হিন্দুত্বের রসায়ন বনাম জাতপাতের রূঢ় বাস্তব
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
ইউজিসি প্রণীত 'ইক্যুইটি রেগুলেশনস ২০২৬' বা তথাকথিত 'ইউজিসি বিল ২০২৬' হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। উত্তর ভারতের রাজপথ, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির ছাত্র বিক্ষোভ আজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিজেপি যে 'হিন্দুত্ববাদী ঐক্যের' তাসের ঘর তৈরি করেছিল তা জাতপাতের রূঢ় বাস্তবতার সামনে ধসে পড়ার মুখে। এটি এখন বিজেপির জন্য এক স্বখাত সলিলে মরণফাঁদ।
ঐতিহাসিকভাবে বিজেপিকে 'ব্রাহ্মণ-বানিয়া' বা উচ্চবর্ণের দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথাপি, গত এক দশকে মোদী-শাহের নেতৃত্বে বিজেপি অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে এই উচ্চবর্ণের ভিত্তির কোলে দলিত ও ওবিসি ভোটব্যাঙ্ককে এনে ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু ইউজিসি-র নতুন নির্দেশিকা সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সম্ভবত লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির জন্য একতরফা সুরক্ষাকবচ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির যে বিধান এই বিলে রাখা হয়েছে, তাকে উচ্চবর্ণের ছাত্ররা দেখছেন তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। উত্তরপ্রদেশ জুড়ে উচ্চবর্ণের ছাত্রদের তীব্র বিক্ষোভ ও সাবর্ণ নেতাদের রোষ প্রমাণ করছে যে, বিজেপি নিজের প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে নিজেই আজ বন্দি। দলিত ভোট টানার টোপ দিতে গিয়ে তারা এখন নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর উচ্চবর্ণের সমর্থন হারাতে বসেছে।
বিজেপির বর্তমান দশা এখন আক্ষরিক অর্থেই 'শ্যাম রাখি না কুল রাখি'। একদিকে তারা যদি এই বিল কার্যকর করে, তবে উচ্চবর্ণের বিশাল একটি অংশ যারা তাদের দীর্ঘদিনের অটুট ভোটব্যাঙ্ক, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঝুঁকি নেওয়া বিজেপির পক্ষে আত্মঘাতী। অন্যদিকে, যদি বিক্ষোভের চাপে পড়ে কেন্দ্র এই বিল প্রত্যাহার বা সংশোধন করে, তবে সমাজবাদী পার্টি বা কংগ্রেসের মতো বিরোধীরা একে 'দলিত-ওবিসি বিরোধী মানসিকতা' হিসেবে প্রচার করবে। ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে বিজেপি এমন এক গোলকধাঁধায় ঢুকেছে, যেখানে যে কোনও এক পক্ষকে তুষ্ট করা মানেই অন্য পক্ষকে হারানো। এই মেরুকরণ কেবল বাইরে নয়, দলের অন্দরেও প্রবল কম্পন সৃষ্টি করেছে।
বিজেপির এই সংকটে ঘি ঢেলেছেন ধর্মীয় নেতৃত্বের একাংশ। বিশেষ করে জ্যোতিষপীঠের শঙ্করাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীকে নিয়ে বিজেপি আজ গভীর সমস্যায় নিমজ্জিত। মাঘ মেলায় তাঁর স্নানযাত্রাকে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের বাধাদান ও তাঁর শিষ্যদের টিকি ধরে পুলিশের টান দেওয়ার প্রতিবাদে শঙ্করাচার্য টানা ধর্নায় বসে পড়েছেন। তাঁর সমর্থনে সাধু-সন্ত মহলে তু্মুল আলোড়ন উঠেছে শুধু নয়, লক্ষ্ণৌ শহরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট পদত্যাগ পর্যন্ত করেছেন। ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার করতে চেয়েছিল, আজ সেই ধর্মেরই শীর্ষস্থানীয় নেতারা যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ব্র্যান্ড বড়সড় ধাক্কা খায়। এটি প্রমাণ করে যে, স্রেফ মন্দির দিয়ে পেটের ক্ষুধা বা সামাজিক মর্যাদার লড়াই মেটানো যায় না।
কেন এই উভয় সংকট? আসলে, হিন্দু ধর্ম যে ভেতর থেকেই গভীর এক বিভাজিত ব্যবস্থা এবং এর অভ্যন্তরেই হাজার বছরের তীব্র বিদ্বেষমূলক দ্বৈরথ বিদ্যমান— তাকে আড়াল করে বিজেপি ও আরএসএস মিথ্যা ন্যারেটিভের আশ্রয়ে এক কৃত্রিম হিন্দু অস্মিতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের যে প্রয়াস নিয়েছিল তার সঙ্গে ধর্মের যোগ নয়, ছিল রাজনৈতিক ব্যভিচারের সমস্ত অনৈতিক ভাব ও প্রক্রিয়া। তাদের 'হিন্দুত্ববাদ' আসলে এক আরোপিত প্রলেপ, যা দিয়ে তারা জাতিভেদ প্রথার ক্ষতে মলম লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু ইউজিসি বিলকে কেন্দ্র করে উচ্চবর্ণ বনাম নিম্নবর্ণের যে সংঘাত আজ রাস্তায় নেমে এসেছে, তা প্রমাণ করে যে 'হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি' আসলে এক 'প্রহেলিকাময় আত্মহনন'। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় মেরুকরণ করে হিন্দু সমাজের আভ্যন্তরীণ তীব্র সামাজিক বৈষম্যের আদিম ক্ষতকে ঢাকা দেওয়া সম্ভব নয়। বিজেপির বর্তমান অন্তর্দ্বন্দ্ব আসলে সেই রাজনৈতিক দৈন্যদশারই বহিঃপ্রকাশ। দলিতকে আপন করার ভেক ধরা আর উচ্চবর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা— এই দুই বিপরীত মেরুকে এক করার যে অবাস্তব স্বপ্ন বিজেপি ফেরি করে, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ইতিমধ্যেই ইউজিসি-র এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনি ব্যাখ্যা এই বিলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আবেদনকারীদের প্রধান যুক্তি হল, সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সমতার অধিকার) অনুযায়ী সুরক্ষা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু ইউজিসি বিলের ৫.৩ এবং ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী সুরক্ষা কেবল সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করে যে এই বিল 'রিভার্স ডিসক্রিমিনেশন' বা বিপরীত বৈষম্য তৈরি করছে, তবে পুরো বিলটিই বাতিল হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, 'বৈষম্য' শব্দের সংজ্ঞা এতই অস্পষ্ট যে এটি যে কোনও নির্দোষ ছাত্রকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারে। আইনি এই জটিলতা বিজেপি সরকারকে এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে তারা না পারছে বিলটি পুরোপুরি সমর্থন করতে, না পারছে এর আইনি ভিত্তিকে রক্ষা করতে।
উত্তরপ্রদেশের লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রয়াগরাজ এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উচ্চবর্ণের ছাত্ররা কেবল বিক্ষোভ মিছিল নয়, বরং বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোর সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, 'আমরা বিজেপির সমর্থক ছিলাম, কিন্তু আমাদের পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।' লক্ষ্ণৌ ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিজেপির অন্তত ২০ জন জেলা পর্যায়ের নেতা গত এক সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হাইকম্যান্ড ছাত্র সমাজের ক্ষোভ বুঝতে ব্যর্থ। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনা বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ছাত্ররা এখন বিজেপির বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খোঁজার কথা বলছে, যা বিজেপির জন্য অশনি সংকেত। কানপুর, বেনারস, জৌনপুর, দেওরিয়া ও প্রতাপগড়ে 'সাবর্ণ সেনা' ও 'করনি সেনা'র মতো উচ্চবর্ণীয় বাহুবলীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে। মিরাট ও সাহরানপুরেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির নর্থ ক্যাম্পাস ও ইউজিসি'র সদর দফতরের সামনে ছাত্র বিক্ষোভে ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। দলের ভেতরেই যখন 'আমাদের সরকার আমাদের বিরুদ্ধেই আইন করছে'— এই সুর চড়তে শুরু করে তখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী কাঠামোর পতন শুরু হয়েছে। সাংসদ ও বিধায়করাও এখন জনগণের ক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হিন্দুত্বের দ্বন্দ্বমুখর এই হানাহানিই সম্ভবত বিজেপি রাজনীতির একাধিপত্যের ইতি ঘটানোর পথে প্রধান অনুঘটক হবে। ধর্মের কৃত্রিম বন্ধন দিয়ে মানুষের পেটের লড়াই বা সামাজিক মর্যাদার সংঘাতকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এই রূঢ় বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ ধর্মের সংকীর্ণতায় নেই, আছে আধুনিক গণতান্ত্রিক মননের বিকাশে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রলম্বিত সংরক্ষণকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি করা কিংবা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অন্ধ বিরোধিতা করা— দুটোই সমাজের জন্য সমান ঘাতক। প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার কেবল তখনই সম্ভব যখন জাতপাত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আধুনিক গণতান্ত্রিক চৈতন্যের উদয় হবে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে ফানুস বিজেপি উড়িয়েছিল, তা আজ জাতপাতের কাঁটায় বিদীর্ণ।
শ্রমের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সামাজিক মুক্তি প্রাপ্তব্য; ধর্মের জগাখিচুড়ি রাজনীতির মাধ্যমে নয়। বিজেপির বর্তমান দৈন্যদশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে রাজনীতি বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তা শেষ পর্যন্ত নিজেই খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশের রাজপথ থেকে সুপ্রিম কোর্টের এজলাস পর্যন্ত আজ সেই সত্যই ধ্বনিত হচ্ছে— ইউজিসি বিল ২০২৬ বিজেপির জন্য কোনও উপহার নয়, বরং এক ঐতিহাসিক পতনের শুরুর সংকেত।

খুব সাবলীল লেখা, ভীষণ আশাব্যঞ্জক ও , ধর্ম ও ধর্মীয় বিভাজনের মাধ্যমে যে সামাজিক মুক্তি বা পরিবর্তন সম্ভব নয়, সেটা জনগন বুঝতে পারছে। আর যত তাড়াতাড়ি এই ধোঁয়াশা কেটে যায় ততই মঙ্গল
ReplyDelete