কতদিন টিকব আমরা?
বিধান চন্দ্র পাল
আমরা যখন কোনও কিছু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে স্থায়ী বলে মনে করি। কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকাই কি স্থায়িত্বশীলতার প্রমাণ? একটি প্রতিষ্ঠান একশো বছর টিকে থাকতে পারে, একটি প্রযুক্তি কয়েক দশক সফল হতে পারে, একটি অর্থনীতি দীর্ঘসময় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে; কিন্তু সেই টিকে থাকার পেছনে যদি এমন কোনও মূল্য দিতে হয় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে, তাহলে তাকে কি সত্যিই Sustainable বা স্থায়িত্বশীল বলা যাবে? এই প্রশ্ন থেকেই স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
চীনের মহাপ্রাচীর, মিশরের প্রাচীন স্থাপনা কিংবা জাপানের হোরিউ-জি মন্দির আমাদের মানুষের অসাধারণ স্থায়িত্বের গল্প বলে। চীনের মহাপ্রাচীর দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে; জাপানের হোরিউ-জি প্রায় ১,৩০০ বছর ধরে বিশ্বের প্রাচীনতম টিকে থাকা কাঠের স্থাপনাগুলোর একটি। এসব স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে নকশা, উপকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে-- দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং স্থায়িত্বশীলতা এক বিষয় নয়।
বর্তমানে পরিবেশ, ব্যবসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা-- প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্থায়িত্বশীলতা শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৮৭ সালের Brundtland Commission-এর Our Common Future প্রতিবেদনে স্থায়িত্বশীল বিকাশের (Sustainable Development) যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তার মূল কথা ছিল: আজকের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু তা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আজকের পৃথিবীতে এই সংজ্ঞাকে সামনে রেখে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হচ্ছে, আমরা আসলে কী টিকিয়ে রাখতে চাই? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব কিছু একইভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
দুর্বল স্থায়িত্বশীলতার (Weak Sustainability) ধারণায় প্রাকৃতিক পুঁজি, মানব পুঁজি ও নির্মিত (Manufactured) পুঁজির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিস্থাপন সম্ভব বলে ধরা হয়। অর্থাৎ, প্রকৃতির কোনও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষের তৈরি সম্পদের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক মূল্য আংশিকভাবে পূরণ করা যেতে পারে। Strong Sustainability আমাদের সতর্ক করে দেয়-- প্রকৃতির সব কিছুকে মানুষের তৈরি সম্পদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। ধরা যাক, একটি বন কেটে সেখানে শিল্পাঞ্চল তৈরি হল। কারখানা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, উৎপাদন বাড়াবে, GDP-তে অবদান রাখবে। বনের কাঠের মূল্য, জমির মূল্য কিংবা carbon sequestration-এর অর্থনৈতিক মূল্যও হিসাব করা যেতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত বন যে পানি ধরে রাখে, মাটি রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য ধারণ করে, পরাগায়নে সহায়তা করে এবং স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে-- এইসব বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতা (ecological function) কি একটি কারখানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব? সবসময় নয়। এখানেই স্থায়িত্বশীলতার গভীর প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রকৃতি অর্থনীতির একটি অংশমাত্র নয়, প্রকৃতিই অর্থনীতির ভিত্তি।
২০২১ সালের The Economics of Biodiversity, The Dasgupta Review অর্থনীতিতে প্রকৃতিকে নতুনভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল-- একটি দেশের প্রকৃত সম্পদকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু GDP যথেষ্ট নয়, প্রাকৃতিক পুঁজি সহ সামগ্রিক সম্পদকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, GDP অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবাহ দেখায়, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় বা পরিবেশগত অবক্ষয়ের মূল্যকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি ও বস্তুগত পুঁজি (physical capital) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু একই সময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির অবক্ষয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় ও দূষণ বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে আমরা যদি শুধু GDP বৃদ্ধি দেখি, কিন্তু একই সময়ে বন, মাটি, পানি, মৎস্যসম্পদ কিংবা ecosystem services-এর অবস্থা বিবেচনা না করি, তাহলে কি দেশের প্রকৃত অগ্রগতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে? সম্ভবত নয়।
গ্রহের সীমানার (Planetary Boundaries) ধারণাও আমাদের একই ধরনের সতর্কবার্তা দেয়। ২০২৩ সালের এক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে পৃথিবীর নয়টি সীমানার মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষকেরা জানান। অর্থাৎ, মানবসভ্যতা এমন কিছু বাস্তুতান্ত্রিক সীমার (ecological limit) ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে, যার বাইরে গেলে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি আমাদের সম্পদের ব্যবহার দক্ষ করতে পারে, দূষণ কমাতে পারে, নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি আমাদের এমন একটি সীমাহীন পৃথিবী তৈরি করে দিতে পারে না, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ অসীম।
আরেকটি ঝুঁকি হল সবুজ ধোঁকাবাজি (Greenwashing)। কোনও প্রতিষ্ঠান তার মূল উৎপাদনব্যবস্থা ও সম্পদ ব্যবহারের ধরন অপরিবর্তিত রেখে কিছু বৃক্ষরোপণ, কার্বন দূরীকরণ বা সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করলেই কি তাকে স্থায়িত্বশীল বলা যায়? স্থায়িত্বশীলতা যদি পরিবর্তনের পরিবর্তে বিদ্যমান অবস্থাকেই বজায় রাখে, তাহলে শব্দটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থটিই হারিয়ে যাবে। তাই স্থায়িত্বশীলতা মূল্যায়নের সময় অন্তত তিনটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন:
১) কতদিন টিকবে?
২) পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা খাপ খাওয়াতে পারবে?
৩) টিকে থাকার প্রক্রিয়ায় আমরা কী হারাচ্ছি?
তৃতীয় প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া কোনও সমাধান নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কর্মসংস্থান, আয়, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হল, কী ধরনের উন্নয়ন, কার জন্য, কতদিনের জন্য এবং কোন বাস্তুতান্ত্রিক সীমানার মধ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্থায়িত্বশীলতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্কও সামনে আসে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার মূল্য শুধু আমাদের প্রজন্মই দেবে না। নদী দূষিত হলে, মাটি নষ্ট হলে, বন হারালে কিংবা জৈব বৈচিত্র্য কমে গেলে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বহন করবে। সুতরাং, একটি প্রতিষ্ঠান কত বছর টিকে থাকল, একটি ব্যবসা কত বড় হল কিংবা একটি দেশ কত দ্রুত GDP বাড়াল-- এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু একইসঙ্গে জানতে হবে, সেই সাফল্যের বিনিময়ে প্রাকৃতিক পুঁজির কী হাল দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের Changing Wealth of Nations এই কারণেই GDP-এর পাশাপাশি একটি দেশের উৎপাদিত মানব ও প্রাকৃতিক পুঁজিকে বিবেচনা করে সামগ্রিক সম্পদকে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়। একটি দেশের প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার উৎপাদন ও জীবনযাপনের ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ণ থাকছে তার ওপর।
সত্যিকারের স্থায়িত্বশীলতা তাই শুধু দীর্ঘদিন টিকে থাকার নাম নয়। এটি এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন, যেখানে আমরা স্বীকার করি যে, আমরা প্রকৃতির মালিক নই, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু একটি কার্যকর অর্থনীতি রেখে যাওয়া যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন একটি পৃথিবীও রেখে যেতে হবে, যেখানে সেই অর্থনীতি এবং মানবজীবনের টিকে থাকার মতো বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে। তাই, স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়তো, 'কীভাবে টিকে থাকব?' নয়; বরং 'আমরা কী টিকিয়ে রাখতে চাই?', কারণ, সব কিছু টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিছু পরিবর্তন করতে হবে, কিছু পুনর্গঠন করতে হবে, কিছু পুরনো ধারণা হয়তো ছেড়েও দিতে হবে। কিন্তু যে বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর আমাদের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, সেগুলোকে রক্ষা ব্যতীত কোনও বিকল্প নেই।
No comments:
Post a Comment