Saturday, 16 August 2025

আশার আলো দেখাল আদালত

নির্বাচন কমিশন ও বিপন্ন গণতন্ত্র

সুজাত ভদ্র



'If the electoral machinery... is worked by the people whose integrity can not be depended upon, democracy will be poisoned at source...' 

- H N Kunzru


গত ১২ অগস্ট (২০২৫) 'বিশেষ নিবিড় ভোটার' তালিকা সংশোধন সম্পর্কিত মামলার শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, 'দেখে শুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের উপর অবিশ্বাস বা বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।' প্রশ্ন হল: তা কেন দেখা দিল? এর প্রধান উত্তরটা নিহিত আছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তিন কমিশনারের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে। 

২০২৩ সালের ২ মার্চ অনুপ বারানওয়াল (Anoop Baranwal) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ এক যুগান্তকারী রায়ে বললেন, সংসদে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্য নির্বাচন করবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতি। এই রায় বাছাইয়ের পদ্ধতি হিসেবে ২০১৩ সালের লোকপাল আইনের ধারা ৪'এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। উদ্দেশ্য একটাই, সংবিধানের স্পিরিট মেনে কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, পূর্ণ স্বচ্ছতা যেন বজায় থাকে। কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে সংস্থা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। এই রায়কে নস্যাৎ করতে ২০২৩ সালের অগস্ট মাসেই মোদি সরকার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে ও বাইরে  প্রবল বিরোধিতাকে যথারীতি উপেক্ষা করে এক নতুন আইন প্রণয়ন করে। তাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও সরকারের মন্ত্রীসভার একজন (প্রধান বিচারপতি নয়) মিলে ঠিক করবেন নির্বাচন কমিশনের তিন কমিশনারকে। 

পরিণতি: একেবারে আরএসএস'এর মতাদর্শে লালিত  তিনজনকে বসিয়ে দেওয়া হল। 

স্মরণ করুন শাসক দলেরই ঘনিষ্ঠ এক আমলার পরিণতি: অরুণ গোয়েল'কে সরকার একদিনের মধ্যে স্বেচ্ছা অবসর করিয়ে, তৎসংক্রান্ত ফাইলপত্র সই সাবুদ করিয়ে কমিশনের সদস্য করল। আবার কোনও অদৃশ্য কারণে দু' দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করলেন। ধনকড়ের মতোই গোয়েলের ঝটিকা আগমন, বিদায় আজও রহস্যাবৃত। তারপর SIR'এর নামে বর্তমান নতুন ফুল বেঞ্চের (২৬তম মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার সহ দুজন) নতুন একগুচ্ছ নির্দেশিকার মুখোমুখি হল বিহার তথা ভারতের নাগরিকরা। অবশ্য, ১৪ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টের এক অন্তর্বর্তী আদেশের মাধ্যমে আপাতত এ দেশের চালু গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ -- সর্বজনীন ভোটাধিকার -- রক্ষিত হল কাগজে কলমে। একটা পরিসর তৈরি হল, রাতারাতি ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়ার সত্যতা যাচাইয়ের।

উল্লেখ্য, সংবিধান রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত গণ পরিষদের দুজন সদস্য -- অধ্যাপক শিব্বান লাল সাক্সেনা ও হৃদয়নাথ কুঞ্জরু (H N Kunzru) -- ১৯৪৯ সালেই বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন এই মর্মে যে, অনুচ্ছেদ ৩২৪ অনুসারে কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখতে গেলে সরকার ও শাসক দলের রাজনীতির বিরুদ্ধে কমিশনকে 'fully insulated' হতে হবে। ১৯৯০ সালের দীনেশ গোস্বামী কমিশন, ২০১৫ সালের আইন কমিশনের ২৫৫তম রিপোর্ট একই কথা বলেছিল। শাসক দলের নিজস্ব লোক বসালে স্বাধীন সংস্থাটি অচিরেই তার চরিত্র হারাবে, তাঁদের এই আশঙ্কার কথা আজ বাস্তব হয়ে উঠেছে। 

কমিশনের প্রথম শক থেরাপি ছিল, এপিক কার্ড ও আধার কার্ড নথি হিসেবে বিবেচ্য নয়। যুক্তি: নথি  জাল হয় (ভাবটা এমন, কমিশনের চাওয়া নথি যেন জাল হয় না, বুলেট প্রুফের মতো সব জাল প্রুফ!) এবং আধার নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি নয় (পাসপোর্ট ছাড়া কমিশনের চিহ্নিত বাকি ১০টা নথি যেন নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি!)। তাই, ১১টা নথির একটা (যা ঝাড়খণ্ডের বেলায় ছিল ৭টা) দেখিয়ে খাঁটি নাগরিকত্বও প্রমাণ করতেই হবে, তাহলেই খসড়া নির্বাচনী ভোটার তালিকায় নাম উঠবে। এটা অসাংবিধানিক। কারণ, লাল বাবু হুসেইন মামলায় নিষ্পত্তি হয়েছে যে, একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারই নাগরিকত্ব বিষয়টিকে ঠিক করার অধিকারী।

বর্তমান মামলার প্রথম দিনেই সুপ্রিম কোর্টের আধার, এপিক কার্ড'কে নথি হিসেবে গ্রহণ করার অনুরোধ কমিশন হলফনামা দিয়ে বিরোধিতা করে এবং ভারতবাসীর নাগরিকত্ব যাচাই করার অধিকার, ক্ষমতা নাকি কমিশনের রয়েছে বলে দাবি করে (প্রাগুক্ত রায়কে অস্বীকার করে)। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের  প্রয়োজনই হত না আধারকে ১২ নং নথি হিসেবে বিবেচনার করার। কমিশন নিজেই নিজের মুখ পোড়ালো। কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত 'প্রায়শই যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি' কমিশন হয় ও 'তার উত্তর সম্পর্কিত' (FAQ) দলিলের (পৃষ্ঠা ১৮) ৪২ নং প্রশ্নোত্তর দেখুন: তাতে বলা আছে, নাম তোলার ক্ষেত্রে  আধার কার্ড জমা দেওয়া প্রত্যাশিত ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের জন্য ('for the sake of purification of electoral  roll')। এটাই যদি অবস্থান হয়, তাহলে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধনের' প্রক্রিয়া তো অতি শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া। সেখানে আধারকে নৈব নৈব চ বলাটা কমিশনেরই ঘোষিত নাগরিক-বান্ধব নীতির নির্লজ্জ লঙ্ঘন। 

এপিক কার্ড সম্পর্কে কমিশনের নিজস্ব ঘোষণাটা শোনা যাক: এপিক বৈধ ভোটারের চিরস্থায়ী পরিচয় পত্র ['EPIC, once issued, is valid for lifetime.' (দ্র: কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত Handbook For Electoral Registration Officers/( ২০১২) অধ্যায় ৯, প্যারা ২৪, পৃ ৭৬)]। পংক্তি ২৭ বলছে, '...EPIC Number is designed to act as the permanent unique identity for every elector' (তদেব, পৃ ৭৬-৭৭)। এর অর্থ, এপিক কার্ড বহনকারী বৈধ ভোটার স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভারতের নাগরিক। আবার, কোনও অবস্থাতেই এই নথি ফর্ম ভর্তির সময় বাদ যাবে না (তদেব, পৃ ২০-২১)। তাহলে কী উদ্দেশ্যে ও কেন ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে কমিশন এপিক'কে বাদ দিচ্ছে? আবার কমিশন জানাচ্ছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তি মানেই যে তিনি ভারতের নাগরিক নন, তা নয়। এর অর্থ, কমিশন দু' ধরনের নাগরিকত্বের স্তর সৃষ্টি করছে (ভোটাধিকার সহ নাগরিক আর এপিক থাকা সত্ত্বেও ভোটাধিকার বিহীন নাগরিক), যা সংবিধান বিরোধী। প্রশ্নটা এখানেই-- কমিশন এমন কোনও পদ্ধতি আবিষ্কার করে চাপিয়ে দিতে পারে কিনা যার পরিণতি লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ভোটাধিকার হরণ! সমস্ত নাগরিককে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা যা কদাপি সংবিধান বা জন প্রতিনিধিত্বমূলক আইনের লক্ষ্য ছিল না, আজও নেই।  কমিশনের এই বিষাক্ত বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূলে আঘাত করছে। ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানেই অসমের ধাঁচে ডি-ভোটার ক্যাটাগরির সৃষ্টি করা। অমনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সক্রিয় হয়ে উঠবে, তাদের বিদেশি পঞ্জীভুক্ত আইনের আওতায় এনে দেশ থেকে গণ বিতাড়নের প্রকল্প নেওয়া শুরু করবে; নয়তো 'উইপোকা'র মতো মারবে। অনুপ্রবেশ কত ক্ষতি করছে -- সে আওয়াজ তো প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসে লাল দূর্গ থেকে দিয়ে দিয়েছেন।

মনে রাখতে হবে, জন প্রতিনিধিত্বমূলক আইনে এরকম কোনও সংস্থান নেই যে কত বছর পর পর (অর্থাৎ, পাঁচ বা দশ বা পনেরো) সারা রাজ্য জুড়ে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকার 'বিশেষ সংশোধন' কর্মসূচি নেওয়াটা বাধ্যতামূলক। যখন কমিশন বলে, বিহারে ২০০২ সালে বা পশ্চিমবাংলায় ২০০৩ সালে শেষবারের মতো 'বিশেষ সংশোধন' হয়েছিল, তখন কমিশন দু' ভাবে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এক, যেন এসব রাজ্যে 'বিশেষ সংশোধনী' বাকি  আছে। দুই, সেটি আসন্ন নির্বাচনের আগেই শেষ করতে হবে, না হলে নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব হবে না। অথচ আইন বলছে, রাজ্য বা দেশ জুড়ে যদি সাধারণ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত সংশোধনী না হয়, তাহলেও নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে হবে। কারণ, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৫'এর স্পিরিটই হল, ভোটার তালিকাভুক্ত যাবতীয় এন্ট্রিকে সঠিক বলে ধরে নিতে হবে ('presumption of  correctness') [দ্র: লাল বাবু হুসেইন মামলা, ১৯৯৫, AIR, SC, 1189 (paras, 6, 13]; অনুচ্ছেদ ৩২৪'এর ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্ট তিন তিনটে রায়ে জানিয়েছে, আইন অনুসারে ভোটার তালিকা যদি সংশোধনও না হয়, ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে দেশের আদালতও সেই নির্বাচনকে বাতিল করতে পারবে না। আর, রুলস'এর আলোচ্য ২১ নং ধারাটি পরিষ্কারভাবে নন-অবস্ট্রাকশন ক্লজ। বাস্তবে, এই কমিশন অতীত থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দেশব্যাপী (বিহার সহ) ভোটার তালিকাকে অপমান করছে। কমিশনের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, ২০০২'এর পর বিহারে (বা এ রাজ্যে ২০০৩'এর পর) যেন ভোটার তালিকা উন্নীতকরণ হয়নি! প্রাগুক্ত আইনটি ও তৎসংক্রান্ত নিয়মাবলীতে (১৯৫০, ১৯৬০) ভোটার তালিকা কখন কীভাবে, কোন ফর্ম (যেমন ৬, ৭) পূরণের মাধ্যমে  সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে, তার নিয়মকানুন দেওয়া আছে। প্রাগুক্ত হ্যান্ডবুকের অষ্টম অধ্যায়ের নামই হচ্ছে 'ক্রমাগত আপগ্রেডেশন'। অর্থাৎ, বিধানসভা, লোকসভা, এমনকি উপনির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাছাই অতি স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। এছাড়াও সংশোধনী পদ্ধতির ব্যবস্থা আছে। 

তাহলে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধনের' স্থানটি ঠিক কোথায় নির্বাচনী আইন বা নিয়মাবলীতে?

কমিশন তার ২৪ জুন (২০২৫) তারিখের বিহারের প্রধান নির্বাচনী আধিকারিককে একটি চিঠিতে লিখছে,  ১৯৫০ সালের জন প্রতিনিধিত্ব আইনের ধারা ২১ অনুসারে বিহারে SIR ২০২৫ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে শুরু হবে। ধারা ২১ হল ভোটার তালিকা প্রস্তুতি ও সংশোধন সংক্রান্ত। এতে তিনটি উপধারা আছে। তিন নম্বর উপধারাতে শুধুমাত্র 'বিশেষ সংশোধনী' করার কথা বলা আছে। লক্ষণীয়, এতে কোথাও 'intensive' (নিবিড়) শব্দটি নেই। সংসদে গৃহীত আইনকে কমিশনের এই ফুল বেঞ্চ বিকৃত করল। উপরন্তু, এই আলোচ্য উপধারাতে স্পষ্ট বলা আছে, বিশেষ সংশোধনী শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রে বা সেই কেন্দ্রের অংশে হতে পারে, সমগ্র রাজ্যে নয়। কমিশন জানে তারা বিকৃত করছে। তাই প্রাগুক্ত বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ধারা ২১ বলে উল্লেখ করেছে। উপধারাকে সচেতনভাবে উপেক্ষা করে বিকৃত করেছে উপধারা ২'কে। ১৯৬০ সালের রুলস্'এর ধারা ২৫'এর (১) ও (২) পড়লে পরিষ্কার হয়ে যাবে কমিশনের অসততা। এই ধারা বলছে,  প্রাগুক্ত ২১ (২) মোতাবেক ভোটার তালিকা সংশোধনী [খেয়াল করবেন, শুধু সংশোধনী] প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য [every constituency] যদি করতে হয় তাহলে দু' ভাবে হতে পারে: নিবিড় বা সামারি অথবা আংশিক নিবিড় বা আংশিক সামারি। কোথাও এই ধারাতেও বা অন্যত্র 'বিশেষ নিবিড় সংশোধনী'র কথা বলা নেই। এটা সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত শব্দবন্ধ যার মধ্য দিয়ে কমিশন বিজেপির এজেন্ডা পূরণের চেষ্টা করছে। 

আবেদনকারীরা এই দিকটার প্রতি আদালতের দৃষ্টি আর্কষণ করেছেন। আদালতের ১৪ অগস্টের আদেশে 'SIR' ব্যবহৃত হয়নি। উল্লেখ্য, মোহিন্দর সিং গিল মামলায় (১৯৭৮) পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের পক্ষে রায়ে বিচারপতি কৃষ্ণা আইয়ার বলেছিলেন, কমিশনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ  ক্ষমতা থাকলেও তা নিরঙ্কুশ নয়। দেশের আইনের প্রতি, প্রকৃতিগত ন্যায়বিচারের প্রতি কমিশন দায়বদ্ধ থাকবে; কমিশনের আদেশ যদি স্বেচ্ছাচারী ও অবৈধ হয় তাহলে আদালতের হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার আছে। [রায়ের চমৎকার তাৎপর্যের জন্য দ্র: S K Mendiratta, How India Votes (4th edn), pp.196-198)]।

আদালতে হলফনামা দিয়ে যেহেতু বলা যাবে না (কারণ কোনও প্রমাণ নেই) যে দেশ রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, সর্বত্র গিজগিজ করছে বাংলাদেশি, সেহেতু নির্বাচন কমিশন বিজেপি-আরএসএস'এর ভাষ্যটাকে সামান্য শুধরে নিয়ে বলছে, জনবিন্যাস বদলে গেছে, বিপুল জনসংখ্যার বাসস্থান পরিবর্তন হয়েছে ইত্যাদি। তাই সংশোধনী দরকার। সাধারণ্যে জানাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে হবে, তাড়াতে হবে, তাই শুদ্ধিকরণ  দরকার ইত্যাদি। কিন্তু সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদের নিদানটা একটু খেয়াল করুন: সর্বজনীন ভোটাধিকার যা 'We the People'এর অন্যতম সর্বোচ্চ রূপ যেখানে গরিব, দরিদ্রতম মানুষটি থেকে গৃহহীন, যৌন কর্মী সকলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে, তাই কমিশন এই আদর্শগত অবস্থানের বদল করার অপচেষ্টায় ব্যস্ত। নির্বাচনে অংশগ্রহণ কোনও এন্ট্রান্স পরীক্ষা নয়-- আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে সঠিকভাবেই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর যদি জন্মের কোনও কাগজ না থাকে এবং তারপরেও তিনি ভারতীয় ও প্রধানমন্ত্রী থাকেন, তাহলে লক্ষ কোটি ভারতীয়ের কাছ থেকে জন্ম সার্টিফিকেট চাইবার কোনও অধিকার কমিশনের আছে কী? 

ভোট শুধু একটা কাগজ নয়। ভোটাধিকার ঘোষণা করে আমরা নাগরিক হিসেবে সবাই সমান। সেই অধিকারকে নির্বাচন কমিশন আঘাত করছে। প্রথম দিনের শুনানিতে প্রকাশ্য আদালতে বিচারপতি সুধাংশু ধুলিয়া কমিশনের আইনজীবীকে বলেছিলেন, কে নাগরিক কে নয়, তা জিজ্ঞাসা করা কমিশনের এক্তিয়ারে পড়ে না ('none of your business')। তবু, নাগরিকত্ব প্রমাণের দাবিতে কমিশন নতুন ১১টি নথির কথা বলছে যা সংগ্রহ করা দুরূহ এবং তাই বৈষম্যমূলক। 'ফ্রন্টিয়ার' পত্রিকা (অগস্ট ১০- ১৬, ২০২৫  সংখ্যা) চমৎকার ভাবে দেখিয়েছে, নতুন নথিগুলি সংখ্যায় বেশি দেখাতে পারে, কিন্তু মোটেই ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। বরং উল্টো। এই কষ্টসাধ্য নথি সংগ্রহ করতে না পারার দরুণ নাম বাদ চলে যাবে, বিদেশি তকমা দিয়ে দেবে। বকলমে অসমের এনআরসি লাগু করে দিতে চাইছে বিজেপি;  নির্বাচন কমিশন তার দোসর। করণ থাপার, যোগেন্দ্র যাদব এই পরিকল্পনাকে নোটবন্দির মতো 'ভোটবন্দি' আখ্যা দিয়েছেন।

আর এই অনিয়ম করা হচ্ছে এ দেশের মৌলিক নিয়মগুলোকে লঙ্ঘিত করেই। অনুচ্ছেদ ১০ অনুসারে ভারতে বসবাসকারী সকল নাগরিককে ধরে নিতে হবে নাগরিক। ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তকরণের কাজ রাষ্ট্রের, নাগরিকের নয়। কারও নামে কেউ আপত্তি তুললে আধা-বিচারবিভাগীয় পদ্ধতির মাধ্যমে যাচাই হবে। গণ ভোটাধিকার কাড়ার কোনও এক্তিয়ার কোনও সংস্থার নেই। এখন কমিশন বলতে চাইছে, তুমি নাগরিক নও, অতএব নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র দেখাও, নয়তো ডি-ভোটার করে দেব। ভোটার প্রমাণের দায়িত্ব ব্যক্তি নাগরিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হল, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম। ফর্ম ভরো, না ভরতে পারলে তোমার নাম কাটা যাবে। বাদ যাওয়ার সংখ্যা দেখুন: ৬৫ লক্ষ। মৃতদের ক্ষেত্রে কমিশন  মৃত ব্যক্তির শংসাপত্র যাচাই করবে (প্রাগুক্ত হ্যান্ডবুক)। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, এক বা  দেড় মাসে ২২ লক্ষ মৃতের ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করে নিশ্চিত হয়েছে কমিশন!!

প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আশুতোষ ভার্সনে আমেরিকার অতীত ইতিহাসের নজির টেনে দেখিয়েছেন, ষাটের দশকে জিম ক্রো'এর মতো এ দেশে সর্বপ্রথম গরিব, ক্ষমতাহীন, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী সম্প্রদায়কে ভারতের গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। নাগরিকত্বের ইস্যুটাকে গণ বিতাড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত করতে চাইছে বিজেপি ও তাদের নব্য দোসর নির্বাচন কমিশন। 

আশার কথা, দেশ জুড়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশ আশার আলোকবর্তিকা হয়েছে। এও আশা করতে দোষ কী যে, দেরিতে হলেও ২০২৩ সালের কমিশনের গঠন সংক্রান্ত সংশোধনীটিও অসাংবিধানিক বলে বাতিল হবে।


Sunday, 10 August 2025

এক পরিকল্পিত ডিজাইন

ভদ্দরজনেরা মজা পাচ্ছেন গরিব বাঙালির লাঞ্ছনায়?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


 

এক ধরনের বামপন্থীরা বলছেন, অমিত মালব্যকে তাঁরা পঞ্চম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বই পাঠিয়ে দেবেন; কারণ, বিজেপি’র লোকজনেরা নাকি বাংলা ভাষাটাই জানে না। অপর এক পক্ষ, যারা ড্রয়িং-রুম বামপন্থী, মূলত ‘আহা আনন্দ’ টিভি চ্যানেল দেখে ও ‘বাজার আনন্দ’ খবরের কাগজ পড়ে দেশ ও দশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন, তাঁরা আরও মজার কথা বলছেন: কই, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের তো পেটাচ্ছে না, যারা মার খাচ্ছেন তাঁরা আসলে ওইসব রাজ্যে লেবরদের কাজে ভাগ বসাচ্ছেন, তাই। এঁদেরই একজন বললেন, ‘labour rate’ নিয়ে ঝামেলা, মানে মজুরি-টজুরি নিয়ে দরাদরি করছে, ফলে, মারধোর খাচ্ছে।

ভাগ্যিস, আপামর বাঙালি আর এদের কথা কেউ শোনেন না। কিন্তু সেই বাসি, পচা কথাগুলি পাড়তে হল, কারণ, কতকগুলি বিষয় আজ স্পষ্ট করে নেওয়ার সময় হয়েছে। দেশ ও রাজ্য এক নতুন বিভাজন-বিন্যাসের কবলে পড়েছে, সেখানে নতুন করে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস নির্মিত হচ্ছে; সেই নবতর বিন্যাসে আজ নিজ নিজ উপলব্ধিতে অবস্থিত হওয়ার পালা।

প্রথমত, এ কথাটা খুব স্পষ্ট করে জেনে নিতে হবে যে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে যে সমস্ত বাঙালি শ্রমজীবী মানুষদের উপরে হামলা ও সন্ত্রাস চলেছে তারা মূলত গরিব এবং প্রধানত নিম্নবর্ণ হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের। দ্বিতীয়ত, এই হামলাগুলি সেই সেই রাজ্যের বসবাসকারী শ্রমজীবী বা অন্যান্য মানুষেরা করছেন না; করছে পুলিশ, প্রশাসন ও কতিপয় বানর সেনার দল। অতএব, এমন ভাবার কোনও কারণই নেই যে, বহিরাগত ও স্থানীয়দের মধ্যকার অর্থনৈতিক রেষারেষি থেকে এই আক্রমণ। এই হামলা সংগঠিত হচ্ছে এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ডিজাইন থেকে। সেই ডিজাইনকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ও এনডিএ জোটের বিপুল জয়ের পরে অমিত শাহের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে, যেখানে তিনি বলছেন, সেই সাংঘাতিক জয়েও তাঁদের ভারত বিজয় সম্পন্ন হয়নি, তা হবে যখন তাঁরা বঙ্গভূমিকে দখলে নিতে পারবেন। কথাটা খেয়ালে রাখবেন। ঠিক যে ভাবে যুদ্ধের শেষ দিনগুলিতে যখন হিটলার তাঁর গোপন বাঙ্কারে প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখনও তিনি তাঁর সেনাপতিদের আদেশ দিচ্ছেন, এখনও যে কজন ইহুদী অউশভিৎস কনসেন্ট্রশন ক্যাম্প অথবা এদিক-ওদিক বেঁচেবর্তে আছে তাদের নিকেশ করে দাও। অর্থাৎ, টার্গেট একটা জাতি বা মতাদর্শ, যাকে সম্পূর্ণ নির্মূল না করতে পারলে হিংস্র একমাত্রিক ফ্যাসিস্ট শাসনকে কায়েম রাখা যায় না। কারণ, ফ্যাসিবাদের মূল চরিত্রই হল এক বর্ণ, এক রঙ, এক ভাবনা, এক ঢঙ।

বাংলা ও বাঙালি তাহলে কীভাবে অমিত শাহের দলের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে? হচ্ছে বৈকী! আর সে কারণেই গেরুয়া দলবলকে বারবার পিছুও হঠতে হচ্ছে। বঙ্গদেশ হল এমন এক শস্য-শ্যামলা ছয় ঋতুর দেবভূমি যেখানে উদারতাবাদ এর জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে প্রবহমান। তা চৈতন্যদেব ও সুফিতন্ত্রের ভাব-মতাদর্শই হোক কি রামপ্রসাদের ভক্তিসায়রে ডুব, স্বাধীন বাংলা রক্ষায় পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের নেতৃত্বে আত্মবলিদান কিংবা আধুনিক সময়ে রামকৃষ্ণদেব-বিবেকানন্দের সর্বধর্ম সমন্বয়, অথবা রবীন্দ্র-নজরুলের বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব বোধ বা নেতাজী-ক্ষুদিরাম-মাস্টারদার স্বাধীনতার লড়াই ও বিভূতি-মানিক-সত্যজিতের সৃষ্টিকর্ম— এমন এক ব্যাপ্ত পরিধিতে জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত জয়গান তো বাঙালির ঐতিহ্যেই রয়েছে। সে বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য মোদী-শাহের দলবলের একবগগা উগ্র হিন্দুয়ানির ঘোর পরিপন্থী। এই ঐতিহ্য যতদিন তার সুললিত ভাষ্যে প্রবহমান থাকবে, ততদিন কোনও উগ্র পাষণ্ড মতাদর্শ এ দেশে সার্বিক ভাবে জায়গা করে নিতে পারবে না, বাংলাতে তো নয়ই। বাংলা ও বাঙালি হল কাউন্টার-পয়েন্ট, এক অপ্রতিরোধ্য ভাষ্য। তাই, বাংলাকে নিশানা।

ফলে, যতক্ষণ না প্রাণচঞ্চল বাংলার জীবনবোধকে উৎপাটিত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ বর্ণবাদী বিদ্বেষমূলক ধর্মব্যবস্থাকে কোনওভাবেই জয়ী করানো যাচ্ছে না। তাই, নেতা, দল ও মিডিয়া কিনে, পয়সা ছড়িয়ে, ফেক রিল ও ভিডিও’র রগরগে রমরমায়, গল্পের গরুকে গাছে তুলে নিত্য নতুন বিকৃত ন্যারেটিভ নির্মাণে ও উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তদের একটা অংশকে কাছে টেনে উদোম চেষ্টা চলেছে বাংলাকে ক্ষতবিক্ষত করে এর দখল নেওয়ার। তবুও সে কাজে যখন সফলতা আসছে না, প্রভূত হিন্দু-উল্লাস চাগিয়ে হিন্দু বাঙালিদের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় নামানো যাচ্ছে না, তখন ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে, প্রায় সমস্ত কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের টাকা আটকে ‘শালে বাঙালি লোগো কো’ ভাতে মারো আর আক্রমণ হানো অন্য রাজ্যে বাঙালি গরিবদের উপর যারা কিনা কিছুতেই অমিত শাহের দলকে ভোট দেয় না।

তাই, বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের ওপর আক্রমণ একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ডিজাইন। ‘অনুপ্রবেশের’ সেই পুরাতন গল্প ছড়িয়ে একে যতই যাথার্থ্য দেওয়ার চেষ্টা চলুক না কেন, মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। প্রথমত মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বলে কোনও লব্জ নেই। কারণ, কোনও ব্যক্তির বিদেশে প্রবেশ আইনগত ভাবে অনিয়মিত হতে পারে, কাগজপত্রহীন হতে পারে, কিন্তু তিনি কখনই ‘অনুপ্রবেশকারী’ নন যা অত্যন্ত অমর্যাদাকর একটি শব্দ, এবং বহু দেশে এই ধরনের প্রবেশকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও দেখা হয় না; তাই, ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটির মধ্যেই অভিবাসীদের মর্যাদা লঙ্ঘনের মাত্রা লুকিয়ে আছে, যা অমানবিক। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রসংঘ নীতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে, প্রত্যেক মানুষের ‘has a right to have rights.’। তথাপি, তর্কের খাতিরে আমরা যদি বাংলাদেশ থেকে আগত ‘কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের’ও গণ্য করি, তাহলেও নির্দ্বিধায় বলতে হয়, এ বিষয়ে কোনও প্রামাণ্য পরিসংখ্যান তো নেইই, উপরন্তু বাংলার শহর ও গ্রামকে তন্নতন্ন করে খুঁজলেও কিছুই মিলবে না। কারণ, ১৯৭১-৭২’এর পর বড়সড় কোনও কাগজপত্রহীন অভিবাসন বাংলাদেশ থেকে আমাদের দেশে হয়নি। তবে হতে পারে, অথবা সীমান্তবর্তী দেশ হিসেবে কেউ কেউ কাগজ ছাড়াই সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়েন। তাদের সংখ্যা নগণ্যই। আসলে, ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ’এর গুজব হল সেই পরিকল্পিত রাজনৈতিক ডিজাইনের একটি উপাদান মাত্র। এর কোনও বাস্তব তথ্যগত ভিত্তি নেই।

ফলে, বিজেপি শাসিত বহির্রাজ্যে এ দেশিয় গরিব শ্রমজীবী বাঙালিদের উপর এই যে একতরফা আক্রমণ নেমে এসেছে, তার এক সুদূরপ্রসারী অভিঘাত তৈরি হতে চলেছে। বাংলার রাজনীতি এ তাবৎকাল উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তদের নেতৃত্বেই প্রবাহিত হয়েছে, যদিচ, এখানে বাম রাজনীতির বহু ইতিবাচকতা সেই বর্ণ ও বিত্তের প্রাবল্যকে কিছুটা খাটো করলেও, সে গন্ধ ও দম্ভকে মুছতে পারেনি। যে ভাবে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ুতে নিম্নবর্ণের উত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের নিজস্ব দল তৈরি হয়েছে, তারা ক্ষমতায় এসেছে, অনুরূপ ঘটনা এ রাজ্যে ঘটেনি। একমাত্র ১৯৩৭ সালে ভারত আইন অনুসারে অবিভক্ত বাংলায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে যে কোয়ালিশন সরকার তৈরি হয়েছিল তা বাংলার নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের এক প্রতীক ছিল। সেই ধারা আজ অবলুপ্ত।

কিন্তু প্রতিরোধে-প্রতিশোধে নিম্নবর্গীয় রাজনীতির পুনরুত্থান আবারও বাস্তব। বাংলার সুবিধাভোগী উচ্চবিত্ত-উচ্চবর্ণ শ্রেণি যে ভাবে গরিব মানুষের উপর আক্রমণে নীরবতা পালন করছে, শুধু তাই নয়, ভাবছে অমিত মালব্য বাংলা ভাষা সম্পর্কে না জেনেই যা খুশি বলছে, অথবা, তারা এইসব কথাবার্তার জবাব দেওয়ার তেমন গুরুত্বই খুঁজে পাচ্ছে না, তারা আসলে বুঝতেই অপারগ যে রাজনৈতিক ঝড়টা এবার কোনদিক থেকে আসছে। যারা টিভি’র টক’শোতে বসে বাংলা ও বাঙালি সম্পর্কে দু-চার বাণী বিতরণ করেন, তাঁরা জানেনই না যে বাংলার নিম্নবর্গীয় শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে গড়ে তুলতে পারেন নিজেদের আত্মরক্ষার ঢাল ও মনন, কীভাবে তাঁরা টেনে নিয়ে চলেন জীবনের রথ, কীভাবে তাঁরা ভালোবাসেন পরস্পরকে ও গড়ে তোলেন উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত অধরা এক ধাত্রীভূমিকে। সাবেক বাম বুলি আওড়ানো ভদ্দরলোকেরা আসলে বুঝেই উঠতে পারছে না যে তাদের মাতব্বরির দিন প্রায় শেষ। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর খিস্তি করে, মিম ছড়িয়ে, বক্রোক্তিতে দিনাতিপাত করতে পারে, কলেজ স্ট্রিটে দু-চার নিষ্ফলা চর্বিতচর্বণ বক্তিমে ঝেড়ে ঘরে ফিরতে পারে, কিন্তু মুশকিল হল, তাদের দিকে আপামর বাংলার মানুষ যে কেউ আর ফিরেও তাকাচ্ছে না, সেটা যখনই তারা ধরতে পারছে, তাদের সে পাগলদশায় তাদেরই আরও বিপদ বাড়ছে।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'নূতন ভারত বেরুক, বেরুক লাঙল ধরে, চাষের কুটির ভেদ করে, জেলে মালা মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে, বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনা ওয়ালার উনুনের পাশ থেকে, বেরুক কারখানা থেকে, হাট থেকে, বাজার থেকে, বেরুক ঝোপ জঙ্গল, পাহাড় পর্বত থেকে।' নতুন বাংলার স্বপ্ন এইভাবেও হতে পারে। হয়তো হচ্ছে। ভদ্দরজনেদের নজরে আসছে না, তাই পিছু হঠছে উচ্চবিত্ত-উচ্চবর্ণেরা, তাদের ছড়ি ঘোরানো ও কর্তামশাইয়ের চিরায়ত ভূমিকা থেকে। হয়তো তাই কোণে দাঁড়িয়ে অতীব গোসায় তারা মজাও পাচ্ছে নিম্নবর্ণীয় বাঙালির লাঞ্ছনায়।


Sunday, 3 August 2025

বিকল্প অর্থনীতির এক ভাবনা

মৌমাছি সহযোগে চাষই হোক আগামী লক্ষ্য

অর্ণব চক্রবর্তী



চারিদিকে ইদানীং এত রেস্তোরাঁ, নানা পদের লোভনীয় খাবার, কৃষি সংক্রান্ত এত আলোচনা, নানা দেশি-বিদেশি হাইব্রিড কৃষি পণ্যের সমাহার, ঠিক তখনই ততটাই অবহেলিত তাঁরা, যারা নিঃস্বার্থ ভাবে এই কৃষিপণ্য উৎপাদন করছে। এই আলোচনায় কৃষক তো বটেই, তবে বেশি মনোযোগে থাকবে নিবিড় পরাগমিলনকারী ও উপকারী পতঙ্গ মৌমাছিরা।

আইনস্টাইন বলেছিলেন, 'মৌমাছি না থাকলে পৃথিবীর আয়ু মাত্র চার বছর।' এ কথা হয়তো সকলে জানলেও মনে রাখে কজন?

পৃথিবীতে সপুষ্পক উদ্ভিদের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তার বংশ বিস্তারের জন্য মৌমাছি এসেছে। মানব সভ্যতার বহু আগে থেকেই মৌমাছি এই পরিবেশে রয়েছে। পরে মানুষ ধীরে ধীরে সমস্ত পশু-পাখির মতো মৌমাছিকে পালন শুরু করে মধু সংগ্রহের জন্য। যে কাজ আজও চলেছে আরও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে দেশ-বিদেশ সর্বত্র। তবে ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশে আজও কেবল মধুর জন্য মৌমাছি পালন করা হয়। অন্যদিকে এগিয়ে থাকা দেশগুলো কৃষি ক্ষেত্রে মৌমাছি পালনের মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি করেছে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌমাছির পরাগমিলনের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের বাজার মূল্য বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ₹১.২৫ লক্ষ কোটি থেকে ₹১.৬৫ লক্ষ কোটি)। (সূত্র: USDA (United States Department of Agriculture), Pollinator Partnership, National Honey Board)।

ফসল ভিত্তিক আর্থিক মূল্য:

ফসলের নাম                        আর্থিক মূল্য

১) বাদাম (Almonds)              $৭ বিলিয়ন+  

(১০০ শতাংশ মৌমাছি নির্ভর)        

২) আপেল                             $২ বিলিয়ন+    

(৯০ শতাংশ মৌমাছি নির্ভর)

৩) ব্লুবেরি                            $৫০০ মিলিয়ন+

(উচ্চ পরাগমিলন নির্ভর)

৪) সূর্যমুখী                             $৪০০ মিলিয়ন+

 (উচ্চ পরাগমিলন নির্ভর)

৫) তরমুজ, খিরা, স্কোয়াশ     $১ বিলিয়ন 

(৯০ শতাংশ পরাগমিলন নির্ভর)

অন্যদিকে, মধু ছাড়াও মৌ বিষ থেকে ক্যানসার সহ নার্ভের নানা রোগের ঔষধ তৈরি হচ্ছে, প্রপোলিস অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, রয়েল জেলি ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি ও যৌবন রক্ষার্থে, বি পোলেন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ও পুষ্টি বৃদ্ধিতে ও মোম বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী প্রস্তুতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া মধুর উপকারিতা তো আমাদের সকলেরই জানা।

মধুর সেবন যারা নিয়মিত করেন তাঁদের করোনা সহ নানা রোগব্যাধি থেকে মুক্তি মিলেছে। এছাড়াও বহু ভিটামিন ও মিনারেল আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশে বছরে গড়ে মাত্র ১০০-১৫০ গ্রাম মধু ব্যবহৃত হয়। অথচ, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সচেতনতা নেই আমাদের দেশে। যদিও হিমাচল সহ উত্তরাখণ্ড ও কাশ্মীরের কিছু আপেল বাগানে মৌমাছির ব্যবহারে আপেলের ফলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সেখানে মৌমাছি পালকরা সমাদৃত।

এছাড়া জৈবচাষে মৌমাছির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনের জন্যই নয়, বরং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রাকৃতিক মাধ্যম।

পরাগমিলন (Pollination):

• মৌমাছিরা বিভিন্ন ফুলে ফুলে গিয়ে পরাগরেণু (pollen) এক ফুল থেকে অন্য ফুলে স্থানান্তর করে;

• এর ফলে, ফল, সবজি, তেলবীজ, ডাল জাতীয় ফসল সহ বহু গাছের ফলন বৃদ্ধি পায়;

• পরাগমিলন ছাড়া অনেক ফসলই যথাযথভাবে ফল ধরতে পারে না।

পরাগমিলন-নির্ভর কিছু ফসল:

টমেটো, বেগুন, কুমড়ো, তিল, সরিষা, আম, আপেল, আঙুর, সূর্যমুখী, বাদাম ইত্যাদি।

জৈবচাষে ফল ও বীজের গুণগত মান উন্নত করে:

• মৌমাছির সাহায্যে গঠিত ফল বা বীজ আকারে বড়, ভারী ও রোগমুক্ত হয়;

• হরমোন ও কৃত্রিম রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা:

• পরাগমিলনের মাধ্যমে জৈব ফার্মে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ ও গুণগত মান উভয়ই উন্নত হয়;

• গবেষণায় দেখা গেছে, মৌচাষ যুক্ত ফলন ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা:

• মৌমাছি প্রাকৃতিক পরাগমিলনের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করে;

• গাছপালা ও বনজ উদ্ভিদদের বংশ বৃদ্ধি মৌমাছির মাধ্যমে সহজ হয়, যা একটি টেকসই বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে।

রাসায়নিক মুক্ত চাষে সহায়ক: 

• ফলে, মৌচাষ ও জৈবচাষ একে অপরের পরিপূরক;

• জৈব কৃষিতে কীটনাশক, হরমোন বা কৃত্রিম সার ব্যবহারের পরিবর্তে মৌমাছির মতো প্রাকৃতিক উপাদান নির্ভরতা বেশি যা মৌমাছির জন্য নিরাপদ;

• মৌমাছির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে জমি নিষ্কলুষ ও পরিবেশবান্ধব।

ফসলের সময়কাল সংক্ষিপ্ত করে:

• মৌমাছির সক্রিয় পরাগমিলন ফসলের ফুল থেকে ফল হওয়ার সময়কে দ্রুততর করে তোলে;

• এর ফলে এক জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল তোলা সম্ভব হতে পারে।

অতিরিক্ত আয় ও জীবিকা:

• চাষিরা জৈবচাষের পাশাপাশি মৌচাষ করলে মধু, মোম ইত্যাদি পণ্য বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন;

• গ্রামীণ অর্থনীতিতে মৌচাষ একটি টেকসই বিকল্প জীবিকা।

পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরে অনেক কৃষক এখন জৈবচাষের সঙ্গে সঙ্গে Apis cerana indica বা Apis mellifera প্রজাতির মৌমাছি পালন করছেন। জৈবচাষে মৌমাছির ভূমিকা শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই, জৈব কৃষি নীতি পরিকল্পনায় মৌচাষকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এছাড়াও বিকল্প জীবিকা হিসাবে মৌমাছি পালন একটি লাভজনক দিক হয়ে উঠতে পারে আগামী প্রজন্মের কাছে। 

মৌমাছি পালন শিখে বাড়িতে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে বা নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ যেমন একটি পেশা হতে পারে, তেমনি মধু বা মধুজাত সামগ্রী ক্রয় করে বিক্রি বা জোগান আরেকটি লাভজনক পেশা হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু একটি যুক্তিপূর্ণ পরিবেশবান্ধব ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে সকল চাষী, প্রকৃতিপ্রেমী, সমাজসেবী সংগঠন ও সকল স্তরের চিন্তাশীল মানুষের কাছে আবেদন, সমাজের নানা স্তরে মৌমাছি পালনে উৎসাহ প্রদান করুন। যে কেউ নিজের বাড়িতে খুব সহজেই মৌমাছি পালন করতে পারেন-- এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিন চারিদিকে। সরকার বিভিন্ন চাষে যেমন উৎসাহ প্রদান করে তেমনি সচেতনতা তৈরি হোক মৌমাছি পালন নিয়ে। বিশেষ করে সকল চাষী ভাইদের কাছে আবেদন, আপনারা আপনাদের চাষের জমিতে কোম্পানির চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন দেখে কোনও প্রকার বিষ বা রাসায়নিক ব্যবহার করবেন না এবং চাষের জমিতে প্রতি বিঘাতে ৪-৬টি সেরেনা মৌমাছির বাক্স রাখুন। বছরের শেষে দেখবেন, আপনার জৈব চাষের ফলন কয়েক গুণ বাড়বে, বিষমুক্ত ফসল ব্যবহার করার ফলে শরীর সুস্থ থাকবে, সঙ্গে ব্যবসায় লাভ বাড়বে। এছাড়া পরিবারের প্রয়োজনীয় খাঁটি মধু পাবেন সারা বছর। কৃষি ক্ষেত্রে 'মৌমাছি সহযোগে চাষ' এটাই হোক আমাদের আগামীর লক্ষ্য।

এই বার্তা যে সকল সরকারি কৃষি বিভাগের আধিকারিক, কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি গবেষক, ছাত্র-ছাত্রী, কৃষি বিশেষজ্ঞ, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের আধিকারিকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, তাঁদের অনুরোধ, এছাড়াও মৌমাছি পালক, কীটপতঙ্গ গবেষক ও মৌমাছি প্রেমী মানুষজন তাদের সকলের কাছেই অনুরোধ, আসুন, সকলে মিলে পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হয়ে মৌমাছি পালন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে সমাজ সংরক্ষণের কাজে এগিয়ে আসি আগামী প্রজন্মের জন্য।


Saturday, 2 August 2025

মাননীয় ভদ্দরলোকীয় কৃতিরা

ওদের ভাষা আমাদের ভাষা

মালবিকা মিত্র



ভদ্রেশ্বর পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমি। তার পাশের ওয়ার্ড ২০ নম্বরে, আমাদের রাস্তার ঠিক ওপারে, রক্তদান শিবির। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। যেতে গিয়ে পুরনো অভ্যাস মতো চায়ের দোকানে একটু আড্ডা দিয়ে গেলাম। ওখানেই শুনছিলাম, এক ভদ্রলোক পুরী বেড়াতে গিয়ে চরম হেনস্থার শিকার। একে তো বাংলায় কথা বলে, তায় আবার নাম অনীশ। অনীশ নামটা অনায়াসেই আনিস, আনিসুর হয়ে যায়। আর আধার কার্ড, প্যানকার্ড বা ভোটার কার্ড ওগুলো তো কোনও পরিচয়পত্রই নয় বিজেপি শাসিত রাজ্যে। সর্বোপরি, ভদ্রলোক পুরীর মাছের বাজারে গিয়ে, মাছের বাজারটা ছোট হয়ে গেছে, সমুদ্র সৈকতের শহরে মানুষ মাছ-মাংস খাবে না তা কি হয় ইত্যাদি মন্তব্য করে ট্যুইট করেছে। বহু রেস্তোরাঁয় নন-ভেজ বন্ধ হয়ে গেছে, পাননি বলে সরস মন্তব্য করেছেন। এসবই হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত ঠিকাদারদের বানর বাহিনীর কর্ণগোচর হয়েছে। এমনকি এক রাত তাকে থানা লক-আপে আটকে রাখা হয়। ফলত, পাঁচ দিন পুরী থাকার প্রোগ্রাম থাকলেও মাত্র দুদিনেই তা সমাপ্ত করে ফিরে আসেন। তার সকরুণ নির্মম অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনছিলাম।

যথারীতি অন্য একজন খদ্দের তিনি সরব হলেন যে, এসব বাজে প্রচার। তার নিজের ছেলে ও বৌমা ভুবনেশ্বরে আইআইটি ও এইমস'এ কর্মরত। তাদের তো কোনও অসুবিধে শোনেননি। বললেন, তাদের বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় পরিজনের কথা, যারা অনেকেই হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ বা দিল্লিতে কর্মরত। তারা কেউ ডাক্তারি করছেন, কেউ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, কেউ উচ্চপদস্থ আমলা বা ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক। কেউ তো অভিযোগ করেনি। ঠিকই, এখন পর্যন্ত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো থেকে এই শ্রেণির লোকজনের ওপর হেনস্থার কোনও অভিযোগ নেই। তারা বরং বাংলাভাষী, বাংলাদেশি, মুসলমান, এসব খুঁজছেন মূলত পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে; ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে নয়। ভদ্রলোক অভিযোগ করলেন, এ রাজ্য থেকে ভিন রাজ্যে শ্রমিকদের যেতে হয় কেন? এ রাজ্যে কাজ নেই কেন? 

আমার হাতে সময় নেই। না হলে তাকে জানানো যেত যে এ রাজ্য থেকে বছরে কুড়ি লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয়। আর প্রায় চল্লিশ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক এ রাজ্যে আসেন। চায়ের দোকানের তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনায় না জড়িয়ে আমি দ্রুত পায়ে রক্তদান শিবিরের পথে এগোলাম। শুধু রক্তদান নয় সঙ্গে আছে ওয়ার্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের সম্বর্ধনা জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। প্রচুর লোকসমাগম। লোকজনের বসার জন্য সুবন্দোবস্ত, প্রচুর চেয়ার। একটি কাউন্টার থেকে যারা রক্তদান করছেন তাঁদের রক্তদানের পর পুষ্টিকর খাদ্য পরিবেশন, একটি সুদৃশ্য স্মারক, এছাড়াও প্রাত্যহিক ব্যবহারযোগ্য ভালো ব্যাগ, লাঞ্চ বক্স ইত্যাদি উপহার দেওয়া হচ্ছে। 

একবার মাইক্রোফোনে ঘোষণা করা হল, দু' ঘণ্টার মধ্যেই ৬৫ জন রক্তদাতা তাঁদের মহামূল্যবান রক্ত দান করেছেন। আধুনিক কারিগরি দক্ষতার কারণে এই মহাদান শুধু ৬৫ জনকেই নয়, রক্তের উপাদান পৃথকীকরণের মাধ্যমে (প্লেটলেট, প্লাজমা, লোহিত রক্তকণিকা) তিন গুণ মানুষের উপকার সাধন করবে। শুনলাম, গত বছর এই শিবিরে বহু মানুষ রক্ত দিতে এসেও ফিরে যান। কারণ, ১০০ জনের বেশি রক্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। তাই এ বছর দুটি ব্লাড ব্যাংক থেকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে। এ বছর কমপক্ষে দেড়শো জনের রক্ত সংগ্রহ করা যাবে। 

রক্তদান সম্পর্কে আমার একটা ভিন্নতর আবেগ আছে। আমি রক্তদাতা নই, আমি গ্রহীতা। আমার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারির সময় ফ্রেশ ব্লাডের জন্য রক্তদাতা নিয়ে যেতে হয়েছিল ব্লাড ব্যাংকে। একজন হলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, বাকিরা ইমরান হক, রমেশ প্রসাদ, সমীর দত্ত, শিশির দোলুই; পাঁচজনের কম্বিনেশনটা ভাবুন। শুদ্ধ ব্রাহ্মণ কায়স্থ নিম্নবর্ণ হিন্দু আবার শিক্ষক ছাত্র শ্রমিক সবাই আছেন। আবার বাঙালি অবাঙালিও আছে। আবার হিন্দু মুসলমান আছে। এই সামগ্রিক মিশ্রণে রক্তদানের কথা শুনলেই আমার শরীরে শ্রদ্ধা জনিত আবেগের স্রোত বয়ে যায়। 

সে যাই হোক, প্রচুর লোকসমাগম আর কম বয়সীদের ভিড় জমেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি ও অনুরোধ মতো আমিও কিছু কৃতি ছাত্র-ছাত্রীর হাতে সম্বর্ধনা তুলে দিলাম। খুব ভালো দামি পিঠ ব্যাগ, একটি স্মারক, কিছু ফুল মিস্টি আর মূল্যবান একটি পেন। প্রায় ৮৫ জনকে এই সম্বর্ধনা দেওয়া হল। এলাকার পৌরসভার কাউন্সিলর, পৌর প্রধান ও উপ পৌর প্রধান সকলেই হাজির। প্রত্যেকেই ভাগাভাগি করে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনে অংশ নিলেন। প্রত্যেকেই তাদের অভিনন্দন জ্ঞাপন করে কিছু বক্তব্য রাখলেন। প্রাক্তন শিক্ষক হবার কারণে বোধ করি আমাকেও কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হল। বলতে পারেন, আমি ছিলাম শেষ বক্তা। 

রক্তদানের মহত্ত্ব জেনে বা না জেনে সকলেই রক্তদান করছেন। তাদের উদ্দেশ্যে কোনও জ্ঞান দানের অধিকার ও অভিপ্রায় কোনওটাই আমার নেই। আমি আগে এই রক্তদানে যোগদান করতে আসার সময় চায়ের দোকানের আড্ডার গল্পটা শোনালাম। এলাকায় একটা এত বড় মহতি কর্মযজ্ঞ চলছে অথচ দেখুন আমি এসে যে কয়েকশো মানুষের ভিড় দেখেছিলাম সেটা মুহূর্তে কত পাতলা হয়ে গেছে। কারণ, ৮৫ জন কৃতি ছাত্রের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিলেন কমপক্ষে দুজন বা আরও বেশি মানুষ, মা বাবা কাকা বা পিসি প্রমুখ। একজন করে সম্বর্ধনা নিয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে তিন বা তার বেশি মানুষ জমায়েত থেকে বিদায় নিয়েছে। এভাবে ৮৫ জনের সম্বর্ধনার শেষে অঙ্কের নিয়মে প্রায় আড়াইশো তিনশো মানুষ একে একে বিদায় নিয়েছে। ফলে, এরপর যারা রইল তারা প্রধানত উদ্যোক্তা স্বেচ্ছাসেবক রক্তদাতা প্রমুখ। অথচ এই কৃতিরা নিজের চেয়ার ছেড়ে পাশের লম্বা হলে একবার উঁকি দিয়ে দেখতে গেল না কারা কীভাবে রক্ত দেয়, কীভাবে তা নেওয়া হয়, সংগ্রহ করা হয়, রক্তদানের আগের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এসব কিছুই জানলো না। 

এভাবেই এক বৃহত্তর সামাজিক পরিসর থেকে কৃতি ছাত্র-ছাত্রীরা ও তাদের অভিভাবকেরা বিযুক্ত হয়ে থাকছেন। বলা যায়, অভিভাবকরা বিযুক্ত করে রাখছেন। স্বপ্ন, 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে'। এই অভিভাবকই তো চায়ের দোকানে বসে চিৎকার করে গলা ফাটায়-- কই, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক আইনজীবী কত সহস্র বাঙালি ভিন রাজ্যে আছেন, তাদের তো বাঙালি বলে হেনস্থা করা হচ্ছে না। আসলে এই শ্রেণিটি নিজেরা রক্তদান করে না। কিন্তু বেঙ্গালুরু বা পুনেতে বসে যখন খবর পায় অসুস্থ বাবা বা মায়ের রক্ত প্রয়োজন, সে সরাসরি ফোন করে ওই কাউন্সিলরকে। অমুক কাকু, তমুক দাদা, আমার মায়ের জন্য আমার বাবার জন্য দু' বোতল রক্তের ব্যবস্থা করে দাও।

এখানেই প্রশ্ন; যে ফোন করে অনুরোধ করল, সে কিন্তু কোনওদিন দাতা হয়নি, সে গ্রহীতা। এমনকি সে জানেও না কীভাবে এই রক্ত পাওয়া যায়। বেশ মনে পড়ছে, একটি শিশুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মাছ কোথায় থাকে? সে বলেছিল, মাছ খাবারে থাকে। আবার প্রশ্ন, খাবার আসে কোথা থেকে? সে বলল, রেস্তোরাঁ থেকে। কারা দিয়ে যায়? শুইগি, জোমাটো। কিছুতেই তাকে বলানো গেল না জেলে বা ধীবরদের কথা, যারা মাঝরাতে মাছ ধরতে বের হয়। ভোর রাতে মাছ ধরে ফিরে বাজারে পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে হোটেল রেস্তোরাঁয়, লোকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যায়। এই সমাজটাকে সে তো দেখেনি কখনও। এরাই কৃতি ছাত্র হবে, এরাই পড়াশোনা করে অনেক বড় হবে, এরা জানবে ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত পাওয়া যায়। কিন্তু সে রক্ত সেখানে কোথা থেকে আসে, তা কখনও জানবে না। না জানলেও চলবে। 

এই না জানাটাই তো 'উচ্চ মেধা'র প্রমাণ। এই কৃতিরাই অথবা এদের মা-বাবা কাকা পিসিরা বুক ঠুকে বলতে পারবে-- কই, দিল্লি বোম্বাই গুজরাট রাজস্থান মধ্যপ্রদেশ বিহার উড়িষ্যায় তো কোনও বাঙালি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক আক্রান্ত হচ্ছে না। বাংলাভাষীর উপর আক্রমণ স্রেফ বাজে কথা। প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালি পবিত্র সরকার, তিলোত্তমা মজুমদার'রা তো এমন কথাই বলে থাকেন। আর সত্যিই তো, এই শ্রেণি তো নিজের পরিবারেও নিজেরা পরস্পরে বাংলা ভাষায় কথা বলেন না। এদের অধিকাংশ কথাবার্তা জুড়ে থাকে ইংরেজি ও কিছুটা হিন্দি। এদের শিশু বাইরে রেইন দেখে। এরা লায়ন ডিয়ার টাইগার চেনে। এরা ঘরে মা বাবার কথাবার্তায় 'ফাক' শব্দের ব্যবহার শুনতে পায়। বাবা বলে, ফাক ইওর মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট। মা বলে, ফাক ইউর হিউম্যানিজম। এদের প্রত্যেকের কাছেই মাতৃভাষা বাংলাটা থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা-ফাংলা। ইংরেজি ভাষায় তো কোনও 'কুৎসিত খিস্তি গালাগালি হয়ই না'। 

আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ভাষা তো ভাবের বাহন। আমি যদি সঠিক ভাবে ভাবতে না পারি, বুঝতে না পারি, তাহলে সেটা প্রকাশ করব কী করে? ভাবটা এ ক্ষেত্রে মুখ্য, ভাষাটা অর্থাৎ প্রকাশ মাধ্যমটা গৌণ। আর ভাবনাটা তো সব সময় মাতৃভাষাতেই হয়। আমি খাই, আমি ভালোবাসি, আমি ঘুমবো, এগুলো কি ইংরেজিতে ভাবা যায়? শুনে একজন বলেছিল, কে বলেছে মাতৃভাষায় ভাবতে হবে! ছোট থেকে যদি ভাবনা শব্দটাই আমার মগজে না থাকে, পরিবর্তে থিঙ্ক শব্দটা স্থান করে নেয়, মিস্টি স্বাদ কি আমার না জানলেও চলে। সুইট সুইটনেস যদি মগজে স্থান নেয়, তাহলে মাতৃভাষা ছাড়াই চিন্তাভাবনা করা যায়। হয়তো বা ঠিক কথাই বলেছেন উনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কথাটা মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না:

'পূর্বে এমন দিন ছিল যখন ইংরেজি পাঠশালা হইতে আমাদের একেবারে ছুটি ছিল না। বাড়ি আসিতাম, সেখানেও পাঠশালা পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া আসিত। বন্ধুকেও সম্ভাষণ করিতাম ইংরেজিতে, পিতাকেও পত্র লিখিতাম ইংরেজিতে, প্রাণের কথা বলিতাম ইংরেজি কাব্যে, দেশের লোককে সভায় আহ্বান করিতাম ইংরেজি বক্তৃতায়। ...দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও না হয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম। তার পরে? তার পরে গৃহবাতায়ন হইতে মাতার স্বহস্তজ্বালিত সন্ধ্যাদীপটি কি চোখে পড়িবে না? যদি পড়ে, তবে কি অবজ্ঞা করিয়া বলিব 'ওটা মাটির প্রদীপ?' ঐ মাটির প্রদীপের পশ্চাতে কি মাতার গৌরব নাই? যদি মাটির প্রদীপই হয় তো সে দোষ কার? মাতার কক্ষে সোনার প্রদীপ গড়িয়া দিতে কে বাধা দিয়াছে? যেমনই হউক না কেন, মাটিই হউক আর সোনাই হউক, ....যখন দুঃখের অন্ধকার ঘনাইয়া আসে তখন রাজপথে দাঁড়াইয়া চোখের জল ফেলা যায় না-- তখন ঐ গৃহ ছাড়া আর গতি নাই।'

বুবুন তার কনভেন্ট স্কুলে ঢুকতে বিলম্বের কারণে গেটে অনেক কান্নাকাটি করলেও দারোয়ান তাকে ছাড়েনি। সে বাড়ি ফিরে আসে। মাকে বলে, আমি ইংরেজিতে কাঁদতে পারিনি। তাই ঢুকতে দিল না। 

-- তাহলে তোর সঙ্গে তো অদিতি যায়, ও ঢুকল কী করে? বুবুনের মায়ের প্রশ্ন। 

বুবুন বলল, ও তো কি সব গড়গড় করে 'ইওর মেমোরেবল রেইনি ডে' প্যারাগ্রাফটা বলতে শুরু করল। দারোয়ান ওকে ছেড়ে দিল। 

অদিতি জানে, ইংরেজিতে কোনও ভুল বলা যায় না; কোনও খারাপ কথা বলা যায় না। পবিত্র ভাষা।


Thursday, 31 July 2025

বিকল্প রাজনীতির একটি পরীক্ষা

নিজেদের কথা নিজেরাই বলা যাক

উত্তাল ঘোষ



বিধানসভা ভোটের বেশ কয়েক মাস বাকি। কিন্তু এখন থেকেই ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। রাজনীতি যে শুধুই ভোটের জন্য এটা তার প্রমাণ। একটা ভোট মিটলেই শুরু হয়ে যায় পরের ভোটের অঙ্ক। ভোটসর্বস্ব এই রাজনীতিতে সভ্যতার বিপদের কথা, সাধারণ মানুষের রোজকার যন্ত্রণার কথা থাকে না। তাই ক্রমশ রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের শ্রদ্ধা কমছে। অনেকেই রাজনীতির এই দেউলিয়াপনা বুঝতে পারলেও বিকল্প নেই। 

ভোটযুদ্ধের এই রমরমার মধ্যেই কার্যত চুপচাপ কাজ শুরু করেছে একটি সংগঠন: জনমঞ্চ; ঘোষণা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মঞ্চ। ভোটসর্বস্ব রাজনীতির বিকল্প রাজনীতির সম্পূর্ণ এক নতুন পরীক্ষা শুরু করেছেন বিভিন্ন পেশায় যুক্ত কিছু সাধারণ মানুষ।  

বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মঞ্চ। ধারণাটা নতুন। জনমঞ্চ বলছে,   

• রাজনৈতিক মঞ্চ হলেও তারা এখনই ভোটে লড়ার কথা ভাবছে না;

• জনমঞ্চ কোনও সরকার বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়;

• তারা পন্থা নিয়ে বিতর্কে যেতে চায় না; 

• ওদের ক্যাচলাইন: আমরা যা বিশ্বাস করি তাই বলি, যা বলি তাই করি।

জনমঞ্চের বেশ কিছু দাবি থাকলেও, মূল দাবি দুটো:

কোনও সরকারি অনুদান ছাড়া প্রত্যেক পরিবারের মাসিক আয় অন্তত ২০ হাজার টাকা করতে হবে; 

প্রকৃতি, বন্যপ্রাণ ও পরিবেশকে রক্ষা করেই উন্নয়নের কাজ করতে হবে।

কোন রাস্তার কথা বলছে জনমঞ্চ?

এতদিন নানা পার্টি তাদের মঞ্চ থেকে নিজেদের কথা বলেছে। সাধারণ মানুষ নিচে বসে হাততালি দিয়েছেন। এবার সাধারণ মানুষ তাঁদের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নিজেদের অধিকারের দাবি তুলবেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে ঠিক করতে হবে তারা কী ভূমিকা নেবে।

সাধারণ মানুষের অধিকার কোনগুলো? 

অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষহীন খাবার, যথেষ্ট পুষ্টি, ব্যক্তি ও সমষ্টির নিরাপত্তা, ভয়হীন ভাবে কথা বলতে পারা, নিজের ধর্ম পালনের অধিকার-- এগুলো মানুষের জন্মগত অধিকার। জনমঞ্চের মতে, এই অধিকার আদায়ে সবার আগে দরকার স্বনির্ভর পরিবার গড়ে তোলা। তাহলে আর রাজনৈতিক দলের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে হবে না। 

দাবি আদায়ের পথ সম্পর্কে জনমঞ্চের ধারণাতেও নতুনত্ব। বলছে, প্রয়োজনে তারা মিটিং-মিছিল করবে (অবরোধ ইত্যাদি করে সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলবে না), কিন্তু কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দেবে। কী ভাবে পরিবারগুলোকে স্বনির্ভর করা যায়, প্রকৃতি-পরিবেশকে রক্ষা করেই উন্নয়ন করা যায়, সে সব হাতেকলমে করে দেখানোর উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে জনমঞ্চ। 

প্রশ্ন, বহু সহৃদয় মানুষ, বিভিন্ন সংস্থা মানুষের জীবনমান বাড়ানোর জন্য কাজ করেন। জনমঞ্চ কি সেরকম কোনও সংগঠন? জনমঞ্চের উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা সমাজসেবায় নামেননি। তাঁরা কোনও এনজিও নন। কারণ তাতে মানুষের কিছু সুবিধা হলেও সিস্টেম বদলায় না। মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-ই পারে শুধু সিস্টেম বদলাতে। সে কাজ করার জন্যই তাঁরা জনমঞ্চ তৈরি করেছেন। 

কোন সিস্টেম বদলের কথা বলছে জনমঞ্চ? 

সে কথায় ঢুকতে গেলে কিছু নিরস তথ্য দিতেই হচ্ছে। 

OXFAM-এর রিপোর্ট বলছে, 

• ভারতে গরিব ৭০ শতাংশ মানুষের ৪ গুণ সম্পদ আছে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতে; 

• সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে আছে দেশের ৭৭ শতাংশ সম্পদ। 

World Inequality Lab প্রকাশিত রিপোর্ট আরও ভয়ঙ্কর:

• আজকের ভারতের অবস্থা ব্রিটিশ আমলের চেয়েও খারাপ: 

সাল                সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতে দেশের মোট আয়ের কত শতাংশ

১৯২২                                            ১৩

২০২২                                            ২২.৬ (সর্বকালীন রেকর্ড)

সাল                সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে দেশের মোট আয়ের কত শতাংশ

১৯৮২                                        ৩০

২০২২                                            ৬০

• শুধু গরিবেরই নয়, মধ্যবিত্তেরও হাল খারাপ হচ্ছে। ৯০'এর দশকে ধনী ১০ শতাংশের পরের ৪০ শতাংশের হাতে ছিল মোট আয়ের ৪৪.১ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটা কমে হয়েছে ২৭.৩ শতাংশ।

সারা দুনিয়ার ছবিটা কেমন?

২০২৩ সালে প্রকাশিত UBS Global Wealth Report অনুযায়ী, দুনিয়ার ধনী ১ শতাংশের হাতে আছে দুনিয়ার সম্পদের ৪৭.৫ শতাংশ। আর গরিব ৪০ শতাংশের হাতে আছে ১ শতাংশেরও কম সম্পদ। দুনিয়া জুড়ে চলছে বাজার অর্থনীতির দাপট, যার মূল নীতিটাই হচ্ছে, আরও আরও আরও মুনাফা। দেখা যাবে, ১৯৯১ সালে আমাদের দেশে বাজার অর্থনীতি চালুর পর থেকে ধনী-গরিবের আয় ও সম্পদের ফারাক দুদ্দাড় গতিতে বাড়ছে। ২০১৪ সালের পর থেকে ফারাক বাড়ছে রকেট গতিতে। 

মুনাফার জন্য বাজার দখল করতে এই মুনাফাবাজদের যুদ্ধ বাঁধাতেও হাত কাঁপে না। International Committee of the Red Cross-এর হিসেব, এখন সারা দুনিয়ায় ১২০টিরও বেশি সশস্ত্র লড়াই চলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, আরও লাভের লোভে সভ্যতাকে বলি দিতেও আপত্তি নেই ধনকুবেরদের। 

সভ্যতার অস্তিত্বের সামনে আরেক বিপদ পৃথিবীর ক্রমশ গরম হয়ে যাওয়া বা বিশ্ব উষ্ণায়ন। এটাও আরও মুনাফার ধান্দারই একটা ফল। বিপদ বাড়াচ্ছে ধনীরা আর ফল ভুগতে হচ্ছে গরিবদের। 

Oxfam-এর রিপোর্ট বলছে,   

সবচেয়ে গরিব ৫০ শতাংশের ছড়ানো দূষণের দ্বিগুণ দূষণ ছড়ায় সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ;

১৯৯০-২০১৯ পর্যায়ে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের ছড়ানো দূষণের ধাক্কায় ২০২৩ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ২,৯০,০০০ কোটি ডলার। সেই ক্ষতির ধাক্কা পোহাতে হচ্ছে গরিব মানুষকেই। 

বিশ্ব ব্যাঙ্কের পূর্বাভাস, উষ্ণায়নের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন করে ৭-১৩ কোটি মানুষ গরিবির গাড্ডায় পড়বেন। Earth.Org-র হিসেবে, উষ্ণায়নের ধাক্কায় শুধু ২০২৪ সালে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছেন। সম্পদের বৈষম্য আর পরিবেশের বিপদ-- এ দুটোই সভ্যতার গোড়ার রোগ। এই রোগ সারাতে না পারলে সভ্যতা টিকবে না। 

জনমঞ্চ প্রশ্ন তুলছে, রাজনীতি কি এই বিপদ সম্পর্কে ভাবছে? আর্থিক অসাম্য আর বিশ্ব উষ্ণায়নের বিপদ আটকাতে না পারলে সভ্যতা বাঁচবে না। সভ্যতা না বাঁচলে বিজেপি-তৃণমূল-সিপিএম-কংগ্রেস, মমতা-মোদী-ট্রাম্প, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-শিখ-ইহুদি, কর্পোরেটের বস্-পরিযায়ী শ্রমিক, কেউ কি বাঁচবে?  জনমঞ্চ মনে করে, রাজনীতির নেতারা এই বিপদের কথা ভালই জানেন। কিন্তু সচেতন ভাবেই আসল রোগ আড়াল করে পরিযায়ী শ্রমিক হেনস্থা-NRC-CAA, হিন্দু জাগো-বাঙালি জাগো, ওয়াকফ আইন, সেটিং তত্ত্ব-‘শ্রী’ প্রকল্প-অনুপ্রবেশ-অপারেশন সিঁদুর-দুর্নীতি-গুণ্ডারাজ ইত্যাদি নিয়ে পাবলিককে মাতিয়ে রাখেন। কারণ, সব রাজনৈতিক দলই এই সিস্টেমের অংশ হয়ে গিয়েছে।

জনমঞ্চের ব্যাখ্যা, যে সিস্টেম শেখায় যে করে হোক মুনাফা আরও বাড়াতে হবে, সেই সিস্টেমের অংশ রাজনৈতিক দলগুলিরও তাই একটাই অঙ্ক, যে করেই হোক ভোটে জিততে হবে। ভোটে জিততে দেদার টাকা ছড়ানো-গুণ্ডা ব্যবহার, ধর্ম ও জাতের সুড়সুড়ি, মিথ্যে কথা বলা-বুথ দখল-সরকারি সংস্থাকে ব্যবহার, কোনও কিছুই বাদ যায় না। Centre for Media Studies (CMS)-এর হিসেব অনুযায়ী, লোকসভা ভোটে খরচ:

২০১৯: ৬০ হাজার কোটি টাকা;

২০২৪: ১.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা।

এত খরচ করে, অনৈতিক পথে জিতে ক্ষমতায় গেলে অনৈতিক কাজ বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। এখন রাজনীতির কোনও নীতি-নৈতিকতা নেই। সেই ঘরে দুর্নীতি-লোভ-লালসা-দলবদল-অপরাধের বাসা বাঁধাটাই স্বাভাবিক। তার ছাপ পড়ছে সামাজিক জীবনেও। 

জনমঞ্চ মনে করে, সাধারণ মানুষের জীবন-যন্ত্রণা পার্টিগুলোর কাছে গুরুত্বহীন। কিছু ললিপপ ধরিয়ে দিয়ে নেতারা ব্যান্ড বাজান-- আমি এটা দিলাম, আমি ওটা দিলাম। কিন্তু সরকারের টাকা মানে তো সাধারণ মানুষেরই টাকা। অর্থাৎ, মাছের তেলে মাছ ভেজে নেতারা ব্যান্ড বাজান। আর সাধারণ মানুষ সেই কথা শুনে নিজেদের মধ্যে তর্ক-হাতাহাতি-লাঠালাঠি-খুনোখুনি শুরু করে। মারে নয়তো মরে। বেশির ভাগ মানুষের বেঁচে থাকাটা পার্টির উপর নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছে। 

পরিত্রাণের রাস্তা কী?

রাহুল সাংকৃত্যায়নের কথা: ভাগো নেহি দুনিয়াকো বদলো। 

কার্ল মার্কসের কথা: দার্শনিকেরা নানা ভাবে দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন, আসল কথা হল একে পরিবর্তন করা। 

বাঙালি সব কিছুতেই নেতিবাচক ভাবনায় অভ্যস্ত। এটা খারাপ-ওটা খারাপ-সেটা খারাপ বলতেই অভ্যস্ত। তাই বাংলার সমাজ-অর্থনীতির মতো রাজনীতিও খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাওয়াটাই ভবিতব্য। কিন্তু কোনটা মানুষের রাজনীতি সেটাও শিখিয়েছেন এক বাঙালি, সুভাষচন্দ্র বসু: জনগণের হাতে সব ক্ষমতা। সেই বিকল্প রাস্তাতেই হাঁটতে চাইছে জনমঞ্চ। তাদের মতে, এটাই সব রোগের বিশল্যকরণী। মানুষের অধিকারের লড়াই-ই বিপদ থেকে বাঁচার রাস্তা। 

জনমঞ্চ বলে রবীন্দ্রনাথের কথা: মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানক, গান্ধীজী, আম্বেদকার, লালন, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুর, ভগত সিং, বিবেকানন্দ, পেরিয়ার, রামমনোহর লোহিয়া, জ্যোতিবা ফুলে, বেগম রোকেয়া, বিদ্যাসাগর, বীরসা মুণ্ডা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, নানা ভাবনা, নানা চেতনা মিলেমিশেই তৈরি তাদের ভাবনা। চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির- এমন দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে জনমঞ্চ।

দুঃখ-কষ্টের জন্য কান্নাকাটি-রাগারাগি-অন্যকে দোষ দেওয়া তো অনেক হল। রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষায় বলতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি, মারামারি, খুনোখুনি করলাম। তাতে লাভ হয়নি। এবার দুঃখ-কষ্টের জন্য দায়ী সিস্টেম বদলের মতো বিকল্প রাজনীতি তৈরির চেষ্টা করা যাক। কঠিন কঠিন তত্ত্বকথা, রাজনীতির নানা আঁকাবাঁকা কূটকচালি ছেড়ে সরাসরি নিজেদের কথা নিজেরাই বলা যাক। 

জনমঞ্চ এখনও খুব ছোট। ৫-৬টি ব্লকে কাজ শুরু করেছে। তাদের ধারণা নিয়ে চলতে রাজি এরকম যে কেউ যুক্ত হতে পারেন, এমনকী তিনি অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আপত্তি নেই। ইতিবাচক বদল ঘটাতে সমমনস্ক যে কোনও সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতে তৈরি জনমঞ্চ। শুধু আমরাই সব বুঝি বা পারি, একদমই সেটা মনে করে না তারা। শিখতে শিখতেই এগোতে চায় অচেনাকে চিনে চিনে।


Tuesday, 29 July 2025

জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর

শাসক-জনতার দূরত্ব কমিয়ে আনার লড়াই

শাহেদ শুভো



'The creatures outside looked from pig to man, and from man to pig, and from pig to man again; but already it was impossible to say which was which.' (Animal Farm, George Orwell). 

ব্যক্তিগত ভাবে অরওয়েলের 'অ্যানিমেল ফার্ম' উপন্যাসের এই লাইনগুলো আমার কাছে ৫ অগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রায়-প্রতীকী মনে হয়! হাসিনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আসলে আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? এই 'একক মাত্রা'র ব্লগে গত বছরের (২০২৪) ৯ অগস্ট প্রকাশিত লেখার শেষ অংশে যে আশঙ্কার কথা বলেছিলাম, তার প্রায় অনেকাংশই কি দৃশ্যমান হচ্ছে? অথচ এত মানুষের হত্যা, তাদের আহত ও আক্রান্ত হওয়া-- সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হাসিনা-শাসনের অবসান, এরপর নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনিসের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলনের নেতা সমূহ ও সিভিল সোসাইটির কয়েকজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে সরকার গঠন, ফলত, গত এক বছরের শাসনে বাংলাদেশে কি কোনও গুণগত পরিবর্তন এসেছে নাকি বাংলাদেশ এখনও সেই পুরনো চক্করেই ঘুরপাক খাচ্ছে? এই প্রশ্নটিই সকলকে ভাবাচ্ছে। 

প্রায় রাজনীতি-শূন্য (জুলাই অভ্যুত্থানে কোনও একক রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল না, সেই অর্থে তা রাজনীতি-শূন্য) এই জনপদের মানুষের এক ফ্যাসিস্ট শাসকের প্রতি ক্ষোভ, সঙ্গে সেই জনপদের মানুষকে স্রেফ ন্যূনতম নাগরিক না মনে করা, তাদেরই করের টাকায় কেনা সামরিক যানে ছাত্র হত্যা করে তার লাশ 'এপিসি'র (সামরিক যান) ছাদে তুলে মানুষকে দেখানো যে, দেখ, আমি হাসিনা অথবা হাসিনা বাহিনী কত শক্তিশালী, আমরা জনগণকে থোড়াই কেয়ার করি, প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে মানুষ ছিল একটা সংখ্যা মাত্র! দৃশ্যমান ফ্যাসিস্ট শাসন তার গোটা সরকারি অধীনস্থকে কীভাবে একটা রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলে, তার প্রকৃত উদাহরণ ছিল বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, লুটেরা ব্যবসায়ী, নানা পরিচয়ে পার্টিজান কর্মী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক-- কোন অংশ ছিল না যারা হাসিনার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়নি? আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, নানা পরিচয়ে হাসিনা এক সর্বব্যাপী রাষ্ট্র তৈরি করেছিল, যা মাফিয়া-স্টেটের সঙ্গে তুলনীয়। গত ১৫ বছরের দুঃশাসন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে জুলাই ২০২৪'এ এক জায়গায় নিয়ে এসেছিল; তা ছিল খুনী হাসিনা ও তার বাহিনীর বিচার। এটা সর্বাত্মক সত্য, যদিও তখনও রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠান হাসিনার আনুগত্যাধীন ছিল। 'রাষ্ট্রের কোনও ছবি নাই' সম্ভবত সুমন মুখোপধ্যায়ের কোনও নাটকের শিরোনাম। রাষ্ট্র নিজে কোনও দৃশ্যমান অবয়ব নয়। তা একটি বিমূর্ত শক্তি, যার অস্তিত্ব বোঝা যায় তার কাজ, নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়ন, আইন ও প্রশাসনের মাধ্যমে। হাসিনার এই বিমূর্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই মানুষ দাঁড়িয়েছিল। সেই লড়াই ছিল রাষ্ট্র বনাম জনগণের। 

৫ অগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ এক নতুন বাংলাদেশে বিনির্মিত হবে-- এই স্বপ্ন অনেকেই দেখেছিলেন। যদিও গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলে আদৌ কি সেখানে বাস্তবিক কোনও সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসুচী ভিত্তিক আকাঙ্ক্ষা থাকে? আবার জুলাই অভ্যুত্থানের চরিত্র কিন্তু কোটা আন্দোলন উদ্ভূত, যা ছিল মূলত সিভিল রাইটস মুভমেন্ট, অবশ্যই দল নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে শুরু হয়েছিল। প্রথমে কোটা বাতিলের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন, যে আন্দোলনকে হাসিনার 'রাজাকার' ট্যাগ দেওয়া, এরপর তা দমন করতে রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর লেলিয়ে দেওয়া। তারপর দেশ জুড়ে গণহত্যা চালানো, তারই ফলশ্রুতিতে সর্বস্তরের মানুষের রাস্তায় নেমে আসা ও হাসিনার বিদায়। প্রশ্ন হতে পারে, কেন ১৫ বছরে হাসিনার পতন হল না? মানুষ কেন জাগলো না? আসলে, কোন সূত্র মানুষের আত্মমর্যাদায় কখন আঘাত করে তা কি বলা যায়? রাস্তায় নেমে মানুষ যখন দেখেছে হাসিনার বাহিনী পশুর মতো মানুষ মারছে, এমনকি নিজের ঘরের বারান্দায়, ছাদেও মানুষ নিরাপদ নয়, তখনই মানুষ পালটা লড়াই করেছে, যা কোনও রাজনৈতিক দল তার একক কর্মসুচী দিয়ে করে উঠতে পারে না। সারা দুনিয়ার অভ্যুত্থান-আন্দোলনের ইতিহাস পাঠ করলে এমন সময় বারবার দেখা গেছে। 

হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ প্রায় তিনদিন সরকারবিহীন ছিল। আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা ও কর্মীরা এই আতঙ্ক ছড়াত যে হাসিনার পতন হলে এক রাতেই ৫ লক্ষ আওয়ামী লীগের কর্মী মারা যাবে, সংখ্যালঘুদের বাংলাদেশ ছাড়তে হবে! হাসিনা পতনের পর নানা আশঙ্কা থাকার পরেও আসলে বিরুদ্ধ মতের ওপর তেমন কোনও বড়সড় আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন হল, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমাজ ও ডঃ ইউনুস এবং বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত এক বছরে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে গেল? যে আন্দোলন সর্বাত্মক ছিল, সেই আন্দোলন পরবর্তী সরকার কি সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি যারা কিনা বাংলাদেশের এলিটোক্রেসির অংশ, তাদের কব্জায় চলে গেল? প্রথমে বিপ্লব তারপর অভ্যুত্থান এরপর রাজ বদল (রেজিম চেঞ্জ)-- ‘জুলাই অভ্যুত্থান'কে নিয়ে নানা ন্যারেটিভ তৈরি করা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সোসাইটি সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে, অথচ 'জনপরিসর' শব্দটি এই বুদ্ধিবৃত্তিক সোসাইটি ব্যবহৃত জনপ্রিয় টার্ম হলেও আসলে কি জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশকে এই বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পেরেছে? আমাদের এই প্রশ্ন সমস্ত রাজনৈতিক দল, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাকে আমরা অভ্যুত্থানের সরকার মনে করি, তাদের কাছে; অথবা আমাদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র প্রতিনিধি যারা পরবর্তীতে ‘এনসিপি' নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, যাদের প্রতি এই সরকারের আনুকূল্য দৃশ্যমান, তাদের কাছেও! তাদের রাজনৈতিক কর্মসুচী আসলে কী? সেখানে উল্লিখিত 'সাধারণ মানুষের রাজনীতি' আসলে কী? এই প্রশ্ন এখন জনমনে উঠেছে। 'দিল্লি না ঢাকা'-- এই শ্লোগান আদৌ কোনও রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান না আসলে এক ধরনের ধর্মীয় উসকানি? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনুস সরকারের নানা চুক্তির প্রসঙ্গ উঠলেও এই ছাত্র নেতারা নীরব। দলের মধ্যে বহুত্ববাদের কথা বললেও ইসলামিস্ট অংশের প্রচ্ছন্ন শক্তি টের পাওয়া যায়; শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী জামাত ইসলাম সহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে তাদের যোগ দৃশ্যমান। বাংলাদেশে এই ধরনের রাজনীতি এক সময় বিএনপি করেছে, এরশাদের 'জাতীয় পার্টি' করেছে এবং আওয়ামী লীগও করেছে! বাংলাদেশের মানুষ এই সুবিধাবাদের রাজনীতি বোঝে! সে কেন আরেকটা সুবিধাবাদের রাজনীতিকে সমর্থন করবে? প্রশ্ন, ছাত্র নেতৃত্বের এই দল কি আসলে কোনও নতুন রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে পেরেছে? বরং তাদের প্রিয় কিছু বুদ্ধিজীবীর শেখানো পাঠ চিন্তাকে নিজেদের বয়ান মনে করছে এবং অন্যান্যদের মতো বরাবর ভাবছে জনগণ কত বোকা। এরা ৭১'এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে ২৪'এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা জনগণ প্রত্যাখান করেছে। মুক্তিযুদ্ধ এক সর্বব্যাপী জনযুদ্ধ ছিল এবং এক-ভাষা ভিত্তিক জাতি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, আর অন্যদিকে জুলাই ২০২৪ ছিল স্বরাষ্ট্রের নাগরিকের বিরুদ্ধে শাসক শ্রেণির আগ্রাসন! 

বহু আলোচিত বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নানান সন্দেহের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ধারায় যাওয়ার জন্য নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এক সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে এই সরকার কতটা আন্তরিক? এই প্রশ্ন প্রায় সব বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আছে। বাংলাদেশের এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রথম থেকেই নির্বাচনের দাবি করছে, যদিও গত ১৫ বছর ধরে প্রায় অধিকাংশ বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে লড়াই করছিল তার অন্যতম দাবি ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন, কারণ, গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাটাকেই আওয়ামী লীগ প্রহসনে পরিণত করেছিল। তাই, ৫ অগস্ট ২০২৪'এর পর অধিকাংশ বিরোধী দল আশা করেছিল এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুতই এক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করবে। কিন্তু এই সরকার এজেন্ডা আকারে আনল সংস্কার এবং হাসিনা আমলের গণহত্যা, গুম খুনের সঙ্গে যুক্তদের বিচার। যদিও এই দাবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সকল বিরোধী দলই করেছে কিন্তু তার সাথে সাথে নির্বাচন প্রক্রিয়াও গুরুত্ব পেয়েছে। এই সরকার বেশ কিছু কমিশন করলেও এবং তাদের অধিকাংশ রিপোর্ট পেশ হলেও জনপ্রশাসন ও পুলিশে আদৌ কোনও সংস্কার হয়নি। তবে, তারা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কিছু পলিসি লেভেলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘ঐক্যমত কমিশন' নামে সংস্কার বিষয়ক মোড়লগিরি শুরু করেছে। টেলিভিশনে লাইভ দেখানো হচ্ছে এই ঐকমত্য কমিশনের আয়োজন, যেন সরকারের একটা পক্ষ বলতে চাইছে, 'দেখুন, এ দেশের রাজনীতিবিদেরা কত খারাপ, আমরা বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে যে সব সংস্কারের আইডিয়া দিচ্ছি এটা তারা মানছে না!'   

বাংলাদেশের রাজনীতি ঘোলাটে হওয়ার অন্যতম কারণ, এখানে আদৌ কোনও রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটেনি। বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যারা কিনা ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্ববহ, এই দুই দলই সরকার গঠনের যোগ্যতা রাখে। অনেক অভিযোগ থাকার পরেও শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী দলটাকে একটা 'হাইব্রিড রেজিমে' পরিণত করেছিল। ৫ অগস্টের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা অসম্ভব। যদিও তাদের বিশ্বাসী সমর্থক গোষ্ঠী তা মনে করে না, কিন্তু এই ১৫ বছরের অন্যায়ের দায় নিতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতা ও কর্মীরা আগ্রহী নয়। বিএনপি এরপর সবচেয়ে বৃহৎ দল, যদি ভোট হয় বিএনপি ক্ষমতা আসছে এটা নিশ্চিত। কিন্তু বিএনপি'র রাজনীতির প্রধান সমস্যা তাদের তৃণমূলে পার্টি কর্মীরা বিভিন্ন পরিচয়ে চাঁদাবাজি, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব সহ খুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিএনপি'র মূল নেতৃত্ব অনেকাংশে প্রগতিশীল হলেও এটা একটা মধ্যপন্থী দল এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন ডানপন্থার রাজনীতির অভিযোগ আছে। ২০০১ থেকে ২০০৭-- বিএনপি তাদের জোটসঙ্গী জামাতকে নিয়ে ইসলামি উগ্রপন্থার অংশ হয়েছিল। ভোটের রাজনীতির অংশ হতে গিয়ে এই দলটিতে এক ধরনের মিশ্র চিন্তার বিকাশ ঘটেছে যা নির্ভর করে ভোটের পাল্লা কোন দিকে বেশি তার উপর। যদিও এত কিছুর পরেও বিএনপি'তে অনেকেই আস্থাশীল। 

ইসলামপন্থী দলগুলো ভোটের রাজনীতিতে খুব শক্তিশালী না হলেও বদরুদ্দিন উমর থেকে শুরু করে অনেকেই বলেছেন, ৫ অগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিকাশ হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে আবারও গত ৯ অগস্টের (২০২৪) আমার লেখাতে ('একক মাত্রা' ব্লগ) ফিরে যাই, সেখানে লিখেছিলাম দলহীন অথবা জোটবদ্ধ নৈরাজ্যবাদ ফ্যাসিজম হটায় কিন্তু তারপর আমলাতান্ত্রিক ফ্যাসিজমে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তীব্র হয়। আর তাদের অন্যতম টুলস নানা উপায়ে ঘৃণাবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, কালচার ওয়ার শব্দের আড়ালে 'কনফ্লিক্ট জোন' তৈরি করে ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যবাদী অবস্থান নিশ্চিত করা। এই সরকার সেই কাজই করছে। যুক্তরাষ্ট্র সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে তারা আঁতাতে মত্ত, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে ‘সিক্রেট অ্যাক্ট'এর ব্যবহার হচ্ছে (এগুলো শেখ হাসিনাই করত)। 

বাংলাদেশে বাম ধারার দুটো অংশ বিদ্যমান-- একটা অংশ রাজনৈতিক দল হিসেবে বাম পরিচায়ক, আরেকটা তরুণ বামপন্থীরা, অনেকটা দল শূন্য অথচ নৈরাজ্যবাদী নয়। দুই অংশের দ্বন্দ্ব আছে। দ্বিতীয় অংশ মূল ধারার বামদের অস্বীকার এবং হাসিনার ফ্যাসিজমের জন্য তারা পার্টিগুলোকেই দায়ী করে। আবার এই অংশ জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এখন ইসলামপন্থীদের দ্বারা নানা পরিচয়ে ট্যাগড হচ্ছে, যা এদের জুলাই কেন্দ্রিক অভ্যুত্থান সম্পর্কে মোহভঙ্গের কারণ। যদিও এই অংশ জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করে এবং হাসিনার বিরুদ্ধে যে মধ্যবিত্ত অংশটি প্রথম দিকে রাস্তায় নামছিল না, তাদের রাজপথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। তবে তাদের অনেকেই এনসিপি ও ছাত্র নেতাদের প্রতি মোহগ্রস্ত ছিল। শেখ হাসিনা সকল রাজনীতিকে এক প্রকার নিয়ন্ত্রণ করার পরও ইসলামী দলগুলো নানা উপায়ে তাদের রাজনীতির বিকাশ ঘটিয়েছে; এতে হাসিনারও প্রচ্ছন্ন মদত ছিল, সে বিশ্বকে দেখিয়েছে তার দল ছাড়া সবাই ইসলামপন্থী। তাই তার ফ্যাসিজম যেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ৫ অগস্ট'এর পর জামায়াত ইসলামের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের অনেকেই নিজ পরিচয় দিয়ে রাজনীতি শুরু করেছে যারা কিনা ছাত্র জীবনে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারাই হুট করে নিজেদের এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ও মূল নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে দাবি করছে। ক্যাম্পাসগুলোকে বিভিন্ন পরিচয়ে তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন ঘোলাটে। জুলাই ২০২৪ আর ২০২৫ এক নয় নিশ্চয়ই। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন অংশীজনের নানা ফন্দিফিকির বেরিয়ে আসছে এবং এটাই স্বাভাবিক যে কেউ কেউ বলছেন, ৫ অগস্ট পরবর্তীকালে সামাজিক অথবা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম করা যায়নি; না হলে পরিস্থিতি নাকি অন্যরকম হত। কী হত বা কী হতে পারত, তা না বুঝলেও এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাকে অভ্যুত্থানের সরকার বলা হয়, তারা সাধারণের উপর গুলি চালিয়েছে। গোপালগঞ্জে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে ইউনুস সরকার। প্রশ্ন উঠবে, শেখ হাসিনার শাসনামলের পর বাংলাদেশের জনগণ কী পেল? 'অ্যানিমেল ফার্ম'এর শেষ অংশে অরওয়েল লিখছেন, 'খামারের প্রাণীরা জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছে, নেপোলিয়ন সহ শূকররা মানুষদের সঙ্গে একসাথে বসে খাচ্ছে, খেলছে এবং চুক্তি করছে। শূকর ও মানুষদের মধ্যে যে ভেদরেখা একসময় ছিল, তা মুছে গেছে। উভয়ের মুখাবয়ব, আচরণ ও লোভ একই হয়ে গেছে।' 

আসলে ক্ষমতা পেলেই কি মানুষ বদলে যায়? কিন্তু কেন? আর যে মানুষগুলো জীবন দিল, আহত হল, যারা রাজপথে লড়াই করল, তারা কী পেল? তাই, 'জুলাই অভ্যুত্থান' এখনও চলমান, যতদিন শাসক আর  জনগণের দূরত্ব না ঘুচবে এরকম 'জুলাই' বারবার ফিরে আসবে। 


Monday, 28 July 2025

'অনুপ্রবেশের' কোনও তথ্যই নেই!

'অনুপ্রবেশ' ভোট রাজনীতির হাতিয়ার মাত্র

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়



অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি মূলত— আর্থনীতিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক— গভীর বৈশ্বিক বৈষম্যের একটি লক্ষণ। মানুষ তাদের জীবনকে উপড়ে ফেলতে বা ছিন্নমূল হতে চায় না। কেউই বাধ্যতামূলক কারণ ছাড়া এক অচেনা, অজানা, অনিশ্চিত ও প্রায়শই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যায় না। আসলে, সীমানা রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির হতাশা মানচিত্রের রেখা দ্বারা আবদ্ধ নয়।

অবৈধ অভিবাসন তখনই ঘটে যখন আইনি পথগুলি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে অসমর্থ হয়ে পড়ে। অবৈধভাবে অভিবাসনকারী বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্য, সংঘাত, রাজনৈতিক নিপীড়ন, জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ অথবা তাদের নিজ দেশে পদ্ধতিগত অস্থিতিশীলতা থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তাই অবৈধ অভিবাসন কেবল একটি আইনি সমস্যা নয় বরং একটি নৈতিক ও কাঠামোগত সামাজিক সমস্যা। এখানে শোষণের তীব্রতা ঢের বেশি। যেমন, অভিবাসীরা (আইনি হোক বা না হোক) প্রায়শই যে অর্থনীতি ও সমাজে যোগদান করে, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, কম পয়সায় প্রয়োজনীয় কাজ ও কর প্রদান করে, অথচ খুব কম সুরক্ষা বা স্বীকৃতি পায়। তবুও কাঁটাতার পেরিয়ে এরা চলে আসতে চায়, কারণ, অর্থ ও মর্যাদার চেয়েও তখন জরুরি নিরাপত্তা ও শান্তি।

অবৈধ অভিবাসন সম্পর্কে আলোচনাগুলি প্রায়শই সহানুভূতি, তথ্য বা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনার পরিবর্তে ভয়-সৃষ্টি, উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সুবিধা দ্বারা পরিচালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালে তৎকালীন ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্রীপ্রকাশ জয়সওয়াল সংসদে বলেছিলেন যে ভারতে ১ কোটি ২০ লক্ষ অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছে; ২০১৬ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু ভারতের সংসদে বলেছিলেন, 'ভারতে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় ২ কোটি অবৈধ অভিবাসী রয়েছে', আবার বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘উইপোকার’ সঙ্গে তুলনা করে ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০১৮ সালে বলেছিলেন, বিজেপি ৪০ লক্ষ অবৈধ অভিবাসীকে চিহ্নিত করেছে। 

অথচ ‘ইকোনমিক টাইমস’এর ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে দেশে বসবাসকারী অবৈধ অভিবাসীদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়। সরকারের হলফনামায় বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ও বহিষ্কার একটি জটিল এবং চলমান প্রক্রিয়া কারণ তাদের নথিভুক্ত প্রবেশ নেই। অথচ, কখনও ১ কোটি ২০ লক্ষ, কখনও ২ কোটি আবার কখন ৪০ লক্ষ দাবি চলতেই থাকে। কীসের ভিত্তিতে এই সব দাবি করা হয়, কখনও কোনও নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। 

ভারতে অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের একমাত্র উৎস হল ‘সেন্সাস’ বা আদমশুমারি। ভারতে অভিবাসন সম্পর্কিত তথ্য আদমশুমারি'র D-Series'এর মধ্যে পাওয়া যায়। এই সারণিগুলি জন্মস্থান, শেষ বাসস্থান, বসবাসের সময়কাল, অভিবাসনের কারণ এবং বয়স, লিঙ্গ, বর্ণ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ও বৈবাহিক অবস্থা ধরনের সামাজিক-জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মতো বিভিন্ন পরামিতির (parameter) উপর ভিত্তি করে অভিবাসী জনসংখ্যাকে শ্রেণিবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করে। যেমন, D-01 ও D-02 সিরিজ জন্মস্থান এবং শেষ বাসস্থান অনুসারে জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে তথ্য প্রদান করে, লিঙ্গ ও থাকার সময়কাল অনুসারে বিভক্ত। D-02 (SC/ST) টেবিলগুলি বিশেষভাবে তফসিলি জাতি ও উপজাতি অভিবাসীদের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, সাধারণ টেবিলের মতোই বিশদ বিবরণ সহ। D-03 সিরিজটি আন্তঃরাজ্য অভিবাসন, অভিবাসনের কারণ এবং সময়কাল পরীক্ষা করে, যার মধ্যে শহর-নির্দিষ্ট ও শহুরে সমষ্টিগত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। D-04 থেকে D-10 টেবিলগুলি বয়স, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বৈবাহিক অবস্থার আরও গভীরে যায়, যা অভিবাসী কর্মীদের, বিশেষ করে যাদের সাম্প্রতিক অভিবাসনের ইতিহাস (0-9 বছর) রয়েছে তাদের সম্পর্কে একটি সূক্ষ্ম ধারণা প্রদান করে। প্রত্যেকটি রাজ্যের জন্য আলাদা-আলাদা টেবিল সেখানে থাকে। 

ভারতে অভিবাসনের তথ্য সংগ্রহ ১৮৭২ সালে শুরু হয়েছিল, যা প্রাথমিকভাবে জন্মস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৬১ সালে পরিধিটি গ্রামীণ/শহুরে অবস্থা এবং বাসস্থানের সময়কাল অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রসারিত হয়েছিল। ১৯৭১ সাল নাগাদ শেষ বাসস্থানের স্থান সম্পর্কিত তথ্য যোগ করা হয় এবং ১৯৮১ সালে পরিযানের কারণ সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন চালু হয়। ১৯৯১ ও ২০০১ সাল পর্যন্ত এই বিন্যাসটি মূলত অপরিবর্তিত ছিল, ছোটখাটো সমন্বয় সহ— যেমন, ২০০১ সালে গ্রামীণ/শহুরে বিবরণ বাদ দেওয়া ও কারণ হিসাবে ‘জন্মের সময় স্থানান্তরিত’ যোগ করা ইত্যাদি। 

আন্তর্জাতিক অভিবাসন, দেশভাগের পর এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের ফলে প্রচুর পরিমাণে অভিবাসীর আগমন ঘটে। ২০০১ সালের হিসাবে ৫১ লক্ষ আন্তর্জাতিক অভিবাসী ভারতে ছিলেন— ৩০ লক্ষ বাংলাদেশ থেকে, ৯ লক্ষ পাকিস্তান থেকে, ৫ লক্ষ নেপাল থেকে এবং ১ লক্ষ শ্রীলঙ্কা থেকে। তবে, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক অভিবাসন তীব্রভাবে (৩১.৬ শতাংশ) হ্রাস পায়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, ভারতে প্রায় ৫৫ লক্ষ মানুষ তাদের শেষ বাসস্থান দেশের বাইরে বলে জানিয়েছেন। এই অভিবাসীদের মধ্যে ৪২ শতাংশ বাংলাদেশ (২৩ লক্ষ) ও ১২.৭ শতাংশ পাকিস্তান (৭ লক্ষ) থেকে এসেছে, যেখানে আফগানিস্তান থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬,৬০০। বাংলাদেশি (৭৬ শতাংশ) এবং পাকিস্তানি (৭৯ শতাংশ) অভিবাসীদের বেশিরভাগই ১৯৯১ সালের আগে ভারতে বসবাস করছিলেন, মূলত দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরে ব্যাপক অভিবাসনের কারণে। ১৯৯১ সালের পরে যারা ভারতে প্রবেশ করেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল এই দুই দেশ থেকে আসা মোট অভিবাসী জনসংখ্যার ২১ শতাংশেরও কম। ২০১১ সালে নতুন আগমন আরও কম ছিল, প্রায় ২২,০০০ বাংলাদেশি এবং ৬,৪০০ পাকিস্তানি ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, যারা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ অভিবাসী জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম প্রতিনিধিত্ব করেন। অর্থাৎ, সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান।

অন্যদিকে অভিবাসনের মূল তথ্য প্রদানদাকারী উৎস আদমশুমারির প্রধান সীমাবদ্ধতা হল যে এটি দশ বছর অন্তর গৃহীত হয়। যার অর্থ, ২০১১ সালের পর ভারতে প্রবেশকারী মানুষের কোনও আপডেটেড গণনা নেই। ২০১৯ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই সংসদে বলেছিলেন যে অবৈধ অভিবাসীদের গোপনে প্রবেশের কারণে তাদের সম্পর্কে কোনও সঠিক কেন্দ্রীয় তথ্য নেই। বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসী অর্থনৈতিক অভিবাসী বা শরণার্থী নন, কারণ তারা ধর্ম, জাতিগত বা রাজনীতির কারণে পালিয়ে আসেন না। তাই, তারা ভারতে শরণার্থী মর্যাদার জন্য যোগ্য নন। কিন্তু যদি তথ্যের বিচার করা হয় তাহলে যে প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করে ওঠে তা হল, যদি ভারতে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যা এতই বেশি হবে তাহলে কেন নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ হয় না? ২০২১ পেরিয়ে ২০২৫ হয়ে গেল, আদমশুমারির কোনও নামগন্ধ নেই। আর আলাদা করে অভিবাসনের জন্য কোনও সমীক্ষাও নেই (ব্যতিক্রম, পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি জরিপ, পরিযায়ী শ্রমিকদের উপরে প্রায় ১.২ লক্ষ পরিবারের নমুনা আকার অন্তর্ভুক্ত করে যা কাজের জন্য আন্তঃরাজ্য অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত)। অথচ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থা নিয়ে বহু সমীক্ষা আছে, অভিবাসন নিয়ে নেই, যেখানে এত বিতর্ক দানা বাঁধছে। ফলে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে, রাজনৈতিক ফায়দার অঙ্কই কি সমীক্ষা না করানোর কারণ? 

অন্যদিকে দেখুন, বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী রাজ্য ও বছরভিত্তিক অবৈধ অভিবাসন/মানব পাচারের মামলার সংখ্যা ২০১৬ সালে ছয়টি রাজ্য থেকে মোট ৪২টি অনুমোদিত হয়েছিল। সর্বাধিক সংখ্যাটি তামিলনাড়ু (১৫), তারপরে অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (৯), পাঞ্জাব (৮), কেরালা (৪), রাজস্থান (৪) ও মহারাষ্ট্র (২) থেকে এসেছে। ২০১৭ সালে (৩০ নভেম্বর পর্যন্ত), সাতটি রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ৩০টি মামলা মঞ্জুর হয়েছিল। তেলেঙ্গানা (১০) শীর্ষে ছিল, তারপরে কেরালা (৫), তামিলনাড়ু (৫), রাজস্থান (৫), পাঞ্জাব (৩), দিল্লি (১) এবং গোয়া (১)। উভয় বছরেই সমস্ত অনুরোধকৃত মামলার অনুমোদন জারি করা হয়েছিল।

দুনিয়াতে যতগুলি বড় ধরনের অভিবাসন ঘটেছে গুগল করে তার ছবি দেখুন, দল বেঁধে সার দিয়ে কাতারে-কাতারে লোক ঢুকে পড়ছে। অথচ শেষ পাঁচ বছরে, কি রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি কোনও ক্ষেত্রেই এরকম কোনও ছবি আমাদের চোখে পড়েছে কী? যদি পড়ত তাহলে বিএসএফ কী করছিল? তবে এও বলা জরুরি যে, 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' কি ঘটেনি? নিশ্চয় ঘটেছে? বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশেই ঘটে। কিন্তু তার সংখ্যা কি কোটি-কোটি বা লাখ-লাখ হতে পারে? পারে না, বড়জোর কয়েকশো বা কয়েক হাজার সর্বাধিক হতে পারে।

তাহলে ভোটার কার্ড সংশোধনীর মতো আবশ্যক ও জরুরি কাজের পিছনে এত মিথ্যা প্রচার কেন? কারণ, মুসলমান ও আর্থনীতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর উপর লক্ষ্যবস্তুগত হয়রানি তৈরি করে নির্বাচনী ফায়দা তোলা। সামগ্রিকভাবে, অভিবাসী-বিরোধী বক্তব্য ও নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়শই তথ্য-ভিত্তিক সমর্থনের অভাব থাকলেও এটি সাম্প্রদায়িক স্টেরিওটাইপ, ভাষা প্রোফাইলিং ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লক্ষ্যবস্তুর উপর নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেয়। ফলে, যখন নির্বাচন নিকটে এবং সেখানে জেতাটা প্রায় অসম্ভব, সেখানেই এই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। দেশবাসীও কাকে কান নিয়ে গেল বলে কাকের পিছনে ধাওয়া করছে কিন্তু কেউ কানে হাত দিয়ে দেখতে চাইছে না যে আদৌ কান কি কাক নিয়ে গেল? তথ্যই নেই অথচ দাবি আছে-- এই তথ্যহীন দাবিকে কি মানুষ পাত্তা দেবে? তবে আজকাল হোয়াটস অ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের হার এত বেশি যে কী হবে বলা কঠিন।


Tuesday, 22 July 2025

'কল করেছেন আজব রকম...'

অবিশ্রান্ত দৌড়

ঋতম ঘোষ



ছুটছি মোরা ছুটছি দেখ, ছুটছি মোরা হল্লা দি,

সবাই মিলে জটলা করে ছোটার সাথে পাল্লা দি। 


আজ এই একবিংশ শতাব্দীর মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে সুকুমার রায় হয়তো এভাবেই আজকের পৃথিবীকে দেখতেন। পিঠের সঙ্গে অলৌকিক ভাবে সংযুক্ত সেই কল, যার আবেশে মানুষ যন্ত্রবৎ সম্মুখে ধাবমান। এই দৌড়নোয় ব্যক্তি মন এতটাই আবিষ্ট যে, সে তার সহজাত মানবিক প্রজ্ঞার পথ থেকে চ্যুত। ফলত, প্রকৃত ‘আহ্লাদ’ই এখন মানবজীবনের সংকট ও অতি দুর্লভ বস্তু হিসেবে দৃষ্ট।

প্রযুক্তি, নগরায়ন ও অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় জীবনযাত্রার ধরন আজ আমূল পরিবর্তিত। থেমে থাকলেই পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত সকলেই। এই গতিময়তার বাহ্যিক প্রভাব আমরা সজ্ঞানে উপলব্ধি করতে অপারগ। কারণ, আজ সভ্যতার চক্র গতি পেয়েছে ঠিকই কিন্তু তা হয়তো একই সঙ্গে মানবচিত্তকে অনেকাংশে পশ্চাদগামীও করে তুলেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি ও কৄত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুঠোবন্দী করেছে সমগ্র বিশ্বকে। কিন্তু এই বুদ্ধিবৄত্তির সুপ্রভাবে উদ্ভূত উপাদানাদি, কতিপয় উপযোগিতার পাশাপাশি, মানব মননের সুকুমার বৃত্তিগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জীবনযাত্রার যান্ত্রিকতায় মনের স্বাভাবিক সহজতা সংক্রমিত হচ্ছে। পূর্বে যে ব্যক্তি কিছু সময় হলেও বৈষয়িক ধ্যানধারণা ও জড়বাদী পৃথিবী থেকে ক্ষণিকের বিশ্রাম নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসায় নিমগ্ন হত, অবকাশ যাপন করত সাহিত্য, শিল্প বা তার আত্মিক ভাবনা জগতের সঙ্গে, সেই মূহুর্ত আজ বিরল। মন আজ অতিশয় প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন। মানব মননের অন্যতম যে গুণ মনোসংযোগ, যার বলে সে দীর্ঘকালীন কোনও প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে ন্যস্ত থাকতে পারে, তার লেখচিত্রও নিম্নগামী। ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার বোমারু প্রবণতা ও টুকরো টুকরো অর্থহীন অথচ সাময়িক সুখপ্রদ দৃশ্যাবলীতে আমাদের মস্তিষ্ক ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে, ফলত অজ্ঞাতেই আমাদের অন্তর্দৃষ্টি লুপ্ত হচ্ছে এবং অহেতুক অধৈর্যপনা আজকের জীবনযাত্রায় একটি অতি স্বাভাবিক গুণ হিসেবে প্রকাশিত। 

সম্প্রতি মাইক্রোসফট'এর একটি বিজ্ঞাপনী প্রচার বিষয়ক সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে যে, একজন মানুষের স্বাভাবিক মনোযোগ ব্যাপ্তি (Average attention span) ক্রমহ্রাসমানতায় ৮.২৫ সেকেন্ডে এসে দাঁড়িয়েছে, যা একটি গোল্ডফিশের মনোযোগ ব্যাপ্তির সমতুল্য; বরং তাদের মনোযোগ ব্যাপ্তি মানুষের তুলনায় কিছুটা বেশি (৯ সেকেন্ড'এর কাছাকাছি)। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ জানাচ্ছে যে, বর্তমানে ৭০ শতাংশ মানুষ কোনও বিষয়ে ২০ মিনিটের বেশি সময় ধৈর্য ধরে থাকতে অক্ষম। মাল্টি-টাস্কিং, অনর্গল তথ্যাদি ও অহরহ বিজ্ঞাপনের প্রভাব মনোসংযোগের মজবুতিতে ঘূণ সঞ্চার করছে।

গতি আমাদের আরও গতির জন্য প্ররোচিত করে। আমাদের সজ্ঞান মন ধীরে চলতে বা প্রয়োজনে থামতে ভুলে যায়। থামা আসলে থেমে যাওয়া নয়। থামা, পুনরায় চলতে আরম্ভ করার পূর্ব ধাপ, যেখানে চিন্তাশীল মনন আমাদের আগামী সফর সম্পর্কে সচেতন করায় ও অবস্থান নির্বিশেষে তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখায়। কিন্তু এই সদা প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা মনুষ্যত্বের নৈতিক চেতনা বিকাশের পথে আজ অন্তরায় হয়ে উপস্থিত। সুস্থিত জীবনযাপন যেন ইউটোপিয়া। ২৪x৭ প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্তি, অ্যালগরিদম চালিত মানব মননের একমুখী সংহতিকরণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক চাপানউতোর ব্যক্তিকে এমন কতকগুলি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে যে সে অভ্যন্তরীণ স্থৈর্য ও মানবিক নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্থিতিশীল জীবনশৈলীর সঙ্গে আপস করে বসছে। অজান্তেই এমন এক ঘূর্ণাবর্তের শিকারে পরিণত হচ্ছে যেখানে হ্যামস্টারের মতোই ইচ্ছা, অনিচ্ছা ব্যতিরেকে তাকে সেই আবর্তনীর ভিতর অবিশ্রান্তভাবে দৌড়তে হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার চিন্তক বিউং চুল-হান এই সমসাময়িক সামাজিক অবস্থার এক বিশ্লেষিত চিত্র এঁকেছেন। জন্মসূত্রে কোরিয়ান হলেও তিনি মূলত জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং একজন প্রশংসিত সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক। ফুকো পরবর্তী আজকের এই যুগের যে চিত্রকে তিনি পাঠককের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন সেখানে তিনি উল্লেখ করছেন কয়েকটি পরিণতির কথা, যেমন বার্নআউট সোসাইটি, দ্য সোসাইটি অফ টায়ার্ডনেস, দ্য সেন্ট অফ টাইম প্রভৃতি। খুব সাধারণভাবে বললে এমন দাঁড়ায় যে, আমরা বর্তমানে একটি অতি সক্রিয় (Hyperactive) সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস করছি যার প্রথম উপসর্গ অবিশ্রান্ততা। বিশ্রাম না নিয়েও আমরা ক্রমাগত আমাদেরই আরও এক শ্রেষ্ঠতর সংস্করণে পরিবর্তিত হবার ঝোঁকে অহর্নিশ এক নিরন্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। অবচেতন এক বীরত্বপূর্ণ মরীচিকার দিকে ধাবমানরত। চুল-হান তাঁর পূর্বসূরি মার্টিন হেইডেগার, হান্না আর্ডেন্ট প্রমুখ তাত্ত্বিকদের সাহায্যে দেখাচ্ছেন যে মানুষ আজ তার সহজাত মানবিক সত্তা হারিয়ে একটি জান্তব শ্রমসর্বস্ব প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। সদা সক্রিয় অস্থির মনোভাব ক্রমাগত তার অন্তর্জগৎ'কে পঙ্গু করে চলেছে। মানবসমাজ সম্মুখীন হচ্ছে ADHD (Attention Deficit/ Hyperactivity Disorder), BPD (Borderline Personality Disorder)'এর মতো রোগের। 

ভাইরাস, ব্যাকট্রিয়াল যুগ অতিক্রম করে আজ আমরা এমন একটি সময়ে পদার্পণ করেছি যেখানে আমাদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সত্ত্বেও আমরা সংক্রমিত হয়েছি স্নায়বিক রুগ্নতায়। অত্যধিক ইতিবাচকতায় আজকের জীবনযাত্রা পর্যুদস্ত। আর এই অতি-ইতিবাচক মনোভাবের ফলাফল স্ব-শোষণ, যা ঘটে চলেছে আমাদের অজান্তেই। অপরিমিত করতে পারার প্রবণতা সদাই আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সময় বিশেষে 'হয়তো না' বা দৃঢ়চিত্তে 'না স্বীকারকে' দুর্বল চিত্তের লক্ষণ বলে মনে করে একটি রসকষহীন বাহ্যিক প্ররোচনার ফাঁদে আমরা ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছি। ফলত, ব্যক্তি বিশেষকে ওই পূর্বোক্ত ক্রিয়াগুলি 'হ্যাঁ আমি পারি', 'আমার করা উচিত' বা 'আমরা পারি ' বলিয়ে নিয়ে তাঁর মনকে এক মাত্রাতিরিক্ত ইতিবাচকতায় ভরিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ব্যক্তি বিশেষের কার্যক্ষমতা বা উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বটে, কিন্তু তা কেবল এই কৃতিত্ব সর্বস্ব সমাজের সর্বাঙ্গীন চাহিদা মেটাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে। না সেখানে লক্ষ করা যাচ্ছে ব্যক্তি মননের স্বাতন্ত্র্য, না তা পরিচয় দিচ্ছে গভীর উৎকর্ষ চেতনার।

আর এ হেন পরিবেশে প্রত্যেক ব্যক্তিও নিজেকে এভাবেই অভ্যস্ত করে নিচ্ছে যা এই কোনওরকম অনুভূতিহীন, জ্বলে যাওয়া বা ঝলসে যাওয়া মননের বিস্তারকে তরান্বিত করছে। ব্যক্তি সাধারণ এই অবস্থাকে উপলব্ধি করতে অপারগ। এই শ্রান্তি বা অস্থিরতাকে উপেক্ষা করেও আমরা আমাদের জীবন চালনাতে বড় একটা  সমস্যা-তাড়িত হচ্ছি না। বরং উল্টোটাই; আরাম আয়েসেই দিন কাটছে।

এখন নিন্দুকগণ বলবেন, তাহলে আর সমস্যা কোথায়? কিন্তু সমস্যা এখানেই যে রোগ যখন কোনওরকম উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে তখন তাকে চেনার কোনও উপায় থাকে না। কখনও ছোটোখাটো সমস্যা দেখা দিলেও রোগী সেই দুশমনকে স্বমনেই পুষে রেখে জীবনযাত্রা সচল রাখে। এর পরিণতি হয় ভয়ানক। সঞ্জীবনীও সেই মারণযন্ত্রণার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

উপায়? 

এই যে গতিময় জীবনের আধিক্য আজ রাজপথে নির্বিবাদে বিচরণ করছে তাকে কিছুটা সংযমের লাগামে সিক্ত করতে হবে। অযথা প্রতিযোগিতায় না ভিড়ে সুস্থ, স্বাভাবিক চিত্তে সহিষ্ণুতা, সহানুভূতিশীল ও বিবেক পরবশ হয়ে প্রতিযোগীদের সারি থেকে পৃথক হয়ে চলার প্রয়াস নিতে হবে। অভিমুখ নির্বাচন করতে হবে মননশীল অনুশীলনের মাধ্যমে। আত্মসমীক্ষা ও আত্মউপলব্ধির উপর আস্থা রাখলে তবেই হয়তো তা প্রসন্ন দীপ্তিতে উদ্ভাসিত করবে মানব চিত্তের অন্দরমহলকে।


Monday, 14 July 2025

আরও এক মৃত নদী বাঁচানো

মরালী নদীর পুনরুজ্জীবন চাই

বিবর্তন ভট্টাচার্য



মৃত নদী বুড়িগঙ্গা প্রাণ ফিরে পেতেই চাকদহ ব্লকে হৈ হৈ পড়ে গিয়েছে। মৃত নদীতে জোয়ার-ভাঁটা খেলছে দেখে এলাকার মানুষ দারুণ ভাবে উৎসাহিত। হরিণঘাটা ব্লকের প্রাক্তন এমএলএ একদিন আমাকে অনুরোধ করলেন, বুড়িগঙ্গা তো অনেকটা সংস্কার হল, এবার মরালী নিয়ে একটু ভাবুন।  আসলে নদিয়া জেলা হল নদীর জেলা। এই জেলায় প্রধান নদী ছয়টি; যেমন, গঙ্গা, ইছামতী, চূর্ণী,  মাথাভাঙা, জলঙ্গী, অঞ্জনা। এছাড়াও প্রচুর মৃত নদী আছে; এগুলোর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, মরালী, যমুনা উল্লেখযোগ্য। তাই শুরু হল পর্যবেক্ষণ।  

চাকদহ ব্লক অঞ্চলে অবলুপ্ত নদীগুলোর মধ্যে মরালী একটি। মরালীর ইতিহাস খুঁজে পাওয়া এতটাই কঠিন আর কোন দশকে এই নদী একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে তা' অনুমান করাও বেশ শক্ত। রেনেল সাহেব কৃত ১৭৬৪ সালের একটি মানচিত্রে মরালী নদীর প্রবাহপথ হিসেবে চাকদহ শহরের দেড় মাইল উত্তরে সামান্য এক ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি সরু সংকীর্ণ জলরেখা দৃষ্ট হয়। এছাড়া ১৯১৭-২১ সালে সার্ভেকৃত ও ১৯৩১ সালে প্রকাশিত চাকদহ থানার মানচিত্রে ওই গতিপথ বরাবর সর্পাকৃতি একটি জলরেখা হিসেবে চিহ্নিত আছে। তবুও পূর্বদিকে বনগ্রাম থানার মানচিত্রেও ওই গতিপথ অঙ্কিত আছে। ১৯১০ সালে প্রকাশিত নদিয়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ওই নদীকে মরাইল (MORAIL) বিল নামে অভিহিত করা হয়েছে। বর্তমানে যেমন অঞ্জনা নদীকে সরকার খাল বানিয়েছে, কারণ, খাল-বিল-বাঁওড় বিক্রি করা অত্যন্ত সহজ। তাই নদীকে খাল বানাও।  

মরালী নামের উৎপত্তি কোথা থেকে তা' বলা কঠিন। এমন কত অজানা অখ্যাত নদী স্নেহময় সুধায় পলি দিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের কল্যাণ সাধন করে গিয়েছে অথচ তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া ভার। আজও জগৎ সংসারে কত মানুষ নীরবে জগতের হিতসাধন করে থাকেন কিন্তু তাঁদের কথাই বা কজন মনে রাখে? তেমনই এককালের মঙ্গলদায়িনী মরালীও হারিয়ে গিয়েছে ইতিহাসের অতল তলে।

মরাল থেকে মরালী নাম হওয়া স্বাভাবিক। বাংলাদেশের মুরলীগঞ্জ থেকে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব দিয়ে ভাগীরথী পর্যন্ত একটি সহজ জলপথ ছিল। সেই জলপথই মরালী। মরালীর যে বৃহত্তর অংশটুকু এখন নদীর আকারে আছে, তার বুকে চড়া পড়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ। এই মরালীর ওপর রাজ্য হাইওয়ে এবং বড় বড় ইমারত গড়ে উঠেছে। নদীটি ভাগীরথী থেকে বেরিয়ে যে যমুনাতে গিয়ে মিশেছে, তা' খানিকটা বোঝা গিয়েছিল ২০০০ সালের বন্যার সময়। বর্তমানে তা হেড়ের খাল ও পূর্ব বিষ্ণুপুর হয়ে শ্রীনগর, হিঙনাড়া, বল্লভপুর, বৈরামপুর, বৃদ্ধপাল্লা, পাল্লা, গোপালনগর দিয়ে যমুনাতে মিশেছে। কিন্তু মরালীতে জল সরবরাহকারী ১৭টি বিল-বাঁওড়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। গাঙ্গরা বিল, ধর্মদহ বিল, নেউলিয়া বিল, সাতশলাকি বিল, ট্যাংরা খাল, মরালী বিল, পারুলিয়া বিল, শ্রীরামপুর খাল, কচুয়া বিল, বড় বিল,  কামডোব বিল, গা বিল, হাতিবাঁধা বিল, চেতলা বিল, চুমুকদহ বিল, মাতলা বিল, ঢাকা বিল-- এগুলো সবই মরালীর জল সরবরাহকারী খাল বিল।

আনুমানিক ১৫ কিমি হেজে ও মজে যাওয়া এই নদীতে কোনও এক সময়‌ কুমীরের বাস ছিল। আর এই মরালী নদীর মৃত্যুর ফলে যমুনা নদীরও মৃত্যু ঘটেছে। যমুনা নদী ভাগীরথী থেকে বিরহীর পাশ দিয়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক পার হয়ে হরিণঘাটা হয়ে গোবরডাঙা রেল স্টেশনের তলা দিয়ে ইছামতীতে গিয়ে মিশেছে।



২০০০ সালের প্রবল বন্যার পর এলাকার মানুষ মরালী নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। বুড়িগঙ্গার মতো হেজে যাওয়া নদী যদি প্রাণ ফিরে পায় তবে মরালীতে কেন প্রাণসঞ্চার হবে না? প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর পাড়ে অন্তত ২ লক্ষ মানুষের বসবাস। এখনও প্রচুর মৎস্যজীবী ও কৃষিজীবী মানুষ মরালী নদীর ওপর নির্ভরশীল। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয় এই মরালী নদী। তিনি এই নদীপথেই সপ্তগ্রাম পর্যন্ত যাতায়াত করতেন। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস এই নদীর উভয় পার্শ্বস্থ গ্রামগুলোতে। মরালী নদী সংস্কার হলে যমুনার জল বৃদ্ধি পাবে। ফাঁসতলা, খেদাইতলা, সাতশলাকি গ্রামের মানুষ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মরালী নদীর সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন।

দীর্ঘ দশ বছর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা এবং দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম'এর উদ্যোগ ও আন্দোলনে বুড়িগঙ্গাতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে তাই এবার মরালী নদীর পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা। ২০২৪'এর সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে একাধিকবার সরেজমিন পর্যবেক্ষণে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মরালী নদীর ছয়টি অবস্থা দেখা গেছে:

১) মহানালা, মসরা ও মথুরাপুর এলাকায় নদী অত্যন্ত সংকীর্ণ অবস্থায় হিউম পাইপ বা কালভার্ট'এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত;

২) ইছাপুর এলাকায় নদীর বুকে বাঁধ দেওয়া হয়েছে;

৩) পারাই গ্রামে নদীতে কোথাও শৈবাল দাম আবার কোথাও কালচে জল;

৪) মথুরাগাছি এলাকায় নদী অন্তঃসলিলা;

৫) সাতসলাকি, খেদাইতলা এলাকায় নদী দিগন্ত বিস্তৃত বিলের মধ্যে হারিয়ে গেছে;

৬) সাতাশী ও নহাটা এলাকার কয়েকটি জায়গায় নদীর খাত দখল হয়ে গেছে।

বস্তুতপক্ষে, মরালী নদী তিনটি ব্লকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত-- চাকদহ, হরিণঘাটা ও বনগ্রাম। ফলে, এই নদীর পুনরুজ্জীবনের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রামের মানুষের উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। আমাদের ধারণা, ১০০ দিনের কাজের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এই কাজ সম্ভব। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি উজ্জীবিত হবে, মৎস্য চাষের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, মানুষ খেয়েপরে বাঁচবে এবং এলাকার মানুষের অন্যত্র কাজের খোঁজে চলে যাওয়া হ্রাস পাবে।


Sunday, 13 July 2025

আরও এক অগ্নীশ্বরের কথা

স্বপ্ন জমাট বাঁধা

মালবিকা মিত্র



কোথাও একটা সংঘর্ষ হয়েছে। অনেকেই আহত হয়েছে। তাদের আনা হয়েছে ডাক্তারখানায়। ডাক্তারবাবু একে একে সব রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা করছেন, প্রয়োজন মতো পরামর্শ দিচ্ছেন। সমবেত ও উত্তেজিত ছোকরার দল ডাক্তারবাবুকে বলছেন, 'আপনি আগে আপনার ছেলেটাকে দেখুন, ওর অবস্থা খুব খারাপ। আপনার ছেলেটা মরে যাবে, ওকে আগে দেখুন।' গল্পের ক্লাইম্যাক্স'এ ডাক্তারবাবু বলছেন, ও তো আগেই মারা গেছে। ওকে দেখে আর কী হবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট গল্প 'রক্ত নোনতা'। স্মৃতি থেকে উল্লেখ করলাম। ছেলের দল বলল, 'দেখছেন না, এখনও রক্ত পড়ছে।' ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, 'মৃত্যুতেই রক্তপাত শেষ হয়ে যায় না।' 

গল্পটা মনে পড়ছে, কারণ দুটি: 

১) চুঁচুড়া থেকে এক পেশেন্টকে রেফার করা হয়েছে কলকাতা মেডিকেল কলেজ। যথেষ্ট পরিমাণ ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে, যাতে এই দীর্ঘ পথ চলতে পারে। কলকাতার ডাক্তার নানা চেষ্টা করে পেশেন্টের সাড়া পেলেন না। তিনি জানালেন, পেশেন্ট কোমায় চলে গেছে। সেই রাতে খবর পেয়ে বাড়ির লোকজন পড়িমরি ছুটল হাসপাতালে। কোথায় কী? বেড ফাঁকা, পেশেন্ট নেই। কোথায় গেল? কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, বাথরুম থেকে স্নান করে পেশেন্ট বেরিয়ে আসছে। আসলে চুঁচুড়া থেকে যে সব ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তার ফলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ডাক্তার সেটাকেই ভেবেছে কোমা। মাত্র দিন দশ আগের কথা। 

২) আজই (১২ জুলাই ২০২৫) সংবাদে প্রকাশ, ঘরের ভিতরে বাবার মৃতদেহ। বাইরের ঘরে একের পর এক রোগী দেখে চলেছেন চিকিৎসক ছেলে। দুর্যোগের দিনে বৃষ্টি মাথায় করে রোগীরা এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে। তাদের দেখে চিকিৎসা করে তারপরেই বাবার শেষকৃত্যে সামিল হলেন ডাক্তারবাবু। এমনই ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ঘটেছে চুঁচুড়ার ইমামবাজার অঞ্চলে। চিকিৎসকের নাম ডাক্তার শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। চুঁচুড়া পুরসভার কাউন্সিলার ইন্দ্রজিৎ দত্ত (বটা) বলেন, অনেক গরিব মানুষ ডাক্তারবাবুর কাছে আসেন। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত বসে ডাক্তারবাবু রোগী দেখেন। কোনও নির্দিষ্ট ভিজিট নেই, যে যা সামর্থ্য দেয়। তাঁর কোনও চাহিদা নেই। এমন ডাক্তারবাবুর জন্য গর্ববোধ করি আমরাও। 



এই সংবাদ পাঠ করে ভেতর থেকেই খুব তাগিদ অনুভব করি কিছু লিখবার। প্রথমত বলে রাখি, আমার বাড়ি ভদ্রেশ্বরে। স্কুলের শিক্ষকতা করতে যেতাম চুঁচুড়ায়। আমার বহু ছাত্র, অভিভাবক এমনকি সহকর্মীরা প্রায় সকলেই এক বাক্যে ডাক্তার শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারা সকলেই ওনার পেশেন্ট। দূরের রোগীদের ট্রেন বাস লঞ্চ পাওয়ার সমস্যা থাকে, তাই তাদের আগে ছেড়ে দেন। বেশি রাতে দেখেন স্থানীয় রোগীদের। আমি নিজে রাত্রি দুটোয় ডাক্তারবাবুকে ফোন করে সমস্যার কথা জানিয়েছি। পরদিন সটান স্কুলে ওষুধ হাজির। কারণ, ওই সময় আমার স্কুলের এক অভিভাবক ডাক্তারবাবুর সামনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাত মারফত পরদিন ওষুধ পৌঁছে গেল আমার হাতে। 

এক অবিচ্ছেদ্য ২৩ বছরের সম্পর্ক আমার সঙ্গে। প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সকল রোগীর সঙ্গে আমিও অপেক্ষমান। সেখানে চেয়ারে বসে আছেন এক অশীতিপর বৃদ্ধা। সমস্ত রোগীদের সঙ্গে তিনি গল্প করছেন। দেখলাম অনেকের সঙ্গেই তাঁর গভীর পরিচিতির সম্পর্ক। পরিবারের লোকজনের খবরাখবর নিচ্ছেন। একটি উনিশ শতকীয় বাড়ির একতলায় আমরা বসে আছি। এরই মধ্যে ডাক্তারবাবু রোগী ডেকে নিচ্ছেন একে একে। প্রায় সবসময়ই জনা ত্রিশ রোগী থেকে যাচ্ছে। আমি অন্যদের কাছ থেকে জানলাম, ওই বৃদ্ধা ডাক্তারবাবুর পিতামহী। একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, ডাক্তারবাবু খেতে যান কখন? ওপরেই তো ওনার ঘর। বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, 'খাওয়া-দাওয়ার কোনও সময়ের ঠিক নেই। ছেলেটা এই করেই অসুস্থ হয়ে যাবে। কোনওদিন চারটে, কোনওদিন পাঁচটা, কখনও বা সাতটায় দুপুরের খাওয়া।' ডাক্তারবাবু আমার ছাত্র না হলেও আমার স্কুলের প্রাক্তনী। তাই, একটু অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার দাবিতে বলতাম, নাতির একটা বিয়ে দিয়ে দিন, তাহলেই একটু নিয়মে বাঁধা যাবে।

একদিন দেখলাম, রোগীদের বসার ঘরে ঠাকুমার সেই চেয়ারটা শূন্য। দেয়ালে ফ্রেমবন্দী হয়েছেন ঠাকুমা। এছাড়া দেখতাম, ফর্সা ধবধবে দীর্ঘকায় ডাক্তারবাবুর বাবা। কখনও উপর থেকে নামছেন, বাইরে যাচ্ছেন। কখনও বা বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকছেন। মুচকি হাসি, অল্পসল্প কথা বিনিময় হত। তিনি একবার দাঁড়িয়ে বলতেন, 'কতক্ষণ?' হয়তো বললাম, প্রায় তিন ঘন্টা। উনি বলতেন, কে জানে আরও কত ঘন্টা! ও নিজেও কি জানে ও কখন খায়, কখন ঘুমায়। এভাবে চললে ও বেশিদিন চালাতে পারবে না। আজ (১২ জুলাই ২০২৫) খবরের কাগজে দেখলাম, সেই দীর্ঘদেহী সুবর্ণকান্তি ভোলেভালা মানুষটা বিদায় নিয়েছেন। এতটুকু আড়ম্বর নেই বাড়িটাতে, মধ্যবিত্ত ছাপ স্পষ্ট। ডাক্তারবাবু আর তাঁর বাবা, ঠাকুমা, যাদের দেখলাম তাঁরা প্রত্যেকেই খুব সাদামাটা আটপৌরে। 

জানেন, ছয় ঘন্টাও হয়তো বসতে হয়, লোকাল হলে সাত আট ঘন্টাও হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, ডাক্তার দেখাতে এসে তো রোগী আরও বেশি অসুস্থ হবে। এখানেই আমার বলার বিষয়। 

প্রথম দিন আমি গিয়েছিলাম আমার একটা এলার্জি দেখাতে। সারা গায়ে মশার কামড়ের মতো অসংখ্য ফুলে ফুলে যায় ক্রমে সেগুলো একটার সঙ্গে আর একটা জুড়ে যায় ধীরে ধীরে, সারা শরীর ফুলে যায়। চর্ম বিশেষজ্ঞ বললেন, দু' বেলা লেভোসেটরিজিন খেতে। খাই ভালো থাকি। ১৫ দিন খাওয়ার পর যেদিন বন্ধ করলাম, সেদিন আবার যথাপূর্বং। আবার আমি বিশেষজ্ঞকে দেখালাম। বললেন, ওটাই দু' বেলা চলুক। আমার তখন খুব বাড়াবাড়ি। সারা গায়ে ল্যাকটোক্যালামাইন লাগাই, বরফ লাগাই, ডাক্তারবাবু দিলেন এলার্জিক্স লোশন। আমি বললাম, কতদিন? ডাক্তারবাবু বললেন এলার্জি যতদিন থাকবে ততদিন এটা খেয়ে যেতে হবে। আর ওটা লাগাতে হবে। আমার কাছে বিষয়টা খুব যুক্তিপূর্ণ মনে হল না। তখনই প্রথম আমি গেলাম ডাক্তার শিবাশিসের কাছে। ডাক্তার শিবাশিস বললেন, এটা কমাতে পারব, অনেক কমিয়েছি। কিন্তু সারাতে পারব না। এখন আপনি দৈনিক দুটো লিভোসেটরিজিন খান, সেটাকে কমিয়ে সপ্তাহে দুটো করা সম্ভব। আরও ভালো সাড়া পেলে, সপ্তাহে বা দু' সপ্তাহে একটা। শুধু ধৈর্য ধরে ওষুধটা খেয়ে যাবেন। শুরু হল চিকিৎসা। বিশ্বাস করুন, বছর খানেক ওষুধ খাওয়ার পর লেভোসেটরিজিন কমতে কমতে সারা বছরে একটাও লাগেনি। এটা ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। 

আমি একদিন দেখাতে গিয়ে বসে আছি, ডাক্তারবাবু নিজেই আমাকে জানতে চাইলেন, কোনও সমস্যা হচ্ছে? আমি জানালাম, অনেকক্ষণ ধরে একটা মৃদু চেস্ট পেইন হচ্ছে। তখন ডাক্তারবাবু অসম্ভব তৎপরতার সঙ্গে স্টেথো লাগালেন, এক ডোজ ওষুধ দিলেন। পাশের একটি ঘরে আমাকে শুতে বললেন। আধঘণ্টা অন্তর খোঁজ নিলেন। এক ডোজ করে ওষুধ দিলেন। ঘন্টা দুই পর বললেন, এবার একটু ভালো বোধ করছেন? এবার একটা ECG করিয়ে নিয়ে একজন মেডিসিনের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। দেরি করবেন না। এক্ষুনি। কথামতো সবকিছু করলাম। ওই রাতেই আইসিইউ'তে ভর্তি করা হল আমাকে। পরে শুনেছি, আইসিইউ'র ডাক্তার বলেছেন, খুব ভালোভাবে লোডিং ডোজ দিয়ে পেশেন্টকে যেভাবে পাঠানো হয়েছে তার জন্য এতটা পথ আসতে পেরেছেন। সিভিয়ার এমআই। তার সঙ্গে পেশেন্টের রোগা পাতলা চেহারা একটু বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। সেই দিন দেখেছিলাম ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা নয়; ডাক্তার শিবাশিস ব্যানার্জি কুড়ি মিনিট-আধঘণ্টা অন্তর দেখতে আসছেন, ওষুধ দিচ্ছেন। এরপর আমার হার্টের বাইপাস সার্জারি হল। 

আমার মুখে জিভের দুপাশে খুব খারাপ রকমের ঘা আছে। কলকাতায় ওরাল স্পেশালিস্ট দেখে, বায়োপসি করে জানিয়েছেন ওটা ইরোসিভ লাইকেন প্লানাস। সমস্ত অ্যালোপ্যাথি ডাক্তাররাই বললেন, এর কোনও রেমেডি নেই, সবই অস্থায়ী। প্রধান চিকিৎসা আইসোট্রেটিনন ক্যাপসুল। কিন্তু সমস্যা হল, ওই ওষুধে লিভার ফাংশন সম্পূর্ণ ঘেঁটে ঘ, লিপিড প্রোফাইল তথৈবচ। আমি পোস্ট-কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি পেশেন্ট, এসব চলবে না। এদিকে আমার জিভ থেকে রক্তপাত হচ্ছে। লিকুইড খাবার ছাড়া খেতে পারি না। অগত্যা ডাক্তার শিবাশিস ব্যানার্জি। বললেন, সেরে যাবে, সম্পূর্ণ না হলেও ৯০ শতাংশ সারবে। এখন আমি আখ চিবোতে পারি না। লঙ্কা বা টক জিনিস খেতে পারি না। কিন্তু ডাল ভাত তরকারি মাছ মাংস মুড়ি ছোলা বাদাম সব খেতে পারি। এক সময় তো ঝাল টক এমনকি কাঁচা লঙ্কা পর্যন্ত খেতে পারছিলাম। কিন্তু প্রাণঘাতী মারাত্মক কোভিড হওয়ার পর ওগুলো আর পারি না। কিন্তু জিভের কষ্টটা সত্যিই নব্বই শতাংশ কমে গেছে।

ছ' ঘন্টা আট ঘন্টা বসে থাকলে পেশেন্ট বিরক্ত হবেই। কিন্তু পেশেন্ট বিরক্ত হয় না। কারণ, ডাক্তারবাবু নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে অক্লান্ত, রোগী দেখে চলেছেন। এখানেই আসল প্রশ্ন। পেশেন্ট পার্টি যদি দেখে তার রোগী কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু ডাক্তারের দেখা নেই, তখন ভিন্নতর প্রতিক্রিয়া হয়। আর পেশেন্ট পার্টি যখন দেখে ডাক্তার নিজেই নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে অক্লান্ত রোগী দেখে চলেছেন, বিরক্তি বোধ হয় না। আবার এর মধ্যেই এমার্জেন্সি, কোলে বাচ্চা কাঁদছে, মা কাজ ফেলে এসেছে, তাদের নিজে ডেকে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এক ডোজ ওষুধ খাইয়ে দিয়ে বলেন, সন্ধ্যায় এসে বাকি ওষুধ নিয়ে যেও। ডাক্তারবাবুর এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ হল, সব পেশেন্টের ওষুধ ডাক্তারবাবু নিজের হাতে তৈরি করে দেন। অতএব, সময় লাগবেই। আমার বান্ধবী বলে, নিজের হাতে ওষুধ দেওয়ার একটা ভিন্ন তাৎপর্য আছে। বাড়ির মা মাসি কাকিমা রান্না করে রণে ভঙ্গ দেন না। তাঁরা বসে থেকে নিজের হাতে বেড়ে খাওয়ান এবং সবার শেষে নিজে খান। ডাক্তারবাবুও কাগজের ওপর খসখস করে কলম চালিয়ে দেন না। অত্যন্ত সংবেদনের সঙ্গে নিজের হাতে ওষুধ বানিয়ে দেন। এখানেই একটা বাড়তি মাত্রা যোগ হয় ওষুধের সঙ্গে। 

ঠাকুমা চলে গেছেন, বাবা তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ও চলে গেলেন। হোয়াটসঅ্যাপের ডিপিতে ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ও কন্যার ছবি দেখেছি। আশা করি, এদের তত্ত্বাবধানে আমার প্রিয় ডাক্তার শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এমনই দায়িত্বশীল ভাবে আরও দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন।


Wednesday, 9 July 2025

উত্তাল বিহার

বিহার কি আবারও পথ দেখাবে?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 


গত দু’ শতকের ইতিহাসে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবিভক্ত বিহার বার বার রুখে দাঁড়িয়েছে, বিদ্রোহের ধ্বজা হাতে নিয়েছে। তা ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহই হোক কি ১৮৯৯'এর মুণ্ডা অভ্যুত্থান, কিংবা ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক চম্পারণ সত্যাগ্রহ বা ১৯২০’র দশকের কিষাণ সভার সংগ্রাম, অথবা ১৯৪২’এর ভারত-ছোড়ো আন্দোলন— জন অংশগ্রহণে বিহার সবসময়েই সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছে, স্ফুলিঙ্গকে দাবানলে পরিণত করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৪’এ জেপি’র ডাকে ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলনই হোক কিংবা ১৯৮০’র দশকের গোড়ায় মধ্য বিহার জুড়ে অভূতপূর্ব কৃষক জাগরণ, পারতপক্ষে একেকটা সময়ে স্থবির হয়ে পড়া মানুষের চৈতন্যের দিশারী হয়েছে বিহার।

আজ আবারও কি এই বিপন্ন সময়ে বিহারের উঠে দাঁড়াবার পালা? গোটা দেশ যখন উত্থিত ফ্যাসিবাদের থাবার সামনে কতকটা অসহায়, ছত্রভঙ্গ বা অন্তর্কলহেও দীর্ণ, তখনই বিহারের জনতা এক উপযুক্ত মুহূর্তে— যখন ফ্যাসিবাদ এমনকী গরিব জনতার নির্বাচনী অধিকারকেও কেড়ে নিতে নির্বাচন কমিশনকে হাতের পুতুল বানিয়ে একবগগা আক্রমণে মত্ত— রুখে দাঁড়িয়েছে। আজ ৯ জুলাই (২০২৫) বিহারের হাজারও মানুষ পথে নেমে এসেছেন। এই জনসমাবেশ এক সর্বাত্মক বনধের রূপ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, পাটনায় ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতৃত্বে হাজার হাজার জনতা ঘেরাও করেছে নির্বাচন কমিশনের দফতর— তাদের দাবি, অবিলম্বে SIR (Special Intensive Revision)’এর নামে কোটি কোটি গরিব, পরিযায়ী, দলিত ও আদিবাসীদের নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

আমরা দেখেছি, গত মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন রাতারাতি ভোটার তালিকায় জল মিশিয়ে রাজ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা থেকে ভোটারের সংখ্যাকে বাড়িয়ে এক অসাধু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এনডিএ জোটকে ক্ষমতায় আনে। এবারে তারাই বিহারে ভোটার লিস্ট থেকে রাতারাতি লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে আগামী বিধানসভা নির্বাচন তড়িঘড়ি সেরে ফেলতে উলটো কৌশল নিয়েছে। বলাই বাহুল্য, এই প্রক্রিয়াটি ভোটারদের, বিশেষত প্রান্তিক এবং দুর্বল শ্রেণির মানুষকে, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

 

১) সময় নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্দেশ্যমূলক

নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে এই ধরনের ব্যাপক সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে প্রায় ২২ বছর পর এই ধরনের নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে ২০০৩ সালের পর আর এমন ব্যাপক সংশোধন হয়নি। স্পষ্ট যে, এই প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে ব্যাহত করতে এবং একটি নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই করা হচ্ছে। বিহারে যেহেতু আর কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন, তাই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। এত কম সময়ে প্রায় ৮ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই করা অসম্ভব।

 

২) বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা

বিহারের মোট ভোটারের প্রায় ৩৭ শতাংশই পরিযায়ী শ্রমিক, যারা রাজ্যের বাইরে কাজ করেন। উৎসবের সময় তাঁরা বাড়িতে আসেন। বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে জন্ম শংসাপত্র বা অন্যান্য কঠিন নথি জমা দিতে হচ্ছে। অনেক পরিযায়ী শ্রমিক, দলিত, মহাদলিত এবং অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের কাছে এই ধরনের নথি না থাকায় তাঁরা ভোটাধিকার হারাতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা আবেদনগুলিতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রায় ৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে।

 

৩) নথিপত্র নিয়ে সমস্যা এবং প্রান্তিক মানুষের উপর প্রভাব

আধার কার্ড, রেশন কার্ড, বা মনরেগা কার্ডের মতো সহজলভ্য নথিগুলিকে বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। বিহারের গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র মানুষের কাছে জন্মের শংসাপত্র বা ১৯৮৭ সালের আগেকার সরকারি পরিচয়পত্রের মতো নথি থাকা অত্যন্ত বিরল। এমন বহু মানুষ আছেন যারা বহু বছর আগেই তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে বাবা-মায়ের জন্ম শংসাপত্র বা অন্যান্য নথি জোগাড় করা অসম্ভব। এর ফলে এই প্রক্রিয়াটি প্রান্তিক ও অশিক্ষিত মানুষদের জন্য বিরাট সমস্যা তৈরি করবে এবং তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারে।

 

৪) প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও আইনের লঙ্ঘন

এই সংশোধন প্রক্রিয়াটি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-কে লঙ্ঘন করছে। ভোটার তালিকা থেকে কোনও নাম বাদ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াতে সেই আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে এই কাজটি করায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলেও ইতিমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে।

 

৫) এনআরসি’র ছায়া

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অনেক বিরোধী নেতা এই প্রক্রিয়াতে এনআরসি’র ছায়া দেখছেন। বোঝাই যাচ্ছে, এর মাধ্যমে অ-ভারতীয়দের নাম বাদ দেওয়ার অজুহাতে বহু ভারতীয় নাগরিককে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করা হবে, যা পরবর্তীতে পুরো প্রক্রিয়াটাকেই ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জী’র দিকে নিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাগরিকত্বের প্রমাণ এইভাবে আদায় করা অত্যন্ত অনৈতিক ও সংবিধান বিরোধী। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে শীর্ষ আদালতে কয়েকটি মামলা দাখিল হয়েছে।


এই আলোকে অন্তত বিহারে দেখা গেল, ইন্ডিয়া জোট ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একযোগে পথে নেমেছে। সিপিআই(এমএল) নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এই SIR প্রক্রিয়াকে ‘ভোটবন্দী’ আখ্যা দিয়ে পরিষ্কার জানিয়েছেন, এটি ২০১৬ সালের নোটবন্দীর মতো সাধারণ মানুষের জন্য ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। তাঁর মূল প্রশ্ন, কেন ২২ বছর পর হঠাৎ করে এই ধরনের ব্যাপক সংশোধন করা হচ্ছে এবং কেন কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা না করেই এটি শুরু করা হল? তাঁর মত, ভোটারদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে এমন নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে যা বহু সাধারণ মানুষের কাছে নেই, বিশেষ করে জন্ম শংসাপত্রের মতো নথি (এমনকী প্রধানমন্ত্রী মোদিজীরও যা নেই)।


লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী SIR প্রক্রিয়াকে ‘গরিবদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বিহারের বন্যা পরিস্থিতি এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন, যারা এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে অক্ষম।


আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব SIR প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ২৫ দিনের মধ্যে ৮ কোটি ভোটারের যাচাই হওয়া অসম্ভব, বিশেষ করে যখন প্রায় ৪ কোটি বিহারী রাজ্যের বাইরে থাকেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে আধার কার্ড, রেশন কার্ড ও মনরেগা কার্ডকে বৈধ নথি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের কোনও স্পষ্টতা নেই এবং তাদের জারি করা বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তিতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁরও আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় ১১টি নথি না থাকায় বহু দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে।


দিনের শেষে এই লেখা যখন প্রকাশের মুখে তখন গোটা বিহার জনজোয়ারে অচল হয়ে পড়েছে। নির্বাচন দফতরের অদূরে দাঁড়িয়ে বিরোধী নেতারা তীব্র ভাষায় নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, নির্বাচন কমিশন 'একটি রাজনৈতিক দলের শাখা' হিসেবে কাজ করছে এবং 'গুজরাতের দুই ব্যক্তি' বিহারের ভোটারদের ভোটাধিকার নির্ধারণ করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে পরবর্তীতে তাদের রেশন ও পেনশনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।


অবশ্য, সমস্ত জড়তাকে ছিন্ন করে বিহারের জেহানাবাদ থেকে দ্বারভাঙ্গা, আরাড়িয়া থেকে মুজাফফরপুর, নওয়াদা থেকে অরওয়াল— সর্বত্র পথে নেমেছেন মানুষ। চাক্কা জ্যাম’এর ডাক দিয়ে যে আন্দোলনের শুরু তা আজ বিহার বনধ’এ রূপান্তরিত হয়েছে। আগামী দিনে এই আন্দোলন সারা ভারতে প্রভাব ফেলে কিনা, অথবা, নির্বাচন কমিশন কিছুটা নরম হওয়া থেকে শেষমেশ পিছু হঠে কিনা, এসব দেখার রইল। সব থেকে বড় কথা, এই প্রক্রিয়া যদি চালু থাকে, তার অন্তিমে কতজন ভোটারের নাম বাদ গেল, সেও দেখার। তারপর বিহার আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।


তবে সাধু সাবধান! বিহারের পর এবারে লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ! আপনার-আমার ভোটাধিকার থাকবে তো?