Friday, 28 August 2026

আদিত্য কুমারের খোয়াইশ

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।

আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।

সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।

কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন। 

এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।

যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।

তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই। 

বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!


Thursday, 20 August 2026

কে পরবাসী নয়?

স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


 

কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।  

ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।  

তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।  

তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ। 

তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে। 

তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ  ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।

এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।

কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক  'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর  ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।

আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।

তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে  ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।

কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত  কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।

আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।


Tuesday, 18 August 2026

নকশাল কয় প্রকার!

দিমাগ তো কাজ করছে...

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



চিদম্বরম যখন বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘নিজেকে একজন দিমাগী নকশাল ভেবে গর্ববোধ করি’, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রে রে করে উঠলেন, ‘চিদম্বরম মোটেও দিমাগী নকশাল নন, উনি বিশুদ্ধ নকশাল।’ ফলে, মোটমাট আমরা এখন পর্যন্ত চার প্রকার নকশাল পাচ্ছি: দিমাগী নকশাল, বিশুদ্ধ নকশাল, আর্বান নকশাল ও হাতিয়ারি নকশাল। এই চার ধরনের নকশালদের হদিশ আমরা গত এক দশক ধরে পেতে পেতে এসেছি। তদুপরি, ‘দিমাগী নকশাল’ নিয়ে তুমুল সোরগোল ওঠায় এক স্বঘোষিত পুরাতত্ত্ববিদ ‘নকশালি ঘাসের’ সন্ধান পেয়েছেন; ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে নদীর তীরে এই নকশালি ঘাস জন্মায়, সেই নদীকে ‘নকশালেশ্বর মহাদেব’ বলা হয়। তাই ‘দিমাগী নকশাল’ হলেন একজন শিবভক্ত…।’ এটা শুনে যোগেন্দ্র যাদব বেশ চমকিত হয়ে তা প্রচারও করে দিয়েছেন।

এখন ‘দিমাগী নকশাল’ যদি শিবভক্ত হন, তাহলে শাসক দলের মহাবিপদ। শিবভক্তদের কীভাবে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে? শিবের রুদ্ররূপ কে না জানে? ভক্তের উপর জুলুম হলে দেবতা কি স্থির থাকবেন? সেইজন্যই ‘বিশুদ্ধ নকশাল’ আরও বিপন্মুক্ত শব্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নকশাল’ শব্দটিরই যদি অমন পৌরাণিক ইতিকথা থাকে, তাহলে সে সব নিয়ে ছেলেখেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়! তবে কেউ বলতেই পারেন, ফেসবুকে কেউ লিখে দিলেই কি তা পুরাণকথা হয়ে যাবে? কোন পুরাণ বা স্মৃতিতে আছে, সে সূত্র কি দিয়েছে? অথবা, এমন কথার কি কোনও লোকজ দৃষ্টান্ত আছে? সে সব জানা যাচ্ছে না। অতএব, সূত্রহীনতার দরুণ এইসব পুরাণগাথার মারপ্যাঁচ আপাতত সরিয়ে রাজনীতির প্রশ্নটিকেই যদি জিইয়ে রাখা যায়, সেখানেও স্ববিরোধ আছে।

মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫ সনের কথা, যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে ‘সর্বাত্মক বিপ্লবের’ ফ্রন্ট, যে ফ্রন্টে একদিকে সামিল হচ্ছে সিপিআই বাদে সমস্ত বাম ও কমিউনিস্ট দল, অন্যদিকে পুরনো কংগ্রেস ও সমাজতন্ত্রী সহ আজকের শাসক দলের পূর্বসূরীরা যাদের ‘ভারতীয় জনসংঘ’ নামে তখন পরিচিতি। এই শেষোক্ত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এরপরে নিজেদের মিলিয়ে দেবে ‘জনতা পার্টি’ নামক একটি নতুন দলে, যে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হবেন ভারতীয় জনসংঘের নেতা নানাজী দেশমুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানী হবেন জাতীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য। আমরা সবাই জানি, জয়প্রকাশ নারায়ণ সে দলের কোনও আনুষ্ঠানিক পদ না নিলেও তিনিই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা ও পথ প্রদর্শক। সেই সময়ে তিনিই, তাঁর সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহে নকশালপন্থীদের যুক্ত হতে প্রকাশ্য সভায় তাঁদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তিকে তাঁর প্রয়োজন। সেদিন জনতা পার্টির নেতারা বা বাঘা বাঘা পূর্বতন জনসংঘীরাও কিন্তু সে কথার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মৃদু আপত্তিও জানাননি। বরং, জনসংঘীদের মূল মেন্টর সংগঠন আরএসএস জরুরি অবস্থার সময় বেআইনি ঘোষিত হলে তাদের ক্যাডার বাহিনী পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থী ও অন্যান্য বাম সংগঠন দ্বারা গঠিত নানারকম সেবামূলক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনেও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ঢুকে পড়ে।

আজ সময় ও পরিস্থিতি পালটেছে। সেই জনতা পার্টি আজ আর নেই। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে পুরনো জনসংঘীরা তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। আরএসএস’এর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু তাদের একটা অংশ তখনও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাম সংগঠনে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে থেকে গেছে। কোনও কোনও প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বাম ঘরানার মিলও ছিল। যেমন, গান্ধীর প্রশ্নে দু’ পক্ষেরই মতামত অনেকটাই এক ছিল। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যেহেতু দেশ জুড়ে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এক উদার আবহ ঐতিহ্যগত ভাবেই বিরাজমান, তাই সে প্রশ্নে আরএসএস উচ্চকিত ভাবে কিছু বলত না; তবে দেশভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ ফাটল দেখা দিয়েছিল, সেখানে ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’— তাদের এই দুই তরফ নির্মাণ মারফত দুই সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একটা সুপ্ত চোরাস্রোত প্রবহমান ছিল। এই চোরাস্রোতে কমবেশি আক্রান্ত ছিল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ ও নিম্নবর্ণদের সেই অংশ যারা দেশভাগের রোষানলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বামপন্থার সার্বিক প্রভাবে এই দুই-তরফের রাজনীতি ততদিন খুব একটা মাথা তুলতে পারেনি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতিই যখন অনেকটা বদলে গেল, বামপন্থীরাও নিজেদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থানে বেশ দুর্বল হল, তখন স্বভাবতই তাদেরও ভেসে যাওয়ার পালা দেখা দিল। বস্তুত, ভোটের হিসেব-নিকেশে তাদেরই একটা বড় অংশ নিজেদের দল ছেড়ে আরএসএস-বিজেপির পিছনে সামিল হয়ে গেল।

তা না হয় হল। কিন্তু তাই বলে চলমান রাজনীতির আপন পরিবর্তনগুলি তো থেমে থাকে না। দেখা গেল, এ তাবৎ সংসদীয় রাজনীতিতে যে সমস্ত নকশালপন্থী শক্তিসমূহ অংশ নিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রস্তাবনার মূল সুরকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছে, তারাই খুব নীতিনিষ্ঠ ভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্তমান শাসক-বিরোধী এমন এক বার্তা নির্মাণ করতে পেরেছে যা অন্যান্য প্রগতিশীল ও সমাজবাদী শক্তির সঙ্গে সাবলীল সংযোগ স্থাপনের দিশা দিতে সক্ষম হয়েছে। সেটা আরও স্পষ্টত দেখা গেল ককরোচ আন্দোলনের গোড়ার দিকে, যখন দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলিই এদের আন্দোলন নিয়ে কিছুটা সন্দিহান, ভাবছে বিজেপি’র বি-টিম কিনা, তখন কিন্তু বিভিন্ন নকশালপন্থী শক্তিগুলি প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের শক্তি, শ্লোগান, দম ও বুদ্ধি জুগিয়েছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াইয়ে রত থেকেছে। বস্তুত পক্ষে, নকশালপন্থী শক্তিসমূহের সামিল হওয়া ও তাদের রাজনৈতিক পরিণতমনস্কতা দেখে অন্যান্য বাম শক্তিও এগিয়ে আসে, এবং বাকী বিরোধী দলগুলিও ভরসা পায়। তারপর তো ইতিহাস, যার পিছনে সর্বোপরি আরশোলাদের নেতৃত্ব, চৈতন্য, বুদ্ধিবৃত্তি, সংযম ও অংশগ্রহণ অতুলনীয়। বলাই বাহুল্য, এক অসামান্য শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোনম ওয়াংচুকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপকতা এতটাই ছড়িয়েছে যে, আরএসএস প্রধানকেও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থাও যেন খানিক সমঝে কথা বলছে। প্রধান বিচারপতি বার কাউন্সিলের সভাপতিকে ধমকে দিয়েছেন, তিনি কেন ছাত্রদের এবং তাঁর মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপারে এসে নাক গলাচ্ছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পট তৈরি হচ্ছে।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ‘দিমাগী নকশালদের’ সন্ধান-ঘোষণা জারি হল। হাতে আম্বেদকর ও ভগৎ সিং’এর ছবি, শ্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভুখমারি সে আজাদী’, যন্তর মন্তরের রাস্তায় হাজার হাজার জনতার মাঝে হাজার হাজার মেয়েদের নিশ্চিন্তে রাত-জাগা, আধপেটা খেয়ে তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে দিন-রাত কাটানো, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসা’র অনশন, পুলিশের ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও মিম বানানো, মা-বাবার অনুশাসনকে তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতেই নেওয়া, পুলিশের লাঠির সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে পড়া, জল কামান চালালে শ্যাম্পু মেখে রেইন ডান্স— দেশ কোনদিন কবে শেষ তরুণ সমাজের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখেছে? যে জাগরণের সামনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহামহিম মন্ত্রী মহাশয়কেও পদত্যাগ করতে হয়? শুধু যন্তর মন্তরে কেন, ঝাড়খণ্ডেও তো শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে হল! এবার তো GenAlpha’রাও পথে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইতিমধ্যেই উত্তাল। আরশোলারা দলে দলে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যায়তনে, বলছে, ‘স্কুল ঠিক করো’। কে রুধিবে এই হড়পা বান?

দিমাগ তো কাজ করছে! জয়প্রকাশ বর্ণিত ‘নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তি’ দেশের ‘গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য’ লাগছে বৈকী! তারা তো দিমাগীই। নকশাল-ভীতি দেখিয়ে কি দিমাগে কার্ফু জারি করা যাবে? ‘নকশাল’ যে প্রকারেরই হোক, অথবা, পুরাতত্ত্ব মতানুযায়ী শিবভক্ত, তার যে রাজনৈতিক অর্থ গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে দেশবাসী বুঝেছে, তা নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আজ সর্বজনীন। নয় কী? নয়তো চিদম্বরম থেকে মহুয়া মৈত্র, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে প্রকাশ রাজ-- সকলেই একযোগে দম্ভ ভরে বলছেন কেন যে, ‘হ্যাঁ আমিও দিমাগী নকশাল।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে লক্ষ লক্ষ ফলোওয়ার নিয়ে কেন গড়ে উঠছে ‘দিমাগী নকশাল পার্টি’? লড়াইটা কি আসলে দিমাগ বনাম অন্ধভক্তির?


Friday, 7 August 2026

বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাট!

অসমাপ্ত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



কৌশিক গাঙ্গুলির 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ছবিটি গত জুলাইয়ে রিলিজ পেয়েছে। ছবিটি একটি দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তার পরিসর ব্যক্তিগত গৃহের দেওয়াল টপকে সমাজ, শ্রেণি ও সিনেমার বাণিজ্যিক ব্যাকরণের দিকে চলে যায়। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য, ছবিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যে কীভাবে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা ও 'অসমাপ্ত দায়'এর রাজনীতি কাজ করে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রা। পেশায় সে একজন শিক্ষিকা। তার কোনও সন্তান নেই। তবে এর জন্য শুভ্রা দায়ী নয়। এর কারণ সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায় (চরিত্রে কৌশিক সেন), শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী ও পেশায় অধ্যাপক। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই দায়ের বোঝা শুভ্রার উপরেই পড়ে। প্রচার হয় শুভ্রাই সন্তান ধারণে অপারগ। সুমনের কোনও দায় নেই। বিচ্ছেদের পর সুমন দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তার স্ত্রী মেঘনা। মেঘনা মুসলমান। এক ছোট্ট কন্যা সন্তান সহ মেঘনাকে বিয়ে করে সুমন। কিন্তু খাতায় কলমে সুমন মেঘনার মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ, একজন শিক্ষিত অধ্যাপক হিসেবে তাকে আভিজাত্যের ভান করতে হয়। মেয়ে ছাড়া যেন তার চলবে না, এমন একটি ভাবমূর্তি তাকে বজায় রাখতে হয়।

আখ্যানের মোড় ঘোরে মেঘনার অসুস্থতায়। জানা যায়, অ্যাডভান্স স্টেজের টিউমার ও ক্যান্সার। গল্পের জটিলতায় অকস্মাৎ শুভ্রার উপর এসে পড়ে একটি নৈতিক দায়। মেঘনার কন্যা সন্তানটি যাতে এই বিপদের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব শুভ্রা অস্বীকার করতে পারে না। এই বিন্দুতেই ছবির শিরোনাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইনত শুভ্রা সুমনের প্রাক্তন, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক ভাবে সে আজও অর্ধাঙ্গিনী। একই সময়ে মেঘনাও সুমনের বর্তমান অর্ধাঙ্গিনী। ফলে, সুমনের জীবনে দুই সময়ের দুই নারী এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ছবির শেষে মেঘনার পরিণতি নির্মম।

'আজও অর্ধাঙ্গিনী' একটি স্পষ্টতই শহুরে মধ্যবিত্তের আখ্যান। এবং এটিই এর সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান। শুভ্রা শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং তার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ভাষা আছে। তার শোক পর্দায় স্থান পাওয়ার সামাজিক পুঁজি আছে। সিনেমা একটি বাণিজ্য। মধ্যবিত্তের সমস্যা সিনেমার এক বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র।

এই প্রসঙ্গেই ২০২৪ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে অভয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মর্তব্য। সে ঘটনার পর শহরে যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, বাইরে থেকে তাকে লিঙ্গ বয়ানের রাজনীতি মনে হলেও আদতে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন। যে সমস্ত গরিব, কাজের মহিলা, প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা রোজ নিগৃহীত হন, তাদের জন্য রাত জাগা হয় না। কিন্তু যখন ঘটনার কেন্দ্রে আসেন একজন শিক্ষিতা, এমডি পাঠরতা ডাক্তার, তখন সেই ঘটনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'ও সেই একই কাঠামোর অনুসারী। শুভ্রার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পর্দায় আসে কারণ সে মধ্যবিত্ত। কৌশিক গাঙ্গুলিদের সিনেমা নিয়ে ব্যবসা করতেই হবে। তাই প্রচলিত ফিকশনাল মেলোড্রামাকে কখনই নন-ফিকশনাল বাস্তবতায় থাকা সমগ্র মেয়েদের আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ছবিটি সেই নিরাপদ বাস্তবতাকেই বেছে নেয় যা মধ্যবিত্ত দর্শক দেখতে অভ্যস্ত। এখানে চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির যন্ত্রণাকেই দৃশ্যমান করে এবং তাকেই রাজনীতি বলে চালায়।

এই আখ্যানটি মেলোড্রামার ব্যাকরণকেও অস্বীকার করে না। মেঘনার ক্যান্সার, দাম্পত্যের ভুল বোঝাবুঝি এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন-- এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যে টুইস্ট আনে। এটি বাণিজ্যিক সিনেমার একটি অবশ্যম্ভাবী শর্ত। শুধুমাত্র দাম্পত্য টানাপোড়েন দিয়ে দু' ঘণ্টার ছবিকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত অসুস্থতা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের মতো আবেগীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মেলোড্রামার ভেতরেই একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও লুকিয়ে আছে। একজন নারী কেন অন্য নারীর সন্তানের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে! এই বাধ্যতা কি ভালোবাসা থেকে আসে, নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারীত্বের সংজ্ঞা থেকে?

ছবির ফর্মগত বৈশিষ্ট্য হল এর অসমাপ্তি। কৌশিক গাঙ্গুলি কোনও চূড়ান্ত মীমাংসায় যাননি। শুভ্রা শেষ পর্যন্ত কী করল, এই প্রশ্নটি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালক লম্বা টেক, স্থির ক্যামেরা ও ন্যূনতম আবহসংগীত ব্যবহার করেছেন। এর ফলে দৃশ্যগুলোতে একটি ডকুমেন্টারিসুলভ বাস্তবতা তৈরি হয়। শুভ্রার নিঃসঙ্গ হাঁটা বা পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে ক্যামেরা তাড়াহুড়ো করে না। এই স্থবিরতাই দর্শকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, প্রথাগত সিনেমা ক্লাইম্যাক্স দেয়। কিন্তু জীবন ক্লাইম্যাক্স দেয় না। জীবন শুধু চলতে থাকে। এখানে ক্যামেরা শুভ্রাকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে না, বরং এক চিন্তাশীল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

সব শেষে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনি কাগজে শেষ হলেও সামাজিক ও মানসিক ভাবে ফুরোয় না। শুভ্রা এবং মেঘনা-- দুজনেই সুমনের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু এই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া তাদের পছন্দ নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা। একজন নারীকে যতক্ষণ না স্ত্রী ও মা-- এই দুই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ততক্ষণ সমাজ তাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করে না। শুভ্রার ক্ষেত্রে এই অসম্পূর্ণতার তকমা আরও নির্মম। কারণ, সন্তান না থাকার দায় তার নয়, তবুও দায় তার ঘাড়েই পড়েছে। অথচ পরিস্থিতির চাপে তাকেই আবার অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কৌশিক গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতির জন্য কোনও উত্তর রাখেননি। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। আর সেই প্রশ্নের নামই 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'। 

সিনেমা করিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলি'রা কিন্তু সবটাই বোঝেন, কিন্তু বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাটের বাইরে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেন না; এটা শুধু শ্রেণি চরিত্র নয়, শহুরে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি।