জনস্বাস্থ্যের গণশত্রু কারা?
সোমা চ্যাটার্জি
এক মাস আগেই অফিসের কাজে ইন্দোর গিয়েছিলাম, আর মাস ঘুরতে না ঘুরতেই খবরের কাগজ পড়ে একটা বড় ধাক্কা খেলাম-- ইন্দোরে দূষিত পানীয় জলের কারণে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবে ১৬ জনের মৃত্যু, ১৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি, যার মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃতদের মধ্যে এক ছ' মাসের শিশুও আছে।
এমনিতেই কাজের সূত্রে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়, গত ছ' মাসের মধ্যে তিনবার যেতে হয়েছিল ইন্দোরে-- দেশের স্বচ্ছতম শহরের তক্মা পাওয়া শহরটি ঝকঝকে না হলেও তকতকে বলা যায়, লোকজনও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং যথেষ্ট শৃঙ্খলা মেনেই চলেন। এ হেন শহরের এই ভয়ানক এপিডেমিকের খবরটা সত্যিই খুব পীড়াদায়ক। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে গত কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তত ৫০০ লোক এই ভয়ানক জলবাহিত রোগের প্রকোপে অসুস্থ হয়েছেন। গত ৪ জানুয়ারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণের গ্রাউন্ড-জিরো ভাগীরথপুরা এলাকায় ৯০০০ জনেরও বেশি মানুষের সমীক্ষার সময় সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
অথচ ইন্দোরের মতো শহরে এইরকম রোগের প্রাদুর্ভাব হবার কারণ কী হতে পারে? খবরে প্রকাশ, ২০১৬-১৭ সালে ইন্দোরের আশপাশের গ্রামগুলির জলের নমুনা পরীক্ষা করে মধ্যপ্রদেশের রাজ্য দূষণ পর্ষদের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৩৮ শতাংশ জলই পানের উপযোগী ছিল না এবং ওই নমুনাতেই জলের মধ্যে মল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থের মিশ্রণ পাওয়া গিয়েছিল। তারপরেও টনক নড়েনি প্রশাসনের।
কেন্দ্রীয় সরকারের 'জল জীবিকা মিশন'এর রিপোর্টেও একই বক্তব্য। ভাগীরথপুরা (যেখানে মূলত এই মহামারীর আঁতুড়ঘর) ও অন্যান্য অন্তত সাতটি অঞ্চলে পানের অযোগ্য জল নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে যে বিষয়টি উদ্বেগজনক; কিন্ত অদ্ভুত ব্যাপার যে প্রায় এক দশক ধরে সেখানকার সরকার কার্যত কোনও ভূমিকা নেয়নি, বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত পানীয় জলের সুরক্ষার দিকে কোনও নজর দেয়নি কেউ। রাজ্যের কংগ্রেস সভাপতি জিতু পাটোয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, গত আট মাস ধরে ভাগীরথপুরা'র বাসিন্দারা অভিযোগ করে আসছিলেন যে পৌর নলের সংযোগ থেকে দূষিত জল আসছে, এমনকি জলের রঙ ও গন্ধ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল জল দূষিত কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাটওয়ারি অভিযোগ করেন, 'বাসিন্দাদের মতে, বর্তমানে ভাগীরথপুরায় পৌর ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সরবরাহ করা জলও দূষিত।' ২০১৯ সালের সিএজি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধুমাত্র ভোপাল ও ইন্দোরে ৫.৪৫ লক্ষ জলবাহিত রোগের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতি বছর প্রতি জেলায় ডায়রিয়া ও জলদূষণে কমপক্ষে ৫০,০০০ জন অসুস্থ হন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, 'শুধুমাত্র অক্টোবরে দূষিত জলের কারণে বারওয়ানীতে ২০০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কিন্তু কেউই আমল দেয়নি।' কংগ্রেস বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং বিজয়বর্গীয়কে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে, কারণ, তিনি নগর উন্নয়ন ও আবাসন দফতরের দায়িত্বে রয়েছেন এবং ভাগীরথপুরা তাঁর ইন্দোর-১ বিধানসভা কেন্দ্রের অংশ। জিতু পাটওয়ারি হুমকি দিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হলে তারা ১১ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু করবেন। তিনি ইন্দোরের মেয়র পুষ্যমিত্র ভার্গব ও সংশ্লিষ্ট পৌর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা দায়ের করার দাবিও জানান।
ভাগীরথপুরায় আক্রান্তদের মধ্যে শুধুমাত্র ডায়েরিয়াই নয়, গুলেন-ব্যারি সিনড্রোমের (জিবিএস) লক্ষণ দেখা গেছে যা একটি বিরল মারাত্মক স্নায়বিক ব্যাধি, যেখানে শরীরের ইমিউন সিস্টেম তার নিজস্ব স্নায়ুকে আক্রমণ করে। এটি প্রায়শই গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বা ভাইরাল সংক্রমণের পরে হয়, এতে প্রায় ১০ শতাংশ রোগী মারা যেতে পারে। ৬৭ বছর বয়সী মহিলা পার্বতী বাই গুলেন-ব্যারি সিনড্রোমে আক্রান্ত, যার চিকিৎসায় ইন্ট্রাভিনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আইভিআইজি) ইনজেকশন লাগে, যার প্রতি ডোজের দাম প্রায় ৩০,০০০ টাকা। রোগীদের প্রায়শই ৫-১০ ডোজ প্রয়োজন। প্রতি রোগীর মোট খরচ ১০-১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য স্বাস্থ্য প্রশাসন এই ঘটনার সঙ্গে জল দূষণের কোনও নিশ্চিত সংযোগ অস্বীকার করেছে।
মধ্যপ্রদেশ সরকার শর্তাধীনে জল ব্যবস্থাপনার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের (এডিবি) কাছ থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল। সেই শর্তগুলির মধ্যে একটি ছিল, প্রতি ১৫ দিনে জল নিরীক্ষণ ও নিয়মিত জলের গুণমান পরীক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে কেউই বোরওয়েল, ট্যাঙ্কার, অনিরাপদ উৎসের গুণগত মান যাচাই করেনি, যার ফলেই সম্ভবত এই বিপর্যয়। তাছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ শৌচাগার উপচে মল দূষণ ছড়াচ্ছে জলে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উপরেও কারও কোনও নজর নেই।
ইন্দোর ধারাবাহিকভাবে ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে, সরকারের স্বচ্ছতা সমীক্ষায় পরপর একাধিক বছর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, শহরের বর্জ্য পৃথকীকরণ, জ্বালানি/কম্পোস্ট প্রক্রিয়াকরণ এবং সবুজ শহর রূপে স্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইন্দোর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্ত ইন্দোরের সাম্প্রতিক জল দূষণ সংকট সব তক্মা ছাপিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যা প্রখ্যাত জল সংরক্ষণবাদী রাজেন্দ্র সিং'এর (যাকে 'Waterman of India' বলা হয়) মতে, একটি গণহত্যারই সামিল, কারণ, এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন যে, এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী সরকারের চূড়ান্ত দুর্নীতি। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে তিনি বলেন, 'দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরে যদি এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে এটা বোঝা অসম্ভব নয় যে অন্যান্য শহরে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থার অবস্থা কতটা গুরুতর হতে পারে।'
৬ জানুয়ারি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, গুজরাতের গান্ধিনগরের সেক্টর ২৪ ও ২৮ এবং আদিওয়ারা এলাকায় পাইপে ছিদ্রের ফলে জল দূষণের কারণে টাইফয়েডে অন্তত ১০০ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মাত্র এক মাস আগেই ভোপালের ভিআইটি'তে জন্ডিস রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, ৩ জন পড়ুয়ার মৃত্যু হয় ও প্রায় ২৫ জন ছাত্র গুরুতর আসুস্থ হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যবিধি আমান্য করা ও খাবারের গুণগত মান খারাপের জন্য বার বার কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্ররা আর্জি জানালেও কোন লাভ হয়নি, যার ফলে ক্যাম্পাসের ভিতরেই ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়, এমনকি গাড়িতে আগুন পর্যন্ত লাগিয়ে দেয় ছাত্ররা। সেদিক থেকে দেখলে ভোপালের ঘটনাটির সঙ্গে ইন্দোর এবং গুজরাতের ঘটনার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, কারণ, এসবই একপ্রকার 'ব্যবস্থা-সৃষ্ট বিপর্যয়'। অদ্ভুত ব্যাপার হল, এর সব কটিতেই মোদি সরকারের 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান', 'স্বচ্ছতা মিশন'এর আড়ালে আসলে উন্নয়নের নামে ভড়ং চলছে এবং ফলে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন, তাঁর দিক থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আমি নিজেই ইন্দোরের রাস্তার উন্নয়নের সাক্ষী। যাওয়া আসার সময় চোখে পড়েছে ২০২৮ সালের কুম্ভ মেলার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে রাস্তা বানানোর তৎপরতা, বানানো হচ্ছে ভিআইপি করিডোর অথচ রাস্তা খোঁড়াখুড়িতেই নিকাশি লাইনের দূষিত জল মিশে যাচ্ছে পানীয় জলের সঙ্গে, যেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারও। ইন্দোরে আইআইটি ও আইআইএম'এর মতো বিশ্বমানের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও শহরের মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সরকারের এই উদাসীনতা স্বভাবতই তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে আমাদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করে।
ইন্দোরের পরে দূষিত জলের আতঙ্ক এবার উজ্জয়িনীতেও। সেখানেও একাধিক এলাকা থেকে জল দূষিত হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে। ভাগীরথপুরায় জল দূষণে মৃত্যুর পরেই সতর্ক করে দিয়েছে উজ্জয়িনীর প্রশাসন। বাসিন্দাদের নলের জল পান না করে ফুটিয়ে খাওয়ার আবেদন করা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে উজ্জয়িনীকে 'মন্দির নগরী' হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সরকারের সব রকমের প্রচেষ্টা থাকলেও মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকার ও চাহিদার দিকে কোনও আগ্রহ নেই সরকারের। সব চেয়ে বড় কথা, যে বিপুল পরিমাণ তীর্থযাত্রী ইন্দোর হয়ে উজ্জয়িনী বা নর্মদায় যাত্রা করেন, সেটিও এই দূষণে এক বড় ভুমিকা পালন করেছে বলাই যায়।
নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে সম্পূর্ণ আলোকমালায় সজ্জিত উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার, প্রতিদিন কয়েক লাখ লোকের ভিড় জমে মহাকাল মন্দির দর্শনের জন্য এবং তারা সবাই যে শৌচাগার ব্যবহার করেন তার অবস্থা দেখলে আঁতকে উঠতে হয়; পরিষ্কার করার কোনও লোক নেই, লোকের পায়ে পায়ে মল পৌঁছে যাচ্ছে মন্দিরের দরজায় এবং মানুষ তাতেই মোক্ষলাভের আশায় সব ভুলে প্রসাদ খাচ্ছেন, পুজো দিচ্ছেন, মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন পুণ্য লাভের আশায়। সরকারের তরফে যে বিপুল টাকা মন্দির এবং নগর সুন্দরায়নে ব্যয় হয়, তার এক শতাংশও শৌচালয় বা পানীয় জল কিংবা পয়ঃমুক্ত জলের জন্য খরচ হয় না। একদিকে পুজোআচ্চা ধর্ম ইত্যাদিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে কুসংস্কারগ্রস্ত করে তোলার জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এক ফোঁটা দূষণমুক্ত জলের জন্য হাহাকার করছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন প্রতিদিন, কিন্তু প্রশাসনের দিক থেকে এই চূড়ান্ত অব্যবস্থা সংস্কারের ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই।
নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের লেখা ১৮৮২ সালের নাটক 'The Enemy of the People' অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচিত্র 'গণশত্রু' (১৯৮৯) ধর্মীয় ভণ্ডামি ও জনস্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব নিয়ে একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা দেয়। আজ ইন্দোর, উজ্জয়িনী বা গান্ধিনগরের মহামারির ঘটনাতেও আমাদের প্রকৃত গণশত্রুদের চিনে নিতে অসুবিধা হয় না।
