Wednesday, 24 June 2026

আত্মপরিচয়ের খোঁজে

'হিন্দু' পরিচয়ের ঐতিহাসিক বিবর্তন

পার্থসারথী চৌধুরী



গত এক দশক ধরে ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির অঙ্গনে 'হিন্দুত্বের' নামে যে ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান, তার নিশ্চিত এক ঐতিহাসিক পট-বিবর্তন আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, যা ঘটছে, যা চলছে তা যুক্তিসিদ্ধ ও অবধারিত। এর মধ্যে ঐতিহাসিকতা ও মিথ্যাচার দুইই আছে। 'হিন্দু' শব্দটি নিজেই এক জটিল ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের রূপ। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, উপনিষদ-- কোথাওই 'হিন্দু' শব্দের কোনও উল্লেখ নেই। তাহলে শব্দটি এল কোথা থেকে? কেনই বা? 'গীতা'য় শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম ও অধর্মের কথা বলছেন ('হিন্দু' নয়)। এই 'ধর্ম' বলতে কী বোঝানো হয়েছিল? 

মধ্যযুগেও বেশি প্রচলিত ছিল 'সনাতন ধর্ম', 'বৈদিক ধর্ম' বা 'বৈষ্ণব', 'শাক্ত' এই পরিচিতিগুলিই। বরং, 'হিন্দু' শব্দটি (যার উদ্ভব আরও কয়েক শতক আগে) তখনও মূলত ভৌগোলিক ও জাতিগত পরিচয় হিসেবেই ব্যবহৃত হত। এই পরিচয় সূত্রেই সে সময়কার তুর্কি, আফগান বা মোগল, যাদের তৎকালীন সাহিত্যে 'যবন' বা 'ম্লেচ্ছ' বলা হত, তাদের থেকে বাকীদের আলাদা করতেই 'হিন্দু' শব্দের ব্যবহার। অর্থাৎ, 'হিন্দু' শব্দের প্রচলনের মধ্যে স্থানীয়দের পরিচিতির ব্যাপারটাই মূলত সিদ্ধ ছিল; সে অর্থে বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্যরা যারা 'সনাতন ধর্মের' কেউ নন, তারাও 'হিন্দু'দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরে, ইংরেজ শাসনে যখন বিদেশি ও দেশি এই দুই সত্তাই বেশ প্রকট ভাবে এক তুমুল বৈপরীত্যের স্মারক হয়ে উঠল, তখন 'হিন্দু' শব্দটির তাৎপর্য যেন অনেকের কাছেই নানা কারণে আরও মূর্ত ও প্রাসঙ্গিক হল। এর মধ্যে বিদেশি অধীনতার গ্লানিও বেশ জোরালো ভাবে ছিল। ১৮৫৭'র মহাবিদ্রোহের অবসানের পর দেশব্যাপী সরাসরি ইংল্যান্ডশ্বরীর শাসন কায়েম হওয়ায় এই 'আমরা'-'ওরা'র বাস্তবতাও বেশ পেকে উঠেছিল। ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'আর্য সমাজ'এর মতো সংগঠনগুলো হিন্দুদের আর্যদের বংশধর এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি হিসেবে দেখাতে চাইল। এই আখ্যানটি পরবর্তীকালের হিন্দু সংস্কারকদের হাতে একটি পুনরুজ্জীবনবাদী মতাদর্শ তুলে দিয়েছিল, যাতে তারা সমসাময়িক পাশ্চাত্যের আধিপত্য ও অহঙ্কারকে মোকাবিলা করতে পারে। স্বামী বিবেকানন্দের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তাঁর ঐতিহাসিক ১৮৯৩ সালের বক্তৃতায় ভারতকে গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার দেশ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার সঙ্গে এর বৈপরীত্য তুলে ধরে এক আধুনিক রূপান্তরে নিয়ে যেতে সচেষ্ট ছিলেন। সেই রূপান্তর প্রচেষ্টায় জাতীয়তাবাদের বীজ সুপ্ত ছিল যা পরে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রাজনৈতিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে 'হিন্দু' (অন্য অর্থে, 'বৈদিক' বা 'সনাতন') উপাদানগুলি প্রকটিত হতে থাকলে ইসলাম-বিরোধী কিছু প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ১৯১৯ সালের খিলাফত আন্দোলনের সময় ভারতীয় মুসলমানদের প্যান-ইসলামি সংহতি ওই সনাতনী মতাদর্শকে আরও উসকে দেয়, যার ফলস্বরূপ এমনকি হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং 'হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের' মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। ঔপনিবেশিক তকমা দ্বারা 'ক্ষুদ্র জাতি' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বোঝা এবং জাতিভেদ প্রথার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া হিন্দুরা এক হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে; জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা 'মরণশীল জাতি'তে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করতে থাকে।

এই মতাদর্শগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভি ডি সাভারকর তাঁর ১৯৩২ সালের 'হিন্দুত্ব: হু ইজ আ হিন্দু?' বইয়ে একটি কট্টর জাতীয়তাবাদী দর্শনের কথা তুলে ধরেন। সাভারকর আর্য সমাজের জাতিগত আখ্যানকে অগ্রাধিকার দিয়ে দাবি করেন যে, ভারতের হিন্দুদের ('হিন্দু' শব্দটিকে তিনি প্রায় অধিকার করে নেন এবং কালক্রমে তার অর্থকেও সংকীর্ণ করে ফেলেন) শরীরে এখনও বৈদিক রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি ভারতকে কেবল একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এক পবিত্র ভূমি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি সংস্কৃতকে 'সকল ভাষার জননী' হিসেবে ঘোষণা করে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে চান। তিনি স্পষ্টভাবে মুসলমানদের বাহ্যিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন; তাঁর অভিযোগ ছিল, তাদের প্রাথমিক আনুগত্য ভারত নয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করা, যেখানে তিনি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ধর্মকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। আগেই বলেছি, 'হিন্দু', 'হিন্দুত্ব' ও 'হিন্দুস্তান' শব্দগুলোর আদি অর্থে কোনও ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে, এই পদগুলোর ব্যুৎপত্তিগত মূল নিহিত রয়েছে সিন্ধু (Indus) নদীর মধ্যে। প্রাচীন পারসিকরা স্বাভাবিকভাবেই 'S' (স) অক্ষরটিকে 'H' (হ) হিসেবে উচ্চারণ করত, যা 'সিন্ধু'কে 'হিন্দু'তে রূপান্তরিত করেছিল। একইভাবে, গ্রিকরা এটিকে 'ইন্দু' উচ্চারণ করত, যা শেষ পর্যন্ত 'ইন্ডিয়া' (India) শব্দের জন্ম দেয়। ফলস্বরূপ, সিন্ধু নদীর তীরে বসবাসকারী অধিবাসীদের ভৌগোলিকভাবে হিন্দু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

'হিন্দুস্তান' বলতে সংকীর্ণভাবে উত্তর ভারতকে বোঝাত, যে অঞ্চলটি পূর্বে 'আর্যাবর্ত' নামে পরিচিত ছিল। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের সর্বজনীনভাবে 'হিন্দুস্তানি' বলা হত। এই ধর্মনিরপেক্ষ, আঞ্চলিক ব্যবহার ইতিহাস জুড়েই স্পষ্ট। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ক্ষমতাশালী মুসলিম সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় গর্বের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে 'হিন্দুস্তানি দল' হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই দলের প্রভাবশালী মুসলিম সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে নিজেদের 'হিন্দুস্তানি' বলে উল্লেখ করতেন। তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দেশি বনাম বিদেশির পার্থক্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হত, যারা 'তুরানি দল' নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ধর্মের নেতারা 'হিন্দুস্তানি' শব্দটিকে কঠোরভাবে ভারতীয় অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান আরও জোরদার বলেন যে, 'হিন্দু' শব্দটি আদিতে আঞ্চলিক তাৎপর্য বহন করত, যা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আর্য সহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ এবং এর বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, প্রাচীন ভারত পরম ধর্মীয় সহনশীলতার এক কল্পরাজ্য ছিল। বৈদিক আর্যদের আগমন ছিল আগ্রাসী সংঘাতের দ্বারা চিহ্নিত। আদিবাসী অধিবাসীরা— কালো চামড়ার মানুষ যারা 'পুর' নামক প্রাচীর ঘেরা শহুরে বসতিতে বাস করত— আর্যদের হাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন হয়েছিল। আর্যরা হিংসাত্মকভাবে এই শহরগুলোকে ধ্বংস করে গর্ববোধ করেছিল এবং তাদের যুদ্ধদেবতা ইন্দ্রকে 'পুরন্দর' বা দূর্গ ধ্বংসকারী হিসেবে ভূষিত করা হয়েছিল। অনেক আদিবাসী তাদের বিশ্বাস রক্ষার্থে দুর্গম অঞ্চলে পালিয়ে গেলেও, যারা পিছনে রয়ে গিয়েছিল তাদের চাকর বা 'দাস' হিসেবে পরাধীন করা হয়েছিল। তবে, সামরিক বিজয় মানেই সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক নির্মূল ছিল না। আর্যরা বুঝতে পেরেছিল যে, আদিবাসী ধর্মগুলোকে সম্পূর্ণরূপে সমূলে উৎপাটিত করা অসম্ভব। ফলস্বরূপ, সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের একটি ধীর প্রক্রিয়া ঘটেছিল। বৈদিক আর্যরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ ও আত্তীকরণ করেছিল। ফলে, একটি মিশ্র ধর্মের সৃষ্টি হয় যেখানে সংস্কৃতভাষী আর্যরা নিরঙ্কুশ একচেটিয়া আধিপত্য বজায় না রেখেই নেতৃত্ব প্রদান করেছিল।

এই আত্তীকরণ সত্ত্বেও কঠোর বৈষম্য অব্যাহত ছিল। রামায়ণের একটি বিখ্যাত বিবরণে বলা হয়েছে যে, কেবল উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষিত আধ্যাত্মিক তপস্যা অনুশীলনের কারণে রামচন্দ্র শম্বুক নামক এক শূদ্র তপস্বীর মস্তক ছিন্ন করেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ আর্য সমাজের অভ্যন্তরে এই ধরনের বহু বৈষম্যমূলক বিচারের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত করে যে, বাংলার বৌদ্ধরা এবং তামিল অঞ্চলের জৈনরা মারাত্মক ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার হয়েছিলেন। নালন্দা ও সোমপুরার মতো প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলো আদিবাসী আক্রমণকারী ও লুঠেরাদের আতঙ্কে পরিখা ও বিশাল দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল, যা বুঝিয়ে দেয় ইসলামি আক্রমণের অনেক আগেই অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় কলহ বিদ্যমান ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্প্রসারণশীল আর্য ধর্ম বিভিন্ন অনার্য আচার-অনুষ্ঠান এবং বৌদ্ধ উপাদানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, যা শেষ পর্যন্ত কঠোর, শাস্ত্র-আবদ্ধ ধর্মের পরিবর্তে একটি বিস্তৃত মানসিকতায় বিবর্তিত হয়।

প্রাচীন ভারতের উচ্চমাত্রায় সংশ্লেষিত ঐতিহ্যগুলোর বিপরীতে ইসলাম এই উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল এক নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা এবং বাধ্যতামূলক শাস্ত্র সম্বলিত চূড়ান্ত এক কাঠামোগত ধর্ম হিসেবে। তবে, উত্তর ভারতে ইসলামের প্রাথমিক অনুপ্রবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ, যার নেতৃত্বে ছিলেন নিরস্ত্র সুফি সাধক ও মুসলিম বণিকেরা, যারা সশস্ত্র অভিযান শুরু হওয়ার অনেক আগেই সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। 'এক হাতে কোরান ও অন্য হাতে তলোয়ার'এর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল বলে যে প্রচলিত তত্ত্ব রয়েছে, আমি তার তীব্র সমালোচনা করছি। জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণই যদি প্রাথমিক পদ্ধতি হত, তবে যৌক্তিকভাবে মুসলিম জনসংখ্যা দিল্লি ও আগ্রার আশেপাশে কেন্দ্রীভূত থাকত, যা ছিল মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র। এর পরিবর্তে সিন্ধু, কেরালা ও বাংলার মতো দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইসলামের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, যা হিন্দু-মুসলিম বিভাজন থেকে লাভবান হওয়া ব্যক্তিদের প্রচারিত হিংসাত্মক ধর্মান্তরকরণ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে। বরং স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, 'ভারতে মুসলিম বিজয় নির্যাতিত গরিব মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিল। ... তারা জমিদারদের আর পুরোহিতদের কবল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল।' 

ইসলামের আগমনের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদ, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, বৈষ্ণববাদ ও শৈববাদ সহ বহু স্বতন্ত্র বিশ্বাসের অস্তিত্ব ছিল। তবে একক কোনও 'হিন্দু' ধর্মের অস্তিত্ব ছিল না। প্রাচীন ভারতীয়দের মধ্যে একটি 'আর্যাবর্ত চেতনা' বিরাজ করত, যা ছিল এমন এক অটুট বিশ্বাস যে তাদের ভূমি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনন্য, অভ্রান্ত ও শ্রেষ্ঠ। দু' হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত তার মূল সভ্যতার ভিত্তি মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করেই কুষাণ, গ্রিক ও হুনদের মতো বিদেশি আক্রমণকারীদের রক্ত ও সংস্কৃতিকে সফলভাবে আত্তীকরণ করেছিল। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা গজনীর মাহমুদের দ্বারা বলপূর্বক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সোমনাথের মতো মন্দির ধ্বংস করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থাকে চূর্ণ করে মাহমুদ প্রাচীন ভারতীয় শক্তির অহঙ্কার ও নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এই ধ্বংসযজ্ঞ অজান্তেই ভারতীয়দের তাদের বিচ্ছিন্ন চেতনা থেকে মুক্ত করেছিল, যা এক নতুন ধর্মীয় পরিচয়ের জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত ছিল। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারতীয়রা এমন এক বিদেশি ধর্মের মুখোমুখি হয় যাকে তারা সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। ইসলামের বিজয় যাত্রার সামনে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এক গভীর পরিবর্তন শুরু করে: তারা তাদের উৎসব, সামাজিক আচরণ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চায়। নিজেদের কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তারা তাদের ভৌগোলিক পরিচয়কে— 'হিন্দু'— একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে রূপান্তরিত করে।

আগত বিদেশি ধর্মতত্ত্ব থেকে স্থানীয় মতবাদগুলোকে আলাদা করতে ইসলাম-পূর্ব সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ব্যবস্থাকে তড়িঘড়ি করে 'হিন্দু' ধর্মের ছাতার নিচে আবদ্ধ করা হয়েছিল। ঠিক যেভাবে বিদেশি রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীকালে ঐক্যবদ্ধ 'ভারতীয়' পরিচয়ের জন্ম হয়েছিল, তেমনি বিদেশি ধর্মীয় প্রচারের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে 'হিন্দু' ধর্মীয় চেতনার উদ্ভব ঘটেছিল। ফলস্বরূপ, 'হিন্দু ধর্মের' জন্মের জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করাটাই ছিল এই উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম উল্লেখযোগ্য অবদান। হিন্দুত্ব সংজ্ঞায়িতকারী আধ্যাত্মিক উপাদানগুলো প্রাচীন হলেও, হিন্দু পরিচয়ের সমষ্টিগত উপলব্ধি এবং সংজ্ঞা মৌলিকভাবে মধ্যযুগের ঘটনাবলীর দ্বারাই রূপ পেয়েছিল। কিন্তু এই আধুনিক সময়ে তার পুনঃউন্মোচন এক অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাতের জন্ম দিয়েছে, যার ভবিষ্যৎ আশঙ্কাপূর্ণ।


Tuesday, 16 June 2026

'দ্য ট্যাপ কোড'

'রাজার কাছে খবর ছোটে...'

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৪০ সালে প্রকাশিত আর্থার কোয়েসলার'এর বিখ্যাত মাস্টারপিস উপন্যাস 'ডার্কনেস অ্যাট নুন' (Darkness at Noon)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী অংশ ছিল 'দ্য ট্যাপ কোড'। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রুব্যাশভ যখন একাকী কারাকক্ষে বন্দী, তিনি তাঁর পাশের সেলের বন্দীর (যার কোড নাম '৪৪২ নম্বর সেল') সঙ্গে দেয়ালে টোকা মেরে যোগাযোগ রাখতেন। এই যোগাযোগের জন্য উভয়েই একটি গ্রিড পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। ইংরেজি বর্ণমালাকে (A থেকে Z) একটি ৫×৫ গ্রিডে সাজানো হত (সাধারণত I এবং J-কে একই ঘরে রাখা হত)। প্রথম দফায় টোকা মেরে বোঝানো হত বর্ণটি কত নম্বর সারিতে (Row) আছে, আর দ্বিতীয় দফার টোকায় সেটি কত নম্বর স্তম্ভে (Column) আছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ 'B' লিখতে চায়, তবে সে প্রথমে ১ বার টোকা দেবে (১ নম্বর সারি), তারপর একটু থেমে ২ বার টোকা দেবে (২ নম্বর স্তম্ভ)। 

বাস্তবে, মুসোলিনির সময় ইতালির রাজবন্দীরাও গ্রিডভিত্তিক ট্যাপ কোড ব্যবহার করতেন। ইতালিয় বর্ণমালার জন্য তারা গ্রিডটি কিছুটা বদলে নিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে 'গ্রেট পার্জ'এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখা কোয়েসলার'এর উপন্যাসে বা বাস্তবে এই দেয়ালে টোকা মারা শব্দগুচ্ছ শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, বরং চরম একাকীত্ব ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন মানুষের বেঁচে থাকা ও একে অপরের পাশে থাকার এক অদ্ভুত মানবিক দলিল হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মানুষের আদিম মানবিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই— যেখানে প্রতিটি টোকার শব্দ বলত, 'আমি এখনও বেঁচে আছি, তুমি একা নও।'

আজ চারপাশ যখন স্তব্ধ হয়ে আসছে, সোশ্যাল মিডিয়া অথবা প্রকাশ্য সভায় কিংবা 'বন্ধু' মহলেও কারও কোনও একটি সমালোচনামূলক উক্তি বা চলমান ঘটনাবলী সম্পর্কে 'মূলধারা' প্রচারিত মতামতের বিরোধী সামান্য ভিন্ন মত কেউ পোষণ করলেই শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী বা পাড়া-প্রতিবেশীদের এক অংশও সবলে তার ওপরে নৃশংস ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তখন প্রতিটি টোকার শব্দ গভীরভাবে অর্থবহ। এই ঝাঁপিয়ে পড়াটা কেবলমাত্র শারীরিক নয়, তীব্র ভাবে মানসিকও। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রাবাসের র‍্যাগিং'এর মতো। আগে আমরা দেখেছি, শাসক-বিরোধী কোনও মতামত প্রকাশে রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসক দলের মাস্তান ও মাতব্বরেরা মূলত বিরোধী দলের কর্মী বা সমর্থকদের উপর হামলা করত। তা নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা হত, তুমুল চাপানউতোর চলত, মিডিয়া ইত্যাদিতেও সোরগোল উঠত, তারপর তার ভয়াবহতা অথবা অভিঘাতে হয়তো কিছু প্রলেপ পড়ত। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা একতরফা। আপনার কোথাও যাওয়ার নেই, কাওকে কিছু বলার নেই, কোনওভাবে বলতে পারলেও কারও শোনার সাহসটুকু নেই, মিডিয়া বলেও কিছু নেই, আদালতও প্রায়-বধির (যদি বা আদালত কিছু বলেও তা মানারও কোনও দরকার নেই)। ভবিষ্যতে হয়তো বিরোধী দল বলেও কিছু থাকবে না। এমন একটি সময়ের গর্ভে পৌঁছনো বোধকরি আবশ্যিক ছিল। না হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষ চেনার পাঠ অসমাপ্ত থেকে যেত।

ছোটবেলায় দেখতাম, ছিঁচকে চোর ধরার জন্য পাড়ার দাদা-কাকুরা দল বেঁধে 'নাইট গার্ড' বা রাতপাহারা দিত। 'ধরা যাক দু-একটি ইঁদুর এবার'এর মতো মাঝেসাঝে তেমন ছিঁচকে কেউ ধরাও পড়ত। একবার তেমন এক চোর ধরা পড়ার খবর শুনে সক্কালবেলা উঠে দৌড়ে গিয়ে দেখি, একটি ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পাড়ার ওই ভদ্দর দাদা-কাকুরা তাকে নৃশংস ভাবে মারছে। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। চোরটির মুখচোখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, সে আকুল নয়নে গলা ছেড়ে চীৎকার করছে, আর এক একজন পালা করে কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ লাথি মেরে, কেউ ঘুষিতে তাকে ছিন্নভিন্ন করছে। এখনও মনে আছে, পাড়ার সব থেকে গোবেচারা, নিরীহ, স্বল্পবাক, ভিতু লোকগুলি তাকে সব থেকে নৃশংস উপায়ে মারছে। জীবনে প্রথম ও শেষ দেখা এই দৃশ্যকল্প আমি বড়জোর মিনিট খানেক কি দেড়েক দেখতে পেরেছিলাম, তারপর এক ছুটে বাড়ি এসে বাথরুমে ঢুকে কেঁদে ফেলি। কিন্তু মন থেকে সে স্মৃতি আজও মুছতে পারিনি। বার বার মনে হয়েছে, ছিঁচকে চুরির শাস্তি তো অমন কঠোর হতে পারে না। আর ওই 'কাকু'টাই বা কীভাবে অমন ভয়ঙ্কর হয়ে চোরটাকে নির্দয় ভাবে মারতে পারছে। তা কি নিছকই সম্পত্তি চুরির আশঙ্কা থেকে নাকি তার অনেকের বিরুদ্ধে অনেক কিছু প্রতিশোধ নেওয়ার ছিল, সেই অশক্ত ও হীনম্মন্য মনের সে সাধ্যি যখন নেই, তখন যাকে হাতের কাছে পাওয়া গেল, তাকেই না হয়...। 

আজ চারপাশে যেন সেই দৃশ্যের মেলা। হঠাৎ করে একপাল মুখচোরা, আপাত নিরীহ কিছু চেনা জন যেন অতীব হিংস্র হয়ে উঠেছে; ছোটবেলায় দেখা সেই গোবেচারা কাকু-দাদাগুলির মতোই, যারা কারও সাতেপাঁচে থাকত না, কোনও বিপদে-আপদেও তাদের পাওয়া যেত না, স্বার্থগন্ধ লালায়িত সেই মানুষগুলো চরে বেড়াত নানাবিধ সুযোগের সন্ধানে আর চুপিচুপি এর-ওর কান ভাঙ্গিয়ে রোপণ করত বিষ ও প্রতিহিংসা। জিঘাংসাই যখন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রনীতি, তখন এই লোকগুলিই ক্ষমতার আধার হয়ে বিষবাষ্পে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। এক সর্বগ্রাসী হিংস্র সমাজের নির্মাণ হতে থাকে। আমরা দগ্ধ হই। আমাদের শব্দমালা হারিয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই মেটাফোরে। তৈরি হয় ট্যাপ কোড। নির্মিত হয় এসোপিয় ভাষা। ১৯২২ সালে 'ধূমকেতু' পত্রিকায় নজরুল লেখেন 'আনন্দময়ীর আগমনে'। তবুও তিনি ছাড় পান না। ইংরেজরা তাঁকে বন্দী করে। পরে রবীন্দ্রনাথ লিখবেন 'তাসের দেশ'। পাশাপাশি, ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের বন্দীরা পাহাড়ি বা আঞ্চলিক উপভাষা (যেমন, সিসিলিয়ান বা নেপোলিটান ডায়ালেক্ট) ব্যবহার করতেন, যা উত্তর ইতালির ফ্যাসিবাদী প্রহরীরা সহজে বুঝতে পারত না। অন্যদিকে, হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের (যেমন, আউশভিৎস, বুখেনভাল্ড) নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্রতার কারণে সেখানে বেঁচে থাকা ও প্রতিরোধের জন্য বন্দীরা অদ্ভুত সব ভাষা তৈরি করেন। ল্যাগার-জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বন্দীরা থাকতেন। তাঁরা জার্মান, পোলিশ, ইয়াইডিশ (Yiddish) শব্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র ‘ক্যাম্প ল্যাঙ্গুয়েজ’ তৈরি করেন। প্রহরীরা এই ভাষা বুঝত না, ফলে বন্দীরা প্রতিরোধের গোপন বার্তা আদান-প্রদান করতেন।

আর এইভাবেই তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক দলিল ও সাহিত্যসম্ভারও। যেমন:

১) আন্তোনিও গ্রামশির 'প্রিজন নোটবুকস': ইতালির বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি মুসোলিনির কারাগারে প্রায় ১১ বছর বন্দী ছিলেন। কারাগারে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘প্রিজন নোটবুকস’ লেখেন। ফ্যাসিবাদী সেন্সরশিপ এড়াতে তিনি খাতার পাতায় সরাসরি 'মার্কসবাদ', 'লেনিন' বা 'শ্রেণি সংগ্রাম' শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। পরিবর্তে তিনি ছদ্মনাম বা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতেন। যেমন, কার্ল মার্কস'কে তিনি লিখতেন 'দ্য ফাউন্ডার'।

২) প্রিমো লেভির 'ইফ দিস ইজ আ ম্যান': নাৎসি আউশভিৎস ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা ইতালিয় লেখক প্রিমো লেভি তাঁর এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে ক্যাম্পের ভেতরের সেই গোপন ভাষা ও যোগাযোগের কথা বিস্তারিত লিখেছেন, কীভাবে শব্দের সামান্য হেরফের করে বা চোখের ইশারায় একে অপরকে প্রহরীদের চাবুক বা গ্যাস চেম্বার থেকে বাঁচানো হত।

৩) হান্স ফালাডা'র 'এভরি ম্যান ডাইস অ্যালোন': নাৎসি জার্মানির পটভূমিতে লেখা এই বিখ্যাত উপন্যাসে (যা বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত) আমরা পাই, কীভাবে এক সাধারণ দম্পতি হিটলারের বিরুদ্ধে পোস্টকার্ডে গোপন বার্তা লিখে বার্লিনের আনাচে-কানাচে ফেলে রেখে এক নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন; যা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যোগাযোগের এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল।

অতএব, 'অচলায়তন'এর বিরুদ্ধে দর্ভক ও শোনপাংশুদের নিয়ে আচার্য এসে পড়েন, অথবা, 'তাসের দেশ'এর রুইতন ও হর্তনের অধীন অন্ধভক্ত টেক্কা, গোলাম, সাহেবদের রাজত্বও ভেঙে পড়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত  'চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়/ এদিক ওদিক ডাইনে বাঁয়,/ রাজার কাছে খবর ছোটে,/ পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,/ দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়-/ একুশ হাতা জল গেলায়।' (একুশে আইন, সুকুমার রায়)।


Saturday, 13 June 2026

চিকিৎসায় গাফিলতি

রোগীর অধিকার ও প্রতিরোধের পথ

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



একজন ২৪ বছরের পর্বতারোহী জ্বর নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে এক মাসের মধ্যে মারা গেলেন। এই একটি ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীরা কতটা অসহায়। আমরা চিকিৎসা কিনি, টাকা দিই, অথচ চিকিৎসার সময় আমাদের ইচ্ছা, আমাদের মতামতের কোনও দাম থাকে না। রোগী এখানে চিরকালই দুর্বল পক্ষ।

চিকিৎসায় গাফিলতি কাকে বলে?  

অ্যাডভোকেট নিশান্ত ভারিহোকে স্পষ্ট করেছেন যে হাসপাতালে সব মৃত্যুই গাফিলতি নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান জাদু নয়। সঠিক চিকিৎসার পরেও রোগী মারা যেতে পারেন। সেটা জটিলতা, গাফিলতি নয়। 

গাফিলতি প্রমাণ করতে তিনটি শর্ত লাগে:

১) দায়িত্বের কর্তব্য: ডাক্তার রোগী দেখলেই আইনি দায়িত্ব শুরু হয়। 

২) কর্তব্যে ত্রুটি: একজন সাধারণ দক্ষ ডাক্তার যা করতেন, তার চেয়ে নিম্নমানের সেবা দেওয়া। 

৩) পরিমাপযোগ্য ক্ষতি: মৃত্যু, পঙ্গুত্ব, আর্থিক ক্ষতি বা অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা। 

এই তিনটিই প্রমাণ করতে হবে।

ভারতের বুকে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের কিছু উদাহরণ:  

১) অনুরাধা সাহা মামলা, কলকাতা ১৯৯৮: মার্কিন প্রবাসী শিশু মনোবিজ্ঞানী অনুরাধা সামান্য ত্বকের অ্যালার্জি নিয়ে ভর্তি হন। তাঁকে মাত্রাতিরিক্ত স্টেরয়েড ডেপোমেড্রল দেওয়া হয়। চিকিৎসার ভুলে তাঁর শরীরের চামড়া খসে পড়ে এবং তিনি মারা যান। ১৫ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এএমআরআই হাসপাতাল ও তিন ডাক্তারকে ৫.৯৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। ভারতে চিকিৎসায় গাফিলতির মামলায় এটিই সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ।

২) আকাঙ্ক্ষা শর্মা মামলা, ২০১২: দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালে ১৭ বছরের মেয়ে মস্তিষ্কের টিউমার অপারেশনের পর মারা যায়। অভিযোগ, অপারেশনের পর আইসিইউ-তে প্রয়োজনীয় নজরদারি ছিল না। রক্তক্ষরণের লক্ষণ উপেক্ষা করা হয়। আকাঙ্ক্ষা শর্মা মামলার রায় বেরয় ১৭ মার্চ, ২০১৬। এটা Dr. K K Sharma vs Fortis Hospital মামলা। ১৭ বছরের আকাঙ্ক্ষা শর্মার বাবা ডা. কে কে শর্মা চণ্ডীগড় স্টেট কমিশনে অভিযোগ করেন। স্টেট কমিশন ১৫/০৪/২০০৮ তারিখে মামলা খারিজ করে দিলে তিনি ন্যাশনাল কনজিউমার ডিসপুটস রিড্রেসাল কমিশনে (NCDRC) আপিল করেন। NCDRC ১৭ মার্চ ২০১৬ তারিখে রায় দেয়। রায়ে NCDRC বলে, হাসপাতালের কোনও গাফিলতি প্রমাণিত হয়নি এবং অভিযোগ খারিজ করে দেওয়া হয়। তাই এই মামলায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

৩) খালি অক্সিজেন সিলিন্ডার, গোরক্ষপুর ২০১৭: বিআরডি মেডিকেল কলেজে অক্সিজেনের অভাবে ৬০ জনের বেশি শিশু মারা যায়। হাসপাতাল বিল মেটায়নি বলে সরবরাহকারী সংস্থা অক্সিজেনের জোগান বন্ধ করে দেয়। এটা সরাসরি প্রশাসনিক গাফিলতি ও ফৌজদারি অপরাধের উদাহরণ। গোরক্ষপুর ২০১৭ অক্সিজেন মামলার রায়টি একক কোনও 'রায়' নয়, একাধিক মামলার ফলশ্রুতি। মূল ঘটনা ছিল ১০-১১ আগস্ট ২০১৭, BRD মেডিকেল কলেজে অক্সিজেন সংকটে শিশুমৃত্যু। অক্সিজেন সরবরাহকারী Manish Bhandari-কে সুপ্রিম কোর্ট ৯ এপ্রিল ২০১৮ জামিন দেয়। PIL মামলাগুলো এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২৭ অক্টোবর ২০২২ খারিজ করে দেয়। চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্তের রায় এখনও হয়নি, যদিও সরকারি তদন্তে 'অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু হয়নি' বলা হয়েছে। 

৪) ভুল পা কেটে ফেলা, মুম্বাই ২০১৬: একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডায়াবেটিক রোগীর ডান পায়ের বদলে বাম পা কেটে ফেলা হয়। রিপোর্ট না দেখেই অপারেশন করা হয়েছিল। পরে রোগীর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ঘটে ১৯ জুন ২০১৬'এ। রোগী রবি রাই ডান পায়ে চোট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কেসটিতে NCDRC রায় দেয় ২৪ জুন ২০২৪। মোট ১.১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়-- যার মধ্যে ফর্টিস হাসপাতাল ৯০ লাখ এবং দুই সার্জন ১০ লাখ করে দেবেন। ২ ডিসেম্বর ২০২৪'এ সুপ্রিম কোর্ট সার্জন ডা. রাহুল কাকরানের আপিল খারিজ করে 'Gross medical negligence' বলে NCDRC-র রায় বহাল রাখে।

উপরের উদাহরণে সবকটিই যে সুস্পষ্ট গাফিলতি, তঞ্চকতা ও অনেক ক্ষেত্রে অন্যায় লাভের জন্য ইচ্ছাকৃত অবহেলা তা নয় যদিও, তবে অনেকগুলো কেসই তাই।

ডাক্তারদের দায়িত্ব ও আইন কী বলে?  

মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া ২০০২ সালে Indian Medical Council (Professional Conduct, Etiquette and Ethics) Regulations, 2002 জারি করে। ২০২০ সালে MCI ভেঙে National Medical Commission (NMC) গঠিত হয়। ২০২৩ সালে NMC Registered Medical Practitioner (Professional Conduct) Regulations, 2023 আনা হয়। এই আইনে স্পষ্ট বলা আছে:  

১) রোগীর সম্মতি: কোনও পরীক্ষা বা অপারেশনের আগে রোগীকে ঝুঁকি বুঝিয়ে লিখিত সম্মতি নিতে হবে। বাধ্য করা যাবে না।  

২) যুক্তিসঙ্গত যত্ন: ডাক্তারকে নিজের দক্ষতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ যত্ন নিতে হবে।  

৩) রেকর্ড রাখা: সব প্রেসক্রিপশন, কেস হিস্ট্রি, ইনডোর চার্ট ৩ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। BHT (Bead Head Ticket) /Treatment Order এবং নার্সদের ওয়ার্ক শিট ইত্যাদি রোগী বা রোগীর বাড়ির লোক চাইলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে।  

৪) কমিশন নেওয়া নিষিদ্ধ: ওষুধ কোম্পানি বা ল্যাব থেকে কাটমানি, উপহার নেওয়া পেশাগত অসদাচরণ।  

৫) জেনেরিক ওষুধ: ডাক্তারকে সম্ভব হলে জেনেরিক নামে ওষুধ লিখতে হবে।

এই নিয়ম ভাঙলেই তা Professional Misconduct। আর সেবার মান ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ হলে তা Medical Negligence। পাশাপাশি Consumer Protection Act, 2019 অনুযায়ী চিকিৎসা একটি পরিষেবা। তাই অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানো, প্যাকেজের বাইরে বিল বাড়ানো, মৃতদেহ আটকে রাখা Unfair Trade Practice বলে গণ্য হবে। এই তিনটিই আইনের বিচারে চিকিৎসায় গাফিলতির আওতায় আসে।

কর্পোরেট হাসপাতাল কীভাবে শোষণ করে?  

১) টার্গেট সিস্টেম: অনেক কর্পোরেট হাসপাতালে ডাক্তারদের মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক সার্জারি বা অ্যাডমিশনের টার্গেট দেওয়া হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় অপারেশন বাড়ে।  

২) প্যাকেজের ফাঁদ: ২ লাখের প্যাকেজে ভর্তি করিয়ে শেষে ৫ লাখ বিল ধরানো হয়। বলা হয় জটিলতা হয়েছে।  

৩) কমিশন চক্র: নির্দিষ্ট ল্যাব বা ফার্মেসি থেকে টেস্ট করালে ডাক্তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিশন পান।  

৪) আইসিইউ ব্যবসা: রোগী মারা গেলেও ভেন্টিলেটরে রেখে বিল বাড়ানো হয়। আত্মীয়দের মিথ্যা আশা দেওয়া হয়।  

৫) ইনস্যুরেন্স হয়রানি: ক্যাশলেস রোগীকে দেরি করে ছাড়া, যাতে বেড চার্জ বাড়ে।

ফলে, বহু ক্ষেত্রেই অতিচিকিৎসা বা অপচিকিৎসা হয়। যাদের ইন্স্যুরেন্স আছে তারাও রেহাই পান না, বরং অতিচিকিৎসার প্রবণতাও এ ক্ষেত্রে বেশিই হয় যেহেতু মেডিক্লেমে সব টাকার প্রায় সিংহভাগ খরচ করে দেয় অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বা প্রসিডিওর করে। গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগে। তাদের হাতে আইনি লড়াইয়ের টাকা নেই, সময় নেই, প্রভাবও নেই।

গাফিলতির শিকার হলে গরিব মানুষ কী করবেন?  

আইনজীবী ভারিহোকের পরামর্শ অনুযায়ী চারটি পথ আছে:  

ক) সব নথি সংগ্রহ: ডিসচার্জ সামারি, প্রেসক্রিপশন, বিল, সিসিটিভি, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এইসব হাসপাতাল দিতে বাধ্য।  

খ) স্টেট মেডিকেল কাউন্সিল: এখানে অভিযোগ করলে লাইসেন্স বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। এই রিপোর্ট পরের মামলায় কাজে লাগে।  

গ) কনজিউমার কোর্ট: জেলা, রাজ্য, জাতীয় স্তরে মামলা করা যায়। খরচ কম, তুলনায় দ্রুত। চিকিৎসা খরচ, আয়ের ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণার ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়।  

ঘ) দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা: ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ১০৬ ধারা অনুযায়ী গাফিলতিতে মৃত্যু হলে জেল হতে পারে। তবে প্রমাণ কঠিন। রেকর্ড জালিয়াতি থাকলে মামলা শক্ত হয়।

বিনামূল্যে আইনি সাহায্যের জন্য District Legal Services Authority-তে যোগাযোগ করা যায়।

কেন অসাধু ডাক্তার ও কর্পোরেটরা আইনের বিরোধিতা করে?  

১) টাকার অঙ্ক: স্বাস্থ্য হল ভারতে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার। ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হলে ব্যবসার লাভ কমে। পুরো হেলথ কেয়ার ইকোসিস্টেমের FY25-এ বাণিজ্য $300 বিলিয়ন, যা ২০৩০-এ $700 বিলিয়নে পৌঁছবে (সূত্র: মিনিস্ট্রি অফ্ হেলথ এ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার, ভারত সরকার কর্তৃক সার্ভে)।

২) রাজনৈতিক যোগ: অনেক বড় হাসপাতালের মালিক সরাসরি রাজনৈতিক নেতা বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ। আইন কড়া হলে এঁদের স্বার্থে আঘাত লাগে।  

৩) ডাক্তারদের লবি: আইএমএ'র মতো সংগঠনের কোনও কোনও নেতৃত্বের যুক্তি যে, মামলার ভয়ে ডাক্তাররা ঝুঁকি নেবেন না, এতে Defensive Medicine বাড়বে। অথচ আসল ভয় হল জবাবদিহির।  

৪) প্রমাণের জটিলতা: চিকিৎসার ভাষা সাধারণ মানুষ বোঝে না। ডাক্তাররা একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চান না। এই কাঠামোগত সুবিধা তাঁরা হারাতে চান না।

রোগী পরিষেবা কেনে কিন্তু তার ইচ্ছার দাম নেই। ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক বিশ্বাসের, কিন্তু সেই বিশ্বাস ভাঙলে প্রতিকারের পথ ভীষণ কঠিন। তবু ন্যায়বিচার অসম্ভব নয়। অনুরাধা সাহা মামলা প্রমাণ করেছে যে লড়াই করলে প্রায় ৬ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এই জরিমানাই কর্পোরেট হাসপাতালকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাওয়ায়।

তাই চুপ করে থাকলে চলবে না। রেকর্ড চাইতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, আইনের পথে হাঁটতে হবে। কারণ, চিকিৎসায় গাফিলতি বন্ধ করার একমাত্র উপায় হল তাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ব্যয়বহুল করে তোলার বিরুদ্ধে কথা বলা। রোগীর জীবনের দাম আছে। সেটা হাসপাতালের বিল দিয়ে মাপা যায় না। 'স্বাস্থ্য'কে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিটি কোনওভাবেই যেন হারিয়ে না যায়।

তথ্যসূত্র:

১) আইনি ও রেগুলেটরি সূত্র:

1. National Medical Commission Regulations, 2023

   - NMC Registered Medical Practitioner (Professional Conduct) Regulations, 2023

   - ডাক্তারের কর্তব্য, রোগীর সম্মতি, রেকর্ড রাখা, কমিশন নিষিদ্ধ - সব ধারা এখানে আছে।

   - সূত্র: NMC-এর অফিসিয়াল গেজেট, ২ আগস্ট ২০২৩।

2. Consumer Protection Act, 2019-

   - ধারা ২(৪২) এ চিকিৎসা পরিষেবাকে 'Service' বলা হয়েছে;

   - Unfair Trade Practice'এর ব্যাখ্যা এখান থেকেই এসেছে।

3. ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩ - ধারা ১০৬

   - আগে ছিল IPC 304A। গাফিলতিতে মৃত্যুর শাস্তি এখানে বলা আছে।

   - সূত্র: Ministry of Home Affairs গেজেট।

4. Jacob Mathew vs State of Punjab, 2005 

   - সুপ্রিম কোর্টের এই রায়েই গাফিলতির তিন শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়: Duty, Breach, Damage;

   - Bolam Test-এর ভারতীয় প্রয়োগ এখানেই।

২) কেস ল ও জাজমেন্ট

1. Kunal Saha vs Dr. Sukumar Mukherjee, 2013 

   - অনুরাধা সাহা মামলার রায়। সুপ্রিম কোর্টের ২৪ অক্টোবর ২০১৩-এর জাজমেন্ট;

   - ৫.৯৬ কোটি ক্ষতিপূরণের ডিটেল এখান থেকে।

2. Puneet Ahluwalia vs Fortis Escorts, 2024 

   - ভুল পা কাটার কেস। NCDRC ২৪ জুন ২০২৪ ও সুপ্রিম কোর্ট ২ ডিসেম্বর ২০২৪।

3. Dr. K.K. Sharma vs Fortis Hospital, 2016  

   - আকাঙ্ক্ষা শর্মা মামলা। NCDRC ১৭ মার্চ ২০১৬'এর রায়।

৩) সরকারি রিপোর্ট ও ডেটা

1. Ministry of Health & Family Welfare রিপোর্ট  

   - ভারতের হেলথ কেয়ার মার্কেট সাইজ: FY2025 এ $300 বিলিয়ন, ২০৩০-এ $700 বিলিয়ন প্রজেকশন;

   - সূত্র: Invest India, MoHFW Annual Report।

2. BRD মেডিকেল কলেজ তদন্ত রিপোর্ট  

   - গোরক্ষপুর ২০১৭ ঘটনার সরকারি তদন্ত। অক্সিজেন সংকট অস্বীকার করা হয়েছে এখানে;

   - এলাহাবাদ হাইকোর্ট PIL খারিজ ২৭ অক্টোবর ২০২২।

৪) আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আর্টিকেল

1. অ্যাডভোকেট নিশান্ত ভারিহোকের ইন্টারভিউ/লেখা

    - গাফিলতি বনাম জটিলতার পার্থক্য, ৪টি পথ - এই ফ্রেমওয়ার্কটা ওনার বক্তব্য থেকে নেওয়া।

2. IMA-র পজিশন পেপার 

    - Defensive Medicine নিয়ে ডাক্তারদের লবির যুক্তি এখান থেকে।

3. District Legal Services Authority-র গাইডলাইন   

    - গরিব রোগীদের বিনামূল্যে আইনি সাহায্যের প্রসেস এখানে আছে।

৫) মিডিয়া ও ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট

1. The Hindu, Indian Express, Times of India আর্কাইভ 

    - অনুরাধা সাহা মামলা।

2. লাইভ ল', বার অ্যান্ড বেঞ্চ   

    - জাজমেন্টের অরিজিনাল কপি আর আইনি বিশ্লেষণ এগুলোতে পাওয়া যায়।


Saturday, 6 June 2026

এক অমোঘ উত্তরণের পথে?

যন্তর মন্তর এক অভূতপূর্ব সমাবেশ দেখল

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই, কোনও বৃহত্তর গণ দাবি বা ইস্যু’তে রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বে উঠে দেশ বা রাজ্যব্যাপী প্রায়-সর্বাত্মক গণ জাগরণ কিংবা আন্দোলন আগে হয়নি। কিন্তু সেই আন্দোলনগুলির পিছনে বা আহ্বানে থাকতেন এমন কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্ব যাঁদের কোনও দলীয় মোড়কে ফেলাটা ছিল দুষ্কর, সর্বোপরি, তাঁদের এক সার্বিক গ্রহণযোগ্যতাও ছিল। যেমন, জয়প্রকাশ নারায়ণ অথবা আন্না হাজারে— স্বাধীনতার পর যে দুই ব্যক্তিত্ব দেশব্যাপী এক গণ আলোড়ন তুলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাণ্ডারী হয়েছিলেন। ফলে, কার গুড় এসে কোন পিঁপড়ে খেয়ে গেল, সে নানাবিধ উত্তর-বিচার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা করতে পারেন, কিন্তু এমনটা ঘটা যে অসম্ভব কিছু নয়, সে কথাটুকুই বললাম মাত্র।

কিন্তু যে প্রসঙ্গে বলতে চাইলাম, সেখানে অন্য আরেকটি মাত্রা আছে। অভিজিৎ দিপকে বা তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এবং তাঁদের হঠাৎ সৃষ্ট ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আজ থেকে ১৫-২০ দিন আগেও ছিলেন একেবারে অপরিচিত (তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের বিভিন্ন মতামত প্রকাশের কারণে তাঁরা এক অংশের মানুষজনের কাছে অবশ্যই পরিচিত বা জনপ্রিয় ছিলেন)। প্রধান বিচারপতির যুব সমাজের প্রতি ‘ককরোচ’ মন্তব্যে অভিজিতের তির্যক ট্যুইট ও সেই অভিঘাত থেকে তৈরি একটি দল, যে দল আর পাঁচটা দলের মতো একেবারেই নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক একটি জমায়েত হিসেবেই যার আত্মপ্রকাশ। অথচ, সেই দলেরই ডাকে আজ (৬ জুন) দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারে হাজারে মানুষের গণ জমায়েত হয়ে গেল। একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাবি উঠল: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।

প্রাথমিক একটা শঙ্কা ছিল, এই সমাবেশ আদৌ করতে দেওয়া হবে কিনা। দেখা গেল, দিল্লি বিমানবন্দরে সকালে অভিজিৎ নামতেই পুলিশ তাঁকে জানিয়ে দেয়, যন্তর মন্তরে তাঁরা সভা করতে পারবেন। ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে এক চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ যে বিদ্যমান, তার খোঁজ গোয়েন্দা দফতরের কাছে ছিল; উপরন্তু, এই সমাবেশকে ঘিরে যুব সমাজের অভ্যন্তরে যে তুমুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, সে খবরও তারা জানত। ফলে, একপ্রকার জনজোয়ারের চাপে সভাটিকে তারা হতে দিল, পাশাপাশি, বাজিয়েও দেখতে চাইল, সোশ্যাল মিডিয়ার কলরব কতটা বাস্তবে আছড়ে পড়ে। তদুপরি, ঠিক তার আগের দিনই, এই সভাকে নিরুৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী সগর্বে ঘোষণা করলেন দেশের অর্থনৈতিক মজবুতির কথা, যাতে যুব সমাজ তাঁর কথায় বল পায়। কিন্তু ন্যাড়া ক’বার বেলতলায় যায়? ককরোচ জনতা পার্টি আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই শাসকের হিন্দু-মুসলমানের দ্বৈরথের গল্পে তারা ক্লান্ত, দেশের অগ্রগতির গুজবেও তারা পরিশ্রান্ত, নির্বাচন কমিশন সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে কব্জা করে দেশে একনায়কতন্ত্রের আস্ফালনও তারা দেখছে, একের পর এক ক্ষমতার দুর্নীতির চরম ও সর্বগ্রাসী ব্যবস্থাকেও তারা জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করছে, অতএব, দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেছে তখন পথে নামা ছাড়া আর উপায় কী! গত দু-এক বছরে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের GenZ আন্দোলনের টাটকা স্মৃতিও তো শাসককুলকে তাড়া করছে যাতে এমনতর পুনরাবৃত্তি এখানেও না হয়। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই এই নতুনতর GenZ আন্দোলনের বীজ ও উত্থান।

বলাই বাহুল্য, সব মিলিয়ে ৬ জুন যন্তর মন্তরে এক অভূতপূর্ব সভা হল। লোকসমাগমও হল ঐতিহাসিক। কোনও মঞ্চ নেই, মাইক নেই, শুধুই শ্লোগান ও উদ্দীপনা; যদিও পরে সে সবের খানিক বন্দোবস্ত হল। মঞ্চে সোনম ওয়াংচুক’কেও দেখা গেল। তিনি বললেন। আর যা ছিল— তীব্র দাবদাহ (৪৫ ডিগ্রি), জলকষ্ট ও উপস্থিত প্রতি জনের অকল্পনীয় জেদ। কেরালা থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার থেকে তামিলনাড়ু— কোথা থেকে ছেলেমেয়েরা আসেনি! বয়স্ক মানুষেরাও ভীড় করেছেন। এক আলটপকা দলের জন্ম মুহূর্তের আহ্বানে মাত্র ৪-৫ দিনের অবসরে এই অচিন্তনীয় জনসমাবেশ এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে, জমি প্রস্তুত, যথার্থ আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্যে অবিচল থেকে যদি নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করা যায় তবে সত্যি অর্থে মর্মবস্তুগত পরিবর্তন সম্ভব।

গত এক দশকে আমাদের দেশে যে ঘৃণার চাষ হয়ে চলেছে, দেশের মানুষ যে অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন, বিরোধাভাসের সামান্য আঁচটুকু পেলেই যখন মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে, তখন এই অভূতপূর্ব জনজাগরণ সকলের মনে আশা ও আস্থার সঞ্চারক বলে বহুজনের বিশ্বাস। আমরা জানি না, এই যুব অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ কী! আপাতত তাঁরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সাতদিন সময় দেওয়া হচ্ছে— হয় তিনি পদত্যাগ করবেন অথবা প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বরখাস্ত করবেন। নচেৎ, তাঁরা আন্দোলনকে এবারে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সংগঠিত করবেন।

অবশ্য, তাঁদেরও কিছু প্রস্তুতি দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার মিম ও তির্যক পোস্ট থেকে তাঁরা বাস্তব ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। একে অপরকে ভালোমতো চেনাজানা ও সাংগঠনিক কিছু কাঠামোরও প্রয়োজন আছে। সে সব অবলম্বনের কথা তাঁরা ভালোমতোই বোঝেন। অন্যত্রও GenZ আন্দোলন রাতারাতি কোনও যাদুবলে কার্যকরী অবয়ব ও অভিঘাতে পৌঁছয়নি। আমাদের দেশে এই সবে শুরু। আর শাসকের বাড়াবাড়িও অতিক্রম করে গেছে নিয়ন্ত্রণের বেড়া। আজ যন্তর মন্তরে তাই অধিকাংশ আরশোলাদের হাতে ছিল ভারতীয় সংবিধান ও আম্বেদকরের ছবি। উচ্চারণে ছিল ‘জয় হিন্দ’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।

যে নতুন যাত্রাপথের আজ শুরু, তার শেষ হবে এক অমোঘ উত্তরণে।


Tuesday, 26 May 2026

ফুটপাথের অর্থনীতি

অন্তরালে মানবিক বিপর্যয়!

অয়ন মুখোপাধ্যায়



সাম্প্রতিক কালে ভারতের নগরোন্নয়ন ও পুর প্রশাসনের অভিধানে একটি নতুন শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে: ‘বুলডোজার’। একদা যা ছিল কেবলই রাস্তা নির্মাণ বা ভারী পরিকাঠামো গড়ার নিরীহ যন্ত্র, আজ তা রাষ্ট্রশক্তির একচ্ছত্র দাপট, তাৎক্ষণিক বিচার ও প্রান্তিক দমনের এক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষত, মহানগরের রাস্তা ও ফুটপাথ ‘পরিষ্কার’ করার নামে হকার উচ্ছেদের যে হিড়িক দেশ জুড়ে তথা পশ্চিমবাংলায় দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কোনও প্রশাসনিক সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচি নয়; বরং তাকে কেউ কেউ স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৃহৎ অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ ঘোষণা বলছেন। এই 'বুলডোজার সংস্কৃতি' আদতে একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটকে আইনি চাদরে ঢেকে ফেলার এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনা।

নান্দনিকতার নগর বনাম বেঁচে থাকার নগর

যে কোনও আধুনিক শহরের দুটি রূপ থাকে। একটি তার বাহ্যিক অবয়ব— ঝকঝকে বহুতল, চওড়া রাস্তা, ফ্লাইওভার ও শপিং মল। অন্যটি তার প্রাণস্পন্দন— যা সচল থাকে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরে। হকাররা হলেন সেই প্রাণস্পন্দনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উচ্ছেদপন্থীদের প্রধান যুক্তি হল, হকারদের কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, যানজট তৈরি হচ্ছে এবং শহরের নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে। প্রথমাংশে এই যুক্তিকে আংশিক সত্য বলে মেনে নিলেও, দ্বিতীয় অংশটি অত্যন্ত সুবিধাবাদী। ‘নান্দনিকতা’ বা ‘বিউটিফিকেশন’এর যে ধারণা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মননে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইউরোপ-কেন্দ্রিক। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যা ও বেকারত্বের দেশে শহরের সৌন্দর্য কখনই তার দরিদ্রতম নাগরিকদের পেটে লাথি মেরে অর্জিত হতে পারে না।

বুলডোজার দিয়ে যখন একটি হকারের অস্থায়ী দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন কেবল কিছু বাঁশ, প্লাস্টিক বা কাঠ ধ্বংস হয় না; তার সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের অন্তত তিন প্রজন্মের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা। ফুটপাথ যদি পথচারীর অধিকার হয়, তবে জীবনধারণের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)। একটি অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি অধিকারকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলার এই সংস্কৃতি কোনও সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

হকার অর্থনীতি: এক অদৃশ্য স্তম্ভ

হকারদের শুধু ‘জবরদখলকারী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে নগরের অর্থনীতিতে তাদের অবদান কতটা গভীর:

১) হকাররা শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে অত্যন্ত সস্তা দরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেন। শপিং মলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে যে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, ফুটপাথে তা-ই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে;

২) রাষ্ট্র যেখানে কোটি কোটি যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেখানে হকাররা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তারা রাষ্ট্রের ওপর বোঝা না হয়ে, উলটে স্বনির্ভরতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন;

৩) পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনে খুচরো বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখেন।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, হকাররা হলেন শহরের ‘অর্থনৈতিক কুশলী’ (Economic Cushions)। মন্দার সময়েও তারা শহরের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেন না। এই বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রটিকে আইনি স্বীকৃতি ও পরিকাঠামো না দিয়ে বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলার চেষ্টা অর্থনৈতিক আত্মহত্যার সামিল।

২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় আইনকে বুড়ো আঙুল

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো প্রায়শই দেশের প্রচলিত আইনকে লঙ্ঘন করে চালানো হয়। ২০১৪ সালে ভারতের সংসদে অত্যন্ত প্রগতিশীল একটি আইন পাস হয়েছিল— ‘দ্য স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪’। এই আইনের মূল কথাই ছিল:

ক) প্রতিটি পুরসভায় একটি করে টাউন ভেন্ডিং কমিটি (TVC) থাকবে, যেখানে হকারদের নিজেদের প্রতিনিধি থাকবে;

খ) প্রথমে শহরের সমস্ত হকারের সমীক্ষা করতে হবে এবং তাদের পরিচয়পত্র ও ভেন্ডিং সার্টিফিকেট দিতে হবে;

গ) কোনও হকারকে উপযুক্ত বিকল্প জায়গা না দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে না।

আইনের এই স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও ভারতের অধিকাংশ রাজ্য ও পুরসভা এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। কোনও নোটিশ না দিয়ে, কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করে, রাতারাতি পুলিশ ও বুলডোজার নামিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এটি কেবল অমানবিক নয়, সরাসরি দেশের আইনের অবমাননা এবং বিচারব্যবস্থার সমান্তরালে এক স্বৈরাচারী প্রশাসনিক সংস্কৃতি। দেশের শীর্ষ আদালতও এ বিষয়ে কড়া মনোভাব দেখিয়েছে ও নিন্দা করেছে।

বুলডোজার সংস্কৃতির মনস্তত্ত্ব 

বুলডোজার সংস্কৃতি আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এটি জটিল সামাজিক সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে না। এটি বিশ্বাস করে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান ‘অ্যাকশন’এ। যখন কোনও প্রশাসন হকার পুনর্বাসনের মতো জটিল নীতি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বুলডোজার নামিয়ে নিজেদের 'তৎপরতা’ প্রমাণ করতে চায়। এই সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের মধ্যেও এক ধরনের বিকৃত আনন্দ বা ‘স্যাডিজম’ তৈরি করে। তারা ভাবে, শহর রাতারাতি ‘পরিষ্কার’ হয়ে গেল। কিন্তু তারা ভুলে যায়, যে হকারটি আজ উচ্ছেদ হল কাল সে পেটের টানে চুরির পথ বেছে নিতে পারে, বা তার সন্তান শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অপরাধের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। 

বুলডোজার ফুটপাথ পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য বা ক্ষোভকে উপড়ে ফেলতে পারে না; বরং তা সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়।

সমাধানের চার দফা পথ

আমরা কি তবে ফুটপাথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখার পক্ষে সওয়াল করছি? একেবারেই নয়। বিশৃঙ্খলা কোনও সুস্থ শহরের লক্ষণ হতে পারে না। কিন্তু সমাধানের পথ ‘উচ্ছেদ’ নয়, সমাধানের পথ ‘নিয়ন্ত্রণ ও সহাবস্থান’। একটি আধুনিক, সংবেদনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুর প্রশাসন নিম্নলিখিত চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে:

পদক্ষেপ ১) নো-ভেন্ডিং জোন চিহ্নিতকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত মোড় বা হাসপাতালের সামনে ‘হকার মুক্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করা হোক, কিন্তু তার ঠিক পাশেই নির্দিষ্ট গলি বা জায়গায় তাদের বসার অনুমতি দেওয়া হোক।

পদক্ষেপ ২) সময় ও জায়গার বণ্টন। বাস্তবায়নের উপায়: বিদেশের মতো ‘টাইম-শেয়ারিং’ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা ভোরে হকাররা বসবেন, বাকি সময় ফুটপাথ পথচারীদের জন্য সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকবে।

পদক্ষেপ ৩) পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: হকারদের প্লাস্টিকের নোংরা ছাউনির বদলে পুরসভা থেকে নির্দিষ্ট আকারের, পরিবেশবান্ধব ও সুদৃশ্য কিওস্ক (Kiosk) বানিয়ে দেওয়া হোক। এতে শহরের সৌন্দর্যও বজায় থাকবে, হকারদের রুটি ও রুজি বাঁচবে।

পদক্ষেপ ৪) ডিজিটাল নথিভুক্তকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: প্রতিটি হকারকে কিউআর কোড যুক্ত পরিচয়পত্র দেওয়া হোক, যাতে বহিরাগত বা বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায় এবং প্রকৃত হকারদের চিহ্নিত করা সহজ হয়।

মানবিক নগরায়নের ডাক

শহর কোনও জড় বস্তু নয়। ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল আর চওড়া পিচের রাস্তাই শহরের শেষ কথা নয়। শহরের আসল পরিচয় তার মানুষের সহাবস্থানে। হকাররা বহিরাগত শত্রু নন; তারা আমাদেরই সমাজ ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন আমরা মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছি, বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশকে সামান্য দুই ফুট ফুটপাথের জন্য বুলডোজারের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে— এর চেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না।

প্রশাসনকে বুঝতে হবে, বুলডোজার দিয়ে ক্ষমতার প্রদর্শন করা সহজ, কিন্তু দূরদর্শিতা দিয়ে একটি মানবিক শহর গড়ে তোলা কঠিন। আমাদের প্রয়োজন এমন এক ‘স্মার্ট সিটি’ যা কেবল প্রযুক্তিতে উন্নত হবে না, যা হৃদয় ও মননে হবে সংবেদনশীল। হকার উচ্ছেদের এই অন্ধ ও হিংস্র ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ অবিলম্বে বন্ধ হোক। ধ্বংসের রূপক নয়, সৃষ্টি ও সহাবস্থানের জয় হোক আমাদের মহানগরে।


Sunday, 24 May 2026

দেশ জুড়ে কিলবিল আরশোলা

কিছু কি ঘটতে চলেছে!

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ইতিহাসের গলিপথে কে কখন কোন আড়াল থেকে সামনে এসে পড়ে, তা কে জানে! যখন চারপাশে পুঁতিগন্ধময় আবর্জনার স্তূপ জমে ওঠে, সবাক মানুষের কন্ঠস্বরও থাকে অবদমিত, তখন কিলবিল আরশোলার দল হয়তো বেরিয়ে এসে ছেয়ে ফেলে গলি ও রাজপথ। কে জানত, কোটা বিরোধী আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের সে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে সম্বোধন করবেন, গোটা দেশ সেই আবর্জনা ঠেলে এমন ভাবে উঠে দাঁড়াবে যে তা ইতিহাসে 'জুলাই গণ অভ্যুত্থান' পরিচয়ে এক পালাবদলের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। 'রুটি নেই তো কেক খেলেই পারে'-- এই উক্তিও ছিল রাজবাড়ির ক্ষমতার অলিন্দ থেকে উৎসারিত, যার পরিণতিতে বিশ্ব পেয়েছে সাম্য-স্বাধীনতার এক দুর্লভ প্রেরণা ও ধারণা। ইতিহাসে এমনতর বাঁক অযূত। সেই ধারাবাহিকতাতেই আমাদের দেশে যুবদের আজ 'আরশোলা' সম্বোধন, যা শুধুমাত্র উচ্চপদে থাকা এক ব্যক্তির মুখনিঃসৃত তিরস্কার মাত্র নয়, বরং এক পচাগলা ব্যবস্থায় কাতর মানুষজনের প্রতি উদগত এমন এক অপমানজনক উচ্চারণ যা দেশের আগাপাশতলা ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর তারপরেই যেন বিস্ফোরণ।

কোনও অফিস নেই, ফান্ডিং নেই, কোনও পরিকল্পনাও নেই; 'আরশোলা' তিরস্কার শোনার পর ১৬ মে একটি প্রতিস্পর্ধী ট্যুইট: 'সব আরশোলারা এক হলে কেমন হয়।' লিখলেন ৩০ বছরের যুবক অভিজিৎ দিপকে। তারপরই সুনামি। এখন আমরা সবাই জানি, পর পর কী ঘটেছে। মাত্র ৫-৬ দিনে ২ কোটি ২০ লক্ষ ফলোয়ারে ভরপুর 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট'টিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ২০ ঘন্টা লড়ে আজ (২৪ মে) আবার সেটিকে তাঁরা পুনরুদ্ধার করেছেন। বন্ধ করা হয়েছিল ককরোচ পার্টির ওয়েবসাইটও; অল্প কিছু ঘন্টায় আবারও নতুন করে তাঁরা তা বানিয়ে নিয়েছেন, এবার আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও বিস্তৃত। কাদের নির্দেশে ও কারিকুরিতে এই নিষেধাজ্ঞা, তা সকলেই জানেন। 

এতসব বাধা-বিপত্তি, আক্রমণকে প্রতিরোধ করে এখন কোন পথে, কীভাবে এগোবে আরশোলার দল? কিন্তু যে আচম্বিতে এই কাণ্ডটি গত ৬-৭ দিনে ঘটে গেল, তাকে বলা যায়, সবে তো কলি'র সন্ধ্যে। অতিশয় বকবক করা কতিপয় বিজ্ঞজনেরা কিছুটা ভুরু নাচিয়ে বলছেন বটে, একটা নতুন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন বই আর তো কিছু নয়; কিন্তু মাটিতে আরশোলার তীব্র কটূ গন্ধ যেন অন্য কথা বলছে! সেই মোতাবেক অনলাইন স্যাটায়ার বা মিম (Meme) হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এই প্রবণতাটি এখন বাস্তব মাঠের রাজনীতি ও আইনি জটিলতায় ধীরে ধীরে এক সামাজিক রূপ নিচ্ছে। পাঁচটি মূল দাবি নিয়ে তাঁরা সোচ্চার হয়েছেন:

১) কোনও প্রধান বিচারপতিকে অবসর-পরবর্তী পুরস্কার হিসেবে রাজ্যসভার আসন দেওয়া যাবে না;

২) যদি কোনও বৈধ ভোটারকে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে UAPA'র অধীনে ব্যবস্থা নিতে হবে;

৩) মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ চাই;

৪) আদানি ও আম্বানিদের মালিকানাধীন সমস্ত মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে এবং গোদি মিডিয়ার সঞ্চালকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে;

৫) যে কোনও বিধায়ক বা সাংসদ দল বদল করলে তাকে আগামী ২০ বছর কোনও নির্বাচনে প্রার্থী বা সরকারি পদ দেওয়া যাবে না।

ফলে, এইসব দাবি-দাওয়া সহ ককরোচ পার্টির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা দেখে, প্রথম রাতেই, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(A) ধারায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এদের মূল X অ্যাকাউন্টটিকে ভারতের সীমানায় প্রথমে ব্লক বা স্থগিত করে দেয়। এর জবাবে তারা তৎক্ষণাৎ ‘Cockroach is Back’ নামে নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে লড়াই জারি রাখে। কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দিল্লির তরুণ সমর্থকেরা আরশোলার পোশাক পরে যমুনা নদী পরিষ্কার করার মতো প্রতীকী সমাজসেবামূলক নাগরিক প্রতিবাদও গড়ে তোলে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে ককরোচ পার্টির সমর্থকেরা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছে (যাতে এই বিপুল অনলাইন সমর্থনকে বাস্তব ভোটে রূপান্তর করা যায় কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে)। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ থেকে আরশোলায় এই 'মেটামরফোসিস' যেন আবালবৃদ্ধবণিতার মনের ভেতর কোথাও জমাট বেঁধে ফেলেছে। শাসক তাকে যতই ভ্যানিশ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিক না কেন, তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে কোনও রাজনৈতিক অভিঘাতের লক্ষ্যে। 

স্পষ্ট ভাষায় অভিজিৎ জানিয়েছেন, কোনও গোদি মিডিয়াকে তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন না। হন্যে হয়ে ঘুরেও কোনও গোদি মিডিয়া তাঁর টিকি'র নাগালটুকুও পায়নি (ব্যতিক্রম 'ইন্ডিয়া টুডে')। এই মুহূর্তে তাদের প্রধান দাবি: NEET পরীক্ষায় দুর্নীতির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। এই দাবিতে চলছে অনলাইন পিটিশনে সই সংগ্রহের কার্যসূচি। অবশ্য, তাদের ওয়েবসাইটটি হ্যাক হয়ে যাওয়ায়, ৬ লক্ষেরও বেশি স্বাক্ষর সংগৃহীত সে পিটিশনের বর্তমান কী হাল তা এখনও জানা যায়নি। বলাই বাহুল্য, ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) এই ঝড়ের মতো উত্থান ভারতীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে:

১) কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক গালিগালাজকে কীভাবে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপান্তরিত করা যায়, CJP তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আগে ইউরোপ-আমেরিকায় ‘স্যাটায়ার পার্টি’ দেখা গেলেও ভারতে এটিই প্রথম, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা কোনও গম্ভীর ইশতেহার নয়, বরং মিম কালচার;

২) তরুণ প্রজন্মের এই দ্রুত ও বিপুল সাড়া প্রমাণ করে যে তারা দেশের বর্তমান সরকার ও প্রথাগত বিরোধী দল উভয়েরই গৎ বাঁধা রাজনীতি ও প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হারিয়েছে। NEET কেলেঙ্কারি ও কর্মসংস্থানের অভাব সহ বহু অন্যায়-অত্যাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুবসমাজের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তা অতি স্পষ্ট;

৩) ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আজকের রাজনীতিতে যে কোনও ওলটপালট হয়ে যেতে বিশেষ সময় লাগে না। জনতা যেন প্রস্তুত হয়েই থাকে, শুধু শুরু করার মুহুর্তটিকে যথাযথ ভাবে বেছে নিতে হয়;

৪) রাজনীতির চলন শুধুমাত্র আর সাবেক রাজনৈতিক দল বা বিশেষ নেতার ওপর নির্ভর করছে না। যে কোনও মুহূর্তে একটি প্রতিষ্ঠিত বা ক্ষমতাসীন দল সমাজ পরিসর থেকে যেমন মিলিয়ে যেতে পারে, তদুপরি, কোনও অচেনা ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কিংবা নতুন গোষ্ঠী ও দল চকিতে নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে। 

ককরোচ জনতা পার্টি কোনও নিবন্ধিত দল নয়, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এটি প্রথাগত নির্বাচনী দল হয়ে উঠবেও না। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিজেই জানিয়েছেন, তাদের আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল নয়, বরং সিস্টেমের ঘুম ভাঙানো। তবে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নীতি-নির্ধারকদের জন্য এই ‘আরশোলা বাহিনী’ আপাতত একটি কড়া বার্তা দিয়েছে— ভারতের বৃহত্তম জনসংখ্যা বা যুবসমাজকে অবহেলা বা উপহাস করলে, তারা ডিজিটাল স্পেসকে বদলে দিয়ে যে কোনও সময় ক্ষমতার সমীকরণকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এখন পর্যন্ত তারা ডিজিটাল পরিসরকে ওলটপালট করেছে বটে, কিন্তু দেখার, এই আন্দোলন বাস্তবিক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং কতটা ক্ষমতা ধরে। তবে ইতিমধ্যেই অভিজিতের কাছে হুমকি ফোন আসতে শুরু করেছে, তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর মা-বাবা'কেও বিপদে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।  

এক ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা অত সহজে দমবার পাত্র নন। দেখাই যাচ্ছে, একটা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে হাজারটা অ্যাকাউন্ট খুলে যাচ্ছে। কিলবিল করে আরশোলারা সব রাস্তায় নেমে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা প্রচারও শুরু হয়েছে, যেমন, এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অভিযোগ এনেছেন যে, ককরোচ পার্টির ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ারদের অধিকাংশই নাকি পাকিস্তান ও আমেরিকার। অথচ, ইন্সটাগ্রাম অ্যানালিটিক্স থেকে অভিজিৎ দেখিয়েছেন, তাঁদের ফলোয়ারদের ৯৪.৭ শতাংশই হল ভারতের।

এই লেখাটি প্রকাশের মুহূর্তে ককরোচ পার্টির ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৩ মিলিয়ন (২ কোটি ৩০ লক্ষ)। হয়তো, লেখাটি যখন পড়বেন তখন তা ৩ কোটিতে পৌঁছে যাবে। 

Wednesday, 20 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি (২)

কল্যাণমুখী ব্যয়ও অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়

অচিন চক্রবর্তী



(পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক চলেছে। কিন্তু সে প্রতর্ককে কখনই এক সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়নি। কোথায় এ রাজ্য এগিয়েছে, কোথায় পিছিয়েছে, দেশেরই বা অবস্থা কেমন, তুলনামূলক বিচারই বা কীভাবে হবে - এই সামগ্রিক পট থেকেই এ লেখার অবতারণা। এই লেখার প্রথম অংশে ছিল রাজ্যের কৃষি, শিল্প সহ মাথাপিছু মাপকাঠির গল্প। দ্বিতীয় অংশে রইল বহু চর্চিত শিক্ষা, দুর্নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের হিসেব-নিকেশ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এই লেখাটি হয়তো পরবর্তী দিনগুলির বিচারের ক্ষেত্রে একটি তুলাদণ্ড হিসেবে থেকে যাবে। সম্পাদক

 দ্বিতীয় অংশ 


দুর্নীতির রকমফের

যে সমস্যাটি এ রাজ্যের জনপরিসর অনেকটাই দখল করে রেখেছে বেশ কিছুকাল তা হল দুর্নীতি। সামাজিক মাধ্যমে এ ওকে তুলোধোনা করেছে দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে না বলে। দুর্নীতি নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের সরব হওয়া না হওয়ার অপেক্ষায় অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। অ-ভাজপা রাজ্যগুলিতে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় রাজ্যের ক্ষমতাশীল দলকে বিপাকে ফেলতে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে বদলি, সর্বত্র যেরকম আর্থিক লেনদেনের কথা জানা গেছে তা নিয়ে মানুষ যে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ তা বলা যায়। দুর্নীতি যেহেতু অগণিত কাজের মধ্যে দিয়ে হয়, এবং দুর্নীতি কেউ চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে করে না, ফলে দুর্নীতির তথ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু দেশে দেশে দুর্নীতির আন্দাজ দিতে ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো সংস্থা কিছু বিশেষ ধরনের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। এই পরিসংখ্যান আদতে দুর্নীতির ব্যাপ্তি নিয়ে মানুষজনের কী উপলব্ধি তাকে ধরার চেষ্টা করে। মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে যদি বাস্তবের সম্পর্ক নাও থাকে তাহলেও এই তথ্যের গুরুত্ব আছে অর্থনীতিতে, কারণ মানুষ ধারণার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার যদি ধারণা হয়ে থাকে কোনও দেশে দুর্নীতি খুব বেশি, যদিও বাস্তবে তা নয়, আমি সেখানে বিনিয়োগ করব না হয়তো। বোঝাই যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতাও হয় বিভিন্ন। ব্যবসায়ীর কাছে এক রকম, সরকারি আধিকারিকের কাছে এক রকম, সাধারণ একজন পরিষেবা গ্রাহকের কাছে আর এক রকম। মানুষ যে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধাভোগী সেগুলি সম্পর্কে, কিংবা যে সব সরকারি আধিকারিকদের তাঁরা ভাল ব্যবহার করতে দেখেছেন সামনে থেকে তাঁদের সম্পর্কে, ভাল ধারণা পোষণ করে থাকেন। দুর্নীতি থাকলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। 

তাহলে প্রশ্ন, পূর্ববর্তী শাসক দলের বিরুদ্ধে এই যে এত দুর্নীতির প্রমাণ তুলে আনল তদন্তকারী সংস্থাগুলি, অধিকাংশ মানুষ যদি ক্ষুব্ধ হন তা নিয়ে, তার প্রভাব পড়েছে হয়তো নির্বাচনের ফলে। অর্থনীতিতে দুর্নীতির দীর্ঘকালীন প্রভাব কেমন হতে পারে? তা যতটা নির্ভর করে দুর্নীতির প্রকৃতির উপর, দুর্নীতির বহরের উপর ততটা নয়। ধরা যাক যে বস্তুটি আইনত প্রাপ্য নয় সেটি কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী এমএলএ, ছোট বড় সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিকের থেকে অর্থের বিনিময়ে পেলেন। যেমন অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকের চাকরি, যে ‘শিক্ষক’ চাকরির যোগ্য নন। আর এক ধরনের দুর্নীতি হতে পারে, যেখানে আইনত প্রাপ্য বস্তুটি পেতেই আমাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যেমন আমি কলেজ সার্ভিস কমিশন দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি আমার মেধার নিরিখে। এবার আমি যখন কলেজে যোগ দিলাম, আমার বেতনক্রম স্থির করতে যে ফাইল যাবে বিকাশ ভবনে, তা যাবে না যদি না আমি কিছু অর্থ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে দিই। এ কাজটি করার কথা যদিও কলেজেরই। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে এমন অজস্র ‘পেয়ে থাকি’র সম্মুখীন হয়তো আমাদের সবাইকেই হতে হয়েছে – পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে জমির মিউটেশন। এতে আমরা আর অবাক হই না। কিন্তু এখানে ইচ্ছে করেই এমন একটি দৃষ্টান্ত দিলাম যা এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের, এবং যা সত্যি বলে জানি। 

ঘুষ নেওয়া এবং দেওয়া এ দুটি কর্মই এ দেশে অপরাধ বলে গণ্য হয়। অথচ উপরে দৃষ্টান্ত সহ যে দুই ধরনের ঘুষের কথা বললাম, আইনের চোখে তারা সমান। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, দ্বিতীয় ধরনের দুর্নীতি আইনের একটু এদিক ওদিক করেই অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। যিনি ঘুষ দিয়েছেন তাঁকে অপরাধী না করে যিনি নিয়েছেন তাঁকে যদি শনাক্ত করায় উৎসাহিত করা যায় তাহলে দুর্নীতি কমতে পারে। কিন্তু প্রথম ধরনের দুর্নীতি, যা থেকে দু' পক্ষই লাভ করছে, যা আইনত তাদের প্রাপ্য নয়, এ ধরনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বেজায় কঠিন, কারণ কোনও পক্ষেরই একে প্রকাশ্যে আনার কোনও ইনসেন্টিভ নেই।    

অর্থের বিনিময়ে চাকরি এবং তার সঙ্গে জড়িত সমস্যাগুলি শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্ভবত সব থেকে বেশি প্রভাবিত করেছে। অপরাধের তদন্ত থেকে কোর্টকাছারির ব্যাপার স্যাপার সমাজমাধ্যমে যেভাবে জায়গা করে নেয়, বহু ছেলেমেয়ে যে শিক্ষা বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে সেই গভীর সমস্যাটির দিকে আলোকপাত হয় না। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় শিক্ষার রূঢ় সত্যটি হল, কোভিডের ধাক্কার আগেও এ রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছতে পারে নি, অন্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। তার সঙ্গে যদি অতিমারির ক্ষতিকে একত্রে দেখি তাহলে সংকটের গভীরতার প্রকৃত ছবিটি পাওয়া যাবে। কোভিডের আগেও প্রতি বছর ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ যে শিক্ষার অঙ্গন থেকে অকালে বিদায় নিচ্ছিল – এই জরুরি কথাটি অনুধাবন প্রয়োজন।  

শিক্ষার কেন্দ্রীয় ভূমিকা 

পশ্চিমবঙ্গবাসীদের মধ্যে উচ্চ-প্রাথমিক থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করছে কতজন, তার পরিসংখ্যান থেকে কিছু প্রবণতা লক্ষ করা যায় যা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল এবং আছে। কিন্তু তা আলোচনায় আসে নি তেমন। আমাদের দুর্ভাগ্য, শিক্ষক নিয়োগ বা তাঁদের বদলি-সংক্রান্ত খবর সংবাদ-পরিসরকে যতটা সরগরম রাখে, শিক্ষা ও শিক্ষণ ততটা নয়, শিক্ষার সর্বজনীনতা তো নয়ই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সর্বজনীনতার দিকে অগ্রগতি যেভাবেই মাপা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে এর শম্বুকগতি নজর এড়াবে না। এখানে বলে রাখা উচিত, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি প্রায় সম্পূর্ণতা ছুঁয়ে ফেলেছে বেশ কিছুকাল আগেই, অন্য সব রাজ্যের মতোই। এ রাজ্যের যে কোনও অঞ্চলের যে কোনও প্রাথমিক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি বা ভর্তি হলেও পঞ্চম শ্রেণির আগে ছেড়ে দিয়েছে এমন শিশু এখন এ রাজ্যে প্রায় নেই বললেই চলে, আর তার সমর্থন পাওয়া যায় অ্যানুয়াল সার্ভে অব এডুকেশন রিপোর্ট (সংক্ষেপে ‘এসার’) থেকেও, যা নিয়ে খবর হয়। আর এখান থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়-শিক্ষা নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত সন্তুষ্টিরও জন্ম দেয়। চাপা পড়ে যায় অন্য সত্যটি, যা হল এ রাজ্যে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের সংখ্যা কমেছে অতি ধীরে, অধিকাংশ রাজ্য বা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায়।    

জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (সংক্ষেপে, এনএসএস) পরিসংখ্যানকে যথেষ্ট নির্ভরশীল সূত্র বলেই ওয়াকিবহাল মহল জানে। ২০১৭-১৮ সালে করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ৩৩.৫ শতাংশের মাধ্যমিক বা উচ্চতর ডিগ্রি আছে; যা শুধু সর্বভারতীয় গড়ের থেকে কম তাই নয়, যে কোনও রাজ্যের থেকে নীচে। যে কোনও রাজ্যের থেকে? বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের থেকেও? হ্যাঁ, তাই। তবে এর মধ্যেই কিঞ্চিৎ আলোর রেখা আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে খানকয়েক রাজ্য পাচ্ছি যারা এ বাবদে পশ্চিমবঙ্গের নীচে। অর্থাৎ, শিক্ষিতের হারে মহিলা ও পুরুষের বৈষম্য এ রাজ্যে অন্য বেশ কিছু রাজ্যের তুলনায় কম। একে নারী শিক্ষার অতিমাত্রিক অগ্রগতি হিসেবে দেখব না পুরুষদের শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে পড়া বলব?

পনেরো-ঊর্ধ্ব সবাইকে হিসেবে ধরলে ষাট-সত্তর-আশি বছর বয়স্কও সবাই থাকছেন তার মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, সে তো দূর অতীতের কথা, বহুকাল আগেই তাঁরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার বয়স ফেলে এসেছেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা কেমন করছে সেটা বলুন। ধরা যাক উচ্চমাধ্যমিকের কথা। একাদশ বা দ্বাদশে যত ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত আছে সেই সংখ্যাকে রাজ্যে ১৬-১৭ বয়সীদের মোট সংখ্যার শতাংশ হিসেবে দেখলে যা পাব তাকে বলে ‘গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও’, সংক্ষেপে জিইআর। পূর্বে উল্লেখিত এনএসএস-এর তথ্য থেকেই পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকে জিইআর ৫৪.৪ শতাংশ। আর গোটা দেশে? ৭০.৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যামিক-পরবর্তী স্তরেও মোটামুটি একই চিত্র – সর্বভারতীয় জিইআর পশ্চিমবঙ্গের জিইআর-এর তুলনায় অনেকটাই বেশি। এনএসএস সমীক্ষা নিয়ে সন্দেহ থাকলে অন্য সূত্রও দেখে নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ২০১৯-২০-র অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন  দেখাচ্ছে, সমগ্র ভারতে উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের জিইআর যেখানে ২৬.৯ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে তা ২০.৩ শতাংশ, নীচের দিক থেকে চার নম্বরে। 

শিক্ষা-সক্ষমতার পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা কোথাও কোথাও এগিয়ে থাকলেও (এসার-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যা নিয়ে খবরও হয়েছে) তার প্রকৃত কারণ সম্ভবত অন্য, সংখ্যাতত্ত্বের অতি সরল অঙ্ক। অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী, বিশেষত আর্থ-সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়েরা শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মাঝপথে। তাই বাকিদের শিক্ষা-সক্ষমতার গড় কিছুটা বেশি হওয়ার কথা, যেহেতু যারা বাইরে রইল তাদের সক্ষমতা সামগ্রিক গড়ের থেকে কম হবেই। অর্থাৎ, শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি যত সম্পূর্ণতার দিকে যাবে সামগ্রিক সক্ষমতার গড় মান প্রথমদিকে খানিকটা কমতেই পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ রেখে গড় মানের উচ্চতা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা নির্বুদ্ধিতা।  

মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেই ছেলেরা সরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষভাবে এ এক গভীর সামাজিক সমস্যা। শিক্ষার স্বল্পতার কারণে কাজের বাজারের শ্রেণি বিন্যাসে তাদের জায়গা হচ্ছে নীচের দিকে। যদি ধরে নিই, দারিদ্রের জন্যে শিক্ষা বেশি দূর এগোচ্ছে না (যা পুরোপুরি সত্যি নয়), আবার শিক্ষা অসম্পূর্ণ বলে কাজের বাজারে সুবিধা হচ্ছে না, যার ফলে দারিদ্রমুক্তিও হচ্ছে না – এরকম একটা দুষ্টচক্রের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে কোনও সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে গেলে প্রথম কর্তব্যটি হল, সমস্যাটি যে আছে তা যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করা। লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে অভ্যস্ত ভাবনায় মেয়েদের শিক্ষার কথাই অগ্রাধিকার পায়, কারণ শিক্ষা যে সক্ষমতা দেয় তা জীবনের অন্য মাত্রাগুলিকেও টেনে তোলে নারী-পুরুষের মধ্যে সুযোগের সমতা অভিমুখে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই সাইকেল বিতরণ থেকে কন্যাশ্রী প্রকল্পের লক্ষ্য হয় মেয়েরা। সেখানে ভুল নেই। কিন্তু ছেলেরা অধিক সংখ্যায় বিদ্যালয়-ছুট হওয়ার ফলে মেয়েদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে, এও কাম্য হতে পারে না। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণগুলি মেয়েদের আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেকটাই আলাদা।

কারণের কথায় অনেকেই বলেন, শিক্ষার সুফল যদি কেউ ভবিষ্যৎ যাপনে দেখতে না পায় তাহলে পড়বে কেন? ‘লাভ’ কী? কথাটি বিভ্রান্তিকর। পড়ে একেবারেই লাভ নেই, এ কথা কোনও মা-বাবাই মনে করেন না। যে কোনও ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকেই তা স্পষ্ট। তাহলে? লাভের হিসেবটিকে যদি ‘নীট লাভ’ ধরে দেখি – অর্থাৎ, শুধু সম্ভাব্য প্রাপ্তির দিকে না দেখে ব্যয়কেও হিসেবে ধরি তাহলে সমস্যাটির গোড়ায় পৌঁছনো যায়। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যিটা হল, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষা-অর্জন এমন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে তা অনেক পরিবারের হিসেবে শিক্ষার সম্ভাব্য প্রাপ্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তার কারণ প্রাইভেট টিউশন। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচ যে শূন্য শুধু তাই নয়, মিড-ডে মিল থেকে সাইকেল এমন বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্তির দিকটিকেও বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শুধু প্রাইভেট টিউশনের ব্যয়ভার যাবতীয় ভর্তুকির প্রভাবকে একেবারেই চাপা দিয়ে দিচ্ছে। প্রাইভেট টিউশন কি অন্য রাজ্যে নেই? আছে, তবে এ রাজ্যের মতো সর্বাত্মক নয়। টিউশন না দিতে পারলে পড়া চালিয়ে যাওয়ার মানে হয় না – এমন ভাবনা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। 

বেপথু কল্যাণকামিতা?

জনকল্যাণ বলতে যা বোঝায় তা যে রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে সে বাবদে বিশেষ মতভেদ নেই বোধহয়। কিন্তু কোন নীতিটি আদতে জনকল্যাণের লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে আর কোনটির পিছনে রয়েছে স্রেফ রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য তা নিয়েই যত কূটকচাল। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে নীতিতে জনকল্যাণের সম্ভাবনা নেই তা থেকে রাজনৈতিক লাভই বা হবে কীভাবে? নির্বাচকরা কী দেখে ভোট দেবেন? তাছাড়া সরকার যাঁরা চালান তাঁরা এমন নীতি নিতে যাবেনই বা কেন যা থেকে রাজনৈতিক লাভ নেই? তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ইস্তাহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মেনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করেছিল। ব্যাপ্তি এবং প্রভাবের দিক থেকে দেখলে প্রকল্পটির গুরুত্ব যদিও কম নয়, এর ভালমন্দ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা তেমন দেখি নি। যা দেখেছি তা এক অতি সরলমনা অবস্থান – রাজকোষ উজাড় করে দানখয়রাতি করে সরকার দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে; অথবা প্রকৃত উন্নয়নের দিকে না গিয়ে রাজ্যবাসীকে ভিক্ষাজীবীতে পরিণত করছে। 

একদিকে বড় শিল্প, বড় বিনিয়োগ, আর্থনীতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আর অন্যদিকে ব্যয়বহুল সরাসরি কল্যাণমূলক প্রকল্প – এই দুইয়ের মধ্যে পাল্লাটা কোনদিকে ঝুঁকবে তা নিয়ে বিতর্ক উন্নয়ন চর্চায় নতুন নয়। এর সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসাও সম্ভব নয়। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি যে মূলত দ্বন্দ্বমূলক নয় তা চর্চার জগতে মোটামুটি স্বীকৃত। বস্তুত, উন্নয়নশীল দেশে এই কল্যাণমূলক ব্যয়ের পথ ধরে যে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব তাও স্বীকৃত। তাই শেষমেশ প্রশ্নটা দাঁড়ায়, কোন ধরনের কল্যাণমূলক প্রকল্প অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে কতটা পোক্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, মহিলাদের হাতে খরচ করার ক্ষমতা থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি বাড়ে, যা মানবোন্নয়নের মধ্যে দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে। হাতের কাছেই উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের মধ্যে অর্থকরী কাজে যোগদানের হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। তাই সরাসরি নগদ হস্তান্তরে যে এ রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মহিলার হাতে অল্প হলেও কিছু টাকা আসছে তার সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কোন দল এর থেকে কী ফায়দা ওঠালো সে প্রশ্ন তাই অবান্তর হয়ে যায়।     

তবু প্রশ্ন থেকে যায়। নগদ হস্তান্তর না মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবা প্রদান? যেমন স্বাস্থ্য বা শিক্ষা। কোন কোলে বাজেটের ঝোলটুকু বেশি টানা উচিত? প্রযুক্তির সুবিধার কারণে এখন প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি মানুষের কাছে নগদ পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পকে বলা যায় ‘নাগালে ঝুলন্ত ফল’। তাই রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকারও নাম বদলে (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার) টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে একে চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানুষের কাছে শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার শর্টকাট নেই। বরাদ্দ অর্থকে পরিষেবায় রূপান্তর ও তা গ্রহীতার কাছে পৌঁছনোর পথটি দীর্ঘ ও জটিল, কারণ এই প্রক্রিয়াটিতে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে ব্যবস্থাপনা আর বিপুল সংখ্যক মানুষ যাঁরা পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত। তাই আশঙ্কা হয়, নাগালে ঝুলন্ত ফলের আকর্ষণে অন্য পরিষেবার ব্যবস্থাপনার দিকটি আড়ালে না চলে যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কারক ভূমিকাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যা একজন মহিলাকে করণ-সক্ষমতা (এজেন্সি ফ্রিডম) দিতে পারে। এরকম প্রকল্পের সঙ্গে দাতা-গ্রহীতার অনুষঙ্গটি লেপটে থাকলেও করণ-সক্ষমতা যে ঘটেছে তার প্রমাণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের অনেকেই ভোটটি দিয়েছেন নিজের পছন্দমতো। প্রকল্পের কারক ভূমিকাটি পূর্ণ বিকশিত হতে পারত যদি এর পরিপূরক মানব উন্নয়নমূলক পরিষেবাগুলিরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটত। 

উৎপাদন পরিকাঠামো না সরাসরি কল্যাণমুখী ব্যয় – কেরলে গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের দশকে এ নিয়ে তীব্র তর্ক চলেছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রভূত উন্নতির কারণে কেরল তার আগেই বিশ্বের নজর কেড়ে ফেলেছে। তখন চিন্তা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন তেমন বাড়ছে না, অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়েই চলেছে। এই উন্নয়নের ‘মডেল’ কি সাসটেনেবল? অনেক উদ্বেগের দিন পেরিয়ে এই শতকের গোড়ায় এসে দেখা গেল, সে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার মন্দ নয়। একে বলা যায় মানবোন্নয়নের ‘উৎকর্ষ চক্র’। দারিদ্রের দুষ্টচক্রের বিপরীত। অর্থাৎ, মানব উন্নয়নে অতীতের মনোযোগের ফলে ভবিষ্যতে আর্থনীতিক বৃদ্ধি সম্ভব হল, যা থেকে আরও মানব উন্নয়ন সম্ভব, যা থেকে আবার বৃদ্ধি। অনেকেই মানলেন, আবার অনেকে বললেন বড় শিল্প না হলে সংকট কাটবে না অত সহজে। কিন্তু এই বিতর্ক থেকে যা উঠে এল তা হল, কল্যাণমুখী ব্যয়ও এক চক্কর ঘুরে অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটায়, আর সেখানে বড় শিল্প থাকতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সেই ব্যয় হতেই হবে সেই সব ক্ষেত্রে যা সরাসরি মানবোন্নয়ন ঘটাতে পারে। 

পশ্চিমবঙ্গকে এই উৎকর্ষ চক্রে সামিল করতে গেলে শিক্ষার প্রতি নিদারুণ অবহেলা থেকে সরে আসতেই হবে। 

শেষ...
প্রথম অংশের লিঙ্ক: