Tuesday, 14 April 2026

ষোড়শ অর্থ কমিশনের বৈষম্য!

কেন্দ্রের হাতেই অধিক ক্ষমতা?

রাজীব ভট্টাচার্য



১৯৫১ সালে অর্থ কমিশনের শুরু থেকে সংবিধান স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন ও ব্যয়ভার নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে বিভাজন, তা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেয়ারম্যান ডঃ অরবিন্দ পানাগড়িয়ার নেতৃত্বে গঠিত ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পার্লামেন্টে পেশ করা হয়। এই রিপোর্টের সুপারিশগুলি পাঁচ বছরের (২০২৬-৩১) জন্য ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে লাগু হল। ভারতীয় সংবিধানে রাজস্ব ক্ষমতার বিভাজন বলতে ত্রিস্তরীয় কাঠামোতে (কেন্দ্র, রাজ্য ও স্থানীয়) সরকারের কর ধার্য করা, ব্যয়ভার ও তহবিল বরাদ্দের বন্টনকে বোঝানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে আর্থিক, রাজস্ব ও ব্যয় বন্টনের সাংবিধানিক বিভাজনকে রাজস্ব যুক্তরাষ্ট্রীয়তা (Fiscal Federalism) বলে। 

ভারতবর্ষে রাজস্বের সাংবিধানিক বিভাজনে অপেক্ষাকৃত উচ্চ প্লবমান (bouyant) রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, ব্যক্তিগত আয়কর, কোম্পানি বা কর্পোরেট কর ও বহিঃ শুল্ক) রয়েছে কেন্দ্রের হাতে, অথচ, রাজ্যগুলির হাতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত নিম্ন প্লবমান রাজস্বের উৎসগুলি (যেমন, দ্রব্য কর, ভূমি রাজস্ব, পেট্রো পণ্য বিক্রয়লব্ধ কর এবং অ্যালকোহল যুক্ত পানীয়র উপর কর)। এছাড়া রাজ্যগুলির উপরে রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে (যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি) ব্যয়ভারের বাধ্যবাধকতা। এই ধরনের বিভাজন আসলে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে  উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার (vertical fiscal imbalance) জন্ম দেয়। এই ভারসাম্যহীনতা মূলত তিনটি উপায়ে দূর করা যেতে পারে: (ক) কিছু উচ্চ প্লবমান করের উৎস কেন্দ্রের থেকে রাজ্যের হাতে স্থানান্তরিত করা; (খ) রাজ্যের উপর থেকে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যয়ভার লাঘব করা ও (গ) সাংবিধানিক পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত কিছু কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেন্দ্র থেকে রাজ্যে হস্তান্তরিত করা। এগুলির মধ্যে তৃতীয়টি হল সর্বাপেক্ষা যুক্তিগ্রাহ্য পদ্ধতি। ভারতবর্ষে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংবিধানের ২৮০ ধারায় অর্থ কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। এই কমিশন মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে তাদের সুপারিশ দেয়:

(ক) কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্বের বিভাজন এবং রাজ্যগুলির নিজেদের মধ্যে রাজস্বের অংশ বিভাজন;

(খ) সাহায্য অনুদান (grant-in-aid) নীতি নির্ধারণ করা; 

(গ) গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে অতিরিক্ত সম্পদ প্রদানের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের সুপারিশগুলিকে পর্যালোচনা করা ও তার যথোপযুক্ত অনুমোদন দেওয়া; 

(ঘ) পৌরসভাগুলিকে অতিরিক্ত অর্থ সাহায্যের উদ্দেশ্যে রাজ্য অর্থ কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলির সঠিক বাস্তবায়ন করা; 

(ঙ) অন্যান্য কোনও বিষয় যেটি সুস্থ ও মজবুত অর্থায়নের ব্যাপারে জরুরি, তার রূপায়ণ করা।

পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের মতোই ষোড়শ অর্থ কমিশনও রাজ্যগুলির জন্য ৪১ শতাংশ শেয়ার (করের ৪০ শতাংশ এবং কর ছাড়ের ১ শতাংশ) ভাগের উল্লম্ব বিভাজন বহাল রেখেছে, যদিও অনেক রাজ্যের তরফেই নিট আয়ের (net proceeds) ৫০ শতাংশ শেয়ার চাওয়া হয়েছিল। উল্লম্ব রাজস্ব ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে তিনটি মূল বিষয় ষোড়শ অর্থ কমিশনের সামনে বিচার্য ছিল: 

(ক) সারচার্জ ও সেস্'এর ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি সত্ত্বেও মোট রাজস্ব আয়ের কম শতাংশ হস্তান্তরিত হওয়া; 

(খ) কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা করে (GST) আধাআধি বন্টনের ফলে মূল্য সংযোজন করের (value-added tax) জমানা (যেখানে রাজ্যের অংশ ছিল ১৪.৫ শতাংশ) থেকে পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) আমলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশ;

(গ) বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত পরিকল্পনায় (central government sponsored scheme) রাজ্যের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। 

রাজ্যগুলির মধ্যে কেন্দ্রীয় রাজস্ব সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য অর্থ কমিশন নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড বিভিন্ন আনুপাতিক গুরুত্ব সমেত স্থির করে দিয়েছে। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল মাথাপিছু আয়ের দূরত্ব (সহজ কথায়, একটি অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের সাথে সর্বাপেক্ষা বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের অথবা প্রথম তিনটি সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের গড়ের মধ্যে দূরত্ব)। রাজ্যগুলির মধ্যে সমতা বজায় রাখতে মাথাপিছু আয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলিকে বেশি পরিমাণ রাজস্ব বন্টনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল জনসংখ্যা, যে ক্ষেত্রে রাজস্ব বন্টনের সময় একটি রাজ্যের মোট জনসংখ্যায় (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) তার অংশ কত সেটি বিচার করা হয়। তৃতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয়টি, জনসংখ্যার বিবর্তনের কর্মক্ষমতা (demographic performance)। ষোড়শ অর্থ কমিশন এই জনসংখ্যা বিবর্তনের পরিমাপের ক্ষেত্রে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সংজ্ঞার পরিবর্তন করেছে। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোট প্রজনন হারকে (total fertility rate) সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ষোড়শ অর্থ কমিশন এই সূচকটিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, মোট প্রজনন হারের পরিবর্তে। চতুর্থ যে বিষয়টি ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে গুরুত্ব পেয়েছে তা হল রাজ্যের মোট বনাঞ্চলের শেয়ার এবং ২০১৫ থেকে ২০২৩'এর মধ্যে বন এলাকার প্রসার। পঞ্চম যে বিষয়টি এই কমিশনের রিপোর্টে প্রথম চালু করা হয়েছে তা হল, জাতীয় জিডিপি'তে রাজ্যের অংশ। রাজ্যগুলির মধ্যে অনুভূমিক রাজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখতে দুটি মূল বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই দুটি বিষয় হল জনসংখ্যা এবং রাজস্ব ক্ষমতা (যা পরিমাপ করা হয় রাজ্যের মাথাপিছু আয় দ্বারা)। অর্থাৎ, রাজ্যগুলির মধ্যে সাম্য বজায় রেখে রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে দুটি মূল বিষয় হল জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয় দূরত্ব। ষোড়শ অর্থ কমিশনে এই দুটি সাম্য নির্ধারণকারী বিষয়ের উপর যে গুরুত্ব তা হল ৬০ শতাংশ, যা পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সমান হলেও তার পূর্ববর্তী কমিশনগুলির তুলনায় অনেকটাই কম। 

রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার যে তত্ত্ব (মাথাপিছু আয়ের সাথে রাজস্ব প্রাপ্তির যে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক, অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যের মোট রাজস্বের বেশি অংশ প্রাপ্ত হওয়া) সাধারণভাবে পেশ করা হয় তা বর্তমান অর্থ কমিশনের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলা যেতে পারে। একটু বিশদে তথ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, রাজস্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির লাভ হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম মাথাপিছু আয়ের রাজ্যগুলির তুলনামূলকভাবে ক্ষতি হয়েছে। এই তথ্য রাজস্ব বন্টনের প্রগতিশীলতার তত্ত্বের বিপরীত। 

এই ষোড়শ অর্থ কমিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল পূর্ববর্তী অর্থ কমিশনের সুপারিশের তুলনায় সাহায্য অনুদান নীতির (grant-in-aid) পরিবর্তন। এই কমিশন ৯. ৪৭ লক্ষ কোটি টাকা ৫ বছরের জন্য সাহায্য অনুদান খাতে প্রদান করেছে। এই অনুদানের দুটি অংশ: (ক) প্রথমটি শহর ও গ্রামের স্থানীয় সংস্থাগুলির জন্য ও (খ) দ্বিতীয় অংশটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের জন্য। কিন্তু পঞ্চদশ অর্থ কমিশনে যে তিনটি অনুদানের উল্লেখ আছে-- রাজস্ব ঘাটতি অনুদান, ক্ষেত্র নির্দিষ্ট অনুদান ও রাজ্য নির্দিষ্ট অনুদান-- সব কটি বর্তমান অর্থ কমিশনের রিপোর্টে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ কথায় বলতে গেলে, এই সাহায্য অনুদান সেই সমস্ত রাজ্যগুলিকে প্রয়োজনে প্রদান করা হত যেগুলি রাজস্ব হস্তান্তর পরবর্তী সময় রেভিনিউ ঘাটতি সমস্যায় জর্জরিত। সংবিধানের ২৭৫(১) ধারা অনুযায়ী, রাজ্য কমিশনের সুপারিশক্রমে পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপালিটিগুলিকে প্রয়োজনে সাহায্য অনুদান প্রদান করা হত। বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে এই ধারাটি রদ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই সুপারিশ কি সংবিধানের আদেশপত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?

বর্তমান কমিশন যথাক্রমে ৪.৪ লক্ষ এবং ৩.৬ লক্ষ কোটি টাকা শহর ও গ্রাম কেন্দ্রিক স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদান বরাদ্দ করেছে। এই অনুদানগুলি প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত: মৌলিক (৮০ শতাংশ) ও কর্মক্ষমতাভিত্তিক (২০ শতাংশ)। এই মৌলিক অনুদানের আবার দুটি অংশ- একটি বদ্ধ (৫০ শতাংশ) অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের (যেমন জীবাণুমুক্তকরণ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প) সাথে যুক্ত আর বাকিটি (৫০ শতাংশ) হল উন্মুক্ত, অর্থাৎ, এই অংশটি কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের সাথে যুক্ত নয়। স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে অনুদানের শর্তাবলীতে দুটি পরিবর্তন হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার দুটি পরিস্থিতিতে এই অনুদান বন্ধ করতে পারে: (ক) যদি ৭৫ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত তাদের রেভিনিউ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে অক্ষম হয় এবং (খ) যদি কোনও রাজ্য অর্থ হস্তান্তর নির্ণায়ক মানদণ্ড পূর্ণ করতে সক্ষম না হয়।

ষোড়শ অর্থ কমিশন রাজস্ব ঘাটতির তত্ত্ব স্বীকার করে নিয়েছে এবং তাই রাজ্যগুলির কাছে শূন্য রেভিনিউ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা রাখেনি, যা সংশোধিত রাজস্ব দায়িত্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনার (Fiscal Responsibility and Budget Management, FRBM) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সর্বোপরি বলা চলে যে, এই অর্থ কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আশার আলো প্রদান করলেও তা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন মারফত উল্লম্ব ও অনুভূমিক বৈষম্য কতটা দূর করতে পারবে, এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত।

                                                                   

No comments:

Post a Comment