Wednesday, 14 January 2026

বাংলাই এখন সারা দেশের ভরসা

বাংলা কি মামায়েভ কুরগান হয়ে উঠতে পারবে?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে ‘নোটবন্দী’ করে ব্যাঙ্কের সামনে হাজার হাজার লোককে দাঁড় করানো, রাতারাতি ‘লকডাউন’ ঘোষণা হেতু লক্ষ লক্ষ গরিব, দিন-আনি-দিন-খাই, পরিযায়ী শ্রমজীবী মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া, সমবেত কাঁসরঘন্টা বাজিয়ে করোনা তাড়ানোর কুসংস্কার, সংসদকে বিরোধী-শূন্য করে গায়ের জোরে নির্বাচন কমিশনার চয়নের প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে হঠানোর বিল পাশ করিয়ে তারপর নিজের দলের লোককে কমিশনারের পদে বসিয়ে (শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে তাদের জীবিতকালে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনও মামলা করা যাবে না— এমন বিধিও অন্তর্ভুক্ত করে) একের পর এক রাজ্যে ভোটার লিস্টকে লণ্ডভণ্ড করে সমস্ত রকম ক্ষমতা দখল করা— এই প্রভূত গায়ের জোয়ারি ও মাস্তানির যে ব্যবস্থাপনা গত ১০-১২ বছরে বিজেপি সরকার গড়ে তুলেছে, তার সামনে দেশের মানুষ ও বিশেষত দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দীর্ণ বিরোধীপক্ষ যেন কিছুটা অসহায় হয়ে পড়েছিল। একদিকে বিকৃত-উগ্র হিন্দুয়ানার জিগির তুলে ধর্মীয় সন্ত্রাস ও দাঙ্গা তৈরি করা, অন্যদিকে অর্থ ও পেশীর জোরে দেশ জুড়ে সমস্ত ক্ষমতাকে করায়ত্ব করে হিটলারি তাণ্ডবে পাকাপোক্ত একদলীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা— এই দ্বিবিধ অনাচারে পিষ্ট দেশবাসী।

ঠিক এই আবহেই এসে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। আরএসএস-বিজেপি নেতা সুনীল বনশল এ রাজ্যে তাঁর পার্টির কর্মীদের ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, এই নির্বাচনে বিজেপি’র জয় কিন্তু জয়ের মুকুটে শুধুমাত্র আরও একটি পালক সংযোজিত হওয়া নয়, বরং সভ্যতার জয়, ‘বিজাতীয়’ এক সভ্যতাকে পরাভূত করে ‘দেশিয়’ সভ্যতার জয়; অর্থাৎ, বঙ্গদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ তাদের কাছে এক ‘বিজাতীয় সত্তা’ যাকে পরাজিত করতে পারলে তাদের ভারত বিজয় সম্পূর্ণ হবে। শুভেন্দু অধিকারী লাফাতে লাফাতে সুনীল বনশলের বক্তব্যের এই অংশটির ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছে।

বুঝতে হবে, কী নৃশংস ও ভয়ঙ্কর এক শক্তির মুখোমুখি আমরা আজ দাঁড়িয়ে। বিজেপি যে আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতো ভালো-মন্দ মিশ্রিত আরও একটি দল নয়, ধর্মীয় ও জাতিগত গণহত্যায় বিশ্বাসী নাৎসি-ফ্যাসিস্ট অনুরূপ আদ্যোপান্ত এক হিংস্র রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার; আর ঠিক এই লক্ষ্যেই তাদের ‘বিজাতীয়’ বাঙালি নিধনের মহড়াও শুরু হয়ে গেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে খুব পরিকল্পিত ভাবে বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ ধরে ধরে পশ্চিমবঙ্গের গরিব-পরিযায়ী বাঙালিদের হয় ব্যাপক হারে পেটানো হচ্ছে, পিটিয়ে খুন করা হচ্ছে, নয়তো পুলিশকে দিয়ে তুলিয়ে বাংলাদেশে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।

পাশাপাশি, রাজ্যেও শুরু করা হয়েছে SIR’এর নামে এক উন্মত্ত তাণ্ডব; যে SIR’এর চোরাগোপ্তা হানায় বিহারে বিরোধীদের একেবারে শুইয়ে দেওয়া গেছে। তার আগে দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় নির্বাচন কমিশনের মদতে ভোটার লিস্টে হয় রাতারাতি লক্ষ লক্ষ নকল নাম ঢুকিয়ে অথবা বাদ দিয়ে বিজেপি নিজেদের কাজ হাসিল করেছে। কারণ, লোকসভা নির্বাচনে প্রায় হারতে হারতে কোনওরকমে সামলে নেওয়া বিজেপি’র সামনে নির্বাচনী জালিয়াতি করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। তাই এ রাজ্যেও এখন তথাকথিত SIR’এর আড়ালে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে, হিয়ারিং’এর অজুহাতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অসুস্থ, হাসপাতালের রোগী, বিশেষ সক্ষম ব্যক্তি সহ যাকে ইচ্ছা দু-তিনবার ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে, ফলত কাউকে মেরে ফেলে, এই ভয়ঙ্কর নাটক চলেছে। ইতিমধ্যেই এই সন্ত্রাসী উল্লাসে বিএলও সহ প্রাণ গেছে প্রায় ৮০ জন সহনাগরিকের।

এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে এ রাজ্যের মীরজাফর-উমিচাঁদের উত্তরাধিকারী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তদের বৃহদাংশ ও গোদি মিডিয়া যখন কঠিন-কঠোর নীরবতায় এবং মাঝেমধ্যে নানান কুযুক্তিতে এই নিধনযজ্ঞের মহড়ায় একপ্রকার সাবাশি দিচ্ছে, আশায় আশায় দিনও গুনছে কবে ইডি-সিবিআই এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে হাতকড়ি পরাবে, ফলে, আরএসএস-বিজেপি’র ‘বিজাতীয়’ বঙ্গদেশ জয় আসান হয়ে যাবে, ঠিক তখুনি চলমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গোপনে প্রায় ১৩ জন অবাঙালি ওস্তাদদের উড়িয়ে এনে হঠাৎ ভোররাত্তিরে আক্রমণ করা হল তৃণমূলের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা আই-প্যাকের দফতর ও শীর্ষকর্তার বাড়ি। উদ্দেশ্য স্পষ্ট! ১৯৭২ সালের আমেরিকার ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ তুল্য এই অভিযানটি আসলে ছিল বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূলের যাবতীয় নীতি-কৌশল, সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ইত্যাদি হাতিয়ে নেওয়া সহ তাদের বিপুল কর্মযজ্ঞের নেটওয়ার্ককে হুমকি ও ভয় দেখিয়ে অকেজো করে দেওয়া। আর সেই সুবাদে একইদিনে প্রাক-দুপুরে ঘটল সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ও অভূতপূর্ব ঘটনাটি, যা কেউ কল্পনাতেও আঁচ করতে পারেননি। খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী সটান হাজির হলেন ঘটনাস্থলে; সাহসের সঙ্গে চলে গেলেন আই-প্যাক শীর্ষকর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ির অন্দরে (যেখানে তখন নাকি ইডি’র তথাকথিত তল্লাশি চলেছে), তারপর ফাইল ও হার্ড ডিস্ক হাতে বেরিয়ে এসে জনতা ও সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে জানালেন ইডি’র আসল মতলব। ঝড়ের গতিতে সে খবর দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ থেকে জনপ্রিয় বিকল্প মিডিয়া, সকলে দু’ হাত তুলে বাহবা জানালেন, রাভিশ কুমার থেকে আকাশ ব্যানার্জি, অজিত অঞ্জুম থেকে অভিসার শর্মা’র মতো বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রায় প্রত্যেকে বললেন, এই ফ্যাসিস্টদের পরের পর নিয়মভঙ্গ ও একতরফা অত্যাচারের বিরুদ্ধে যখন প্রায় সমস্ত বিরোধী নেতা ও দলগুলি কোণঠাসা তখন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপযুক্ত সময়ে যথাযথ পদ্ধতিতে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এক লহমায় মমতা হয়ে উঠলেন ফ্যাসিস্ট-বিরোধী প্রতিরোধের জাতীয় নেত্রী। একপ্রকার ব্যর্থ হল আই-প্যাক'এর অফিস থেকে তৃণমূলের নথি, তথ্য ও রণনীতি ছিনিয়ে নেওয়ার ইডি'র প্রয়াস। ১৪ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে ইডি'র আইনজীবী সে কথা কবুলও করলেন যে তাঁরা শুধু দলীয় কেন, কোনও ধরনের নথিই বাজেয়াপ্ত করেননি। 

এই সামগ্রিক ঘটনাক্রম ও পরিপ্রেক্ষিত এরপর কোনদিকে গড়াবে তা অনুমান করা হয়তো দুষ্কর কিন্তু বাংলা থেকে প্রতিরোধের যে নিদর্শন ও বার্তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল তার তাৎপর্য অসীম। সেই অর্থে বাংলার আগামী বিধানসভা নির্বাচন এক অমূল্য গুরুত্ব অর্জন করেছে। তালিবানি-হিন্দুত্ববাদী বনশল কথিত ‘বিজাতীয়’ বাঙালিদের উপর হিন্দুস্থানীদের বিজয় লাভে গত ৫০০ বছরের লালন-চৈতন্য জাত ও রবীন্দ্র-নজরুলে পুষ্ট বাঙালি ঐতিহ্য, পরম্পরা ও সংস্কৃতির ইমারত কি ভেঙে পড়বে, নাকি, বাংলা হবে স্তালিনগ্রাদের মামায়েভ কুরগান পাহাড় ও রেড অক্টোবর স্টিল ফ্যাক্টরি (যেখান থেকে সোভিয়েত জনগণ ও সেনাদের সার্বিক প্রতিরোধে হিটলার বাহিনী প্রথম পিছু হঠতে শুরু করে), যা ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের সার্বিক পরাজয়ের যাত্রাশুরুর সূচক হবে।

মনে হচ্ছে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিছক দর্শক হয়ে বসে থাকবেন না, বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা রক্ষার লড়াইয়ে সর্বতোভাবে নিজেদের সঁপে দেবেন। কিন্তু সব থেকে বিধ্বস্ত অবস্থা দেখছি এ রাজ্যের বামেদের বৃহৎ অংশটিকে যারা নিতান্তই মমতা-ফোবিয়াতে ভুগতে ভুগতে দিন-মান-কাল সব বিস্মৃত হয়েছেন। SIR’এ সাধারণ মানুষের তীব্র হেনস্থা ও মৃত্যু মিছিলে তারা যেমন চোখে ঠুলি পরেছেন, তেমনই বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের পেটাই ও বলপূর্বক বেআইনি দেশান্তরেও নিষ্ঠুর নীরবতার আশ্রয় নিয়েছেন। প্রকারান্তরে ধরেই নিয়েছেন, তাদের হৃত সাম্রাজ্য তৃণমূলের কাছ থেকে বিজেপি’র হাত ঘুরেই তাদের কোলে এসে পড়বে। অথচ, ধরে নিলে কী হবে, মুখে বলছেন ‘সেটিং’। কী মুশকিল! ‘সেটিং’ই যদি হবে, তাহলে বিজেপি তৃণমূলের হাত থেকে রাজ্যের শাসনভার নিতেই বা যাবে কেন! আর ত্রিপুরা বা কেরালায় তো তৃণমূল নেই, সেখানে যথাক্রমে গোটা রাজ্যে ও তিরুবনন্তপুরম পৌরসভায় বিজেপি কীভাবে ড্যাং ড্যাং করে জিতে যায়! কথায় বলে, অক্ষমের নাই যুক্তির ধার! হায়, এ রাজ্যে বামেদের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব বামেরা নিজেরাই ধ্বংস করেছে। না হলে তাদের তরফ থেকে কি আর দাবি তোলা হয় যে, ইডি’র তল্লাশিতে ঢুকে পড়ার জন্য মমতাকে গ্রেফতার করা হোক! ফলে, তাদের অবস্থা এখন, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘incapacitated’ বা অক্ষম অথবা অথর্ব হয়ে পড়া, অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে তারা এখন নিজেদের জালেই বন্দী হয়ে নড়াচড়ার অবস্থাতেও আর নেই।   

ভারতবর্ষের কোনও রাজনৈতিক দলই ধোয়া তুলসিপাতা নয়। তৃণমূল বা বাম দলগুলিও নয়। কিন্তু যে দলের আদর্শগত লক্ষ্য কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায় বা জাতির নির্মূলিকরণ (ethnic cleansing), তারা বাকী দলগুলি থেকে গুণগত ভাবে সম্পূর্ণত আলাদা। এখানেই বিজেপির সঙ্গে অন্যান্য সমস্ত দলের পার্থক্য। ঠিক যেমন আলাদা ছিল জার্মানির নাৎসি ও ইতালির ফ্যাসিস্টরা। তাদের লক্ষ্যই ছিল ইহুদি ও অনার্যদের নির্মূল করা— আমরা ইতিহাসের সে পর্ব পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু কিছুটা ভিন্ন টার্গেটে আবার একই সংঘাতের শুরুয়াত হয়েছে। এই মর্মান্তিক পরিবেশে আপাতত বাংলাই এখন সারা দেশের ভরসা। এখানে শুরু হয়েছে প্রতিরোধের শেষ লড়াই। তাই আগামী কয়েক মাস নিরন্তর জেগে থাকার সময়, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনঐক্যের প্রাচীর গড়ে তোলার কাজ।


2 comments:

  1. তৃণমূলকে জাতশত্রু ভেবে তাদের বিরোধীতা করতে গিয়ে যে বিজেপির হাত শক্ত করে ফেলেছে সি পি এম তথা বাম রাজনৈতিক দল গুলি, তার ফল বঙ্গবাসী টের পাচ্ছে, কিন্ত এটুকু বোঝার বুদ্ধি তাদের নেই যে আজকের সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা শূন্য এবং বিজেপির ফ্যাসিস্ত নীতির বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনও কর্মসূচি বা পরিকল্পনা ও তারা করেনি, ফলত আজকে তাদের দলের বা নীতির প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নাধীন

    ReplyDelete