বাংলা ও বাঙালির বাঁচার লড়াই
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
বিজেপি’র আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের নতুন অস্ত্র SIR’এর ধুরন্ধর আক্রমণের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ বিহারের মাটি থেকে উঠেছিল, তাকে বাংলা ও দেশবাসীর পক্ষ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শীর্ষ আদালতে এক কার্যকরী ও নির্ধারক জায়গায় পৌঁছে দিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সুপরিচিত ভঙ্গিতে যে সওয়াল করলেন তা রাজনৈতিক লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই অভিনব ঘটনার সঙ্গে কিছুটা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সালের ১৮ এপ্রিল চম্পারণের মোতিহারি জেলা আদালতে নিজে দাঁড়িয়ে নিজ পক্ষে গান্ধীজীর সওয়াল করার স্মৃতি মনে আসতে পারে। দুই ঘটনার বাস্তবতা আলাদা হলেও প্রেক্ষিত ছিল প্রায় একই, যেখানে জনতার ওপর নেমে আসা একতরফা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, আইনি কূটকচালিকে অতিক্রম করে সর্বস্তরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগ্রগণ্য ভূমিকা দাবি করে।
দেশ আজ যে কী ভয়ঙ্কর গহ্বরে প্রবেশ করেছে তা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান। আমরা দেখলাম, গত ২ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালতের এক শুনানিতে ভারত সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার মেহতা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দীর্ঘদিন বন্দী দেশের অন্যতম শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক’এর জামিনের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রকারান্তরে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বললেন যে তিনি নাকি GenZ’কে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামার আহ্বানও এখন এ দেশে দেশদ্রোহ! অথচ, ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত রাম রহিম বা আশারাম বাপু দু’ দিন পর পর নিয়মিত দিব্যি জেল থেকে প্যারোলে বেরিয়ে ঘরে-বাইরে আরামে জীবনযাপন সেরে নেয়। অথবা, আমরা এখনও জানি না, এপস্টাইন ফাইলের স্তূপ থেকে মহামহিম মোদি মহারাজের আর কী কী কীর্তি প্রকাশ পাবে এবং সে জন্যও তাঁর আদৌ কোনও বিচার হবে কিনা! অথচ, টানা পাঁচ বছর ধরে ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে এখনও বিনা বিচারে জেলে পচতে হয় শারজিল ও উমর খালিদ’কে।
এই এখন নতুন ভারতবর্ষ।
এই নতুন ভারতবর্ষেই এবার শুরু হয়েছে বাঙালি নিধনযজ্ঞের ব্যাপক প্রস্তুতি ও সূত্রপাত। কতকটা হিটলারের ইহুদি নিধন অথবা একদা দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস বানিয়ে রাখার মতো। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে গত কয়েক মাস ধরে বেছে বেছে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের পুলিশ চূড়ান্ত হেনস্থা করছে, ‘বাংলাদেশি’ বলে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে, অনেককে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক করে ওই দেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অ-বিজেপি রাজ্যগুলিতেও বিজেপি লালিত হিন্দুবাদী সংগঠনগুলি মারফত পরিযায়ী বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে পিটিয়ে মেরেও ফেলা হচ্ছে। এই নিধনযজ্ঞ আরও ফলপ্রসূ হতে পারে যদি দেশ জুড়ে এক ভয়ঙ্কর নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ (অর্থাৎ, এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ওপর ওপর দেখলে মনে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই যেন সব কিছু হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা চরম ফ্যাসিবাদ, যেমন রাশিয়া ও বর্তমানে উক্ত পথে অগ্রসরমান আমেরিকা) চালু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সহ যাবতীয় ক্ষমতা সমূহকে দখল করা যায়। তা কতকটা সফলও হয়েছে।.২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় ফল করার পর বুঝে যায় যে তাদের দিন এবার সমাগত, যদি না ভোটার তালিকায় কিছু বড় ধরনের ঘোটালা পাকিয়ে সব তছনছ করে দলীয় আদর্শ অনুসারী একটি তালিকা তৈরি করা যায়। ইতিমধ্যে সিবিআই-ইডি-আয়কর ইত্যাদি এজেন্সিগুলিকে নিজেদের দাসানুদাস বানাবার পর পরই তারা আইন বদলে নির্বাচন কমিশনকেও নিজেদের তাঁবে নিয়ে এসেছে। এবার আর দেরি কেন! কমিশন যখন হাতের মুঠোয়, কমিশনাররা যখন সব তুরুপের তাস, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভোটার তালিকার খোলনলচে বদলে দেওয়ার ‘মাদারি কা খেল’ তো বাঁ হাতের ব্যাপার। তাই হল! লোকসভা নির্বাচনের পর পরই ভোটার লিস্ট লণ্ডভণ্ড করে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের নামে যা হল তা সাদা বাংলায় ‘প্রহসন’ বৈ আর কিছু নয়। একদিকে বিপুল সংখ্যায় বাদ দেওয়া হল বিজেপি-বিরোধী ভোটারদের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মারফত বুথ ধরে ধরে আগের নির্বাচনে ভোটদানের তথ্যের ম্যাপিং করে), অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিজেপি ভোটারদের ব্যাপক নাম ঢুকিয়ে পালটে দেওয়া হল ভোটার তালিকার মৌলিক চরিত্র। বিজেপি’র রথ ছুটল উর্ধ্বশ্বাসে, নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের ভিত্তিভূমি তৈরি হল।
আর এই সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা বধের পালা! কারণ, বাংলা হল সেই ভূমি যেখান থেকে উদিত হয়েছে সর্বধর্ম সমন্বয় ও উদারতার চেতনা। চৈতন্য ও লালন এখানে হাত ধরাধরি করে এখনও হেঁটে চলেন। ইসলামি সুফিতন্ত্র ও হিন্দুয়ানার ভক্তিযোগ বাংলার আকাশে-বাতাসে চির প্রবহমান। তাই, বাংলাকে ছিন্নভিন্ন এবং বাঙালিদের গৌরব ও অস্মিতাকে ধ্বংস না করতে পারলে নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের অবয়ব নির্মিতি সম্পূর্ণ হয় না। কারণ, বাংলাই সেই প্রতিরোধের শেষ দূর্গ যা সারা দেশকে গত পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তি ও স্বস্তি দিয়ে গেছে। এ কথা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জানে আর সে জন্যই তাদের যাবতীয় অপচেষ্টা।
এই অসহনীয় ও দুর্বিষহ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলার মাটিতে কবরে যাওয়া মীরজাফর-উমিচাঁদের প্রেতাত্মা ও তাদের উত্তরসূরীরা আবারও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ সেই সরকারবাড়ির ‘ধেড়ে আনন্দ’ ও পূর্ব মেদিনীপুরের জনৈক মেজখোকার যৌথ নেতৃত্বে উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত একপাল খোকাখুকুর দল তাদের জাল ছড়িয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরার খেলায় নেমে পড়েছে। এ লড়াই বাংলায় বরাবরই ছিল। যে ধেড়ে খুকু খুব আপসোস করে বলেন যে বাংলার ‘ডেমোগ্রাফি’ বদলে যাচ্ছে, সব মুসলমানে ছেয়ে গেল গা, নধরকান্তি সঞ্চালক হৈ হৈ করে হাবিবপুর সীমান্তে শ’খানেক লোককে বসে থাকতে দেখে ক্যামেরা তাক করে ফাটা রেকর্ডের মতো বলতে থাকেন যে ওই ওই পালাচ্ছে, লাখে লাখে রোহিঙ্গা পালাচ্ছে, তারা যে বাংলার ওপর আজকের বর্গী আক্রমণে বেজায় খুশি তা বলাই বাহুল্য। এরাই হল বাঙালিদের সেই ক্ষমতাধারী উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত উত্তরাধিকার যারা নবদ্বীপে চৈতন্য মহাপ্রভুর নগর সংকীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের হয়ে দালালি করেছিল, লালনের আখড়া ভেঙে দিয়েছিল, বিদেশ থেকে ফেরার পর স্বামী বিবেকানন্দকে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে পরিত্যাগ করেছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ঢিল ছুঁড়ে অপমানে জর্জরিত করে কলকাতা ছাড়া করেছিল, ১৯৩৭ সালে বঙ্গদেশে ফজলুল হকের সরকারকে আখ্যায়িত করেছিল ‘বাংলার মসনদে এখন এক চাষা বসেছে’; এদেরই প্রগাঢ় উত্তরসুরী চন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৪ সালে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে একটি ছাতামাথা বই লিখে বিধবা বিবাহ ও স্ত্রী-শিক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন। আজ সেই এরাই, কেন্দ্রে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী শাসকের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে বাংলায় কবর ফুঁড়ে উঠে আসার চেষ্টা করছে।
SIR তাই মামুলি ভোটার তালিকা সংশোধনের কোনও কার্যক্রম নয়; তা মুসলমান বাঙালি, নমঃশূদ্র বাঙালি, সুফিতন্ত্রে প্রভাবিত বাঙালি, বাউল সাধনায় ধৌত বাঙালি, উদারতার পরশে নবজন্মে রাঙা বাঙালি, বিচিত্র সম্ভারে শ্রমশীল বাঙালি, কবি-লেখক-গায়ক-চিত্রকর ও সৃষ্টিশীল বাঙালি, যাদের গত ৫০০ বছরের অর্জিত সমস্ত সম্মান ও বোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী কৌলিন্য প্রথাকে ফিরিয়ে আনার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা। আমাদের অর্জিত বোধ ইতিহাসের মর্মে লিপিবদ্ধ যেখানে নবাব সিরাজদ্দৌলা গঙ্গার ঘাটে নৌকায় বসে রামপ্রসাদ সেনকে গাইবার অনুরোধ করলে তিনি শোনান, ‘আমায় দাও মা তবিলদারি/ আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’, হিন্দু ব্রাহ্মণেরা চৈতন্যদেবের নগর সংকীর্তন বেআইনি ঘোষণা করলে বাংলার সুলতান হুসেন শাহ চৈতন্যদেবের পাশে এসে দাঁড়ান, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে (১৮৫৭) ব্যারাকপুর ও বহরমপুরে এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ বাঙালি মানুষ যে ঐক্য-সংস্কৃতির পরিচায়ক ছিলেন, তাইই আমাদের গৌরব ও পরম্পরা। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও এই পরম্পরা অটুট আছে বটে কিন্তু বহির্শত্রুর যে তীব্র আক্রমণ ও মরীয়া প্রচেষ্টা বাংলাকে দখলে নেওয়ার, সঙ্গে মীরজাফর-নরেন গোঁসাই, সাভারকার-শ্যামাপ্রসাদের শিষ্যরা, ইডি-সিবিআই’এর ভয়ে কিছু দালাল-সাংবাদিক ও প্রচারক, তাতে আমাদের বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, কিন্তু লড়াইও হয়ে উঠছে সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী।
এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রাজ্যের বাকী সব তথাকথিত বিজেপি বিরোধী দলগুলি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও ‘বিজেপি বনাম তৃণমূল’ এই অঙ্কে ভাবতে গিয়ে কোণঠাসা ও জনবিচ্ছিন্ন, বরং উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত ভাবনার ফাঁদে পড়ে আরও ল্যাজেগোবরে অবস্থা তখন সাধারণ শ্রমজীবী-নিম্নবর্ণ ও আঘাতপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণ কিছু মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে প্রায় প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল যে সহায়তা ও সমর্থন জুগিয়ে গেছে এবং এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে সর্বতোভাবে লড়াইকে এক উচ্চমার্গে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, তা শুধু এ রাজ্যে নয় গোটা দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ফলে, বিজেপি পাড়ায় পাড়ায় বা গ্রামেগঞ্জে লোক তো আর পাচ্ছেই না, বরং বাম ও অন্যান্যদের অবস্থা আরও করুণ দেখাচ্ছে যখন তারা মমতার সার্বিক এই রণংদেহী অবস্থানকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে আরও জনবিচ্ছিন্নতার বিপাকে পড়ছে।
এখন দেখার, সংসদীয়, অসংসদীয় ও ন্যায় বিচারের পথে যে লড়াইয়ের ধারাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল গড়ে তুলেছে তা সারা দেশে মোদি জমানার ‘নিয়মতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ’এর সার্বিক পরাজয়ের কারণ ও সড়ক হয়ে উঠতে পারে কিনা। ইতিমধ্যেই অখিলেশ যাদব ও ওমর আবদুল্লা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এই লড়াইয়ে মমতার সঙ্গে আছেন। আমরা তাকিয়ে রইলাম আগামী দিনের দিকে।

আপাতত ২৬ + ৫ = ৩১ অবধি বাংলা ও আমরা বিজেপির নখ আর থাবা থেকে নিরাপদ।
ReplyDelete(RSS ঘাপটি মেরে থাকবে, ফিসফিস করে বিষ ঝাড়বে, যদি না ...)
আর আমাদের দীর্ঘ লালিত সাংস্কৃতিক লিগ্যাসি তো একটা প্রবচন শিখিয়েই দিয়েছে, রাখে হরি মারে কে / মারে হরি রাখে কে।
অতএব ...
ভুয়ো ভোটার আর কারচুপি নিয়েই চিন্তা।
ReplyDelete