Wednesday, 2 September 2026

উত্তম ১০০ (১)

বাঙালিয়ানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তরাধিকার

বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়


(৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ - ২৪ জুলাই ১৯৮০)


বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজ যখন নিজের চেনা নৈতিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে ফিরছিল, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে মহানায়ক উত্তমকুমারের। আজ বহু দশক পরেও বাঙালির পারিবারিক সৌহার্দ্য, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে কোনও আলোচনায় উত্তমকুমার এক অনন্য ও অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন।

মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ডের আখ্যান

বাঙালিয়ানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান তার মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধ। অভাব বা প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সহজাত চারিত্রিক দৃঢ়তা, তাকে উত্তমকুমার পর্দায় এক মহৎ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সমাজব্যবস্থায় যখন পুঁজিবাদ ও নৈতিক স্খলনের চোরাস্রোত চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা বাঙালির সৎ ও আদর্শবাদী সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

'বিচারক' চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। এই ছবিতে একজন জজের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট, তাঁর নিজের অতীত ভুলের সঙ্গে বর্তমান বিবেকের যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তাকে উত্তম অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার 'থানা থেকে আসছি' ছবিতে এক রহস্যময় তদন্তকারী অফিসারের চরিত্রে তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ অভিনয় সমাজের উচ্চবিত্ত ও কপট শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াপনাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। উত্তমকুমার বাঙালি পুরুষকে শিখিয়েছিলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্থবিত্ত নয়, একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার সততা, নীতিবোধ এবং সোজা মেরুদণ্ডের মধ্যে। তিনি যখন পর্দায় কোনও আদর্শবাদী ডাক্তার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইঞ্জিনিয়ার বা সৎ কেরানির চরিত্রে অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতেন, তখন সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদমিত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠত।

পারিবারিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার যৌথ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, বড়দের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি অপত্য স্নেহ এবং ত্যাগের মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে একটি আদর্শ বাঙালি পরিবার। উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পারিবারিক মূল্যবোধের উদযাপন।

'মৌচাক' ছবিতে ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া এক বড় ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় ছিল অনবদ্য। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না অতি-নাটকীয়তা। গুরুজনদের সামনে তাঁর বিনীত শারীরিক ভাষা, ছোট ভাইদের শাসন করার পাশাপাশি তাদের আগলে রাখার যে নির্ভরতা— তা ছিল চিরাচরিত বাঙালি সমাজব্যবস্থার আসল প্রতিচ্ছবি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা চারপাশকে গ্রাস করছে, পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তমের এই ছবিগুলো আমাদের যৌথ পরিবারের সেই সুবর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ত্যাগই ছিল আনন্দের মূল উৎস।

'মানুষ' হয়ে ওঠার লড়াই

বাঙালির মজ্জাগত মূল্যবোধে ব্যক্তির স্বার্থপরতাকে সবসময় নিকৃষ্ট মনে করা হয়েছে এবং লোককল্যাণ বা পরোপকারকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। উত্তমকুমারের বহু চরিত্র এই মানবিক দর্শনের সার্থক রূপায়ণ।

এই প্রসঙ্গে 'অমানুষ' চলচ্চিত্রের মধুসূদন বা 'মধু' চরিত্রটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও কুৎসায় জর্জরিত হয়ে এক সময়ের সৎ ও আদর্শবাদী জমিদারপুত্র যখন মদ্যপ ও সমাজ-পরিত্যক্ত এক রুক্ষ মানুষে পরিণত হয়, তখনও তার ভেতরের আসল মানবিকতা ও পরোপকারী সত্তাটি মরে যায় না। ঝড়ের রাতে বাঁধ ভেঙে যখন গোটা গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে মধুর সেই মরণপণ লড়াই আসলে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে ফুটিয়ে তোলে। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাইরের খোলসটি যতই মলিন বা রুক্ষ হোক না কেন, মানুষের ভেতরের আসল মূল্যবোধ যদি খাঁটি থাকে তবে সে সমাজকে এক নতুন পথ দেখাতে পারে। একইভাবে 'আনন্দ আশ্রম' বা 'ধন্যি মেয়ে' ছবিতেও তাঁর চরিত্রগুলো ছিল মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর এক একটি জীবন্ত উদাহরণ।

প্রেমের গরিমা

বাঙালির প্রেমের ব্যাকরণ চিরকালই অত্যন্ত মার্জিত, নান্দনিক ও আত্মিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। উত্তমকুমার রূপোলি পর্দায় প্রেমের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন, তাতে শরীরী আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গরিমা ও একাত্মতা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'সাগরিকা' বা 'অগ্নিপরীক্ষা'— প্রতিটি ছবিতেই উত্তমকুমারের চরিত্রগুলো ছিল নারীর প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রেমিক হিসেবে কখনও আগ্রাসী বা অধিকারপ্রমত্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন পরম আশ্রয়দাতা ও ছায়াসঙ্গী। নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই ভুবন ভোলানো মৃদু হাসি, কথা বলার সময় অপরিসীম ভদ্রতা এবং ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য নিজের অহংকার বা সুখ বিসর্জন দেওয়ার অভিব্যক্তি বাঙালি যুবসমাজকে এক গভীর রুচিসম্পন্ন প্রেমের পাঠ দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, প্রেম মানে কেবল অধিকার করা নয়, প্রেম মানে অপর মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়ে আপন করে নেওয়া। এই কারণে তাঁর রোমান্টিক চরিত্রগুলো আজও বাঙালির প্রেমের চিরন্তন ও পরিশীলিত আদর্শ হয়ে রয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বাঙালি মননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্ম, জাতপাত বা সংস্কৃতির কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার যে ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত, উত্তম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চেতনার এক ঐতিহাসিক জয়গান গেয়েছিলেন।

'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' চলচ্চিত্রটি এই ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। একজন পর্তুগিজ সংস্কৃতির মানুষ হয়েও হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি কীভাবে বাংলার মাটি, বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং কবিগানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এক নিপাট বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন— পর্দায় সেই রূপান্তরের কারিগর উত্তম। ভোলানাথ ময়রার সঙ্গে কবিগানের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর মুখাবয়বের সেই ঐশ্বরিক ভক্তি এবং গম্ভীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— 'খ্রিষ্ট আর কৃষ্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই', তখন তা কেবল ছবির সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বাংলার সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর ইশতেহার। তৎকালীন দাঙ্গা-পরবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে অস্থির বাংলার বুকে উত্তমের এই রূপায়ণ এক গভীর সামাজিক ক্ষতে মলম লাগানোর কাজ করেছিল এবং প্রমাণ দিয়েছিল যে বাঙালিয়ানা কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

'নায়ক'-এর আত্মদর্শন

সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও একজন মানুষের নিজের শিকড়, নৈতিকতা এবং বিবেকের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকা উচিত, তার এক মননশীল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে উত্তম মূলত নিজের জীবনেরই এক সমান্তরাল চরিত্র 'অরিন্দম মুখার্জী'-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খ্যাতির চরম চূড়ায় বসে থাকা একজন সুপারস্টারের ভেতরের একাকীত্ব, তাঁর অতীত জীবনের আদর্শচ্যুতির ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের বিবেককে টিকিয়ে রাখার যে ছটফটানি— তা উত্তম যে ভাবে তাঁর চোখের পলক, ঠোঁটের কোণের বিষাদ ও শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ট্রেনের কামরায় এক তরুণী সাংবাদিকের কাছে অভিনয় গুণে নিজের ভেতরের সব গ্লানি, পাপবোধ ও দুর্বলতা উজাড় করে দেওয়ার দৃশ্যটি উন্মোচিত করে, সাফল্য বা গ্ল্যামার মানুষের শেষ কথা হতে পারে না; নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। উত্তমের এই মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বাঙালি সমাজকে এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

কেন আজও উত্তমের বিকল্প নেই?

আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক হাই-টেক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ভাষা ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে চরম যান্ত্রিকতা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও বাঙালির নৈতিক অবচেতনে ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উত্তম আজও এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা। কারণ, উত্তম কেবল সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি কোনও অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির নিজস্ব মূল্যবোধের এক পরম বিশ্বস্ত অভিভাবক।

যখনই বাঙালি সমাজ কোনও নৈতিক সংকটে ভোগে, পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে বা যান্ত্রিকতার ভিড়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরে পেতে চায়, তখনই তারা ফিরে যায় উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের সেই মায়াবী আশ্রয়ে। তাঁর সেই প্রাণখোলা ভুবন ভোলানো হাসি, ধুতি-পাঞ্জাবির আভিজাত্য, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই চিরচেনা রূপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, সততা, পরিবার, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং আত্মমর্যাদাই হল একজন খাঁটি মানুষের আসল পরিচয়। 

যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালিয়ানা তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে, ততদিন বাঙালির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমারের এই অনন্য দৃষ্টান্ত চিরকাল অম্লান ও অতুলনীয় হয়ে থাকবে।


Tuesday, 1 September 2026

ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র

ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


In This World

রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।

এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।

এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'  (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।

রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।

২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।

সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।