নারীর শ্রম আজও অদৃশ্য কেন?
কৌশিকী ব্যানার্জী
ভারতের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার যে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্ন ও ক্রমহ্রাসমান, তা নিয়ে চর্চা বহুদিনের। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও প্রজনন হারে হ্রাসের ফলে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ বিষয়ে ক্লাউদিয়া গোল্ডিন-এর (১৯৯৫) একটি বিখ্যাত তত্ত্ব ‘feminization-U hypothesis’-এর কথা বলতেই হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের সম্পর্কটি একটি U-আকৃতির বিন্যাস অনুসরণ করে। অর্থাৎ, অর্থনীতি যখন কৃষি থেকে শিল্প খাতে (নিম্ন থেকে মধ্যম আয়) রূপান্তরিত হয়, তখন নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ (Female Labour Force Participation) প্রাথমিকভাবে হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে শিক্ষার স্তর, সেবা খাত ও মজুরি বৃদ্ধির সাথে সাথে (উচ্চ আয়) তা আবার বৃদ্ধি পায়। তবে ভারত এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম, এখানে সম্পর্কটি উল্টো-U আকৃতির। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ বৃদ্ধি, নিম্ন প্রজনন হার এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার হতাশাজনকভাবে নিম্নমুখী ও হ্রাসমান। কৃষিক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হ্রাস, যার সাথে অন্য খাতে কর্মসংস্থানের আনুপাতিক বৃদ্ধি না ঘটা, শিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির দুষ্প্রাপ্যতা এবং কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য সুগম রাস্তা ও গণপরিবহনের অভাবকেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন।
গ্রামীণ ভারতে এ ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়েছে: NSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; অন্যদিকে, শহুরে ভারতে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ। কারণস্বরূপ: 'আয় প্রভাব', অর্থাৎ, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির কারণে নারীদের কর্মজগৎ থেকে সরে দাঁড়ানো, কিংবা শিক্ষার হারবৃদ্ধির ফলে কর্মজগতে দেরিতে প্রবেশ বা কর্মস্থল, পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানি ও অপরাধ এবং সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব। কিন্তু, অশ্বিনী দেশপাণ্ডে ও জিতেন্দ্র সিং'এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে পতনের মূল কারণ, গ্রামীণ নারী, বিশেষ করে গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার হ্রাস পাওয়া। অবশ্য এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, জনসংখ্যার অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি পরিবারগুলোর আয় অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিংবা, নারীদের অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি উপজাতি নারীদের ওপর যৌন অপরাধের হার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে তাদের কর্মে যোগদানের হার কম কেন?
আর একটি পরিসংখ্যান দিলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে। ২০২৬ সাল অবধি ভারতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের (NEET) বাইরে থাকা মহিলাদের হার অত্যন্ত বেশি: ৩৯ থেকে ৪৪ শতাংশ। এর অর্থ, প্রতি ১০ জন তরুণীর মধ্যে ৪ জনেরও বেশি কর্মশক্তি বা শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠবে, এরা কোথায় রয়েছেন? এঁরা কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই গৃহস্থালি কাজে নিযুক্ত, যাকে বলে অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রম, যা জিডিপির হিসাব বহির্ভূত। এই মহিলারা পারিবারিক ব্যবসা, পশুপালন, কৃষিকাজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য করা হয় না, বরং তাঁদের ‘অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ হিসেবেই তালিকাভুক্ত করা হয়। জাতীয় সমীক্ষাগুলিতে বলা হয়েছে, কাজ যদি নারীদের নিজেদের বাড়িতে কিংবা বাড়ির কাছাকাছি সহজলভ্য হয়, তবে তারা করতে আগ্রহী।
দেশপাণ্ডে তাঁর আর একটি গবেষণাপত্রে এইসব অবেতনভুক্ত গার্হস্থ্য শ্রমে নিযুক্ত মহিলাদের কর্মকাণ্ডকে ‘ব্যয় সাশ্রয়ী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা বলেছেন। কারণ, তাঁদের অবেতন শ্রম পরিবারের শ্রমব্যয় হ্রাস করছে। কিন্তু তাঁদের এই কাজ প্রচলিত অর্থনৈতিক উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃত নয়। শুধু পারিবারিক ব্যবসা বা কৃষিকাজ নয়, এরা অবেতনভোগী পরিচর্যা ও বিভিন্ন সাংসারিক কাজেও যুক্ত, যার অন্তর্ভুক্ত শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাপ্তবয়স্ক এবং অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা প্রদান, যেমন, খাওয়ানো, প্রাত্যহিক জীবনযাপনের কাজে সহায়তা করা, চিকিৎসার প্রয়োজনে পাশে থাকা এবং পরিচর্যা-সংক্রান্ত অন্য যে কোনও প্রয়োজন মেটানো। জনসংখ্যার বার্ধক্য ও ‘demographic dividend’ হ্রাসের ফলে আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব জুড়ে অবৈতনিক সেবা কাজের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি বা বাজার-ভিত্তিক সেবা অবকাঠামো ও পরিষেবার অভাব সম্ভবত নারীদের ওপর সেবাদানের বোঝা বৃদ্ধি করবে এবং পরিবার ও শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্যের দুষ্টচক্রকে আরও সুদৃঢ় করবে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোকে ব্যাহত করে।
ভারতের ক্ষেত্রে অর্থনীতি বিরাট ক্ষতির মুখে। কারণ, এই মুহূর্তে দেশে সর্বাধিক কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে খুব কমসংখ্যক মহিলা ফর্মাল সেক্টরে স্থায়ী মজুরিভিত্তিতে কর্মরত। বেতনভুক ও অবৈতনিক— উভয় প্রকারের কাজের ক্ষেত্রেই ভারতে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্রা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। এখানে শক্তিশালী পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যাপক প্রচলন। টাইম নিউজ সার্ভে বলছে, ভারতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে দ্বিগুন সময় 'অবৈতনিক সেবা কাজে' এবং তিন গুন বেশি সময় 'অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে' ব্যয় করেন। অধিকন্তু, ভারতে অবৈতনিক সেবা কাজের বোঝা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর (৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব) সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে হিসেব করা হয়েছে, যা বিশ্ব গড়ের চেয়ে ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তাছাড়া, ৮৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের সংখ্যা— যাদের সাধারণত অত্যন্ত উচ্চমাত্রার প্রত্যক্ষ সেবার প্রয়োজন হয়— ২০৫০ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট জার্নাল'এ ২০২৪-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ভারতে অবেতনভুক্ত পরিচর্যা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকট লিঙ্গ বৈষম্যকে তুলে ধরা হয়েছে। গড় সময়ের অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিদিন পরিচর্যার কাজে এক ঘণ্টা বেশি ব্যয় করলে নারীরা তাদের মোট কর্মসংস্থানজনিত সময় ১.১৩ ঘণ্টা কমিয়ে দেন; পক্ষান্তরে পুরুষেরা এই সময় কমান মাত্র ১৬ মিনিট (যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যহীন)। নারী এবং পুরুষেরা তাদের স্ব-কর্মসংস্থানজনিত (self-employment) সময় যথাক্রমে ১৮ মিনিট এবং ১.২ মিনিট কমিয়ে দেন। এমনকি কর্মরত মহিলারাও দৈনিক ৩.৫ থেকে ৪.৮ ঘন্টা গার্হস্থ্য শ্রম দিয়ে থাকেন যার এক-চতুর্থাংশ সময় পুরুষরা দেন। ভারতে কোভিড মহামারির সময় নারীদের ওপর গৃহস্থালি কাজের বোঝা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ভারতে যে সব মেয়েরা পরিচর্যা কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের অন্যান্য সাংসারিক কাজেও নিযুক্ত করে দেওয়া হয়। কারণ, পরিবারের অসুস্থ বা নির্ভরশীল সদস্যদের এমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন হতে পারে যার প্রস্তুতির জন্য রান্নাবান্নায় অধিক সময় ব্যয় করতে হয়; কিংবা তাদের বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত চাহিদার কারণে ঘর পরিষ্কার ও কাপড় ধোয়ার কাজেও সময় ব্যয় করতে হতে পারে। ঘরোয়া কাজে এই বৈষম্য উন্নত দেশেও রয়েছে, যাকে ‘মাতৃত্বের দণ্ড’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আবার এর বিপরীত মতও রয়েছে যেখানে অবেতনভোগী পরিচর্যা কাজ সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি এবং দৈনিক ও আন্তঃপ্রজন্মগত ভিত্তিতে শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সমষ্টিগত অর্থনীতির সচলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে সেবা প্রদানের ফলে সেবা প্রদানকারীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বোঝা চাপতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, নিজের যত্ন নেওয়ার সময়ের অভাব, বিনোদনের অভাব, যা মানসিক চাপ বৃদ্ধি ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকি, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিম্নমান এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ; আর এসবই ঘটে ‘সময় দারিদ্র্যে'র (time-poverty) দরুণ। এগুলো পরোক্ষভাবে বিরাট সামাজিক ব্যয় হয়ে দাঁড়ায়, যা মূলত মানব সক্ষমতা থেকে বঞ্চনা এবং শ্রমশক্তির স্বল্প ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়; আর এর ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বা ফলাফলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
বর্তমান ভারতে কয়েক কোটি অবেতনভুক্ত মহিলা শ্রমিক রয়েছে। এদের কাজের মূল্যায়ন বা অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে এলসনের (২০১৭) 3R Strategy- ‘Recognize, Reduce, Redistribute’ প্রয়োজন। তাছাড়া, লিঙ্গ-ভিত্তিক গতানুগতিক ধারণাগুলোকে বর্জন করে নারীদের ক্ষমতায়ন, গণপরিবহন থেকে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদান, সবেতন পরিচর্যা ছুটি, বাজারপ্রদত্ত সেবা পরিকাঠামো ও পরিষেবা, মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান কর্মক্ষেত্রে যোগদানের হার বাড়াতে পারে। মেয়েদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানসিকতার অনেক বদল হয়েছে। এবার লিঙ্গপ্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসে অবৈতনিক সেবা ও ঘরোয়া কাজের দুষ্টচক্র থেকে মেয়েদের বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়ে আলোচনা এতই কম যে তা স্বাধীনতার এত বছর পরেও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

No comments:
Post a Comment