Saturday, 16 January 2021

কৃষক জিতলে দেশ জিতবে

আদালতের সাময়িক স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য


কোম্পানি রাজের স্বার্থে কৃষকের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দিল্লী সীমান্তে কৃষকের অবস্থান আন্দোলন প্রায় পঞ্চাশ দিন পেরিয়ে এল। এর মধ্যে সরকারের সাথে কয়েক দফা কৃষক নেতাদের বৈঠক হয়েছে। এই সব ব্যর্থ বৈঠকের মধ্য দিয়ে একটাই বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। সরকার এই কৃষক প্রতিরোধের ফলে যথেষ্ট কোণঠাসা এবং লাঠি-গুলি চালিয়ে এই আন্দোলনকে দমন করার বিকল্প এই মুহূর্তে বিজেপির মতো চূড়ান্ত দমনকারী সরকারের কাছেও খোলা নেই। তাই আলাপ আলোচনার একটা ভান বজায় রাখা আর অপেক্ষা করা কবে কৃষক ধৈর্য হারাবে বা ক্লান্ত হয়ে পড়বে, কবে কৃষকের ঐক্যে ফাটল ধরবে, মনোবলে টান পড়বে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সরকারের সে গুড়ে বালি।

সরকারের হয়ে এবার মাঠে নেমেছে সর্বোচ্চ আদালত। সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করে কোর্ট বলেছে, এ স্থগিতাদেশ কৃষি আইনের উপর নয়, কৃষি আইনের বাস্তবায়নের উপর। কিন্তু এই স্থগিতাদেশের সাথে আদালত এটাও বলেছে যে এই পর্যায়ে পুরনো ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রণালী জারি থাকবে আর এই আইনের ফলশ্রুতি হিসেবে কোনও কৃষকই জমি হারাবে না। তবে সরকার যে বলছিল নতুন আইনের সাথে এমএসপি'র কোনও সম্পর্ক নেই, আর পুরো ব্যাপারটাই নিছক ফসল সংক্রান্ত, জমি হারাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না? কোর্টের এই স্পষ্টিকরণে সরকারের বক্তব্য আরও সন্দেহজনক হয়ে উঠল না কি?

কোনও আইন সংবিধানসম্মত কিনা তা বিচার করার এক্তিয়ার অবশ্যই সর্বোচ্চ আদালতের রয়েছে। কিন্তু স্থগিতাদেশে আইন সম্পর্কে কোনও কথাই বলেনি সুপ্রিম কোর্ট। পুরো আদেশটাই এসেছে সরকার ও আন্দোলনরত কৃষকদের মধ্যে বর্তমান সংঘাতে যবনিকাপাত কী করে ঘটানো যায় সেই প্রচেষ্টা থেকে। সরকারের বদলে কৃষকদের বলা হল কোর্ট কর্তৃক ঘোষিত চার সদস্যের কমিটির কাছে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরতে। কমিটিকে বলা হল দু' মাসের মধ্যে কোর্টের কাছে আলোচনার রিপোর্ট পেশ করতে। অর্থাৎ, বল এখন কমিটি ও কোর্টের কোর্টে। সরকার যেভাবে পুঁজিপতিদের ঋণ মকুব করে দেয়, সেভাবেই কোর্ট কি এবার সরকারের দায়িত্ব মকুব করে দিল?

কোনও আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার যদি জনগণের বিরোধিতার সম্মুখীন হয় তাহলে সেই বিরোধ মোকাবিলার দায়িত্ব সেই সরকারেরই। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের কথাবার্তা যদি আটকে যায় তাহলে সেই কথাবার্তাকে ফলপ্রসূ করানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া যেতেই পারে, কিন্তু সরকারকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে পুরো ব্যাপারটা আদালতের নিজের হাতে তুলে নেওয়াটা কি আদৌ সংবিধানসম্মত? সরকার, সংসদ ও আদালত- এই তিন স্তম্ভের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের যে সুষ্ঠু বন্টনের উপর ভিত্তি করে সংবিধান মেনে গণতন্ত্র পরিচালিত হওয়ার কথা, সেই মূল ব্যাপারটাই কি সুপ্রিম কোর্ট এবার গুলিয়ে দিতে শুরু করেছে?

সুপ্রিম কোর্ট কৃষকদের বলেছে সাময়িক স্থগিতাদেশ ও কমিটি গঠনকেই প্রতিবাদের জয় হিসেবে মেনে নিতে। মোদী সরকার বলছে কৃষকেরা আইন না বুঝে নাকি বিভ্রান্ত হয়ে প্রতিবাদে নেমেছে। তাই আলোচনার নামে কৃষকদের ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকারের মন্ত্রীরা। এবার ক্লাস শুরু হল আন্দোলন নিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট চায় না মহিলা, বৃদ্ধ ও শিশুরা অবস্থান আন্দোলনে অংশ নিক। এক উকিল যিনি বলেছিলেন, নির্ভয়ার মার কাছে জানতে চাওয়া উচিত অত রাতে মেয়ে দিল্লীর রাস্তায় কী করছিল; বলেছিলেন, নিজের মেয়ে বা বোনের প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কের খবর পেলে পুরো পরিবারের সামনে নিজের খামারবাড়িতে পেট্রোল ঢেলে তাকে পুড়িয়ে মারবেন, এবার তিনি সুপ্রিম কোর্টকে জানালেন যে তাঁর মক্কেল কৃষক সংগঠন নাকি কথা দিয়েছে যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সবাই বাড়ি ফিরে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে ধন্যবাদ জানালেও সংশ্লিষ্ট কৃষক সংগঠনটি এই তথ্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। কৃষকেরা এবার ১৮ জানুয়ারি গোটা দেশ জুড়ে কৃষক রমণীদের প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন। 

সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি হল চার সদস্যের নবগঠিত কমিটি। যে চার জন সদস্যকে কোর্ট বেছে নিয়েছে তাদের দুজনের পরিচয় কৃষি অর্থশাস্ত্রী হিসেবে আর অন্য দুজন হলেন দুই কৃষক সংগঠনের নেতা। কিন্তু এঁদের সকলের সাধারণ পরিচয় হল এঁরা মোদী সরকারের কৃষি নীতি ও নতুন কৃষি আইনের কট্টর সমর্থক। কমিটির প্রথম বৈঠক এখনও হয়নি, কিন্তু কমিটির একজন মনোনীত সদস্য বিবৃতি দিয়ে কমিটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। ভূপিন্দার সিং মান'এর এই সরে আসা নিছক তথ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিবৃতিটিও যথেষ্ট অর্থবহ। মান বলেছেন, তিনি এমন কিছু করতে চান না যাতে কৃষক এবং পাঞ্জাবের স্বার্থ বিপন্ন হয়। নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার সাথে সাথে কমিটি সম্পর্কেও এই মন্তব্য যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। 

মান'এর এই মন্তব্যকে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি মন্ত্রী নীতিন গডকারির সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের সাথে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার 'আইডিয়া এক্সচেঞ্জ' শীর্ষক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে গডকারির বক্তব্য খুব স্পষ্ট। তাঁর মতে, মূল সমস্যা হল ভারতে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং বাজার দরের চেয়ে বেশি এমএসপি। ফলে, সরকারের কাছে সমাধান সূত্র হল খাদ্যশস্য উৎপাদন কমিয়ে এনে জৈব ইন্ধন উৎপাদনে জোর বাড়ানো। সোজা কথায়, ধান গম চাষের বদলে ইথনল উৎপাদনে মনোযোগী হওয়া। কৃষক যখন কোম্পানির ইচ্ছে, হিসেব এবং নির্দেশ মতো চুক্তিচাষীতে পরিণত হবে তখন কৃষির চরিত্র কী হবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ এই ইশারা।

কৃষি আইনের ঘোষিত উদ্দেশ্য কৃষককে স্বাধীনতা দেওয়া, কৃষকের আয় বাড়ানো। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের একদা বহু প্রশংসিত ঘাঁটি পাঞ্জাবের অভিজ্ঞ কৃষকের গডকারির ঐ 'আসল কথা' বুঝতে অসুবিধে হয়নি। কৃষিতে আদানি আম্বানির কোম্পানি রাজ প্রতিষ্ঠা মানে কৃষকের শেষ স্বাধীনতাটুকু কেড়ে নিয়ে তাকে কোম্পানির ভাড়াটে বানিয়ে দেওয়া। মূল্য নির্ধারণ ও শস্য ক্রয়ের প্রক্রিয়া থেকে সরকারের সরে যাওয়া মানে কৃষকের ইচ্ছে মতো মূল্য নির্ধারণ ও শস্য বিক্রয় নয়, বাজারের নিয়ম অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ ও কেনাবেচা। আর গডকারি ঠিকই বলেছেন, বাজারের দাম এমএসপি বা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সমর্থন মূল্য থেকে গড়ে যথেষ্ট কম। যে বাজারে কোম্পানি ক্রেতা আর কৃষক বিক্রেতা সেখানে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে বাজার বিক্রেতা নয়, ক্রেতার কথাতেই চলবে। আর তাই পাঞ্জাবের পোড় খাওয়া কৃষক 'স্বাধীনতা ও আয় বৃদ্ধির' ছেঁদো প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিতে নারাজ।

ভারতীয় কৃষিতে আজ পর্যন্ত চোখে পড়ার মতো সাফল্য বলতে সবুজ বিপ্লবের কথাই আলোচিত হয়েছে। আর স্বাধীন ভারতে আত্মনির্ভরতার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বলতে আমেরিকার গমের উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠা। এই কৃতিত্বের মূলে পাঞ্জাব। সবুজ বিপ্লবের মডেল আজ অবশ্যই গভীর সংকটে - প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনতি, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান কৃষি খরচ, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানাবিধ বিপদ সংকেত কৃষি বিকাশের নতুন মডেলের দাবি জানাচ্ছে। মোদী সরকারের নয়া কৃষি আইনে এই বিকল্প পথের অনুসন্ধানের লেশমাত্র নেই। যা আছে তা হল কৃষিকে বৃহৎ ব্যবসায় রূপান্তরিত করার মরিয়া প্রচেষ্টা। তার ফলে আদানি আম্বানির মুনাফার পাহাড় আরও উঁচু হবে, আর খাদ্যশস্যের ব্যাপারে আমরা হয়তো আবার আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ব। ক্ষুধার প্রতিযোগিতায় ভারত হয়তো আরও কয়েক ধাপ নীচে নেমে যাবে। কৃষির সঙ্গে যুক্ত ব্যাপক জনগণের দারিদ্র্য হয়ে উঠবে গভীরতর। 

তাই দিল্লী সীমান্তের কৃষকের আন্দোলন আজ আর রাজধানীর সীমানায় আটকে নেই। সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে বাঁচাতে ও কৃষক আন্দোলনকে ঠেকাতে যাই ফন্দি আঁটুক, দেশের ব্যাপক মানুষ আজ কৃষকের সাথে; কোম্পানি রাজের বিরুদ্ধে, কৃষকের সাথে; মোদী সরকারের গুন্ডামির বিরুদ্ধে, সংবিধানের পথে গণতন্ত্রের সাথে - এবারের প্রজাতন্ত্র দিবসে এটাই আসমুদ্র হিমাচল ভারতবাসীর মনের কথা। কৃষক জিতলে দেশ জিতবে, আমরা সবাই জিতব। তাই লড়তেই হবে, ছিনিয়ে আনতেই হবে জনগণের জয়।


সংস্কার-কুসংস্কার!

বক্ষকাহন 

অমৃতা ঘোষাল



তখন শিশুটির বয়স মাত্র এক মাস। এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছি তাদের ফুটফুটে কন্যার মুখ দেখতে। শিশুর পরিচর্যাকারী আয়া দেখলাম একটি তামার পয়সা মোমের আগুনে একটু ধরে শিশুটির বুকের ওপরে চেপে চেপে রাখছে। শিশুটির মা সামনেই বসে। আর শিশুটির একনাগাড়ে অসহ্য কান্না। শিশুটির মা বেশ পৃথুল চেহারার। তিনি আমাকে বললেন যে, বড় হলে তার কন্যার বুক যেন অতিরিক্ত আয়তনে না বাড়ে, সেজন্যে এই ব্যবস্থা। কারণ, সেই মা চান না যে তার শিশুকন্যা তারই মতো মেদবহুল দেহ আর বড় আয়তনের বক্ষ ধারণ করুক। তাদের বাড়ি পুনরায় যাওয়ার দুর্ভাগ্য আমার আর হয়নি।

এর ঠিক উল্টো একটা গল্প শোনাই। কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত 'শূন্য এ বুকে' ছবিতে পুরুষ মনস্তত্ত্ব নারীবক্ষের ফ্যান্টাসিতে কী বিচিত্র রকমের আন্দোলিত! স্ত্রীর বক্ষ কতটা উচ্চ আর কতটা সমতল- সেই দেহ-ভৌগোলিক গবেষণায় ভেঙে যায় দাম্পত্য। তার মানে একটা সম্পর্কে ফাটল ধরাতে বক্ষেরও ভূমিকা থাকে!

আফ্রিকার ক্যামেরুনে যেমন নারীর বক্ষ-রক্ষার এক অদ্ভুত চর্চা মেলে। ব্রেস্ট আয়রনিং। সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া কিংবা সদ্য ঋতুমতী হওয়া মেয়েদের ওপর চালানো হয় বক্ষ-সমতলীকরণের প্রক্রিয়া। বেশ তীব্র মালিশ করে বক্ষের বিকাশকে কখনও কখনও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এর থেকেও জটিল একটা প্রক্রিয়া আছে। খুব উত্তপ্ত পাথর কিংবা ভারি কিছু বসিয়ে দেওয়া হয় মেয়েটির বুকের ওপরে। কিংবা ভীষণ শক্তভাবে কাপড় বা রবার দিয়ে বেঁধে সদ্য জেগে ওঠা বুকের বেড়ে ওঠাকে আটকে দেওয়া হয়। সাধারণভাবে বাড়ির মা, ঠাকুমা কিংবা প্রবীণ অভিজ্ঞ মহিলারাই এই কাজের যাবতীয় দায় গ্রহণ করেন। খুব ভোরে কিংবা সন্ধ্যের দিকে আলো-আঁধারে চলে এই প্রক্রিয়া। স্থান রান্নাঘর কিংবা ঘরের ভিতরকার কোনও লুকোনো স্থান। লুকোনো যাতে ঘরের পুরুষদের চোখ না পৌঁছয়। কিন্তু এত আয়োজনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? ঘরের মেয়েকে আগলে রাখা। সে যাতে কখনও কোনও বিকৃতির শিকার না হয় সে জন্যেই এই প্রক্রিয়া। মনে করা হয়, বক্ষ বর্ধিত হলে সে পুরুষের কাছে আকর্ষক হয়ে উঠবে, সুতরাং যৌন লালসার বস্তু হয়ে উঠবে। তাই তার বক্ষকে একেবারে দেহের সঙ্গে চেপে চেপে মিশিয়ে দেওয়ার আয়োজন। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই প্রক্রিয়া এখনও সমস্ত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেশ নির্বিচারে চলে। নারীর দেহে এ পদ্ধতির পরিণতি যা-ই হোক না কেন, ধর্ষণের পরিসংখ্যান কিন্তু কিছু মাত্র কমেনি! ব্রেস্ট আয়রনিং পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাওয়া মেয়েদের ক্ষেত্রে সুস্থ যৌন জীবন-যাপন কিংবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিঃসন্দেহে দুটোই কষ্টকর হয়ে ওঠে। নার্ভ-মাসল প্রভৃতির রোগে আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু, সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।

একবার এক জ্ঞানী পুরুষ বিবাহে উন্মুখ আরেক পুরুষকে নারীর তিন বক্ষ ক্যাটেগরির কথা শুনিয়েছিলেন- প্রথমত 'উন্নত', দ্বিতীয়ত 'অবনমিত', তৃতীয়ত 'পরাজিত'। না না, এ কোনও অ্যাডাল্ট জোকস নয়। এ ছিল এক উচ্চশিক্ষিত মানবদরদীর নিজস্ব বিভাজনরীতি। এবার সমস্যাটা হল, বিবাহে উন্মুখ পুরুষটি যেই বিয়ের জন্যে পাত্রী দেখতে যায়, অমনি তার চোখ গিয়ে স্থির হয় নারীর বক্ষের ওপর। উন্নত ক্যাটেগরি খুঁজতে গিয়ে হতভাগ্য হিমশিম খায়। বেচারার আর বিয়ে করাই হয় না।

গালভারি নামটা ছিলো 'মূলাক্করম', অর্থাৎ 'ব্রেস্ট ট্যাক্স'। এক কালে দক্ষিণ ভারতের  ট্রাভাঙকুর অঞ্চলে (বর্তমানে কেরালার অন্তর্গত) নিম্নবর্ণের হিন্দু নারীদের থেকে বক্ষ কর আদায় করতেন উচ্চবর্গ ব্রাহ্মণ পুরুষেরা। ব্রাহ্মণদের যুক্তি ছিল, নিম্নজাতের নারীকে (শুদ্র কিংবা অস্পৃশ্য মূলত) জনসমক্ষে বক্ষ ঢাকতে হলে কর দেওয়া বাধ্যতামূলক, কারণ তাদের বক্ষ ঢাকার অধিকার নেই। 'চণ্ডালের ঝি'-দের নাকি নগ্ন থাকারই রেওয়াজ! যাই হোক, যেমন বক্ষের পরিমাপ, সেই মতো নির্ধারিত হবে তাদের কর। পরিমাপ মাপবে কে? উচ্চবর্গ, আবার কে? এক বিদ্রোহী এর মধ্যে আগুন লাগালো। নাঙেলি নামের এক রমণীর বুকের ভেতর আগুন ছিল। কলাপাতায় মুড়ে নিজের কাটা স্তন দুটোকে তুলে দিল ক্ষমতাবানের হাতে। অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণে মরল সেই অগ্নিকন্যা। চিরুকন্দন তার স্বামী। দেহের চেয়েও যে আত্মাকে ভালোবেসেছিল। সেও মরল। কিছু পাগল প্রেমিক থাকেই যুগে-যুগান্তরে। 'ব্রেস্ট ট্যাক্স'-এর রীতিও মরল।

মরেনি আমাদের ভেতরের চড়াই-উৎরাই। পৃথুলা মহিলারা এখনও বক্ষ-আবরণী কিনতে গিয়ে মিনিমাইজার খোঁজেন। অনেক পুরুষ এখনও একমাত্র উন্নত বক্ষেরই সঙ্গিনী খোঁজেন। অনেক ছিপছিপে তরুণী এখনও ওষুধের দোকানে গিয়ে চুপি চুপি বক্ষ-মালিশ তেল কেনেন। এই বক্ষ-সংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে একটু নতুনভাবে ভাবতে পারি তো! তখন দেখব, এই ভাবতে ভাবতেই 'বক্ষ' শব্দের চেয়ে 'আশ্রয়' শব্দটা দামি হয়ে উঠবে।


Friday, 15 January 2021

প্রজাতন্ত্রের আত্মনির্ঘোষ!

সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে লিখেছিলেন, ‘যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে/ তারা কথার বেড়া গাঁথে কেবল দলের পরে দলে।’ আজকাল এ-গান কেবলই ফিরে ফিরে মনে আসে। ভাবি, এত কথা দিয়ে আমরা কি কেবল কথার বেড়াই গেঁথে চলেছি? যে কথা বলছি, তা মানুষের কানে পৌঁছচ্ছে হয়তো, কিন্তু তার পরে? কান থেকে মন অবধি যে পথটুকু, সেটুকু কি পার হতে পারছে সেই কথা? না কি, যেমন অনেক গ্রামের সীমানা অবধি বিদ্যুতের খুঁটি পৌঁছেছে সেই কোন কালে, কিন্তু সেখান থেকে বাকি সংযোগটুকু আর হয়ে ওঠেনি, অতএব বহু দিন অবধি গ্রামবাসীর ঘরে আলো জ্বলেনি, তেমনই শেষ মাইলে আটকে থাকছে কথাগুলো? ‘একের কথা আরে/ বুঝতে নাহি পারে, / বোঝায় যত কথার বোঝা ততই বেড়ে চলে’— কথার বোঝা বাড়িয়েই চলেছি?

রবীন্দ্রনাথের গান না-হয় ‘তোমার কথা’ নিয়ে, সে-কথা অতি উচ্চমার্গের। কিন্তু যে-সব জাগতিক পথে আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরা, সেখানেও তো প্রতি পদে কথার বেড়া একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের বাধা হয়ে দাঁড়ায়, প্রতিনিয়ত বিস্তর আলোচনা আর তর্ক আর লেখা-পড়ার শেষে আমরা আবিষ্কার করি, নিজের কথা অন্যদের ঠিক মতো বুঝিয়ে উঠতে পারিনি, নিজেও অন্যদের কথা ভাল করে শুনতে পারিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনে হয়তো বলি: কেহ কারও মন বোঝে না।

বুঝতে হলে শুশ্রূষা চাই, সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেই গুণটি যে আমরা দিনে দিনে হারিয়ে ফেলছি, তা নিয়েই বা সংশয়ের অবকাশ কোথায়? এখন বেশির ভাগ কথোপকথনে সবাই সব সময় কথা বলে, তাই কোনও সময় কারও কথা শোনার জো নেই। কিন্তু সেটা সত্যের একটি দিক। ঘাটতি তো কেবল শোনার আগ্রহে নয়, বলার সামর্থ্যেও। আমরা যা বলি, মুখের কথায় অথবা লেখার ভাষায়, তার কি সেই শক্তি আছে, যা শ্রোতার চেতনার দ্বার খুলে দিতে পারে? যদি থাকে সেই শক্তি, তবে শ্রোতা সে-কথায় মন না দিয়ে পারবেন কি? সমস্ত শ্রোতার মনের নাগাল পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা বিলাসিতামাত্র, কিন্তু যাঁদের কাছে আজ পৌঁছতে পারছি না, কাল যদি তাঁদের অন্তত এক জনকেও আমাদের কথার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে পারি, তা হলে তো এক পা এগোনো গেল! এক এক পা করেই তো হাজার মাইলের অভিযান শুরু হয়।

রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথে এই অভিযানে কখনও বিরত হননি। জনসংযোগকে তিনি বরাবর দেখেছেন মনসংযোগ হিসেবেই, তাঁর কথা মানুষের মন অবধি পৌঁছতে পারল কি না, তা নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল দুর্মর। ওই গানটিও সে-প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। এবং এক ভাবে উত্তর দিয়েছেও বটে। কথার বোঝা বেড়ে চলার আক্ষেপ জানানোর পরেই তার উজ্জ্বল আশ্বাস: ‘যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর/ তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হতে দূর।/ বোঝে কি নাই বোঝে/ থাকে না তার খোঁজে, / বেদন তাদের ঠেকে গিয়ে তোমার চরণতলে।’ মুগ্ধ শ্রোতা আশ্বস্ত হয়ে ভাবে, মেলাবেন তিনি, মেলাবেন। কথা যার নাগাল পায় না, সুরে সুরে সেই লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে।

কিন্তু সংশয়ী হয়তো প্রশ্ন তুলবে— ব্যাপারটা ঠিক কী দাঁড়াল বটে? কথা ছেড়ে সুরের সাম্পান বেয়ে ‘তোমার চরণতলে’ পৌঁছনোর সাধনমার্গটি না-হয় সাধকরা বুঝে নেবেন, কিন্তু ওই যে ‘একের কথা আরে বুঝতে নাহি পারে’ গোছের জাগতিক সমস্যাটা উঠেছিল, তার সুরাহা হবে কী করে? এক জনের কথা আর এক জনকে বোঝানো গেল না, অথচ বুঝল কি বুঝল না তার খোঁজে না থেকে সবাই ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ গাইতে গাইতে অনন্তের পথে চলে গেল? এটা কেমন ফাঁকিবাজি? সংশয়ের দুয়ার পেরিয়ে যাঁরা সর্বজ্ঞতার ব্রহ্মলোকে পৌঁছে গেছেন তাঁরা হয়তো রায় দিয়ে দেবেন: এমন ফাঁকিই তো রবীন্দ্রনাথের স্বধর্ম, তিনি অনেক প্রশ্ন তোলেন, তার পরে উত্তর না খুঁজে একটা হাওয়ার নাড়ু হাতে ধরিয়ে দেন, কখনও জীবনদেবতার কথা বলেন, কখনও সবার সুরে সবাইকে মিলিয়ে দেন।

চাইলে এমন ভাবনা আমরা ভাবতেই পারি, আটকাচ্ছে কে? আবার যাচাই করে দেখতে পারি অন্য একটা সম্ভাবনাও। কথা আর সুরের টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ কি অন্য কোনও কথা জানাতে চাইছেন? যে-ভাবে তিনি অনেক কথাই অনুক্ত রেখে দেন, বিশেষ করে তাঁর বহু গানেই না-বলা বাণীরা যে-ভাবে নিহিত থাকে, মরমি শ্রোতার অপেক্ষায়? এবং, স্রষ্টা কী চেয়েছেন তার গণ্ডিতে সৃষ্টিকে বেঁধে রাখতে হবে, তারও তো কোনও বাধ্যতা নেই। আমরা আমাদের মতো করে গানের মানে তৈরি করে নিতেই পারি। যেমন ধরা যাক গানের ওই পঙ্‌ক্তিটি: বোঝে কি নাই বোঝে, থাকে না তার খোঁজে। এ-পঙ্‌ক্তি সুরের প্রসঙ্গে এসেছে বটে, কিন্তু তার তাৎপর্য নিছক সেই প্রসঙ্গতেই সীমিত থাকছে কি? না কি, সুর এখানে একটি বৃহত্তর ধারণার প্রতীক হয়ে উঠছে? যে ধারণাকে বোঝা-না-বোঝার ছকে ধরা যায় না? এখানেই ‘কথা ছেড়ে’ সুর বাজানোর একটা গভীরতর অর্থের আভাস মেলে। আমরা যে-ভাবে কথা বলি, ইটের পরে ইট সাজানোর মতোই কথার পরে কথা সাজাই, হিসেব কষে, যুক্তির শৃঙ্খলা অনুসরণ করে বাগ্‌বিস্তার করি, তার প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেই প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে আছে এক অন্য অনুভূতির ভুবন, যে অনুভূতিকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, যা জন-মনের অন্তর্নিহিত আবেগকে ধারণ করে মূর্ত হয়ে ওঠে। দর্শনে ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনও কোনও ধারায় তাকে ‘অ্যাফেক্ট’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে সেই তত্ত্বের জটিল বিশ্বে প্রবেশের চেষ্টা করব না। শুধু এইটুকুই বলার যে, যাকে আমরা ‘র‌্যাশনাল’ বা যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ বলি, তার সাহায্যে এই আবেগ/অনুভূতির তল পাব না।

তার অর্থ এই নয় যে, তা কোনও অলৌকিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে— এই অনুভূতি সামাজিক বাস্তবের জমি থেকেই জন্মায়, সেই বাস্তবই তাকে লালন করে। এমনও নয় যে তাকে যুক্তি-বিরোধী বলে চিহ্নিত করা যায়, কিন্তু যুক্তিবদ্ধ চিন্তার কাঠামোয় তা কাজ করে না, তার জন্ম কর্ম সবই চেতনার অন্য এক স্তরে। সুরের প্রসঙ্গটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী বলেই মনে হয়, তার কারণ সুর আমাদের চেতনার যে পর্দায় কাজ করে, তাকে যুক্তির অঙ্কে পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়— স্থান-কাল-পাত্রের হিসেব কষে কোথায় কখন কার কোন সুর ভাল লাগবে তার একটা পাইকারি হিসেব হয়তো কষে দেওয়া যায়, সকালের রাগ, বিকেলের রাগিণী, এফ এম চ্যানেলের ‘মুড ম্যাপিং’, এ-সবেরই নিশ্চয়ই যুক্তি আছে, বিজ্ঞান আছে, কিন্তু ওই যে সুমন তাঁর গানে বলেছিলেন, ‘জানি না কাঁদায় কেন সহজ সুরের শয়তানি’, সে-কথার কোনও মার নেই। অ্যাফেক্ট নামক ব্যাপারটিকে নিয়েও আমাদের যুক্তি বলতে বাধ্য হয়: জানি না। এই না-জানাকে যদি স্বীকার না করি, তা হলে আমাদের সমস্ত শব্দ এবং বাক্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কথার বেড়া গাঁথা হয়, সেই বেড়ার এ-পারে দাঁড়িয়ে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের মধুবংশীর গলি-র প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়: মন পেলাম কই?

ব্যক্তিগত জীবনের নানা সম্পর্ক, সামাজিক পরিসরে পারস্পরিক আদানপ্রদান, সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনে সৃষ্টিকর্মের স্বীকৃতি— এমন নানা স্তরেই এ-প্রশ্ন আমাদের ভাবায়। কিন্তু আমরা এখানে একটি অন্য স্তরের কথা ভাবতে চাইব। প্রশ্নটিকে দেখতে চাইব রাজনীতির ভুবনে। একেবারে ব্যবহারিক রাজনীতির দুনিয়ায়। সেই দুনিয়ায় যে সঙ্কট নিয়ে আমরা এখন ভয়ানক ভাবে উদ্বিগ্ন, তাকে এক কথায় বলা চলে ‘রাইট উইং পপুলিজম’ বা দক্ষিণপন্থী জন-উন্মাদনার রাজনীতি। ঘরে ও বাইরে এই রাজনীতির কারবারিদের দাপটে গণতন্ত্র বিপন্ন, বিপন্ন সামাজিক সহিষ্ণুতার কাঠামো, এমনকি সভ্যতাও নিরাপদ নয়। তাদের প্রচার ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমরা নানা ভাবে যুক্তি তথ্য সাজাই, মানুষের কাছে সেই তথ্য ও যুক্তি পৌঁছে দিই, এই ভাবে বিপদের মোকাবিলার চেষ্টা করি। সে-চেষ্টা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমাদের সমস্ত যুক্তি, সমস্ত তথ্য অনেক সময়েই ওই জন-উন্মাদনাকে প্রশমিত করতে ব্যর্থ হয়, বহু মানুষ সব বিচারবুদ্ধি শিকেয় তুলে বিদ্বেষের সওদাগরদের পিছু পিছু দৌড়য়, গণতন্ত্রের প্রচলিত পথটির সুযোগ নিয়েই তার বিপদ ঘোর থেকে ঘোরতর হয়ে ওঠে। ব্যর্থ এবং সন্ত্রস্ত হয়ে আমরা মানুষের নির্বুদ্ধিতাকে দোষ দিই, বলি, ‘লোকে এই ভাবে বিচারবোধ হারিয়ে ফেললে সর্বনাশ তো হবেই!’

কিন্তু যাকে বহু মানুষের নির্বুদ্ধিতা ভাবছি, তা হয়তো আসলে তাঁদের নিরুপায় অস্তিত্বের পরিণাম। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি-ব্যবসায়ীরা এই অসহায় অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের কারবার ফেঁদেছেন, একটা শত্রুপক্ষ খাড়া করে সেই বানানো শত্রুর বিরুদ্ধে বহু মানুষের আবেগ জাগিয়ে তুলে তাঁদের সংহত করছেন নিজেদের শিবিরে। সেই শত্রুপক্ষ কোথাও কালো মানুষ কিংবা অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসী, কোথাও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কোথাও বা নাগরিক সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থী সদস্যরা। ‘শত্রুজয়ের’ এই অভিযানে নায়কের ভূমিকায় যাঁরা অবতীর্ণ হচ্ছেন, এই আবেগই তাঁদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। শুধুমাত্র যুক্তি-তথ্য দিয়ে এই পুঁজির মোকাবিলা করা কঠিন। যেখানে দক্ষিণপন্থী ক্ষমতাবানদের মোকাবিলায় সাফল্য এসেছে, যেমন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, সেখানে প্রতিস্পর্ধী শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে সামাজিক আন্দোলন। সেই আন্দোলন গড়ে তুলতে জন-আবেগ একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছে। বলিভিয়ার মতো দেশে জনজাতির মানুষ তাঁদের নিজস্ব সমাজ সংস্কৃতি অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সংগঠিত হয়েছেন এবং আক্ষরিক অর্থেই যে-ভাবে মরণপণ লড়াই করেছেন, বিপুল আবেগ ছাড়া তা সম্ভবই নয়। তাঁরা ‘অ্যাফেক্ট’-এর রাজনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, যার সামনে মার্কিন রাষ্ট্রশক্তি এবং বহুজাতিক অতিপুঁজির সম্মিলিত শক্তি হার মেনেছে। এই অভিজ্ঞতা একটা খুব সহজ, কিন্তু খুব বড় শিক্ষা দেয়: জন-আবেগের সদ্‌ব্যবহার করে সংগঠিত আন্দোলন গড়তে পারলে সেই আবেগের অপব্যবহারের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করা সম্ভব।

তাকানো যেতে পারে ঘরের দিকে। রাজধানী দিল্লির উপকণ্ঠে প্রতিবাদী কৃষকদের যে আন্দোলন ইতিহাস রচনা করেছে, তার অকল্পনীয় শক্তিমত্তায় আমরা স্তম্ভিত। এই শক্তি স্পষ্টতই জন-আবেগের। কৃষি অর্থনীতির হিসেবনিকেশ দাখিল করে আর লাভ-লোকসানের অঙ্ক কষে যাঁরা এই জনজাগরণের সমালোচনা করছিলেন, তাঁরাও ক্রমে সেই আবেগের মহিমা বুঝতে পেরে রীতিমতো ঘাবড়ে গেছেন। একটি বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ কৃষি-ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষার দাবিতে শুরু হয়ে এই আন্দোলন যে-ভাবে প্রজাতন্ত্রের আত্মনির্ঘোষ হয়ে দাঁড়াল, ‘অ্যাফেক্ট’-এর ধারণাকে বাদ দিয়ে তার প্রকৃত অর্থ কিছুতেই বোঝা যাবে না। এটা খুবই লক্ষণীয় ব্যাপার যে, জন-আবেগ জাগিয়ে তুলে এবং তাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখল করতে ও দখলে রাখতে ওস্তাদ শাসকরাও এই আন্দোলনের সামনে সম্পূর্ণ নাজেহাল।

এই পরিপ্রেক্ষিতেই একটি দুর্ভাগ্যজনক সত্য প্রকট হয়ে ওঠে। যে বিপদের কবলে আমরা পড়েছি, তার মোকাবিলায় প্রধান ভূমিকা পালনের কথা ছিল বামপন্থীদের, কিন্তু আমাদের দেশের, বস্তুত পৃথিবীর অনেক দেশেরই, মূলধারার বামপন্থী দলগুলি এখনও জন-আবেগের এই গুরুত্ব যথেষ্ট বুঝে নিতে পারেনি। তারা আজও কেতাবি বামপন্থার ‘যুক্তিবাদী’ কাঠামোর ভিতরে থেকে দক্ষিণপন্থী পপুলিজম-এর সঙ্গে লড়তে চাইছে। এবং হালে পানি পাচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন আসছে। বামপন্থীরা কথা দিয়ে কথার বেড়া গাঁথছেন। আবেগের সুর এখনও তাঁদের অধরা। সেটা গভীর দুশ্চিন্তার কারণ বইকি।

Tuesday, 12 January 2021

প্রতিপক্ষ যখন দুষ্ট ক্ষত

সজাগ থাকার সময়

প্রবুদ্ধ বাগচী

 


নতুন ইংরেজি বছরের সব থেকে বড় স্বস্তির খবর কোভিডের টিকা। এর পেছনে রয়েছে সারা দেশ ও দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের মেধা ও নিবিড় গবেষণা যা একটা ঘরবন্দী বছরের শেষে আমাদের সবার মনেই কিঞ্চিৎ খুশির ছোঁয়া এনে দিচ্ছে। যদিও জানি না, সবাইকে টিকা দেওয়ার প্রশ্নে সরকার সদয় হবেন কি না, সেই বিষয়ে এখনও আলো-আঁধারি। জানি না হালের রীতি মেনে টিকার দাম বাজারের ওঠাপড়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে কি না। আর কীভাবেই বা এত বড় দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যাবে প্রতিষেধক, কাজটা ভোট করানোর থেকেও কঠিন। আর এও জানি না, বিহারের ভোটের সময় যেমন টিকা চলে এসেছিল নির্বাচনী রাজনীতির উঠোনে, এবার তেমন কিছু ঘটবে কি না । কারণ, এই বছর শুধু কোভিডের টিকা দেওয়ার বছরই নয়, পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনেরও বছর। আর আমাদের রাজ্যে তার উত্তাপ ইতিমধ্যে এতটাই যে প্রথাগত পৌষের শীতে হাল্কা করে ফ্যানের হাওয়াও মিঠে লাগতে আরম্ভ করেছে। 

হ্যাঁ, টিকা নিয়ে কিছু সমস্যা আছে, সেটা বৈজ্ঞানিক নয় অবশ্যই। আর সেটা বুঝে নেওয়ার জন্য একটু পেছন ফিরে তাকানো দরকার। ১৯৯৫ সাল থেকে পোলিও দূর করার লক্ষ্যে পালস পোলিও টিকাকরণ শুরু হয়েছিল সারা দেশ জুড়ে। তার ব্যবস্থাপনা ছিল অতি সহজ। পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় বুথে স্বাস্থ্যকর্মীরা দু' ফোঁটা ড্রপ খাইয়ে দেবেন পাঁচ বছরের নীচে থাকা সব শিশুদের, একই দিনে । কিন্তু এই টিকা দেওয়া যখন শুরু হয় তখন সারা দেশে পোলিও রোগের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতা ছিল বেশ কম। সময় মতো টিকা না খাওয়ালে যে সারা জীবনের মতো একটা শিশু শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে যেতে পারে এবং একবার তা ঘটে গেলে আর তাকে সারিয়ে তোলার কোনও সম্ভাবনা থাকে না, এটা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানলেও সাধারণের মধ্যে সেই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ায় খামতি ছিল। এর প্রকাশ ঘটল প্রতিরোধে। টিকা দিতে গেলে একদল বাধা দিতে আরম্ভ করলেন, বাচ্চাকে আটকে রাখলেন ঘরের মধ্যে, নিজেরা উদ্যোগ করে বুথে এলেন না । 

শুনতে খারাপ লাগলেও এই প্রতিরোধ প্রধানত এসেছিল একটি বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। যদিও আর সবাই নির্বিবাদে এটা গ্রহণ করেছিলেন আদৌ তা নয়। অনেক জায়গায়, স্থানীয় সমস্যা, দাবি-দাওয়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছিল টিকা নেওয়া বা বয়কটের বিষয়টা। অনেকটা ভোটের মতো। শহরাঞ্চলের সম্পন্ন পরিবারগুলি সরকারি টিকাকর্মীদের তাদের বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না, বহুতলের মেন গেট বন্ধ করে রাখা হত, আজও হয়। কিন্তু দোষ বেশি পড়েছিল বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর। অবশ্যই বলা দরকার, শিক্ষা ও সচেতনতা, জনস্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আর্থ-সামাজিক ভাবেই চোখে পড়ার মতো পিছিয়ে। ফলে, বিভিন্ন এলাকায় এইসব মহল্লায় সুকৌশলে অপপ্রচার করা হয়েছিল যে পোলিও টিকা নিলে নাকি শিশুরা প্রজনন ক্ষমতা হারাবে। শিক্ষাহীন মানুষ সেইসব বিশ্বাস করেছিলেন। প্রতিরোধ এমন জায়গায় গিয়েছিল যে, স্থানীয় ধর্মগুরু মৌলবি, ইমামদের সঙ্গে সরকারিভাবে বৈঠক করে তাঁদের আস্থা অর্জন করতে হয়েছিল। পাশাপাশি এটাও বলা দরকার, দশ-বারো বছর অক্লান্ত চেষ্টার পরে এই অনাস্থার বেড়া টপকানো গিয়েছিল। একটা সময় পালস পোলিওর দিন সকালে স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা করে এলাকার সবাইকে টিকা নেওয়ার কথা বলা হত, এই ঘটনায় আমি নিজে সাক্ষী। মৌলবি সাহেব স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে গিয়ে বাড়ি বাড়ি টিকা খাওয়াচ্ছেন এই ঘটনাও আমি দেখেছি। সেইসব এখন ইতিহাস, দেশ আজ পোলিও মুক্ত। যদিও টিকাকরণ আজও চলছে। 

কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, কোভিডের টিকাকরণ অতটা সোজা ব্যাপার নয় যে দু' ফোঁটা ড্রপ খাইয়ে দিলেই চলবে। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে হাতে সিরিঞ্জ দিয়ে টিকা ইঞ্জেকশন দিতে হবে। তারপর কোনও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হল কি না দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আধ ঘণ্টা। যেটুকু খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে একজনের জন্য প্রায় চল্লিশ/পয়তাল্লিশ মিনিট লেগে যাবে। এবং সাধারণভাবে ইঞ্জেকশন নেওয়ার ক্ষেত্রে আমজনতার যে ভয় থাকে (যা আসলে অমূলক) সেটা এখানে একটা ফ্যাক্টর। আর ওই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টাও, বিজ্ঞানসম্মতভাবে যাই হোক,  টিকা ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে সমস্যা। কারওর সামান্য কোনও সমস্যা দেখা দিলেও তা থেকে বড় গোলমাল বেঁধে যেতে পারে, তৈরি হতে পারে অবাঞ্ছিত অশান্তি। সরকার কী টিকা দিচ্ছেন, কেন দিচ্ছেন এ নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনও ধারণা নেই। সকলেই খবরের কাগজ পড়েন না, টিভি চ্যানেল দেখেন না। কথাটা বলছি কেন? কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক্রমে শিশুদের জন্য একটি মিজলস (হাম)'এর টিকা সারা রাজ্যে (সম্ভবত সারা দেশেই) প্রচলন করার কথা হয়েছিল ২০১৮'র শেষার্ধে। এই বিষয়ে যাবতীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি, সমস্ত স্তরের স্বাস্থ্যকর্মী, আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ সব সারা হয়ে গিয়েছিল। টিকা দেওয়ার তারিখ অবধি ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। সেই টিকার ব্যবস্থাপনাটাও ছিল ঠিক এইরকম। ইনজেকশন দিয়ে টিকা দেওয়া হবে, আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য। কিন্তু কোনও একটা রহস্যজনক কারণে এতদূর প্রস্তুতির পরেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সেই টিকাকরণ বাতিল করার নির্দেশ দেন। আজও সেই টিকা শিশুদের দেওয়া যায়নি। তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করেন, ওই সময় ওই ধরনের টিকা দিতে গেলে জেলায় জেলায় ভিন্ন উপদ্রব শুরু হতে পারত। কারণ, একদল টিকা ঘিরে চোরা প্রচার করত, অন্যরা তার ফায়দা লুঠত। সমীকরণ খুব স্পষ্ট। 

কথাটা উঠছে এই কারণে যে এই রাজ্যে যেভাবে আজ মৌলবাদীদের চাষবাস এবং একপক্ষের যেমন ভীষণ তাড়া মসনদে বসার, তার জন্য তাঁরা যা কিছু করা সম্ভব করতে পেছপা নন। এইখানে এসে ভয়। সামনে পেছনে দুদিকে ভয়। যে কোনও ইস্যুতে যত মেরুকরণ তীব্র করা যায়, দুই পক্ষেরই নজর সেইদিকে, তার মধ্যে হিন্দু মৌলবাদীদের পাল্লা ভারী। মনে করে দেখা যেতে পারে, করোনা সংক্রান্ত লকডাউনের প্রথম দিকে কীভাবে তবলিগি জমায়েত থেকে সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রচার সামনে রেখে বিপুল পরিমাণ বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। সেই সময় কলকাতার কিছু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বাসিন্দারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, লকডাউন উপেক্ষা করছেন (কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা ছিল, এটা সত্যি) - এই নিয়ে ফেক ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অবিরত। বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু প্রধান বস্তিতে করোনা সাঙ্ঘাতিক ভাবে নাকি ছড়িয়ে পড়েছে। আসল ঘটনা মোটেও তেমন ছিল না। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সরকারি স্তরে বাসিন্দাদের খাদ্যশস্য দেওয়ার সময় অন্য বাসিন্দারা সংখ্যালঘু এলাকার সামনে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড করে দিয়েছেন যাতে তারা সেগুলো নিতে আসতে না পারেন।  যারা এগুলো করেছে, তাদের করোনা সংক্রমণ নিয়ে আদৌ চিন্তা ছিল তা তো আর নয়, তারা চেয়েছে বিদ্বেষের একটা বিষাক্ত কুয়াশায় আমাদের ঘিরে রাখতে যাতে আমাদের ক্ষোভের সূচিমুখ হয়ে থাকে কোনও একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের আচরণের দিকে, অন্য সব প্রকাণ্ড অন্যায় আর শয়তানির দিকে ততটা আর নয়। 

আজ নির্বাচনের দামামায় সেই সাম্প্রদায়িক কৃমিকীটদের নড়াচড়া অনেক বেশি। অনগ্রসর সংখ্যালঘুদের মধ্যে যদি সুকৌশলে একটা অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাঁরা হয়তো আড়ষ্ট হয়ে যাবেন আর তখুনি বলা হবে, দেখলেন তো 'ওরা' টিকা নেয় না, তার মানে রোগ ছড়িয়ে দিতে চায়! কোভিড থেকে সতর্ক তো থাকতেই হবে কিন্তু এইসব সম্ভাবনা থেকেও সজাগ না থাকলেই নয়। প্রতিপক্ষ আসলে খুব শক্তিশালী, করোনা ভাইরাসের থেকেও।

 

Saturday, 9 January 2021

নির্বাচনের ডামাডোলে

যে কথাগুলি কেউ বলছেন না

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


পশ্চিমবঙ্গে গোদি মিডিয়ার টিভি চ্যানেলগুলি খুললেই এখন ‘হা রে রে রে’ রব। যেন সারা রাজ্য জুড়ে ডাকাত পড়েছে। ক্রম অগ্রসরমান নির্বাচনী রণাঙ্গণে দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যেন একে অপরকে মহাকলরবে পরস্পরের দিকে রে রে করে তেড়ে যাচ্ছে। কোথায় দিল্লির সীমান্তে লাখে লাখে কৃষক প্রায় ৪০ দিন ধর্না দিয়ে পড়ে আছেন, করোনা-বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে ‘হা-অন্ন হা অন্ন’ রব, ‘দেশিয়’ ভ্যাকসিনের রাজনীতি ও কেরামতিতে যখন আতঙ্কিত দেশবাসী, কর্মহীন মানুষের বিপুল স্রোতে এক আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থা- তখন এ রাজ্যের গোদি মিডিয়া ‘রাম রাম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস সচকিত করছে। যেন, রামভক্তদের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা আরোহন নিছক সময়ের অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার তর গোদি মিডিয়ার মোটে সইছে না, তাই গেরুয়া শিবিরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বিধৃত করে এদের আপাত জীবন-যাপন। বীতশ্রদ্ধ হয়ে বহুজনে এখন টিভি দেখা বন্ধ রেখেছেন, বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরের নানান রকমফের থেকে তবুও অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে।

তাই, নেতাদের দলবদল ও আকচাআকচি থেকে মুখ ফিরিয়ে আমরা সাধারণজনেরা বরং অনেক বেশি কথা বলতে চাইব নিজেদের দাবিদাওয়া ও অভাব-অভিযোগ নিয়ে। দেশ ও রাজ্য কোনদিকে এগোচ্ছে, আমাদের সমস্যাগুলিই বা কোথায় আর কীভাবে নিজেদের আরও কার্যকরী ভাবে আগুয়ান করা যায়, সেই হতে পারে প্রকৃত কথা ও বার্তা।

যেমন ধরা যাক, দিল্লির সীমান্তে অবস্থানরত কৃষকদের কথা। এই অবস্থান সারা দেশের জন্যই এক অভূতপূর্ব বার্তা বয়ে আনছে। একদিকে তা যেমন গোটা দেশের কৃষক সমাজকে রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ করেছে, অন্যদিকে তা এক নতুন রাজনৈতিক-অর্থনীতির আলোকবর্তিকা হিসেবেও উদিত হয়েছে; এই অর্থে যে, কৃষিকাজ ও কৃষক সমাজের সঙ্গে সমাজের ক্ষমতাশালী বৃত্ত (যেমন কর্পোরেটকুল বা শাসকশ্রেণি) এতদিন যে আধিপত্যের সম্পর্ক বজায় রেখেছে ও কৃষক সমাজকে প্রান্তিক করেই নিজেদের অতি-মুনাফা উশুল করেছে, তা আজ ঘোরতর প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে। কৃষকদের এই নবজাগরণ ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে বাদ দিয়ে আগামী যে কোনও নির্বাচনে কোনও এজেন্ডাই তৈরি হতে পারে না। গোদি মিডিয়া এ নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক নীরবতা অবলম্বন করতে পারে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আগামী নির্বাচনে কৃষক সমাজের পক্ষ থেকে কতকগুলি দাবির উত্থাপন এখন অনিবার্য:

        ক) সমস্ত শস্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করতে হবে;

        খ) চাষবাসের এলাকা থেকে দু-তিন কিলোমিটার অন্তর সরকারি মান্ডি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে;

        গ) প্রান্তিক ও ছোট চাষীদের শস্য কেনার ব্যাপারে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে;

        ঘ) বেসরকারি সংস্থাকেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা তার উপরে দাম দিয়েই শস্য কিনতে হবে।

আমরা জানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ও ভার্চুয়াল জগতের বিপুল প্রসারে এমন এক আর্থিক ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে যেখানে কাজ ও কাজের জগতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিত্য নতুন কাজের এলাকা ও পরিসর যেমন তৈরি হচ্ছে, আবার পুরনো কাজের জগৎ ও এলাকা হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন যে কাজের পরিসর উঠে আসছে, তাও খুব দ্রুত বদলে বদলে যাচ্ছে। অল্প কথায় বললে, শ্রম ও শ্রম বাজারে যেমন বহু কাজ বিদায় নিয়েছে, নতুন কাজেরও প্রসার হয়েছে। কিন্তু নতুন এই কাজগুলি সব সময় স্থায়ী বা চিরকালীন নয়। এক কথায়, এমন এক নমনীয় কাজের ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে যেখানে কাজের স্ফীতির সঙ্গে অপ্রতুলতাও একযোগে বিরাজ করছে। কেউ কেউ এই নতুন ব্যবস্থাপনাকে ‘গিগ’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেন যেখানে আদত কথাটা হল: কাজ আছে চাকরি নেই। অর্থাৎ, প্রায় সমস্ত কাজগুলি অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, স্বল্প সময়ের বা অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা, কাজের নির্ঘন্ট ও নির্দিষ্ট সময় বলে আর কিছু থাকছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক করে দিচ্ছে, কার কখন কতটা কাজ ও মজুরি। এই অবস্থা কাজের জগতে এক ভয়ঙ্কর বিপন্নতা ও আশঙ্কার পরিবেশ তৈরি করেছে। উনিশ শতকের শ্রমিকদের ১২-১৪ ঘন্টা কাজের যে রীতি ও সার্বিক দুরবস্থা ছিল, তাই যেন আবার নতুন করে ফিরে এসেছে। কাজের এই পরিবেশ ও সম্পর্ক পালটে যাওয়ার ফলে বহু ক্ষেত্রেই শ্রমদানকারীরা শ্রমিকের মর্যাদাও পাচ্ছেন না। তাদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে না দেখিয়ে ‘পার্টনার’ হিসেবে দেখানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে, যা শ্রম-উৎসারিত আয়ের বন্টনের ক্ষেত্রে ‘মজুরি’ হিসেবে না দেখিয়ে ‘শেয়ার’ হিসেবে এখন দেখানোর চল। ‘প্ল্যাটফর্ম’ অর্থনীতির নাম করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চালনায় ‘শেয়ার’এর ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োজনের এই নতুন আয়োজন এখন সুবিদিত ও প্রচলিত। যেমন, ‘আর্বান ক্ল্যাপ’, ‘উবের’এর তথাকথিত পার্টনার কর্মী বা ড্রাইভাররা বা বিভিন্ন অনলাইন সংস্থায় যারা ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার কথা সকলেই জানেন। ফলে, শ্রমিক হিসেবে যে ন্যূনতম বিধিব্যবস্থা চালু থাকার কথা, যেমন, ন্যূনতম মজুরি, পিএফ, ইএসআই, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদি, তা এইসব ‘শেয়ার’ ভিত্তিক ক্রিয়াকর্মে নাকি প্রযোজ্য নয়। অতএব, তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা বলতে কিছুই নেই। উপরন্তু, কাজেরও কোনও নিরাপত্তা নেই। কাজ এই আছে তো এই নেই।

উল্লেখ্য, এই বিপুল নতুন শ্রমবাহিনীর জন্য কেউই কিছু বলছেন না। এদের জন্য কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও এজেন্ডা বা আওয়াজও নেই। তাই এই মূল দাবিগুলি ওঠা উচিত:

        ক) অনলাইন ব্যবস্থায় কর্মরত কর্মীদের কাজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে;

        খ) যে যেখানে কর্মরত তাঁদের সেই সমস্ত অনলাইন সংস্থার ‘কর্মী’ হিসেবে গণ্য করতে হবে;

        গ) এই কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।

এর পাশাপাশি এ রাজ্যে রয়েছেন এক বিশাল ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং উদ্যোগপতি যারা নিজ শ্রমে নিজ বিনিয়োগে দিনাতিপাত পরিশ্রম করে দিন গুজরান করেন। দীর্ঘ লকডাউনের কারণে এঁদের কাজকর্মে প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, ই-কমার্স ও হোম-ডেলিভারির বাড়বাড়ন্তে এদের পেশাগত জগতেই বিশাল বিপর্যয় নেমে এসেছে। পাড়ায় পাড়ায় বহু মুদি-স্টেশনারি বা খাবারের দোকান বিপন্ন, ফুটপাতে হকারদের কেনাবেচাও বহু গুণে অধোগামী, টুকিটাকি গৃহস্থালী শিল্পের বাজারও ধুঁকছে। নিজেদের উদ্যোগ চালাতে পরিশ্রান্ত এইসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সামনে এখন ঘোর অন্ধকার। এঁরা সমাজের এক বিশাল অংশ। এঁদের কথাও নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে আসতে হবে:

        ক) ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোগপতিদের জন্য নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প তৈরি করতে হবে;

খ) হস্তশিল্প ও অন্যান্য ক্ষুদ্র উদ্যোগের গৃহস্থালী পণ্যগুলিকে সরকারি তরফে ক্রয়-বিক্রয়ের আয়োজন করা হোক;

        গ) এঁদের উদ্যোগের স্বার্থে অত্যাল্প সুদে সহজ ঋণের সর্বজনীন ব্যবস্থা প্রণয়ন করা উচিত।

ধর্ম নয়, বর্ণ নয়, জাতি নয়, জাতপাত নয়- সমাজের বৃহত্তর মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক মুদ্দাগুলিকে সংহত করেই আগামী নির্বাচনের এজেন্ডা তৈরি হবে। বহু দাবি ও এজেন্ডা এখনও অনাদায়ী, তা নিয়ে প্রচার ও আন্দোলনও চলবে। আমি এখানে চেষ্টা করলাম, সমাজের বিপুল এক অংশের কথা বলতে, যাদের দাবিদাওয়া সেভাবে আলাদা করে কেউ ভেবে দেখেন না। বিশেষত, নব-উত্থিত রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রাঙ্গণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নতুন যে ‘গিগ’ শ্রমবাহিনীর আত্মপ্রকাশ, তাঁদের কথা কোনও রাজনৈতিক দলই এখনও সেভাবে বলছেন না। কারণ, তাঁদের ব্যাপক অস্তিত্ব এইসব রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিগোচরেই আসেনি।

দিল্লির সীমান্তে কৃষকেরা যে দীর্ঘস্থায়ী ও অবিশ্বাস্য এক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন তা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক-অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে আমার বিশ্বাস। সমাজ-ভাবনার সব উপাদান তো আর সাহেবদের মাথা থেকে আসে না (যেমন এ দেশে অনেকে তাকিয়ে থাকেন), এই মাটিতেও যে তা নির্মিত হয়, তা আরও একবার পণ্ডিতদের বিনয়ের সঙ্গে মেনে নেওয়া যথাযথ হবে। একইভাবে, দেশ জুড়ে ও এ রাজ্যেও প্রযুক্তির অভিঘাতে যে নতুন অর্থনীতির জন্ম হয়েছে, তার আধারেই আজকের মেহনতি শ্রমবাহিনীকে নির্দিষ্ট করে এবং তাঁদের দাবিদাওয়াগুলিকে সংহত করেই প্রকৃত এজেন্ডা গড়ে উঠবে। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষকে হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-বিহারী, ঘটি-বাঙাল, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণে বিভাজন করে যে বিভেদকামী রাজনীতি এ দেশের মাটিতে আপাত সাফল্য পেয়েছে (যদিও তা এখন নিম্নমুখি), তার বিপ্রতীপে কৃষক সমাজ সহ সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে তাঁদের রুটি-রুজি-মর্যাদা-স্বাধীনতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেই এক প্রকৃত গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারত গড়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের আগামী বিধানসভা নির্বাচন এই ক্ষেত্রে অবশ্যই পথ দেখাবে।

          

Monday, 4 January 2021

শিক্ষাব্যবস্থা যখন ঝিমোচ্ছে

শিক্ষকদের কথা

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

 

শিক্ষকদের কথা বলতে হলে নিশ্চয় সবার আগে এসে পড়ে সময় ও সমাজের কথা। কোন্ সময় এবং কোন সমাজে শিক্ষকদের কথা ভাবতে বসেছি তা তো জানতেই হয়।

আমরা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছি যে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ( Art 45 Directive Principle) বা শিক্ষা অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও এই দেশে এখনও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শিশু নিরক্ষর যা সব কালে সব সমাজেরই কলঙ্ক। আর যারা সাক্ষর তাদের কজন প্রকৃত শিক্ষিত তা নিয়েও ঘোর সংশয়। তবু, সাক্ষরদের শিক্ষা প্রসঙ্গ থাক।

সেই কবে (১৯১১) গোখলে প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি উদ্যোগ চেয়ে প্রস্তাব এনেছিলেন (তা অবশ্য তখনই গৃহীত হয়নি), আর বরোদার মহারাজা গায়কোয়াড তাঁর রাজ্যে অবৈতনিক শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন (১৯০৬)। আরও আছে। মূল কথা হল, আমরা পারিনি, কিন্তু তার দায় কার? একালে অনেকে, বিশেষ করে যে সব কর্তাব্যক্তি শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষে, তারা সহজেই ঘাড় থেকে তেমন্ দায় নামিয়ে দেয়, দোষ দেয় শিক্ষকদের। শিক্ষকদের দোষ নিশ্চয় আছে, কিন্তু কতটা? সে সব নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব।

এমন নয় যে শিক্ষকদের কথা বা তাঁদের সমস্যার কথা বলার কেউ নেই। একটা সময় নিশ্চয় তেমন ছিল, সে সুদূর অতীতের কথা। তারপর দেশে দেশে শিক্ষকরা সংঘবদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের হয়ে কথা বলতে এগিয়ে এসেছেন কিছু সংগঠন। সে সব সংগঠনের কথাও বলতে হবে। এমন সংগঠন তো এক নয়, স্তরভেদে অনেক। শিক্ষকদের স্তরভেদটা আমাদেরও বোঝা প্রয়োজন। আলোচনার সুবিধার্থে, রীতি মেনে  আমরা প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তিনটি স্তরের কথা বিবেচনা করব। এক) প্রাথমিক শিক্ষা, দুই) স্কুল শিক্ষা, তিন) উচ্চশিক্ষা (কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তর)।

সব সংগঠনের সামনে মূল আলোচ্য বিষয় হল শিক্ষার সমস্যা কোন সময়ে ও কোন সমাজে? অধিকাংশ স্তরের প্রধান সংগঠনগুলি বিংশ শতাব্দীর প্রায় গোড়াতেই তাঁদের উপস্থিতির জানান দিতে শুরু করেন। আমরা অতটা পিছিয়ে যাব না। আমরা প্রধানত উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের ভারতবর্ষীয় সমাজের কথাই বিবেচনা করব।

১৯৩৫ সালে গঠিত নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (ABPTA) যে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রধান মুখ, তাতে সন্দেহ নেই। একটা সময় তো প্রায় ৭৬ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষক এর সদস্য ছিলেন। এই সংগঠনের সাফল্য কামনা করে চিঠি দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, নেহরু প্রমুখ দেশনেতারা, বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। বক্তা হয়ে এসেছেন শরৎ বসু। ঐতিহ্যের বিচারে অবশ্য মান্য এই সংগঠন, কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে ও শিক্ষকদের মানোন্নয়নে এর প্রভাব কতটা?

শরৎ বসু ১৯৩৭ সালে বলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষকরা যা পান তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষন তো দূর ঐ টাকায় কুকুর-বেড়ালের পেট ভরানো যায় না। শিক্ষকদের পারিশ্রমিক বা বেতন কেমন ছিল তা বোঝাতেই শরৎ বসুর কথাটা উল্লেখ করলাম। কিন্তু এখনও কি সেই হাল? নিশ্চয় না। সব স্তরেই শিক্ষকরা এখন বেশ আকর্ষণীয় মাইনে পান। আকর্ষণীয় কিন্তু তা যথেষ্ট কিনা তা নিয়ে সংশয় অবশ্যই আছে।

আমরা যদি মানি যে সুশিক্ষা দিতে একেবারে গোড়ায় ফিরতে হবে, তবে মানতেই হয় যে প্রাথমিক শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে কথা তো সমাজ মানে কিন্তু রাষ্ট্রের আয়োজন তো তা মানে বলে মনে হয় না। কেন মনে হয় না? সরকার তো আজও প্রাথমিক শিক্ষার আয়োজনই সম্পূর্ণ করতে পারেনি। প্রধান কারণ নিশ্চয়ই দারিদ্র ও অপুষ্টি। খালি পেটে অসুস্থ কোনও শিশুকে কে শেখাবে বা তার শিক্ষার দায়িত্ব নেবে কে– সরকার, না সমাজ, না শিক্ষক? সমাজের একাংশের দাবি মেনে শিশুদের জন্য বিনি পয়সায় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন হয়েছে স্কুলে স্কুলে, দেখাশোনার ভার শিক্ষকদের। কিন্তু যদি বরাদ্দ যথেষ্ট না হয় তবে তাদের করণীয় কী? অনেক জায়গায় সমাজ এগিয়ে এসে শিশুদের জন্য কলাটা, মুলোটা, ডিম বা মাছ জোগাড় করে আনে। কোথাও বাগান বা মাছচাষের আয়োজনও হয়। কিন্তু তা তো সাধারণ চিত্র নয়, আর রাষ্ট্র যে অর্থবরাদ্দ করে তাতে শিশুর পুষ্টি হয় না, হতে পারে না। খিদের প্রাবল্যে যে শিক্ষার্থী অন্যমনস্ক, শিক্ষক তাকে যদি বলে পড়ায় মন দাও, তো সে এক অপরাধ নয় কি?

আমাদের সামাজিক কুঅভ্যাসও কিছু কম নয়। মাঠে প্রাত্যঃকৃত্য বা যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা বা বিশুদ্ধ পানীয় জলের গুরুত্ব না বোঝা যে অন্যায় তা আমরা সবাই বুঝলেও, শিশূদের জন্য টয়লেট বা বিশুদ্ধ পানীয় জলের আয়োজন করবে কে? শিক্ষকরা পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর শিক্ষা দেবেন না?

পাঠ্যক্রম নিয়েও সমস্যা অনেক। কে দেখে? শিক্ষক না দেখে পারে না। তবু সে কিছু বলে না কেন? রাজনীতির লাঠির ভয়ে, প্রাণসংশয়ে? ওদিকে, প্রয়োজনের চেয়ে কম শিক্ষক হলে তারা কী করে? স্কুলের হাজারও কাজ, শিক্ষাকর্তাদের ঘনঘন মিটিং আর শিক্ষা-বহির্ভূত কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ– কোনওটাই অগ্রাহ্য করতে পারে না তারা। অথচ তাদের শুনতে হয় যে তারা নাকি খিচুড়ি স্কুলের, ম্যাটিনি স্কুলের শিক্ষক। এ তো আর রামনাথের যুগ নয়, এই শিক্ষকদের পেট আছে, পরিবার আছে। অধিকাংশ শিক্ষক চোখ বুজেই থাকেন, গালমন্দ গায়ে মাখে্ন না, তারা অনেকে স্কুল চত্বরের কাছেপিঠে থাকেনও না। তাই অনেক সমস্যা তাদের নজরেই আসে না, অনেকে প্রশাসনিক কর্তা বা রাজনৈতিক কর্তাদের নাকগলানো পছন্দ করেন না, তবু ইচ্ছে না থাকলেও তাদের ঘাঁটাতে সাহস পান না। ফাঁকা স্কুল চত্বরে মদের খালি বোতল তাদের অনেককে গুটিয়ে রাখে।           

অন্য ছবিও দেখেছি। অনেক শিক্ষক প্রতিবাদে মুখর হন, কেউ কেউ বাচ্চাদের জন্য লজেন্স, বিস্কুট থেকে ল্যাপটপও সাথে করে আনেন। ভিক্ষে করে লাইব্রেরি বানান।  

একদল সমীক্ষক শহর থেকে গ্রামে এসে দেখেন শিক্ষার মান নেমেছে। তারা দেখেন না অপুষ্ট শিশুর সাঁতারে দক্ষতা, বা গাছে চড়ার কেরামতি ইত্যাদি। দেখেন কেবল ভাষা শিক্ষা তথা ইংরেজি বিদ্যার দৌড় বা যোগ-বিয়োগ শিক্ষার হাল। তাঁরা খবর নেন না সমাজের বা শিক্ষকদের হালচাল। সে খবর আসে অন্য সূত্রে (প্রধানত রাজনৈতিক দলের কর্মী সূত্রে)। সেই খবরে ভরসা রেখে রাষ্ট্র শিক্ষক নিয়োগের বা তাদের বেতনক্রমের বা শিশুদের পাঠ্যক্রমের সংস্কার করে। শিক্ষা যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকে। সরকার কখনও শিক্ষাকর্তাদের বলে উঠতে পারল না– কেন স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও দেশের সব শিশুকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আনা গেল না বা তাদের কেন ন্যূনতম সাক্ষরতার পাঠ দেওয়া গেল না?

অর্থাৎ, দোষ খুঁজলে সকলেরই কিছু দোষ চোখে পড়বে। তা বলে কি অস্বীকার করতে পারব যে শিক্ষার মান পড়ছে? নাকি তার দায় আদৌ শিক্ষকদের নয়? মানোন্নয়নে মাঝে মাঝে ট্রেনিং'এর আয়োজন হয়। তাতে কী হয়?

একজন ট্রেনারের কথা শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন একটা রূপক গল্প। একটা রুগ্ন গরুকে যথেষ্ট খড়, ভূষি খাওয়ানো হল, ক’দিন তার বেশ যত্নআত্তি হল, তাতে সে গরুটার চেহারা ভালো হলেও দুধের পরিমাণ বাড়ল না। কিন্তু কেন? ভাবলাম বুঝি ইমদাদুল মিলনের গল্প শুনছি। তা নয়। শ্রোতা শিক্ষার্থীরা একযোগে বলে উঠলেন– বয়স হয়েছে নিশ্চয়! ট্রেনার বললেন না তা হয়নি। তখন সকলেই প্রায় এক বাক্যে রায় দিলেন যে, এমন গরুর পেছনে খরচ বৃথা। একে অবিলম্বে ভাগাড়ে দেওয়া ভালো আরও যত্নআত্তি না করে।

-   আর এমন যত্ন আত্তি করা জীব গরু না হয়ে যদি হ’ন কোনও শিক্ষক?

এরপর অনেকের মাথা নীচু, তারা চুপ। অনেকে তারপরও অন্য আলোচনায় মত্ত রইলেন। আমি বুঝলাম অনাগ্রহী বা অনুপযুক্ত শিক্ষকদের ট্রেনিং দেওয়া বৃথা যদি না তারা নিজেরা ভেতর থেকে শিক্ষাদানের গুরুত্ব টের পান!

এমন ট্রেনিং কিন্তু উচ্চশিক্ষায় যুক্ত শিক্ষকদের দেওয়া হয় না। ‘রিফ্রেসার্স কোর্স’ ইত্যাদি তো ট্রেনিং নয়, তার আয়োজনের মূল লক্ষ্য হয় শিক্ষকদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো। কেন ট্রেনিং হয় না? বিদেশে প্রয়োজন হয় না, তাই এ দেশেও? নাকি অন্য কারণ কিছু আছে? কারণ যাই থাক, এ দেশে সর্বস্তরেই সমস্যাগুলির চরিত্র প্রায় অভিন্ন। এখানে শিক্ষার মান ও কাঠামো দুর্বল। আর এক বড় সমস্যা প্রাইভেট ট্যুশন। সমস্যাটা সব স্তরেই– প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার শেষ স্তরেও। আর, দুধ একবার যে শুয়ে শুয়ে বোতলে খেয়েছে তার অভ্যাস বদল সহজ নয়- সে তো তার আত্মবিশ্বাস খুইয়েছে! তাই সব বিষয়ে সব স্তরে তার প্রাইভেট টিউটর চাইই চাই।

এক ভদ্রলোক তো তাঁর ‘স্কলারদের’ গবেষণাপত্র আর থিসিসও লিখে দিতেন। লক্ষ্যণীয় যে, শিক্ষকরা অর্থের বিনিময়ে এমন সব অনৈতিক কাজেও যুক্ত হতে পারেন! এ কথা বলছি না যে প্রাইভেট ট্যুশন অবৈধ বা কোনও অনৈতিক কর্ম। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম পেশা এই প্রাইভেট ট্যুশন। কিন্তু পেশাটি বিবর্তিত হয়ে হয়ে একালে এটা হয়েছে নম্বর বাড়ানোর এক কৌশল। আমরা দেখেছি ও শুনেছি যে একদা অফিসের বড়বাবু, শিক্ষিত বেকার, পুরোহিত ইত্যাদিরা হতেন প্রাইভেট টিউটর। তারা বিশেষ বিশেষ বিষয়ে শিক্ষার্থীর সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে তা ডিঙ্গোনোর পথ বাতলাতেন। এখন টিউটর চাই সব বিষয়ে, সব ক্লাসে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষায়তনের শিক্ষকের চাহিদা বেশি। দোষ তো সমাজেরও। আমরা অনেক অভিভাবক চাই পরীক্ষায় চোখ-ধাঁধানো ভালো ফল, চাই শিক্ষা শেষে সন্তানের ভালো সরকারি চাকরি।  

যদিও শিক্ষকদের পারিশ্রমিক বেড়েছে বহুগুণ, তাতে কী? মানসিকতায় বদল আসেনি। আর কমেনি তুলনা। শিক্ষকদের তুলনায় কে কত বেশি পান সে অঙ্কও শিখে নিচ্ছেন শিক্ষকরা ও কর্তব্যকর্মে মনোযোগ হারাচ্ছেন! তুলনা করার এমন সুযোগ তো সরকারই তাদের দিচ্ছে, তাই সরকার মাঝে পরামর্শ দিয়েই সরে পড়ছে। মাঝে মাঝে সরকার ধমক বা হুমকিও দেয়, তবে শিক্ষকরা বুঝে গেছেন যে সে সব ফাঁকা আওয়াজ। তাদেরও সংগঠন আছে না!

তবে ধমক যথাযথ হলে যে কাজ হয় তা দেখা গেছে ১৯৮৬ সালের নতুন পে-স্কেল প্রবর্তনকালে। আবার এও দেখা গেছে যে সংগঠনগুলি আর্থিক দাবিদাওয়া আদায়ে যত তৎপর, শিক্ষকদের কর্তব্যকর্মে উদবুদ্ধ করায় তত তৎপর নয়। এ যেন এক অলঙ্ঘনীয় বিধি যা সর্বস্তরের সব শিক্ষক সংগঠনের জন্য অবশ্যমান্য।

এসবের মূলে আছে কুশিক্ষা। কুশিক্ষা কেবল নিরক্ষর মানুষে সীমাবদ্ধ নয়, কুশিক্ষার আলো শিক্ষক মহলে, সে অন্ধকার শিক্ষানীতি নির্ধারক থেকে তা রূপায়নে ব্যস্ত সব শিক্ষাকর্তাদের ঘরে ঘরে। অশিক্ষার চেয়ে যেন কুশিক্ষার মূল্য চুকোতে বেশি ব্যস্ত আজকের সমাজ। এমন সঙ্কট মেটাতে শিক্ষকরা এগিয়ে এসে সমাজের হাত ধরে না, অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে দেখেও সে তার নিজের তাৎক্ষণিক লাভের অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত। একালে শিক্ষক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।

একালে আরও কিছু সমস্যা জুড়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি আর কোভিড১৯ পরিস্থিতি। আগেই বলেছি যে, তেমন তেমন ধমকে কাজ হয়। এবার করোনা ভয়ে সরকার দ্রুত বিদ্যায়তনও বন্ধ করে দিল। যখন স্কুল-কলেজ বন্ধ তখন বিদ্যাচর্চা বন্ধ হবে কেন? জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ তো চেয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার বাহন হোক। সমাজও ব্যস্ত হল। সেই চাপে চালু হয়ে গেল ‘অনলাইন’ পড়াশোনা।বাস্তব সমস্যার দিকে তাকালো না সরকার বা সমাজ। দেখল না যে, অন্তত এ দেশে ‘অনলাইন’ পড়াশোনার পরিকাঠামোই নেই। দারিদ্র ডিঙ্গিয়ে শিক্ষার্থী কেমন করে জোটাবে স্মার্টফোন? ক’জন ব্যবহার করবে তা? ক’টা জোটাবে? বিদ্যুৎ সংযোগ পাবে?

আরও সমস্যা আছে। যে শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পরিবেশ পাবে না, তার কী হবে? শিক্ষকরা ‘অনলাইন’এ পড়ানো শুরু করলেন, পরীক্ষাও  নিচ্ছেন! তাঁরা প্রশ্ন করলেন না সরকারকে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?' বললেন না সমাজকে– ‘এভাবে শিক্ষাদান হয় না। শিক্ষার মানোন্নয়ন হয় না।' শিক্ষা চলেছে, চলেছে ‘অনলাইন’ প্রাইভেট ট্যুশনও। শিক্ষার্থীরা শৈশব হারাচ্ছে, কৈশোর হারাচ্ছে, যৌবনেরও কিছুটা। অভিভাবকরা জানেন না বা মানেন না যে এই শিক্ষা সুশিক্ষা নয়, এই শিক্ষা পেয়ে শিক্ষার্থী চাকরি পাবে না, কাজ পাবে না। তাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে, আর এই আনন্দহীন যজ্ঞের পুরোহিত হয়ে ঝিমোচ্ছেন নির্বিকার শিক্ষকরা।  


Saturday, 2 January 2021

Wisdom of Our Time

Tide Does Not Obey Royal Command

 Amit Bhaduri


He was revered as the ruler of everything he had surveyed. The legendary King Canute commanded the incoming tide to roll back, not to wet his royal feet and robe. To the embarrassment of his courtiers, the sea did not obey, despite the divine power of the king. The legend survives because it speaks truth to the arrogance of power nurtured by flattery.

Modern democracies do not bestow divine power to its democratically elected leader. But it gives him (or her) a chance to become a despot, not a dictator. He rules democratically by laws passed in the parliament. Despotic tendencies in democracies are a new breed conveniently coming up especially these days under the cover of the pandemic in several countries around the world. It may be ghost parliament of sorts where the opposition is absent, it may be the parliament suspended in the name of say health emergency, or it may simply be the habit formed by the heady after-effect of a brute majority enjoyed in the parliament until the time of reckoning comes again, if it comes at all.

It is now history that the Indian parliament recently enacted three farm bills which has set off tides of protests by farmers led mostly by farmers from Punjab, Haryana and western U.P., and more joining in increasingly from many other parts of India. They want the three farm laws to be repealed, and want in its place a written reasonable minimum support price law, not an unwritten verbal assurance for all essential agricultural commodities. The government is unwilling.

The incoming tidal wave of protests was about to reach the throne of the democratic leader and wet his feet and robes, but was stopped by force. Not the farmers, but the government in power ordered its police to dig trenches on national highways, used barricades and water cannons. And yet, the waves of protest did not die down; it only began to rise and consolidated peacefully at selected points of entry at the border of the capital. The resistance is getting more and more massive, and spreading to distant parts of India.

The leader says he is misunderstood. The laws are meant to bring in prosperity and double the income of the farmers in a couple of years only if they follow his lead. His courtiers and advisors too believe in the magic of the market place. Minimum support price is a hindrance to prosperity, only free market can deliver. These three laws are designed to create a free market. This would be a free market in which Mr. Ambani’s team keen on expanding its retail outlets of agricultural products, or Mr. Adani’s men desperate to fill up the already constructed silos with grains will bargain over the price with farmers most of whom own less than a couple of acres of land. Moreover, in case of disagreement, not the civil court but the central government which passed the law in the first place will give the verdict. And, the states where the land is geographically located, will have no say either. It will be the Central government which passes the law, executes it and settles dispute, absolute concentration rather than separation of power in a federal democratic set up envisaged in the Indian constitution. The farmers say they will have none of such laws, but the leader in a solemn voice says over and over again on the media he is being misunderstood. His courtiers and paid pundits repeat passionately through the big media that, indeed leader is being misunderstood. The reason might be Pakistanis, Khalistanis, Maoists, and urban Naxalites along with opposition political parties, perhaps all of them infiltrated by those various dangerously separatist elements. They are misleading the innocent farmers.

This is not the first time. The Muslims misunderstood the CAA. The Kashmiries did not see the beauty of repealing Article 370. Traders pretended not to understand GST. The poor somehow eking an existence did not understand demonetization, nor did the migrant worker understand and appreciate the sudden lockdown which was more effective in destroying them than the Covid virus. Nevertheless the leader leads resolutely to make the country great in every way.  

He is understood only by the real patriots (‘deshvakts’), and opposed by the traitors to the country (‘deshadrohis’). He is criticized by those (the tukra-tukra gang) who want to shred to pieces our ancient glorious Hindu Rashtra in the making. They do not really belong to this country because they are alien to its culture, and its grand, scientific tradition which transformed the face of Lord Ganesh to that of an elephant through plastic surgery, where the ancient wise men (Rishis) had found out long ago how by making noise with the utensils and lighting candles you could win the war against epidemics in a few days. We cannot say for sure whether  all his courtiers, his ministers, his pundits and the mainstream media agree. They certainly do not show any sign of disagreeing. Flattery not understanding, loyalty not questioning, subservience not dissent is the name of only game that is to be played in this politics.

Viking king Canute ruled most of Scandinevia and conquered by force Britain. Most historians claim he was actually a wise ruler, too wise perhaps to believe in the unlimited divine power of the king. He understood that forces far stronger that any royal order guided the course of incoming tide. And indeed, on that day his throne was placed next to the sea only to demonstrate this wisdom. He understood motivated flattery of his courtiers tended to hide simple wisdom. This sea side episode was a simple, yet powerful demonstration of his ‘maan ki baat’ to his courtiers and to his subjects. That is why it has stayed in history after a thousand years, and has become a legend. To understand the simple truth that the tide is stronger than royal order was the wisdom of his time. The wisdom of our time is that  the might wave of a massively popular tide is more powerful than any act of the parliament.  Is there wisdom in our time and country to accept it gracefully?                  

Friday, 1 January 2021

নতুন বছরের কথা

উগ্র রক্ষণশীল রাজনীতিকে রুখতে তাকাতে হবে নিজেদের দিকে

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


এক সজ্জন বন্ধু একটি প্রশ্ন করে আমাকে উসকে দিলেন।

‘আচ্ছা, এত রক্ষণশীল, বিভেদকামী, ধর্মান্ধ হয়েও বিজেপি কী করে এত সংখ্যক মানুষের সমর্থন এখনও আদায় করে চলেছে?’

প্রশ্নটি যথাযথ। এবং স্বভাবতই অনেকে একে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। নতুবা, ‘মানুষ মোহগ্রস্ত’, ‘ভুল বুঝছে’, ‘ইভিএমের কেরামতি’ এইসব নানাবিধ দায়সারা উত্তর দিয়ে থাকেন।  এতে সাপও মরে না লাঠিও ভাঙে না। বরং, এই প্রশ্নটিকে যথাযথ ভাবে মোকাবিলা করে নিলেই উগ্র মতান্ধতার বিপক্ষে একটি যথার্থ পরিসর গড়ে উঠতে পারে।

উগ্র রক্ষণশীলতার বীজ সমাজের প্রকোষ্ঠেই নানা ভাবে রোপিত হয়ে আছে। তা যেমন জনমানসে আছে, বিভিন্ন দল ও রাজনৈতিক অনুশীলনেও আছে। এ কথা সুবিদিত যে, সারা বিশ্ব জুড়েই গত দশ বছরে উগ্র রক্ষণশীল মতান্ধতা ক্রমেই সবলতর হয়েছে ও বহু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসন পেয়েছে। এর মূল উৎস নিহিত আছে তার আগের পর্বে। যে পর্ব বিশ্বায়ন, উদারবাদী অর্থনীতি, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মৌলবাদ, কর্পোরেট উগ্রবাদ ইত্যাকার বিবিধ অনুষঙ্গে ভরপুর হয়েছিল। আর তা থেকেই সাধারণজনের যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দারিদ্র্য, উষ্মা- তা নতুন ধরনের এক ন্যারেটিভ রচনায় বিরুদ্ধ শক্তিকে প্ররোচিত করে। আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম হয়নি। স্বভাবতই, সংগঠিত রক্ষণশীল মতাদর্শের বয়ানে মতান্ধ শক্তির উত্থান এক শক্ত জমি পেয়ে গেল।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এর ভিত্তি ও লক্ষণগুলো ছিল কতকটা এমনতর:

এক) বৃটিশ-সৃষ্ট হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্বকে হাতিয়ার করে আরএসএস-বিজেপি শক্তি মুসলমানদের একটি কাল্পনিক বিপদ হিসেবে বরাবর বাকী ভারতবাসীর সামনে দাঁড় করিয়ে এসেছে। বৃটিশ আগমনের আগে ভারতীয় শাসকদের ধর্মীয় পরিচয়কে ন্যাক্কারজনক ভাবে উচ্চকিত করে (অথচ বৃটিশ শাসকদের ধর্মীয় পরিচয়কে কিন্তু একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না) একটি ধর্মীয় সমাজকে, তাদের তরফে, শত্রু হিসেবে জনতার সামনে পেশ করা হয়। সে বাদে, অস্বীকার করার উপায় নেই, দেশভাগের ধর্মীয় ইন্ধন, গত সত্তর বছরে নানা স্থানে দাঙ্গা, প্যান-ইস্লামিয় মৌলবাদের বাস্তবতা, আগের জমানার শাসকদের ক্ষমতার লোভে মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ (যেমন রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেওয়া ও শাহবানু মামলায় হেরে গিয়ে সংসদে নারীর অধিকারকে খর্ব করে আইন প্রণয়ন), সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থানকে নাকচ করে বিভিন্ন ধর্মের পেছনে তা’ দেওয়া ইত্যাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুশীলনে হিন্দু-মুসলমান নাগরিকদের মধ্যে বিভাজনের এক সহিংস বাতাবরণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল; যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিকে সময় বিশেষে রাজনৈতিক ফায়দা তুলে ক্ষমতা দখলে মদত দিয়েছে। এই আবহে, হিন্দু সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে (বিশেষত উচ্চবর্ণ) যে বিভ্রান্তি ও প্রতিহিংসামূলক ধর্মীয় চেতনা সুপ্ত ছিল, তাকে চাগাড় দিয়ে ও বিপন্নতার দোহাই তুলে আজকের রক্ষণশীলেরা (আরএসএস-বিজেপি) এক রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড নিজেদের ঘরে তুলে নিতে সক্ষম হয়েছে। তারা আপাত ভাবে বোঝাতে পেরেছে যে, বৃহত্তর হিন্দু সমাজ বিপন্ন, তাই তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি আর বিজেপি সেই ঐক্যের পাটাতন।

দুই) কংগ্রেস প্রণীত মিশ্র অর্থনীতি- যার সুবাদে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের সুবিশাল পরিসর- দেশের স্বল্পসংখ্যক মানুষকেই রুটিরুজি ও আশ্রয়ের সংস্থান দিতে পেরেছে। বহু জনমুখি প্রকল্প ঘোষিত হলেও তা আপামর দেশবাসীর কাছে মোটেই যথাযথ ভাবে পৌঁছতে পারেনি। এই ব্যর্থতার কথা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী স্বীকার করেছিলেন এ কথা বলে যে এক টাকার সরকারি সংস্থানের মাত্র ১৬ পয়সা নিচুতলায় মানুষের কাছে পৌঁছয়। এই যে বিশাল অপচয় ও ‘সমাজতন্ত্রের’ কথা বলে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি ও সরকারি দফতরে সাধারণ মানুষের নিত্য হেনস্থা, তা সরকারি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেই জনমানসে এক নেতিবাচক ধারণা নির্মাণ করেছিল। সেই ইস্যুটিকে রক্ষণশীলেরা কাজে লাগিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের বিলোপসাধনের প্রস্তাব এনে ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার ডিজিটালকরণকে হাতিয়ার করে যে ব্যবস্থাগুচ্ছ তারা নিয়েছে তার প্রতি মানুষের একটা প্রাথমিক বিশ্বাস অবশ্যই তৈরি হয়েছে। যে কারণে বিমুদ্রাকরণের মতো অত ভয়ঙ্কর একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তার ফলে মানুষের প্রভূত যাতনা ও মৃত্যু হওয়া সত্ত্বেও কোথাও তেমন কোনও প্রতিবাদ সংগঠিত হয়নি, বরং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা গ্রহণকে মানুষ আপেক্ষিক ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই গ্রহণ করেছে। যে কারণে এই ব্যবস্থাপনার পর পরই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’র বিপুল জয় সম্ভব হয়েছিল।

তিন) সবচেয়ে কার্যকরীভাবে রাজনীতির দাবিদাওয়ার মোড়টিকে আরএসএস-বিজেপি ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। জীবন-জীবিকার প্রশ্নটিকে হিমঘরে পাঠিয়ে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন, ‘লাভ জেহাদ’, রামমন্দির, কাশ্মীরে ৩৭০ বিলোপ, সমস্ত সমস্যার মূলে পাকিস্তান, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, সিএএ-এনআরসি ইত্যাদি এমন সমস্ত মুদ্দাকে তারা জনমানসে এনে ফেলে যে সাময়িক ভাবে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ভাবতে শুরু করে যে এই সমস্ত সমস্যার সমাধানেই সম্ভবত তাদের বেঁচেবর্তে থাকার দিনলিপি লুকিয়ে আছে। নানারকমের গালগল্প, ফেক ভিডিও ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট ছড়িয়ে, নিজেদের নেটওয়ার্কে সেগুলিকে ভাইরাল করে তারা রাজনীতির এক নতুন বয়ান তৈরি করে বেশ সবলভাবে এক মিথ্যার জাল নির্মাণে সক্ষম হয়। তাদের বলা কথাগুলির মধ্যে কিছু সত্যের উপাদান হয়তো ছিল, যার সঙ্গে হিন্দু মানসিকতার মানুষ খানিক একাত্ম বোধ করে এবং তাদের উত্থাপিত কথাবার্তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে তাদের নির্বাচনী বৈতরণী পারে সহায়ক হয়। কিন্তু ক্রমেই ভেঙে পড়া অর্থনীতির কারণে এই মোহ অচিরেই কাটতে শুরু করে এবং গত বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এই ধোঁকাবাজির খেলা তাদের হাত থেকে কতকটা ফসকে যায়। এই প্রথম বিরোধীদের তোলা জীবন-জীবিকার মুদ্দা স্পষ্ট করে নির্বাচনী লড়াইয়ের এজেন্ডা হয়ে ওঠে এবং কোনওরকমে এনডিএ জিতে গেলেও বিরোধীরা জবরদস্ত লড়াইয়ের স্বাক্ষর রাখে। আর আজ দিল্লিকে ঘিরে কৃষকদের মহাজাগরণ এই গোটা পর্বটিতেই এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রথম দেখা গেল, উগ্র হিন্দুবাদী শিবির থতমত খেয়ে গেছে এবং ভারতীয় জনমানসে সাধারণজনের আসলি মুদ্দাগুলি আবার প্রধান জায়গায় ফেরত আসতে শুরু করেছে। একেবারে হালের হরিয়ানা পুরসভা ও আঞ্চলিক নির্বাচনে বিজেপি জোটের ভরাডুবি সেইদিকেই আবারও জোরালো ইঙ্গিত করল।

চার) এছাড়াও উল্লেখনীয়, ধর্ম-জাতপাত-জাতি-লিঙ্গ নিয়ে গত সত্তর বছরে তথাকথিত উদারবাদীরা (কংগ্রেস ও তার সহযোগী দল) যে সস্তা ও সুবিধাবাদী রাজনীতি করেছে তার দামও তাদের মেটাতে হয়েছে। সেই জনমোহিনী ও চটকদারি রাজনীতিরও পালটা হিসেবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা জনতার সমর্থন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। যেমন, মণ্ডল কমিশনের দৌলতে বিহার-উত্তরপ্রদেশ সহ অনেক রাজ্যে যে বিদ্বেষমূলক জাতপাতের রাজনীতির সূচনা হয় তার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীরা এক ‘ঐক্যবদ্ধ হিন্দু সমাজের’ রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে। তা তাদের কাজেও দেয়। এ কথা তো অস্বীকার করার নয়, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে যাদবতন্ত্রের অত্যাচারে বহু মানুষ নিষ্পেষিত হয়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের মতোই যাদববাদ এমন এক নতুন ধরনের জাতপাতের রাজনীতির অনুশীলন আমদানি করে যে বাকী জাতের লোকেরা বিপন্নতা ও আক্রমণের শিকার হয়। এটা বাস্তব। একে অস্বীকার করে লাভ নেই। অনুরূপ ভাবে, ধর্মের নামে মুসলমানদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা, ধর্মীয় গুরুদের নানা ভাবে হাতে নিয়ে মুসলমানদের ঘেটো ব্যবস্থায় নিক্ষিপ্ত করে শুধুমাত্র ভোটের জন্যই তাদের ব্যবহার করে নেওয়া- এই অনুশীলনও তো দীর্ঘদিন চলেছে। এ নিয়ে মুসলমান সমাজের মধ্যেও নানারকম ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল। বলাই বাহুল্য, এই নোংরা রাজনীতির কুফলের ফায়দা আরএসএস-বিজেপি সুচতুরভাবে ব্যবহার করতে সফল হয়েছে। পাশাপাশি, লিঙ্গ রাজনীতির বাড়াবাড়িও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু মানুষকে আহত করেছে। কারণ, এই বাড়াবাড়ির শিকার শুধুমাত্র পুরুষেরা হয়নি, নারীরাও হয়েছে। ভুরি ভুরি মিথ্যা অভিযোগের ঠেলায় শীর্ষ আদালতকেও ৪৯৮এ নিয়ে সংশোধনী আনতে হয়েছে। এ নিয়ে দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজের একটি অসাধারণ তথ্যচিত্রও আছে: ইন্ডিয়াজ সনস। অর্থাৎ, এক কথায়, ধর্ম-জাতপাত-লিঙ্গ সমতার নাম করে তথাকথিত উদারবাদী, গণতন্ত্রীরা যথেচ্ছ বিভদমূলক খেলা খেলেছে, নতুন ধরনের এক অসম ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছে ও জনতাকে ধোঁকা দিয়েছে। আর এর সুযোগ তো উগ্র রক্ষণশীলেরা নেবেই। যেভাবে এক সময় শ্রমিকশ্রেণির নাম করে সোভিয়েত ইউনিয়নে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল এক দমবন্ধ করা আমলাতান্ত্রিক মৌলব্যবস্থা, যার পতনও তাই অনিবার্য ছিল।

তাই, আজ অনেক বেশি তাকাতে হবে নিজ রাজনীতি ও তার অনুশীলনের দিকে। যে ধর্মীয় উগ্রবাদের রাজনীতি আজ প্রায় গোটা দেশকে অনেকটাই কব্জা করেছে, তার বিরুদ্ধে তো প্রকৃত গণতান্ত্রিক, সমতা-ভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচির বাস্তবতাই আঁধার পেরতে সাহায্য করবে। সেটা না বুঝলে, হাজারও নীতিকথা আউড়ে, মরণকালে হরিনাম করে মৌলবাদের জনভিত্তিকে টলানো যাবে না। কারণ, বুঝতে হবে, ওরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে সংহত করে রাজনীতির অনুশীলন করছে, যে কাজটা আপেক্ষিক ভাবে অনেক সহজ। কেননা, ধর্মীয় আবেগ দ্রুত বহমান ও প্ররোচনামূলক। কিন্তু, গণতান্ত্রিক শক্তিকে জীবন-জীবিকা, ধর্ম-জাতপাত-লিঙ্গ সমতা ও বহুত্ববাদের কর্মসূচি নিয়েই জয় করতে হবে এ লড়াই। নয়তো, আমরা হারিয়ে যাব এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার জগতে। তাই কাজটা কঠিন কিন্তু বাস্তবতা সে জমি প্রস্তুত করেছে। সারা ভারতের ঐক্যবদ্ধ কৃষক আন্দোলন পথ দেখাচ্ছে।