Tuesday, 16 June 2026

'দ্য ট্যাপ কোড'

'রাজার কাছে খবর ছোটে...'

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৪০ সালে প্রকাশিত আর্থার কোয়েসলার'এর বিখ্যাত মাস্টারপিস উপন্যাস 'ডার্কনেস অ্যাট নুন' (Darkness at Noon)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী অংশ ছিল 'দ্য ট্যাপ কোড'। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রুব্যাশভ যখন একাকী কারাকক্ষে বন্দী, তিনি তাঁর পাশের সেলের বন্দীর (যার কোড নাম '৪৪২ নম্বর সেল') সঙ্গে দেয়ালে টোকা মেরে যোগাযোগ রাখতেন। এই যোগাযোগের জন্য উভয়েই একটি গ্রিড পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। ইংরেজি বর্ণমালাকে (A থেকে Z) একটি ৫×৫ গ্রিডে সাজানো হত (সাধারণত I এবং J-কে একই ঘরে রাখা হত)। প্রথম দফায় টোকা মেরে বোঝানো হত বর্ণটি কত নম্বর সারিতে (Row) আছে, আর দ্বিতীয় দফার টোকায় সেটি কত নম্বর স্তম্ভে (Column) আছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ 'B' লিখতে চায়, তবে সে প্রথমে ১ বার টোকা দেবে (১ নম্বর সারি), তারপর একটু থেমে ২ বার টোকা দেবে (২ নম্বর স্তম্ভ)। 

বাস্তবে, মুসোলিনির সময় ইতালির রাজবন্দীরাও গ্রিডভিত্তিক ট্যাপ কোড ব্যবহার করতেন। ইতালিয় বর্ণমালার জন্য তারা গ্রিডটি কিছুটা বদলে নিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে 'গ্রেট পার্জ'এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখা কোয়েসলার'এর উপন্যাসে বা বাস্তবে এই দেয়ালে টোকা মারা শব্দগুচ্ছ শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, বরং চরম একাকীত্ব ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন মানুষের বেঁচে থাকা ও একে অপরের পাশে থাকার এক অদ্ভুত মানবিক দলিল হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মানুষের আদিম মানবিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই— যেখানে প্রতিটি টোকার শব্দ বলত, 'আমি এখনও বেঁচে আছি, তুমি একা নও।'

আজ চারপাশ যখন স্তব্ধ হয়ে আসছে, সোশ্যাল মিডিয়া অথবা প্রকাশ্য সভায় কিংবা 'বন্ধু' মহলেও কারও কোনও একটি সমালোচনামূলক উক্তি বা চলমান ঘটনাবলী সম্পর্কে 'মূলধারা' প্রচারিত মতামতের বিরোধী সামান্য ভিন্ন মত কেউ পোষণ করলেই শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী বা পাড়া-প্রতিবেশীদের এক অংশও সবলে তার ওপরে নৃশংস ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তখন প্রতিটি টোকার শব্দ গভীরভাবে অর্থবহ। এই ঝাঁপিয়ে পড়াটা কেবলমাত্র শারীরিক নয়, তীব্র ভাবে মানসিকও। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রাবাসের র‍্যাগিং'এর মতো। আগে আমরা দেখেছি, শাসক-বিরোধী কোনও মতামত প্রকাশে রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসক দলের মাস্তান ও মাতব্বরেরা মূলত বিরোধী দলের কর্মী বা সমর্থকদের উপর হামলা করত। তা নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা হত, তুমুল চাপানউতোর চলত, মিডিয়া ইত্যাদিতেও সোরগোল উঠত, তারপর তার ভয়াবহতা অথবা অভিঘাতে হয়তো কিছু প্রলেপ পড়ত। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা একতরফা। আপনার কোথাও যাওয়ার নেই, কাওকে কিছু বলার নেই, কোনওভাবে বলতে পারলেও কারও শোনার সাহসটুকু নেই, মিডিয়া বলেও কিছু নেই, আদালতও প্রায়-বধির (যদি বা আদালত কিছু বলেও তা মানারও কোনও দরকার নেই)। ভবিষ্যতে হয়তো বিরোধী দল বলেও কিছু থাকবে না। এমন একটি সময়ের গর্ভে পৌঁছনো বোধকরি আবশ্যিক ছিল। না হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষ চেনার পাঠ অসমাপ্ত থেকে যেত।

ছোটবেলায় দেখতাম, ছিঁচকে চোর ধরার জন্য পাড়ার দাদা-কাকুরা দল বেঁধে 'নাইট গার্ড' বা রাতপাহারা দিত। 'ধরা যাক দু-একটি ইঁদুর এবার'এর মতো মাঝেসাঝে তেমন ছিঁচকে কেউ ধরাও পড়ত। একবার তেমন এক চোর ধরা পড়ার খবর শুনে সক্কালবেলা উঠে দৌড়ে গিয়ে দেখি, একটি ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পাড়ার ওই ভদ্দর দাদা-কাকুরা তাকে নৃশংস ভাবে মারছে। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। চোরটির মুখচোখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, সে আকুল নয়নে গলা ছেড়ে চীৎকার করছে, আর এক একজন পালা করে কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ লাথি মেরে, কেউ ঘুষিতে তাকে ছিন্নভিন্ন করছে। এখনও মনে আছে, পাড়ার সব থেকে গোবেচারা, নিরীহ, স্বল্পবাক, ভিতু লোকগুলি তাকে সব থেকে নৃশংস উপায়ে মারছে। জীবনে প্রথম ও শেষ দেখা এই দৃশ্যকল্প আমি বড়জোর মিনিট খানেক কি দেড়েক দেখতে পেরেছিলাম, তারপর এক ছুটে বাড়ি এসে বাথরুমে ঢুকে কেঁদে ফেলি। কিন্তু মন থেকে সে স্মৃতি আজও মুছতে পারিনি। বার বার মনে হয়েছে, ছিঁচকে চুরির শাস্তি তো অমন কঠোর হতে পারে না। আর ওই 'কাকু'টাই বা কীভাবে অমন ভয়ঙ্কর হয়ে চোরটাকে নির্দয় ভাবে মারতে পারছে। তা কি নিছকই সম্পত্তি চুরির আশঙ্কা থেকে নাকি তার অনেকের বিরুদ্ধে অনেক কিছু প্রতিশোধ নেওয়ার ছিল, সেই অশক্ত ও হীনম্মন্য মনের সে সাধ্যি যখন নেই, তখন যাকে হাতের কাছে পাওয়া গেল, তাকেই না হয়...। 

আজ চারপাশে যেন সেই দৃশ্যের মেলা। হঠাৎ করে একপাল মুখচোরা, আপাত নিরীহ কিছু চেনা জন যেন অতীব হিংস্র হয়ে উঠেছে; ছোটবেলায় দেখা সেই গোবেচারা কাকু-দাদাগুলির মতোই, যারা কারও সাতেপাঁচে থাকত না, কোনও বিপদে-আপদেও তাদের পাওয়া যেত না, স্বার্থগন্ধ লালায়িত সেই মানুষগুলো চরে বেড়াত নানাবিধ সুযোগের সন্ধানে আর চুপিচুপি এর-ওর কান ভাঙ্গিয়ে রোপণ করত বিষ ও প্রতিহিংসা। জিঘাংসাই যখন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রনীতি, তখন এই লোকগুলিই ক্ষমতার আধার হয়ে বিষবাষ্পে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। এক সর্বগ্রাসী হিংস্র সমাজের নির্মাণ হতে থাকে। আমরা দগ্ধ হই। আমাদের শব্দমালা হারিয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই মেটাফোরে। তৈরি হয় ট্যাপ কোড। নির্মিত হয় এসোপিয় ভাষা। ১৯২২ সালে 'ধূমকেতু' পত্রিকায় নজরুল লেখেন 'আনন্দময়ীর আগমনে'। তবুও তিনি ছাড় পান না। ইংরেজরা তাঁকে বন্দী করে। পরে রবীন্দ্রনাথ লিখবেন 'তাসের দেশ'। পাশাপাশি, ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের বন্দীরা পাহাড়ি বা আঞ্চলিক উপভাষা (যেমন, সিসিলিয়ান বা নেপোলিটান ডায়ালেক্ট) ব্যবহার করতেন, যা উত্তর ইতালির ফ্যাসিবাদী প্রহরীরা সহজে বুঝতে পারত না। অন্যদিকে, হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের (যেমন, আউশভিৎস, বুখেনভাল্ড) নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্রতার কারণে সেখানে বেঁচে থাকা ও প্রতিরোধের জন্য বন্দীরা অদ্ভুত সব ভাষা তৈরি করেন। ল্যাগার-জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বন্দীরা থাকতেন। তাঁরা জার্মান, পোলিশ, ইয়াইডিশ (Yiddish) শব্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র ‘ক্যাম্প ল্যাঙ্গুয়েজ’ তৈরি করেন। প্রহরীরা এই ভাষা বুঝত না, ফলে বন্দীরা প্রতিরোধের গোপন বার্তা আদান-প্রদান করতেন।

আর এইভাবেই তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক দলিল ও সাহিত্যসম্ভারও। যেমন:

১) আন্তোনিও গ্রামশির 'প্রিজন নোটবুকস': ইতালির বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি মুসোলিনির কারাগারে প্রায় ১১ বছর বন্দী ছিলেন। কারাগারে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘প্রিজন নোটবুকস’ লেখেন। ফ্যাসিবাদী সেন্সরশিপ এড়াতে তিনি খাতার পাতায় সরাসরি 'মার্কসবাদ', 'লেনিন' বা 'শ্রেণি সংগ্রাম' শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। পরিবর্তে তিনি ছদ্মনাম বা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতেন। যেমন, কার্ল মার্কস'কে তিনি লিখতেন 'দ্য ফাউন্ডার'।

২) প্রিমো লেভির 'ইফ দিস ইজ আ ম্যান': নাৎসি আউশভিৎস ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা ইতালিয় লেখক প্রিমো লেভি তাঁর এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে ক্যাম্পের ভেতরের সেই গোপন ভাষা ও যোগাযোগের কথা বিস্তারিত লিখেছেন, কীভাবে শব্দের সামান্য হেরফের করে বা চোখের ইশারায় একে অপরকে প্রহরীদের চাবুক বা গ্যাস চেম্বার থেকে বাঁচানো হত।

৩) হান্স ফালাডা'র 'এভরি ম্যান ডাইস অ্যালোন': নাৎসি জার্মানির পটভূমিতে লেখা এই বিখ্যাত উপন্যাসে (যা বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত) আমরা পাই, কীভাবে এক সাধারণ দম্পতি হিটলারের বিরুদ্ধে পোস্টকার্ডে গোপন বার্তা লিখে বার্লিনের আনাচে-কানাচে ফেলে রেখে এক নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন; যা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যোগাযোগের এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল।

অতএব, 'অচলায়তন'এর বিরুদ্ধে দর্ভক ও শোনপাংশুদের নিয়ে আচার্য এসে পড়েন, অথবা, 'তাসের দেশ'এর রুইতন ও হর্তনের অধীন অন্ধভক্ত টেক্কা, গোলাম, সাহেবদের রাজত্বও ভেঙে পড়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত  'চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়/ এদিক ওদিক ডাইনে বাঁয়,/ রাজার কাছে খবর ছোটে,/ পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,/ দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়-/ একুশ হাতা জল গেলায়।' (একুশে আইন, সুকুমার রায়)।


2 comments:

  1. বাহ্!সময়োপোযোগী লেখা!পড়ে ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  2. অসামান্য লেখা। শুধু অসামান্য বলাটাই ঠিক নয় , অত্যন্ত সাহসী লেখা। আমরা অল্প বয়স থেকে জেনে এসেছি কোয়েসলার স্তালিন জমানার কমিউনিস্ট অত্যাচার নিয়ে অথবা মার্ক্সবাদের প্রয়োগ নিয়ে স্তালিনের অত্যাচার নিয়ে এই বই লিখেছেন , এবং লেখার ফলে তাঁকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়। এছাড়াও তিনি কমিউনিস্ট জমানার অন্দরে ঢুকে যে বিশ্লেষণ করেছেন তা অতুলনীয়। তবে অনিন্দ্য এর বাইরেও কোয়েসলারের তদানীন্তন সময়ের জেল বন্দিদের নিয়ে যে বিশ্লেষণ করেছেন তা আমাদের কাছে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হল সন্দেহ নেই। তবে আমরা বর্তমানে যে অবস্থার মধ্যে আছি সেটাও কোয়েসলারের ভাবনার ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। জানিনা আগামীতে আমরা কোন অবস্থার মধ্যে পৌঁছব। হয়ত লেখা দূরস্থান , ভাবনার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিশেষ আরোপিত হতেই পারে। মধ্যবিত্ত সমাজ এখনো নিঃশ্চুপ। ক্রিস্টোফার হিল রুশ বিপ্লবের ইতিহাস লিখতে গিয়ে প্রথমেই বলেছিলেন যে রাশিয়াতে বিপ্লব আগে না হওয়ার বড় কারণ হল সেখানে কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল না , আমাদের দেশে সব কিছু থেকেও কেন নেই ? এর উত্তর কে দেবে ? তবে অপেক্ষায় আছি , এই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষ একদিন প্রতিবাদের ধ্বজা তুলে ধরবে।

    ReplyDelete