Saturday, 18 September 2021

বাণিজ্যে বসতে ক্রিকেট

১৯৭১ থেকে ২০২১

ভারতীয় ক্রিকেটের বিস্ময়বর্ষ থেকে অধঃপতন

শোভনলাল চক্রবর্তী


১৯৭১-এর শুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট দল সফর করে প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পরে ইংল্যান্ড। বিদেশের মাটিতে উপর্যুপরি দুটি সিরিজ জয় ভারতীয় ক্রিকেটকে রাতারাতি বিশ্ব ক্রিকেটের আঙিনায় এক স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। ওই বছরটি ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে স্থান পায় বিস্ময়বর্ষ হিসাবে।

আজ ৫০ বছর পর বদলে গেছে ক্রিকেটের খোলনলচে। সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওভাল টেস্ট জয়ের পর অনেক ক্রিকেট প্রতিবেদক এই জয়কে ১৯৭১-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু ঈগল আর চিলের মধ্যে কি তুলনা টানা চলে? ক্রিকেটের বাণিজ্যকরণের ঠেলায় আজ তো ক্রিকেট থেকে ক্রিকেটটাই বাদ পড়তে বসেছে। যে ভাবে এবং যে সব কারণে ইংল্যান্ডের সঙ্গে পঞ্চম টেস্ট বাতিল হল, তাতে ভারতীয়  ক্রিকেটের অধঃপতন স্পষ্টভাবে লেখা রয়ে যাবে। যে ভাবে রাতারাতি ক্রিকেটারদের ইংল্যান্ড থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হল আইপিএল খেলার জন্য, তাতে বলাই যায় যে ছোট ফরম্যাটের ক্রিকেট- যেমন ৫০ ওভারের বা ২০ ওভারের- টেস্ট ক্রিকেটকে হত্যা করেছে।

১৯৭১ আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল, কিন্তু তার পাশে ২০২১ নেহাতই সাধারণ আর একটা জয়। ১৯৭১-এর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের  দল ঘোষণার পর দেশ জুড়ে শুরু হয়েছিল প্রবল বিতর্ক। কারণ, দল থেকে বাদ পড়েছিলেন ব্যাটসম্যান মনসুর আলি খান পতৌদি, চাঁদু বোরদে, স্পিন বোলার চন্দ্রশেখর, অলরাউন্ডার রুসি সুর্তি এবং উইকেটরক্ষক ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনও ততটা শক্তিশালী দল হয়ে ওঠেনি। সেই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলেও চলছিল একটা পর্বান্তর। গ্যারি সোবার্স, রোহান কানহাই'রা তখন তাঁদের ব্যাটন তুলে দিচ্ছেন নতুনদের হাতে যাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ক্লাইভ লয়েড, রয় ফ্রেডরিক্স এবং ভ্যানবার্ন হোল্ডার। ছয় টেস্টের সিরিজে ভারতীয় দলের নতুন অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকর, সহ-অধিনায়ক ভেঙ্কটরাঘবন এবং বেশ কিছু নতুন মুখ। 

ভারতীয় দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ পৌঁছতেই কাগজের হেডলাইন হল- দল পৌঁছেছে কিন্তু পুরো টিমের কিটস সব লোপাট, পাওয়া যাচ্ছে না। নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দরে বিমান বদলের সময় নাকি দলের সব খেলোয়াড়ের কিটস ভুল বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া তোলপাড়। এদিকে কিংস্টন, জামাইকা পৌঁছে বসে আছে দল, প্র্যাকটিস করতে পারছে না। এর মধ্যেই চলে এল আরও এক দুঃসংবাদ। দলের দুই নতুন সদস্য সুনীল গাভাস্কার ও গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ অসুস্থ। গাভাস্কারকে নাকি অস্ত্রোপচার করাতে হবে! শেষে জানা গেল, গাভাস্কারের একটি আঙুলে নখকুনি হয়ে তাতে পুঁজ জমে গেছে, তার জন্য তাঁর একটা ছোট্ট অস্ত্রোপচার জরুরি। এদিকে নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ চিঠি লিখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে জানিয়ে দিল যে তাদের তরফে কোনও ভুল হয়নি, তারা ঠিক বিমানেই কিটস তুলে দিয়েছে এবং সেই নথিও তারা তুলে দিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের হাতে। ভারতীয় দলের সেই সফরের ম্যানেজার ছিলেন কেকি তারাপোরে। তিনি তখন কাগজপত্র নিয়ে ছুটলেন কিংস্টন বিমানবন্দরে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল, বেওয়ারিশ মালপত্রের ভিড়ে পরে আছে ভারতীয় খেলোয়াড়দের সমস্ত কিটস! আর একদিন পরেই  সেগুলো ফেলে দেওয়া হত আবর্জনার স্তূপে। 

এই অবস্থায় শুরু হল সিরিজ। সাবিনা পার্ক, কিংস্টনের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন ভেস্তে যায় বৃষ্টির কারণে। দ্বিতীয় দিনে টসে জিতে ভারতকে দুরমুশ করার অভিসন্ধি নিয়ে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়ক জীবন্ত কিংবদন্তি গ্যারি সোবার্স। ভারতের পাঁচ উইকেট পড়ে যায় মাত্র ৭৫ রানে। মনে আছে ইংরেজি ধারাবিবরণী দিচ্ছিলেন টনি কোজিয়ার। তিনি বলেছিলেন, এই ভারতীয় দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে কোনও ক্লাব দলের বিপক্ষেও খেলার অযোগ্য। সেই কথা কি পৌঁছেছিল মাঠে ব্যাটিংরত দিলীপ সারদেশাই-এর কানে? কোজিয়ারকে মোক্ষম জবাব দিয়েছিল সারদেশাইয়ের অনবদ্য ব্যাটিং। তাঁর চওড়া ব্যাটের কল্যাণে ভারত ইনিংস শেষ করল ৩৮৭-তে, সারদেশাই অপরাজিত ২১২! সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন সোলকার ও ভেঙ্কটরাঘবন।

দিলীপ সারদেশাই
 

এর পর আরও চমক বাকি ছিল। ভারতের স্পিন বোলিংয়ে কুপোকাত হলেন সোবার্স, কানহাইয়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ভারতের অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকার যখন সোবার্সের কাছে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ফলো-অন করতে বলছিলেন, তখন নাকি তাঁর গলা কাঁপছিল। কারণ? কারণ বাঁ-হাতি ওয়াদেকারের খেলোয়াড় জীবনের রোল মডেল ছিলেন বাঁ-হাতি সোবার্স। সেই গুরুকে ফলো-অন করাতে লজ্জিত হয়েছিলেন ওয়াদেকার। এই ছিল সেদিনের ক্রিকেট ও এক খেলোয়াড়ের প্রতি অন্যের সম্মানের নমুনা।

আসলে ক্রিকেট একটা সংস্কৃতি, একটা বোধ। এসব আজ ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছে আরও অনেক কিছুর মতো। ফলো-অন করতে নেমে অবশ্য চোখ ঝলসানো ক্যালিপসো ব্যাটিং করেছিলেন রোহান কানহাই, খেলেছিলেন ১৫৮ রানের একটি শৈল্পিক ইনিংস। ওই টেস্ট ড্র হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় ড্রেসিংরুমে রোহান কানহাইয়ের সেই অপরূপ ব্যাটিং এক ২১ বছরের নবাগত ভারতীয় ব্যাটসম্যানকে এমন উদ্বুদ্ধ করেছিল যে সারা জীবন তিনি তা ভোলেননি। অনেক পরে নিজ পুত্রের নাম রেখেছিলেন তাঁর নামে: রোহান। প্রথম টেস্টে সেই নবাগতের দলে স্থান হয়নি। তাঁর অভিষেক হয়েছিল দ্বিতীয় টেস্টে। একদম ঠিক ধরেছেন। সেই নবাগতের নাম সুনীল গাভাস্কার। 

সেই ঐতিহাসিক টেস্টটি খেলা হয়েছিল পোর্ট অফ স্পেনের কুইন্স পার্ক ওভাল মাঠে। সোবার্স টসে জিতে এবার ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভারতীয় স্পিন বোলিংয়ের সামনে তাঁর দল ধরাশায়ী হয় ২১৪ রানে। অন্য দিকে সারদেশাই প্রথম টেস্টে যেখানে শেষ করেছিলেন, শুরু করলেন ঠিক সেখান থেকে। খেললেন ১১২ রানের একটি অসামান্য ইনিংস। যার দৌলতে ভারতের রান উঠল ৩৫২। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নবাগত অফ স্পিনার জ্যাক নরেইগা পেলেন ৯৫ রানের বিনিময়ে ৯ উইকেট, যা আজও ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলিংয়ে এক রেকর্ড। দ্বিতীয় ইনিংসেও তেমন দাঁড়াতে পারল না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইনিংস শেষ হয়ে গেল ২৬১ রানে। ভেঙ্কটরাঘবন পেলেন পাঁচ উইকেট। সেলিম দুরানি বল হাতে শূন্য রানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সোবার্সকে, আর খুব অল্প রানে ক্লাইভ লয়েডকে। ভারতের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১২৪ রানের। তিন উইকেট হারিয়ে ভারতের রান হল ১২৫। গাভাস্কার করেছিলেন ৬৭। ভারত ৭ উইকেটে টেস্ট ম্যাচ জিতল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ভারত সেদিন এক অনন্য কীর্তি স্থাপন করল। 

সেই সময়ে কলকাতার পরিস্থিতি রাজনৈতিক ভাবে ছিল অশান্ত। নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে আসছেন মানুষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরকারী ভারতীয় ক্রিকেট দলে ছিলেন কলকাতার রুসি জিজিবয়। তাঁর মন পরে থাকত কলকাতায়। সঙ্গে গোটা দলের। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তৃতীয় টেস্ট চলাকালীন স্বাধীন হল বাংলাদেশ। পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করল ভারতের হাতে। জর্জটাউনের ওই তৃতীয় টেস্ট ড্র হয়েছিল, কিন্তু গাভাস্কার করেছিলেন জীবনের প্রথম টেস্ট শতরান। 

ব্রিজটাউনের চতুর্থ টেস্টও ড্র হল। ত্রিনিদাদের পঞ্চম ও শেষ টেস্টে প্রথমে ব্যাট করে ভারত রান তোলে ৩৬০। গাভাস্কার সেঞ্চুরি করেন (১২৪) ও সারদেশাই ৭৫। ব্যাট হাতে মূল্যবান ৫১ রান করেন ভেঙ্কটরাঘবন। জেতার জন্য মরিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে রান তোলে ৫২৬। ম্যাচ বাঁচাতে মরিয়া ভারতের নবাগত গাভাস্কার অসহ্য দাঁতের ব্যথা নিয়ে খেলেছিলেন সিরিজের শ্রেষ্ঠ ইনিংস। ভারতের ৪২৭ রানে গাভাস্কারের অবদান ছিল ২২০। এই ইনিংস খেলার পর গাভাস্কারকে নিয়ে রচিত হয় ক্যালিপসো সংগীত। ছয় দিনের ওই টেস্টের শেষ দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ২৬২ রানের। কিন্তু ভারতের স্পিন ও মিডিয়াম পেস বোলিংয়ে আবার ধরাশায়ী হয় ক্যারিবিয়ানরা। আবিদ আলি পেয়েছিলেন তিন উইকেট। দিনের শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ছিল ৮ উইকেটে ১৬৫। সোবার্সের দলের হাত থেকে সিরিজ ছিনিয়ে নেয় ভারত। ওই সিরিজের সর্বোচ্চ রান প্রাপক ছিলেন গাভাস্কার (৭৭৪), দ্বিতীয় ছিলেন সারদেশাই (৬৪২) এবং তৃতীয় ছিলেন সোবার্স (৫৯৭)। সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেট প্রাপক ছিলেন ভেঙ্কটরাঘবন, পেয়েছিলেন ২২টি উইকেট। ভারতের তিন স্পিনার বেদী, প্রসন্ন ও ভেঙ্কট মিলে পেয়েছিলেন ৪৮টি উইকেট। 

এরপর ভারত আগস্ট মাসে যায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে। সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোয় তখন রে ইলিংওয়ার্থ-এর ইংল্যান্ড টানা ২৪ টেস্টে অপরাজিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট দল। ইংল্যান্ডগামী দলে জায়গা পেলেন গুগলি বোলার চন্দ্রশেখর, উইকেটরক্ষক ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার। এই দুজনেই উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন ওই সিরিজে। ইংল্যান্ড সফরে লর্ডসের প্রথম টেস্ট ড্র হয়েছিল। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে গাভাস্কার যখন ইংল্যান্ডের পেস বোলার জন স্নো-এর একটি বলকে কভার অঞ্চলে ঠেলে দিয়েই একটি দ্রুত রান নিচ্ছিলেন, তখন স্নো বিচ্ছিরি ভাবে গাভাস্কারের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটান। গাভাস্কারের হাত থেকে ছিটকে যায় ব্যাট। স্নো ব্যাটটি মাটি থেকে তুলে ছুঁড়ে দেন গাভাস্কারের দিকে। এই ঘটনায় তোলপাড় পড়ে যায়। ইংল্যান্ডের মিডিয়া সহ বিশ্বের সমস্ত মিডিয়া স্নোকে এমন অখেলোয়াড়চিত মনোভাব দেখানোর জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেন। ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্স ডেক্সস্টার স্নোকে দ্বিতীয় টেস্টে দল থেকে বাদ দিয়ে ব্যাপারটা সামলে দেন। 

ওল্ড ট্রাফোর্ডে দ্বিতীয় টেস্টে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ইলিংওয়ার্থ সেঞ্চুরি করেন। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসের ৩৮৬ রানের জবাবে ভারতের স্কোরবোর্ডে ওঠে ২১২। গাভাস্কার অর্ধশতরান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের ব্রায়ান লাকহার্স্ট সেঞ্চুরি করেন। ম্যাচের শেষ দিনে লাঞ্চের কিছু পরে ইংল্যান্ড তিন উইকেটে ২৪৫ তুলে ডিক্লারেশন দেয়। ভারত বাকি সময় ব্যাট করায় ম্যাচ ড্র হয়। ওভালে তৃতীয় টেস্টে দলে ফিরে আসেন জন স্নো। দুটি ইনিংসেই গাভাস্কারের উইকেট নেন স্নো। প্রথম ইনিংসে ছয় রানে এবং দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে। প্রথম ইনিংসে গাভাস্কারকে একটি বাউন্সার দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন স্নো। গাভাস্কারের গলার চেন ছিঁড়ে গিয়েছিল সেই বাউন্সারে, বলটি গাভাস্কারের গলা বা থুতনিতে লাগলে খুব বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত। ইংল্যান্ড অধিনায়ক রে ইলিংওয়ার্থ এই ঘটনায় স্নো'কে প্রকাশ্যে সাবধান করেন। এই টেস্টে টসে জিতে ইংল্যান্ড প্রথমে ব্যাট করে তোলে ৩৫৫ রান। অল্প কয়েক রানের জন্য সেঞ্চুরি হাতছাড়া করেন ইংল্যান্ডের উইকেট রক্ষক এলান নট। ভারতের প্রথম ইনিংস থেমে যায় ২৮৪ রানে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের উইকেটরক্ষক ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার খেলেন ৬৯ রানের এক মূল্যবান ইনিংস। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস ১০১ রানে মুড়িয়ে দেন একা চন্দ্রশেখর। তাঁর গুগলির কোনও নাগাল পাননি ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা। মাত্র ৩৮ রানে ৬টি উইকেট নেন তিনি। চন্দ্রশেখরের বলের কমেন্টারি করতে গিয়ে রিচি বেনো কোনও কথা বলতেন না। কিছুক্ষণ থেমে থেকে বলতেন, ব্যাপারটা কী হল বুঝে আপনাদের বলার চেষ্টা করব। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৭৩ রান। ছয় উইকেট হারিয়ে ভারত তুলে নেয় ১৭৪ রান। অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকার খেলেছিলেন ৪৫ রানের এক ধৈর্যশীল ইনিংস। ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের টেস্ট জয়ের মুহূর্তে ইংরেজি কমেন্টারি করছিলেন জন আর্লট। আজও কানে বাজে তাঁর সেই দৃপ্ত কণ্ঠস্বর: ইন্ডিয়া ক্রিয়েটস হিস্ট্রি। 

ইংল্যান্ডের ২৬ টেস্টে অপরাজিতের দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল ভারত। কানে রেডিও নিয়ে বিভিন্ন ভাবে ঘুরে ঘুরে একটা বিশেষ অবস্থানে এলে শোনা যেত কমেন্টারি। সেও ছিল এক মজার ব্যাপার। আজ সবই এতই সহজলভ্য যে জীবন থেকে নতুন কিছু পাওয়ার আনন্দটাই চলে গেছে। ১৯৭১ আমাদের কাছে নিছক দুটি ক্রিকেট সিরিজ জয় নয়, মনের মণিকোঠায় সাজিয়ে রাখা দুটি অমূল্যরতন, আজও যার দীপ্তি মনকে রাঙিয়ে তোলে।


Tuesday, 14 September 2021

ব্যক্তির জীবনে ব্যক্তি

ভবঘুরে ভাবনার বাতাস

প্রবুদ্ধ বাগচী


অপরাধ জগৎ নিয়ে যারা চর্চা করেন তাঁরা তাঁদের নিরীক্ষায় দেখেছেন, প্রতিটি অপরাধীর হয়ে ওঠার পেছনে অন্য কোনও এক বড় মাথা থাকে; অপরাধীদের পরিভাষায় যাদের বলা হয় ‘গডফাদার’। এটা আমরা সকলেই জানি ও বুঝি যে কেউ মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়েই অপরাধী হয় না- অপরাধী হয়ে ওঠার একটা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থাকে। দুনিয়ার সিংহভাগ অপরাধীদের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপট একটা জোরালো ফ্যাক্টর। মোদ্দা কথাটা হল, একটা জগৎ থেকে আরেকটা অন্য জগতে চলে আসার ক্ষেত্রে এই ‘পাকা মাথা’রা একটা সেতুর মতো। 

কিন্তু  স্বাভাবিক জীবনস্রোত থেকে অন্ধকার জীবনে ঢুকে পড়ার ক্ষেত্রে এই ‘গডফাদার’ কথাটা যেমন বাঁকা অর্থে প্রয়োগ করা হয়, তেমনি কিন্তু এর একটা ইতিবাচক ব্যঞ্জনাও আছে। চার্লস শোভরাজ বা দায়ুদ ইব্রাহিম কিংবা বীরাপ্পান'এর মতো দাগী অপরাধীদের ক্ষেত্রে যেমন কোনও ‘দাদা কাহিনি’ আছে তেমনি ‘দস্যুরাণী’ ফুলন দেবীর জীবনে বন্দুক ছিল তার নিপীড়িত জীবনকাহিনির এক প্রত্যুত্তর। কিন্তু অপরাধের এই কালো বৃত্ত ছেড়ে যদি আমরা চোখ রাখি অন্যদিকে তাহলেও দেখব এই একই চিত্র। 

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে যারা সফল ও উল্লেখ্য ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদেরও বেড়ে ওঠার একটা পর্যায়ে এসে পড়েছিলেন এমন একেকজন যাদের প্রভাব তাঁদের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে অন্য খাতে। হিন্দু কলেজে ডিরোজিও ছিলেন এমনই এক শিক্ষক যিনি তাঁর একদল ছাত্রকে নতুন জীবন দর্শনে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন। এইসব ছাত্ররা পরের জীবনে সকলেই কৃতবিদ্য। ঠাকুরবাড়ির দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনে রামমোহন রায় ছিলেন এমনই এক পথপ্রদর্শক- বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও তাঁদের গভীর সখ্য এত দূর ছিল যে নিজের ব্যক্তি জীবনের সংকটের সময়েও দ্বারকানাথ আশ্রয় পেতে চাইতেন রামমোহনের কাছে। তাই প্রবাসে রামমোহনের অকালমৃত্যু তাঁর কাছে ছিল প্রায় পিতৃহারা হওয়ার মতোই তীব্র শোকাবহ। একটা সময় অবধি কেশবচন্দ্র সেন তাঁর গুরু হিসেবে বিবেচনা করতেন দেবেন ঠাকুরকে, পরে অবশ্য তাঁদের সম্পর্কে চিড় ধরে। রামকৃষ্ণদেবকে নিজের পথের দিশারী হিসেবে না-পেলে নরেন্দ্রনাথ দত্ত আমাদের কাছে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে উঠতে পারতেন কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন। 

নিজের কবিতা লেখার ক্ষেত্রে প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথের আদর্শ পুরুষ ছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী, এটা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ইউরোপের শিল্পী হ্যাভেলের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর শিল্পভাবনার ক্ষেত্রে এক বড় প্রভাব ফেলে। আর ‘মাস্টারমশাই’ নন্দলাল বসু একেবারে আক্ষরিক অর্থেই নিজের মাস্টারমশাই হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথকে। সত্যজিৎ রায় আবার নন্দলাল বসুর গুণমুগ্ধ হয়েও আলাদা করে গুরুত্ব দিতেন বিনোদবিহারীকে, যার প্রতি শ্রদ্ধায় তিনি তৈরি করে ফেলেন তাঁর ‘ইনার আই’ তথ্যচিত্র। রবীন্দ্রনাথের সমকালীন কবিরা প্রায় ঘোষিত ভাবেই তাঁদের লেখালিখির আদর্শ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, যার ব্যতিক্রম কাজী নজরুল ও মোহিতলাল মজুমদার। পরে অবশ্য ‘কল্লোল’ যুগের কবিরা সচেতনভাবে এই প্রভাব কেটে বেরিয়ে আসতে চান। 

সংগীত মূলত একটি গুরুমুখি বিদ্যা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত পুরোটাই ঘরানা-নির্ভর। ফলে, শাস্ত্রীয় সংগীতে যাদের সিদ্ধি তাঁদের সঙ্গে যুক্ত আছে কোনও না কোনও গুরুর নাম। কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত যে রবীন্দ্রসংগীত, তার কাঠামো পোক্ত হলেও তার পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত একেক রকমের প্রশিক্ষণধারা। তাই একদল গায়কের কাছে এক সময় দিনু ঠাকুর ছিলেন তাঁদের গুরু, পরে সেই জায়গা নেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। শৈলজারঞ্জনের ধারায় প্রশিক্ষিত হয়েও আবার পরে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সুচিত্রা মিত্র বা সুবিনয় রায়, মায়া সেন'রা একেক রকম শিষ্যগোষ্ঠী তৈরি করে নেন। আলাদা পথে সেই কাজ করতে থাকেন দেবব্রত বিশ্বাসও। এঁদের অনুগামী সকলের কাছেই তাঁদের শিক্ষাগুরুর পথই অনুসরণযোগ্য পথ- ব্যাপারটার মধ্যে একটা ধার্মিক ঝোঁক থাকলেও এটাই হয়ে এসেছে বা এখনও চলছে। 

বাঙালির রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই গুরুবাদ যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। বাংলায় গুপ্ত সমিতির উন্মেষ কালে গ্যারিবল্ডি, ম্যাতসিনি এঁদের বিপ্লবী ভাবধারা দূর থেকে উদ্দীপ্ত করলেও একটা সময় একে সুগঠিত চেহারা দিতে বাংলায় এলেন অরবিন্দ ঘোষ। তিনি তখন বিপ্লবী রাজনীতির পথপ্রদর্শক। তাঁর আদেশে যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় গেলেন বরদায় অস্ত্রশিক্ষা নিতে, বাকিরা সলতে পাকানোর কাজ করতে ছড়িয়ে পড়লেন নানা জায়গায়। মুরারিপুকুর বোমার মামলায় সেই আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও এবং পরে অরবিন্দ ঘোষ অন্য জগতে চলে গেলেও তিনি যে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তার আঁচ কিন্তু নেভেনি। রাসবিহারী বসু তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন চন্দননগরে তাঁর এক গুরুর কথা, যিনি তাঁকে বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট করেন। কল্পনা দত্তের স্মৃতিচারণে দেখি, মাস্টারদা সূর্য সেন কীভাবে উদ্বোধিত করছেন তাঁর তরুণী ছাত্রদের, যার মধ্যে আছেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। অভাবী পরিবারের এই তরুণী মাস্টারদার ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের মঞ্চে। অনুশীলন সমিতির ইতিহাসেও পাই এমন অনেকের নাম যারা এক সময়ে তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত করতেন দেশপ্রেমের উন্মাদনা ও আবেগ। স্বদেশি যুগে এঁদের একটা সময় বলা হত ‘ছেলেধরা’। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’তে দেখি, সন্দীপের আকর্ষণে মুগ্ধ ছিল তাঁর তরুণ শিষ্য অমূল্য। সুভাষচন্দ্র বসু অকুন্ঠে স্বীকার করে গেছেন, গান্ধীজী নন, তাঁর রাজনৈতিক গুরু আসলে চিত্তরঞ্জন দাশ।

অবশ্য ‘ছেলেধরা’র এই অভিধা পরে জুটেছে আরও অনেকেরই কপালে যার ব্যঞ্জনা সবটাই রাজনৈতিক বিচারে ইতিবাচক। বরিশালের অশ্বিনী দত্ত বা ঢাকার পুলিনবিহারী দাস এমনই কিছু প্রোজ্জ্বল চরিত্র। কংগ্রেসি রাজনীতির সেকাল-একালেও পাওয়া যাবে এমন সব নাম যারা দলের সাংগঠনিক দিক ম্যানেজ করতেন। বাংলার রাজনীতিতে অতুল্য ঘোষ ও পরের পর্বে প্রিয় দাসমুন্সির নাম তো এই প্রসঙ্গে না করলেই নয়। সাম্যবাদী রাজনীতির গোড়ার যুগে বিবেকানন্দ'র অনুজ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এমনই এক চরিত্র যার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল নজিরবিহীন, অথচ তিনি কখনও সরাসরি দেশের কমিউনিস্ট দলের সঙ্গে যুক্ত হননি। যদিও কমিউনিস্ট পার্টির ঊষাকাল থেকেই তা সংগঠন-নির্ভর আর সেই কাঠামোকে সজীব রাখতে গেলে এইরকম ‘ছেলেধরা’ বা ‘গডফাদার’দের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। 

খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন'এও লেনিন বা পরে স্তালিনকে এরকম এক কিংবদন্তী হিসেবে দেখা হয়েছে অনেক দিন। কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ হলেও দেশে দেশে লেনিন বা স্তালিনের শৌর্য নিয়ে গান চলচ্চিত্র নাটক রচিত হয়েছে প্রচুর। এ দেশের নকশালপন্থীরা তো এক সময় চিনের চেয়ারম্যান মাও'কে তাঁদের চেয়ারম্যান বলেই ঘোষণা করেছিলেন, মাওই ছিলেন তাঁদের ‘পথপ্রদর্শক’। চারু মজুমদারকে তাঁরা অনেকেই এখনও ঈশ্বরের মতো ভক্তি করেন। মহাদেব মুখার্জি নামে এক নকশাল নেতা তাঁর দলের পোস্টারে বিশেষণ হিসেবে লিখতেন ‘চারু মজুমদারের হাতে গড়া’- এই ঘোষণার সঙ্গে বালক ব্রহ্মচারীর ‘সন্তান দল’ শিষ্যদের কি খুব মূলগত প্রভেদ পাওয়া যাবে ? 

দল বা গোষ্ঠী ছেড়ে দিলেও একেবারে আমাদের ব্যক্তিগত ন-আনা ছয়-আনা জীবনেও এমন কিছু মানুষকে আমরা খুঁজে পাই যাদের সংস্পর্শ আমাদের চেতনা ও ভাবনাচিন্তাকে কিছুটা পরিশুদ্ধতর করে অথবা ঘটিয়ে দেয় এক বাঁক বদল। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পরে একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল যিনি আমায় শঙ্খ ঘোষ, সুধীর চক্রবর্তী ও অশোক মিত্রের লেখার সঙ্গে পরিচিত করান। অনেকেই মনে করতে পারবেন এমন অনেকের কথা, যারা হয়তো তাঁর পাড়াতুতো দাদা বা দিদি অথবা শিক্ষক-শিক্ষিকা- এঁরা কারও কারও জীবনে কিছু কিছু আলো জ্বেলে দিয়ে যান। এঁদের যে নামেই ডাকি না কেন, এই মানুষগুলোর একটা ইতিবাচক ভূমিকা কোথাও বোধহয় আমরা অস্বীকার করতে পারি না। 

অর্থনীতির কাঠামো সমাজে তার প্রতিবিম্ব ফেলে যায় নিশ্চয়ই। ইদানীং বেশ কয়েক দশক আমাদের সামাজিক সংগঠন অনেক শিথিল, আমাদের সামাজিক দূরত্ব প্রায় এক ব্যাধির মতোই বিস্তৃত। অধুনা অতিমারি সেই সামাজিক দূরত্ব যাপনকে শারীরিক দূরত্বের সঙ্গে কৌশলে প্রতিস্থাপন করে তাকেই আমাদের বেঁচে থাকার বাধ্যতা বলে দাগিয়ে দিয়েছে। তাই এইসব ব্যক্তি মানুষগুলি আজ কে কোথায় ছিটকে গিয়েছেন তার হদিশ পাওয়া সহজ নয়। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, শুধু তাই পবিত্র যা ব্যক্তিগত। সাহিত্য শিল্পের আওতায় যাই হোক, সামাজিক ক্ষেত্রে এতটা বিপজ্জনক উচ্চারণে অবশ্যই আমাদের আস্থা নেই। কিন্তু ব্যক্তির জীবনে ব্যক্তির ভূমিকা- সে কি একেবারেই পরিত্যাজ্য ? ব্যক্তি কি ইতিহাসেরও উপাদান নয়? ব্যক্তিকে কি আমরা এত দূর পর্যন্ত বসিয়ে রাখতে পারি আমাদের বিচারবোধের চৌকাঠের বাইরে? আপাতত এই ভবঘুরে ভাবনার এলোমেলো বাতাস পাক খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরে-বাইরে।


Monday, 13 September 2021

পিছচ্ছে দেশ

বিশ্ব সূচকের মাপকাঠিতে আমাদের ক্রম অধোগতি

রাজীব ভট্টাচার্য


২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে কয়েক বছর বাদ দিলে, প্রায় এক দশক ধরেই সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অভিমুখ ক্রমশ নিম্নগামী। জীবনযাত্রার মান, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সুরক্ষা, মানসিক শান্তি, সন্ত্রাস-মুক্ত পরিবেশ, নারী সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য- প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবক্ষয় বা অনুন্নয়ন সত্যিই এক ভীষণ চিন্তার কারণ। তবে করোনা-পূর্ব পরিস্থিতিতে চীন ও ভারত এই দুই রাষ্ট্রকে সর্বাধিক দুই উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্ররূপে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে গত এক দশকে কতটা উন্নয়ন ঘটেছে তা অতি পরিচিত, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত কিছু আর্থ-সামাজিক সূচকের সাহায্যে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই শুরু করা যাক সুইডেনের ফ্রিডম হাউস’এর সদ্য প্রকাশিত ২০২১ সালের প্রতিবেদন দিয়ে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ভারত একটি সম্পূর্ণ 'মুক্ত রাষ্ট্র' হিসেবে গণ্য হলেও ২০২১ সালে 'আংশিক-মুক্ত' রাষ্ট্রের শিরোপা পেয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভারতে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অবক্ষয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা খর্ব হওয়া। এই সূচক যে দুটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: (ক) রাজনৈতিক অধিকার ও (খ) নাগরিক স্বাধীনতা। ২০২১ সালে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৮২টি (৪২.০৫ শতাংশ) দেশ 'সম্পূর্ণ মুক্ত', ৫৯টি (৩০.২৬ শতাংশ) দেশ 'আংশিক-মুক্ত' ও ৫৪টি (২৭.৬৯ শতাংশ) দেশ 'মুক্ত নয়' শিরোপা পেয়েছে।

সমগ্র বিশ্বে ২০০৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্রের ফাঁক (যা নির্ধারিত হয় প্রতি বছর কত সংখ্যক দেশে গণতন্ত্রের উন্নতি ঘটেছে ও কত সংখ্যক দেশে তার অবনতি ঘটেছে তার পার্থক্যের উপর) সমস্ত বছরগুলিতেই ঋণাত্মক (২০০৫ সাল ছাড়া) এবং ২০২০ সালে তা সর্বোচ্চ (-৪৫)। অর্থাৎ, গণতন্ত্রের অবক্ষয় বা নিম্নগতি গোটা বিশ্বেই পরিলক্ষিত। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের উপর অত্যধিক চাপ, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের ভীতি প্রদর্শন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার অভাব, বিভেদমূলক নাগরিকত্ব আইন, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, কিছু সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ ও গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থানকে দায়ী করা হয়েছে। তাই আজ ভারত সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শকের জায়গা থেকে বিচ্যুত ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রাজনীতির বলয়ে পরিবৃত হয়ে মূল্যবোধ ও সাম্যের পথে দিকভ্রান্ত।  

এরপর দেখা যাক ২০২১ সালের বিশ্ব সুখ সূচক (World Happiness Index)। এর আগের আটটি World Happiness Report (WHR)’এর মতো বর্তমান নবম রিপোর্টটিরও মূল ভিত্তি হল রাষ্ট্রভিত্তিক সুখ ও সমৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা, যা আসলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মানদণ্ড। বিষয়গত সমৃদ্ধির পরিমাণ তিনটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: (ক) জীবনের মূল্যায়ন (খ) ইতিবাচক আবেগ ও (গ) নেতিবাচক আবেগ। ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৯৫টি দেশের মধ্যে জীবনের মূল্যায়নে ভারতের স্থান ছিল ৯২তম। এই সূচক অনুযায়ী ২০১৭-২০১৯’এর মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ৯৩তম। ২০১৮-২০২০’তে WHI’এর বিশ্ব সূচক অনুযায়ী ১৪৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩৯তম। সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড, তারপর ডেনমার্ক, সুইৎজারল্যান্ড প্রমূখ। সর্বনিম্নে রয়েছে আফগানিস্তান।

দুর্নীতি বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান দেয় Global Corruption Perception Index (GCPI), অর্থাৎ, দুর্নীতি উপলদ্ধি সূচক। এর ২০২০ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্বের ১৮০টি দেশকে সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতি অনুযায়ী ক্রমপর্যায়ে সাজানো হয় নির্দিষ্ট মানের ভিত্তিতে। দেখা যায় যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অতি সামান্য বা কোনও উন্নতিই পরিলক্ষিত হয়নি। গোটা দশক জুড়ে প্রায় একইরকম ছবি ধরা পড়েছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশের ক্ষেত্রে GCIP’এর মান পঞ্চাশের নিচে। ভারত ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী আরও নিচে নেমে ৮৬তম আসন দখল করেছে এবং এই সূচকের মান ৪০। অর্থাৎ, দুর্নীতি মুক্ত সমাজের ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি খুবই সামান্য।

ভারতের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনও দারিদ্র্যের শিকার। এর মূল কারণ বেকারত্ব হারের বৃদ্ধি এবং ফল হল অপুষ্টি জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। তাই এবার আমরা দেখব বিশ্ব ক্ষুধা সূচক বা Global Hunger Index (GHI) আমাদের কী পরিসংখ্যান প্রদান করে। এর মূল লক্ষ্য হল সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ও দেশে ক্ষুধা নিবারণের উপায় কতটা সূরাহা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা। এই সূচকটি চারটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: অপুষ্টি, শিশু নষ্ট হওয়া, শিশুর বৃদ্ধি রোধ ও শিশু মৃত্যুহার। এই GHI-এ মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ১০০ পয়েন্ট স্কেল ব্যবহার করা হয়। মান 0 হল সর্বোৎকৃষ্ট ক্ষুধাহীন এবং ১০০ হল সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। কিন্তু বাস্তবে এর মান এই দুই সীমার মাঝে কোথাও হয়ে থাকে। ২০২০ সালে GHI অনুযায়ী, ৪৮টি দেশ নিম্ন GHI (<৯..৯); ২৬টি দেশ মাঝারি GHI (১০-১৯.৯); ৪০টি দেশ  খারাপ  GHI (২০-৩৪.৯); ১১টি দেশ উদ্বেগজনক GHI (৩৫-৪৯.৯) ও অতি উদ্বেগজনক GHI দেশের সংখ্যা (≥৫০) বর্তমানে শূন্য। এই ১০৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৯৪তম। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ৭৫তম ও পাকিস্তান ৮৮তম। অর্থাৎ, GHI’এর ক্ষেত্রে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অবস্থার উন্নতি ঘটলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের অবস্থা যথেষ্ট সংকটজনক।

আজ বিশ্ব জুড়ে যার জোর চর্চা সেটি হল বিশ্ব লিঙ্গ ফারাক বা Global Gender Gap (GGP)। ২০০৬ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম দ্বারা এটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বময় লিঙ্গ সাম্যের অগ্রগতি ও দেশভিত্তিক তারতম্য দূরীকরণ। এটি মূলত চারটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। ২০০৬ সালে GGP’তে ভারতের স্থান ছিল ৯৮তম ও তার মান ছিল ০.৬০১। কিন্তু ২০২০ সালে এসে ভারতের স্থান দাঁড়িয়েছে ১৪০ ও তার মান ০.৬২৫। এর মধ্যে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে ভারত নেমে গিয়েছে ১১০তম (২০০৬ সালে) স্থান থেকে ১৫১তম (২০২০ সালে) স্থানে। শিক্ষা অর্জনে ১০২তম স্থান থেকে ১২৯তম স্থানে; স্বাস্থ্য ও জীবনধারণে ১০৩তম স্থান থেকে ১৫৫তম স্থানে ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ২০তম স্থান থেকে ৫১তম স্থানে অবনমন ঘটেছে ওই একই সময়ে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া ছিল পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন স্থানে (৩৩.৮ শতাংশ)। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে ভারতের GGP’র আঞ্চলিক স্থান ষষ্ঠ। তাই লিঙ্গ ভারসাম্য রক্ষায় ভারতের উন্নতি মোটেই উল্লেখযোগ্য নয় বরং অবনতির লক্ষণই প্রকট।

এরপর দেখা যাক বিশ্ব প্রতিযোগিতা সূচকের (Global Competitiveness Index, GCI) পরিস্থিতি কীভাবে বদলেছে। ৬৩টি দেশের বিভিন্ন বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এই সূচক নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে প্রধান স্তম্ভ হল: প্রতিষ্ঠান, যথাযথ পরিকাঠামো, স্থায়ী সমষ্টিগত কাঠামো, ভালো স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা ও ট্রেনিং, দক্ষ পণ্য ও শ্রমের বাজার, উন্নত আর্থিক বাজার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মানবসম্পদের বিকাশ, ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার, উদ্ভাবন ক্ষমতার ক্রমবিকাশ প্রভৃতি। ১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে এই সূচকে ভারতের অবনমন ঘটেছে। ১৯৯৭ সালে এই সূচকে ভারতের স্থান ছিল ৪১তম, ২০১৭’তে পৌঁছয় ৪৫তম (তবে ২০১৯ ও ২০২০’তে সামান্য উন্নতি ঘটে তা পৌঁছয় ৪৩তম স্থানে)।

সব শেষে দৃষ্টি দেওয়া যাক মানব উন্নয়ন সূচক বা Human Development Index, (HDI)’এ যা ১৯৯০ সালে UNDP তার প্রথম মানব উন্নয়ন রিপোর্টে প্রথম প্রকাশ করে। HDI তিনটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: (ক) দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন (যা সম্ভাব্য আয়ুষ্কালের সাহায্যে মাপা হয়); (খ) জ্ঞানের বিকাশ (যা ২৫ বছর ঊর্ধ্বে গড় বিদ্যালয় শিক্ষা এবং শিশুদের প্রত্যাশিত বিদ্যালয় শিক্ষার গড়ের উপর নির্ভরশীল); (গ) শালীন জীবনযাত্রার মান (যা পরিমাপ করা হয় জনপ্রতি সার্বিক জাতীয় আয় দ্বারা)। HDR ২০২০ অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১৮৯টি দেশের মধ্যে ভারতের HDI’তে স্থান ১৩১তম এবং তার মান ০.৬৪৫। ১৯৯০ সালে এর মান ছিল ০.৪২৯, অর্থাৎ, প্রায় ৫০.৩ শতাংশের পরিবর্তন। ২০১৯ সালে ভারতের স্থান ছিল ১২৯তম, অর্থাৎ, সেখান থেকে দু’ ধাপ অবনমন ঘটেছে। বৈষম্য নিয়ন্ত্রিত HDI’এর মান ০.৪৭৫। ভারত মধ্য মানব উন্নয়ন দেশভুক্ত। এর মূল কারণ মাথাপিছু GNI কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এই দুই দিক থেকেই ভারতের অবস্থা ভীষণভাবে শোচনীয়।

তাই উপরের আলোচনা একটি কথা স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, কাগজে-কলমে সম্ভাবনাময় উদীয়মান বাজার অর্থনীতির তকমা পেলেও দীর্ঘকালীন স্থায়ী উন্নয়নের মাপকাঠিতে ভারত পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে যথেষ্ট পিছিয়ে। এছাড়া সার্বিক জাতীয় উৎপাদনের দ্রুত হ্রাস, বেকারত্বের অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, গণতান্ত্রিক পরিবেশের অবক্ষয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, শিল্পের অধোগতি, সরকারি রাজকোষের ঘাটতি বৃদ্ধি, উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সর্বোপরি সামাজিক ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের করুণ পরিস্থিতি আমাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।