Tuesday, 1 September 2026

ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র

ফ্রেমের ভিতরে রাষ্ট্র

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


In This World

রাষ্ট্রের প্রথম কাজ একটি রেখা টানা, দ্বিতীয় কাজ সেই রেখার ওপারে একজন 'অপর' তৈরি করা। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ (১৯৫১) এই ব্যাকরণই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তারপর মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে। সিনেমা আবার উল্টো কাজ করে, সংখ্যাকে মানুষে ফেরায়। তাই রাজনৈতিক সিনেমা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাসকে প্রশ্ন করার যন্ত্র।

এই প্রশ্ন সবচেয়ে তীব্র হয় ফ্যাসিবাদ পর্দায় এলে। জার্মান দার্শনিক ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২-১৯৪০) ১৯৩৫ সালে তাঁর প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ক অফ আর্ট ইন দ্য এজ অফ মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন'-এর উপসংহারে লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ নাকি রাজনীতিকে নান্দনিক করে তোলে, কমিউনিজম তার জবাবে শিল্পকে নাকি(!) রাজনীতিকরণ করে। ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার নানান রকম ছলের ন্যারেটিভ।লেখাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জার্মানিতে ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হচ্ছে এবং লেনি রিফেনস্টালের 'ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল' (১৯৩৫) মুক্তি পাচ্ছে। সেই তথ্যচিত্রে নীচ থেকে নেওয়া শটে নেতাকে 'দেবতুল্য' করা এবং জনতাকে 'ভিড়'-এ পরিণত করা, ফ্যাসিবাদী সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করে। মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৫ অক্টোবর আমেরিকায় মুক্তি পায় চার্লি চ্যাপলিনের 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর'। সেখানে টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল অ্যাডলফ হিটলারের আদলে তৈরি। হিঙ্কেলের অর্থহীন জড়ানো শব্দের ভাষণ ক্ষমতার ভঙ্গির ব্যঙ্গ। শেষে ইহুদি নাপিত হিঙ্কেল সেজে যে ভাষণ দেয়, 'সৈনিকরা দাসত্বের জন্য লড়ো না, স্বাধীনতার জন্য লড়ো', যা গণতন্ত্রের পক্ষে ইশতেহার হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে হিঙ্কেলকে 'টোমানিয়া' নামক একটি কাল্পনিক দেশের নিষ্ঠুর একনায়ক বা 'ফুয়ি' (Phooey) হিসেবে দেখানো হয়। চার্লি চ্যাপলিন এই চলচ্চিত্রে একই সাথে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল এবং তার অবিকল দেখতে একজন সাধারণ ইহুদি নাপিতের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। হিঙ্কেলের গোঁফ, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি ও উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষ সরাসরি হিটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। হিঙ্কেলের দেওয়া ভাষণগুলো ছিল জার্মান ভাষার মতো শুনতে কিছু অর্থহীন শব্দ বা 'গিবরিশ' (Gibberish)। বিখ্যাত দৃশ্য -- বেলুন দিয়ে তৈরি একটি পৃথিবীর গ্লোব নিয়ে হিঙ্কেলের নাচ ও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ ভারতে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতার মধ্যে এই ইতিহাস ফিরে আসে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হয় ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাতে বলা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিপীড়নের ভিত্তিতে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন। মুসলিমরা এই তালিকার বাইরে। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর ২০১৯-২০ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার মূলে ছিল একই প্রশ্ন-- কে নাগরিক! রাষ্ট্র কাগজ চায়, কিন্তু ট্রমা তৈরি করে দেবার পর নিরস্ত মানুষের কোনও কাগজ থাকে না। এই প্রক্রিয়া বুঝতে আনন্দ পটবর্ধনের দুটি ছবির আলোচনা করা জরুরি। 'রাম কে নাম' ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দেখানো হয়; বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার ও তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা নথিভুক্ত করে। যদিও ছবি মুক্তির দু' মাস পর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় 'পিতৃ, পুত্র ঔর ধর্মযুদ্ধ' (ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি ওয়ার)। ১২০ মিনিটের দুই অংশের এই ছবিতে প্রথম অংশ বাবরি পরবর্তী বম্বে দাঙ্গায় নারীর উপর হিংসা এবং দ্বিতীয় অংশে শহুরে পুরুষতন্ত্রের সংকট দেখানো হয়। সঞ্জয় কাকের 'জশন-এ-আজাদি' (২০০৭ শীতে কাশ্মীরে পাঁচ দিন ধরে তোলা ফুটেজ নিয়ে তৈরি), কোনও ভাষ্য ছাড়াই, রাস্তায় বাঙ্কার, কারফিউ আর নিখোঁজ মানুষের পোস্টার, যা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রের উপস্থিতিই এক দখলদারি।

এই 'অপর' নির্মাণের দীর্ঘতম প্রক্রিয়া দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ অগস্ট কেবল ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের একটি ঘটনাই নয়, এটি ছিল এক চলমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ফন টাঞ্জেলম্যান তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত 'ইন্ডিয়ান সামার' বইতে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, দেশভাগে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি, নিহত প্রায় দশ লক্ষ। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ষাট লক্ষ। তাঁরা শুধু ভিটে হারাননি, হারিয়েছিলেন পেশা, ভাষা আর মর্যাদা। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'  (১৯৬০) ও সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) মানুষের নেমে আসা ঢলে বিভিন্ন রকমের মানুষের শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নানা রকমের করুণ কাহিনী। 'মেঘে ঢাকা তারা'র নীতা শুধু পরিবারের জন্য ত্যাগ করে না, সে রাষ্ট্রের পুনর্বাসনে ব্যর্থতার প্রতীক। এই ধারাবাহিকতা আজও ফুরোয়নি। কলকাতার যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি থেকে শুরু করে ইদানীংকালের উদাহরণ ২০১৭ সালের ২৫ অগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সেনা অভিযানে প্রায় ৭,৪০,০০০ রোহিঙ্গার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া, একই বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

ইউরোপে এর ভয়াবহ রূপ ছিল হলোকস্ট। হলোকস্ট বলতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি রাষ্ট্রের ইহুদি নিধনকে বোঝায়, যার চূড়ান্ত পর্ব 'ফাইনাল সলিউশন' কার্যকর হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এবং প্রায় ষাট লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জমান (১৯২৫-২০১৮) তাঁর ৫৬৬ মিনিটের তথ্যচিত্র 'শোয়া'(১৯৮৫)-তে কোনও আর্কাইভ ফুটেজ নেই, আছে বেঁচে থাকা মানুষ, সাক্ষী ও অপরাধীদের সাক্ষাৎকার এবং ফাঁকা ক্যাম্পের দীর্ঘ শট।

রাষ্ট্র জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দিলেও সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব দেয় না। মীরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক' (২০০৬) (ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি), গোগোল গাঙ্গুলির নাম-সংকট যা পরের প্রজন্মেরও অবস্থান তুলে ধরে। দীপা মেহতার 'ওয়াটার' ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে প্রিমিয়ার হয় যা ১৯৩৮ সালের বারাণসীর বিধবা আশ্রমে ধর্মীয় আইন ও পিতৃতন্ত্র মিলে নারীকে 'অপর' করে রাখে। ব্রিটিশ পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম'এর 'ইন দিস ওয়ার্ল্ড' (২০০২) হাতে ধরা ক্যামেরা ও অপেশাদার অভিনেতাদের অভিনয়ে তোলা দুই আফগান কিশোরের ইউরোপে অনুপ্রবেশের যাত্রা , ২০০৩'এর ফেব্রুয়ারিতে ৫৩তম বার্লিন উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার জেতে। এই বিচ্ছিন্নতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের গল্পে ফেরে, যখন কেরল বা মুম্বইয়ে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক ভাষার কারণে হেনস্থার শিকার হন।

২০০০ সালের পর রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুঁজিরও। পল থমাস অ্যান্ডারসনের 'দেয়ার উইল বি ব্লাড' ২০০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার হয়, আমেরিকায় মুক্তি ২৬ ডিসেম্বর, তেল ব্যবসা ও ধর্মের জোট দেখায়। ক্যাথরিন বিগেলোর 'দ্য হার্ট লকার' ২০০৮ সালে ভেনিসে প্রিমিয়ার হয়, ২০১০ সালের ৭ মার্চ ৮২তম অস্কারে ছয়টি পুরস্কার জেতে। বিগেলো প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের অস্কার পান। পল গ্রিনগ্রাসের 'গ্রিন জোন' ২০১০ সালে একই যুদ্ধের রাজনীতি দেখায়। কেন লোচের 'আই, ড্যানিয়েল ব্লেক' ২০১৬ সালের ২২ মে ৬৯তম কান উৎসবে পাম-দ্যে-অর জেতে, তাঁরই 'দ্য উইন্ড দ্যাট শেকস দ্য বার্লি' (২০০৬)ও উল্লেখযোগ্য। এটিও ২০০৬ এ পাম্-দ্যে-অর জেতে। চৈতন্য তামহানের 'কোর্ট' ২০১৪ সালে ৭১তম ভেনিসে সেরা ছবি ও লুইজি দে লরেন্টিস পুরস্কার জেতে, ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয় এবং ২০১৬ সালে ভারতের অস্কার প্রতিনিধি হয়। ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির 'ক্লোজ-আপ' ১৯৯০ সালে মুক্তি পায়, যেখানে হোসেন সাবজিয়ান মহসেন মখমলবাফ সেজে ঠকায় এবং কিয়ারোস্তামি বাস্তব মানুষদের দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। স্পাইক লির 'ডু দ্য রাইট থিং' (১৯৮৯) এবং নাগরাজ মঞ্জুলের 'সাইরাত' (২০১৬) বার্লিনে প্রদর্শিত ও সর্বোচ্চ আয়কারী মারাঠি ছবি, মূলধারার ভিতর থেকে জাতি ও বর্ণের প্রশ্ন তোলে।

সিনেমা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে পারে না, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে দেখার ভঙ্গি পাল্টে দেয়। রাষ্ট্র ভাগ করে শাসন করে, সিনেমা বিচ্ছিন্নদের একই ফ্রেমে বসায়। দেশভাগের বাঙালি, রোহিঙ্গা শরণার্থী, দলিত কর্মী, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পর্দায় প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। এখানেই সহমর্মিতা রাজনৈতিক কাজ। কিন্তু যখন প্রতিরোধকেও পণ্য করা হয়, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক ছবি ট্যাগ হয়ে বিক্রি হয়, তখন দরকার সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি, যা ঋত্বিক, পটবর্ধনরা শিখিয়ে গেছেন। সীমান্তের কাঁটাতার উঁচু হতে পারে, কিন্তু ফ্রেমের ভিতর মানুষ থেকে যায়।


Sunday, 30 August 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মসংস্থান

আশা না নিরাশা?

রাজীব ভট্টাচার্য



বিশ্ব শ্রম সংগঠন বা আইএলও'র সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে অনিশ্চয়তা সূচক (যা মূলত আর্থিক ও নীতি নির্ধারণকারী ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল) ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ থেকে অভূতপূর্ব স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে মন্দা ও কোম্পানিতে নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস এবং ভোগব্যয়কে দুর্বল করে দিতে পারে। সর্বোপরি, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাবে ক্ষতির ঝুঁকি শ্রমের বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

উচ্চশিক্ষা উন্নত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশার সম্ভাবনা জাগালেও, তা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই বেকারত্ব হ্রাসে অক্ষম। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারের চাইতে কম। কিন্তু এই চিত্রটি অপেক্ষাকৃত অল্প আয় বা মধ্য আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে একইরকম নয়। এই সমস্ত দেশগুলিতে স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেওয়ার হার যথেষ্টই কম। বর্তমানে এর সঙ্গে জুড়েছে তরুণ প্রজন্মের চাকরিজীবীদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বিশেষ করে প্রথমবার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণকারী উচ্চ দক্ষ পেশার ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসাহের মূল কারণ হল, দ্রুত হারে গণনার খরচ হ্রাস পাওয়া। ফলে, গণনার ক্ষমতা এবং তথ্য সঞ্চয় ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং)। তাছাড়া বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত হারে প্রয়োগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের পথকে প্রশস্ত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় দ্রুত হারে হ্রাস পাওয়াতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করে উচ্চশিক্ষিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বাজারে জোগান বৃদ্ধিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে ।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এসি মোগলু এবং রেস্ট্রেপো (২০১৮) কর্মসংস্থানের বাজারের উপর এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন: 

(ক) স্থানচ্যুতি প্রভাব বা ডিসপ্লেসমেন্ট ইফেক্ট; 

(খ) উৎপাদনশীলতা প্রভাব বা প্রোডাক্টিভিটি এফেক্ট এবং 

(গ) দক্ষতা সম্পূরক প্রভাব বা স্কিল কম্প্লিমেন্টারিটি এফেক্ট। 

স্থানচ্যুতি প্রভাব সরাসরি নতুন প্রযুক্তির শ্রমিক দ্বারা পুরাতন শ্রমিকদের প্রতিস্থাপনকেই বোঝায়। এই প্রভাবের ফলে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় প্রভাবটি এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার ফলে এই দক্ষতায় পারদর্শী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া যা শ্রমের বাজারকে উদ্বুদ্ধ করবে। তৃতীয় প্রভাবটি মানুষ ও যন্ত্রের পরস্পরের প্রতি সম্পূরক সম্পর্কের কথা বোঝায়। এই নতুন প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান প্রতিস্থাপিত না করে যদি তার সম্পূরক হয়ে উঠতে পারে তবে তা নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই তিনটি প্রভাবের মধ্যে প্রথম প্রভাবটি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব দুটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি শেষ দুটি প্রভাব প্রথম প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে।

ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি টিসিএস সম্প্রতি ২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৩,৪৬০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে, যার মূল কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিবিড় প্রয়োগ। ওরাকেল'এর মতো বিশ্ব বিখ্যাত আইটি কোম্পানিও প্রায় ১২,০০০ কর্মীকে ওই একই কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং ইনফোসিস এর মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও।এই কোম্পানিগুলি দক্ষতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ায় গতানুগতিক কাজ, কোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সম্পন্ন করতেই বেশি আগ্রহী। তাই দৈত্যাকার আইটি কোম্পানিগুলি ছাড়াও অ্যামাজন (গত ৬ মাসে ৩০ হাজার), ব্লক (৪০০০'এর বেশি), ড্রপবক্স (৫০০'এর বেশি) কর্মচারী ছাঁটায়ের পথে হেঁটেছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীদের বেকারত্ব তাদের মনোবলে আঘাত হানবে, কোম্পানির প্রতি আনুগত্যকে দুর্বল করবে এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের অবক্ষয় বৃদ্ধি করবে। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'এর মতে, কর্মহীন ইঞ্জিনিয়ার ও দ্রব্য পরিচালনকারীরা দ্রুত নতুন স্বাধীন বিনিয়োগ বা স্বতন্ত্র উদ্যোগে উদ্যোগী হবে। আবার অনেকের মতে, এই বেকারত্বের মূল কারণ সীমিত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা-জোগানের অমিল। যদি ভারতীয় অর্থনীতি এর সঙ্গে নিজেকে মানানসই না করে তুলতে পারে তাহলে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার সাথে সেবার রফতানি হ্রাস পাবে ও শহরাঞ্চলের ব্যয়ের গতিও মন্থর হবে। এর ফলে ভারতবর্ষ সেই পূর্ববর্তী মধ্য-আয় বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। ফলস্বরূপ, ভারতের বেকারত্বের হার এপ্রিল ২০২৫'এ ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৬.৯ শতাংশ এবং জুন মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭.১ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক যুব বেকারত্ব মে মাসে ১৭.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশ।

টেসলা এবং স্পেস এক্স'এর কর্ণধার এলন মাস্ক'এর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজকে একটি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করবে এবং সম্ভবত আমাদের কারওরই সেই অর্থে আর কাজ থাকবে না। এনথ্রপিক'এর সহ প্রতিষ্ঠাতা দাড়িও আমোদেই এর মতে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট কলার কর্মীরা তাদের চাকরি হারাবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা জিওরজিয়েভার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুনামি সারা পৃথিবীতে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকের এক বিরাট অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের (যেমন স্টিম ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ শক্তি দ্বারা যন্ত্র চালিত তাঁত, মোটর যানবাহন, বেতার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট) চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব অনেকাংশেই আলাদা। পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যত সংখ্যক কর্মসংস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তার থেকে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তাই স্থায়ী প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ধারণাটি কখনই বাস্তবায়িত হয়নি। 

জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল লক্ষ্য হল, অনিয়মিত জ্ঞানীয় কাজ (non-routine cognitive task) অর্থাৎ প্রতিদিনের বাঁধা-ধরা নিয়মের বাইরে যে সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতার প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের উচ্চ সারির দক্ষতাযুক্ত কাজগুলিকে অতি দ্রুত এবং ব্যাপক আকারে প্রতিস্থাপিত করা ও দ্রুতগতিতে তার উন্নতি করা। অনেকের মতে, এর ফলে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। অতি সম্প্রতি ICRIER (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভারতের দশটি শহরে ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের উপর জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের ধারণা পাওয়া। এই সমীক্ষাটি কিন্তু ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশাল আকারে কর্মসংস্থান হারানোর ধারণার পরিপন্থী। বরং নতুন প্রযুক্তিকে ভিন্ন আকারে ঢেলে সাজানো বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে উন্নততর কাজে নিয়োগেরই নিদর্শন দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে খরচ, প্রতিভার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কারণে।

নীতি আয়োগ'এর সাম্প্রতিকতম একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫'এর মাঝামাঝি প্রায় ৭৮,০০০ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ হারিয়েছেন (প্রায় ৫০০ মানুষ প্রতিদিন)। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছাঁটাই অথবা নতুন কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কারণে আইবিএম, মাইক্রোসফট, সিটি ব্যাংক গ্রুপ, জিপি মরগান, গোল্ডম্যান স্যাক্স'এর মতো সংস্থাগুলি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের মতে, ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, মানব প্রতিনিধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যমণি। শিল্প, সেবা, অর্থ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার বিরাট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মানের যে মডেলগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে নিরাপত্তার দিকটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যাপক কৌশলের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নীতি আয়োগের লক্ষ্য তিনটি মূল স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল- 

(ক) বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় সমস্ত স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত হারে প্রসার;

(খ) ভারতকে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক আকর্ষণীয় পীঠস্থান হিসেবে উন্নীত করা ও 

(গ) বিরাট মাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বা নৈপুূণ্য বৃদ্ধির কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা যার মূল উদ্দেশ্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া। 

তাই এখন দেখার, বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য যে পরিকল্পনাগুলি নেওয়া হয়েছে তার দ্রুত রূপায়ণের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের বৃদ্ধিতে প্রতিস্থাপক নাকি পরিপূরক কোনও ভূমিকা পালন করে।


Friday, 28 August 2026

আদিত্য কুমারের খোয়াইশ

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



২৫ অগস্ট পাটনার ডাক বাংলো চৌকে সকাল ১০টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা এককাট্টা হবে— এই খবরটা পেয়েই আদিত্য কুমার, তার মা-বাবা’র বারণকে অগ্রাহ্য করে, হাজির হয়ে যায় যথাস্থানে যথাসময়ে। ছাত্রদের উপর যখন জল-কামান চলছে, লাঠিচার্জ হচ্ছে, তখন আদিত্য একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে রীতিমতো জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে হেঁচকা টানে কোলে করে তুলে নিয়ে যায়, তখনও সে বলে চলেছে; তারপর এক মহিলা পুলিশের দল তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে, ধাক্কা দিতে দিতে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। প্রায় সাত ঘন্টা থানায় বসিয়ে রেখে আদিত্যকে যথেচ্ছ ভয় দেখিয়ে, তার মা-বাবা’র ওপর এফআইআর লাগুর হুমকি দিয়ে, তারপর তার মা-বাবা’কে ডেকে এনে মারধোর করে আদিত্যকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শুধু বিহার নয়, সারা দেশ এই দৃশ্য দেখেছে ও আদিত্য’র কথা শুনেছে।

আদিত্য কুমার। ছ’ বছরের এক বালক। স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাচন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সংগৃহীত খবরের ভাণ্ডার, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চটজলদি উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও সর্বোপরি, রাজনৈতিক বোধ ও গভীরতা, গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছে। যন্তর মন্তরে GenZ’র আন্দোলন ও প্রজ্ঞা যখন আমাদের সকলকে আলোড়িত করছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে GenAlpha’র রাস্তায় নেমে আসাতে আমরা যুগপৎ অবাক ও আন্দোলিত হচ্ছি, তখন পাটনায় এই অভিনব GenAlpha আদিত্যকে দেখে আমাদের বিস্ময় ও স্বপ্ন যেন এক নতুন হদিশ পেয়েছে। মজদুরি করা বাপ ও সাফাই কর্মী মায়ের সন্তান আদিত্য তারপর বার বার সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কোনও লজ্জা, সংকোচের বিন্দুমাত্র আভাস তার চোখেমুখে নেই, চৌখস রাজনীতিবিদের মতো সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা বোধ করেনি, নিজের মতামতকে খোলাখুলি জানান দিতেও তার সিকি আনা কুন্ঠা নেই। মনে হবে, চারপাশের দামড়া ও দেখতে চালাক বুড়োখোকারা যখন অপদার্থতা, ভয়-ভীতি ও লোভ-হিংসার মায়াজালে আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন GenZ ও GenAlpha’র দলবলেরা যেন সমাজের বিবেক ও যোদ্ধা হয়ে অভিমন্যু’এর মতো রক্তাক্ত চক্রব্যূহকে ছেদ করতে উদ্যত। আদিত্য সেই উন্মুক্ত প্রবাহের তীক্ষ্ণধী প্রতিনিধি। সে ধারণ করেছে সমস্ত রসদ ও হিত-মন্ত্র।

সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, দেশ ও সমাজের এত কথা সে জানল কীভাবে, তার স্পষ্ট উত্তর: বন্ধুর বাড়িতে টিভি’তে খবর দেখে ও সংবাদপত্র পড়ে। বিহারের প্রায় প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো নাম সে স্পষ্ট করে বলতে পারে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সে সসম্মানে ‘পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু’ বলে সম্বোধন করে এবং ছাত্রদের আন্দোলনে সে কেন সামিল হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানায় যে, লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সে যখন পরীক্ষায় বসবে তখন যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।

কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, হিন্দি বলয়ের প্রায় সমস্ত রাজ্যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে রাস্তায় নেমে নিজ নিজ স্কুলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কোনও স্কুলে ছাত্র আছে তো শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে তো বই নেই, বই আছে তো ছাদ নেই। রাজস্থানে একটি স্কুলে মোষের ঘরে ছাত্রদের ক্লাস চলে শুনে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা’র নেতৃত্বে একটি দল যখন সেই স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে তারা রীতিমতো প্রহৃত হন। বাঁকুড়ার গ্রামে ২০ বছরের আব্দুল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে তার নিজের স্কুলটি কেমন অবস্থায় আছে দেখতে গিয়ে গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার বাবা তাকে বাঁচাতে সেখানে পৌছলে ওই গুণ্ডাদের হাতেই প্রহৃত হয়ে মারা যান। লক্ষ্ণৌ’তে স্কুলের ছেলেমেয়েরা পথ অবরোধ করে জানায়, ডিএম’কে আসতে বলুন আমাদের দুরবস্থার কথা শুনতে, যদি ডিএম না আসতে পারেন তো সিএম আসুন। 

এ যেন কচিকাঁচা ও তরুণ প্রজন্মের এক গণ অভ্যুত্থান। তারা কোনওভাবেই আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি, মন্দির-মসজিদের বিভাজন, বা তথাকথিত দেশভক্তির গোলানো কথাবার্তা শুনতে রাজী নয়। তাদের কাছে দেশপ্রেম মানে ভদ্রস্থ বিদ্যালয় ও গুণগত শিক্ষা, সুষম আহার, শিক্ষা শেষে সুষ্ঠু রোজগার, দাঙ্গা নয় সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তারা বয়সে ৬ কি ৩০, কিন্তু তারা জানে চারপাশে কী ঘটছে; তারা দেখেছে ও বুঝেছে, তাদের পরিবারে, মহল্লায়, স্কুলে-কলেজে কীভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদ্বেষ-বিষ, কত সহজে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কারণে বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি মেরেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠেছে কুৎসিত ও ঘৃণ্য বাক্যরাশিতে। আর সমান্তরালে, একের পর এক ভেঙে পড়েছে নতুন নির্মিত ব্রিজ, নির্মাণের পনেরো দিনের মধ্যে হাঁ-মুখ বের করেছে চলাচলের সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে স্মার্ট সিটি, অস্তিত্বহীন হাসপাতালের খাতায়-কলমে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়ম করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে সাব্যস্ত করতে হচ্ছে নিজ পরিচয় ও নাগরিকত্ব, সামান্য যে ক’টি সরকারি চাকরির সুযোগ দেখা দিচ্ছে তাও বিকিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, সরকারি কোষাগার ফাঁকা করে তোষণ চলছে বড় বড় কর্পোরেটপতিদের, গোদি মিডিয়ার অশ্লীল চিল-চীৎকার ও মিথ্যাচারে বিষিয়ে উঠছে চারপাশ; আরও কত কী! এই অবিশ্রান্ত বিবমিষা ও অনাচার নিয়ত বধ করছে সাধারণ দেশবাসীকে। আমজনতা আর পেরে উঠছে না। ধর্মের নেশা ও ‘উন্নয়নের’ বুলডোজারে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অভুক্ত দেশবাসী। এই ঘোর অমানিশায়, তাই, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রায়-প্রতিটি ঘরের নিজ নিজ সন্তানেরাই। আদিত্য’র মায়ের গালে ও হাতে পুলিশের চপেটাঘাত ও টানাহ্যাঁচড়ার চিহ্নের বিরুদ্ধে ওই ছ’ বছরের শিশুই চেঁচিয়ে উঠে বিচার চেয়েছে, পাটনা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছে। এরা যেন সকলে এক সুরে বলছে: ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’।

যা এতদিন অবিশ্বাস্য মনে হত, তাই হয়ে উঠছে বাস্তব। যে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র অর্থবান লোকজন শুধুমাত্র আপন হিত ব্যতীত আর কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করেনি; গরিব মানুষ, মুসলমান, মহিলা, দলিত ও আদিবাসীদের আইনের বলে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও হিংসা দিয়ে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় দেশ জুড়ে আগুন লাগিয়েছে, তখন সে আগুন তো তাদের ঘরও স্পর্শ করবে বৈকি! আপন ক্ষুদ্র স্বার্থে লালায়িত হয়ে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করলে সে ক্ষতি তো তাদের পরের প্রজন্মকেই বরবাদ করবে। তাই, যন্তর মন্তরে অনশনরত ছেলেমেয়েদের কাছে এসে তাদের মা-বাবা’রা আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ভুলেই আজ এই পরিণতি; তাঁরা নেশার ঘোরে বিষ পান করে বসে আছেন। অতএব, তাঁদের কি সাধ্যি বা অধিকার, সেই অগাধ ভুলের পরিণতির বিরুদ্ধেই যখন GenZ ও GenAlpha’রা পথে, তখন তাদের বারণ করার! তাই, অচিরেই ভেঙে পড়ছে অন্ধ বিশ্বাসের ইমারত, ব্যক্তিগত ভাবে কতটুকু পেলাম তার থেকেও বড় হয়ে উঠছে সমাজের সামগ্রিক প্রাপ্তির কথা, যার আলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির মূল্য যথার্থ হয়ে ওঠে, কেটে যাচ্ছে কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পালিত অসূয়া, ঘেন্না ধরছে মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতির ফন্দিসমূহে, আলগা হয়ে পড়ছে এক-একমাত্র-একমুখি চিন্তাপ্রয়াসের সমস্ত কসরত।

তাই, আদিত্যকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সে বড় হয়ে কী হবে বা কী করবে, তখন তার চটজলদি জবাব: ‘জ্যায়সা পড়াই ত্যায়সা নোকরি’। সে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে চায়। ক্লাস সেভেন অবধি পড়ে সম্রাট চৌধুরীর মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার কোনও ধুরন্ধর খোয়াইশ তার নেই। 

বড়রা কি বোঝে, তারা যখন Whatsapp বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই অন্ধের যষ্ঠি তো বালক, কিশোর অথবা যুবকেরাই হয়!


Thursday, 20 August 2026

কে পরবাসী নয়?

স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়


 

কে পরবাসী? এই একটা প্রশ্নেই কেঁপে ওঠে পৃথিবীর সব কাঁটাতার। কারণ, আমাদের জন্মই তো ছিল চলনে। তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার মাটি ছেড়ে হোমো-স্যাপিয়েন্স হেঁটেছিল। পায়ে, নৌকায়, রক্তে গোটা গ্রহটাকে আপন করে নিয়েছিল। আমার কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের ডবল-হেলিক্সে প্রতি প্যাঁচে লেখা আছে একটা নাম: আফ্রিকা।  

ডারউইন বলেছেন, মেন্ডেল বলেছেন, লেভনটিন-লেউইনও মাথা নেড়েছেন। জিনের ভাষ্য একই— সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পথে নেমেছিল। আমরা সবাই সেই পথেরই যাত্রী।  

তারপর এল শস্য। উর্বর নদীর তীরে দাঁড়ালো গাছ। গাছ মানুষকে বাঁধলো, বানালো সভ্যতা, নগর, ঘর। তাই আজ সব বড় সভ্যতা নদীমাতৃক। কিন্তু তারও আগে? আদিম মানুষ ছিল জঙ্গলে। শিকারির হাতে থলি ছিল না, ছিল শুধু পথ। আর শিকারির ধর্মই হল— থেমে না থাকা।  

তাই বলি, কে পরবাসী নয়? আমরা সবাই মাইগ্রেন্ট। আমাদের রক্তে পথ, আমাদের জিনে ভ্রমণ। 

তাই মাইগ্রেশন আমাদের শরীরের কোড। দেশ, পাসপোর্ট, ভিসা— এগুলো সভ্যতার একেবারে শেষকালের আবিষ্কার। তার আগে ছিল নদী, পাহাড়, মরুসীমা। সীমা ছিল, কিন্তু সীমান্ত ছিল না। কবে এল আধুনিক দেশ? ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজারা ঠিক করলেন প্রত্যেক রাজার নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব আইন, নিজস্ব প্রজা থাকবে। বাইরের কোনও শক্তি সেই ভূখণ্ডে নাক গলাবে না। এটাই আধুনিক নেশন-স্টেট। আধুনিক নেশন-স্টেট মানে এমন একটি রাজনৈতিক একক যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, সেই ভূখণ্ডের ওপর একচেটিয়া ক্ষমতা আছে এবং ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ নিজেদের এক কাল্পনিক জাতি বলে মনে করে। 

তারপর এল উপনিবেশ। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ১৪টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র বসে আফ্রিকাকে কাগজে ভাগ করল। পেন্সিলের এক টানে গোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল। এরপর কাঁটাতার। বিশ শতকের আবিষ্কার। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ লাইন। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। তাকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ভারত ভাগের সীমারেখা টানতে বলা হয়েছিল। তিনি জীবনে ভারতে আসেননি। লন্ডন থেকে ম্যাপ আর ১৯৪১ সালের জনগণনার কাগজ দেখে ১২ আগস্ট ১৯৪৭-এ 'লাইন' জমা দেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ। এদিকে, ১৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭'এ  ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে গেছে। সেই রেখাই বাংলা আর পাঞ্জাবকে দু-ভাগ করল। ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন ইজরায়েল, ১৯৫৩ সালে ৩৮তম অক্ষরেখা। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হল ভেতর ও বাইরে তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজ হল, বাইরের মানুষটাকে 'অপর' বানানো।

এই 'অপর' বানানোর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হলোকাস্ট চিন্তাবিদ হ্যানা আরেন্ট। তিনি ১৯৫১ সালে তাঁর বই 'দি অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম'এ 'statelessness' শব্দটি ব্যবহার করেন। Statelessness'এর বাংলা রাষ্ট্রহীনতা। আরেন্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীনতা হল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিশাপ। কারণ, নাগরিকত্ব চলে গেলে মানুষের আর কোনও অধিকার থাকে না। না কথা বলার, না কাজের, না বাঁচার। রাষ্ট্র তখন মানুষকে কাগজ থেকে মুছে দেয়।

কিন্তু কে উদ্বাস্তু নয়? ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ১.৪ কোটি মানুষ এক রাতে উদ্বাস্তু হল। ভারত সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রকের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের রিপোর্ট বলছে, শুধু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তারা শুধু ঘর হারালো না, ভাষা, পেশা, আত্মীয়তা, কবর হারালো। ঋত্বিক ঘটক  'সুবর্ণরেখা'য় দেখালেন, ইছামতী নদীর ওপারে বাস্তু নেই, আছে শুধু যাযাবরত্ব। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর  ইউএনএইচসিআর (UNHCR- United Nations High Commissioner for Refugees) বলছে, ৭.৪ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কক্সবাজারে। কক্সবাজারের কুতুপালং এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রিফিউজি সেটেলমেন্ট। এরা সবাই একই প্রশ্নের শিকার। 'তোমার কাগজ কোথায়?' রাষ্ট্র কাগজ চায়। এই 'ট্রমা' সৃষ্টিই রাষ্ট্র চায় যা তাকে পুলকিত করে।

আর অভিবাসী? সে তো আমরা সবাই। ইউরোপ আমেরিকায় কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি, মধ্যপ্রাচ্যে ঘর সামলাতে যাওয়া কেরালার মেয়ে, সিলিকন ভ্যালিতে কোড লিখতে যাওয়া বাঙালি ছেলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ বলছে, গ্লোবাল রেমিট্যান্স ৮৪০ বিলিয়ন US ডলার। এই টাকাটা কার ঘামে? যারা অন্য দেশের নোংরা কাজ করে, রাত জাগে এবং নিজের ভাষা ভোলে। ফ্রানৎজ ফ্যানন 'দি রেচেড অফ দি আর্থ' বইতে (১৯৬১) লিখেছিলেন, উপনিবেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শোষণের ওপর। আজকের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও তাই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ, সিঙ্গাপুরের পোর্ট— সবই অভিবাসী শ্রমিকের হাড় দিয়ে গাঁথা। তবু রাষ্ট্র তাকে বলে 'অনুপ্রবেশকারী'। শব্দটাই 'আইন' তৈরি করে।

তাহলে কে বড়লোক দেশ আর কে নয়? উত্তরটা ইতিহাসে। ১৫০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫০ বছর ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর বাকি অংশকে লুট করেছে। ত্রিনিদাদের একজন ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক এরিক উইলিয়ামস 'ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্লেভারি' বইতে (১৯৪৪) সালে দেখিয়েছেন, আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ও চিনির ব্যবসা থেকেই ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের পুঁজি এসেছে। উৎসা পট্টনায়েক দেখিয়েছেন, ১৭৬৫ থেকে  ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন US ডলার মূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। কঙ্গো থেকে বেলজিয়াম রাবার নিয়েছে, আফ্রিকা থেকে ফ্রান্স নিয়েছে ইউরেনিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল। ১৯৭৪ সালের ইউএস-সৌদি চুক্তির পর তেল ডলারে বিক্রি হতে শুরু করল। আজ ১ USD সমান ৯৬.১০ ভারতীয় টাকা। US ডলার ইনডেক্স নামলে ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। একে বলে অর্থনৈতিক হিংসা। যুদ্ধ লাগে না, ব্যাংক আর এক্সচেঞ্জ রেটই যথেষ্ট।

কেন এসব হল? দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি আছে। টমাস হবস 'লেভিয়াথান' বইতে (১৬৫১) সালে লিখেছিলেন, মানুষ 'নেকড়ে'। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। তাই রাষ্ট্র দরকার। জন লক 'টু ট্রিটিসেস অফ্ গভর্নমেন্ট' বইতে (১৬৮৯) সালে বললেন, না, মানুষ চুক্তি করে। মানুষ স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র বানায়। আধুনিক রাষ্ট্র হবসকে বেছে নিয়েছে। সে ভয় দেখিয়ে ঐক্য তৈরি করে। তুমি না থাকলে ওরা এসে তোমার চাকরি, তোমার মেয়ে, তোমার ধর্ম নিয়ে নেবে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিস' বইতে (১৯৮৩) সালে বলেছেন, জাতি হল কল্পিত সম্প্রদায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, তবু এক পতাকার নিচে কাঁদি এবং অপরকে মারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারটি বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন 'ন্যাশনালিজম'এ (১৯১৭) লিখেছেন, নেশন হল পলিটিক্যাল ও কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

তাহলে উপায়? এপিস্টেমোলজির (জ্ঞানতত্ত্ব) জায়গা থেকে উত্তর হল দেখার ভঙ্গি পাল্টানো। আমরা কীভাবে জানি, কী সত্যি বলে মানি! রাষ্ট্র আমাদের শেখায় মানুষ 'সমান নাগরিক'। সাহিত্য, সিনেমা, গান আমাদের শেখায় 'মানুষ সমান' সম্পর্কের। মহাশ্বেতা দেবী 'অরণ্যের অধিকার'এ বলেন বিরসা মুন্ডার কথা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে 'অন দিস ল্যান্ড' নামক বিশ্ববন্দিত  কবিতায় লিখলেন, এই মাটিতে এমন কিছু আছে যা জীবনের যোগ্য। এগুলো কাগজ নয়, এগুলো প্রমাণ যে সীমান্তের ওপারেও জীবন আছে।

আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমরা সবাই পরবাসী। কারণ, কারওরই আসল বাড়ি এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও নেই। আমরা সবাই উদ্বাস্তু। কারণ, সময় নামের নদী আমাদের প্রতিদিন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই অভিবাসী। মৃত্যু নামের সীমান্তটা সবাইকে একদিন পেরতে হবে। দেশ, কাঁটাতার, পাসপোর্ট— এগুলো মানুষের বানানো খেলনা। খুব শক্তিশালী খেলনা, রক্ত ঝরায়, কিন্তু খেলনাই। তাই প্রশ্নটা পাল্টাতে হবে। কে বড়লোক দেশ নয়, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, যেখানে কারও কাগজ লাগবে না প্রমাণ করতে যে সে মানুষ? যতদিন না সেই পৃথিবী আসে, ততদিন মহাভারতের বিদুরের মতো কিছু মানুষ থাকবে। যারা রাজসভায় বসে সত্যি কথাটা বলবে। রাজা ভুলতে বললেও, বিদুর মনে রাখবে। কারণ, স্মৃতি না থাকলে সভ্যতা থাকে না।


Tuesday, 18 August 2026

নকশাল কয় প্রকার!

দিমাগ তো কাজ করছে...

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



চিদম্বরম যখন বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘নিজেকে একজন দিমাগী নকশাল ভেবে গর্ববোধ করি’, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রে রে করে উঠলেন, ‘চিদম্বরম মোটেও দিমাগী নকশাল নন, উনি বিশুদ্ধ নকশাল।’ ফলে, মোটমাট আমরা এখন পর্যন্ত চার প্রকার নকশাল পাচ্ছি: দিমাগী নকশাল, বিশুদ্ধ নকশাল, আর্বান নকশাল ও হাতিয়ারি নকশাল। এই চার ধরনের নকশালদের হদিশ আমরা গত এক দশক ধরে পেতে পেতে এসেছি। তদুপরি, ‘দিমাগী নকশাল’ নিয়ে তুমুল সোরগোল ওঠায় এক স্বঘোষিত পুরাতত্ত্ববিদ ‘নকশালি ঘাসের’ সন্ধান পেয়েছেন; ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে নদীর তীরে এই নকশালি ঘাস জন্মায়, সেই নদীকে ‘নকশালেশ্বর মহাদেব’ বলা হয়। তাই ‘দিমাগী নকশাল’ হলেন একজন শিবভক্ত…।’ এটা শুনে যোগেন্দ্র যাদব বেশ চমকিত হয়ে তা প্রচারও করে দিয়েছেন।

এখন ‘দিমাগী নকশাল’ যদি শিবভক্ত হন, তাহলে শাসক দলের মহাবিপদ। শিবভক্তদের কীভাবে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে? শিবের রুদ্ররূপ কে না জানে? ভক্তের উপর জুলুম হলে দেবতা কি স্থির থাকবেন? সেইজন্যই ‘বিশুদ্ধ নকশাল’ আরও বিপন্মুক্ত শব্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নকশাল’ শব্দটিরই যদি অমন পৌরাণিক ইতিকথা থাকে, তাহলে সে সব নিয়ে ছেলেখেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়! তবে কেউ বলতেই পারেন, ফেসবুকে কেউ লিখে দিলেই কি তা পুরাণকথা হয়ে যাবে? কোন পুরাণ বা স্মৃতিতে আছে, সে সূত্র কি দিয়েছে? অথবা, এমন কথার কি কোনও লোকজ দৃষ্টান্ত আছে? সে সব জানা যাচ্ছে না। অতএব, সূত্রহীনতার দরুণ এইসব পুরাণগাথার মারপ্যাঁচ আপাতত সরিয়ে রাজনীতির প্রশ্নটিকেই যদি জিইয়ে রাখা যায়, সেখানেও স্ববিরোধ আছে।

মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫ সনের কথা, যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে ‘সর্বাত্মক বিপ্লবের’ ফ্রন্ট, যে ফ্রন্টে একদিকে সামিল হচ্ছে সিপিআই বাদে সমস্ত বাম ও কমিউনিস্ট দল, অন্যদিকে পুরনো কংগ্রেস ও সমাজতন্ত্রী সহ আজকের শাসক দলের পূর্বসূরীরা যাদের ‘ভারতীয় জনসংঘ’ নামে তখন পরিচিতি। এই শেষোক্ত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এরপরে নিজেদের মিলিয়ে দেবে ‘জনতা পার্টি’ নামক একটি নতুন দলে, যে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হবেন ভারতীয় জনসংঘের নেতা নানাজী দেশমুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানী হবেন জাতীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য। আমরা সবাই জানি, জয়প্রকাশ নারায়ণ সে দলের কোনও আনুষ্ঠানিক পদ না নিলেও তিনিই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা ও পথ প্রদর্শক। সেই সময়ে তিনিই, তাঁর সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহে নকশালপন্থীদের যুক্ত হতে প্রকাশ্য সভায় তাঁদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তিকে তাঁর প্রয়োজন। সেদিন জনতা পার্টির নেতারা বা বাঘা বাঘা পূর্বতন জনসংঘীরাও কিন্তু সে কথার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মৃদু আপত্তিও জানাননি। বরং, জনসংঘীদের মূল মেন্টর সংগঠন আরএসএস জরুরি অবস্থার সময় বেআইনি ঘোষিত হলে তাদের ক্যাডার বাহিনী পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থী ও অন্যান্য বাম সংগঠন দ্বারা গঠিত নানারকম সেবামূলক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনেও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ঢুকে পড়ে।

আজ সময় ও পরিস্থিতি পালটেছে। সেই জনতা পার্টি আজ আর নেই। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে পুরনো জনসংঘীরা তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। আরএসএস’এর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু তাদের একটা অংশ তখনও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাম সংগঠনে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে থেকে গেছে। কোনও কোনও প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বাম ঘরানার মিলও ছিল। যেমন, গান্ধীর প্রশ্নে দু’ পক্ষেরই মতামত অনেকটাই এক ছিল। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যেহেতু দেশ জুড়ে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এক উদার আবহ ঐতিহ্যগত ভাবেই বিরাজমান, তাই সে প্রশ্নে আরএসএস উচ্চকিত ভাবে কিছু বলত না; তবে দেশভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ ফাটল দেখা দিয়েছিল, সেখানে ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’— তাদের এই দুই তরফ নির্মাণ মারফত দুই সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একটা সুপ্ত চোরাস্রোত প্রবহমান ছিল। এই চোরাস্রোতে কমবেশি আক্রান্ত ছিল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ ও নিম্নবর্ণদের সেই অংশ যারা দেশভাগের রোষানলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বামপন্থার সার্বিক প্রভাবে এই দুই-তরফের রাজনীতি ততদিন খুব একটা মাথা তুলতে পারেনি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতিই যখন অনেকটা বদলে গেল, বামপন্থীরাও নিজেদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থানে বেশ দুর্বল হল, তখন স্বভাবতই তাদেরও ভেসে যাওয়ার পালা দেখা দিল। বস্তুত, ভোটের হিসেব-নিকেশে তাদেরই একটা বড় অংশ নিজেদের দল ছেড়ে আরএসএস-বিজেপির পিছনে সামিল হয়ে গেল।

তা না হয় হল। কিন্তু তাই বলে চলমান রাজনীতির আপন পরিবর্তনগুলি তো থেমে থাকে না। দেখা গেল, এ তাবৎ সংসদীয় রাজনীতিতে যে সমস্ত নকশালপন্থী শক্তিসমূহ অংশ নিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রস্তাবনার মূল সুরকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছে, তারাই খুব নীতিনিষ্ঠ ভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্তমান শাসক-বিরোধী এমন এক বার্তা নির্মাণ করতে পেরেছে যা অন্যান্য প্রগতিশীল ও সমাজবাদী শক্তির সঙ্গে সাবলীল সংযোগ স্থাপনের দিশা দিতে সক্ষম হয়েছে। সেটা আরও স্পষ্টত দেখা গেল ককরোচ আন্দোলনের গোড়ার দিকে, যখন দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলিই এদের আন্দোলন নিয়ে কিছুটা সন্দিহান, ভাবছে বিজেপি’র বি-টিম কিনা, তখন কিন্তু বিভিন্ন নকশালপন্থী শক্তিগুলি প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের শক্তি, শ্লোগান, দম ও বুদ্ধি জুগিয়েছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াইয়ে রত থেকেছে। বস্তুত পক্ষে, নকশালপন্থী শক্তিসমূহের সামিল হওয়া ও তাদের রাজনৈতিক পরিণতমনস্কতা দেখে অন্যান্য বাম শক্তিও এগিয়ে আসে, এবং বাকী বিরোধী দলগুলিও ভরসা পায়। তারপর তো ইতিহাস, যার পিছনে সর্বোপরি আরশোলাদের নেতৃত্ব, চৈতন্য, বুদ্ধিবৃত্তি, সংযম ও অংশগ্রহণ অতুলনীয়। বলাই বাহুল্য, এক অসামান্য শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোনম ওয়াংচুকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপকতা এতটাই ছড়িয়েছে যে, আরএসএস প্রধানকেও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থাও যেন খানিক সমঝে কথা বলছে। প্রধান বিচারপতি বার কাউন্সিলের সভাপতিকে ধমকে দিয়েছেন, তিনি কেন ছাত্রদের এবং তাঁর মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপারে এসে নাক গলাচ্ছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পট তৈরি হচ্ছে।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ‘দিমাগী নকশালদের’ সন্ধান-ঘোষণা জারি হল। হাতে আম্বেদকর ও ভগৎ সিং’এর ছবি, শ্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভুখমারি সে আজাদী’, যন্তর মন্তরের রাস্তায় হাজার হাজার জনতার মাঝে হাজার হাজার মেয়েদের নিশ্চিন্তে রাত-জাগা, আধপেটা খেয়ে তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে দিন-রাত কাটানো, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসা’র অনশন, পুলিশের ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও মিম বানানো, মা-বাবার অনুশাসনকে তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতেই নেওয়া, পুলিশের লাঠির সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে পড়া, জল কামান চালালে শ্যাম্পু মেখে রেইন ডান্স— দেশ কোনদিন কবে শেষ তরুণ সমাজের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখেছে? যে জাগরণের সামনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহামহিম মন্ত্রী মহাশয়কেও পদত্যাগ করতে হয়? শুধু যন্তর মন্তরে কেন, ঝাড়খণ্ডেও তো শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে হল! এবার তো GenAlpha’রাও পথে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইতিমধ্যেই উত্তাল। আরশোলারা দলে দলে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যায়তনে, বলছে, ‘স্কুল ঠিক করো’। কে রুধিবে এই হড়পা বান?

দিমাগ তো কাজ করছে! জয়প্রকাশ বর্ণিত ‘নকশালপন্থীদের বিপ্লবী প্রাণশক্তি’ দেশের ‘গণতন্ত্রের শুদ্ধিকরণের জন্য’ লাগছে বৈকী! তারা তো দিমাগীই। নকশাল-ভীতি দেখিয়ে কি দিমাগে কার্ফু জারি করা যাবে? ‘নকশাল’ যে প্রকারেরই হোক, অথবা, পুরাতত্ত্ব মতানুযায়ী শিবভক্ত, তার যে রাজনৈতিক অর্থ গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে দেশবাসী বুঝেছে, তা নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আজ সর্বজনীন। নয় কী? নয়তো চিদম্বরম থেকে মহুয়া মৈত্র, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে প্রকাশ রাজ-- সকলেই একযোগে দম্ভ ভরে বলছেন কেন যে, ‘হ্যাঁ আমিও দিমাগী নকশাল।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে লক্ষ লক্ষ ফলোওয়ার নিয়ে কেন গড়ে উঠছে ‘দিমাগী নকশাল পার্টি’? লড়াইটা কি আসলে দিমাগ বনাম অন্ধভক্তির?


Friday, 7 August 2026

বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাট!

অসমাপ্ত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



কৌশিক গাঙ্গুলির 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ছবিটি গত জুলাইয়ে রিলিজ পেয়েছে। ছবিটি একটি দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তার পরিসর ব্যক্তিগত গৃহের দেওয়াল টপকে সমাজ, শ্রেণি ও সিনেমার বাণিজ্যিক ব্যাকরণের দিকে চলে যায়। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য, ছবিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যে কীভাবে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা ও 'অসমাপ্ত দায়'এর রাজনীতি কাজ করে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রা। পেশায় সে একজন শিক্ষিকা। তার কোনও সন্তান নেই। তবে এর জন্য শুভ্রা দায়ী নয়। এর কারণ সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায় (চরিত্রে কৌশিক সেন), শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী ও পেশায় অধ্যাপক। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই দায়ের বোঝা শুভ্রার উপরেই পড়ে। প্রচার হয় শুভ্রাই সন্তান ধারণে অপারগ। সুমনের কোনও দায় নেই। বিচ্ছেদের পর সুমন দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তার স্ত্রী মেঘনা। মেঘনা মুসলমান। এক ছোট্ট কন্যা সন্তান সহ মেঘনাকে বিয়ে করে সুমন। কিন্তু খাতায় কলমে সুমন মেঘনার মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ, একজন শিক্ষিত অধ্যাপক হিসেবে তাকে আভিজাত্যের ভান করতে হয়। মেয়ে ছাড়া যেন তার চলবে না, এমন একটি ভাবমূর্তি তাকে বজায় রাখতে হয়।

আখ্যানের মোড় ঘোরে মেঘনার অসুস্থতায়। জানা যায়, অ্যাডভান্স স্টেজের টিউমার ও ক্যান্সার। গল্পের জটিলতায় অকস্মাৎ শুভ্রার উপর এসে পড়ে একটি নৈতিক দায়। মেঘনার কন্যা সন্তানটি যাতে এই বিপদের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব শুভ্রা অস্বীকার করতে পারে না। এই বিন্দুতেই ছবির শিরোনাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইনত শুভ্রা সুমনের প্রাক্তন, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক ভাবে সে আজও অর্ধাঙ্গিনী। একই সময়ে মেঘনাও সুমনের বর্তমান অর্ধাঙ্গিনী। ফলে, সুমনের জীবনে দুই সময়ের দুই নারী এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ছবির শেষে মেঘনার পরিণতি নির্মম।

'আজও অর্ধাঙ্গিনী' একটি স্পষ্টতই শহুরে মধ্যবিত্তের আখ্যান। এবং এটিই এর সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান। শুভ্রা শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং তার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ভাষা আছে। তার শোক পর্দায় স্থান পাওয়ার সামাজিক পুঁজি আছে। সিনেমা একটি বাণিজ্য। মধ্যবিত্তের সমস্যা সিনেমার এক বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র।

এই প্রসঙ্গেই ২০২৪ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে অভয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মর্তব্য। সে ঘটনার পর শহরে যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, বাইরে থেকে তাকে লিঙ্গ বয়ানের রাজনীতি মনে হলেও আদতে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন। যে সমস্ত গরিব, কাজের মহিলা, প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা রোজ নিগৃহীত হন, তাদের জন্য রাত জাগা হয় না। কিন্তু যখন ঘটনার কেন্দ্রে আসেন একজন শিক্ষিতা, এমডি পাঠরতা ডাক্তার, তখন সেই ঘটনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'ও সেই একই কাঠামোর অনুসারী। শুভ্রার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পর্দায় আসে কারণ সে মধ্যবিত্ত। কৌশিক গাঙ্গুলিদের সিনেমা নিয়ে ব্যবসা করতেই হবে। তাই প্রচলিত ফিকশনাল মেলোড্রামাকে কখনই নন-ফিকশনাল বাস্তবতায় থাকা সমগ্র মেয়েদের আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ছবিটি সেই নিরাপদ বাস্তবতাকেই বেছে নেয় যা মধ্যবিত্ত দর্শক দেখতে অভ্যস্ত। এখানে চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির যন্ত্রণাকেই দৃশ্যমান করে এবং তাকেই রাজনীতি বলে চালায়।

এই আখ্যানটি মেলোড্রামার ব্যাকরণকেও অস্বীকার করে না। মেঘনার ক্যান্সার, দাম্পত্যের ভুল বোঝাবুঝি এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন-- এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যে টুইস্ট আনে। এটি বাণিজ্যিক সিনেমার একটি অবশ্যম্ভাবী শর্ত। শুধুমাত্র দাম্পত্য টানাপোড়েন দিয়ে দু' ঘণ্টার ছবিকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত অসুস্থতা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের মতো আবেগীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মেলোড্রামার ভেতরেই একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও লুকিয়ে আছে। একজন নারী কেন অন্য নারীর সন্তানের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে! এই বাধ্যতা কি ভালোবাসা থেকে আসে, নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারীত্বের সংজ্ঞা থেকে?

ছবির ফর্মগত বৈশিষ্ট্য হল এর অসমাপ্তি। কৌশিক গাঙ্গুলি কোনও চূড়ান্ত মীমাংসায় যাননি। শুভ্রা শেষ পর্যন্ত কী করল, এই প্রশ্নটি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালক লম্বা টেক, স্থির ক্যামেরা ও ন্যূনতম আবহসংগীত ব্যবহার করেছেন। এর ফলে দৃশ্যগুলোতে একটি ডকুমেন্টারিসুলভ বাস্তবতা তৈরি হয়। শুভ্রার নিঃসঙ্গ হাঁটা বা পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে ক্যামেরা তাড়াহুড়ো করে না। এই স্থবিরতাই দর্শকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, প্রথাগত সিনেমা ক্লাইম্যাক্স দেয়। কিন্তু জীবন ক্লাইম্যাক্স দেয় না। জীবন শুধু চলতে থাকে। এখানে ক্যামেরা শুভ্রাকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে না, বরং এক চিন্তাশীল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

সব শেষে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনি কাগজে শেষ হলেও সামাজিক ও মানসিক ভাবে ফুরোয় না। শুভ্রা এবং মেঘনা-- দুজনেই সুমনের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু এই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া তাদের পছন্দ নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা। একজন নারীকে যতক্ষণ না স্ত্রী ও মা-- এই দুই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ততক্ষণ সমাজ তাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করে না। শুভ্রার ক্ষেত্রে এই অসম্পূর্ণতার তকমা আরও নির্মম। কারণ, সন্তান না থাকার দায় তার নয়, তবুও দায় তার ঘাড়েই পড়েছে। অথচ পরিস্থিতির চাপে তাকেই আবার অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কৌশিক গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতির জন্য কোনও উত্তর রাখেননি। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। আর সেই প্রশ্নের নামই 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'। 

সিনেমা করিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলি'রা কিন্তু সবটাই বোঝেন, কিন্তু বাণিজ্যের অমোঘ ফর্ম্যাটের বাইরে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেন না; এটা শুধু শ্রেণি চরিত্র নয়, শহুরে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি।


Thursday, 30 July 2026

প্রজন্মের আর্তনাদ

পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা চাই

সোমা চ্যাটার্জি



গত সপ্তাহে দিল্লীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে সমাজমাধ্যমে যে রিলসের বন্যা বয়ে গেছে, তার সব কটিই মন ছোঁয়া হলেও একটি আমাকে খুব ব্যক্তিগত ভাবে স্পর্শ করেছে। ওই ভিডিওটিতে দেখাচ্ছিল যে, একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কেঁদে কেঁদে হিন্দিতে বলছেন, 'আভি হমারে বাচ্চো কে ভবিষ্যৎ কে লিয়ে হমে ভিখ মাঙ্গনা পারেগা ক্যা?' অর্থাৎ, আমাদের কি এখন নিজেদের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য ভিক্ষে করতে হবে?

CBSE বোর্ডের ক্লাস নাইনের ছাত্রের এক অভিভাবক হিসেবে আমাকে এই কথাটি বিশেষ ভাবে নাড়া দিয়েছে। কারণ, আগামী বছরগুলিতে আসন্ন CBSE পরীক্ষার্থীদের যে উৎকন্ঠা বা উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে তাতে এদের ভবিষ্যতে আশার আলো যে বিশেষ নেই তা বোঝা কঠিন নয় এবং আমাদের মতো অভিভাবকদেরও যে নিজেদের দাবি-দাওয়ার জন্য পথে নামতে হবে না, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। 

কিন্তু কেন এই উদ্বেগ ? 

নতুন শিক্ষানীতি (NEP 2020)'কে সামনে রেখে CBSE যে শিক্ষাপদ্ধতি ও সিলেবাসে বদল আনছে, তা তত্ত্বে ভালো শোনালেও বাস্তবে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। নতুন শিক্ষানীতি, বিভ্রান্তিকর সিলেবাস আর বইহীন ক্লাসরুম-- এই সাঁড়াশি সমস্যায় ছাত্ররা জর্জরিত। পরীক্ষার দু' মাস আগে সিলেবাস বদল, বই নেই, আবার তৃতীয় ভাষাও নিতে হবে-- ক্লাস নাইনের এই চিত্রই আজ সারা দেশে CBSE-র বাস্তব ছবি। 

এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ফাঁক হল, পরিকল্পনা আছে প্রস্তুতি নেই, সবই 'উপর থেকে চাপানো সিদ্ধান্ত, নিচে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনও প্রস্তুতি নেই'। যেমন, শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে এসে বিষয় কমানো বা বাড়ানো, ছাত্র-শিক্ষক কেউ বুঝতে পারছে না কী পড়বে। নীতি আগে বই পরে-- এটাই এই ব্যবস্থার  বড় ত্রুটি। NEP চালুর কথা ঘোষণা হল কিন্তু বই ছাপা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি কিছুই সময় মতো হল না। তাছাড়া স্কুলগুলিতে সব নির্দেশাবলীর তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও যোগাযোগের চরম অভাব। CBSE-এর সার্কুলার স্কুল পর্যন্ত পৌঁছতে অনেক সময় লাগে এবং সব কিছুই অভিভাবক ও ছাত্ররা শেষ মুহূর্তে জানতে পারে। এদিকে মুখে বা নীতিতে এক দেশ, এক সিলেবাস কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এক বই নয়। সরকারি স্কুলে জুলাই-অগস্টে বই পাওয়া যায় অথচ বেসরকারি স্কুলে এপ্রিলেই বই আসছে। কোথা থেকে আসছে তার কোনও উত্তর নেই। বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

আরও বড় গ্যাঁড়াকল হল Competency Based Education-- অর্থাৎ, 'মুখস্থ'বিদ্যা বাদ দিয়ে Competency Based Learning শুরু করো। ভালো কথা, ছাত্ররা প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে  নয়, প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিখবে। Case study, HOTS (Higher Order Thinking Skills)'এর প্রশ্ন বাড়বে। ছাত্ররা 'কেন' এবং 'কীভাবে' শিখবে, শুধু 'কী' নয়। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকরা নিজেরাই এই নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত নন। দু' দিনের অনলাইন ওয়ার্কশপে কি ২০ বছরের পড়ানোর অভ্যাস বদলানো যায়? স্কুলে পর্যাপ্ত ক্লাস হয় না, শিক্ষক-শিক্ষিকারা সব সময়ই ট্রেনিং নিতে ব্যস্ত। প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন বদলালেও বই ও গাইড বই এখনও পুরনো ধাঁচের। যার ফলে ছাত্ররা না পারছে পুরনো নিয়মে পড়তে, না পারছে নতুন নিয়মে ভাবতে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, যাদের বাচ্চারা ক্লাস নাইনে পড়ছে তারাই বিভ্রান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ, এই ক্লাসের ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে এক ত্রিভুজ সংকটে। যেমন,

১) বইয়ের চরম অভাব: নতুন সিলেবাস অনুযায়ী SST-এর চারটি বিষয়কে এক করে নতুন বই আসার কথা ছিল শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই। কিন্তু জুলাই মাস শেষ হয়ে গেল, বাজারে বই নেই। সব স্কুলেই প্রথম নির্ধারক পরীক্ষা (First Periodic Assessment) হয়ে গেছে, গরমের ছুটির সময়েও বই ছিল না, এদিকে স্কুল খুললেই পরীক্ষা। কোনও স্কুল PDF দিচ্ছে, কেউ বলছে ফটোকপি করিয়ে নাও। প্রত্যন্ত বা গ্রামের ছাত্র যাদের ইন্টারনেট নেই সে কী করবে? 

২) ৬ষ্ঠ বিষয়ের বদল: আগে ৫টি মূল বিষয় + ৬ষ্ঠ বিষয় হিসেবে Computer, Sanskrit, Art Education ইত্যাদি ঐচ্ছিক ছিল। এখন অনেক স্কুলে হঠাৎ করে ৬ষ্ঠ বিষয় বদলে দেওয়া হচ্ছে। যে ছাত্র অষ্টম শ্রেণি অবধি Computer পড়েছে, নাইনে এসে তাকে Skill Subject নিতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাতে কলমে কৃষিকাজও শেখানো হবে। কিন্তু জায়গা কোথায়? জমি কে দেবে? তার কোনও নির্দেশিকা নেই। শুধুমাত্র  এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত চারবার ৬ষ্ঠ বদল করেছে CBSE বোর্ড। সুতরাং, ভবিষ্যতের stream selection ঝুঁকির মুখে। ফলে, যে ছাত্র কম্পিউটার নিয়ে ভবিষ্যতে পড়ার স্বপ্ন দেখত, তার স্বপ্নও বিঁশ বাও জলে।

৩) Third Language (তৃতীয় ভাষার) বাধ্যবাধকতা: NEP অনুযায়ী ক্লাস 9-10'এ ৩টি ভাষা বাধ্যতামূলক। হিন্দি, ইংরেজির সঙ্গে এখন তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মানি, বাংলা, উড়িয়া ইত্যাদি নিতে হচ্ছে। সমস্যা হল, অনেক স্কুলে তৃতীয় ভাষার শিক্ষকই নেই। ছাত্ররা ৮ বছর ধরে দুটি ভাষা পড়ে এসে হঠাৎ তৃতীয় একটি নতুন ভাষা কীভাবে রপ্ত করবে? বোর্ডের পরীক্ষায় এই বিষয়ের নম্বর যোগ হবে কিনা, তা নিয়েও স্পষ্টতা নেই। ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই 'দিশেহারা-- পরীক্ষায় কী আসবে? বই তো নেই; তৃতীয় ভাষায় ফেল করলে কী হবে?' এই প্রশ্নেই সবাই জেরবার। 

আরও মারাত্মক হল, পরীক্ষার খাতা অভিভাবকদের দেখতে না দেওয়া। তার ফলে আমাদের বোঝার ক্ষমতা নেই যে নম্বর ঠিক দেওয়া হচ্ছে কিনা বা কোন প্রশ্নের উত্তর কেমন ভাবে লিখে কত নম্বর পাওয়া যাবে। স্কুল বলছে, বোর্ডের নির্দেশ বাচ্চাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে যাতে তারা নিজেদের Assessment নিজেরাই করতে পারে। তা বলে সেটা এই ডামাডোলের মধ্যেই? বই নেই, সিলেবাস বদল, এই অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেই সেটা করতে হবে?

শিক্ষকদের সমস্যা আরও ভয়ঙ্কর। পুরনো বই দিয়ে নতুন সিলেবাস মেলাতে হচ্ছে। নতুন পেডাগগির জন্য workshop-এর চাপও আছে। ফলে, পড়ানোর সময় কম, paper work বেশি, অতএব অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে  দ্বিগুণ কোচিং ফি দিয়ে বাচ্চাকে ভরতি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, স্কুলে যা হচ্ছে তাতে  ভরসা রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্যর কারণে বেশির ভাগ মেধাবী ছাত্রদেরই পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে, অনীহা দেখা দিছে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রতি বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছাত্র এবং অভিভাবক দুজনেই এতকাল বেসরকারি বা প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে সুবিধা হবে বলে মোটা মাইনের বেসরকারি CBSE স্কুলের উপরই ভরসা করে এসেছিলেন। কিন্তু এখন সেখানেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিত্য নতুন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। অনেক ছাত্রই মানসিক অবসাদে ভুগছে। 

NEP 2020-এর লক্ষ্য শিক্ষার কেন্দ্রিকরণ, যাতে গ্লোবাল, যুক্তিবাদী, দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা যায়। কিন্তু রাস্তা যদি গর্তে ভরা হয়, তাহলে গাড়ি যতই ভালো হোক গন্তব্যে পৌঁছবে না। ভারতের মতো বৈচিত্রপূর্ণ  দেশে 'এক শিক্ষানীতি' কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সব আলাদা। তাই কেন্দ্রে বসে এক সিলেবাসে ১৪০ কোটি ছাত্রকে না পড়িয়ে শিক্ষানীতির বিকেন্দ্রিকরণ করলে স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি শিল্প, ভাষা, সংস্কৃতির মধ্যে একটা সুসংহত মেলবন্ধন ঘটবে। যখন প্রতিটি রাজ্য নিজের মতো করে শিক্ষা মডেল বানাবে, তখন হিমাচল-কেরালা-পশ্চিমবঙ্গ একে অপরের থেকে শিখবে। বিকেন্দ্রিকরণ মানে 'ভেঙে দেওয়া' নয়। বরং 'সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগোনো'। সমবায়ী যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ছাঁচে শিক্ষানীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে-- পুরো বিকেন্দ্রিকরণও হবে না আবার কেন্দ্রের দায়িত্বও থাকবে, যেমন NCERT Framework, শিক্ষার ন্যূনতম মান, জাতীয় পরীক্ষা, স্কলারশিপ, শিক্ষক ট্রেনিং, টাকা দেওয়া ও তার যথোপযুক্ত ব্যবহার হছে কিনা তা দেখা ও পরিদর্শন করা।

তবে সবার প্রথমেই দরকার প্রস্তুতি, যাতে ছাত্ররা বই, ভাষা ও সিলেবাসের জাঁতাকলে আটকে না পড়ে। যেমন, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মার্চের মধ্যে বই, সিলেবাস ও নমুনা প্রশ্নপত্র প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা,  মাঝপথে সিলেবাস কাটছাঁট না করা, বই ও শিক্ষকের নিশ্চয়তা স্থাপন, এপ্রিলের মধ্যে প্রতিটি স্কুলে বই পৌঁছে দেওয়া, খালি শিক্ষকের পদ তিন মাসের মধ্যে পূরণ, তৃতীয় ভাষার জন্য শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তা ঐচ্ছিক রাখা, কোচিং মাফিয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। ধাপে ধাপে পরিবর্তন করা যাতে ছাত্ররা দিশেহারা বোধ না করে। প্রতি বছর একটি করে পরিবর্তন আনা। বই ও ডিজিটাল দুটোই পাশাপাশি চলুক, কিন্তু বইয়ের বিকল্প হিসেবে নয়। সর্বোপরি, সিলেবাস ও নীতি তৈরির সময় ছাত্র প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। সার্কুলার নয়, এক মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় CBSE-এর Mentor Teacher নিয়োগ করতে হবে, প্রতিটি ব্লকে দিতে হবে বিনামূল্যে বই।

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে 'উপর থেকে হুকুম, নিচে কে ভুগছে কেউ দেখে না'— এই মানসিকতা থেকেই এই আন্দোলনের উত্থান। NEET পেপার ফাঁসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার পচন— পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং ছাত্রদের প্রতি উদাসীনতা। দেশের পনেরোটি শহরে CJP-র প্রতিবাদের মূল স্লোগান ছিল 'বই দো, শিক্ষক দো, ভবিষ্যৎ বাঁচাও'। শিক্ষা ব্যবসা নয়, আমাদের অধিকার-- এই দাবিতেই প্রতীকীভাবে তারা ছেঁড়া বই, খালি ব্যাগ নিয়ে মিছিল করেছে; বলেছে, 'আমাদের হাতে বই নেই, তাই খালি ব্যাগ নিয়েই স্কুল যাচ্ছি।' 

যখন সিস্টেম ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তাই শেষ কথা। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ তাই একটা প্রজন্মের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। কে বলতে পারে, আমাদের বাচ্চারা যারা আজ  সরকারি শিক্ষানীতির জাঁতাকলে ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারাই আবার কোনদিন ইঁদুরের আন্দোলন সংঘটিত করবে কি না!


Monday, 27 July 2026

যুব-রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

গণতন্ত্র নির্বাচন পরিধির বাইরে বিস্তৃত 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-এর যন্তর মন্তর আন্দোলনকে সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। পরবর্তীকালে ইতিহাস এর নেতৃত্বের চরিত্র কিংবা প্রতিটি নির্দিষ্ট দাবির যৌক্তিকতা কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায় যে, আন্দোলনটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মধ্যেকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর তাৎপর্য কেবল একজন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা সরকারের আলোচনায় বসার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর বৃহত্তর তাৎপর্য নিহিত আছে এই বিষয়টিতে যে, কীভাবে প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে উঠে আসা একটি উদ্যোগ জনমতকে সংহত করে নীতি নির্ধারণের স্তর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারল।

বিগত কয়েক দশকে ভারতে বড় আন্দোলন বলতে সাধারণত রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন বা প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বকেই বোঝানো হত। কিন্তু CJP-র ক্ষেত্রে সেই কাঠামো অনুপস্থিত ছিল। সূচনাটা হয়েছিল ডিজিটাল পরিসরে। পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ এবং ব্যঙ্গ প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখান থেকে সেই অসন্তোষ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় শারীরিক জমায়েতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রদের সমাবেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে বাধ্য করে। সোনম ওয়াংচুক'কে জোরজবরদস্তি যন্তর মন্তর থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে ছাত্রদের উপর পুলিশের ব্যাপক লাঠিচার্জের ফলে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে এবং যন্তর মন্তরে জনতার ঢল নামে, তারই ফলশ্রুতিতে অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। বর্তমান সরকারের আমলে জনচাপের মুখে মন্ত্রী স্তরে এই ধরনের পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে বিরল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরীক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেয় এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আইন মোতাবেক পদক্ষেপের কথা বলে। এই প্রেক্ষাপটেই আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।

আমরা জানি, উদার গণতন্ত্রের বৈধতা শুধুমাত্র নিয়ম ভিত্তিক নির্বাচনের উপর নির্ভর করে না। নির্বাচন হল বৈধতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু বৈধতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জবাবদিহিতা। এই জবাবদিহিতা আসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সক্রিয় বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। এই অর্থে প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের ব্যত্যয় হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং এটি গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত স্ব-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার একটি অংশ। বিশ্ব ইতিহাসে বহু সংস্কারই সম্ভব হয়েছে। কারণ, নাগরিক সমাজ যখন দেখেছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে তখন তারা সম্মিলিতভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। CJP-র আন্দোলন সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি। এটি প্রমাণ করেছে, ভারতের মতো একটি বৃহৎ এবং জটিল গণতন্ত্রেও জনমত নীতি এবং শাসনকে প্রভাবিত করা যায়।

এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যুব অংশগ্রহণের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনা। গত এক দশকে রাজনৈতিক ভাষ্যে একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ ছিল যে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের অংশগ্রহণ মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ এবং তা বাস্তব রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয় না। যন্তর মন্তরের অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট-ভিত্তিক আলোচনা এবং ব্যঙ্গ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের উপস্থিতিতে। অংশগ্রহণকারীরা গরম ও রোদ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি সত্ত্বেও টানা অবস্থান বজায় রাখেন। এই প্রক্রিয়া দেখিয়ে দেয় যে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কেবল বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করে না, বরং তা বাস্তব রাজনৈতিক সংহতির একটি অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে পারে। NEET-এর অনিয়ম সরাসরি লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করেছিল। সেই কারণেই বহু তরুণ, যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক আন্দোলনে ছিল না, তারাও এই উদ্যোগে যুক্ত হন।

ভারতে আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার তাৎপর্য ছিল ভিন্ন। একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং শিল্পের ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই আবহে পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে তা শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্যা নয়, সামাজিক গতিশীলতার যে প্রধান মাধ্যমগুলি আছে তার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন। কারণ, ভারতে বহু পরিবারের কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই হল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও পেশাগত উন্নতির প্রধান পথ।

এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জবাবদিহিতার উপর জোর দেওয়া। সাধারণত কোনও সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ভবিষ্যতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। কিন্তু এখানে আন্দোলনকারীরা দাবি তোলেন যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। জনবিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত লাগলে শুধুমাত্র নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও সামনে এসে দায় স্বীকার করতে হতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রীর দায়বদ্ধতা একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রীতি। এখানে সরাসরি ব্যক্তিগত অসদাচরণ প্রমাণিত না হলেও দফতরের ব্যর্থতার দায় মন্ত্রীকে নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে CJP-র দাবি ভারতীয় রাজনীতিতে সেই রীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে ইঙ্গিত করে।

সংগঠনের কাঠামোর দিক থেকেও এই আন্দোলন ছিল ভিন্ন। পূর্ববর্তী বহু বড় আন্দোলন কোনও জাতীয় রাজনৈতিক দল বা একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। CJP-র ক্ষেত্রে সেই কেন্দ্রীয়তা ছিল না। এর শক্তির উৎস ছিল বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক। স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্র, পেশাজীবী, স্বাধীন কর্মী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা যোগাযোগই ছিল মূল ভিত্তি। অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে কর্মসূচি রূপায়ণ, সবই হয়েছে অপেক্ষাকৃত অ-শ্রেণিবদ্ধ পদ্ধতিতে। এটি ডিজিটাল যুগের নাগরিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ধরনের কাঠামোর সুবিধা হল, এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বেশি এবং নেতৃত্বের উপর নির্ভরতা কম থাকে। তবে এর অসুবিধা হল, দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক স্থিতি বজায় রাখা এবং একটি সুসংহত নীতিগত রূপরেখা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বললে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর এর প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। বহু প্রথমবারের অংশগ্রহণকারীর জন্য এই আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ। আলোচনা, বিক্ষোভ, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপ এবং আইনি প্রক্রিয়া— এই সমস্ত অভিজ্ঞতা তাদের নাগরিক চেতনাকে গঠন করেছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা দেখায় যে কম বয়সে নাগরিক অংশগ্রহণ পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায়। সেই যুক্তি মেনে নিলে বলা যায়, CJP-র প্রকৃত উত্তরাধিকার এমন একটি প্রজন্মের উত্থান যারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে ইতিহাস বলে যে, অনেক সফল আন্দোলনই প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের পর গতিশীলতা হারায়। এর কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, নেতৃত্বের সংকট, আদর্শগত বিভাজন অথবা জনসাধারণের মনোযোগের অভাব। রাজপথের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে না পারলে আন্দোলনের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। এর জন্য প্রয়োজন টেঁকসই নীতি প্রস্তাব, সাংগঠনিক তদারকি এবং নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ। CJP এই পথে কতটা অগ্রসর হতে পারবে তা এখনও সময়ের অপেক্ষা।

সরকারের জন্যও এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। নির্বাচনী বিজয় গণতান্ত্রিক বৈধতার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়। শাসন পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, সংবেদনশীলতা এবং জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হয়। যখন প্রতিষ্ঠানগুলি নাগরিকদের উদ্বেগকে সময়মতো সম্বোধন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অসন্তোষ জমতে থাকে। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সেই জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। এই অর্থে CJP-কে শুধুমাত্র একজন মন্ত্রী বা একটি পরীক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে বিষয়টিকে সরলীকরণ করা হবে। বরং এটি ছিল ন্যায্যতা, সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, CJP-র যন্তর মন্তর আন্দোলন ভারতীয় গণতন্ত্রের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, যদিও সেটি প্রতীকীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ; এর বড় অবদান হল এটি পুনরায় প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত পরিবেশেও শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিবাদ শাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নির্বাচনের গণ্ডির বাইরে বিস্তৃত। তরুণ নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনে তারা সংগঠিত হতে পারে। আর কোনও সরকারই টানা শান্তিপূর্ণ জন-আন্দোলনকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। এটি জেপি আন্দোলন, ২০১১-এর দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন বা ২০১৯-২০'র কৃষক আন্দোলনের মতো যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা তা নির্ভর করছে পরবর্তী বছরগুলিতে নীতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ার উপর। আপাতত এটি সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে যুব-নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল যার চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনও বাকি।


Sunday, 26 July 2026

জয়তু নতুন প্রজন্ম

যা পেলাম  তা দুর্লভ

কৃশাণু মিত্র



কী পাইনি তার হিসাব আজ মেলাব না। ককরোচ আন্দোলন এই দিশাহারা সময়কে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই বরং কী কী পাওয়া গেল, তা খতিয়ে দেখি।

১) নতুন সময়ের নেতৃত্ব

আমরা তথাকথিত সবজান্তারা আলোচনা সভায়, মিছিলে, গণসংগঠনে যাদের মুখ দেখি, তাদের বাইরেও যে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রয়েছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমরা ভেবেছিলাম, সমাজের দায়িত্ব বোধহয় কেবল আমাদেরই। আর ওরা? ওরা নাকি মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত! অথচ প্রযুক্তির ব্যবহার করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া, গোদি মিডিয়াকে ছাপিয়ে ও আইটি সেলের প্রোপাগান্ডাকে কার্যত গুনতিতে নস্যাৎ করে ভারতবাসীর মন জয় করে নেওয়ার কাজ তারাই করে দেখাল।

২) পেলাম লক্ষ লক্ষ সাংবাদিক

যারা স্পনসর্ড গোদি মিডিয়াকে গণতান্ত্রিক পথেই বাণপ্রস্থে পাঠিয়ে দিতে পারে। গোদি মিডিয়া যখন কদর্য ভাষ্যে সমাজে বপন করছে কূট বিষ, তখন এই লক্ষ লক্ষ তরুণ তাদের মোবাইলে, কম্পিউটারে নির্মাণ করছে রিল, মিম আর নবতর ভাষ্য ও স্বপ্ন। এরাই প্রকৃত সাংবাদিক ও মিডিয়া।

৩) শিখলাম সাংস্কৃতিক লড়াই

মজে যাওয়া খাত ভরে উঠল নতুন প্লাবনে। বিহার ও যন্তর মন্তরের ব্যঙ্গাত্মক গান আজ মনের মণিকোঠায় হিল্লোল তোলে। রঙ্গ-তামাশাও যে প্রতিবাদের পথ হতে পারে, তা আমরা ভাবিনি। যখন কোনও পড়ুয়া পুলিশকে গিয়ে বলে, 'আমায় ডান্ডা মারো', তখন বিশ্বের মানুষের বুক রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। 'দেওয়ালে দেওয়ালে' নয়, প্রযুক্তির হাত ধরে সবুজের বার্তা পৌঁছে যায় আপামর জনসাধারণের ঘরে ঘরে। মিম, কার্টুন, কবিতা, রিল— নিরন্তর তৈরি হতে থাকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের সৃজনশীল সত্তাকে মিলিয়ে। যাকে বয়স্করা সর্বনাশ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, নবীনরা তাকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করে তুলল। রাষ্ট্রকে নিয়ে এমন মশকরা আমরা কস্মিনকালেও দেখিনি। আমরা জানতাম, রাষ্ট্র মানেই লেফট-রাইট; তার সঙ্গে যুদ্ধ মানেই 'লেফ্টিও রাইট' (আমার কাছে যার অর্থ, বামেদের বহু ব্যবহৃত অথচ বিফল পথ)। ইংল্যান্ড প্রবাসী এক পুত্র মুম্বই থেকে তার বাবা-মাকে যন্তর মন্তরে পাঠিয়েছে এই বলে— 'বাবা, তুমি আমার হয়ে পুলিশের কাছে একটা ডান্ডা খেয়ে এসো।'

৪) ঘুচে গেল নারী-পুরুষের বিভেদ

অগণিত তরুণ-তরুণীর সমাবেশ যেখানে নারীশক্তির কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারত, সেখানে নারীরা ছিলেন নির্ভয়। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তার কারণ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারীদের মানসিকতা, নাগরিক ও GenZ জমায়েত নয়— এমন উপলব্ধিও সামনে এসেছে। প্রতিবাদ আর নারীমুক্তি পাশাপাশি হেঁটেছে। মেয়েরা কেবল সংসার করবে, লেখাপড়া করবে না— এই মনুবাদী, তালিবানী রাষ্ট্র-ন্যারেটিভ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আগ্রাসনে ভেঙে পড়েছে। কন্যাসমা একজন যখন হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট নিয়ে বলে, 'পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক করে, আমার ন্যাপকিন নয়', তখন পরিবারের মনুবাদী একনায়কত্ব খানখান হয়ে যায়। আমি এই প্রজন্মকে, এই কন্যাকে প্রণাম করি। এই প্রজন্ম পরিবারের ভীত-সন্ত্রস্ত জ্যেষ্ঠদেরও শিক্ষা দিতে পেরেছে।

৫) ধর্ম যখন ভাই-ভাই 

জুনেইদ ভাই ও তাঁর সঙ্গীরা দেখিয়েছেন কাকে বলে মানবধর্মী উৎসব। ককরোচদের ধর্ম নিরপেক্ষ মানসিকতা ও শিখ সম্প্রদায়ের পাগড়ি দান রবীন্দ্রনাথের ‘মহামানবের সাগরতীরে’ যেন ভারতবাসীকে হাজির করেছে। গরু-গোবর, হনুমান কিংবা হিন্দুত্ববাদী বহু ন্যারেটিভ মুহূর্তেই খসে পড়েছে। এক প্রতিবাদী জনৈক RAF জওয়ানকে বলছে, 'আমি পাকিস্তানি, আমাকে গুলি করো।' ভোটের রাজনীতির জন্য রাষ্ট্র যে সব উপাদানকে ব্যবহার করেছে, পড়ুয়ারা তা ওলটপালট করে দিয়েছে। রাষ্ট্রকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে।

৬) মেটামরফোসিস

'আরশোলারা কি এক জায়গায় হতে পারে না?' অভিজিৎ দিপকে'র এই আকাঙ্ক্ষা থেকে ককরোচদের যে উত্থান এবং অভিজিতের দেশে ফিরে আসা, যেন কাফকার 'মেটামরফোসিস'। সোনম ওয়াংচুক যেন পেট্রোল চালিত ইঞ্জিনের স্পার্ক প্লাগ। 'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে…'— জ্বলে উঠল আকাশ-বাতাস, গান্ধীর পথে। যেখানে বস্তু পোড়ে না, পোড়ে প্রতিটি মানুষের মন। আত্মদহন পরশমণি হয়ে ভুল-ঠিক চেনার পথ দেখিয়ে দেয়।

৭) আন্দোলনের পথ

আন্দোলনের ধারার যে পরিচিত রূপ দেখা যায়— ধরা যাক জঙ্গলের লড়াই— সেখানে কত বীর শহিদ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যদি ভগৎ সিং কিংবা তাঁর সমসাময়িক স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের কথাও ভাবি (যদিও সেই যুগে মিডিয়া আজকের মতো সর্বব্যাপী ছিল না), তাহলে দেখব, অনশন এমন একটি পথ যা বিপথগামী সমাজ মানসে আত্মদহনের কাজ করে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের অবস্থান পরিবর্তন করে অনশন। এই পর্যায়টি আদতে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যে বাচ্চারা অনশনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রণাম করে বলি—

'জয়তু নতুন প্রজন্ম। অনেক শেখালে।'


Wednesday, 22 July 2026

২০ জুলাই সারাদিন

যে যেখানে  লড়ে যায় আমাদেরই লড়া...

অভিষেক



বর্ষাস্নাত জুলাই। ১৯ তারিখ। হাওড়া স্টেশন। সকাল আটটা পনেরো। পূর্বা এক্সপ্রেস ছেড়ে দিল দিল্লির উদ্দেশ্যে। ১ সপ্তাহ ধরে টিকিট চেষ্টা করেছি, পাইনি। তৎকালে বুকিং পেয়ে গেলাম অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে…

গন্তব্য অবশ্যই দিল্লি। নিট পরীক্ষায় দুর্নীতি বহু ছাত্রের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে ২১ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। আমরা সেই খবর জানি। একটি সর্বভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই তীব্র অনৈতিকতা আমার ওপরেও প্রভাব ফেলেছে অনেকখানি। ঠিক করে ফেলি, দিল্লি যাব, যন্তর-মন্তরে যুক্ত হব আরশোলাদের আন্দোলনের সঙ্গে। সর্বোপরি, সোনম ওয়াংচুক স্যার'এর তত্ত্বাবধানে সিজেপি যে আহ্বান জানিয়েছে দেশের যুবসমাজ সহ সমস্ত শিক্ষানুরাগীদের কাছে, সেখানে যোগদান করব। চলো সংসদ, ২০ জুলাই।

ট্রেন ছাড়ার পর বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা অতিক্রম করে তা ধানবাদে থামল দুপুর ১২টা নাগাদ। এরপর ট্রেন যত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে থেমেছে, যেমন গয়া, রফিগঞ্জ, সাসারাম, মুঘলসরাই, এলাহাবাদ, ইটাওয়া, আলিগর ইত্যাদি সমস্ত স্টেশনে যাত্রী উঠছেন। বহু সংখ্যায়। তাদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ ছাত্রছাত্রী অথবা শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষতিকর শিক্ষানীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব তাদের ওপর পড়েছে। আসন সংরক্ষিত না থাকলেও এঁরা উঠে পড়ছেন এবং অদম্য মনোবল নিয়ে ট্রেনের যে কোনও স্থানে একটু জায়গা পেলেই নিজেকে আঁটিয়ে নিচ্ছেন কোনওক্রমে। প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও পরে তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি। সবার গন্তব্য একই। শিক্ষা ক্ষেত্রে দিল্লি সরকারের কাজকর্মে সবাই তিতিবিরক্ত। সময় যত এগোচ্ছে, হৃদ্যতা বাড়ছে। এরা সবাই কমন হোয়াটসএপ গ্রুপ বানিয়েছেন, যাতে দুরন্ত ভীড়ে প্রিয়জনেরা কাছছাড়া না হয়। আমাকেও সদস্য করলেন সেই গ্রুপের। বেশিরভাগের বয়স কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে।

রাত কাটল। ২০ তারিখ সকাল। সকাল ৬টায় দিল্লি স্টেশনে ঢোকার কথা ট্রেনের। ঢুকল প্রায় সাতটায়। স্টেশন থেকে বেরতে বেরতে দেখি অনুসন্ধান কেন্দ্রে প্রচুর ভীড়। স্টেশনে উপস্থিত মানুষজন একটু চিন্তিত, উদভ্রান্ত। দিল্লিগামী অনেক ট্রেন নাকি বাতিল হয়েছে এবং কিছু ট্রেন সময়ের থেকে দেরিতে চলছে। প্রথমে সন্দেহ হলেও পরে বুঝলাম, সরকার তার খেলা শুরু করে দিয়েছে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা ক্যাব নিয়ে যন্তর মন্তর গেলাম। চালক আমাকে একটু দূরেই নামালেন। রাস্তা ধরে যেতে গিয়ে দেখি, অনেক রাস্তায় লোহার বেষ্টনী ব্যবহার করে যানের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। 

যন্তর মন্তরে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। আসার পথে দেখেছি, মেট্রো স্টেশনগুলি থেকে কাতারে কাতারে মানুষ বেরিয়ে আসছেন। এক উর্দিধারী পুলিশকর্মী আমার সব কিছু চেক করলেন। আমার ফোনটা চাইলেন। অনেকক্ষণ দেখলেন। যাই হোক, মঞ্চে পৌঁছনোর আগে থেকেই প্রভূত ভিড়। সেখানে পুলিশ প্রহরা বেশি নেই। সাজোসাজো রব। ৯টায় শুরু হবে ঐতিহাসিক 'চলো সংসদ' মার্চ। 



শুরু হতে হতে প্রায় সাড়ে ন’টা হল। বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ব্যক্তি তাঁদের বক্তব্য রাখলেন, উপস্থিত থাকলেন, হাটলেন কিছুটা পথ। এরপর দশটা/ সাড়ে দশটা নাগাদ অনেকের মোবাইলে মেসেজ ঢুকতে থাকল– আপনাদের ইন্টারনেট বন্ধ করা হচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা গেল অনেকের মোবাইলে টাওয়ার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। সিগনাল দুর্বল। বোঝা গেল, সরকার শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার করছে। প্রবল ভীড়ের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণ অহিংসক উপায়ে জনতা হেঁটে চলেছে। আশেপাশের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলছি, তাঁদের উৎস জানছি। পঞ্জাব, হিমাচল, ইউপি, বিহার, এমপি, হরিয়ানা, রাজস্থান থেকে দলে দলে মানুষ এসেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁটছেন। অনেকে বলছেন, আজ পুলিশ প্রবল অত্যাচার করবে। ভাবলাম, নাহ্, অতটা বাড়াবাড়ি পুলিশ করবে বলে মনে হয় না। কারণ, ২ দিন আগেই সোনম স্যারকে অপহরণ করে পুলিশ মুখ পুড়িয়েছে, এর মধ্যেই এত তাড়াতাড়ি ওরা এতটা নিষ্ঠুর হবে না। পরে দেখলাম, ওরা নিষ্ঠুর নয় নৃশংস হল। কারণ, এটা দিল্লি পুলিশ।

মাঝখানে খবর এল, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা'কে ডেকে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। মিছিলের মধ্যেই অগোচরে আরএসএস তাদের চর পুঁতে রেখেছে। তারা গুজব ছড়াচ্ছে, অভিযান ফলপ্রসূ আর এগোনোর দরকার নেই, সরকার দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এ যে স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের মিছিল। এরা প্রবল পরাক্রমে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। দিল্লি পুলিশ ৩টে স্তরে নিরাপত্তা বেষ্টনী সাজিয়েছে। প্রথমটি ব্যর্থ হলে লাঠি চালাবে, তারপর টিয়ার গ্যাস এবং সবশেষে শ্যুট অ্যাট দ্য গেট। টিয়ার গ্যাস ও বন্দুক সজ্জিত গাড়ি চলাফেরা করছে একটু দূরে। 

যন্তর মন্তর থেকে সংসদ প্রায় ২ কিমি। আমরা সংসদ মার্গ ধরে হাঁটছি। এদিকে রাইসিনা রোড, রাজেন্দ্র প্রসাদ রোডে পিলপিল করে মানুষ জড়ো হচ্ছেন পায়ে পায়ে। সংসদে পৌঁছনোর প্রায় ৩/৪ টি পথ আছে। ভীড় বাড়ছে।

প্রায় সাড়ে বারোটা | এর তার ফোনে শুনতে পাচ্ছি, অনেকে পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করেছে। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি সামনের বিপুল জনতার ভীড় প্রবল গতিবেগে আমাদের দিকে ধাবমান একটা ঢেউএর মতো এসে পড়ছে। কোনওক্রমে ফুটপাথে সরে, তারপরে ফুটপাথের পাশে একটা উচু স্থানে উঠে প্রাণ বাঁচালাম। নচেৎ পদপিষ্ট হতাম হয়তো। বুঝলাম, সামনের দিকে কিছু একটা অশান্তি শুরু হয়েছে। এমনিতেই ভ্যাপসা গরম। ব্যাগে রাখা জল আর খাবার শেষ। রাস্তায় কোনও খাবার বা জল না থাকায় আমি ভীড় ছেড়ে আরও পেছনের দিকে চললাম। সংসদ মার্গ ছেড়ে বেরনোর পথে দেখি পুলিশ সেদিকেও ব্যারিকেড দিচ্ছে। মতিগতি বুঝলাম না। সকাল থেকে ব্রেকফাস্টও হয়নি। ভাবলাম কাছেপিঠে কোথাও একটা কিছু খেয়ে নিয়ে আবার এসে অবস্থানে ফেরা যাবে। আসার পথে শুনলাম দিপকে তাঁর অনশন তুলে নিয়েছেন।

ফিরে এলাম দেড়টা নাগাদ। এসে দেখি অবাক কাণ্ড– ঘটনাস্থলে প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ প্রবল লাঠিবর্ষণ শুরু করেছে নির্মম ভাবে। অনেকে আহত। আমি তো হতভম্ব। কী করব কিছু বোঝার আগেই দেখলাম অল্প দূরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়েছে। একটু বাদেই এলাকা ধোঁয়ায় ভর্তি। আমি কোনওক্রমে নাকে মুখে রুমাল চেপে দ্রুতগতিতে বেরবার পথ খুঁজছি। আবছা দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, র‍্যাফ লাঠি চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করছে জনতাকে।

পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে অনেকটা পথ পার হয়ে কনট প্লেসে এলাম। এদিকে চোখমুখ জ্বলছে। ব্যাগে একটা ছোট বোতলে স্যালাইন ওয়াটার ছিল। সেটা চোখে দিতে দিতে হাঁটতে থাকলাম। মোবাইল ফোনে চার্জ নেই। গাড়িও বুক করতে পারছি না। অনেকটা হেঁটে একটা দোকানে এসে ফোন চার্জ করলাম। এতক্ষণে ইন্টারনেট কানেকশন এসেছে। নেটে দেখলাম যন্তর মন্তরে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে দিল্লি পুলিশ। বাইরে বৃষ্টি। দোকানের মালিক বললেন, পুলিশ আন্দোলনকারীদের শকুনের মতো খুঁজছে আর পেলেই হেনস্থা করছে। বেরিয়ে গেলাম। কিছুটা হেঁটে আর কিছুটা ভাড়ার বাইকে চেপে এয়ারপোর্ট পৌছলাম।

সারাদিন এত তুলকালামের পর মাথা ভারী। সকালে অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তার থেকেও বেশি আশা নিয়ে দিল্লি ছাড়লাম। আজ স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের যে ঢল দেখলাম দিল্লির রাজপথে, বুঝলাম, ভারতের দুর্বলতাই ভারতের আসল শক্তি: ভারতের দেড়শো কোটি জনগণ…।


Sunday, 19 July 2026

রাত পোহালেই ২০ জুলাই

সন্ধিক্ষণের উপান্তে দাঁড়িয়ে দেশ

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



সাদা অ্যাপ্রন পরে ডাক্তার সেজে পুলিশের দল আশপাশের সবাইকে জোরজবরদস্তি সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে মঞ্চে উঠে পড়ল, তারপর সাদা বিছানার চাদর দিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলে শীর্ণ, দুর্বল, অভুক্ত সোনম ওয়াংচুক’কে (তাঁর অশক্ত প্রতিবাদ সত্ত্বেও) প্রায় চ্যাংদোলা করে দণ্ডায়মান আম্বুলেন্সে তুলে চম্পট দিল। এইভাবেই ভেবেছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই’ আন্দোলনকে দুরমুশ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু কোথায় কী! কথায় বলে, ‘শাসক যত মারে/ জনতা তত বাড়ে’। সোনমজী’র অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই চারিদিক থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এসে ছেয়ে ফেলল যন্তর মন্তর প্রান্তর।

মাস দুয়েক আগে প্রধান বিচারপতির ‘আরশোলা’ মূলক একটি চিহ্নিতকরণকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে মিম ও তির্যক-মন্তব্যের ঢেউ উঠেছিল, তারই অভিঘাতে ইন্সটাগ্রামে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রারম্ভকে বহু মানুষই ততটা সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু যখন তা সত্যিই অন্তত ২.৫ কোটি ফলোয়ার সহ ছাত্র-যুবসমাজের এক তীব্র যন্ত্রণা ও আর্তিকে প্রতিনিধিত্ব করল, ‘আমিও এক আরশোলা’ প্রতিধ্বনি যখন নিজেকেও গ্লানিবিদ্ধ করল, তখন আর পিছনে তাকানোর অবকাশ ছিল না। চকিতে সব যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এই চলমানতার অন্যতম মুখ্য উদ্যোক্তা তরুণ তুর্কি অভিজিৎ দিপকে তাঁর আমেরিকার মসৃণ জীবনের সমস্ত আয়েসকে বিসর্জন দিয়ে দেশে ফিরে এলেন এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পানে নিজেকে অবলীলায় নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে রইলেন আশুতোষ রাঙ্কে ও সৌরভ দাস। পরে আরও কিছু উজ্জ্বল মুখ। এরপরের ঘটনাবলী আমরা জানি; যেন এক লহমায় বদলে যেতে বসল দেশের নকশা। যে একতরফা বয়ানের বুলডোজার দেশকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল, প্রশ্ন উঠছিল আদৌ আর আমরা পবিত্র সংবিধানের রক্ষাকবচ ফিরে পাব কিনা, বিরোধী পক্ষ বলেও কিছু থাকবে কিনা, ঠিক সেই অমানিশা মুহূর্তে যুবসমাজ যেন ধারণ করল গত এক দশকে আমাদের যাবতীয় ব্যর্থতার নৈরাশ্যকে, নির্মাণ করতে চাইল এক নতুন চলার পথ। শাসকও কিছুটা বুঝল, যা হচ্ছে তা তাদের পক্ষে মোটে ভালো নয়। ফলে, তারা গোপনে কিছু ভয়-ভীতি দেখানো, ছ্যাঁচড়াদের মতো আরশোলাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা অথবা প্রভাব খাটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া, আরও কত কী করল! কিন্তু এতে যখন চিঁড়ে ভিজল না, তখন ঠিক আছে, দেখা যাক এদের দৌড় কতটা গোছের মনোভাব নিল।

এইভাবে খুব অল্পদিনেই গড়াতে গড়াতে এই মুহূর্তে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি এক সন্ধিক্ষণের উপান্তে। ২০ জুলাই সকাল ন’টায় আরশোলাদের নেতৃত্বে যন্তর মন্তর থেকে শুরু হবে সংসদ অভিযান। সোনমজী’কে পুলিশ তুলে নিয়ে গেলেও তিনি সফদরজং হাসপাতালে এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এক লিখিত বার্তায় চলমান এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সংসদ অভিযানের সার্বিক সাফল্য চেয়েছেন। পাশাপাশি, আইসা’র তরফে নেহা, আমিন, মনীশ ও এসএফআই’এর ঐশী সহ মোট ২১ জন ছাত্র-যুবদের যন্তর মন্তরে অনশন চলছে। আইসা’র অনশন ২১ দিনে পড়েছে বলে খবর। নাগপুর, পুনে, পাটনা, লক্ষ্ণৌ, কলকাতা, শান্তিনিকেতন, সোলান, হায়দ্রাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন শহরেও শুরু হয়ে গেছে ছাত্রদের বিক্ষোভ জমায়েত ও মিছিল বা প্রতীকী অনশন-অবস্থান। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন আমজনতাও। একই সঙ্গে দলে দলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যন্তর মন্তরে এসে হাজির হচ্ছেন ছাত্র-যুব সহ বিভিন্ন বয়সের নাগরিক। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু মানুষ চলেছেন দিল্লি অভিমুখে। 

অনেকদিন পর জাতীয় স্তরে এক গণ আন্দোলন যেন অবয়ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতেই বহু মানুষের মনে পড়বে, ১৯৭৪-৭৫’এ জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে ‘সর্বাত্মক বিপ্লব’এর কথা, অথবা, ২০১১-১২ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না হাজারের ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতের ছবি, কিংবা ২০২০-২১ সালে দিল্লি সীমান্তে মাসের পর মাস লক্ষাধিক কৃষকদের অবস্থান। তবে এবারের গণ উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা খানিকটা ভিন্ন। যদিও আন্দোলনটা শুরু হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে এবং ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে কিন্তু সমাজের বিভিন্ন অংশের জড়িয়ে পড়াটা এতটাই বাস্তব যে তা যন্তর মন্তরে জমায়েতের চরিত্র দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। যদি শিক্ষার্থী মেয়েরা এই আন্দোলনে আসছেন তো তাঁদের মায়েরাও জুড়ে যাচ্ছেন; যদি আইটি সেক্টরের তরুণ দল অফিস শেষে এখানে এসে গলা মেলাচ্ছেন তো নয়ডার শ্রমিকেরাও বাদ যাচ্ছেন না; হরিয়ানা-পঞ্জাব থেকে যদি কিষাণেরা আসছেন তো দিল্লি-ইউপি’র বেকার যুবকেরাও বাদ থাকছেন না। কারণ, দেশের সার্বিক অবক্ষয় এমন স্তরে পৌঁছেছে যেখানে মন্দিরের প্রণামী চুরি থেকে বুলডোজার দিয়ে গরিবের ঘর ভাঙা, হেঁসেলে আগুন, দলিত, সংখ্যালঘুদের উপর একচেটিয়া নৃশংস আক্রমণ, দেশের মানুষের কর্মহীনতা থেকে নিম্ন আয়, শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বত্র দুর্নীতি থেকে ছাত্রদের ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ-- সব ইস্যুগুলিই এক মালার মতো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু অপেক্ষা ছিল এক স্ফুলিঙ্গের। আর সেই সুবাদেই এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে ‘ককরোচ’দের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া ও তাদের জোটবদ্ধতা, যন্তর মন্তরে ধৈর্য ধরে লাগাতার বসে থাকা, সোনম ওয়াংচুকের অনশন, তাঁকে নির্দয় ভাবে পুলিশ কর্তৃক অপহরণ, শাসকের লাগাতার ঔদ্ধত্য, এসআইআর, সংবিধানের অমান্যতা, গণতন্ত্রের সলিল সমাধি সহ জমে ওঠা নানান বঞ্চনা ও অত্যাচার দেশ জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তাতে কোনও একদিন এমনতর প্রতিরোধক জনপ্লাবন তৈরি হওয়া অনিবার্য ছিল। তাইই হয়েছে।

গোদি মিডিয়ার উপেক্ষা ও গালিগালাজকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, কাতারে কাতারে মানুষ পুলিশি নিরাপত্তার তিন বলয় পেরিয়ে গতকাল (১৮ জুলাই) থেকে যন্তর মন্তর চত্বর ভরিয়ে তুলছে। যারা আসছেন, প্রতিজন দু’ দুবার সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরবন্দী হচ্ছেন, মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে তাঁদের প্রবেশ করতে হচ্ছে, তারপরে পুলিশ আবার জনে জনে শরীরী তল্লাশি নিয়ে তবে ছাড়ছে। যেন ভিন দেশের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপার হচ্ছে। এই ভয় কীসের? কেন? তবুও, পুলিশের রেকর্ডে নজরবন্দী হয়েও নির্ভয়ে, দ্বিধাহীন চিত্তে তরুণ থেকে বয়স্কজনেরা এই মহাসম্মেলনে ভীড় করছেন। এইখানেই এই আন্দোলনের সব থেকে বড় হিম্মৎ। অনেক দিন পর দেশের মানুষের কন্ঠস্বর ও দাবি সমস্ত ভয়-ভীতিকে চুরমার করে খোলামেলা আন্দোলিত হতে চাইছে। ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত বিরোধী দলের নেতারা একে একে মঞ্চে এসে বক্তব্য রেখে গেছেন।

খেয়াল করুন, সময়ানুযায়ী আজ ১৯ জুলাই রাতে (ঘড়ি মোতাবেক ২০ জুলাই 12:30 am) বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। সারা বিশ্ব জুড়ে এই উন্মাদনার (বিশেষ করে তরুণদের) মাঝে দেশের GenZদের এক বড় অংশ কিন্তু সেই ফুটবল মাতোয়ারা খানিকটা ছেড়ে (এটা কিন্তু কম কথা নয়) আমাদের এই মহা দুর্দিনে এক অন্যতর শপথ নিয়েছেন: দায়বদ্ধতা। হ্যাঁ, দেশের নেতা-মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতা রাখতে হবে। যদি তাদের বা দফতরের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অংশগ্রহণে দেশ-বিরোধী বা জনগণ-বিরোধী কোনও অপকর্ম হয়ে থাকে, তাহলে সেই মন্ত্রী ও আধিকারিকদের দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাদের বিদায় দিতে হবে। পাশাপাশি এ কথাও উঠেছে, দেশের সংবিধানের শপথ-- ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে লঙ্ঘন করা যাবে না। উত্তরপ্রদেশের দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০ জুলাই লক্ষাধিক মানুষের ঐতিহাসিক সংসদ যাত্রা এক নতুন ভারত নির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। ২১ জুলাই থেকে দেশ বদলাতে থাকবে— অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে পুনরায় তার যাত্রা শুরু হবে।

রাত পোহালেই ২০ জুলাই। আমরা জানি না, রাতে শাসকের কী পরিকল্পনা আছে। অথবা, রাতটুকু নির্বিঘ্নে কেটে গেলেও কাল সকালে কী প্রতীক্ষা করছে। এই মুহূর্তে সোনম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দিপকে, নেহা, আমিন, মনীশ প্রত্যেকে জীবন-সংশয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। সংসদ অভিযান কীভাবে দেশের বর্তমান ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে মোড় ঘোরাতে পারে তা দেখার; কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব থেকে নয়, সঙ্গে এসে মিলেমিশে। এই এখন চলার পথ।  


Friday, 17 July 2026

মানুষ আসলে 'অভিবাসী'

'নথি'র চেয়ে মানুষ বড় 

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়



আজ আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলব তা শুধু রাজনীতির নয়, সিনেমারও। কারণ, সিনেমা মানেই তো বিষয়কে ফ্রেমে বাঁধা। আর রাষ্ট্রও আজকাল মানুষকে নথিতে বাঁধছে। দুটো প্রক্রিয়াই আসলে একই প্রশ্ন করে: কাকে দেখা হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে!

রাষ্ট্রের প্রধান কাজ এখন দুটো। এক, মানুষকে নথিতে বেঁধে ফেলা, আর দুই, ক্ষমতাকে রোজকার ভাষার অংশ করে দেওয়া। প্রথমটা দেখা যায় ফাইলে, দ্বিতীয়টা দেখা যায় সংলাপে বা ব্যবহারিক ভাষার কালচারে। তখনই রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়। নীতি-আদর্শের তর্ক কমে। জায়গা নেয় সন্দেহ আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। ভারতবর্ষে গত কয়েক বছরে এই বিষক্রিয়া আমরা দুই দিকেই দেখছি। শাসক ক্ষমতার জোরে অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে বিরোধীদের বাঁধছে। আর বিরোধীরাও তাদের কৌলিন্য হারিয়ে সেই একই দুর্নীতির যন্ত্র হয়ে উঠছে। ফলে, কোথাও ক্ষমতায় তারা ছোট অংশ পেলেও, সেখানেও একই ক্ষয় শুরু হয়, যার খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। ভোটের সময় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এই ক্ষয় নিয়ে নিরুত্তাপ। এটাই নয়া-ফ্যাসিজমের সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের খোলস থাকে, অন্দরে মানুষের জায়গা ছোট হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই আসে ভোটার তালিকার সংশোধনের কথা। আগে যা ছিল নিয়মিত সংশোধন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাসের পর মাস ধরে যাচাই; আর আইন মোতাবেক, বিশেষ নিবিড় সংশোধন হত সেই সব এলাকায় যা হয়তো দাঙ্গা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বস্ত। ২০২৫-এর অক্টোবরে যখন দেশ জুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হল, প্রশ্ন উঠল: রুটিন কাজে 'জরুরি' পদ্ধতি কেন?

বিহারে ভোটার তালিকার খসড়া থেকেই প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গেল। কারণ, মৃত্যু, স্থানান্তর, ডুপ্লিকেট। চূড়ান্ত তালিকায় সংখ্যা কমল। কিন্তু এক মাস সময় আর কাগজের শর্ত নিয়ে আপত্তি উঠল। কর্নাটক-তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভোটাধিকার খর্বের আশঙ্কায় প্রতিবাদ করলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও  তাই বললেন। সিপিআইএম নেতৃবৃন্দ বাংলাভাষী মানেই সন্দেহ করা যাবে না, বললেন। কেন্দ্র সরকার  বলল, এটা শুদ্ধিকরণ। একই বয়ান নির্বাচন কমিশনেরও।

এখানেই রাজনীতির আসল খেলা। যখন লক্ষ লক্ষ নাম 'বিচারাধীন' ফাইলে পড়ে, তখন সেটা 'শুদ্ধি' নাকি 'বাদ'? এরই ফাঁক দিয়ে রাজনৈতিক বয়ানে ঢোকে 'অনুপ্রবেশকারী', 'রোহিঙ্গা'। এগুলো আইনি শব্দ নয়, লেবেল; যা লাগিয়ে দিলে মানুষটা আর নাগরিক থাকে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ বলছে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানরা আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে আটকায় কাগজে। জন্মের শংসাপত্র, স্কুলের রেকর্ড, জমির দলিল সবার কাছে নেই। ADR (Association for Democratic Reforms)-এর পর্যবেক্ষণ, বিশেষ এসআইআর'এ আধার গ্রাহ্য নয়। অথচ কোটি মানুষের কাছে আধারই একমাত্র পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭-এর পর আসা উদ্বাস্তু, মতুয়া সম্প্রদায়, আন্দামান-ছত্তিশগড়ে পুনর্বাসিত মানুষের ফাইল এই বিতর্কের মধ্যেই পড়ে। তাদের পূর্বপুরুষ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই ঘর ছেড়েছিলেন। দেশভাগের সেই যন্ত্রণা বাঙালির যৌথ স্মৃতি। এখন সেই রাষ্ট্রই যদি বলে, 'প্রমাণ করো তুমি এ দেশের', তাহলে সেই স্মৃতি অস্বীকৃত হয়।

মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট ১৯৩৫ সালে 'সভ্যতার কাহিনি' প্রথম খণ্ডে লিখেছিলেন, সভ্যতার শুরুই হয়েছে মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমনের মধ্য দিয়ে। পোলিশ-ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ট বাউম্যান ১৯৯৮ সালে 'বিশ্বায়ন: মানবিক পরিণতি' বইতে বলেন, 'আধুনিক মানুষ স্থির নাগরিক নয়, সে পর্যটক ও উদ্বাস্তুর মাঝামাঝি'। ইতিহাসবিদ,দার্শনিক ও সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সঈদ ২০০০ সালে 'রিফ্লেকশনস্ অন এক্সাইল' প্রবন্ধে  বলেন, 'নির্বাসন শুধু জায়গা বদল নয়, রাজনৈতিক অবস্থা। নির্বাসিত মানুষ নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না।' 

১৯৪৭ ছিল আমাদের দেশে উপমহাদেশের বৃহত্তম গণ-অভিবাসন। তাই কাউকে 'বহিরাগত' বলা মানে সেই স্মৃতিকে মুছে দেওয়া। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ২০০৪ সালে 'পলিটিক্স অফ দ্য গভার্ন্ড' বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে একে বলেছিলেন 'রাজনৈতিক সমাজ'। তাঁর মতে, ভারতে মানুষ শুধু ভোটার নয়। তাদের পাড়া আছে, জীবিকা আছে। রাষ্ট্র যখন বারবার কাগজ চায়, সেই জীবনটাই যেন অবৈধ হয়ে যায়। সবই 'ক্ষমতা'র রূপ! ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ১৯৭৬ সালে 'যৌনতার ইতিহাস'এর প্রথম খণ্ডের পঞ্চম অংশে 'বায়োপাওয়ার' বা জৈব-ক্ষমতার কথা বলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপ বদলেছে। প্রাচীন সার্বভৌম শক্তির কাজ ছিল 'মৃত্যু অথবা বাঁচতে দেওয়া', কিন্তু বায়োপাওয়ারের মূল লক্ষ্য হল, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, জন্মহার, মৃত্যুহার ও আয়ুষ্কালের মতো বিষয়গুলোকে তদারকি করে জীবনকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও লালনপালন করা । রাষ্ট্র যখন পুরো মানবজীবনকে নিজের রাজনৈতিক কৌশলের অধীনে নিয়ে আসে, তখন তাকেই বায়োপাওয়ার বা জৈব-ক্ষমতা বলা হয়। তাই আদমশুমারি, স্বাস্থ্য, ভোটার তালিকা, ডেটা দিয়ে ঠিক হয় কে ভোট দেবে, কে ভাতা পাবে, কে সন্দেহজনক— সব ঠিক হয় অফিস ঘরে। ইতালিয়ান চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি ১৯২৯-৩৫ সালে জেলে বসে 'জেলখানার ডায়েরি'-এর ১২ ও ১৩ নম্বর নোটবুকে লেখেন, আধিপত্য টেঁকে সম্মতিতে। ভয় আর বিভাজনকে যখন 'জাতীয় স্বার্থ' বলা হয়, মানুষ নিজেই শৃঙ্খল পরে।

এই নথি ও ক্ষমতার সম্পর্কটা আমরা সবচেয়ে ভালো বুঝি গল্পে। সিনেমাই রাষ্ট্রের মুখটা সবচেয়ে স্পষ্ট করে দেখায়। তাই আমি চারটে ছবি রাখছি। চার মহাদেশ, চার সময়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র কি মানুষকে রক্ষা করছে, না পরিচালনা করছে?

ডারসু উজালা, আকিরা কুরোসাওয়া, ১৯৭৫

ডারসু সাইবেরিয়া জঙ্গলের শিকারি। তার পাসপোর্ট নেই। প্রকৃতিই তার আইন। শহরের অফিসার তাকে সভ্য করতে চায়। পারে না। ডারসু শহরের নিয়মে টেঁকে না। এই ছবি বলে, রাষ্ট্র যখন সবকিছু মাপতে চায়, স্বাধীন অস্তিত্বই বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।

অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম, কোস্তা গাভরাস, ২০১৯ 

২০১৫-র গ্রিস। গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ বলল 'না'। কিন্তু সরকার সেই 'না'-কেই মানল না। কারণ, আন্তর্জাতিক অর্থের কাঠামো অন্য কথা বলছিল। 'না' টা কী ছিল?

২০১৫ সালের ৫ জুলাই গ্রিসে একটা গণভোট হয়েছিল। গণভোটের প্রশ্ন ছিল: 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক আর আইএমএফ যে কঠোর ঋণ শর্ত দিচ্ছে, গ্রিস কি সেটা মেনে নেবে?' সেই শর্তগুলো ছিল: পেনশন কমানো, ট্যাক্স বাড়ানো, সরকারি চাকরি ছাঁটাই। গ্রিসের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস মানুষকে বললেন: 'এই শর্তে না বলুন'। ফলাফল কী হল? ৬২ শতাংশ মানুষ ভোট দিল 'না'। অর্থাৎ, তারা বলল, আমরা এই কঠোরতা মানব না। কিন্তু তার এক সপ্তাহের মধ্যেই কী ঘটল? সিপ্রাস সরকার সেই 'না'কে অগ্রাহ্য করে ইউরোপের কাছ থেকে আরও কঠোর শর্তেই ঋণ নিল। মানুষের ভোটের রায়কে বাঁচানোর জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা বাঁচাতে হল।

কস্তা গাভরাস দেখাচ্ছেন, গণতন্ত্রে মানুষের রায় থাকলেও আসল ক্ষমতা থাকে আন্তর্জাতিক অর্থ, ব্যাংক আর ঋণের কাঠামোর হাতে। মানুষ বলল 'না', কিন্তু সিস্টেম বলল 'হ্যাঁ' করতেই হবে। গণতান্ত্রিক রায় কীভাবে কাঠামোর কাছে হারে, এই ছবি তার দলিল।

প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্যজিৎ রায়, ১৯৭০ 

কলকাতার শিক্ষিত, বেকার ছেলে সিদ্ধার্থের ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রশ্ন তার জীবনের সঙ্গে মেলে না। সে উত্তর দিতে পারে না, কারণ, ব্যবস্থাটাই তার ভাষা বোঝে না। ৫৫ বছর আগের ছবি। নিয়মের সঙ্গে না মিললেই মানুষ অপ্রাসঙ্গিক।

আই, ড্যানিয়েল ব্লেক, কেন লোচ, ২০১৬

ব্রিটেনের ছুতোর। অসুস্থ। সরকারি ভাতার অনলাইন ফর্ম ভরতে পারে না। নিয়মের জটে সে অস্তিত্বহীন। কাউন্টারে কেউ তাকে মানুষ দেখে না, দেখে ফাইল। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের লাইনের সঙ্গে এই ড্যানিয়েলের ফারাক কতটুকু?

চারটে ছবি একই কথা বলছে। 'নথি' না থাকলে রাষ্ট্র দেখে না। কাঠামো না মানলে গণতন্ত্র টেঁকে না। মানুষ যখন 'সংখ্যা' হয়ে যায়, রাজনীতির মৃত্যু ঘটে। বিশ্ব জুড়েও একই ছবি। সব জায়গায় নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ। এর থেকে বেরনোর পথ নিয়ে যদি ভাবতে হয় তবে প্রথমেই আসে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার কথা। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ না হলে নিয়মই নাগরিক দমনের অস্ত্র। দুই, নাগরিকত্ব কাগজ নয়, মর্যাদার প্রশ্ন। তিন পুরুষ ধরে যে মাটিতে আছে তাকে বারবার প্রমাণ দিতে বলা যায় না। তিন, রাজনীতির ভাষ্য ফেরানো। 'ওরা বনাম আমরা' নয়, গণতন্ত্রের শক্তি তর্কে, ফ্যাসিবাদের শক্তি নীরবতায়। আজকের সংকট নৈরাজ্যের নয়। এটা দমন-ভাষার এক ঠাণ্ডা অথচ নতুন শৃঙ্খলা। এখানে নাগরিক মানে ডেটা, ভোটার মানে সংখ্যা, প্রতিবাদ মানে কেস ফাইল। মানুষের কান্না, রাগ, স্বপ্ন— এগুলোর জন্য কলাম নেই।

'ডারসু' শেখায় সম্পর্ক। 'অ্যাডাল্টস ইন দ্য রুম' দেখায় কাঠামোর নিষ্ঠুরতা। 'প্রতিদ্বন্দ্বী' বলে বঞ্চনা। ড্যানিয়েল ব্লেক দেখায় রাষ্ট্রের স্বার্থপর উদাসীনতা। তাই, যখন 'নথি'র চেয়ে মানুষ বড় হবে তখনই মুক্তি। কারণ, মানুষ আসলে 'অভিবাসী'। আর গণতন্ত্রের মালিকও মানুষই। 'নথি' নয়।


Monday, 13 July 2026

বদলাচ্ছে না, বদলে গেছে!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রলয়ে অর্থনৈতিক মহাবিপ্লব

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক মানব ইতিহাসের তীব্রতম অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সাক্ষী। ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প, খনিজ সম্পদ বা স্পর্শক উৎপাদন খাতকে বহু পিছনে ফেলে প্রধান পরিসরটি দখল করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক শিল্প। চলতি আর্থিক বছরগুলির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিমাণ বার্ষিক ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি স্পর্শ করেছে। এনভিডিয়া (Nvidia), মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic)’এর মতো প্রযুক্তি দৈত্যদের সম্মিলিত বাজার মূল্য বিশ্বের প্রধান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর জিডিপি’কেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা ও জেনারেটিভ এআই মডেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম মাত্র কয়েক বছরে কয়েকশো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে পুঁজির এই তীব্র সমাগম প্রমাণ করে যে, ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একমাত্র লাভজনক পরিসর হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বুঝছে। এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন এ তাবৎকালের অর্থনীতির সমস্ত ধ্রুপদী ভাবনা, শ্রম-পুঁজি সমীকরণ ও প্রথাগত বৃদ্ধি-মডেলকে সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল করে দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ শুধু যান্ত্রিক ক্রিয়ামাত্র নয়, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীল ও প্রশাসনিক কাজের ভারও নিখুঁতভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। ব্যাঙ্কিং, আইনি পরামর্শ, কোডিং, কনটেন্ট তৈরি, গ্রাহক সেবা থেকে শুরু করে জটিল চিকিৎসা বিশ্লেষণের সিংহভাগই এখন এআই-এজেন্ট দ্বারা পরিচালিত। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষ রাতারাতি কাজ হারাচ্ছে। কারণ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মানবসম্পদের পেছনে ব্যয় সংকোচন হেতু অতি-উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগে মেতে উঠেছে। অবশ্য পাশাপাশি, এই ধ্বংসস্তূপের ওপর কিছু নতুন কাজেরও সৃষ্টি হচ্ছে, তবে তা কোনও স্থায়ী বা স্থিতিশীল কর্মসংস্থান নয়। এই নতুন কাজগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়ক— যেমন, 'প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং', 'ডেটা অ্যানোটেশন' বা নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের ত্রুটি সংশোধন (Debugging) ইত্যাদি। এই কাজগুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত (Highly Specialised) এবং বিশেষ মেধার দাবিদার হলেও এগুলোর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্যই— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত দ্রুত নিজেকে উন্নত করছে, এই সহায়ক কাজগুলোর প্রয়োজনীয়তাও তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে, নতুন সৃষ্টি হওয়া কর্মসংস্থান কর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী চাকুরির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ।

কাজের বাজারের এই তীব্র রূপান্তর শ্রমের ভুবনকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর করে তুলেছে। আজ যে দক্ষতা অর্জনের জন্য একজন তরুণ কয়েক বছর ব্যয় করছে, শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই সেই দক্ষতাটি নবতর প্রযুক্তির কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। সব কিছু এত ক্ষিপ্র গতিতে ও আকস্মিকভাবে ঘটছে যে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চলতে পারছে না। কারণ, আমাদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিল্প বিপ্লবের যুগের সমগোত্রীয় শ্রমিক ও কর্মী তৈরির ছাঁচে গঠিত। চার বছরের একটি ডিগ্রি বা প্রথাগত পাঠক্রম আজ বাজারের তাৎক্ষণিক চাহিদার তুলনায় প্রায় এক দশক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে গতিতে তাদের সিলেবাস পরিবর্তন করে, প্রযুক্তি তার চেয়ে হাজার গুণ দ্রুত গতিতে বিবর্তিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে এবং ডিগ্রিধারী লাখ লাখ তরুণ এক চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পতিত হচ্ছে, যা শ্রমের বাজারে এক গভীর শূন্যতা ও কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে।

কাজের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ভিত্তির এই আকস্মিক ভাঙন কেবল বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়ছে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও। কাজের অভাব মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং সমাজে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একদিকে মুষ্টিমেয় প্রযুক্তি-পুঁজির মালিকদের উপচে পড়া সম্পদ, অন্যদিকে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎহীনতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক গভীর হতাশা, বিষাদগ্রস্ততা ও আত্মঘাতী প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। সমাজে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে, ডিজিটাল অপরাধ ও পারিবারিক হিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ এক গভীর নৈরাজ্যের মুখোমুখি, যেখানে পুরনো সামাজিক নিয়মগুলো ভেঙে পড়ছে কিন্তু কোনও নতুন সুসংহত সামাজিক ভরসা গড়ে উঠছে না। এই আচম্বিত ও অযাচিত নতুন সমস্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও দিশেহারা।

আমরা দেখেছি, যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্বের সংকটে ভোগে এবং অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন অবচেতনভাবেই তাদের মনে এক ধরনের আদিম ভয় ও অতি-রক্ষণশীল মানসিকতা জন্ম নেয়। এই সামগ্রিক আবহে মানুষ নিজের দুর্দশার প্রকৃত কারণ বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ত্রুটিকে না বুঝে বোধবুদ্ধি হারিয়ে তাৎক্ষণিক ফল লাভের আশায় অযৌক্তিক ভাবনার ফাঁদে পড়ে প্রায়-পাগলদশায় নিমজ্জিত হয়। ফলে, এক বড় অংশের মানুষ মনে করতে থাকে যে, তার এই চরম সংকটের জন্য তার চারপাশের অন্য কোনও ‘অচেনা’ পরিসরের মানুষেরাই দায়ী— যেমন, অভিবাসী শ্রমিক, ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ বা প্রান্তিক জাতির লোকজন। তারা মনে করে, এই 'অন্যরা' এসে তাদের যাপনে ও রুটি-রুজিতে ভাগ বসাচ্ছে। আর এই তীব্র নৈরাশ্য থেকে উদগত মনস্তাত্ত্বিক ভয়, অন্ধ ক্ষোভ ও পারস্পরিক ঘৃণাকেই সুচতুরভাবে কাজে লাগিয়ে দেশে দেশে শক্তিশালী হচ্ছে ফ্যাসিস্ট ও উগ্র-মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলি। তারা সুচতুর ভাবে এই অসহায়তা ও বিভাজন ভাবনাকে চাগিয়ে তুলছে (সোশ্যাল মিডিয়ার ফেক খবর ও মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার পক্ষপাতদুষ্টতায় যা সম্ভবও হচ্ছে) এবং বর্ণবাদী, ধর্মবাদী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করছে। এই ঘৃণার রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা ক্ষমতা দখল করে (বেশ কিছু দেশে করেওছে) বিদ্বেষ ও বিভাজন-কেন্দ্রিক এক স্থায়ী মতান্ধ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা প্রকৃত সংকটকে আড়াল করে সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণকে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

তাই বলে বিশ্ব তো এভাবে একবগগা হানাহানির নিয়মে দিনের পর দিন চলতে পারে না। অতএব, এই মহাসংকট থেকে নিষ্কৃতির কিছু বাস্তবোচিত রাস্তাও নির্মিত হচ্ছে। যখন দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগুয়ান প্রলয়ে বিপুল ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা প্রকারান্তরে বিলীন, তখন পথ হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জারিত সুবিশাল উদ্বৃত্তের ওপর শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে সুনিশ্চিত করা। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবশ্যম্ভাবী প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে কোনওভাবেই অস্বীকার না করে, বরং তাকে সানন্দে স্বাগত জানিয়ে, তার দ্বারা উৎসারিত যে বিপুল উৎপাদনশীলতা ও উপচে পড়া উদ্বৃত্ত-প্রবাহ, তার উপর যদি সর্বসাধারণের আইনি অধিকার কায়েম করা যায়, তবে মানুষকে আর বেঁচে থাকার জন্য বাধ্যত দৈনিক ৮-১৬ ঘণ্টা মজুরি-দাসত্ব করতে হয় না। সেই সুবাদে সূত্রপাত গোছের একটি উপায় হিসেবে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে এই আইনি অধিকার প্রণয়ন করার চল হয়েছে— যেমন, ব্রাজিলে ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’, মেক্সিকো’তে ‘প্রোগ্রেসা’ অথবা, আলাস্কা’তে ‘পার্মানেন্ট ফান্ড ডিভিডেন্ড’, এমনকি ইরান, কেনিয়া, লাইবেরিয়াতেও এমন নানাবিধ প্রকল্প বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সবিশেষ উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘যুবসাথী’ ইত্যাদি এবং তামিলনাড়ুতেও এই ধরনের নগদ হস্তান্তরের প্রকল্প বিশ্বের মর্যাদা কুড়িয়েছে ও অনুসরণযোগ্য পথ হিসেবে গ্রহণীয় হয়েছে; যদিচ, ইদানীং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের’ নাম পরিবর্তন ও উপভোক্তাদের তালিকা কাটছাঁটের ফলে এই প্রকল্পটি আপাতত সর্বজনীন চরিত্র হারিয়ে কিছুটা বিশ বাঁও জলে এবং পরিণতিস্বরূপ জেলায় জেলায় চলছে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ। বহু দেশে অবশ্য এখনও নগদ হস্তান্তরের প্রকল্প চালু না হলেও বিভিন্ন সরকারি পরিষেবার মাধ্যমেও মানুষের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ (প্রকারান্তরে, আয় বৃদ্ধি) বেশ স্পষ্ট। নিউ ইয়র্ক শহরের কর্পোরেশন এমনতর পরিষেবার জন্য যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

বলাই বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও বিশ্বের অন্যত্র, এই যে নগদ হস্তান্তরের উদ্যোগগুলিকে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)’এর পাইলট প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা হয়, সেগুলো আসলে ভবিষ্যতের 'Universal High Income' (UHI) বা সর্বজনীন উচ্চ আয়ের প্রাথমিক ভ্রূণ বা ল্যাবরেটরি টেস্ট। আগেই বলেছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ যখন উৎপাদন ব্যবস্থাকে মানুষের শ্রম ব্যতিরেকেই 'অতি-উৎপাদনশীল' করে তুলবে, রাষ্ট্রের উদ্বৃত্তের পরিমাণ হবে কল্পনাতীত। তাই বলাই যায়, আজকের এই কল্যাণমুখি নগদ হস্তান্তরের প্রকল্পগুলো কোনও সাময়িক দয়া বা খয়রাতি নয়, বরং মজুরি-দাসত্ব থেকে মুক্তিস্বরূপ 'সর্বজনীন উচ্চ আয়ের' যুগে পদার্পণ করার প্রথম সোপান।

প্রশ্ন হল, এই অকল্পনীয় প্রযুক্তিগত তথা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাতে কেকের ভাগ নিয়ে ধর্ম-বর্ণ-জাতি ভিত্তিক বিদ্বেষমূলক রাজনীতির ঘৃণ্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে তৎপ্রসূত রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিসরে আমজনতাকে স্বস্তির আয় জোগানো— কোনটা পথ? প্রথম পথটি ফ্যাসিস্ট ও মতান্ধদের, যারা চায় ভিন্ন গোষ্ঠীর নির্মূলিকরণ, দ্বিতীয় পথটি গণতান্ত্রিক সমাজবাদের যারা সকল বৈচিত্র্যকে ধারণ করে এক উদার সমাজবাদী অর্থনীতি নির্মাণে ব্রতী। 

যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জারিত অফুরন্ত উদ্বৃত্তের ওপর ভিত্তি করে সমাজ মানুষের মানসম্পন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রার সর্বাত্মক ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারবে, মানুষ তখন কেবল জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বা ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্যত কোনও অসহায় যন্ত্রের মতো কাজ করবে না। কাজ হবে ব্যক্তির সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছাধীন, সৃজনশীল ও আত্মবিকাশের মাধ্যম। মানুষের তখন আর জীবনধারণের দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রজনী যাপনের কোনও কারণ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজনৈতিক অর্থনীতি এই ধারণাকে পূর্ণাঙ্গ রূপে বাস্তবায়িত করতে পারে।