Wednesday, 28 January 2026

ইউজিসি বিল ২০২৬: ধর্মান্ধতার সংকট

হিন্দুত্বের রসায়ন বনাম জাতপাতের রূঢ় বাস্তব

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



ইউজিসি প্রণীত 'ইক্যুইটি রেগুলেশনস ২০২৬' বা তথাকথিত 'ইউজিসি বিল ২০২৬' হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। উত্তর ভারতের রাজপথ, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির ছাত্র বিক্ষোভ আজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিজেপি যে 'হিন্দুত্ববাদী ঐক্যের' তাসের ঘর তৈরি করেছিল তা জাতপাতের রূঢ় বাস্তবতার সামনে ধসে পড়ার মুখে। এটি এখন বিজেপির জন্য এক স্বখাত সলিলে মরণফাঁদ।

ঐতিহাসিকভাবে বিজেপিকে 'ব্রাহ্মণ-বানিয়া' বা উচ্চবর্ণের দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথাপি, গত এক দশকে মোদী-শাহের নেতৃত্বে বিজেপি অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে এই উচ্চবর্ণের ভিত্তির কোলে দলিত ও ওবিসি ভোটব্যাঙ্ককে এনে ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু ইউজিসি-র নতুন নির্দেশিকা সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সম্ভবত লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির জন্য একতরফা সুরক্ষাকবচ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির যে বিধান এই বিলে রাখা হয়েছে, তাকে উচ্চবর্ণের ছাত্ররা দেখছেন তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। উত্তরপ্রদেশ জুড়ে উচ্চবর্ণের ছাত্রদের তীব্র বিক্ষোভ ও সাবর্ণ নেতাদের রোষ প্রমাণ করছে যে, বিজেপি নিজের প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে নিজেই আজ বন্দি। দলিত ভোট টানার টোপ দিতে গিয়ে তারা এখন নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর উচ্চবর্ণের সমর্থন হারাতে বসেছে।

বিজেপির বর্তমান দশা এখন আক্ষরিক অর্থেই 'শ্যাম রাখি না কুল রাখি'। একদিকে তারা যদি এই বিল কার্যকর করে, তবে উচ্চবর্ণের বিশাল একটি অংশ যারা তাদের দীর্ঘদিনের অটুট ভোটব্যাঙ্ক, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঝুঁকি নেওয়া বিজেপির পক্ষে আত্মঘাতী। অন্যদিকে, যদি বিক্ষোভের চাপে পড়ে কেন্দ্র এই বিল প্রত্যাহার বা সংশোধন করে, তবে সমাজবাদী পার্টি বা কংগ্রেসের মতো বিরোধীরা একে 'দলিত-ওবিসি বিরোধী মানসিকতা' হিসেবে প্রচার করবে। ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে বিজেপি এমন এক গোলকধাঁধায় ঢুকেছে, যেখানে যে কোনও এক পক্ষকে তুষ্ট করা মানেই অন্য পক্ষকে হারানো। এই মেরুকরণ কেবল বাইরে নয়, দলের অন্দরেও প্রবল কম্পন সৃষ্টি করেছে।

বিজেপির এই সংকটে ঘি ঢেলেছেন ধর্মীয় নেতৃত্বের একাংশ। বিশেষ করে জ্যোতিষপীঠের শঙ্করাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীকে নিয়ে বিজেপি আজ গভীর সমস্যায় নিমজ্জিত। মাঘ মেলায় তাঁর স্নানযাত্রাকে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের বাধাদান ও তাঁর শিষ্যদের টিকি ধরে পুলিশের টান দেওয়ার প্রতিবাদে শঙ্করাচার্য টানা ধর্নায় বসে পড়েছেন। তাঁর সমর্থনে সাধু-সন্ত মহলে তু্মুল আলোড়ন উঠেছে শুধু নয়, লক্ষ্ণৌ শহরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট পদত্যাগ পর্যন্ত করেছেন। ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার করতে চেয়েছিল, আজ সেই ধর্মেরই শীর্ষস্থানীয় নেতারা যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ব্র্যান্ড বড়সড় ধাক্কা খায়। এটি প্রমাণ করে যে, স্রেফ মন্দির দিয়ে পেটের ক্ষুধা বা সামাজিক মর্যাদার লড়াই মেটানো যায় না।

কেন এই উভয় সংকট? আসলে, হিন্দু ধর্ম যে ভেতর থেকেই গভীর এক বিভাজিত ব্যবস্থা এবং এর অভ্যন্তরেই হাজার বছরের তীব্র বিদ্বেষমূলক দ্বৈরথ বিদ্যমান— তাকে আড়াল করে বিজেপি ও আরএসএস মিথ্যা ন্যারেটিভের আশ্রয়ে এক কৃত্রিম হিন্দু অস্মিতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের যে প্রয়াস নিয়েছিল তার সঙ্গে ধর্মের যোগ নয়, ছিল রাজনৈতিক ব্যভিচারের সমস্ত অনৈতিক ভাব ও প্রক্রিয়া। তাদের 'হিন্দুত্ববাদ' আসলে এক আরোপিত প্রলেপ, যা দিয়ে তারা জাতিভেদ প্রথার ক্ষতে মলম লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু ইউজিসি বিলকে কেন্দ্র করে উচ্চবর্ণ বনাম নিম্নবর্ণের যে সংঘাত আজ রাস্তায় নেমে এসেছে, তা প্রমাণ করে যে 'হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি' আসলে এক 'প্রহেলিকাময় আত্মহনন'। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় মেরুকরণ করে হিন্দু সমাজের আভ্যন্তরীণ তীব্র সামাজিক বৈষম্যের আদিম ক্ষতকে ঢাকা দেওয়া সম্ভব নয়। বিজেপির বর্তমান অন্তর্দ্বন্দ্ব আসলে সেই রাজনৈতিক দৈন্যদশারই বহিঃপ্রকাশ। দলিতকে আপন করার ভেক ধরা আর উচ্চবর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা— এই দুই বিপরীত মেরুকে এক করার যে অবাস্তব স্বপ্ন বিজেপি ফেরি করে, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ইতিমধ্যেই ইউজিসি-র এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনি ব্যাখ্যা এই বিলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আবেদনকারীদের প্রধান যুক্তি হল, সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সমতার অধিকার) অনুযায়ী সুরক্ষা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু ইউজিসি বিলের ৫.৩ এবং ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী সুরক্ষা কেবল সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করে যে এই বিল 'রিভার্স ডিসক্রিমিনেশন' বা বিপরীত বৈষম্য তৈরি করছে, তবে পুরো বিলটিই বাতিল হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, 'বৈষম্য' শব্দের সংজ্ঞা এতই অস্পষ্ট যে এটি যে কোনও নির্দোষ ছাত্রকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারে। আইনি এই জটিলতা বিজেপি সরকারকে এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে তারা না পারছে বিলটি পুরোপুরি সমর্থন করতে, না পারছে এর আইনি ভিত্তিকে রক্ষা করতে।

উত্তরপ্রদেশের লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রয়াগরাজ এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উচ্চবর্ণের ছাত্ররা কেবল বিক্ষোভ মিছিল নয়, বরং বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোর সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, 'আমরা বিজেপির সমর্থক ছিলাম, কিন্তু আমাদের পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।' লক্ষ্ণৌ ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিজেপির অন্তত ২০ জন জেলা পর্যায়ের নেতা গত এক সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হাইকম্যান্ড ছাত্র সমাজের ক্ষোভ বুঝতে ব্যর্থ। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনা বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ছাত্ররা এখন বিজেপির বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খোঁজার কথা বলছে, যা বিজেপির জন্য অশনি সংকেত। কানপুর, বেনারস, জৌনপুর, দেওরিয়া ও প্রতাপগড়ে 'সাবর্ণ সেনা' ও 'করনি সেনা'র মতো উচ্চবর্ণীয় বাহুবলীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে। মিরাট ও সাহরানপুরেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির নর্থ ক্যাম্পাস ও ইউজিসি'র সদর দফতরের সামনে ছাত্র বিক্ষোভে ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। দলের ভেতরেই যখন 'আমাদের সরকার আমাদের বিরুদ্ধেই আইন করছে'— এই সুর চড়তে শুরু করে তখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী কাঠামোর পতন শুরু হয়েছে। সাংসদ ও বিধায়করাও এখন জনগণের ক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হিন্দুত্বের দ্বন্দ্বমুখর এই হানাহানিই সম্ভবত বিজেপি রাজনীতির একাধিপত্যের ইতি ঘটানোর পথে প্রধান অনুঘটক হবে। ধর্মের কৃত্রিম বন্ধন দিয়ে মানুষের পেটের লড়াই বা সামাজিক মর্যাদার সংঘাতকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এই রূঢ় বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ ধর্মের সংকীর্ণতায় নেই, আছে আধুনিক গণতান্ত্রিক মননের বিকাশে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রলম্বিত সংরক্ষণকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি করা কিংবা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অন্ধ বিরোধিতা করা— দুটোই সমাজের জন্য সমান ঘাতক। প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার কেবল তখনই সম্ভব যখন জাতপাত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আধুনিক গণতান্ত্রিক চৈতন্যের উদয় হবে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে ফানুস বিজেপি উড়িয়েছিল, তা আজ জাতপাতের কাঁটায় বিদীর্ণ।

শ্রমের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সামাজিক মুক্তি প্রাপ্তব্য; ধর্মের জগাখিচুড়ি রাজনীতির মাধ্যমে নয়। বিজেপির বর্তমান দৈন্যদশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে রাজনীতি বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তা শেষ পর্যন্ত নিজেই খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশের রাজপথ থেকে সুপ্রিম কোর্টের এজলাস পর্যন্ত আজ সেই সত্যই ধ্বনিত হচ্ছে— ইউজিসি বিল ২০২৬ বিজেপির জন্য কোনও উপহার নয়, বরং এক ঐতিহাসিক পতনের শুরুর সংকেত।


Sunday, 25 January 2026

কিশোরী গর্ভাবস্থা থেকে মুক্তি...

সুস্থ সমর্থ পূর্ণাঙ্গ নারী দেশের সম্পদ

শুক্তিসিতা



আপনি কি জানেন, এই বাংলারই কোনও কোনও জেলায় ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৪০ জন মেয়েরই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছরের নিচে? এ বিষয়ে প্রথমেই দায়ী হন তার পরিবার, যাঁরা মনে করেন ‘আপদ বিদায়’ হল; নইলে বেশি পণ দিতে হবে, পড়াতে হবে, খাওয়াতে হবে। মা-বাবাকে ‘বয়সকালে দেখবে তো বাড়ির ছেলেই’। তবে? আচ্ছা, শিক্ষক-শিক্ষিকারা দায়ী নন? ওঁরা কি বোঝাতে পারেননি মেয়েটি পড়তে পারে? মেয়েটিও বড় হবে? রোজগার করবে? মেয়েটির জীবনে নিজস্ব কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, আনন্দ আছে। আর বিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ আর পঞ্চায়েত? স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এমনকি তার বান্ধবীরাও?

বিয়ের পর কী? অনিবার্য মাতৃত্ব। ভাবুন তো, এক ১৪ বা ১৫ বছরের মেয়ে মা হয়ে যাচ্ছে। অথচ তার শরীর এখনও গঠিত নয়। ফলে, অনিবার্য মাতৃত্ব সঙ্গে নিয়ে আসে অনিবার্য নানা বিপদও। সাধারণত নিরক্ষর বা স্বল্প স্বাক্ষর গরিব ঘরের মেয়েদেরই এই বিপদটি বেশি। তারা স্বাভাবিকভাবেই অপুষ্ট, অ্যানিমিয়াগ্রস্ত। এই অপুষ্ট, অসুস্থ, অপ্রস্তুত মায়ের গর্ভকালও বিপন্ন।

সারা পৃথিবীতে ১৩.৫ কোটি শিশুর জন্মের মধ্যে ১ কোটি ৫০ লক্ষ শিশুর মায়ের বয়স ১৫ থেকে ১৯'এর মধ্যে। ২০ লক্ষ শিশুর মায়ের বয়স ১২ থেকে ১৫'এর মধ্যে।

লতিকাকে খুব ভোরবেলা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওর নিজের মামাতো দাদা। লতিকা বুঝতে পারেনি। বলল, চল্, চল্, একটা খুব মজার জিনিস দেখাব। ওদের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে আসার পর ওকে নিয়ে গমের ক্ষেতে ঢুকে পড়ল। লতিকার মুখ বেঁধে... খুব, খুউব, খুউব ব্যথা। লতিকার ঠ্যাং বেঁধে আলের ধারে শুইয়ে রেখেছিল ওর ওই দাদাই। ওর রক্তমাখা জামা আর অজ্ঞান শরীরটা দেখে ওদের পাড়ার বিজু মাসি লতিকার বাবা-মাকে খবর দেয়। লতিকার বয়স বারো।

সামাজিকভাবে জানা গেছে এই কিশোরীদের মধ্যে অনেকেই বিয়ের আগেই মা হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ নানাবিধ-

১) পরিবারের মধ্যে বা বাইরে ধর্ষণ;

২) নিজের ইচ্ছায়;

৩) দারিদ্র্যের জন্য পরিবারের দ্বারা বা স্বেচ্ছায় গণিকাবৃত্তি;

৪) পাচার হয়ে গিয়ে অবৈধভাবে।

এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ কারণগুলি সরাসরি আইনি সুরক্ষা ও ব্যবস্থার অনুপস্থিতির জন্য ঘটে। দ্বিতীয় কারণটিও আজকাল শহরে/গ্রামে প্রবল আকার ধারণ করছে। পরিযায়ী মা-বাবার ফেলে যাওয়া সংসার সামলায় বস্তুত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং কিশোর-প্রজন্ম। ফলে, তাদের পড়াশোনার ব্যাপারে আগ্রহ সহজেই শিথিল হয়ে পড়ে। এরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে। ক্লাসে সহায়তাও মেলে না। অথচ হাতে সুলভে মেলে মোবাইল ফোন। সেখানে বিচিত্র পর্নোগ্রাফি সহ বিভিন্ন প্রলোভনের শিকার হয় কিশোরীটি। অথচ যৌনতার পাঠ নেই; শরীরবিজ্ঞানও সে জানে না। নিজেকে রক্ষায় সে অক্ষম। গর্ভ নিরোধক'এর ব্যবহারেও সে অজ্ঞ।

বিন্নির বাবা-মা দুজনেই দু' মাস হল কেরলে চলে গেছে। ঘরে আছে ওর ঠাকুমা আর দাদু। দাদুর চোখে ছানি। ঠাকুমা হাঁটু ব্যথায় কাতরায়। বিন্নিকে সামলাতে হয় ওর ছোট ভাইকেও। এখন ঠাকুমা রোজ সকালে চিল্লায়, 'ঘরটা ঝাঁট দিলিনে বিন্নি?', 'ওরে ও মেয়ে, যা গিয়ে জল ভরে আন্।', 'আরে একটু চুলোর পানে আয় না, ভাত তো সিদ্ধ হয়ে গেল। দুটো আলু ফেলতে পারলি না?' বিন্নির ভালো লাগে না। রোজ সেই একই খাবার। আলু সেদ্ধ ভাত আর শাক ভাজা। মাছ কতদিন খায়নি। বাবা কবে টাকা পাঠাবে, তবে খাবে। বিন্নির বন্ধু টুকলি'র বাবা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। টুকলি'কে কি সুন্দর মোবাইল কিনে দিয়েছে। টুকলি বিন্নিকে রোজ বিকেলে কত ছবি দেখায়। দেখতে দেখতে একদিন ফোনই করে বসল শাকিলকে। শাকিল আর বিন্নির দেখা হতে লাগল। শাকিল কত স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখতে দেখতে বিন্নির শরীরও ভরে ওঠে। এই মাসে বিন্নির পিরিয়ড হয়নি। টুকলি ওকে ভয় দেখাল, 'তুই কি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলি?' বিন্নির মা নেই। ও কাকে বলবে? বিন্নি ওর পিসির বাড়ি গেল। 

'পিসি, তিন মাস আমার পিরিয়ড হয়নি।'

পিসি হায় হায় করে উঠল। 'ছি ছি ছি এ কী করলি বিন্নি?' 

মার সাথে কী কথা হল পিসির, বিন্নি বুঝতে পারল না। পিসি বলল, 'কাল দুপুরে আসিস।' বিন্নি এখন একটা অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে। অঝোরে রক্তপাত হয়ে চলেছে। বন্ধ হচ্ছে না। বিন্নির বয়স তেরো।

এই অকাল-গর্ভে সে দারুণভাবে শঙ্কিত, লজ্জিত ও বিপন্ন। তার পরিবারকে জানাতেই সময় চলে যায় বহু সপ্তাহ। তবুও তার পরিবার এই দুর্দশা কাটাতে বেসরকারি জায়গায় যান গর্ভপাতের উদ্দেশ্যে। এই ধরনের বেআইনি অসাধু, অবৈজ্ঞানিক গর্ভপাতের ফলাফল:

১) প্রবল রক্তপাত;

২) জরায়ুতে ঘা;

৩) যৌনাঙ্গ ও জরায়ু আহত;

৪) ফিস্টুলা;

৫) অসম্পূর্ণ গর্ভপাত, ফলে আবার অস্ত্রোপচার দরকার হয়, যার ঝুঁকিও খুব বেশি;

৬) মৃত্যু।

দীর্ঘকালীন কুফল:

১) বন্ধ্যাত্ব;

২) কোমরে ব্যথা;

৩) পরবর্তী গর্ভের সমস্যা;

৪) জরায়ুতে ক্ষত;

৫) মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি: অবসাদ, উদ্বেগ, বিষাদ, ভয়, অপরাধবোধ ও আত্মহত্যার প্রবণতা;

৬) সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক অত্যাচার, নিন্দা, পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়া।

আর কিশোরীটি যদি শেষ পর্যন্ত সন্তান প্রসব করে, তার জন্যও অপেক্ষা করে থাকে তেমনি বহু শারীরিক, সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি। প্রথমত, শিশুর ওজন খুব কম এবং শিশু-মৃত্যু [৫০ শতাংশ], দ্বিতীয়ত, মায়ের উচ্চ রক্তচাপ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঝিল্লি ছিঁড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস; মূত্রনালীর ব্যাধি, বেশি রক্তপাত হবার প্রবণতা; যৌন-ব্যাধির সংক্রমণ, হেপাটাইটিস-বি হবার প্রবল সম্ভাবনা, সময়ের আগে প্রসবের কারণে মায়ের মৃত্যুও হতে পারে।

কিশোরী-মায়ের জন্য স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে দারিদ্র্য গভীরতর হয়। মা নিজে কোনও কাজে যুক্ত হতে পারে না। কোনও দক্ষতার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারে না। ফলে, কাজের বাজারে তার দাম আরও কমে যায়। অর্থাৎ, কিশোরী-মাতৃত্বের কারণে সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার অধিকার হারায়। মা হবার পরে তার পুষ্টিরও বিশেষ হেরফের হয় না। ফলে, জীবনকে উন্নত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন রুদ্ধ হয় তার কাছে। সে আবার মা হয়। তার শরীর ও মন আরও ক্ষইতে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও সে কোনও সদর্থক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে না।

শাবানার বিয়েতে ওর বাবা জিতেই গিয়েছিলেন। বিডিও অফিসের চুক্তিকর্মী পিয়ন ওর বাবা আব্বাস। শাবানা দেখতে খুব সুন্দর বলে শহর থেকে খুব বড় ঘরের ছেলে ওকে বিয়ে করতে চাইছে। তাছাড়া দু' লক্ষ টাকাও দেবে। বাবা বলল, শাবানা! তুই আমাদের লক্ষ্মী। বিয়ের পরের মাসেই শাবানার পেটে বাচ্চা এসে গেল। শাবানা কিছু খেতে চায় না। ওর শাশুড়ি ওকে ভাল-মন্দ কিছু খেতেও দেয় না। বাচ্চাটাও হল লিকলিকে। শাবানার শরীরটাও দুর্বল। রান্নাঘরে যেতে ইচ্ছে করে না ওর। শাশুড়ি খুব খোঁটা দেয়। বরও গালি দেয়, প্রথম বাচ্চাটা মেয়ে হল, তাই। এক বছর বয়সী বাচ্চাটা। ভালো করে হাঁটতেও পারে না। শাবানা আবার গর্ভবতী। এখন শাবানার বয়স কুড়ি। ওর চারটে বাচ্চা। চারটেই মেয়ে। শ্বশুরবাড়িতে দিন রাত গালি খেতে খেতে শাবানা ঠিক করে, ও আত্মঘাতী হবে।

অথচ বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি এবং দ্রুত বিচার- সবই শিশুর প্রাপ্য। যে কিশোরীটি আধুনিক হতে গিয়ে খাওয়া কমিয়ে দেয়, অথবা বাজারে-কেনা সুস্বাদু কিন্তু চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়, তারও কি স্বাস্থ্য-শিক্ষা পাওয়ার কথা ছিল না? বড় হবার সময়ে যে প্রলোভন আসে, তাকে সামলানোর মতো সংযম ও শিক্ষা কি তার হয়েছিল? সে কি জানে 'যৌনতা' নিরাপদও হতে পারে? সেই নিরাপত্তার উপাদানগুলি কি কিশোরীটি জানত? আচ্ছা, সে যদি ভালো খেলোয়াড় হতে চায়, তাহলে তার শরীরকে আরও মজবুত ও পুষ্ট করতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা ও অভ্যাস তারও দরকার। অথবা, কিশোরীটি সংগীত শিল্পী বা চিত্রকর হতে চাইতে পারে না? ভালো ডাক্তার বা প্রযুক্তিবিদ? বিজ্ঞানী? এই সব কিছু হতে চাইলে তার বিদ্যাশিক্ষাও নির্দিষ্ট সহায়তা দাবি করে। কিশোরীটির জন্য কি এই ব্যবস্থাগুলি মজুত আছে?

পরিবারে তার জন্য সম্মান জোটে? না লাঞ্ছনা? আত্মীয়স্বজনরা দেখা হলেই বিয়ের কথা পাড়েন, না জিজ্ঞেস করেন, 'কী রে, কী সিনেমা দেখছিস আজকাল?' বান্ধবীরা কি শুধু ছেলেদের দিকে তাকাতে বলে, না বলে, 'চল না, একটা নাটক করি আমরা!' গ্রামে প্রতিবন্ধী মানুষদের শংসাপত্র বানানোর জন্য ওই যে ছেলেটি এগিয়ে এল, তাকে বিডিও সাহেব কত প্রশংসা করলেন। সেও কি পারে না? আচ্ছা, স্কুলের মাস্টারমশাইরা পড়া-না পারলে শুধু গালি দেন? না বলেন, 'এই রবিবারে সকালটা ফাঁকা রাখিস। নদীর পাড়ে কয়েকটা গাছ লাগাব। ভূগোলের একটা ক্লাসও নেব কিন্তু।'

গতকালই ঈশা খবর পেয়েছে আফরিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। কারণ, আফরিন গর্ভবতী। আফরিনের বয়স সাড়ে-তেরো। ঈশা ওকে স্কুল থেকে ফেরার পথে চকলেট খাইয়ে 'অন্বেষা ক্লিনিক'-এ নিয়ে গেল। সেখানে যিনি কাউন্সেলর মহিলা, তিনি খুব যত্ন করলেন আফরিনকে। ডাক্তার দেখালেন। ওর গর্ভের বয়স তিন মাস। গর্ভপাত শুনেই আফরিন কাঁদতে লাগল। কাউন্সেলর বললেন, ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন। এবার ঈশা বলল, 'শুধু বাবা-মা থাকলে হবে না। বিয়ে বন্ধ করতে হবে। ওর মা হওয়াও। আমাদের পাড়াতেই উপ-প্রধান থাকেন। আমি নিয়ে আসব।'

ঈশা কথা বলল ওদের স্কুলের হেড দিদিমণি শাবানা ম্যাডামের সঙ্গে। শাবানা ম্যাডাম আরও দু'জন মাস্টারমশাই, ‘প্রগতি’ সংঘের দু'জন দাদাকেও নিয়ে এলেন। রীতিমতো মিছিল। ডাক্তারবাবু বুঝিয়ে বললেন, এই অসতর্ক 'যৌনতা'র কুফলকে চাপা দেবার জন্য আরেকটা কুকাজ করবেন না। ওর বিয়ে দেবেন না! বাচ্চা হতে গিয়ে আফরিনের মৃত্যু হতে পারে। পুলক স্যার বললেন, আফরিন অঙ্কে খুব ভালো। আমি চাই ও বিজ্ঞানী হোক। বিয়ে হবে কেন? ‘প্রগতি’র দাদারা আর উপ-প্রধান তখনই শপথ নিলেন, আজ থেকেই বিভিন্ন জায়গায় কিশোরী-বিবাহের বিরুদ্ধে আর কিশোরী-মাতৃত্বের বিপদ সম্পর্কে পোস্টার লাগানো হবে।

ঈশা আজ জিতে গেল। বাড়ি ফেরার পথে বাবার সঙ্গে দেখা। আজকের গল্পটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই বাবা ওকে নিয়ে সরাসরি থানায় চললেন। ইনস্পেক্টর ঈশার খুব প্রশংসা করলেন। বললেন, 'ঈশা! তোমার মতো আরও অনেক ঈশা তৈরি করতে হবে তোমাকেই।' ঈশা উজ্জ্বল হেসে বলল, নিশ্চয়ই। ঈশার বন্ধুরা জড়ো হল ওদের বাড়িতে পরের দিন সকালবেলাতেই। আশা-পিসি এসেছেন ওদের বাড়িতে। পিসিকে বলতেই পিসি বললেন, চলো, এই গ্রামে শিগগিরই 'শিশু সুরক্ষা সমিতি'টা আবার জমিয়ে গড়ে তুলি!

আমাদের সব নাগরিককেই এ কথা মাথায় রাখতে হবে, একজন সুস্থ সমর্থ পুরুষের পাশাপাশি একজন সুস্থ সমর্থ পূর্ণাঙ্গ নারীও আমাদের দেশের অন্যতম সম্পদ। জীবন, নিরাপত্তা, বিকাশ এবং অংশগ্রহণ-- শিশুর এই চারটি অধিকারই নারীর জন্য প্রতিষ্ঠিত হোক।


Wednesday, 21 January 2026

শতবর্ষে মহাশ্বেতা

'উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই'

সোমনাথ গুহ


(১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ - ২৮ জুলাই ২০১৬)

হাসদেও অরণ্যে বেলাগাম বৃক্ষছেদন করে, জঙ্গল উজাড় করে আদানিদের হাতে তা খননের জন্য তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেখানকার গোন্ড, ওঁরাও আদিবাসীরা প্রতিবাদে মুখর। নিকোবর দ্বীপে লুপ্তপ্রায় জনজাতি শম্পেন এবং নিকোবারিজদের বলপূর্বক অন্যত্র সরিয়ে সত্তর হাজার কোটি টাকার মোচ্ছব চালু করতে কেন্দ্রীয় সরকার বদ্ধপরিকর। প্রকৃতির প্রাচীন নিদর্শন আরাবলি পাহাড় সরকারি স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিপদের সম্মুখীন, সেখানকার ভীল, মিনা জনজাতিরা বিপন্ন। এই বিপর্যস্ত মানুষদের কথা যাঁর লেখনিতে ধারাবাহিক ভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছিল, গত ১৪ জানুয়ারি সেই মহীরূহ মহাশ্বেতা দেবী শতবর্ষ পূরণ করলেন। 

জল জঙ্গল জমিনের ওপর যখন দেশ জুড়ে বেলাগাম হামলা হচ্ছে, তখন বোঝা যায় লেখিকা আজও কত প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখাতেই তো আমরা পড়েছি, উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই। আদালতে বীরসা ও বীরসাইতদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অপরাধ দাঁড় করানো ছিল কঠিন। অতএব, সরকারের সিদ্ধান্তে এশিয়াটিক কলেরায় বীরসার জেলে মৃত্যু হয়। পুলিশের বড় কর্তারা সবাই খুব খুশি। ইয়োরোপিয়ান ক্লাবে মদের ফোয়ারা ছোটে। বীরসার মা জঙ্গলে বসে থাকেন, স্থির বিশ্বাস এই নদী গাছ পাহাড় মাটি দেখতে দেখতে একদিন সে ফিরে আসবে। মুন্ডাদের মধ্যে রটে যায়, উলগুলানের শেষ নাই, বীরসার মরণ নাই। কয়েক দশক বাদে দেখা যায়, তাঁর মতো বসাই টুডুরও মরণ নাই। চার-চারবার তাঁর মৃতদেহ শনাক্ত হয়, গ্রাম-শহর, বনবাদাড়ে ছড়িয়ে পড়ে বসাই মৃত, পুলিশ প্রশাসন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তবুও কোনও এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রবল নিপীড়নের কারণে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, সেখানে বসাইয়ের কন্ঠস্বর গর্জে ওঠে। বীরসা, বসাই উভয়েই মিথ হয়ে যায়, সাহিত্যের মহাসড়কে মহাশ্বেতাও চিরস্থায়ী হয়ে যান।

অথচ শুরুটা হয়েছিল অন্য ভাবে; অন্তত তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যের নিরিখে সেরকমটাই মনে হতে পারে। নিজের পরিচিত জগত ছেড়ে সেই ১৯৫৬ সালে সুদূর বুন্দেলখন্ডে ঝাঁসিতে চলে গিয়েছিলেন, ‘তীর্থযাত্রীর মন’ নিয়ে রাণী লক্ষ্মীবাইয়ের জীবন অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। গ্রাম-গঞ্জ পরিক্রমা করে লোকগীতি, ছড়া, রাসো, প্রচলিত কাহিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন, সন্ধ্যাবেলায় স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বসে পড়েছেন, শুনেছেন রাণীর কথা। যখন রাণীর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন, সমবেত মানুষ সহজাত বিশ্বাসে বলে উঠেছেন, 'রাণী মরগেই ন হোউনী, আভি তো জীন্দা হোউ।' তাঁরা এখনও মনে করেন, রাণী যদি হাতে মাটি তুলে নিতেন তো সেই মাটি ফৌজ বনে যেত, কাঠ তাঁর হাতের স্পর্শে হয়ে উঠত উদ্যত তরবারি, পাথর ছুঁয়ে সেটাকে তিনি ঘোড়া বানিয়ে দিতেন। এর পাশাপাশি দক্ষ শাসক, অকুতোভয় যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্বের কাছে তিনি উপেক্ষিতা হয়েছেন। সেই সময় লেখিকা ঝাঁসিতে রাণীর একটি মূর্তি ভিন্ন অপর কোনও স্মৃতিচিহ্নই দেখেননি, গোয়ালিয়রে শুধু একটি বেদি যা স্থানীয় মানুষদের চাপে তাঁর মৃত্যুর সত্তর বছর পর নির্মিত হয়। 

এর কয়েক বছর পরে ষাটের দশকের শুরুতে আমরা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন আখ্যান পাই – ‘লায়লী আশমানের আয়না’। এই গল্পের সঙ্গে বলিউডের অধুনা 'গ্যাংস্টার' ছবির মিল আছে, সঙ্গে আছে দরবারি নর্তকির মশলা। সময়টা উনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক। উত্তর ভারতে ঠগীদের যুগ শেষ হয়ে এসেছে, তাদের এক উত্তরসূরী বাবুলাল বেনারসের গঙ্গার বুকে দস্যুবৃত্তি করে অর্থ ও প্রতিপত্তির এক বিপুল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তার নাতি কুন্দন এই কারবারে আরও দড়, উপরি হিসাবে জুটিয়ে নিয়েছে এক রূপসী লখনৌওয়ালি নাচনি। নাম তার লায়লী আশমান। ওয়াজেদ আলি শাহ যখন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হন, সে ও তার মা নবাবের আরও অনেক ঘনিষ্ঠজনদের সাথে শহরে এক নতুন লখনৌই গড়ে তোলে। লায়লী কুন্দনের আশ্রিতা, কিন্তু কুন্দন তার মনের খোঁজ পায় না। পাক্কা ফিল্মি চিত্রনাট্য, যা বম্বেতে সিনেমাও হয়েছিল। আপাত ভাবে ঝাঁসির রাণী আর এই উপন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন, যাকে বলে দুটি ভিন্ন জঁর, কিন্তু একটু গভীরে দেখলেই পাওয়া যায় এক চোরাস্রোত-- টিঁকে থাকার জন্য নারীর স্বতন্ত্র লড়াই এবং ঐতিহাসিক উপাদান। 

এই ঐতিহাসিকতায় মহাশ্বেতা তাঁর সাহিত্যে বারবার ফিরে গেছেন এবং সেটা নিম্নবর্গের ইতিহাস। সত্তর বছর আগে ‘ঝাঁসির রাণী’তেই তার নিদর্শন আমরা পাই। কাহিনিতে বারবার সাধারণ নগরবাসীর কথা উঠে আসে। রাজপুত, বুন্দেলা, কুর্মী, আফগান, মারাঠিদের দৈনন্দিন জীবন, বিচিত্র পেশার সব মানুষ কাহিনিতে ভিড় করে আসে। সেখানে শহরের অলিগলিতে প্রবল পরাক্রমশালী বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মরণপণ লড়াইয়ের চিহ্ন ছড়িয়ে থাকে। মহাশ্বেতা লিখছেন, 'ইতিহাস কী? কোন কথাকে আমরা ইতিহাস বলব? মানুষের কথা যদি ইতিহাস হয়, তবে বলব, ঝাঁসির রাজপথে সে দিন যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার বুঝি তুলনা নেই।... কিশোর বালক থেকে পাঠান, আফগান, মারাঠি, বুন্দেলা সৈন্য প্রত্যেকে সেখানে দাঁড়িয়ে শেষ অবধি লড়েছে।... সে দিন যে ইতিহাস রচনা করেছিল বহু হাজার ভারতীয়, সেই ইতিহাসই ভারতের প্রকৃত ইতিহাস।' 

'অরণ্যের অধিকার', 'চোট্টি মুন্ডা' এবং তাঁর 'তির', 'তিতুমীর' সবই তো নিপীড়িত জনজাতির ইতিহাস, তথাকথিত ‘সাবঅলটার্নদের’ আখ্যান। প্রথম উপন্যাসটিতে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পন্থা নিয়ে আমরা নিবিড় আলোচনা পাই যা মুন্ডা সমাজের আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ফুটিয়ে তোলে। জেল থেকে বেরিয়ে বীরসা যখন শান্তির কথা বলেন, জাগরী সেটার বিরোধিতা করেন কারণ ওই পথে তারা বারবার ঠকে এসেছেন। লড়াইয়ের পথ কষ্টকর, তবুও সেটাই তাঁদের পথ। বীরসা তাতেও রাজি নন, দিকে দিকে সভা করার ও সবার মত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নানা গল্পে নারীর বেঁচে থাকার লড়াই, অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের অভাব সংগ্রামের সাথে মিলে মিশে যায়। ‘সাঁঝ-সকালের মা’ গল্পে পাখমারা সমাজের জটিল মনুষ্য-রূপী শেয়াল শকুনের হাত থেকে বাঁচতে লাল চেলি আর ছোট একটা ত্রিশুল হাতে নিয়ে ঠাকুরনী হয়ে গেছিল। সে বুঝেছিল, ‘অলৌকিকতা দিয়ে নিজের চারদিকে বর্ম না আঁটলে নিজেকে ও বাঁচাতে পারবে না।’ পুত্র সাধনের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, সূয্যি না উঠতে মা বলে ডাকবি আর সূয্যি ডুবতে মা বলে ডাকবি, বাকি সময় ঠাকুরনী। এটাই ছিল মা-পুতের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। 

‘দ্রৌপদী’ গল্পটি তো ভারতীয় সাহিত্যে একটি মাইলফলক হয়ে গেছে। কী অপরিসীম জেদ, সাহস, আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রবল শক্তিশালী সেনা অফিসারকে হেলায় অবজ্ঞা করা যায়! সে সাঁওতাল রমণীকে ‘বানিয়ে’ নিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছিল। গল্পের শেষে কে কাকে বানালো ভেবে গায়ে কাঁটা দেয়: 'দ্রৌপদীর কালো শরীর আরো কাছে আসে। দ্রৌপদী দুর্বোধ্য, সেনানায়কের কাছে একেবারে দুর্বোধ্য এক অদম্য হাসিতে কাঁপে... তীক্ষ্ণ গলায় বলে, কাপড় কি হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?... হেথা কেও পুরুষ নাই যে লাজ করব। কাপড় মোরে পরাতে দিব না। আর কি করবি? লেঃ কাউন্টার কর, লেঃ কাউন্টার কর...? দুই ক্ষতবিক্ষত স্তন নিয়ে দ্রৌপদী অফিসারকে ঠেলতে থাকে। তার চোখে ভয়, নিরস্ত্র এক নারীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেও সে ভীত।' শুধু ওই অফিসার নয়, তামাম ভারতের সেনা পুলিশ প্রশাসন আজ ওই গল্পের সম্মুখে থরহরি কম্পমান। কাহিনির প্রকট বাস্তবতার কারণে তারা এতটাই বিপন্ন বোধ করে যে যেখানেই এর নাট্য প্রদর্শনী হয় সেখানেই শাসক সেটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। হওয়ারই কথা! কাশ্মীরের কুনান-পোশপোরা বা মণিপুরের মনোরমার কলঙ্কিত অধ্যায় এখনও তো তাদের তাড়া করে বেড়ায়। 

মহাশ্বেতার গল্পে মানুষ দুঃখী, দারিদ্র্যে জর্জরিত, প্রবল ভাবে নিপীড়িত কিন্তু তারই মধ্যে তারা বেঁচে থাকার, প্রতিরোধ করা, এমনকি বদলা নেওয়ার উপায় ঠিক বার করে নেয়। আর তারা অনেকেই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘জল’ গল্পের মঘাই, বয়স আশি, জাতে ডোম, রুক্ষ, বিবর্ণ জমির ওপর দিয়ে হেঁটে সে ঠিক আন্দাজ পেয়ে যায় পাতালে কোথায় কুলকুল করে বয়ে যায় জল। তার নির্দেশ মতো কন্ট্রাক্টরের লোক মাটি ফাটায়, জলে প্লাবিত হয় গ্রাম। ‘বিছন’ গল্পে দেখি গভীর অন্ধকারে নাবাল জমির ফণীমনসার জঙ্গলে একা রাত্রিবাস করে অত্যাচারী জমিদার লছমন সিংয়ের আজ্ঞাবহ দুলন গঞ্জু। ছেলের মৃত্যুর শোকে উন্মাদ হয়ে ওই একই জমিতে লছমনের লাশ পুঁতে ফেলে তার ওপর ধান ফলায়। গ্রামবাসীদের কাছে বিছন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার প্রতীক। 

মহাশ্বেতা দেবী গড়পড়তা ‘ভদ্রলোক’ লেখক নন। ‘অগ্নিগর্ভ’ নামক গল্পের সংকলনে তিনি লিখছেন, 'বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল বিবেকহীন বাস্তব-বিমুখিতার সাধনা চলেছে। লেখকরা দেওয়ালের লেখা দেখেও দেখছেন না।... বেকার-সমস্যা ক্রমবর্ধমান, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া, শিক্ষায় চূড়ান্ত নৈরাজ্য, এতে মধ্যবিত্ত ভারসাম্য হারাচ্ছে, প্রবল ধাক্কায় চলে যাচ্ছে অন্য শ্রেণীর দিকে। শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্র স্পষ্টতর হচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিলগ্নে একজন দায়িত্ববান লেখককে কলম ধরতেই হয় শোষিতের সপক্ষে অন্যথায় ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না।' 

আজ একশো বছর পার করে এত প্রাসঙ্গিক, এত সমকালীন, এত সৃষ্টিশীল কোনও লেখক কি আছেন আমাদের মধ্যে? 


Sunday, 18 January 2026

রাতুল বসাক: সুযোগের মাঝে সেতুবন্ধন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন সর্বতোভাবে সহায়ক

শুভ্রা সেন



সমাজমাধ্যম আজ আর কেবল বিনোদন বা ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা নয়। এটি ক্রমশ এমন এক শক্তিশালী পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষের কাজ, চিন্তা, সংগ্রাম ও সাফল্য একে অপরের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কেউ প্রশংসা করছে, কেউ অনুপ্রাণিত হচ্ছে, আবার কেউ নতুন করে বুঝতে পারছে আমাদের পরিচিত সীমার বাইরেও কত কিছু করা সম্ভব। এই বিস্তৃত পৌঁছনোর পেছনে প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষজনের ক্ষেত্রে।

সমাজ দীর্ঘদিন ধরে  বিশেষ সক্ষম মানুষজনকে সহানুভূতির চোখে দেখেছে, সক্ষমতার চোখে নয়। অথচ বাস্তবতা হল, উপযুক্ত সুযোগ, সহায়ক পরিবেশ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পেলে তাঁরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে অবদান রাখতে পারেন। সমস্যা তাঁদের সক্ষমতায় নয়, সমস্যা আমাদের ব্যবস্থাপনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। দুঃখের বিষয়, এইসব মানুষদের অসংখ্য অনুপ্রেরণামূলক কথা আমাদের অজানাই থেকে যায়। মূলধারার আলোচনায় খুব কমই জায়গা পায় তাঁদের সংগ্রাম, উদ্ভাবন বা সাফল্যের কথা। সমাজমাধ্যম এই শূন্যস্থানটি কিছুটা হলেও পূরণ করতে শুরু করেছে। এখানে কেউ নিজের কাজ তুলে ধরছেন, কেউ আবার অন্যের কাজ শেয়ার করছেন। ধীরে ধীরে এই গল্পগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে ।

এই প্রেক্ষাপটে রাতুল বসাকের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জন্ম থেকেই দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রযুক্তি কীভাবে অন্ধত্ব ও সুযোগের মাঝখানে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। কলকাতা ব্লাইন্ড স্কুল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পর তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং'এ ডিপ্লোমা করেন। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় কোনও ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন অন্যদের জন্য পথ তৈরি করতে।

রাতুল একটি গভীর সমস্যা উপলব্ধি করেন। অনেক দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণের কাছে কম্পিউটার শিক্ষা বা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ছিল না। অথচ বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। তিনি জানতেন, প্রযুক্তি কীভাবে তাঁর নিজের জীবন বদলে দিয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি নিজেই হবেন সেই সেতু, যা অন্ধত্ব ও সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। অসাধারণ ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি স্ক্রিন রিডার, সহায়ক সফটওয়্যার ও ডিজিটাল টুল ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেন। আজ তিনি পাঁচজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষকের একটি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একসঙ্গে তাঁরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্লাস করান এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেন। ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ৩০০'রও বেশি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছেন। অনেকের জন্য এই প্রশিক্ষণ কেবল শেখার অভিজ্ঞতা নয়; আত্মনির্ভরতার প্রথম ধাপ।

এই প্রযুক্তির মানবিক রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাতুলের সংগীতচর্চার মধ্যে দিয়ে। ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে তাঁকে দেখা যায় একজন দক্ষ তবলা বাদক ও সংগীত শিক্ষক হিসেবে। তিনি তবলার মাধ্যমে নানা বয়সের মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের, সংগীত শেখাচ্ছেন। সবচেয়ে অভিনব দিক হল, তিনি ছোটবেলায় শেখা বাংলা ছড়া ও ছন্দগুলোকে তবলার সুরে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। ‘হাট্টিমাটিম টিম’, ‘ইকির মিকির চামচিকির’, ‘খোকা যাবে শ্বশুরবাড়ি’— এই ধরনের ছড়াগুলো শুনলেই অনেকের মনে শৈশবের মিষ্টি স্মৃতি ফিরে আসে। এই ছড়া ও ছন্দ কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এগুলো ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে দুই থেকে ছয় বছর বয়সে, যখন শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুত ঘটে, তখন গল্প, ছড়া ও সুর তাদের ভাবনার বিকাশ, শব্দভাণ্ডার ও ভাষাগত দক্ষতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ আধুনিক ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে এই ধরনের লোকজ ছড়া ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক সম্পদ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। রাতুল সেই হারিয়ে যেতে বসা জায়গাটিকেই সমাজমাধ্যমে নতুন করে প্রাণ দিচ্ছেন। লক্ষণীয় বিষয়, তাঁর তবলার সুরে তৈরি এই ছড়াগুলো ব্যবহার করে অনেকেই নতুন ভিডিও বানাচ্ছেন। মানুষ সেগুলো পছন্দ করছে, শেয়ার করছে। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন— বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষার ভাণ্ডারে এমন বিপুল সম্পদ রয়েছে, যা ভাষা শিক্ষা ও শিশুদের প্রাথমিক বিকাশে অত্যন্ত উপযোগী। বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা যায়, ছড়া ও সংগীতের মাধ্যমে শিক্ষা শিশুদের জন্য সহজ, আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

রাতুলের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি শুধু কর্মসংস্থানের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও শিক্ষার বাহনও হতে পারে। একজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী মানুষ যখন নিজে প্রশিক্ষক হন, সংগীত শিক্ষক হন, কনটেন্ট নির্মাতা হন, তখন তিনি কেবল নিজের জীবন বদলান না, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে প্রতিবন্ধকতা কোনও করুণা পাওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ভিন্নভাবে সক্ষম হওয়ার একটি বাস্তবতা।

সমাজমাধ্যম যদি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এই ধরনের গল্প আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। তখন হয়তো আরও কেউ অনুপ্রাণিত হবেন, আরও কেউ প্রযুক্তি শেখার সাহস পাবেন, আবার কেউ নীতি নির্ধারণের জায়গায় বসে ভাববেন, কীভাবে এই উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করা যায়।

প্রযুক্তি কেবল তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; প্রযুক্তি/ tech architecture কীভাবে করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কারা তা ব্যবহার করতে পারছেন— সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার তৈরি করেন, তাঁদের ব্যবহারযোগ্যতা ও সুগমতাকে প্রযুক্তিগত স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা জরুরি। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, তখন প্রশ্ন ওঠে— এই ব্যবস্থাপনাগুলি কি দৃষ্টিহীন, শ্রবণ-প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষিত হচ্ছে? নাকি সেগুলো অজান্তেই নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে? আমার মনে হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি প্রতিবন্ধকতাকে আরও কার্যকরভাবে দূর করার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। স্ক্রিন রিডার, ভয়েস-টু-টেক্সট, টেক্সট-টু-স্পিচ, স্বয়ংক্রিয় সাবটাইটেল, ভাষান্তর কিংবা ব্যক্তিগত সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে দৃষ্টিগত, শ্রবণগত, শারীরিক ও শেখার সীমাবদ্ধতাকে অনেকাংশে অতিক্রম করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি নিজে থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে না, তাকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হয়। এই কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি AI কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, ভাষা বা সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে শেখে, তবে সেটি অজান্তেই অন্যদের বাদ দিয়ে দেয়। তাই প্রয়োজন এমনভাবে AI'কে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা, ভাষা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা তার শেখার অংশ হয়। তবেই এই প্রযুক্তি প্রত্যেক মানুষের জন্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারবে।

একই সঙ্গে, আমরা যারা এই ধরনের ডিজিটাল ও সমাজমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি, আমাদের প্রত্যেকেরই ভূমিকা রয়েছে। সুগম বিষয়বস্তু তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তির নৈতিক ও মানবিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া— এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সীমাহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে মানবকল্যাণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

রাতুল বসাকের মতো মানুষেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন, অন্ধকার কখনও উদ্দেশ্যকে ম্লান করতে পারে না। আসল দৃষ্টি চোখে নয়, মননে। আর যখন প্রযুক্তি, সহমর্মিতা ও সুযোগ একসঙ্গে কাজ করে, তখন সীমাবদ্ধতাও সম্ভাবনায় রূপ নেয়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার পথে এই গল্পগুলো শুধু অনুপ্রেরণা নয়, পথনির্দেশ।

নিচে রাতুল বসাকের নিজস্ব ইউটিউব পেজের লিংক দেওয়া হল। সেখানে তাঁর কাজ, প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল উদ্যোগের ঝলক পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে তাঁর সঙ্গে কথা বলে একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকার আপনাদের সামনে তুলে ধরার প্রত্যাশা রাখছি।

https://www.youtube.com/watch?v=YVyrgf2uzJ8


Wednesday, 14 January 2026

বাংলাই এখন সারা দেশের ভরসা

বাংলা কি মামায়েভ কুরগান হয়ে উঠতে পারবে?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য



মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে ‘নোটবন্দী’ করে ব্যাঙ্কের সামনে হাজার হাজার লোককে দাঁড় করানো, রাতারাতি ‘লকডাউন’ ঘোষণা হেতু লক্ষ লক্ষ গরিব, দিন-আনি-দিন-খাই, পরিযায়ী শ্রমজীবী মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া, সমবেত কাঁসরঘন্টা বাজিয়ে করোনা তাড়ানোর কুসংস্কার, সংসদকে বিরোধী-শূন্য করে গায়ের জোরে নির্বাচন কমিশনার চয়নের প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে হঠানোর বিল পাশ করিয়ে তারপর নিজের দলের লোককে কমিশনারের পদে বসিয়ে (শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে তাদের জীবিতকালে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনও মামলা করা যাবে না— এমন বিধিও অন্তর্ভুক্ত করে) একের পর এক রাজ্যে ভোটার লিস্টকে লণ্ডভণ্ড করে সমস্ত রকম ক্ষমতা দখল করা— এই প্রভূত গায়ের জোয়ারি ও মাস্তানির যে ব্যবস্থাপনা গত ১০-১২ বছরে বিজেপি সরকার গড়ে তুলেছে, তার সামনে দেশের মানুষ ও বিশেষত দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দীর্ণ বিরোধীপক্ষ যেন কিছুটা অসহায় হয়ে পড়েছিল। একদিকে বিকৃত-উগ্র হিন্দুয়ানার জিগির তুলে ধর্মীয় সন্ত্রাস ও দাঙ্গা তৈরি করা, অন্যদিকে অর্থ ও পেশীর জোরে দেশ জুড়ে সমস্ত ক্ষমতাকে করায়ত্ব করে হিটলারি তাণ্ডবে পাকাপোক্ত একদলীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা— এই দ্বিবিধ অনাচারে পিষ্ট দেশবাসী।

ঠিক এই আবহেই এসে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। আরএসএস-বিজেপি নেতা সুনীল বনশল এ রাজ্যে তাঁর পার্টির কর্মীদের ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, এই নির্বাচনে বিজেপি’র জয় কিন্তু জয়ের মুকুটে শুধুমাত্র আরও একটি পালক সংযোজিত হওয়া নয়, বরং সভ্যতার জয়, ‘বিজাতীয়’ এক সভ্যতাকে পরাভূত করে ‘দেশিয়’ সভ্যতার জয়; অর্থাৎ, বঙ্গদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ তাদের কাছে এক ‘বিজাতীয় সত্তা’ যাকে পরাজিত করতে পারলে তাদের ভারত বিজয় সম্পূর্ণ হবে। শুভেন্দু অধিকারী লাফাতে লাফাতে সুনীল বনশলের বক্তব্যের এই অংশটির ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছে।

বুঝতে হবে, কী নৃশংস ও ভয়ঙ্কর এক শক্তির মুখোমুখি আমরা আজ দাঁড়িয়ে। বিজেপি যে আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতো ভালো-মন্দ মিশ্রিত আরও একটি দল নয়, ধর্মীয় ও জাতিগত গণহত্যায় বিশ্বাসী নাৎসি-ফ্যাসিস্ট অনুরূপ আদ্যোপান্ত এক হিংস্র রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার; আর ঠিক এই লক্ষ্যেই তাদের ‘বিজাতীয়’ বাঙালি নিধনের মহড়াও শুরু হয়ে গেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে খুব পরিকল্পিত ভাবে বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ ধরে ধরে পশ্চিমবঙ্গের গরিব-পরিযায়ী বাঙালিদের হয় ব্যাপক হারে পেটানো হচ্ছে, পিটিয়ে খুন করা হচ্ছে, নয়তো পুলিশকে দিয়ে তুলিয়ে বাংলাদেশে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।

পাশাপাশি, রাজ্যেও শুরু করা হয়েছে SIR’এর নামে এক উন্মত্ত তাণ্ডব; যে SIR’এর চোরাগোপ্তা হানায় বিহারে বিরোধীদের একেবারে শুইয়ে দেওয়া গেছে। তার আগে দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় নির্বাচন কমিশনের মদতে ভোটার লিস্টে হয় রাতারাতি লক্ষ লক্ষ নকল নাম ঢুকিয়ে অথবা বাদ দিয়ে বিজেপি নিজেদের কাজ হাসিল করেছে। কারণ, লোকসভা নির্বাচনে প্রায় হারতে হারতে কোনওরকমে সামলে নেওয়া বিজেপি’র সামনে নির্বাচনী জালিয়াতি করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। তাই এ রাজ্যেও এখন তথাকথিত SIR’এর আড়ালে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে, হিয়ারিং’এর অজুহাতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অসুস্থ, হাসপাতালের রোগী, বিশেষ সক্ষম ব্যক্তি সহ যাকে ইচ্ছা দু-তিনবার ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে, ফলত কাউকে মেরে ফেলে, এই ভয়ঙ্কর নাটক চলেছে। ইতিমধ্যেই এই সন্ত্রাসী উল্লাসে বিএলও সহ প্রাণ গেছে প্রায় ৮০ জন সহনাগরিকের।

এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে এ রাজ্যের মীরজাফর-উমিচাঁদের উত্তরাধিকারী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তদের বৃহদাংশ ও গোদি মিডিয়া যখন কঠিন-কঠোর নীরবতায় এবং মাঝেমধ্যে নানান কুযুক্তিতে এই নিধনযজ্ঞের মহড়ায় একপ্রকার সাবাশি দিচ্ছে, আশায় আশায় দিনও গুনছে কবে ইডি-সিবিআই এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে হাতকড়ি পরাবে, ফলে, আরএসএস-বিজেপি’র ‘বিজাতীয়’ বঙ্গদেশ জয় আসান হয়ে যাবে, ঠিক তখুনি চলমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গোপনে প্রায় ১৩ জন অবাঙালি ওস্তাদদের উড়িয়ে এনে হঠাৎ ভোররাত্তিরে আক্রমণ করা হল তৃণমূলের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা আই-প্যাকের দফতর ও শীর্ষকর্তার বাড়ি। উদ্দেশ্য স্পষ্ট! ১৯৭২ সালের আমেরিকার ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ তুল্য এই অভিযানটি আসলে ছিল বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূলের যাবতীয় নীতি-কৌশল, সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ইত্যাদি হাতিয়ে নেওয়া সহ তাদের বিপুল কর্মযজ্ঞের নেটওয়ার্ককে হুমকি ও ভয় দেখিয়ে অকেজো করে দেওয়া। আর সেই সুবাদে একইদিনে প্রাক-দুপুরে ঘটল সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ও অভূতপূর্ব ঘটনাটি, যা কেউ কল্পনাতেও আঁচ করতে পারেননি। খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী সটান হাজির হলেন ঘটনাস্থলে; সাহসের সঙ্গে চলে গেলেন আই-প্যাক শীর্ষকর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ির অন্দরে (যেখানে তখন নাকি ইডি’র তথাকথিত তল্লাশি চলেছে), তারপর ফাইল ও হার্ড ডিস্ক হাতে বেরিয়ে এসে জনতা ও সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে জানালেন ইডি’র আসল মতলব। ঝড়ের গতিতে সে খবর দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ থেকে জনপ্রিয় বিকল্প মিডিয়া, সকলে দু’ হাত তুলে বাহবা জানালেন, রাভিশ কুমার থেকে আকাশ ব্যানার্জি, অজিত অঞ্জুম থেকে অভিসার শর্মা’র মতো বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রায় প্রত্যেকে বললেন, এই ফ্যাসিস্টদের পরের পর নিয়মভঙ্গ ও একতরফা অত্যাচারের বিরুদ্ধে যখন প্রায় সমস্ত বিরোধী নেতা ও দলগুলি কোণঠাসা তখন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপযুক্ত সময়ে যথাযথ পদ্ধতিতে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এক লহমায় মমতা হয়ে উঠলেন ফ্যাসিস্ট-বিরোধী প্রতিরোধের জাতীয় নেত্রী। একপ্রকার ব্যর্থ হল আই-প্যাক'এর অফিস থেকে তৃণমূলের নথি, তথ্য ও রণনীতি ছিনিয়ে নেওয়ার ইডি'র প্রয়াস। ১৪ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে ইডি'র আইনজীবী সে কথা কবুলও করলেন যে তাঁরা শুধু দলীয় কেন, কোনও ধরনের নথিই বাজেয়াপ্ত করেননি। 

এই সামগ্রিক ঘটনাক্রম ও পরিপ্রেক্ষিত এরপর কোনদিকে গড়াবে তা অনুমান করা হয়তো দুষ্কর কিন্তু বাংলা থেকে প্রতিরোধের যে নিদর্শন ও বার্তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল তার তাৎপর্য অসীম। সেই অর্থে বাংলার আগামী বিধানসভা নির্বাচন এক অমূল্য গুরুত্ব অর্জন করেছে। তালিবানি-হিন্দুত্ববাদী বনশল কথিত ‘বিজাতীয়’ বাঙালিদের উপর হিন্দুস্থানীদের বিজয় লাভে গত ৫০০ বছরের লালন-চৈতন্য জাত ও রবীন্দ্র-নজরুলে পুষ্ট বাঙালি ঐতিহ্য, পরম্পরা ও সংস্কৃতির ইমারত কি ভেঙে পড়বে, নাকি, বাংলা হবে স্তালিনগ্রাদের মামায়েভ কুরগান পাহাড় ও রেড অক্টোবর স্টিল ফ্যাক্টরি (যেখান থেকে সোভিয়েত জনগণ ও সেনাদের সার্বিক প্রতিরোধে হিটলার বাহিনী প্রথম পিছু হঠতে শুরু করে), যা ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের সার্বিক পরাজয়ের যাত্রাশুরুর সূচক হবে।

মনে হচ্ছে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিছক দর্শক হয়ে বসে থাকবেন না, বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা রক্ষার লড়াইয়ে সর্বতোভাবে নিজেদের সঁপে দেবেন। কিন্তু সব থেকে বিধ্বস্ত অবস্থা দেখছি এ রাজ্যের বামেদের বৃহৎ অংশটিকে যারা নিতান্তই মমতা-ফোবিয়াতে ভুগতে ভুগতে দিন-মান-কাল সব বিস্মৃত হয়েছেন। SIR’এ সাধারণ মানুষের তীব্র হেনস্থা ও মৃত্যু মিছিলে তারা যেমন চোখে ঠুলি পরেছেন, তেমনই বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের পেটাই ও বলপূর্বক বেআইনি দেশান্তরেও নিষ্ঠুর নীরবতার আশ্রয় নিয়েছেন। প্রকারান্তরে ধরেই নিয়েছেন, তাদের হৃত সাম্রাজ্য তৃণমূলের কাছ থেকে বিজেপি’র হাত ঘুরেই তাদের কোলে এসে পড়বে। অথচ, ধরে নিলে কী হবে, মুখে বলছেন ‘সেটিং’। কী মুশকিল! ‘সেটিং’ই যদি হবে, তাহলে বিজেপি তৃণমূলের হাত থেকে রাজ্যের শাসনভার নিতেই বা যাবে কেন! আর ত্রিপুরা বা কেরালায় তো তৃণমূল নেই, সেখানে যথাক্রমে গোটা রাজ্যে ও তিরুবনন্তপুরম পৌরসভায় বিজেপি কীভাবে ড্যাং ড্যাং করে জিতে যায়! কথায় বলে, অক্ষমের নাই যুক্তির ধার! হায়, এ রাজ্যে বামেদের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব বামেরা নিজেরাই ধ্বংস করেছে। না হলে তাদের তরফ থেকে কি আর দাবি তোলা হয় যে, ইডি’র তল্লাশিতে ঢুকে পড়ার জন্য মমতাকে গ্রেফতার করা হোক! ফলে, তাদের অবস্থা এখন, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘incapacitated’ বা অক্ষম অথবা অথর্ব হয়ে পড়া, অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে তারা এখন নিজেদের জালেই বন্দী হয়ে নড়াচড়ার অবস্থাতেও আর নেই।   

ভারতবর্ষের কোনও রাজনৈতিক দলই ধোয়া তুলসিপাতা নয়। তৃণমূল বা বাম দলগুলিও নয়। কিন্তু যে দলের আদর্শগত লক্ষ্য কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায় বা জাতির নির্মূলিকরণ (ethnic cleansing), তারা বাকী দলগুলি থেকে গুণগত ভাবে সম্পূর্ণত আলাদা। এখানেই বিজেপির সঙ্গে অন্যান্য সমস্ত দলের পার্থক্য। ঠিক যেমন আলাদা ছিল জার্মানির নাৎসি ও ইতালির ফ্যাসিস্টরা। তাদের লক্ষ্যই ছিল ইহুদি ও অনার্যদের নির্মূল করা— আমরা ইতিহাসের সে পর্ব পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু কিছুটা ভিন্ন টার্গেটে আবার একই সংঘাতের শুরুয়াত হয়েছে। এই মর্মান্তিক পরিবেশে আপাতত বাংলাই এখন সারা দেশের ভরসা। এখানে শুরু হয়েছে প্রতিরোধের শেষ লড়াই। তাই আগামী কয়েক মাস নিরন্তর জেগে থাকার সময়, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনঐক্যের প্রাচীর গড়ে তোলার কাজ।


Monday, 12 January 2026

ভেনেজুয়েলা এখন মাথাব্যথার কারণ?

তেল কোম্পানির কর্তারা হাত তুলে দিয়েছেন

প্রশান্ত ভট্টাচার্য



মহাকাব্যর একটি ঘটনার পুনর্নির্মাণ। আধুনিক পৃথিবীর রাবণ কারাকাসের বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে এল রাম-সীতাকে। হ্যাঁ, আমি ভেনেজুয়েলার কথা বলছি। ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ কেবল ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী আচরণ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের প্রকাশ, যারা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ইত্যাদির ধার ধারে না। ভেনেজুয়ালায় হামলা তা ফের প্রমাণ করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর আধিপত্যের ইতিহাসে অন্য দেশে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করার ঘটনা এই প্রথম নয়। 

বিশ্ব রাজনীতির ঠাণ্ডা যুদ্ধ তখন অস্তমিত। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিখাইল গর্বাচেভের পদত্যাগের মধ্য দিয়েই বিশ্বে চার দশক ধরে চলা স্নায়ুদ্ধের সমাপ্তি হয়। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ঠিক এইভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। বুশ পানামায় হামলার ওই জঘন্য অপারেশনের নাম দিয়েছিলেন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। এখানেও বুশ মাদক পাচারকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছিলেন। অথচ ঘটনা হচ্ছে, নরিয়েগা এক সময় ওয়াশিংটনের মিত্র ছিলেন। কেবল পানামাতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় নরিয়েগার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রায় ২৬ হাজার আমেরিকান সেনা পানামায় সামরিক আগ্রাসন চালায়। নরিয়েগা ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আত্মগোপন করলেও কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এরপর মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন আদালত নরিয়েগাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। জেলের পর তাঁকে অর্থ পাচারের সাজা ভোগের জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হয় আর এরপর হত্যা ও অন্যান্য অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। একজন মার্কিন স্টুজ হয়ে নরিয়েগার যদি এই হাল হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বিরোধী বলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিচিত নিকোলা মাদুরোর কী হবে তা অনুমেয়।  

চার বছর সাইডলাইনে থাকার পর দ্বিতীয় বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট হয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মেক্সিকো উপসাগরের নাম পাল্টে 'আমেরিকান উপসাগর' করে দিয়েছিলেন, তখন দুনিয়াদারির রাজনীতিকরা ভেবেছিলেন এটি ট্রাম্পের স্রেফ ক্ষ্যাপামি। তারপর আমদানি শুল্ক অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়াটাকেও গোড়ায় তুঘলকি বলে হালকা করে নিচ্ছিলেন অনেকেই। আমাদের নরেন্দ্র মোদীও। এত দিনে হয়তো বিশ্ব নাগরিকরা উপলব্ধি করেছেন, কেন বিষয়টি নিছক হাসির ছিল না। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ট্রাম্পের আকাশবাহিত বাহিনী গিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যে ভাবে প্রাসাদ থেকে বন্দি করে সোজা নিয়ে এল মার্কিন মুলুকে, তা কোনও কল্পকাহিনি বা সস্তা রাজনৈতিক থ্রিলার নয়, দস্তুরমতো বাস্তব, সুপরিকল্পিত, যত্ন সহকারে সংঘটিত। এই ভাবেই রচিত হচ্ছে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের বিশ্ব-কূটনীতি। সমস্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সোজা অন্য দেশের অন্দরে ঢুকে প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার এই পদ্ধতি প্রমাণ করে দিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাসমারোহে সামরিক কর্তৃত্ববাদে ফিরে গিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর মান্যতা ইত্যাদি সমূলে উৎপাটিত ওয়াশিংটন ডিসির বিশ্ববীক্ষা থেকে। কোনও সাফাই দিতে অনভ্যস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট তবু বলছে, মাদকচক্র বিরোধী আন্তর্জাতিক স্তরে যে ঘোষিত যুদ্ধ চলছে, মাদুরো দম্পতিকে তুলে আনা তারই অংশ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন, তা থেকে গোটা প্রহসনটি স্পষ্ট হয়ে যায়। সে সব তথ্য অনুসারে মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে যে সব অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মাদক-সন্ত্রাস ও কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও বিধ্বংসী ডিভাইস রাখা ইত্যাদি। কিন্তু মার্কিন মুলুকে কোকেন ও ফেন্টানিল পাচার নিয়ে মাদুরোকে যেভাবে দায়ী করা হয়েছে তার কোনও ভিত্তি নেই, কারণ, ভেনেজুয়েলা কোকেন উৎপাদনকারী দেশ নয়; কোকেন উৎপাদিত হয় মূলত কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায়। ভেনেজুয়ালা অতীতে একটি ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মার্কিন দেশে কোকেন পাচারের প্রধান রুট মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। তাছাড়া ফেন্টানিল সংকটের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কোনও যোগসূত্র নেই। এই সিনথেটিক মাদকের উৎপাদন ও পাচার মূলত চিন থেকে আসা কেমিক্যাল উপাদান আর মেক্সিকান কার্টেলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ এমনকি ইউএসএ মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাও ভেনেজুয়ালাকে ফেন্টানিলের উৎস বা পাচারকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেনি। অথচ সেগুলোই মাদুরোর বিরুদ্ধে চার্জ। তবে এসব ব্যাপারে বরাবরই ওয়াশিংটন পৃথিবীতে 'ভ্যাপিকান'। 

পাঠক মনে করে দেখুন, ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার যুক্তি হিসাবে মার্কিন প্রশাসন সাদ্দাম হোসেনের কাছে উইপনস অব মাস ডিসট্রাকশন (গণ–বিধ্বংসী) রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ইত্যাদি থাকার অজুহাত দিয়েছিল। পরে কিন্তু কিছুই মেলেনি। মাদুরোর ক্ষেত্রে অতদূর যাওয়ারও প্রয়োজন মনে করছে না। তাছাড়া ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন করলেও এই হামলার মূল উদ্দেশ্য যে তেল লুঠ, সেটা তাঁর সংবাদ সম্মেলনেই স্পষ্ট। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আমাদের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিগুলিকে— যেগুলি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তাদের ভেনেজুয়েলায় পাঠাতে চলেছি।’ আর এ কাজটি নির্বিঘ্নে করার জন্য মাদুরো সরকারের মতো স্বাধীনচেতা প্রশাসন দিয়ে হবে না।। তাই চাই পিট্টু সরকার। শোনা যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের ব্যর্থতার কথাও। বাকি দুনিয়া নিশ্চয়ই ভাবছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের গণতন্ত্রের হাঁড়ির হাল নিয়ে না ভেবে কেন ভেনেজুয়েলার নৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ে এত ব্যথিত ও বিপন্ন। মাদুরো নাকি সে দেশে নির্বাচন চুরি করেছেন, অর্থাৎ, অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা কব্জা করেছেন। এই অভিযোগের সত্যাসত্য নির্ণয়ের দরকার নেই, বিশেষত যখন ট্রাম্পের শ্রীমুখেই গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার অসারতার কথা শুনে ফেলেছেন বিশ্ববাসী। বস্তুত, এবারের রাবণ মডেলে কারাকাস অভিযানে ট্রাম্পের নিজস্ব শৈলীর অভিনব পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। আমার ধারণা, ট্রাম্পীয় এই পদক্ষেপ তেলের বাজারে রুশ-ভারত সহ অন্যদের ধমকেচমকে রাখার একটি ধাপ। 

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপের পিছনে কোনও একক ও সুসংহত মহাকৌশল নেই বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, এই সংকটকে বুঝতে হবে কৌশলগত, আদর্শগত ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনার অংশ হিসাবে। হয়তো, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কেননা, সেই চাভেজের সময় থেকে ভেনেজুয়েলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। কারাকাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। কিউবার পর ভেনেজুয়েলাই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মূর্তিমান প্রতিবাদ। কারাকাস বিকল্প শক্তিকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আদর্শগত ও কূটনৈতিকভাবে নিজেকে যুক্ত করেছে আর গত কয়েক দশকে সার্বভৌমত্বের এমন এক ন্যারেটিভ সামনে এনেছে যা ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিল। যদিও ওই ঘোষণায় ছিল-- আমেরিকা মহাদেশের স্বাধীন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপের কোনও হস্তক্ষেপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ বিবেচনা করবে। এখানেই লুকিয়ে আছে পেন্টাগনের হস্তক্ষেপ বৈধ না অবৈধ প্রশ্নটি। আমরা কিন্তু বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটন লাতিন আমেরিকার স্বাধীন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছে। গত শতাব্দীর সাতের দশকের গোড়ায় ১৯৭৩ সালে চিলির সালভাদোর আলেন্দে সরকারের পতন ঘটিয়ে পিনোচেতের পিট্টু সরকারের আগমন  ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। 

এই যাদের গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গি তাদের চোখের সামনে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরো সরকারের স্বমেজাজে টিকে থাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কাছে যুগপৎ অসম্মান ও দুঃস্বপ্নের। নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলা তাই ওয়াশিংটনের সামনে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর  বিশ্বাসযোগ্যতা ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বজায় রাখার পক্ষে কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। মার্কিন আধিপত্যবাদের সুনাম ও প্রতিপত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। ওয়াশিংটনের মুখ্য উদ্দেশ্য, অন্য রাষ্ট্রগুলিকে অনুরূপ অবাধ্যতা থেকে নিরুৎসাহ করা, সহবত শেখানো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানেন না, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে নিজের রাষ্ট্রে বন্দি করলেই সেই রাষ্ট্রটি দখল করা যায় না। এটি একটি পুরনো সাম্রাজ্যবাদী ধারণা। ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে এলেই কি ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের শ্বেতপ্রাসাদ নিতে পারবে?

ভেনেজুয়েলা জুড়ে চলছে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। নিকোলাস মাদুরোর পক্ষে বিক্ষোভ। ভেনেজুয়েলানরা দেখিয়ে দিচ্ছে, একজন প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি করলেই জনগণকে বন্দি করা যায় না। নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনার পর ৩ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভ ভরে ঘোষণা করেছিলেন, নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারাই ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও সহ প্রশাসনের কর্তাদের দেখিয়ে বলেছিলেন, এঁরাই ভেনেজুয়েলা চালাবেন আর তাঁর নির্দেশেই সব কিছু হবে। কিন্তু পরের দিনই ট্রাম্প বুঝলেন, সবটা তাঁর সাজানো ঘুঁটি অনুযায়ী চলবে না। ট্রাম্প বলতে বাধ্য হলেন, তিনি আশা করেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ মার্কিন নীতি অনুসরণ করে দেশ চালাবেন। না হলে দেলসিদের ওপর মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ আঘাত নেমে আসবে। 

৩ জানুয়ারি নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত নেত্রী, শান্তিতে নোবেল জয়ী মারিয়া মাচাদো'কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মদত দিয়ে আসছিল়, যাতে তিনি তাঁর দেশের লোককে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারেন। পক্ষান্তরে, মাচাদো বিভিন্ন বক্তৃতায়, এমনকি লিখিতভাবে, বারবার অনুরোধ করেছেন মার্কিন হস্তক্ষেপের। মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর মাচাদো প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলায় গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান। কিন্তু তাঁর অনুরোধ সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। যদি তা করার বাস্তবতা থাকত, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম লঙ্ঘন করে রাতের অন্ধকারে কমপক্ষে ৪০ জনকে খুন করে মাদুরোকে অপহরণ করত না। তবে মাচাদোতে আস্থা নেই ওয়াশিংটনের। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, মাচাদো একজন চমৎকার মহিলা কিন্তু নেতা হিসেবে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্য নন। 

ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ২৩৩ ধারা অনুসারে ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্বভার নিলেও বিশ্ব রাজনীতির কৌতূহল, ভেনেজুয়েলা আসলে এখন কে চালাচ্ছে? চিন-রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ভূমিকা ও সমর্থনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ'এর মধ্যে ঠাণ্ডা-গরম আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা সমাধানের কথা বলেছেন। যদিও ট্রাম্পের 'মহাবন্ধু' নরেন্দ্র মোদী কোনও 'রা কাটছেন না। বিদেশমন্ত্রকও মিন মিন করছে। তবে গোটা ঘটনাটা ট্রাম্পের পক্ষে খুব সুখকর হচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মাদুরোকে অপহরণের পর ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, তারা ভেনেজুয়েলা দখল করে ফেলবে, দেশের সর্বস্তরের জনগণ তাদের স্বাগত জানাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দেশটির অধিকাংশ মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পকে দস্যু, চোর-ডাকাত, লুটেরা বলছে। দুদিন না যেতেই মার্কিনিরা স্বীকার করেছে যে মাদুরো অপহরণের মাধ্যমে সমস্যা কমেনি বরং জটিলতা বেড়েছে। দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গেলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তেল ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের অভিলাষ পূরণ হবে না। বিশেষ করে যে তেল কোম্পানিগুলির জন্য ট্রাম্প অভিযান করলেন, তারাই এখন বলছে ভেনেজুয়েলায় যাবে না, কারণ, তেল একটি অস্তগামী শিল্প। উপরন্তু, ঠিকঠাক তেল উত্তোলনের একটি পরিকাঠামো গড়ে তুলতেই সেখানে ১০ বছর সময় লাগবে-- এত লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে তেল কোম্পানির কর্তারা একেবারেই রাজী নন। তাহলে, ভেনেজুয়েলা অভিযান কি একলা রাজা ট্রাম্পের রাজকীয় খেয়াল? যার জন্য গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই পস্তাতে শুরু করেছে?

জানি না, ভেনেজুয়েলা আরেকটা ভিয়েতনাম বা বেইরুট হয়ে উঠবে কিনা!



Saturday, 10 January 2026

অস্তগামী ডলার

তাই, মরীয়া আমেরিকা

মালবিকা মিত্র



পুরা কাহিনীর ট্রয় নগরী যা ইলিয়ান নগরী নামে পরিচিত, ছিল দুর্ভেদ্য। গ্রিকরা কোনও মতেই ট্রয় নগরীর ভেতরে প্রবেশ করা তো দূরে থাক, নগরীর প্রধান ফটকই পার হতে পারেনি। অতঃপর গ্রিকরা এক বিরাট আকারের সুদৃশ্য কাঠের ঘোড়া বানালো। সেই ঘোড়ার পেটের ভেতর কিছু গ্রিক সৈন্য অস্ত্র নিয়ে ঢুকে গেল ও সেই ঘোড়াকে ট্রয় নগরীর নিকটে রেখে এল। নগরবাসী এমন সুন্দর ঘোড়া দেখে তাকে টানতে টানতে নগরীর ভেতর নিয়ে গেল। তারপর যেই না গভীর অন্ধকার রাত্রি হল, ঘোড়ার পেট থেকে গ্রিক সৈন্যরা বেরিয়ে এসে নগরীর সিংহ দুয়ার খুলে দিল। আর বিশাল গ্রিক সৈন্যবাহিনী ফটক দিয়ে রাতের অন্ধকারে নগরীতে ঢুকে পড়ল। 

প্রায় এমনই গল্প শোনাচ্ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। কীভাবে জেমস বন্ডের কায়দায় ভেনেজুয়েলা থেকে সস্ত্রীক মাদুরোকে তুলে আনা হল আমেরিকায়। ঠিক যেন গুপি বাঘা হাল্লার রাজাকে শুন্ডিতে তুলে আনল। 

বিবরণটা একটু শোনাই যাক। যে প্রাসাদে মাদুরো থাকতেন, তার অবিকল প্রতিকৃতি বানিয়ে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা দিনের পর দিন নাকি অকস্মাৎ আক্রমণের মহড়া দিতেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ চারজনের নজরদারিতে এই কোর কমিটি ছিল। তারাই অপারেশনের চাবিকাঠি। গভীর রাতে দেড়শোটির বেশি যুদ্ধবিমান একসাথে আকাশে উড়ল। এলোমেলো বোমাবর্ষণে সব তছনছ। তারপর সাইবার ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারাকাস শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হল। সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মার্কিন কমান্ডোরা হেলিকপ্টার থেকে মাদুরোর ডেরায় প্রবেশ করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তারা মাদুরোর বাড়ির মজবুত ইস্পাতের দরজা কেটে ভেতরে ঢুকে গেল। চলল গুলি বিনিময়। এরপর কমান্ডোরা মাদুরো'র বেডরুমে ঢুকে স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস সহ মাদুরোকে টেনে হিঁচড়ে, চোখ বেঁধে, হাতকরা পরিয়ে, প্রথমে যুদ্ধ জাহাজে তারপর বিমানে চাপিয়ে সোজা আমেরিকা পাড়ি দিল। 

মধ্যযুগেও কোনও শাসক নিজের যুদ্ধ বিজয়কে এভাবে বিনোদনের মতো পরিবেশন করত না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসক বোঝাতে চায় সে আক্রান্ত, আক্রমণকারী নয়। সেই নেকড়ে যেমন মেষ শাবককে বলেছিল, 'তোর বাবা জলঘোলা করেছিল।' এরকম একটা অজুহাত দেখিয়ে নিতান্ত বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করেছি এটা বোঝাতে চাইত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাবার্তায় কোনও আবরণ নেই, যেন কসাইয়ের দোকানে ছাল ছাড়ানো মুন্ডু কাটা ঝুলিয়ে রাখা সারি সারি খাসি। মানুষও এইরকম ফিল্মি বিবরণ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। বোধ করি বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির ক্ষেত্রটা কমে যাচ্ছে। অনেক মোটা দাগে গায়ের জোরের ক্ষেত্রটা বেড়ে যাচ্ছে। মনে আছে, প্রথম জর্জ বুশের সময় যে উপসাগরীয় যুদ্ধ চলল, তখন সমগ্র যুদ্ধটাকে লাইভ টেলিকাস্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এককভাবে সিএনএন টিভিকে। তারা কত নিখুঁত যুদ্ধ পরিচালনা হচ্ছে, শুধু শত্রু সৈন্য বেছে বেছে মারা হচ্ছে, তার মিথ্যা বিবরণ দিয়েছিল। অথচ বাস্তবে হাসপাতাল খাদ্য গুদাম রেড ক্রস মসজিদ সর্বত্র মিসাইল হামলা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে ও আশ্রয় হারিয়েছে। কিন্তু টিভির পর্দায় যুদ্ধের টানটান উত্তেজনাকর টেলিকাস্ট এবং পরদিন ট্রেনে বসে তার সোৎসাহে আলোচনা। 

ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য 'তোর বাবা জল ঘোলা করেছিল' তেমন যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা একেবারেই অচল, খোঁড়া। বলেছে আমেরিকায় ড্রাগ-ট্রাফিকিং'এর কথা। কিন্তু বাস্তব সত্য হল, আমেরিকায় সমগ্র ড্রাগ ব্যবসার মাত্র এক শতাংশ ভেনেজুয়েলার অংশীদারিত্ব। বলা হয়েছে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এই আক্রমণের লক্ষ্য। প্রশ্ন আসে, তাহলে সৌদি আরবে তো কোনও নির্বাচনী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই নেই। সে দেশের সঙ্গে আমেরিকার মিত্রতা হয় কী করে? মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান মিত্র সৌদি আরব। এসবই আসলে খোঁড়া যুক্তি। 

ঘটনার উৎস লুকিয়ে আছে ১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জার ও সৌদি আরবের সঙ্গে করা একটি চুক্তিতে। এটি আসলে মার্কিন ডলারের বেঁচে থাকার বিষয়ে। ড্রাগ নয়, সন্ত্রাসবাদ নয়, 'গণতন্ত্র' নয়। এটি পেট্রোডলার সিস্টেম যা আমেরিকাকে ৫০ বছর ধরে প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রেখেছে। আর ভেনেজুয়েলা তা শেষ করার হুমকি দিয়েছে। সমগ্র আমেরিকান আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোডলার। হেনরি কিসিঞ্জার সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করেন-- বিশ্বব্যাপী বিক্রি হওয়া সমস্ত তেলের মূল্য মার্কিন ডলারে স্থির করতে হবে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি আরবকে সামরিক সুরক্ষা ও পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রদান করবে। এই একক চুক্তি বিশ্ব জুড়ে ডলারের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের তেল কেনার জন্য ডলার প্রয়োজন। ডলার পেতে গেলে সারা পৃথিবীর বাণিজ্য হবে আমেরিকা মুখী। এটি আমেরিকাকে অনিয়ন্ত্রিত নোট ছাপতে সুযোগ করে দেয়। এটি আমেরিকার সামরিক ব্যয়, জনকল্যাণ রাষ্ট্র ও ঘাটতি ব্যয়কে অর্থায়ন করে। পেট্রোডলার মার্কিন আধিপত্যের জন্য বিমান বাহিনীর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

ভেনেজুয়েলার তেলের মজুত ভাণ্ডার ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়। সৌদি আরবের থেকেও বেশি। বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ভেনেজুয়েলা সেই তেল চিনা ইউয়ানে বিক্রি করছিল, ডলারে নয়। ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলা ঘোষণা করে যে সে 'ডলার থেকে মুক্ত হবে'। তারা ডলার ছাড়া অন্য সব মুদ্রা ইউয়ান, ইউরো, রুবেল গ্রহণ করতে শুরু করে। তারা BRICS (Brazil, Russia, India, China, South Africa)'এ যোগদানের আবেদন করেছিল, চিনের সাথে সরাসরি পেমেন্ট চ্যানেল CIPS তৈরি করেছিল, যা সম্পূর্ণভাবে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত পেমেন্ট চ্যানেল SWIFT'কে অস্বীকার করে; আর কয়েক দশক ধরে এই ডি-ডলারাইজেশন চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট তেলের অধিকারী ছিল। ঠিক এখানেই আমেরিকার সমস্যা ও দুশ্চিন্তা। পেট্রো ডলার না বাঁচলে বিশ্ব বাণিজ্য আমেরিকা মুখী হবে না। সে ক্ষেত্রে আমেরিকায় অর্থনীতি ও পরিষেবা ভেঙে পড়বে। এমনকি অনিয়ন্ত্রিত নোট ছাপার ফলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে।

পেট্রো ডলারের বিরোধিতা করলে কী হয়, তার একটি প্যাটার্ন আছে। 

সাল ২০০০: সাদ্দাম হুসেন ঘোষণা করেন ইরাক ইউরোতে তেল বিক্রি করবে ডলারে নয়। ২০০৩'এ ইরাক আক্রমণ। শাসন পরিবর্তন। সাদ্দামকে ফাঁসি দেওয়া হয়। 

সাল ২০০৯: গাদ্দাফি তেল বাণিজ্যের জন্য 'গোল্ড দিনার' নামে একটি সোনা-ভিত্তিক আফ্রিকান মুদ্রা প্রস্তাব করেন। হিলারি ক্লিন্টনের ফাঁস হওয়া ইমেলগুলি থেকে জানা যায়, এটি ছিল হস্তক্ষেপের প্রধান কারণ, 'এই সোনা লিবিয়ান গোল্ডেন দিনারের ভিত্তিতে একটি প্যান-আফ্রিকান মুদ্রা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল।' 

২০১১: NATO লিবিয়ায় বোমা মারে। লিবিয়া এখন খোলা দাস বাজার। 

এবার মাদুরোর পালা। কারণ, ভেনেজুয়েলা সাদ্দাম ও গাদ্দাফির সম্মিলিত তেলের পাঁচ গুন বেশি তেল নিয়ে হাজির হয়ে খোলামেলা ভাবে ইউয়ানে বিক্রি করছে। ডলার নিয়ন্ত্রণের বাইরে পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করছে। BRICS-এ যোগদানের আবেদন করছে। চীন, রাশিয়া, ইরানের সাথে অংশীদারিত্ব করছে— এই তিন দেশই বিশ্বব্যাপী ডি-ডলারাইজেশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটি কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। পেট্রোডলারকে চ্যালেঞ্জ করলে শাসন পরিবর্তন হয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে এটাই সত্য। 

কতটা নির্লজ্জের মতো স্টিফেন মিলার (US Homeland Security Advisor) মাত্র দু' সপ্তাহ আগে মন্তব্য করেছেন, 'American sweat, ingenuity and toil created the oil industry in Venezuela. Its tyrannical expropriation was the largest recorded theft of American wealth and property.'। ভেনেজুয়েলার তেলের ভাণ্ডার যেহেতু মার্কিন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে আবিষ্কৃত হয়েছে, অতএব সেটার মালিকানা আমেরিকার। বলে কিনা ভেনেজুয়েলা আমেরিকার সম্পদ চুরি করছে। আমার দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, আর আমি হলাম চোর। একেই বলে যুক্তি। এই যুক্তিতে ভারতের রেল ব্যবস্থা, আধুনিক শিল্প জ্ঞান-বিজ্ঞান, সবকিছুর উপরেই ব্রিটিশের অধিকার। কারণ, তা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে চালু হয়েছিল। এরপর হয়তো বলা হবে, বিশ্বের সমস্ত আপেল বাগানের মালিক শ্বেতাঙ্গ প্রভু। কারণ, গাছ থেকে আপেল পড়ার বিজ্ঞানটি (মাধ্যাকর্ষণ) তাদের সূত্রায়িত। 

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তনীয় গুতেরেজ ট্রাম্পের এই ভূমিকাকে 'বিপদজনক পদক্ষেপ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। রাশিয়া চীন ইরান সরাসরি আমেরিকাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকেছে। খোদ মার্কিন মুলুকে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠরা ছাড়া সকলেই ভেনেজুয়েলা আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব। মার্কিন কংগ্রেসকে এড়িয়ে এই অভিযান চালানোর জন্য সে দেশের আইনসভাও সমালোচনায় মুখর। তবে এই মুখরতায় বিশেষ আশাবাদী হই না। মনে পড়ে ২০১৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ইমপিচমেন্ট হয়েছিল, ২০০৩ সালের ব্রিটিশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের বিবৃতি এবং চিলকট তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে। টনি ব্লেয়ার মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছ থেকে ২০০২ সালে গালফ যুদ্ধের অনুমোদন আদায় করেছিল। আরও উল্লেখযোগ্য, রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব কোফি আন্নান তখন মন্তব্য করেছিলেন, ইরাকে শাসক পরিবর্তন করাই ছিল আক্রমণের লক্ষ্য। তখন আমি সেটা মানতে চাইনি। গভীর দুঃখ ও ক্রোধের সাথে আমি এই ভুল স্বীকার করছি। আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রধান অভিযোগটা ছিল পার্লামেন্টকে ভুল তথ্য পরিবেশন করা। মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে ইরাকের লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও আশ্রয়হীন করাটা অপরাধ নয়। সংসদকে মিথ্যা তথ্য পরিবেশনটা অপরাধ। টনি ব্লেয়ার একটি মৌখিক ক্ষমা প্রার্থনা ও ভুল স্বীকার করে রেহাই পেলেন। আহারে গণতন্ত্র।

কিন্তু কথা হল, পেট্রোডলার ইতিমধ্যেই মারা যাচ্ছে। ইউক্রেনের যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া রুবেল ও ইউয়ানে তেল বিক্রি করছে। সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইউয়ান সেটেলমেন্ট নিয়ে আলোচনা করছে। ইরান বছরের পর বছর ধরে নন-ডলার মুদ্রায় বাণিজ্য করছে। চীন CIPS তৈরি করেছে, যা SWIFT-এর বিকল্প, ১৮৫টি দেশে ৪,৮০০টি ব্যাঙ্ক রয়েছে। BRICS সম্পূর্ণভাবে ডলার এড়িয়ে পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করছে। ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে ভেনেজুয়েলা BRICS-এ যোগ দিলে এই প্রক্রিয়া দ্রুত ত্বরান্বিত হবে। এই আক্রমণের আসল উদ্দেশ্য এটাই। চীন ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। ফলে, আমেরিকা বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। ডি-ডলারাইজেশনে আগ্রহী প্রতিটি জাতিকে বার্তা দেওয়া হয়েছে-- ডলারকে চ্যালেঞ্জ করলে আমরা বোমা ফেলব। 

এর সম্ভাব্য ফল কী হতে পারে? 

প্রথম সম্ভাবনা, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। তাদের 'ভেনেজুয়েলায় যাওয়া' সম্পর্কে যোগাযোগ করা হয়েছে। বিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তেল আবার ডলারে প্রবাহিত হবে। ভেনেজুয়েলা আরেকটি ইরাক, আরেকটি লিবিয়া হয়ে উঠবে। 

দ্বিতীয় সম্ভাবনা, যখন চীনের প্রতিশোধ নেওয়ার্ মতো যথেষ্ট অর্থনৈতিক লিভারেজ থাকবে, যখন BRICS বিশ্বের ৪০ শতাংশ জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং বলবে 'আর ডলার নয়', যখন বিশ্ব বুঝবে যে পেট্রোডলার বজায় থাকে সহিংসতার জোরে। কারণ, এই আক্রমণ প্রমাণ করে যে, ডলার নিজের যোগ্যতায় আর টিঁকে থাকতে পারছে না। যখন আমেরিকাকে মুদ্রা বজায় রাখতে গেলে দেশগুলিকে বোমা মারতে হয়, তখন সেই মুদ্রা মৃত্যুপথযাত্রী। নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। 

তৃতীয় সম্ভাবনা, ট্রাম্পের এই বার্তা ডি-ডলারাইজেশনকে থামানোর পরিবর্তে ত্বরান্বিত করতে পারে। কারণ এখন গ্লোবাল সাউথের প্রতিটি দেশ জানে, ডলারের আধিপত্যকে হুমকি দিলে কী হয়। এবং তারা বুঝতে পারছে যে একমাত্র রক্ষা হল দ্রুত এগিয়ে যাওয়া। কারণ, পরিস্থিতিটা যখন 'এগোলে মরতে হবে, পিছোলে মারা পড়বে', তখন এগিয়ে মরাই বাঞ্ছনীয়। 


ঋণ স্বীকার: পার্থ সারথি। 

#Venezuela twitter handle Ricardo @RIC_rtp


Wednesday, 7 January 2026

ইন্দোরের পর গান্ধিনগর-উজ্জয়িনী

জনস্বাস্থ্যের গণশত্রু কারা?

সোমা চ্যাটার্জি



এক মাস আগেই অফিসের কাজে ইন্দোর গিয়েছিলাম, আর মাস ঘুরতে না ঘুরতেই খবরের কাগজ পড়ে একটা বড় ধাক্কা খেলাম-- ইন্দোরে দূষিত পানীয় জলের কারণে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবে ১৬ জনের মৃত্যু, ১৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি, যার মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃতদের মধ্যে এক ছ' মাসের শিশুও আছে।

এমনিতেই কাজের সূত্রে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়, গত ছ' মাসের মধ্যে তিনবার যেতে হয়েছিল ইন্দোরে-- দেশের স্বচ্ছতম শহরের তক্‌মা পাওয়া শহরটি ঝকঝকে না হলেও তকতকে বলা  যায়, লোকজনও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং যথেষ্ট শৃঙ্খলা মেনেই চলেন। এ হেন শহরের এই ভয়ানক এপিডেমিকের খবরটা সত্যিই খুব পীড়াদায়ক। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে গত কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তত  ৫০০ লোক এই ভয়ানক জলবাহিত রোগের প্রকোপে অসুস্থ হয়েছেন। গত ৪ জানুয়ারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণের গ্রাউন্ড-জিরো ভাগীরথপুরা এলাকায় ৯০০০ জনেরও বেশি মানুষের সমীক্ষার সময় সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

অথচ ইন্দোরের মতো শহরে এইরকম রোগের প্রাদুর্ভাব হবার কারণ কী হতে পারে? খবরে প্রকাশ, ২০১৬-১৭ সালে ইন্দোরের আশপাশের গ্রামগুলির জলের নমুনা পরীক্ষা করে মধ্যপ্রদেশের রাজ্য দূষণ পর্ষদের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৩৮ শতাংশ জলই পানের উপযোগী ছিল না এবং ওই নমুনাতেই জলের মধ্যে মল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থের মিশ্রণ পাওয়া গিয়েছিল। তারপরেও টনক নড়েনি প্রশাসনের।

কেন্দ্রীয় সরকারের 'জল জীবিকা মিশন'এর রিপোর্টেও একই বক্তব্য। ভাগীরথপুরা (যেখানে মূলত এই মহামারীর আঁতুড়ঘর) ও অন্যান্য অন্তত সাতটি অঞ্চলে পানের অযোগ্য জল নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে যে বিষয়টি উদ্বেগজনক; কিন্ত অদ্ভুত ব্যাপার যে প্রায় এক দশক ধরে সেখানকার সরকার কার্যত কোনও ভূমিকা নেয়নি, বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত পানীয় জলের সুরক্ষার দিকে কোনও নজর দেয়নি কেউ। রাজ্যের কংগ্রেস সভাপতি জিতু পাটোয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, গত আট মাস ধরে ভাগীরথপুরা'র বাসিন্দারা অভিযোগ করে আসছিলেন যে পৌর নলের সংযোগ থেকে দূষিত জল আসছে, এমনকি জলের রঙ ও গন্ধ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল জল দূষিত কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাটওয়ারি অভিযোগ করেন, 'বাসিন্দাদের মতে, বর্তমানে ভাগীরথপুরায় পৌর ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সরবরাহ করা জলও দূষিত।' ২০১৯ সালের সিএজি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধুমাত্র ভোপাল ও ইন্দোরে ৫.৪৫ লক্ষ জলবাহিত রোগের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতি বছর প্রতি জেলায় ডায়রিয়া ও জলদূষণে কমপক্ষে ৫০,০০০  জন অসুস্থ হন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, 'শুধুমাত্র অক্টোবরে দূষিত জলের কারণে বারওয়ানীতে ২০০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কিন্তু কেউই  আমল  দেয়নি।' কংগ্রেস বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং বিজয়বর্গীয়কে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে, কারণ, তিনি নগর উন্নয়ন ও আবাসন দফতরের দায়িত্বে রয়েছেন এবং ভাগীরথপুরা তাঁর ইন্দোর-১ বিধানসভা কেন্দ্রের অংশ। জিতু পাটওয়ারি হুমকি দিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হলে তারা ১১ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু করবেন। তিনি ইন্দোরের মেয়র পুষ্যমিত্র ভার্গব ও সংশ্লিষ্ট পৌর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা দায়ের করার দাবিও জানান।

ভাগীরথপুরায় আক্রান্তদের মধ্যে শুধুমাত্র ডায়েরিয়াই নয়, গুলেন-ব্যারি সিনড্রোমের (জিবিএস) লক্ষণ দেখা গেছে যা একটি বিরল মারাত্মক স্নায়বিক ব্যাধি, যেখানে শরীরের ইমিউন সিস্টেম তার নিজস্ব স্নায়ুকে আক্রমণ করে। এটি প্রায়শই গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বা ভাইরাল সংক্রমণের পরে হয়, এতে প্রায় ১০ শতাংশ রোগী মারা যেতে পারে। ৬৭ বছর বয়সী মহিলা পার্বতী বাই গুলেন-ব্যারি সিনড্রোমে আক্রান্ত, যার চিকিৎসায় ইন্ট্রাভিনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আইভিআইজি) ইনজেকশন লাগে, যার প্রতি ডোজের দাম প্রায় ৩০,০০০ টাকা। রোগীদের প্রায়শই ৫-১০ ডোজ প্রয়োজন। প্রতি রোগীর মোট খরচ ১০-১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য স্বাস্থ্য প্রশাসন এই ঘটনার সঙ্গে জল দূষণের কোনও নিশ্চিত সংযোগ অস্বীকার করেছে। 

মধ্যপ্রদেশ সরকার শর্তাধীনে জল ব্যবস্থাপনার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের (এডিবি) কাছ থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল। সেই শর্তগুলির মধ্যে একটি ছিল, প্রতি ১৫ দিনে জল নিরীক্ষণ ও নিয়মিত জলের গুণমান পরীক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে কেউই বোরওয়েল, ট্যাঙ্কার, অনিরাপদ উৎসের গুণগত মান যাচাই করেনি, যার ফলেই সম্ভবত এই বিপর্যয়। তাছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ শৌচাগার উপচে মল দূষণ ছড়াচ্ছে জলে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উপরেও কারও কোনও নজর নেই।

ইন্দোর ধারাবাহিকভাবে ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে, সরকারের স্বচ্ছতা সমীক্ষায় পরপর একাধিক বছর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, শহরের বর্জ্য পৃথকীকরণ, জ্বালানি/কম্পোস্ট প্রক্রিয়াকরণ এবং সবুজ শহর রূপে স্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইন্দোর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্ত ইন্দোরের সাম্প্রতিক জল দূষণ সংকট সব তক্‌মা ছাপিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যা প্রখ্যাত জল সংরক্ষণবাদী রাজেন্দ্র সিং'এর (যাকে 'Waterman of India' বলা হয়) মতে, একটি গণহত্যারই সামিল, কারণ, এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন যে, এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী সরকারের চূড়ান্ত দুর্নীতি। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে তিনি বলেন, 'দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরে যদি এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে এটা বোঝা অসম্ভব নয় যে অন্যান্য শহরে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থার অবস্থা কতটা গুরুতর হতে পারে।'

৬ জানুয়ারি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, গুজরাতের গান্ধিনগরের সেক্টর ২৪ ও ২৮ এবং আদিওয়ারা এলাকায় পাইপে ছিদ্রের ফলে জল দূষণের কারণে টাইফয়েডে অন্তত ১০০ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মাত্র এক মাস আগেই ভোপালের ভিআইটি'তে জন্ডিস রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, ৩ জন পড়ুয়ার মৃত্যু হয় ও প্রায় ২৫ জন ছাত্র গুরুতর আসুস্থ হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যবিধি আমান্য করা ও খাবারের গুণগত মান খারাপের জন্য বার বার কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্ররা আর্জি জানালেও কোন লাভ হয়নি, যার ফলে ক্যাম্পাসের ভিতরেই ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়, এমনকি গাড়িতে আগুন পর্যন্ত লাগিয়ে দেয় ছাত্ররা। সেদিক থেকে দেখলে ভোপালের ঘটনাটির সঙ্গে ইন্দোর এবং গুজরাতের ঘটনার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, কারণ, এসবই একপ্রকার 'ব্যবস্থা-সৃষ্ট বিপর্যয়'। অদ্ভুত ব্যাপার হল, এর সব কটিতেই মোদি সরকারের 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান', 'স্বচ্ছতা মিশন'এর আড়ালে আসলে উন্নয়নের নামে ভড়ং চলছে এবং ফলে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন, তাঁর দিক থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আমি নিজেই ইন্দোরের রাস্তার উন্নয়নের সাক্ষী। যাওয়া আসার সময় চোখে পড়েছে ২০২৮ সালের কুম্ভ মেলার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে রাস্তা বানানোর তৎপরতা, বানানো হচ্ছে ভিআইপি করিডোর অথচ রাস্তা খোঁড়াখুড়িতেই নিকাশি লাইনের দূষিত জল মিশে যাচ্ছে পানীয় জলের সঙ্গে, যেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারও। ইন্দোরে আইআইটি ও আইআইএম'এর মতো বিশ্বমানের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও শহরের মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সরকারের এই উদাসীনতা স্বভাবতই তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে আমাদের মনে  প্রশ্নের উদ্রেক করে।

ইন্দোরের পরে দূষিত জলের আতঙ্ক এবার উজ্জয়িনীতেও। সেখানেও একাধিক এলাকা থেকে জল দূষিত হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে। ভাগীরথপুরায় জল দূষণে মৃত্যুর পরেই সতর্ক করে দিয়েছে উজ্জয়িনীর প্রশাসন। বাসিন্দাদের নলের জল পান না করে ফুটিয়ে  খাওয়ার আবেদন করা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে উজ্জয়িনীকে 'মন্দির নগরী' হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সরকারের সব রকমের প্রচেষ্টা থাকলেও মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকার ও চাহিদার দিকে কোনও আগ্রহ নেই সরকারের। সব চেয়ে বড় কথা, যে বিপুল পরিমাণ তীর্থযাত্রী ইন্দোর হয়ে উজ্জয়িনী বা নর্মদায় যাত্রা করেন, সেটিও এই দূষণে এক বড় ভুমিকা পালন করেছে বলাই যায়। 

নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে সম্পূর্ণ আলোকমালায় সজ্জিত উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার, প্রতিদিন কয়েক লাখ লোকের ভিড় জমে মহাকাল মন্দির দর্শনের জন্য এবং তারা সবাই যে শৌচাগার ব্যবহার করেন তার অবস্থা দেখলে আঁতকে উঠতে হয়; পরিষ্কার করার কোনও লোক নেই, লোকের পায়ে পায়ে মল পৌঁছে যাচ্ছে মন্দিরের দরজায় এবং মানুষ তাতেই মোক্ষলাভের আশায় সব ভুলে প্রসাদ খাচ্ছেন, পুজো দিচ্ছেন, মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন পুণ্য লাভের আশায়। সরকারের তরফে যে বিপুল টাকা মন্দির এবং নগর সুন্দরায়নে ব্যয় হয়, তার এক শতাংশও শৌচালয় বা পানীয় জল কিংবা পয়ঃমুক্ত জলের জন্য খরচ হয় না। একদিকে পুজোআচ্চা ধর্ম ইত্যাদিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে  মানুষকে কুসংস্কারগ্রস্ত করে তোলার জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এক ফোঁটা দূষণমুক্ত জলের জন্য হাহাকার করছেন, প্রাণ  হারাচ্ছেন প্রতিদিন, কিন্তু প্রশাসনের দিক থেকে এই চূড়ান্ত অব্যবস্থা সংস্কারের ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই। 

নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের লেখা ১৮৮২ সালের নাটক 'The Enemy of the People' অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচিত্র 'গণশত্রু' (১৯৮৯) ধর্মীয় ভণ্ডামি ও জনস্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব নিয়ে একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা দেয়। আজ ইন্দোর, উজ্জয়িনী বা গান্ধিনগরের মহামারির ঘটনাতেও আমাদের প্রকৃত গণশত্রুদের চিনে নিতে অসুবিধা হয় না।