Thursday, 3 April 2025

'পরিপূরক শুল্কের' গুঁতোয়

ভারত কি শুধু দেখবে?

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


 

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল ২০২৫’কে ‘মুক্তির দিন’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। অস্যার্থ, ওইদিন তিনি মার্কিন জনগণকে বিশ্বের অর্থনৈতিক জাঁতাকল থেকে মুক্তি দেবেন। ‘আমেরিকাকে আবার সেরা বানানো’র অভিলাষে তিনি ওইদিন নিজ দেশে বিদেশি আমদানির ওপর এমন শুল্ক চাপাবেন যে বাকী দেশ সব হাহাকার রবে পিষ্ট হবে এবং ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে তাঁর চরণতলে আছাড়িবিছাড়ি খাবে! বিশেষ করে চীন, কানাডা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ভারতকে (প্রিয় বন্ধুবর মোদীজীর কথা ভুলে মেরে) এমন শিক্ষা দেবেন যে এরপর আর আমেরিকাকে তার চলার পথে কেউ রুখতে পারবে না।

ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প যে ভাবে গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা’কে নিজের দেশে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের তামাম আশঙ্কাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্যারিস চুক্তি থেকে সটান পিঠটান দিয়েছিলেন, ধরে ধরে ‘বেআইনি’ অভিবাসীদের প্লেনে তুলে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছিলেন (ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল পরিয়ে), সরকারি কর্মচারীদের লাটে ছাঁটাই করছিলেন, এমনকী বিচারকদের ‘মার্কিনী স্বার্থ’ বিষয়ে সবক শেখাচ্ছিলেন, এলন মাস্কের বাচ্চা ছেলে নাক খুঁটে তাঁর টেবিলে হাত রাখলে সেই ১৫০ বছরের পুরনো রাষ্ট্রপতির টেবিলটাকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন, সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত এলন মাস্ক’এর টেসলা গাড়ি এক পিস কিনে বন্ধুকৃত্য অবধি করেছিলেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল যে এমন এক ‘ম্যানিয়াক’ লোককে আমেরিকার মানুষজন এমনি এমনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করেননি (অনেকটা ঠিক হিটলারের নির্বাচনের মতো)। আমেরিকার অর্থনীতি যে ধ্বস্ত হয়ে পড়েছে, ভেতরটা একেবারে ছিবড়ে, দেশে হু হু করে বাড়ছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, বিশ্ব জুড়ে জোগান-শৃঙ্খলে আমেরিকান ব্র্যান্ড বলে আর কিছুই নাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নবরঙে আমেরিকা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে, তখন খুব স্বাভাবিক যে অতি-জাতীয়তার শীৎকারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া তাদের আর তেমন কিছু করারও ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই একই ঘটনা জার্মানিতেও ঘটেছিল ‘ভার্সাই চুক্তি’ পরবর্তী হিটলারের অভ্যুদয়ে। বাকীটা ইতিহাস। তবে, ইতিহাসের নাকি পুনরাবৃত্তি হয় না বলে বলা হয়ে থাকে, তথাপি যদি হয়, তাহলে তা কেমনতর সে বিষয়েও মহাজনেদের মতামত সুবিদিত।

তবুও, ২ এপ্রিল ট্রাম্প সাহেব সত্যি সত্যিই ‘reciprocal tariff’ বা ‘পরিপূরক শুল্ক’ সম্পর্কে বেশ এক বড় ঘোষণা দিলেন! হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে সাংবাদিকদের সামনে হাতে একটি বোর্ড তুলে ধরে সেখান থেকে পড়ে পড়ে তিনি কয়েকটি দেশের নাম করে তাদের ওপর চাপানো শুল্কের হার বেশ সদর্পে ঘোষণা করলেন। যেমন, প্রথমেই বললেন চীনের নাম এবং তাদের ওপর শুল্ক চাপানোর হার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি শুল্ক চাপানো হল কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ওপর যথাক্রমে ৪৯, ৪৬ ও ৩৬ শতাংশ হারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ইংল্যান্ড’ও বাদ যায়নি, তাদের ওপর চাপানো হার যথাক্রমে ২০ ও ১০ শতাংশ। আর ভারত? ভারতের ওপর মোদীজীর অতি প্রিয় বন্ধু ট্রাম্পের শুল্ক হার চাপলো ২৬ শতাংশ। এবং এই প্রতিটি শুল্কই নাকি ‘ডিসকাউন্ট’এ দেওয়া, আসল হার আরও বেশি (উনি সে সব কমিয়ে দিয়েছেন)। ভারতের কথা বলতে গিয়ে তিনি অবলীলায় বললেন, ‘very tough, very tough’। অর্থাৎ, তিনি বোঝালেন যে, তাদের দেশের পণ্য যদি অন্য দেশে উচ্চ শুল্ক হারের কোপে পড়ে দুর্মূল্য হয়, তাহলে তিনিও সে দেশের পণ্যকে উচ্চ শুল্ক হারের গুঁতো দিয়েই সবক শেখাবেন। একদা মুক্ত বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের ধ্বজা ওড়ানো দেশ আমেরিকা কি সত্যিই কোনও বিপদে পড়ল যে উলটো পথে হেঁটে এখন দুয়ার আঁটা ছাড়া তার সামনে আর কোনও উপায় নেই?

বলাই বাহুল্য, এই নতুন ‘পরিপূরক শুল্ক’র দাপটে প্রায় প্রতিটি দেশই যারপরনাই ক্ষুব্ধ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ভাবে ট্রাম্পের অত্যন্ত কাছের জন, ইতালির চরম দক্ষিণপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শুল্ক হারের কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন। চীনের বিদেশ মন্ত্রক তো তীব্র ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে যে, মার্কিন দেশের এই শুল্ক নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রীতিকে লঙ্ঘন করছে এবং চীন নিজেদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষায় এর বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নিয়ে শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্য যুদ্ধে লড়ে যাবে। পাশাপাশি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে জাপান, ইউকে থেকে অস্ট্রেলিয়া— প্রায় প্রত্যেকটি দেশই এই নীতির নিন্দা করেছে। অথচ, একমাত্র ভারতই এখনও পর্যন্ত গলা তুলে তেমন উচ্চবাচ্য কিছু বলেনি। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী আমতা আমতা করে জানিয়েছেন যে বিষয়টি ভেবে দেখার মতো(!)। অবশ্য, এর প্রকোপে ভারতীয় শেয়ার বাজার আজ (৩ এপ্রিল ২০২৫) দিনের শুরুতেই ভালই গোত্তা খেয়েছে এবং দিনের শেষে এসে সেনসেক্স’এর পতন ৩২২ পয়েন্ট। বোঝাই যাচ্ছে, ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক হার ভারতীয় শিল্পের এক বড় অংশকে বেশ বিপদে ফেলে দিয়েছে। ভারত এখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এলন মাস্ক’এর টেসলা গাড়ির ওপর ১১০ শতাংশের শুল্ক প্রত্যাহার করে তুষ্টিকরণের রাজনীতি করবে, নাকি, অন্যান্য দেশগুলির মতো চোখে চোখ রেখে আমেরিকার রক্ষণশীল অর্থনীতির সমালোচনা করার হিম্মত দেখাবে, তা ‘ডোলান’ ট্রাম্পের বিশ্বস্ত বন্ধু মোদীজীই জানেন।

তবে এ কথা অনস্বীকার্য, ট্রাম্পের নয়া শুল্ক নীতি বিশ্বের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে এক আমূল পরিবর্তন আনবে এবং আমেরিকার পক্ষে তা অশনি সংকেত। আজ কোনও পণ্যের ওপরেই কোনও দেশের একচেটিয়া অধিকার আর মান্যতা পায় না, কারণ, বিশ্বায়নের ফলে যে অর্থনৈতিক জোগান-শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে, সেখানে একেকটি দেশে একেকরকম পণ্যাংশ নির্মিত হয়ে আরেক দেশে গিয়ে assembled হয়। ফলে, কোনও পণ্যেরই আজ সে অর্থে নিজ দেশ নেই, কোনও পণ্যকেই বলা যাবে না যে তা অমুক দেশের। নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে ট্রাম্প কি আজকের অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের এই খবরটুকু রাখেন না? তা বিশ্বাস করা কঠিন। আসলে, বিশ্ব বাজারে আমেরিকা আজ ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তাঁর নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ সঙ্গীন। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সঙ্গী করে অর্থনৈতিক বিজয় রথে চীন আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। পাশাপাশি, আজকের বিশ্ব বাজারেও চীন নানান উপায়ে নিজেদের উপস্থিতিকে আরও গ্রহণীয়, লাভজনক ও সর্বজনীন করে তুলেছে। ইতিমধ্যেই ভিয়েতনাম ও চীনে প্রচুর পরিমাণে রফতানিমূলক ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্র গড়ে ওঠায় তারা বিশ্বকে বহুল পরিমাণে সস্তায় পণ্যের জোগান দিতে পারছে, যেখানে আমেরিকার পক্ষে নতুন করে সেই জায়গায় পৌঁছনো আর সম্ভব নয়; কারণ, তাদের দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলিও উক্ত দেশগুলিতে (এমনকি তাইওয়ান’এও) ম্যানুফ্যাকচারিং হাবকে রফতানি করে নিজ দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থনীতির সক্ষমতাকে ইতিমধ্যেই খুইয়ে বসে আছে। অথচ ট্রাম্পের মনে হয়েছে, এখন পথ বিদেশের পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে তাদের দুর্মূল্য করে তুলে নিজের দেশের উৎপন্ন পণ্যগুলিকে আপেক্ষিক সস্তা দরে ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন করে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব গড়ে তোলা ও আমেরিকাবাসীকে কাজ দেওয়া। কিন্তু পুঁজিবাদের আবহে এর ফলে যে মুদ্রাস্ফীতি ও অকর্মণ্যতা চেপে বসবে সে কথা তিনি বিস্মৃত হয়েছেন। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এইভাবেই ভেবে থাকেন এবং শুরুতে জনতার বেশ বাহবাও পান, তারপর আমরা জানি, সে সব কল্পকথা কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের মোট রফতানির ১৮ শতাংশ আমেরিকার সঙ্গে। ২৬ শতাংশ শুল্ক চেপে বসায় এই রফতানি নিশ্চিত ভাবে ধাক্কা খাবে। বিশেষ করে, আইটি, ওষুধ, পোশাক, গাড়ি ও অলঙ্কার— এইসব শিল্প  বেশ কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হবে বলে অনুমান। তবে বিশ্বায়নের আবহে আমেরিকা যদি সত্যি সত্যিই মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিকে অস্বীকার করে, তার বিপ্রতীপে আজ অনেকগুলি দেশ এক জায়গায় এসে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ছে যে নতুন কোনও অর্থনৈতিক অক্ষরেখা গড়ে ওঠাটা অবান্তর কিছু নয় আর। হয়তো দেখা যাবে, ডলারের সে জোরও আর আগামী দিনে থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, ভারত এই জায়মান গতিশীলতাকে কতটা বুঝতে ও ধারণ করতে সক্ষম। কারণ, আমাদের বর্তমান শাসকও তো সমান ভাবেই উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী, যাদের বরং ট্রাম্পের অমূলক চিন্তার সঙ্গে ভালো মেলে।

           

Wednesday, 2 April 2025

নীল অর্থনীতি

সমুদ্র উপকূলে রাজ্যেরও অধিকার থাকা উচিত

দীপঙ্কর দে



আগামী দিনে যে বিষয়ে ভারতের সমুদ্র উপকূলবর্তী রাজ্যগুলির সঙ্গে ভারত সরকারের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী, সেটি হল, 'কন্টিনেন্টাল শেলফ' বা মহীসোপানকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে তার ভাগ-বাঁটোয়ারা কী ভাবে হবে তা নিয়ে! তবে আগে বোঝা উচিত, 'কন্টিনেন্টাল শেলফ' বা মহীসোপান কাকে বলে। 'কন্টিনেন্টাল শেলফ' বা মহীসোপান হচ্ছে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোর সমুদ্রের দিকে জলের নীচে যে ভূখণ্ড ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে নেমে যায়; ভূগোলের ভাষায় 'মহীসোপান', যাকে উপকূলীয় ওই দেশের বর্ধিত অংশ বলে ধরা হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন কি বলে? ১৯৫৮ সালের কনভেনশন অনুযায়ী, সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোর স্থলভাগের বেসলাইন থেকে লম্বালম্বিভাবে সমুদ্রের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকার মালিকানা সম্পূর্ণ ওই দেশের। একে বলা হয় Exclusive Economic Zone (EEZ) বা একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেখানে সমুদ্রের জল ও তলদেশের ওপর ওই দেশের একচ্ছত্র অধিকার থাকে। সেখানকার সমুদ্রে অন্য কোনও দেশ মাছ ধরতে পারে না। এরপর থেকে দেড়শো নটিক্যাল মাইল সীমা পর্যন্ত সমুদ্র তলদেশের খনিজ সম্পদের মালিক হবে ওই দেশ, তবে সমুদ্রের জলে থাকা মাছ ধরতে পারে অন্য দেশও। এই পুরো সাড়ে তিনশো নটিক্যাল মাইলকে ওই দেশের 'মহীসোপান' বলা হয়।

এই যে মহীসোপানকে কেন্দ্র করে ক্রম-নির্মিত বিশাল অর্থনীতি, তার সঙ্গে কীভাবে আমাদের দেশে কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধ তৈরি হচ্ছে তা উদাহরণ দিয়ে বললে বুঝতে সহজ হবে! যেমন, এখন যেহেতু উপকূল সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্তের একচেটিয়া অধিকারী ভারত সরকার তাই বোম্বে হাই থেকে যে তেল ও গ্যাস উৎপাদন হয় তা থেকে মহারাষ্ট্র সরকার রয়্যালটি বাবদ এক কানাকড়িও পায় না! সবটাই যায় কেন্দ্রের পকেটে; যেমন, ২০১২-১৩ সালে ONGC সমুদ্রতল থেকে তোলা তেলের রয়্যালটি বাবদ ৩৯৪০ কোটি টাকা ভারত সরকারকে দিয়েছে। অথচ, অসম বা ত্রিপুরার স্থলভূমি থেকে উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের রয়্যালটি কিন্তু পায় সংশ্লিষ্ট রাজ্য। কয়লার ক্ষেত্রেও রাজ্যগুলি রয়্যালটি পায়। তাহলে একইভাবে মহীসোপানে প্রাপ্ত সম্পদের ওপরেও রাজ্য সরকারের রয়্যালটি পাওয়ার ন্যায্যতা থাকবে না কেন? স্বভাবতই, বাংলার সমুদ্র উপকূলে যদি তেল ও গ্যাসের সন্ধান মেলে সেই সম্পদের উপর বাংলার কোনও অধিকার কি থাকা উচিত নয়? 

ভারতের নয়টি উপকূল রাজ্যগুলির সমুদ্রতটের দৈর্ঘ্য ৫৪২২.৬ কিমি। মনে রাখতে হবে, নয়টি উপকূলীয় রাজ্য ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরেও যে মহীসোপান বিদ্যমান, সেগুলির মালিকানাও ভারত রাষ্ট্রের! এই সংখ্যাকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল দিয়ে গুন করলে যে বর্গ ক্ষেত্রটির আয়তন পাওয়া যাবে সেটি আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ভারত রাষ্ট্রের অংশ। এই বিশাল মহীসোপান অঞ্চলের সম্পদের মালিক ভারত রাষ্ট্র। মোট মহীসোপান অঞ্চলের আয়তন ভারতের মোট স্থলভূমির (৩২,৮৭,২৬৩ বর্গ কিমি) প্রায় সমান।

কিন্তু অদ্ভূতুড়ে বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিশাল নীল অর্থব্যবস্থায় (Blue economy) বাংলার মতো উপকূলবর্তী রাজ্যগুলির কোনও ভাগ নেই। ভারতের নয়টি রাজ্যের সবচেয়ে বড় উপকূল রয়েছে গুজরাতে (দৈর্ঘ্য ১২১৪.৭ কিমি)। সবচেয়ে ছোট উপকূল গোয়ার (দৈর্ঘ্য ১০১ কিমি)। আর পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের দৈর্ঘ্য ১৫৭.৫ কিমি। তাহলে বাংলার সামুদ্রিক অঞ্চলের (মহীসোপান) আয়তন কত? মনে রাখতে হবে, উপকূল থেকে মহীসোপানের ব্যাপ্তি ৩৫০ নটিক্যাল মাইল। এক নটিক্যাল মাইল সমান ১.৮৫২ কিমি। তাই অঙ্কের হিসেবে বাংলার সমুদ্র অঞ্চলের আয়তন হচ্ছে: ১৫৭.৬ x ৩৫০ x ১.৮৫২ বর্গ কিমি, মানে, ১০২০৯১.৫ বর্গ কিমি। আর বাংলার স্থলভাগের পরিমাণ মাত্র ৮৮,৭৫২ বর্গ কিমি। 

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৯৭ বলছে, (১) ভারতের আঞ্চলিক জলসীমা, মহাদেশীয় তাক অথবা একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সমুদ্রের নীচে অবস্থিত সমস্ত জমি, খনিজ ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র কেন্দ্রের অধীনে থাকবে এবং তাদের উদ্দেশ্যে অধিকৃত হবে; (২) ভারতের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্যান্য সমস্ত সম্পদও কেন্দ্রের উপর ন্যস্ত থাকবে এবং তাদের উদ্দেশ্যে ধারণ করা হবে। তাই বোঝাই যাচ্ছে, মহীসোপানের সব সম্পদের একচেটিয়া মালিক কেন্দ্রের সরকার। উপকূলবর্তী রাজ্যের কোনও অধিকার নেই। বলাই বাহুল্য, সংবিধান রচিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে। গত ৭৫ বছরে সমুদ্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সমুদ্রাঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। আগেই বলেছি, ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি নামে তৈরি হয়েছে একটি স্বতন্ত্র অর্থনীতির পরিসর। এই বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র থেকে রাজ্যগুলিকে বঞ্চিত করা অনৈতিক। তাই যুক্তরাষ্ট্রীয় মতাদর্শের স্বার্থে সংবিধানের ২৯৭ অনুচ্ছেদ নতুন করে লিখতে হবে। এটা সময়ের দাবি !

আরও একটি কারণে মহীসোপানের সুস্থায়ী উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে উপকূলবাসী ও রাজ্য সরকারের অংশগ্রহণ খুব জরুরি। সেটি হল, সমুদ্রের গভীর বা তলদেশ থেকে যদি অত্যধিক মাত্রায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজ শুরু হয়, তাহলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে, যার ভয়াবহ প্রভাব মানবজাতিও এড়াতে পারবে না। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করতে শুরু করেছেন। বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলনও চলছে। ইতিমধ্যে ভারতের আওতাধীন সামুদ্রিক এলাকায়, যেমন, কেরালা, গুজরাত এবং আন্দামান ও নিকোবরের উপকূলীয় অঞ্চল বরাবর দূরবর্তী গভীর জলভাগ থেকে সামুদ্রিক খনিজ উত্তোলনের জন্য খনন কাজ শুরু করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকী, এই মর্মে টেন্ডারও ডাকা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু উপকূলবাসীর কোনও মতামত গ্রহণ করা হয়নি। উপকূলে বসবাসকারী আমজনতা এই খনন কাজ শুরু করার পক্ষপাতী নয়। তাদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক অধিকারের বলে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল। এখানেই বিপদ লুকিয়ে।

তাই, নীল অর্থনীতিতে উপকূলবর্তী রাজ্যগুলিরও সমান হক আছে, সে দাবি এবার সজোরে ওঠা উচিত।


Monday, 31 March 2025

‘রাম’গরুড়ের ছানা…

হাস্যরসও যখন অপরাধ

সোমা চ্যাটার্জি



ভারতীয় সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক হাস্যরস বা ব্যঙ্গ, যাকে ইংরেজিতে 'পলিটিকাল স্যাটায়ার' বলে, তার গ্রহণযোগ্যতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

গত  কয়েক দিন ধরে  স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার একটি কমেডি ভিডিও 'নয়া ভারত' ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে রাজনৈতিক অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং বিরূপ সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখা যাছে। কমেডিটি'তে কুণাল বর্তমান  সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকটিই কৌতুকের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন এবং ‘গদ্দার' বলে  একটি প্যারডি পরিবেশন করেছেন যার অর্থ বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু এই ঘটনার পর মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে ও শিবসেনা দল আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এমনকি মুম্বাই'এর হ্যাবিটাট সেন্টার যেখানে কুণাল এই অনুষ্ঠান করেছিলেন, সেখানে গিয়ে ভাঙচুর করে তাঁর কুশপুতুল পুড়িয়েছে। 

কুণাল কামরা তাঁর বিতর্কের জন্য, বিশেষ করে তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গের জন্য যথেষ্ট পরিচিত। ২০২০ সালে এক বিমানে সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর মুখোমুখি হওয়ার পর একাধিক বিমান সংস্থা তাঁকে নিষিদ্ধ করে। বিচার বিভাগ সম্পর্কে তাঁর রসিকতার জন্য তিনি আইনি সমস্যায় জর্জরিত হয়েছেন, এমনকি সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ট্যুইট'এর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অবমাননার মামলা জারি করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কামরা ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার একজন সমালোচক হিসাবেই বরাবর সোচ্চার থেকেছেন।

অবশ্য এই ঘটনা নতুন নয়। ২০১৭ সালে কুণাল তাঁর প্রথম ইউটিউব ভিডিও আপলোড করেন যার শিরোনাম ছিল 'দেশপ্রেম ও সরকার'। আট মিনিটের ক্লিপটিতে তিনি বিমুদ্রাকরণ, ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করা এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় নিন্দা সম্পর্কে রসিকতা করেছিলেন। বেশ কয়েকটি সহিংস হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও কুণাল ভিডিওটি সরিয়ে নেননি। এটি ১.৮ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে। গত বছর অক্টোবরের শুরুতেও কুণাল মুম্বাইয়ের বিলাসবহুল কমেডি ক্লাব 'দ্য হ্যাবিট্যাট'এ পাঁচটি শো করেন কিন্তু তাঁর বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যায় এবং তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর মুম্বাইয়ের বাড়িওয়ালা পর্যন্ত তাঁকে উচ্ছেদ করেন। কিন্তু কামরা তখনও বলেছিলেন, তিনি যে  জিনিসগুলি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন সেগুলি নিয়েই রসিকতা করতে চান, কারণ, তাঁর মতে 'কমেডি আক্রমণাত্মক কোনও শিল্প নয়, এক বাস্তবতা'। 

'দ্য হ্যাবিট্যাট'এর মালিক বলরাজ ঘাই' এর কথায়, ২০১৬ সালে 'দ্য হ্যাবিট্যাট' খোলার পর থেকে তাঁর সেন্টারটি রাজনৈতিক উৎপীড়ন ও ক্ষোভের নিশানা হয়ে উঠেছে এবং প্রতি বছর তিন থেকে চারটি এরকম ঘটনা ঘটে চলেছে। তাঁর মতে, কিছু দর্শকের কাছে কামরা একজন নায়ক, 'এমন একজন যিনি কর্তৃত্বের কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে কথা বলেন'। কামরার এজেন্ডা বিনা কারণে 'প্রতিষ্ঠান বিরোধী' হওয়া নয়, তাঁর এজেন্ডা 'উন্নত ব্যবস্থা, উন্নত শাসন, উন্নত সমাজ'। ঘাই বলেন, যারা কামরার শোয়ের টিকিট কেনেন তাঁরা জেনেই আসেন যে এখানে কী ধরনের রাজনৈতিক উপাদান উপস্থাপিত হবে, সে জন্য যদি শ্রোতারা সম্পূর্ণরূপে কামরার সঙ্গে একমত থাকেন, তিনি যে কোনও রসিকতা করতে পারেন এবং কোনও অপরাধ না করে চাতুরীর সঙ্গে সত্যি কথা বলতে পারাটাও একটা পরিছন্ন শিল্পবোধকেই ব্যক্ত করে।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে ভারতে স্ট্যান্ড-আপের ভবিষ্যৎ ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কৌতুকাভিনেতাদের স্বাধীন মন নিয়ে নিজের শিল্পকে প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ট্যান্ড-আপ কমেডি ভারতে তুলনামূলকভাবে নতুন। ২০১০-এর দশক থেকে অনেকেই এটিকে ক্যারিয়ার হিসাবে ভাবতে শুরু করে, তবে এর পূর্বসূরীরা অনেক পুরনো।  প্রাচীন ইতিহাসেও রাজদরবারে বিদূষকরা ছিলেন যারা উপহাস ও বিদ্রুপের মাধ্যমে রাজা ও পারিষদদের  মনোরঞ্জন করতেন কিন্তু তাদেরও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে কমেডি মানব জীবনের একটি অঙ্গাঙ্গী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ভারতে কৌতুকাভিনেতাদের নির্মমভাবে হয়রানি ও ট্রোলের শিকার হওয়ার জন্য ভারতের স্ট্যান্ড-আপ কমেডির ভবিষ্যৎ এখন  অজানা।

২০১৯ সালে কৌতুকাভিনেত্রী আগ্রিমা জোশুয়া মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের একটি মূর্তি প্রকল্প সম্পর্কে রসিকতা করার পর ২০২০ সালের ৭ জুলাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) সমর্থকরা 'দ্য হ্যাবিট্যাট' ভাঙচুর করে ও আগ্রিমা জোশুয়ার কাছে রসিকতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং তাঁকে ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। জোশুয়াকে বাধ্য করা হয়  জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি, শিবসেনা, এমএনএস এবং কংগ্রেসের কাছে ক্ষমা চাইতে। জোশুয়া বলেন, ক্ষমা চাওয়ার পর আরও ঘৃণা ও আপত্তিকর মন্তব্য শুনতে হয়েছিল এবং তাঁকে কোনওরকম নিরাপত্তাও  দেওয়া হয়নি। 

একই ভাবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে কট্টর ডানপন্থী হিন্দু রক্ষক সংগঠনের সদস্য ও ইন্দোরের প্রাক্তন বিজেপি মেয়রের ছেলে একলব্য লক্ষ্মণ সিং গৌরের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে মুনাওয়ার ফারুকি নামে এক কৌতুকাভিনেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় এক মাস ধরে তাঁকে আটক রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি হিন্দু দেবদেবীদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। অথচ, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই ফারুকিকে আটক করা হয় এবং পুলিশ পরে স্বীকার করে যে তিনি হিন্দু দেবতাদের অপমান করেছেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। তবুও, ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলি তখন থেকে বারবার তাঁকে হেনস্থা করেছে এবং তাঁর অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য করেছে। গোয়ায় সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে মঞ্চে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে ৫০০ লোক নিজেদের আগুনে পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়।

২০২১ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টারে ভারতের শীর্ষস্থানীয় স্ট্যান্ড-আপ কৌতুকাভিনেতা বীর দাস 'টু ইন্ডিয়াস' নামে একটি কৌতুক কবিতা পাঠ করে শোনানোর পর তাঁকে নিদারুণ হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে দাস ভারতকে বৈপরীত্যের দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন যেখানে লোকেরা 'দিনের বেলায় মহিলাদের পূজা করে কিন্তু রাতে তাদের ধর্ষণ করে'। অনুষ্ঠানটি তীব্র ভাবে সমালোচিত হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি মামলাও দায়ের হয়। সমালোচকরা তাঁর বিরুদ্ধে ভারতকে বদনাম করার অভিযোগ আনেন। দাস'এর বক্তব্য তিনি ওই কবিতাটিতে দক্ষিণ এশীয় দেশের সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনাই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিজেপি'র মুখপাত্র আদিত্য ঝা দাসের বিরুদ্ধে 'দেশকে অপমান' করার জন্য পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন এবং অবিলম্বে তাঁকে গ্রেফতারের দাবি জানান। ঝা'এর অভিযোগ, 'নারী ও ভারতের বিরুদ্ধে' এই অবমাননাকর বক্তব্য উস্কানিমূলক এবং এটি আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। 

শাসকগোষ্ঠীরা যে ব্যঙ্গের প্রতি খুব একটা সহনশীল নয় সে ব্যাপারে কলকাতাও পিছিয়ে নেই। তার প্রমাণ দ্য হ্যাবিট্যাটের 'অল-স্টার' লাইন-আপের অংশ, অভিনেতা অনির্বাণ দাশগুপ্ত। ২০১৭ সালে অনির্বাণ কলকাতায় তাঁর বড় হয়ে ওঠা এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর অন্তর্ধান সম্পর্কে সেখানকার শিশুরা কী ভাবেন তা নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করে রসিকতা করেছিলেন। সেই ভিডিও অপসারণের দাবিতে তিনি কলকাতার রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘বামপন্থী’ বা  ‘ডানপন্থীদের’ হেনস্থার আক্রমণাত্মক ভঙ্গী একই ধরনের। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবসময় কমেডিকে দমন করে।

এই প্রসঙ্গে কমেডি শিল্পের কিংবদন্তি চার্লি চ্যাপলিন'এর কথা অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসে পড়ে। চ্যাপলিন নিজেও একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ধর্মকে অস্বীকার করতেন। ১৯৪০ সালে নির্মিত তাঁর 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর' ছবিটিতে তিনি অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনির তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং ফাসিবাদ, নাৎসিবাদ ও ইহুদী বিদ্বেষেরও সমালোচনা করেন। তার ফলে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে এটির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়। চ্যাপলিন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, 'কমেডি তৈরিতে, ট্র্যাজেডি উপহাসের চেতনাকে উদ্দীপিত করে।' তাঁর মতে, কমেডি এমনই শিল্প যা রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অনুকরণ করে এবং উপহাস করে। এটি সরকারকে তাদের কর্মের জন্য দায়বদ্ধ করে তোলে। হাস্যরস হল ভিন্ন মতের একটি বুদ্ধিমান অভিব্যক্তি।

১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর জওহরলাল নেহরুকে কার্টুনিস্ট আর কে লক্ষ্মণ ব্যঙ্গ করেছিলেন। ট্রোল বা ভাড়া করা গুণ্ডাদের দিয়ে আক্রমণ করার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেন যে কার্টুনটি তাঁর খুব ভালো লেগেছে এবং তিনি ফ্রেমবন্দী স্বাক্ষরিত একটি বড় কপিও চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের রাজনৈতিক ভাবে আরোপিত সমসাময়িক ভারতে বিদ্রূপ বা হাস্যরস হারিয়ে গেছে বলে মনে হয়। গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাহুল ত্রিপাঠি বিশ্বাস করেন যে, বর্তমান শাসক দল এবং তার পদাতিক সৈন্যদের সমস্যা হল যে তাদের জাতীয়তাবাদ, হিন্দুধর্ম ও বহুত্ববাদের এত সংকীর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে তা যে কোনও বিরোধী চিন্তাভাবনার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে তাদের অস্থির করে তোলে। তাই তারা প্রতিশোধ স্পৃহায় জড়িত থাকে, কারণ, তারা ধর্মীয় এবং জাতীয় গর্বের অনুভূতির নিজস্ব মাপকাঠিতে এগুলিকে বিচার করে।

ভারতে কুণাল কামরা ও মুনাওয়ার ফারুকি'র মতো কৌতুকাভিনেতারা এবং রচিতা তানেজার মতো কার্টুনিস্টরা যে কাজ করেন তার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও ধরনের ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট রনবীর এলাহাবাদীকে ইউটিউবে কোনও বিষয়ে কিছু আপলোড করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফারুকি এবং আরও তিন সহযোগীর সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া কৌতুকাভিনেতা নলীন যাদবের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারাগুলির মধ্যে ২৯৫এ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা) ২৯৮ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার ইচ্ছাকৃত অভিপ্রায়) এবং ১৮৮ (অবাধ্যতা)'এর অধীনেও মামলা চলছে। যাদবের  নিজের ভাষায়, 'ইন্দোরের মানুষের কাছে এখন তিনি একজন সন্ত্রাসবাদী এবং তার আর কোনও পরিচয় নেই।' স্ট্যান্ড-আপ কৌতুকাভিনেতা প্রশাস্তি সিং-এর মতে, 'দশ বছর আগে যে  রসিকতা নিছক বিরক্তিকর ছিল, আজ তার মাত্র ১ শতাংশই আপনাকে সমস্যায় ফেলে দিতে পারে।' 

হাস্যরস আমাদের সবচেয়ে গুরুতর ট্র্যাজেডির অর্থ বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু উপরোক্ত ঘটনাগুলি বারবার মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও আজ রাজনৈতিক বিদ্রুপ ও মতবিরোধের কোনও স্থান নেই। সাম্প্রতিক সময়ে মোদী সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার চেষ্টা করে চলেছে। কামরার মতে, সংশোধিত তথ্য প্রযুক্তি বিধি তাঁর 'রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক কাজে জড়িত থাকার ক্ষমতা' হ্রাসের একটি হাতিয়ার। সরকার তাঁর ফ্যাক্ট-চেক ইউনিটকে 'জাল, মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর' বলে 'এমনতর বিষয়বস্তু'কে অপসারণের ক্ষমতা দিয়ে কমিক্সকে 'স্বেচ্ছাচার ও বিষয়গত' হস্তক্ষেপের আওতায় আনতে চাইছে। কামরা বলেন, 'সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পূর্ণ একচেটিয়া অধিকার চায় এবং এটি আমাদের এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে এনে ফেলেছে।' তিনি ইতিমধ্যে বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। ইতিমধ্যেই বিদেশি অনুদান নীতি (এফসিআরএ অ্যাক্ট) লঙ্ঘনের জন্য শিবসেনা নেতা সঞ্জয় নিরুপম অভিযোগ করেছেন যে কামরা বিদেশ থেকে এই ধরনের শো করার জন্য ৪ কোটি টাকা পেয়েছেন, যা কামরা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার কথা বললে তিনি বলেন, একমাত্র মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী বললেই তিনি ক্ষমা চাইবেন।

হাসি আজও আমাদের অন্ধকার সময়ে বেঁচে থাকার ওষুধ। কিন্তু মঞ্চের রসিকতার বিতর্ক রুখতে যদি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় তাহলে আগামী দিনে প্রস্তাবিত নতুন সংবিধানে হাস্যরসকে অপরাধ হিসেবে দেখানো এবং অপরাধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দিন আসন্ন বলেই মনে হয়।


Thursday, 27 March 2025

হিন্দি এক নির্মিত ভাষা

ভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহ

দীপঙ্কর দে



সারা দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে জোরদার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠছে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিন ও তাঁর দল ডিএমকে'র নেতৃত্বে। দ্রাবিড় জাতিসত্তার শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তামিলরা ভারত রাষ্ট্রের ত্রিভাষা নীতি, নতুন শিক্ষা নীতি সহ ইউনিয়ন সরকারের ব্রাহ্মণ্যবাদী কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছেড়েছেন। ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রীর 'টাকা আটকে' দেওয়ার অসাংবিধানিক হুমকির বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা হুমকি 'কর দেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের এক মিনিট সময় লাগবে' স্রেফ রাজনৈতিক তরজা ভাবলে ভুল হবে।

হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তামিলদের লড়াই আজকের নয়। ১৯৩৭ সালে তৎকালীন ভারত সরকার এক অধ্যাদেশ জারি করে আদেশ দেয়, তামিলনাড়ুর প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। সেই আদেশের বিরুদ্ধে ই ভি পেরিয়ারের নেতৃত্বে তামিলনাড়ুর বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলন চলে লাগাতার তিন বছর। ভাষা শহীদ হন দু' জন। অবশেষে ১৯৪০ সালে সেই আদেশ প্রত্যাহার করে বলা হয় দেবনাগরী লিপিতে লেখা হিন্দির সঙ্গে ইংরেজি ভাষাও সরকারি কাজকর্মে ব্যবহার করা যাবে। এই মীমাংসা সূত্রটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে খুব সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। 

তামিলনাড়ুর হিন্দি বিরোধী আন্দোলনকে বুঝতে হলে তৎকালীন রাজনীতির চর্চা অবশ্যই আবশ্যক। গত শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস উদ্যোগ নেয়, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে একটি সর্বজন সম্মত ভারতীয় ভাষাকে ব্যবহার করা হবে। সেই মতো ঠিক হয় হিন্দি বা হিন্দুস্থানী হবে সেই ভারতীয় ভাষা। ১৯১৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর উদ্যোগে 'দক্ষিণ ভারত হিন্দি প্রচার সভা' প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দুস্থানী ভাষাকে দলীয় যোগাযোগের মাধ্যম বলে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ক্ষমতায় আসে জাতীয় কংগ্রেস। প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী হন কংগ্রেসের রাজাগোপালাচারী। ১৯৩৭ সালের অগস্ট মাসে, ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই, রাজাগোপালাচারী প্রতিটি বিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষা শিক্ষাকে আবশ্যিক ঘোষণা করেন। তখন তামিলনাড়ু কংগ্রেসে ব্রাহ্মণ নেতাদের প্রাধান্য ছিল। তাছাড়া রাজাগোপালাচারী নিজেও ছিলেন কট্টর ব্রাহ্মণ। তিনি একটি পদার্থবিদ্যার পুস্তক অনুবাদকালীন প্রচুর সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার করায় এমনিতেই সমালোচিত ছিলেন। ক্ষমতায় এসেই তাঁর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক ভাবেই তামিল রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পেরিয়ারের 'আত্মসম্মান আন্দোলন' (সেলফ রেসপেক্ট মুভমেন্ট) ও জাস্টিস পার্টি একযোগে হিন্দি আগ্রাসনের প্রতিবাদে গণ আন্দোলনের ডাক দেয়। রাজাজীর ঘোষণার প্রতিবাদে ৪ অক্টোবর ১৯৩৭ এক হিন্দি বিরোধী জনসভার আয়োজন হয়। আন্দোলন উপেক্ষা করে রাজাগোপালাচারী ২১ এপ্রিল ১৯৩৮ সালে এক আদেশনামায় তামিলনাড়ুর সব কটি সরকারি বিদ্যালয়ে (১২৫) হিন্দি বাধ্যতামূলক বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। 

হিন্দি বিরোধী আন্দোলন আরও গতি পায়। এমনকি শৈব ধর্মাবলম্বীরাও ভেলোরে অনুষ্ঠিত তাঁদের মহাজন সভায় হিন্দির বিরোধিতা করেন। তামিলনাড়ুর মুসলিম লীগ উর্দুর পরিবর্তে তামিল ভাষার দাবিতে সামিল হন। অনেক আর্য ব্রাহ্মণও একই সিদ্ধান্ত নেন। তাই তামিল ভাষার আন্দোলন স্রেফ দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তামিলবাসী তাঁদের মাতৃভাষা রক্ষার তাগিদে তীব্র হিন্দি বিরোধিতায় সামিল হয়েছিলেন। ১৯৩৯ সালে ভারতের বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের বিরোধিতায় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির কংগ্রেস সরকার ইস্তফা দেয়। শাসনভার গ্রহণ করেন গভর্নর জেনারেল। গভর্নরের আশ্বাসে ৩১ অক্টোবর পেরিয়ার আন্দোলনে বিরতি টানেন। অবশেষে  ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজ সরকার বাধ্যতামূলক হিন্দি শিক্ষার আদেশ প্রত্যাহার করে।

সাময়িক পিছু হটলেও জাতীয় কংগ্রেস সারা দেশে হিন্দি চাপানোয় অনড় ছিল। ১৯৬৪ সালে নেহেরুর মৃত্যুর পর নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয় শুধুমাত্র হিন্দিকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার। দিল্লী ঘোষণা করে ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে দেশে বলবৎ হবে সরকারি ভাষা আইন (অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট) এবং হিন্দি হবে সরকারি ভাষা। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা তামিলনাড়ু। ত্রিচিতে চিন্নাস্বামী নামে এক যুবক প্রতিবাদে আত্মাহুতি দেয়। কলেজ ছাত্রদের উদ্যোগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। প্রতিবাদে আরও কয়েক জন আত্মাহুতি দেন। তামিল নেতা আন্নাদুরাই ২৬ জানুয়ারি শোক দিবস পালনের ডাক দেন। পরবর্তী দু' সপ্তাহে ভাষা দাঙ্গায় প্রাণ হারান অন্তত ৭০ জন নাগরিক। তামিল প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয় দিল্লী। অবশেষে ১৯৬৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এক রেডিও ভাষণে তামিল নাগরিকদের আস্বস্ত করেন, নেহেরুর প্রস্তাবিত হিন্দি ও ইংরেজি দুটি ভাষাই সরকারি ভাষা বলে ব্যবহৃত হবে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে আন্দোলন তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরে আর কোনওদিন জাতীয় কংগ্রেস বা অন্য কোনও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল তামিলনাড়ুর মসনদে বসতে পারেনি। তাদের কোনও না কোনও তামিল ভাষী আঞ্চলিক দলের লেজুড় হয়ে রাজনীতি করতে হয়েছে। সেই থেকে তামিলনাড়ুর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে কোনও আঞ্চলিক দল। তামিল রাজনীতি আবর্তিত হয় তাদের মাতৃভাষা ও দ্রাবিড় জাতিসত্তাকে আঁকড়ে ধরেই। ষাটের দশকে তামিল জাতিসত্তার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় ডিএমকে নেতা করুণানিধি (বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের পিতা)।

গত ষাটের দশকে তামিলনাড়ুতে ভারত সরকারের ত্রিভাষা নীতির প্রতিবাদের পর ইউনিয়ন সরকার ত্রিভাষা বাধ্যতামূলক না করলেও দিল্লী লাগাতার হিন্দি ভাষার আগ্রাসন চালিয়ে গেছে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর উপর। বিগত এক দশকে সব সরকারি ক্ষেত্রে হিন্দির আধিপত্য পরিকল্পিত ভাবে বাড়িয়েছে ভারত সরকার। সারা দেশে এমন এক বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে মনে হবে হিন্দি ভারতের জাতীয় ভাষা। সাধারণ নাগরিক থেকে উচ্চ আদালতের এক মাননীয় বিচারক পর্যন্ত তাঁর রায়ে হিন্দিকে ভারতের জাতীয় ভাষা বলে ভুল করে বসেন। আমরা যেন ভুলে যেতে বসেছি, ভারতে কোনও একটি জাতীয় ভাষা নেই। দেশের অন্তত বাইশটি প্রাচীন ভাষাকে সংবিধান স্বীকৃত ভাষা বলে গণ্য করা হয়। 

২০২০ সালে নতুন শিক্ষা নীতি ঘোষণার পর ভাষা সমস্যা আবার মাথা চাড়া দিয়েছে। খানিকটা পরিবর্তন করে আবার ত্রিভাষা নীতির কথা বলা হয়েছে। আগের ত্রিভাষা নীতিতে বলা ছিল, সব কটি অ-হিন্দি ভাষী রাজ্যে ইংরেজি ও স্থানীয় ভাষা শিক্ষার সঙ্গে হিন্দি অবশ্যই শিখতে হবে (স্মরণ থাকতে পারে, স্বাধীনতার পর ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির পুনঃগঠন হয়েছিল)। নতুন শিক্ষা নীতিতে বলা হল, অ-হিন্দি ভাষী রাজ্যগুলিতে তিনটে ভাষা শিখতে হবে তবে কোনও বিশেষ ভাষার কথা উল্লেখ করা হল না। শুধু বলা হল, তিনটে ভাষার অন্তত দুটি ভাষা হতে হবে স্থানীয় ভাষা। সরাসরি হিন্দির উল্লেখ না থাকলেও ত্রিভাষা নীতিতে হিন্দি চাপিয়েই দেওয়া হল; কারণ, ইংরেজির সঙ্গে  হিন্দি হচ্ছে ভারতের সরকারি ভাষা। তাই কোনও বাঙালি বা তামিল ছাত্রকে, বিদ্যালয়ে তিনটি ভাষা শিক্ষা আবশ্যিক হলে, স্বভাবতই তাদের নিজেদের মাতৃভাষার সঙ্গে হিন্দি শিখতে হবে যেহেতু তিনটির অন্তত দুটি ভাষা হতে হবে ভারতীয় ভাষা। ঠিক এখানেই তামিলরা আপত্তি তোলেন। তাঁদের যুক্তি খুব পরিষ্কার। ছাত্রদের  তিনটি ভাষা শেখার চাপ অযৌক্তিক। তাছাড়া হিন্দি ভাষী রাজ্যগুলিতে ছাত্ররা যখন বড় জোর দুটি ভাষা শিখছে তখন অ-হিন্দি ভাষী রাজ্যের ছাত্রদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ভাবে তিনটি ভাষা শেখার নীতি বিভেদমূলক।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্র কেন বার বার অ-হিন্দি ভাষী রাজ্যগুলিতে হিন্দি চাপাতে চাইছে? আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, হিন্দি ভাষার বয়স মেরেকেটে মাত্র দুশো বছরও হবে না। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এই ভাষাটি নির্মাণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষাবিদ জন গিলক্রিস্টের তত্ত্বাবধানে। মনে রাখতে হবে, তখন সরকারি দফতরে ফার্সি ও উর্দু ভাষার চল ছিল; আর ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা, যা মূলত উত্তর ভারতের কথ্য ভাষা। মীরার ভজন গীত হত হিন্দুস্থানী ভাষায়। দফতরের কাজের সুবিধার্থে গিলক্রিস্ট সাহেবের উদ্যোগে হিন্দুস্থানী ভাষার পরিমার্জন করে নির্মিত হল হিন্দি। ফার্সি ও উর্দু শব্দের পরিবর্তে ব্যবহার করা হল সংস্কৃত শব্দ আর লিপি হল দেবনাগরী। এভাবেই তৈরি হল আর্যাবর্তের ভাষা হিন্দি। সিপাহী বিদ্রোহের পর সরকারি মদতে খুব দ্রুত ফার্সি, উর্দু ও হিন্দুস্থানী ভাষার স্থান দখল করল হিন্দি। সেই থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভাষা হয়ে উঠল হিন্দি আর মুসলমানের ভাষা উর্দু। ধর্মের ভিত্তিতে দুই ভাষা ভাষীরাও বিভক্ত হয়ে গেলেন। 

গত দুশো বছরে হিন্দির আগ্রাসনে বর্তমান আর্যাবর্তের বহু প্রাচীন ভাষা ও আদিবাসী কৃষ্টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্বাধীন ভারতে হিন্দুত্বের আগ্রাসন যত বেড়েছে সঙ্গে বেড়েছে হিন্দির আগ্রাসন। ভারতে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান হয়ে উঠেছে আর্যাবর্তের এক রাজনৈতিক হাতিয়ার। অনার্য দক্ষিণ ভারত এই আগ্রাসন মেনে নিতে পারেনি। দ্রাবিড় জাতিসত্তা বার বার রুখে দাঁড়িয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। হালে অনার্য ও আর্য বিভাজন দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের বিভাজন বলে প্রচারিত হচ্ছে। এই বিভাজন মূলত সভ্যতার দ্বন্দ্বের প্রকাশ। অনার্য ও আর্যদের ঐতিহাসিক লড়াই আজও চলছে।


Monday, 24 March 2025

কবর খুঁড়ে ঔরঙ্গজেব কেন?

মেরুকরণ ও বিদ্বেষই বিজেপির অস্ত্র

সোমা চ্যাটার্জি



গত দু' দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হল, পুরনো মসজিদ্গুলিকে পুরনো হিন্দু মন্দিরের নতুন সংস্করণ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার প্রচেষ্টা; সাম্প্রতিককালে যার ছায়া পড়েছে মহারাষ্ট্রে। নাগপুর থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে ছত্রপতি সম্ভাজিনগর জেলায় (যা আগে ঔরঙ্গাবাদ নামে পরিচিত ছিল) ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো ঔরঙ্গজেবের একটি সাধারণ স্মৃতিস্তম্ভ কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি দ্বারা অপসারণের দাবিতে বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ও দাঙ্গার রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে।

এই হিংসার সূত্রপাত শিবাজি পুত্র সম্ভাজির উপর নির্মিত 'ছাভা' নামে একটি বলিউড চলচ্চিত্র যেখানে ওই মারাঠা শাসককে ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা যায় এবং হেরে যাওয়ার পর তাকে শারীরিক ভাবে নিগৃহীত করা হয়। এর আগে সমাজবাদী পার্টির নেতা আবু আজমি মহারাষ্ট্র বিধানসভায় বলেন যে 'ছাভা'তে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। এই মন্তব্যের ফলে তাকে বিধানসভা থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তিনি তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এরপর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কুশপুতুল পুড়িয়ে তাঁর সমাধি অপসারণের দাবিতে স্লোগান দেওয়ার পর গত সোমবার (১৭ মার্চ) থেকে সেখানে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, ৩০০ বছর আগে অনাড়ম্বর ও খোলা কবরস্থানে সমাহিত ঔরঙ্গজেব আজ এতদিন পরে হঠাৎ এত আলোচিত ও বিতর্কিত হয়ে উঠলেন কেন?

তার কারণ সম্ভবত এই যে, মুঘল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ শাসক ঔরঙ্গজেব তাঁর ৩৯ বছরের রাজত্বকালে  ভারতীয় উপমহাদেশের বেশির ভাগ অংশকে তাঁর একক শক্তির অধীনে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা সমগ্র ইউরোপকে ছাপিয়ে যায় এবং তাদের সম্পদ বিশ্বে অতুলনীয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা সুপরিকল্পিত ভাবে ওই সময় ঔরঙ্গজেবকে ধর্মান্ধ ও নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল'এর 'দ্য হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া' বা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সচিব হেনরি মায়ারস এলিয়ট'এর 'দ্য হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া অ্যাজ  টোলড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ান' পড়লে বোঝা যায়, এদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের তুলনায় তথাকথিত হিন্দু যুগ ও বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার মহত্ব প্রচার এবং ঔপনিবেশিক স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঔরঙ্গজেবকে খলনায়কে পরিণত করা। ব্রিটিশ বর্ণিত এই ইতিহাস ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিদ্দ্বজ্জনেদের কাছে ঔরঙ্গজেবকে ধর্মান্ধ, নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে পরিচিত করে তোলে। ১৯২৪ সালে শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবিদ  যদুনাথ সরকারের 'হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজব' বইটিতেও তিনি ঔরঙ্গজেবের রাজনৈতিক দর্শনকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণু বলে ব্যক্ত করেছেন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত 'ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া' গ্রন্থে নেহেরুও ঔরঙ্গজেবের শাসনকালের ত্রুটিগুলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং তাঁকে 'একজন ধর্মান্ধ ও কঠোর শুদ্ধবাদী' বলে তিরস্কার করেন। সম্ভবত এই ধরনের বিবৃতিই ভারতের হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের সূচনা করে এবং সমগ্র ভারতীয় বিদ্বান সমাজে ঔরঙ্গজেব একজন ক্রূর, হিংস্র ও হিন্দু বিদ্বেষী মুসলমান শাসক হিসেবে চিহ্নিত হন।

আধুনিক ভারতের অনুষঙ্গ থেকে ঔরঙ্গজেবকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০১৫ সালে যখন দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোড'এর নাম পরিবর্তন করে এপিজে আব্দুল কালামের নামে করা হয় এবং বিজেপি ও সমমনস্ক হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ঔরঙ্গজেবকে একজন নিষ্ঠুর ইসলামপন্থী নিপীড়ক হিসাবে বর্ণনা করতে থাকে। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী  বারাণসীতে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির সংলগ্ন 'জ্ঞানব্যাপী মসজিদ' ধ্বংস করার সপক্ষে বলতে গিয়েও 'ঔরঙ্গজেবের নৃশংসতা ও সন্ত্রাস' সম্পর্কে বলেন, যদিও জ্ঞানব্যাপী মসজিদটি আদৌ কোনও হিন্দু মন্দিরের উপর নির্মিত কিনা তার কোনও ইতিহাস ভিত্তিক প্রমাণ আজও মেলেনি এবং আদালতে এটি বিচারাধীন।

বিজেপি এবং আরএসএস'এর যৌথ উদ্যোগে মুসলমান বিরোধী অ্যাজেন্ডার অংশ হিসেবে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু পত্রিকায় ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে বহু মিথ্যা ধারণা প্রচার করা হচ্ছে। যেমন, তিনি নাকি অনেক হিন্দু মন্দির ধ্বংস এবং লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের হত্যা করেছিলেন। অথচ, ঔরঙ্গজেব তাঁর ন্যায়বিচারের জন্য সমস্ত ধর্মীয় ধারার মানুষের কাছে আলোচিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেব বহু হিন্দু মন্দির সংস্কার করে ব্রাহ্মণদের জমি, বৃত্তি চালু করেছিলেন এবং সম্ভবত তিনিই তাঁর প্রশাসনে সবচেয়ে বেশি হিন্দুদের নিয়োগ করেছিলেন। ঔরঙ্গজেব হিন্দু উৎসবের উপর চালু কর বাতিল করে এই ধরনের উদযাপনকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। অসংখ্য ইউরোপীয় ভ্রমণকারী এবং হিন্দু লেখক ১৬৯০'এর দশকের শেষের দিকে হোলি উদযাপনের কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে ঔরঙ্গজেবের নিজের সন্তানরাও অংশ নিতেন।

গত এক দশক ধরে ভারতের ইতিহাসকে বিকৃত করে ভারতের ইসলামি অতীত সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করার যে নির্লজ্জ প্রচেষ্টা বিজেপি তথা প্রধানমন্ত্রীর মদতপুষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো চালাচ্ছে তাতে ভারতীয় রাজনীতির সহিংসতার দিকটিই প্রতিভাত হয়ে উঠছে। সুপরিকল্পিত ভাবে গোদি মিডিয়া এবং বলিউডকে ব্যবহার করা হচ্ছে একের পর এক জাতীয়তাবাদী বিতর্ক উসকে দিয়ে ভুল তথ্য-নির্ভর ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র বানাতে, যেমন, 'পদ্মাবত', 'পৃথ্বীরাজ', 'তানাজি', যেখানে সব মুসলমান শাসকই বর্বর, নিষ্ঠুর এবং হিন্দু বিরোধী। অথচ যে সময়ের পটভূমিতে চলচ্চিত্রগুলি তৈরি হয়েছে, সেই সময় জাতীয়তাবাদের কোনও ধারণাই ভারতীয়দের মধ্যে ছিল না।

এখনও অনেক ভারতীয় বিশ্বাস করেন যে মুসলমান শাসকেরা প্রায়শই ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দু মন্দিরগুলি লুটপাট ও ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ করতেন। স্বাধীনতার পর প্রথম চার দশকে এই সমস্যাটি এত প্রকট ছিল না। কিন্তু ১৯৮০-র দশকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপি অযোধ্যায় ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত 'বাবরি মসজিদ'এর স্থানে একটি রাম মন্দির নির্মাণের জন্য প্রচার শুরু করে এবং ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ওই মসজিদ ভেঙে ফেলে। এর ফলে ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কমপক্ষে ২০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। এই  আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল আরএসএস এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি যা 'সংঘ পরিবার' নামে পরিচিত; যাদের মূল উদ্দেশ্যই হল ভারতে হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণ এবং মুসলমান নিধন।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুসলমান বিরোধী ঘৃণার মনোভাব এবং হিংসাকে বৈধতা দানের মাধ্যমে ধর্মীয় মেরুকরণের সপক্ষে একের পর এক আইন প্রণয়ন করে চলেছে। তারা ২০১৭ সালে গো-মাংস নিষিদ্ধ করা থেকে ২০১৯'এর নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের মাধ্যমে ক্রমাগত মুসলমানদের কোণঠাসা করে ফেলার পদক্ষেপ নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে  চলেছে। উত্তরাখণ্ডে ইতিমধ্যেই আইনে পরিণত হওয়া ইউনিফর্ম সিভিল কোড দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃবর্ণ বিবাহ বা তাদের নিজস্ব পছন্দের লিভ-ইন সম্পর্কে প্রবেশের সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। সংসদে পাসের অপেক্ষায় থাকা হাল আমলের ওয়াকফ সংশোধনী বিল প্রণয়নেরও আসল উদ্দেশ্য সমস্ত মুসলিম দাতব্য সম্পত্তি, মসজিদ এবং সমাধিসৌধকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।

'ইউএপিএ অ্যামেন্ডমেন্ড অ্যাক্ট'এর ভয়াবহ বাতাবরণে বিনা বিচারে মানুষকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দি করে রাখা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও আজ রাষ্ট্রের নজরদারি ও হস্তক্ষেপে বিপর্যস্ত। উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে এ বছর জুমার নামাজের বিরুদ্ধে 'হোলি' উদযাপন ছিল পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচারের অংশ। এমনকি 'হোলির' দিন সম্ভলের  মসজিদ্গুলিকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় এবং প্রশাসন ওইদিন মুসলমানদের বাড়ির ভিতর থাকতে আদেশ দেয়। দলিতরাও এই হোলির হিংসার বলি হয়েছে। বিহারের ঔরঙ্গাবাদ জেলায় এক দলিত নাবালিকা কোমল পাসওয়ানকে রঙ নিতে অস্বীকার করার জন্য পিষে মেরে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভারতের ক্রমাগত নিম্নগামী অর্থনৈতিক অবস্থা, মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বের দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর লক্ষ্যে আজ পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মুসলমান বিরোধী ঘৃণার মনোভাব ও ধর্মান্ধতার ধারণাগুলি সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রেও এই গৈরিকিকরণ চলেছে। মুসলমান বিরোধী নিপীড়নের নতুন নতুন অজুহাত আবিষ্কৃত হচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতির বিরুদ্ধেও নতুন সব হাতিয়ার তৈরি হচ্ছে। নিত্য নতুন আইন ও বিল মুসলমানদের প্রতিদিন আরও ভীত, সন্ত্রস্ত ও দুর্বল করে তুলছে এবং নিরাপত্তাহীনতার দিকে  ঠেলে দিচ্ছে।  

বিকৃত ইতিহাস, ধর্মীয় মেরুকরণ ও রাজনীতির এই ত্রিভুজ সংকটে সাধারণ মানুষের আবেগ বিধ্বস্ত ও দোদুল্যমান। তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্ম ও সচেতন নেতৃত্বের হাতে।


Sunday, 23 March 2025

আশা-আশঙ্কার দোলাচলে

বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে

শাহেদ শুভো



এই লেখাটি যখন লিখছি সেই মুহুর্তে আমার নিউজ স্ক্রলে দেখছি ইজরায়েল ফিলিস্তিনিতে হামলা চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করছে! নেতানাহু যুদ্ধ বিরতিকে অস্বীকার করেছেন! দুর্নীতিবাজ নেতানেহু তাঁর দেশে চরম অজনপ্রিয়, তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে হলে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে অন্যায্য হামলা চালিয়ে যেতে হবে, যেমন ভারতে স্রেফ একটা চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলি মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কবর ধংস করতে চায়! কী অদ্ভুত মিল-- আমাদের এখানে পীর-ওলিদের মাজার ভাঙছে ইস্লামিস্ট চরমপন্থীরা! গত সাত মাসে ৮০'র অধিক মাজার ভেঙ্গে ফেলেছে তারা! পবিত্র রমজান মাসে ফিলিস্তিনের সাধারণ নাগরিকদের উপর যখন একদল নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন অন্য কেউ ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগের কোনও মোঘল শাসকের কবর উপড়ে ফেলে ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়; আবার আমার দেশেই তৌহিদী জনতার বেশে মাজারে অ-ইসলামিক কর্মকাণ্ডের ধুয়ো তুলে সেগুলিকে ধংস করা হচ্ছে। 

আছিয়া নামে এক শিশুকে নারকীয় ভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে তারই স্বজনেরা! কী অমানবিক এই সমাজ! এর প্রতিবাদে যখন সারা দেশের মানুষ, রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন  রাজপথে, গণজাগরণ মঞ্চের সাবেক ও বর্তমান সিপিবি নেতা লাকি আক্তার তাঁর অবস্থান থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত হন, সেইদিন পুলিশ বামেদের উপর হামলা চালায়। ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য সহ ইসলামপন্থী একটা অংশ প্রচার করে যে, বামেদের এই আন্দোলন থেকে মূলত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের আয়োজন করা হয়েছে। পিনাকীবাবু ভিডিও বানায় এবং সিপিবি অফিস দখল নিতে বলে। শাপলা-শাহবাগ'এর বাইনারি হাজির করে তারা! ন্যারেটিভ, পালটা ন্যারেটিভ, বাইনারি, কালচারাল ওয়ার, মব লিঞ্চিং, মব জাস্টিস, তৌহিদী জনতা, সংস্কার, কবর দেওয়ার হুমকি (যা কিছু আমার পছন্দ নয়), ফার রাইট, নয়া বন্দোবস্ত এগুলো এখন আমাদের অ্যালগরিদম স্ক্রল ফিড আর নিউজ ফিডের স্ক্রিনিং। যা ঘটছে অথবা দৃশ্যমান, সেগুলোই কি সত্য? সাধারণ মানুষের কি এতে কোনও যোগ আছে? নাকি প্রপাগান্ডা চালানো একটা অংশ এমন ভাবে দেখাচ্ছে যেন বাংলাদেশের রাস্তায় জঙ্গিরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! বাংলাদেশ কি পরবর্তী আফগানিস্তান? আমরা ভয় পাচ্ছি, সাম্রাজ্যবাদী চক্র কি 'ওয়ার অন টেরর'এর ক্ষেত্র বানাচ্ছে বাংলাদেশকে? 

বাংলাদেশের এই মুহুর্তে বৃহত্তম দল বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চাইছে। বেশ কিছু জরিপ থেকেও তেমন একটা ছবি ধরা পড়েছে। তাদের সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় সমমনা দলগুলিও দ্রুত নির্বাচন চাইছে। অবশ্য, জনমনে এবং ফেসবুকের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে অনেক খবর ঘুরে বেড়ায় যার সত্য-মিথ্যা সাধারণজনেরা জানে না। প্রশ্ন হল, অন্তর্বর্তী সরকার কি নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তরিক? শেখ হাসিনাও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাত বদল চায়নি এবং বাংলাদেশের সংকটের শুরু এই 'পাওয়ার ট্রান্সফার'এর অনীহা থেকেই! অভ্যুত্থান পরবর্তী লেখায় আমি বেশ কিছু সংশয়ের কথা বলেছিলাম। হাসিনা পতনের অন্যতম কারণ ১৫ বছর জোর করে অসৎ পদ্ধতিতে তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং এক অলিগার্ক বাহিনী গড়ে সমস্তরকম অন্যায় করে যাওয়া। ২০২৪'এর জুলাই ছিল হাসিনা বাহিনীর চরম নৃশংসতার বহিঃপ্রকাশ। ফলে, সাধারণ মানুষ, ছাত্র আর রাজনৈতিক দলগুলো এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল সকল বিভেদ ভুলে; দেশের অধিকাংশ মানুষের একটাই লক্ষ্য ছিল: হাসিনার পতন! 

হাসিনা উচ্ছেদের পর প্রশ্ন উঠেছে, তাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের সামনে কি কোনও বিকল্প রাজনীতির উপস্থিতি ছিল? বাস্তব এটাই যে, কোনও রাজনৈতিক দল একক ভাবে হাসিনা পতনে ভূমিকা রাখেনি, অনেক অনুঘটকও ছিল, হয়তো কিছু ষড়যন্ত্রও ছিল। কিন্তু কোনওটাই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র নয়; তা ছিল বাংলাদেশের অধিংকাংশ মানুষের চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা ২০২৪'এর আগে অবধি বিএনপি'র গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে, এমনকি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও অনেককেই সেই সময় সক্রিয় দেখা যায়নি। তাই সেই গণতন্ত্র বা ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন স্রেফ বিএনপি'র দলগত আন্দোলনে পরিণতি পায়। যখন হাসিনার দুর্বৃত্ত পেটোয়া বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত নগরবাসী দেখে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তখনই তারা প্রবলভাবে হাসিনার বিরুদ্ধাচারণ করে, ফলত হাসিনার পতন হয়। হাসিনা'র পতনের পর প্রায় তিনদিন যখন দেশে কোনও কার্যকর সরকার ছিল না তখন কিন্তু ছাত্রজনতা ও সেনাবাহিনী একসঙ্গে বাংলাদেশের সেই সময়ের সার্বিক পরিস্থিতি সামলে ছিল, হাসিনা পরবর্তী বড় ধরনের গণহত্যা হওয়া থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নানা জনে এখন অভ্যুত্থানের ক্রেডিট সংগ্রহে ব্যস্ত। অথচ জনগণের অভিপ্রায় না থাকলে এই সামগ্রিক লড়াই হত কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। 

রাজনৈতিক সংস্কার বা নয়া বন্দোবস্তের প্রশ্ন সবই এখন আলাপে আসছে যদিও হাসিনার পতনের আগে তা সেভাবে কেউ ভেবে দেখেনি। একজন ভাইরাল কবি লিখেছেন, 'জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে কেন সংস্কার করতে হবে, জনগণ শুধু ভোটের মালিক!' আবার একজন সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার বলেছেন ভোটকে ব্যান করে দিতে! কী অদ্ভুত! এরাই আমাদের জেন-জি সম্প্রদায়ের আইডল! এদের কারও অঙ্গুলি হেলন ও উত্তেজনায় ৩২ নম্বর গুড়িয়ে দেওয়া হয়! ১৯৭১ না ২০২৪-- এখন অ্যালগরিদমের স্ক্রলের আলাপ, আপনি ২৪'এর নির্বিচার হত্যাকে স্বীকার করে নিবেন! আবার ৭১'এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্বে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল সেই বিষয় প্রশ্ন তৈরি করবেন মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে! এইসব কিছু দেখে অনেকে ধারণা করছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মূলত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সক্রিয় রাজনৈতিক অংশই কি ২৪'এর হাসিনা পতনের আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে? 

রাজনৈতিক দলগুলি, বিশেষ করে বিএনপি'র মতো জনমুখি শক্তিশালী সংগঠনগুলো, যাদের মূল অংশ এক ধরনের উদার গণতান্ত্রিক চরিত্রের এবং অনেকগুলো উদারপন্থী বাম দল এই সরকার এবং এদের সঙ্গে থাকা ছাত্র নেতৃত্বকে নিয়ে সন্দিহান, কারণ, এই ছাত্ররা প্রথম থেকেই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র রাজনীতির নামে 'অরাজনৈতিক' পরিচয়ের কথা বললেও এদের অধিকাংশই জামাতের ছাত্র সংগঠন 'শিবির'এর বর্তমান এবং প্রাক্তন কর্মী! আবার যে 'জাতীয় নাগরিক কমিটি' করা হয়েছিল সেখানে অনেক সংগঠকের পরিচয় ছিল প্রাক্তন 'শিবির'। শিবির বা জামায়াত হওয়াটা অবশ্যই দোষের নয় কিন্তু জনমানসের বৃহৎ অংশের মধ্যে এখনও তাদের মুক্তিযুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যদিও তাদের অনেকেই বলছে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু তাদের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকাংশের মধ্যে আমরা কি আদৌ দেখতে পেয়েছি বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে পরিষ্কার কোনও অবস্থান? এই নেতৃত্বদানকারী অংশ এই মুহূর্তে নির্বাচনে আগ্রহী নয়! তারা হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিচার, দ্বিতীয় রিপাবলিকের গণপরিষদ নির্বাচন, ৭২'এর  সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়া, এই আলাপেই ব্যস্ত। কাকতালীয় ভাবে, জামাত সহ তাদের আরেক মিত্র শক্তি এবি পার্টিও ছাত্রদের এই সুরেই অনেকটা কথা বলছে। মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে, নির্বাচন কি আদৌ হবে? এর মধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা সরকারকে জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে। তৎসত্ত্বেও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা কি বিশ্বাস করে যে তারা কী ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছে এই দেশের জনগণের উপর? বিন্দুমাত্র অনুশোচনা অনুভব না করা এই দলের সমর্থকরা তো শেখ হাসিনা ও তাঁর দলবলের মতো পালিয়ে যেতে পারেনি। তাদের কী অবস্থা হবে? 

এসবের মধ্যেই তরুণদের রাজনৈতিক দলের অভিষেক হল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি' নামে। ব্যাপক আয়োজনে এই দলের অভিষেকে বর্তমান সরকারে তাদের সংযুক্ত থাকার খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই তাদের 'কিংস পার্টি' বলছে। এই দল শুরু থেকেই বিতর্ক জারি রেখেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি'র নেতা যিনি বর্তমান সরকারে তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা এখন সুখকর না তাই নির্বাচন পেছনোর পক্ষে মত দিয়েছিলেন, যদিও পরে তাঁর ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন; আবার সংগঠনের অর্থ বিষয় প্রশ্ন করা হলে দলের অর্থদাতাদের বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা দেখিয়েছেন। এই দলের অর্থ সহ নানা প্রসঙ্গে অনেক প্রশ্ন জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই দলের মতাদর্শ কী? শুধু বিগত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধবাদিতার রাজনীতি কি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী থাকবে?

আরও প্রশ্ন উঠছে-- দেশের তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র দ্বিদলীয় রাজনীতির যুগ কি শেষ হবে? কারণ, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপি'র তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীরাও চাঁদাবাজি ও দখলের কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে। আবার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কি এই সরকারের সঙ্গে যুক্ত নতুন রাজনৈতিক দল অস্বীকার করতে পারে? গত শনিবার (২২ মার্চ) মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব সফিকুল আলম জানিয়েছেন যে দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা।

গোটা বাংলাদেশটা ঢাকা অথবা ঢাবির ক্যাম্পাস নয়। এখনও গ্রামে সামন্ত চিন্তার সমাজ সক্রিয়! জাতীয় পুঁজির নামে হাসিনা লুটেরা পুঁজি নির্মাণ করেছে, আবার গার্মেন্টস'এ গত সাত মাসে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, আন্দোলনরত শ্রমিকের রক্তে লাল হয়েছে এই সরকারের হাত। এই প্রশ্নও আছে, প্রবাসে যে মানুষগুলো সস্তা শ্রম বেচে তাদের নাগরিক সত্তা কী? এমন অনেক প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা তরুণরা নতুন রাজনীতি নির্মাণ করবে নাকি বিগত দিনের মতোই বৃহত্তম দল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আরেকটা এলিটোক্রেসির কাঠামো তৈরি করবে?  চারপাশের পরিস্থিতি আমাদেরও ভাবিয়ে তোলে-- বাংলাদেশ কি ভবিষ্যতের গাজা হয়ে উঠছে? সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত আর আমাদের বিভ্রান্ত রাজনীতি এই ব-দ্বীপকে কোন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে?


Tuesday, 18 March 2025

ভুয়ো ভোটারের মেগা কারচুপি

আগামী নির্বাচনের দিনগুলি!

কল্যাণ সেনগুপ্ত



আশ্চর্যজনক ভাবে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং সর্বশেষ দিল্লির নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভ ওইসব রাজ্যের বিজেপি বিরোধী পক্ষকে হতবাক ও সচকিত করেছে। অন্য নানা কারণ থাকা সত্ত্বেও ভোটার লিস্টের গড়বড় অবশ্যই পরাজয়ের একটি বড় বিষয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিরোধী সংঘবদ্ধতার অভাব, নানাবিধ সাংগঠনিক ত্রুটি ইত্যাদি অবশ্যই ছিল। কিন্তু, প্রতিটি রাজ্যেই ভোটের ফল প্রকাশের পর সবার নজরে এসেছে যে লোকসভার নির্বাচন সাঙ্গ হবার মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই এক অসম্ভব ঘটনা ঘটেছে; বেশ কয়েক লক্ষ ভোটারের অবাস্তব সংখ্যা বৃদ্ধি। যেমন মহারাষ্ট্রে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যবর্তী মাত্র সাত মাস সময়ে ভোটার লিস্টে ৩৯ লক্ষ ভোটারের নাম যুক্ত হয়েছে। এই নতুন নাম তালিকাভুক্তির অধিকাংশই হচ্ছে অনলাইনে, যেখানে কোনও ভেরিফিকেশন ছাড়াই এন্তারসে বিজেপি শাসিত কিছু রাজ্য থেকে নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার নেপোয় এসে দই মেরে দিয়ে চলে যাচ্ছে! কথিত তিন রাজ্যের বিজেপি বিরোধী নেতৃত্ব অন্যান্য বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে ভোটার লিস্টের এই অসম্ভব সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে তাদের সময়মতো নজরই পড়েনি। এ ব্যাপারে প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই, এরপর তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ তথ্য সহকারে তাঁর নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানালে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ইস্যুটিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সোরগোল তোলেন যে এখন আর তাকে কোনওভাবেই পাস কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

এর ফলে অবশ্য শুধু এ রাজ্যেই নয়, এ বছরের শেষের দিকে আসন্ন বিহার নির্বাচনেও এইদিকে সব দলেরই নজর থাকবে। যদিও বিহারের নির্বাচনে মূল বিষয় হচ্ছে বিরোধী দল সমূহকে বিরোধী জোট গড়ে  নিজেদের মধ্যে সুষ্ঠু রূপে আসন বণ্টনের সমস্যাটি সহমতের ভিত্তিতে সমাধান করা। তৃণমূল স্তরে জোটের সাংগঠনিক ঐক্যবদ্ধ রূপ গড়ে তুলতে সফল হলে সর্বত্র প্রচারে ঝড় তোলা সম্ভব। আমরা লক্ষ করেছি, অতীতের ভোটে কংগ্রেস তার জাতীয় রাজনীতির ওজন দেখিয়ে বাস্তব সাংগঠনিক ক্ষমতার থেকে অনেক বেশি আসন আদায় করে অথচ যোগ্য লড়াই দিতে ব্যর্থ হয়ে বিজেপিকেই জিততে পরোক্ষে সাহায্য করে। এর অবসান জরুরি। বিহারে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন দলের কিছু এলাকায় যথেষ্ট শক্তি আছে, কিন্তু তাদের কম আসনে লড়তে বাধ্য করা হয়। এরও প্রতিকার হওয়া উচিত। বিহারে বিজেপি নীতিশকেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করায় লড়াই বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াল নিঃসন্দেহে। ফলে, বিরোধী ঐক্যে সামান্য ত্রুটিও ভবিষ্যতে হতাশার কারণ হতে পারে।

এ রাজ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি। বাস্তবে সিপিএম ও কংগ্রেসের ভূমিকা এখানে স্রেফ বিজেপিকে পরোক্ষে মদত দেওয়া। বিশেষত সিপিএমের ভোটই যে বিজেপির ভাণ্ডারকে পুষ্ট করেছে সে তো দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই অনুষ্ঠিত দিল্লির ভোটে বিজেপি জেতায় এবং আপ হারায় কংগ্রেস নেতৃত্বের কি নির্লজ্জ উল্লাস! দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেতৃত্ব যদি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে তবে তার লাভ যায় শাসক বিজেপির পক্ষেই। আজ অনেকের মনেই এই প্রশ্ন উঠছে যে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের এমন অদ্ভুত আচরণের কারণ কী? দেশের একটি শিশুও সম্ভবত জানে, সর্বাত্মক বিরোধী ঐক্য বিনা বিজেপিকে হারানো অসম্ভব। তবুও কোনও এক রহস্যজনক কারণে বিরোধী ঐক্যের ইন্ডিয়া জোটকে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাংলার ভোট আগামী বছর। তবে অনেকে এমনটাও  ভাবছেন, কোনও কারণে এ রাজ্যের ভোট কয়েক মাস এগিয়ে এনে বিহারের সঙ্গেই সাঙ্গ হবে না তো? সেটা সম্ভব একমাত্র রাজ্য সরকার চাইলেই। রাজ্যের সরকার চূড়ান্ত গরমে ভোট গ্রহণের অসুবিধার কথা অতীতে বহুবার প্রকাশ্যে বলেছে। বাংলার চেয়েও বিহারের ভোট বিজেপির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, একসঙ্গে ভোট হলে বিজেপি বাংলার ভোটে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব অর্থাৎ মোদী-শাহ'দের এনে প্রচারে বেশি সময় দিতে পারবে না, এতে লাভ টিএমসি'র। সে কারণেই বিজেপি এতে রাজি হবে না, কিন্তু আটকাতে পারবে কি? কারণ, এ বিষয়ে রাজ্যের প্রস্তাব গ্রহণ না করা কঠিন এবং যুক্তির দিক দিয়েও একসঙ্গে ভোট করার পক্ষেই বিজেপি বলে থাকে, সবাই জানে। সুতরাং রাজ্য চাইলে একসঙ্গে হবার সম্ভাবনাই বেশি।

ভোট বাংলায় যবেই হোক নিশ্চিত ভাবেই লড়াই দ্বিমুখি হবে। একটা সামান্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে-- উচ্চতর কংগ্রেস নেতৃত্বের অনুরোধে কিছু আসন ছেড়ে দিলে গড়ে উঠতে পারে এক অনিচ্ছুক কর্তব্যের জোট। কারণ এ রাজ্যে কংগ্রেস কর্মীদের কাছে বিজেপির চেয়েও তৃণমূল অনেক বড় শত্রু। আর জোট হলেও বাকি সব আসনে কংগ্রেস কর্মীরা তৃণমূলকে আদৌ ভোট দেবে কিনা সন্দেহ। এর জন্য অবশ্য ভোটের ফলে বিশেষ হেরফের হবে না। আমরা জানি, লোকসভার ভোটে বিজেপি কিঞ্চিৎ বেশি ভোট পায় বিধানসভার ভোটের তুলনায়। তবে এবার  ভোটে সব দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছে সংঘ নেতৃত্ব, এমনটাই জানিয়েছেন সংঘকর্তা মোহন ভগবৎ স্বয়ং। অস্বীকার করার উপায় নেই, শেষ তিনটি রাজ্যের ভোটে তৃণমূল স্তরের প্রচারে সংঘের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট প্রভাবশালী। সুতরাং, এ রাজ্যেও অধিক সাবধানতার প্রয়োজন নিশ্চিত। মাথায় রাখতে হবে, এরই সাথে যুক্ত হবে বিজেপির বিশাল অর্থ ভাণ্ডারের সুচতুর ব্যবহার। ফলে লড়াই এবার বেশ কঠিন।

উপরোক্ত বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও শাসক দলের প্রধান কাজ আসন্ন ভোটে প্রতিটি বুথে ভুয়ো ভোটারের সন্ধান ও তা লিপিবদ্ধ করে প্রথমে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে সে তালিকা সহ অভিযোগ দায়ের করা ও কড়া নজর রাখা। তৎসহ সমস্ত বিরোধী পক্ষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের উপর প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা। আমরা জানি, নতুন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি হচ্ছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের এক খাস ও নির্ভরযোগ্য আধিকারিক। সুতরাং এদের চালাকি ও অন্যায় কর্মের ব্যাপ্তি সীমাহীন। এরা জানে, আদালতকে কীভাবে নিজেদের সপক্ষে ব্যবহার করতে হয়। ফলে আশঙ্কা হয় যে, বিরোধী পক্ষকে আগাগোড়া 'গুড হিউমারে' রেখে শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত ভোটার লিস্টে বিজেপি কৃত যথেষ্ট গড়বড় সহ তা প্রকাশিত হয়ে যেতে পারে। স্ক্রুটিনি, নাম সংযোজন বা বাতিলের সমস্ত প্রক্রিয়ার অন্তে শেষ কথা তো বলবেন মুখ্য কমিশনারই এবং তার আজ্ঞাই শিরোধার্য করতে হবে সব পক্ষকে। কিন্তু তাতে  অসন্তুষ্ট হলেও শেষ মুহূর্তে কিছু করার আদৌ কোনও সুযোগ থাকবে কি? সামনে থাকবে মাত্র দুটো অপশন, হয় নির্বাচন বয়কট করো নয়তো আদালতে যাও এবং সেখানেও শেষ সময়ে আদালত কোনওরকম সুবিচার দেবে, এমন আশা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং তার জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি বিরোধী শক্তির সুসম্পর্ক ও বোঝাপড়া বিশেষ জরুরি। প্রধান বিরোধীরা এ বিষয়গুলো বুঝলেও কতখানি সফল হন, তার উপরেও এবারের ভোটের ফল অনেকখানিই নির্ভরশীল।