Saturday, 9 May 2026

এবারের ২৫ বৈশাখ

'তাসের দেশ' ও সেই পদযাত্রা

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'তাসের দেশ' লিখেছিলেন। উৎসর্গ করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। শতবর্ষ পানে অগ্রসরমান এই নৃত্যনাট্যটি এবারের ২৫ বৈশাখে তাসের দল'কে মনে করাতে পারে। 

২০১২ সালের ২৫ বৈশাখের আশপাশে 'একক মাত্রা' একটি অনবদ্য সংখ্যা প্রকাশ করেছিল যার প্রচ্ছদ বিষয় ছিল 'অন্য রবীন্দ্রনাথ'। বৈচিত্র্য ও গভীরতার গুণে সেই সংখ্যার এত কদর হয়েছিল যে তার আর অবশিষ্ট কপি পড়ে নেই। সেবার ছিল কবিগুরুর সার্ধশতবর্ষ কাল।

তিনি এইভাবেই বারে বারে ফিরে আসেন।

এবারের ২৫ বৈশাখ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বাংলা ৩০ আশ্বিন, ১৩১২) দিনটিকেও মনে করাতে পারে। কারণ, বাংলার অগুনতি মানুষ আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩, ৯ মে ২০২৬) ১৬ অক্টোবর দিনটিকে স্মরণ করে আবারও হাঁটার প্রস্তুতি নিয়েছেন সেই পথ ধরে যে পথে তিনি গঙ্গার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো ছুঁয়ে পৌঁছেছিলেন নাখোদা মসজিদ অবধি। তাঁর অপার কর্মসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ তো ব্যাপ্ত ও সর্বজনীন; মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার সমস্ত আবেদনেই তিনি আছেন। ১৬ অক্টোবর (১৯০৫) ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিন। সেই দিনটিকে তিনি এক অনন্য প্রতিবাদী রূপ দেন। ডাক দেন 'অরন্ধন' ও 'রাখিবন্ধন' উৎসব পালনের। সেদিন ঘরে ঘরে উনুন জ্বলবে না এবং একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে এই বার্তা দেওয়া হবে যে, ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশ ভাগ করলেও বাঙালির হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করতে পারবে না।

সেদিন ভোরে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাবেশ গঙ্গার জগন্নাথ ঘাটে (মতান্তরে, বাগবাজার বা সংলগ্ন কোনও ঘাট) সমবেত হয়। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল গঙ্গাস্নানের মধ্য দিয়ে। সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল উক্ত ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে। স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে রবীন্দ্রনাথ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। যখন মিছিল শুরু করেন, তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারণ ধুতি, গায়ে চাদর এবং পায়ে কোনও জুতো ছিল না। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তাঁরই রচিত সেই কালজয়ী গান: 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।'

মিছিল উত্তর কলকাতার বিভিন্ন গলি ও প্রধান রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে সামনে হেঁটে একেকজন পথচারী, রিকশাচালক এবং সাধারণ মানুষের হাতে রাখি বেঁধে দিচ্ছিলেন। কোনও ভেদাভেদ নেই, সবার লক্ষ্য একটাই, অখণ্ড বাংলা। মিছিল চিৎপুর রোড হয়ে নাখোদা মসজিদের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাপথের সবচেয়ে আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল যখন মিছিলটি চিৎপুর রোডের নাখোদা মসজিদের সামনে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন চিত্তে মসজিদের ভেতরে এবং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম মৌলবি ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের দিকে এগিয়ে যান। প্রথা ভেঙে তাঁদের কবজিতে রাখি বেঁধে দেন। এই অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মিছিল যখন এগোচ্ছিল, তখন কেবল পুরুষরাই নন, বাড়ির অন্দরমহল থেকে মহিলারাও জানলা ও বারান্দা দিয়ে উলুধ্বনি দিচ্ছিলেন এবং শাঁখ বাজাচ্ছিলেন। অনেকেই রাস্তার ওপর নেমে এসে মিছিলে যোগদান করেন। জনশ্রুতি আছে, স্বদেশি তহবিলের জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের যথাসর্বস্ব দান করছিলেন। এমনকি রাস্তার ধারের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— যারা হয়তো জানতেনও না যে রবীন্দ্রনাথ কে— তাঁরাও কবির বাড়িয়ে দেওয়া হাতের রাখি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন। মিছিলটি যখন একটি আস্তাবলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে কর্মরত সহিসদের দেখে রবীন্দ্রনাথ থমকে দাঁড়ান, নিজ হাতে তাদের হাতেও রাখি বেঁধে দেন।

পদযাত্রার শেষে সেই উত্তাল জনসমুদ্র এসে জমায়েত হয় আপার সার্কুলার রোডে (বর্তমান আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) অবস্থিত ফেডারেশন হল প্রাঙ্গণে। সেখানে আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্বে এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আনন্দমোহন বসু উপস্থিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ 'বিজয় সম্মিলনী'র গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং বাংলার অখণ্ডতার শপথ নেন। তিনি তো কেবল নিভৃতচারী কবি নন, বরং জাতির দুর্দিনে একজন দক্ষ সেনাপতি ও পথপ্রদর্শক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেদিন পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, সেদিন মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা এবং ঐক্য তিনি দেখেছিলেন, তা কলকাতার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। সমগ্র শহরটি যেন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিল।

আজ (২৫ বৈশাখ ১৪৩৩) আবারও সেই একই পথ ধরে হাঁটবেন শয়ে শয়ে মানুষ। তেমনই ভেবেছেন ও প্রস্তুতিও নিয়েছেন। অন্তত ১২০ বছর পর। হয়তো গাইবেন 'বাংলার মাটি বাংলার জল...'। 



 


2 comments:

  1. খুবই প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়ের ওপর অনিন্দ্য আলোকপাত করলো।সঙ্গে আছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইতিহাস।তাসের দেশ হল সমাজ রাষ্ট্র আর যাপনেরও এক আলো-হাওয়া- হীন অন্ধকার প্রকোষ্ঠ যেখানে আছে শুধু নিয়মতান্ত্রিকতার রূদ্ধশ্বাস না মরে বেঁচে থাকা। " চল নিয়মমতো " চিডেতন হর্তন ইস্কাবন " দিয়ে সাজানো মুমূর্ষু জীবন থেকে কবি ও গীতিনাট্যকার মুক্তির সন্ধান দিলেন___ "যাবোই আমি যাবোই , বাণিজ্যেতে যাবোই __নীলের কোলের শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা।শৈলচূডায নীড বেঁধেছে সাগরবিহঙ্গেরা।" অনিন্দ্য যে ইতিহাস তুলে ধরেছে তা চিরস্মরণীয়।আর প্রাসঙ্গিকও।তাই অভিনন্দন জানাই এই বহুমুখী লেখককে।

    ReplyDelete
  2. প্রাসঙ্গিক লেখা ভালো লাগলো।

    ReplyDelete