Monday, 2 March 2026

৬০+৫ লক্ষের গেরোটাই কাটাতে হবে

কারা কোন দিকে?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ব্যাপক গণ নজরদারি, দিকে দিকে জনতার বিক্ষোভ, মমতার ঐতিহাসিক সওয়াল ও শীর্ষ আদালতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশের বলে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (বা নির্যাতন কমিশন) ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের একটি অসমাপ্ত ‘চূড়ান্ত নির্বাচক তালিকা’ প্রকাশ করেছে। বাংলার মানুষকে যতটা তারা ঘায়েল করবে ভেবেছিল, ততটা না পারলেও কিছুটা ক্ষতি তো করেইছে; সর্বোপরি, ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে এখনও ‘বিচারাধীন’ (বলা ভালো, বন্দী) রেখেছে, খসড়া তালিকা থেকে লাখ পাঁচেক মানুষকে গায়েবও করে দিয়েছে। যদিচ আগেই, খসড়া তালিকাতেও বহু জীবিত মানুষকে তারা ‘মৃত’ সাজিয়েছিল। অর্থাৎ, বিজেপি’র রাজ্য নেতৃত্বের আবদার মতো নির্যাতন কমিশন ১ কোটি ২৫ লক্ষ মতো নাম বাদ দেওয়ার এজেন্ডা নিয়েই মাঠে নেমেছে। অন্তত এখনও তারা সেই মোতাবেকই এগোনোর চেষ্টা করছে— খসড়া তালিকায় বাদ ৫৮ লক্ষ + চূড়ান্ত তালিকায় বাদ ও বিচারাধীন মিলিয়ে যথাক্রমে ৫ লক্ষ + ৬০ লক্ষ যার সর্বমোট যোগফল ১ কোটি ২৩ লক্ষ। এই অঙ্কে না পৌঁছতে পারলে ভ্যানিশকুমার ও মনোজ আগরওয়াল, দুজনের কপালেই অশেষ দুঃখ আছে। তাই, লাস্ট ল্যাপে এখন উর্ধ্বশ্বাস অবস্থা।

বাংলা, বোঝাই যাচ্ছে, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি বা বিহারের মতো নয়, যেখানে বিনা প্রতিরোধে বিরোধীদের বেকুব বানিয়ে ভোটার তালিকায় দেদার কারচুপি করে অনায়াসে রাজ্যের দখল নেওয়া যাবে। এখানে প্রথম দিন থেকেই সাধারণ সচেতন মানুষ ও শাসক দল (রাজ্যে শাসক কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে বিরোধী) সদা-সতর্ক হয়েই পথে থেকেছে, পদে পদে কমিশনের বদমায়েসিগুলি ধরেছে, ঠিক ঠিক ভাবে আদালতে সওয়াল করেছে, দিল্লির রাজপথেও হল্লা-বোল তুলেছে এবং সমানে সমানে টক্কর দিয়েছে। পাশাপাশি, খুবই বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বহু আতঙ্কিত মানুষজন আত্মহননের পথে গেছেন, অনেকে চাপ ও আশঙ্কা সহ্য না করতে পেরে অসুস্থ হয়েও মারা গেছেন। সর্বমোট মৃতের সংখ্যাটা ১৭০’এর মতো! আবার এও দেখা গেছে, কিছু আত্মঘোষক ‘ভদ্রলোক’ নাম্নী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত এক শ্রেণির জীব খুব আহ্লাদিত হয়ে এই আপামর বাঙালি নির্মূলিকরণের কার্যসূচিকে উদাত্ত কন্ঠে তাদের পোষিত চ্যানেলে (ধেড়ে-আনন্দ) বাহবা দিয়েছে এবং এই গোত্রের বাকীরা চারপাশে নীরবে অথবা ফিসফাসে সর্বত্র নানাবিধ মদত জুগিয়েছে। তিলু মজুমদার ও নাড়ু ব্যানার্জি এদেরই অগ্রগণ্য। নাড়ু তো সেই আরজিকর আন্দোলনের সময়েই চুপিচুপি কুণাল ঘোষের পদতলে নিজেকে সঁপে দিয়ে এসেছিল, এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছে, সিপিএম ও বিজেপি’র ফ্রন্ট হওয়া উচিত। বলাই বাহুল্য, সকলেরই যেমন মতপ্রকাশের অধিকার আছে তেমনই পক্ষ বিচারের গুরুত্বও কম কিছু নয়। যে যার আপন মনে সে হিসেবও করে রাখে।

মোদ্দা কথাটা হল, SIR নিয়ে যখন বাংলার রাজনীতিতে মৃত্যুমিছিল চলেছে, বাঙালির ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তৈরি হচ্ছে, বাঙালি তার আপন সত্তায় চলতে-ফিরতে পারবে কিনা সে সংশয় নির্মিত হচ্ছে, বাঙালি মুসলমান, দলিত, আদিবাসী ও মহিলাদের নিজ ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে, তখন সেই দ্বৈরথে পক্ষ-বিপক্ষ বিচারকে তো উপেক্ষা করার কোনও উপায় নেই! আমরা এক মহারণের মাঝে এসে পড়েছি। তাই, আমাদের চেহারা ও কথনও আরও স্পষ্টতর হচ্ছে, আমরা একে অপরকে আসল সত্তায় চিনতে শিখছি।

খসড়া তালিকা থেকে যে ৬০ লক্ষ বাংলার নাগরিককে ‘বিবেচনাধীন’ করে ফেলে রাখা হল, যে ৫ লক্ষকে বেমালুম বাদ দেওয়া হল, এই মুহূর্তে লড়াইটা এসে দাঁড়িয়েছে, এদের সকলকে (মৃতজন ও স্থানান্তরিত বাদে; অবশ্য তাদের বাদ দিয়েই তো খসড়া তালিকা তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে) চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে একটি সুষ্ঠু তালিকা নির্মাণের, যেখানে বর্ণ-ধর্ম-জাতি-লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক পাবেন তাঁদের ভোটদানের পূর্ণাঙ্গ অধিকার। এ নিয়ে পথের লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনি লড়াইও জারি থাকবে। কিন্তু বিষয়টিকে কমিশন ও তাদের প্রভুদের পক্ষ থেকে খানিক জটিল‌ করে তোলা হচ্ছে। নিত্য নতুন বিধি আরোপ করে নির্যাতন কমিশন একদিকে SIR’এর কাজটিকে দীর্ঘায়ত করছে, অন্যদিকে সমস্ত নিয়মকানুন ভেঙে, এমনকি আদালতের নির্দেশও অমান্য করে তালিকা নির্মাণে যথেচ্ছাচার চালিয়ে যাচ্ছে। খেয়াল করে দেখুন, যারা এই ‘বাদ’ ও ‘বিচারাধীন’এর তালিকাভুক্ত, তাদের অধিকাংশই মুসলমান ও নিম্নবর্ণ সম্প্রদায়ের এবং বিশেষত মহিলা। এই অবস্থার ফেরে হতেই পারে, বর্তমান সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে গেল, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে কেন্দ্র রাজ্যের দখল নিল। যে ভাবে সমস্ত কিছুকে সাজানো হচ্ছে, তাতে এই কার্ডটিও যে তাদের আস্তিনে লুকনো আছে, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তদুপরি, মাত্র ৫০০ মতো বিচারবিভাগীয় অফিসার দিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহে এই ঝুলে থাকা ৬০+৫=৬৫ লক্ষ নামের বিচার আদপে সম্ভব কিনা, সে তো কোটি টাকার প্রশ্ন। তবে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ যখন দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন আশা করা যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁরা আপাত কোনও সুরাহা নিশ্চিত বের করবেন।

কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষের দ্বৈরথে বাংলা যে আজ প্রবল ভাবে দ্বিখণ্ডিত, তা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। এই মেরুকরণ আগেও ছিল, কখনও সুপ্ত কখনও প্রকট। আজ আবারও তা আপন চিত্রণে তীব্রতর ভাবে প্রকটিত হয়েছে। চারপাশের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী-পরিজন, সহপাঠী-সহকর্মী মিলিয়ে কায়িক শ্রম বিমুখ যে ‘নিপাট ভদ্রসমাজ’ (মূলত উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত শোভিত), তাদের অনেকাংশের অন্তরের এমন গহন গরল কখনও কল্পনা করা যায়নি— যারা মনে মনে পোষণ করে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সম্পূর্ণত নিকেশ করে দেওয়ার দুঃসহ বাসনা, চৈতন্যে বহন করে গরিব মানুষকে দেওয়া সামান্য সরকারি অনুদানের প্রতি তীব্র বিবমিষা, উদয়াস্ত পরিশ্রম করা শ্রমজীবী মহিলাদের (গৃহে ও বাইরে একত্রে) অল্পবিস্তর অনুদান প্রাপ্তিকে (যা তাদের দেয় অতি-নিম্ন মজুরির একপ্রকার ক্ষতিপূরণ) ‘ভিক্ষাবৃত্তি’ তুল্যে ঘৃণার চোখে দেখে, তথ্যহীন ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘জনবিন্যাস পরিবর্তন’এর মিথ্যা গল্প ফেঁদে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি লালন করে চলে হিংস্র গণহত্যার প্লট— সেই তারাই আজ সরবে অথবা নীরবে কোমর বেঁধে নেমেছে এক বিদ্বেষ ভরা সমাজ নির্মাণে। SIR এই মনুবাদী হিন্দু-বর্ণভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে একটি পদক্ষেপ। তাই উক্ত তথাকথিত ভদ্রসমাজের একটা বড় অংশ আজ SIR’এর পক্ষে। আর সেই সুবাদে ‘ভদ্রবাদী’ বাম ব্যক্তিসমূহ ও দলগুলিও এ নিয়ে কেউ উদাসীন অথবা নীরব সমর্থক, কেউ বা চাঁদ সদাগর। মনে পড়ছে, ছোটবেলায় স্বচক্ষে দেখা ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে কোনও গরিব-গুর্বো লোককে ধরে ‘ভদ্রজনেদের’ কী অমানুষিক গণপিটুনি আর উৎকট উল্লাস!

তৃণমূল দল ও তদের নেত্রী প্রথম থেকেই SIR বিরোধী লড়াইকে আইনের পথে ও রাস্তায়, দু’ জায়গাতেই এনে ফেলেছেন। কিছু ফলও পেয়েছেন। ২ মার্চ এসইউসি ও সিপিআইএমএল (লিবারেশন) চূড়ান্ত তালিকায় নাম বাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করে নির্বাচন কমিশনের অফিসে ডেপুটেশন দিয়েছে। ‘দেশ বাঁচাও গণতন্ত্র বাঁচাও’ মঞ্চ একপ্রস্থ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ফেসবুকে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে ‘সারা বাংলা বিচারাধীন ভোটার মঞ্চ’ যারা বিচারাধীন ভোটারদের নানারকম সহায়তা দিতে একটি কার্যকরী যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ৬ মার্চ থেকে ধর্মতলা মেট্রো চ্যানেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্নায় বসবেন ও পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। সম্ভবত ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানি। পাশাপাশি, প্রায় প্রথম দিন থেকেই তৃণমূলের কর্মী ও BLA’রা বহু জায়গায় ভোটারদের পাশে থেকে সহায়তা করেছেন, চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম বাদ গেল তাদের অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। কিন্তু বাস্তবে কতটা সুরাহা হচ্ছে বা সর্বত্র সত্যি সত্যি তাঁরা মাঠেঘাটে আছেন কিনা তা মানুষই বুঝে নেবেন। উপরন্তু, ১ মার্চ এক সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলা এবার স্তালিনগ্রাদ হবে। এই উচ্চারণ মানুষ বাম দলগুলির থেকে শুনে অভ্যস্ত, অভিষেকের কন্ঠ নির্গত এই নিনাদ রাজনৈতিক কাঠামো ও অন্তর্বস্তুতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহক। এর সঙ্গে মিলিয়েই কিছুদিন আগে প্রতীক উর রহমানের তৃণমূল দলে নিঃশর্ত যোগদানের বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে।

তবে আমাদের আপাতত লক্ষ্য, বাংলার সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ভোটাধিকার অর্পণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে বাংলার শত্রুদের বাংলা থেকে চির বিতাড়ন।


3 comments:

  1. দলমত নির্বিশেষে বাঙালি অস্মিতার প্রশ্নে আমরা সবাই পথে নামতে প্রস্তুত। অনুগ্রহ করে কর্মসূচি গুলো একটু জানাবেন । আমার মত যারা ফেসবুক ফলো করে না তাদের সুবিধা হবে।

    ReplyDelete
  2. এই বিশাল অন্যায়কে jusএই সব অন্যায় tify করার জন্য তথাকথিত শিক্ষিত ও ভদ্র বাবুরা আবোলতাবোল বকছে।
    অনুপ্রবেশ আদি কিছু বাঁধা গত আউড়ে যাচ্ছে টিয়াপাখির মতো। আমরা দেখছি নিজেকে সাহিত্যিক বলে পরিচয় দেওয়া লেখিকা টেলিভশন চ্যানেলে হেটস্পিচ দিয়ে যাচ্ছে দিব্যি।
    দেশের নাগরিক আমরা ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। ভোটার লিস্টে নাম উঠবে কিনা জানিনা।
    হাসপাতাল থেকে ক্রিটিকাল রোগী বণ্ড দিয়ে বেরিয়ে এসে শুনানিতে যাচ্ছেন।এই সব অন্যায় চলছে কেমন নির্বিবাদে।

    ReplyDelete
  3. Kaushiki Banerjee3 March 2026 at 17:24

    excellent

    ReplyDelete