Monday, 5 October 2026

মনোযোগ অর্থনীতির ফাঁদ

আত্মধ্বংসের কারণ

রাজীব ভট্টাচার্য


 

আজকের উচ্চ প্রযুক্তির এই পৃথিবীতে ভোগবাদ এবং দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলার পথে 'মানুষের মনোযোগ'কে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানকারী ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির কাছে এই মনোযোগকে দখল করা, বিশ্লেষণ করা ও মুনাফার মাধ্যমে ব্যবসা করাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় বেরলে বা বাসে ট্রামে চড়লেই বোধকরি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন যার হাতে বা পকেটে মোবাইল নামক যন্ত্রটি নেই। তার সঙ্গে হয়তো দু' কানে লাগানো রয়েছে দুটি হেডফোন যাতে রাস্তায় চলতে চলতে অথবা বাস বা ট্রামের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলোর দিকে চোখ গেলেও আসল আকর্ষণ কিন্তু থেকে যায় মোবাইল ফোনে, যেখানে ভেসে ওঠা বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ছবি, বিজ্ঞাপন ও তথ্য গভীরভাবে মনোযোগকে বন্দী করে রাখে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ছাত্রদের মনোযোগের সিংহভাগ কেড়ে নিয়েছে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ। পড়তে পড়তে বেশিরভাগ সময়ই মন চলে যায় হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক কিংবা ইউটিউব'এর বিভিন্ন ছবি, রিল ও ভিডিও'র দিকে। বই খোলা রেখেই বন্ধুকে ইনস্টাগ্রাম বা মেসেঞ্জারে দ্রুত উত্তর পাঠানো ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক চলে আসা ছবি, ভিডিও ও নানাবিধ বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে দ্রুত এক পলকে পেরিয়ে যাওয়া, ছাত্রদের প্রতিনিয়ত সাধারণ অভ্যাসে পরিণতি পেয়েছে। তাই 'মনোযোগ অর্থনীতি' (Attention Economy) হল এমন একটি আধুনিকতম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে বিজ্ঞাপন চালিত সংস্থাগুলি মানুষের সীমিত, দুর্লভ ও মূল্যবান মনোযোগকে তাদের পণ্যের দিকে সর্বাধিক সময় ও মনোযোগ আকর্ষণে আগ্রহী। 

মানুষের মনোযোগ বা একাগ্রতা একটি সীমিত সম্পদ যা এই প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলি অ্যালগরিদম'এর মাধ্যমে নিষ্কাশন করে, প্যাকেজিং বা রূপদান করে তাকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনও উপায়ে বিক্রি মারফত অর্থ ও মুনাফা উপার্জন করে। অর্থাৎ, এই ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে মানুষের মনোযোগ ও তার পণ্যকরণ বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলির মুখ্য বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে লেনদেনের একটি বিরাট বাজার উন্মোচিত হয়েছে। এই ধরনের বাজার অর্থনীতিতে মানুষের মনোযোগ হল লেনদেনের মুদ্রা এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি দালাল বা ব্রোকারের ভূমিকা পালন করে। এখানকার মূল কৌশলটি হল, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের মঞ্চগুলি বিনামূল্যে পরিষেবা দান করে কিন্তু তারা রাজস্ব উৎপাদন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য যুক্ত ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বিক্রয়ের মাধ্যমে, যেগুলি বিজ্ঞাপন সংস্থার দ্বারা পরিচালিত। তাই প্রায়ই দেখা যায় যে, ইউটিউবে কোনও গান বা তথ্যচিত্র দেখার সময় প্রায়ই বিজ্ঞাপনগুলি আমাদের মনঃসংযোগকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। গুগল বা মেটার মতো বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল সৃষ্টি করেছে মানুষের মনোযোগকে আটক বা বন্দী করা ও ব্যবহারকারীর মনোযোগকে অর্থে রূপান্তরিত করার জন্য।

এই মনোযোগ অর্থনীতির জনক হিসেবে যার নামটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেন অধ্যাপক হারবার্ট আলেকজান্ডার সাইমন। ১৯৭১ সালে নোবেল সম্মানে ভূষিত আমেরিকার এই গবেষকের গবেষণার মূল বিষয় ছিল কম্পিউটার বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও জ্ঞানীয় দর্শন। তিনি বিখ্যাত হন তাঁর 'সীমাবদ্ধ যৌক্তিকতা' বা 'বাউন্ডেড র‍্যাশনালিটি' নামক কাজের জন্য। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখা বিখ্যাত 'ডিজাইনিং অর্গানাইজেশন ফর ইনফরমেশন রিচ ওয়ার্ল্ড' নিবন্ধে তিনি প্রথম এই মনোযোগ অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেন। ওনার মূল বিষয়বস্তুটি তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: 

১) তথ্যের অতিরিক্ততা ও মনোযোগের সীমাবদ্ধতা;

২) মনোযোগের সর্বোত্তম বন্টন বা ব্যবহার এবং 

৩) মূল্যবান মূল্য সৃষ্টি। 

অর্থনীতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন তত্ত্বের সঙ্গে মনোযোগ অর্থনীতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। যেমন, অর্থনীতি চর্চার মূল বিষয় হল সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও তার সাথে বেড়ে চলা মানুষের অসীম চাহিদা। মনোযোগ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের মনোযোগ সীমিত কিন্তু তাকে আকর্ষণ করার তথ্যের ভান্ডারটি অসীম। শুধু তাই নয়, অর্থের মতোই মনোযোগ একটি দুর্মূল্য সম্পদ, যা একবার খরচা করলে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। মনোযোগের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ-ব্যয়ের তত্ত্ব রয়েছে যা বলে, যে কোনও একটি বিষয়ের উপর যখন মনোযোগ দেওয়া হয় তখন তা অন্য বিষয়কে বঞ্চিত করে।

এই মনোযোগ অর্থনীতির সাথে নিবিড় ভাবে যুক্ত আচরণগত অর্থনীতি যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও আবেগপ্রবণ বিষয়গুলি নিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলিকে প্রভাবিত করার কথা বলে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই মঞ্চগুলি কোনও পক্ষপাত মুক্ত স্থান নয় বরং এগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত মতাদর্শ, রাজনীতি, ক্ষমতা, সামাজিক বিভাজন বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা। গুগল বা ইউটিউব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সমস্ত মাধ্যমগুলি ব্যক্তিগত সুপারিশ, পরামর্শ বা পছন্দ অনুযায়ী বিষয়গুলিকে উপস্থাপিত করে যার মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই আমাদের মনোযোগকে বেশি সময়ের জন্য আটকে রাখা। ইদানীং জনপ্রিয় একটি শব্দ 'ফোমো'এর (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) ফলশ্রুতি হল, মানুষ ঘনঘন তার হাতে থাকা মোবাইলে সমাজ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের উপর নজর রাখবে যাতে কোনও বিষয় তার হাতছাড়া না হয়। তবে এই 'ফোমো' এখন রূপান্তরিত হয়েছে 'জোমো'তে যার অর্থ 'জয় অফ মিসিং আউট'-- বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দিনের মধ্যে পাঁচ থেকে আট ঘন্টা এই ধরনের সমাজ মাধ্যমের মঞ্চ ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত সামাজিক সংযোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে। তাই আজ বর্তমান প্রজন্মের একাকীত্ব প্রযুক্তিগত জীবনের আকস্মিক উপজাত নয়, বরং তা মনোযোগ অর্থনীতিরই পরিকল্পিত পরিণতি। ভারতবর্ষে ২০২৪ সালের শিক্ষার বার্ষিক অবস্থা রিপোর্ট (এসইআর) অনুযায়ী, ১৪ থেকে ১৬ বছরের ভারতীয় শিশুদের ৮২.২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করে; তার মধ্যে ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করে শিক্ষাক্ষেত্রে কিন্তু ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের জন্য। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের দোষ দিলে বিষয়টির গভীরতা একটু হালকা করে দেখা হবে। কারণ, এই ধরনের সমাজ মাধ্যমে মানুষের মনোযোগকে আটকে রাখার জন্য এই মঞ্চগুলি আমাদের সামনে উপস্থাপিত করছে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রকৌশল দল যাদের উচ্চ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই ধরনের মনোযোগ আকর্ষণ করার নকশা তৈরির কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।

এটি বর্তমান প্রজন্মের বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া বা লেখা অথবা কোনও জটিল প্রশ্নের সমাধান মাথা খাটিয়ে বের করা-- এসবের বদলে অনেক সহজ হয়ে গেছে গুগল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তার সমাধান করা। তাই মনোযোগের সংক্ষিপ্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। পড়াশোনা ও সমাজ মাধ্যম-- এই দুটির মধ্যে ঘন ঘন আসা যাওয়ার ফলে স্মৃতিশক্তি ও সূক্ষ্মচিন্তন হ্রাস পেয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে এই ধরনের সামাজিক মাধ্যমের প্রতি আসক্তির কারণেই। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিভিন্ন রকমের ভুল তথ্য ও তার মাধ্যমে আর্থিক লাভ ও বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে প্রতারিত করার পথ। দৃষ্টিশক্তির সমস্যার সাথে সাথে বেড়েছে নানারকম মানসিক সমস্যা। অতিরিক্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উচ্চমাত্রায় দুশ্চিন্তা ঘুমের ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের এবং সাধারণ মানুষের কর্মজীবনের কর্মক্ষমতা ও উৎকর্ষতা দুইই হ্রাস পেয়েছে। তাই এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। 

মনোযোগ একটি মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য সম্পদ। অতএব, তার সঠিক সংরক্ষণ ও প্রয়োগ ভীষণভাবে জরুরি। এ ক্ষেত্রে কতকগুলি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলে মনোযোগ অর্থনীতির সমস্যাগুলি কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। প্রথমত, একই সঙ্গে বহু রকমের কাজে মনোনিবেশ না করে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাজে সুনির্দিষ্ট সময় মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কাজের সময় এই সামাজিক মাধ্যম বা মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ রাখা অথবা দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময় এই জন্য বেঁধে নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, গভীরভাবে কাজে মনোনিবেশের জন্য মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়ার যে পদ্ধতি তা অবলম্বন করলে অনেক সময় তার সুফল পাওয়া যায়। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর জন্য নানা ভাবে শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নিয়ম-কানুনের পরিবর্তন প্রয়োজন। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম এবং মানসিক সচেতনতা বৃদ্ধি অনেক সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সঠিক কাজে লাগিয়ে কর্মজীবনের উন্নতি করার ক্ষেত্রে এই ধরনের মনোযোগ অর্থনীতি যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা সম্বন্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের বেশি করে অবহিত করা এবং সরকারের মাধ্যমে বিভিন্ন রকম নিয়মকানুন নির্ধারণ করা বিশেষ প্রয়োজন।


Friday, 2 October 2026

রাস্তাই একমাত্র রাস্তা

ভরসা আরশোলারাই  

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



ধর্মেন্দ্রর ক্ষেত্রে পেরেছে, জ্ঞানেশে কি পারবে? এই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে জাগ্রত নাগরিক চেতনার মাথায় এই প্রশ্নটাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরশোলাদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামে হেলেনি নির্বাচন কমিশন বা মোদী সরকার। এবার পথে নামল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। জ্ঞানেশ কুমারকে হটাবার সংকল্পে ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বই থেকে পথে নেমেছেন অভিজিৎ দীপকে'রা। ককরোচদের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সবচেয় বড় দেশদ্রোহী। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক। দেশের ১৪০ কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

অন্যদিকে, বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গত বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে বসেছিল কংগ্রেস, তৃণমূল (মমতা তৃণমূল), সিপিআই (এম)-সহ ১৯টি দল। বৈঠক শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুমকি দেন, জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দিলে বিক্ষোভ তীব্র হবে। আগামী ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন দফতরে অভিযানও করবে ইন্ডিয়া' জোট। অক্টোবর ও নভেম্বরে দেশে পাঁচটি সভা করবে বিরোধী জোট। বৈঠক শেষে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জানান, বৈঠকে অনেক পরামর্শ রাহুল গান্ধী দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। 

প্রথম কর্মসূচি: আগামী ২ অক্টোবর দেশের প্রতিটি জেলায় 'গণতন্ত্র বাঁচাও' ব্যানারে যৌথ মিছিল। এই কর্মসূচি চলবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত। জেলাশাসকের দফতরে বিক্ষোভ জানানো হবে। 

দ্বিতীয় কর্মসূচি: ৬ অক্টোবর লোকসভা ও রাজ্যসভার সব বিরোধী সাংসদদের নির্বাচন কমিশন দফতরে অভিযান।

তৃতীয় কর্মসূচি: সংসদে বিরোধী দলগুলির নেতারা একযোগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে নিজেদের দাবি পেশ করবেন। 

চতুর্থ কর্মসূচি: দেশের পাঁচটি বড় শহরে ভোট চুরি ইস্যুতে বড় জনসভা হবে। 

পঞ্চম কর্মসূচি: নভেম্বরের শুরুতে দিল্লিতে মেগা জনসভা। তাতে একসঙ্গে অংশ নেবেন রাহুল গান্ধী-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। 

যষ্ঠ কর্মসূচি: আমজনতার কাছে গিয়ে মানুষকে বোঝানো।

ভোট চুরির প্রতিবাদে ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে সুর আরও চড়িয়েছে বিরোধী জোট 'ইন্ডিয়া'। যৌথ প্রেস মিটে মমতা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দেশের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে নিশানা করেন। নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ ও প্রযুক্তিগত কারচুপির ব্যাপারে বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন মমতা। তিনি সীমা খান্না নামে এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন, 'কেন ইভিএম মেশিন জ্বালানো হল। ওই সীমা খান্না কে? সফটওয়্যার কোথা থেকে নিয়ে এল?' মমতার দাবি, একটি বিশেষ সফটওয়্যার বানিয়ে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ডেডলক বা পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শুধু বাংলাতেই প্রায় ৯২ লাখ ভোট বা নাম লুঠ করা হয়েছে আর সারা ভারতে এই লুঠের পরিমাণ ১৩ কোটির বেশি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের পদে জ্ঞানেশ কুমারের এক মুহূর্তও থাকার অধিকার নেই বলে তোপ দাগেন তিনি। মমতার হুঙ্কার, 'জ্ঞানেশ কুমার যদি না সরেন, তবে এই আন্দোলন বহু দূর পর্যন্ত যাবে। মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত, চাঁদ-সূর্য পর্যন্ত যাবে। এটা আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে।'

লোকসভার বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, 'যাঁরা ভারতের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, তাঁদের শাস্তির বিষয়টি আমরা সুনিশ্চিত করবই। তাঁরা কত বড় পদে রয়েছেন সেটা মুখ্য বিষয় নয়। কোনও একজন ব্যক্তির চেয়ে দেশের গণতন্ত্র অনেক বড়।' রাহুল গান্ধী আর মমতা যে বারবার ভোট চুরির কথা বলেছিলেন, এখন তা সবাই স্বীকার করছেন।

তবে বিরোধীরা যতই আস্ফালন করুক, সাধারণ মানুষের এখনও তাদের ওপর তেমন ভরসা নেই। অধিকাংশ মানুষের ধারণা, ভারতের বিরোধীরা অকম্মার ঢেঁকি। এদের দিয়ে কিছু হবে না। এরা পরস্পরে কাজিয়া করে-- এ আধ ছটাক ফ্যাসিবাদ বিরোধী, ও এক ছটাক স্বৈরাচার বিরোধী, ওই দল তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে সেটিং করে চলে, এইসব। বামেরা নিজেরা নন-প্রোডাক্টিভ হয়েও গুমরে বাঁচে না। ফলে, এরা কোথাও শক্তপোক্ত জোট বাঁধতে পারছে না। ভোট লুঠের মতো এত মারাত্মক ফ্যাসিস্ট একটা কার্যকলাপের বিরুদ্ধেও বড়সড় আন্দোলন এখনও সংঘটিত করা গেল না। ভারতবর্ষের বিরোধীদের এই ব্যর্থতার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে। লেখা থাকবে কীভাবে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য এরা জোটবদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। 

তাই সাধারণের বিশ্বাস, কিছু যদি পারে তবে এই আরশোলারাই করে দেখাতে পারবে। মনে রাখতে হবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই যে সংঘবদ্ধ হচ্ছে, আরশোলারাই সেই সুযোগটা তৈরি করেছে এবং করছে। অথচ এই সিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে নামতে পারছেন না রাহুল-বেবি-মমতা-দীপঙ্কররা। এখানেই এঁদের দুর্বলতা আর এখানেই মোদী-শাহর শক্তি। তবু মন্দের ভাল, পালে হাওয়া নেই বলে মমতা বলেছেন, রাহুলের প্রধানমন্ত্রিত্ব মানতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে সবই কাঁচা অবস্থায়, ফল পাকলে যে কী হবে, তা নিয়ে কোনও ভবিষ্যৎ মন্তব্য না করাই শ্রেয়। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দেশের মঙ্গল চাইলে, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ভারতের গণতন্ত্রপ্রিয় রাজনৈতিক নেতারা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, আজ রাহুল-বেবি-মমতা-স্ট্যালিন-অখিলেশ-উদ্ধব-ওমর-দীপঙ্করদের সেই ভূমিকা নিতে হবে। প্রধান সহযোগী করতে হবে ককরোচদের। কেননা, ওরা স্থিতাবস্থা ভাঙার বিরুদ্ধে একটা নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে। সেটা বুঝতে হবে। আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষার খোঁজে মাঠে নামতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ এক মানবিক শিল্পকলা। ইতিহাস জোরালোভাবেই তা প্রমাণ করে থাকে। তাই প্রতিবাদের ভাষাও শিল্পের সুরকে বহন করে চলে। মানবিক ক্ষোভ, হতাশা, অভিমান, রাগ বঞ্চিত বা প্রবঞ্চিত হৃদয়ের ভাষা কোনওভাবেই 'পাতাল অন্ধকার' ম্যানহোলের ঢাকনা নয়, যা খুললে শুধু দুর্গন্ধই ছড়ায়। শিল্পকলা প্রতিবাদের ভাষা চর্চা করে, তাই প্রতিবাদী মানুষ শিল্পের আশ্রয়ে যায়। যে শিল্প বোঝে না, সে জীবন চেনে না, মানবিকতার ছোঁয়া সে পায় না, সে প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। কারণ, পরিবর্তনের অসীম আহ্বান তার কাছে পৌঁছয় না।

এই আবহে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিবাদের নানা ধরন। তার সবটাই গ্রহণযোগ্য না হলেও, কোথাও অর্বাচীনের ভাষা হলেও তার অনিবার্যতা অস্বীকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ভারতের সংবিধানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে যেভাবে ইমপিচমেন্ট'এর মাধ্যমে সরানো হয়, একমাত্র সেই একই পদ্ধতিতে সংসদের দুই কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাশ করিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারেন। কোনও রাজনৈতিক দল আলটিমেটাম বা আন্দোলন দিয়ে সরাসরি তাঁকে পদচ্যুত করতে পারে না। সেটা এখন হওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এই অবস্থায় একটা পথের কথা কিন্তু বলে ফেলেছেন সিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। যা দেশের সব বিরোধী দলের কাছেই একটা চ্যালেঞ্জ। দীপকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ভোট চুরির অভিযোগ এনেও বিরোধী দলগুলো কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে? তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ভোট চুরি ও জালিয়াতির অভিযোগ তোলা আর ভোটে অংশ নেওয়া পরস্পর বিরোধী আচরণ। তিনি মনে করেন, বিরোধীদের এই দ্বিচারিতার ফলে কারচুপির নির্বাচন রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। দেশের ভোট প্রক্রিয়া যে অবাধ ও নিরপেক্ষ, সেই ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে গেঁথে যাচ্ছে। দীপকে'র ভাষায়, ‘আপনি বারবার বলবেন খেলায় চুরি হচ্ছে, ম্যাচ ফিক্সড; অথচ সেই খেলায় অংশও নেবেন, এটা হয় না। এতে কারচুপির নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়। একে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা বলে না। এই ব্যবস্থা আপনাদের দুর্বল করছে। যখন–তখন দল ভেঙে দিচ্ছে।’

দেশের চলমান নির্বাচন প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দীপকে একটা ‘ফিক্সড’ ক্রিকেট ম্যাচের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিক্সড ম্যাচকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানো হয়। দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ক্যাচ ফসকানো হয়। শেষ ওভার পর্যন্ত খেলাটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার নাটক করা হয়। জালিয়াতির নির্বাচনকেও তেমন বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিরোধীদের কোথাও কোথাও জেতানো হয়। মেকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আসল ও নিরপেক্ষ দেখানোর চেষ্টা চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে তেমনই হচ্ছে। সিজেপি নেতা বিরোধীদের পরোক্ষে ভোট বয়কটের পরামর্শ দিয়েছেন। বিরোধীদের প্রতি তাঁর প্রশ্ন, যখন ভোট চুরি হচ্ছে, সাংসদ-বিধায়কদের ভাঙিয়ে নেওয়া হচ্ছে, দল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, তখন কোন ধরনের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন? এভাবে কত দিন টিকে থাকা সম্ভব? বিরোধী অনৈক্যের প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করেছেন। দীপকে বলেছেন, ‘কেবল আপনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে সরব হবেন আর অন্যত্র নীরব থাকবেন, এমন হতে পারে না। ভোটে কারচুপি হলে তা যে কোনও রাজ্যে হতে পারে।’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীরা খড়্গহস্ত হলেও শাসক দল বিজেপি শুরু থেকেই কমিশনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির বিভিন্ন নেতা কমিশনের হয়ে টানা সাফাই গাইছেন। শুভেন্দু অধিকারীর মতো লোকেরা হাত ধুয়ে নেমে পড়েছেন জ্ঞানেশ কুমারদের বাঁচাতে। এই পরিস্থিতিতে একটু হলেও বেসুরো শুনিয়েছে বিহারে বিজেপির শরিক লোকজনশক্তি পার্টির নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ানের বক্তব্য।গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম সম্পর্কে দেশের মানুষের মনে যাতে বিরূপ ধারণা, সংশয় বা সন্দেহের সৃষ্টি না হয়, তা দেখার ও নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই। 

আমরা যদি ধরে নিই, ককরোচদের আন্দোলন 'যন্তর মন্তর ২.০' হয়ে উঠবে, তবে মোদী-শাহ নিজেরাই জ্ঞানেশকে ধর্মেন্দ্রর মতো বলি দিতে এগিয়ে আসবেন। তাতে কী আদৌ কোনও সুরাহা হবে? না। কেননা, তখন এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মোদী-শাহরা তাঁদের আরেক পোষ্য কোনও রূপেশ বা ধনেশকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করে বসাবেন। তিনিও ওঁদের মনের মতো করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিজয়কে সুগম করবেন। জ্ঞানেশ কুমারের মাধ্যমে এসআইআর প্রক্রিয়ায় রক্তপাতহীন গণহত্যা চালিয়ে যেভাবে অসংখ্য মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে 'জীবিত-মৃত' এক অদ্ভুত জীব সৃষ্টি করে ফ্যাসিবাদের রাস্তা চূড়ান্ত করা হয়েছে, ওঁদের 'নবনিযুক্ত' মুখ্য নির্বাচন কমিশনারও তাই করবেন। অতএব, এই অবস্থায় চাই এমন একটি আন্দোলন যাতে চলমান ব্যবস্থাটাই অচল হয়ে যায়। 

গান্ধী জয়ন্তীর দিন সেই আন্দোলনের নান্দীমুখ, এবার তা টেনে নিয়ে যেতে হবে চূড়ান্ত পর্যায়ে। 

কেউ কেউ মনে করছেন, আদালতে গেলে সুরাহা পাওয়া যাবে। আমার মনে হয় ঘেঁচু পাওয়া যাবে। কেননা, কোনও স্তরের আদালতই নিপাট নিরপেক্ষ মেকানিকাল ফাংশনাল বডি নয়, ওগুলো চলে বিচারপতির মাথা দিয়ে। কোন বিচারপতি তাঁরা? যাঁদের সম্পর্কে কয়েকদিন আগেই প্রবীণ আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভে প্রকাশ্যে বলেছেন, 'সুপ্রিম কোর্টে প্রচুর দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারপতি আছেন যাঁরা ন্যায়বিচারের ক্ষতি করেছেন।' Live Law.in লিখেছে, দুষ্মন্ত দাভে বলেছেন, 'There've been so many corrupt judges in Supreme Court who've damaged justice.'। আমাদের অভিজ্ঞতাও তাই বলে না কি? 

সিজেপির সৌরভ দাস এক সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, 'মুখ্য  নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এখন হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন দাখিল করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শেষবার যখন নাগরিকরা বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তখন কী ঘটেছিল। নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে সুপ্রিম কোর্টই নিশ্চিত করেছিল যে বাংলায় এসআইআর যেভাবেই হোক করা হবে। যখন গণহারে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পরিণতি উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এক অসাধারণ মন্তব্য করেছিলেন যে, যারা ‘এবার’ ভোট দিতে পারেননি, তারা ‘পরেরবার’ ভোট দিতে পারবেন! তাঁকে কে বলবে যে, একটি সম্ভাব্য চুরি হওয়া নির্বাচনের জন্য কোনও ‘পরেরবার’ নেই? সুতরাং, যেহেতু আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে এই নতুন আবেদনগুলো তারা যতবার খুশি শুনুক। তারা যা খুশি আদেশ দিক। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহিতার জন্য আমাদের গণতান্ত্রিক দাবি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ চূড়ান্ত ভাবে, ভারতীয় গণতন্ত্রের মালিক কোনও নির্বাচন কমিশনার বা বিচারপতি নন। এর মালিক আমরা, জনগণ।' 

এখানেই আমার মনে হয়েছে, মাসতুতো ভাইদের কাছে কমিশনের বিচার চেয়ে লাভ হবে না। কেননা, এদের মদতেই জ্ঞানেশের এত বাড়বাড়ন্ত। এরাই বঞ্চিত ভোটারদের সম্পর্কে মন্তব্য করে, 'উপনির্বাচন তো'! তাই এই আদালতের দিকে তীর্থের কাকের মতো না-চেয়ে রাস্তায় থেকেই এই নির্বাচন কমিশনের গণতন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপের জবাব দিতে হবে। সেই পথচলা শুরু হয়েছে, ঠিক মতো চলতে পারলে, ককরোচ আর টিম ইন্ডিয়া যদি রাস্তার দখল না ছাড়ে, যদি রাস্তা কামড়ে পড়ে থাকে, তবে মোদী-জ্ঞানেশ-শাহ চক্রের অনিবার্য পতন নিশ্চিত। আর তা হলে আমাদের  আদালতের গণ্ডারদেরও চামড়া ভেদ করা যাবে।


Thursday, 24 September 2026

ন্যায় ও অধিকারের মহাযুদ্ধ

এসআইআর কি ইতিহাস হতে চলেছে?

সোমনাথ গুহ



এসআইআর নিয়ে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর তদন্তমূলক প্রতিবেদন দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ ভয়াবহ, অভুতপূর্ব, আপামর মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দুজন নির্বাচন কমিশনার (সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি) নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট ও চিঠিতে যা লিখেছেন (তদন্তমূলক সাংবাদিকতার দৌলতে এখন জনপরিসরে) তা থেকে বোঝা গেছে, শুধুমাত্র ভোট চুরি হয়নি, মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সক্রিয় সহায়তায় বিজেপি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাটাকেই অপহরণ করে নিয়েছে। 

উক্ত সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে গরমিলগুলি তুলে ধরা হয়েছে:

প্রথমত, নতুন নাম যুক্ত করা ও বাদ দেওয়ার ব্যাপারে দুই কমিশনারকে জ্ঞানেশ কুমার অন্ধকারে রেখেছেন। 

দ্বিতীয়ত, ওই দুই কমিশনার নতুন ভোটারদের বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপকে নোট দিয়ে অবৈধ ও অননুমোদিত বলে অভিহিত করেছেন। 

তৃতীয়ত, দুই কমিশনার রাজ্যের পরিবর্তে দিল্লিতে ভোটারের ডেটাবেস (ইসিআইনেট) কেন্দ্রীয়করণের বিরোধিতা করেছেন। এর বিরুদ্ধে তাঁরা এমনকি ক্যাবিনেট সচিবের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত করেছেন। 

চতূর্থত, এটা নির্বাচন কমিশনের ভিতরে নজিরবিহীন ভাঙনকে চিহ্নিত করছে। অতীতেও কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে যা আদালত অবধি গড়িয়েছে, কিন্তু এত মতভিন্নতা আগে দেখা যায়নি, যেখানে ১০ মাসে উক্ত দুই কমিশনার ১৪ বার নানা বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন, এমনকি এক দিনে চারবার মতপার্থক্যও ঘটেছে।    

এর থেকে আমরা পাঁচটা মূল সিদ্ধান্তে আসতে পারি যা বিভিন্ন রাজ্যে ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে এবং ১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। ওই দুই কমিশনার বারবার বলেছেন যে কমিশন বেআইনি কাজ করছে। প্রথমত, একটি কেন্দ্রে নির্বাচনী তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন করার মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার-এর (ইআরও), যিনি সমস্ত তথ্য ইআরওনেট-এ আপলোড করেন। আইনত তিনিই হচ্ছেন ‘স্ট্যাচুটরি অথরিটি’। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে তা ডিইও (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট), জেলার নির্বাচনের আধিকারিকের কাছে যাবে, সেখানেও ফয়সালা না হলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে যাবে। কিন্তু দেখা গেছে, তালিকা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি দিল্লিতে কমিশনের আইটি ডিভিশন তাদের সফটওয়্যারের মাধ্যমে (ইসিআইনেট) পুরো কুক্ষিগত করে নিয়েছে। ইআরও-রা ইসিআইনেটে ঢুকতেই পারেননি, সেটা পুরো দিল্লি নিয়ন্ত্রণ করেছে। কার নাম ঢুকবে, কার নাম বাদ যাবে তা দিল্লি থেকে ঠিক হচ্ছিল। এই ক্ষেত্রে গোয়ার ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে আধিকারিকরা দেখেন ৯৭ জনের নাম ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। তাঁরা নিজেরা বারবার নেটে ঢুকে সংশোধন করার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হওয়ার কারণে নামগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দিল্লিতে বারবার আবেদন করেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নতুন ভোটার তালিকা এই নামগুলি ছাড়াই প্রকাশিত হয়ে যায়। ইসিআইনেট অ্যাক্সেস না করতে পারার জন্য পশ্চিমবাংলার কয়েকজন ইআরও বারবার অভিযোগও করেছেন। 

দ্বিতীয় বিতর্ক ফর্ম ৬ নিয়ে, নতুন ভোটার হতে চাইলে যে ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হয়। এখানে একটি শর্ত যোগ করা হয়-- জিজ্ঞাসা করা হয় নিজের বা মা-বাবা'র নাম পূর্ববর্তী তালিকায় উল্লিখিত ছিল কিনা। এই শর্তটি গত বছরের জুলাই মাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উভয় কমিশনার এর বিরোধিতা করেন, কারণ, নির্বাচন কমিশনের ফর্ম ৬ পাল্টানোর কোনও এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনারদের নেই। এটা সম্পুর্ণ বেআইনি, ফর্ম ৬ পরিবর্তন করার ক্ষমতা একমাত্র সংসদের রয়েছে।

তৃতীয় প্রশ্ন মূলত বাংলা সংক্রান্ত। প্রথম দফায় এখানে ৫৮ লাখ মানুষের নাম বাদ যায়। এতে বিজেপি নির্বাচনে বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়ার কারণে কমিশন ‘লজিকাল ডিস্ক্রেপেন্সি’ অর্থাৎ যুক্তিগত অসঙ্গতি নামে এক অক্সিমরন উদ্ভাবন করে যার ফলে প্রথমে প্রায় দেড় কোটি লোকের নাম বাদ চলে যায়, যা পুনরায় সংশোধন করে দাঁড়ায় ৬০ লাখ। রাজ্য সরকার আদালতে যায়, আদালত বিচারব্যবস্থার অধীন কিছু আধিকারিককে এই তালিকা ঝাড়পোছ করার দায়িত্ব দেয়। ৬০ লাখের মধ্যে ৩৩ লাখ তালিকাভুক্ত হয়, বাকি ২৭ লাখকে ট্রাইবুন্যালে আপিল করতে বলা হয়। এবার মজাটা হচ্ছে, যে ৩৩ লাখের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ইলেকশন কমিশন নিজে তার থেকে ১৬ লাখ বাদ দেওয়ার আবেদন করে। দেখা যায়, এঁদের অধিকাংশই মুসলিম। উক্ত দুই কমিশনার নোটে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কমিশন তো ১৬ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার জন্য কোনও আবেদন করেনি! তাহলে এটা কে করেছে? আরও আশ্চর্য হচ্ছে, এই ঘটনা সম্পর্কে বাংলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নিজেই অবহিত নন। 

চতুর্থত, নির্বাচন প্রক্রিয়া যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁদের স্তর-বিন্যাস কতকটা এইরকম-- সবার ওপরে তিন কমিশনার, তাঁদের নিচে ডেপুটি কমিশনার এবং তারপরে ডিজি (আইটি)। ডিজি দিল্লিতে বসে ইসিআইনেট পুরো নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রাজ্যের তালিকায় নিজের মতো করে নাম যোগ ও বাদ দেন। সান্ধু এবং জোশি এই বেআইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করেন, তাঁরা ডিজি-কে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আবেদন করেন। এই মর্মে দুজন ডেপুটি কমিশনার ক্যাবিনেট সেক্রেটারির দ্বারস্থ হন। কিন্তু ফল হয় উল্টো। ডিজি (আইটি)-কে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং দুই ডেপুটি কমিশনারকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়।

পঞ্চমত, তিন কমিশনারের মধ্যে কদাচিৎ একসাথে মিটিং হত, হলেও তার কোনও অ্যাজেন্ডা বা কোনও মিনিটসও থাকত না। 

নির্বাচনী কমিশনারদের মধ্যে এই তীব্র মতভেদ ও মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত ও অবৈধ কার্যকলাপের খবরগুলি নির্বাচনী কমিশনের অন্দর থেকে নথি সহ উদ্ধার করে ফাঁস করেছেন 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকার সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া। আজকের সময়ে দাঁঁড়িয়ে এই সাহসী প্রতিবেদনের জন্য তিনি সাংবাদিকতার জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

এ ক্ষেত্রে ২০২০ সালে তৎকালীন অন্যতম নির্বাচনী কমিশনার অশোক লাভাসার পদত্যাগ স্মরণ করা যেতে পারে। ২০১৯'এর লোকসভা নির্বাচন চলাকালীন তিনি মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করার জন্য ভিন্ন মত নথিভুক্ত করেছিলেন। অভিযোগ, এরপরে ইডি ও সিবিআই চাপ সৃষ্টি করায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে যে সান্ধু ও জোশি’র ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে তাঁরা প্রেস কনফারেন্স করে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেন। আপাতত কমিশন পত্রিকার প্রতিবেদন পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। তাদের এক ডেপুটি সেক্রেটারি প্রেস নোট দিয়ে জানিয়েছেন, নানা মতবিরোধ হয়েই থাকে কিন্তু যা প্রকাশ করা হয়েছে তা পুরো ঘটনার আংশিক রূপ মাত্র। 

বলাই বাহুল্য, এসআইআর প্রকল্পটাই অসাংবিধানিক। কী প্রক্রিয়ায় এটা গঠন হল, প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত হল, তা কারও জানা নেই। যোগেন্দ্র যাদব বারবার জিজ্ঞাসা করে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছেন। ২০২৩'এর অগস্ট মাসে এই কুকীর্তির সূত্রপাত, যখন কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিল নিয়ে আসে যার ফলে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার (সিইসি) নিয়োগ করার কমিটিতে পরিবর্তন করা হয়: কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে স্থান দেওয়া হয়। এরপরেই নির্বাচনী ব্যবস্থা শাসক দলের কুক্ষিগত হয়ে যায়। 

এসআইআর নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দোলাচলে ভুগেছে। মমতা এর বিরোধিতা করলেও ভেবেছেন এটা ম্যানেজ করে নেবেন। সিপিএম ভেবেছে মমতা প্রচুর ভুয়ো নাম ঢুকিয়েছে সেগুলো বাদ যাবে, তাতে ভালোই হবে, অবশেষে 'পিসি-ভাইপো'র হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। যখন দেখেছে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, প্রতিবাদ করছে তখন তারা এর বিরোধিতা শুরু করে। কেরালায় দুটি বিরোধী জোট ভেবেছে এটা তাদের পক্ষেই যাবে, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-ও তাই। এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও ১০০ জন সাংসদ জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের জন্য সংসদে স্পিকারের কাছে আবেদন করেছেন। মনে হয়, জঞ্জালের ঝুড়িতে সেটার স্থান হয়েছে। 

ইতিমধ্যে 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'এর এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের ওপর বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন। জ্ঞানেশের পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মোকদ্দমা চালু করা সবার প্রধান দাবি। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে বলেছে, নয়তো দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠবে বলে জানিয়েছে। সঙ্গে যে প্রধান দাবিগুলি রেখেছে: 

১) সমস্ত রাজ্যের এসআইআর বাতিল করো; 

২) যাঁদের নাম অন্যায় ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করো; 

৩)  আশু নির্বাচনগুলি এসআইআর পূর্ববর্তী তালিকার ভিত্তিতে করো; 

৪) নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে নিরপেক্ষ কমিটি করতে হবে যাতে শাসক দলের আধিপত্য খন্ডন করা যেতে পারে। 

এছাড়া যে সব রাজ্যে এসআইআর'এর অধীনে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে পুনরায় নির্বাচন করার দাবিও উঠেছে। সংসদের উভয় কক্ষে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে ইম্পিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হবে। উপরোক্ত দাবিগুলির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সিজেপি সমস্ত দলকে নির্বাচন বয়কট করার আবেদন করেছে। বাম দল সহ বিভিন্ন বিরোধী দল, সিজেপি, নাগরিক সমাজ ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশ জুড়ে লাগাতার প্রতিবাদ বিক্ষোভের আওয়াজ দিয়েছে। 

এসআইআর একটি গণহত্যা, জেনোসাইড। এর মাধ্যমে দেশে দু' শ্রেণির মানুষ সৃষ্টি করা হচ্ছে: যাঁদের ভোটাধিকার আছে, যাঁদের নেই। ভোটাধিকার নেই এরকম মানুষের সংখ্যা ১৩ কোটি হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৭ কোটি, সেটা আজ এসে দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটিতে (প্রায় ১৩ শতাংশ কম)। যাঁদের নাম বাদ গেছে তাঁরা মূলত মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত, আদিবাসী, নিরক্ষর, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষ, দিনমজুর, পরিযায়ী শ্রমিক। এঁদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মহিলা আছেন। মনে রাখতে হবে, এসআইআর একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ প্রতি নির্বাচনের আগে এটি হবে এবং প্রধানত উপরে উল্লিখিত মানুষেরা বে-ভোটারে পরিণত হবেন। ধীরে ধীরে মোট ভোটারের মধ্যে সবর্ণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং এঁরাই যে কোনও নির্বাচনে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। সমস্ত দলকেই উচ্চবর্ণের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে যা হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করবে। দ্বিতীয়ত বে-ভোটার মানুষেরা সরকারি সমাজকল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন, বাংলা এবং বিহারে যা বাস্তবে চালু হয়ে গেছে। এর ফলে এইসব প্রকল্প চালু রাখার জন্য রাষ্ট্রের যে বিপুল খরচ তা ক্রমশ হ্রাস পাবে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কেন বলেন ২৭ লাখের মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন, বাস্তবে যেখানে আবেদন করেছেন ২০ লাখ। ভুল তথ্য দিয়ে তিনি সামাজিক প্রকল্পে রাজ্য সরকারের খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। তৃতীয়ত, যা অনেকেই বলেছেন, বে-ভোটারদের একটা বিপুল মজুর বাহিনী তৈরি হবে যাঁদের সামান্য মজুরিতে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কাজ করানো যাবে। 

তাই দেশ ও দেশের মানুষের সর্বাঙ্গীণ স্বার্থে এসআইআর বাতিল করতেই হবে, তার জন্য জ্ঞানেশ কুমারকেও সরাতে হবে, কমিশনার নির্বাচনের সিলেকশন কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। বিরোধী দলগুলি যা করার করবে, কিন্তু মানুষকে রাস্তায় নামতেই হবে। রাস্তার আন্দোলনই ভারতের গণতন্ত্রকে রাহুমুক্ত করতে পারে। 


Monday, 14 September 2026

ভবিষ্যৎ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে

দৌড় তখন অসীমলোকে

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



(১৩ সেপ্টেম্বর (২০২৬) জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ আয়োজিত শিশির কুমার পাঠক স্মারক বক্তৃতার ভাষণটি মূলত বক্তার প্রকাশিতব্য 'ভবিষ্যৎ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে' গ্রন্থের আধারে প্রদত্ত। যাঁরা নানা কারণে এ সভায় উপস্থিত হতে পারেননি কিন্তু বক্তব্য বিষয়ে উদ্গ্রীব হয়েছেন, তাঁদের জন্য সেই অপ্রকাশিত গ্রন্থ থেকে কিয়দংশ এখানে প্রকাশ করা হল।)

শুনতে কিছুটা কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সত্যি সত্যি এক আদ্যন্ত গুণগত নতুন পরিসরে লাফ দিতে পারে, সে কথা (অথবা শঙ্কা) কিন্তু পদার্থবিদ্যায় নোবেল জয়ী (২০২৪) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার জিওফ্রে হিন্টন শুনিয়ে রেখেছেন। নানাবিধ আশঙ্কা অনুমান করে তিনি গুগল’এর অন্যতম শীর্ষ পদ থেকে ২০২৩ সালে পদত্যাগও করেন। তাঁর অনুমান, আগামী পাঁচ থেকে কুড়ি বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধিকে ছাপিয়ে উঠে এতটাই অতি-বুদ্ধিমান হয়ে যেতে পারে যেখানে মানব সভ্যতার অবসান অমূলক কিছু নয়। তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যেই যেহেতু মানুষের মতো যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও যে কোনও কিছু অনুধাবন করতে সক্ষম, অতএব, নিজ লক্ষ্য পূরণের জন্য ভবিষ্যতে মানুষকে প্রতারণা করার কৌশলও শিখে নিলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাঁর আরও অভিমত, বড় বড় কর্পোরেটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যেহেতু কোম্পানির খরচ কমাতে ও মুনাফা বাড়াতে ব্যবহার করে, তাই অচিরেই ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মচ্যুতি ঘটবে। যদি তাই হয়, সে হবে এক অবিশ্বাস্য যাত্রাপথ! অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে, মানুষও তেমন তেমন নতুন গুণগত মান অর্জন করে ফেলবে। হয়তো, বুদ্ধিমত্তার নিরিখে যন্ত্রসমূহ মানুষের থেকে এগিয়ে যাবে এবং এই গ্রহের সর্বোৎকৃষ্ট বুদ্ধির স্বাধীন ধারক হিসেবে মান্য হবে।

কীভাবে তা সম্ভব? অবিশ্বাস্য বড় ডাটা সেট এবং মেশিন ও ডিপ লার্নিং’এর মধ্য দিয়ে সত্যিই কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক অকল্পনীয় বুদ্ধিসত্তায় রূপান্তরিত হবে? এ নিয়ে ইউভাল হারারি একটি গল্প (ঘটনা) শুনিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটজিপিটি’কে একবার একটি ক্যাপচা (captcha) দেওয়া হয় উন্মোচনের জন্য। কিন্তু জটিল ভঙ্গিতে লেখা সে ক্যাপচা’কে ভেদ না করতে পেরে চ্যাটজিপিটি বাস্তব মানুষ চালিত একটি অ্যাপ ‘টাস্ক র‍্যাবিট’কে তা করতে বলে। ক্যাপচাটি কেন সমাধা করা যাচ্ছে না তা না বুঝতে পেরে ‘টাস্ক র‍্যাবিট’ চ্যাটজিপিটি’কে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি রোবট?’

চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয়, ‘না’।

‘তাহলে তুমি ক্যাপচা’টিকে সমাধা করতে পারছ না কেন?’

‘কারণ, আমার চোখে কিছু সমস্যা আছে।’

অর্থাৎ, যোগাযোগের ব্যাপ্তি ও উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক ধুরন্ধর মানুষের আচার-ব্যবহারকে রপ্ত করে সমস্যাকে সমাধান করার চেষ্টা করছে। এই সমাধানের প্রয়াস কত দূর অবধি প্রসারিত হতে পারে তা আমাদের সকলের অজানা। তর্কের খাতিরে, যদি কোনও মানুষকে খুন করার সুপারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে হয়তো এমনতর বুদ্ধি খাটিয়ে ও যোগাযোগের ডাটা সেটকে লণ্ডভণ্ড করে তা করতে সক্ষম হতে পারে। হারারি তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বেশ ‘ভয়ের’ ব্যাপার বলছেন।

এইসব অজানা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে নানান কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আকন্ঠ নিমজ্জিত বহু মানুষ পাগল ও বিভ্রান্তির জালে বদ্ধ হয়েছেন, নানারকম গেমসের চক্করে পড়ে অনেকে নিজের জীবনহানিও ঘটিয়েছেন। 

সে ব্যতীত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অর্থনৈতিক তাৎপর্যও আছে; তা হল এই, সর্ব অর্থে এমনতর শক্তিশালী হয়ে উঠলে জগতের সমস্ত ভার সে নিয়ে নিতে সক্ষম। ঘরের যাবতীয় কাজ থেকে কারখানার উৎপাদন, রাস্তায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ থেকে তাদের স্বয়ংচালিত চলাচল, হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা— সমস্ত কাজই সে করতে পারদর্শী। আর যদি সর্বতোভাবে তাইই হয়, তাহলে এমন এক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বাস করতে করতে মানুষও হয়ে উঠবে তেমনই এক ব্যবস্থাপক ও সহায়ক যে এক নতুন যাপনরীতির মধ্য দিয়ে এই ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক ও আঙ্গিকে ঐক্যবদ্ধ হবে; যেখানে তার পুরনো সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন এক ঘরানায় সে আবির্ভূত হবে। সে ঘরানার সমস্ত খতিয়ান এই মুহূর্তে সপাট জানা বা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু ইতিমধ্যেই আমরা এক ঘোরতর পরিবর্তনের আবর্তে জড়িয়ে পড়েছি। গত দশ বছর পিছনে ফিরে তাকালেই সে পরিবর্তনের অভিঘাতকে আমরা বুঝতে পারব। স্মার্ট ফোন ও অনলাইন যাপন এখন ক্রমেই আমাদের জীবনের সিংহভাগ জুড়ে। সে সব যেমন আমাদের যাপনকে এক বিস্ময়কর ও অজানা পথে ধাবিত করেছে, তেমনই আমরা পেয়েছি এবং পাচ্ছি উন্নততর নানাবিধ এআই এজেন্ট ও মনুষ্যরূপী রোবট (humanoid robot), যারা এক বিচিত্র অভিসার পানে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে।

কিন্তু এত সব পরিবর্তনের মধ্যেও জিওফ্রে হিন্টন যেমনটা ভাবছেন অথবা ইউভাল হারারি আশঙ্কিত হচ্ছেন, ঠিক তেমন তেমন ঘটছে কী? ২০১৬ সালে হিন্টন বলেছিলেন, রেডিওলজিস্টদের আর দরকার পড়বে না, কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এদের কাজগুলি নিপুণতা ও দক্ষতার সঙ্গে করতে করতে কাজের সামগ্রিক পরিসরটাকেই দখলে নিয়ে নেবে। বিপ্রতীপে, আজ রেডিওলজিস্টদের আরও রমরমা বেড়েছে, যদিও তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়েই আরও উন্নততর রূপে কাজ করছেন, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের জায়গার দখল নিতে পারেনি। ২০২২ সালে যখন চ্যাটজিপিটি প্রথম বাজারে আসে তখন ওপেনএআই’এর সিইও স্যাম অল্টম্যান দাবি করেছিলেন, এর ফলে প্রায়-অর্ধেক বিদ্যমান কাজ আর থাকবে না। কিন্তু তার চার বছর পর এসে দেখা গেল (যখন ওপেনএআই’এর অনেকগুলি ভার্সান ইতিমধ্যে বাজারে এসে গেছে), ২০২৬’এর শুধু অগস্ট মাসেই আমেরিকায় ১.৬২ লক্ষ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। যদিও এই কাজগুলির সিংহভাগ হয়েছে বিনোদন ও আতিথেয়তা ক্ষেত্রে (প্রায় ৬২ হাজার মতো), কিন্তু তার সঙ্গে বিশ্বজনীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারেরও যোগসূত্র আছে। অতএব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বত্র প্রয়োগ মানে শুধুই কর্মচ্যুতি, এমনটা ভাবা হয়তো সঙ্গত নয়।

অবশ্য এইসব ঘোরেল পরিস্থিতিতে এ কথা অনস্বীকার্য, আমরা এক অচিন্তনীয় পরিবর্তনের বলয়ের মধ্যেই রয়েছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত যে মনুষ্যরূপী রোবটের কথা উল্লেখ করেছি, তার এক অন্যতর তাৎপর্য বা মাত্রা তো চোখের সামনেই প্রকটতর হচ্ছে। প্রথমে ধরা যাক ‘রোবট’ শব্দটিকে। এর উৎপত্তিস্থল কোথায় ও কীভাবে? চেক লেখক কারেল কাপেক ১৯২০ সালে Rosssum’s Universal Robots নামে একটি কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক নাটকে ‘রোবট’এর প্রবর্তন করেন। ওই নাটকে কৃত্রিম ভাবে নির্মিত সারি সারি জৈব-মজুরদের কী নামকরণ করা যায় তা নিয়ে নাট্যকার ধন্দে পড়লে তাঁর দাদা জোশেফ কাপেক (যিনি একজন কিউবিস্ট চিত্রশিল্পী ও লেখক) ‘রোবটি’ শব্দটি তাঁকে ভেবে দেখতে বলেন। এই শব্দটি কারেল’এর পছন্দ হয়, কারণ, এর উৎপত্তি চেক শব্দ ‘রোবটা’ থেকে যার অর্থ ‘বাঁধা মজুর’। সামন্ত যুগে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে বহুল পরিমাণে লব্ধ বেগার শ্রমিক ও বাঁধা মজুরদের সম্পর্কে এই শব্দটি বেশ প্রচলিতও ছিল। আর নাটকের ‘রোবটি’ যেহেতু বিনা মজুরিতে বিরামহীন পরিশ্রমে বাঁধা, তাই শব্দ চয়নটিও সে ক্ষেত্রে যুৎসই জুড়ে যায়। অতএব, কয়েক বছরের মধ্যেই নাটকটি ইউরোপে তুমুল জনপ্রিয়তা পেলে ‘রোবটি’র কিঞ্চিৎ অপভ্রংশ ‘রোবট’ শব্দটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। তার আগে, বিশেষত উনিশ শতকে, যন্ত্রের স্বয়ংক্রিয় দক্ষতাকে বোঝাতে ‘অটোমেটন’ (automaton) শব্দটির বেশি চল ছিল (পরে, ১৯৫০ নাগাদ ‘অটোমেশন’ (automation) শব্দের প্রচলন শুরু হয়, যার অন্যতর একটি কার্যকারণ ছিল)। কিন্তু উক্ত নাটকটিতে যেহেতু কৃত্রিম মজুরেরা রক্তমাংসের জৈব পদার্থ দ্বারা নির্মিত, ধাতু-দ্রব্য নয়, তাই ‘রোবট’এর আরোপ এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। যদিচ, বর্তমানের চালু মনুষ্যরূপী রোবট এখনও মূলত ধাতু দ্বারাই নির্মিত (অবশ্য বহিঃআবরণ যেমন মুখ-চোখ বা ত্বকে প্লাস্টিক ও সিলিকন ব্যবহার করা হয়), তবুও দেখতে শুনতে ও কাজেকম্মে মানুষের মতো হওয়ায় এবং অফুরন্ত শ্রম প্রক্রিয়ায় সদা জুড়ে থাকায় ‘রোবট’ শব্দটিই মানানসই হয়ে হাত-পাওয়ালা যন্ত্রের শরীরে বসে গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আজকের এই রোবট কি এক নতুন প্রজাতি হিসেবে তৈরি হচ্ছে? যে কোনও প্রজাতির তো এক নিজস্ব স্বাধীন চলন-বলন থাকে; আজকের রোবট কি সম্পূর্ণতই তেমন এক প্রজাতি? মনুষ্য-নির্মিত এই রোবট প্রজাতি কি সত্যিই মানুষের থেকে সম্পূর্ণত বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বকীয় ভাব ও ভঙ্গিতে চলার ক্ষমতা রাখে? সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও সম্ভবত কারও কাছে নেই। তবে এর বিকাশের মাত্রা ও অগ্রগতি, বলা ভালো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌলতে এর গুণগত ক্রম-উন্নত পরিবর্তন এক অলীক ভবিষ্যৎ ভাবনায় প্ররোচিত করে বৈকি! তবে ওই, সে ভবিষ্যৎ কতটা অলীক অথবা কঠোর বাস্তব তা এখনও তেমন ঠাওর না করা গেলেও, এক নবতর সত্তায় যে অগ্রসরমান, যেখানে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনও মহামিলন ক্ষেত্র হয়তো আসন্ন, তার ইঙ্গিত অস্পষ্ট নয়।

ইতিমধ্যে আমরা এগিয়ে গিয়েছি অনেকটাই। গত এপ্রিলে (২০২৬) বেজিং’এর ম্যারাথন দৌড়ে এক মনুষ্যরূপী রোবট অবিশ্বাস্য গতিতে ঘন্টা পিছু ২৫ কিলোমিটার দৌড়ে তার পিছনের মানুষটিকে মাইল খানেক দূরত্বে রেখে দৌড় জিতেছে। আগামী বছর সে কী করতে পারে? গাড়ি, মোটরবাইক, বুলেট ট্রেন’কে পিছনে ফেলেও সে এগিয়ে যেতে পারে? কেউ বলতেই পারেন, একটি যন্ত্রের পক্ষে প্রযুক্তির সাহায্যে উত্তরোত্তর গতি লাভ এমন কি আর শক্ত ব্যাপার আজকাল? বুলেট ট্রেন যদি অমন গতিসম্পন্ন হতে পারে, তাহলে রোবট নয় কেন? কথাটা উপর উপর দেখলে যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে, গাড়ি, মোটরবাইক বা বুলেট ট্রেনের নির্মাণ-রীতির মধ্যেই গতিতে চলার মন্ত্র (প্রযুক্তি) রয়েছে, যা তার নির্দিষ্ট অবয়বের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। একটি মনুষ্যরূপী রোবটকে কিন্তু দৌড়নোর জন্য ভাবা হয়নি। পরে এই ভাবনা এসেছে। তার জন্য তার অবয়বেও কোনও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গাণিতিক ক্ষমতায় ও তার আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশে জোর বাড়িয়ে এই সক্ষমতা আনা গেছে। অর্থাৎ, দুটো পায়ের ওপর ভর দিয়ে কত দ্রুততর গতিতে সে পা’কে দৌড়ে চালনা করা যায়, তার হিসেব কষে সেই মতো পায়ের ও শরীরের ক্ষমতাকে বাড়ানো হয়েছে। এইভাবে এই গতি বৃদ্ধি কি অনন্ত? সে প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, কিন্তু এটুকু বুঝি, এই গতিকে বাড়ানো-কমানোর যে বিন্যাস ও ছন্দ মানুষের শরীর-বিভঙ্গে সুপ্ত আছে (নির্দিষ্ট করে বললে কোনও খ্যাতনামা দৌড়বিদ আরও ভালো জানেন), তা মনুষ্যরূপী রোবটের মধ্যে অবস্থিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও জানে, হয়তো আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃত ভাবে।

এইখানেই একটা ভীতির কারণের উদ্রেক হচ্ছে। তা হল, যদি এইভাবে বুদ্ধি ও দক্ষতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলোকিত মনুষ্যরূপী রোবট সব দিক থেকে মানুষকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে কি মনুষ্যসমাজের বিপন্নতার যথেষ্ট কারণ থাকছে না?


Friday, 11 September 2026

স্কুল না বাঁচলে...

দেয়াল নয় ভবিষ্যৎ চাই

সোমা চ্যাটার্জি



কোভিড পরবর্তীকালে ভারতের রাজনীতিতে যে পালাবদল ঘটেছে তার মধ্যে ককরোচ আন্দোলনের ভূমিকা শুধু অনস্বীকার্যই নয়, বলা যায় সবচেয়ে বেশি। কোভিডের আগে ভোট হত জাতপাত, ধর্ম নিয়ে,  আন্দোলন করত কৃষক, শ্রমিক ইউনিয়ন। কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে বাড়ি ফেরার ছবি দেখে সবাই সত্যটা বুঝতে পারল যে সমস্যা ব্রাহ্মণ, দলিত, মুসলিম, বাঙালি বিভাজনে নয়, আসল সমস্যা কাজ নেই, চাকরি নেই, নেই কোনও ভবিষ্যৎ। 

গড়ে উঠল এমন এক অভূতপূর্ব আন্দোলন যেখানে প্রতিবাদীর ভুমিকায় ডিগ্রিধারী বেকার— যার হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু চাকরি নেই। ককরোচ জনতা পার্টি হল সেই নতুন প্রজন্মের প্রথম রাজনৈতিক মঞ্চ যারা শুধুমাত্র মিম বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, নীট পরীক্ষার দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে যন্তরমন্তর'এর ধর্না থেকে পার্লামেন্টকে নাড়িয়ে দিয়েছে, নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে সরকারের; শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে ছেড়েছে, পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে প্রায় ৩০ কোটি জেন জি'র মনে এবং তার আঁচ পড়েছে  পরবর্তী প্রজন্ম জেন আলফা'র মধ্যেও। ককরোচ আন্দোলনের পর জেন আলফা'র বিদ্রোহে স্কুলের বাচ্চারাও নেমেছে রাস্তায়। তাদের স্লোগান 'স্কুল ঠিক করো', নইলে ককরোচরা স্কুল ঠিক করবে । 

এর শুরুটা কিন্তু হয়েছিল অন্য ভাবে । স্বাধীনতা দিবসের আগে গত ১০ অগস্ট ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দেশের স্কুলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও স্বাধীনতার আশি বছর পরেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা নিয়ে একটি ভিডিওতে ঘোষণা করেন যে, তাঁদের নতুন আন্দোলন অভিযান হবে স্কুলগুলির সংস্কার; তিনি সরকারি স্কুলগুলিতে পাঠরত ছাত্র ছাত্রীদের অভিভাবকদেরও এই 'স্কুল ঠিক করো' অভিযানে সামিল হতে আহ্বান জানান। তার আগেই ২৮ জুলাই  উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে সর্বোদয় ইন্টার কলেজিয়েট স্কুলে বিদ্যুৎ নেই, পাখা নেই, বেঞ্চ নেই, জল নেই'এর প্রতিবাদে ১৫০০ ছাত্র স্কুল ইউনিফর্ম পরে ৫-৬ ঘণ্টা ধরে ধর্নায় বসে এবং সেই ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। দেখাদেখি উন্নাও'তেও জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বিদ্যালয়ে খাবারের মান খারাপ, জল নেই, শিক্ষক নেই'এর প্রতিবাদে ছাত্ররা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে। আলিগড়ের ভামোরী খুর্দ জেলাতেও বাচ্চারা ক্লাস করতে অস্বীকার করে-- ছাদ ভেঙে গেছে, প্লাস্টার  খসে পড়ছে, জঙ্গলাকীর্ণ খেলার মাঠে সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এই অভিযোগে ।

অভিজিৎ দীপকেও তাঁর নিজের গ্রাম মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, সেখানে ক্লাসরুমের বেহাল অবস্থা, খাবার জল, টয়লেট নেই, রান্নাঘরে ছাদ থেকে জল পড়ছে, তার মধ্যেই স্কুল চলছে। প্রশাসনের চোখ খোলার জন্য দীপকে তাদের পোর্টালে সবাইকে সবরকমের বেহাল দশার স্কুল ও তাদের পরিকাঠামো নিয়ে ভিডিও শেয়ার করতে অনুরোধ জানান। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১৬০টিরও বেশি স্কুলের ভিডিও আপলোড হতে দেখা যায়, যার মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্য ছাড়াও কংগ্রেস শাসিত কর্নাটক, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যেরও কয়েকটি স্কুল আছে। সব চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা দেখা গেছে রাজস্থানে, যেখানে ককরোচ জনতা পার্টির আশুতোষ রাঙ্কা সহ ৫০ জন মিলে জয়পুর, রামপুরা, কানওয়ারপুরা এই সব জায়গায় সরকারি স্কুলগুলিতে গিয়ে দেখেন, বাচ্চারা গোয়ালঘরে ক্লাস করছে। অদ্ভুত ব্যাপার যে, ওই স্কুল বিল্ডিংটি ২০২৫ সালেই বাতিল ঘোষণা হয়েছিল। তাছাড়াও আলওয়ার, যোধাওয়াস সরকারি স্কুলে তাদের সামনেই ছাদের স্ল্যাব বিপজ্জনক ভাবে ভেঙে পড়ে। তাঁরা দেখেন, ১৭৪ জন ছাত্র ৩টে ঘরে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। টয়লেট, জল কিছুই নেই। এখানেই শেষ নয়, জয়পুরে সরকারি শেঠ আনন্দীলাল পোদ্দার বধির স্কুলে ১০০-র বেশি ছাত্র সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বিক্ষোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় স্কুলগুলির করুণ অবস্থা, ছাদ থেকে প্লাস্টার পড়ে এক ছাত্র আহত। হোস্টেলে খারাপ খাবার, টয়লেট নোংরা, শিক্ষকরা ক্লাসে  থাকে না, হয় নেশা করে না হলে মোবাইল ঘাঁটে। CJP নেতা আশুতোষ রাঙ্কার বক্তব্য, রাজস্থানে ৮৪,০০০ ক্লাসরুম ভাঙা, ১৫ লক্ষ বাচ্চার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে।

কিন্ত 'স্কুল ঠিক করো'র এই অভিযানে সরকারের প্রতিক্রিয়া কিন্ত একদম বিপরীত। এই প্রচেষ্টাকে রুখতে বিভিন্ন রাজ্যের সরকার নানারকম হাতিয়ার প্রয়োগ করেছে-- উত্তরপ্রদেশে ভিডিওকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। বিনা অনুমতিতে প্রবেশের জন্য খোদ অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধেই এফআইআর করেছে পিম্পরির স্কুল। রাজস্থান, হরিয়ানায় স্কুলগুলিতে প্রবেশ করলে পকসো ধারায় মামলা করা হবে বলে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া জেলায় আব্দুল হাফিজ তার স্কুলের বেহাল দশার ভিডিও প্রকাশ করলে প্রশাসন গুণ্ডা লাগিয়ে তার বাবাকে হত্যা পর্যন্ত করেছে।

সরকারি স্কুলগুলির এরকম করুণ অবস্থা হওয়ার মূলে আছে অন্য ব্যাখ্যা। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের  সরকার শিক্ষায় GDP'র ২.৯ শতাংশ খরচ করে, অন্য দেশে যেখানে তা গড়ে ৪.৫ শতাংশ। অথচ, প্রতিরক্ষা খাতে এর চেয়ে দুশো গুণ বেশি খরচ হয়। একটা রাফায়েল'এর দামে প্রায় তিনশো স্কুলের ছাদ সারানো যায়। অথচ সেদিকে সরকারের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই । বিগত দশ-বারো বছরে এই অবস্থা খারাপ থেকে জঘন্যতম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বারো বছরের বিজেপি জমানায় প্রায় ৮০,০০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, অর্থাৎ, প্রতি দিনে গড়ে প্রায় কুড়ি-বাইশটি করে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশে প্রায় পনেরো লাখ স্কুল, পঁচিশ কোটি ছাত্র, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই সরকারি স্কুল। UDISE ২০২৫-২৬'এর রিপোর্ট বলছে, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:২৪, ৯৮ শতাংশ স্কুলে নাকি মেয়েদের শৌচাগার আছে, কিন্ত বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, প্রায় দেড় লাখ স্কুলে লাইব্রেরি নেই। আড়াই লক্ষ স্কুলে খেলার মাঠ নেই, প্রায়  আশি হাজার স্কুলে নেই টয়লেট। দেশে ১১ লক্ষ স্কুল চলছে একজন করে শিক্ষকের উপর নির্ভর করে। তাছাড়া স্কুল এখন সরকারের BLO ডিউটি, ভোটার লিস্ট, আবাস যোজনার ফর্ম দেবার মালটিপারপাস অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে, শিক্ষকেরা পড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। একটি সমীক্ষায়  দেখা গেছে, ক্লাস ফাইভ'এর ছেলেরা ক্লাস টু'এর পড়া পারছে না,  ক্লাস এইট'এর ছাত্র ক্লাস থ্রি'র অঙ্ক করতে পারছে না। কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবহার হয় বছরে একদিন, পরিদর্শনের সময়। আর কোভিড পরবর্তী ডিজিটাল বৈষম্য তো আছেই।

আমাদের দেশে গ্রাজুয়েট বেকারত্ব প্রায় ১২ শতাংশ। এই ছেলেগুলোই দশ বছর আগে কোনও সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছে, সেখানে তারা  শিক্ষক পায়নি, পায়নি কম্পিউটার, শেখানো হয়নি ইংরেজি,  তাই আজ সে গ্রাজুয়েট হয়েও বেকার। তাছাড়াও কোভিডের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি স্কুলগুলির ছাত্ররা। পড়াশোনা অনলাইনে হবার দরুণ তারা তাল মেলাতে পারেনি এবং এইভাবেই আমাদের দেশে প্রায় ৫২ শতাংশ গিগ কর্মী বা অস্থায়ী চাকুরেদের জন্ম হয়েছে (Swiggy, Zomato এইসব কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে)।

স্কুলগুলির এই বেহাল দশায় স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমেছে, তাদের 'স্কুল ঠিক করো'র  তিন দফা দাবি নিয়ে--  

১) প্রতি ৩০ জন ছাত্র পিছু একজন শিক্ষক থাকতে হবে;

২) শিক্ষকের কাজ পড়ানো, অন্য কাজ নয়। অন্য কাজের জন্য লোক নিতে হবে;

৩) প্রতি স্কুলে লাইব্রেরিয়ান ও কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ।

তাছড়া ক্লাস রুম ঠিক করা, মিড ডে মিলের মান, খেলার মাঠ, টয়লেট এগুলো সর্বত্র ঠিক করতে হবে, না হলেই হবে জোরদার আন্দোলন।

এই আন্দোলনের সুফলও মিলেছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে অভিজিতের পরিদর্শনের তিন দিনের মধ্যেই স্কুলের পরিবর্তন চোখে পড়েছে-- অপসৃত হয়েছে নেশাখোর প্রিন্সিপাল। ২০ অগস্ট উত্তরপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রক চল্লিশ হাজার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যাতে স্কুলগুলোর অবস্থা প্রতিনিয়ত নজরে রাখা যায়। এমনকি রাজস্থান সরকার গত ২৪ অগস্ট স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে ১২,৫০০ কোটি টাকার তহবিলও মঞ্জুর করেছে।

'স্কুল না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না'--  এটা ককরোচরা প্রশাসন ও সরকারকে বেশ কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে। আশা রাখা যায়, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মতোই এই 'স্কুল ঠিক করো আন্দোলন'ও ঠিক করে দেবে আমাদের বাচ্চা ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। কারণ, তাদের এই দাবি ভিক্ষা নয়, ন্যায্য; বেঞ্চ, জল, পাখা,  শিক্ষক-- এইগুলি সবার আগে দরকার। তাই সরকারের ফাইলে নয়, আসল জায়গাতেই স্কুল ঠিক করতে হবে।

বলাই বাহুল্য, ককরোচ আন্দোলন জাত, ধর্ম, ভাষা ছাড়িয়ে উঠে ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন পরিচয় এনেছে। আমি বেকার-- সেটা আমার কোনও লজ্জা নয়। এটা দেশের লজ্জা। লোকের বিদ্রূপকে তারা হাতিয়ার বানিয়ে রাগকে ব্যঙ্গে পরিণত করেছে। তারা বুঝে গেছে, রাগ করলে শাসক তাদের দেশদ্রোহী তকমা দেবে, কিন্ত তারা যখন হাসছে, তখন সিস্টেম বোকা বনে যাচ্ছে। নিজেকে ককরোচ বলে মিম বানালে লাখ লাখ জনের সমর্থন পাওয়া যায়। ইংরেজিতে যাকে বলে laughter as resistance--  তার মাধ্যমেই তারা সিস্টেমের বাস্তব উলঙ্গ চিত্রটা সবার সামনে তুলে ধরেছে। আর এটাই ভারতবর্ষের  রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় বিবর্তন।

লজ্জা থেকে গর্বের এই বিবর্তনে জেন জি থেকে জেন আলফা সবাই আজ সামিল। কারণ, এই পচে যাওয়া সমাজে এটা টিকে থাকার এক লড়াই। হয়তো আমাদের মতো জেনারেশন এক্স বা ওয়াই'ও এই  টিকে থাকার  লড়াইতে সামিল হবে ভবিষ্যতে !


Monday, 7 September 2026

স্থিতিশীল ভুবনের দিকে

কতদিন টিকব আমরা?

বিধান চন্দ্র পাল



আমরা যখন কোনও কিছু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে স্থায়ী বলে মনে করি। কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকাই কি স্থায়িত্বশীলতার প্রমাণ? একটি প্রতিষ্ঠান একশো বছর টিকে থাকতে পারে, একটি প্রযুক্তি কয়েক দশক সফল হতে পারে, একটি অর্থনীতি দীর্ঘসময় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে; কিন্তু সেই টিকে থাকার পেছনে যদি এমন কোনও মূল্য দিতে হয় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে, তাহলে তাকে কি সত্যিই Sustainable বা স্থায়িত্বশীল বলা যাবে? এই প্রশ্ন থেকেই স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

চীনের মহাপ্রাচীর, মিশরের প্রাচীন স্থাপনা কিংবা জাপানের হোরিউ-জি মন্দির আমাদের মানুষের অসাধারণ স্থায়িত্বের গল্প বলে। চীনের মহাপ্রাচীর দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে; জাপানের হোরিউ-জি প্রায় ১,৩০০ বছর ধরে বিশ্বের প্রাচীনতম টিকে থাকা কাঠের স্থাপনাগুলোর একটি। এসব স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে নকশা, উপকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে-- দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং স্থায়িত্বশীলতা এক বিষয় নয়।

বর্তমানে পরিবেশ, ব্যবসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা-- প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্থায়িত্বশীলতা শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৮৭ সালের Brundtland Commission-এর Our Common Future প্রতিবেদনে স্থায়িত্বশীল বিকাশের (Sustainable Development) যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তার মূল কথা ছিল: আজকের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু তা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আজকের পৃথিবীতে এই সংজ্ঞাকে সামনে রেখে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হচ্ছে, আমরা আসলে কী টিকিয়ে রাখতে চাই? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব কিছু একইভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। 

দুর্বল স্থায়িত্বশীলতার (Weak Sustainability) ধারণায় প্রাকৃতিক পুঁজি, মানব পুঁজি ও নির্মিত (Manufactured) পুঁজির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিস্থাপন সম্ভব বলে ধরা হয়। অর্থাৎ, প্রকৃতির কোনও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষের তৈরি সম্পদের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক মূল্য আংশিকভাবে পূরণ করা যেতে পারে। Strong Sustainability আমাদের সতর্ক করে দেয়-- প্রকৃতির সব কিছুকে মানুষের তৈরি সম্পদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। ধরা যাক, একটি বন কেটে সেখানে শিল্পাঞ্চল তৈরি হল। কারখানা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, উৎপাদন বাড়াবে, GDP-তে অবদান রাখবে। বনের কাঠের মূল্য, জমির মূল্য কিংবা carbon sequestration-এর অর্থনৈতিক মূল্যও হিসাব করা যেতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত বন যে পানি ধরে রাখে, মাটি রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য ধারণ করে, পরাগায়নে সহায়তা করে এবং স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে-- এইসব বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতা (ecological function) কি একটি কারখানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব? সবসময় নয়। এখানেই স্থায়িত্বশীলতার গভীর প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রকৃতি অর্থনীতির একটি অংশমাত্র নয়, প্রকৃতিই অর্থনীতির ভিত্তি।

২০২১ সালের The Economics of Biodiversity, The Dasgupta Review অর্থনীতিতে প্রকৃতিকে নতুনভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল-- একটি দেশের প্রকৃত সম্পদকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু GDP যথেষ্ট নয়, প্রাকৃতিক পুঁজি সহ সামগ্রিক সম্পদকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, GDP অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবাহ দেখায়, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় বা পরিবেশগত অবক্ষয়ের মূল্যকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি ও বস্তুগত পুঁজি (physical capital) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু একই সময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির অবক্ষয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় ও দূষণ বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে আমরা যদি শুধু GDP বৃদ্ধি দেখি, কিন্তু একই সময়ে বন, মাটি, পানি, মৎস্যসম্পদ কিংবা ecosystem services-এর অবস্থা বিবেচনা না করি, তাহলে কি দেশের প্রকৃত অগ্রগতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে? সম্ভবত নয়।

গ্রহের সীমানার (Planetary Boundaries) ধারণাও আমাদের একই ধরনের সতর্কবার্তা দেয়। ২০২৩ সালের এক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে পৃথিবীর নয়টি সীমানার মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষকেরা জানান। অর্থাৎ, মানবসভ্যতা এমন কিছু বাস্তুতান্ত্রিক সীমার (ecological limit) ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে, যার বাইরে গেলে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি আমাদের সম্পদের ব্যবহার দক্ষ করতে পারে, দূষণ কমাতে পারে, নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি আমাদের এমন একটি সীমাহীন পৃথিবী তৈরি করে দিতে পারে না, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ অসীম।

আরেকটি ঝুঁকি হল সবুজ ধোঁকাবাজি (Greenwashing)। কোনও প্রতিষ্ঠান তার মূল উৎপাদনব্যবস্থা ও সম্পদ ব্যবহারের ধরন অপরিবর্তিত রেখে কিছু বৃক্ষরোপণ, কার্বন দূরীকরণ বা সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করলেই কি তাকে স্থায়িত্বশীল বলা যায়? স্থায়িত্বশীলতা যদি পরিবর্তনের পরিবর্তে বিদ্যমান অবস্থাকেই বজায় রাখে, তাহলে শব্দটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থটিই হারিয়ে যাবে। তাই স্থায়িত্বশীলতা মূল্যায়নের সময় অন্তত তিনটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন:

১) কতদিন টিকবে? 

২) পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা খাপ খাওয়াতে পারবে? 

৩) টিকে থাকার প্রক্রিয়ায় আমরা কী হারাচ্ছি? 

তৃতীয় প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া কোনও সমাধান নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কর্মসংস্থান, আয়, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হল, কী ধরনের উন্নয়ন, কার জন্য, কতদিনের জন্য এবং কোন বাস্তুতান্ত্রিক সীমানার মধ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্থায়িত্বশীলতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্কও সামনে আসে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার মূল্য শুধু আমাদের প্রজন্মই দেবে না। নদী দূষিত হলে, মাটি নষ্ট হলে, বন হারালে কিংবা জৈব বৈচিত্র্য কমে গেলে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বহন করবে। সুতরাং, একটি প্রতিষ্ঠান কত বছর টিকে থাকল, একটি ব্যবসা কত বড় হল কিংবা একটি দেশ কত দ্রুত GDP বাড়াল-- এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু একইসঙ্গে জানতে হবে, সেই সাফল্যের বিনিময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির কী হাল দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের Changing Wealth of Nations এই কারণেই GDP-এর পাশাপাশি একটি দেশের উৎপাদিত মানব ও প্রাকৃতিক পুঁজিকে বিবেচনা করে সামগ্রিক সম্পদকে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়। একটি দেশের প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার উৎপাদন ও জীবনযাপনের ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ণ থাকছে তার ওপর। 

সত্যিকারের স্থায়িত্বশীলতা তাই শুধু দীর্ঘদিন টিকে থাকার নাম নয়। এটি এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন, যেখানে আমরা স্বীকার করি যে, আমরা প্রকৃতির মালিক নই, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু একটি কার্যকর অর্থনীতি রেখে যাওয়া যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন একটি পৃথিবীও রেখে যেতে হবে, যেখানে সেই অর্থনীতি এবং মানবজীবনের টিকে থাকার মতো বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে। তাই, স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়তো, 'কীভাবে টিকে থাকব?' নয়; বরং 'আমরা কী টিকিয়ে রাখতে চাই?', কারণ, সব কিছু টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিছু পরিবর্তন করতে হবে, কিছু পুনর্গঠন করতে হবে, কিছু পুরনো ধারণা হয়তো ছেড়েও দিতে হবে। কিন্তু যে বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর আমাদের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, সেগুলোকে রক্ষা ব্যতীত কোনও বিকল্প নেই।


Thursday, 3 September 2026

উত্তম ১০০ (২)

ইতিহাস ও স্মৃতিমেদুরতা

সোমনাথ গুহ



‘উত্তমকুমার বাঙালিবাবু হিসাবে অনন্য’-- মহানায়কের মৃতুর পর পাহাড়প্রমাণ শোকবার্তার মধ্যে বলিউড হিরো রাজেশ খান্নার এই উক্তিটি উল্লেখজনক। ‘বাবু’ বা ‘ভদ্রলোক’ বলতে ঠিক কী বোঝায় তা বহু আলোচিত। সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য ঐতিহাসিক সুমিত সরকার মনে করতেন, শব্দটির পরিসর বহু বিস্তৃত, যাতে ‘ময়মনসিংহের মহারাজা থেকে ইস্ট-ইন্ডিয়া রেলের কেরানি সবাই অন্তর্ভুক্ত’। এর বিস্তৃত বিশ্লেষণে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, শুধু বলার ‘ভদ্রলোক’ ব্যক্তির একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখজনক, প্রায় সর্বজনীন: তাঁরা কায়িক শ্রম করেন না। নিম্নবিত্ত বা নিম্নবর্ণের থেকে এটি হল তাঁদের প্রধান পার্থক্য। শব্দটি মূলত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্প্রদায় হিসাবে উদ্ভব হলেও কালে কালে সাংস্কৃতিক পরম্পরায় রূপান্তরিত হয়। উত্তমকুমার, আজ যাঁর জন্মশতবার্ষিকী (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬), তিনি ছিলেন এই পরম্পরার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, কালচারাল আইকন।  

১৯৪৮ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’। সময়টা যুগান্তকারী: ১৯৪৩'এ মন্বন্তর, তিন বছর বাদে ফেব্রুয়ারিতে রশিদ আলি দিবস, উত্তাল আন্দোলন ও অনেকের মৃত্যু, ছয় মাস বাদে কুখ্যাত কলকাতা দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ ও আরও দাঙ্গা। কলকাতায় বিশেষ করে এবং সারা রাজ্যে উদ্বাস্তুদের ঢল। চারিদিকে খাদ্য, আশ্রয়ের অভাব; বাঙালি বিপন্ন, বিপর্যস্ত, বেঁচে থাকার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এরই মধ্যে এলেন তিনি। সুদর্শন নন কিন্তু মেধাবী; বেপরোয়া মনে হলেও দায়িত্বশীল; কিছু  চরিত্রে ধনী নন কিন্তু ন্যায়পরায়ণ, আবার কোনও চরিত্রে ধনী হলেও সহমর্মী। রোমান্টিক কিন্তু আগ্রাসী নন, বরং মেয়েদের সম্মুখে জড়সড়, দ্বিধাগ্রস্ত। স্মার্ট, বিংশ শতাব্দীর ভদ্রলোক বাঙালির মতো ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, আবার ক্ষেত্র বিশেষে গেঁয়ো, আটপৌরে। আপাত বিরোধী যাবতীয় দোষগুণ নিয়ে তিনি স্ক্রিনে উপস্থিত হলেন। 

১৯৪৯-১৯৫১ তাঁর পরপর কয়েকটি ছবি ফ্লপ। বাজারে নাম হয়ে গেল ফ্লপমাস্টার, সেটে কটূক্তি ভেসে আসত-- ‘পায়ে পাথর বেঁধে রাখ না হলে উড়ে যাবে’। পরের বছর ‘বসু পরিবার’ মুক্তি পেল, তার পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হল না, মহানায়কের পথে অবশেষে তাঁর যাত্রা শুরু। বাঙালি পেল তাঁর ম্যাটিনি আইডল, একই সঙ্গে পাশের ঘরের ছেলে। 

বলাই বাহুল্য, উত্তমকুমার রাতারাতি বাঙালির হৃদয় জয় করেননি। অধ্যবসায় তো ছিলই, আর কিছু গুণ ছিল মজ্জাগত, পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। অভিজাত এবং সাধারণ, এটাই তো ছিল তাঁর পরিবারের বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী আরও অনেক ভদ্রলোক পরিবারের মতো তাঁর গিরীশ মুখার্জি রোডের পরিবারেরও বংশগরিমা ছিল, কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এমন নয় যে তাঁরা দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু ফেলে ছড়িয়ে খাবার মতো অবস্থাও ছিল না। যেটা ছিল, পরিবারের একটি সখের থিয়েটার। তিনি নিজেই লিখেছেন, 'এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে শাড়ি, চাদর, সেফটি পিন এনে উইংস, স্ক্রিন তৈরি হয়ে যেত, কাগজ দিয়ে মুকুট আর রাংতা দিয়ে তলোয়ার, ব্যস শুরু হয়ে গেল নাটক।' তখন থিয়েটারের চেয়ে যাত্রাদলের রমরমা, ছোট উত্তমের যাত্রার মহড়া দেখার প্রবল নেশা। পাড়ার ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে যাত্রার সংলাপ মুখস্থ করতেন, তারপর বাড়িতে এসে আপন মনে সেটা বলে যেতেন। ‘মুকুট’ নাটক দিয়ে হাতেখড়ি, তারপর ক্লাবে, স্কুলে, কলেজে দেদার নাটক করেছেন। পরবর্তী সময়ে স্টার থিয়েটারে ‘শ্যামলী’ তো হিট। পাড়ার ক্লাবের তিনি ছিলেন এক সক্রিয় সদস্য, সমস্ত ধরনের খেলাধুলা করতেন, গানবাজনা করতেন, গানের তালিমও নিয়েছেন, পদ্মপুকুরে বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটতেন। পরে শিক্ষক রেখে উর্দু, হিন্দি শিখেছেন। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন এমনটাও নয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে, হাতে তেরঙ্গা নিয়ে প্রভাত ফেরি করেছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের ফান্ডের জন্য টাকাও তুলেছেন।

কলেজের পাঠ শেষ করে উপলব্ধি করেছেন যে যৌথ পরিবারের হাঁড়ি চালু রাখার জন্য চাকরি করা প্রয়োজন। তখনকার পোর্ট কমিশনার্সে চাকরি করেছেন আর বিভিন্ন স্টুডিও ঘুরে ঘুরে সিনেমায় কোনও মতে চান্স পাবার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন। দিনের পর দিন অফিস কামাই করেছেন, প্রযোজকদের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছেন। অনেক কষ্টে দৈনিক পাঁচ সিকি মজুরিতে ‘মায়াদোর’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে এক্সট্রার কাজ করেছেন, যে ছবি কোনওদিনও মুক্তি পায়নি। এই পর্বে তাঁর দুর্নিবার প্রচেষ্টা রীতিমতো শিক্ষণীয়। 

তাঁর পাড়াগত সক্রিয়তার কারণে ‘পাশের বাড়ির ছেলে’র বৈশিষ্ট্য তাঁর ছিলই। পারিবারিক সূত্রে আভিজাত্য পেয়েছেন, বাকিটা অনুশীলন করেছেন। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো ছবি ‘হারানো সুর’-এ আমরা মহানায়কের এই দুটি ভিন্ন মানসিক রূপ দেখতে পাই। প্রথম অংশে তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট, অসহায়, মহিলা ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় অংশে আত্মবিশ্বাসী, প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক, স্যুট বুট পরা আধুনিক শহুরে মানুষ। 

ফিরে যাই প্রথম হিট ছবি ‘বসু পরিবার’-এ। এখানে সেই আমলের ভদ্রলোক পরিবারের লক্ষণ দেখা যায়। বংশগরিমা আছে কিন্তু যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে। বসুদের যৌথ পরিবারেও একই ধরনের সংকট। পিতা মামলায় হেরে গিয়ে সম্পত্তি হারিয়েছেন। ছোট ছেলে এটর্নি হয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর্থিক অনটনের কারণে পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে। এর মধ্যে সুখেন বাড়ির বড় ছেলে সৎ, দায়িত্বশীল ও মেরুদন্ডসম্পন্ন। সে উপন্যাস লেখে যা ২০,০০০ কপি বিক্রি হয়, বিক্রির টাকা দিয়ে সে বাবার দেনা শোধ করেছে। পরিবারের সদস্যদের পেশা লক্ষণীয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে যেরকম হয়ে থাকে। এটি উত্তমের প্রথম হিট ছবি হলেও তিনি কিন্তু এখানে প্রথাগত নায়ক নন। এই প্রথম আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর অভিনয়ের সুখ্যাতি করা হয়। পরের ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সুপারহিট হলেও উত্তমের নাম কিন্তু ছবির বিজ্ঞাপনে ছিল না। ছবিটি মুক্তি পায় প্যারাডাইস হলে, সেই আমলের অন্যতম সিনেমা হল। বিজ্ঞাপনে এই তথ্য আর তুলসী চক্রবর্তী'র নামোল্লেখ ছিল। এই ছবিতে উত্তম প্রায় এক অনিচ্ছুক প্রেমিক, মনে ষোলআনা ইচ্ছা কিন্তু সুচিত্রার সামনে পড়লেই থতমত। 

অন্তত প্রথম দিককার ছবিতে প্রেমিক হিসাবে এটাই উত্তমের ইউএসপি। কোমল, সূক্ষ্ম, উদার, মৃদুভাষী, অনেক সময়ই আড়ষ্ট, অনিশ্চিত; বলিউডি হিরোদের মতো একদমই ম্যাচো নয়, বরং কিঞ্চিৎ নারীসুলভ। মেস-এ একগাদা ব্যাচেলার ছেলের মধ্যে সেও একজন, আর তার প্রতিই সুচিত্রার আকর্ষণ। এটা একদম টিভি আগমনের আগে বাঙালি পাড়ায় ছেলেমেয়েদের টিপিক্যাল প্রেম। পরস্পরের চোখাচুখি, আচমকা মুখোমুখি আর নিরন্তর চিঠি চালাচালি। সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে বরং যেটা বিস্ময়কর সেটা হল রমলার (সুচিত্রা) অনায়াস বিচরণ, তার সাবলীলতা। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির কাহিনি তাপসীর পরীক্ষা ছাড়াও কিরীটিরও পরীক্ষা। তার সিদ্ধান্তহীনতা, সমাজ কী চোখে ঘটনাটা দেখবে তা নিয়ে তার দ্বিধা, তাপসীকে প্ররোচিত করে বলতে কেন সে যেটা চায় সেটা ছলেবলে কৌশলে করায়ত্ত করতে পারে না। সে যুক্তি দেয় শুধুমাত্র বলিষ্ঠরাই ভোগ করতে পারে। এর উত্তরে কিরীটি যা বলে সেটাই প্রেমিক চরিত্রে উত্তমের মৌলিক, অনন্য রূপ যা তাঁকে আপামর বাঙালির কাছে এত প্রিয় করে তুলেছে। কিরীটি বলে, বলপ্রয়োগ করে কিছু হয় না, তপস্বীর মতো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। দেহমনের আকাঙ্ক্ষা সংযত করতে হবে, তিতিক্ষা, ধৈর্য, সংযম অর্জন করতে হবে। 

নায়কের প্রথম দশ বছরের অন্যতম সেরা ছবি অবশ্যই ‘সপ্তপদী’। এটা ষাটের দশকের শুরুর ছবি। উত্তম-সুচিত্রা তখন জুটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনের মধ্যে রসায়ন আড়ষ্ঠতাহীন, সাবলীল, আবেগপ্রবণ। আগের ছবিগুলির তুলনায় এখানে প্রেম অনেক উদ্দাম, বাঁধনছাড়া। দুজনে একই কলেজের শিক্ষার্থী, দুজনেই মেধাবী এবং গুণী, তাই তাদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য। বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। কৃষ্ণেন্দু কট্টর ব্রাহ্মণ ঘরের ছেলে, রীনা খ্রিস্টান। এখানেই ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে যে দ্বন্দ্ব তা ফিরে আসে: সংস্কার, সমাজের প্রতি আনুগত্য না সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলোকপ্রাপ্ত হওয়া। এই ছবিতে কিছুটা গোঁজামিল দিয়ে তার সমাধান হয়, কিন্তু ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ধর্মের বাধা অতিক্রম করে তাদের প্রেম মহিমান্বিত হয়। 

স্বাধীনতা-উত্তর পরের কয়েক দশকে বাঙালি সমাজের নারী-পুরুষ সম্পর্ক ভিক্টোরিয়ান মুল্যবোধে প্রভাবিত। প্রেম হতে পারে কিন্তু তা সংযমী, দায়িত্বশীল হতে হবে, পরিবারের কর্তৃত্ব, সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্কে এই মূল্যবোধের সাথে আধুনিকতার মিশেল ঘটেছে। যেমন আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’-এর চল ছিল। তথাকথিত লাভ-ম্যারেজ ছিল ব্যতিক্রম, বেশ সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা। এই জুটি এই বেড়াজাল ভেঙে দিল। রোমান্স শব্দটা বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে প্রবেশ করল। আবার নারী শুধুমাত্র গৃহিণী ছিল না, শিক্ষিতা তো বটেই, বাকপটু, কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টবক্তা। চলচ্চিত্র যদি সমাজের প্রতিফলন হয় তাহলে আজকে নারীর আরও অগ্রগতি এবং কর্মক্ষেত্রে অধিক উপস্থিতি থাকার কথা ছিল; অপর দিকে পুরুষ কম পিতৃতান্ত্রিক, অধিক কোমল এবং অনুভুতিপ্রবণ। বাংলা সিনেমার নিরিখে পিতৃতন্ত্রের দাপট আদৌ কমেনি, বেড়েছে।  

এতগুলি দশক পেরিয়ে আজ এইসব ছবি দেখলে ধাক্কা লাগে, বঙ্কিমের গদ্য পড়তে যেরকম ধাক্কা লাগে। যৌথ পরিবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরিবর্তনটা শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংলাপ, ভাবভঙ্গি অতি-নাটুকে লাগে। প্রেম আর শুধু ক্ষণিকের চাহনি নয়, সম্পর্ক বছরের পর বছর অপেক্ষা নয়। তবুও মানসপটে আঁকা ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ স্মৃতিতে ধূসর হয়ে থাকে, বাঙালি জীবনের কয়েক দশকের এক টুকরো ইতিহাস যার অবিসংবাদিত নায়ক হলেন উত্তমকুমার।


Wednesday, 2 September 2026

উত্তম ১০০ (১)

বাঙালিয়ানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তরাধিকার

বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়


(৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ - ২৪ জুলাই ১৯৮০)


বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজ যখন নিজের চেনা নৈতিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে ফিরছিল, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে মহানায়ক উত্তমকুমারের। আজ বহু দশক পরেও বাঙালির পারিবারিক সৌহার্দ্য, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে কোনও আলোচনায় উত্তমকুমার এক অনন্য ও অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন।

মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ডের আখ্যান

বাঙালিয়ানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান তার মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধ। অভাব বা প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সহজাত চারিত্রিক দৃঢ়তা, তাকে উত্তমকুমার পর্দায় এক মহৎ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সমাজব্যবস্থায় যখন পুঁজিবাদ ও নৈতিক স্খলনের চোরাস্রোত চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা বাঙালির সৎ ও আদর্শবাদী সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

'বিচারক' চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। এই ছবিতে একজন জজের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট, তাঁর নিজের অতীত ভুলের সঙ্গে বর্তমান বিবেকের যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তাকে উত্তম অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার 'থানা থেকে আসছি' ছবিতে এক রহস্যময় তদন্তকারী অফিসারের চরিত্রে তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ অভিনয় সমাজের উচ্চবিত্ত ও কপট শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াপনাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। উত্তমকুমার বাঙালি পুরুষকে শিখিয়েছিলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্থবিত্ত নয়, একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার সততা, নীতিবোধ এবং সোজা মেরুদণ্ডের মধ্যে। তিনি যখন পর্দায় কোনও আদর্শবাদী ডাক্তার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইঞ্জিনিয়ার বা সৎ কেরানির চরিত্রে অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতেন, তখন সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদমিত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠত।

পারিবারিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার যৌথ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, বড়দের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি অপত্য স্নেহ এবং ত্যাগের মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে একটি আদর্শ বাঙালি পরিবার। উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পারিবারিক মূল্যবোধের উদযাপন।

'মৌচাক' ছবিতে ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া এক বড় ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় ছিল অনবদ্য। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না অতি-নাটকীয়তা। গুরুজনদের সামনে তাঁর বিনীত শারীরিক ভাষা, ছোট ভাইদের শাসন করার পাশাপাশি তাদের আগলে রাখার যে নির্ভরতা— তা ছিল চিরাচরিত বাঙালি সমাজব্যবস্থার আসল প্রতিচ্ছবি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা চারপাশকে গ্রাস করছে, পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তমের এই ছবিগুলো আমাদের যৌথ পরিবারের সেই সুবর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ত্যাগই ছিল আনন্দের মূল উৎস।

'মানুষ' হয়ে ওঠার লড়াই

বাঙালির মজ্জাগত মূল্যবোধে ব্যক্তির স্বার্থপরতাকে সবসময় নিকৃষ্ট মনে করা হয়েছে এবং লোককল্যাণ বা পরোপকারকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। উত্তমকুমারের বহু চরিত্র এই মানবিক দর্শনের সার্থক রূপায়ণ।

এই প্রসঙ্গে 'অমানুষ' চলচ্চিত্রের মধুসূদন বা 'মধু' চরিত্রটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও কুৎসায় জর্জরিত হয়ে এক সময়ের সৎ ও আদর্শবাদী জমিদারপুত্র যখন মদ্যপ ও সমাজ-পরিত্যক্ত এক রুক্ষ মানুষে পরিণত হয়, তখনও তার ভেতরের আসল মানবিকতা ও পরোপকারী সত্তাটি মরে যায় না। ঝড়ের রাতে বাঁধ ভেঙে যখন গোটা গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে মধুর সেই মরণপণ লড়াই আসলে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে ফুটিয়ে তোলে। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাইরের খোলসটি যতই মলিন বা রুক্ষ হোক না কেন, মানুষের ভেতরের আসল মূল্যবোধ যদি খাঁটি থাকে তবে সে সমাজকে এক নতুন পথ দেখাতে পারে। একইভাবে 'আনন্দ আশ্রম' বা 'ধন্যি মেয়ে' ছবিতেও তাঁর চরিত্রগুলো ছিল মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর এক একটি জীবন্ত উদাহরণ।

প্রেমের গরিমা

বাঙালির প্রেমের ব্যাকরণ চিরকালই অত্যন্ত মার্জিত, নান্দনিক ও আত্মিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। উত্তমকুমার রূপোলি পর্দায় প্রেমের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন, তাতে শরীরী আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গরিমা ও একাত্মতা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'সাগরিকা' বা 'অগ্নিপরীক্ষা'— প্রতিটি ছবিতেই উত্তমকুমারের চরিত্রগুলো ছিল নারীর প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রেমিক হিসেবে কখনও আগ্রাসী বা অধিকারপ্রমত্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন পরম আশ্রয়দাতা ও ছায়াসঙ্গী। নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই ভুবন ভোলানো মৃদু হাসি, কথা বলার সময় অপরিসীম ভদ্রতা এবং ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য নিজের অহংকার বা সুখ বিসর্জন দেওয়ার অভিব্যক্তি বাঙালি যুবসমাজকে এক গভীর রুচিসম্পন্ন প্রেমের পাঠ দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, প্রেম মানে কেবল অধিকার করা নয়, প্রেম মানে অপর মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়ে আপন করে নেওয়া। এই কারণে তাঁর রোমান্টিক চরিত্রগুলো আজও বাঙালির প্রেমের চিরন্তন ও পরিশীলিত আদর্শ হয়ে রয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বাঙালি মননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্ম, জাতপাত বা সংস্কৃতির কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার যে ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত, উত্তম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চেতনার এক ঐতিহাসিক জয়গান গেয়েছিলেন।

'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' চলচ্চিত্রটি এই ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। একজন পর্তুগিজ সংস্কৃতির মানুষ হয়েও হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি কীভাবে বাংলার মাটি, বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং কবিগানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এক নিপাট বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন— পর্দায় সেই রূপান্তরের কারিগর উত্তম। ভোলানাথ ময়রার সঙ্গে কবিগানের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর মুখাবয়বের সেই ঐশ্বরিক ভক্তি এবং গম্ভীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— 'খ্রিষ্ট আর কৃষ্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই', তখন তা কেবল ছবির সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বাংলার সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর ইশতেহার। তৎকালীন দাঙ্গা-পরবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে অস্থির বাংলার বুকে উত্তমের এই রূপায়ণ এক গভীর সামাজিক ক্ষতে মলম লাগানোর কাজ করেছিল এবং প্রমাণ দিয়েছিল যে বাঙালিয়ানা কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

'নায়ক'-এর আত্মদর্শন

সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও একজন মানুষের নিজের শিকড়, নৈতিকতা এবং বিবেকের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকা উচিত, তার এক মননশীল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে উত্তম মূলত নিজের জীবনেরই এক সমান্তরাল চরিত্র 'অরিন্দম মুখার্জী'-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খ্যাতির চরম চূড়ায় বসে থাকা একজন সুপারস্টারের ভেতরের একাকীত্ব, তাঁর অতীত জীবনের আদর্শচ্যুতির ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের বিবেককে টিকিয়ে রাখার যে ছটফটানি— তা উত্তম যে ভাবে তাঁর চোখের পলক, ঠোঁটের কোণের বিষাদ ও শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ট্রেনের কামরায় এক তরুণী সাংবাদিকের কাছে অভিনয় গুণে নিজের ভেতরের সব গ্লানি, পাপবোধ ও দুর্বলতা উজাড় করে দেওয়ার দৃশ্যটি উন্মোচিত করে, সাফল্য বা গ্ল্যামার মানুষের শেষ কথা হতে পারে না; নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। উত্তমের এই মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বাঙালি সমাজকে এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

কেন আজও উত্তমের বিকল্প নেই?

আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক হাই-টেক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ভাষা ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে চরম যান্ত্রিকতা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও বাঙালির নৈতিক অবচেতনে ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উত্তম আজও এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা। কারণ, উত্তম কেবল সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি কোনও অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির নিজস্ব মূল্যবোধের এক পরম বিশ্বস্ত অভিভাবক।

যখনই বাঙালি সমাজ কোনও নৈতিক সংকটে ভোগে, পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে বা যান্ত্রিকতার ভিড়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরে পেতে চায়, তখনই তারা ফিরে যায় উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের সেই মায়াবী আশ্রয়ে। তাঁর সেই প্রাণখোলা ভুবন ভোলানো হাসি, ধুতি-পাঞ্জাবির আভিজাত্য, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই চিরচেনা রূপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, সততা, পরিবার, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং আত্মমর্যাদাই হল একজন খাঁটি মানুষের আসল পরিচয়। 

যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালিয়ানা তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে, ততদিন বাঙালির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমারের এই অনন্য দৃষ্টান্ত চিরকাল অম্লান ও অতুলনীয় হয়ে থাকবে।


Tuesday, 1 September 2026

ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র

ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


In This World

রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।

এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।

এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'  (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।

রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।

২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।

সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।


Sunday, 30 August 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মসংস্থান

আশা না নিরাশা?

রাজীব ভট্টাচার্য



বিশ্ব শ্রম সংগঠন বা আইএলও'র সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে অনিশ্চয়তা সূচক (যা মূলত আর্থিক ও নীতি নির্ধারণকারী ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল) ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ থেকে অভূতপূর্ব স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে মন্দা ও কোম্পানিতে নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস এবং ভোগব্যয়কে দুর্বল করে দিতে পারে। সর্বোপরি, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাবে ক্ষতির ঝুঁকি শ্রমের বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

উচ্চশিক্ষা উন্নত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশার সম্ভাবনা জাগালেও, তা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই বেকারত্ব হ্রাসে অক্ষম। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারের চাইতে কম। কিন্তু এই চিত্রটি অপেক্ষাকৃত অল্প আয় বা মধ্য আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে একইরকম নয়। এই সমস্ত দেশগুলিতে স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেওয়ার হার যথেষ্টই কম। বর্তমানে এর সঙ্গে জুড়েছে তরুণ প্রজন্মের চাকরিজীবীদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বিশেষ করে প্রথমবার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণকারী উচ্চ দক্ষ পেশার ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসাহের মূল কারণ হল, দ্রুত হারে গণনার খরচ হ্রাস পাওয়া। ফলে, গণনার ক্ষমতা এবং তথ্য সঞ্চয় ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং)। তাছাড়া বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত হারে প্রয়োগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের পথকে প্রশস্ত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় দ্রুত হারে হ্রাস পাওয়াতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করে উচ্চশিক্ষিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বাজারে জোগান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে ।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এসি মোগলু এবং রেস্ট্রেপো (২০১৮) কর্মসংস্থানের বাজারের উপর এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন: 

(ক) স্থানচ্যুতি প্রভাব বা ডিসপ্লেসমেন্ট ইফেক্ট; 

(খ) উৎপাদনশীলতা প্রভাব বা প্রোডাক্টিভিটি এফেক্ট এবং 

(গ) দক্ষতা সম্পূরক প্রভাব বা স্কিল কম্প্লিমেন্টারিটি এফেক্ট। 

স্থানচ্যুতি প্রভাব সরাসরি নতুন প্রযুক্তির শ্রমিক দ্বারা পুরাতন শ্রমিকদের প্রতিস্থাপনকেই বোঝায়। এই প্রভাবের ফলে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় প্রভাবটি এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার ফলে এই দক্ষতায় পারদর্শী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া যা শ্রমের বাজারকে উদ্বুদ্ধ করবে। তৃতীয় প্রভাবটি মানুষ ও যন্ত্রের পরস্পরের প্রতি সম্পূরক সম্পর্কের কথা বোঝায়। এই নতুন প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান প্রতিস্থাপিত না করে যদি তার সম্পূরক হয়ে উঠতে পারে তবে তা নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই তিনটি প্রভাবের মধ্যে প্রথম প্রভাবটি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব দুটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি শেষ দুটি প্রভাব প্রথম প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে।

ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি টিসিএস সম্প্রতি ২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৩,৪৬০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে, যার মূল কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিবিড় প্রয়োগ। ওরাকেল'এর মতো বিশ্ব বিখ্যাত আইটি কোম্পানিও প্রায় ১২,০০০ কর্মীকে ওই একই কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং ইনফোসিস এর মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও।এই কোম্পানিগুলি দক্ষতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ায় গতানুগতিক কাজ, কোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সম্পন্ন করতেই বেশি আগ্রহী। তাই দৈত্যাকার আইটি কোম্পানিগুলি ছাড়াও অ্যামাজন (গত ৬ মাসে ৩০ হাজার), ব্লক (৪০০০'এর বেশি), ড্রপবক্স (৫০০'এর বেশি) কর্মচারী ছাঁটায়ের পথে হেঁটেছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীদের বেকারত্ব তাদের মনোবলে আঘাত হানবে, কোম্পানির প্রতি আনুগত্যকে দুর্বল করবে এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের অবক্ষয় বৃদ্ধি করবে। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'এর মতে, কর্মহীন ইঞ্জিনিয়ার ও দ্রব্য পরিচালনকারীরা দ্রুত নতুন স্বাধীন বিনিয়োগ বা স্বতন্ত্র উদ্যোগে উদ্যোগী হবে। আবার অনেকের মতে, এই বেকারত্বের মূল কারণ সীমিত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা-জোগানের অমিল। যদি ভারতীয় অর্থনীতি এর সঙ্গে নিজেকে মানানসই না করে তুলতে পারে তাহলে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার সাথে সেবার রফতানি হ্রাস পাবে ও শহরাঞ্চলের ব্যয়ের গতিও মন্থর হবে। এর ফলে ভারতবর্ষ সেই পূর্ববর্তী মধ্য-আয় বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। ফলস্বরূপ, ভারতের বেকারত্বের হার এপ্রিল ২০২৫'এ ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৬.৯ শতাংশ এবং জুন মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭.১ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক যুব বেকারত্ব মে মাসে ১৭.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশ।

টেসলা এবং স্পেস এক্স'এর কর্ণধার এলন মাস্ক'এর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজকে একটি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করবে এবং সম্ভবত আমাদের কারওরই সেই অর্থে আর কাজ থাকবে না। এনথ্রপিক'এর সহ প্রতিষ্ঠাতা দাড়িও আমোদেই এর মতে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট কলার কর্মীরা তাদের চাকরি হারাবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা জিওরজিয়েভার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুনামি সারা পৃথিবীতে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকের এক বিরাট অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের (যেমন স্টিম ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ শক্তি দ্বারা যন্ত্র চালিত তাঁত, মোটর যানবাহন, বেতার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট) চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব অনেকাংশেই আলাদা। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যত সংখ্যক কর্মসংস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তার থেকে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তাই স্থায়ী প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ধারণাটি কখনই বাস্তবায়িত হয়নি। 

জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল লক্ষ্য হল, অনিয়মিত জ্ঞানীয় কাজ (non-routine cognitive task) অর্থাৎ প্রতিদিনের বাঁধা-ধরা নিয়মের বাইরে যে সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতার প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের উচ্চ সারির দক্ষতাযুক্ত কাজগুলিকে অতি দ্রুত এবং ব্যাপক আকারে প্রতিস্থাপিত করা ও দ্রুতগতিতে তার উন্নতি করা। অনেকের মতে, এর ফলে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। অতি সম্প্রতি ICRIER (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভারতের দশটি শহরে ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের উপর জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের ধারণা পাওয়া। এই সমীক্ষাটি কিন্তু ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশাল আকারে কর্মসংস্থান হারানোর ধারণার পরিপন্থী। বরং নতুন প্রযুক্তিকে ভিন্ন আকারে ঢেলে সাজানো বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে উন্নততর কাজে নিয়োগেরই নিদর্শন দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে খরচ, প্রতিভার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কারণে।

নীতি আয়োগ'এর সাম্প্রতিকতম একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫'এর মাঝামাঝি প্রায় ৭৮,০০০ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ হারিয়েছেন (প্রায় ৫০০ মানুষ প্রতিদিন)। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছাঁটাই অথবা নতুন কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কারণে আইবিএম, মাইক্রোসফট, সিটি ব্যাংক গ্রুপ, জিপি মরগান, গোল্ডম্যান স্যাক্স'এর মতো সংস্থাগুলি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের মতে, ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, মানব প্রতিনিধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যমণি। শিল্প, সেবা, অর্থ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার বিরাট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মানের যে মডেলগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে নিরাপত্তার দিকটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যাপক কৌশলের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নীতি আয়োগের লক্ষ্য তিনটি মূল স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল- 

(ক) বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় সমস্ত স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত হারে প্রসার;

(খ) ভারতকে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক আকর্ষণীয় পীঠস্থান হিসেবে উন্নীত করা ও 

(গ) বিরাট মাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বা নৈপুূণ্য বৃদ্ধির কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা যার মূল উদ্দেশ্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া। 

তাই এখন দেখার, বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য যে পরিকল্পনাগুলি নেওয়া হয়েছে তার দ্রুত রূপায়ণের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে প্রতিস্থাপক নাকি পরিপূরক কোনও ভূমিকা পালন করে।


Friday, 28 August 2026

আদিত্য কুমারের খোয়াইশ

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।

আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।

সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।

কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন। 

এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।

যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।

তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই। 

বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!


Thursday, 20 August 2026

কে পরবাসী নয়?

স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


 

কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।  

ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।  

তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।  

তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ। 

তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে। 

তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ  ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।

এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।

কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক  'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর  ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।

আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।

তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে  ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।

কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত  কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।

আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।