Sunday, 5 July 2026

ফিরে দেখা: চলচ্চিত্র উৎসব

সিনেমার খোলা জানালা বন্ধ?

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



এই লেখাটা আজ ২০২৬-এর জুলাই মাসে বসে লিখতে হচ্ছে। কারণ, ২০২৫-এর নভেম্বরে হয়ে যাওয়া ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আজ হঠাৎ করেই একটা দলিল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে কলকাতা কি আবার এমন একটা জানালা খুলে রাখতে পারবে, যেখান দিয়ে গোটা দুনিয়ার যন্ত্রণা, প্রতিরোধ আর স্বপ্ন এসে আমাদের ঘরে ঢোকে?

বইমেলা আর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল— এই দুই উৎসবের হাত ধরেই কলকাতা গত কয়েক দশক ধরে চিনেছে পৃথিবীকে। মরুভূমির বেদুইন থেকে আমাজনের আদিবাসী, বসনিয়ার উদ্বাস্তু থেকে মণিপুরের কান্না— সব ভাষা, সব ধর্ম, সব লড়াইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় এই দুই আঙিনাতেই। সিনেমা শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল নাগরিক শিক্ষার পাঠশালা। আমরা শিখেছি সহাবস্থান কাকে বলে, মানুষের অধিকার কেন জরুরি, রাষ্ট্র যখন খাঁচা হয়ে ওঠে তখন শিল্প কীভাবে তালা ভাঙে।

আজ বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। নতুন ক্ষমতা-কাঠামোয় সংস্কৃতি কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যে শহর দেশভাগের ছেঁড়া শিকড়ের গল্প দেখিয়ে কেঁদেছে, যে শহর মানবিকতার আলোয় পথ চিনেছে, সেই শহর কি আগামী দিনেও অভিবাসী মানুষ, উদ্বাস্তু পরিবার, দলিত কণ্ঠস্বর, আদিবাসী অধিকার, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের পাশে একইভাবে দাঁড়াতে পারবে? শোষণের বিরুদ্ধে মানবাধিকারের পক্ষে যে-স্বর কলকাতা এতদিন তুলেছে, সেই স্বর কি আগের মতোই মর্যাদা পাবে? তাই যখন চারপাশে দেওয়াল উঠছে, তখন ২০২৫-এর নভেম্বরে দেখা সেই ছবিগুলোর কথাই বারবার ফিরে আসছে। কারণ সেগুলো প্রমাণ করেছিল— উচ্ছেদ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা আর কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও পৃথিবী জুড়ে একটা ঐকতান বাজছে। সিনেমা সেই ঐকতানেরই নাম।

৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলেছিল ৬ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর (২০২৫) পর্যন্ত। ৩৯টি দেশের ২১৫টি ছবি দেখানো হয়েছিল ২১টি প্রেক্ষাগৃহে। উৎসব কর্তৃপক্ষ নতুন বিভাগ ‘Beyond Borders’ চালু করেছিল, যেখানে মূল থিম ছিল বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন। পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত, লোভে ঢাকা যুগে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তবু সিনেমা বিশৃঙ্খলার মধ্যে আলোর দিশারি হয়ে জ্বলছে— এই বার্তাই উৎসবের রাজনৈতিক অভিমুখ স্পষ্ট করে দেয়।



এই প্রেক্ষাপটে প্যালেস্টাইনের ছবিগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। ‘Palestine 36’ ছিল প্যালেস্টাইনের অস্কারে পাঠানো অফিসিয়াল ছবি। ১৯৩৬-১৯৩৯ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্যালেস্টিনি বিদ্রোহের পটভূমিতে তৈরি এই ছবি দেখায়, ১৯১৭-এর বালফোর ঘোষণার পর কীভাবে ভূমি-হারানো মানুষের দুর্দশা শুরু হয়। ছবিতে ব্রিটিশ দমননীতি, জমি দখল আর স্থানীয়দের বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া স্পষ্ট। উপনিবেশবাদ কীভাবে ‘আমরা-ওরা’ বিভাজন তৈরি করে রাষ্ট্রীয় হিংসার বৈধতা দেয়, সেই ইতিহাসকে ছবিটি সামনে আনে। রশিদ মাশারাবির ‘Songe’এও দখলদারিত্ব ও নির্বাসনের যন্ত্রণা উঠে আসে। লেবাননের 'Tales of the Wounded Land' ২০২৩-২৪ সালের বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নাবাতিয়েহ অঞ্চলের দলিল। পরিচালক দেখান, ভাঙা দেওয়াল শুধু ইঁট-কাঠ নয়, আঘাত আর স্মৃতির ভাষা।

উদ্বাস্তু সংকটের আরেক দলিল কাজাখস্তানের ‘Entrapment’। ছবিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আগ্রাসনের আশঙ্কায় সোভিয়েত অঞ্চল থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে। রেল স্টেশনে ছোট্ট মেয়ে ল্যাম্পপোস্ট ধরে মাকে খুঁজছে— এই একটা দৃশ্যই বাস্তুচ্যুতির সমস্ত আবেগ ধরে রাখে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কীভাবে সাধারণ মানুষকে অসহায় করে, তা এখানে নির্মমভাবে ফুটে ওঠে।

ইরানের ‘Scarecrow’ স্বৈরতন্ত্রের সাংস্কৃতিক চেহারা তুলে ধরে। ছবিতে এক মেয়ের শিল্পীসত্তাকে পরিবার দমিয়ে রাখে। দূর দেশে ‘স্কেয়ারক্রো’ সেজে অভিনয় করা তার দমিত ইচ্ছারই রূপক। রাষ্ট্র ও পরিবারের দ্বৈত নিপীড়নের মধ্যে নারীর পরিচয় সংকট এখানে স্পষ্ট। ভিন্ন স্বরকে চুপ করিয়ে দেওয়ার এই কৌশলই নয়া ফ্যাসিবাদের ভাষা।

শ্রীলঙ্কার ‘Riverstone’ রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দলিল। রোড মুভিতে তিন পুলিশ অফিসার উপরমহলের আদেশে এক সন্দেহভাজনকে হত্যা করে। আইন যখন ক্ষমতার হাতে বন্দী, নাগরিকের নিরাপত্তা তখন শব্দমাত্র। জার্মানি-ইতালি-অস্ট্রিয়ার যৌথ প্রযোজনা ‘A Land Within’ দেখায়, ইতালীয় প্রশাসনের অধীনে দক্ষিণ টাইরলের জার্মান-ভাষী সংখ্যালঘুরা কীভাবে জাতিগত দমনের শিকার। ইতিহাসের উত্তাল মুহূর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

ভারতের ছবিগুলোও কম সাহসী নয়। ‘Pinjar’ কলকাতায় মুসলিমদের ভাড়া বাড়ির বৈষম্য নিয়ে। কোভিডের সময় এক মুসলিম পরিবারকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। ছবিতে বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর কাজের লোক গোবর-জল দিয়ে উঠোন ধোয়। খাঁচার পাখি এখানে কুসংস্কার আর সামন্ততন্ত্রে বন্দী আত্মার প্রতীক। কর্পোরেট শহরের বুকে এই ধর্মীয় অস্পৃশ্যতা নীরব ফ্যাসিবাদ ছাড়া কিছু নয়। ‘White Snow’ সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াই। কার্গিলের এক শর্ট ফিল্ম ধর্মীয় নেতারা নিষিদ্ধ করেন প্রসব-পরবর্তী রক্ত দেখানোর অপরাধে। ছবিতে এক মা নিষিদ্ধ ডিভিডি আর টিভি নিয়ে ইয়াকের পিঠে চেপে উপত্যকায় ঘোরেন। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের যৌথ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এ এক মায়ের শিল্প-বিদ্রোহ।

গুয়াতেমালার ‘Mountains of Fire’ কর্পোরেট-রাষ্ট্র আঁতাতের গল্প। ছবিতে দুই আগ্নেয়গিরি-বিশেষজ্ঞ আদিবাসী গ্রামে গিয়ে দেখেন, সরকার কীভাবে প্রান্তিক মানুষকে অবহেলা করছে। উন্নয়নের নামে জমি থেকে উৎখাত, বিশ্বাসকে অসম্মান— এটাই কর্পোরেট আধিপত্যের নতুন চেহারা।


'কোমলগান্ধার'

উৎসবের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অংশ ছিল এক কিংবদন্তি পরিচালকের শতবর্ষ উদযাপন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’— এই ছবিগুলো দেশভাগ আর শিকড়-ছেঁড়া মানুষের মহাকাব্য। ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বে ১২.৩২ কোটি মানুষ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত। সেই কারণেই এই ছবিগুলো আজও জরুরি। ‘Beyond Borders’ বিভাগে মিশরের ‘The Brink of Dreams’ আর সুদানের ‘Madaniya’ দেখিয়েছে, তরুণরা রাস্তার থিয়েটার আর অনলাইন জোটে কীভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। এগুলো কোটি কোটি মানুষের শিকড়হীন জীবনের যন্ত্রণা ও আশার অন্বেষণ এবং বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের শক্তিশালী আখ্যান। পোল্যান্ড ছিল এবারের ফোকাস কান্ট্রি। ১৯টি পোলিশ ছবি দেখানো হয়। পরিবেশ নিয়ে চারটি আন্তর্জাতিক ছবিও ছিল। সত্যজিৎ রায়ের উক্তি দিয়ে ‘Beyond Borders’ বিভাগ শুরু হয়েছিল: 'তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল!'।

এইসব ছবি একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, ফ্যাসিবাদ এখন আর শুধু বুটের আওয়াজ নয়। কখনও তা উচ্ছেদের নোটিশ, কখনও তা নোটিশ না দিয়েও রাতারাতি উচ্ছেদ, কখনও ভাড়া বাড়ির বৈষম্য, কখনও সিনেমায় সেন্সরশিপের কাঁচি, কখনও উন্নয়নের বুলডোজার। ৩১তম কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সেই অদৃশ্য খাঁচাগুলোকেই দৃশ্যমান করেছিল। আজ ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশ্ন একটাই— এই জানালাটা খোলা থাকবে তো? সিনেমা যদি প্রতিরোধের ভাষা হয়, তবে সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদেরই। কারণ, দেওয়াল তোলা সহজ, জানালা খোলা রাখাটাই কঠিন। আর কলকাতা যদি সেই কঠিন কাজটাই ভুলে যায়, তবে 'কী কী ভুলে যেতে হবে আর কী কী ভাবে বাধ্য থাকতে হবে'-- এই ব্রাকেটে যেন নাগরিক অধিকার আন্দোলন বদ্ধ না থাকে।