Friday, 23 September 2022

ডিজে'র ব্যবহার নিষিদ্ধ হোক

আন্দোলনের পথে বলাগড়ের মানুষ

 অয়ন মুখোপাধ্যায়


পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো আমাদের বলাগড় ব্লকের বিভিন্ন প্রান্ত ভয়াবহ ডিজের শব্দ দূষণে আক্রান্ত। যে কোনও অনুষ্ঠানে ডিজের বিকট শব্দে আজ সাধারণ মানুষ  অতিষ্ঠ। কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।যে যত পারছে বেশি করে ডিজে বাজাচ্ছে। ক্ষমতার আস্ফালন। সকাল থেকে সারারাত বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে বিকট শব্দ করে ডিজে বেজে চলে একটানা ডুমডুম ডিপডিপ গুড়গুড় ইত্যাদি শব্দে।

সামনেই দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, রাস উৎসব, শীতকালীন পিকনিকের ঘনঘটা। চলবে ডিজে'র বেলাগাম ব্যবহার। তারপর তো রয়েছেই মাইকের চিৎকার। ফলে, সর্বত্র শব্দ দূষণ ঘটে।মানুষের কষ্ট বাড়ে। বাড়ে শারীরিক ক্ষতি। বিশেষ করে আক্রান্ত হয় শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। ডিজের দাপটে হার্ট ও উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগীরা বিপদে পড়ে বেশি। মানসিক অস্থিরতাও বেড়ে যায়। দুর্ঘটনা ঘটে রাস্তায়।

অন্যদিকে, ডিজে চালিয়ে উচ্ছৃঙ্খল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে, মদ খেয়ে মারামারির মতো ঘটনা আমরা প্রায়শই দেখতে পাই। আর এইসব দেখে আমরা যদি প্রতিবাদ না করি, প্রতিরোধ না গড়ে তুলি, তাহলে কীসের সংস্কৃতি চর্চা! পৃথিবীর গভীরতর অসুখ বলে আমরা পালিয়ে যেতে পারি না। অদ্ভুত আঁধার এসেছে বলে আমরা কি তাহলে ঘরের মধ্যে বসে থাকব? আমাদের মননে আছে সাংস্কৃতিক বোধ, আছে সামাজিক দায়বদ্ধতা আর সেই তাগিদ থেকেই আমাদের এই আন্দোলন, এই লড়াই।

আমরা মনে করি, সংস্কৃতি মানে শুধু নাচ গান আবৃত্তি চর্চা নয়। সংস্কৃতি বলতে বুঝি সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা আচরণ, যোগ্যতা, জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, আদর্শ ও আইন সহ বিভিন্ন  উপায়ের যৌগিক সমন্বয়। আমাদের মতে, সংস্কৃতি বলতে সেই সব পন্থাকে বোঝায় যার মধ্যে দিয়ে মানবজাতি তার প্রকৃত বর্বরতাকে কাটিয়ে উঠে পূর্ণরূপে মানুষে পরিণত হয়। আমাদের প্রশ্ন, ডিজে'র ব্যবহার কি বর্বরতা কাটিয়ে ওঠা? নাকি মানুষকে বর্বরতর সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া?

আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা, গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের সদস্য-সদস্যারা প্রশাসনের কাছে এই আবেদন রাখছি যে, আসন্ন উৎসবের দিনগুলিতে অবিলম্বে ডিজে বন্ধ হোক। বন্ধ হোক তারস্বরে মাইক বাজানো। সরকারি নিয়ম বিধি মেনে চলুক বক্স ও মাইক।

সমস্ত পুজো কমিটির কাছে আবেদন, সুস্থ সংস্কৃতির স্বার্থে আপনারা নিজে থেকে ডিজে বন্ধ রাখতে এগিয়ে আসুন। সামাজিক মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। আসুন, দীর্ঘদিন ভুল করার অভ্যাস ত্যাগ করি। প্রশাসন ও সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অনুরোধ, ভবিষ্যতের কথা ভেবে  আপনি-আপনারা শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলনের সাথী হোন।

আমাদের দাবি:

১) শব্দ দূষণ সংক্রান্ত আইন মেনে চলতে হবে;

২) বিনা অনুমতিতে উচ্চ শব্দ করার যন্ত্রগুলি বাজানো যাবে না;

৩) ডিজে'কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক;

৪) প্রশাসনের প্রতি আবেদন, জনগণ এবং পুজো কমিটিগুলোকে নিয়ে বিকট শব্দের খারাপ দিকগুলি সম্পর্কে সচেতনতা শিবির করতে হবে।

৫) প্রশাসনকে সংবিধানের ২১ নম্বর ধারার মর্যাদা দিয়ে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের অধিকার সুরক্ষিত  রাখতে হবে ।

পরিশেষে আবারও বলি, আসুন আনন্দের দিনগুলোতে আমরা যেন নিরানন্দ না হয়ে যাই। শব্দ দূষণকে রুখে দিয়ে আসুন আমরা আগামী প্রজন্মের কাছে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করি। সবচেয়ে আনন্দের কথা, ডিজে বন্ধের ব্যাপারে সই সংগ্রহ শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা প্রশাসনকে এই দাবিপত্র পাঠাব। পরিতোষ হাই স্কুল, রাধারাণী উচ্চ বিদ্যালয়, বলাগড় উচ্চ বিদ্যালয়, সোমরা দুর্গাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়, খামারগাছি কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীরা সমর্থন জানিয়েছেন।এছাড়া বলাগড় ব্লকের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মী, সাধারণ মানুষ আমাদের সমর্থন করেছেন।

গত কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গে আমাদের সংগঠনের সভাপতি সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যতম সহ-সভাপতি সৈকত বাগচী, সন্ধ্যা ঘোষ ও আশীষ চক্রবর্তী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যা মৌসুমী মজুমদার এবং সংস্কৃতি কর্মী সানন্দা গুণ বিশ্বাস এই ব্যাপারে সই সংগ্রহে সহযোগিতা করে  আসছেন।

সংযোজন:

এ ব্যাপারে স্থানীয় বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী তাঁর মতামত জানিয়েছেন:

'একজন মানুষ যার নাম অয়ন মুখার্জী। যিনি সিপিএম পার্টির নেতা। যার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা চুঁচড়া ভোট গণনা কেন্দ্রে। যিনি সেদিন মুখ বিকৃত করে আমাকে বলেছিলেন, 'আপনি চল্লিশ হাজার ভোটে হেরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যাবেন!'

'আপনারা জানেন আমি হারিনি। ভবিষ‍্যৎবাণী সফল হয়নি অয়নবাবুর। দিদি মমতা ব‍্যানার্জীর আশীর্বাদ ও কঠোর পরিশ্রম আর আপনাদের ভোট আর ভালোবাসায় জনসংঘ নেতা শ‍্যামাপ্রসাদের জন্মভূমিতে গত লোকসভার ভোটে ছত্রিশ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকা বিজেপিকে প্রায় নয় হাজার ভোটে পরাজিত করতে পেরেছি। তবে পরে আমার সঙ্গে অয়নবাবুর আবার দেখা হয় এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, সিপিএম হলেও মানুষটির মনে সমাজ সেবার অকৃত্রিম ভাবনা আছে। তাই খানিকটা বন্ধু মতো হয়ে গেছেন। 

'সেই অয়ন মুখার্জী একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট  হয়েছেন। কী আন্দোলন, কেন আন্দোলন উনি নিজেই সেটা  লিখেছেন। আমি সিপিএম বিরোধী হলেও তাঁর কথার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছি। উনি সিপিএম করেন বলেই তার সঠিক বা সত‍্য কথনের সঙ্গে বিরোধিতার জন‍্য বিরোধিতা করব মাত্র- আমি এমন মনোভাব পোষণ করি না। 

'তাই আমি অয়নবাবুর ডিজে বন্ধের আন্দোলনকে সমর্থন করছি। চাইছি, দলমত নির্বিশেষে সবাই এটাকে সমর্থন করুন। বন্ধ হোক পরিবেশ দূষণ। একটা সুন্দর সুস্থ  উৎসব হোক। আমার আনন্দ যেন অন‍্যের কষ্টের কারণ না হয়ে ওঠে।' 


Wednesday, 21 September 2022

স্বাধীনতার ৭৫ বছর: ১

ভারতবর্ষ কোন পথে

সমর বাগচী

 


সম্প্রতি ‘স্বরাজ ইন্ডিয়া’ পার্টির প্রধান যোগেন্দ্র যাদব বিহারে নীতিশ কুমার বিজেপি পার্টির জোট ছেড়ে নতুন সরকার গঠন করার পর আমায় এবং অনেককেই এক চিঠিতে ২০২৪’এর লোকসভা ভোটে বিজেপি হারবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করেন।

আমি তাঁকে একটা চিঠি দিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, যদি তাই হয়, তাহলে বিহার এবং ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মডেল কী হবে? পশ্চিমবঙ্গের গত বিধানসভা ভোটে টিএমসি’র বিরুদ্ধে প্রচুর দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেসের বিপুল প্রচার স্বত্ত্বেও, যা বহুলাংশে সত্যি, বিজেপিকে ভালভাবে হারিয়ে টিএমসি তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসে। যে বামফ্রন্ট ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল সেই ফ্রন্ট এবং কংগ্রেস বিধানসভায় শূন্য হয়ে যায়। এইরকম যে হবে তা আমি ভাবতে পারিনি। টিএমসি’র জেতার কারণ পরে ভেবে দেখেছি তিনটি। প্রথম দুটি প্রধান।

এক) টিএমসির গ্রামের মানুষের জন্য উন্নয়নের কাজ; যা আমার গ্রামে শিক্ষা নিয়ে কাজ করার ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলার এবং দু-একটা এনডিটিভি’র মতো চ্যানেলের গ্রামের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎকার থেকে বুঝেছি;

দুই) গ্রামের মহিলাদের ক্ষমতায়ন;

তিন) মোদি, অমিত শাহ এবং বহিরাগত বিজেপি নেতাদের বাঙালিদের অস্মিতার ওপর আক্রমণ।

কিন্তু প্রশ্ন হল, কী দাঁড়াল ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর পশ্চিমি মডেলে উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে? প্রায় ৭ কোটি মানুষ এই উন্নয়নের যূপকাষ্ঠে ঘরছাড়া হয়েছে। এইসব কিছু মানুষদের আমি দেখেছি আশির দশকে, যখন পুরুলিয়াতে বিজ্ঞান মিউজিয়াম নির্মাণ করছি, পাঞ্চেত বাঁধে ঘরছাড়া হয়ে বসবাসকারী বাঁধের পাশে বাঘমারা ও শিউলিবাড়ি গ্রামে। সে এক অবর্ণনীয় দুর্দশার জীবন। নব্বইয়ের দশকে মেধা পাটকার আমায় অনুরোধ করেন কলকাতার ডিভিসি-র প্রধান অফিসে গিয়ে ডিভিসি থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের সম্বন্ধে কোনও খবর পাওয়া যায় কিনা দেখতে। গিয়ে জানি যে ওদের কোন আর্কাইভ নেই। আমি ডিভিসি লাইব্রেরিতে দু-তিন দিন কাজ করি এবং ডিভিসি'র প্রথম অ্যানুয়াল রিপোর্টে পাঞ্চেত বাঁধের উদ্বোধনের খবর পড়ি। জহরলাল নেহেরু বুধনি শবরকে দিয়ে ঐ বাঁধের উদ্বোধন করান। ঐ অনুষ্ঠানে জলমন্ত্রী তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বলেছিলেন, পাঞ্চেত বাঁধ হওয়ায় বাঁধের পাশের গ্রামের মানুষদের জীবন পাল্টে যাবে। হ্যাঁ, সত্যিই পাল্টে গেছে। তা আমি দেখে এসেছি ২০০৮ সাল নাগাদ যখন পাঞ্চেতের কাছে গড়পঞ্চকোটে বেড়াতে যাই। তখনও আগের মতো ঐ একই অবস্থায় দেখে এসেছি বাঘমাড়া ও শিউলিবাড়ি গ্রামের মানুষদের। 

গত ২০ বছরে ১০ থেকে ১২ কোটি মানুষ কর্মপ্রযুক্ত হয়েছে। কাজ পেয়েছে মাত্র ৩০ লক্ষ। কিন্তু কোটিপতিদের সম্পদ বেড়েছে ১১২ গুণ। আজকের শিল্প কারখানা চলে উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে। চালু হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স। খুব কমই দক্ষ কর্মী লাগবে। তাই, শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে ভারতের ১৩৯ কোটি লোকের দেশে চাকরি দেওয়া যাবে না। ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’ প্রকাশিত ২০২২ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুইলিটি রিপোর্ট’ জানাচ্ছে যে, ভারতের জনসংখ্যার ওপরের ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৬৫ শতাংশ সম্পদ দখল করে আছে। ২০২১ সালে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স-এ ১৫৬টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪০। FAO-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ২০১৯-২০২১ সালের হিসেবে ২২.৪৩ কোটি লোক অপুষ্টিতে ভুগছে। ২০২০ সালে ১০,৬৭৭ জন চাষি আত্মহত্যা করেছে।  

এদিকে প্রকৃতি ভেঙ্গে পড়ছে। শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই নয়, পৃথিবীর অরণ্য, জীববৈচিত্র, জল, মাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। জমির বন্ধ্যাকরণ হচ্ছে এবং মরুভূমি এগিয়ে আসছে, উত্তর-দক্ষিণ মেরু ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ এবং পৃথিবীর সমস্ত হিমবাহ গলে যাচ্ছে, ওজোন গহ্বর সৃষ্টি হচ্ছে, সমুদ্র দুষিত হয়ে সামুদ্রিক প্রাণী বিপন্ন হচ্ছে। সমুদ্রতল উঁচু হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতেই চেন্নাই, মুম্বাইয়ের মতো সমুদ্রতটবর্তী শহর ও গ্রাম জলের তলায় তলিয়ে যাবে। সারা পৃথিবী জুড়ে বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হচ্ছে যার এক বড় অংশ বিপজ্জনক। দ্রুত হারে বিভিন্ন ধাতু শেষ হয়ে  যাচ্ছে। পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য জীবপ্রজাতি আজ অস্তিত্বের সংকটে। স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন ও বার্কলের বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন যে, পৃথিবীর মানুষরা যদি একইরকমের জীবন যাপন করে তাহলে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি আসন্ন। তাহলে যে প্রজাতি সব থেকে আগে বিলুপ্ত হবে তা হচ্ছে মনুষ্য প্রজাতি। পৃথিবীর এই আগামী বিপর্যয়ের সময়ে আমরা ভারতের উন্নয়নের কথা ভাবছি।

কেন আজ এই অবস্থা? এর মূল কারণ, পৃথিবীর ধনী মানুষদের ক্রমান্বয়ে ভোগবাদের বৃদ্ধি। এই ধনীদের মধ্যে যেমন পশ্চিমের উন্নত দেশের মানুষ আছে, তেমনই তৃতীয় বিশ্বের ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরাও আছে। ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে শিল্প বিপ্লব সম্পন্ন হয় এবং শিল্প-পুঁজিবাদ শুরু হয়। ১৮০০ সালে যখন একজন আমেরিকান বাজারে যেত, সে প্রায় ১৫০০ বর্গ ফুট বাজারে ৩০০ রকমের জিনিস কেনাকাটার সুযোগ পেত। আর ২০০০ সালে এক লক্ষ লোক বাস করে এমন এক শহরে যখন একজন আমেরিকান বাজারে যায় সে ১০ লক্ষ রকমের জিনিস বাছাই করে কেনাকাটার সুযোগ পায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বর্গ ফুট বাজারে। গত কুড়ি-তিরিশ বছরে কলকাতা এবং ভারতের যে কোনও শহরে শপিং মলের বাড়বাড়ন্ত থেকে ভোগবাদের বৃদ্ধি আমরা বুঝতে পারি। সেইসব মলে আমরা বঙ্কিমের হুসেন শেখ বা রামা কৈবর্তকে দেখতে পাই না। এই আগ্রাসী ভোগবাদই আজ পৃথিবীকে ধ্বংসের কিনারায় এনে ফেলেছে। আমেরিকান লেখক মার্ক টোয়েন তাই লেখেন, ‘Civilization is a limitless multiplication of unnecessary necessities.’। 

রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে ‘বিলাসের ফাঁস’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘এখনকার দিনে ব্যক্তিগত ভোগের আদর্শ বাড়িয়া উঠিয়াছে। এইজন্য বাহবার শ্রোত সেই মুখেই ফিরিয়াছে। এখন পরিচ্ছদ, বাড়ি, গাড়ি, জুড়ি, আসবাবপত্র দ্বারা লোকে আপন মাহাত্ম্য ঘোষণা করিতেছে। ধনীতে ধনীতে এখন এই লইয়া প্রতিযোগিতা। ইহাতে যে কেবল তাহাদেরই চাল বাড়িয়া যাইতেছে তাহা নহে, যাহারা অশক্ত তাহাদেরও বাড়িতেছে।’ ইতালির তুরিন শহরে ‘City and Civilization’ বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘অতীব ভোগবাদী জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, যা জনসাধারণের খুব এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত, তা বহুদা বিস্তৃত হচ্ছে। এই যে ক্রমবর্ধমান বোঝা তা যে কোনও সভ্যতার পক্ষে  মারাত্মক… বিরাট সম্পত্তির অধিকারী হওয়া এবং বিলাসবহুল জীবন পাহাড়ের মতো বিচ্ছিন্নতার দেওয়াল তোলে যা প্রাকৃতিক পাঁচিলের মতো উঁচু… পশ্চিমে যাকে গণতন্ত্র বলা হয় তা একটি সমাজে কখনও সত্যি হতে পারে না যেখানে লোভ লাগামছাড়া হয়। জনসাধারণ তাকে শুধু উৎসাহিতই করে না প্রশংসাও করে।’ ১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে রাণী মহলানবিশকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘এমন সময়ে আমেরিকায় এসে চোখে পড়ল মানুষ কতই অনাবশ্যক ব্যর্থতায় সমাজকে ঝাঁঝরা করে তুলেছে, আবর্জনাকে ঐশ্বর্যের সাড়ম্বরে সাজিয়েছে, আর তার পেছনে দিনরাত্রি নিযুক্ত হয়ে আছে... পৃথিবীর ওপর কি অভ্রভেদী বোঝা চাপিয়েছে।’

এই বোঝা আমেরিকাকে কোথায় এনে ফেলেছে তা দেখুন আমেরিকার এক চিন্তকের বক্তৃতায়। পৃথিবীর মিউজিয়ামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আছে যার নাম ইন্টারন্যাশানাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (ICOM)। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তিন বছর অন্তর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। ১৯৮৯ সালে হল্যান্ডের দেন হাগ শহরে তেমন এক সম্মেলনে আমি উপস্থিত ছিলাম। সম্মেলনের মুখ্য বক্তা ছিলেন আমেরিকার এক চিন্তক নিল পোস্টম্যান; উনি আমেরিকার সমাজ সম্বন্ধে বলছেন, ‘যতরকমের প্রযুক্তিগত উন্নতি হচ্ছে তা ব্যবহার করার জন্য আমাদের সমাজকে আমরা প্রস্তুত করেছি। আমরা পাগলের মতো, স্বইচ্ছায়, কিছু চিন্তা না করে তার যে কী পরিণাম হতে পারে তা না ভেবে তাকে অবহেলা করেছি। এবং যেহেতু প্রযুক্তির তা প্রয়োজন তাই আমরা ধর্ম, পরিবার, শিশু, ইতিহাস এবং শিক্ষা থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। আমরা যা করেছি তার জন্য আমেরিকান সভ্যতা ধ্বসে পড়ছে। সবাই জানে যে এটি সত্যি কিন্তু তার মোকাবিলা করবার জন্য তারা শক্তিহীন। আমাদের প্রযুক্তির স্বপ্নের একটি আংশিক বিবরণ দিই। ১৯৯৫ সালের মধ্যে আমাদের শিশুরা হয় মা নয় বাবার কাছে থাকবে (অর্থাৎ, বিবাহ বিচ্ছেদ হবে)। আমাদের বড় বড় শহরে ৫০ শতাংশের কম ছাত্র হাই স্কুলের দরজা পেরয়। এটি ঘটছে এমন একটি সংস্কৃতিতে যা সাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের চিন্তা আবিষ্কার করেছে... আমাদের জনসাধারণের এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ছয় কোটি মানুষ নিরক্ষর। প্রতি বছর চার কোটি লোক বাড়ি বদল করে এবং বহু লক্ষ মানুষের কোনও গৃহ নেই, রাস্তায় কিংবা সাবওয়েতে বাস করে। ১৯৫৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত (অর্থাৎ ১৯৮৯) হিংসাত্মক অপরাধ ১১,০০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। প্রতি দশজন আমেরিকানের মধ্যে দুজন তাদের জীবনের কিছু সময় মানসিক প্রতিষ্ঠানে কাটাবে। আমাদের শহরগুলো ট্রাফিক জ্যামে আটকে যাচ্ছে; আমাদের পানীয় জল সীসা ও মেডিক্যাল বর্জ্য দ্বারা বিষাক্ত; আমাদের বৃষ্টিতে অ্যাসিড; পৃথিবীর অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে আমাদের দেশের মানুষ মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি অ্যাস্পিরিন খায়; পশ্চিম দেশের মধ্যে আমাদের দেশে শিশু মৃত্যুর হার সর্বাধিক এবং আমাদের কিশোর-কিশোরীরা তাদের মাথা ড্রাগ দিয়ে ভাজছে।’ 

এই হছে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের অবস্থা। সেই দেশে আমাদের শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা, বেশির ভাগ উচ্চবিত্ত, যাদের শিক্ষিত করবার জন্য দেশ কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, দেশ ছেড়ে সেই দেশে পাড়ি দিচ্ছে ভোগবাদী জীবন যাপন করার জন্য। তাদের বেশির ভাগ কাজ করছে এমন সব কর্পোরেট সংস্থায় যারা তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করছে নানা উপায়ে। তাদের মধ্যে খুব কম জনই আছে যারা উচ্চপর্যায়ের জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন অবদান রাখার কাজ করছে।     

ক্রমাগত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি শিল্প-পুঁজিবাদের ধর্ম। গান্ধী বলছেন, ‘আমি ভীত যে শিল্পবাদ মানুষের পক্ষে অভিশাপ হবে। একটি দেশ অন্য দেশকে শোষণ করবে তা চিরদিন চলতে পারে না। শিল্পবাদ নির্ভর করে বিদেশি বাজারকে শোষণ করা এবং প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতির ওপর।’ তাই গান্ধী ভারতবাসীকে সাবধান  করছেন, ‘ঈশ্বর করুন ভারত যেন কোনওদিন পশ্চিমের মতো শিল্পায়ন না করে। একটি ছোট্ট দ্বীপ-দেশ আজ সমস্ত পৃথিবীকে শৃঙ্খলিত করেছে। আজ যদি ৩০ কোটির সমস্ত দেশ (অর্থাৎ, ভারত) একইরকম অর্থনৈতিক শোষণ করে তাহলে সমস্ত পৃথিবী পঙ্গপাল পড়ার মতো নিঃস্ব হয়ে যাবে।’

ক্রমশ...

এই লেখার দ্বিতীয় ভাগ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:

https://ekakmatra2013.blogspot.com/2022/09/blog-post_25.html 

 

Saturday, 17 September 2022

জঁ ল্যুক গদার (১৯৩০-২০২২)

শ্বাসরুদ্ধকর দক্ষতা ও গতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


যে গল্প বলতে গেলে প্রবন্ধে হারিয়ে যায়। যা ফর্ম্যাটকে গ্রহণ করে, পরিবর্তন করে, ফর্ম্যাটকে বর্জন করে ও ব্যাকরণ-সদৃশ হয় না, পাঠযোগ্য না হলেও যে ভাষা একদম নিজের মতো, তাকে পাঁচটা আর শিল্পের কাছ থেকে ভাড়া করার প্রয়োজনই পড়ে না। হয়তো সেটাই চলচ্চিত্র। আজ চলচ্চিত্র কেন তার ভাষা খুঁজবে সাহিত্যের কাছে ?

জঁ ল্যুক গদার প্রয়াত।

শুটিং লোকেশনে গিয়ে তিনি চিত্রনাট্য লিখতেন, আর ক্যামেরা চালুর আগে চরিত্রদের মুখে সংলাপের জোগান দিতেন। ফরাসি রথী-মহারথীদের মতো স্টুডিওতে গিয়ে, বিশাল লটবহর নিয়ে স্টোরিবোর্ড মেনে শুটিং করার ঐতিহ্যকে তিনি গুঁড়িয়ে দেন প্রথম ছবিতেই। প্রাকৃতিক আলোতে হাতে ধরা ক্যামেরা নিয়ে শ্যুট করায় তাঁর ছবির ভেতর এক ধরনের প্রামাণ্যচিত্রের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা পরবর্তী সময়ে বেশ অনুকরণীয় হয়ে ওঠে অন্যদের মধ্যে। 

এই ফরাসি-সুইস পরিচালক- যিনি ন্যুভেল ভ্যেগ (ফরাসি নিউ ওয়েভ)-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক- ১৯৫০ এবং '৬০ এর দশকের শেষের দিকে চলচ্চিত্রে বিপ্লব এনেছিলেন। ৯১ বছর বয়সে তাঁর চিরবিদায়। আইকনোক্লাস্টিক চরিত্রে চূড়ান্তভাবে অধার্মিকতা, আপাতদৃষ্টিতে ইম্প্রোভাইজড ফিল্মিং ও শৈলীর পাশাপাশি অবাঞ্ছিত মৌলবাদের বিরুদ্ধে সর্বাধিক পরিচিত প্রতিবাদী গদার এখনকার মতো একটি অসম্ভাব্য কেরিয়ারের পুনরুজ্জীবন উপভোগ করার আগে অথবা ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা করারও আগে ১৯৬০-এর দশকে তাঁর নির্মিত ধারাবাহিক রাজনৈতিক ছবিগুলো যেন ছিল এক-একটা প্রতীক। এক-একটা চিহ্ন তৈরি করে যেন তার যুক্তি খুঁজতেন গদার। 

ফরাসি সংবাদমাধ্যম রিপোর্ট করেছে যে তিনি সুইজারল্যান্ডে 'শান্তিপূর্ণভাবে' তাঁর সঙ্গী অ্যানিমারি মিভিলের পাশে মারা গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবারের সদস্যের উদ্ধৃতি দিয়ে 'লিবারেশন' রিপোর্ট করেছে যে তাঁর মৃত্যুতে সহায়তা করা হয়েছে, যা সুইজারল্যান্ডে বৈধ: 'তিনি অসুস্থ ছিলেন না, তিনি কেবল ক্লান্ত ছিলেন। তাই নিজেকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এটা তার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল।' গদারের আইনজীবী প্যাট্রিক জেনারেট এক সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, 'একাধিক অক্ষম রোগের' মেডিকেল রিপোর্টের পরে গদারের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্যুইট করেছেন: 'আমরা একটি জাতীয় ধন হারিয়েছি, এক প্রতিভাবান চোখ।' যে চলচ্চিত্র নির্মাতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন 'লাস্ট নাইট ইন সোহো'র পরিচালক এডগার রাইট, যিনি তাঁকে 'সকলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আইকনোক্লাস্টিক ফিল্ম-মেকারদের একজন' বলে অভিহিত করেছিলেন। 

১৯৩০ সালে প্যারিসে গদার জন্মগ্রহণ করেন, পরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা হ্রদের তীরে নিয়নে বেড়ে ওঠেন। আবার প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে তিনি 'সিনে-ক্লাব'এ একটি প্রাকৃতিক আবাস খুঁজে পান যা ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের একটি শক্তিশালী স্তম্ভকে প্রমাণ করে। তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক ও সমালোচক আন্দ্রেঁ বাঁজার অন্যতম বন্ধু ও ছাত্র। বাঁজার অন্য ছাত্রদের সঙ্গে (যেমন, ভবিষ্যতের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, ক্লদ শ্যাব্রল, এরিক রোহমার এবং জ্যাক রিভেত) তিনি দেখা করেন। এর মধ্যে বাঁজা শিগগিরই ইনফ্লুয়েনশিয়াল 'কাহিয়ার্স দ্যু সিনেমা' সহ নতুন ফিল্ম ম্যাগাজিনের জন্য লেখা শুরু করে দিয়েছেন। সম্পাদক ছিলেন আন্দ্রে বাঁজা আর গদার ছিলেন এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের সাথী। 

সাবেক হলিউড ফিল্ম-মেকিংকে রক্ষা করে গদার শুরু থেকেই একটি প্রচলিত ন্যারেটিভকে তছনছ করার মতো নোট তৈরি করতে থাকেন তাঁর ফিল্মি মণীষায়। হামফ্রে বোগার্টের প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধা ছিল; ১৯৬০ সালে তাঁর প্রথম বৈশিষ্ট্যসূচক প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিকশন ফিল্ম 'ব্রেথলেস'-এ তা প্রকাশ পায়। এর আগে তিনি 'শ্লাট এট্ ভেরোনিক'এর মতো শর্ট ফিল্মের একটি সিরিজের মাধ্যমে ফিল্ম-মেকিং'এ তাঁর পথ সহজ করে নিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে 'অল দ্য বয়েজ আর কলড প্যাট্রিক' তাঁর ঢিলেঢালা, দৃশ্যত স্লিপড মেকিং শৈলীকে প্রাধান্য দিয়েছিল। এক ক্ষুদ্র অপরাধী এবং তার গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে ত্রুফোর নিটোল মর্মন্তুদ ধারণায় তিনি গেলেন না, কিন্তু গদার ভেবেছিলেন যে তিনি এটিকে একটি অন্যরকম বৈশিষ্ট্যে পরিণত করতে পারেন এবং তা পারেন কিনা সেই অনুমতিও চেয়েছিলেন বন্ধু ত্রুফো ও বাঁজার কাছ থেকে। ত্রুফো তার 'দ্য 400 ব্লোজ' ফিচারের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেছিলেন এবং তার প্রভাব গদারকে তাঁর প্রকল্পটি (ব্রেথলেস) বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেছিল। এবারে গদার সজোরে চলচ্চিত্র থেকে আহ্বান পেলেন কিছু করার, তাঁর দৌড় আর থামল না। 

১৯৬৯ সালে প্যারিসের রাস্তায় নগণ্য কৃত্রিম আলোকসজ্জা এবং প্রতিদিনের লিখিত একটা স্ক্রিপ্ট সহ শ্যুট করা হয়েছিল, তবু থার্ড গ্রেডেড অত্যন্ত পাতি একটি হলিউডি থ্রিলারকে কী বানানো যায়- 'ব্রেথলেস' হয়ে গেল একটি সর্বোত্তম সাংস্কৃতিক ঘটনা; যা জঁ-পল বেলমন্দকে তারকা বানিয়েছে এবং বার্লিন ফিল্মে গদার সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন। উৎসব ও তার পরবর্তী চলচ্চিত্র Le Petit Soldat ফরাসি সরকারের নির্যাতনকে তুড়ি মেরে প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্স আনার পরামর্শ দিয়েছিল এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এটি ছিল সেই চলচ্চিত্র যার ভিত্তিতে গদার তাঁর প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাথে দেখা করেছেন এই ছবিতে; সেই সঙ্গে তাঁর সিনেমার প্রতি বিখ্যাত অমোঘ উক্তি করেছিলেন: 'সিনেমা প্রতি সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেমেই সত্য। অর্থাৎ, প্রতি সেকেন্ডে সিনেমা ২৪ বার মিথ্যে কথা বলে। কারণ, স্থিরচিত্রগুলি সেকেন্ডে ২৪ বার চালনা করে একটি চলমানতার বিভ্রম তৈরি করে। এটাই সিনেমা।' 

নিজে নির্মাতা হওয়ার আগে সিনেমা দেখেছেন দিনরাত এক করে। একই ছবি বহুবার। বন্ধুদের মতোই তিনি প্রথমে ছিলেন চলচ্চিত্র সমালোচক। সমালোচনাকালে যে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের ছবি নাকচ করতেন, সেই ধারণাগুলোই পরবর্তী সময়ে নিজের ছবিতে কাজে লাগাতে থাকেন। ৯১ বছরের জীবনে দু' হাত ভরে সিনেমা বানিয়েছেন— চল্লিশের অধিক পূর্ণ দৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ছাড়াও প্রামাণ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, টিভি সিরিজ সব মিলিয়ে তাঁর সৃষ্টি।

গদার একবার কথায় কথায় বলেছিলেন, চলচ্চিত্র বানাতে নারী আর বন্দুকই যথেষ্ট। তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ১৯৬০ সালে নির্মিত প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ব্রেথলেস’এর মাধ্যমে। ক্রাইম ড্রামাটির ভেতর থাকা প্যাট্রিসিয়া প্রেমে পড়ে মিশেল নামে এক অপরাধী ব্যক্তির। চলচ্চিত্রের শেষ অঙ্কে পুলিশের গুলিতে মারা যায় মিশেল, তবে ওই ছবি দেখে বিশ্ব চলচ্চিত্র গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে, কারণ, ছবিটির অভিনবত্ব। সম্পাদনায় জাম্পকাট, চরিত্রের ট্রিটমেন্ট এবং হলিউডের ক্রাইম জঁরার প্লট নিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন গদারকে সে সময় শুধু আলাদাই করে দেয়নি, বিশ্ব চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। গদার প্রথম ছবিতে সম্পাদনার যে রীতি ব্যবহার করেছেন তা দর্শককে ধাক্কা দেয়, আর চলচ্চিত্র দেখার চোখকেও পাল্টে দেয়। সে সময়ের ছবিতে যে ধরনের সম্পাদনা হত, তাতে ‘মন্তাজ’ সম্পর্কে দর্শকের সচেতন হওয়ার কোনও সুযোগই ছিল না। কিন্তু গদার যেন আধমরা দর্শকদের ঘা মেরে জাগাতে চাইলেন। একই সঙ্গে ঘা মেরে ভাঙতে চাইলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের চিরাচরিত ব্যাকরণকেও।

১৯৬৫ সালের মধ্যে করিনার সঙ্গে গদারের বিবাহ বিচ্ছেদে শেষ হয়েছিল। ষাট ও সত্তরের দশকের যুগে বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গেও তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর ফিল্ম-মেকিং রিফ্লেক্স এটিকে ধারণ করে নিরন্তর। তিনি 'জিগা ভের্তভে' নামে একটি দল করেছিলেন। সোভিয়েত পরিচালক ভের্তভে'র ১৯২৯ সালের ছবি 'ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা'র মাধ্যমে প্যারিসে ছাত্র অভ্যুত্থানের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছিলেন। এই আন্দোলন ১৯৬৮ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বন্ধ করতে সাহায্য করেছিল। সত্যিই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিচিত ছিলেন। নিজের রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনকে তিনি মিলিয়ে দিয়েছিলেন। কোনওদিন ভণ্ডামি করেননি। ব্যক্তিজীবন, প্রেম, বিবাহ, বিচ্ছেদ ও বামপন্থা কোনওটাকেই তিনি আলাদা করে দেখতে চাননি। ১৯৭০'এর দশকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গদারের কঠোর রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানগুলি তাদের পুরনো ভাবনা হারাতে শুরু করে, কিন্তু তার ২০০১ সালের ফিচার ফিল্ম 'ইন প্রেজ অফ লাভ' একটি প্রত্যাবর্তন চিহ্নিত করে। ২০১৪ সালের 'গুড বাই টু ল্যাঙ্গুয়েজ'এর জন্য কান-এ জুরি পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং ২০১৮ সালে 'দ্য ইমেজ বুক' একটি বিশেষ পুরস্কার 'পালমে ডি'অর' পেয়েছিল।

তাঁর বন্য বিভ্রান্তি, সাউন্ডট্রাকে ডিফেক্টিভ সংলাপদৃশ্য, ঠিকঠাক লোকেশনের কাজ, নন-ন্যারেটিভ ট্যুর এবং 'জাম্প-কাটস' কখনও একটি স্বজ্ঞাত, অশিক্ষিত লেখক দ্বারা অনুপ্রাণিত, অর্ধ-ইচ্ছাকৃত ভুল সম্পাদনা করে তিনি দেখিয়েছেন ফিল্মে ব্যাকরণ ইচ্ছাকৃতভাবে কেমন ভাঙতে হয় ও কেন ভাঙতে হয়, ঠিক বিপ্লবের সময় সমাজের প্যারাডাইমকে তছনছ করা যেমন। ১৯৬০-এর দশক ছিল তাঁর গৌরবময় সময় যখন ছবি এবং স্লোগান বিশ্বকে বদলে দিতে পারে; তিনি শ্বাসরুদ্ধকর দক্ষতা এবং গতির সঙ্গে ফিল্ম তৈরি করছিলেন। গদার ছিলেন গর্বিত, কার্যকরীভাবে ফ্যাশনেবল, মহাদেশীয় যেন এক শীতলতার প্রতীক।  ফিল্মের একটি রোল ধরে রাখা এবং এটি দর্শককে পরিদর্শন করা যেন বেশ আইকনিক- তবে ক্ষুব্ধ অপ্রত্যাশিত ধরনের লোকেরা ভাবছিল যে তারা যদি অন্ধকার চশমা খুলে ফেলে তবে তা আরও ভালভাবে দেখতে সক্ষম হবে না। 

যৌন নৈতিকতা ও ঘনিষ্ঠতা এবং প্রেমের যন্ত্রণাদায়ক অসম্ভাব্যতা ছিল তাঁর থিম। Bande à Part (১৯৬৪) এবং 'টু বা থ্রি থিংস আই নো অ্যাবাউট হার' (১৯৬৭)'এ একটি বিস্ময়কর শক্তি ও শৈলী রয়েছে: তারা আনন্দের জন্য লাফ দেয় এবং নামার পথে মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করে। ভিস্যুয়াল পলিটিক্স তার কয়েনেজ। আসলে যেন সেল্যুলয়েডের মাধ্যমে এক পরিপক্ক অথচ সহজলভ্য মাস্টারপিস প্রবন্ধ। মাচা মেরিল হল অত্যাশ্চর্য সুন্দর একজন শ্লাট, আর একজন অল্পবয়সী বিবাহিত মহিলা একজন সুদর্শন অভিনেতার সঙ্গে একটি সম্পর্ক পরিচালনা করছেন। এটি তীব্রভাবে কামোত্তেজক, একটি বিশুদ্ধ ফ্রি-হুইলিং তেজ সহ; এটি একটি ডিগ্রেসিভ সিনেপ্রবন্ধ এবং প্যারিসের মধ্য দিয়ে একটি মুভি- আর কোথায়? ম্যাগাজিন ইন্টারভিউ এবং বিজ্ঞাপনের আইকনোগ্রাফিতে ব্যাপকভাবে জনসাধারণের আগ্রহ রয়েছে, অন্তর্বাসের জন্য একটি ফেটিশস্টিক ছেদন (rupture)। প্রায় অসংলগ্ন, নিজের মধ্যেই শ্যুটের কিছু বিতর্কিত ব্যাধিকে শোষণ করে তৈরি হয় আ্যাকশন: যা হবে উন্মত্ত, প্রায় প্রহসনমূলক- হলিউডের শিশুসুলভতার উপর একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য, মেলোড্রামা- তবুও দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের জন্য সবসময় উন্মুক্ত।


Sunday, 11 September 2022

'লক্ষ্মী ছেলে'

অন্ধকারে প্রদীপের মতো

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


দেশ জুড়ে অদ্ভুত হাওয়া। সেই হাওয়ায় বাজার এখন খুব গরম। যখন-তখন যার-তার ‘ভাবাবেগে আঘাত’ ক্রমাগত লেগেই চলেছে। কথায় বলে, ‘ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া’। ব্যাপারটা কিছুটা যেন সে-রকমই দাঁড়িয়েছে। পান থেকে চুন খসলেই নানান মানুষের নানান ভাবাবেগ– এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একেবারে আনকোরা ভাবাবেগ- এমনই আহত হচ্ছে যে ‘হা হতোস্মি’ বলে বসে পড়া দূরস্থান, প্রাচীন ডাকাত দলের মতো ‘হা-রে রে-রে’ অট্টহাস্যে দশদিক কাঁপিয়ে অনেকেই তেড়ে আসছেন। ব্যাপারটা প্রাথমিকভাবে হাস্যকর মনে হলেও আদতে ভয়ের, আশঙ্কার; আবার একইসঙ্গে ইতিবাচক প্রত্যাশারও। 

বেশিরভাগেরই মতে, ‘ট্রেন্ড’ হিসাবে যদি এটা চলতেই থাকে, মানে চলতে-চলতে একদিন যদি উসেইন বোল্টের সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে, তাহলে এ-দেশ অন্ধ-বোবা-কালাদের দেশে পরিণত হবে। অথচ ভেবে দেখলে এও বোঝা যায় যে, সমাজের প্রগতির জন্য ‘ভাবাবেগে আঘাত’ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি আয়ুধ। যাঁদের নিয়ে আমাদের গর্ব, অর্থাৎ রামমোহন, বিদ্যাসাগরের কথাই দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যেতে পারে; তাঁরা আজ কেন প্রণম্য, কেন তাঁদের সমাজ-সংস্কারক কিংবদন্তির মর্যাদা দেওয়া হয়? কেননা, তাঁরা সেই যুগে মানুষের ‘ভাবাবেগে আঘাত’ দেওয়ার কাজটিই করেছিলেন। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা থেকে বাল্যবিবাহ রোধ, বিধবাবিবাহ চালু, নারী শিক্ষার জন্য দিকে-দিকে বিদ্যালয় খুলে দেওয়া ইত্যাদি সবই তো সে-যুগের আমজনতার ‘ভাবাবেগে আঘাত’ করেই করা সম্ভব হয়েছিল। তার জন্য রামমোহন-বিদ্যাসাগরদের কী-কী ঝড় পোয়াতে হয়েছিল সে-কথা বলাই বাহুল্য। তাঁদের জন্যই আজ একুশ শতকে অনেকটা খোলা-হাওয়ার উন্মুক্ত পরিবেশ বাঙালি পেয়েছে। ‘ভাবাবেগে ক্রমাগত আঘাত’ দেওয়া ছাড়া এটা সম্ভব হত না। 

জানি না, কৌশিক গাঙ্গুলির নতুন ছবি ‘লক্ষ্মী ছেলে’ জনমনে শেষাবধি কী প্রভাব ফেলবে, তবে ‘ভাবাবেগে আঘাত’ না-হোক সামান্য খোঁচা যে অবশ্যই দেবে তা নিশ্চিত। এমনিতে বাংলা ছবির বাজার খারাপ। বাংলা কেন, হিন্দি-বলিউডি ছবিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ওটিটি'র দৌলতে বিদেশি সিরিজ আর দক্ষিণী ছবি বাজার মাত করে রেখেছে। বাঙালিত্বে সুড়সুড়ি দিয়ে বাংলা ছবি দেখার জন্য বাঙালিকে হলমুখি করার চেষ্টা প্রবল, তবুও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। ‘লক্ষ্মী ছেলে’ হয়তো মোড় ঘোরাবে। 

এ-ছবিতে সুপার-স্টার বলতে যা বোঝায় সেরকম প্রায় কেউই নেই, শ্যুটিং-এর লোকেশনও আহামরি কিছু নয়, আগমার্কা ঝাড়পিট নেই, ঝিনচ্যাক আইটেম-সং বা কোমর-দোলানোও নেই, মারকাটারি ভিএফএক্স নেই; অর্থাৎ, সব মিলিয়ে বিগ-বাজেট বিনিয়োগের মতো কিচ্ছুটি নয় এ-ছবি। বরং একেবারে উলটো পথের পথিক। এমন এক ছবি যা প্রচলিত জনমতকে তীব্র শ্লেষ করে– বলে, ধর্ম নয়, বিজ্ঞান– আরও গম্ভীর হয়ে জানায়, কুসংস্কার নয়, মানবতাই হল টিকে থাকার একমাত্র পন্থা। অন্ধবিশ্বাস, নির্বিচার ভক্তিকে পুঁজি করে যেখানে দু-পয়সা কামিয়ে নেওয়ার বাসনা কালো-মেঘের মতো ঘিরে ধরেছে গোটা সমাজকে, সেখানে এক টুকরো প্রদীপ হাতে ‘লক্ষ্মী ছেলে’ ‘অমরনাথ’ নয় ‘আমির হোসেন’ হাজির হয়, সঙ্গে পায় গায়ত্রী আর শিবনাথকেও। নির্মিত হয় কাহিনির শরীর যা সমাজের রক্ত-মাংস-মজ্জাকে আশ্রয় করে গড়ে তোলে আশ্চর্য এক ছবি। একে ছায়াছবি না বলে বরং কায়াছবিই বলা যাক। ঠাসবুনোটে গল্পকে কীভাবে জ্যান্ত করে তুলতে হয় তা কৌশিক গাঙ্গুলি দেখিয়েছেন আবারও। আর এটাই ছবিটির ইউএসপি, জনমুখে যা প্রচারিত হচ্ছে। এমন একটি সময়ে এমন একটি ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে– বাণিজ্যিক দিক থেকেও, অগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গিতেও। 

এই ছবি সত্যিই আঁধারাচ্ছন্ন সময়ে প্রদীপ নিয়ে এসেছে। মনে পড়ে যায়, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘অন্ধকারকে অভিশাপ দেওয়ার চেয়ে…’ নিবন্ধটির কথা। কতদিন আগে পড়েছিলুম, অথচ আজও অমলিন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘অন্ধকার কী?’ বলেছিলেন, 'অন্ধকার তো সত্যিকারের কোনো জিনিস নয়। সে তো শুধু আলোর অভাব। যতই গাঢ় হোক, একটা জোনাকি উড়লেই ভয় কেটে যায়।' এই ছবিও তাইই। হিংসা, অসহিষ্ণুতা, কুসংস্কার, দুর্নীতি, কণ্ঠরোধের অন্ধকার সময়ে একটি প্রদীপ। এ-কথা সত্য যে প্রদীপের শক্তি কতটুকু, কতখানিই বা আলো সে ছড়িয়ে দিতে পারে, সে-তো আর বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে না। তবুও বাঙালির জীবন যখন নবজাগরণের আলোয় আলোকিত হয়েছিল, তখন থেকে আজ অবধি কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়। এখন বোধকরি সে-আলো কিছুটা নিষ্প্রভ হয়েছে। আজকাল আবার পেছন দিকে টানছে নরকের হাতগুলি। সেখানে দাঁড়িয়ে কৌশিক গাঙ্গুলির এই প্রদীপটিকে ক্ষুদ্র বলে দূরে ঠেলা যায় নাকি, বরং হাত দিয়ে আড়াল করে বিষাক্ত-হাওয়ার কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখাই কর্তব্য। হোক না সে ক্ষুদ্র প্রয়াস, তবুও সেও তো এক নতুন শুরু। 'আদিম মানুষ যদি সূর্যাস্তের পর হাত পা গুটিয়ে থাকত, শুধুই অপেক্ষা করত সূর্য ওঠার জন্য – তবে যে-তিমিরে সে ছিল, সেই তিমিরেই থেকে যেত। অন্ধকারকে জয় করার পথে প্রদীপ ছিল নেহাতই তুচ্ছ একটা ধাপ। অতটুকু আলো দিয়ে কতটুকু আঁধার কাটত? তবু সেই নগন্য সূচনাটুকুও না-হলে আমরা আজ কোথায় থাকতুম?'

তাই প্রশ্নগুলি উঠুক আবার নতুন করে। কুসংস্কারের সঙ্গে বিজ্ঞানের সংঘাত লাগুক। ভাবাবেগ আহত হয়ে শতচ্ছিন্ন হোক। মানুষ বরং নতুন প্রদীপের উষ্ণতার আশিস মাথায় ঠেকিয়ে নিক। মনে রাখতে হবে, দিনের শেষে মানুষই মানুষের শত্রু, আবার মানুষই তো মানুষের বন্ধুও। কোন্ হাত মানুষ বাড়াবে সেটা এবার মানুষকেই ঠিক করতে হবে। আমরা এইবারে দেরি না-করে ছবিটা বরং দেখেই আসি। আর কিছু না-হোক, এক অন্য রেশের স্পর্শ যে অবশ্যই লাগবে, তা গ্যারেন্টেড। কেননা এই বাজারে এমন ছবি আত্মশক্তির দোরে টোকা মারে যে!


Friday, 9 September 2022

উন্নয়নের সলিল সমাধি!

জলে ভেসে যায় বেঙ্গালুরু 

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত


 

বেঙ্গালুরু ডুবু ডুবু, মহেঞ্জোদারো ভেসে যায়! পাকিস্তানে বন্যা। তাতে কী? কিন্তু যদি আর ফিরে না পাই মহেঞ্জোদারো, ফিরে না পাই ভারতীয় সংস্কৃতির আদি ঠিকানা? মহেঞ্জোদারো–হরপ্পা একসাথে উচ্চারিত দুই নাম, একটি থাকবে, অন্যটি? তো, সেও ভাবায়। আর ভাবতে পারি না, এমন বৃষ্টিবিহীন দিনে। ওদিকে বৃষ্টিতে ডুবতে বসেছে আমাদের দেশেরই এক প্রিয় শহর।
 

শহরটার নাম বেঙ্গালুরু। আমাদের গর্বের সিলিকন সিটি বা প্রধান আইটি নগরী। এ দেশে প্রধান নগর বলতে এই সেদিনও আমরা মুম্বই, চেন্নাই, দিল্লীর পাশে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম আমাদের অতি প্রিয় শহর কলকাতাকে। এখনও আমরা চাই বটে, কিন্তু বিশ্ব যে মানে না। তাদের কেউ পছন্দের তালিকায় রাখে হায়দ্রাবাদ, কেউ রাখে আমেদাবাদ, কেউ বলে পুনে– এখন অবশ্য অনেকেই বলে বেঙ্গালুরুর নাম। হায়দ্রাবাদকে হটিয়ে দিয়ে এখন সেই শহরই হয়েছে প্রধান আইটি নগরী। 

 

এর মধ্যে অন্য কোনও সূত্র (যথা রাজনীতি, প্রাদেশিকতা ইত্যাদি) খোঁজা বৃথা। আমরা যারা সবেতে রাজনীতি বা প্রাদেশিকতা খুঁজি, তারা দুঃখ পেতে পারি। তাদের দুঃখ কমাতেই বুঝি আসরে নেমেছেন স্বয়ং পরিবেশের দেবতা। এই দেবতা ইন্দ্র না বরুণ, জানি না। তাঁদের যেন দয়ামায়া নেই- তাই আমাদের জন্য খরা, বৃষ্টিহীন মাস, আর ওদের ভাসাতে ব্যস্ত বৃষ্টি।

 

এমন বৃষ্টি পারে নাকি একটা শহরের পতন ঘটাতে? মহেঞ্জোদারো ডুবে যাক, ভেসে যাক। সবাই জানে, আমরা আর ‘দিবে আর নিবে’ নীতি বা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে বিশ্বাস রাখি না। তাই, হে প্রভু, ডোবালে ডোবাও পাকিস্তান, কিন্তু বেঙ্গালুরুকে বাঁচাও যে কোনও মূল্যে। 

 

ওদিকে দেখছি, হায়, হায়! বেঙ্গালুরুর বড় বিত্তশালীদের ব্যবসা থেকে প্রিয় বাসস্থান সব ভেসে যায় যে। দেখ, কেমন অঝোরে ঝরেই চলেছে বারিরাশি। নগর ভাসছে। সেই ২০০৬ সালে একবার দেখেছিলাম এই শহরে এমন বৃষ্টি। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কংগ্রেসের বাসবপুন্নিয়া বলেছিলেন, এই শহরকে তিনি বিশ্বের সেরা শহর করে দেবেন। এমন হবে এর উন্নয়ন। এই বুঝি সেই উন্নয়ন! বলা হচ্ছে, বিগত ৯০ বছরে নাকি এই শহর এমন বৃষ্টি দেখেনি। স্কুল-কলেজ বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ।

 

যে যা বলে বলুক, হোটেল মালিকদের সংগঠন, সরকার কিছু বলেনি! জানি বলবেও না। সরকার চালায় যে দল তাদের তো দল চালাতে টাকা লাগে, নাকি? আমাদের চাঁদা না পেলে ওদের চলবে? তাই তো আমরা হোটেলওয়ালারা, এ হেন পরিস্থিতিতে ঘরভাড়া বাড়িয়েছি অবিশ্বাস্য হারে। এক রাতের ভাড়া এখন মাত্র ৪০,০০০ টাকা! লাল সঙ্কেত শহর জুড়ে। আর কী বা করা যায়? সেই জমা জল যে বেরচ্ছেও না। কিন্তু কেন? নিশ্চয় দেশকে খুশি করার জন্য নয়, বা কর্নাটকের রাজনীতি বদলে দিতে নয়। যদিও যে সব অঞ্চল ভাসছে বা অতি বর্ষণে ডুবতে বসেছে, সেখানকার অধিকাংশ বিধায়ক ঘোড়া কেনাবেচার আগে থেকেই বিজেপি দলের। বেঙ্গালুরু পুরসভার আয় বিস্তর। দেশে তার আয়ের তুলনা চলে একমাত্র বৃহৎ মুম্বই পুরসভার সঙ্গে। আর রাজ্যের যা আদায় তার কম-বেশি ৬০ শতাংশ তো এই পুরসভাই দেয়।

 

তবে, নেতাদের দায় ঝেড়ে ফেলার প্রবণতা এখানেও সমান তালে বহমান। সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিবেশ সংক্রান্ত। কেউ সেদিকে নজরই দেয়নি। দিকে দিকে গড়ে উঠেছে মল, বহুতল। বড় ব্যবসায়ীরা চাইলেই যত্রতত্র বুজিয়ে ফেলা হয়েছে পুকুর-দীঘি। খালি জায়গা পেলেই হল। শহরে গাছও কমেছে, শিশুদের খেলাধুলোর জায়গা নিত্য কমেছে (অবশ্য তাদের নানা কিসিমের শিক্ষায়তন বাড়ছে), শহরের ৭০ শতাংশের বেশি অংশ কংক্রিটের ঢালাই।  ওদিকে রাজ্য সরকার নাকি ভাবছে, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে তারা কিছু জলাশয়ে স্লুইস গেট বসাবে! এমন প্রতিশ্রতিও যে অতি বিপজ্জনক, কে বোঝাবে কর্তাদের? কে বোঝাবে যে শুধু শিল্প, নিয়ন্ত্রণহীন শিল্প কেবল জিডিপি বাড়ায় না, দূষণও বাড়ায়। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে। মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন কর্তারা যেন হঠাৎ টের পেলেন যে তাঁরা পরিবেশের গুরুত্ব অস্বীকার করে ব্যক্তিগত সুখ-সাধনায় মেতে ছিলেন এতকাল! এখন কী হবে?

 

আপাতত একে অন্যকে প্রবোধ দিচ্ছেন- কিছু হবে না, পাগল প্রকৃতি ফের শান্ত হবে।  যেমন ২০০৬-এ শান্ত হয়েছিল নিজ খেয়ালে। এবারও তাই হবে। ফের আমরা ঘোড়া কেনাবেচায় মন দেব। দিতেই হবে। তবে কিছু কাজ তো দেখাতে হবে। নতুবা লোকে মানবে কেন? এই রাজ্যের ঘোড়াদের মতির স্থিরতা কম, কবে বলবে বেশ ছিলাম আমরা কুমারস্বামী বা সিদ্ধারামাইয়ার রাজত্বে, অতএব...।

 

ব্যবসায়ীদের মতিগতিও বোঝা ভার। তবে, ভরসা এই যে তাদের একটা বড় অংশ আজও মোদী ভাইদের সঙ্গে আছে। থাকবেও। সবাই তো মোহনদাস পাই নয়। তিনিই বা কোন সাধুপুরুষ! ইনফোসিসের প্রাক্তন কর্তা তিনি, সুযোগ নেননি? যতদিন ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা আছে, ঋণ শোধ না করার ব্যবস্থা আছে বা অর্থমন্ত্রী নির্মলা আছেন, আছে পরিবেশের আইনকানুন অগ্রাহ্য করার সুযোগ, বিদেশি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, অন্তত ততদিন তো তারা আছেই মোদীভাই-এর সঙ্গে। থাকতেই হবে। নইলে আয়কর, ইডি, সিবিআই ধরবে না? কংগ্রেস আমলেও তারা এসব সুযোগ পেয়েছে তবে কংগ্রেসিরা জানত না বহু কিছু। এখন মোদিজীর রাজত্বে তারাও শিখেছে অনেক। তাই ভয়, কংগ্রেস যদি তাদের অন্যভাবে পুষিয়ে দেবার চক্রান্ত করে, আমরা যদি তাদের সেই চক্রান্তের শিকার হতে দিই, তবে তো...।

 

ওসব নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। এখন এই বৃষ্টি বা জলদস্যুর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়াটাই বড় ব্যাপার। তারপর একদিন নিশ্চয় বলতে পারব যে, 'এমন শহরটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’- অন্তত যদি হোটেলের ঘরভাড়া দেখেন। যদিও জানি, সব দেশেই এক নিয়ম। বরং, চলো গান করি– এমন উন্নয়ন দেখি নাই কভু, শুনি নাই প্রভু!