কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন সর্বতোভাবে সহায়ক
শুভ্রা সেন
সমাজমাধ্যম আজ আর কেবল বিনোদন বা ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা নয়। এটি ক্রমশ এমন এক শক্তিশালী পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষের কাজ, চিন্তা, সংগ্রাম ও সাফল্য একে অপরের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কেউ প্রশংসা করছে, কেউ অনুপ্রাণিত হচ্ছে, আবার কেউ নতুন করে বুঝতে পারছে আমাদের পরিচিত সীমার বাইরেও কত কিছু করা সম্ভব। এই বিস্তৃত পৌঁছনোর পেছনে প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষজনের ক্ষেত্রে।
সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সক্ষম মানুষজনকে সহানুভূতির চোখে দেখেছে, সক্ষমতার চোখে নয়। অথচ বাস্তবতা হল, উপযুক্ত সুযোগ, সহায়ক পরিবেশ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পেলে তাঁরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে অবদান রাখতে পারেন। সমস্যা তাঁদের সক্ষমতায় নয়, সমস্যা আমাদের ব্যবস্থাপনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। দুঃখের বিষয়, এইসব মানুষদের অসংখ্য অনুপ্রেরণামূলক কথা আমাদের অজানাই থেকে যায়। মূলধারার আলোচনায় খুব কমই জায়গা পায় তাঁদের সংগ্রাম, উদ্ভাবন বা সাফল্যের কথা। সমাজমাধ্যম এই শূন্যস্থানটি কিছুটা হলেও পূরণ করতে শুরু করেছে। এখানে কেউ নিজের কাজ তুলে ধরছেন, কেউ আবার অন্যের কাজ শেয়ার করছেন। ধীরে ধীরে এই গল্পগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে ।
এই প্রেক্ষাপটে রাতুল বসাকের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জন্ম থেকেই দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রযুক্তি কীভাবে অন্ধত্ব ও সুযোগের মাঝখানে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। কলকাতা ব্লাইন্ড স্কুল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পর তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং'এ ডিপ্লোমা করেন। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় কোনও ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন অন্যদের জন্য পথ তৈরি করতে।
রাতুল একটি গভীর সমস্যা উপলব্ধি করেন। অনেক দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণের কাছে কম্পিউটার শিক্ষা বা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ছিল না। অথচ বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। তিনি জানতেন, প্রযুক্তি কীভাবে তাঁর নিজের জীবন বদলে দিয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি নিজেই হবেন সেই সেতু, যা অন্ধত্ব ও সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। অসাধারণ ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি স্ক্রিন রিডার, সহায়ক সফটওয়্যার ও ডিজিটাল টুল ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেন। আজ তিনি পাঁচজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষকের একটি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একসঙ্গে তাঁরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্লাস করান এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেন। ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ৩০০'রও বেশি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছেন। অনেকের জন্য এই প্রশিক্ষণ কেবল শেখার অভিজ্ঞতা নয়; আত্মনির্ভরতার প্রথম ধাপ।
এই প্রযুক্তির মানবিক রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাতুলের সংগীতচর্চার মধ্যে দিয়ে। ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে তাঁকে দেখা যায় একজন দক্ষ তবলা বাদক ও সংগীত শিক্ষক হিসেবে। তিনি তবলার মাধ্যমে নানা বয়সের মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের, সংগীত শেখাচ্ছেন। সবচেয়ে অভিনব দিক হল, তিনি ছোটবেলায় শেখা বাংলা ছড়া ও ছন্দগুলোকে তবলার সুরে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। ‘হাট্টিমাটিম টিম’, ‘ইকির মিকির চামচিকির’, ‘খোকা যাবে শ্বশুরবাড়ি’— এই ধরনের ছড়াগুলো শুনলেই অনেকের মনে শৈশবের মিষ্টি স্মৃতি ফিরে আসে। এই ছড়া ও ছন্দ কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এগুলো ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে দুই থেকে ছয় বছর বয়সে, যখন শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুত ঘটে, তখন গল্প, ছড়া ও সুর তাদের ভাবনার বিকাশ, শব্দভাণ্ডার ও ভাষাগত দক্ষতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ আধুনিক ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে এই ধরনের লোকজ ছড়া ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক সম্পদ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। রাতুল সেই হারিয়ে যেতে বসা জায়গাটিকেই সমাজমাধ্যমে নতুন করে প্রাণ দিচ্ছেন। লক্ষণীয় বিষয়, তাঁর তবলার সুরে তৈরি এই ছড়াগুলো ব্যবহার করে অনেকেই নতুন ভিডিও বানাচ্ছেন। মানুষ সেগুলো পছন্দ করছে, শেয়ার করছে। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন— বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষার ভাণ্ডারে এমন বিপুল সম্পদ রয়েছে, যা ভাষা শিক্ষা ও শিশুদের প্রাথমিক বিকাশে অত্যন্ত উপযোগী। বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা যায়, ছড়া ও সংগীতের মাধ্যমে শিক্ষা শিশুদের জন্য সহজ, আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
রাতুলের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি শুধু কর্মসংস্থানের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও শিক্ষার বাহনও হতে পারে। একজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী মানুষ যখন নিজে প্রশিক্ষক হন, সংগীত শিক্ষক হন, কনটেন্ট নির্মাতা হন, তখন তিনি কেবল নিজের জীবন বদলান না, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে প্রতিবন্ধকতা কোনও করুণা পাওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ভিন্নভাবে সক্ষম হওয়ার একটি বাস্তবতা।
সমাজমাধ্যম যদি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এই ধরনের গল্প আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। তখন হয়তো আরও কেউ অনুপ্রাণিত হবেন, আরও কেউ প্রযুক্তি শেখার সাহস পাবেন, আবার কেউ নীতি নির্ধারণের জায়গায় বসে ভাববেন, কীভাবে এই উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করা যায়।
প্রযুক্তি কেবল তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; প্রযুক্তি/ tech architecture কীভাবে করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কারা তা ব্যবহার করতে পারছেন— সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার তৈরি করেন, তাঁদের ব্যবহারযোগ্যতা ও সুগমতাকে প্রযুক্তিগত স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা জরুরি। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, তখন প্রশ্ন ওঠে— এই ব্যবস্থাপনাগুলি কি দৃষ্টিহীন, শ্রবণ-প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষিত হচ্ছে? নাকি সেগুলো অজান্তেই নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে? আমার মনে হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি প্রতিবন্ধকতাকে আরও কার্যকরভাবে দূর করার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। স্ক্রিন রিডার, ভয়েস-টু-টেক্সট, টেক্সট-টু-স্পিচ, স্বয়ংক্রিয় সাবটাইটেল, ভাষান্তর কিংবা ব্যক্তিগত সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে দৃষ্টিগত, শ্রবণগত, শারীরিক ও শেখার সীমাবদ্ধতাকে অনেকাংশে অতিক্রম করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি নিজে থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে না, তাকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হয়। এই কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি AI কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, ভাষা বা সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে শেখে, তবে সেটি অজান্তেই অন্যদের বাদ দিয়ে দেয়। তাই প্রয়োজন এমনভাবে AI'কে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা, ভাষা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা তার শেখার অংশ হয়। তবেই এই প্রযুক্তি প্রত্যেক মানুষের জন্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারবে।
একই সঙ্গে, আমরা যারা এই ধরনের ডিজিটাল ও সমাজমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি, আমাদের প্রত্যেকেরই ভূমিকা রয়েছে। সুগম বিষয়বস্তু তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তির নৈতিক ও মানবিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া— এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সীমাহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে মানবকল্যাণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
রাতুল বসাকের মতো মানুষেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন, অন্ধকার কখনও উদ্দেশ্যকে ম্লান করতে পারে না। আসল দৃষ্টি চোখে নয়, মননে। আর যখন প্রযুক্তি, সহমর্মিতা ও সুযোগ একসঙ্গে কাজ করে, তখন সীমাবদ্ধতাও সম্ভাবনায় রূপ নেয়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার পথে এই গল্পগুলো শুধু অনুপ্রেরণা নয়, পথনির্দেশ।
নিচে রাতুল বসাকের নিজস্ব ইউটিউব পেজের লিংক দেওয়া হল। সেখানে তাঁর কাজ, প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল উদ্যোগের ঝলক পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে তাঁর সঙ্গে কথা বলে একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকার আপনাদের সামনে তুলে ধরার প্রত্যাশা রাখছি।
https://www.youtube.com/watch?v=YVyrgf2uzJ8









