স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।
ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।
তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।
তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ।
তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে।
তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।
এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।
কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক 'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।
আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।
তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।
কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।
তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।
আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।

খুব ভালো লেখা
ReplyDelete