Thursday, 19 March 2026

খোদ বাংলায় বিপন্ন বাঙালি?

হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের আক্রমণে আক্রান্ত বাঙালি

সীমা ঘোষ



প্রায় সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় অসমের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় একটি কলেজে অধ্যাপনা সূত্রে জীবন কাটিয়ে কলকাতায় ফিরেছি মাত্র কিছুদিন হল। এর মধ্যে বহু আসা যাওয়া থাকলেও মাত্র কয়েকদিনের ব্যস্ততায় কলকাতা ক্রমশ দূর থেকে দূরতর দ্বীপ হয়ে থেকেছে, বিশেষত মোবাইল ইন্টারনেটের এই রমরমার আগে পর্যন্ত তো বটেই! কলকাতায় আমার পড়াশোনার পুরনো জায়গার একটা অবশ্যই ন্যাশনাল লাইব্রেরি! নতুন বিল্ডিং'এ লাইব্রেরি চলে যাবার পর বাইরে থেকে দেখে এসেছি, কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি। 

কলকাতার ছন্দে ফিরতে আবার ওখান থেকেই তাই শুরু করি। রিডিং রুমের পুরনো হলুদ হয়ে যাওয়া কার্ডটা খুঁজেপেতে নিয়ে গিয়ে বুঝলাম, ওটা তামাদি হয়ে গেছে, নতুন করে করতে হবে। ভবানী ভবনের দিকের, মানে ঐ আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের দিকের গেট (সম্ভবত ২ নম্বর) দিয়ে ঢুকছি, হিন্দিভাষী সিকিউরিটি পাকড়াও করল, 'কাঁহা জায়েঙ্গে, কিঁউ জায়েঙ্গ?' সামনে একটা জাবদা খাতা খুলে এগিয়ে দিয়ে আমার উদ্দেশ্য বিধেয় সব নথিভুক্ত করা হল। এরপর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নামে যে নতুন বিল্ডিং, ওখানে গিয়ে কার্ড রিনিউ সংক্রান্ত কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে জিজ্ঞাসা করতে তিনিও হিন্দিতে শুরু করলেন। প্রথমটা হোঁচট খেলেও, মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে আমিও আমার বাংলায় প্রয়োজনীয় কথা সারলাম। 

আধার কার্ড আর পাসপোর্ট সাইজ ফটো, সব চাই। অসমে থাকার অভ্যেসে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এনআরসি'র কাগজ সব সঙ্গে থাকে, কিন্তু ফটো মোবাইলে। তো সেদিন বিশেষ কিছু হবে না বুঝে চা খেতে গেলাম। পুরনো সেই ক্যান্টিন এখন নেই, সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে দেয়াল ঘেঁষে একটি গুমটি মার্কা দোকান, যেভাবে ফুটপাথে দোকান তৈরি হয়, সেখানে দেখলাম বেশ কিছু যুবক-যুবতী পিঠে ব্যাগ নিয়ে, না নিয়ে হা হা হো হো করছ। ভাবছি, এত যৌবন জলতরঙ্গ এই মোবাইলের যুগে লাইব্রেরিতে কী করছে? কলতানে কান পেতে বুঝলাম, এদের সিংহভাগ অবাঙালি, আর কোলাহলের ভাষা হিন্দি। তবে, নিজের কৌতূহলকে নিশ্চিন্ত করতে গিয়ে আরও বুঝলাম যে, এদের মধ্যে দু-একজন বাঙালিও আছে, তবে তারাও ঐ পরিবেশে আর বাংলায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না সম্ভবত। 

যাই হোক, পরে একদিন গেলাম নতুন কার্ড করে। একটু ফুরফুরে ভাব নিয়ে রিডিং রুমের দিকে যাচ্ছি, মনে হাজার স্মৃতির আনাগোনা চলছে। ব্যাগপত্র জমা রেখে ঢুকতে যাব, বাঁদিক থেকে এক সিকিউরিটি বললেন, ‘ম্যাডাম ইধার আইয়ে!' চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে গেলাম, ‘খাতে মেঁ এন্ট্রি করিয়ে।’ মানে, আবার নামধাম কার্ডের নাম্বার সব লিখুন। এবার রিডিং রুমে ঢুকতে যাব, আরও এক সিকিউরিটি। ঐ মাত্র দেড়-দু' মিটার দূরে রিডিং রুমের দরজার সামনে বসা, বললেন, 'ম্যাডাম আপকা কার্ড দিখাইয়ে।' দেখালাম, 'অব ঠিক হ্যায়, যাইয়ে।' 

এরপর আরও এক প্রস্থ চেকিং। রিডিং রুমে ঢুকতেই আরেক মহিলা সিকিউরিটি। ঐ এক ভাষা ও এক ভঙ্গিতে সব যাচাই করলেন। ভাবছি, আমি কোনও পাঠক না জেলের কয়েদি, যাকে জেলে ঢোকানোর আগে রীতিমতো খানা তল্লাশি চালাচ্ছে আমাদের গর্বের কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার! আঠারো বছর বয়স থেকে এই লাইব্রেরিতে যাতায়াত করছি। মনে হচ্ছিল না আমি আমার অতি চেনা  শহরের এক পাঠক, নিছক বই পড়ার জন্য জাতীয় গ্রন্থাগারে ঢুকছি। আরও হতাশ হলাম একটা মনের মতো আসন খুঁজে বসতে গিয়ে (সকাল দশটাতেও)। ডিজিটাইজড রিডিং রুমের সমস্ত চেয়ার টেবিল এখন ল্যাপটপ-বান্ধব। সেখানে একটি সিটও প্রায় খালি নেই বললেই চলে। এরা কারা? লোকজন তো বলাবলি করে, এখনকার ছেলেমেয়েরা নাকি পড়াশোনা করে না? এরা সবাই তরুণের দল দেখছি! কৌতূহলী চোখে একটি সিট খোঁজার অছিলায় অনুসন্ধান শুরু করলাম। আড়চোখে দেখে যাই এদের টেবিল। এরা সবাই সেই  গবেষক পাঠক নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে এরা ফ্রি ওয়াইফাই, ফ্রি বিদ্যুতের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মনে হল চাকরির পরীক্ষার পড়াশোনা করছে। আর করবে নাই বা কেন? জাতীয় গ্রন্থাগার এদের জন্য কেরিয়ার কর্নার তৈরি করেছে, খোলা শেলফে এনসাইক্লোপিডিয়া'র বদলে সাজিয়ে রেখেছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার হাজারও বইপত্র। সেখানে ইউজিসি, নেট, ক্যাট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, গেট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, নিট, জেইই, টেট, বেড, ডব্লিউবিসিএস, জেনারেল নলেজ, এসএসসি সংক্রান্ত বহুবিধ বই। মনে হল, জাতীয় গ্রন্থাগার আর গবেষণাগার নয়, উচ্চমানের সর্বসুবিধাযুক্ত একটি আধুনিক কোচিং সেন্টার। অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান পদের দু-একজনের সঙ্গে বাংলা বই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, এরা কোনও বাংলা বই ও বাঙালি লেখকের নামই জানে না। এদের মুখের ভাষা বাংলা বা ইংরেজি নয়, হিন্দি, কারণ সবাই আদতে বিহারের। এদের  অনেকেই গত তিন-চার বছর আগে চাকরিতে বহাল হয়েছেন। দু' এক জনের নাম জানলাম সঞ্জীব কুমার, মণীশ কুমার প্রভৃতি, যাদের ঘর বিহার, থাকে সাঁত্রাগাছি, হাওড়া। আমরা বিহারে চাকরি করতে গেলে আমার ভাষায় কাজ করতে পারব?

বইয়ের ক্যাটালগ লিখে জমা দিলাম। উদাস চিত্তে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছি। যেতে গিয়ে ঘাড় উঁচু করে এই বিখ্যাত গ্রন্থাগারের চারপাশে ঘিরে উঠে যাওয়া সুউচ্চ বহুতলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকাই, সেখানে প্রতিটি তলের বারান্দার নীচের অংশে শ্লোগানের মতো সাঁটা আছে হিন্দিতে লেখা বিখ্যাত মনীষীদের উদ্ধৃতি আর তার মধ্যে বেশিটাই হিন্দির সপক্ষে তাঁদের বিভিন্ন সময়ে করা উক্তি। খুব ইচ্ছে করছিল, আমার উদার বাঙালি বন্ধুদের জন্য এক টুকরো ছবি তুলি। কিন্তু পারব না, ছবি তোলায় কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে।

আমার দিল্লি প্রবাসী কন্যাও প্রথমবার অনেক উৎসাহ নিয়ে জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে দারুণ রকম হোঁচট খায়। ল্যাপটপ নিয়ে রিডিং রুমে ঢুকতে গিয়ে প্রায় জেলখানার কয়েদির মতো চেকিং'এ ও এতটাই  হতাশ হয়ে পড়ে যে দ্বিতীয়বার যাবার ইচ্ছে ঐ দিনই ত্যাগ করে। তবে হিন্দিতে লেখা পোস্টার নিয়ে ও ট্যুইটারে লিখেছিল, যার প্রতিক্রিয়া একদিনে প্রায় আটশো ছাড়িয়ে যায়। বুঝলাম, আমাদের মতো ভুক্তভোগী ক্ষুব্ধ পাঠক কম নেই! আশ্চর্য হলাম, এই ঘটনার দু' দিন পরে গিয়ে দেখি, সেই সব পোস্টার উধাও। জানি না এর সঙ্গে ঐ ট্যুইটার পোস্টের কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা।

শাসক একভাবে তার লক্ষ্য পূর্ণ করে না, কৌশল বদলায়। কোনও রাজ্যকে এখন আর কাটাকাটির দরকার নেই। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সার্কুলার জারিরও প্রয়োজন নেই। তাই, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে সে তার কৌশল বদলাতে শুরু করেছে। বিশ্বভারতীর কথাই ধরুন। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা এখন হিন্দিতে কথা বলে (বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে)! কেন বাঙালিরা হিন্দি বলে? কারণ, ভর্তির সময় প্রথম যার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হয় তিনি তো হিন্দিভাষী! গত তিন-চার বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানে যত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে তাঁদের বেশিরভাগ ইউপি-বিহারের মানুষ। আমার ছেলেকে 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে' গাইতে হয় সংস্কৃতে, বাংলায় নয়। বাংলায় লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এভাবে খোদ কবির প্রতিষ্ঠানেই ব্রাত্য করে তোলা শুরু হয়েছে! বাঙালি অধ্যাপক অনলাইন ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দিতে। কারণ, ক্লাসের একটি ছাত্র হিন্দিভাষী। হিন্দিভাষী কোনও রাজ্যে একটি বাঙালি ছাত্রের জন্য এই বদান্যতা আমরা কল্পনা করতে পারি? অধ্যাপক থেকে কর্মচারী সব ক্ষেত্রে নিযুক্তিতে ধীরে ধীরে হিন্দিভাষীর অগ্রাধিকার যে হচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগে চোখ কান খোলা রাখলেই টের পাওয়া যায়। 

হাওড়া স্টেশনে এখন আর বাংলা বলা যায় না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিটিই, আরপিএফ, চা-বিস্কুটের স্টল, রেস্টুরেন্ট, ফুডকোর্ট কোথাও বাংলা ভাষাভাষী নেই। হাওড়াতে পা রেখে বাঙালি অনুভব করে সে যেন ভিন রাজ্যে ঢুকল। আমরা ভুলে গিয়েছি, মানভূমের বাংলা ভাষা আন্দোলনে হাজার হাজার সত্যাগ্রহী পুরুলিয়া থেকে এই হাওড়া ব্রিজ অতিক্রম করে কলকাতায় পৌঁছেছিল। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের গড়ে তোলা আইএসআই'এর আইন পরিবর্তন করে কব্জা করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। এ নিয়ে বিক্ষোভ প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা জেনেছি। 'উদার বাঙালি' কি চেয়ে চেয়ে দেখবে? 

এ লেখা শেষ করব ভাষা ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতে দীর্ণ অসমের কথা বলে। তিনটি জেলা নিয়ে বরাকের মানুষ বাংলায় কথা বলে। তাই অসম প্রদেশে এসেও আমি কথ্য অসমিয়া শিখতে পারিনি। কিন্তু এখন? কান পাতলেই অসমিয়া শোনা যাচ্ছে। এসপি অফিস, মিউনিসিপ্যালিটি, ব্যাঙ্ক, জেলা শাসকের কার্যালয়ে কর্মচারীরা অসমিয়ায় কথা বলে। এই উপত্যকায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মী পদে স্থানীয়দের ১০০ শতাংশ চাকরি দেবার গ্যারান্টি থাকলেও তা কায়দা করে উপেক্ষা করা হয়েছে, জুটেছে অসমিয়াদের কপালে। বাঙালি বাংলায় লিখবে, বইমেলা করবে, পত্রিকা বের করবে। আর ওদিকে দিল্লির শাসক তার মূল উদ্দেশ্য সফল করতে কৌশলে বাংলা ভাষাটাকেই ঘৃণ্য ও অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে। ওরা বাঙালিকে একটি হাস্যকর অপ্রাসঙ্গিক জাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে দেশের সিংহভাগ সাধারণ অসচেতন মানুষের কাছে। খোদ কলকাতায় বাঙালির ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসকে আক্রমণ করা হচ্ছে। তাদের কাজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হিন্দিভাষী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বাঙালিকে কাজ দেওয়া হবে না ঘোষণা করছে! আর বাঙালিরা প্রাদেশিকতার ছোঁয়াচ লাগার ভয়ে এখনও এসব দেখে চুপ করে বসে আছে!

 

No comments:

Post a Comment