‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।
আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।
সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।
কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন।
এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।
যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।
তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই।
বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!

অসামান্য একটি লেখা, লেখাটা ছড়িয়ে পড়ুক,, আদিত্যরা সংখ্যায় বাড়ুক,জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক......
ReplyDeleteওরে নবীন ওর আমার কাঁচা আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা"