Sunday, 8 November 2026

ক্ষুধার্ত ভারত জাগে

খাদ্য সকলের নৈতিক অধিকার

শ্রীপর্ণা চক্রবর্তী



শরৎ আসে, শরৎ যায়। উৎসবের জাঁক মাখে শহর থেকে গ্রাম। আর এই শরতেরই কোনও এক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টির সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ ও পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয় বিশ্ব ক্ষুধা সূচক বা ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে জার্মানির ত্রাণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা Welthungerhilfe, রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমের আন্তর্জাতিক শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ক আইন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IFHV) এবং সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তা সংস্থা Helvetas। কোনও দেশের জনসংখ্যার কত অংশ পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ থেকে বঞ্চিত (Undernourishment), পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতির হার (Child Stunting) ও উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার (Child Wasting), এবং পাঁচ বছর বয়সের আগে শিশু মৃত্যুর হার (Child Mortality)— এই চারটি নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষুধা ও অপুষ্টির ব্যাপ্তি।

২০২৬ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০তম (ইথিওপিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে)। ২০০০ সালে ৩৮.১ থেকে ২০০৬ সালে ৩৭.০, ২০১২ সালে ২৮.৮, ২০১৮ সালে ২৫.৮ হয়ে ২০২৬ সালে ভারতের ক্ষুধা সূচকের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২৪.১-এ; ‘চরম উদ্বেগজনক’ পরিস্থিতি থেকে ক্রমোন্নতি ঘটিয়ে দেশ এখন ‘গুরুতর’ ক্ষুধার শ্রেণিতে! জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩–২৫ সময়কালে ভারতে আনুমানিক ১৪২.৫ মিলিয়ন মানুষ অপর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণজনিত অপুষ্টিতে ভুগেছে এবং ২০২৫ সালে ভারতের প্রায় ৫২০.১ মিলিয়ন মানুষ, অর্থাৎ জনসংখ্যার ৩৫.৫ শতাংশ, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখেনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম, যা তীব্র অপুষ্টির অন্যতম লক্ষণ। একই বয়সের ২৯.৩ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। দেশের ৯.৮ শতাংশ মানুষের কাছে এখনও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কার্যত বিলাসিতা। শিশু মৃত্যুর হার কমানো এবং সামগ্রিক অপুষ্টির পরিস্থিতির উন্নতিতে গত দুই দশকে অগ্রগতি সত্ত্বেও শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থার এই চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বিশেষত, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের কৃশতার হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ফলে, আম্বানি-আদানির অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, দেশের প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ন্যূনতম পুষ্টির নিশ্চয়তাটুকুও এখনও অধরা।

ভারতে শিশু অপুষ্টির সামগ্রিক চিত্র বুঝতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের National Family Health Survey-5 (NFHS-5, ২০১৯–২১)-এর তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সমীক্ষায় শিশু অপুষ্টি পরিমাপের জন্য মূলত তিনটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে— 

Stunting: বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও শারীরিক বিকাশের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়;

Wasting: উচ্চতার তুলনায় ওজন কম, যা সাধারণত সাম্প্রতিক বা তীব্র অপুষ্টির পরিচায়ক; এবং

Underweight: বয়সের তুলনায় ওজন কম, যা দীর্ঘমেয়াদি ও সাম্প্রতিক উভয় ধরনের অপুষ্টির প্রভাব নির্দেশ করতে পারে। এর মধ্যে Stunting বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তা শিশুর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

NFHS-5 অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩৩.৮ শতাংশ খর্বাকৃতির (Stunted), ২০.৩ শতাংশ কৃশতায় (Wasted) আক্রান্ত এবং ৩২.২ শতাংশ বয়সের তুলনায় কম ওজনের (Underweight)। রাজ্যের প্রায় প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে একজন বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতির এবং প্রায় একই অনুপাতে শিশুর ওজনও বয়সের তুলনায় কম। একই সমীক্ষার রাজ্যভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিহারে খর্বাকৃতির হার ৪২.৯ শতাংশ, উত্তরপ্রদেশে ৩৯.৭ শতাংশ, ঝাড়খণ্ডে ৩৯.৬ শতাংশ, গুজরাটে ৩৯ শতাংশ এবং মধ্যপ্রদেশে ৩৫.৭ শতাংশ। এই রাজ্যগুলির প্রতিটিতেই খর্বাকৃতির হার পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি। আবার, পশ্চিমবঙ্গে কম ওজনের শিশুর হার ৩২.২ শতাংশ, যা উত্তরপ্রদেশের ৩২.১ শতাংশের প্রায় সমান। রাজ্যভেদে এই বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট— মেঘালয়ে খর্বাকৃতির হার ৪৬.৫ শতাংশ, অথচ কেরালায় তা মাত্র ২৩.৪ শতাংশ।

আবার একই সমাজের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যেও অপুষ্টির বোঝা সমভাবে বণ্টিত নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারতের দরিদ্রতম আর্থ-সামাজিক শ্রেণির পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি এবং কৃশতার হার যথাক্রমে ৫৯ ও ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ধনীতম শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ২৬ ও ১৩ শতাংশ। UNICEF-এর তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত শিশুদের মধ্যেও খর্বাকৃতির হার তুলনামূলকভাবে বেশি; জনজাতিভুক্ত শিশুদের মধ্যে কৃশতার হারও উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ। অর্থাৎ, ক্ষুধা ও অপুষ্টি কেবল খাদ্যের অভাবের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং সুযোগ ও সম্পদের অসম বণ্টন।

সামগ্রিকভাবে এই পরিসংখ্যানগুলি স্পষ্ট করে, শিশু অপুষ্টি ভারতের একটি বিস্তৃত জাতীয় সমস্যা হলেও তার অভিঘাত সর্বত্র সমান নয়। রাজ্যভিত্তিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দারিদ্র্য, খাদ্য নিরাপত্তার অভাব, স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমাবদ্ধতা এবং জাতপাত ও সামাজিক বঞ্চনার মতো কাঠামোগত বৈষম্যও এই সংকটের গভীরতা ও বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই বৈপরীত্যের অন্য প্রান্তে রয়েছে আরও এক উদ্বেগজনক দৃশ্য। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর Food Waste Index Report 2024 অনুযায়ী, শুধু গৃহস্থালি পর্যায়েই ভারতীয় পরিবারগুলিতে বছরে প্রায় ৭৮.২ মিলিয়ন টন খাবার নষ্ট হয়, অর্থাৎ মাথাপিছু প্রায় ৫৫ কেজি। গৃহস্থালি ক্ষেত্রে খাদ্যের এই অপচয়ের পরিমাণে চিনের পরেই ভারতের স্থান। এর অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও রয়েছে গুরুতর প্রভাব। ল্যান্ডফিলে অক্সিজেনের অভাবে খাবার পচে মিথেন (CH₄) উৎপন্ন হতে পারে, যা ২০ বছরের সময়সীমায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৮০ গুণ বেশি উষ্ণায়ন ক্ষমতা সম্পন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস। বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি ও অপচয়ের কারণে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮–১০ শতাংশ ঘটে। এর পাশাপাশি, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে গড়ে প্রায় ২,৫০০ লিটার জল সরবরাহের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, কোটি কোটি ভুখা মানুষের দেশেই অঢেল খাদ্যের পাশাপাশি জল ও খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত মূল্যবান সম্পদও অনর্থক নষ্ট হয়ে চলেছে।

সরকার অবশ্য বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের পদ্ধতি নিয়েই আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সূচকের চারটি উপাদানের মধ্যে তিনটিই— শিশুর খর্বাকৃতি, কৃশতা ও শিশু মৃত্যু— মূলত শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পরিস্থিতি নির্দেশ করে; তাই এগুলির ভিত্তিতে সমগ্র দেশের ক্ষুধার চিত্র নির্ধারণ কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভারতের মতো জনবহুল ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে খাদ্যপ্রাপ্যতা, শিশুপুষ্টি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে যথেষ্ট বৈষম্য রয়েছে। ফলে জাতীয় গড় অনেক সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলির প্রকৃত পরিস্থিতিকে আড়াল করে। কিন্তু সূচকের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা কি দেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টির উপস্থিতিকে নাকচ করার যথেষ্ট যুক্তি হতে পারে?

বস্তুত, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক কেবল ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা নয়, অপুষ্টি, শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও শিশু মৃত্যুর মতো সূচকের মাধ্যমে ক্ষুধার বহুমাত্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করে। কারণ, দেশে খাদ্য সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও তার সুষম বণ্টন ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা থাকে না, যার প্রভাব শিশুদের স্বাস্থ্যেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকার NFHS-এর মতো নিজস্ব সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরতেই পারে, তবে ভিন্ন উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে পরিচালিত দুটি সমীক্ষা পরস্পরের বিকল্প নয়।

এক দশকেরও বেশি আগে, ১০ জানুয়ারি ২০১২-তে HUNGaMA (Hunger and Malnutrition) রিপোর্ট প্রকাশের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং স্বীকার করেছিলেন, “The problem of malnutrition is a matter of national shame. Despite impressive growth in our GDP, the level of under-nutrition in the country is unacceptably high.”। কিন্তু, আমাদের বর্তমান সরকার বাহাদুর যে কোনও ক্ষেত্রে বিরূপ ফলাফল প্রকাশ্যে এলে লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়ার বদলে নির্দ্বিধায় সমীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। ফলে লজ্জা মোচনের ব্যাপারটাও গায়েব। ক্ষমতা ও সুযোগ থাকলে হয়তো সমীক্ষার ফলাফল অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হত না, সমীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাটির বৈধতা কিংবা অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলে বসত। অনেকটা খেলায় হেরে গিয়ে বোর্ডটাই লন্ডভন্ড করে দেওয়ার মতো। তবে বিশ্ব জুড়েই ক্ষমতার অলিন্দে এ ধরনের বালখিল্য আচরণ দেখতে দেখতে আমরা এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি! তাই কিছু উৎকট বিভ্রান্তির ধোঁয়া তুলে মূল সমস্যাকে আড়াল করা এবং সমস্ত প্রশ্নের মুখে প্রতিক্রিয়াহীন থাকার এক সুপরিকল্পিত অভ্যাস গড়ে তোলা হয়েছে ক্রমে।

অতীতে এ নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে কিঞ্চিৎ আলাপ-আলোচনা হত। কিন্তু শেষ ক’বছর আমাদের মাননীয় বিশ্বগুরু এ ধরনের আপত্তিকর পরিসংখ্যানকে নিজস্ব যুক্তিজালে গণতন্ত্রের পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক প্রতিপন্ন করতে এতটাই সফল হয়েছেন যে, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটিও মুখে কুলুপ এঁটে বাধ্য ছাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর নন-বায়োলজিক্যাল মানুষটির রসনাবিলাসে ব্যবহৃত বাহারি মাশরুমের গুণাগুণ, নীতাদেবীর ব্যবহৃত কাপ-প্লেটের দুর্লভতা ও আভিজাত্য, অথবা কিং কোহলির মহার্ঘ্য পানীয় জলের চারিত্রিক বিন্যাস— এ জাতীয় উত্তপ্ত শিরোনামই গ্রাস করে থাকে জনমানস। যদিও খোদ এই দেশীয় সংবাদমাধ্যমগুলি বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ধারাবাহিকভাবে তথৈবচ নম্বর নিয়ে নিম্নস্থানেই (২০২৬ সালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭তম) কিংবা বলা ভালো, অকৃতকার্য হয়, সে আলাদা প্রসঙ্গ। যাই হোক, পরের বছর আবার নতুন সূচক, নতুন প্রতিবেদন, নতুন পরিসংখ্যান, পুরনো প্রতিক্রিয়া। যে দেশ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, সেই দেশেরই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে আজও ন্যূনতম পুষ্টিসম্মত আহার কেন অধরা— এই মৌলিক প্রশ্নটিই থেকে যায় অনুচ্চারিত।

অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণায় বহু আগেই দেখিয়েছেন, ক্ষুধা কেবল খাদ্যের সামগ্রিক অভাবের সমস্যা নয়; বরং খাদ্য অধিগ্রহণের সামর্থ্য ও অধিকার হারানোরও সমস্যা। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর Poverty and Famines গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, খাদ্যের মোট সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবিকা বিপর্যস্ত হলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। ভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী রাষ্ট্রনীতিও দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে, সে সত্য অমর্ত্য সেন-সহ বহু বিদ্বজ্জন আগেই দেখিয়েছেন। অথচ সেই অমর্ত্য সেনই আজ বর্তমান সরকার ও তার অনুগামীদের একাংশের কাছে, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, রীতিমতো চক্ষুশূল। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি রাজনৈতিক বিরাগ যতই প্রবল হোক, তাঁর গবেষণালব্ধ সত্যকে অস্বীকার করলেই বাস্তবের পরিবর্তন ঘটে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনাহার প্রতিরোধের পরীক্ষিত উপায়গুলি গ্রহণের পরিবর্তে সেগুলিকে উপেক্ষা ও প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতাই যেন ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। ক্ষুধার মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান নিয়ে গভীরতর আলোচনার পরিবর্তে যাবতীয় বিতর্ক আবর্তিত হচ্ছে সূচকের পদ্ধতিগত নির্ভরযোগ্যতাকে কেন্দ্র করে। পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে ক্ষুধা ও অপুষ্টির বাস্তবতা ও তা প্রতিরোধের পদক্ষেপগুলিই যদি উপেক্ষিত থেকে যায়, তবে তা নিছক বিতর্কের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রশাসনের অগ্রাধিকার সম্বন্ধে প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।

দেশের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হিন্দুত্ব এখন ‘সনাতন’ পরিচয়ের নবতর ব্যাখ্যা নির্মাণে ব্যস্ত। কার পাতে কী উঠবে, তা নির্ধারণের অধিকার নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে আস্ফালনের অন্ত নেই। ধর্মীয় আবেগের জিগির তুলে আমিষ-নিরামিষের মতো গৌণ বিষয় যখন আলোচনার কেন্দ্রে স্থান করে নেয়, তখন সেই একই দেশের অসংখ্য শিশুর ক্ষুধা ও অপুষ্টির তীব্রতা ক্রমশ অন্তরালে চলে যায়। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র বস্তুত নিজের ভবিষ্যতের ভিতকেই দুর্বল করে। সবুজ বিপ্লবের অন্যতম রূপকার নরম্যান বোরলগ ১৯৭০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের বক্তৃতায় বলেছিলেন, “Food is the moral right of all who are born into this world.”। খাদ্য এবং একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ বা সরকারি পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; বরং জন্মসূত্রে প্রত্যেক মানুষের নৈতিক অধিকার এবং মানবোন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। এই উপলব্ধিই উন্নয়নের যে কোনও দাবির ভিত্তি হওয়া উচিত । সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই যখন রাষ্ট্র ব্যর্থ, তখন প্রবৃদ্ধির যাবতীয় গর্বের পাশে ক্ষুধার প্রশ্নটি অনিবার্যভাবেই এক গভীর স্ববিরোধ হয়ে দাঁড়ায়।


1 comment:

  1. অসম্ভব প্রয়োজনীয় নিবন্ধ। বাচ্চারা খিদে পেটে ঘুমাতে যায় যে দেশে সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধাণের সীমাহীন নির্লজ্জতা দেখলে রাগে, ঘৃণায় গা রি রি করে।
    কি অসম্ভব অপচয় হয় আমাদের এই গরিব দেশে। মাথায় ফুল গুঁজে মণ্ত্রী তথাকথিত পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মেতেছেন। সোনার দোকানে ধনতেরাস না কি, তার জন্য ভীড় উপচে পড়ছে। অজস্র উদাহরণ। শিক্ষা নেই, খাদ্য নেই, পানীয় নেই, রোগের চিকিৎসা নেই, নিরাপত্তা নেই। অনন্ত মোচ্ছব চলছে শুধু। - শ্রেয়া ঘোষ।

    ReplyDelete