Thursday, 13 October 2022

মোমিনপুরে কী ঘটেছে?

পারস্পরিক অবিশ্বাস থেকে বেরতেই হবে

সুমন সেনগুপ্ত


সামাজিক মাধ্যম থেকে পাড়ার চায়ের দোকানে একটাই প্রশ্ন: মোমিনপুরে কী হয়েছে? কলকাতার পশ্চিম প্রান্তে কি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছে? এই দাঙ্গা কি ১৯৪৬ সালের নোয়াখালি দাঙ্গার সমতূল্য? হিন্দুরা কি সত্যিই আক্রান্ত হয়েছে ইকবালপুরে ও সংলগ্ন অঞ্চলে? কেন ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে ঐ অঞ্চলে? কেনই বা ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে? তাহলে কি প্রশাসন কিছু আড়াল করতে চায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে তথ্য ও সমস্যার ঈষৎ গভীরে যেতে হবে।

প্রথমে খেয়াল করতে হবে, কোন সময়টাকে বেছে নেওয়া হল এই তথাকথিত ‘গোষ্ঠী সংঘর্ষ’ বা 'হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা’ দেখানোর জন্য। সেদিনটা ছিল একদিকে লক্ষ্মী পুজো, অন্যদিকে নবী দিবস। মুসলমান মানুষজনের নমাজ পড়া থেকে শুরু করে হজরত মহম্মদের জন্মদিন, অর্থাৎ নবী দিবস পালন- সব কিছুর মধ্যেই তাঁদের পুরো মহল্লা ও সম্প্রদায়কে জড়িয়ে নেওয়ার বিষয় থাকে। যদিও নবী দিবসে কী হয় তা অনেকের জানা নেই, তাই সেই সূত্র ধরেই আসে অবিশ্বাস। মিলাদ-উন-নবী আসলে হজরত মহম্মদের জন্মদিন পালন। যদিও আজও গ্রামবাংলার অনেক স্থানেই এই নবী দিবস উদযাপন করা হয় না, কিন্তু শহর মফস্বলের বেশ কিছু জায়গায় একজন মুসলমান ধার্মিক মানুষের কী করণীয়, তা নিয়ে দু' একজন মৌলবী এইদিন আলোচনা করেন। তারপর কিছু খাওয়া দাওয়া এবং মিষ্টি বিতরণ করা হয়ে থাকে- এইভাবেই বাংলার স্থানে স্থানে মিলাদ-উন-নবী পালন করা হয়। মৌলবী না পাওয়া গেলে অডিও-যন্ত্র দিয়েও অনেক সময় সিডি বা আগে থেকে বলা কথা প্রচার করা হয়। 

হিন্দুদেরও দুর্গাপুজো বা কালীপুজো বারোয়ারী হয়, কিন্তু তা নিয়ে কোনও মানুষের কোনও আপত্তি শোনা গেছে বলে জানা নেই। যদিও ইদানীং হিন্দুদের বেশ কিছু পুজো বা ধর্মীয় আচার অনেক বেশি বেশি করে বাইরে আনা হচ্ছে, হয়তো গণেশ পুজো বা শিবরাত্রির মতো অনুষ্ঠান বাইরে দেখা যাচ্ছে, হয়তো বা রামনবমীর মতো অনুষ্ঠান বাংলায় হচ্ছে, কিন্তু তা কখনই এই বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আমাদের মা-ঠাকুমারা যে লক্ষ্মীর পুজো করে থাকেন, সেই লক্ষ্মী চঞ্চলা, তাই সেই দেবীকে তাঁরা ঘরের ভিতরেই পুজো করেন। 

তাহলে মোমিনপুরে সেই লক্ষ্মী পুজোকে কেন্দ্র করে গণ্ডগোল কেন? আসলে বিষয়টা লক্ষ্মী পুজোকে জড়িয়ে নয়। বিষয়টা গণ্ডগোল করার জন্য করা; তা থেকে যাতে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা যায় সেই উদ্দেশ্যেই এইসব করা। ২০১৭ থেকে ২০১৯'এর মধ্যে যে সমস্ত 'দাঙ্গা' সারা বাংলার বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে, তার প্রত্যেকটির চরিত্র যদি দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে এগুলি কোনওটিই বড় হাঙ্গামা নয়, কম তীব্রতার। এমন হাঙ্গামায় প্রাণহানি প্রায় নেই বললেই চলে। যদিও এমনতর ঘটনাও মুহূর্তের জন্যও কাম্য নয়। কিছু বাড়িঘর জ্বলার ছবি, গাড়ি এবং বাইক পোড়ার ভিডিও, কিছু মানুষ ঘরছাড়া হওয়া, কয়েকটি ধর্মস্থান আক্রান্ত হওয়ার ছবি, আগুন জ্বলছে, বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, রাস্তায় উত্তেজিত জনতার জটলা- এইরকম ছবি ছড়ানো হয়েছে । বরং, অন্য কোনও অঞ্চলের ছবি ও ভিডিও এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে যে তাকেই সত্যি মনে হয়েছে অনেকের। কিন্তু কোনও এলাকায় সাম্প্রতিক খুব বড় কিছু হয়নি- একমাত্র আসানসোল ছাড়া- কয়েকদিনের মধ্যেই সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও চলে আসে। মোমিনপুরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এটা একটা প্যাটার্ন। এর ফলে যেটা হয়- সারাক্ষণ একটা চাপা টেনশন, একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়। সেই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় ঘৃণার চাষ। ভাইরাল করে দেওয়া হয় 'হিংসার' ভিডিও৷ সত্যের সঙ্গে মিথ্যে মিশিয়ে বয়ান তৈরি করে হাড়হিম করা প্রচার চালানো হয়। উদ্দেশ্য, আমরা চায়ের দোকানে সেইসব নিয়ে আলোচনা করব, মোবাইলে যা আসবে তাই বিশ্বাস করতে শুরু করব, সেগুলিকে ফরওয়ার্ড করব আর অন্যদেরও বলব সেই কথা বিশ্বাস করতে।

আসলে আমাদের পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর ধর্মাচারণ ও তাঁর সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা এত কম জানি, বা বলা ভালো জানি না, যে সেই অজ্ঞানতার মধ্য দিয়ে ঢুকে পরে পারস্পরিক অবিশ্বাস। মোমিনপুরে একটি হরিজন বস্তি আছে, তার পাশেই নবী দিবস পালনের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন কিছু মুসলমান যুবক। পতাকা লাগানোর সময়ে তার বিরোধিতা করেন সেই বস্তির কিছু মানুষ। তাঁরা বলেন পাশেই একটি মন্দির আছে, সুতরাং ওই অঞ্চলে পতাকা লাগানো যাবে না। সেইখান থেকেই শুরু হয় বচসা। সামান্য কথা কাটাকাটিতে তখনকার মতো মিটে গেলেও, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য অনুযায়ী, পরে ওই হরিজন বস্তির মানুষজন এসে ওই পতাকা খুলে নেন। তারপর মুসলমান মানুষজনও প্রতিবাদ করেন। তাঁদের একটাই দাবি- যাঁরা ওই পতাকার অবমাননা করেছেন তাঁদের গ্রেফতার করতে হবে। এই গণ্ডগোলের সময়ে মুসলমান যুবকেরা থানা ঘেরাও করেন, বিক্ষিপ্ত কিছু ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এখান থেকে আসরে নামে বিজেপি। সারা রাত ধরে বিজেপির বিরোধী দলনেতা এবং রাজ্য সভাপতি ট্যুইট করে অনবরত চেষ্টা করতে থাকেন কী করে এই ছোট্ট ঘটনাকে জাতীয় স্তরে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়। 

এএনআই থেকে পরের দিন সকালে কিছু ছবি এবং ভিডিও সহ ট্যুইট করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনওভাবে খবর তৈরি করা যায় না। রিপাবলিক টিভি ও অন্যান্য গোদি মিডিয়া যাঁরা কোনও না কোনও ভাবে সারাক্ষণ চেষ্টা করে চলে কীভাবে যে কোনও ছোট খবরকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাতে- যাতে সমাজের মধ্যে এই গরল আরও বেশি মাত্রায় প্রবেশ করে- তারা অবধি মোমিনপুরের এই ঘটনার এমন কোনও ফুটেজ বা ছবি জোগাড় করতে পারেনি যার মধ্যে দিয়ে তাদের এই কাজটা সহজ হয়। ফলে, কোনওভাবেই আর এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা বিজেপি তুলতে পারেনি। 

প্রচার করা হয়, ঐ মুসলমান যুবকেরা নাকি পাকিস্তানের পতাকা লাগাচ্ছিলেন। অথচ, ইসলামের পতাকা যে সবুজ রঙের এবং তাতে যে চাঁদের ছবি থাকে, তা যেহেতু বেশির ভাগ হিন্দু মানুষের অজানা, তাই তা নিয়েও আরেক প্রস্থ প্রচার চলে যে ঐ মুসলমান যুবকেরা পাকিস্তানের সমর্থক। কিন্তু এত কিছু করেও বিজেপির পক্ষে বাড়তি কিছু করা সম্ভব হয়নি। যে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য তারা ঐ হরিজন বস্তির পিছিয়ে পড়া দলিত ও ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের তাতিয়েছিল, তাঁদেরই একটা অংশ পরে স্বীকার করেছেন যে এমন কিছু হয়নি যা নিয়ে এত শোরগোল করতে হবে।

অতঃ কিম?

আশঙ্কার কথা হল, আজকের অবিশ্বাসের আবহে এই প্রবণতা কিন্তু বাড়তেই থাকবে। প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ একটা কথা বারংবার বলতেন- উঁচু মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সমস্যা কোনওদিনও মিটবে না, কোনও রাজনৈতিক দলের তরফ থেকে এই কাজ করা সম্ভবও নয়। দু' জন প্রতিবেশী মানুষকে পাশাপাশি বসিয়ে একে অন্যের সম্পর্কে জানার মধ্যে দিয়েই এই সমস্যা মিটতে পারে। একজন হিন্দু মানুষ যদি মুসলমান সমাজ, তাঁর ধর্ম, তাঁর সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা করেন, তবেই এই সামাজিক মাধ্যম দিয়ে প্রচারিত মিথ্যে তথ্যকে মোকাবিলা করা সম্ভব। 

এখন যাঁরা মোমিনপুর অঞ্চলে যাচ্ছেন ওইদিনের ঘটনার খোঁজ খবর করতে, তাঁদের মধ্যে কতজনই বা জানেন মুসলমানদের সম্পর্কে? তাঁরা ঈদ-উল-ফিতর বা বকরি-ঈদের তফাত বোঝেন কী? কীরকম আর্থিক অবস্থায় এই মানুষগুলি আছেন, তাঁদের মধ্যে কতজন সরকারি বা বেসরকারি চাকরি করেন? কেন সরকারি চাকরিতে তাঁদের আনুপাতিক হার অত্যন্ত কম? তাঁদের মধ্যে শিক্ষার হার কেমন? কেন এখনও একজন মুসলমান যুবক বা যুবতীকে শহরে ঘর ভাড়া পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়? এই জানার মধ্যে দিয়েই আসলে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব। তাহলেই কাটবে অজ্ঞানতা ও অবিশ্বাস। তাহলেই সামাজিক মাধ্যমের এই যুগেও মিথ্যে প্রচারকে ভেঙে সঠিক দিশায় পৌঁছনো সম্ভব। 

তৈরি করা আজকের বিভাজিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সামাজিক কাজটাই অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শঙ্খবাবু আরও একটি কথা বলতেন, যেহেতু ঘৃণার কারবারীরা সারা বছর ধরে তাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজটা করে থাকে, আর আমরা কোনও একটি ঘটনার পরে সেখানে জল নিয়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করি, তাই শুধুমাত্র জল ছিটিয়ে এই সমস্যা মিটবে না। একমাত্র পথ হচ্ছে, আমরাও যদি ছোট ছোট স্তরে আমাদের প্রতিবেশীকে জানার চেষ্টা করি, তাহলেই একদিন আমরা সকলে হিন্দু-মুসলমান নয়, সঠিক অর্থে মানুষ হয়ে উঠতে পারব।


Thursday, 6 October 2022

সংঘর্ষ ও নির্মাণ

ধর্মীয় হানাহানি বনাম প্রকৃত আয় বৃদ্ধি

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


 

একটি ইউটিউব চ্যানেলের পক্ষ থেকে আগত গুজরাত বিধানসভা নির্বাচন সম্পর্কে সেই রাজ্যের বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে চলমান মানুষজনের মতামত সংগ্রহ করা চলছিল। প্রকাশিত সেই ভিডিও’তে দেখলাম, একজন শ্রমজীবী মানুষ বলছেন, ‘আমরা শুধু চাই, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যটা সরকার ফ্রি করে দিক, তাহলে মাসে কোনওরকমে যে দশ হাজার টাকা রোজগার করি, তাতেই আমাদের ভালোমতো চলে যাবে। দিল্লিতে আপ সরকার এই কাজটা করেছে, তাই আমরা আপ’কেই এবার ভোট দেব।’ কথাটি অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যেতে পারে, আজকের আমূল পরিবর্তিত রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে এক দিকনির্দেশ।

আমাদের দেশে খাওয়া-পরা বাদ দিলে সাধারণ মানুষের আয়ের বাকী বড় অংশটাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পিছনে খরচ হয়। যতই বিনামূল্যে সর্বজনীন শিক্ষা, মিড-ডে মিলের কথা বড় মুখে বলা হোক না কেন, বাস্তবতা হল, প্রাইভেট স্কুল ও টিউশনির চাপে সে গুড়ে বালি। দিনের শেষে, ফেল কড়ি মাখো তেল। ছেলেমেয়েদের শিক্ষার খরচ টানতে বাবা-মায়ের নাভিশ্বাস। News18.com'এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় (২০২২) উল্লেখযোগ্য ভাবে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে সরকারি স্কুলে পড়ুয়াদের ৫৬ শতাংশ অভিভাবকেরা স্কুল-অতিরিক্ত খরচ, যেমন, প্রাইভেট টিউশন, কোচিং ক্লাস ইত্যাদির পিছনে বছরে গড়ে প্রতি সন্তান পিছু বাড়তি ১৪,০০০ টাকারও বেশি ব্যয় করে। তার ওপর সরকারি স্কুলগুলির দৈন্য দশায় গরিবের লেখাপড়া মাথায় ওঠে। কিন্তু শিক্ষা বড় বালাই। বড় বড় পাশ না দিলে কাঙ্ক্ষিত চাকরিও জোটে না, আধুনিক বাণিজ্য জগতেও পেরে ওঠা যায় না, গরিবের ছেলে গরিবই থাকে। কথা হল, দিল্লির আপ সরকার এই পটটাকেই আমূল বদলে দিয়েছে। সেখানে সরকারি স্কুলগুলি এতটাই উন্নত ও পারদর্শী হয়েছে যে এমনকি অবস্থাপন্ন অভিভাবকেরাও প্রাইভেট স্কুল থেকে সন্তান-সন্ততিদের ছাড়িয়ে এনে সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। আলাদা করে প্রাইভেট কোচিং’এরও কোনও দরকার নেই। ছাত্রের সমস্ত দায়-দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের। স্বাভাবিক, সে খবর ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোণে কোণে। বলাই বাহুল্য, গরিবের কান ও মন দুইই খোলা থাকে। তাই, গুজরাতের পথেঘাটেও সে বার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

শুধু তাই নয়। দিল্লিতে মহল্লায় মহল্লায় (প্রতি এক কিলোমিটার দূরত্বে) বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্য ক্লিনিক নিত্য রোগভোগের হাত থেকে গরিবদের তো বাঁচিয়েইছে, তাদের কর্মক্ষমতাকে অটুট রাখতেও সমান হাত বাড়িয়েছে। এক কথায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রকল্প দিল্লির গরিব শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের পরিবারের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে- এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনামূল্যে পানীয় জল, ২০০ ইউনিট অবধি বিদ্যুৎ ফ্রি, বাসে মহিলাদের ফ্রি সফর। একই ব্যবস্থাপনা পঞ্জাব সরকারও শুরু করেছে।

এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক তাৎপর্যকে অনুধাবন না করতে পারলে মুশকিল আছে। গরিবের মন যেহেতু উদার থাকে, তাই তাঁরা সহজেই ধরে ফেলেছেন, কেজরিওয়াল সরকারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে যুগল অভিসারে আসলে তাঁদের প্রকৃত আয়টাই বেড়ে গেছে। কারণ, এই দুই ক্ষেত্রে তাঁদের আগে যে ব্যয় হত তার যথেষ্ট সাশ্রয় হওয়াতে তাঁদের হাতে বাড়তি কিছু টাকা থাকছে (অথবা বাজার থেকে ঋণ করতে হচ্ছে না), ফলে, তাঁরা অনেক বেশি পুষ্টিকর খাবার ও অর্থ সঞ্চয়ের দিকে মুখ ফেরাতে পারছেন। এই সহজ সত্যটিই উপরে উল্লিখিত গুজরাতের ওই শ্রমজীবী মানুষের কথায় প্রতিফলিত হয়েছে।

এই বিষয়টা চর্চা করার আগে এর রাজনৈতিক অভিযোজন নিয়ে দু-এক কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এ দেশে গরিবের রাজনীতি বলতে মূলত বোঝাত, রাস্তায় নেমে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবি আদায় করা। সেই আন্দোলনে সমাজ বদলের অভিমুখও স্পষ্ট ছিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে অন্তত ৯০’এর দশক অবধি এই ধারাই কম বেশি শক্তিশালী ছিল, একবিংশ শতকের প্রথম দশকেও তা কোথাও কোথাও কার্যকরী ভাবে প্রবল ছিল। কোনও কোনও ধারা গরিব কৃষক ও আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করে এমনকি সুবিস্তৃত সশস্ত্র সংগ্রামও গড়ে তুলেছিল। যেমন, নকশালপন্থীদের বিভিন্ন উদ্যোগ। তাছাড়া আরও কিছু তেজস্বী স্রোত ছিল যা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সুষ্ঠু জীবনযাপনের পক্ষে ঐতিহাসিক সব ধারাবাহিক লড়াইয়ের ঐতিহ্য তৈরি করে। এদের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখ্য, তেভাগার কৃষক আন্দোলন, ধানবাদে এ কে রায়ের নেতৃত্বাধীন এমসিসি সংগঠনের শ্রমিকদের লড়াই, মুম্বাইয়ে দত্ত সামন্তের নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রাম, বিহারে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন’এর উদ্যোগে দলিত ও পিছড়ে বর্গের মানুষের লাগাতার সংগ্রাম, শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে ছত্তিশগড়ে শ্রমজীবী মানুষের সংঘর্ষ ও নির্মাণ এবং আরও এমনতর বহুবিধ ছোট-বড় সংগ্রামের ধারা।

মূলত ২০০০ সালের পর একটা ধীর পট পরিবর্তন দেখা দেয়। ক্রমেই ওয়েব দুনিয়ার সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠা, শনৈ শনৈ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবাহন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির আঙ্গিকে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আসতে থাকায় সংগ্রামের গতিধারায় কিছু অন্যতর বাঁকের দেখা মেলে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় স্তরে একদলীয় শাসনপ্রথা দুর্বল হয়ে পড়া ও রাজ্যে রাজ্যে বহু নতুন নতুন দলের উত্থানের ফলে বিভিন্ন দলের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে টাগ-অফ-ওয়ার’টা প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে, ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার অভিলাষে বিভিন্ন দল 'জনমোহিনী' নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করে। তা তো একপ্রকার জনতারই জিত! কারণ, জনতার বৃহৎ অংশটি এটা বোঝে যে, কোনও একটি দলের প্রতি চির-আনুগত্য বজায় রাখলে তাদের কোনও লাভ নেই। বরং, একটা দর-কষাকষির মতো করে এই দল সেই দলের মধ্যে যদি সমর্থনটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাচানো যায়, তাহলে দলগুলিও নিজেদের জনপ্রিয়তা অটুট রাখার তাড়নায় আরও এটা-সেটা জনপ্রকল্প বা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে পারে। বাস্তবেও তাই ঘটল। প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই দেখা গেল, সেই দলের সরকারগুলিই নির্বাচনে ভাল ফল করছে যারা আরও বেশি বেশি জনহিতকর প্রকল্প লাগু করছে। অর্থাৎ, জন-আকর্ষণটা লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে গেল ‘কু’ ও ‘সু’ শাসনের তারতম্যের বিচারের দিকে। যেন, একটা নতুন সরকার এলে গরিবের কিছু সুরাহা হতে পারে; অথবা তেমন দলকেই ভোট দেওয়া যেতে পারে, যে দল গরিবের জন্য কিছু করেছে বা করতে পারে।

এইসব ডামাডোলের মধ্যেই ২০১২ সাল থেকে বিজেপি’র প্রবল উত্থান। যে জনহিতকর রাজনীতির সরল প্রক্রিয়াটার সূত্রপাত হয়েছিল ২০০০ সালের পর থেকে, সেখানে এবার একটা বিচ্যুতি ঘটল। কারণ, বিজেপি এসে গরিবের রুটি-রুজির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে এবং সেই সুবাদে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যকার আকচাআকচিকে জনতার দিক থেকে ব্যবহার করার সক্ষমতাকে, ভেস্তে দিল হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন করে। গরিব মানুষদের অনেকেই ভেবে বসলেন, হিন্দু-মুসলমান সংঘাতই বোধহয় তাদের বেঁচেবর্তে থাকার প্রধান সমস্যা। কয়েকটা বছর এই করে কাটল। সম্ভবত, দিল্লির সীমান্তে এক বছর ধরে চলমান কৃষক আন্দোলন বিজেপি’র এই ভয়ঙ্কর ভাগাভাগির রাজনীতিতে সবল আঘাত হানল। কিন্তু তা বলে, রুটি-রুজি বনাম সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস- গরিব মানুষ কোন পক্ষে থাকবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি এখনও কাটেনি। কিন্তু কাটছে। যে কারণে, গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কায় বিজেপি ‘রেউড়ি রাজনীতি’র বাপ-বাপান্ত করেও এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের তীব্র অর্থ সংকটকে স্বীকার করে নিয়েও ডিসেম্বর অবধি (আরও তিন মাস বাড়িয়ে) ‘প্রধানমন্ত্রী অন্ন যোজনা’র অধীন ‘ফ্রি রেশন’ ব্যবস্থাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। সোজা কথায়, হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের রাজনীতিতে আর চিঁড়ে যে তেমন ভিজছে না, তা তাদেরও বেশ মালুম হচ্ছে। এখন দেখার, আগামী দু-এক বছরে সারা দেশের রাজনীতি শেষাবধি কোন অভিমুখে বহমান হয়- ধর্মীয় পরিচয় নাকি রোটি কাপড় অউর মকান।

তবে, জনহিতকর প্রকল্প বা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বলতে কোনগুলিকে দীর্ঘমেয়াদে ফলদায়ক বলে অভিহিত করা যাবে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এ বিষয়ে স্পষ্টত দুটি ভিন্নতর প্রবণতা প্রতীয়মান:

এক) গরিব মানুষের হাতে সরাসরি কিছু অর্থ বা খাদ্যশস্য তুলে দাও যা দিয়ে তাদের অন্তত দিন গুজরান হতে পারে। সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্প ধারণার সঙ্গে এর অনেকটাই মিল আছে। এই ধরনের প্রকল্প বিভিন্ন রাজ্যে চালু আছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারও অল্প কিছু ক্ষেত্রে চালু করেছে।

দুই) সরাসরি এইভাবে অর্থ না দিয়ে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচগুলিকে যদি সরকারি উদ্যোগ ও সাহায্যের মাধ্যমে কমানো যায় তাহলে গরিব মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ে। শুধু তাই নয়, এর মধ্য দিয়ে এমন কিছু আবশ্যিক সরকারি উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে যা এক সবল সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিকাঠামো হিসেবে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ নির্মাণ করতে সক্ষম। যেমন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র। সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে যদি সত্যি সত্যিই এক অনুকূল পরিবেশে উন্নত শিক্ষা প্রদান করা যায়, তা যেমন সমাজের সমস্ত শিশু, কিশোর ও যুবকদের কাছে শিক্ষার অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে, পাশাপাশি, একটি গরিব ঘরের মেয়ে অর্থের অভাবে সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় না; বরং সে আরও সক্ষম হয়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ আত্মপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

কতকটা দ্বিতীয় এই ভাবনার আদলেই শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা সংঘর্ষ ও নির্মাণের এমন এক মডেল গত শতকের ৭০-৮০’র দশকে বাস্তবত দল্লি-রাজহরার বুকে গড়ে তুলেছিল। আর তার জন্যই শিল্পপতিদের মাফিয়ার হাতে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমরা জানি, শ্রমিকদের অনুদানে গড়ে ওঠা ‘শহীদ হাসপাতাল’ ওই অঞ্চলের স্বাস্থ্যচিত্রটিকেই আমূল বদলে দিয়েছিল। ১৯৮৩ সালে মাত্র ১৫টি বেড নিয়ে শুরু হওয়া ওই হাসপাতাল পরে আরও বড় একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয় যেখানে নিঃস্বার্থ চিকিৎসকেরা নিরলস কাজ করে অঞ্চলটির চেহারাই পালটে দিয়েছিলেন। ডাঃ নর্মান বেথুন ও ডাঃ দ্বারকানাথ কোটনিসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কলকাতা থেকেও এক দল চিকিৎসক ছত্তিশগড়ে পৌছে 'শহীদ হাসপাতালের' পাশে দাঁড়িয়ে এই স্বাস্থ্য আন্দোলনকে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। একদিকে শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার লড়াই, অন্যদিকে সুস্থ সমাজের ভিত নির্মাণ- এই ছিল শঙ্কর গুহ নিয়োগীর ‘সংঘর্ষ ও নির্মাণের’ দর্শন।

শহীদ হাসপাতাল

আজকের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সেই দর্শনের বাস্তব রূপায়ন অনেকটাই সম্ভব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, বিদ্যুৎ- এইসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা ও পরিকাঠামো যদি যথাযথ ও সুষ্ঠু ভাবে প্রদান করা যায়, তা একদিকে যেমন গরিব মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে সাহায্য করে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য এক কর্মক্ষম, দক্ষ, শিক্ষিত মানবসম্পদও নির্মাণ করতে পারে। রাজনীতির এই ধারাটাই আজ সর্বত্র আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে। সাধারণজনের চৈতন্য ও মননে সেই আকাঙ্ক্ষারই অনুরণন। যে রাজনৈতিক দল তা উপলব্ধি ও অনুশীলন করবে, মানুষ ধীরে ধীরে তাকেই সমর্থন দেবে। সম্ভবত এই কারণেই সর্বত্র আপ’এর জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।

এখন প্রশ্ন হল, আপনি কোনদিকে? ধর্মীয় হানাহানি-জাতপাতের রাজনীতি নাকি প্রকৃত আয় বৃদ্ধির রাজনৈতিক-অর্থনীতি? সাধারণ মানুষকে আজ এই দুই পক্ষের কোনও একদিকে এসে দাঁড়াতে হবে! 

  

Sunday, 2 October 2022

'আদালত ও একটি মেয়ে'

'সন্ততি' দিলে না হৃদয়ের সন্তাপপটে...

অমৃতা ঘোষাল



'সন্ততি'। অবশ্যই পরম আনন্দ মনকে ভরিয়ে তোলার মতো একটা শব্দ। কিন্তু যদি এ শব্দের ব্যবহার মনের কোণে এক চিলতে দ্বিধা জাগিয়ে দেয়? তখনও কী তা আনন্দের উৎস-শব্দ রূপেই গণ্য হবে? আসলে 'নারীত্ব' আর 'মাতৃত্ব' সমার্থক নয়। এই দু'য়ের চেয়েও 'মানবত্ব' শব্দটা সত্য।

ঋতুদর্শন। এক আধো কিশোরী, আধো বালিকা প্রথম ঋতুদর্শনের পর পরিবারের প্রবীণার থেকে জানতে পারে যে, এখন তার দেহ সন্তান ধারণের উপযোগী হয়ে উঠেছে। ক্রমশ তার মধ্যে যেন আরোপ করা হতে থাকে কীভাবে স্নেহময়ী জননী হয়ে উঠবে- সেই শিক্ষা। তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে গর্ভলাভ আর গর্ভধারণের ব্যাপারটা খুবই প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ, প্রায় শিশুকাল থেকে একটা মেয়ের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে, স্ত্রীলিঙ্গ থাকার কারণে তাকে একদিন মা হতে হবে। পুতুল খেলাও যে কারণে মেয়েদের ক্ষেত্রে একপ্রকার যেন অনিবার্য ব্যাপার। কত সহজে এক শিশুকন্যা নির্জীব পুতুলকে কোলে নিয়ে বলে, 'এটা আমার ছেলে কিংবা মেয়ে!' তাকে আবার খাওয়ায়, স্নান করায় কিংবা আদর করে ইত্যাদি। শিশুর জন্যে খেলনা কেনার সময়ও সেই বিষম প্রশ্নই স্পষ্ট শুনি- ছেলে না মেয়ে? ঠিক এরকম একটা দেশে ২০২২'এর সেপ্টেম্বরে পাওয়া গেল বিস্ময়কর এক রায়। জনতার রব উঠল- 'যুগান্তকারী' রায়! রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, এএস বোপান্না ও জেবি পারদিওয়ালার বেঞ্চ।

১৯৭১ সালের ‘মেডিক্যাল টার্মিনেশন অব প্রেগন্যান্সি’ আইন অনুসারে, গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাত হতেই পারে, অবশ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। তবে, ভ্রূণের বয়স ১২ সপ্তাহ থেকে ২০ সপ্তাহ হলে দু'জন চিকিৎসকের মত প্রয়োজন। আর ২০ সপ্তাহ অতিক্রম করে গেলে যদি গর্ভপাতের প্রয়োজন হয় তবে মেডিক্যাল বোর্ডের অনুমতি নিতে হবে। ২০১৬'এর জুলাই মাসে এক ধর্ষিতা নারীর ২৪ সপ্তাহের ভ্রূণ গর্ভপাতের অনুমতি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ভ্রূণের গঠনগত অস্বাভাবিকত্বর কারণে সেই নারীটিরও জীবন সংশয় হতে পারে- এমন এক রিপোর্ট দেয় মুম্বইয়ের কেইএম হাসপাতালের সাত সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতাগির পরামর্শ অনুযায়ী বিচারপতি জে এস কেহর ও বিচারপতি অরুণ মিশ্রের বেঞ্চ ছাব্বিশ বছরের ওই গর্ভবতী তরুণীর গর্ভপাতের অনুমতি দেয়। 

২০১৭'এর জুলাই মাসে ঘটে যায় আরেকটি মানবিক ব্যাপার। গর্ভাবস্থার ২৬ সপ্তাহে ভ্রূণের গঠনগত ত্রুটির কারণে গর্ভপাতের অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন পশ্চিমবঙ্গের এক সন্তানসম্ভবা। এসএসকেএম'এর রিপোর্টকে মান্যতা দিয়ে বিচারপতি দীপক মিশ্র এবং বিচারপতি এ এম খানউইলকরের ডিভিশন বেঞ্চ 'স্পেশাল মেডিক্যাল কেস' হিসেবে গর্ভপাতের অনুমতি দেয়। এবার ২০২১'এ আইনসম্মতভাবে গর্ভপাতের সময়সীমা সেই ২০ সপ্তাহ থেকে বেড়ে ২৪ সপ্তাহ হল। তবে তা কিন্তু শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন অন্তঃসত্ত্বা, ধর্ষিতা এবং নাবালিকাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন স্বামী মারা গিয়েছেন বা ডিভোর্স হয়েছে- এমন নারীরাও এর অন্তর্ভুক্ত হলেন। ২০২১'এর আইন অনুযায়ী, আবেদনের পাঁচ দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

২০২২'এর ২৯ সেপ্টেম্বরে আরও এক ধাপ এগোলো ভারতের আইন। নারীর বৈবাহিক সত্তার সঙ্গে গর্ভপাতের সম্পর্ক আর বিবেচনা করা হল না। নারীর নিজস্ব ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েই গর্ভপাতের ক্ষেত্রে বিবাহিত আর অ-বিবাহিত নারীর পার্থক্যকে অ-স্বীকার করা হল। বলা হল, গর্ভের সন্তানকে জন্ম দেওয়া উচিত হবে কিনা তার সিদ্ধান্ত একমাত্র নেবেন গর্ভধারিণীই। সেই সঙ্গে বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেল। বিবাহের পরেও নিজের অসম্মতিতে কোনও নারী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়তেই পারেন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ সন্তান নেওয়ার মতো মধুর না-ও হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানালেন যে, ভারতীয় সাংবিধানিক অধিকারকে মর্যাদা দিয়েই বিবাহিত কিংবা অ-বিবাহিত যে কোনও নারীরই নিজস্ব গর্ভকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা আছে। অর্থাৎ, যে কোনও নারীরই সুস্থ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকারকে অনেকটা গুরুত্ব দেওয়া হল। আর  সম্পর্কের ফলে গর্ভসঞ্চার হলে সেই  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও ভারতীয় নারীর রয়েছে। যৌনসঙ্গী পুরুষটি অসম্মত হলে কিংবা ছেড়ে চলে গেলে সে ক্ষেত্রেও সন্তানসম্ভবা নারী গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। অবশ্য, ভ্রূণের ২৪ সপ্তাহের সেই শর্তটি কিন্তু রইল। 

এই সবের মূলে যে ঘটনাটি ছিল, তা খানিকটা এরকম- ২৩ সপ্তাহের এক  অন্তঃসত্ত্বা নারীকে তার প্রেমিক বিবাহ করতে অস্বীকার করেন। তখন গর্ভপাতের অনুমতি চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সেই বছর পঁচিশের তরুণী। এবার তিনি তাঁর ন্যায্য অধিকার চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। প্রথমত তিনি অ-বিবাহিত, দ্বিতীয়ত তাঁর প্রেমিক বিবাহে অনিচ্ছুক, সর্বোপরি তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তান লালনের প্রতিকূল। ২০২২ সালের ২১ জুলাই সেই নারীকে গর্ভপাতের অধিকার দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আর এই প্রথমবার গর্ভপাতের  'মেডিক্যাল কেস'এর স্টিরিওটাইপ থেকে বেরিয়ে এল ভারতীয় আইন।

এখন প্রশ্ন হল, আমাদের দেশের কতজন নারী এই গর্ভপাতের অধিকারের খবর রাখেন? মফস্বল এলাকায় অধ্যাপনা করার সূত্রে দেখেছি, অনেক মেধাবী ছাত্রী কলেজে পড়ার সময়েই গর্ভবতী হয়ে পড়ে ও অনেক অসুবিধার মধ্যে তারা আর স্নাতক হয়ে ওঠে না। কিংবা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের নারীরা তো এখনও জানেনই না যে গর্ভপাত ২৪ সপ্তাহ অবধি আইনসম্মতভাবেই করা সম্ভব। ফলত, শিক্ষায় অনগ্রসর এলাকায় কিন্তু গর্ভপাত করাতে আগ্রহী হাতুড়ে ডাক্তারদের বেশ রমরমা। বেশ কয়েক বছর আগে প্রথম সারির কিছু সংবাদপত্রে প্রায় রোজই চোখে পড়ত কিছু ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন। অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব থেকে তারা নাকি মুক্তি দেয় আর পুরো পদ্ধতিই নাকি নিরাপদ আর গোপন। বলাই বাহুল্য, সেই ক্লিনিকগুলোর সব ক'টি বৈধ নয়, আর নিরাপদ তো নয়ই! তবু সেখানে ভিড় তো যথেষ্টই হত।

বর্তমানে সরকারি সূত্রে যতটা জন্মনিরোধক নিয়ে প্রচারের কথা শোনা যায়, ততটা কি গর্ভপাত বিষয়ে শোনা যায়! কিংবা ভ্রূণ নির্ধারণ যে অনুচিত- এই বিষয়ে যতটা শিক্ষিত মানুষ সরব, ততটা বাক্যব্যয় কি গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে করে? সমাজের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা নারীর ধর্ষণের পরে যতটা আওয়াজ তোলেন, তারা কি ধর্ষিতা নারীর গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে ততটাই  উদ্বিগ্ন হন! যদি সত্যিই গর্ভপাতের অধিকারের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত, তাহলে কিন্তু পরিত্যক্ত সদ্যোজাত'র সংখ্যাটিও নিঃসন্দেহে কমত। তাই গর্ভপাতের আইন সংশোধন করাই একমাত্র পন্থা নয়, তার যথাযথ প্রচারও প্রয়োজন। 'সন্ততি'র মতো অনুপম শব্দ তখন আর গর্ভধারিণীর মনে কোনও কালো মেঘ ঘনিয়ে তুলবে না।


Thursday, 29 September 2022

উত্তাল ইরান

ধর্মীয় অনুশাসনে দেশ চলবে না

নীলকন্ঠ আচার্য


 

গত দু' সপ্তাহ ধরে ইরানের রাজধানী সহ প্রায় ৮০টি শহরের রাজপথ ও আকাশ বাতাস হাজার হাজার ইরানি তরুণী ও তরুণদের দীপ্ত প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। তাদের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শ্লোগান উঠেছে, 'জান, জিন্দেগি, আজাদী' (নারী, জীবন, স্বাধীনতা)', 'আমরা সবাই মাহশা', 'ইসলামি শাসন নিপাত যাক', 'স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক', 'যারা আমাদের বোন-ভাইকে হত্যা করেছে তাদের আমরা খতম করব' ইত্যাদি।  

ঘটনার সূত্রপাত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২। ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলের বাসিন্দা ২২ বছরের মেয়ে মাহশা আমিনি তার মা, বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে একটি গাড়িতে যখন তেহরানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আসছিল তখন সেখানে বিশেষ পুলিশের একটি দল ('নীতি পুলিশ') তাদের পথ আটকায় এবং মাহশা ঠিকমতো হিজাব পরেনি এই অভিযোগে(!) তার মা-বাবার সামনেই তাকে জোর করে টেনে নিয়ে যায় ও আটক করে। হিজাবে তার চুল নাকি ঠিক মতো ঢাকা ছিল না! তাই দেশের ইসলামি আইন লঙ্ঘনের(!) কারণে পুলিশ তাকে গাড়ির মধ্যেই শারীরিক নির্যাতন চালায় যা তাদের হেফাজতে চূড়ান্ত রূপ নেয়। মাহশা অসুস্হ হয়ে চির অজ্ঞানে নিমজ্জিত হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু ঘটে। 

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানী তেহরান সহ ইরানের বেশ কিছু শহরে তরুণীরা তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের সমর্থনে ‌দেশের তরুণরাও বিক্ষোভে অংশ নিতে শুরু করে। বিক্ষোভ ক্রমশ  ব্যপক রূপ ধারণ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই তা দাবানলের মতো ইরানের ছোট-বড় প্রায় ৪৫টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী এই বিক্ষোভের ওপর দমন-পীড়ন নামিয়ে আনলে তা আগুনের মতো আরও প্রসারিত হয়। বহু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ বেঁধে যায়। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালাতে থাকে। এই প্রতিবেদন লেখার সময়, সংবাদ সূত্র অনুসারে প্রায় ৭৬ জনের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে (BBC, Al Jazeera), ১০০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত এবং প্রায় ১২০০ বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। 

তরুণী ও প্রৌঢ়া সহ শত শত নারীরা মাহশা আমিনির এই হত্যা এবং ইরানের শাসকের মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিক হিজাবনীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাস্তায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গণহারে নিজেদের হিজাব খুলে আগুনে পোড়ানো শুরু করে। এমনকি প্রকাশ্যে নিজেদের চুল কেটে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে। শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে তাদের কেটে ফেলা লম্বা চুল দিয়ে প্রতিবাদের 'কেশধ্বজা' বানিয়ে তা টাঙ্গিয়ে দেয়। এক অভূতপূর্ব রোষে বৃহৎ তরুণ ও যুবসমাজ পুলিশ বাহিনীর সামনে প্রতিরোধের প্রাচীর  গড়ে তোলে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো একযোগে এই প্রতিবাদী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বয়কট করে চলেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, শহরের বিভিন্ন স্থানে টাঙানো দেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা রোহউল্লা খোমেইনির বড় ছোট সব ধরনের প্রতিকৃতিকে জনতা টেনে ছিঁড়ে নামিয়ে ফেলছে। উল্লেখ্য যে, এই বিক্ষোভ আন্দোলনে ইরানের দু'বারের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হাশেমি রাফসানজানির মেয়েও সামিল হয় এবং বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে আটক। বিখ্যাত ইরানি ফুটবলার আলি করিমিও এই আন্দোলনকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। বেশ কিছু জায়গায় এই উত্তাল গণরোষের সামনে সুরক্ষা কর্মীদের পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। ইরানের  বিচার বিভাগের প্রধান দফতর থেকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা রক্ষীরা ক্লান্ত। তারা নাকি কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো শুতে যেতে বা বিশ্রাম নিতে পারছে না। অর্থাৎ, এই বিক্ষোভ‌ আন্দোলন ক্রমশ যেন বিশেষ‌ মাত্রা অর্জন করে চলেছে। 

ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশ  তুরস্ক ও সিরিয়ায় এই আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি, গ্রিস, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি দেশে বসবাসকারী ইরানি জনতাও এই আন্দোলনের সমর্থনে সেইসব দেশের ইরানি দূতাবাসগুলোর সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এদিকে ইরানের পশ্চিম সীমান্তে ইরাকী ভূখণ্ডে অবস্থিত কুর্দিস্তান অটোনমাস রিজিওন নামের একটি স্বশাসিত অঞ্চলে গত পাঁচ দিন ধরে ইরানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কামানের গোলা বর্ষণ, ড্রোন ও মিসাইল আক্রমণ শুরু করা হয়েছে যা পরিস্থিতিকে হয়তো আরও জটিল করে তুলতে পারে।          ‌      

ইরানে মহিলাদের উপর এই বাধ্যতামূলক হিজাব আইন ঘোষিত হয় ১৯৭৯ সালের মার্চে ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর। এর বিরুদ্ধে ওই সময় সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার মহিলারা বিক্ষোভ আন্দোলন গড়ে তোলেন। একই সময়ে পুরুষদের জন্য বহুবিবাহ প্রথার আইনও লাগু করা হয়। তারপর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার হিজাব বিরোধী এবং নারীদের সমান অধিকারের দাবিতে বড় বড় প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২০০৬ ও ২০১৪ সালের আন্দোলনগুলো ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়াও, প্রতি বছর ১২ জুলাই সরকারি হিজাব দিবস পালনের সময় ইরানের সাহসী নারীরা বিভিন্ন স্থানে হিজাব খুলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে থাকেন। এই অপরাধে(!) বহু নারী পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন।


 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগে ভারতের বেঙ্গালুরুর স্কুলে হিজাব পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অর্থাৎ, মুসলমান স্কুল ছাত্রীদের হিজাব না পরার জন্য বাধ্য করা হয়। কর্নাটক হাইকোর্টও স্কুল প্রশাসনের পক্ষেই রায় দেয়। এর বিরুদ্ধে মুসলমান স্কুল ছাত্রীরা দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করে। বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। 

হিজাব প্রশ্নে ভারত ও ইরানের ঘটনাক্রম আপাতভাবে বিপরীত মনে হলেও বিষয়টি কিন্তু একই। অর্থাৎ, দুটি ক্ষেত্রেই সরকার, শাসক বা কর্তৃপক্ষ মেয়েদের ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতার উপর বলপূর্বক নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছে যা নারীদের নিজস্ব পছন্দের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে। দুই ক্ষেত্রেই ধর্মীয় মৌলবাদী কর্তৃত্ব পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে  বজায় রাখতে চায়। তাই, নারীর অস্তিত্ব, জীবন এবং  স্বাধীনতা অর্জনের যে মৌলিক দাবি আদায়ের পথে ইরানি নারীরা আজ যেভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে নৃশংস মৌলবাদী শাসক শক্তির চোখে চোখ রেখে, ইরানের শুধু নয়, সারা দুনিয়ার অর্ধেক আকাশের ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে আনতে চলেছে, তাকে সহস্র কুর্নিশ জানাই।


Sunday, 25 September 2022

স্বাধীনতার ৭৫ বছর: ২

ভারতবর্ষ কোন পথে?

সমর বাগচী

 

যারা এই লেখাটির প্রথম ভাগ পড়তে চান তাঁরা ক্লিক করুন:

https://ekakmatra2013.blogspot.com/2022/09/blog-post_21.html 

 

রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন তুলছেন সভ্যতাকে নিয়ে। কাকে সভ্যতা বা উন্নয়ন বলব? যে বছর উনি ‘রক্তকরবী’ লিখছেন (১৯২৪), চিনে গিয়ে এক বক্তৃতায় বলছেন, ‘ধনী পশ্চিম একশো বছরেরও বেশি তাদের রথে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে। তার ধুলোয় আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে, আওয়াজে কানে তালা লাগছে, আমাদের নিজেদের অসহায়তায় আমরা বিনম্র হচ্ছি এবং রথের গতিবেগে বিহ্বল হচ্ছি। আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে, এই রথযাত্রাই হচ্ছে উন্নয়ন এবং সেই উন্নয়নই সভ্যতা। যদি কেউ প্রশ্ন করার সাহস করে, ‘কীসের জন্য উন্নয়ন এবং কার জন্যে উন্নয়ন’ তাহলে তা অদ্ভুত এবং হাস্যকরভাবে পূর্বদেশীয় বলে মনে করা হবে।’ প্রয়াণের বছরে (১৯৪১), লিখছেন ‘সভ্যতার সংকট’: ‘কম বয়সে ইউরোপের সভ্যতার অন্তরের দানকে আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু আজ আমার এই বিদায়ের দিনে সেই বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’ ১৯৪০ সালে কালিম্পং থেকে কবি অমিয় চক্রবর্তীকে এক চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘ব্রাহ্মণের মাথা, ক্ষত্রিয়ের শক্তি এবং শূদ্রের কাজকে ব্যবহার করে আজকের ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির ইউরোপকে আর ঠেকানো যাচ্ছে না। কিন্তু, আমি দেখতে পাচ্ছি যে তাদের পা এক আনত তলে বিলুপ্তির পথে।’       

আজ যদি ভারত ও চিনের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারাও লুক্সেমবার্গের মতো মাথাপিছু ১৪ global hectare (gha) বা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা অথবা আমেরিকার মতো ৮ gha-এর বেশি বাস্তুতান্ত্রিক পায়ের ছাপ (Ecological Footprint) ফেলবে, যেখানে পৃথিবীর ধারণ  ক্ষমতা হচ্ছে মাথাপিছু মাত্র ১.৯ gha, তাহলে কয়েক দশকেই পৃথিবী মরুভূমি হয়ে যাবে।

পৃথিবীর এই শিল্পায়িত নাগরিক সমাজের বিপদের কথা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। গান্ধী বলছেন, ‘সময় আসছে যখন আজ যারা পাগলের মতো তাদের চাহিদা বাড়িয়ে চলেছে… তারা একদিন তাদের পথ বদলাবে এবং বলবে, ‘এ আমরা কী করলাম’?’ তাই, ১৯০৪ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘স্বদেশী সমাজ’ এবং গান্ধী ১৯০৭ সালে গুজরাতিতে ‘হিন্দ স্বরাজ’। ‘স্বদেশী সমাজ’-এ রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘আমাদের সমাজ এখন আর এরূপভাবে চলিবে না। কারণ বাহির হইতে যে উদ্যত শক্তি প্রত্যহ সমাজকে আত্মসাৎ করিতেছে তাহা ঐক্যবদ্ধ, দৃঢ়- তাহা আমাদের বিদ্যালয় হইতে আরম্ভ করিয়া প্রতিদিনের দোকানবাজার পর্যন্ত সর্বত্রই নিজের একাধিপত্য স্থুলসূক্ষ্ম সর্ব আকারেই প্রত্যক্ষ্যগম্য করিয়াছে (জনান্তিকে, রবীন্দ্রনাথ যেন আজকের শিক্ষা, খুচরো ব্যবসা ইত্যাদিতে কর্পোরেট ও বহুজাতিক সংস্থার অনুপ্রবেশের কথা বলছেন)। এখন সমাজকে ইহার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করিতে হইলে অত্যন্ত নিশ্চিতরূপে তাহার আপনাকে দাঁড় করাইতে হইবে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি প্রত্যহ অতি অল্প পরিমাণেও কিছু স্বদেশের জন্য উৎসর্গ করিবে। বহু সম্বন্ধবিশিষ্ট গ্রাম সমাজের পরিবর্তন এনে দেশের পুনরুজ্জীবন আনতে হবে।’        

ক্রমেই রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী দুজনেই গ্রাম পুনর্গঠনের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এল্মহার্স্টকে নিয়ে আসছেন। শ্রীনিকেতন স্থাপন করছেন। সমবায়ের ওপর রবীন্দ্রনাথের চারটি প্রবন্ধ আছে। ১৯২২ সালে ‘সমবায়-২’ প্রবন্ধে কবি স্বাবলম্বনের কথা লিখছেন, ‘দেশের সমস্ত গ্রামকে নিজের সর্বপ্রকার প্রয়োজনসাধনক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে (এ প্রায় গান্ধীর গ্রাম স্বরাজের কথা)। এজন্য কতকগুলি পল্লী নিয়ে এক একটি মণ্ডলী স্থাপন করা দরকার। সেই মণ্ডলীর প্রধানগণ যদি গ্রামের সমস্ত কর্মের ও অভাবমোচনের ব্যবস্থা করে মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পর্যাপ্ত করে তুলতে পারে তবেই স্বায়ত্তশাসনের চর্চা সর্বত্র সত্য হয়ে উঠবে। নিজ পাঠশালা, শিল্প শিক্ষালয়, ধর্মশিক্ষা, সমবেত পণ্যভাণ্ডার ও ব্যাঙ্ক স্থাপনের জন্য পল্লীবাসীদের সাহায্য ও উৎসাহ দান করতে হবে। এমনি করে পল্লীগুলি আত্মনির্ভরশীল ও ব্যূহবদ্ধ হয়ে উঠলেই আমরা রক্ষা পাব। কিভাবে বিশিষ্ট পল্লীসমাজ গড়ে তুলতে হবে সেই হচ্ছে আমাদের প্রধান সমস্যা।’

১৯৪৫ সালের ৫ অক্টোবর এক চিঠিতে গান্ধী নেহেরুকে লিখছেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার চিন্তার মধ্যে যদি গভীর ফারাক থাকে তবে দেশবাসীর তা জানা দরকার।… আমি নিশ্চিত যে ভারতকে যদি সত্যিকারের স্বাধীনতা পেতে হয় এবং ভারতের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীকেও, তাহলে শীঘ্র অথবা কিছু পরেই আমাদের বুঝতে হবে যে মানুষকে গ্রামে বাস করতে হবে শহরে নয়, কুঁড়েঘরে প্রাসাদে নয়। কোটি কোটি মানুষ শহর ও প্রাসাদে নিজেদের মধ্যে শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাদের তখন হিংসা এবং অসত্য ছাড়া আর অন্য কোন পথ থাকবে না... তুমি এটা ভেব না যে আমি আজকের মতো গ্রাম সমাজের কথা কল্পনা করছি। আমার স্বপ্নের গ্রাম আজও আমার মনে গাঁথা আছে। প্রতিটি মানুষই তার স্বপ্নের জগতে বাস করে। আমার আদর্শ গ্রামে বুদ্ধিমান মানুষ বাস করবে। তারা জন্তুর মতো ময়লা ও অন্ধকারে বাস করবে না। স্ত্রী এবং পুরুষ মুক্ত থাকবে এবং পৃথিবীর যে কোনও মানুষের সামনে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখবে।’ নেহেরু চারদিন পরে ৯ অক্টোবর উত্তরে বলছেন, ‘হিন্দ স্বরাজ ৩৮ বছর আগে লেখা হয়েছিল। সেদিনের চেয়ে আজ বিশ্ব সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে, বোধহয় একটা ভুল পথে... আপনি ঠিকই বলেছেন যে পৃথিবী বা তার একটি বড় অংশ মনে হচ্ছে আত্মহত্যা করার জন্য উদগ্রীব। তার কারণ বোধহয় একটি দুষ্ট বীজ সভ্যতায় পোঁতা হয়েছিল।’ নেহেরু তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে লিখছেন, ‘আমরা পরিবর্তনের নদীকে থামাতে পারি না অথবা তার থেকে আলাদা হয়ে থাকতে পারি না এবং মনের দিক থেকে আমরা যারা একবার ইডেন-এর আপেল খেয়েছি তার স্বাদ ভুলতে পারি না এবং আদিমতায় ফিরে যেতে পারি না।’ তা, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর শিল্প আপেল খেয়ে ভারতের কী হাল হয়েছে তা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

মারা যাবার এক বছর আগে ১৯৬৩ সালে নেহেরু প্রায় বুক চাপড়ে কাঁদছেন। ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে ‘Social Welfare in a Developing Economy’ সেমিনারে নেহেরু বলছেন, ‘আমার মন এই বোধ আনার চেষ্টা করছে, যে দেশের ৫ লাখ ও ৫০,০০০ গ্রাম এবং সেখানে যে সব মানুষ বাস করে তাদের নিয়ে কী করব… আমি যদি শুধু উৎপাদনের কথা ভাবি তাহলে এই সমস্ত বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ কারখানা কৃষির মতো অত গুরুত্বপূর্ণ নয়… গান্ধী যা ভেবেছিলেন তা খুবই ঠিক। তিনি সবসময় ভারতের গ্রামের কথা এবং ঐসব গ্রামে অনুন্নত মানুষের কথা ভাবতেন এবং কিছু একটা পরিকল্পনা করেছিলেন। তা শুধু তাঁতই ছিল না। সেটি তো ছিল একটি প্রতীক মাত্র। তিনি গ্রামীণ শিল্পের ওপর জোর দিয়েছিলেন যা আবার আধুনিক মানুষ কোনও কাজের জিনিস বলে মনে করে না।’               

১৯৬৩-র ২৩ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে পরিকল্পনার ওপর একটি বিতর্কে নেহেরু বলছেন, ‘আমি বেশি বেশি করে মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গির কথা ভাবছি। এটি অদ্ভুত যে আমি এই বিষয়ে তাঁর নাম করছি। আমি সবদিক থেকে আধুনিক যন্ত্রের প্রশংসক। আমি সবচেয়ে ভাল মেশিনারি এবং প্রযুক্তি চাই। কিন্তু, আজ ভারতের যা অবস্থা, আমরা যত তাড়াতাড়িই না যন্ত্রের দিকে এগোই… বিরাট সংখ্যক মানুষকে তা বেশ কিছুকাল ধরে ছোঁবে না।’ এই বোধ যদি নেহেরুর আগে আসত তাহলে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যরকম  হত।

রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী দুজনেই গ্রাম পুনর্গঠনের কথা বলছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং তাঁর প্রিয় সন্তোষ কুমার মজুমদারকে কৃষিবিদ্যা এবং নিজের জামাই নগেন্দ্রনাথকে ডেয়ারি শিখতে আমেরিকা পাঠালেন। বহু গ্রামে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন দেখলেন যে শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে তাঁর শিক্ষার আদর্শ পুরোপুরি পালন করা যাবে না তখন তিনি শ্রীনিকেতনে ‘শিক্ষাসত্র’ খুলছেন গ্রামের গরিব শিশুদের জন্য, যেখানে তাঁর শিক্ষাদর্শ পালন করা যাবে।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে গান্ধী ঠিক করলেন বিনা পাসপোর্টে পায়ে হেঁটে পাকিস্তান যাবেন। যখন দিল্লি পৌঁছলেন তখন দেখছেন সেখানে বিরাট দাঙ্গা চলছে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীরা মুসলমানদের বাড়ি, মসজিদ দখল করছে। গান্ধী ১৩ জানুয়ারি অনশন শুরু করলেন। ১৪ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে তাঁর স্বপ্নের ভারতের কথা বলছেন, ‘যেখানে একে অপরের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধালু হবে, যেখানে নারীর ইজ্জত রক্ষিত হবে, যেখানে অস্পৃশ্যতা থাকবে না, থাকবে না কোনও মাদক দ্রব্যে আসক্তি। যেখানে নিঃস্ব বা ভিক্ষাজীবী বলে কেউ থাকবে না, থাকবে না উচ্চ নীচের ভেদ- একদিকে ধনীর অসীম বৈভব আর অন্যদিকে অর্ধাশনে দিবস যাপনকারী শ্রমজীবী মানুষের বৈষম্য। যেখানে সবাই স্বেচ্ছায় সানন্দে কায়িক শ্রমের দ্বারা জীবিকা উপার্জন করতে গর্ব বোধ করবে। কায়িক শ্রম ও বৌদ্ধিক শ্রমের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকবে না। আমি সেই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরণ অনশন চালিয়ে যেতে চাই।’ তাঁকে আর অনশন চালাতে হয়নি। হিন্দু মহাসভার এক আতঙ্কবাদী ২৮ জানুয়ারি তাঁকে হত্যা করল। তারাই আজ দেশে আবার আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

এই আলোচনার আলোকে ভবিষ্যৎ সমাজের এই রূপটি আমি সমাজের কাছে পেশ করতে চাই:

·       প্রকৃতির জমি, মাটি, জল, বাতাস, অরণ্য, নদী, সমুদ্র, পর্বত ইত্যাদির স্বাস্থ্য বজায় রেখে সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য সৃষ্টি করতে হবে এবং তা শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্যই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাঁচার অধিকারকেও মনে রাখতে হবে;

·       ধাতু নির্ভর সমাজ নয়, জৈব নির্ভর সমাজ;

·       সবার জন্য প্রয়োজন মতো খাদ্য;

·       রাসায়নিক পদ্ধতিকে বর্জন করে জৈব পদ্ধতিতে কৃষি;

·       প্রত্যেকের জন্য স্বাস্থ্যপূর্ণ নানারকম খাদ্যের ব্যবস্থা;

·       রবীন্দ্রনাথের কথা মনে রাখতে হবে, ‘সহজ ও সরল সমাজই সভ্যতার মাপকাঠি এবং অপরিমিত হচ্ছে বর্বরতা।’

·       শহর সভ্যতাকে বর্জন করে এক সহজ সরল গ্রাম সমাজ নির্মাণ করতে হবে। সবাইকে বাস্তুতন্ত্রের দিক থেকে সুস্থায়ী গৃহে বাস করতে হবে। বাড়িগুলো এমন হবে যে সেগুলো তারাই নির্মাণ এবং সংরক্ষণ করতে পারবে। বাড়ি হবে শক্তির দিক থেকে দক্ষ। কিছু কিছু বাড়িকে ভাঙতে হবে। কিন্তু, সমস্ত ভেঙ্গে ফেলা জিনিসকে পুনর্ব্যবহার করতে হবে;

·       ভাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আয়োজন করতে হবে;

·       যে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিস সবাই ব্যবহার করতে পারবে না তার উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। এটি করা গেলে শক্তি এবং নানারকমের ধাতুর প্রয়োজনও কমে যাবে;

·       সমস্ত পুরনো এবং ফেলে দেওয়া জিনিসকে আবার ব্যবহার করতে হবে;

·       সমস্ত উৎপাদন হবে কো-অপারেটিভের মধ্যে দিয়ে। বেশিরভাগ জিনিস স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করতে হবে। এতে জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবহন করার প্রয়োজন হবে না। এটি হলে শক্তি, পরিবহন, জিনিসপত্র, রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদির প্রয়োজন অনেক কমে যাবে;

·       বেশিরভাগ মানুষ গ্রামেরই বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকবে। মার্কস কম্যুনিস্ট সমাজে এই Associated Producers-দের কথাই বলেছিলেন। নগরায়নের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে;

·       লিঙ্গসাম্য আনতে হবে;

·      Associated Producers-দের এই গ্রামভিত্তিক সমাজে এক নতুন রকমের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে, সেই শিশুকাল থেকে যা চেষ্টা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী। যে শিক্ষা শিশুকে আত্মনির্ভর হতে শেখাবে;

·       শিশুকাল থেকে শিশুকে নতুন এক উন্নত সংস্কৃতিতে উদবুদ্ধ করতে হবে যা নিজের সঙ্গে অপরের ভাবের মিলন ঘটাতে পারে। এর ফলে বর্তমান শিল্প সমাজে যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে তার অবসান হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এক বহু সম্বন্ধবিশিষ্ট সমাজের নির্মাণ হবে। ভোগবাদকে পরিহার করে এক সরল কিন্তু উচ্চ চিন্তার সংস্কৃতি নির্মিত হবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে রেখে, ‘না রে না হবে না তোর স্বর্গসাধন, যতই করিস সুখের সাধন।’ মার্কস, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর ভাষায় শ্রম হবে মানুষের জীবনের আনন্দের এক অংশ;

·       কিন্তু কী করে আসবে এই সমাজ? এর জন্য চাই অহিংস সংঘর্ষ ও নির্মাণ। একদিকে সমাজ বদলাবার জন্য মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অহিংস সংগ্রাম এবং অন্যদিকে সমাজ নির্মাণের কাজ যেমন শুরু করেছিলেন গান্ধী এবং শঙ্কর গুহ নিয়োগী।

·       এই প্রবন্ধের প্রায় প্রতিটি বিষয় নিয়ে একটি করে প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে।

      

(শেষ)