Monday, 30 March 2026

অসমের সমীকরণ

বিরোধী জোট পারবে কী?

বাসব রায়



অসমের নির্বাচন ৯ এপ্রিল। জিতবে কে, এই প্রশ্ন সবার। সরাসরি কে জিতবে তার উত্তর না খুঁজে কার জয়ের সম্ভাবনা বেশি তা নিয়ে আলোচনা মনে হয় বেশি ভালো। ২০১৬ সাল থেকে অসমে বিজেপি জোট সরকার চলছে। জোট তিন দলের-- বিজেপি, অসম গণ পরিষদ বা অগপ এবং বড়ো পিপলস ফ্রন্ট বা বিপিএফ।

অসমের হিন্দু বাঙালিরা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে ভোট দিচ্ছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্রে যে দলের সরকার থাকে তাকেই ভোট দেয় অসমের হিন্দু বাঙালিরা। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, অসম আন্দোলনের ভয়। অসমে বাঙালিরা মার খেলে সেটা আটকাবে কোনও সর্বভারতীয় দল, যা অসমের কোনও আঞ্চলিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। কেন্দ্রে কংগ্রেস থাকতে অসমের বাঙালিরা ঢেলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। এখন সেটাই পাচ্ছে বিজেপি। অসমিয়াদের প্রথম পছন্দের দল নিঃসন্দেহে অসম গণ পরিষদ। বিজেপি জোট অসমিয়াদের ভোট‌ও পাচ্ছে।

বড়োল্যান্ডে এগারোটা কেন্দ্র। যদিও সেখানে বড়োভাষী সংখ্যায় কম, কিন্তু স্বশাসিত পরিষদ তাদের‌ই। বিপিএফের জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী ইউপিপিএল। তবে সম্প্রতি বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় ইউপিপিএলের শক্তি কমে গেছে।

ভোট ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকে অসম সরকার ৩২ লক্ষ মহিলাকে ৩২০০ কোটি টাকা বীজ কেনার জন্য দিয়েছে। আবার এ মাসেই অরুণোদয় প্রকল্পে ৪০ লক্ষ মহিলাকে দিয়েছে ৯ হাজার করে মোট ৩৫০০ কোটি টাকা। যার সরল হিসেব হল, অসমের ১২৬ কেন্দ্র পিছু ইতিমধ্যেই বিজেপি খরচ করে ফেলেছে ৫০ কোটি টাকা।

গত কয়েক বছর ধরে অসম সরকার 'অবৈধ দখলদারদের' উচ্ছেদ করে জমি উদ্ধারে নেমেছে। এবং আশ্চর্যের কিছু নয় যে এর অধিকাংশ জমিই খুব কম দামে পেয়েছে আদানি গোষ্ঠী আর খুব কম পরিমাণে পতঞ্জলি গোষ্ঠী। মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে ধারাবি উন্নয়নের জন্য এক লক্ষ কোটি টাকার বরাত পেয়েছিল আদানি গোষ্ঠী। বিজেপি বিরোধী সরকার হলে ওই চুক্তি বাতিল হয়ে যেত বলেই মহারাষ্ট্র নির্বাচনে সবরকম উপায় কাজে লাগিয়েছিল বিজেপি। ফলাফল সবাই জানে। অসমের নির্বাচনেও এক‌ই পরিস্থিতি। আদানি গোষ্ঠী সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। 

অসম গণ পরিষদের ২৬ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মুসলমান। মজার বিষয় হল, অসম আন্দোলনের মূল ভিত্তিই ছিল মুসলমান বিরোধ যাকে 'বঙাল খেদা' আন্দোলনের তকমা পরানো হয়েছিল। তো বলার কথা এটাই যে, এবারের নির্বাচনে অগপ ৫'এর বেশি আসন পেলে আমি অন্তত বিস্মিত হব। কারণ আর কিছুই নয়, অসমে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর মুসলমান অধ্যুষিত আসন ছাড়া হয়েছে অগপ'র জন্য।

খুব দেরি করে হলেও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয়েছে উজান অসমের দুই দলের, যথাক্রমে অসম জাতীয় পরিষদ ও রাইজর দল। উজান অসমে ৪৯ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি জোট পেয়েছিল ৩৯। এবার সেটা কমে ৩০'এ আসতে পারে। ২০২৪ লোকসভা ভোটে অসমের মুসলমানরা ঢেলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। এবার তার অন্যথা হ‌ওয়ার সম্ভাবনা কম। 

অসমের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। বিরোধীদের প্রচারে এটা অন্যতম বড় বিষয়। এ ছাড়া রয়েছে নকল কংগ্রেস বনাম প্রকৃত কংগ্রেস প্রচার। কারণ, অসম বিজেপির প্রায় অর্ধেক প্রার্থী কংগ্রেস থেকে এসেছে। কিন্তু এসব অভিযোগ মানুষ কতটা বিশ্বাস করবে সেটাই বড় প্রশ্ন। দুটি শিবিরেই প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। টিকিট না পেয়ে দু' তরফেই কয়েকটি আসনে নির্দল হিসেবে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

মনোনয়ন পর্বে নাটকের পর নাটক। একেবারে শেষ মুহূর্তে জোট হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে রাইজর দলের, যার প্রধান অখিল গগৈ। এ ছাড়া রয়েছেন অসম জাতীয় পরিষদের লুরিণজ্যোতি গগৈ। বামেরা কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে। কিন্তু নাটক এটা নয়, নাটক অন্যত্র। বর্তমানের ১৮ বিধায়ককে বিজেপি প্রার্থী করেনি। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদ্রোহ প্রকাশ করলেও অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে আলোচনার পর চুপ করেছেন। হাফলংয়ের বিধায়ক তথা অসমের মন্ত্রী নন্দিতা গার্লোসাকে প্রার্থী করেনি বিজেপি। তিনি হুমকি দেন কংগ্রেসে যোগ দেবেন। সাত তাড়াতাড়ি হেলিকপ্টারে করে উড়ে গিয়ে নন্দিতাকে বোঝান হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। হাফলং থেকে আরেক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দেয় কংগ্রেস। মজার বিষয়, পরদিনই হাফলংয়ে নন্দিতা গার্লোসা হয়ে যান কংগ্রেসের প্রার্থী। কংগ্রেসের নগাঁওয়ের সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ দল ছেড়েই অসমের রাজধানী দিশপুরে বিজেপি প্রার্থী হয়ে গেছেন। দিশপুরের বর্তমান বিধায়ক অতুল বরা বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছিলেন। হিমন্ত তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথাবার্তার পর অতুল শান্ত হয়ে যান। 

অসমে কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ভুপেন বরা দল ছেড়েছেন। বিহপুরিয়ায় তিনি ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যান। এবার তাঁকে বিজেপি প্রার্থী করেছে। বর্তমানের বিধায়ক বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছিলেন, হিমন্ত গিয়ে কথা বলার পর এখন চুপ। বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জে কংগ্রেসের বিধায়ক কমলাক্ষ বিজেপিতে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন। কাটিগড়ায় আবার বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন অমরচান্দ। মধ্য গুয়াহাটি কেন্দ্রে আবার অন্যরকম গল্প। বিজেপি'র হয়ে দাঁড়িয়েছেন হিন্দিভাষী বিজয় গুপ্তা। তৃণমূলের পক্ষে বাঙালি অভিজিৎ মজুমদার। কংগ্রেস এই কেন্দ্র ছেড়েছে অসম জাতীয় পরিষদকে। তাদের প্রার্থীই একমাত্র অসমিয়া। নির্বাচন খুব ইন্টারেস্টিং হবে।

এদিকে নির্বাচন কমিশন তার কাজ শুরু করে দিয়েছে-- বরপেটা ও ঢকুয়াখানায় কংগ্রেস প্রার্থীর মনোনয়ন খারিজ করে দিয়েছে। তিতাবর কেন্দ্রে মনোনয়ন বাতিল হয়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থীর। চা-বাগানের ভোট কাটতে অসমের বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে ঝাড়খণ্ডের শাসক দল।

উল্লেখ্য, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ ও বিরোধী জোটের ভোটের ফারাক ছিল মাত্র ০.৮ শতাংশ। যদিও ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে সেই ফারাক বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ শতাংশ। 

এবার কী হয় সেটাই দেখার।


No comments:

Post a Comment