Thursday, 30 July 2026

প্রজন্মের আর্তনাদ

পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা চাই

সোমা চ্যাটার্জি



গত সপ্তাহে দিল্লীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে সমাজমাধ্যমে যে রিলসের বন্যা বয়ে গেছে, তার সব কটিই মন ছোঁয়া হলেও একটি আমাকে খুব ব্যক্তিগত ভাবে স্পর্শ করেছে। ওই ভিডিওটিতে দেখাচ্ছিল যে, একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কেঁদে কেঁদে হিন্দিতে বলছেন, 'আভি হমারে বাচ্চো কে ভবিষ্যৎ কে লিয়ে হমে ভিখ মাঙ্গনা পারেগা ক্যা?' অর্থাৎ, আমাদের কি এখন নিজেদের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য ভিক্ষে করতে হবে?

CBSE বোর্ডের ক্লাস নাইনের ছাত্রের এক অভিভাবক হিসেবে আমাকে এই কথাটি বিশেষ ভাবে নাড়া দিয়েছে। কারণ, আগামী বছরগুলিতে আসন্ন CBSE পরীক্ষার্থীদের যে উৎকন্ঠা বা উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে তাতে এদের ভবিষ্যতে আশার আলো যে বিশেষ নেই তা বোঝা কঠিন নয় এবং আমাদের মতো অভিভাবকদেরও যে নিজেদের দাবি-দাওয়ার জন্য পথে নামতে হবে না, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। 

কিন্তু কেন এই উদ্বেগ ? 

নতুন শিক্ষানীতি (NEP 2020)'কে সামনে রেখে CBSE যে শিক্ষাপদ্ধতি ও সিলেবাসে বদল আনছে, তা তত্ত্বে ভালো শোনালেও বাস্তবে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। নতুন শিক্ষানীতি, বিভ্রান্তিকর সিলেবাস আর বইহীন ক্লাসরুম-- এই সাঁড়াশি সমস্যায় ছাত্ররা জর্জরিত। পরীক্ষার দু' মাস আগে সিলেবাস বদল, বই নেই, আবার তৃতীয় ভাষাও নিতে হবে-- ক্লাস নাইনের এই চিত্রই আজ সারা দেশে CBSE-র বাস্তব ছবি। 

এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ফাঁক হল, পরিকল্পনা আছে প্রস্তুতি নেই, সবই 'উপর থেকে চাপানো সিদ্ধান্ত, নিচে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনও প্রস্তুতি নেই'। যেমন, শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে এসে বিষয় কমানো বা বাড়ানো, ছাত্র-শিক্ষক কেউ বুঝতে পারছে না কী পড়বে। নীতি আগে বই পরে-- এটাই এই ব্যবস্থার  বড় ত্রুটি। NEP চালুর কথা ঘোষণা হল কিন্তু বই ছাপা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি কিছুই সময় মতো হল না। তাছাড়া স্কুলগুলিতে সব নির্দেশাবলীর তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও যোগাযোগের চরম অভাব। CBSE-এর সার্কুলার স্কুল পর্যন্ত পৌঁছতে অনেক সময় লাগে এবং সব কিছুই অভিভাবক ও ছাত্ররা শেষ মুহূর্তে জানতে পারে। এদিকে মুখে বা নীতিতে এক দেশ, এক সিলেবাস কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এক বই নয়। সরকারি স্কুলে জুলাই-অগস্টে বই পাওয়া যায় অথচ বেসরকারি স্কুলে এপ্রিলেই বই আসছে। কোথা থেকে আসছে তার কোনও উত্তর নেই। বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

আরও বড় গ্যাঁড়াকল হল Competency Based Education-- অর্থাৎ, 'মুখস্থ'বিদ্যা বাদ দিয়ে Competency Based Learning শুরু করো। ভালো কথা, ছাত্ররা প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে  নয়, প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিখবে। Case study, HOTS (Higher Order Thinking Skills)'এর প্রশ্ন বাড়বে। ছাত্ররা 'কেন' এবং 'কীভাবে' শিখবে, শুধু 'কী' নয়। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকরা নিজেরাই এই নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত নন। দু' দিনের অনলাইন ওয়ার্কশপে কি ২০ বছরের পড়ানোর অভ্যাস বদলানো যায়? স্কুলে পর্যাপ্ত ক্লাস হয় না, শিক্ষক-শিক্ষিকারা সব সময়ই ট্রেনিং নিতে ব্যস্ত। প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন বদলালেও বই ও গাইড বই এখনও পুরনো ধাঁচের। যার ফলে ছাত্ররা না পারছে পুরনো নিয়মে পড়তে, না পারছে নতুন নিয়মে ভাবতে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, যাদের বাচ্চারা ক্লাস নাইনে পড়ছে তারাই বিভ্রান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ, এই ক্লাসের ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে এক ত্রিভুজ সংকটে। যেমন,

১) বইয়ের চরম অভাব: নতুন সিলেবাস অনুযায়ী SST-এর চারটি বিষয়কে এক করে নতুন বই আসার কথা ছিল শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই। কিন্তু জুলাই মাস শেষ হয়ে গেল, বাজারে বই নেই। সব স্কুলেই প্রথম নির্ধারক পরীক্ষা (First Periodic Assessment) হয়ে গেছে, গরমের ছুটির সময়েও বই ছিল না, এদিকে স্কুল খুললেই পরীক্ষা। কোনও স্কুল PDF দিচ্ছে, কেউ বলছে ফটোকপি করিয়ে নাও। প্রত্যন্ত বা গ্রামের ছাত্র যাদের ইন্টারনেট নেই সে কী করবে? 

২) ৬ষ্ঠ বিষয়ের বদল: আগে ৫টি মূল বিষয় + ৬ষ্ঠ বিষয় হিসেবে Computer, Sanskrit, Art Education ইত্যাদি ঐচ্ছিক ছিল। এখন অনেক স্কুলে হঠাৎ করে ৬ষ্ঠ বিষয় বদলে দেওয়া হচ্ছে। যে ছাত্র অষ্টম শ্রেণি অবধি Computer পড়েছে, নাইনে এসে তাকে Skill Subject নিতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাতে কলমে কৃষিকাজও শেখানো হবে। কিন্তু জায়গা কোথায়? জমি কে দেবে? তার কোনও নির্দেশিকা নেই। শুধুমাত্র  এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত চারবার ৬ষ্ঠ বদল করেছে CBSE বোর্ড। সুতরাং, ভবিষ্যতের stream selection ঝুঁকির মুখে। ফলে, যে ছাত্র কম্পিউটার নিয়ে ভবিষ্যতে পড়ার স্বপ্ন দেখত, তার স্বপ্নও বিঁশ বাও জলে।

৩) Third Language (তৃতীয় ভাষার) বাধ্যবাধকতা: NEP অনুযায়ী ক্লাস 9-10'এ ৩টি ভাষা বাধ্যতামূলক। হিন্দি, ইংরেজির সঙ্গে এখন তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মানি, বাংলা, উড়িয়া ইত্যাদি নিতে হচ্ছে। সমস্যা হল, অনেক স্কুলে তৃতীয় ভাষার শিক্ষকই নেই। ছাত্ররা ৮ বছর ধরে দুটি ভাষা পড়ে এসে হঠাৎ তৃতীয় একটি নতুন ভাষা কীভাবে রপ্ত করবে? বোর্ডের পরীক্ষায় এই বিষয়ের নম্বর যোগ হবে কিনা, তা নিয়েও স্পষ্টতা নেই। ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই 'দিশেহারা-- পরীক্ষায় কী আসবে? বই তো নেই; তৃতীয় ভাষায় ফেল করলে কী হবে?' এই প্রশ্নেই সবাই জেরবার। 

আরও মারাত্মক হল, পরীক্ষার খাতা অভিভাবকদের দেখতে না দেওয়া। তার ফলে আমাদের বোঝার ক্ষমতা নেই যে নম্বর ঠিক দেওয়া হচ্ছে কিনা বা কোন প্রশ্নের উত্তর কেমন ভাবে লিখে কত নম্বর পাওয়া যাবে। স্কুল বলছে, বোর্ডের নির্দেশ বাচ্চাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে যাতে তারা নিজেদের Assessment নিজেরাই করতে পারে। তা বলে সেটা এই ডামাডোলের মধ্যেই? বই নেই, সিলেবাস বদল, এই অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেই সেটা করতে হবে?

শিক্ষকদের সমস্যা আরও ভয়ঙ্কর। পুরনো বই দিয়ে নতুন সিলেবাস মেলাতে হচ্ছে। নতুন পেডাগগির জন্য workshop-এর চাপও আছে। ফলে, পড়ানোর সময় কম, paper work বেশি, অতএব অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে  দ্বিগুণ কোচিং ফি দিয়ে বাচ্চাকে ভরতি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, স্কুলে যা হচ্ছে তাতে  ভরসা রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্যর কারণে বেশির ভাগ মেধাবী ছাত্রদেরই পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে, অনীহা দেখা দিছে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রতি বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছাত্র এবং অভিভাবক দুজনেই এতকাল বেসরকারি বা প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে সুবিধা হবে বলে মোটা মাইনের বেসরকারি CBSE স্কুলের উপরই ভরসা করে এসেছিলেন। কিন্তু এখন সেখানেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিত্য নতুন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। অনেক ছাত্রই মানসিক অবসাদে ভুগছে। 

NEP 2020-এর লক্ষ্য শিক্ষার কেন্দ্রিকরণ, যাতে গ্লোবাল, যুক্তিবাদী, দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা যায়। কিন্তু রাস্তা যদি গর্তে ভরা হয়, তাহলে গাড়ি যতই ভালো হোক গন্তব্যে পৌঁছবে না। ভারতের মতো বৈচিত্রপূর্ণ  দেশে 'এক শিক্ষানীতি' কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সব আলাদা। তাই কেন্দ্রে বসে এক সিলেবাসে ১৪০ কোটি ছাত্রকে না পড়িয়ে শিক্ষানীতির বিকেন্দ্রিকরণ করলে স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি শিল্প, ভাষা, সংস্কৃতির মধ্যে একটা সুসংহত মেলবন্ধন ঘটবে। যখন প্রতিটি রাজ্য নিজের মতো করে শিক্ষা মডেল বানাবে, তখন হিমাচল-কেরালা-পশ্চিমবঙ্গ একে অপরের থেকে শিখবে। বিকেন্দ্রিকরণ মানে 'ভেঙে দেওয়া' নয়। বরং 'সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগোনো'। সমবায়ী যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ছাঁচে শিক্ষানীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে-- পুরো বিকেন্দ্রিকরণও হবে না আবার কেন্দ্রের দায়িত্বও থাকবে, যেমন NCERT Framework, শিক্ষার ন্যূনতম মান, জাতীয় পরীক্ষা, স্কলারশিপ, শিক্ষক ট্রেনিং, টাকা দেওয়া ও তার যথোপযুক্ত ব্যবহার হছে কিনা তা দেখা ও পরিদর্শন করা।

তবে সবার প্রথমেই দরকার প্রস্তুতি, যাতে ছাত্ররা বই, ভাষা ও সিলেবাসের জাঁতাকলে আটকে না পড়ে। যেমন, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মার্চের মধ্যে বই, সিলেবাস ও নমুনা প্রশ্নপত্র প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা,  মাঝপথে সিলেবাস কাটছাঁট না করা, বই ও শিক্ষকের নিশ্চয়তা স্থাপন, এপ্রিলের মধ্যে প্রতিটি স্কুলে বই পৌঁছে দেওয়া, খালি শিক্ষকের পদ তিন মাসের মধ্যে পূরণ, তৃতীয় ভাষার জন্য শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তা ঐচ্ছিক রাখা, কোচিং মাফিয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। ধাপে ধাপে পরিবর্তন করা যাতে ছাত্ররা দিশেহারা বোধ না করে। প্রতি বছর একটি করে পরিবর্তন আনা। বই ও ডিজিটাল দুটোই পাশাপাশি চলুক, কিন্তু বইয়ের বিকল্প হিসেবে নয়। সর্বোপরি, সিলেবাস ও নীতি তৈরির সময় ছাত্র প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। সার্কুলার নয়, এক মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় CBSE-এর Mentor Teacher নিয়োগ করতে হবে, প্রতিটি ব্লকে দিতে হবে বিনামূল্যে বই।

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে 'উপর থেকে হুকুম, নিচে কে ভুগছে কেউ দেখে না'— এই মানসিকতা থেকেই এই আন্দোলনের উত্থান। NEET পেপার ফাঁসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার পচন— পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং ছাত্রদের প্রতি উদাসীনতা। দেশের পনেরোটি শহরে CJP-র প্রতিবাদের মূল স্লোগান ছিল 'বই দো, শিক্ষক দো, ভবিষ্যৎ বাঁচাও'। শিক্ষা ব্যবসা নয়, আমাদের অধিকার-- এই দাবিতেই প্রতীকীভাবে তারা ছেঁড়া বই, খালি ব্যাগ নিয়ে মিছিল করেছে; বলেছে, 'আমাদের হাতে বই নেই, তাই খালি ব্যাগ নিয়েই স্কুল যাচ্ছি।' 

যখন সিস্টেম ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তাই শেষ কথা। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ তাই একটা প্রজন্মের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। কে বলতে পারে, আমাদের বাচ্চারা যারা আজ  সরকারি শিক্ষানীতির জাঁতাকলে ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারাই আবার কোনদিন ইঁদুরের আন্দোলন সংঘটিত করবে কি না!


2 comments:

  1. লেখাটি খুব বাস্তব সমস্যাকে তুলে ধরেছে । সমস্যা হলো স্বাধীন ভারতে কোনো সরকার দেশের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত নয় । তাই স্কুল হোক বা কলেজ যখনই তারা কোনো পরিবর্তন আনতে চায় সেখানে যত ভালো ভালো কথাই লেখা থাকুক , তার প্রয়োগের কোনও বাস্তব চিন্তা থাকেই না। স্কুল থাকুক ছেলেমেয়েরা শিখুক এটা তারা চায় না । এটাই আসল কথা । না হলে ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মত একটা সিলেবাস পাঠিয়ে দিলেই হলো । স্কুলগুলো এখন সপ্তাহে সব ক্লাস নেওয়া হয় না শুনলাম ।সেভাবেই এখন রুটিন তৈরি হচ্ছে। আমার এক আত্মীয় বলল ওর ছেলে সিবিএসই বোর্ডে এইচ এর পড়ে । তিনদিন স্কুলে যায় । বাকি তিনদিন + রবিবার তারা প্রাইভেট টিউশন পড়বে।কাজেই । স্কুল একটা নাম লেখানোর জায়গা । এগুলো সব ওপেন সিক্রেট ব্যাপার ।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লেখা। আমার সহকর্মীদের ছেলে মেয়েরা এক ই সমস্যায় ভুগছে। সব অভিভাবকরা চিন্তিত এবং অবাক যে সারা দেশব্যাপী এই বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

    ReplyDelete