'উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই'
সোমনাথ গুহ
(১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ - ২৮ জুলাই ২০১৬)
হাসদেও অরণ্যে বেলাগাম বৃক্ষছেদন করে, জঙ্গল উজাড় করে আদানিদের হাতে তা খননের জন্য তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেখানকার গোন্ড, ওঁরাও আদিবাসীরা প্রতিবাদে মুখর। নিকোবর দ্বীপে লুপ্তপ্রায় জনজাতি শম্পেন এবং নিকোবারিজদের বলপূর্বক অন্যত্র সরিয়ে সত্তর হাজার কোটি টাকার মোচ্ছব চালু করতে কেন্দ্রীয় সরকার বদ্ধপরিকর। প্রকৃতির প্রাচীন নিদর্শন আরাবলি পাহাড় সরকারি স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিপদের সম্মুখীন, সেখানকার ভীল, মিনা জনজাতিরা বিপন্ন। এই বিপর্যস্ত মানুষদের কথা যাঁর লেখনিতে ধারাবাহিক ভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছিল, গত ১৪ জানুয়ারি সেই মহীরূহ মহাশ্বেতা দেবী শতবর্ষ পূরণ করলেন।
জল জঙ্গল জমিনের ওপর যখন দেশ জুড়ে বেলাগাম হামলা হচ্ছে, তখন বোঝা যায় লেখিকা আজও কত প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখাতেই তো আমরা পড়েছি, উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই। আদালতে বীরসা ও বীরসাইতদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অপরাধ দাঁড় করানো ছিল কঠিন। অতএব, সরকারের সিদ্ধান্তে এশিয়াটিক কলেরায় বীরসার জেলে মৃত্যু হয়। পুলিশের বড় কর্তারা সবাই খুব খুশি। ইয়োরোপিয়ান ক্লাবে মদের ফোয়ারা ছোটে। বীরসার মা জঙ্গলে বসে থাকেন, স্থির বিশ্বাস এই নদী গাছ পাহাড় মাটি দেখতে দেখতে একদিন সে ফিরে আসবে। মুন্ডাদের মধ্যে রটে যায়, উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই। কয়েক দশক বাদে দেখা যায়, তাঁর মতো বসাই টুডুরও মরণ নাই। চার-চারবার তাঁর মৃতদেহ শনাক্ত হয়, গ্রাম-শহর, বনবাদাড়ে ছড়িয়ে পড়ে বসাই মৃত, পুলিশ প্রশাসন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তবুও কোনও এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রবল নিপীড়নের কারণে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, সেখানে বসাইয়ের কন্ঠস্বর গর্জে ওঠে। বীরসা, বসাই উভয়েই মিথ হয়ে যায়, সাহিত্যের মহাসড়কে মহাশ্বেতাও চিরস্থায়ী হয়ে যান।
অথচ শুরুটা হয়েছিল অন্য ভাবে; অন্তত তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যের নিরিখে সেরকমটাই মনে হতে পারে। নিজের পরিচিত জগত ছেড়ে সেই ১৯৫৬ সালে সুদূর বুন্দেলখন্ডে ঝাঁসিতে চলে গিয়েছিলেন, ‘তীর্থযাত্রীর মন’ নিয়ে রাণী লক্ষ্মীবাইয়ের জীবন অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। গ্রাম-গঞ্জ পরিক্রমা করে লোকগীতি, ছড়া, রাসো, প্রচলিত কাহিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন, সন্ধ্যাবেলায় স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বসে পড়েছেন, শুনেছেন রাণীর কথা। যখন রাণীর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন, সমবেত মানুষ সহজাত বিশ্বাসে বলে উঠেছেন, 'রাণী মরগেই ন হোউনী, আভি তো জীন্দা হোউ।' তাঁরা এখনও মনে করেন, রাণী যদি হাতে মাটি তুলে নিতেন তো সেই মাটি ফৌজ বনে যেত, কাঠ তাঁর হাতের স্পর্শে হয়ে উঠত উদ্যত তরবারি, পাথর ছুঁয়ে সেটাকে তিনি ঘোড়া বানিয়ে দিতেন। এর পাশাপাশি দক্ষ শাসক, অকুতোভয় যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্বের কাছে তিনি উপেক্ষিতা হয়েছেন। সেই সময় লেখিকা ঝাঁসিতে রাণীর একটি মূর্তি ভিন্ন অপর কোনও স্মৃতিচিহ্নই দেখেননি, গোয়ালিয়রে শুধু একটি বেদি যা স্থানীয় মানুষদের চাপে তাঁর মৃত্যুর সত্তর বছর পর নির্মিত হয়।
এর কয়েক বছর পরে ষাটের দশকের শুরুতে আমরা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন আখ্যান পাই – ‘লায়লী আশমানের আয়না’। এই গল্পের সঙ্গে বলিউডের অধুনা 'গ্যাংস্টার' ছবির মিল আছে, সঙ্গে আছে দরবারি নর্তকির মশলা। সময়টা উনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক। উত্তর ভারতে ঠগীদের যুগ শেষ হয়ে এসেছে, তাদের এক উত্তরসূরী বাবুলাল বেনারসের গঙ্গার বুকে দস্যুবৃত্তি করে অর্থ ও প্রতিপত্তির এক বিপুল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তার নাতি কুন্দন এই কারবারে আরও দড়, উপরি হিসাবে জুটিয়ে নিয়েছে এক রূপসী লখনৌওয়ালি নাচনি। নাম তার লায়লী আশমান। ওয়াজেদ আলি শাহ যখন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হন, সে ও তার মা নবাবের আরও অনেক ঘনিষ্ঠজনদের সাথে শহরে এক নতুন লখনৌই গড়ে তোলে। লায়লী কুন্দনের আশ্রিতা, কিন্তু কুন্দন তার মনের খোঁজ পায় না। পাক্কা ফিল্মি চিত্রনাট্য, যা বম্বেতে সিনেমাও হয়েছিল। আপাত ভাবে ঝাঁসির রাণী আর এই উপন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন, যাকে বলে দুটি ভিন্ন জঁর, কিন্তু একটু গভীরে দেখলেই পাওয়া যায় এক চোরাস্রোত-- টিঁকে থাকার জন্য নারীর স্বতন্ত্র লড়াই এবং ঐতিহাসিক উপাদান।
এই ঐতিহাসিকতায় মহাশ্বেতা তাঁর সাহিত্যে বারবার ফিরে গেছেন এবং সেটা নিম্নবর্গের ইতিহাস। সত্তর বছর আগে ‘ঝাঁসির রাণী’তেই তার নিদর্শন আমরা পাই। কাহিনিতে বারবার সাধারণ নগরবাসীর কথা উঠে আসে। রাজপুত, বুন্দেলা, কুর্মী, আফগান, মারাঠিদের দৈনন্দিন জীবন, বিচিত্র পেশার সব মানুষ কাহিনিতে ভিড় করে আসে। সেখানে শহরের অলিগলিতে প্রবল পরাক্রমশালী বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মরণপণ লড়াইয়ের চিহ্ন ছড়িয়ে থাকে। মহাশ্বেতা লিখছেন, 'ইতিহাস কী? কোন কথাকে আমরা ইতিহাস বলব? মানুষের কথা যদি ইতিহাস হয়, তবে বলব, ঝাঁসির রাজপথে সে দিন যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার বুঝি তুলনা নেই।... কিশোর বালক থেকে পাঠান, আফগান, মারাঠি, বুন্দেলা সৈন্য প্রত্যেকে সেখানে দাঁড়িয়ে শেষ অবধি লড়েছে।... সে দিন যে ইতিহাস রচনা করেছিল বহু হাজার ভারতীয়, সেই ইতিহাসই ভারতের প্রকৃত ইতিহাস।'
'অরণ্যের অধিকার', 'চোট্টি মুন্ডা' এবং তাঁর 'তির', 'তিতুমীর' সবই তো নিপীড়িত জনজাতির ইতিহাস, তথাকথিত ‘সাবঅলটার্নদের’ আখ্যান। প্রথম উপন্যাসটিতে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পন্থা নিয়ে আমরা নিবিড় আলোচনা পাই যা মুন্ডা সমাজের আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ফুটিয়ে তোলে। জেল থেকে বেরিয়ে বীরসা যখন শান্তির কথা বলেন, জাগরী সেটার বিরোধিতা করেন কারণ ওই পথে তারা বারবার ঠকে এসেছেন। লড়াইয়ের পথ কষ্টকর, তবুও সেটাই তাঁদের পথ। বীরসা তাতেও রাজি নন, দিকে দিকে সভা করার ও সবার মত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নানা গল্পে নারীর বেঁচে থাকার লড়াই, অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের অভাব সংগ্রামের সাথে মিলে মিশে যায়। ‘সাঁঝ-সকালের মা’ গল্পে পাখমারা সমাজের জটিল মনুষ্য-রূপী শেয়াল শকুনের হাত থেকে বাঁচতে লাল চেলি আর ছোট একটা ত্রিশুল হাতে নিয়ে ঠাকুরনী হয়ে গেছিল। সে বুঝেছিল, ‘অলৌকিকতা দিয়ে নিজের চারদিকে বর্ম না আঁটলে নিজেকে ও বাঁচাতে পারবে না।’ পুত্র সাধনের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, সূয্যি না উঠতে মা বলে ডাকবি আর সূয্যি ডুবতে মা বলে ডাকবি, বাকি সময় ঠাকুরনী। এটাই ছিল মা-পুতের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি।
‘দ্রৌপদী’ গল্পটি তো ভারতীয় সাহিত্যে একটি মাইলফলক হয়ে গেছে। কী অপরিসীম জেদ, সাহস, আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রবল শক্তিশালী সেনা অফিসারকে হেলায় অবজ্ঞা করা যায়! সে সাঁওতাল রমণীকে ‘বানিয়ে’ নিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছিল। গল্পের শেষে কে কাকে বানালো ভেবে গায়ে কাঁটা দেয়: 'দ্রৌপদীর কালো শরীর আরো কাছে আসে। দ্রৌপদী দুর্বোধ্য, সেনানায়কের কাছে একেবারে দুর্বোধ্য এক অদম্য হাসিতে কাঁপে... তীক্ষ্ণ গলায় বলে, কাপড় কি হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?... হেথা কেও পুরুষ নাই যে লাজ করব। কাপড় মোরে পরাতে দিব না। আর কি করবি? লেঃ কাউন্টার কর, লেঃ কাউন্টার কর...? দুই ক্ষতবিক্ষত স্তন নিয়ে দ্রৌপদী অফিসারকে ঠেলতে থাকে। তার চোখে ভয়, নিরস্ত্র এক নারীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেও সে ভীত।' শুধু ওই অফিসার নয়, তামাম ভারতের সেনা পুলিশ প্রশাসন আজ ওই গল্পের সম্মুখে থরহরি কম্পমান। কাহিনির প্রকট বাস্তবতার কারণে তারা এতটাই বিপন্ন বোধ করে যে যেখানেই এর নাট্য প্রদর্শনী হয় সেখানেই শাসক সেটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। হওয়ারই কথা! কাশ্মীরের কুনান-পোশপোরা বা মণিপুরের মনোরমার কলঙ্কিত অধ্যায় এখনও তো তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
মহাশ্বেতার গল্পে মানুষ দুঃখী, দারিদ্র্যে জর্জরিত, প্রবল ভাবে নিপীড়িত কিন্তু তারই মধ্যে তারা বেঁচে থাকার, প্রতিরোধ করা, এমনকি বদলা নেওয়ার উপায় ঠিক বার করে নেয়। আর তারা অনেকেই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘জল’ গল্পের মঘাই, বয়স আশি, জাতে ডোম, রুক্ষ, বিবর্ণ জমির ওপর দিয়ে হেঁটে সে ঠিক আন্দাজ পেয়ে যায় পাতালে কোথায় কুলকুল করে বয়ে যায় জল। তার নির্দেশ মতো কন্ট্রাক্টরের লোক মাটি ফাটায়, জলে প্লাবিত হয় গ্রাম। ‘বিছন’ গল্পে দেখি গভীর অন্ধকারে নাবাল জমির ফণীমনসার জঙ্গলে একা রাত্রিবাস করে অত্যাচারী জমিদার লছমন সিংয়ের আজ্ঞাবহ দুলন গঞ্জু। ছেলের মৃত্যুর শোকে উন্মাদ হয়ে ওই একই জমিতে লছমনের লাশ পুঁতে ফেলে তার ওপর ধান ফলায়। গ্রামবাসীদের কাছে বিছন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার প্রতীক।
মহাশ্বেতা দেবী গড়পড়তা ‘ভদ্রলোক’ লেখক নন। ‘অগ্নিগর্ভ’ নামক গল্পের সংকলনে তিনি লিখছেন, 'বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল বিবেকহীন বাস্তব-বিমুখিতার সাধনা চলেছে। লেখকরা দেওয়ালের লেখা দেখেও দেখছেন না।... বেকার-সমস্যা ক্রমবর্ধমান, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া, শিক্ষায় চূড়ান্ত নৈরাজ্য, এতে মধ্যবিত্ত ভারসাম্য হারাচ্ছে, প্রবল ধাক্কায় চলে যাচ্ছে অন্য শ্রেণীর দিকে। শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্র স্পষ্টতর হচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিলগ্নে একজন দায়িত্ববান লেখককে কলম ধরতেই হয় শোষিতের সপক্ষে অন্যথায় ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না।'
আজ একশো বছর পার করে এত প্রাসঙ্গিক, এত সমকালীন, এত সৃষ্টিশীল কোনও লেখক কি আছেন আমাদের মধ্যে?

জন্মশতবার্ষিকীর বছরে তাঁর প্রতি লেখকের এই শ্রদ্ধার্ঘ এক কথায় অনবদ্য। আদিবাসীদের অধিকার ও সামাজিক সংগ্রামের কথা যে কোনও সাহিত্যিকের উপজীব্য হয়ে উঠতে পারে, মহাশ্বেতার পড়লেই বোঝা যায়, তাঁর নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণের দিকটি ও প্রশংসনীয় ভাবে ধরা পড়েছে লেখকের কলমে। মহাশ্বেতার লেখনীর তীক্ষ্ণতা ও প্রাসঙ্গিকতা আজও প্রশ্নাতীত ও সোচ্চার , এবং আজও তাঁকে স্মরণ করে
ReplyDeleteস্বীকৃতির মাধ্যমে লেখকও যে তাঁর সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন তার জন্য তাকে ধন্যবাদ।