Wednesday, 15 June 2016

কলকাতার কিডনি

মেয়র কি অমূল্য বাস্তুতন্ত্রের মৃত্যুর জয়ডঙ্কা বাজাচ্ছেন?


দেবব্রত চক্রবর্তী
 শ্রীযুক্ত শোভন চট্টোপাধ্যায়  মহাশয় কেবলমাত্র কলকাতার মেয়র মাত্র নন, বর্তমানে আমাদের রাজ্যের মহামান্য পরিবেশমন্ত্রীও বটে তাসিংহাসনে অধীন হওয়া এবং প্রমোশন প্রাপ্তির দু' সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই তিনি সম্প্রতি পূর্ব কলকাতা জলাভূমির আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ 'রামসার’ স্বীকৃতির বিষয়ে ভীষণ উষ্মা প্রকাশ করেছেন ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলির সংরক্ষণ এবং যুক্তিসঙ্গত দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের স্বার্থে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশগুলি নিজেদের মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদন করে ১৯৮২ সালে ভারতবর্ষ এই রামসার চুক্তির সাথে যুক্ত হয় এবং আমাদের রাজ্যের অন্যতম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইকোলজিস্ট ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের উদ্যোগে ২০০২ সালে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি 'রামসারস্বীকৃতি পায় আপনারা জানেন, সারা পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ২২০০ গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি রামসার তালিকাভুক্তভারতের মাত্র ২৬টি জলাভূমি এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অধিকারী এবং তার মধ্যে অন্যতম আমাদের পূর্ব কলকাতার  জলাভূমি উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য উড়িষ্যার  ভিতরকনিকা ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং জলাভূমিও এই রামসার তালিকাভুক্ত

আমাদের পরিবেশমন্ত্রী বলেছেন 'রামসার' তালিকায় নাম থাকার দরুণ পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এলাকায় ঠিকঠাক উন্নতি করতে পারছেন না। এদিকে কলকাতার প্রতিটি প্রবেশ পথে বিশাল হোর্ডিং ঝুলছে, Come to Bengal Ride the Growth আমাদের রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রীর মতে, কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির বিভিন্ন ইনফ্রাস্টাকচার প্রোজেক্ট, উন্নয়নের নীলনকশা পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ জমি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি রামসার স্বীকৃতির কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না কলকাতার মেয়র হিসাবে তার বক্তব্য, রামসার স্বীকৃতির সময়ে এই বিষয়ে কলকাতা কর্পোরেশনের সাথে পরামর্শ করা হয়নিঅথচ ২০০২ সালে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রয়াসে এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি যখন রামসার তালিকাভুক্ত হয় তখন কলকাতা কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৃণমূলের হাতে এবং কলকাতার মেয়র ছিলেন সুব্রত মুখার্জি আমাদের পরিবেশমন্ত্রী বুঝতেই পারছেন না যে এই পূর্ব কলকাতার জলাভূমির ভেতরের ভেড়ি এবং চাষিদের কাছ থেকে উচিত মূল্যে জমিগুলি কিনে নিয়ে সেখানে উনি বিভিন্ন প্রোজেক্ট করতে পারবেন না কেন? একদিকে কলকাতার মেয়র হিসাবে তিনি রামসার স্বীকৃতি বাতিল করার জন্য দরবার করছেন অন্যদিকে ওনার অধীনে পরিবেশ দপ্তর পরিবেশের ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে পূর্ব কলকাতার জলাভূমির অভূতপূর্ব চরিত্র বজায় রাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত 

শোভনবাবুর হাতে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক এবং জাইকা' কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট  বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির প্রলোভন অথচ জমির অভাবে সেই প্রোজেক্টগুলি বাস্তবায়িত হতে পারছে না বাইপাসের পশ্চিম দিকে যখন হোটেল, হাউসিং কমপ্লেক্স সমেত বড় বড় প্রজেক্ট তখন বাইপাসের পূর্বদিকে বিপুল পরিমাণ জমি জলাভূমি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক চুক্তি রামসার স্বীকৃতি প্রাপ্ত হওয়ায় হুড়মুড়িয়ে উন্নয়নের রথ চালানো যাচ্ছে না আর যথারীতি বাকি রাজনৈতিক নেতাদের মতো রাগ গিয়ে পড়ছে পরিবেশবিদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের নামে উন্নয়ন বিরোধী মতামতের ওপর অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের মতো আমাদের মেয়র এবং রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রী মনে করেন পরিবেশ বাঁচানো এক অর্থহীন প্রয়াস এবং সেটা উচ্চারণ করতে তিনি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেন না। তিনি বলেন, জলাভূমি সংরক্ষণ means little to the common man.

কলকাতার পূর্ব প্রান্তের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট ১২৫০০ হেক্টরের এই জলাভূমি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এবং অত্যাশ্চর্য এক প্রাকৃতিক কিডনি পূর্বলকাতার জলাভূমি ময়লা জল এবং জঞ্জাল পুনঃব্যবহার, পরিশোধন এবং বর্জ্য থেকে উৎপাদনের অনন্যসাধারণ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম নজির ঐতিহাসিক কাল থেকে বর্তমানের লবণ হ্রদ  অঞ্চল থেকে পিয়ালি পর্যন্ত বিদ্যাধরী  নদীর একটি খাত বজায় ছিল এবং ব্রিটিশ জমানার প্রাথমিক যুগে সেন্ট্রাল লেক চ্যানেল মারফত কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা এই বিদ্যাধরী খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিল পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে বিদ্যাধরীর এই খাত মজে যাওয়ায় ক্রমশ কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা সঙ্কটগ্রস্ত হয়ে পড়ে অবশেষে ক্লার্ক সাহেবের পরিকল্পনায় কলকাতা শহরের ময়লা জল হুগলি নদীতে ফেলার পরিবর্তে ১৮৭৫ সালে কলকাতা শহরের ভূগর্ভ পয়ঃপ্রণালী তৈরি হয় ৩৮ মাইলের ইঁটের এবং ৩৭ মাইলের পাইপের পয়ঃপ্রণালী কলকাতা শহর ছেয়ে ফেলে সমস্ত ময়লা জল বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে পাম্প করে সেন্ট্রাল চ্যানেলের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হতে থাকে  বিদ্যাধরী নদীর মুখে পরবর্তীতে গঙ্গা দূষনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেল যে গঙ্গার তীরের প্রতিটি বড় শহর যখন শহরের বর্জ্য সরাসরি গঙ্গায় ফেলে গঙ্গা দূষণ ঘটাচ্ছে তখন একমাত্র কলকাতা শহর গঙ্গার পরিবর্তে শহরের বর্জ্য এবং ময়লা জল আজ থেকে ১০০ বছর আগে থেকেই শহরের পূর্বপ্রান্তের বিস্তীর্ণ জলাভূমির মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে শোধন করে গঙ্গার উল্টোদিকে চালান করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রী এই অসাধারণ দৃষ্টান্ত বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ

বর্তমানে আমাদের শহর প্রত্যেক দিন প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন লিটার ময়লা জল এবং ২৫০০ টন কঠিন জঞ্জাল উৎপন্ন করে কলকাতা শহর স্থাপিত হওয়ার পর থেকে  আজ পর্যন্ত কোনও সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়নি  - শহরের সমস্ত নোংরা জল খোলা এবং ভূগর্ভের পয়ঃপ্রণালীর মাধ্যমে বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশনে গিয়ে জমা হয়, পাম্পিং স্টেশনগুলি সেই জল বিন্দুমাত্র শোধন না করে পাম্প করে ফেলে বিভিন্ন খালে  তিলজলা, তপসিয়া, বেলেঘাটা, কেস্টপুর, বাগজোলা খাল ইত্যাদি আর সেই খালের পচা, অপরিশোধিত প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন লিটার ময়লা  জল প্রত্যহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক, মনুষ্যসৃষ্ট খাল, উপখালের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় প্রায় ২৫০ ওপর ভেড়িতে এবং অবশেষে প্রাকৃতিক উপায়ে প্রায় পরিশোধিত অবস্থায় ব্যবহৃত হয় চাষের জমিতে, মিলে যায় কুলটি গাঙে এবং বিদ্যাধরী নদীতে ১৯৫৬ সালে কলকাতার পূর্বপ্রান্তে এইরকম ময়লা জলে মাছ চাষ করার ভেড়ি  ছিল প্রায় ৮০০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে, তারপর থেকে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ঠেলায় শুরু হয়েছে কমার পালা আজ থেকে প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগে কলকাতার এই অমূল্য  কিডনির পচন ধরা শুরু হয়েছিল সল্টলেক স্থাপনের মাধ্যমে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কথা মাথায় না রেখে, এই সমস্ত ভেড়ি, জলাভূমি বুজিয়ে প্রথমে গড়ে ওঠে পরিকল্পিত নগরী বিধাননগর; তারপরে সেক্টর , ইস্টার্ন মেট্রপলিটান বাইপাস, কসবা শিল্পাঞ্চল, মুকুন্দপুর এবং রাজারহাটের একটি অংশ ১৯৯২ সাল নাগাদ বামফ্রন্ট সরকার এই অমূল্য জলাভূমির ২২৭ একর এলাকা  বুজিয়ে এক আন্তর্জাতিক বিজনেস সেন্টার  গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। অবশেষে এই অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে  বনানী কক্করের  পিআইএলের ফলে কলকাতা হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দেয়- সেই থেকে একদল বিজ্ঞান সচেতন  মানুষ আমাদের কলকাতা শহরের এই প্রাকৃতিক  কিডনি রক্ষা করার প্রয়াস চালাচ্ছেন আর সরকার বদল হলেও সেই একই মানসিকতায় রাজনৈতিক দলগুলি অদূরদর্শী উন্নয়নের নামে এই অমূল্য সম্পদ বেচে দেওয়ার চক্রান্ত চালাচ্ছে

বর্তমানে ১২৫০০ হেক্টরের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই প্রাকৃতিক কিডনির মধ্যে ৫৮৫২ হেক্টর জলাজমি এবং ভেড়ি (জলকর) ৪৭১৮ হেক্টরের মতো নিচু ধানের জমি, ৬০২ হেক্টর মতো বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং চাষের জমি এবং মধ্যে মধ্যে ১৩২৬ হেক্টরের মতো বসত জমি  দুই ভেড়ির মাঝে চলার পথ, মানুষের বসতি, ছোট ছোট গ্রাম বর্তমান কলকাতা শহরের প্রত্যহ ৭৫০ মিলিয়ন লিটার ময়লা জল বিনা পয়সায় শোধন হয়ে যায় এই প্রাকৃতিক জলাভূমির মাধ্যমে অনবদ্য দক্ষতায় অঞ্চলের মৎস্য চাষিরা কলকাতা শহরকে এই দূষিত জলের ভেড়ি থেকে উপহার দেয় ১১০০০ টনের থেকেও বেশি মিষ্টি জলের মাছ রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, মৃগেল, সিলভার কার্প, চারাপোনা, ট্যাংরা, গ্রাস কার্প গরিব মানুষের পাতে সস্তায় প্রোটিন যোগায়। এখনও মাত্র ৩০ টাকায় কলকাতা শহরে মাছ ভাত পাওয়া যায় এই অনবদ্য দক্ষ চাষিদের কারণে  জলা জমির কচুরিপানা শোষণ করে নেয় ময়লা জলের তেল কঠিন জঞ্জালের সারের ফলে উৎপাদন হয় ৩৭০০০ টনের ওপর চাল এবং কলকাতা শহরের প্রায় অর্ধেক সবজি, কলা সরবরাহ হয় এই অঞ্চল থেকে প্রায় ১২৮০-১৩০০ কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি হয় এই প্রাকৃতিক কিডনির সহায়তায় মেকানিক্যাল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের বিপুল খরচা বাঁচায় কর্পোরেশন এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি অঞ্চল আর এই বিপুল কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যাঙ্কের কোনও অনুদান নেই, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিগত কোনও সাহায্য নেই, এলাকার রাজবংশী, বাগদি, আদিবাসী এবং নমশূদ্র জনসম্প্রদায়ের দক্ষতা, ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য, সৌরশক্তির এক চমৎকার সংযোজনে গড়ে উঠেছে এই স্বনির্ভর প্রযুক্তির অননুকরণীয় নজির এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর প্রায় ১০০,০০০ অধিবাসী, রাজ্যের অন্যান্য কৃষক বা কৃষি শ্রমিকের তুলনায় ঈর্ষণীয় পরিমাণ বেশি উপার্জন করেন, কলকাতা শহরের টাটকা সবছি মাছ ইত্যাদির দাম সস্তা রাখতে সাহায্য করেন এবং বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিজ দক্ষতায় ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যে পরিষ্কার করেন সাধারণ জনতার এই জ্ঞান এবং দক্ষতার পরিচয় অনুভব করতে যে কোনও কলকাতাবাসী একবার বানতলা চর্মনগরী ঘুরে আসতে পারেন; সেখানে বসানো হয়েছে ভারতের সর্ববৃহৎ সেডিমেন্টেসন ট্যাঙ্ক, কিন্তু নিশ্চল নিথর অন্যদিকে শয়ে শয়ে সচল ভেড়ির মধ্যে পড়ে আছে বানতলা চর্মনগরীর অচল যন্ত্রদানব

পূর্ব কলকাতার জলাভূমি একাধারে ফ্রি সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, অভূতপূর্ব জলজ বাগান এবং বন্যা প্রতিরক্ষার উপায় এই প্রসঙ্গে গত বছর নভেম্বরের চেন্নাই বন্যার কথায় বলি। ২০ বছর পূর্বে চেন্নাইতে ৬৫০র ওপর জলাভূমি ছিল; আজকের দিনে উন্নয়নের ঠেলায় সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭’এ। তার ফলে বিপুল বর্ষার জল নিকাশি ও শোষণের উপায় না থাকাতে চকচকে এয়ারপোর্ট থেকে আধুনিক ভবনের প্রান্তর ভাসিয়েছে অসময়ে বৃষ্টি কলকাতাও চেন্নাইয়ের মতো নিচু এলাকা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র মিটার উঁচুপূর্ব কলকাতার জলাভূমির বিলুপ্তি এই শহরের বাসযোগ্যতাকে  যে বিপদের মুখে  ঠেলছে তার পরিণাম  অনুমান করার ক্ষমতা দুঃখজনক ভাবে আমাদের পরিবেশ মন্ত্রীর অনুপস্থিত রামসার চুক্তি অনুসারে, স্থানীয় সরকার (এ ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার) এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মাসের মধ্যে জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ম্যানেজমেন্টের প্ল্যান প্রস্তুত করার কথা ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে ১৪ বছর অতিক্রান্ত- আমাদের রাজ্য সরকার এবং কলকাতা কর্পোরেশন আজ পর্যন্ত কলকাতার এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা এবং ম্যানেজমেন্টের প্ল্যান প্রস্তুত করে উঠতে পারেনি। উল্টে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিগত দফায় ক্ষমতায় আসার পরে এই বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা ২৫০০০ বেআইনি বিল্ডিংকে আইনানুগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছেন আর আমাদের রাজ্যের বর্তমান পরিবেশমন্ত্রীর স্টেটমেন্ট আরও সাংঘাতিক। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক ডেলিগেশনকে তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের কাছে জলাভূমি সংরক্ষণের তুলনায় সিভিক সার্ভিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ

 বিগত ৩০-৩৫ বছর ধরে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা, সমস্ত রাজনৈতিক দল কলকাতাবাসীর বিপুল ক্ষতি করে একটু একটু করে এই অমূল্য সম্পদ নষ্ট হয়ে যেতে, দখল করে নিতে, আইনি স্বীকৃতি  দিয়ে অধিগ্রহণে উৎসাহ দিচ্ছেন আর অতি দ্রুত পুরো কলকাতাকে ঠেলে দিচ্ছেন এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে কলকাতা শহরের ঢালই পূর্বদিকে, অতি বর্ষা জমা জলের স্বাভাবিক গতিপথ পূর্বদিকে- এই গতি রুদ্ধ করে দিলে কলকাতা জলে ভাসবে, গরমে অতিষ্ঠ হবে, ১০০,০০০ মৎস্যজীবী, কৃষিজীবী বাস্তুচ্যুত হবে এবং রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতা গোটা কলকাতা তার বাসযোগ্যতা হারাবে উন্নতির মরীচিকায় বাঙ্গালোর আগামী ২০২৫ সালের পরে বাসযোগ্য থাকবে কিনা এই বিষয়ে যখন সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে, জলাভূমি বুজিয়ে উন্নতির কুফল হিসাবে যখন আমাদের চেন্নাইয়ের বন্যা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত, তখন আমাদের মেয়র রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রী পূর্ব কলকাতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অমূল্য বাস্তুতন্ত্রের মৃত্যুর জয়ডঙ্কা বাজাচ্ছেন আমাদের উদাসীনতার ফায়দা ওঠাচ্ছেন অবিবেচক রাজনৈতিক নেতৃত্বসমূহ

Friday, 10 June 2016

পাঞ্জাবের ডানা

পল্লবী ব্যানার্জি

পাঞ্জাব কিম্বা পিপীলিকা, ডানা যারই গজাক, তা ছেঁটে দেওয়াই বড়কর্তাদের অবশ্য কর্তব্য। আর তাই, উড়তা পাঞ্জাবের পেছনে আদা ছোলা খেয়ে পড়ে গেছেন সেন্সর বোর্ডের কর্তা, মোদীকাকার কর্তাভজা ভাইপো শ্রী পহলাজ নিহালনি। সেন্সর বোর্ড একখানা লম্বা চিঠিতে উড়তা পাঞ্জাব-এর সিনেমাওয়ালাদের কাছে ১৩টা সম্পাদনা চেয়েছে যা গুণে গেঁথে দেখলে প্রায় ৯০খানা কাট। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিনেমার সংলাপ এবং দৃশ্যের মধ্যে থেকে পাঞ্জাব এবং ওই রাজ্যের আরও কয়েকটা জেলার নাম তুলে নিতে হবে। কেন? কারণ সামনে পাঞ্জাবের বিধানসভা ভোট এবং সেখানে বিজেপির বন্ধুদল অকালি দল কে সমানে সমানে টক্কর দিতে উঠেপড়ে লেগেছে আপ এবং কংগ্রেস। আর এই গরম বাজারে আচমকা পাঞ্জাবের ওড়াউড়ি নিয়ে সিনেমা বানিয়ে বাজারে ছাড়লে ব্যালট বাক্সে মানে ইভিএম-এ তার খারাপ প্রভাব পড়তেই পারে।

পাঞ্জাব কেন উড়ছে?

রেড বুল নামক ক্যাফেন পানীয় তাদের বিজ্ঞাপনে দাবী করে থাকে, যে ওটা পান করলে আপনার ডানা গজাবে। পাঞ্জাব অবশ্য রেড বুল খেয়ে ওড়েনি। মূলত বর্ডারের ওপারের পাকিস্তান থেকে আসা কোকেন, হেরোইন চরস, আফিম, গাঁজার হাওয়ায় ভর দিয়েই পাঞ্জাব উড়ে চলেছে। সরকারি বেসরকারি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য বলছে পাঞ্জাবের যুবসমাজের মোটামুটি সত্তর শতাংশের বেশি ড্রাগের কবলে পড়ে গেছে। গত দু বছরে ড্রাগের সমস্যার আপাত মোকাবিলায় ব্যপক ধরপাকড়ও করেছে পাঞ্জাব পুলিশ। কিন্তু সেইসব এফআইআর-এর তালিকা ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে যারা ধরা পড়েছে তাদের অধিকাংশই ড্রাগ সেবক কিম্বা ছোট মাপের দালাল। আসল বড় বড় মাছ যারা ড্রাগের পয়সা বাড়ি গাড়ি হাঁকিয়ে ফেলছে তাদের টিকি ছোঁয়ার কোনও ইচ্ছে এবং হয়তো ক্ষমতাও পুলিশের নেই।
এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না, এই তথ্য ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে খুবই লজ্জাজনক। আর তাই সরকারে ক্ষমতায় থাকা দল উঠেপড়ে লেগেছে যাতে বিশ্ব সংসারের কাছে পাঞ্জাবের এ হেন লজ্জাজনক ছবি না পৌঁছয়।

একই প্যাটার্ন ফিরে ফিরে আসে

সত্য গোপন করে অথবা বলা ভালো সত্য কেটেছেঁটে তাতে নানারকম পুলটিস লাগিয়ে বিশ্বের দরবারে পরিবেশন করায় নিহালনির মোদীকাকা বেশ দঢ়। কীরকম, সেটা একটা ছোট উদাহরণ না দিলে বোঝাতে পারব না। ২০১১ সালে নরেন্দ্র মোদীর ব্রেনচাইল্ড, বঁড়শিতে শিল্পপতি গাঁথার মহামেলা 'ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সামিট'-এ অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই সামিট প্রতি বছর গান্ধীনগরে অনুষ্ঠিত হয়। সামিট শুরু হবার কিছুদিন আগে থেকেই আমাকে মেলাপ্রাঙ্গণে যাতায়াত করতে হচ্ছিল। সেই সময়ে লক্ষ করেছিলাম রাস্তার দুপাশে সার সার ঝুপড়ি। প্লাস্টিক, তেরপল, প্যাকিং বাক্স, পাতার ছাউনিতে সংসার। সামিট শুরু হবার ঠিক আগের দিন সকালে ঐ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় হঠাত খেয়াল করলাম একটাও ঝুপড়ি নেই। দু সেকেন্ড লেগেছিল বুঝতে, যে রাস্তার দু পাশে ঠিক ফুটপাথ যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে প্রায় আট ফুট উঁচু প্যান্ডেলের দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। আর এই এক ফর্মুলায় প্রতিটা রাস্তা মুড়ে ফেলা হয়েছে। সত্যিই তো, দেশ বিদেশের শিল্পপতি, নেতা নেত্রীদের তো আর গুজরাটের রাস্তায় থাকা গরীব লোকের মুখ দেখতে দেওয়া যায় না! আর পহলাজ নিহালনি যেহেতু মোদীকাকার সুযোগ্য এবং আশীর্বাদধন্য ছাত্র, তিনি এই পথে চলবেন এতে আর আশ্চর্য্য কী?

Saturday, 28 May 2016

বিষয় পশ্চিমবঙ্গ

নতুন সরকার নতুন পর্ব 
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ভোট পর্ব মিটল, ফলাফল বেরল, শপথ নিয়ে সরকারে আসীনও হলেন শাসকেরা। গত পাঁচ বছরে সদর্থক কিছু কাজ করার ফল হাতেনাতে পেয়েছেন মমতার সরকার। সে নিয়ে আমরা ‘একক মাত্রা’র মে সংখ্যায় (‘পশ্চিমবঙ্গের হাল হকিকত') কিছু আলোচনাও করেছি। আমাদের এই সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছিল এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে, তখনও বোদ্ধারা খুব সংশয়ে ছিলেন ভোটের ফলাফল নিয়ে। মিডিয়া, বিশেষত আনন্দবাজার গোষ্ঠীর হলুদ সাংবাদিকতায় তখন অনেকেরই মনে হচ্ছে এবার মমতা আর ক্ষমতায় ফিরছেন না। নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, প্রচ্ছন্ন হুমকি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে- এবার ২০১১’র ‘পরিবর্তনপন্থী’দের দেখে নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনও খুব কড়া হাতে দীর্ঘ সময়ব্যাপী নির্বাচনের নির্ঘণ্ট পরিচালনা করছেন। এমতাবস্থায় আমাদের সংখ্যাটি যখন বেরল, অনেকেই আমাদের বিশ্লেষণগুলিকে খোলা মনে নিতে পারেননি, কারও কারও মনে হয়েছে আমরা একটু হেলে আছি দিদির দিকে। কেউ কেউ, যারা আমাদের ওপর আস্থা রাখেন, তাঁরাও ভাবছেন আমরা বোধহয় সময় ও বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। নিকটজনেরা যখন জিগেস করেছেন ভোটের ফলাফল কী হবে, নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়েছি, তৃণমূল ২০০’র কিছুটা এপাশ ওপাশে থাকবে। বাস্তবিক দেখা গেল, তাই ঘটল। আমরা সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছি মাত্র।

এখন দু-তিনটি বিষয় মনে হচ্ছে। যে কণ্টকহীন গুরুদায়িত্ব মমতার সরকারের ওপর অর্পণ করলেন এ রাজ্যের মানুষ তার ফলাফল কী দাঁড়াবে। কারণ, এবারে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে এবং বিরোধীরা কার্যত নিধিরাম সর্দার’এ পরিণত হয়েছেন। তাহলে কি শাসককুল এখন এই খোলা মাঠ পেয়ে যা খুশি তাই করবেন? আবারও বলি, বাস্তবতার নিরিখে এমনতর ভাবার কোনও কারণ নেই; এটা একটা অতিকথা যে তৃণমূল ধান্দাবাজ ও সিন্ডিকেট-নির্ভর একটি পার্টি যার কোনও নিয়মনীতি বা আদর্শ নেই। বরং এটা অনুধাবন করতে হবে, তৃণমূল ও মমতা এক নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষিতে স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ারের ফসল,  একটি স্টেটমেন্ট এবং প্রান্তিক মানুষের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা। একে অতিক্রম করার সাধ্য তৃণমূল দলেরও নেই। যেদিন তা ঘটবে সেদিন ইতিহাসের অন্য এক বয়ানের সূত্রপাত হবে। মানুষের স্বতঃসারিত আবেগ, স্বপ্ন ও সম্মিলিত চৈতন্যে তৃণমূলের বিস্তার; যে কারণে অন্য দল ভেঙ্গে আসা নেতা-কর্মীরা, নবাগত পেশাদার বা ব্যক্তিরা, সাধারণ ভাবে কাজেকম্মে পারদর্শী ও সামাজিক মানুষেরা তৃণমূলে প্রবেশাধিকার পান এবং অবস্থা বিশেষে তাঁদের কেউ কেউ লাইমলাইটে চলে আসেন, নির্বাচনে দাঁড়ানোর টিকিটও পান বা বিশেষ গুরুত্বের কোনও কাজ। এটাই একটা গণ পার্টির বৈশিষ্ট্য এবং প্রকারান্তরে তলা থেকেই জনমতের চাপে এর গঠন, বিস্তার ও লয়। তা বলে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে দলটি ও এদের নেতারা একেবারে ধোয়া তুলসিপাতা। বরং সমাজের ক্লেদ, হিংসা, সঙ্কীর্ণতাও প্রতিফলিত হয় এদের কার্যকলাপে, সমাজের সুদিকগুলির সঙ্গেই।

এবার প্রশ্ন, আগামী পাঁচ বছরের যাত্রাপথটি কী ও কেমন? আপাতত এটুকুই বলা যায়, নির্মম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার ফলে খুব যে বিপদে পড়ে গেল মানুষ, তেমন ভাবনাটা অমূলক বলেই মনে হচ্ছে। জনকল্যাণের মধ্য দিয়ে অগ্রগতি ও বৃদ্ধির হার বাড়ানোর যে পথ মমতা নিয়েছেন, বিপুল জনাদেশ সেই পথেই এগোতে তাঁকে নিদান দিয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রশ্নটা কীভাবে মোকাবিলা করবে এই সরকার তা দেখার কৌতূহল রইল। শুধুমাত্র বিরোধীদের মোকাবিলা করার প্রশ্ন নয়, সাধারণ মানুষও অনেক প্রশ্ন তুলতে পারেন, জবাব চাইতে পারেন- সেইগুলোকে কীভাবে এই সরকার সামাল দেবে তা দেখতে হবে। কারণ, এই প্রশ্নে গতবার এঁদের ভূমিকা খুব একটা ভাল ছিল না। তবে নিঃসন্দেহে বলতেই হয়, উন্নয়নের প্রশ্নে মমতা এক নতুন দিশা দেখিয়েছেন যা তথাকথিত বাম্পন্থীদের যথেষ্ট লজ্জা দেবে।

Monday, 16 May 2016

নগরায়নের তাণ্ডব



যদি উড়ালপুল না ভাঙত!
প্রবুদ্ধ বাগচী
 
চিত্র পরিচালক বাসু চট্টোপাধ্যায় অনেক দিন আগে কলকাতা দূরদর্শনের জন্য একটা সিরিয়াল তৈরি করেছিলেন, যার নাম ছিল যদি এমন হত’। ওই সিরিয়ালের চিত্রনাট্যে প্রথম থেকে আস্তে আস্তে একটা সম্ভাব্য সংকট তৈরি করা হত, তারপর ক্লাইম্যাক্সে এসে একজন এসে দাঁড়াতেন পর্দায়; বলতেন, না এমনটা আসলে হয়নি। কিন্তু হলে কী হত? তারপর সেই সংকট মোচন করে মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়ে শেষ হত এপিসোড। সন্দেহ নেই, একটু ভিন্ন মেজাজের ট্রিটমেন্ট, দর্শকদের জন্য স্বাদ বদল। কলকাতার জনবহুল রাজপথে নির্মীয়মাণ উড়ালপুলের ভেঙে পড়ার পর, কেন জানি না, আমার ওই সিরিয়ালের এপিসোডগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল ।

আকস্মিক ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ, রক্ত, ছিন্ন প্রত্যঙ্গ, প্রশাসনের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা আমাদের মনেও তৈরি করছিল এক বিপন্নতা। তারই মধ্যে সংবাদ চ্যানেলের লাইভ নিউজ দেখানোর কাড়াকাড়ি, প্রশাসনের সর্বময়ী নেত্রীর নিলাজ বক্তব্য এবং ফুটপাথে চেয়ার পেতে বসে লোক দেখানো মাতব্বরি অথচ সেনা জওয়ানদের সুসংহত নিষ্ঠ প্রয়াসে সাধারণের আস্থা, আস্তে আস্তে যা স্বাভাবিকতার দিকে নিয়ে গেছে। পাশাপাশি, সেতু নির্মাণের প্রকৌশলী দক্ষতা নিয়ে চাপানউতোর যা ক্রমশ গড়িয়ে আসছে বরাত পাওয়া সংস্থার রাজনৈতিক ছাতা ও মাল সরবরাহকারী সংস্থার অস্বচ্ছ অভিসন্ধির দিকেও, হয়তো বা। এই তদন্ত, অনুসন্ধান, চাপানউতোর ও আমাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক রুচিমাফিক চাপা পড়া মানুষের মুখে ব্যালট পেপার খুঁজে বেড়ানোর নেতা ও নেত্রীসুলভ ইতরামো পেরিয়ে আমরা যদি বিষয়টাকে একটি অন্যভাবে দেখতে চাই, কেমন হয়?

এই দেখতে চাওয়ার সঙ্গে অবশ্যই জড়িয়ে থাকবে রাজধানী শহর কলকাতা ও তার সংলগ্ন এলাকার নগরায়নের অভিমুখ, যার সূত্রপাত ঘটেছে দেশের উন্মুক্ত অর্থনীতি উত্তর জমানায়। এর পরিণতি ঠিক কোথায় আমাদের নিয়ে যাবে আমরা জানি না, তবে তা যে কোনও অমরাবতীর দ্বারপ্রান্ত নয়, এটা বোঝার জন্য খুব বেশি মাথা ঘামাতে হয় না। যেমন ধরা যাক, এই যে জেএনইউআরএম প্রকল্প, যার আওতায় এই উড়ালপুল তৈরি হচ্ছিল। এই প্রকল্প ইউপিএ সরকারের একটি নগরায়ন প্রকল্প যার মূল উদ্দেশ্য বড় বড় শহরের নাগরিক পরিষেবা ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন। কিন্তু অনেক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পের আর্থিক দায় শুধুমাত্র কেন্দ্রের সরকারের নয়, রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দায় আছে। কোনও রাজ্য সরকারই আর্থিক ভাবে সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভর এমন উদাহরণ এই দেশে নেই। ফলে, কেন্দ্রীয় সরকারের আংশিক অনুদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বেশির ভাগ রাজ্য সরকারই অপারগ। অথচ কেন্দ্র রাজ্যের রাজস্ব বন্টনের অনুপাতে যে ঘোর অসাম্য তা নিয়ে নতুন খোলাবাজারি অর্থনীতিতে তেমন দিকনির্দেশ নেই। এই অসাম্য নিয়ে একদা এই রাজ্যের বামপন্থীরা জোরদার হইহই করেছিলেন, তাঁদের দাবি নিছক সারহীন ছিল না। কিন্তু রাজ্য সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রধান উপাদান বাণিজ্য কর বিলোপ করে যখন দেশব্যপী ভ্যাট(ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) চালু হল তার জন্য যে দেশজোড়া কমিটি হয়েছিল তার প্রধান ছিলেন এই রাজ্যেরই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী। ফলে রাজ্যগুলি এই ভ্যাটের প্রকোপে তাঁদের নিজস্ব স্বাধীনতা নিজেরাই হারাল, এখনও যে জিএসটি বিল কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনায় আছে তাতে রাজ্যগুলির রাজস্ব আদায়ে খুব একটা সুবিধে হবে এমন নয়, যদিও এই রাজ্যের বর্তমান সরকারি দল সেই বিল আইনে পরিণত করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে আগাম প্রতিশ্রুত। কিন্তু আর্থিক সংকটে দীর্ণ রাজ্য সরকারগুলি এই নগরায়ন প্রকল্পের পূর্ণ সুযোগ পাবে না কারণ ম্যাচিং গ্র্যান্ট না দিলে নয়া দিল্লীর সরকারও অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দেবে। তাহলে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো রাজ্যে এই জেএনইউআরএম প্রকল্পের অগ্রাধিকার ঠিক করা একটা বড় ইস্যু। আমরা আমাদের সীমিত সাধ্যে কী করব? কাদের জন্য করব? কতটুকু করব?

গিরিশ পার্কে উড়ালপুল ভাঙার সঙ্গে এইসব প্রশ্নের কী যোগ তার ব্যাখ্যা পাঠক চাইতেই পারেন। আশা করা যায়, ক্রমশ তিনি তাঁর জবাব পাবেন। এই দিক বদলের হদিশ পাওয়া যাবে গত কয়েক বছরের নাগরিক উন্নয়ন ও পরিষেবার দিকে চোখ রাখলে। সন্দেহ নেই, কলকাতার মতো ব্যস্ত ও জনবহুল শহরে, যেখানে রাস্তার আনুপাতিক হার প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম সেখানে শহরের রাস্তায় যানবাহনের গতি বাড়াতে গেলে উড়ালপুল করা প্রয়োজন। নয়া দিল্লি বা মুম্বাই শহরে যেখানে শহরতলির পরিসীমা আরও বড় সেখানেও নানা উড়ালপুল তৈরি হয়েছে, এখনও হচ্ছে। সে তুলনায় কলকাতায় উড়ালপুলের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও বেশ কম। এর ফলে যানজট ও দূষণে কীভাবে আমাদের অমূল্য সময় অনুৎপাদক হিসেবে অপব্যয় হচ্ছে অতি সম্প্রতি সেই বিষয়ে একটি সমীক্ষার রিপোর্ট বেরিয়েছে যা যথেষ্ট হতাশা জাগায়।
প্রাক উদার অর্থনীতি জমানায় কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধায় দুটো খুব দরকারি উড়ালপুল তৈরি হয়েছিল - একটি শিয়ালদহে, অন্যটি হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে ব্র্যাবোর্ন রোডের ওপর। জায়গা হিসেবে এই দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিয়ালদহ এলাকায় একদিকে প্রান্তিক রেল স্টেশন, এখানেই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র উত্তর দিক থেকে এসে হাত ধরছেন আচার্য জগদীশ চন্দ্রের, অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী রোড পশ্চিমগামী হয়ে জুড়ে দিচ্ছে শিয়ালদহের সঙ্গে হাওড়া স্টেশনকে। এখানে উড়ালপুলের প্রয়োজন ছিল। ঠিক যেমন ছিল, হাওড়া স্টেশন থেকে হাওড়া সেতু পেরিয়ে শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রের দিকে সহজতর যাতায়াত। কোন সরকারের আমলে কবে এই উড়ালপুলের পরিকল্পনা হয়েছিল তা এখনি হাতের কাছে নেই। না থাকলেও কিছু আসে যায় না। প্রয়োজনের নিরিখটাই বেশি জরুরি।

কিন্তু পরিবর্তন ঘটল তারপরে। যখন খোলা অর্থনীতির নিয়ম রাজ্য সরকারগুলিকে কিছুটা স্বাধীনতা দিল যে কোনও লগ্নি বা বিদেশি অনুদানের ক্ষেত্রে। বামফ্রন্ট আমলের শেষ দশ বছরে আমরা নতুন করে কলকাতায় প্রচুর উড়ালপুলের কথা শুনলাম এবং তার বেশ কিছু তৈরিও হল নানা বিদেশি অনুদানে অথবা ওই জেএনইউআরএম প্রকল্পে। যেমন, পার্ক স্ট্রিট উড়ালপুল, গড়িয়াহাট উড়ালপুল, নাগের বাজার উড়ালপুল, কাশিপুরে লকগেট ফ্লাই ওভার, ওদিকে বাইপাস থেকে রাজারহাটগামী উড়ালপুল, ভিআইপি রোড থেকে রাজারহাটগামী উড়ালপুল, ভিআইপি রোড থেকে উল্টোডাঙ্গা মোড় এড়িয়ে সরাসরি বাইপাসে চলে যাওয়ার (এবং বিপরীতটাও) উড়ালপুল, পরমা উড়ালপুল যা পার্ক সার্কাস সাত মাথার মোড় থেকে বাইপাস যাওয়া সহজ করবে, রবীন্দ্রসদন উড়ালপুল, ডানলপ মোড়ের উড়ালপুল যা নাকি দক্ষিণেশ্বর থেকে বিটি রোডে আসার পথকে সুগম করবে, প্রস্তাব হল ভিআইপি রোডে বাগুইহাটির কাছে আরেকটি উড়ালপুলের, আরেকটি উড়ালপুল ভিআইপি রোড থেকে বিমানবন্দরে ঢুকে সোজা চলে যাবে নতুন টারমিনালের সামনে। এগুলির কিছু কিছু বাম আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল, কিছুর কাজ শেষ হয়েছে বর্তমান সরকারের জমানায়, কিছু উড়ালপুলের কাজ এখনো চলছে বাইপাসের ওপর, বেহালা ও বন্দর এলাকার দিকেও চালু আছে কিছু উড়ালপুলের কাজ। এইসব উড়ালপুলের আর্থিক দায় কারা বহন করেছেন বা করছেন তা সরকারি নথিতে পাওয়া যাবে। কিন্তু বলার কথা এটাই, এই উড়ালপুলগুলি কলকাতা শহরের গণ পরিবহনে যে অসংখ্য সাধারণ মানুষ রোজ যাতায়াত করেন তাঁদের গতায়াতে বিন্দুমাত্র সুরাহা করেনি। কারণ, এই প্রতিটি উড়ালপুল দিয়েই গণ পরিবহনের কোনও বাস/ মিনিবাস চলার অনুমতি নেই, এগুলি শুধুমাত্র গাড়িচালক, বা বলা ভাল, গাড়ির মালিকদের জন্য । পার্ক স্ট্রিট বা গড়িয়াহাট উড়ালপুল দিয়ে কদাচিত কয়েকটি বাস যায় বটে বা দক্ষিণেশ্বর থেকে বিটি রোডে আসতে একটু বেনিয়ম করে মাঝে মধ্যে কিছু বাস সেতুতে উঠে পড়ে তবে সেটা সাধারণ নিয়মের অনুবর্তী নয়, আসলে ওই সেতু পাবলিক বাস চলার জন্য অনুমোদিত নয়। শহরের গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির ডানা মেলে এখনও বাইপাস বা অন্যত্র যে সব উড়ালপুল মাথা তুলতে চাইছে সেখানেও এই একই নিয়ম অদূর ভবিষ্যতে লাগু হবে এটা স্পষ্ট। পরমা উড়ালপুল সম্প্রতি নাম পালটে ‘মা’ হয়েছে, কিন্তু তিনি সকলের মা নন। শহরের সম্পন্ন ধনী বা শাঁসালো উচ্চ মধ্যবিত্ত যাদের অন্তত একটি চার চাকার বাহন আছে একমাত্র তাদেরই তিনি তাঁর কোল পেতে দিতে পারেন!  

বিপরীত পক্ষে একটু নজর করলেই দেখা যাবে পার্ক স্ট্রিট বা গড়িয়াহাটের মোড়ে উড়ালপুলের নীচে পাবলিক বাস মিনিবাসের চেনা জ্যাম জট, এদিকে উলটোডাঙ্গার মোড় বা বিমানবন্দরের এক নম্বর গেট, শ্যামবাজার পাঁচ মাথা মোড়ে সারি সারি গাড়ির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা, এক্সাইড মোড় বা মিন্টো পার্কে শ্লথ গতি যান চলাচল। অথচ অফিসের ব্যস্ত সময়েও বিদ্যাসাগর সেতু থেকে নেমে রবীন্দ্র সদন উড়ালপুল ধরে আপনি মিনিট দশ/পনেরোয় পৌঁছে যেতে পারেন পার্ক সার্কাস সাত মাথায়, সেখান থেকে বাইপাস যদি আপনি চার চাকার সওয়ার হন। এবং গাড়ির জানলা দিয়ে যদি আপনার চোখ একটু বাইরে রাখেন দেখবেন নীচে এক্সাইড মোড় থেকে বেকবাগান অবধি গাড়ির গতি কী শিথিল, পদে পদে সিগন্যাল, কোথাও তারই মধ্যে বাস মিনিবাসের কন্ডাক্টারের যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে লোক তোলার চির চেনা অভ্যাস। যে পথ আপনি পেরোলেন দশ পনের মিনিটে গণ পরিবহনের যাত্রীদের সেই পথ পেরোতে সময় লাগবে কম পক্ষে আধ ঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট। একই ভাবে বালি ব্রিজ পেরিয়ে ডানলপ ফ্লাইওভার ধরে ও লকগেটের জোড়া ফ্লাইওভারে চেপে আপনি যখন শোভাবাজার মেট্রো স্টেশন পৌঁছে যাবেন মিনিট কুড়ি-পঁচিশে তখন গাড়িবিহীন এক নিত্যযাত্রী টালা ব্রিজের একপ্রস্থ জ্যাম পেরিয়ে শ্যামবাজার পাঁচ মাথায় আসবেন এবং আবার একটা বড় সিগন্যাল পেরোতে আরো বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করবেন। আপনার গাড়িতে চালানো এফএম রেডিও বড় জোর এই বার্তা আপনাকে জানিয়ে দেবে শহরের রাস্তায় কোথায় কোথায় গাড়ির গতি শ্লথ, এই বার্তায় আপনার কী এমন যায় আসে? আপনার সময়ের দাম অনেক বেশি কারণ আপনি গাড়ি চড়েন এবং সেই সুবাদে আপনি নতুন নতুন সব উড়ালপুলে চাপতে পারেন। বাকিদের জন্য ব্যস্ত অফিস টাইমে নিত্যসঙ্গী যানজট, ঘন ঘন হাতঘড়িতে টাইম দেখা – ঠিক সময় অফিসে ঢুকতে পারবেন তো? কারণ ওই উড়ালপথের মসৃণ হাতছানি আপনার জন্য নয়, তার স্পষ্ট পক্ষপাত গাড়ি চাপিয়ে নাগরিকদের জন্য। আপনি বড় জোর কোনও ছুটির দিনে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে বউ বাচ্চা নিয়ে ওইসব না চাপা উড়ালপুলে উঠে একদিনের বাদশা বনতে পারেন। কিন্তু নির্মিত ও নির্মীয়মাণ ওইসব উড়ালপুলের উন্নয়ন যজ্ঞে আসলে আপনার কোনও আমন্ত্রণ নেই।

যে উড়ালপুল ভেঙে পড়ে এত কথার জন্ম দিল তাও কিন্তু তৈরি হচ্ছিল ওই প্রথম শ্রেণির নাগরিকদের জন্যই। ওটি যদি অচিরে পুনর্নির্মাণও হয় আপনার জন্য ভয়াল পোস্তা বাজারের জ্যাম একটুও কমে আসবে এমন আশা বাতুলতা। আমাদের উন্নয়ন আসলে এইরকমই একচোখা। সাধারণ যাত্রীদের জন্য তার কোনও দায় নেই। হয় তাঁরা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকবেন মস্ত এক সর্পিল উড়ালপুলের দিকে অথবা তার তলায় চাপা পড়ে থাকবেন উন্নয়ন প্রভুদের ভাগ বাঁটোয়ারার বিবাদে। অনেকদিন আগে সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন: বলতে পারো, বড়লোকে মোটর কেন চড়বে?/ আর গরীব লোকে সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে! সাম্যবাদের আদর্শে প্রাণিত কিশোর কবির প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিত হয়তো পাল্টে গেছে, কিন্তু ওই প্রশ্নের জবাব আজও মেলেনি। তবে সমীকরণ কিন্তু মিলে গেছে। উড়ালপুলের তলায় যাদের চাপা পড়ার কথা ছিল, তাঁরাই পড়েছেন। তাঁরা তো আর কোনোদিন ওই উড়ালপুলে এমনিতেও চাপতে পারতেন না!