Wednesday, 2 September 2026

উত্তম ১০০ (১)

বাঙালিয়ানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তরাধিকার

বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়


(৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ - ২৪ জুলাই ১৯৮০)


বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজ যখন নিজের চেনা নৈতিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে ফিরছিল, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে মহানায়ক উত্তমকুমারের। আজ বহু দশক পরেও বাঙালির পারিবারিক সৌহার্দ্য, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে কোনও আলোচনায় উত্তমকুমার এক অনন্য ও অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন।

মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ডের আখ্যান

বাঙালিয়ানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান তার মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধ। অভাব বা প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সহজাত চারিত্রিক দৃঢ়তা, তাকে উত্তমকুমার পর্দায় এক মহৎ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সমাজব্যবস্থায় যখন পুঁজিবাদ ও নৈতিক স্খলনের চোরাস্রোত চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা বাঙালির সৎ ও আদর্শবাদী সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

'বিচারক' চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। এই ছবিতে একজন জজের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট, তাঁর নিজের অতীত ভুলের সঙ্গে বর্তমান বিবেকের যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তাকে উত্তম অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার 'থানা থেকে আসছি' ছবিতে এক রহস্যময় তদন্তকারী অফিসারের চরিত্রে তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ অভিনয় সমাজের উচ্চবিত্ত ও কপট শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াপনাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। উত্তমকুমার বাঙালি পুরুষকে শিখিয়েছিলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্থবিত্ত নয়, একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার সততা, নীতিবোধ এবং সোজা মেরুদণ্ডের মধ্যে। তিনি যখন পর্দায় কোনও আদর্শবাদী ডাক্তার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইঞ্জিনিয়ার বা সৎ কেরানির চরিত্রে অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতেন, তখন সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদমিত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠত।

পারিবারিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার যৌথ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, বড়দের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি অপত্য স্নেহ এবং ত্যাগের মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে একটি আদর্শ বাঙালি পরিবার। উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পারিবারিক মূল্যবোধের উদযাপন।

'মৌচাক' ছবিতে ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া এক বড় ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় ছিল অনবদ্য। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না অতি-নাটকীয়তা। গুরুজনদের সামনে তাঁর বিনীত শারীরিক ভাষা, ছোট ভাইদের শাসন করার পাশাপাশি তাদের আগলে রাখার যে নির্ভরতা— তা ছিল চিরাচরিত বাঙালি সমাজব্যবস্থার আসল প্রতিচ্ছবি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা চারপাশকে গ্রাস করছে, পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তমের এই ছবিগুলো আমাদের যৌথ পরিবারের সেই সুবর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ত্যাগই ছিল আনন্দের মূল উৎস।

'মানুষ' হয়ে ওঠার লড়াই

বাঙালির মজ্জাগত মূল্যবোধে ব্যক্তির স্বার্থপরতাকে সবসময় নিকৃষ্ট মনে করা হয়েছে এবং লোককল্যাণ বা পরোপকারকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্থান। উত্তমকুমারের বহু চরিত্র এই মানবিক দর্শনের সার্থক রূপায়ণ।

এই প্রসঙ্গে 'অমানুষ' চলচ্চিত্রের মধুসূদন বা 'মধু' চরিত্রটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও কুৎসায় জর্জরিত হয়ে এক সময়ের সৎ ও আদর্শবাদী জমিদারপুত্র যখন মদ্যপ ও সমাজ-পরিত্যক্ত এক রুক্ষ মানুষে পরিণত হয়, তখনও তার ভেতরের আসল মানবিকতা ও পরোপকারী সত্তাটি মরে যায় না। ঝড়ের রাতে বাঁধ ভেঙে যখন গোটা গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে মধুর সেই মরণপণ লড়াই আসলে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে ফুটিয়ে তোলে। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাইরের খোলসটি যতই মলিন বা রুক্ষ হোক না কেন, মানুষের ভেতরের আসল মূল্যবোধ যদি খাঁটি থাকে তবে সে সমাজকে এক নতুন পথ দেখাতে পারে। একইভাবে 'আনন্দ আশ্রম' বা 'ধন্যি মেয়ে' ছবিতেও তাঁর চরিত্রগুলো ছিল মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর এক একটি জীবন্ত উদাহরণ।

প্রেমের গরিমা

বাঙালির প্রেমের ব্যাকরণ চিরকালই অত্যন্ত মার্জিত, নান্দনিক ও আত্মিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। উত্তমকুমার রূপোলি পর্দায় প্রেমের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন, তাতে শরীরী আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গরিমা ও একাত্মতা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'সাগরিকা' বা 'অগ্নিপরীক্ষা'— প্রতিটি ছবিতেই উত্তমকুমারের চরিত্রগুলো ছিল নারীর প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রেমিক হিসেবে কখনও আগ্রাসী বা অধিকারপ্রমত্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন পরম আশ্রয়দাতা ও ছায়াসঙ্গী। নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই ভুবন ভোলানো মৃদু হাসি, কথা বলার সময় অপরিসীম ভদ্রতা এবং ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য নিজের অহংকার বা সুখ বিসর্জন দেওয়ার অভিব্যক্তি বাঙালি যুবসমাজকে এক গভীর রুচিসম্পন্ন প্রেমের পাঠ দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, প্রেম মানে কেবল অধিকার করা নয়, প্রেম মানে অপর মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়ে আপন করে নেওয়া। এই কারণে তাঁর রোমান্টিক চরিত্রগুলো আজও বাঙালির প্রেমের চিরন্তন ও পরিশীলিত আদর্শ হয়ে রয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বাঙালি মননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্ম, জাতপাত বা সংস্কৃতির কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার যে ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত, উত্তম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চেতনার এক ঐতিহাসিক জয়গান গেয়েছিলেন।

'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' চলচ্চিত্রটি এই ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। একজন পর্তুগিজ সংস্কৃতির মানুষ হয়েও হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি কীভাবে বাংলার মাটি, বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং কবিগানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এক নিপাট বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন— পর্দায় সেই রূপান্তরের কারিগর উত্তম। ভোলানাথ ময়রার সঙ্গে কবিগানের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর মুখাবয়বের সেই ঐশ্বরিক ভক্তি এবং গম্ভীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— 'খ্রিষ্ট আর কৃষ্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই', তখন তা কেবল ছবির সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বাংলার সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর ইশতেহার। তৎকালীন দাঙ্গা-পরবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে অস্থির বাংলার বুকে উত্তমের এই রূপায়ণ এক গভীর সামাজিক ক্ষতে মলম লাগানোর কাজ করেছিল এবং প্রমাণ দিয়েছিল যে বাঙালিয়ানা কোনও সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

'নায়ক'-এর আত্মদর্শন

সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও একজন মানুষের নিজের শিকড়, নৈতিকতা এবং বিবেকের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকা উচিত, তার এক মননশীল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে উত্তম মূলত নিজের জীবনেরই এক সমান্তরাল চরিত্র 'অরিন্দম মুখার্জী'-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খ্যাতির চরম চূড়ায় বসে থাকা একজন সুপারস্টারের ভেতরের একাকীত্ব, তাঁর অতীত জীবনের আদর্শচ্যুতির ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের বিবেককে টিকিয়ে রাখার যে ছটফটানি— তা উত্তম যে ভাবে তাঁর চোখের পলক, ঠোঁটের কোণের বিষাদ ও শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ট্রেনের কামরায় এক তরুণী সাংবাদিকের কাছে অভিনয় গুণে নিজের ভেতরের সব গ্লানি, পাপবোধ ও দুর্বলতা উজাড় করে দেওয়ার দৃশ্যটি উন্মোচিত করে, সাফল্য বা গ্ল্যামার মানুষের শেষ কথা হতে পারে না; নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। উত্তমের এই মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বাঙালি সমাজকে এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

কেন আজও উত্তমের বিকল্প নেই?

আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক হাই-টেক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ভাষা ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে চরম যান্ত্রিকতা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও বাঙালির নৈতিক অবচেতনে ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উত্তম আজও এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা। কারণ, উত্তম কেবল সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি কোনও অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির নিজস্ব মূল্যবোধের এক পরম বিশ্বস্ত অভিভাবক।

যখনই বাঙালি সমাজ কোনও নৈতিক সংকটে ভোগে, পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে বা যান্ত্রিকতার ভিড়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরে পেতে চায়, তখনই তারা ফিরে যায় উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের সেই মায়াবী আশ্রয়ে। তাঁর সেই প্রাণখোলা ভুবন ভোলানো হাসি, ধুতি-পাঞ্জাবির আভিজাত্য, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই চিরচেনা রূপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিকূলতা যতই আসুক না কেন, সততা, পরিবার, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং আত্মমর্যাদাই হল একজন খাঁটি মানুষের আসল পরিচয়। 

যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালিয়ানা তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে, ততদিন বাঙালির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমারের এই অনন্য দৃষ্টান্ত চিরকাল অম্লান ও অতুলনীয় হয়ে থাকবে।


1 comment:

  1. সঠিক মূল্যায়ন।

    ReplyDelete