Monday, 12 January 2026

ভেনেজুয়েলা এখন মাথাব্যথার কারণ?

তেল কোম্পানির কর্তারা হাত তুলে দিয়েছেন

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



মহাকাব্যর একটি ঘটনার পুনর্নির্মাণ। আধুনিক পৃথিবীর রাবণ কারাকাসের বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে এল রাম-সীতাকে। হ্যাঁ, আমি ভেনেজুয়েলার কথা বলছি। ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ কেবল ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী আচরণ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের প্রকাশ, যারা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ইত্যাদির ধার ধারে না। ভেনেজুয়ালায় হামলা তা ফের প্রমাণ করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর আধিপত্যের ইতিহাসে অন্য দেশে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করার ঘটনা এই প্রথম নয়। 

বিশ্ব রাজনীতির ঠাণ্ডা যুদ্ধ তখন অস্তমিত। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিখাইল গর্বাচেভের পদত্যাগের মধ্য দিয়েই বিশ্বে চার দশক ধরে চলা স্নায়ুদ্ধের সমাপ্তি হয়। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ঠিক এইভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। বুশ পানামায় হামলার ওই জঘন্য অপারেশনের নাম দিয়েছিলেন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। এখানেও বুশ মাদক পাচারকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছিলেন। অথচ ঘটনা হচ্ছে, নরিয়েগা এক সময় ওয়াশিংটনের মিত্র ছিলেন। কেবল পানামাতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় নরিয়েগার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রায় ২৬ হাজার আমেরিকান সেনা পানামায় সামরিক আগ্রাসন চালায়। নরিয়েগা ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আত্মগোপন করলেও কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এরপর মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন আদালত নরিয়েগাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। জেলের পর তাঁকে অর্থ পাচারের সাজা ভোগের জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হয় আর এরপর হত্যা ও অন্যান্য অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। একজন মার্কিন স্টুজ হয়ে নরিয়েগার যদি এই হাল হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বিরোধী বলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিচিত নিকোলা মাদুরোর কী হবে তা অনুমেয়।  

চার বছর সাইডলাইনে থাকার পর দ্বিতীয় বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট হয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মেক্সিকো উপসাগরের নাম পাল্টে 'আমেরিকান উপসাগর' করে দিয়েছিলেন, তখন দুনিয়াদারির রাজনীতিকরা ভেবেছিলেন এটি ট্রাম্পের স্রেফ ক্ষ্যাপামি। তারপর আমদানি শুল্ক অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়াটাকেও গোড়ায় তুঘলকি বলে হালকা করে নিচ্ছিলেন অনেকেই। আমাদের নরেন্দ্র মোদীও। এত দিনে হয়তো বিশ্ব নাগরিকরা উপলব্ধি করেছেন, কেন বিষয়টি নিছক হাসির ছিল না। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ট্রাম্পের আকাশবাহিত বাহিনী গিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যে ভাবে প্রাসাদ থেকে বন্দি করে সোজা নিয়ে এল মার্কিন মুলুকে, তা কোনও কল্পকাহিনি বা সস্তা রাজনৈতিক থ্রিলার নয়, দস্তুরমতো বাস্তব, সুপরিকল্পিত, যত্ন সহকারে সংঘটিত। এই ভাবেই রচিত হচ্ছে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের বিশ্ব-কূটনীতি। সমস্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সোজা অন্য দেশের অন্দরে ঢুকে প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার এই পদ্ধতি প্রমাণ করে দিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাসমারোহে সামরিক কর্তৃত্ববাদে ফিরে গিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর মান্যতা ইত্যাদি সমূলে উৎপাটিত ওয়াশিংটন ডিসির বিশ্ববীক্ষা থেকে। কোনও সাফাই দিতে অনভ্যস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট তবু বলছে, মাদকচক্র বিরোধী আন্তর্জাতিক স্তরে যে ঘোষিত যুদ্ধ চলছে, মাদুরো দম্পতিকে তুলে আনা তারই অংশ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন, তা থেকে গোটা প্রহসনটি স্পষ্ট হয়ে যায়। সে সব তথ্য অনুসারে মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে যে সব অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মাদক-সন্ত্রাস ও কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও বিধ্বংসী ডিভাইস রাখা ইত্যাদি। কিন্তু মার্কিন মুলুকে কোকেন ও ফেন্টানিল পাচার নিয়ে মাদুরোকে যেভাবে দায়ী করা হয়েছে তার কোনও ভিত্তি নেই, কারণ, ভেনেজুয়েলা কোকেন উৎপাদনকারী দেশ নয়; কোকেন উৎপাদিত হয় মূলত কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায়। ভেনেজুয়ালা অতীতে একটি ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মার্কিন দেশে কোকেন পাচারের প্রধান রুট মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। তাছাড়া ফেন্টানিল সংকটের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কোনও যোগসূত্র নেই। এই সিনথেটিক মাদকের উৎপাদন ও পাচার মূলত চিন থেকে আসা কেমিক্যাল উপাদান আর মেক্সিকান কার্টেলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ এমনকি ইউএসএ মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাও ভেনেজুয়ালাকে ফেন্টানিলের উৎস বা পাচারকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেনি। অথচ সেগুলোই মাদুরোর বিরুদ্ধে চার্জ। তবে এসব ব্যাপারে বরাবরই ওয়াশিংটন পৃথিবীতে 'ভ্যাপিকান'। 

পাঠক মনে করে দেখুন, ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার যুক্তি হিসাবে মার্কিন প্রশাসন সাদ্দাম হোসেনের কাছে উইপনস অব মাস ডিসট্রাকশন (গণ–বিধ্বংসী) রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ইত্যাদি থাকার অজুহাত দিয়েছিল। পরে কিন্তু কিছুই মেলেনি। মাদুরোর ক্ষেত্রে অতদূর যাওয়ারও প্রয়োজন মনে করছে না। তাছাড়া ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন করলেও এই হামলার মূল উদ্দেশ্য যে তেল লুঠ, সেটা তাঁর সংবাদ সম্মেলনেই স্পষ্ট। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আমাদের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিগুলিকে— যেগুলি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তাদের ভেনেজুয়েলায় পাঠাতে চলেছি।’ আর এ কাজটি নির্বিঘ্নে করার জন্য মাদুরো সরকারের মতো স্বাধীনচেতা প্রশাসন দিয়ে হবে না।। তাই চাই পিট্টু সরকার। শোনা যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের ব্যর্থতার কথাও। বাকি দুনিয়া নিশ্চয়ই ভাবছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের গণতন্ত্রের হাঁড়ির হাল নিয়ে না ভেবে কেন ভেনেজুয়েলার নৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ে এত ব্যথিত ও বিপন্ন। মাদুরো নাকি সে দেশে নির্বাচন চুরি করেছেন, অর্থাৎ, অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা কব্জা করেছেন। এই অভিযোগের সত্যাসত্য নির্ণয়ের দরকার নেই, বিশেষত যখন ট্রাম্পের শ্রীমুখেই গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার অসারতার কথা শুনে ফেলেছেন বিশ্ববাসী। বস্তুত, এবারের রাবণ মডেলে কারাকাস অভিযানে ট্রাম্পের নিজস্ব শৈলীর অভিনব পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। আমার ধারণা, ট্রাম্পীয় এই পদক্ষেপ তেলের বাজারে রুশ-ভারত সহ অন্যদের ধমকেচমকে রাখার একটি ধাপ। 

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপের পিছনে কোনও একক ও সুসংহত মহাকৌশল নেই বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, এই সংকটকে বুঝতে হবে কৌশলগত, আদর্শগত ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনার অংশ হিসাবে। হয়তো, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কেননা, সেই চাভেজের সময় থেকে ভেনেজুয়েলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। কারাকাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। কিউবার পর ভেনেজুয়েলাই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মূর্তিমান প্রতিবাদ। কারাকাস বিকল্প শক্তিকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আদর্শগত ও কূটনৈতিকভাবে নিজেকে যুক্ত করেছে আর গত কয়েক দশকে সার্বভৌমত্বের এমন এক ন্যারেটিভ সামনে এনেছে যা ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিল। যদিও ওই ঘোষণায় ছিল-- আমেরিকা মহাদেশের স্বাধীন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপের কোনও হস্তক্ষেপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ বিবেচনা করবে। এখানেই লুকিয়ে আছে পেন্টাগনের হস্তক্ষেপ বৈধ না অবৈধ প্রশ্নটি। আমরা কিন্তু বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটন লাতিন আমেরিকার স্বাধীন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছে। গত শতাব্দীর সাতের দশকের গোড়ায় ১৯৭৩ সালে চিলির সালভাদোর আলেন্দে সরকারের পতন ঘটিয়ে পিনোচেতের পিট্টু সরকারের আগমন  ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। 

এই যাদের গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গি তাদের চোখের সামনে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরো সরকারের স্বমেজাজে টিকে থাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কাছে যুগপৎ অসম্মান ও দুঃস্বপ্নের। নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলা তাই ওয়াশিংটনের সামনে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর  বিশ্বাসযোগ্যতা ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বজায় রাখার পক্ষে কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। মার্কিন আধিপত্যবাদের সুনাম ও প্রতিপত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। ওয়াশিংটনের মুখ্য উদ্দেশ্য, অন্য রাষ্ট্রগুলিকে অনুরূপ অবাধ্যতা থেকে নিরুৎসাহ করা, সহবত শেখানো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানেন না, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে নিজের রাষ্ট্রে বন্দি করলেই সেই রাষ্ট্রটি দখল করা যায় না। এটি একটি পুরনো সাম্রাজ্যবাদী ধারণা। ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে এলেই কি ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের শ্বেতপ্রাসাদ নিতে পারবে?

ভেনেজুয়েলা জুড়ে চলছে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। নিকোলাস মাদুরোর পক্ষে বিক্ষোভ। ভেনেজুয়েলানরা দেখিয়ে দিচ্ছে, একজন প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি করলেই জনগণকে বন্দি করা যায় না। নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনার পর ৩ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভ ভরে ঘোষণা করেছিলেন, নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারাই ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও সহ প্রশাসনের কর্তাদের দেখিয়ে বলেছিলেন, এঁরাই ভেনেজুয়েলা চালাবেন আর তাঁর নির্দেশেই সব কিছু হবে। কিন্তু পরের দিনই ট্রাম্প বুঝলেন, সবটা তাঁর সাজানো ঘুঁটি অনুযায়ী চলবে না। ট্রাম্প বলতে বাধ্য হলেন, তিনি আশা করেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ মার্কিন নীতি অনুসরণ করে দেশ চালাবেন। না হলে দেলসিদের ওপর মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ আঘাত নেমে আসবে। 

৩ জানুয়ারি নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত নেত্রী, শান্তিতে নোবেল জয়ী মারিয়া মাচাদো'কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মদত দিয়ে আসছিল়, যাতে তিনি তাঁর দেশের লোককে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারেন। পক্ষান্তরে, মাচাদো বিভিন্ন বক্তৃতায়, এমনকি লিখিতভাবে, বারবার অনুরোধ করেছেন মার্কিন হস্তক্ষেপের। মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর মাচাদো প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলায় গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান। কিন্তু তাঁর অনুরোধ সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। যদি তা করার বাস্তবতা থাকত, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম লঙ্ঘন করে রাতের অন্ধকারে কমপক্ষে ৪০ জনকে খুন করে মাদুরোকে অপহরণ করত না। তবে মাচাদোতে আস্থা নেই ওয়াশিংটনের। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, মাচাদো একজন চমৎকার মহিলা কিন্তু নেতা হিসেবে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্য নন। 

ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ২৩৩ ধারা অনুসারে ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্বভার নিলেও বিশ্ব রাজনীতির কৌতূহল, ভেনেজুয়েলা আসলে এখন কে চালাচ্ছে? চিন-রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ভূমিকা ও সমর্থনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ'এর মধ্যে ঠাণ্ডা-গরম আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা সমাধানের কথা বলেছেন। যদিও ট্রাম্পের 'মহাবন্ধু' নরেন্দ্র মোদী কোনও 'রা কাটছেন না। বিদেশমন্ত্রকও মিন মিন করছে। তবে গোটা ঘটনাটা ট্রাম্পের পক্ষে খুব সুখকর হচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মাদুরোকে অপহরণের পর ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, তারা ভেনেজুয়েলা দখল করে ফেলবে, দেশের সর্বস্তরের জনগণ তাদের স্বাগত জানাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দেশটির অধিকাংশ মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পকে দস্যু, চোর-ডাকাত, লুটেরা বলছে। দুদিন না যেতেই মার্কিনিরা স্বীকার করেছে যে মাদুরো অপহরণের মাধ্যমে সমস্যা কমেনি বরং জটিলতা বেড়েছে। দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গেলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তেল ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের অভিলাষ পূরণ হবে না। বিশেষ করে যে তেল কোম্পানিগুলির জন্য ট্রাম্প অভিযান করলেন, তারাই এখন বলছে ভেনেজুয়েলায় যাবে না, কারণ, তেল একটি অস্তগামী শিল্প। উপরন্তু, ঠিকঠাক তেল উত্তোলনের একটি পরিকাঠামো গড়ে তুলতেই সেখানে ১০ বছর সময় লাগবে-- এত লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে তেল কোম্পানির কর্তারা একেবারেই রাজী নন। তাহলে, ভেনেজুয়েলা অভিযান কি একলা রাজা ট্রাম্পের রাজকীয় খেয়াল? যার জন্য গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই পস্তাতে শুরু করেছে?

জানি না, ভেনেজুয়েলা আরেকটা ভিয়েতনাম বা বেইরুট হয়ে উঠবে কিনা!



No comments:

Post a Comment