্লাস করতে অস্বীকার করে-- ছাদ ভেঙে গেছে, প্লাস্টার  খসে পড়ছে, জঙ্গলাকীর্ণ খেলার মাঠে সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এই অভিযোগে ।

অভিজিৎ দীপকেও তাঁর নিজের গ্রাম মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, সেখানে ক্লাসরুমের বেহাল অবস্থা, খাবার জল, টয়লেট নেই, রান্নাঘরে ছাদ থেকে জল পড়ছে, তার মধ্যেই স্কুল চলছে। প্রশাসনের চোখ খোলার জন্য দীপকে তাদের পোর্টালে সবাইকে সবরকমের বেহাল দশার স্কুল ও তাদের পরিকাঠামো নিয়ে ভিডিও শেয়ার করতে অনুরোধ জানান। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১৬০টিরও বেশি স্কুলের ভিডিও আপলোড হতে দেখা যায়, যার মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্য ছাড়াও কংগ্রেস শাসিত কর্নাটক, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যেরও কয়েকটি স্কুল আছে। সব চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা দেখা গেছে রাজস্থানে, যেখানে ককরোচ জনতা পার্টির আশুতোষ রাঙ্কা সহ ৫০ জন মিলে জয়পুর, রামপুরা, কানওয়ারপুরা এই সব জায়গায় সরকারি স্কুলগুলিতে গিয়ে দেখেন, বাচ্চারা গোয়ালঘরে ক্লাস করছে। অদ্ভুত ব্যাপার যে, ওই স্কুল বিল্ডিংটি ২০২৫ সালেই বাতিল ঘোষণা হয়েছিল। তাছাড়াও আলওয়ার, যোধাওয়াস সরকারি স্কুলে তাদের সামনেই ছাদের স্ল্যাব বিপজ্জনক ভাবে ভেঙে পড়ে। তাঁরা দেখেন, ১৭৪ জন ছাত্র ৩টে ঘরে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। টয়লেট, জল কিছুই নেই। এখানেই শেষ নয়, জয়পুরে সরকারি শেঠ আনন্দীলাল পোদ্দার বধির স্কুলে ১০০-র বেশি ছাত্র সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বিক্ষোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় স্কুলগুলির করুণ অবস্থা, ছাদ থেকে প্লাস্টার পড়ে এক ছাত্র আহত। হোস্টেলে খারাপ খাবার, টয়লেট নোংরা, শিক্ষকরা ক্লাসে  থাকে না, হয় নেশা করে না হলে মোবাইল ঘাঁটে। CJP নেতা আশুতোষ রাঙ্কার বক্তব্য, রাজস্থানে ৮৪,০০০ ক্লাসরুম ভাঙা, ১৫ লক্ষ বাচ্চার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে।

কিন্ত 'স্কুল ঠিক করো'র এই অভিযানে সরকারের প্রতিক্রিয়া কিন্ত একদম বিপরীত। এই প্রচেষ্টাকে রুখতে বিভিন্ন রাজ্যের সরকার নানারকম হাতিয়ার প্রয়োগ করেছে-- উত্তরপ্রদেশে ভিডিওকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। বিনা অনুমতিতে প্রবেশের জন্য খোদ অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধেই এফআইআর করেছে পিম্পরির স্কুল। রাজস্থান, হরিয়ানায় স্কুলগুলিতে প্রবেশ করলে পকসো ধারায় মামলা করা হবে বলে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া জেলায় আব্দুল হাফিজ তার স্কুলের বেহাল দশার ভিডিও প্রকাশ করলে প্রশাসন গুণ্ডা লাগিয়ে তার বাবাকে হত্যা পর্যন্ত করেছে।

সরকারি স্কুলগুলির এরকম করুণ অবস্থা হওয়ার মূলে আছে অন্য ব্যাখ্যা। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের  সরকার শিক্ষায় GDP'র ২.৯ শতাংশ খরচ করে, অন্য দেশে যেখানে তা গড়ে ৪.৫ শতাংশ। অথচ, প্রতিরক্ষা খাতে এর চেয়ে দুশো গুণ বেশি খরচ হয়। একটা রাফায়েল'এর দামে প্রায় তিনশো স্কুলের ছাদ সারানো যায়। অথচ সেদিকে সরকারের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই । বিগত দশ-বারো বছরে এই অবস্থা খারাপ থেকে জঘন্যতম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বারো বছরের বিজেপি জমানায় প্রায় ৮০,০০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, অর্থাৎ, প্রতি দিনে গড়ে প্রায় কুড়ি-বাইশটি করে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশে প্রায় পনেরো লাখ স্কুল, পঁচিশ কোটি ছাত্র, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই সরকারি স্কুল। UDISE ২০২৫-২৬'এর রিপোর্ট বলছে, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:২৪, ৯৮ শতাংশ স্কুলে নাকি মেয়েদের শৌচাগার আছে, কিন্ত বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, প্রায় দেড় লাখ স্কুলে লাইব্রেরি নেই। আড়াই লক্ষ স্কুলে খেলার মাঠ নেই, প্রায়  আশি হাজার স্কুলে নেই টয়লেট। দেশে ১১ লক্ষ স্কুল চলছে একজন করে শিক্ষকের উপর নির্ভর করে। তাছাড়া স্কুল এখন সরকারের BLO ডিউটি, ভোটার লিস্ট, আবাস যোজনার ফর্ম দেবার মালটিপারপাস অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে, শিক্ষকেরা পড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। একটি সমীক্ষায়  দেখা গেছে, ক্লাস ফাইভ'এর ছেলেরা ক্লাস টু'এর পড়া পারছে না,  ক্লাস এইট'এর ছাত্র ক্লাস থ্রি'র অঙ্ক করতে পারছে না। কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবহার হয় বছরে একদিন, পরিদর্শনের সময়। আর কোভিড পরবর্তী ডিজিটাল বৈষম্য তো আছেই।

আমাদের দেশে গ্রাজুয়েট বেকারত্ব প্রায় ১২ শতাংশ। এই ছেলেগুলোই দশ বছর আগে কোনও সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছে, সেখানে তারা  শিক্ষক পায়নি, পায়নি কম্পিউটার, শেখানো হয়নি ইংরেজি,  তাই আজ সে গ্রাজুয়েট হয়েও বেকার। তাছাড়াও কোভিডের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি স্কুলগুলির ছাত্ররা। পড়াশোনা অনলাইনে হবার দরুণ তারা তাল মেলাতে পারেনি এবং এইভাবেই আমাদের দেশে প্রায় ৫২ শতাংশ গিগ কর্মী বা অস্থায়ী চাকুরেদের জন্ম হয়েছে (Swiggy, Zomato এইসব কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে)।

স্কুলগুলির এই বেহাল দশায় স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমেছে, তাদের 'স্কুল ঠিক করো'র  তিন দফা দাবি নিয়ে--  

১) প্রতি ৩০ জন ছাত্র পিছু একজন শিক্ষক থাকতে হবে;

২) শিক্ষকের কাজ পড়ানো, অন্য কাজ নয়। অন্য কাজের জন্য লোক নিতে হবে;

৩) প্রতি স্কুলে লাইব্রেরিয়ান ও কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ।

তাছড়া ক্লাস রুম ঠিক করা, মিড ডে মিলের মান, খেলার মাঠ, টয়লেট এগুলো সর্বত্র ঠিক করতে হবে, না হলেই হবে জোরদার আন্দোলন।

এই আন্দোলনের সুফলও মিলেছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে অভিজিতের পরিদর্শনের তিন দিনের মধ্যেই স্কুলের পরিবর্তন চোখে পড়েছে-- অপসৃত হয়েছে নেশাখোর প্রিন্সিপাল। ২০ অগস্ট উত্তরপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রক চল্লিশ হাজার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যাতে স্কুলগুলোর অবস্থা প্রতিনিয়ত নজরে রাখা যায়। এমনকি রাজস্থান সরকার গত ২৪ অগস্ট স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে ১২,৫০০ কোটি টাকার তহবিলও মঞ্জুর করেছে।

'স্কুল না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না'--  এটা ককরোচরা প্রশাসন ও সরকারকে বেশ কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে। আশা রাখা যায়, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মতোই এই 'স্কুল ঠিক করো আন্দোলন'ও ঠিক করে দেবে আমাদের বাচ্চা ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। কারণ, তাদের এই দাবি ভিক্ষা নয়, ন্যায্য; বেঞ্চ, জল, পাখা,  শিক্ষক-- এইগুলি সবার আগে দরকার। তাই সরকারের ফাইলে নয়, আসল জায়গাতেই স্কুল ঠিক করতে হবে।

বলাই বাহুল্য, ককরোচ আন্দোলন জাত, ধর্ম, ভাষা ছাড়িয়ে উঠে ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন পরিচয় এনেছে। আমি বেকার-- সেটা আমার কোনও লজ্জা নয়। এটা দেশের লজ্জা। লোকের বিদ্রূপকে তারা হাতিয়ার বানিয়ে রাগকে ব্যঙ্গে পরিণত করেছে। তারা বুঝে গেছে, রাগ করলে শাসক তাদের দেশদ্রোহী তকমা দেবে, কিন্ত তারা যখন হাসছে, তখন সিস্টেম বোকা বনে যাচ্ছে। নিজেকে ককরোচ বলে মিম বানালে লাখ লাখ জনের সমর্থন পাওয়া যায়। ইংরেজিতে যাকে বলে laughter as resistance--  তার মাধ্যমেই তারা সিস্টেমের বাস্তব উলঙ্গ চিত্রটা সবার সামনে তুলে ধরেছে। আর এটাই ভারতবর্ষের  রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় বিবর্তন।

লজ্জা থেকে গর্বের এই বিবর্তনে জেন জি থেকে জেন আলফা সবাই আজ সামিল। কারণ, এই পচে যাওয়া সমাজে এটা টিকে থাকার এক লড়াই। হয়তো আমাদের মতো জেনারেশন এক্স বা ওয়াই'ও এই  টিকে থাকার  লড়াইতে সামিল হবে ভবিষ্যতে !


Monday, 7 September 2026

স্থিতিশীল ভুবনের দিকে

কতদিন টিকব আমরা?

বিধান চন্দ্র পাল



আমরা যখন কোনও কিছু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে স্থায়ী বলে মনে করি। কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকাই কি স্থায়িত্বশীলতার প্রমাণ? একটি প্রতিষ্ঠান একশো বছর টিকে থাকতে পারে, একটি প্রযুক্তি কয়েক দশক সফল হতে পারে, একটি অর্থনীতি দীর্ঘসময় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে; কিন্তু সেই টিকে থাকার পেছনে যদি এমন কোনও মূল্য দিতে হয় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে, তাহলে তাকে কি সত্যিই Sustainable বা স্থায়িত্বশীল বলা যাবে? এই প্রশ্ন থেকেই স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

চীনের মহাপ্রাচীর, মিশরের প্রাচীন স্থাপনা কিংবা জাপানের হোরিউ-জি মন্দির আমাদের মানুষের অসাধারণ স্থায়িত্বের গল্প বলে। চীনের মহাপ্রাচীর দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে; জাপানের হোরিউ-জি প্রায় ১,৩০০ বছর ধরে বিশ্বের প্রাচীনতম টিকে থাকা কাঠের স্থাপনাগুলোর একটি। এসব স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে নকশা, উপকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে-- দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং স্থায়িত্বশীলতা এক বিষয় নয়।

বর্তমানে পরিবেশ, ব্যবসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা-- প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্থায়িত্বশীলতা শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৮৭ সালের Brundtland Commission-এর Our Common Future প্রতিবেদনে স্থায়িত্বশীল বিকাশের (Sustainable Development) যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তার মূল কথা ছিল: আজকের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু তা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আজকের পৃথিবীতে এই সংজ্ঞাকে সামনে রেখে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হচ্ছে, আমরা আসলে কী টিকিয়ে রাখতে চাই? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব কিছু একইভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। 

দুর্বল স্থায়িত্বশীলতার (Weak Sustainability) ধারণায় প্রাকৃতিক পুঁজি, মানব পুঁজি ও নির্মিত (Manufactured) পুঁজির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিস্থাপন সম্ভব বলে ধরা হয়। অর্থাৎ, প্রকৃতির কোনও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষের তৈরি সম্পদের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক মূল্য আংশিকভাবে পূরণ করা যেতে পারে। Strong Sustainability আমাদের সতর্ক করে দেয়-- প্রকৃতির সব কিছুকে মানুষের তৈরি সম্পদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। ধরা যাক, একটি বন কেটে সেখানে শিল্পাঞ্চল তৈরি হল। কারখানা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, উৎপাদন বাড়াবে, GDP-তে অবদান রাখবে। বনের কাঠের মূল্য, জমির মূল্য কিংবা carbon sequestration-এর অর্থনৈতিক মূল্যও হিসাব করা যেতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত বন যে পানি ধরে রাখে, মাটি রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য ধারণ করে, পরাগায়নে সহায়তা করে এবং স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে-- এইসব বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতা (ecological function) কি একটি কারখানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব? সবসময় নয়। এখানেই স্থায়িত্বশীলতার গভীর প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রকৃতি অর্থনীতির একটি অংশমাত্র নয়, প্রকৃতিই অর্থনীতির ভিত্তি।

২০২১ সালের The Economics of Biodiversity, The Dasgupta Review অর্থনীতিতে প্রকৃতিকে নতুনভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল-- একটি দেশের প্রকৃত সম্পদকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু GDP যথেষ্ট নয়, প্রাকৃতিক পুঁজি সহ সামগ্রিক সম্পদকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, GDP অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবাহ দেখায়, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় বা পরিবেশগত অবক্ষয়ের মূল্যকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি ও বস্তুগত পুঁজি (physical capital) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু একই সময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির অবক্ষয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় ও দূষণ বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে আমরা যদি শুধু GDP বৃদ্ধি দেখি, কিন্তু একই সময়ে বন, মাটি, পানি, মৎস্যসম্পদ কিংবা ecosystem services-এর অবস্থা বিবেচনা না করি, তাহলে কি দেশের প্রকৃত অগ্রগতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে? সম্ভবত নয়।

গ্রহের সীমানার (Planetary Boundaries) ধারণাও আমাদের একই ধরনের সতর্কবার্তা দেয়। ২০২৩ সালের এক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে পৃথিবীর নয়টি সীমানার মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষকেরা জানান। অর্থাৎ, মানবসভ্যতা এমন কিছু বাস্তুতান্ত্রিক সীমার (ecological limit) ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে, যার বাইরে গেলে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি আমাদের সম্পদের ব্যবহার দক্ষ করতে পারে, দূষণ কমাতে পারে, নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি আমাদের এমন একটি সীমাহীন পৃথিবী তৈরি করে দিতে পারে না, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ অসীম।

আরেকটি ঝুঁকি হল সবুজ ধোঁকাবাজি (Greenwashing)। কোনও প্রতিষ্ঠান তার মূল উৎপাদনব্যবস্থা ও সম্পদ ব্যবহারের ধরন অপরিবর্তিত রেখে কিছু বৃক্ষরোপণ, কার্বন দূরীকরণ বা সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করলেই কি তাকে স্থায়িত্বশীল বলা যায়? স্থায়িত্বশীলতা যদি পরিবর্তনের পরিবর্তে বিদ্যমান অবস্থাকেই বজায় রাখে, তাহলে শব্দটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থটিই হারিয়ে যাবে। তাই স্থায়িত্বশীলতা মূল্যায়নের সময় অন্তত তিনটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন:

১) কতদিন টিকবে? 

২) পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা খাপ খাওয়াতে পারবে? 

৩) টিকে থাকার প্রক্রিয়ায় আমরা কী হারাচ্ছি? 

তৃতীয় প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া কোনও সমাধান নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কর্মসংস্থান, আয়, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হল, কী ধরনের উন্নয়ন, কার জন্য, কতদিনের জন্য এবং কোন বাস্তুতান্ত্রিক সীমানার মধ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্থায়িত্বশীলতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্কও সামনে আসে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার মূল্য শুধু আমাদের প্রজন্মই দেবে না। নদী দূষিত হলে, মাটি নষ্ট হলে, বন হারালে কিংবা জৈব বৈচিত্র্য কমে গেলে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বহন করবে। সুতরাং, একটি প্রতিষ্ঠান কত বছর টিকে থাকল, একটি ব্যবসা কত বড় হল কিংবা একটি দেশ কত দ্রুত GDP বাড়াল-- এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু একইসঙ্গে জানতে হবে, সেই সাফল্যের বিনিময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির কী হাল দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের Changing Wealth of Nations এই কারণেই GDP-এর পাশাপাশি একটি দেশের উৎপাদিত মানব ও প্রাকৃতিক পুঁজিকে বিবেচনা করে সামগ্রিক সম্পদকে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়। একটি দেশের প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার উৎপাদন ও জীবনযাপনের ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ণ থাকছে তার ওপর। 

সত্যিকারের স্থায়িত্বশীলতা তাই শুধু দীর্ঘদিন টিকে থাকার নাম নয়। এটি এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন, যেখানে আমরা স্বীকার করি যে, আমরা প্রকৃতির মালিক নই, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু একটি কার্যকর অর্থনীতি রেখে যাওয়া যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন একটি পৃথিবীও রেখে যেতে হবে, যেখানে সেই অর্থনীতি এবং মানবজীবনের টিকে থাকার মতো বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে। তাই, স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়তো, 'কীভাবে টিকে থাকব?' নয়; বরং 'আমরা কী টিকিয়ে রাখতে চাই?', কারণ, সব কিছু টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিছু পরিবর্তন করতে হবে, কিছু পুনর্গঠন করতে হবে, কিছু পুরনো ধারণা হয়তো ছেড়েও দিতে হবে। কিন্তু যে বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর আমাদের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, সেগুলোকে রক্ষা ব্যতীত কোনও বিকল্প নেই।


Thursday, 3 September 2026

উত্তম ১০০ (২)

ইতিহাস ও স্মৃতিমেদুরতা

সোমনাথ গুহ



‘উত্তমকুমার বাঙালিবাবু হিসাবে অনন্য’-- মহানায়কের মৃতুর পর পাহাড়প্রমাণ শোকবার্তার মধ্যে বলিউড হিরো রাজেশ খান্নার এই উক্তিটি উল্লেখজনক। ‘বাবু’ বা ‘ভদ্রলোক’ বলতে ঠিক কী বোঝায় তা বহু আলোচিত। সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য ঐতিহাসিক সুমিত সরকার মনে করতেন, শব্দটির পরিসর বহু বিস্তৃত, যাতে ‘ময়মনসিংহের মহারাজা থেকে ইস্ট-ইন্ডিয়া রেলের কেরানি সবাই অন্তর্ভুক্ত’। এর বিস্তৃত বিশ্লেষণে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, শুধু বলার ‘ভদ্রলোক’ ব্যক্তির একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখজনক, প্রায় সর্বজনীন: তাঁরা কায়িক শ্রম করেন না। নিম্নবিত্ত বা নিম্নবর্ণের থেকে এটি হল তাঁদের প্রধান পার্থক্য। শব্দটি মূলত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্প্রদায় হিসাবে উদ্ভব হলেও কালে কালে সাংস্কৃতিক পরম্পরায় রূপান্তরিত হয়। উত্তমকুমার, আজ যাঁর জন্মশতবার্ষিকী (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬), তিনি ছিলেন এই পরম্পরার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, কালচারাল আইকন।  

১৯৪৮ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’। সময়টা যুগান্তকারী: ১৯৪৩'এ মন্বন্তর, তিন বছর বাদে ফেব্রুয়ারিতে রশিদ আলি দিবস, উত্তাল আন্দোলন ও অনেকের মৃত্যু, ছয় মাস বাদে কুখ্যাত কলকাতা দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ ও আরও দাঙ্গা। কলকাতায় বিশেষ করে এবং সারা রাজ্যে উদ্বাস্তুদের ঢল। চারিদিকে খাদ্য, আশ্রয়ের অভাব; বাঙালি বিপন্ন, বিপর্যস্ত, বেঁচে থাকার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এরই মধ্যে এলেন তিনি। সুদর্শন নন কিন্তু মেধাবী; বেপরোয়া মনে হলেও দায়িত্বশীল; কিছু  চরিত্রে ধনী নন কিন্তু ন্যায়পরায়ণ, আবার কোনও চরিত্রে ধনী হলেও সহমর্মী। রোমান্টিক কিন্তু আগ্রাসী নন, বরং মেয়েদের সম্মুখে জড়সড়, দ্বিধাগ্রস্ত। স্মার্ট, বিংশ শতাব্দীর ভদ্রলোক বাঙালির মতো ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, আবার ক্ষেত্র বিশেষে গেঁয়ো, আটপৌরে। আপাত বিরোধী যাবতীয় দোষগুণ নিয়ে তিনি স্ক্রিনে উপস্থিত হলেন। 

১৯৪৯-১৯৫১ তাঁর পরপর কয়েকটি ছবি ফ্লপ। বাজারে নাম হয়ে গেল ফ্লপমাস্টার, সেটে কটূক্তি ভেসে আসত-- ‘পায়ে পাথর বেঁধে রাখ না হলে উড়ে যাবে’। পরের বছর ‘বসু পরিবার’ মুক্তি পেল, তার পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হল না, মহানায়কের পথে অবশেষে তাঁর যাত্রা শুরু। বাঙালি পেল তাঁর ম্যাটিনি আইডল, একই সঙ্গে পাশের ঘরের ছেলে। 

বলাই বাহুল্য, উত্তমকুমার রাতারাতি বাঙালির হৃদয় জয় করেননি। অধ্যবসায় তো ছিলই, আর কিছু গুণ ছিল মজ্জাগত, পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। অভিজাত এবং সাধারণ, এটাই তো ছিল তাঁর পরিবারের বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী আরও অনেক ভদ্রলোক পরিবারের মতো তাঁর গিরীশ মুখার্জি রোডের পরিবারেরও বংশগরিমা ছিল, কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এমন নয় যে তাঁরা দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু ফেলে ছড়িয়ে খাবার মতো অবস্থাও ছিল না। যেটা ছিল, পরিবারের একটি সখের থিয়েটার। তিনি নিজেই লিখেছেন, 'এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে শাড়ি, চাদর, সেফটি পিন এনে উইংস, স্ক্রিন তৈরি হয়ে যেত, কাগজ দিয়ে মুকুট আর রাংতা দিয়ে তলোয়ার, ব্যস শুরু হয়ে গেল নাটক।' তখন থিয়েটারের চেয়ে যাত্রাদলের রমরমা, ছোট উত্তমের যাত্রার মহড়া দেখার প্রবল নেশা। পাড়ার ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে যাত্রার সংলাপ মুখস্থ করতেন, তারপর বাড়িতে এসে আপন মনে সেটা বলে যেতেন। ‘মুকুট’ নাটক দিয়ে হাতেখড়ি, তারপর ক্লাবে, স্কুলে, কলেজে দেদার নাটক করেছেন। পরবর্তী সময়ে স্টার থিয়েটারে ‘শ্যামলী’ তো হিট। পাড়ার ক্লাবের তিনি ছিলেন এক সক্রিয় সদস্য, সমস্ত ধরনের খেলাধুলা করতেন, গানবাজনা করতেন, গানের তালিমও নিয়েছেন, পদ্মপুকুরে বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটতেন। পরে শিক্ষক রেখে উর্দু, হিন্দি শিখেছেন। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন এমনটাও নয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে, হাতে তেরঙ্গা নিয়ে প্রভাত ফেরি করেছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের ফান্ডের জন্য টাকাও তুলেছেন।

কলেজের পাঠ শেষ করে উপলব্ধি করেছেন যে যৌথ পরিবারের হাঁড়ি চালু রাখার জন্য চাকরি করা প্রয়োজন। তখনকার পোর্ট কমিশনার্সে চাকরি করেছেন আর বিভিন্ন স্টুডিও ঘুরে ঘুরে সিনেমায় কোনও মতে চান্স পাবার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন। দিনের পর দিন অফিস কামাই করেছেন, প্রযোজকদের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছেন। অনেক কষ্টে দৈনিক পাঁচ সিকি মজুরিতে ‘মায়াদোর’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে এক্সট্রার কাজ করেছেন, যে ছবি কোনওদিনও মুক্তি পায়নি। এই পর্বে তাঁর দুর্নিবার প্রচেষ্টা রীতিমতো শিক্ষণীয়। 

তাঁর পাড়াগত সক্রিয়তার কারণে ‘পাশের বাড়ির ছেলে’র বৈশিষ্ট্য তাঁর ছিলই। পারিবারিক সূত্রে আভিজাত্য পেয়েছেন, বাকিটা অনুশীলন করেছেন। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো ছবি ‘হারানো সুর’-এ আমরা মহানায়কের এই দুটি ভিন্ন মানসিক রূপ দেখতে পাই। প্রথম অংশে তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট, অসহায়, মহিলা ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় অংশে আত্মবিশ্বাসী, প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক, স্যুট বুট পরা আধুনিক শহুরে মানুষ। 

ফিরে যাই প্রথম হিট ছবি ‘বসু পরিবার’-এ। এখানে সেই আমলের ভদ্রলোক পরিবারের লক্ষণ দেখা যায়। বংশগরিমা আছে কিন্তু যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে। বসুদের যৌথ পরিবারেও একই ধরনের সংকট। পিতা মামলায় হেরে গিয়ে সম্পত্তি হারিয়েছেন। ছোট ছেলে এটর্নি হয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর্থিক অনটনের কারণে পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে। এর মধ্যে সুখেন বাড়ির বড় ছেলে সৎ, দায়িত্বশীল ও মেরুদন্ডসম্পন্ন। সে উপন্যাস লেখে যা ২০,০০০ কপি বিক্রি হয়, বিক্রির টাকা দিয়ে সে বাবার দেনা শোধ করেছে। পরিবারের সদস্যদের পেশা লক্ষণীয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে যেরকম হয়ে থাকে। এটি উত্তমের প্রথম হিট ছবি হলেও তিনি কিন্তু এখানে প্রথাগত নায়ক নন। এই প্রথম আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর অভিনয়ের সুখ্যাতি করা হয়। পরের ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সুপারহিট হলেও উত্তমের নাম কিন্তু ছবির বিজ্ঞাপনে ছিল না। ছবিটি মুক্তি পায় প্যারাডাইস হলে, সেই আমলের অন্যতম সিনেমা হল। বিজ্ঞাপনে এই তথ্য আর তুলসী চক্রবর্তী'র নামোল্লেখ ছিল। এই ছবিতে উত্তম প্রায় এক অনিচ্ছুক প্রেমিক, মনে ষোলআনা ইচ্ছা কিন্তু সুচিত্রার সামনে পড়লেই থতমত। 

অন্তত প্রথম দিককার ছবিতে প্রেমিক হিসাবে এটাই উত্তমের ইউএসপি। কোমল, সূক্ষ্ম, উদার, মৃদুভাষী, অনেক সময়ই আড়ষ্ট, অনিশ্চিত; বলিউডি হিরোদের মতো একদমই ম্যাচো নয়, বরং কিঞ্চিৎ নারীসুলভ। মেস-এ একগাদা ব্যাচেলার ছেলের মধ্যে সেও একজন, আর তার প্রতিই সুচিত্রার আকর্ষণ। এটা একদম টিভি আগমনের আগে বাঙালি পাড়ায় ছেলেমেয়েদের টিপিক্যাল প্রেম। পরস্পরের চোখাচুখি, আচমকা মুখোমুখি আর নিরন্তর চিঠি চালাচালি। সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে বরং যেটা বিস্ময়কর সেটা হল রমলার (সুচিত্রা) অনায়াস বিচরণ, তার সাবলীলতা। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির কাহিনি তাপসীর পরীক্ষা ছাড়াও কিরীটিরও পরীক্ষা। তার সিদ্ধান্তহীনতা, সমাজ কী চোখে ঘটনাটা দেখবে তা নিয়ে তার দ্বিধা, তাপসীকে প্ররোচিত করে বলতে কেন সে যেটা চায় সেটা ছলেবলে কৌশলে করায়ত্ত করতে পারে না। সে যুক্তি দেয় শুধুমাত্র বলিষ্ঠরাই ভোগ করতে পারে। এর উত্তরে কিরীটি যা বলে সেটাই প্রেমিক চরিত্রে উত্তমের মৌলিক, অনন্য রূপ যা তাঁকে আপামর বাঙালির কাছে এত প্রিয় করে তুলেছে। কিরীটি বলে, বলপ্রয়োগ করে কিছু হয় না, তপস্বীর মতো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। দেহমনের আকাঙ্ক্ষা সংযত করতে হবে, তিতিক্ষা, ধৈর্য, সংযম অর্জন করতে হবে। 

নায়কের প্রথম দশ বছরের অন্যতম সেরা ছবি অবশ্যই ‘সপ্তপদী’। এটা ষাটের দশকের শুরুর ছবি। উত্তম-সুচিত্রা তখন জুটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনের মধ্যে রসায়ন আড়ষ্ঠতাহীন, সাবলীল, আবেগপ্রবণ। আগের ছবিগুলির তুলনায় এখানে প্রেম অনেক উদ্দাম, বাঁধনছাড়া। দুজনে একই কলেজের শিক্ষার্থী, দুজনেই মেধাবী এবং গুণী, তাই তাদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য। বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। কৃষ্ণেন্দু কট্টর ব্রাহ্মণ ঘরের ছেলে, রীনা খ্রিস্টান। এখানেই ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে যে দ্বন্দ্ব তা ফিরে আসে: সংস্কার, সমাজের প্রতি আনুগত্য না সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলোকপ্রাপ্ত হওয়া। এই ছবিতে কিছুটা গোঁজামিল দিয়ে তার সমাধান হয়, কিন্তু ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ধর্মের বাধা অতিক্রম করে তাদের প্রেম মহিমান্বিত হয়। 

স্বাধীনতা-উত্তর পরের কয়েক দশকে বাঙালি সমাজের নারী-পুরুষ সম্পর্ক ভিক্টোরিয়ান মুল্যবোধে প্রভাবিত। প্রেম হতে পারে কিন্তু তা সংযমী, দায়িত্বশীল হতে হবে, পরিবারের কর্তৃত্ব, সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্কে এই মূল্যবোধের সাথে আধুনিকতার মিশেল ঘটেছে। যেমন আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’-এর চল ছিল। তথাকথিত লাভ-ম্যারেজ ছিল ব্যতিক্রম, বেশ সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা। এই জুটি এই বেড়াজাল ভেঙে দিল। রোমান্স শব্দটা বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে প্রবেশ করল। আবার নারী শুধুমাত্র গৃহিণী ছিল না, শিক্ষিতা তো বটেই, বাকপটু, কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টবক্তা। চলচ্চিত্র যদি সমাজের প্রতিফলন হয় তাহলে আজকে নারীর আরও অগ্রগতি এবং কর্মক্ষেত্রে অধিক উপস্থিতি থাকার কথা ছিল; অপর দিকে পুরুষ কম পিতৃতান্ত্রিক, অধিক কোমল এবং অনুভুতিপ্রবণ। বাংলা সিনেমার নিরিখে পিতৃতন্ত্রের দাপট আদৌ কমেনি, বেড়েছে।  

এতগুলি দশক পেরিয়ে আজ এইসব ছবি দেখলে ধাক্কা লাগে, বঙ্কিমের গদ্য পড়তে যেরকম ধাক্কা লাগে। যৌথ পরিবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরিবর্তনটা শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংলাপ, ভাবভঙ্গি অতি-নাটুকে লাগে। প্রেম আর শুধু ক্ষণিকের চাহনি নয়, সম্পর্ক বছরের পর বছর অপেক্ষা নয়। তবুও মানসপটে আঁকা ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ স্মৃতিতে ধূসর হয়ে থাকে, বাঙালি জীবনের কয়েক দশকের এক টুকরো ইতিহাস যার অবিসংবাদিত নায়ক হলেন উত্তমকুমার।


Wednesday, 2 September 2026

উত্তম ১০০ (১)

বাঙালিয়ানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তরাধিকার

বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়


(৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ - ২৪ জুলাই ১৯৮০)


বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজ যখন নিজের চেনা নৈতিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে ফিরছিল, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে মহানায়ক উত্তমকুমারের। আজ বহু দশক পরেও বাঙালির পারিবারিক সৌহার্দ্য, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে কোনও আলোচনায় উত্তমকুমার এক অনন্য ও অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন।

মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ডের আখ্যান

বাঙালিয়ানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান তার মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধ। অভাব বা প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সহজাত চারিত্রিক দৃঢ়তা, তাকে উত্তমকুমার পর্দায় এক মহৎ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সমাজব্যবস্থায় যখন পুঁজিবাদ ও নৈতিক স্খলনের চোরাস্রোত চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা বাঙালির সৎ ও আদর্শবাদী সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

'বিচারক' চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। এই ছবিতে একজন জজের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট, তাঁর নিজের অতীত ভুলের সঙ্গে বর্তমান বিবেকের যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তাকে উত্তম অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার 'থানা থেকে আসছি' ছবিতে এক রহস্যময় তদন্তকারী অফিসারের চরিত্রে তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ অভিনয় সমাজের উচ্চবিত্ত ও কপট শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াপনাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। উত্তমকুমার বাঙালি পুরুষকে শিখিয়েছিলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্থবিত্ত নয়, একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার সততা, নীতিবোধ এবং সোজা মেরুদণ্ডের মধ্যে। তিনি যখন পর্দায় কোনও আদর্শবাদী ডাক্তার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইঞ্জিনিয়ার বা সৎ কেরানির চরিত্রে অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতেন, তখন সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদমিত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠত।

পারিবারিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার যৌথ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, বড়দের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি অপত্য স্নেহ এবং ত্যাগের মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে একটি আদর্শ বাঙালি পরিবার। উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পারিবারিক মূল্যবোধের উদযাপন।

'মৌচাক' ছবিতে ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া এক বড় ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় ছিল অনবদ্য। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না অতি-নাটকীয়তা। গুরুজনদের সামনে তাঁর বিনীত শারীরিক ভাষা, ছোট ভাইদের শাসন করার পাশাপাশি তাদের আগলে রাখার যে নির্ভরতা— তা ছিল চিরাচরিত বাঙালি সমাজব্যবস্থার আসল প্রতিচ্ছবি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা চারপাশকে গ্রাস করছে, পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তমের এই ছবিগুলো আমাদের যৌথ পরিবারের সেই সুবর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ত্যাগই ছিল আনন্দের মূল উৎস।

'মানুষ' হয়ে ওঠার লড়াই

বাঙালির মজ্জাগত মূল্যবোধে ব্যক্তির স্বার্থপরতাকে সবসময় নিকৃষ্ট মনে করা হয়েছে এবং লোককল্যাণ বা পরোপকারকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। উত্তমকুমারের বহু চরিত্র এই মানবিক দর্শনের সার্থক রূপায়ণ।

এই প্রসঙ্গে 'অমানুষ' চলচ্চিত্রের মধুসূদন বা 'মধু' চরিত্রটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও কুৎসায় জর্জরিত হয়ে এক সময়ের সৎ ও আদর্শবাদী জমিদারপুত্র যখন মদ্যপ ও সমাজ-পরিত্যক্ত এক রুক্ষ মানুষে পরিণত হয়, তখনও তার ভেতরের আসল মানবিকতা ও পরোপকারী সত্তাটি মরে যায় না। ঝড়ের রাতে বাঁধ ভেঙে যখন গোটা গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে মধুর সেই মরণপণ লড়াই আসলে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে ফুটিয়ে তোলে। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাইরের খোলসটি যতই মলিন বা রুক্ষ হোক না কেন, মানুষের ভেতরের আসল মূল্যবোধ যদি খাঁটি থাকে তবে সে সমাজকে এক নতুন পথ দেখাতে পারে। একইভাবে 'আনন্দ আশ্রম' বা 'ধন্যি মেয়ে' ছবিতেও তাঁর চরিত্রগুলো ছিল মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর এক একটি জীবন্ত উদাহরণ।

প্রেমের গরিমা

বাঙালির প্রেমের ব্যাকরণ চিরকালই অত্যন্ত মার্জিত, নান্দনিক ও আত্মিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। উত্তমকুমার রূপোলি পর্দায় প্রেমের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন, তাতে শরীরী আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গরিমা ও একাত্মতা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'সাগরিকা' বা 'অগ্নিপরীক্ষা'— প্রতিটি ছবিতেই উত্তমকুমারের চরিত্রগুলো ছিল নারীর প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রেমিক হিসেবে কখনও আগ্রাসী বা অধিকারপ্রমত্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন পরম আশ্রয়দাতা ও ছায়াসঙ্গী। নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই ভুবন ভোলানো মৃদু হাসি, কথা বলার সময় অপরিসীম ভদ্রতা এবং ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য নিজের অহংকার বা সুখ বিসর্জন দেওয়ার অভিব্যক্তি বাঙালি যুবসমাজকে এক গভীর রুচিসম্পন্ন প্রেমের পাঠ দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, প্রেম মানে কেবল অধিকার করা নয়, প্রেম মানে অপর মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়ে আপন করে নেওয়া। এই কারণে তাঁর রোমান্টিক চরিত্রগুলো আজও বাঙালির প্রেমের চিরন্তন ও পরিশীলিত আদর্শ হয়ে রয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বাঙালি মননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্ম, জাতপাত বা সংস্কৃতির কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার যে ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত, উত্তম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চেতনার এক ঐতিহাসিক জয়গান গেয়েছিলেন।

'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' চলচ্চিত্রটি এই ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। একজন পর্তুগিজ সংস্কৃতির মানুষ হয়েও হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি কীভাবে বাংলার মাটি, বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং কবিগানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এক নিপাট বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন— পর্দায় সেই রূপান্তরের কারিগর উত্তম। ভোলানাথ ময়রার সঙ্গে কবিগানের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর মুখাবয়বের সেই ঐশ্বরিক ভক্তি এবং গম্ভীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— 'খ্রিষ্ট আর কৃষ্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই', তখন তা কেবল ছবির সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বাংলার সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর ইশতেহার। তৎকালীন দাঙ্গা-পরবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে অস্থির বাংলার বুকে উত্তমের এই রূপায়ণ এক গভীর সামাজিক ক্ষতে মলম লাগানোর কাজ করেছিল এবং প্রমাণ দিয়েছিল যে বাঙালিয়ানা কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

'নায়ক'-এর আত্মদর্শন

সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও একজন মানুষের নিজের শিকড়, নৈতিকতা এবং বিবেকের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকা উচিত, তার এক মননশীল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে উত্তম মূলত নিজের জীবনেরই এক সমান্তরাল চরিত্র 'অরিন্দম মুখার্জী'-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খ্যাতির চরম চূড়ায় বসে থাকা একজন সুপারস্টারের ভেতরের একাকীত্ব, তাঁর অতীত জীবনের আদর্শচ্যুতির ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের বিবেককে টিকিয়ে রাখার যে ছটফটানি— তা উত্তম যে ভাবে তাঁর চোখের পলক, ঠোঁটের কোণের বিষাদ ও শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ট্রেনের কামরায় এক তরুণী সাংবাদিকের কাছে অভিনয় গুণে নিজের ভেতরের সব গ্লানি, পাপবোধ ও দুর্বলতা উজাড় করে দেওয়ার দৃশ্যটি উন্মোচিত করে, সাফল্য বা গ্ল্যামার মানুষের শেষ কথা হতে পারে না; নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। উত্তমের এই মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বাঙালি সমাজকে এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

কেন আজও উত্তমের বিকল্প নেই?

আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক হাই-টেক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ভাষা ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে চরম যান্ত্রিকতা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও বাঙালির নৈতিক অবচেতনে ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উত্তম আজও এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা। কারণ, উত্তম কেবল সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি কোনও অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির নিজস্ব মূল্যবোধের এক পরম বিশ্বস্ত অভিভাবক।

যখনই বাঙালি সমাজ কোনও নৈতিক সংকটে ভোগে, পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে বা যান্ত্রিকতার ভিড়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরে পেতে চায়, তখনই তারা ফিরে যায় উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের সেই মায়াবী আশ্রয়ে। তাঁর সেই প্রাণখোলা ভুবন ভোলানো হাসি, ধুতি-পাঞ্জাবির আভিজাত্য, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই চিরচেনা রূপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, সততা, পরিবার, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং আত্মমর্যাদাই হল একজন খাঁটি মানুষের আসল পরিচয়। 

যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালিয়ানা তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে, ততদিন বাঙালির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমারের এই অনন্য দৃষ্টান্ত চিরকাল অম্লান ও অতুলনীয় হয়ে থাকবে।


Tuesday, 1 September 2026

ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র

ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


In This World

রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।

এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।

এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'  (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।

রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।

২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।

সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।


Sunday, 30 August 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মসংস্থান

আশা না নিরাশা?

রাজীব ভট্টাচার্য



বিশ্ব শ্রম সংগঠন বা আইএলও'র সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে অনিশ্চয়তা সূচক (যা মূলত আর্থিক ও নীতি নির্ধারণকারী ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল) ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ থেকে অভূতপূর্ব স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে মন্দা ও কোম্পানিতে নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস এবং ভোগব্যয়কে দুর্বল করে দিতে পারে। সর্বোপরি, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাবে ক্ষতির ঝুঁকি শ্রমের বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

উচ্চশিক্ষা উন্নত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশার সম্ভাবনা জাগালেও, তা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই বেকারত্ব হ্রাসে অক্ষম। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারের চাইতে কম। কিন্তু এই চিত্রটি অপেক্ষাকৃত অল্প আয় বা মধ্য আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে একইরকম নয়। এই সমস্ত দেশগুলিতে স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেওয়ার হার যথেষ্টই কম। বর্তমানে এর সঙ্গে জুড়েছে তরুণ প্রজন্মের চাকরিজীবীদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বিশেষ করে প্রথমবার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণকারী উচ্চ দক্ষ পেশার ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসাহের মূল কারণ হল, দ্রুত হারে গণনার খরচ হ্রাস পাওয়া। ফলে, গণনার ক্ষমতা এবং তথ্য সঞ্চয় ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং)। তাছাড়া বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত হারে প্রয়োগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের পথকে প্রশস্ত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় দ্রুত হারে হ্রাস পাওয়াতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করে উচ্চশিক্ষিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বাজারে জোগান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে ।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এসি মোগলু এবং রেস্ট্রেপো (২০১৮) কর্মসংস্থানের বাজারের উপর এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন: 

(ক) স্থানচ্যুতি প্রভাব বা ডিসপ্লেসমেন্ট ইফেক্ট; 

(খ) উৎপাদনশীলতা প্রভাব বা প্রোডাক্টিভিটি এফেক্ট এবং 

(গ) দক্ষতা সম্পূরক প্রভাব বা স্কিল কম্প্লিমেন্টারিটি এফেক্ট। 

স্থানচ্যুতি প্রভাব সরাসরি নতুন প্রযুক্তির শ্রমিক দ্বারা পুরাতন শ্রমিকদের প্রতিস্থাপনকেই বোঝায়। এই প্রভাবের ফলে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় প্রভাবটি এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার ফলে এই দক্ষতায় পারদর্শী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া যা শ্রমের বাজারকে উদ্বুদ্ধ করবে। তৃতীয় প্রভাবটি মানুষ ও যন্ত্রের পরস্পরের প্রতি সম্পূরক সম্পর্কের কথা বোঝায়। এই নতুন প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান প্রতিস্থাপিত না করে যদি তার সম্পূরক হয়ে উঠতে পারে তবে তা নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই তিনটি প্রভাবের মধ্যে প্রথম প্রভাবটি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব দুটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি শেষ দুটি প্রভাব প্রথম প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে।

ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি টিসিএস সম্প্রতি ২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৩,৪৬০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে, যার মূল কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিবিড় প্রয়োগ। ওরাকেল'এর মতো বিশ্ব বিখ্যাত আইটি কোম্পানিও প্রায় ১২,০০০ কর্মীকে ওই একই কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং ইনফোসিস এর মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও।এই কোম্পানিগুলি দক্ষতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ায় গতানুগতিক কাজ, কোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সম্পন্ন করতেই বেশি আগ্রহী। তাই দৈত্যাকার আইটি কোম্পানিগুলি ছাড়াও অ্যামাজন (গত ৬ মাসে ৩০ হাজার), ব্লক (৪০০০'এর বেশি), ড্রপবক্স (৫০০'এর বেশি) কর্মচারী ছাঁটায়ের পথে হেঁটেছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীদের বেকারত্ব তাদের মনোবলে আঘাত হানবে, কোম্পানির প্রতি আনুগত্যকে দুর্বল করবে এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের অবক্ষয় বৃদ্ধি করবে। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'এর মতে, কর্মহীন ইঞ্জিনিয়ার ও দ্রব্য পরিচালনকারীরা দ্রুত নতুন স্বাধীন বিনিয়োগ বা স্বতন্ত্র উদ্যোগে উদ্যোগী হবে। আবার অনেকের মতে, এই বেকারত্বের মূল কারণ সীমিত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা-জোগানের অমিল। যদি ভারতীয় অর্থনীতি এর সঙ্গে নিজেকে মানানসই না করে তুলতে পারে তাহলে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার সাথে সেবার রফতানি হ্রাস পাবে ও শহরাঞ্চলের ব্যয়ের গতিও মন্থর হবে। এর ফলে ভারতবর্ষ সেই পূর্ববর্তী মধ্য-আয় বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। ফলস্বরূপ, ভারতের বেকারত্বের হার এপ্রিল ২০২৫'এ ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৬.৯ শতাংশ এবং জুন মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭.১ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক যুব বেকারত্ব মে মাসে ১৭.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশ।

টেসলা এবং স্পেস এক্স'এর কর্ণধার এলন মাস্ক'এর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজকে একটি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করবে এবং সম্ভবত আমাদের কারওরই সেই অর্থে আর কাজ থাকবে না। এনথ্রপিক'এর সহ প্রতিষ্ঠাতা দাড়িও আমোদেই এর মতে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট কলার কর্মীরা তাদের চাকরি হারাবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা জিওরজিয়েভার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুনামি সারা পৃথিবীতে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকের এক বিরাট অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের (যেমন স্টিম ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ শক্তি দ্বারা যন্ত্র চালিত তাঁত, মোটর যানবাহন, বেতার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট) চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব অনেকাংশেই আলাদা। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যত সংখ্যক কর্মসংস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তার থেকে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তাই স্থায়ী প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ধারণাটি কখনই বাস্তবায়িত হয়নি। 

জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল লক্ষ্য হল, অনিয়মিত জ্ঞানীয় কাজ (non-routine cognitive task) অর্থাৎ প্রতিদিনের বাঁধা-ধরা নিয়মের বাইরে যে সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতার প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের উচ্চ সারির দক্ষতাযুক্ত কাজগুলিকে অতি দ্রুত এবং ব্যাপক আকারে প্রতিস্থাপিত করা ও দ্রুতগতিতে তার উন্নতি করা। অনেকের মতে, এর ফলে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। অতি সম্প্রতি ICRIER (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভারতের দশটি শহরে ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের উপর জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের ধারণা পাওয়া। এই সমীক্ষাটি কিন্তু ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশাল আকারে কর্মসংস্থান হারানোর ধারণার পরিপন্থী। বরং নতুন প্রযুক্তিকে ভিন্ন আকারে ঢেলে সাজানো বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে উন্নততর কাজে নিয়োগেরই নিদর্শন দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে খরচ, প্রতিভার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কারণে।

নীতি আয়োগ'এর সাম্প্রতিকতম একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫'এর মাঝামাঝি প্রায় ৭৮,০০০ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ হারিয়েছেন (প্রায় ৫০০ মানুষ প্রতিদিন)। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছাঁটাই অথবা নতুন কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কারণে আইবিএম, মাইক্রোসফট, সিটি ব্যাংক গ্রুপ, জিপি মরগান, গোল্ডম্যান স্যাক্স'এর মতো সংস্থাগুলি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের মতে, ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, মানব প্রতিনিধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যমণি। শিল্প, সেবা, অর্থ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার বিরাট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মানের যে মডেলগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে নিরাপত্তার দিকটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যাপক কৌশলের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নীতি আয়োগের লক্ষ্য তিনটি মূল স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল- 

(ক) বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় সমস্ত স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত হারে প্রসার;

(খ) ভারতকে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক আকর্ষণীয় পীঠস্থান হিসেবে উন্নীত করা ও 

(গ) বিরাট মাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বা নৈপুূণ্য বৃদ্ধির কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা যার মূল উদ্দেশ্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া। 

তাই এখন দেখার, বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য যে পরিকল্পনাগুলি নেওয়া হয়েছে তার দ্রুত রূপায়ণের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে প্রতিস্থাপক নাকি পরিপূরক কোনও ভূমিকা পালন করে।


Friday, 28 August 2026

আদিত্য কুমারের খোয়াইশ

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।

আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।

সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।

কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন। 

এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।

যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।

তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই। 

বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!