দেয়াল নয় ভবিষ্যৎ চাই
সোমা চ্যাটার্জি
কোভিড পরবর্তীকালে ভারতের রাজনীতিতে যে পালাবদল ঘটেছে তার মধ্যে ককরোচ আন্দোলনের ভূমিকা শুধু অনস্বীকার্যই নয়, বলা যায় সবচেয়ে বেশি। কোভিডের আগে ভোট হত জাতপাত, ধর্ম নিয়ে, আন্দোলন করত কৃষক, শ্রমিক ইউনিয়ন। কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে বাড়ি ফেরার ছবি দেখে সবাই সত্যটা বুঝতে পারল যে সমস্যা ব্রাহ্মণ, দলিত, মুসলিম, বাঙালি বিভাজনে নয়, আসল সমস্যা কাজ নেই, চাকরি নেই, নেই কোনও ভবিষ্যৎ।
গড়ে উঠল এমন এক অভূতপূর্ব আন্দোলন যেখানে প্রতিবাদীর ভুমিকায় ডিগ্রিধারী বেকার— যার হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু চাকরি নেই। ককরোচ জনতা পার্টি হল সেই নতুন প্রজন্মের প্রথম রাজনৈতিক মঞ্চ যারা শুধুমাত্র মিম বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, নীট পরীক্ষার দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে যন্তরমন্তর'এর ধর্না থেকে পার্লামেন্টকে নাড়িয়ে দিয়েছে, নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে সরকারের; শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে ছেড়েছে, পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে প্রায় ৩০ কোটি জেন জি'র মনে এবং তার আঁচ পড়েছে পরবর্তী প্রজন্ম জেন আলফা'র মধ্যেও। ককরোচ আন্দোলনের পর জেন আলফা'র বিদ্রোহে স্কুলের বাচ্চারাও নেমেছে রাস্তায়। তাদের স্লোগান 'স্কুল ঠিক করো', নইলে ককরোচরা স্কুল ঠিক করবে ।
এর শুরুটা কিন্তু হয়েছিল অন্য ভাবে । স্বাধীনতা দিবসের আগে গত ১০ অগস্ট ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দেশের স্কুলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও স্বাধীনতার আশি বছর পরেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা নিয়ে একটি ভিডিওতে ঘোষণা করেন যে, তাঁদের নতুন আন্দোলন অভিযান হবে স্কুলগুলির সংস্কার; তিনি সরকারি স্কুলগুলিতে পাঠরত ছাত্র ছাত্রীদের অভিভাবকদেরও এই 'স্কুল ঠিক করো' অভিযানে সামিল হতে আহ্বান জানান। তার আগেই ২৮ জুলাই উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে সর্বোদয় ইন্টার কলেজিয়েট স্কুলে বিদ্যুৎ নেই, পাখা নেই, বেঞ্চ নেই, জল নেই'এর প্রতিবাদে ১৫০০ ছাত্র স্কুল ইউনিফর্ম পরে ৫-৬ ঘণ্টা ধরে ধর্নায় বসে এবং সেই ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। দেখাদেখি উন্নাও'তেও জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বিদ্যালয়ে খাবারের মান খারাপ, জল নেই, শিক্ষক নেই'এর প্রতিবাদে ছাত্ররা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে। আলিগড়ের ভামোরী খুর্দ জেলাতেও বাচ্চারা ক্লাস করতে অস্বীকার করে-- ছাদ ভেঙে গেছে, প্লাস্টার খসে পড়ছে, জঙ্গলাকীর্ণ খেলার মাঠে সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এই অভিযোগে ।
অভিজিৎ দীপকেও তাঁর নিজের গ্রাম মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, সেখানে ক্লাসরুমের বেহাল অবস্থা, খাবার জল, টয়লেট নেই, রান্নাঘরে ছাদ থেকে জল পড়ছে, তার মধ্যেই স্কুল চলছে। প্রশাসনের চোখ খোলার জন্য দীপকে তাদের পোর্টালে সবাইকে সবরকমের বেহাল দশার স্কুল ও তাদের পরিকাঠামো নিয়ে ভিডিও শেয়ার করতে অনুরোধ জানান। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১৬০টিরও বেশি স্কুলের ভিডিও আপলোড হতে দেখা যায়, যার মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্য ছাড়াও কংগ্রেস শাসিত কর্নাটক, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যেরও কয়েকটি স্কুল আছে। সব চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা দেখা গেছে রাজস্থানে, যেখানে ককরোচ জনতা পার্টির আশুতোষ রাঙ্কা সহ ৫০ জন মিলে জয়পুর, রামপুরা, কানওয়ারপুরা এই সব জায়গায় সরকারি স্কুলগুলিতে গিয়ে দেখেন, বাচ্চারা গোয়ালঘরে ক্লাস করছে। অদ্ভুত ব্যাপার যে, ওই স্কুল বিল্ডিংটি ২০২৫ সালেই বাতিল ঘোষণা হয়েছিল। তাছাড়াও আলওয়ার, যোধাওয়াস সরকারি স্কুলে তাদের সামনেই ছাদের স্ল্যাব বিপজ্জনক ভাবে ভেঙে পড়ে। তাঁরা দেখেন, ১৭৪ জন ছাত্র ৩টে ঘরে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। টয়লেট, জল কিছুই নেই। এখানেই শেষ নয়, জয়পুরে সরকারি শেঠ আনন্দীলাল পোদ্দার বধির স্কুলে ১০০-র বেশি ছাত্র সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বিক্ষোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় স্কুলগুলির করুণ অবস্থা, ছাদ থেকে প্লাস্টার পড়ে এক ছাত্র আহত। হোস্টেলে খারাপ খাবার, টয়লেট নোংরা, শিক্ষকরা ক্লাসে থাকে না, হয় নেশা করে না হলে মোবাইল ঘাঁটে। CJP নেতা আশুতোষ রাঙ্কার বক্তব্য, রাজস্থানে ৮৪,০০০ ক্লাসরুম ভাঙা, ১৫ লক্ষ বাচ্চার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে।
কিন্ত 'স্কুল ঠিক করো'র এই অভিযানে সরকারের প্রতিক্রিয়া কিন্ত একদম বিপরীত। এই প্রচেষ্টাকে রুখতে বিভিন্ন রাজ্যের সরকার নানারকম হাতিয়ার প্রয়োগ করেছে-- উত্তরপ্রদেশে ভিডিওকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। বিনা অনুমতিতে প্রবেশের জন্য খোদ অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধেই এফআইআর করেছে পিম্পরির স্কুল। রাজস্থান, হরিয়ানায় স্কুলগুলিতে প্রবেশ করলে পকসো ধারায় মামলা করা হবে বলে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া জেলায় আব্দুল হাফিজ তার স্কুলের বেহাল দশার ভিডিও প্রকাশ করলে প্রশাসন গুণ্ডা লাগিয়ে তার বাবাকে হত্যা পর্যন্ত করেছে।
সরকারি স্কুলগুলির এরকম করুণ অবস্থা হওয়ার মূলে আছে অন্য ব্যাখ্যা। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সরকার শিক্ষায় GDP'র ২.৯ শতাংশ খরচ করে, অন্য দেশে যেখানে তা গড়ে ৪.৫ শতাংশ। অথচ, প্রতিরক্ষা খাতে এর চেয়ে দুশো গুণ বেশি খরচ হয়। একটা রাফায়েল'এর দামে প্রায় তিনশো স্কুলের ছাদ সারানো যায়। অথচ সেদিকে সরকারের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই । বিগত দশ-বারো বছরে এই অবস্থা খারাপ থেকে জঘন্যতম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বারো বছরের বিজেপি জমানায় প্রায় ৮০,০০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, অর্থাৎ, প্রতি দিনে গড়ে প্রায় কুড়ি-বাইশটি করে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশে প্রায় পনেরো লাখ স্কুল, পঁচিশ কোটি ছাত্র, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই সরকারি স্কুল। UDISE ২০২৫-২৬'এর রিপোর্ট বলছে, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:২৪, ৯৮ শতাংশ স্কুলে নাকি মেয়েদের শৌচাগার আছে, কিন্ত বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, প্রায় দেড় লাখ স্কুলে লাইব্রেরি নেই। আড়াই লক্ষ স্কুলে খেলার মাঠ নেই, প্রায় আশি হাজার স্কুলে নেই টয়লেট। দেশে ১১ লক্ষ স্কুল চলছে একজন করে শিক্ষকের উপর নির্ভর করে। তাছাড়া স্কুল এখন সরকারের BLO ডিউটি, ভোটার লিস্ট, আবাস যোজনার ফর্ম দেবার মালটিপারপাস অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে, শিক্ষকেরা পড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ক্লাস ফাইভ'এর ছেলেরা ক্লাস টু'এর পড়া পারছে না, ক্লাস এইট'এর ছাত্র ক্লাস থ্রি'র অঙ্ক করতে পারছে না। কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবহার হয় বছরে একদিন, পরিদর্শনের সময়। আর কোভিড পরবর্তী ডিজিটাল বৈষম্য তো আছেই।
আমাদের দেশে গ্রাজুয়েট বেকারত্ব প্রায় ১২ শতাংশ। এই ছেলেগুলোই দশ বছর আগে কোনও সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছে, সেখানে তারা শিক্ষক পায়নি, পায়নি কম্পিউটার, শেখানো হয়নি ইংরেজি, তাই আজ সে গ্রাজুয়েট হয়েও বেকার। তাছাড়াও কোভিডের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি স্কুলগুলির ছাত্ররা। পড়াশোনা অনলাইনে হবার দরুণ তারা তাল মেলাতে পারেনি এবং এইভাবেই আমাদের দেশে প্রায় ৫২ শতাংশ গিগ কর্মী বা অস্থায়ী চাকুরেদের জন্ম হয়েছে (Swiggy, Zomato এইসব কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে)।
স্কুলগুলির এই বেহাল দশায় স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমেছে, তাদের 'স্কুল ঠিক করো'র তিন দফা দাবি নিয়ে--
১) প্রতি ৩০ জন ছাত্র পিছু একজন শিক্ষক থাকতে হবে;
২) শিক্ষকের কাজ পড়ানো, অন্য কাজ নয়। অন্য কাজের জন্য লোক নিতে হবে;
৩) প্রতি স্কুলে লাইব্রেরিয়ান ও কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ।
তাছড়া ক্লাস রুম ঠিক করা, মিড ডে মিলের মান, খেলার মাঠ, টয়লেট এগুলো সর্বত্র ঠিক করতে হবে, না হলেই হবে জোরদার আন্দোলন।
এই আন্দোলনের সুফলও মিলেছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। মহারাষ্ট্রের পিম্পরিতে অভিজিতের পরিদর্শনের তিন দিনের মধ্যেই স্কুলের পরিবর্তন চোখে পড়েছে-- অপসৃত হয়েছে নেশাখোর প্রিন্সিপাল। ২০ অগস্ট উত্তরপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রক চল্লিশ হাজার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যাতে স্কুলগুলোর অবস্থা প্রতিনিয়ত নজরে রাখা যায়। এমনকি রাজস্থান সরকার গত ২৪ অগস্ট স্কুল সংস্কারের লক্ষ্যে ১২,৫০০ কোটি টাকার তহবিলও মঞ্জুর করেছে।
'স্কুল না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না'-- এটা ককরোচরা প্রশাসন ও সরকারকে বেশ কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে। আশা রাখা যায়, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মতোই এই 'স্কুল ঠিক করো আন্দোলন'ও ঠিক করে দেবে আমাদের বাচ্চা ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। কারণ, তাদের এই দাবি ভিক্ষা নয়, ন্যায্য; বেঞ্চ, জল, পাখা, শিক্ষক-- এইগুলি সবার আগে দরকার। তাই সরকারের ফাইলে নয়, আসল জায়গাতেই স্কুল ঠিক করতে হবে।
বলাই বাহুল্য, ককরোচ আন্দোলন জাত, ধর্ম, ভাষা ছাড়িয়ে উঠে ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন পরিচয় এনেছে। আমি বেকার-- সেটা আমার কোনও লজ্জা নয়। এটা দেশের লজ্জা। লোকের বিদ্রূপকে তারা হাতিয়ার বানিয়ে রাগকে ব্যঙ্গে পরিণত করেছে। তারা বুঝে গেছে, রাগ করলে শাসক তাদের দেশদ্রোহী তকমা দেবে, কিন্ত তারা যখন হাসছে, তখন সিস্টেম বোকা বনে যাচ্ছে। নিজেকে ককরোচ বলে মিম বানালে লাখ লাখ জনের সমর্থন পাওয়া যায়। ইংরেজিতে যাকে বলে laughter as resistance-- তার মাধ্যমেই তারা সিস্টেমের বাস্তব উলঙ্গ চিত্রটা সবার সামনে তুলে ধরেছে। আর এটাই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় বিবর্তন।
লজ্জা থেকে গর্বের এই বিবর্তনে জেন জি থেকে জেন আলফা সবাই আজ সামিল। কারণ, এই পচে যাওয়া সমাজে এটা টিকে থাকার এক লড়াই। হয়তো আমাদের মতো জেনারেশন এক্স বা ওয়াই'ও এই টিকে থাকার লড়াইতে সামিল হবে ভবিষ্যতে !

No comments:
Post a Comment