Sunday, 19 April 2020

লকডাউনে পরিবার

অমৃতের পুত্র নই!
অমৃতা ঘোষাল

ছুটি, অনলাইনে সামান্য কাজ, মাইনে আপাতত পুরোই পাচ্ছেন, বাজারও সকালে ভালোই মিলছে। দিব্যি আছেন। চোখের দূষণ শুধু হয়ে উঠছে একজন। আপনার থপথপে ম্যাড়ম্যাড়ে ধর্মপত্নী। কেমন যেন নোংরা মতো নাইটি পরেই কিচেনে ঢুকছে! চান করে এলেও বেশ নোংরা লাগে। নাইটিগুলোয় হলুদ ছোপ। 'কাজের মাসি'-মার্কা স্ত্রী নিয়ে আপনার মন খুব খারাপ। কিছুক্ষণ ফেসবুক। অফিসে তিন মাস আগে জয়েন করা তরুণীর ঝকঝকে ডিপি। ছবিতে বুকের ভাঁজে নীল পাথরের লকেট। মুগ্ধ হয়ে দেখছেন, অমনি ঘরের ওই মহিলা এসে আপনার চেয়ারের নিচে সিগারেটের ছাই মুছে দিচ্ছে। ঘামের বিকট গন্ধে আপনার গা গুলিয়ে উঠল। আপনি সহ্য করতে না পেরে ঘর মুছতে থাকা প্রাণীটির কাঁধে বেশ কষিয়ে লাথি মারলেন। গৃহকর্তা হিসেবে খুব অন্যায় করলেন নাকি!

ছেলে স্কুলে অনলাইনে দেওয়া হোমটাস্ক করছে। বর 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' করে চলেছে। শাশুড়ি শয্যাশায়ী। আয়া সবেতন ছুটিতে। সকালে শাশুড়ির বেডপ্যান নিতে গিয়ে খুব বমি পেল আপনার। তারপর আপনি শাশুড়ির ব্রেকফাস্টে স্যুপ বানিয়ে তাতে মাত্রাতিরিক্ত নুন দিয়ে দিলেন। দুপুরে তাকে গলা-ভাতের সঙ্গে দিলেন একটাই উচ্ছের তরকারি। শাশুড়িকে পরিষ্কার করার সময় ডেটল জলে না মিশিয়ে এমনিই তার লোলচর্মে ঢেলে দিলেন। তারপর একটা রুক্ষ তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে শাশুড়িকে পরিচ্ছন্ন করলেন। আপনি তো লক্ষ্মী সোনা বৌমা নাকি!

আপনার কিছুই ভালো লাগছে না। ঘরে মদ নেই। মাইনে ঢুকেছে অর্ধেক। ছেলে ছয় মাসের। ওইটুকু বাচ্চা কি আরামে থাকে! খালি খায়, ঘুমায় আর কাঁদে! ভাবছেন ছেলের মাকে বলবেন, বাপের বাড়ির থেকে কিছু টাকা আদায় করতে। চাকরি রেখে আর লাভ নেই। বৌকে আদর করে বোঝাতে যাবেন। অমনি ছেলে উঠল কঁকিয়ে। হাত নিশপিশ করে উঠল। এক হাতে ছেলের ঠোঁট দুটো চেপে যদি অন্য হাতে গলাটা টিপে ধরা যায়। আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল--- 'যাহঃ শালা'! বৌ উঠে গিয়ে আপনার বাচ্চাকে কোলে তুলে নিল! আপনি কিছুই করলেন না আর। আপনি তো একজন দায়িত্ববান পিতা নাকি!

আপনি মোবাইল এখন প্রায়ই বন্ধ রাখেন। বরকে সময় দেন। লোকটা ভালোই ঘর সামলায়। রান্নার দায়িত্বও বরের। হেয়ার রিমুভাল ক্রিম অনলাইনে আনিয়েছেন। আপাতত সেগুলো প্রয়োগ করে মসৃণ হওয়ার অপেক্ষা। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হবে না। দুপুরে তাই বরের সঙ্গেই চাইছেন বিডিএসএম-খেলা। নখ আপনার এমনিতেই বেশ বড়। তার ওপর ডিপ অরেঞ্জ নেলপলিশ। পুরুষের লোমশ বুকে তীক্ষ্ণ নখাগ্র ফুটিয়ে আনন্দ নেবেন। হঠাৎ ধরিয়ে নেবেন সিগারেট। নিজের মুখের ধোঁয়া অন্যের মুখে চালান করতে করতে উত্তেজিত হবেন। বয়ফ্রেন্ডের মুখ মনে করে সিগারেটের একটা আলগা ছ্যাঁকাও দিয়ে দিন ভেজা পাউরুটির মতো 'সুইট হাবি'র গলায়। আপনি বিছানায় চূড়ান্ত আবেদনময়ী তো নাকি!

ঘটনাগুলো আপাতভাবে বানানো মনে হলেও একেবারে মিথ্যে নয়! লকডাউন প্রত্যেক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমরা বন্দী, আর নিজের মতো করেই বাঁচবার উপায় খুঁজে নিতে হবে। বাঁচার চেয়েও আরও বেশি করে খুঁজছি কিভাবে নিজের শখ-আহ্লাদকে অব্যাহত রাখব সেই পন্থা! জৈবিকতাকে মেটানোর বিবিধ উপায় খুঁজে চলেছে মানুষ। অবদমিত ব্যাপারগুলো কিন্তু অনেক সময়েই অতিরিক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। শুধু পূর্ণতাসাধনের পদ্ধতি খুঁজতে গিয়েই যত হয়রানি! এক স্বামী-সোহাগিনী সুন্দরী যেমন সেদিন ফোন করে জানতে চাইলেন, 'তোরাও কি রাত্রে মাস্ক পরেই...!'

বিস্ময়ের পরতে পরতে 'Phobos', 'Thanatos', 'Deimos' প্রমুখ এসে উঁকি মারেন। আমরা যে সত্যিই এবার বিমূঢ় সময়ে পৌঁছে গিয়েছি, বেঁচে থাকতে হলে বিভ্রান্ত হতে হবে। মানসিকভাবে একটু পিছিয়ে পড়া শিশু হঠাৎই মায়ের হাতে তুমুল মার খেয়ে বারান্দায় বসে নিজের মনে দুলতে আরম্ভ করে। মাটির দিকে তাকিয়ে দোলে, আকাশ দেখতে সে ভয় পায়। সব মিলিয়ে একটা ক্যালেইডোস্কোপিক পটভূমি গড়ে উঠেছে, নতুন নতুন গঠন যেন একবার গড়ে উঠেই অতল কৃষ্ণগহ্বরে ডুবে যাচ্ছে। করোনার অ-প্রত্যাশিত অভিঘাত স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমরা কোনও অংশেই অমৃতের পুত্র অন্তত নই। বাইরের চকচকে পৃথিবীর বিলাস-উপাদানের ওপর বড্ড বেশি নির্ভরশীল আমরা।

লকডাউন পরিস্থিতিতে যখন কৃত্রিম নির্ভরতার সূত্রগুলো ক্রমশ হারাতে শুরু করেছি, তখন আর আত্ম-সংশোধনের চেষ্টাই আমরা করি না, কারণ আমরা অনেকেই হৃদয়হীন হয়ে সুখ পাই। এখন ধর্ষকাম-মর্ষকামের নিষ্ঠুরতা দেখাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ক্ষেত্র তাই হয়ে উঠল পরিবার। অবশ্য উল্টোটাও দেখা যাচ্ছে। পরিবারকে গভীরভাবে আঁকড়ে সুরক্ষিত থাকার দৃষ্টান্তও অজস্র মিলছে। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পারিবারিক হিংসার এক একটি নির্লজ্জ ঘটনা। সবাই দেখছি, জানছি, শুনছি আর সহ্য করছি। এখনও সময় ফুরোয়নি। একটু অভিনয় ছেড়ে এই বন্দীদশায় আরেকবার চেষ্টা করি মানসিকভাবে মুক্ত হতে। বাড়ির সবাইকে সুস্থভাবে কাছে টেনে বলি,  'আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি'। তবে রিপুর থেকে মুক্তি পাওয়া এখন এত সহজ কি? উত্তর মেলে না।

Saturday, 18 April 2020

করোনার তেতো কথা

সরকারি পদক্ষেপের সমালোচনাও একপ্রকারের সহযোগিতা
অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
,
শিল্পী: ক্ষীরোদ বিহারী ঘোষ

মালোচনা সদর্থক হোক বা নিরর্থক- এ কথা মেনে নিতেই হবে যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিন্তাভাবনা সংক্রান্ত-সমালোচকও শাসকের সহকর্মী। দুনিয়াতে এমন মানুষ নেই যিনি ভাবছেন করোনা থেকে যাক, এ সভ্যতা শেষ হয়ে যাক। আমি নিহিলিস্টদের এ তালিকায় রাখছি না, কেননা সংখ্যাটা বিচারের সাপেক্ষে নগণ্য। এ কথা সত্য যে, করোনা ভাইরাসের উৎস-সন্ধান এখনও চলছে, সে সম্বন্ধে যুক্তির পরাকাষ্ঠায় নতজানু হয়ে বলার মতো সত্য আমাদের কাছে নেই। ফলে, কী কারণে ও কীভাবে এর উদ্ভব সে সব বিশ্লেষণের প্রশ্নই নেই। কী আছে তবে? আছে দুটো নিহিত মর্মবস্তু: এক, যতদিন না চিকিৎসা (ওষুধ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি) আবিষ্কার হচ্ছে ততদিন অবধি যতটা সম্ভব মানুষজনকে আক্রান্ত হতে না দেওয়া– উপায় লকডাউন, সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ আরোপ ও সর্বোপরি র‍্যাপিড টেস্টের মাধ্যমে শনাক্তকরণ; দুই, প্রথমটির কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা।

যে সব তথ্য আমাদের সামনে আসছে তার মধ্যে অন্যতম হল- ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে সব থেকে কম পরিমাণে টেস্টের সংখ্যা। তাহলে লকডাউনের মানে কী? শুধুমাত্র রেশন বিলি করে মানুষজনকে ঘরে আটকে রাখা? সেখানেও তো উঠছে হাজারও অভিযোগ। সাংসদ জন বার্লা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেছেন যে আমাদের রাজ্যে এই দুর্দিনেও নাকি রেশন বন্টন নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। অন্যদিকে টেস্ট বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য হল, ভারতে প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় ২৪৩টি (সূত্র: ওয়ার্ল্ডোমিটার )। ভারতবর্ষের ওপরে-নিচে যে দেশগুলি আছে তাদের একটিরও টেস্ট সংখ্যা প্রতি মিলিয়নে ১৮০০০-এর কমে নয়, এমনকি জনস্বার্থে প্রচারিত সর্বাধিক শত্রুদেশ পাকিস্তানে অবধি ৪১৯। আর পশ্চিমবঙ্গে দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম- ৩৩.৭টি প্রতি মিলিয়নে (সূত্র: দ্য ওয়্যার ও নিউ-ইয়র্ক টাইমস)। এর মধ্যে, ১৯,০০০ ডাক্তারদের প্রতিনিধিত্বকারী পশ্চিমবঙ্গ ডাক্তার ফোরাব'এর ডাঃ অর্জুন দাশগুপ্ত বলেছেন, 'যদি আপনি কোভিড বলে কাওকে সন্দেহ করেন এবং নমুনাগুলি প্রেরণ করেন তবে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, অথবা তিন থেকে চার দিন পরে রিপোর্টটি আসছে।' (সূত্র: নিউ-ইয়র্ক টাইমস)। তদুপরি তথ্য গোপনের অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আরেকটা অশনি সংকেত।

কলকাতার একজন নেফ্রোলজিস্ট ডাঃ প্রতীম সেনগুপ্ত ফেসবুকে লিখেছেন যে, করোনাভাইরাস রোগীরা যখন শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যর্থতার লক্ষণ নিয়ে মারা যাচ্ছিল, তখনও কমিটি কোভিড১৯-কে মৃত্যুর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেনি। সেনগুপ্ত আরও লিখেছিলেন, 'এটি সত্যের সাথে নির্লজ্জভাবে মিথ্যা খেলা'– এ বিষয়ে ফুসফুসের এক্স-রে এবং করোনা ভাইরাস রোগীর একটি সিটি স্ক্যান করে রেনাল ব্যর্থ হয়ে মারা গেছে বলে ঘোষণা করার একটি তথ্য উনি শেয়ার করেছিলেন (সূত্র: নিউ-ইয়র্ক টাইমস ১৪ এপ্রিল ২০২০)।  এসব বিষয় কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বৈকি!

লকডাউনের অর্থই হচ্ছে পুরো দেশকে একটা বাক্সের মধ্যে পুরে, কতকগুলো ছোট-ছোট বাক্সে ভাগ করে স্ট্যাটিস্টিক্যালি সিগ্নিফিক্যান্ট লেভেলে স্যাম্পেলিং-এর ভিত্তিতে র‍্যাপিড টেস্টিং চালিয়ে দেশের মধ্যে করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত বিস্তার ও তার আদল জেনে ফেলা। তবেই আসবে মোকাবিলার স্ট্র্যাটেজির প্রশ্ন। অথচ এইখানেই প্রশ্ন উঠে আসে সামর্থ্যের। কিট নেই, ভেন্টিলেটর কম, হাসপাতাল নেই, ডাক্তার নেই, ল্যাব নেই ইত্যাদি নাকেকান্না। তাহলে সে প্রসঙ্গে আসবেই- দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অর্থনৈতিক অব্যবস্থার কথা, লাগামছাড়া বঞ্চনার কথা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিকাঠামো উন্নয়নে ছিটেফোঁটা বরাদ্দের কথা, লকডাউনের মধ্যে আটকে যাওয়া অসংখ্য ভুখা মানুষের মধ্যে সচেতনতার সাড়া না পাওয়ার কারণ ইত্যাদির কথা। সুতরাং, সমালোচনা তো হবেই । আর তা না হলে এই পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতের জন্য আমরা কী শিক্ষা নেব!

শিক্ষা নেবার বালাই তো নেইই, বরং সেই কেঁচে-গন্ডুষ করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তির পরিকল্পনা। লকডাউনের ফলে দুনিয়া জুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে তা আর কিছুই নয়, মোদ্দা কথায়, পুঁজিবাদের টিকে থাকার সংকট। আইএমএফ বলেছে, গ্রেট ডিপ্রেশন নয়, গ্রেট লকডাউন। তাতে কী! আরে তাতেই তো পুঁজিবাদের ঢাল জিডিপির ভিত্তিতে শুরু হয়ে গেছে হেলিকপ্টার ইকোনমির প্রস্তাব, বেইল-আউটের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি; যাতে কোনওভাবে বেনিয়াতন্ত্রের বিপদ না ঘটে। বিখ্যাত কিছু অর্থনীতিবিদ মৃদুস্বরে যে ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করছেন তার নাম ঠারেঠোরে বললে কমিউনিজম। সুতরাং, করোনা পরিস্থিতি সামলে গেলে যেন আবার বিদ্রোহ-আন্দোলনের উপক্রম না হয় সে জন্য এখন থেকেই ঘুঁটি  সাজিয়ে রাখছে শীর্ষমহল। সুতরাং, করোনা পরিস্থিতি যা জনমানসের চোখ কিছুটা হলেও খুলে দিয়েছে- যারা বুঝতে  শুরু করেছে ধর্ম-জাত-বর্ণ নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে থাকতে হলেও নির্বাচনের ভিত্তি হবে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সমতা। ফলে, সাধারণ্যে এই সমালোচনার ঢেউ একপক্ষের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের, অন্যপক্ষের কাছে আশার। কেননা জোড়াতাপ্পি দিয়ে আর কদিন মানুষ বাঁচবে, চুপ করে থাকবে, সেইটাই দেখার।

অন্তিমে, যে বিষয়টা করোনার সঙ্গে জড়িত হয়েও আলোচিত নয় তা হল পরিবেশ। করোনা মিটলেই কি দুনিয়া সুরক্ষিত? এই যে খনিজদ্রব্যের সন্ধানে পৃথিবীর ফুসফুসের (পড়ুন অরণ্যের) বিনষ্টিকরণ চলছে তা কি আমাদের আরও বড় বিপদের দিকে ঠেলছে না। শুধু তাই নয়, বিশ্ব উষ্ণায়ন, অরণ্যনাশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত যে জুনোটিক রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে, যা চলবে, সেও কি মানবসমাজের চিন্তার বিষয় নয়? নাকি আমরা আমল দেব না তাতে। সর্বনাশের সম্ভাবনাকে পাত্তা না দিলেই সর্বনাশ আটকে যাবে, এমনও তো নয়। সুতরাং, এ নিয়েও কি আমরা আলোচনা-সমালোচনা করব না !

অবশ্যই করব। আমরা আলোচনা যেমন করব, বেগতিক দেখলে কঠোর সমালোচনাও করব। দুনিয়াতে সবাই সব কিছু জানে না, যতটুকু জানে তাও অনেকাংশে সম্পূর্ণ নয়। তাই বোঝার ধরন, ভাবনার প্রকৃতি ও বলার ভাষা সবসময় যে সঠিক ও খাঁটি হবে তাও নয়। তথ্য ও তত্ত্বের মাপকাঠিতে শাসককে ঠিক করে নিতে হবে কোনটা গ্রহণ করা হবে কোনটা হবে না। তবেই সে প্রকৃত শাসক, দণ্ডমুণ্ডের কর্তার গদিতে আসীন। কিন্তু তা না করে কাওকে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগ করে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যাবে না। ভয় দেখিয়ে পরোয়ানা শানিয়ে মগজে কার্ফিউ জারি করা যাবে না।  তাহলে সাধারণ সমালোচনা থেকে ঝড় উঠবেই– দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।

তখন আবার ব্যাপারটা রাজনৈতিক হয়ে যাবে ।

Thursday, 16 April 2020

কোভিড১৯'এর ধাক্কা


ভার্চুয়াল অর্থনীতির তিন লাফ
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
বিশ্ব জুড়ে কোভিড১৯-এর প্রকোপে, বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকায়, মানুষের মৃত্যু মিছিল যে ত্রাসের সঞ্চার করেছে তা অভাবনীয়। সেই সঙ্গে এই দুর্যোগের অবসান কবে, তা নিয়েও সকলের শঙ্কা ও উদ্বেগের সীমা-পরিসীমা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যৎ যাপনের অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। বিশেষ করে, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে আর তাতে সাধারণ মানুষের অবস্থান ও তার জীবন-জীবিকার কী দশা হবে তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ও ভীতির পারদ যথেষ্ট উর্ধ্বমুখি। ইতিমধ্যেই এ দেশে ও বিদেশে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, কারখানার চিমনিগুলো অনেকদিন হল খাঁ খাঁ করছে, পরিষেবা শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসেবে, সারা বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি মানুষ কাজ হারাবেন- সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাসস্থান ও খাদ্য পরিষেবা ক্ষেত্র, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প, ক্ষুদ্র ও বাণিজ্য ক্ষেত্র এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম। সবচেয়ে বড় কথা, অর্থনীতির রথ যেমন চলছিল তেমন কবে আবার চলতে শুরু করবে তা নিয়ে কেউ কিছু বলতে অক্ষম। কারও কারও মতে, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় বেকারত্ব মহামন্দার সময়ের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

কিন্তু ইতিমধ্যে গঙ্গা বা টেমস নদী দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। তাই এইসব ঘনঘোর দুঃসহতার মাঝে আরও একটি ভিন্ন চিত্রও উদীয়মান। দেখা যাচ্ছে, এতদসত্ত্বেও বেশ কিছু কোম্পানি তাদের কর্মী নিয়োজনের ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। যেমন এ দেশে টিসিএস ও উইপ্রো এই বার্ষিক বছরে যথাক্রমে ৩০,০০০ ও ১২,০০০ কর্মী নিয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে। কগনিজেন্ট’ও জানিয়েছে, তারা এই বছরে ২০,০০০ কর্মী নিয়োগ করবে। লকডাউন তাদের ক্ষেত্রে তেমন কোনও বাধা নয়। এই জায়গাটি চিত্তাকর্ষক। অনুরূপ আরও কিছু তথ্য হাজির করলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। যেমন, এই লকডাউন সময়ে অর্থনীতির কোন ক্ষেত্রটি প্রসারিত ও বাণিজ্য-সমৃদ্ধ হয়েছে? আসলে কাদের ব্যবসা বাড়ল? বোঝাই যাচ্ছে, উত্তরটি হল, ভার্চুয়াল দুনিয়ার কারবারীদের। এখন আপনারা সকলেই ‘জুম’ ভিডিও-কলিং অ্যাপ্লিকেশনটি সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছেন। কারণ, লকডাউনের কারণে স্কুল-কলেজে অনলাইনে ক্লাস নিতে এর ব্যবহার এখন তুঙ্গে। তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বে যেখানে ‘জুম’এর মাসিক ডাউনলোড ছিল ৫ লক্ষের মতো, মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ লক্ষের কাছাকাছি (প্রায় ১৭ গুণ বৃদ্ধি)। এমত ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রায় সমস্ত অ্যাপ ও উপযোগিতা টুলস’এর এখন রমরমা বাণিজ্য। যেমন, টিকটক, ইউটিউব, অ্যামাজন, গুগল পে, টিন্ডার ইত্যাদিদের বৃদ্ধির হার ও ব্যবহার অকল্পনীয় স্তরে পৌঁছেছে। অ্যামাজন ইন্ডিয়ার কীওয়ার্ড সার্চ অনুসন্ধান করে দেখা যাচ্ছে, গত ৪ থেকে ১১ এপ্রিলের সপ্তাহে ক্রেতারা ম্যাগির থেকে মোবাইলের খোঁজ বেশি করেছেন। কারণ, স্মার্ট ফোনই এখন যোগাযোগ, বাণিজ্য, কাজ, বিনোদন ও রোজগারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শুধু কি তাই! খেয়াল করুন, এই লকডাউনের সুযোগে আমাদের দেশে ক্রিপটোকারেন্সি’র দৈনিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিমিশা জৈনের বক্তব্য হল, লকডাউন ব্যবসা-বাণিজ্যের রীতিনীতিকেই বদলে দিচ্ছে ও আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা যাব।

তা তো বটেই! ইতিমধ্যে দেখাই যাচ্ছে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম যা এতদিন সীমিত পরিসরে অনুশীলিত হত, তা কোভিড১৯’এর কারণে এখন সর্বজনীন হয়ে উঠছে। থ্রি-ডি প্রিন্টিং যা আধুনিক উৎপাদনশীলতায় এক নতুন আঙ্গিকের সূচনা করেছিল তাও হয়ে উঠছে দস্তুর। অনলাইন শপিং, ভার্চুয়াল ক্লাস, টেলি-ঔষধি, নেট-বিনোদন, মায় আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট যা কিছু, সবই এখন ভার্চুয়ালি চাগিয়ে উঠেছে ঘরবন্দী মানুষের তাড়নায়। যে রূপান্তর হয়তো হত আরও ধীরে, আরও কয়েক বছর পর, তা এখন কোভিড১৯-ব্যতিব্যস্ততায় কোনও উপায়ন্তর না পেয়ে তড়িৎ গতিতে আয়ত্তাধীন-প্রায়। ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল দুনিয়া দখল নিয়ে নিচ্ছে অর্থনীতির সিংহভাগ ও জীবনযাপনের প্রায় সমস্ত দায়।      

পরিবর্তনের এই বাস্তব অভিঘাতকে বোঝার চেষ্টা না করলে বর্তমানের এই মহাসংকটময় পরিস্থিতিকে আন্দাজ করা যাবে না। আজ নিঃসন্দেহে অনুধাবন করা উচিত, গত পাঁচ থেকে দশ বছরে বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতির আঙ্গিকটাই দ্রুত বদলে গেছে। এবং তা কতকটা নিঃশব্দে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স’এর অভিঘাতে মনুষ্য শ্রমকে প্রতিস্থাপিত করে আমরা এমন এক স্বকীয় যন্ত্র-চালিত উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে শনৈ শনৈ এগোচ্ছিলাম যে অচিরেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, অধিক সংখ্যক লোকের হাতে আর সংগঠিত চাকরি থাকবে না; প্রযুক্তির বিকাশের অনুষঙ্গে অস্থায়ী নানাবিধ কাজের পরিসর তৈরি হবে ও আবার তা মিলিয়ে যাবে নতুনতর প্রযুক্তি-আঙ্গিকের অভিষেকে। এই অস্থায়ী কাজের প্রাঙ্গণে যথাযথ কিছু মানুষের কাজ মিলবে বটে কিন্তু তা স্বল্প সময়ের জন্য বা চুক্তির ভিত্তিতে। অর্থনীতিতে কাজের এই নতুন আঙ্গিককে অনেকেই ‘গিগ অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেন যার মোদ্দা কথাটি হল- কাজের চরিত্র হবে অস্থায়ী ও উত্তরণ সাপেক্ষ। অর্থাৎ, প্রযুক্তির নবতর দ্রুত উল্লম্ফন পুরনো কাজ ও কর্মীকে অসার করে দিয়ে নতুনের সন্ধান করবে যা আবার কিছু সময় পর পরিত্যক্ত-যোগ্য হবে। এইভাবে কাজের এমন এক ধারা প্রবহমান হবে যেখানে মনুষ্য শ্রমের পরিমাণগত প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই কমে আসতে থাকবে। কোভিড১৯-এর আচম্বিত সর্বগ্রাসী আক্রমণ প্রযুক্তি চালিত এই চলমান প্রক্রিয়াটিকেই ত্বরান্বিত করল বলে মালুম হচ্ছে। এটা এই অর্থে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যদি ২০ কোটি মানুষের কাজ চলে যাওয়া সাব্যস্ত হয় তাহলে তা হওয়ারই ছিল, হয়তো আরও কিছু সময় পরে, কোভিড১৯ তার পরোয়ানা আগেই ধরিয়ে দিল।

অন্যদিকে, কোভিড১৯-এর তাণ্ডবে যারা ধনতন্ত্রের অন্ত সুনিশ্চিত দেখছেন অথবা কিছুটা আপস করে ধনতন্ত্রের প্রকট বৈষম্য নীতির অবসানের প্রত্যাশা করছেন তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সমসময়ের অর্থনীতির অন্তর্হিত ক্রমবিকাশমান বার্তাটিকে পড়তেই পারেননি। গত তিন-চারশো বছর ধরে ধনতন্ত্রের যে বিকাশ, তার মূল চালিকাশক্তিই ছিল উৎপাদনের পরিসরে মুনাফার হারকে ক্রমাগত বাড়িয়ে চলা এবং কোনও কর্মক্ষেত্রে তা স্থিতাবস্থায় পৌঁছলে নতুন উর্বর ক্ষেত্রে পুঁজিকে স্থানান্তরিত করা। এই কারণেই পুরনো শিল্প বাতিল হয়ে বন্ধ হয় ও নতুন শিল্পের উদয় ঘটে। আর এই কাণ্ডটিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে প্রযুক্তি, যার উদ্দেশ্যই হল আরও বেশি আধুনিক ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠে মুনাফার হারকে বাড়িয়ে চলা। স্বতঃসিদ্ধ এই যে, শ্রমিকের তুলনায় যন্ত্রের ব্যবহার যত আনুপাতিক হারে বাড়বে ততই উৎপাদনশীলতা তথা মুনাফার হারের বৃদ্ধি হবে ও তজ্জনিত কারণে মনুষ্য শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। এইভাবেই ধনতন্ত্র তার যাত্রাপথকে অব্যাহত রেখেছে ও আজ এসে বাধ্যত প্রযুক্তির এমন এক গুণগত পরিবর্তনের স্মারক হয়েছে যেখানে প্রযুক্তি নিজেই অর্জন করেছে প্রায় মনুষ্যতুল্য স্বাধীন এক কর্মসত্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সাধারণ ভাবে মনুষ্য শ্রমের প্রয়োজনীয়তা তাই আপেক্ষিক অর্থে আরও হ্রাস পেয়েছে ও পাবে

শ্রমের নিরিখে এর ফলে যে পরিস্থিতির উদয় হবে তা কতকটা এইরকম: (১) কৃষি, পরিষেবা (শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে ধরে) ধরনের কিছু মৌলিক ক্ষেত্র ছাড়া মনুষ্য শ্রমের প্রয়োজনীয়তা চূড়ান্ত ভাবে হ্রাস পাবে; (২) যারা কাজ করবেন তাদের মধ্যে মূলত তিন ধরনের আয়ের ভিত্তিতে শ্রম বিভাজন হবে- নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ আয়। বলাই বাহুল্য, নিম্ন আয়ের শ্রমই হবে মোট ব্যয়িত শ্রমের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ; (৩) তদুপরি, সমাজের কর্মক্ষম মানুষের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের হাতে কোনও কাজ থাকবে না (তা স্বল্প বা দীর্ঘ সময় উভয়তই)। আর এই শেষোক্ত কারণটির জন্যই ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (বা ইউবিআই) প্রদানের চর্চা রাজনৈতিক ও অর্থনীতির মহলে ক্রমেই জোরদার হয়েছে। এখন কোভিড১৯’এর আক্রমণ সরকারগুলিকে বাধ্য করছে সমস্ত কাজহারা মানুষের কাছে অর্থ ও খাদ্য পৌঁছে দিতে। নির্দ্বিধায় এই বাধ্যতাকে বলা যেতে পারে ইউবিআই’এর মহড়া, কোভিড১৯-এর কারণেই যার সূত্রপাত।

মড়ক, মহামারি বিশ্বে নতুন কিছু নয়। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও বহু আঞ্চলিক যুদ্ধের নিত্য সাক্ষী এ ধরিত্রী জননী। ফলত লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু আগেও প্রত্যক্ষ করা গেছে। আর স্বভাবতই এইসব দুর্যোগের সময় মানুষের হৃদয় উদ্বেলিত হয়, তার কুসুম মন চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করে, তাকে মৃত্যুভয় গ্রাস করে। তখন মানুষ স্বপ্ন দেখে, আশা করে এক নির্মল মনের স্বত্বাধারী হয়ে উঠতে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুঃসময় আর না আসে। কিন্তু সব ঝড় থেমে গেলে আবারও চারপাশ পঙ্কিল হয়ে ওঠেএ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। যদি আধুনিক সময় ধনতন্ত্রকেই সাব্যস্ত করে থাকে, তবে তার কন্দরেই রয়েছে লোভ, জিঘাংসা ও বৈষম্যের প্রগাঢ় বিষ। তাকে নিকেশ না করে তার বৈষম্যের ক্ষুধাকে নির্বিষ করা যায় না। আর ধনতন্ত্র অবসানের স্বপ্ন যারা দেখেন তারা যদি বোঝেন যে ধনতন্ত্র আসলে লালিত হয় প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের চৈতন্যে ধনে-মানে-ক্ষমতায় অন্য সকলকে ছাপিয়ে যাওয়ার চরম উচ্চাশা থেকেই, তাহলে তার অবসানকল্পে যে কাজের ভার ও প্রজ্ঞাকে উপলব্ধ করতে হয় তা বড় গভীর ও ব্যাপ্ত।

কোভিড১৯ আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের ধ্বস্ত করেছে। লক্ষাধিক মানুষের শবকে পিছনে ফেলে যারা বেঁচেবর্তে এগিয়ে যাবেন তাঁরা আবারও শুরু করবেন তাঁদের দৈনন্দিন কর্মধারা। স্বভাবতই মানুষের প্রাপ্য তালিকায় জীবনের নবতর জয়গান তেমন কিছুই থাকবে না, বরং চলমান পরিবর্তিত অর্থনীতিকে কোভিড১৯ যে দ্রুত এক ধাক্কায় অনেকটা ডিজিটাল-বন্দী করে ফেলল, থাকবে সে জানানটুকুই। আর থাকবে এ বার্তাও যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত অর্থনীতির যে আপন গতিপথ নির্মিত হয়েছে, সেখানে আজকের রাষ্ট্রপ্রধানদের আর তেমন কোনও কীর্তি প্রকৃত প্রস্তাবে অসার। তারা বড়জোর নিজেদের প্রাসঙ্গিক ও ক্ষমতাবান রাখতে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-জাতপাতের নামে অসার বজ্জাতিটুকুই করতে পারবে। সবটা মিলিয়ে এই নতুনতর হঠাৎ-পাওয়া পরিস্থিতিকে মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করেন সেটাই এখন দেখার।                          

Wednesday, 15 April 2020

করোনা চিত্র


পরিযায়ী শ্রমিক: সমস‍্যার একপিঠ মাত্র
সঞ্জয় মজুমদার

COVID-19 ঘিরে আমাদের দেশে যা কিছু ঘটছে তার দায় কারও একার উপর চাপানো ঠিক নয়। এটা পারস্পরিক দোষারোপ করার সময় নয়, রাজনীতির তো নয়ই। তবু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দোষারোপ এবং রাজনীতি দুটোই চলছে এবং বেশ ভালো ভাবেই চলছে। সরকার বহু ক্ষেত্রেই তথ্য গোপন করছে, এইরকম সন্দেহ সাধারণের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। খোদ মার্কিন মুলুক, যা করোনা সংক্রমণের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে,  সেখানেও চূড়ান্ত কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে।

আমাদের দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের যাতায়াত এবং জমায়েতের যা কিছু খবর সামনে আসছে তার কিছুটা হয়তো প্ররোচনামূলক বা গুজবের ফলশ্রুতিতে, তবে বেশির ভাগটাই মানুষ তাঁদের পুঞ্জীভূত উদ্বেগ ও আশঙ্কা থেকে আতঙ্কিত হয়ে করছেন। এর একটা কারণ বোধহয় পরিযায়ী শ্রমিকরা দলবদ্ধভাবেই থাকা বা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। দশজনের মধ্যে তিনজনের বাড়ি ফেরার ইচ্ছে না থাকলেও, দলে ভিড়ে সেটা করতেই হয়। দিল্লি, বান্দ্রা এবং সুরাটের যা ছবি আমরা পাচ্ছি তা জনস্বাস্থ্যের নিরিখে নিঃসন্দেহে উদ্বেগের এবং চূড়ান্ত ক্ষতিকর। রোজগারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পকেটে টাকা-পয়সার অভাব, সংক্রমিত হওয়ার ভয়, ছোট অপরিচ্ছন্ন বাসস্থান, অভুক্ত দিনযাপন, কিংবা নিছকই বাড়ির টান- যে কোন‌ও কারণেই হোক এঁরা ফিরতে চাইছেন। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের একটা নিশ্চিত দায়িত্ব থেকেই যায়। হয় তাদেরকে বুঝিয়ে আশ্বস্ত করে আর‌ও কয়েকদিন সেখানেই আটকে রাখা, অথবা ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া। কার্যকরী সিদ্ধান্ত একটা নিতেই হবে।

বাড়ি ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের যেমন একটা বিরাট অংশ আছেন, তেমনি উল্টো দিকে, বেশ কিছু সংখ্যক শ্রমিক আছেন যাঁরা কিন্তু দলবদ্ধভাবেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেননি। কারণটা অবশ্যই সেই রাজ্যের সরকারি ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা, এনজিও, স্থানীয় মানুষজন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকটাই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপাতত সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে আমার বাড়িতে কাজ করতে আসেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংগ্রামপুরের বাসিন্দা আজিজুল (মূলত খবরের কাগজ শিশি-বোতল লোহালক্কড় কিনে বিক্রি করেন)। আজিজুলের ছেলে মুম্বাইতে সোনার গয়নার কারখানায় কাজ করেন। ফোন করে জানতে পারলাম, কারখানার মালিক ব্যক্তিগত উদ্যোগে চল্লিশ জন কর্মীকেই মুম্বাইয়ের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে এবং কারখানার একাংশ ইত্যাদিতে ভালো মতো থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। নিজেই গাড়ি চালিয়ে চাল ডাল তেল নুন পৌঁছে দিয়ে আসছেন। এরপরেও এঁদের একটা বড় অংশ, আগামীকাল বা কয়েক ঘণ্টা পরেই, কোথাও জমায়েত হয়ে বাড়ি ফিরতে চাইবেন না এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না।

আরেকটা বিষয়, আটকে থাকা মানুষজনের মধ্যে শুধুমাত্র পরিযায়ী শ্রমিকরা আছেন, এটাই বা কেমন কথা! অজস্র মানুষজন অবস্থার ফেরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে রয়েছেন। গন্তব্যে ফিরতে পারছেন না। কেউ পরিবার পরিজন সহ বেড়াতে গিয়ে আটকে রয়েছেন। কেউ মুমূর্ষু রুগী নিয়ে দক্ষিণ ভারতে গিয়ে আটকে রয়েছেন। প্রচুর ছাত্রছাত্রী তাদের হোস্টেল বা মেসবাড়িতে আটকে রয়েছেন। তাদের কথাটাও সামনে আনা প্রয়োজন। কিন্তু, সব মিলিয়ে এত কিছু ভাবতে গেলে লকডাউন তুলে দিতে হয়, ফলে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং'ও মানার প্রয়োজন নেই, যা এই পরিস্থিতিতে অসম্ভব।  বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতে লকডাউনের সময়সীমা অনেক আগে থেকেই শুরু করা উচিত ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন, টেস্ট-এর (ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত) সংখ্যা যত বাড়ানো যাবে ততই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই আমরা জোরদার করতে পারব। সরকারকেও এ ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতেই হবে। তা না হলে কতজনের টেস্ট হয়েছে, কতজন সংক্রামিত হয়েছেন, চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছেন কজন এবং শেষমেশ মারা গিয়েছেন বা সুস্থ হয়ে ফিরেছেন কতজন- এইসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যত গোপন করা হবে ততই বিপদ বাড়বে। ফলে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করলেও কিছুতেই সচেতনতা আনা যাবে না এবং লকডাউনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সার্থক হবে না। দিনের শেষে জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি, দুটোই মুখ থুবড়ে পড়বে। দৈনিক রোজগারের উপর ভিত্তি করে থাকা প্রান্তিক মানুষেরা যত বেশি কর্মদিবস হারাতে শুরু করবেন ততই হতাশা এবং হিংস্রতা তাঁদের মধ্যে জন্ম নেবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও লুটপাট করে খাওয়ার প্রবণতা বাড়বে।

এর সঙ্গে আর‌ও কিছু ছবি অস্বীকার করলে চলবে না। ধর্মীয় জমায়েত এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জমায়েত ছাড়াও আমরা সাধারণ মানুষও দোকান বাজার রাস্তাঘাটে কারণে অকারণে অজস্র জমায়েত করেই চলেছি। বিভিন্ন মিডিয়াতে ক্রমাগত তার ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। তবু হুঁশ ফিরছে না। পুলিশ প্রশাসনের শত চেষ্টা সত্ত্বেও মানুষজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সম্প্রতি টেলিভিশন রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ক্যানিংয়ের বিডিও অফিসের সামনে কোনওরকম সরকারি ঘোষণা ছাড়াই, সম্ভবত গুজবের উপর ভিত্তি করে, কয়েক হাজার মানুষ সস্তায় চাল পাওয়ার আশায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।‌ ফলে জমায়েতের দায় কোন‌ও ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা যাবে না।

দাড়িপাল্লার একদিকে এখন করোনা নামক অতিমারিকেন্দ্রিক জনস্বাস্থ্য,  অন্যদিকে মানুষের রুজি-রোজগার ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতি। এই দুই পাল্লার ভারসাম্য রক্ষার দায় কার? অবশ্যই সিংহভাগটুকু সরকারকেই নিতে হবে, কোন‌ও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদেরও রীতিমতো দায়িত্ব আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরামর্শে সরকার যা নির্দেশাবলী জারি করছে সেগুলো যতটা সম্ভব মেনে চলাটাই এই সময়ের দাবি। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জোগান আজকের তারিখ পর্যন্ত গোটা দেশে ঠিকই আছে। কেবল মানুষের কাছে সে সব পৌঁছনো সুনিশ্চিত করতে হবে।

চিকিৎসাকর্মী, পুলিশ বা প্রশাসনের কর্মী, ব্যাঙ্ক এবং পৌরকর্মী, প্রত্যেকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাঁরা নিজেরাও করোনা সংক্রমনের ভয়ে আতঙ্কিত। ইতিমধ্যেই আমাদের দেশ সহ গোটা পৃথিবীতে বেশ কয়েকশো চিকিৎসা ও পুলিশকর্মী করোনার প্রকোপে মারা গেছেন। আমরা না হয় ঝগড়াঝাঁটি ভুলে, ইগোর অত্যাচার পাশে সরিয়ে রেখে, এঁদের পাশে দাঁড়াই। আমাদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া করোনা মোকাবিলা কার্যত অসম্ভব এবং অবাস্তব।

Tuesday, 14 April 2020

নববর্ষের কথা

হন্তারক দৈত্যকে বোতলবন্দি 
করার রক্ষাকবচ প্রকৃতির হাতেই
অনিরুদ্ধ মুখোপাধ্যায়
 
ভাবি, আজ অন্তত আমরা একসাথে ভাবি।
 
যে নির্জন দ্বীপে আজ আমরা সবাই বসে আছি- কেন এখানে এলাম? কী এমন হল যার জন্য আমাদের এই বাধ্যতা? বরং চোখে দূরবীন লাগাই। দুর থেকে, হ্যাঁ, আমাদের রেখে আসা অতীতকে দেখি। আর চারপাশের আমাদের ক্রিয়াকলাপে চোখ রাখি। 

আমরা সুন্দর সুন্দর কথা বলি বিস্তর। মুখে লেগে থাকে হিসেবি হাসি। উন্নয়নের জোয়ারে আমরা গা ভাসাই। বাড়িতে আমি পাখির ছবি টাঙাই। নদীর পাড়ের হোটেলে আমি দিনযাপন করি। সমুদ্রতীরে গাড়ি ছোটাই। জলাভূমিকে মুহূর্তে উধাও করি। আমাদের রচিত শিল্পে বাতাসে জলে অন্ধকার নেমে আসে। প্রিয় সুর কখন উৎকট চীৎকার হয়ে যায়। স্বাভাবিক খাদ্য অস্বাভাবিক হয়ে যায় রাসায়নিক সখ্যের চক্রান্তে। বলি বটে জঙ্গলের রূপে আমরা মুগ্ধ- সে আমাদের কথার কথা। বরং যুগ যুগ ধরে যা কিছু স্বাভাবিক নিয়মে বাঁধা- এই আমরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে- তার ওপর আগ্রাসন চালিয়েছি। নিন্দুকরা তো হন্তারকও বলেন। ঐ নিন্দুকরা আসলে না-মানুষের দল। আমরা আমাদেরই তৈরি করা  শব্দবন্ধে উত্তর-আধুনিক সভ্যতার সীমা বাড়িয়ে চলেছি। ম্যাজিক দেখিয়ে গিয়েছি অন্যদের। হাতিয়ার করেছি অর্থ ও প্রযুক্তিকে। অবাক হয়ে সহনাগরিকেরা বুঝে না বুঝে যত হাততালি দিয়েছে, আমরা উচ্চকিত হয়েছি। আরও ম্যাজিক আরও। আমরা ভাব দেখিয়েছি আমরা আরোপিত ঈশ্বর- সব পারি, সব জানি, গতিবিধি আমার সর্বত্র। এভাবেই চলেছে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। আমাদের মতো করে আমরা আমাদের মনের ভূগোল ইতিহাস তৈরি করেছি। আমরাই স্থির করেছি প্রথম বিশ্ব-দ্বিতীয় বিশ্ব, সাদা-কালো, উন্নত-অনুন্নত কত না বিভাজন।

অতঃপর এই নির্জন দ্বীপে আজ
আমরা সবাই। সব পাওয়া আর সবহারারা এখন একই শৃঙখলে। একে অপরের প্রাণরক্ষার খাতিরে দ্বীপান্তরে। হানা দিয়েছে দৈত্য। অজানা দৈত্য প্রাণ নিতে এসেছে। অপ্রস্তুত পৃথিবী জুড়ে ত্রাস। আত্মকেন্দ্রিক ভোগক্লান্ত বৃহত্তর সমাজ তৈরি ছিল না এসবের তরে। আর তৈরি থাকবেই বা কীভাবে? আমরাই তো অনেকে বলে আসছিলাম, জলবায়ু পরিবর্তন- ওসব আবার কী? অ্যামাজন পুড়েছে? পুড়ুক না! অস্ট্রেলিয়ার আগুন লাগা অরণ্য থেকে বেরিয়ে পড়েছে মা কোয়ালা? কী এমন হয়েছে যদি মেষভালুক বা বাঘেরা হেঁটে বেড়ায় জাতীয় সড়কে? শত শত বছরের গাছেদের প্রকাশ্য নিধনও যেন তাদের প্রাপ্য- অনেকদিন তো বেঁচেছ। তোমরা মনুষ্যেতর- অনেক হয়েছে। আমরা বাড়তে বাড়তে দেখ প্রায় সাড়ে সাতশো কোটি গোটা বিশ্বে। আমাদের জায়গা দাও। পথ ছাড়ো তোমরা। আমরা চাঁদে গিয়েছি, গ্রহান্তরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমরা বাজার জানি। বাজারও তার সেরা বিনোদনের বস্তুটিকে চিহ্নিত করে ফেলেছে। হঠাৎ কী যে হল! বলছিলাম না, অচেনা দৈত্য এসে পড়েছে। নিজেকে সে পরিবর্তন করে দ্রুত। সে শ্বাসঘাতী অত্যাচার করে। মৃত্যুর আগে ডুবে মরার অনুভূতি জোগায়। সেও হন্তারক। সেও অদৃশ্য। সেও ম্যাজিক জানে। সেও লড়াইয়ের কৌশল শিখে ফেলেছে। পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমরা দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে। কী পরিহাস এই বসন্তের। আপনি নির্বাক। বরং সবাক হয়েছে না-মানুষেরা।

যদি আমাদের আর্তি, আমাদের বোধ প্রকৃতির মায়াজালকে টলাতে পারে সেটাই হবে শেষ সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য এখনও পড়ে আছে সামান্য কিছু প্রকৃতি ও তার সন্তানেরা। আসুন, আমরা সবাই এই অন্যরকম নতুন বছরের শুরুতে তাদের দিকে স্নেহ ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিই। আজ আমাদের দুর্দিনের এই দ্বীপান্তরে প্রকৃতিরও যে মনখারাপ। প্রকৃতির সন্তানেরা তো আমাদের ভালবাসতেই চেয়েছিল। ভুললে চলবে না, এই হন্তারক দৈত্যকে বোতলবন্দি করার রক্ষাকবচও কিন্তু প্রকৃতির হাতেই।
 নব আনন্দে জেগে ওঠার সুযোগ বিশ্বপ্রকৃতি মানবসভ্যতাকে নিশ্চয়ই আরেকবার দেবে।

Friday, 10 April 2020

বিশ্ব প্রকৃতি


উন্নত দেশগুলির বেহাল অবস্থা কেন!
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

কোভিড১৯-এর দাপটে এখন বিশ্ব জুড়ে নাভিশ্বাস। এ আর বলার মতো কী কথা! সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে তার ভেতরে অন্য এক ছবিও যেন প্রতীয়মান।

কেউ কেউ এই দ্রুত পালটে যাওয়া চারপাশকে ‘এন্ড অফ ক্যাপিটালিজম’ বলছেন, কেউ বলছেন নতুন মানবসত্তার উত্থানের কথা। আকাশ আবার নীল রঙ ফিরে পাচ্ছে, বাতাস অনেক শ্বাসযোগ্য হচ্ছে, নদী-নালা স্বচ্ছ হয়ে উঠছে, কাশির দমকের সঙ্গে কালো কফ’ও তেমন দেখা দিচ্ছে না- এইসব ছবিও অনেককে স্বস্তি দিচ্ছে। তাহলে সব কিছু ছাপিয়ে এই ধরা কি আবার নির্মল, স্বচ্ছ, প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে? বহু মানুষ এমনটাই ভাবতে চাইছেন। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মৃত্যুভয়ে জর্জরিত, বিপন্ন, বিপর্যস্ত মানুষ আশার আলো বোনে, বহু গুণে মানবিক ও দার্শনিক হয়ে ওঠাই তার কাছে তখন ব্রত। এই স্বপ্নের বুনন তাকে কলুষমুক্ত করে। এ শুধু আজকের প্রবণতা নয়, বহুবার, বারবার মানুষ এমনতর স্বপ্নের ছাপ রেখে গেছে। কিন্তু আবারও, সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে এলে, সে তার জিঘাংসার দান ফেলতে কসুর করেনি।

একদিন কোভিড১৯’কে মনুষ্য প্রজাতি হয়তো জয় করবে, তার ঔষধি ও ভ্যাকসিনও আবিষ্কৃত হবে, মৃত্যু মিছিল স্তব্ধ হবে কিন্তু আবারও সে সুসময়ে নতুন করে মানুষের দুঃসহ যাপন যে পৃথিবীর আলোবাতাসকে গ্রাস করবে না, তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই! আমরা জানি, প্রতিটি কর্মের ফল সে কর্মের ছাপ বহন করে। আজ মানুষের ঐকান্তিক ও মরীয়া প্রচেষ্টায় হয়তো নিকট ভবিষ্যতে রুদ্ধ হবে কোভিড১৯-এর আগ্রাসন কিন্তু এর এই তীব্র প্রকোপে কি অতীত কর্মের কোনও ছাপ ছিল না? সে প্রশ্নটি আমাদের সাধারণজনকে বড় ভাবাচ্ছে। কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন হয়তো অনেকেরই মাথায় ছিটকে উঠছে।

যেমন, বলা হয়েছে, কোভিড১৯ অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এর মারণক্ষমতা মোট আক্রান্তের ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি নয়। এই ধারণাটি অনেক দিন ধরেই ঘুরছে এবং এ দেশের পরিসংখ্যানেও তেমন ইঙ্গিত আছে। কিন্তু চোখটা টেরিয়ে গেল ইউরোপিয় দেশগুলির তথ্য দেখে। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয় তথ্যে (সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ১০ এপ্রিল ২০২০) দেখা যাচ্ছে,
দেশ                    আক্রান্ত            মৃত্যু          শতাংশ
স্পেন                   ১৫২৪৪৬         ১৫২৩৮         ৯.৯
ইতালি                 ১৪৩৬২৬         ১৮২৭৯         ১২.৭২
ফ্রান্স                    ৮৩০৮০         ১০৮৮৭         ১৩.১
ইংল্যান্ড                 ৬১৫১৬           ৭৯৭৮         ১২.৯৬
বেলজিয়াম              ২৪৯৮৩         ২৫২৩          ১০.০৯

অর্থাৎ, ইউরোপের অতি আক্রান্ত দেশগুলিতে মৃত্যুর হার ১০ শতাংশ বা তার অধিক। এই হার যে বাড়বে না সে কথা জোর করে এখনই কেউ বলতে পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা, এ রোগের প্রকোপ কবে প্রায়-নির্মূল হবে সে কথাও অনিশ্চিত। তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলি থেকে এইসব উন্নত দেশে মৃত্যুর হার কেন বেশি তা নিয়ে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। যেমন, কেউ কেউ বলছেন, ইউরোপের দেশে বরিষ্ঠ মানুষজনের সংখ্যা বেশি এবং যেহেতু বয়সোজনিত কারণে তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং তারা নানা পূর্ব-ব্যাধি দ্বারাও ন্যুব্জ অতএব তাদের মৃত্যুহারও বেশি। এই তথ্যটি আমি জানি না যথেষ্ট সাবলীল কিনা। এ নিয়ে তেমন কিছু সংকলনও হয়নি। তবে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য ইতালি সম্পর্কে পাচ্ছি (সূত্র: www.worldometers.info)- ১০ এপ্রিল ২০২০-তে সংকলিত মোট সমাধা হয়ে যাওয়া ৪৬৭৪৯ কেসগুলির (closed cases) মধ্যে আরোগ্য লাভ করেছেন ২৮৪৭০ জন বা ৬১ শতাংশ এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮২৭৯ জনের বা ৩৯ শতাংশের। এই আরোগ্য লাভ ও মৃত্যুর মধ্যে দূরত্ব কিন্তু খুব বেশি লম্বা নয়। ছবিটি অত্যন্ত নিরাশাজনক।

প্রশ্ন হল, ইউরোপে মৃত্যুহারে এই উর্ধ্বগতি কেন?  যেমন ধরা যাক ইতালি। গত ২৫ মার্চ ‘দ্য ল্যানসেট’এ ইতালির মৃত্যুর কারণ নিয়ে ‘The Italian Health System and the Covid19 Challenge’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ বেরিয়েছে। সেখানে ইতালির এই দুর্যোগের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে তাদের ন্যাশনাল হেলথকেয়ার সার্ভিস ব্যবস্থার ভেঙ্গে পড়াকে এবং তা ঘটেছে মূলত দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণ ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারের তরফে অর্থ সংস্থানের জোগান কমিয়ে আনার ফলে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ইতালিতে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ৩৭ বিলিয়ন ইউরো কাটছাঁট করা হয়েছে। এই বেপরোয়া বেসরকারিকরণ ও স্বাস্থ্যের ব্যবসা শুধু ইতালি কেন, প্রায় সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকায় সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার দাসে পরিণত করেছে এবং অতি মাত্রায় ওষুধ, হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভরশীল করিয়েছে। যে কোনও মামুলি অসুখবিসুখেই ডাক্তার ও ওষুধের ওপর মানুষকে অতি মাত্রায় নির্ভর করিয়ে দেওয়ার ফলে অতি চিকিৎসা, ভুল চিকিৎসা ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার বলি হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই প্রাণঘাতী চিকিৎসা জনিত মহামারীতে মৃত্যু এক স্বাভাবিক জীবনপ্রণালীতে রূপ পেয়েছে, যাকে তারা আবার নামকরণ করেছে iatrogenic disease নামে। আমেরিকায় প্রতি বছরে সব থেকে বেশি মৃত্যুর প্রথম দুটি কারণ যদি হার্ট অ্যাটাক ও ক্যানসার হয় তো তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই iatrogenic disease। ওষুধ ও হাসপাতালের ওপর এই অতি নির্ভরতা মানুষকে প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণত বিযুক্ত করেছে এবং জল কাদা মাটিতে বেঁচে থাকার যে স্বাভাবিক যাপন তার থেকে দূরে সরিয়ে তাকে ভূ-বিরোধী এক যান্ত্রিক সত্তায় পরিণত করেছে, যেখানে অজানা কোনও রোগ বা ভাইরাসকে মোকাবিলা করার জৈবিক ক্ষমতাকে সে হারিয়ে ফেলেছে। আর এই বিপর্যয় উন্নত দেশের প্রায় সব পরিসরেই নির্মম ভাবে থাবা বসিয়েছে।

গত ১৮ মার্চ ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় জর্জ মনবিয়ট একটি নিবন্ধে বলছেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে শাসন করছে প্রধানত তামাক ও তেল কোম্পানিগুলো। তাদের নির্দেশিত বিবিধ নীতির কারণে ভেঙ্গে পড়েছে জলবায়ুর ভারসাম্য, ধস নেমেছে জৈব জগতে, দূষিত হয়েছে জল ও বাতাস, অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে শারীরিক স্থূলতা ও ক্রেতা ঋণ এবং সর্বশেষ প্রকোপ হল এই করোনা ভাইরাস। এই সার্বিক বিপর্যয়ের আধারেই আজকের কোভিড১৯-এর মারণক্ষমতাকে বিচার করা উচিত। সে তুলনায় ভারত সহ অন্যান্য এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলির অবস্থা অনেক ভাল। দারিদ্র্য ও পরম্পরাগত ঐতিহ্যের নানাবিধ কারণে প্রকৃতি-বিযুক্ত বদ্ধ জীবনের ওষুধ-সর্বস্বতা এখানে এখনও তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। যে কারণে মানুষের সাধারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখানে অনেক বেশি ও প্রকৃতির নিয়মে নানা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে সঙ্গী করে ও শরীরে তার স্বভাবজাত অ্যান্টিবডি তৈরি করেই বাঁচার কৌশলে তারা অনেক বেশি পারদর্শী। তা বলে, চিহ্নিত রোগী ও রোগের সংক্রমণকে উপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু উন্নত দেশের ‘অতি উন্নতি’র কাছে বিকিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তা ‘অনুন্নত’ দেশের সাধারণজনের তুলনায় যে প্রকৃতিগত ভাবে দুর্বল ও অসহায় তা আজ এই বাতায়নে এসে স্বীকার করে নেওয়াই ভাল।

দেশের সুবিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ বি এম হেগড়ে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, অসুস্থ মানুষজনের মাত্র ১ শতাংশের চিকিৎসা দরকার। অসুখ ও রোগভোগকে শরীর ও মন অনেকাংশেই প্রতিরোধ করতে পারে। কথায় বলে, জ্বর হয়েছে? ওষুধ খেলে সাতদিনে সারবে, না খেলে এক সপ্তাহ। স্বাস্থ্য সচেতনতা, শরীরকে বুঝে চলা, ধুলো মাটি জল হাওয়া নিয়ে বাঁচা– এই হতে পারে আমাদের বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার সুর। আর সেখানেই আছে নীরোগ হওয়ার মোক্ষম দাওয়াই। তবু যদি শরীর না দেয় তখন তো ডাক্তারবাবুরা আছেনই। কিন্তু কথায় কথায় ওষুধ, হাসপাতাল, অস্ত্রোপচার? নৈব নৈব চ। কোভিড১৯ নিয়ে যে বিশ্বত্রাস ও উন্নত দেশগুলির মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থা তার থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের আরও আরও প্রকৃতির কোলকে আশ্রয় করতে হবে। ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, পশু-পাখি, গাছপালা নিয়েই তো আমাদের সার্বিক জীবন।

তবে আমাদের অন্য এক দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে। দেশে যে লকডাউন চলেছে তার অর্থনৈতিক অভিঘাত কী হতে পারে এ নিয়ে অবশ্যই শঙ্কার কারণ আছে। ক্ষুধা বনাম কোভিড– কোন পথে চলেছে দেশ? অর্থনীতির আঙ্গিনায় কি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আগতপ্রায়? সমস্ত কিছু কি উলটে যেতে বসেছে নাকি মহামারীর এ এক ক্ষণিকের ঝাপটা মাত্র! যার পর আবার আগের মতোই পৃথিবীকে দিকনির্দেশ করবে চরম লোভ ও জিঘাংসা! অত রোমান্টিকতার আদৌ কি কিছু আছে? উন্নত দেশগুলি সজোরে ধাক্কা খেল বলে কী এ অনুন্নত দেশগুলোর তির্যক তিরস্কার: দ্যাখ, কেমন লাগে!       

জনস্বাস্থ্যের প্রারম্ভ

ঔপনিবেশিক ভারতে ম্যালেরিয়া মহামারীর ইতিহাস 
ও জনস্বাস্থ্যের প্রারম্ভ
সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনায়: উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায় 

১.

ঔপনিবেশিক ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ম্যালেরিয়া একটি বহু আলোচিত ব্যাধি। তার কারণ প্রসঙ্গে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই পরিবেশের কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গোটা বঙ্গদেশে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরে কলেরা ও ম্যালেরিয়া অসুখ দুটি মহামারীর রূপ নিয়েছিল যা বাংলা সম্পর্কে ঔপনিবেশিক মহলে একটা নেতিবাচক ধারণা গড়ে তুলেছিল। ১৮৩০'এর দশকে F P Strong অসুখের সেই সময়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা অর্থাৎ পচা জিনিস থেকে নির্গত বায়ু দায়ী (miasma) বলে ধরা হত। সে সময়ে এটি ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছিলেন অনেক চিন্তকই। ১৮৪০ সালে James Taylor'এর লেখা থেকেও পাওয়া যায় যে তখন ম্যালেরিয়ার পরিবেশগত কারণের উপর খুব জোর দেওয়া হয়েছিল। সেই বছরেই সেপ্টেম্বরে বাৎসরিক বন্যা যেই কমে যায় তখন ম্যালেরিয়া দেখা দেয় এবং নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত তার তীব্রতা বজায় থাকে। কিছু কিছু এলাকা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে জনসাধারণ বহুদিন ধরে জ্বরে ভোগে ।

Twining এর মতে, উত্তর ভারতের জনসাধারণ যথেষ্ট শক্তিশালী ও পরিশ্রমী জাতি এবং সেই তুলনায় বাঙালিরা দুর্বল যার কারণ অংশত তাদের প্রধান খাদ্য চাল, এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া। ১৮৫০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশে দেখা দিল 'বর্ধমান জ্বর' যা সম্ভবত ম্যালেরিয়া মহামারী, যার প্রকোপে বহু জেলার অনেক জনসাধারণ মারা যায়। ম্যালেরিয়া অসুখের প্রকোপের একটি সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা তাই ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন।

বাংলার প্রাদেশিক স্যানিটারি কমিশনারদের রিপোর্টে ১৮৭১-১৮৭২ থেকে  প্রত্যেক দশকের আদমশুমারিতে ম্যালেরিয়ার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হত। ম্যালেরিয়া যে শুধু মৃত্যু ডেকে এনেছিল তাই নয়, এটি ছিল অন্য অনেক অর্থে ক্ষতিকারক। এই অসুখে ভুগে রোগী হয়ে পড়ত খুব দুর্বল, কর্মক্ষমতা হ্রাস পেত এবং এর দ্বারা ঔপনিবেশিক আদর্শ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের পুরুষ ও যুদ্ধবাজ জাতি এবং নারীসুলভ কমনীয় বাঙালি জাতির মধ্যে যে বিভাজন-মিথ আগেই করা হয়েছিল তা আরও সমর্থন অর্জন করেছিল। এই তত্ত্বের বিশ্লেষণ  থেকে বোঝা যেত ঔপনিবেশিক ভাবনায় চিকিৎসাবিজ্ঞান কিভাবে জাতিতত্ত্বকে প্রভাবিত করেছিল এবং বাঙালিরা নিজেদের শারীরিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার ব্যাখ্যায় এই ধরনের বিশ্লেষণের শরণাপন্ন হত। ১৮৮৯-এ  বাংলার স্যানিটারি কমিশনারের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের সমগ্র মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের কারণ ছিল ম্যালেরিয়া জ্বর যা বছরে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল।

২.

ম্যালেরিয়া রোগের ইতিহাসের অন্য একটি দিক ছিল ম্যালেরিয়ার কারণ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের উপায়ের  সন্ধানের জন্য গবেষণা। এই গবেষণালব্ধ ফলাফলকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা ১৮৫০-এর দশকে
T E Dempster বলে একজন অফিসার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ম্যালেরিয়া সম্পর্কে বোঝেন যে, এই রোগটা আসে খালের মাধ্যমে যে জলসেচ ব্যবস্থা আছে, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। 'spleen index' অর্থাৎ প্লীহার অবস্থাকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বোঝার নির্ভরযোগ্য সূচক বলে তিনিই কিন্তু প্রথম দেখিয়েছিলেন।

ম্যালেরিয়া মহামারীর কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকারের তরফ থেকে ১৮৬৩ সালে বাংলাদেশে একটি তদন্ত কমিটি স্থাপন করা হয়েছিল। এর ভারতীয় সদস্য রাজা দিগম্বর মিত্র রেলপথ নির্মাণ এবং রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ - এগুলির সাথে সাথেই  ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বা এর মধ্যে যোগাযোগ আছে বলে  দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

স্যার রোনাল্ড রস্ কর্তৃক ম্যালেরিয়া বাহক মশার বিষয়ে আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত ম্যালেরিয়া দমনের দুটি পন্থা ছিল - জলাভূমি প্রভৃতির ক্ষেত্রে উন্নতি গ্রহণ এবং প্রতিষেধক ওষুধ যেমন সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে প্রস্তুত কুইনাইন প্রয়োগ। ১৯০০ সাল নাগাদ ভারতের বড় বড় শহরে নিকাশি ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল। কুইনাইন পাউডার সরকারি চিকিৎসা বিভাগে বন্টন করা হত ও সেখান থেকে অন্যান্যদের কাছে পৌঁছত। এটা খুব ইন্টারেস্টিং যে কুইনাইনকে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র (tool of Empire)মনে করা হত সেই সময়ে। অবশ্য এটি সবসময় খুব সফল অস্ত্র ছিল না এবং ওষুধ হিসেবে এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছিল। আমাদের বর্তমানে কলকাতার পিজি হাসপাতালেই স্যার রোনাল্ড রস তাঁর পুরো গবেষণাটি চালিয়েছিলেন। রোনাল্ড রস অ্যানোফিলিস (anopheles) মশাকে  ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু বাহক বলে চিহ্নিত করার পরে জনস্বাস্থ্য নীতির ক্ষেত্রে একেবারে নতুন প্রতিক্রিয়া দেখা দিল । রোনাল্ড রস ও তার অনুগামীরা ম্যালেরিয়ার মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য 'mosquito brigade' গঠন ও 'নিকাশি ব্যবস্থা'র উন্নতি, জলাভূমি সাফাই ইত্যাদির ওপর জোর দিয়েছিলেন। অনেক ব্রিটিশ মেডিক্যাল অফিসার কুইনাইন প্রয়োগের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। ১৯১১ সালে ভারত সরকারের স্যানিটারি কমিশনার নিযুক্ত হলেন C P Lukisd - তিনি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি বিধানের উপরেই জোর দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন রোনাল্ড রসের ভক্ত ও তাঁর অনুসারী।

৩.

১৯০৯ সালের অক্টোবরে সিমলাতে ইম্পেরিয়াল ম্যালেরিয়া কনফারেন্স হয়। এরপরেই স্থাপিত হল সেন্ট্রাল ম্যালেরিয়া কমিটি। এছাড়া Pasudism নামে একটা নতুন জার্নাল ছাপানো শুরু হয়েছিল । কনফারেন্সের পরে ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সুদুরপ্রসারী কোনও গবেষণাকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল অফিসারদের পরিচিতি করানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের সুবিধা হয়েছিল।

১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিসার্চ ফান্ড এসোসিয়েশন-এর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম ছিল ম্যালেরিয়াকে ঘিরে। এই সময়ে ঔপনিবেশিক সরকারের উন্নতির বাধাস্বরূপ ছিল ম্যালেরিয়া ব্যাধি। ঐ IRFA-এর তরফ থেকে ম্যালেরিয়া নিবারণ তদারকের জন্য প্রথম বছরে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা স্থানীয় সরকারগুলিকে প্রদান করা হয়েছিল। বাংলাদেশে C A Bentley সাহেব তখন স্যানিটারি অধিকর্তা ও জনস্বাস্থ্য অধিকর্তা। তাঁর মতে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব-এর জন্য দায়ী ছিল নদী ব্যবস্থার অবনতি ও সেচ ব্যবস্থার প্রতিকূলতা । রেলপথ নির্মাণের জন্য যেখানে সেখানে বাঁধ দেওয়ার ফলে জলনিকাশি ব্যবস্থা মার খাচ্ছিল, ফলে জমা জলে ম্যালেরিয়ার জীবাণু বৃদ্ধি পাচ্ছিল।ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষির, প্রচুর স্বাস্থ্যের অবনতি হত সাধারণ মানুষের। এবং, গ্রামগুলির জনসাধারণ প্রায়ই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হত। তাঁর মতে অবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজন ইতালির অনুসরণে পরিকল্পনা গ্রহণ অর্থাৎ মাটির উপরিভাগের জমা জল নিষ্কাশন এর সুবন্দোবস্ত করা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা স্থানীয় আবহাওয়ার উপযোগী চাষ ও কৃষকদের সমৃদ্ধি বৃদ্ধির মাধ্যমে একই সঙ্গে কৃষিব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি।

অনেকের মতে, ঔপনিবেশিক আমলের ম্যালেরিয়া ছিল মানুষের তৈরি করা ম্যালেরিয়া। অর্থাৎ, রাস্তাঘাট ও রেলপথ নির্মাণ এবং নদীপথে বাঁধ নির্মাণ প্রভৃতি তথাকথিত উন্নতিমূলক কার্যকলাপের ফলে প্রথাগত জল নিকাশি ব্যবস্থার শেষ অবস্থা ও কৃষি ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয় যার সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের অবনতি তথা ম্যালেরিয়া প্রকোপ বৃদ্ধি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অতএব এখনকার সমস্যার সঙ্গে তখনকার সমস্যাতে একটা ব্যাপার তো প্রায় একই। সেটি হল আধুনিক সভ্যতা যত এগোবে বা প্রকৃতিনিধন যত হবে ততই কিন্তু বীজাণু রোগের প্রাবল্য  বাড়বে এবং একইসঙ্গে প্রতিষেধক ওষুধও চালু হবে - ক্যাপিটালিজম সবটাকে ঢুকিয়ে নেবে তার আলেখ্যে আর মাঝখানে বেশ কিছু মানুষ মহামারীতে মারা যাবে। যে কোনও সমাজ ব্যবস্থাতেই।

৪.

ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে জনস্বাস্থ্য নীতির খুব সামান্য সূত্রপাত হয়েছিল বলা চলে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ডিসপেনসারি ও হাসপাতালের স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি বসন্তরোগ, ম্যালেরিয়া, কলেরা ও অন্যান্য ব্যাধির প্রতিষেধক টিকা প্রদানের কেন্দ্রস্থল ছিল। ১৮৫৭-র  পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকারের শাসন শুরু হবার পরে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ১৮৫৮ সালে 'Royal Commission on the Sanitary State of The Army in India' নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৮৬৩-র রিপোর্টে এই কমিশন ইউরোপিয়দের বাসস্থানের (সৈন্য ছাউনি ও বেসামরিক অঞ্চল) সুনির্দিষ্টকরণ, India Office Medical Board-এর সভাপতি এবং কমিশনের সদস্য J T Martin-এর নির্ধারিত ভূতাত্ত্বিক নীতিসমূহ অনুযায়ী তার সংগঠন এবং ব্রিটেনের স্বাস্থ্য আইন ও নির্দেশ অনুযায়ী এই অঞ্চলগুলির শাসনতান্ত্রিক পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল। এই অনুযায়ী Military Cantonments Act,1864 অনুসারে নতুন নিয়োজিত ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ সেনাছাউনিগুলিকে আরও প্রশস্ত করে বানাতে শুরু করে।

সৈন্যদের মধ্যে সিফিলিস প্রভৃতি যৌনব্যাধির প্রকোপ ছিল খুব বেশি এবং তা দমনের উদ্দেশ্যে Cantonment Act এর বলে পতিতালয়গুলির নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক তদন্ত ও দেখাশুনা করা হত। ১৮৬৮ তে প্রবর্তিত হলো Indian Contagious Diseases Act কিন্তু ১৮৮৮-তেই এই আইন রদ করা হয় তবে পতিতালয়ের অধিবাসীদের স্বাস্থ্য বিভাগীয় নজরদারি বন্ধ হয়নি এবং নতুন প্রবর্তিত Military Cantonment, 1864 দ্বারা তা চালু থাকে। ১৮৯৫-এ প্রবর্তিত আইনে স্বাস্থ্য বিভাগীয় নজরদারি ইত্যাদি বন্ধ থাকে কিন্তু ১৮৯৭'এ তার ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। Epidemic Diseases Act ,1897 এমন একটি আইন ছিল যা প্রাদেশিক সরকারের হাতে বহু ক্ষমতা প্রদান করেছিল।

১৮৮০ সালের Compulsory Vaccination Act প্রাদেশিক সরকারগুলিকে কিছু শহর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে  ৬ বছরের চেয়ে বড় শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক টীকাপ্রদান চালু করেছিল । তবে অনেক জায়গায় এই আইন প্রবর্তন করা হয়নি এবং ১৯০৬ সালে শুধু ৪৪১টি শহর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে এটি চালু ছিল যা ব্রিটিশ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা ৭ ভাগের উপস্থিতিকে প্রতিনিধিত্ব করত।
আগেই বলে বলেছি ডিসপেনসারির ভূমিকার কথা। ১৮৭০ সাল থেকে ব্যয় সংক্ষেপ করার জন্য ঔপনিবেশিক সরকার ডিসপেনসারির খরচ চালানোর থেকে দূরে সরে থাকছিল এবং স্থানীয়ভাবে এগুলির ব্যয় নির্বাহের ওপর জোর দিয়েছিল। বাংলার সরকারের মতে: 'the utility of dispensaries has now become so fully acknowledged that there is no necessity for the state to offer assistance to such an extent as when the movement was recent...  The accumulation of balances further shows that there is no difficulty in obtaining locally even mere money that suffices to meet the wants of there institutions as ar present conducted.'

১৮৬৭ সালে বাংলাদেশে ৬১টি ডিসপেনসারি চালু ছিল। ১৯০০ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৫০০। মহিলাদের প্রতিষেধক টীকাদান ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডিসপেনসারিগুলি ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৬৯ সালে বেরেলি জেলায় ডিসপেনসারির তত্ত্বাবধায়ক-এর মতে মহিলাদের সেখানে আসার জন্য রাজি করানোর ব্যাপারে তার এবং অন্যান্য কর্মচারীদের খুব অসুবিধে হয়েছে। ১৮৭১ সালে বাংলাদেশে যারা ডিসপেনসারিতে চিকিৎসার জন্য এসেছিল তাদের মধ্যে শতকরা ১৮ ভাগ ছিল মহিলা। ১৯০০ সালে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলি ইন্সপেক্টর জেনারেল বলেছিলেন যে বাংলাদেশের অধিকাংশ ডিসপেনসারি এখন 'been improved... in connection with the privacy of women. In all places the object has been to have a separate delivery window for females, which shall open, if possible, into a separate waiting room for that sex. Privacy for women has been held by me to be a most important condition of success.'

ডিসপেনসারির বাইরে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে সরকারের ভূমিকা প্রধানত সীমিত ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যচর্চা বিষয়ক বইপত্র বিতরণের মধ্যে।  J M Cunningham এর 'Sanitary Primer' বইটি বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছিল এবং ভারতীয় বিদ্যালয়গুলির নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তক ছিল। ১৮৮৭'তে এই বইটির পরিবর্তে খ্রীষ্টান মিশনারিদের সংগঠন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ 'The way to health' পাঠ্যপুস্তক নির্বাচিত হয়েছিল।


৫.

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অথবা ১৮৫০ সালের পরে কিছুটা শিল্পায়ন আরম্ভ হলে শিল্পাঞ্চলগুলিকে কেন্দ্র করে জনবসতি বাড়তে থাকে এবং বহু রেললাইন, সড়ক, জলাধার, বাঁধ নির্মাণের ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভীষণ অবনতি ঘটতে থাকে। ইতিমধ্যে সরকার কেবলমাত্র মিলিটারিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে কলেরার প্রকোপ কমাতে সক্ষম হলেও গ্রামাঞ্চলে ম্যালেরিয়া, কলেরা ও কালাজ্বরের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়নি। কারণ, তৎকালীন সমাজে বিভিন্ন ঘটনার তথ্যপঞ্জী হিসেব কষে তা অনুসারে ১৮৭১-৮১ সালের মধ্যে বাংলায় লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণত্যাগ করে। এর মধ্যে মেদিনীপুর বর্ধমানের মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৮৫ হাজার ও দেড় লক্ষ। বাধ্য হয়ে সরকার ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে শহর ও শহরতলি, মেলা ও জনবহুল এলাকাগুলিতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলিতে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ করা, জলনিকাশির ব্যবস্থা করা,  স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা, বিশোধক  রাসায়নিক সরবরাহ শুরু করে। কিন্তু পরিস্থিতির আদৌ বিশেষ উন্নতি ঘটেনি তেমন।
বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে(১৯২০ ও তারপর) জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজকর্মের দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে চলে যায় এবং ১৯২০ সালে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জনস্বাস্থ্য বিভাগ খোলা হয়েছিল। এ কথা অনস্বীকার্য যে পশ্চিমী চিকিৎসাবিজ্ঞান নগর বা শহরের বিত্তশালীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, গ্রামের লোকজন বা শহরের দরিদ্র সম্প্রদায়ের কাছে ঔপনিবেশিক পর্বে তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো সম্প্রসারিত তেমন হয়ে ওঠেনি।


সহায়ক রেফারেন্স:
-------------------------
১) David Arnold, Colonizing the Body, State Medicine and Epidemic Disease in Nineteenth Century India, Oxford University Press, Delhi edn, 1993;
২) Poonam Bala, Imperialism and Medicine in Bengal : A Socio-Historical Perspective, Sage Publications, New Delhi, 1991;
৩) Mark Harrison. Public Health in British India: Anglo Indian Preventive Medicine 1859-1914, Cambridge University Press, Foundation Book, New Delhi, 1994;
৪) David Arnold, The New Cambridge History of India;  Science, Technology and Medicine in Colonial India, Cambridge University Press, 2000 (pdf copy).