কিছু কি ঘটতে চলেছে!
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
ইতিহাসের গলিপথে কে কখন কোন আড়াল থেকে সামনে এসে পড়ে, তা কে জানে! যখন চারপাশে পুঁতিগন্ধময় আবর্জনার স্তূপ জমে ওঠে, সবাক মানুষের কন্ঠস্বরও থাকে অবদমিত, তখন কিলবিল আরশোলার দল হয়তো বেরিয়ে এসে ছেয়ে ফেলে গলি ও রাজপথ। কে জানত, কোটা বিরোধী আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের সে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে সম্বোধন করবেন, গোটা দেশ সেই আবর্জনা ঠেলে এমন ভাবে উঠে দাঁড়াবে যে তা ইতিহাসে 'জুলাই গণ অভ্যুত্থান' পরিচয়ে এক পালাবদলের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। 'রুটি নেই তো কেক খেলেই পারে'-- এই উক্তিও ছিল রাজবাড়ির ক্ষমতার অলিন্দ থেকে উৎসারিত, যার পরিণতিতে বিশ্ব পেয়েছে সাম্য-স্বাধীনতার এক দুর্লভ প্রেরণা ও ধারণা। ইতিহাসে এমনতর বাঁক অযূত। সেই ধারাবাহিকতাতেই আমাদের দেশে যুবদের আজ 'আরশোলা' সম্বোধন, যা শুধুমাত্র উচ্চপদে থাকা এক ব্যক্তির মুখনিঃসৃত তিরস্কার মাত্র নয়, বরং এক পচাগলা ব্যবস্থায় কাতর মানুষজনের প্রতি উদগত এমন এক অপমানজনক উচ্চারণ যা দেশের আগাপাশতলা ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর তারপরেই যেন বিস্ফোরণ।
কোনও অফিস নেই, ফান্ডিং নেই, কোনও পরিকল্পনাও নেই; 'আরশোলা' তিরস্কার শোনার পর ১৬ মে একটি প্রতিস্পর্ধী ট্যুইট: 'সব আরশোলারা এক হলে কেমন হয়।' লিখলেন ৩০ বছরের যুবক অভিজিৎ দিপকে। তারপরই সুনামি। এখন আমরা সবাই জানি, পর পর কী ঘটেছে। মাত্র ৫-৬ দিনে ২ কোটি ২০ লক্ষ ফলোয়ারে ভরপুর 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট'টিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ২০ ঘন্টা লড়ে আজ (২৪ মে) আবার সেটিকে তাঁরা পুনরুদ্ধার করেছেন। বন্ধ করা হয়েছিল ককরোচ পার্টির ওয়েবসাইটও; অল্প কিছু ঘন্টায় আবারও নতুন করে তাঁরা তা বানিয়ে নিয়েছেন, এবার আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও বিস্তৃত। কাদের নির্দেশে ও কারিকুরিতে এই নিষেধাজ্ঞা, তা সকলেই জানেন।
এতসব বাধা-বিপত্তি, আক্রমণকে প্রতিরোধ করে এখন কোন পথে, কীভাবে এগোবে আরশোলার দল? কিন্তু যে আচম্বিতে এই কাণ্ডটি গত ৬-৭ দিনে ঘটে গেল, তাকে বলা যায়, সবে তো কলি'র সন্ধ্যে। অতিশয় বকবক করা কতিপয় বিজ্ঞজনেরা কিছুটা ভুরু নাচিয়ে বলছেন বটে, একটা নতুন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন বই আর তো কিছু নয়; কিন্তু মাটিতে আরশোলার তীব্র কটূ গন্ধ যেন অন্য কথা বলছে! সেই মোতাবেক অনলাইন স্যাটায়ার বা মিম (Meme) হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এই প্রবণতাটি এখন বাস্তব মাঠের রাজনীতি ও আইনি জটিলতায় ধীরে ধীরে এক সামাজিক রূপ নিচ্ছে। পাঁচটি মূল দাবি নিয়ে তাঁরা সোচ্চার হয়েছেন:
১) কোনও প্রধান বিচারপতিকে অবসর-পরবর্তী পুরস্কার হিসেবে রাজ্যসভার আসন দেওয়া যাবে না;
২) যদি কোনও বৈধ ভোটারকে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে UAPA'র অধীনে ব্যবস্থা নিতে হবে;
৩) মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ চাই;
৪) আদানি ও আম্বানিদের মালিকানাধীন সমস্ত মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে এবং গোদি মিডিয়ার সঞ্চালকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে;
৫) যে কোনও বিধায়ক বা সাংসদ দল বদল করলে তাকে আগামী ২০ বছর কোনও নির্বাচনে প্রার্থী বা সরকারি পদ দেওয়া যাবে না।
ফলে, এইসব দাবি-দাওয়া সহ ককরোচ পার্টির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা দেখে, প্রথম রাতেই, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(A) ধারায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এদের মূল X অ্যাকাউন্টটিকে ভারতের সীমানায় প্রথমে ব্লক বা স্থগিত করে দেয়। এর জবাবে তারা তৎক্ষণাৎ ‘Cockroach is Back’ নামে নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে লড়াই জারি রাখে। কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দিল্লির তরুণ সমর্থকেরা আরশোলার পোশাক পরে যমুনা নদী পরিষ্কার করার মতো প্রতীকী সমাজসেবামূলক নাগরিক প্রতিবাদও গড়ে তোলে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে ককরোচ পার্টির সমর্থকেরা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছে (যাতে এই বিপুল অনলাইন সমর্থনকে বাস্তব ভোটে রূপান্তর করা যায় কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে)। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ থেকে আরশোলায় এই 'মেটামরফোসিস' যেন আবালবৃদ্ধবণিতার মনের ভেতর কোথাও জমাট বেঁধে ফেলেছে। শাসক তাকে যতই ভ্যানিশ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিক না কেন, তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে কোনও রাজনৈতিক অভিঘাতের লক্ষ্যে।
স্পষ্ট ভাষায় অভিজিৎ জানিয়েছেন, কোনও গোদি মিডিয়াকে তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন না। হন্যে হয়ে ঘুরেও কোনও গোদি মিডিয়া তাঁর টিকি'র নাগালটুকুও পায়নি (ব্যতিক্রম 'ইন্ডিয়া টুডে')। এই মুহূর্তে তাদের প্রধান দাবি: NEET পরীক্ষায় দুর্নীতির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। এই দাবিতে চলছে অনলাইন পিটিশনে সই সংগ্রহের কার্যসূচি। অবশ্য, তাদের ওয়েবসাইটটি হ্যাক হয়ে যাওয়ায়, ৬ লক্ষেরও বেশি স্বাক্ষর সংগৃহীত সে পিটিশনের বর্তমান কী হাল তা এখনও জানা যায়নি। বলাই বাহুল্য, ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) এই ঝড়ের মতো উত্থান ভারতীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে:
১) কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক গালিগালাজকে কীভাবে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপান্তরিত করা যায়, CJP তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আগে ইউরোপ-আমেরিকায় ‘স্যাটায়ার পার্টি’ দেখা গেলেও ভারতে এটিই প্রথম, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা কোনও গম্ভীর ইশতেহার নয়, বরং মিম কালচার;
২) তরুণ প্রজন্মের এই দ্রুত ও বিপুল সাড়া প্রমাণ করে যে তারা দেশের বর্তমান সরকার ও প্রথাগত বিরোধী দল উভয়েরই গৎ বাঁধা রাজনীতি ও প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হারিয়েছে। NEET কেলেঙ্কারি ও কর্মসংস্থানের অভাব সহ বহু অন্যায়-অত্যাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুবসমাজের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তা অতি স্পষ্ট;
৩) ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আজকের রাজনীতিতে যে কোনও ওলটপালট হয়ে যেতে বিশেষ সময় লাগে না। জনতা যেন প্রস্তুত হয়েই থাকে, শুধু শুরু করার মুহুর্তটিকে যথাযথ ভাবে বেছে নিতে হয়;
৪) রাজনীতির চলন শুধুমাত্র আর সাবেক রাজনৈতিক দল বা বিশেষ নেতার ওপর নির্ভর করছে না। যে কোনও মুহূর্তে একটি প্রতিষ্ঠিত বা ক্ষমতাসীন দল সমাজ পরিসর থেকে যেমন মিলিয়ে যেতে পারে, তদুপরি, কোনও অচেনা ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কিংবা নতুন গোষ্ঠী ও দল চকিতে নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে।
ককরোচ জনতা পার্টি কোনও নিবন্ধিত দল নয়, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এটি প্রথাগত নির্বাচনী দল হয়ে উঠবেও না। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিজেই জানিয়েছেন, তাদের আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল নয়, বরং সিস্টেমের ঘুম ভাঙানো। তবে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নীতি-নির্ধারকদের জন্য এই ‘আরশোলা বাহিনী’ আপাতত একটি কড়া বার্তা দিয়েছে— ভারতের বৃহত্তম জনসংখ্যা বা যুবসমাজকে অবহেলা বা উপহাস করলে, তারা ডিজিটাল স্পেসকে বদলে দিয়ে যে কোনও সময় ক্ষমতার সমীকরণকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এখন পর্যন্ত তারা ডিজিটাল পরিসরকে ওলটপালট করেছে বটে, কিন্তু দেখার, এই আন্দোলন বাস্তবিক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং কতটা ক্ষমতা ধরে। তবে ইতিমধ্যেই অভিজিতের কাছে হুমকি ফোন আসতে শুরু করেছে, তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর মা-বাবা'কেও বিপদে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

Beshi
ReplyDelete