রাজনৈতিক দিশাতেই কি বড় গলদ?
অয়ন মুখোপাধ্যায়
রাগ আছে— এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: এই রাগটা কাদের বিরুদ্ধে? পার্টির বিরুদ্ধে, নাকি পার্টির ভেতরে জমে ওঠা কিছু বিকৃতির বিরুদ্ধে? যে সংগঠন কেবল একটি নির্বাচনযন্ত্র নয়, বরং যে সংগঠনের ইতিহাসের ভেতর রক্ত, ত্যাগ আর মতাদর্শের দীর্ঘ অনুশীলন আছে, তার বিরুদ্ধে রাগ সহজে জন্মায় না। রাগ জন্মায় তখনই যখন প্রত্যাশা ভাঙে। যখন দেখা যায়, আদর্শের জায়গায় ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে, তাত্ত্বিক চর্চার জায়গায় কৌশলী নীরবতা, সাংগঠনিক গণতন্ত্রের নামে গোষ্ঠীসর্বস্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে বাম রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখেছি, গত দুই দশকে পার্টির নেতৃত্বের একাংশ ক্রমশ মতাদর্শিক দৃঢ়তা হারিয়েছে। রাজনৈতিক শিক্ষা কমেছে, তাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। পার্টি ক্লাস কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বহু জায়গায়। কর্মীরা কেবল মিটিং আর মিছিলের যান্ত্রিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ। বিপ্লবী পার্টির যে বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা, যে তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা, যে আত্মসমালোচনার ঐতিহ্য— তা আর দৃশ্যমান নয়। সমালোচনা করলে বা প্রশ্ন তুললেই তাকে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিন্নমতকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে পার্টির ভেতরে সেটাকে চেপে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে, সংগঠন ভেতর থেকে শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।
তবে এই সমস্যাকে নিয়ে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। কারণ, পার্টির চিন্তাভাবনার মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে কিছু গলদ জমেছে। ফলে, সংগঠন ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে বহু মানুষের কাছে। শুধু নৈতিকতার বুলি উচ্চারণ করলে বা সবাইকে বলতে দিলেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে না। বামপন্থার মৌলিক অবস্থান তার শ্রেণি-রাজনীতিতে, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীনতায়, রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র বিশ্লেষণে— এসব জায়গা থেকেই যদি পার্টি সরে আসে, তবে বিভ্রান্তি অনিবার্য। আজ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় জনতা পার্টি-র মতো শক্তির উত্থান এবং তার ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে গৌণ করে দেখা হয়েছে, ফলত, পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটারদের একাংশ সেই ফ্যাসিবাদের পক্ষেই সরে গেছেন। এই মূল রাজনৈতিক অবস্থানগত দুর্বলতার জায়গাতেই ধস নেমেছে। শুধু সাংগঠনিক ত্রুটি নয়, মতাদর্শিক স্খলনই পার্টির কাছে এখন সবচেয়ে বড় সংকট।
আরও একটি প্রশ্ন এখানে উঠে আসে— বর্তমানের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও লড়াইগুলির চরিত্র ও মাত্রা কি এক নতুন রাজনৈতিক সংজ্ঞা তৈরি করছে? উত্তর সম্ভবত, হ্যাঁ। কারণ, আজকের লড়াই কেবল জমি বা মজুরি নিয়ে নয়, পরিচয়, নাগরিকত্ব, সাংবিধানিক অধিকার, পরিবেশ, ডিজিটাল পরিসর— সব কিছুকে ঘিরে। আন্দোলনের ভাষা বদলেছে, সংগঠনের পদ্ধতি বদলেছে, নেতৃত্বের কাঠামো বদলেছে। স্বতঃস্ফূর্ততা ও নেটওয়ার্ক ভিত্তিক প্রতিবাদ অনেক সময় ঐতিহ্যগত পার্টি কাঠামোর বাইরে গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে যদি পুরনো ছকে ফেলা হয় তাহলে বিশ্লেষণ ভ্রান্ত হবে। নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ, তাদের রাজনৈতিক বোধ, তাদের সংগঠনের ধরণ— এসব বুঝতে ব্যর্থ হলে পার্টি ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়বে। বর্তমানে বহু বামপন্থী দল এই কারণেই অপ্রাসঙ্গিকতার সংকটে ভুগছে। সুতরাং সংকট শুধু নেতৃত্বের নয়, সময়কে বোঝার ক্ষেত্রে অক্ষমতারও। প্রতিটি সময় নতুন লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করে, আর সেই সংজ্ঞা নির্মাণে মতাদর্শের পুনঃপাঠ অপরিহার্য।
হালে প্রতীক উরের বক্তব্যে এই দ্বন্দ্বটিই স্পষ্ট হয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এত রাগ কেন পার্টির উপর? তাঁর উত্তর ছিল সরল ও তীব্র: 'এই পার্টির জন্য প্রাণ দিতে বসেছিলাম। অসংখ্য কমরেড প্রাণ দিয়েছেন। রাগ পার্টির উপর নয়। রাগ তাঁদের উপর যারা কর্মীদের চুপ করিয়ে রাখতে চান। হাজার হাজার কর্মী প্রতিদিন সংগঠনের ভেতরেই অপমানিত হন। তাঁদের রাগও পার্টির বিরুদ্ধে নয়, কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে।' এই বক্তব্যের মধ্যে আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় এক কথা আছে যেখানে লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক সততার উচ্চারণ ও প্রশ্ন করার সাহস। কারণ, যে সংগঠনের প্রতি টান নেই, যে সংগঠনকে ভালোবাসে না, তার বিরুদ্ধে কেউ ক্ষুব্ধ হয় না। এখানে রাগ আসলে প্রত্যাশার অন্য নাম। রাগ মানে বিচ্ছেদ নয়, রাগ মানে ভাঙা বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা।
সমস্যাটা আরও প্রকট হয় যখন সংগঠন ধীরে ধীরে মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠে। যখন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নীতি অনুপস্থিত থেকে ব্যক্তি প্রাধান্য পায়। যখন শাখা স্তরের কর্মীর প্রশ্ন বা আবেগকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে রাখা হয়, তখন সেই সংগঠন আর বিপ্লবী থাকে না, সেটি কেবল নির্বাচনী যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। তখন সাংগঠনিক কাজ হয়ে দাঁড়ায় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এখান থেকেই বামপন্থার ক্ষয় শুরু হয়, যার সূত্রপাত সংগঠনের ভেতরেই।
বামপন্থী দলগুলির মধ্যে যে সংগঠন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা এমন নেতৃত্বের হাত ধরে যাঁরা ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেমন জ্যোতি বসু কিংবা বিনয় চৌধুরী— তাঁদের রাজনৈতিক চরিত্রে সংযম, তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ছিল স্পষ্ট। মতবিরোধ ছিল, বিতর্ক ছিল, কিন্তু ভাবনার কেন্দ্রে ছিল মতাদর্শ। আজ যদি সেই ভাবনার কেন্দ্রে অন্তঃসারশূন্যতা দেখা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় পার্টির অভ্যন্তরীণ চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে, সংগঠনের ভিতরের অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসছে। এর দায় কার? এই বিষয়ে কি কখনও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হবে? সত্য কি সামনে আসবে? উত্তর অজানা। ফলে সংগঠনের প্রশ্নে কর্মীদের মনে অসন্তোষ থেকেই যাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অসন্তোষকে কি আমরা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করতে পারছি? বাস্তবতা বলছে, পারছি না। কারণ, নির্বাচনের মুখে কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় প্রকাশ্য নেতৃত্ব যদি অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেন, তাহলে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হয়। আত্মসমালোচনা জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে সংগঠনের ভেতরে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে। প্রকাশ্য আত্মপ্রসাদ সংগঠনকে শুদ্ধ করে না, বরং দুর্বল করে। আবার এটাও সত্য, যদি ভেতরে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অসন্তোষ বাইরে বেরবে। তাই সংগঠনের ভেতর এমন এক পরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে মতভেদকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না, বরং মতান্তরের মধ্য দিয়েই নতুন পথ ও নতুন চিন্তার জন্ম হবে।
একটি বিপ্লবী পার্টির বৈশিষ্ট্য কেবল তার ঘোষণাপত্রে নয়, তার কর্মীদের চলাফেরায়, ভাষায়, রাজনৈতিক সচেতনতায় ফুটে ওঠে। যদি সেই চরিত্রই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব কোনও আগ্রহের বিষয় নয়। মানুষের মাথাব্যথা তার রোজগার, অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা নিয়ে। জনগণ দেখতে চায়, পার্টি তাদের জীবনের প্রশ্নে কতটা প্রাসঙ্গিক। সাধারণ মানুষ ব্রাঞ্চ, এরিয়া কমিটি, জেলা কমিটি বা পলিটব্যুরোর জটিল কাঠামো বুঝতে চান না। তারা বোঝেন, কে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, আর কে নয়। একজন কর্মী পার্টি ছেড়ে চলে যেতেই পারেন। কিন্তু যদি হাজার হাজার সৎ কর্মীকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পার্টি ফাঁপা হয়ে যাবে। পার্টি ভাঙে বাইরের আক্রমণে নয়, ভেতরের অবক্ষয়ে। আবার পুনর্জন্মও শুরু হয় ভেতর থেকেই— আত্মসমালোচনার সাহস, মতাদর্শে প্রত্যাবর্তন এবং ব্যক্তির উপর নীতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
রাগ আছে। কারণ, ভালোবাসা আছে। এই সংগঠনের ইতিহাস এখনও মূল্যবান। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়, রাগ কি বিভাজনের হাতিয়ার হবে, নাকি বামপন্থার পুনর্জাগরণের সূর্যোদয় ডেকে আনবে? এর উত্তর হয়তো সময় বলবে। তবে সমস্ত উত্তর নির্ভর করছে তাদের উপর, যারা এখনও নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, যারা পার্টির প্রতি বিশ্বাস হারাননি, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে ভয় পান না। সেই প্রশ্নই এখন পার্টির প্রকৃত শক্তি।
প্রশ্ন উঠুক, এই মুহূর্তে পার্টির রাজনৈতিক দিশা ও বাস্তব কর্মসূচিতে কি বড়সড় কোনও গলদ আছে? মূল্যায়ন করতে হবে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে কেন ধারাবাহিক ভাবে বাম ভোট বিজেপি'র বাক্সে পড়ে বামপন্থীদের শক্তিকে এতটাই নগণ্য করে দিচ্ছে? তার দায় কি আমাদের রাজনৈতিক দিশাহীনতার মধ্যে লুকিয়ে নেই?
প্রথমত ও প্রধানত, সিপিএম বামপন্থী না, অন্য যা কিছু হতে পারে কিন্তু বাম না।
ReplyDeleteকাজেই তাদের দলে বাম আদর্শ পালনের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। এই পোর্টালের লেখক ও সম্পাদকের বাম-ঢেকুর থাকতেই পারে, অনেকেরই যেমন তিন বিচি থাকে। তো সিপিএম দলের নেতাদের নিজের দলে থেকে ভোটে লড়ে জেতা অসম্ভব, নিজের বুথেই ভোট পায়না। সেই জন্যেই দলত্যাগ। আর কবে বিয়ে হবে, বেলা যে পড়ে এলো -- এই সিনড্রোমে আক্রান্ত সবাই, তাই দলত্যাগ। এর বেশি কিছু খুঁজতে গেলে বাঁজা মাথা চ্যুইংগাম আশ্রিত হবে মাত্র, আর কিছু না। আবর্জনা ঘাঁটলে, দুর্গন্ধের বাস্তবতাই বেরোবে। ফুল বাংলা থেকে ইংরেজি বানানে গেলেই চিত্তির।
অত্যাচারিত, নিপীড়িত, দলিত, সর্বহারাদের প্রতি কর্তব্য নিষ্ঠা ও সমর্থন, আর সিপিএম কখনোই সমার্থক নয়। সুতরাং বাম মানেই সিপিএম নয়।
ReplyDeleteএ ছাড়া, কোনোও সুস্থ চিত্তের মানুষ বর্তমানের কোনোও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী সমর্থক হ'তে পারেন না।
দিশা হীন নয় বরং দিশাতেই গলদ, ঠিকই বলেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী শত্রু নির্ধারণ করলে বিজেপি হতো প্রধান শত্রু। কিন্তু ৩৪ বছরের ক্ষমতার সিংহাসনের সাপেক্ষে প্রধান শত্রু তৃণমূল। এইখানে এসেই দ্বিতীয় শত্রু প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে ষাঁড়ের শত্রু বাঘে খাক এই যুক্তি অনুযায়ী পাইকারি হারে সিপিএমের ভোট বিজেপিতে চলে গেছে। এখন আর তা ফিরছে না।
ReplyDeleteআমাদের সমস্যা হল, ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর কোন বিরক্তি বা বিরাগ তৈরি হলেও আমরা কোন বিকল্প বিরোধী দল পাচ্ছিনা। কারন সেই জায়গাটা দখল করে আছে বিজেপি। আমরা প্রধান শত্রু চিনতে ভুল করছি না। তাই আমাদের কাছে কোন বিকল্প নেই।
কথাটা বলেছিলাম সংবাদ মাধ্যমের তর্কের আসরের এক নিয়মিত সিপিএম নেতাকে।বলেছিলাম, যখন রানের খরা চলে,তখন সব বলে রান পাওয়া যায় না। আগে দু-চারটে বল খেলে নিতে হয়। এটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ নয়। আগে বিরোধী দলের মর্যাদা বা ভূমিকাটা লাভ করতে হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান অধিকার হোক প্রধান লক্ষ্য। তবেই তো বিকল্প সরকার হিসেবে আপনাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। জবাবে সেই নেতা বলেছিল, তার মানে বামেদের হাতে তৃণমূল তামাক খাবে, আর আমরা দর্শক থাকবো।
তাহলেই বুঝুন।