Tuesday, 26 May 2026

ফুটপাথের অর্থনীতি

অন্তরালে মানবিক বিপর্যয়!

অয়ন মুখোপাধ্যায়



সাম্প্রতিক কালে ভারতের নগরোন্নয়ন ও পুর প্রশাসনের অভিধানে একটি নতুন শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে: ‘বুলডোজার’। একদা যা ছিল কেবলই রাস্তা নির্মাণ বা ভারী পরিকাঠামো গড়ার নিরীহ যন্ত্র, আজ তা রাষ্ট্রশক্তির একচ্ছত্র দাপট, তাৎক্ষণিক বিচার ও প্রান্তিক দমনের এক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষত, মহানগরের রাস্তা ও ফুটপাথ ‘পরিষ্কার’ করার নামে হকার উচ্ছেদের যে হিড়িক দেশ জুড়ে তথা পশ্চিমবাংলায় দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কোনও প্রশাসনিক সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচি নয়; বরং তাকে কেউ কেউ স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৃহৎ অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ ঘোষণা বলছেন। এই 'বুলডোজার সংস্কৃতি' আদতে একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটকে আইনি চাদরে ঢেকে ফেলার এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনা।

নান্দনিকতার নগর বনাম বেঁচে থাকার নগর

যে কোনও আধুনিক শহরের দুটি রূপ থাকে। একটি তার বাহ্যিক অবয়ব— ঝকঝকে বহুতল, চওড়া রাস্তা, ফ্লাইওভার ও শপিং মল। অন্যটি তার প্রাণস্পন্দন— যা সচল থাকে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরে। হকাররা হলেন সেই প্রাণস্পন্দনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উচ্ছেদপন্থীদের প্রধান যুক্তি হল, হকারদের কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, যানজট তৈরি হচ্ছে এবং শহরের নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে। প্রথমাংশে এই যুক্তিকে আংশিক সত্য বলে মেনে নিলেও, দ্বিতীয় অংশটি অত্যন্ত সুবিধাবাদী। ‘নান্দনিকতা’ বা ‘বিউটিফিকেশন’এর যে ধারণা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মননে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইউরোপ-কেন্দ্রিক। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যা ও বেকারত্বের দেশে শহরের সৌন্দর্য কখনই তার দরিদ্রতম নাগরিকদের পেটে লাথি মেরে অর্জিত হতে পারে না।

বুলডোজার দিয়ে যখন একটি হকারের অস্থায়ী দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন কেবল কিছু বাঁশ, প্লাস্টিক বা কাঠ ধ্বংস হয় না; তার সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের অন্তত তিন প্রজন্মের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা। ফুটপাথ যদি পথচারীর অধিকার হয়, তবে জীবনধারণের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)। একটি অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি অধিকারকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলার এই সংস্কৃতি কোনও সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

হকার অর্থনীতি: এক অদৃশ্য স্তম্ভ

হকারদের শুধু ‘জবরদখলকারী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে নগরের অর্থনীতিতে তাদের অবদান কতটা গভীর:

১) হকাররা শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে অত্যন্ত সস্তা দরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেন। শপিং মলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে যে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, ফুটপাথে তা-ই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে;

২) রাষ্ট্র যেখানে কোটি কোটি যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেখানে হকাররা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তারা রাষ্ট্রের ওপর বোঝা না হয়ে, উলটে স্বনির্ভরতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন;

৩) পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনে খুচরো বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখেন।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, হকাররা হলেন শহরের ‘অর্থনৈতিক কুশলী’ (Economic Cushions)। মন্দার সময়েও তারা শহরের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেন না। এই বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রটিকে আইনি স্বীকৃতি ও পরিকাঠামো না দিয়ে বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলার চেষ্টা অর্থনৈতিক আত্মহত্যার সামিল।

২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় আইনকে বুড়ো আঙুল

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো প্রায়শই দেশের প্রচলিত আইনকে লঙ্ঘন করে চালানো হয়। ২০১৪ সালে ভারতের সংসদে অত্যন্ত প্রগতিশীল একটি আইন পাস হয়েছিল— ‘দ্য স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪’। এই আইনের মূল কথাই ছিল:

ক) প্রতিটি পুরসভায় একটি করে টাউন ভেন্ডিং কমিটি (TVC) থাকবে, যেখানে হকারদের নিজেদের প্রতিনিধি থাকবে;

খ) প্রথমে শহরের সমস্ত হকারের সমীক্ষা করতে হবে এবং তাদের পরিচয়পত্র ও ভেন্ডিং সার্টিফিকেট দিতে হবে;

গ) কোনও হকারকে উপযুক্ত বিকল্প জায়গা না দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে না।

আইনের এই স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও ভারতের অধিকাংশ রাজ্য ও পুরসভা এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। কোনও নোটিশ না দিয়ে, কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করে, রাতারাতি পুলিশ ও বুলডোজার নামিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এটি কেবল অমানবিক নয়, সরাসরি দেশের আইনের অবমাননা এবং বিচারব্যবস্থার সমান্তরালে এক স্বৈরাচারী প্রশাসনিক সংস্কৃতি। দেশের শীর্ষ আদালতও এ বিষয়ে কড়া মনোভাব দেখিয়েছে ও নিন্দা করেছে।

বুলডোজার সংস্কৃতির মনস্তত্ত্ব 

বুলডোজার সংস্কৃতি আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এটি জটিল সামাজিক সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে না। এটি বিশ্বাস করে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান ‘অ্যাকশন’এ। যখন কোনও প্রশাসন হকার পুনর্বাসনের মতো জটিল নীতি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বুলডোজার নামিয়ে নিজেদের 'তৎপরতা’ প্রমাণ করতে চায়। এই সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের মধ্যেও এক ধরনের বিকৃত আনন্দ বা ‘স্যাডিজম’ তৈরি করে। তারা ভাবে, শহর রাতারাতি ‘পরিষ্কার’ হয়ে গেল। কিন্তু তারা ভুলে যায়, যে হকারটি আজ উচ্ছেদ হল কাল সে পেটের টানে চুরির পথ বেছে নিতে পারে, বা তার সন্তান শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অপরাধের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। 

বুলডোজার ফুটপাথ পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য বা ক্ষোভকে উপড়ে ফেলতে পারে না; বরং তা সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়।

সমাধানের চার দফা পথ

আমরা কি তবে ফুটপাথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখার পক্ষে সওয়াল করছি? একেবারেই নয়। বিশৃঙ্খলা কোনও সুস্থ শহরের লক্ষণ হতে পারে না। কিন্তু সমাধানের পথ ‘উচ্ছেদ’ নয়, সমাধানের পথ ‘নিয়ন্ত্রণ ও সহাবস্থান’। একটি আধুনিক, সংবেদনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুর প্রশাসন নিম্নলিখিত চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে:

পদক্ষেপ ১) নো-ভেন্ডিং জোন চিহ্নিতকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত মোড় বা হাসপাতালের সামনে ‘হকার মুক্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করা হোক, কিন্তু তার ঠিক পাশেই নির্দিষ্ট গলি বা জায়গায় তাদের বসার অনুমতি দেওয়া হোক।

পদক্ষেপ ২) সময় ও জায়গার বণ্টন। বাস্তবায়নের উপায়: বিদেশের মতো ‘টাইম-শেয়ারিং’ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা ভোরে হকাররা বসবেন, বাকি সময় ফুটপাথ পথচারীদের জন্য সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকবে।

পদক্ষেপ ৩) পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: হকারদের প্লাস্টিকের নোংরা ছাউনির বদলে পুরসভা থেকে নির্দিষ্ট আকারের, পরিবেশবান্ধব ও সুদৃশ্য কিওস্ক (Kiosk) বানিয়ে দেওয়া হোক। এতে শহরের সৌন্দর্যও বজায় থাকবে, হকারদের রুটি ও রুজি বাঁচবে।

পদক্ষেপ ৪) ডিজিটাল নথিভুক্তকরণ। বাস্তবায়নের উপায়: প্রতিটি হকারকে কিউআর কোড যুক্ত পরিচয়পত্র দেওয়া হোক, যাতে বহিরাগত বা বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায় এবং প্রকৃত হকারদের চিহ্নিত করা সহজ হয়।

মানবিক নগরায়নের ডাক

শহর কোনও জড় বস্তু নয়। ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল আর চওড়া পিচের রাস্তাই শহরের শেষ কথা নয়। শহরের আসল পরিচয় তার মানুষের সহাবস্থানে। হকাররা বহিরাগত শত্রু নন; তারা আমাদেরই সমাজ ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন আমরা মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছি, বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশকে সামান্য দুই ফুট ফুটপাথের জন্য বুলডোজারের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে— এর চেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না।

প্রশাসনকে বুঝতে হবে, বুলডোজার দিয়ে ক্ষমতার প্রদর্শন করা সহজ, কিন্তু দূরদর্শিতা দিয়ে একটি মানবিক শহর গড়ে তোলা কঠিন। আমাদের প্রয়োজন এমন এক ‘স্মার্ট সিটি’ যা কেবল প্রযুক্তিতে উন্নত হবে না, যা হৃদয় ও মননে হবে সংবেদনশীল। হকার উচ্ছেদের এই অন্ধ ও হিংস্র ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ অবিলম্বে বন্ধ হোক। ধ্বংসের রূপক নয়, সৃষ্টি ও সহাবস্থানের জয় হোক আমাদের মহানগরে।


No comments:

Post a Comment