Friday, 24 September 2021

যা দেখেছি

কিউবা: নরক এবং স্বর্গ!

ফ্রেই বেট্টো

অনুবাদ: সমর বাগচী

 (ফ্রেই বেট্টো ব্রাজিলের এক সুবিখ্যাত লেখক ও দার্শনিক)


কিউবার বিপ্লবের প্রতি আমার যে সংহতি তা কারওরই অজানা নয়। গত ৪০ বছর ধরে আমি মাঝে মাঝেই কাজের জন্য অথবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে কিউবায় গিয়েছি। বহুদিন ধরে ক্যাথলিক বিশপদের সঙ্গে কিউবার সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতা করার কাজে নিযুক্ত ছিলাম, যা আমার লেখা ‘
Fidel and Religion’ (Fontanar/Companhia das Letras) এবং ‘Paradise Lost, Journeys to the Socialist World’ নামে দুটি গ্রন্থে বর্ণনা করেছি।

সম্প্রতি, FAO-এর সঙ্গে এক চুক্তিতে আমি কিউবার সরকারকে খাদ্য সুরক্ষা ও পুষ্টি শিক্ষা পরিকল্পনার কাজে উপদেশ দেওয়ার কাজে নিযুক্ত আছি। আমি কিউবার অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং তারা যে অসুবিধা ভোগ করছে, বিপ্লবের যে চ্যালেঞ্জ, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের যে সমালোচনা, তার সঙ্গে পরিচিত। আমি জেল পরিদর্শনে গিয়েছি, কিউবার যাজক এবং সাধারণ মানুষ যারা সমাজবাদের বিরোধী, তাদের সঙ্গে বসবাস করেছি। তারা যখন আমাকে, অর্থাৎ, একজন ব্রাজিলের অধিবাসীকে বলে যে কিউবায় কোনও গণতন্ত্র নেই, তখন আমি শব্দের বিমূর্ততা থেকে বাস্তব অনুধাবন করার চেষ্টা করি। প্রশ্ন করি- কতগুলো ছবি বা খবর দেখা গেছে যে কিউবানরা কষ্টে আছে, রাস্তার ধারে ভিখারিরা সার দিয়ে বসে আছে, শিশুরা রাস্তায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে বা পরিবারগুলি দীর্ঘ সেতুর নিচে অবস্থান করছে? যেমন দেখা যায় স্পেনের বড় শহরে দীর্ঘ লাইনে বছরের পর বছর চিকিৎসার জন্যে অপেক্ষারত দুঃস্থ মানুষদের!

আমি বন্ধুদের সাবধান করছি:

  • তুমি যদি ব্রাজিলের ধনী মানুষ হও এবং কিউবায় বসবাস করতে যাও তোমার মনে হবে তুমি নরকে এসেছ। তুমি প্রতি বছর তোমার গাড়ি বদলাতে পারবে না, দামী দামী কাপড়জামা কিনতে পারবে না, ছুটিতে বারে বারে বিদেশ ভ্রমণে যেতে পারবে না এবং অন্যের কাজকে শোষণ করতে পারবে না, কর্মীদের লেখাপড়ায় বঞ্চিত রাখতে পারবে না। মেরিয়া নামে যে মেয়েটি তোমার বাড়িতে প্রায় ২০ বছর ধরে কাজ করছে তার জন্যে ‘গর্ব’ অনুভব করবে, কিন্তু তাকে তুমি তোমার বাড়ির অন্দরে প্রবেশের, শিক্ষার এবং স্বাস্থ্যের অধিকার দেবে না।
  • যদি তুমি মধ্যবিত্ত হও তাহলে প্রেতলোকের অভিজ্ঞতার জন্য তৈরি হও, যদিও কিউবা এখন আর রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নয়। আমলাতন্ত্র বজায় আছে, তোমাকে বাজারের লাইনে ধৈর্য বজায় রাখতে হবে; যে জিনিস আজ পাওয়া যাচ্ছে, আমদানির অনিশ্চয়তার জন্য এক মাস পরে তা হয়তো পাওয়া যাবে না।
  • কিন্তু, তুমি যদি মাইনে পাওয়া লোক হও, গরিব হও, গৃহহীন বা জমিহীন হও, তাহলে স্বর্গের অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্যে তৈরি হও: খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসগৃহ এবং কাজের ব্যাপারে বিপ্লব তোমাকে গ্যারান্টি দেবে। তুমি যা খেতে পছন্দ কর সেই সব খেতে না পাওয়ার জন্য অভ্যেস কর। কিন্তু, তুমি ক্ষুধার্ত থাকবে না। তোমার পরিবার শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং এমনকি নিখরচায় জটিল সার্জারির সুযোগ পাবে। তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নাগরিকের অধিকার।

গ্রিসের যে গণতন্ত্রের কথা আমরা জানি তার গুণ আছে। কিন্তু, আমাদের মনে রাখা ভাল যে সেই সময়ে এথেন্সে ২০০০ মানুষকে সেবা করার জন্য ৪,০০,০০০ দাসকে কাজ করতে হত। যদি ঐসব দাসের কাউকে গণতন্ত্রের মহত্ব সম্বন্ধে জিগ্যেস করা হয় তাহলে সে কী উত্তর দেবে?

আমি কিউবার ভবিষ্যৎ’কে ব্রাজিল, গুয়াতেমালা এবং এমনকি পিউয়েরতোরিকো (যা এখন আমেরিকার উপনিবে‌শ, যাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি)’র মতো হতে দিতে চাই না। আমি এও চাই না যে কিউবা আমেরিকাকে আক্রমণ করুক এবং ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল ভাগ দখল করুক, যেমন করেছে আমেরিকা গুয়ান্তানামাতে- যাকে একটা নিপীড়নের কেন্দ্র বানানো হয়েছে তথাকথিত আতঙ্কবাদীদের জন্য।

আমার অনুভবে গণতন্ত্র হচ্ছে ‘আমার মা বাপ’– যাকে জনসাধারণ স্বীকৃতি দিয়েছে- এবং ‘আমাদের রুটি’– প্রকৃতির দান ও মানুষের শ্রমকে ভাগাভাগি করে বাঁচা। জনগণের দ্বারা নির্বাচনই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করে না। ব্রাজিল এবং ভারত যাদের আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলি, সেখানে দেখতে পাই গরিব মানুষের প্রকট দুর্দশা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, নিপীড়ন এবং দুঃখকষ্ট। যারা কিউবার ১৯৫৯ সালের আগের অবস্থা জানে তারা বলতে পারবে কাস্ত্রো কেন বিপ্লবের জয়ের জন্য এত সমর্থন পেয়েছিল। বিপ্লবের আগে কিউবার পরিচিতি ছিল ক্যারিবিয়া’র গণিকাগার হিসেবে। ব্যাঙ্ক এবং পর্যটন শিল্পকে মাফিয়ারা নিয়ন্ত্রণ করত যেগুলি নিয়ে বেশ কয়েকটা চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। হাভানার যে প্রধান সন্নিহিত অঞ্চল তাকে এখনও ভেলাডো বলা হয়। কারণ, সেখানে কালোদের ঢুকতে দেওয়া হয় না।

তাঁবে থাকা কিউবাকে হারিয়ে আমেরিকা কখনও খুশি হয়নি। তাই, সিয়ারা মায়েস্ত্রা গেরিলাদের হাতে আসার পরে আমেরিকা ভাড়াটে সৈন্যদের সাহায্যে কিউবা আক্রমণ করার চেষ্টা করে। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে তারা পরাজিত হয়। পরের বছর প্রেসিডেন্ট কেনেডি কিউবায় অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে যা আজও বজায় আছে।

কিউবা একটা ছোট্ট দ্বীপ যার প্রাকৃতিক সম্পদ খুবই সীমিত। তার আবশ্যিক প্রয়োজনীয় পদার্থের প্রায় ৬০ শতাংশ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ট্রাম্প এই অবরোধ আরও জোরদার করে (২৪৩টা নতুন কার্যকারী অবরোধ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে যা এখনও প্রেসিডেন্ট বাইডেন তুলে নেয়নি)। বর্তমান কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারির জন্য কিউবার প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন শিল্প একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই, আভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে। কিউবানদের মিতব্যয়ী হতে হয়েছে। যারা কিউবার বিপ্লবে অখুশি ও আমেরিকান স্বপ্নে বিভোর, তারা গত ২১ জুলাই CIA'এর সংহতিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। CIA'এর প্রধান এই মহাদেশ ঘুরে গেছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল ছাড়া অন্য কে আজ কিউবার বর্তমান অবস্থা বুঝতে পারবে? আর্থিক, বাণিজ্যিক এবং শক্তি উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবরোধ শুরু হয়ে গেছে। হোয়াইট হাউস কিউবাতে একটা আভ্যন্তরীণ সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটাতে চায় যার ফলে কিউবার মানুষ ‘মানবিক মিশন’ চাইবে। এই ছুতোয় আক্রমণ এবং সামরিক হস্তক্ষেপ করা হবে।

আমার মনে পড়ছে, ২০১৯ সালের দ্বিতীয়ার্ধে আমি বলেছিলাম যে আমরা এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমেরিকা অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটা বাধার সৃষ্টি করে কিউবার অর্থনীতি ও শক্তি উদ্যোগকে পিষে মারার চেষ্টা করেছে। এর পরে আসে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ২৪৩টা কার্যকরী ব্যবস্থা। ট্রাম্প কিউবাকে 'সন্ত্রাসবাদ প্রসার করছে' বলে চিহ্নিত করে। এইসব বাধানিষেধের ফলে বিদেশি মুদ্রা অর্জন করার যে সব উৎস ছিল- যেমন পর্যটন, কিউবান-আমেরিকানদের কিউবাতে ভ্রমণ বা বিদেশি মুদ্রা পাঠানো- বন্ধ হয়ে যায়। বিদেশি মুদ্রার একটা বড় উৎস কিউবান মেডিক্যাল ব্রিগেড এবং অন্য দেশের দিক থেকে কিউবার প্রতি সংহতি- তাকে বদনাম করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এইসব অবরোধের ফলে দেশে খাদ্য, ওষুধপত্র এবং কাঁচামালের অভাব দেখা দেয় যার ফলে অর্থনীতি ও উৎপাদনে খারাপ প্রভাব পড়ে। দেশের রফতানি ও সম্পদের বিনিয়োগ কমে যায়। দেশে জ্বালানি এবং স্পেয়ার পার্টস'এর অভাব দেখা দেয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে শুরু করে। এটা হচ্ছে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-১৯৯৫ সালের মধ্যে কিউবার অর্থনীতিতে যে বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছিল তাকে সমাধান করা গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হল মিডিয়ার নিয়মিত অপপ্রচার যা এক রীতি বর্জিত যুদ্ধ, যা পার্টি, রাষ্ট্র এবং দেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে মানুষকে ভুল বোঝাবার চেষ্টা করল যে কিউবা’র সরকার মানুষের কল্যাণ সাধনে অপারগ। 

এই অবস্থার মধ্যেই করোনা মহামারি সারা পৃথিবীতে দেখা দিল। এটা বলা উচিত যে আমেরিকার মতো ধনী দেশেরও এই সমস্যাকে মোকাবিলা করার সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। প্রতি লক্ষ মানুষের হিসেবে আমেরিকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু কিউবার চেয়ে অনেক বেশি ছিল; যেখানে আমেরিকায় প্রতি দশ লাখে ১৭২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে কিউবায় তা মাত্র ৪৭ জন। যখন আমেরিকা ভ্যাকসিনের জাতীয়তাবাদে নিমজ্জিত তখন কিউবার ডাক্তারদের ‘হেনরি রিভ ব্রিগেড’ সবচেয়ে গরিব দেশগুলোতে কাজ করেছে। এই কাজের জন্য কিউবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত।

সরাসরি কিউবা আক্রমণ করার সাফল্য লাভ না করলেও আমেরিকা তার কঠিন অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবা চেষ্টা করেছে সেই অবরোধকে মোকাবিলা করার। কিন্তু, আমেরিকা সব সময় ক্যারিবিয়ান ওই দেশটিকে অধিকার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। ১৯৯২ সালের শুরুতে রাষ্ট্রসংঘ সর্বস্বীকৃত ভাবে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ বন্ধ করার জন্য ভোট দেয়। কিউবার সরকার রিপোর্ট করে যে এপ্রিল ২০১৯ থেকে মার্চ ২০২০ সালের মধ্যে অবরোধের জন্য কিউবা ৫০ লক্ষ ডলারের সম্ভাব্য বাণিজ্য হারিয়েছে। গত ছয় দশকে কিউবা হারিয়েছে ১৪.৪ কোটি ডলার। বর্তমানে কিউবাতে যাতে বিদেশ থেকে তেল ঢুকতে না পারে তার জন্য আমেরিকা জাহাজ কোম্পানিগুলির ওপর অবরোধ জারি করেছে।

এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য রাস্তায় মিছিল হচ্ছে। কিন্তু, কিউবার সরকার রাস্তায় ট্যাঙ্ক ও মিলিটারি নামাচ্ছে না। মারতি, চে গুয়েভারা এবং ফিদেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত কিউবার জনগণ প্রমাণ করেছে তারা অজেয়। আমরা যারা একটা ন্যায়পূর্ণ পৃথিবী চাই, তাদের কিউবার সঙ্গে সংহতিতে তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।                          

(১ অগস্ট ২০২১ ইংরেজি সমাজবাদী সাপ্তাহিক Janata Weekly-তে প্রকাশিত)।

 

Thursday, 23 September 2021

সবাই এত চুপ কেন?

গুজরাত ও নভি মুম্বইয়ের বন্দরগুলি কি 

মাদক পাচারের আখড়া হয়ে উঠেছে?

শোভনলাল চক্রবর্তী

সম্প্রতি গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দরে ডাইরেক্টরেট অফ রেভেনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই)'এর আমেদাবাদ সার্কল আটক করল তিন হাজার কেজি হেরোইন; আন্তর্জাতিক বাজারে যার অর্থমূল্য একুশ হাজার কোটি টাকা। প্রথমেই বলা দরকার যে, হেরোইন অনেক ছোট ওজনের একক মিলিগ্রাম বা গ্রামে বিক্রি হয়। সুশান্ত সিং রাজপুত আত্মহত্যার তদন্তে নেমে নায়িকা রিয়া চক্রবর্তীর কাছে নাকি ১০ গ্রাম মারিজুয়ানা পাওয়া গিয়েছিল। পরে দীপিকা পাড়ুকোনের কাছেও পাওয়া কিছু মাদক নিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলতে থাকা ব্রেকিং নিউজ আমাদের অনেকের স্মৃতিতেই আজও উজ্জ্বল। 

সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ! আজ যখন ডিআরআই জানাচ্ছে যে মুন্দ্রা বন্দরে আটক হেরোইন পৃথিবীর সব চেয়ে বড় হেরোইন আটক অভিযানের অন্যতম, তখনও কোনও হেলদোল নেই মিডিয়ার। কেন এই নিরুৎসাহ? আমরা আসব সেই প্রশ্নের উত্তরে। তার আগে একটু আন্দাজ করে নেওয়া যাক একুশ হাজার কোটি টাকা ঠিক কত টাকা? 

দুটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা হয়তো বুঝতে সুবিধা হবে। প্রথমত, সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রজেক্টের মোট ব্যয় কুড়ি হাজার কোটি টাকা; আর দ্বিতীয়ত, গোটা ভারতবর্ষে কোভিড টিকাকরণের মোট খরচ কুড়ি হাজার কোটি টাকা। ভাবুন, যে টাকায় পুরো দেশের মানুষকে টিকা দেওয়া হয়ে যেতে পারে, সেই বিপুল অর্থের হেরোইন আমদানি হচ্ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়ারা শহরের আশি ট্রেডিং কোম্পানির নামে। কোম্পানির খাতা অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে তারা অভ্র দানা আমদানি করছিল এবং জাহাজটি মুন্দ্রা বন্দরে এসেছিল ইরানের আব্বাস বন্দর থেকে। ডিআরআই সন্দেহ করে যে আফগানিস্তান থেকে যেহেতু আমদানি হচ্ছে, তাই এর মধ্যে অন্য কিছু থাকতে পারে। কারণ, আফগানিস্তানের মূল রফতানি যোগ্য উপাদান এখন মাদক ও হেরোইন। ডিআরআই দল গান্ধীনগরে অবস্থিত একটি ফরেনসিক ল্যাবরেটরির বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওই বন্দরে হানা দেয় এবং আমদানি হওয়া বাক্সগুলি খুলে পরীক্ষা করে। বাক্সের পাউডার দ্রব্যের মধ্যে হেরোইনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে এই বিপুল পরিমাণ হেরোইন আটকের খবর তারা প্রচার করে। তারা বিস্তারিত ভাবে জানায় যে মোট দুটি বাক্সের প্রথমটি থেকে আটক হয় প্রায় দু' হাজার কেজি হেরোইন এবং দ্বিতীয়টি থেকে এক হাজার কেজি। এর পাশাপাশি দিল্লি, চেন্নাই, আমেদাবাদ, গান্ধীধাম ও মান্ধাভি শহরেও তল্লাশি শুরু হয়। এখনও পর্যন্ত দু'জনকে এই হেরোইন কাণ্ডে আটক করা হয়েছে এবং দিল্লির দু'জন আফগানবাসীর উপর নজরদারি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। 

হেরোইন আটক অবশ্য এই প্রথম নয়। গত জুলাই মাসে নভি মুম্বইয়ের নব সেবা বন্দরে, ওই সেই আফগানিস্তান থেকে ইরানের আব্বাস বন্দর হয়ে আসা তিনশো কেজি হেরোইন আটক হয়েছিল। সেবারও পাউডার গুঁড়োর মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল হেরোইন। ২০২০ সালের অগস্ট মাসে এই মুন্দ্রা বন্দরেই আটক হয়েছিল ১৯০ কেজি হেরোইন, যা বাঁশের গায়ে পাইপের রং করে সেই বাঁশের ভিতর লুকনো ছিল। সেবার অবশ্য পাকিস্তান থেকে ইরানের চাবাহার বন্দর হয়ে এসেছিল ওই হেরোইন। সেই সময়ে দু'জন কাস্টমস এজেন্ট সহ পাঁচজন ড্রাগ ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। তারপর যা হয়, প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে এক সময় ছাড়া পেয়ে যান তাঁরা। 

মুন্দ্রা বন্দরে ৩০০০ কেজি হেরোইন যেদিন আটক হয়, তার ঠিক দু' দিন পরে ভারতীয় জল সীমান্ত রক্ষীরা সাতজন ইরানি মৎসজীবীকে আটক করেন। তাঁদের  উপর তল্লাশি চালিয়ে তিরিশ কেজি হেরোইন পাওয়া যায়। মৎস্যজীবীরা জেরার মুখে জানান যে এই হেরোইন গুজরাতে তাঁদের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এবং গুজরাত হয়ে ওই হেরোইন চলে যেত পঞ্জাব মারফত দিল্লিতে। 


এতক্ষণ এই হেরোইন পাচার আর আটকের কাহিনিতে পাঠকেরা আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করলেন যে এখানে বারবার করে ফিরে আসছে গুজরাত আর নভি মুম্বইয়ের বন্দরগুলির নাম, তার সঙ্গে পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের নাম। পাকিস্তান আফগানিস্তান আজ ভাই-ভাই। আফগানিস্তানের তালিবানদের অর্থের মূল উৎস হেরোইনের ব্যবসা। অনেকে বলছেন, সেই কোটি কোটি মার্কিন ডলারের হেরোইন ব্যবসার ভাগ না পেয়েই নাকি আমেরিকা আফগানিস্তান ত্যাগ করেছে। আমাদের দেশের ড্রাগ ব্যবসার কেন্দ্র ছিল বরাবরই মুম্বই, তবে ইদানীং ব্যাটন বদল হয়েছে। এখন গুজরাত হয়ে পঞ্জাবে ঢোকে ড্রাগ। ড্রাগের স্বর্গ রাজ্য এখন পঞ্জাব। সারা দেশ জুড়ে ড্রাগ ব্যবসার যে জাল, তার কেন্দ্র অবশ্যই দিল্লি। আগে ড্রাগ আসত প্লেনে করে বিমানবন্দর হয়ে। সেখানে নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ড্রাগ এখন আসছে জলপথে- আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে পশ্চিম ভারতের বন্দরে। এই বন্দরগুলির মালিকানা এখন আর সরকারি হাতে নেই। সরকার এগুলিকে তুলে দিয়েছে বেসরকারি পুঁজিপতিদের হাতে। গুজরাত ও নভি মুম্বইয়ের যে কটি বন্দরের নাম এই হেরোইন চক্রে উঠে আসছে তার সবগুলির মালিকানা এখন আদানিদের হাতে। 

এখানে দুটি সম্ভাবনা আছে। এক, আদানিরা সবটা জানেন। জেনে এই মাদক পাচারে তাঁরা তাঁদের বন্দর দিয়ে বেনামে একটা সেফ প্যাসেজ দিচ্ছেন, অবশ্যই মোটা অর্থের বিনিময়ে। আর দুই, তাঁরা কিছুই জানেন না। যদি দ্বিতীয়টা হয় তবে কি ডিআরআই বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ম্যারাথন জেরায় বসবে? এক' দু টাকা নয়, একুশ হাজার কোটি টাকার মাদক আটক হয়েছে। গুজরাত ও কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে আদানিরা কীভাবে যুক্ত তা আমরা সবাই জানি। তবে কি এবার নির্বাচন কমিশন, সিবিআই-এর মতো ডিআরআই'কেও খাঁচার তোতা করে রেখে দেওয়া হবে? ডানা ছেঁটে দেওয়া হবে? অন্য দেশে এত বিশাল পরিমাণ মাদক আটক হলে, যাঁরা ওই মাদক আটক করলেন তাঁরা বিশেষ পুরস্কার পেতেন। এখানে ঠিক তার উল্টো, চারিদিকে শ্মশানের নীরবতা। কোন মিডিয়া হাউসের ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে আদানিদের মাদক পাচারে নাম জড়াবে? যাদের টাকায় মাইনে হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ? তাও আবার একুশ হাজার কোটি টাকার? ছিঃ ছিঃ, কানে শোনাও পাপ! 

ইতিমধ্যে হাওয়ায় খবর ভাসছে যে বুঁদির কেল্লার মতো দাঁড়িয়ে থাকা এনডিটিভি'কে কিনতে চলেছেন ওই আদানিরা। ফলে, একুশ হাজার কোটি টাকার মামলা এখন তামাদি। কথায় আছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তবে প্রিন্ট মিডিয়া খবর করেছে, ছোট করে। শুনেছি, তাদেরও বাধ্যবাধকতা আছে। পুঁজিপতিরা সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার তাগিদে মিডিয়াকে আগে হাত করেন, তারপর সেখানে শুধুই সরকার বন্দনা। আর সরকার বিনিময়ে দিয়ে থাকে অবাধ ছাড়। যেমন ধরুন, পুরো পশ্চিম ভারতের গুজরাত ও সংলগ্ন বন্দরগুলো জুড়ে যদি আজ মাদক পাচারের একটা নিরাপদ পথ গড়ে ওঠে, তবে সেখানে বিশ্বের বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরা আসবেন। টাকার কোনও হিসেব-নিকেশ সেখানে থাকার কথা কী? ধরুন, এই যে ২১ হাজার কোটি টাকার মাদক আটকে গেল, এটা যদি বন্দর থেকে বেরিয়ে যেত তাহলে আদানিরা তার লভ্যাংশ পেতেন না, এ কথা শুনলে তো ঘোড়াও হাসবে! ওই টাকার ২ শতাংশ খরচে কেন্দ্রের সরকারকে চিরস্থায়ী করা কোনও ব্যাপার নাকি? ভারতে এখন বিরোধী দল, নির্বাচন, গণতন্ত্র সব কেমন যেন পরাবাস্তব হয়ে উঠেছে। একটি দল ও গুটিকয়েক পুঁজিপতি- এরই নাম এখন ভারতবর্ষ। যে কয়টি ব্যবসায় লাভের কোনও উর্ধ্বসীমা হয় না, তার একটি মাদক ব্যবসা। 

দেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যের এবং পেয়ারের এক শিল্পপতির অধীনে থাকা বন্দর দিয়ে হেরোইন পাচার হচ্ছে এটা এখন আলোর মতো স্পষ্ট। এত বিপুল পরিমাণ হেরোইন আটকা পড়ে গেল কী করে তা নিয়ে বরং তদন্ত হোক! ডিআরআই সংস্থাটি দেখা যাচ্ছে রীতিমতো 'দেশদ্রোহী'- কোনও তালজ্ঞান নেই, মাদক আটকে দিলেই হল! এই সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলে হয়তো আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাঘ্রচর্মাবৃত শেয়ালরা একসঙ্গে হুক্কা-হুয়া করে ডেকে উঠতে পারে।


Tuesday, 21 September 2021

এনএসএসও'র সমীক্ষা

বাংলার কৃষকের আয় এত কম কেন?

সোমনাথ গুহ

কেন্দ্রীয় সংস্থা এনএসএসও (ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন)'র সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের কৃষক পরিবারের গড় মাসিক আয় ৬৭৬২ টাকা; যেখানে দেশের কৃষক পরিবারের গড় মাসিক আয় ১০,২১৮ টাকা। এই সমীক্ষা ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। কৃষক পরিবার বলতে বোঝায়, যাঁরা বছরে অন্তত ৪০০০ টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন করেন এবং যে পরিবারের অন্তত একজন কৃষিকাজে যুক্ত। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, এই মাসিক আয়ের মাত্র ২২.৮ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫৪৭ টাকা আসে চাষ থেকে; দিনমজুরি, এনরেগায় কাজ, বেসরকারি চাকরি, লোকের বাড়ি বিবিধ কাজ ইত্যাদি থেকে আসে ৫৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৭২১ টাকা। অন্যান্য পেশা থেকে আয় আরও প্রায় ১৪ শতাংশ। এর অর্থ, পশ্চিমবাংলার অধিকাংশ কৃষক আংশিক চাষি। এটা অস্বাভাবিক নয়, যখন আমরা দেখি রাজ্যের ৯৬ শতাংশ কৃষক ছোট ও ক্ষুদ্র।

২০১৩ সালে এনএসএসও'র সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের চাষির গড় মাসিক আয় ছিল ৬৪২৬ টাকা। ছয়টি রাজ্যের গড় মাসিক আয় ছিল ৫০০০ টাকার নীচে- বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবাংলা, উত্তরাখণ্ড, ওড়িশা ও উত্তরপ্রদেশ। বিহারের আয় ছিল নিম্নতম: ৩৫৫৮ টাকা, পশ্চিমবাংলার আয় ঠিক তার ওপরে: ৩৯৮০ টাকা। হরিয়ানার আয় ছিল সবচেয়ে অধিক: ১৪,৪৩৪ টাকা। 

নাবার্ড'এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের চাষির গড় আয় বেড়ে হয় ৮৯৩১ টাকা, অর্থাৎ, পাঁচ বছরে বৃদ্ধি মাত্র ২৫০৫ টাকা। যদি মুদ্রাস্ফীতিকে ধরা হয় তাহলে আয়বৃদ্ধি যৎসামান্য, বরং বলা যায় অধোগামী। বিভিন্ন রাজ্য অনুযায়ী পাঁচ বছরে বৃদ্ধির খতিয়ান দেখা যেতে পারে: বিহারের ৩৫৫৮ থেকে বেড়ে হয় ৭১৭৫, পশ্চিমবাংলায় ৩৯৮০ থেকে ৭৭৫৬, উত্তরপ্রদেশে ৪৯২৩ থেকে ৬৬৬৮, অসমে ৬৬৯৫ থেকে ৯৮৭৮, মহারাষ্ট্রে ৭৩৮৬ থেকে ১০,২৮৬, তামিলনাড়ু'তে ৬৯৮০ থেকে ৯৭৭৫ টাকা। সবুজ বিপ্লবের গড় পাঞ্জাব এবং হরিয়ানায় বৃদ্ধি যথাক্রমে ১৮,০৫৯ থেকে ২৩,১৩৩ টাকা এবং ১৪,৪৪৩ থেকে ১৮,৪৯৬ টাকা। 

এই দুটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৬'র পরে পশ্চিমবাংলার চাষির আয় পরবর্তী দু' বছরে কমে গেছে ৭৭৫৬ টাকা থেকে ৬৭৬২ টাকায়। ২০১৯'এর বাজেটের পর 'পিএম কিষাণ' এবং 'কৃষকবন্ধু' প্রকল্পের কারণে কৃষকের আয় তাঁর জমির পরিমাণ অনুযায়ী বর্তমানে কিছু বেড়ে থাকতে পারে। 

এই রাজ্যের কৃষকের আয় এত কম কেন? ২০১১'এর সেন্সাস অনুযায়ী, পশ্চিমবাংলার জনঘনত্ব প্রতি স্কোয়ার কিমিতে ১০২৮, শুধুমাত্র বিহারের আরও বেশি- ১১০৬; সারা ভারতে এটা হচ্ছে ৩৮২। পশ্চিমবঙ্গে জমির ওপর প্রবল চাপ, যার ফলে কৃষক প্রতি জমির পরিমাণ অতি অল্প: ০.৭৭ হেক্টর, অর্থাৎ ৫.৭০ বিঘা। পাঞ্জাবে এটা ৩.৬২ হেক্টর, অর্থাৎ ২৬.৮২ বিঘা। বোঝাই যাচ্ছে, আয় এবং জমির পরিমাণ- এই দুটি মূল ক্ষেত্রে সারা দেশের চিত্রটা প্রবল ভাবে অসমান। এর ফলে কৃষি সমস্যার সর্বভারতীয় যে সমাধান সেটা বাংলার ক্ষেত্রে কার্যকরী নাও হতে পারে। 

পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় কৃষকদের জোত বড় এবং তাঁরা দেশের বাকি চাষিদের থেকে অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন। সবুজ বিপ্লবের অঞ্চল হিসাবে এই কারণে ঐ দুটি রাজ্যকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কৃষকদের এই নতুন চাষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকারি আধিকারিকরা ষাটের দশকে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার করেছিলেন। এই অভিনব চাষে দীক্ষিত করার জন্য পাঞ্জাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, পোকামাকড় কীটপতঙ্গের ওষুধের লাগামছাড়া ব্যবহারের ফলে সাবেক চাষ লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন ব্যাংক কম সুদে, সহজ কিস্তিতে ট্র্যাক্টর কেনার ঋণ দেয়। পুরো পাঞ্জাব ট্র্যাক্টরে ভরে যায়। এই নতুন পদ্ধতিতে চাষ শুরু করার পর এত আনাজ উৎপন্ন হত যে সরকার পুরো কিনে উঠতে পারত না। প্রায় তিন দশক পর, তথাকথিত আধুনিক উপকরণ ব্যবহারের কারণে কৃষিতে যে অভাবনীয় প্রাচুর্য এসেছিল, ঠিক সেই সব কারণের জন্যই সংকট ধীরে ধীরে ঘনীভূত হল- যার বহিঃপ্রকাশ আজ আমরা দিল্লির উপকন্ঠে সমাবেশিত ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্যে প্রত্যক্ষ করছি। 

খাতায় কলমে বাংলায় সবুজ বিপ্লব হয়নি, কিন্তু ঐ বিপ্লবের যাবতীয় কুফল আজ বাংলার কৃষককে ভোগ করতে হচ্ছে। যে বিষাক্ত উপকরণগুলো পাঞ্জাব হরিয়ানায় ব্যবহৃত হয়েছিল, তা এই রাজ্যেও ব্যাপক হারে প্রয়োগ করা হয়েছে। উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, ইন্সেক্টিসাইড, পেস্টিসাইডের দাপটে সাবেক চাষ হারিয়ে যায়। পাঞ্জাবের কৃষক সম্পন্ন হওয়ার কারণে এই নতুন চাষের অত্যধিক খরচ তাঁরা বহন করতে পেরেছিলেন। অল্প জমিতে এত খরচের চাষ করতে গিয়ে বাংলার চাষি মুখ থুবড়ে পড়েন। সবুজ বিপ্লবের ফলে ঐ দুই রাজ্যে প্রায় তিন দশক ধরে কৃষকের উপার্জন উল্লেখজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাংলায় আয় বৃদ্ধির তো প্রশ্নই নেই, উল্টে ছোট জমিতে সবুজ বিপ্লব ধরনের চাষ করতে গিয়ে এখানে সংকট পাঞ্জাব হরিয়ানার চেয়েও আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। 

বাংলায় জনপ্রতি জমি ৫.৭০ বিঘা হলেও এক বিপুল সংখ্যক কৃষকের জমি তিন বিঘার আশেপাশে। আগে একবারই চাষ হত কিন্তু বিঘা প্রতি প্রায় ৩০০-৩৬০ কেজি ধান হত। খরচ তেমন ছিল না, কারণ গরু-ছাগলের গোবর নাদি স্বাভাবিক সার হিসাবে কাজে দিত। প্রতি গ্রামের পরম্পরাগত বীজের ভাণ্ডার ছিল তাই উচ্চফলনশীল, বীজের কোনও প্রয়োজন ছিল না। এখন একটার বদলে দুটো চাষ হয়, কিন্তু বিঘা প্রতি ফলন কম, চাষের খরচ অনেক বেশি, এর ফলে চাষির নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা। 

অনেকের অভিযোগ, সরকার অপদার্থ, বাংলায় মান্ডিগুলো অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু ছোট, ক্ষুদ্র চাষি তাঁদের ঐ অল্প উৎপাদন নিয়ে আদৌ মান্ডিতে যেতে কি উৎসাহী? তাঁরা পরিষ্কার বলেন, গ্রামে মান্ডি থাকলেও সেখানে ফসল বেচার অনেক হ্যাপা। লাইন দাও, স্লিপ কাটো, দালাল ও নেতাদের দাদাগিরি, এর পরেও টাকা জমা পড়বে প্রায় এক সপ্তাহ বাদে। মুনিষ তো ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, তাঁকে তো নগদ টাকা দিতে হবে। সুতরাং, কুইন্টাল প্রতি সরকারি রেট হয়তো ১৮৬০ টাকা, কিন্তু ঘরে এসে যিনি নগদ টাকা দেন চাষি তাঁকেই ১৫০০ টাকায় ধান দিয়ে দেন। যৎসামান্য লাভ হয়, লোকসানও হয়। ছোট চাষির তো সামান্য পুঁজি, সেটা তো তিনি পুরোটাই চাষে নিয়োগ করেছেন। ফসল বেচে সঙ্গে সঙ্গে টাকা না পেলে তিনি খাবেন কী? মান্ডিতে চাষির ব্যাংকের খাতায় ফসলের টাকা জমা না দিয়ে নগদ দেওয়াতেও বিরাট বিপদ, প্রবল দুর্নীতির আশঙ্কা। 

পাঞ্জাব ও বাংলার কৃষকের সমস্যা অনেকটাই ভিন্ন। শুধু মান্ডি বাড়ালে, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিলেই কি বাংলার চাষির সমস্যার সমাধান হবে? এই কারণে ব্যাংকে এক ধরনের রিভল্ভিং কৃষি ঋণ আছে। ধরা যাক, একটা চাষের জন্য তাঁকে ২০,০০০ টাকা ঋণ দেওয়া হল, ফসল বিক্রি করে তিনি ঐ ঋণ শোধ করে দেবেন এবং পুনরায় তাঁকে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দ্বিতীয় চাষের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। দেখা যায়, কৃষি এত অলাভজনক হয়ে পড়ছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথম ঋণটাই কৃষক শোধ করে উঠতে পারেন না, একটা অংশ পড়ে থাকে। তাতে হয় পরের চাষের ঋণ আটকে যায়, নয়তো অনাদায়ী অংশ জমতে জমতে একটা বৃহৎ অঙ্কে দাঁড়িয়ে যায়। চাষি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।  

অন্য সমস্যার মধ্যে আছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলিতে সেচের অপ্রতুলতা। আছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়- উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণায়, বিশেষ করে সুন্দরবনে। প্রতি বছর সেখানে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়া এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। একটা তুফান থেকে সামলে ওঠবার আগেই পরেরটা এসে পড়ে, এর ফলে সুন্দরবনের জনজীবন পুরো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরেই দেখা যায় স্কুলছুট বেড়ে গেছে, নারী পাচার বেড়েছে, বহু মানুষ ভিটে ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। অন্য রাজ্যে কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষের সংখ্যায় পশ্চিমবাংলা চতুর্থ, প্রথম তিনটি হল উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও রাজস্থান। ফলে, যত দিন যাচ্ছে, বাংলার চাষির মোট উপার্জনের মধ্যে কৃষিকাজ থেকে আয়ের পরিমাণ কমছে। ব্যক্তি হিসাবে তিনি ২০ শতাংশ চাষি, বাকিটা অন্য পেশার। এটা অবশ্যম্ভাবী, যত দিন যাবে এই ২০ শতাংশ কমবে- চাষি আর চাষি থাকবেন না। 

বাংলার কৃষককে বাঁচাতে গেলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও অন্যান্য পেশাকে লাভজনক করে তুলতে হবে। সমস্যা গভীর ও জটিল, জেলা বিশেষে, অঞ্চল বিশেষে ভিন্ন। শুধুমাত্র মান্ডি আর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আওড়ালে এই সমস্যা আমরা ছুঁতেও পারব না। 


Sunday, 19 September 2021

‘দ্য গ্রেট রেজিগনেশন’!

চাকরি ছাড়ার হিড়িক কেন?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 

এই বছরের গোড়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বহু দেশে ‘গ্রেট রেজিগনেশন’ বা ‘ইস্তফার মহাহিড়িক’ এক রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। দলে দলে কর্মীরা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন। মার্কিন ব্যুরো অফ লেবর স্ট্যাটিসটিক্স’এর (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় এই বছরের শুধুমাত্র জুন মাসেই ১ লক্ষ ৬৪ হাজার কর্মী স্ব স্ব কর্মক্ষেত্র থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। মাইক্রোসফট’এর একটি সমীক্ষা বলছে, চলতি বছরে কর্মরত ৪১ শতাংশ কর্মী কাজ ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। বিএলএস’এর আরেকটি তথ্য বলছে, মার্কিন দেশে গত এপ্রিল ২০২০’তে যেখানে ৪০ লক্ষ কাজের সুযোগ ছিল তা জুন ২০২১’এ এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটিতে। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ অফুরান কিন্তু কাজের লোক অপ্রতুল। ব্যাপারটি অদ্ভুত হলেও বাস্তব। এমনকি কাজের লোক পেতে ম্যাকডোনাল্ড ও অ্যামাজন’এর মতো সংস্থা তাদের দেয় বোনাস ২০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তবুও যথেষ্ট কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন হল, লোকজন সব যাচ্ছে কোথায়?

বদলে যাওয়া রাজনৈতিক-অর্থনীতির আঙ্গিকের সঙ্গে এই উদ্ভুত পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বহুবার বলা হয়েছে, গত এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত তথ্য-কেন্দ্রিক ভার্চুয়াল বিপ্লবের যে ধারা অপ্রতিহত গতিতে অর্থনীতির প্রায় সমস্ত আঙিনাকে ছেয়ে ফেলেছে, সেখানে কোভিডের উদয় গত দেড় বছরে এই চলমানতাকে আরও তীব্র ও ব্যাপ্ত করেছে। বাড়ি থেকে কাজ, ডিজিটাল মাধ্যমের বহুল ব্যবহার, অ্যাপ’এর ছড়াছড়ি, বাড়ি থেকে দোকানদারি, সোশ্যাল মিডিয়ার গণসংযোগ, বাড়িতে বসেই খেলাধুলো, ঘর থেকেই সেমিনার-আলোচনাসভা-সম্মেলন, ভার্চুয়াল মাধ্যমে স্কুল-কলেজের পড়াশোনা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ব্যাঙ্কের লেনদেন, বিনোদনের রকমফের- সব মিলিয়ে এমন এক নতুন পরিসর নির্মিত হয়েছে যে কাজের বয়ান ও কর্মজগতের সম্পর্কগুলিই গেছে আমূল বদলে। মূলত পরিষেবা ও রিটেল’এর কর্মজগতে এই অভাবনীয় পরিবর্তন এক যুগ সন্ধিক্ষণের আবাহন করেছে। যেন, কর্মজগতের এ তাবৎ আঙ্গিক ও সম্পর্কগুলিই তছনছ হয়ে যেতে বসেছে। তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ব্যবস্থাটাই বুঝি ভেঙে পড়ছে।

আসলে, পরিষেবা ও রিটেল ক্ষেত্র অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে চলে আসায় এবং তদুপরি প্রায়-সম্পূর্ণত ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল হয়ে ওঠায় যে কাজের পরিসর তৈরি হয়েছে তা আরও আরও নতুন কাজেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাড়ি বাড়ি বিবিধ পণ্য বা খাবার পৌঁছে দেওয়ার যে ব্যবস্থাপনা, তাকে কেন্দ্র করেই কাজের বহু নতুন আয়োজন তৈরি হয়েছে- যেমন, ডেলিভারি বয় নিযুক্তি থেকে স্বয়ংক্রিয় অ্যাপ’এর ব্যবস্থাদি, টাকাপয়সার অনলাইন লেনদেন থেকে পণ্যের চাহিদা-জোগানের শৃঙ্খল গড়ে তোলা ও নানাবিধ- তা শুধুমাত্র নতুন কর্মসংস্থানই জোগায়নি, এক জোরালো অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই উদ্ভুত ব্যবস্থাপনা, কোভিডে মানুষের বাধ্যত ঘরবন্দী দশায় আরও বেশি অভিনব হয়ে উঠে মানুষকে ঘরকুনো করে দিয়েছে; আর তা করতে গিয়ে তাকে আবার এমন এমন কাজের আঙ্গিক ও পরিসর নির্মাণ করতে হয়েছে যার স্থায়িত্ব স্বল্পস্থায়ী ও নিযুক্ত কর্মীবাহিনীও চুক্তিভিত্তিক। যারা নিযুক্ত হলেন, তাদের সামনে কাজের এক অপার বিচিত্র দুনিয়া খুলে গেল বটে কিন্তু সেখানে এতই অনিশ্চয়তা ও চাপ যে তারাও মানিয়ে নিতে নিতে এমন ভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন যে তাঁদের পক্ষে কাজ ছেড়ে দেওয়া ও নতুন কাজে যোগ দেওয়া রীতিমতো দস্তুর হয়ে উঠল। কর্মের এই গতিময়তায় ও কাজের অফুরান বিস্তারে, দেখা গেল, বহু ক্ষেত্রেই কর্মীর চাহিদা তাদের জোগানের থেকে অধিক হয়ে উঠছে। ফলে, কর্মীদের দরকষাকষির আপাত সুযোগও গেল বেড়ে। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে এমন পরিস্থিতিই সর্বদা বিরাজ করবে। ভবিষ্যতে এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। সে আলোচনায় পরে আসছি।

তদুপরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসী বিচরণে অন্যতর কাজেরও এমন আঙ্গিক নির্মিত হতে থেকেছে যেখানে স্বাধীন ভাবে সাফল্যের সঙ্গে কর্মরত হতে পারলে রোজগারের পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। যেমন, ইউটিউবার’এর সাফল্য এখন আকাশচুম্বী। সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি জানিয়েছেন, তাঁর বক্তৃতা ইউটিউবে জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি সেখান থেকে রয়্যালটি বাবদ মাসে চার লক্ষ টাকা করে পাচ্ছেন। শুধু তিনি কেন, বহু বহু মানুষ ইউটিউব’এ ভিডিও আপলোড করে (যদি জনপ্রিয়তার মানদণ্ড অতিক্রম করতে পারে) যথেষ্ট রোজগারের উপায় পেয়েছেন। কিছুদিন আগে খবরে প্রকাশ, বাঁকুড়ার এক ঠাকুমা তাঁর নাতির সাহায্যে ইউটিউব’এ রান্নার নানান কলাকৌশলের ভিডিও আপলোড করে বেশ কয়েক লক্ষ টাকা উপার্জনের ব্যবস্থা করেছেন। বলার কথা এই, কাজের এমনতর বহুমাত্রিক বিবিধ ধারা এসে পড়েছে যে তা মানুষের মধ্যে কাজকর্ম সম্পর্কে এক নতুন সংজ্ঞা হাজির করছে। এই কাজগুলি আচম্বিত, স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অনেক সময়েই প্রভূত অর্থের হাতছানিতে ভরপুর। ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে অর্থ রোজগারের আশায় যেহেতু বহু মানুষ সামিল হয়েছেন, ফলে, ভিডিও-মেকিং’এর কারুকৌশল জানাটাও এখন হয়ে উঠেছে রোজগারের অন্যতম আরেক উপায়। এইভাবে অর্থ উপার্জনের একেকটি ক্ষেত্র উন্মোচিত হচ্ছে আর তার পিছু ধরে কাজের আরও কতকগুলি প্রয়োজনীয় পরিসর নির্মাণ হয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে আবার রোজগারের সংস্থান হচ্ছে।

ধরা যাক, স্বউদ্যোগী হয়ে ওঠার স্বপ্ন- যা ‘স্টার্ট-আপ’ অভিধায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে বহু মানুষকে প্রণোদিত করেছে ও এই পথে নামিয়েছে। যে কোনও পরিষেবা প্রদান বা পণ্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন স্বউদ্যোগ গড়ে ওঠাটা আজ প্রকৃতই বাস্তব এবং তার জন্য যে খুব বেশি মূলধনের দরকার পড়ে তাও সব সময় নয়। অতীতে যে কোনও স্বউদ্যোগ গড়ে তোলার পিছনে বাজারের লভ্যতা খুব বড় বিষয় ছিল। কিন্তু আজ সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ের এক সুদূরপ্রসারী আন্তর্জালের দৌলতে ব্যাপারটা খুব অনায়াস হয়ে উঠেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, বহুজনে চাকরি অথবা চুক্তি-ভিত্তিক কাজ ছেড়ে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে ব্রতী হয়েছেন। এই কারণেও ইদানীং অনেকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

 

এ এক আশ্চর্য রাজনৈতিক-অর্থনীতির গলিপথে আমাদের প্রবেশ। যে গলিপথ থেকে আরও হাজারে হাজারে অলিগলি নির্গত হয়ে আমাদের নিয়ে চলেছে এক লোভনীয় অথচ অনিশ্চয়তার ভুবনে। যে গলিতে প্রবেশ করা গেল (কাজের সংস্থান হল), সে গলির পথ কিছুটা গিয়ে যদি দেখা যায় রুদ্ধ, তবে আরও কোনও গলি সে গলি থেকে নির্গত হয়েছে। এইভাবে অলিতে গলিতে ঘুরে নুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে তবেই আজকের নিত্য যাপনকর্ম। এইভাবেই শ্রম আজ যন্ত্রের অ্যালগরিদমে হন্যে হয়ে এ-কাজ সে-কাজে পরিব্যাপ্ত থেকে কিছু না কিছু রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। তবে, চুক্তির শর্তানুযায়ী যেটুকু ব্যবসা শ্রমের অধিকারী ব্যক্তি-শ্রমিক কোম্পানিকে দিতে পারছেন তার কিয়দংশ মাত্রই তিনি ফেরত পাচ্ছেন। অন্যত্র ভাগের কড়ি যদি বেশি হয় তবে অনায়াসে তিনি সেদিকে গমন করতে পারেন। তাই গলির ভেতর গলি, অযূত গলির ভেতর দিয়ে শ্রমের অনির্দেশ্য যাত্রাপথ। আর এই যাত্রাপথের দিকনির্দেশ ক্রমেই হাতে নিয়ে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এমন এক ডিজিটাল যন্ত্রব্যবস্থা যা কৃষ্ণ গহ্বরের মতো প্রবল আকর্ষণে পুঁজির সিংহভাগকে টেনে নিচ্ছে নিজ কক্ষে। পুঁজির কাছে এই প্রবল আকর্ষণটি হল মুনাফার ক্রম উচ্চ হার যা অর্জিত হয় শ্রম-ব্যয়কে সংকুচিত করে। শ্রম ঘুরে বেড়াচ্ছে ফ্রি মলিকিউলের মতো, তার দায়-দায়িত্ব আর পুঁজির নেই।

কিন্তু এই ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরেই আবার শ্রমের চাহিদা-জোগানের নিজস্ব চালিকাশক্তিটিও সক্রিয়। যদি শ্রমের সামনে প্রভূত কাজের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যায়, তবে শ্রমের এক নিজস্ব প্রতিরোধ শক্তি গড়ে ওঠে। তা এই অর্থে, শ্রম তখন এক কাজ ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাওয়ার ফুরসত ও ভরসা পায়। আর যেহেতু আজ মনুষ্য শ্রমের একটা বড় অংশ বিশেষ দক্ষতা ও জ্ঞান নির্ভর, অতএব, কোনও কোনও সন্ধিক্ষণে বিশেষ দক্ষতা-জ্ঞানলব্ধ শ্রমের আকাল পুঁজির পক্ষে সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠতে পারে। আজকের ‘গ্রেট রেজিগনেশন’ বা ‘ইস্তফার মহাহিড়িক’এর প্রবণতা সেই সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে। আর তা শুধু উন্নত দেশেই নয়, আমাদের দেশেও সক্রিয় হয়েছে। কারণ, আধুনিক রাজনৈতিক-অর্থনীতি কোনও দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই আর। তার ভার্চুয়াল অস্তিত্ব তাকে বিশ্বায়িত করেছে বহু আগেই।

 

খবরে প্রকাশ, সম্প্রতি দেশের বড় বড় আইটি কোম্পানিগুলির (টিসিএস, উইপ্রো, ইনফোসিস ইত্যাদি) কর্মী চাহিদা প্রায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মীদের তারা বেশ উচ্চ হারে বেতন ও বোনাস (৭০ থেকে ১২০ শতাংশ বর্ধিত হারে) দিতে রাজী হয়েছে। অথচ, মাত্র গত বছরেই এই সময়ে তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নিয়োগের হার ৫০ শতাংশেরও বেশি পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তির ক্রম বিবর্তনে, বিশেষত কোভিড কালে আরও উন্নত প্রযুক্তির আবাহনে, এমন সমস্ত দক্ষতা ও জ্ঞানলব্ধ শ্রমের দরকার পড়েছে যে তা না হলে বৃহৎ ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির পক্ষে পুঁজির বাজারে অগ্রণী হয়ে টিকে থাকাটা কষ্টকর। যে দক্ষতা-নির্ভর মনুষ্য শ্রমের চাহিদা সব থেকে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে: অ্যাপলিকেশন ডেভেলপার, সেলসফোর্স ডেভেলপার ও সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার। এই চাহিদা ও খরচের ফলে ২০২১-২২ সালের আর্থিক বছরে মজুরি খাতে আইটি কোম্পানিগুলির প্রায় ১.৬ থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। যদি শ্রমের পিছনে এই ব্যয় বৃদ্ধি করতে কোম্পানিগুলি বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হত, তবে তারা আগামী দিনে পুঁজির বাজার থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেত। ‘ইস্তফার মহাহিড়িকে’ তারা জেরবার হত। বা হয়তো, কিছুটা হয়েওছে।

অর্থাৎ, এক শ্রেণির দক্ষতা-জ্ঞানলব্ধ শ্রমের যে উচ্চমূল্যের বাজার তৈরি হয়েছে, তার বাধ্যত ব্যবহারের কারণেই এই উচ্চমূল্যের ধারক শ্রমিক বা কর্মীরা শ্রমের বাজারে পুঁজির সঙ্গে বেশ জোরালো দর কষাকষিতে নিযুক্ত হতে পারছেন। তাঁদের ট্রেড ইউনিয়নের কোনও দরকার পড়ছে না, নিজেদের জ্ঞানমূল্যের জোরেই তাঁরা আদায় করে নিচ্ছেন সম্ভ্রম ও উচ্চ মজুরি। এঁরাই এক অর্থে আজকের আধুনিক শ্রমিকের এক বড় অংশ। আর তা পুরনো জমানার মতো গুটি কয়েক পেশাদারি লোকজনের এক্তিয়ারভুক্ত নয়, লাখে লাখে এমনতর শ্রমিক-কর্মীর উপস্থিতি। তথ্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দুনিয়ায় পুঁজির বিপুল সমাবেশ ও অপ্রতিরোধ্য গতির পক্ষেই তাই এই ধরনের উচ্চ মজুরি প্রদান করা বাস্তবে সম্ভব। কারণ, নিকট ভবিষ্যতে এই দক্ষতা-জ্ঞানলব্ধ শ্রমের কার্যকারিতা ফুরিয়ে আসবে কোনও উন্নততর যন্ত্র-প্রযুক্তিতে উত্তরণের মাধ্যমে আর তখন আবার দেখা যাবে যে মনুষ্য শ্রমের আপেক্ষিক প্রয়োজন কমে এসেছে এবং ‘গ্রেট রেজিগনেশন’এর ইতি ঘটেছে। এইভাবেই আমরা প্রযুক্তির নবতর উন্মেষের মধ্য দিয়ে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে প্রবেশ করেছি যেখানে চেষ্টা চলেছে মনুষ্য শ্রমের ভারকে লাঘব করে মজুরি খরচ কমিয়ে মুনাফার হারকে উর্ধ্বমুখি রাখা। কিন্তু মানুষ ছাড়া যেহেতু উন্নত প্রযুক্তির নির্মাণ ও তার ব্যবহার প্রায়শই অসম্ভব, তাই নিয়ম করেই এমন এমন সময় আসে যখন মনুষ্য শ্রমের চাহিদা কিছু সময়ের জন্য বেড়ে যায়- আখেরে দীর্ঘমেয়াদে মনুষ্য শ্রমকে বাতিল, অকেজো অথবা দুঃস্থ করে দিতেই।

কিন্তু প্রশ্ন হল, আমাদের মতো দেশে এখনও যারা নিতান্তই মুটে-মজুর, গায়ে গতরে খাটা শ্রমজীবী মানুষ, যাদের দক্ষতার মূল্য প্রায় বিলীন, সাবেক কর্মক্ষেত্রে যাদের বিচরণ- তাহলে তাদের বেঁচে থাকার উপায় কী? এই প্রশ্নটির উত্তর নিয়েই সকলের এখন মাথাব্যথা। সে আবার অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। কিন্তু গিগ অর্থনীতি যে ধীরে ধীরে সমাজ জীবনকে ছেয়ে ফেলছে, সে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার আর কোনও উপায় নেই। কারণ, পুঁজি ও মুনাফার বৃহদাংশ এখন গুটি কয়েক কর্পোরেটের কাছেই গচ্ছিত। তারা ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে দখল নিচ্ছে বিশ্বের সমগ্র রাজনৈতিক-অর্থনীতিকে।