Tuesday, 9 February 2021

অপ্রিয় হলেও সত্য

এক আশ্রম ও তার কথা

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

 

বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত মহাশয় জানতে চান বিশ্বভারতীর জমির পরিমাণ ঠিক কত? ৩০০০ হেক্টর থেকে ৪০০ একর নানারকম তথ্য র‍য়েছে সামনে। তার প্রশ্ন: তথ্য হিসেবে কোনটি সত্য? কোনও সন্দেহ নেই যে প্রশ্নটি সহজ ও সরল। সন্দেহ নেই যে, বিরল জিজ্ঞাসু মনের অধিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবু, মানতেই হয় যে তিনিও এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজেননি। তাঁর জিজ্ঞাসু মন 'গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই তা সর্বত্রগামী।'  

তবে, তিনি খোঁজেননি বলেই এমন প্রশ্ন তোলা কী অরাবিন্দ্রিক বা অযৌক্তিক? কী বলে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ? তা হয়তো নয়। যদি বলতে পারতাম, 'নিশ্চয় নয়' তবে অনেক অনেক বেশি খুশি  হতে পারতাম। তবে তা প্রাণখুলে বলতে পারছি কই? 

উপাচার্য মহোদয়ের কৃপায় বা ভয়ে ঐ তল্লাটে আর বুঝি কেউ প্রাণখুলে কথা বলতে পারেন না। তিনি আলাপিনী তুলে দিতে ব্যস্ত, ব্যস্ত প্রয়াত শান্তিদেব ঘোষের বাড়ি দখল করতে, ব্যস্ত কাদা ছুঁড়তে। আশ্রমিকদের সব্বাইকে কালিমালিপ্ত করতে চান তিনি। তা, তিনি তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা মতো চলবেন বৈকি। বোকা বনেছি আমরা, আমরা যারা ভেবেছিলাম বিশ্বভারতীর উপাচার্য তো - তিনি একটা  সীমা মেনে চলবেন। তিনি কেবল পাঁচিল তুলবেন না, পাঁচিল পেরিয়ে হলেও আসবেন কাছে। এলেন না তো! 

এমন নয় যে তিনিই প্রথম বিশ্বভারতীর জমি চিহ্নিত করতে পাঁচিল দিতে চান। আগেও বহুজন সে কাজে হাত দিয়েছেন, আগেও কিছুজনকে পেয়েছি যারা বিশ্বভারতীর আদর্শে পুরোপুরি প্রাণিত হয়ে উঠতে পারেননি।  কিন্তু এমনটি কেউ ছিলেন বলে তো জানি না। তবে আমি আর কতটুকু জানি, যদিও জানতে চাই অনেক। তেমন জানার আগ্রহ নিয়েই একদিন হাজির হয়েছিলাম আম্রকুঞ্জে, যেখানে নবনিযুক্ত উপাচার্য মহাশয় হাজির হয়েছিলেন কয়েকজন আশ্রমিককে (যথা রামবহাল তেওয়ারি বা সুপ্রবুদ্ধ সেন) সম্বর্ধনা জানাতে। তিনি তখন সবে এসেছেন। সেদিন তাঁর মনে হয়নি সব আশ্রমিক ধান্দাবাজ, যেমন সেদিন সব আশ্রমিকের মনে হয়নি যে উপাচার্য মহোদয় মানুষ ভালো না। তাঁদের অনেকের মনে হয়েছিল যে, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি মিথ্যে না হলেও হতে পারে নিছক মানবিক ভুল। এমন ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে চরিত্রহীন কাউকে সরকার দায়িত্ব পালনে পাঠাতে পারেই না। তখনই কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, খারাপ দিন আসছে। বিশ্বাস করিনি। নিজের বোকামিতে লজ্জা পাচ্ছি আজ। 

শিক্ষা কমিশনের বৈঠকে শ্রী ব্রহ্মচারী একবার বললেন, তিনি আদর্শ গার্হস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় (residential University) গড়ার সুপারিশ করতে চান। তার উদাহরণ রূপে তিনি যে সব  বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভেবেছেন ও বলেছেন তার অবস্থান বাংলায় নয়। আমি বলেছিলাম - কেন, বাংলাতেই তো এমন উদাহরণ আছে, বিশ্বভারতী। এমন পরামর্শ দেবার জন্য আজ লজ্জিত। লজ্জিত এই জন্য নয় যে ভুল পরামর্শ দিয়েছি, লজ্জিত এই জন্য যে গার্হস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় (residential University) কর্তা যদি অযোগ্য হ'ন তবে বিপদ বাড়ে। যেমন বেড়েছে বিশ্বভারতীতে। 

যারা বর্তমান উপাচার্যকে ঐ আসনে ডেকে বসিয়েছেন তারা কি সে জন্য লজ্জিত? 

তবে সুভাষ দত্ত মহাশয়ের প্রস্তাব সমর্থনে কোনও লজ্জা নেই। বিশ্বভারতী বলুক না তার জমির পরিমাণ ঠিক কত। কোথা থেকে তারা পেলেন সে জমি? যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, শান্তিদেব ঘোষ (তাঁর উত্তরাধিকারীরা) বা অমর্ত্য সেনরা বিশ্বভারতীর জমি নিয়ম বহির্ভূত উপায়ে দখল করে রেখেছেন তবে তাঁরা ফেরত দিন। এমন তো কেউ কেউ অবশ্যই থাকতে পারেন। কেউ কেউ যদি নিয়ম ভেঙ্গে জমি-বাড়ি হস্তান্তর করেছেন, তবে তাঁদের চিহ্নিত করুন উপাচার্য মহাশয় বা বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কেউ যদি অকারণে বা নিছক কলঙ্ক লেপনের খেলায় মাততে চান তবে তো তার প্রতিবাদ হবেই। উপাচার্য মহাশয় কেন মনে রাখছেন না যে তিনি কোনও দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ন'ন, ভয় দেখানো বা ধমক বা চমক দেওয়া তাঁর কাজ নয়। তিনি উপাচার্য। বিশ্বভারতীর উপাচার্য।

 

Sunday, 7 February 2021

গণতন্ত্র যখন মৃতদেহ

পেরেক প্রজাতন্ত্র!

শোভনলাল চক্রবর্তী


প্রজাতন্ত্র দিবসের ভারী বুটের কুচকাওয়াজ মিটে গেছে সেই কবেই। 'বিটিং দ্য রিট্রিট'এর বিউগল বাজিয়ে ফিরে গেছেন সবাই। কিন্তু রাজধানী দিল্লি ক্রমশই যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ ধারণ করেছে। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশি ব্যারিকেড, কাঁটাতারের বেড়া, ট্রেঞ্চ, রাজপথে গেঁথে দেওয়া সারি সারি পেরেক- আক্ষরিক অর্থেই রণসজ্জা। ঠিক যেমনটা যুদ্ধের সময় হয় তেমনই প্রতিনিয়ত রাজধানীর বিভিন্ন 'সীমান্ত' থেকে ভেসে আসছে বিবিধ 'সংবাদ'। দেখে মনে হচ্ছে যেন ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী কোনও দেশের যুদ্ধ বেঁধেছে। এমনকি, বিদেশমন্ত্রকও 'ভারতের নামে অপপ্রচার' প্রতিরোধে তৎপর হয়ে উঠেছে, যুদ্ধের সময় ঠিক যেমনটা ঘটে! ভয় হয়, যে কোনও মুহূর্তে হাল্লার রাজা ঘুম ভেঙে উঠে বসবেন এবং 'যুদ্ধ যুদ্ধ' বলে হুঙ্কার দিয়ে উঠবেন। 

আজ যদি ধৃতরাষ্ট্র আচমকা হস্তিনাপুরে হাজির হতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয় সঞ্জয়কে সামনে বসিয়ে সবার প্রথমে জানতে চাইতেন, কী করে এমন কুরুক্ষেত্র বাঁধল? সঞ্জয় তখন তাঁকে আস্বস্ত করে নিশ্চয় বলতেন, শান্ত হন মহারাজ, এতে অবাক হওয়ার কী আছে? এই রণসজ্জা তো একদিনের প্রস্তুতিতে তৈরি হয়নি। ফ্রিজে মাংস রাখার সন্দেহে যেদিন একজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, সেদিন অবাক হয়েছিলেন কী? উল্টে হত্যাকারীদের জাতীয় পতাকা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল। না, তখনও অবাক হননি। মাথায় পাগড়ি দেওয়ার অপরাধে একটি ছেলেকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে খুন করল কিছু মানুষ, আর আমরা অবাক হওয়া তো দূরস্থান, দেখলাম সামাজিক মাধ্যমে পিটিয়ে মারার সমর্থনে এগিয়ে আসছেন মানুষ। আমরা কেউ কেউ গর্বিত হলাম, কেউ ভাবলাম, কী হবে ওই সাতে পাঁচে থেকে? সেনার গাড়ির বনেটে বেঁধে নিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি দেখে আমাদের অনেকেই মনে মনে হেসেছি, কেমন টাইট দেওয়া গেল তাঁদের, যাঁরা নিয়মিত পাথর ছুঁড়তেন সেনাবাহিনীর দিকে। না, তখনও অবাক হইনি। 

নোটবন্দি করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আর্থিক সঙ্কট, কিন্তু আমরা হাততালি দিয়েছি আর গুণগান গেয়েছি, অবাক হইনি। কারণ সবই নাকি আমাদের ভালোর কথা ভেবে। সন্ত্রাসবাদীদের কোমর ভাঙার জন্য, মাওবাদীদের দুর্বল করার জন্য আর কালো টাকা বিনাশ করার জন্যই নাকি এইসব আয়োজন। এসবের কিছুই যখন হল না তখনও আমরা অবাক হইনি, উল্টে সবটাই আমাদের ভাগ্যদোষ বলে মেনে নিয়েছি। তারপর এল গণতন্ত্রের মাহেন্দ্রক্ষণ, বিলুপ্ত হল সংবিধানের ৩৭০ ধারা। আমরা গোটা ব্যাপারটা ভেবে দেখার, ভালোমন্দ বিবেচনার সুযোগই পেলাম না। দেশপ্রেমের ঢাকঢোলের আওয়াজে চাপা পড়ে গেল কাশ্মীরের অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর। আজও কাশ্মীর এক বৃহৎ কারাগার বিশেষ, আমরা কী বিশেষ অবাক হয়েছি তাতে? 

আমাদের এক প্রতিবেশী দেশ, যার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পান আমাদের প্রধানমন্ত্রী; তাদের সেনাবাহিনী আমাদের দেশের সীমায় ঢুকে পড়লেও আমাদের মিথ্যা বলা হয়। আমরা সেটাই বিশ্বাস করি এবং অবাক হই না। আমরা বিশ্বাস করি যে মেঘের আড়ালে রাডার ফাঁকি দিয়ে আমরা শত্রুপক্ষের ঘাঁটি উড়িয়ে দিয়ে এসেছি। আপাদমস্তক মিথ্যা প্রচারে ডুবে থাকা আমরা আর কিছুতেই অবাক হই না। যে কার্টুন আমি আঁকিনি, যে চুটকি আমি বলিনি, যে লেখা আমি লিখিনি, তার জন্য জেলে বসে পচতে আজ আমরা যেন সদাপ্রস্তুত। না না, এতে অবাক হওয়ার কী আছে? আচ্ছা, একটি মেয়েকে একাধিকবার ধর্ষণ করে, খুন করে, তার দেহ উর্দি পড়া পুলিশের পাহারায় জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় কি আমরা একটুও অবাক হয়েছিলাম? 

এই সুবিশাল না-অবাকের সারি ডিঙিয়ে আজ আমরা দাঁড়িয়েছি সিঙ্ঘু, গাজীপুর আর টিকরি সীমান্তে যেখানে সোনার ফসল ফলানো কৃষকদের জন্য আমাদের সুমহান প্রজাতন্ত্র রাস্তায় পেতে রেখেছে লোহার পেরেকের তৈরি ব্যারিকেড। একে যদি পেরেক প্রজাতন্ত্র না বলি, তাহলে আর কাকে বলব! এইবার শুরুর অপেক্ষা কুরুক্ষেত্রের। সঞ্জয় আজ অতীত। এখন তথ্য সংগ্রহ ও সম্প্রচারের মাধ্যম অষ্টপ্রহর জাগ্রত ও সজাগ। বিদ্যুৎ সংযোগ, জল ও ইন্টারনেট বন্ধ করে, টুইটারকে ধমক দিয়ে সেই সহস্র চোখের দৃষ্টিপথ রুদ্ধ করার ক্ষমতা মহাশক্তিধর সরকার ও তার অতিপরাক্রমী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেই। অতএব, কুরুরাজ না জানতে পারেন, দেশ ও দুনিয়া বিলক্ষণ জানে কীভাবে এবং কেন দিল্লির পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে উঠল। সাধারণ বুদ্ধিতে এই পরিণতি সত্যিই অবিশ্বাস্য। কবে কীভাবে এই পর্বের অবসান ঘটবে, তার জন্য কাকে কতটা মূল্য চোকাতে হবে, এ সবের উত্তর এখন ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু ইতিমধ্যে যা ঘটে গেছে তা ভারতের ইতিহাসের এক  অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। সেই কলঙ্ক ঔদ্ধত্যের এবং অপদার্থতার। 

সাধারণ মানুষের কথা শুনতে কতটা অপারগ হতে পারে কোনও রাষ্ট্র, তার নিদর্শন আজ দিল্লির রাস্তায় সারা বিশ্ব দেখছে। এই ব্যারিকেডের প্রতিটি পেরেক জানান দিচ্ছে রাষ্ট্রের সেই অনিচ্ছার। তাহলে কি এখন থেকে কথা বলতে পেরতে হবে এই বিপুল ব্যারিকেডের বাধা? রাস্তায় রাখা এই পেরেক অভিজ্ঞান হয়ে থেকে গেল আজকের ভারতের, যার মলিনতা ঘোচাতে পারবে না ক্রিকেটের ঈশ্বরের আলটপকা টুইট, বা একগুচ্ছ বলিউডি 'আমিক্যাবল' টুইট। 

বুঝে এবং না বুঝে কেন্দ্রের বড় বড় মাথারা যে 'গুরুবর'এর বিভিন্ন উক্তি দুমদাম উদ্ধৃত করেন, সেই 'গুরুবর' একটি গানে লিখেছিলেন, 'তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি'। এই লাইনের অর্থ বোঝার ক্ষমতা থাকলে কেন্দ্রের নায়ক নায়িকারা বুঝতেন যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুশাসক হওয়ার কোনও যোগ্যতাই তাঁদের নেই। তাঁদের যা বহুল পরিমাণে আছে তা হল অহঙ্কার, এবং সেই অহঙ্কারের কারণেই তাঁরা ভুলে মেরে দিয়েছেন যে ক্ষমতার সঙ্গে আসে দায়িত্ব, আর দায়িত্বের প্রধান অঙ্গ হল জনগণের কথা শোনার আগ্রহ ও ধৈর্য। অবশ্য এখানে 'ভুলে মেরে দিয়েছেন' লেখাটা ঠিক হল না, কারণ, ওই বোধ তাঁদের কোনওদিনই ছিল না। সেই কারণেই কৃষকদের সঙ্গে শাসকেরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস শুধু সময়ের অপব্যবহার করেছেন সমস্যাটাকে আরও জটিল করে তোলার অভিপ্রায়ে। আজও আক্ষরিক অর্থে দুনিয়ার হাটে চূড়ান্ত অমর্যাদার পরও সরকারপক্ষের আত্মসংশোধনের কোনও তাগিদ নেই বরং অসহিষ্ণুতার পারদ আরও চড়ছে। কৃষকদের ছলে, বলে, কৌশলে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা আরও প্রবল হচ্ছে। 

প্রশ্নটা এখানে সরকার বনাম বিরোধী রাজনীতি বা সরকার বনাম কৃষকের নয়, প্রশ্ন ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার। বর্তমানে পেরেক প্রজাতন্ত্রের রাস্তায় গণতন্ত্র মৃতদেহের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর সংস্কারের নামে আত্মঘাতী পথে ছুটে চলেছে সরকার।


Saturday, 6 February 2021

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি

উত্তরণ নাকি রূপান্তর

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের শরিক। এই প্রথম রাজ্য-রাজনীতিতে বহু দলীয় নির্বাচনের আঙ্গিক যথেষ্ট জোরালো হয়ে দেখা দিয়েছে। এর আগে অবধি দুই যুযুধান পক্ষের ভোটযুদ্ধের সাক্ষী ছিল এ রাজ্য– কংগ্রেস-সিপিএম কিংবা সিপিএম-তৃণমূল। আর এখন সিপিএম-কংগ্রেস জোট, তৃণমূল, বিজেপি- এক ত্রিস্তরীয় নির্বাচনী পরীক্ষার সময়কাল আসন্ন। এছাড়াও আরও যে দুটি সম্ভাবনার কথা অহরহ প্রচারিত হচ্ছে তার একটি হল, বিজেপি যদি আগামী নির্বাচনে ব্যালট-যুদ্ধ জিততে পারে তবে কেন্দ্র-রাজ্যে একই সরকারের নজিরও পশ্চিমবঙ্গ বহু দশক পরে দেখতে পাবে। দ্বিতীয়টি হল, যদি বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস-সিপিএম-তৃণমূল ইত্যাদি একটি মহাগঠবন্ধন হিসেবে প্রতিরোধের দেওয়াল তুলতে পারে তাহলে সেও হবে এক অনন্য নজির। সুতরাং, রাজ্য-রাজনীতির এক যুগ-সন্ধিক্ষণে সকলে অপেক্ষমান।

অনেকে বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী শক্তি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তার যথেষ্ট কারণও আছে- নোটবন্দি, ৩৭০ ধারা, রামমন্দির, সিএএ-এনআরসি, কৃষি আইন ইত্যাদি একপেশে সিদ্ধান্তের তালিকা নিতান্ত কম নয়। তবুও বিজেপিকে এখনও ফ্যাসিবাদী শক্তি বলা যায় না। বরং সম্ভাব্য ফ্যাসিবাদী দল বলা যেতে পারে। কেননা ভারতবর্ষের পুঁজিতন্ত্র এখনও সেই পর্যায় অতিক্রম করেনি যা একটি রাজনৈতিক দলকে সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদী দলে পরিণত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারতের বড় পুঁজি বনাম ছোট ও মাঝারি পুঁজির মধ্যে থাকা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এটাকে ঠেকিয়ে রেখেছে। তাই বড় পুঁজি এখন সর্বাগ্রে ছোট ও মাঝারি পুঁজিকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। আর তার ফলেই নানা ধরনের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের রব হামেশাই উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের জনমনে কি বিজেপি দলের এই সর্বভারতীয় চেহারা ধরা পড়ছে না– এ প্রশ্ন নিতান্তই বালখিল্যতা। অবশ্যই ধরা পড়ছে কিন্তু অসহায়ত্ব ও নিরুপায় বলে যে দুটি শব্দ বাংলা শব্দকোষে আছে তাই-ই এখন আমজনতার হৃদকোষেও মোটা হয়ে ফুটে উঠেছে ।

এর আগে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম-শাসনের অবসান ঘটানো ছিল আরও একটি ঐতিহাসিক নজির। তা সম্ভব হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। ইতিহাস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বৈপ্লবিক দৃষ্টান্তের কথা বিস্মৃত হবে না– তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থেকে যাবেনই। কিন্তু হাল আমলের সব থেকে বড় সমস্যা হল অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবাদ। রাজ্যে সংগঠিত ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের দরুণ আগতপ্রায় কর্পোরেট বড় পুঁজির সংখ্যা প্রায় শূন্যের কাছে। ফলে, বড় লগ্নি ব্যতিরেকে ছোট-মাঝারি-অসংগঠিত ক্ষেত্র নির্ভর অর্থনৈতিক দোলাচলে বাংলার পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যেও দুটি বর্গ আভাসে বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বহুদিন। বাম-আমলে বড় পুঁজির কাছে একটা আপাত শান্তি বজায় ছিল, যা এখন আর নেই । ফলে, একদল পুনর্বার বাম-শক্তিকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু জনসমর্থনের নিরিখে বামপন্থা তথা বামপন্থীরা এখন এতটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে যে বিজেপির উত্থান সেই ফাঁকতালে ধীরে ধীরে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। আর এখানেই বাংলার আরেক দল পুঁজিপতি শ্রেণি সমর্থন জাহির করছে। 

অন্যদিকে, বিজেপি দলটি ঠিক যে যে প্রশ্নে তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করছে, অর্থাৎ দুর্নীতি, তোলাবাজি ও পরিবারকেন্দ্রিকতা, তাকে প্রতিহত করে বিজেপির জাতীয় চরিত্রের বিশ্লেষণ জনগণের সম্মুখে হাজির করার পালে হাওয়া লাগাতে তৃণমূল পারছে না। কেননা মতাদর্শগত বিচারে কংগ্রেসি মানসিকতার একটা আলোছায়াময় জাতীয়তাবাদী জনদরদি চরিত্র ছাড়া তৃণমূলের অন্য অবস্থান সবিশেষ নেই, যেখানে বামপন্থীদের মতোই বিজেপি আরএসএস সমর্থিত একটি ক্যাডারভিত্তিক রেজিমেন্টেড দল। ফলে, লড়াইটা মোটেই সমানে-সমানে নয়। পক্ষান্তরে রাজ্যের বামপন্থী দলগুলি জাতীয় স্তরে ঘটে চলা বৃহৎ আন্দোলনগুলির প্রেক্ষিতে যে সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলবে রাজ্য-রাজনীতিতে সে প্রচেষ্টাও অতীব ক্ষীণ। অতএব, সম্ভাব্য ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বিপরীতে যে এক গণতান্ত্রিকতার প্রতিভূ প্রকট হবে– তা এখন নিতান্তই অসম্ভব। আর এভাবেই বিজেপি বাংলায় বর্ধিষ্ণু দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

অনেকে বলাবলি করছেন, একুশে রাম ছাব্বিশে বাম ইত্যাদি। কিন্তু এসব ভাবনা যে কতটা দিবাস্বপ্ন তা ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলিকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সিপিএম–বিজেপি দুটি দলই রেজিমেন্টেড। ফলে, সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি দুটি দলেরই যথেষ্ট পাকা। সেখানে যদি বিজেপি আগামী নির্বাচনে একবার জিতে যায় তবে বাংলার রাজনীতিতে সিপিএম নামক দলটির আর আদৌ অস্তিত্ব থাকবে কিনা সেটাই সংশয়ের বিষয়। এখানে মতাদর্শগত ফারাকের চেয়েও বড় কথাটা হল সমাজ-অর্থনীতির চরিত্র বদলে। আসলে এখন পুঁজিপতি শব্দটির অভিধানিক পরাকাষ্ঠা কোনও ব্যক্তিবাদকে সূচিত করে না, বরং তা কর্পোরেট বা যৌথবাদে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে রামের বদলে বামের কতটা সুবিধা হবে, তা নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়।

পুঁজিবাদ সদাসর্বদা জাতীয়করণের মধ্যে দিয়ে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছে। ফলে, তা এখন দেশের উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে যাতে একচেটিয়া মালিকানা তাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বামপন্থী দলগুলি এখানে কেবলই নতুন প্রযুক্তির বিরোধিতা থেকে মূল্য-নির্ধারণের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের খাড়া করতে চাইছে। তারা শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির স্বার্থে কার্যকলাপ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সে-কারণে তারা সংশোধনবাদীদের কায়দায় পুঁজিতন্ত্রের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করে ও বৈপ্লবিক চেতনার বিকাশের মাধ্যমে এই দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে জাগ্রত করার ভাবনায় একেবারে জল ঢেলে দিয়েছে। ফলে, বর্তমানে বামপন্থীদের যে রূপ প্রতিভাত তা সংস্কারবাদী আন্দোলনের একটি উপভাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। পুনর্বার ক্ষমতা দখলের উন্মাদনায় তারা ভবিষ্যতের সমাজ বদলের স্বপ্নকে স্থগিত করেছে এবং হারিয়েছে জনসমর্থন, এমনকি পার্টি মেম্বারের সংখ্যাতেও হ্রাস পেয়েছে যুবাদের পরিমাণ। নতুন নেতৃত্বের মুখ প্রায় আর একটিও অবশিষ্ট নেই। অপ্রাসঙ্গিকতা ছাড়া অন্য কোনও কিছুই যেন তাদের জন্য বাকি নেই।

অথচ বামপন্থা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষিত ছিল না। এটি একটি মানসিকতা, একটি ভাবাদর্শ। দীর্ঘ ৩৪টি বছর এ রাজ্যে একটি বামপন্থী দলের শাসনের পরেও আজ এমন দশা কেন হল যে তা একটি সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী দলকে উঠে আসার পক্ষে মদত দিল? অনেকে এখানে তৃণমূলের কথা বলেন কিন্তু ৩৪ বছর ধরে যদি চেতনার লড়াই বামপন্থীরা লড়ত তাহলে কি মাত্র ১০ বছরেই সেই দুর্গ এমন চৌচির হতে পারত? আসলে এ রাজ্যে বামপন্থা শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের রঙ হয়েই প্রথম থেকে বিদ্যমান ছিল, সেখানে মানুষের অন্তর্জগতের পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সমাজব্যবস্থা তৈরির প্রায় কোনও আগ্রহ ছিল না। তাই প্রথম থেকে কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে নানা আপসমুখি ভূমিকায় বাম জমানার অবস্থান লক্ষ করা যায়। এখানেই তাদের মূল ব্যর্থতা। ফলে, মানুষের কাছে এই বামপন্থার ধারা অন্যান্য ডানপন্থার চেয়ে খুব কিছু আলাদা নয়।

কিন্তু মানুষ সবসময় একটি বিকল্প চায়। আর এখন রাজ্য-রাজনীতিতে কোনও দলই প্রায় আর বিকল্পের সন্ধান দিতে পারছে না। সকলেই যেন হাত তুলে নিয়েছে, সকলেই অপারগ। আর এখানেই আগামী নির্বাচন একটি সময়ের অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে। রাজ্য-রাজনীতির এই চেহারা উত্তরণও নয়, রূপান্তরও নয়– কেবলই ভাষান্তর। সকলেই জানে কোনও কিছুরই পরিবর্তন হবে না– রাজা আসবে রাজা যাবে, পোশাকের আর মুখোশের রঙ বদলাবে; সাধারণজনের মেজাজে থাকবে একটাই ভাবনা: সব 'ঝুট হায়! সব ঝুট হায়!'

 

Monday, 1 February 2021

এত অনীহা কেন?

অথ টিকা-কাহিনি

প্রবুদ্ধ বাগচী

 

কোভিড-এর ভয়াবহ আশঙ্কা আর বিপর্যয় নিয়ে সদ্য যে-বছরটাকে আমরা ফেলে এলাম, তার একেবারে শেষ পর্বে আশার আলো ছিল একটাই যে সারা দুনিয়া জুড়েই রোগটির প্রতিষেধক আবিষ্কারের প্রয়াস একটা ইতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেশ কিছু দেশ গত বছরেই প্রতিষেধক টিকার ব্যবহার শুরু করে দিয়েছিল, আমাদের দেশে তার শুভ সূচনা হয়েছে এক পক্ষকাল আগে। হয়তো এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে ঢলে পড়া সমুচিত নয়। তবে পাশাপাশি এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, সকাল অনেক সময়ই জানিয়ে দেয় আমাদের দিনটা কেমন যাবে। 

একটা কোনও রোগকে কেন্দ্র করে মহামারি বা অতিমারি অবস্থা তৈরি হওয়ার ঘটনা এই যে প্রথম হল এমন নয়। এর আগেও অনেক মারণ রোগ মানুষের সভ্যতাকে আক্রমণ করেছে, বহু মানুষের প্রাণ কেড়েছে- আবার বিজ্ঞানীদের মেধা ও নিষ্ঠার কাছে পরাজিত হয়ে সে সব জীবাণু পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। স্মল পক্স, ডিপথেরিয়া, কলেরা, প্লেগ, এমনকি অনেকাংশে যক্ষ্মা আজ আর কোনও মানুষের শরীরের পক্ষে দুষ্টগ্রহের মতো উৎপাত নয়, তাঁদের প্রাণ সংশয়ের কারণ নয়, সহজেই তাঁদের আমরা নিরাময় করে তুলতে পারি। কিন্তু কোভিড-১৯ চরিত্রে কিছুটা আলাদা। কেননা, একই সময়ে সারা দুনিয়ায় সে তার সাম্রাজ্য ছড়িয়ে ফেলেছে এবং এই প্রথম একটা রোগের আশঙ্কায় সারা পৃথিবী প্রায় বছরখানেকের জন্য একরকম থমকে রয়েছে, যার আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কথাটা আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সত্যি। 

গত প্রায় এক বছর ধরে সারা দেশ গৃহবন্দী। আর্থিক কাজকর্ম হয় বন্ধ, নয়তো শ্লথগতি। বহু মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, বহু মানুষ ছটফট করছেন কবে এই রাহুর প্রকোপ থেকে তাঁরা মুক্তি পাবেন। অনেকেই বেপরোয়া হয়ে রোগের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়ছেন রুটি-রুজি-জীবিকার সন্ধানে। এই সময়কালে দেশে যখন টিকা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হল, সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয় দেশের আমজনতার পক্ষে এটা একটা স্বস্তির খবর। কিন্তু পাশাপাশি এটাও প্রশ্ন তুলে দেয়, টিকা দেওয়া শুরু হওয়ার পনের দিন কেটে যাওয়ার পরেও টিকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কিছুতেই প্রার্থিত সংখ্যায় পৌঁছতে পারছে না। সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার কর্মসূচি চললেও অনেকেই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন, প্রতিদিনই আমরা শুনতে পাচ্ছি টিকা নেওয়ার হার যথেষ্ট কম। এমনটা ঘটল কেন? কোথাও কি একটা বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা ঘটছে? 

বিষয়টা একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। ভাবনাটা নাছোড়বান্দা হয়ে পায়ে পায়ে ঘোরে আরও এই কারণে যে মানুষ তো এতদিন রোগের আক্রমণের ভয়ে সিটিয়ে ছিলেন, নিজেদের আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করেও নিজেরা ঘরে বন্দী ছিলেন অথবা নিতান্ত জীবিকার প্রয়োজনে দিনের পর দিন প্রবল সতর্কতা ও আশঙ্কা  নিয়ে পথে বেরিয়েছিলেন; তাহলে আজ যখন তাঁদের সামনে একটা প্রতিকারের পথ এসে দাঁড়িয়েছে তাকে তাঁরা এড়িয়ে যাচ্ছেন কোন বিচারে? যদি চাহিদা ও জোগানের সাবেকি তত্ত্বের কথা ভাবি তাহলে তো টিকার চাহিদা যথেষ্ট থাকার কথা এবং এই মুহূর্তে জোগানের কোনও অসুবিধে নেই। তবে সমস্যাটা কোথায়? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে, আর সেই সঙ্গে আরও একবার নজর রাখতে হবে বিগত সময়ে আমাদের দেশের রাজনীতির পটভূমির দিকে। 

গত ছয়-সাত বছর ধরে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা যাদের হাতে কুক্ষিগত তারা তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শাখা-প্রশাখা এবং অনুগত প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় যে কাজটা করতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে তা হল- গোটা দেশ জুড়ে একটা বিজ্ঞান-বিরোধী (পড়ুন অবৈজ্ঞানিক) মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে পারা যা সফল হয়েছে ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের প্রতি মানুষের যুক্তিহীন আস্থা তৈরি করতে। এমনিতেই আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনায় কোনওদিনই বলীয়ান ছিলেন না; তবু শিক্ষার বিস্তার, আংশিক চেতনার উন্নয়ন এবং কিছুটা বিশ্বায়নের সামাজিক প্রভাবে একশ্রেণির মানুষ আলোকিত হয়েছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই পিছিয়ে থাকা অংশের পিছিয়ে থাকাকে আরও স্থায়ী করার পাশাপাশি ওই আলোকিত অংশকেও অন্ধকারের দিকে টেনে আনা হয়েছে খুব কায়দা করে। গণেশের মাথার মধ্যে প্লাস্টিক সার্জারির বিজ্ঞান খুঁজে পাওয়া, পুষ্পক রথের মধ্যে যুদ্ধ বিমানের প্রযুক্তি আবিষ্কার কিংবা মহাভারতের সঞ্জয়-কথিত ধারাবিবরণীর মধ্যে ইন্টারনেটের উপস্থিতির প্রচার- এগুলো নিছক রাজনীতির নেতাদের মস্করা বলে ধরা ভুল। এর পেছনে আছে স্পষ্ট একটা দুরভিসন্ধি- নিকষ তামসিকতাকে সামাজিক রাজনৈতিক প্রামাণ্যতা প্রদান। দেশের কোনও কোনও রাজ্যের পাঠ্যসূচিতেও এই ধরনের আষাঢ়ে গপ্পোকে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এটা একটা সংগঠিত প্রয়াস।

আমরা কেউই ভুলিনি, করোনা-সংক্রান্ত লকডাউনের গোড়ার দিকে জনতা কার্ফু নামে তালি বা থালা বাজানোর পরামর্শ, রাতের এক বিশেষ প্রহরে নিষ্প্রদীপ থাকার নিদান- ঘটা করে সারা জাতির উদ্দেশে এইসব বিজ্ঞান-বিরোধী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন একটা ভাব করা হয়েছে যে ব্যক্তি-বিশেষের হাতযশেই নাকি দেশব্যাপী এই অতিমারির নিরসন সম্ভব; জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইটা নাকি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতোই কুরু-পাণ্ডবের দ্বৈরথ। ইতিমধ্যে খুচরো নেতারা কেউ কেউ খোদ রাজধানী দিল্লির বুকে গোমূত্র-পার্টির আয়োজন করে প্রচার করেছেন, গোচোনা খেলেই নাকি কোভিড সেরে যায়, কেউ কোনও বিশেষ পাঁপড়ের বিজ্ঞাপন করেছেন কোভিড প্রতিষেধক বলে। এর প্রতিটিই একটা বিশেষ লক্ষ্যে পরিচালিত, দেশের মানুষ যাতে বৈজ্ঞানিক সত্যের ধারেকাছে না মাড়ান। অথচ যারা একটু আধটু সংবিধানের খবর রাখেন তাঁরা জানেন, বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারাকে প্রেরণা জোগানো আমাদের সংবিধানের নির্দেশাবলীর (ডাইরেক্টিভ প্রিন্সিপাল) অন্তর্ভুক্ত। চুলোয় যাক সংবিধান!

আমাদের আরও একটু মনে করে দেখতে হবে, টিকা নিয়ে সারা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও যখন গবেষণা চলছিল, সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে আসছিল নানা খবর, প্রতিবেদন, তখনও কিন্তু কোনও বিজ্ঞানকর্মী বা গবেষকের নাম আমাদের সামনে সেভাবে আসেনি যেভাবে ও যতটা প্রচার করা হয়েছিল ‘আত্মনির্ভরশীল ভারত’এর মতো এক ‘খায় না মাথায় মাখে’ তত্ত্ব। টিভির সামনে আমরা সমানে দেখে চললাম রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী অথবা আমলার মুখ, কোনও গবেষক বিজ্ঞানীদের নয়।  একটা সময় এমন প্রচারও হল যে স্বাধীনতা দিবসের দিনেই নাকি ভারতে টিকাপ্রদান কর্মসূচি চালু করে দেওয়া হবে। বিজ্ঞান নয়, নিবিড় গবেষণা নয়, এক ভুয়ো জাতীয়তাবাদী অস্মিতার আস্ফালন- বিজ্ঞান যাকে কোনওমতেই অনুমোদন করে না। 

অবশেষে টিকা এল। তা নিয়েও ঘোর সংশয়। কোভিশিল্ড না কোভ্যাক্সিন। কার তৃতীয় ট্রায়াল এখনও পরীক্ষিত নয়, কার আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছেন। সরকারের ভাষ্য লোকে আর তেমন বিশ্বাস করছেন না, সরকারকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন আছে। কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসা করোনা মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে তড়িঘড়ি এই টিকার প্রচলন ও এ বছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে তার জন্য ৩৫০০ কোটি টাকার সংস্থান নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এর পিছনে অনেকেই বাহুবলী নেতার বাহাদুরি আদায় ও কর্পোরেট স্বার্থ- এই দুইয়ের জুতসই ককটেল খুঁজে পাচ্ছেন।

অন্যদিকে টিকা নিয়ে অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে আঁকড়ে আছেন অনেকেই। এমনকি চিকিৎসকদের একটা মহল অবধি কোভ্যাক্সিন নিয়ে প্রতিরোধ করেছেন দিল্লির এইমস'এ। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন আত্মনির্ভরতার বেলুন ঝুলিয়ে এই টিকা দেওয়া কতটা নিরাপদ। এই বিতর্ক তো উপেক্ষা করার নয়। খেয়াল রাখা দরকার, এই মুহূর্তে প্রথম দফায় মূলত স্বাস্থ্যকর্মী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মী-আধিকারিকরা টিকার আওতায় রয়েছেন। এদের মধ্যে যদি টিকা নিয়ে সংশয় ও আড়ষ্টতা থাকে তার প্রভাব পড়বে পরের পর্যায়ে। টিকা নিয়ে এই দুরকম জিজ্ঞাসা- যার একদিকে স্পষ্ট অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা, অন্যদিকে টিকার গুণগত মান নিয়ে ভাবনা- তার সবটাই ঘনিয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিসন্ধি ও অপরিণামদর্শী মানসিকতার পথ বেয়ে। এই সংশয় আর তার প্রতিকারের দায় একান্তভাবেই তাদের।

 

Saturday, 30 January 2021

গাজীপুর: ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট

কৃষকেরা হেরে গেলে আমরাও হেরে যাব

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য


দিল্লিতে ২৬ জানুয়ারি লাখো মানুষের ট্রাকটর মিছিলের একটা অংশকে পরিকল্পিত ভাবে ঈষৎ ঘেঁটে দিয়ে বিজেপি-আরএসএস ভেবেছিল, এবারে দেশপ্রেমের ধ্বজা তুলে দেশবাসীকে খেপিয়ে কৃষক আন্দোলনকে ভেস্তে দেওয়া যাবে। এই একই পদ্ধতি তারা শাহিনবাগ আন্দোলনের সময়েও নিয়েছিল। এবারে তাদের ধারণা ছিল, সহজ-সরল মনের কৃষকদের মধ্যে যদি এই সুযোগে কিঞ্চিৎ অপরাধ-বোধ জারিত করা যায়, তাহলে তারা নিজেরাই মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে ঘরে ফিরে যাবে। সেই মতো ছক কষে, পেইড দালাল দিয়ে কাজটি তারা করে ফেলতে পারবে বলে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু কথায় আছে, অতি চালাকের গলায় দড়ি।

অবশ্য, জনৈক দীপ সিধু ও তার দলবলকে দিয়ে লালকেল্লায় একেবারে চিত্রনাট্য অনুসরণ করে একটা নাটক বিজেপি-আরএসএস করিয়ে ফেলল। সে নাটকের অন্তে ছিল গোদি মিডিয়া এসে হৈ রৈ করে ব্যাটনটা নিজের হাতে নিয়ে রসালো গল্প বলে শেষ ল্যাপটায় একবারে কেল্লা ফতে করে দেবে। ঠিক যেমন যেমন ভাবা গিয়েছিল, তেমন তেমনই সব এগিয়েছে। ২৬ জানুয়ারি দিনের শেষে কৃষকদের একটা অংশের মধ্যে অপরাধ-বোধও দেখা দিয়েছে এবং তাঁরা যে দোষে দুষ্ট নন, তার জন্য তাঁরা নিজেরা আগ বাড়িয়ে ক্ষমাও চেয়েছেন (যদিও বা যেটুকু যা ঘটেছে তা সেদিনের গোটা আন্দোলনের বড়জোর শতকরা ১ ভাগ মাত্র ছিল)। ধীরে ধীরে এবার একটা হতাশার ভাব যেন মোচড় দিয়ে ওই সহজ-সরল মনগুলিকে খেয়ে ফেলতে লাগল। এতটাই ইতস্ততা বোধ তাঁদের ওপর চেপে বসল যে ১ ফেব্রুয়ারির পূর্বঘোষিত সংসদ অভিযানের কর্মসূচিকেও তাঁরা স্থগিত রাখলেন। ২৭ জানুয়ারি দেখা গেল, পরিকল্পিত ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে ট্রোল ও ঘৃণা বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। কৃষকদের কোনও কোনও নেতা একটু যেন বেশি কাতর হয়ে পড়লেন এবং অযাচিত ভাবে ২৬ জানুয়ারি যা কিছু ‘অন্যায়’ ঘটেছে (যদিও তার জন্য তাঁরা এতটুকু দায়ী নন এবং যা ঘটেছে তা তেমন কিছু বড় ব্যাপারও ছিল না) তার জন্য একটু বেশিই ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে পড়লেন। ধূর্ত ও নৃশংস বিজেপি বাহিনী সরল মনের কৃষকদের এই স্বঘোষিত অপরাধী ভাবনাকে সুযোগ বুঝে ষোলআনা উশুল করতে মাঠে নেমে পড়ল।

২৮ জানুয়ারি সিঙ্ঘু সীমান্তে হঠাৎ করে উদিত হল একদল ‘স্থানীয়’ মানুষ যারা নাকি কৃষকদের দ্বারা জাতীয় পতাকার অবমাননায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং ‘অতএব’ জানান দিল যে এই জায়গা ছেড়ে কৃষকেরা তোমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে মানে মানে কেটে পড়ো। গাজিপুর সীমান্তে বিকেল থেকে হাজির হতে থাকল শয়ে শয়ে পুলিশ বাহিনী এবং কৃষকদের বলা হল রাতের মধ্যেই সীমানা খালি করে দিতে। নিভিয়ে দেওয়া হল আলো, জলের বন্দোবস্তকে তছনছ করা হল এবং শৌচাগারগুলিকে পর্যন্ত ভেঙে দিল। ইতিমধ্যে দু-একটি ছোটখাটো কৃষক সংগঠন আন্দোলন থেকে সরে গেছে, এর পরের পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, কৃষক নেতাদের নামে এফআইআর হয়েছে, মনেও কিছু শঙ্কা এসেছে- সবটা মিলিয়ে কিছুটা যেন ছন্নছাড়া ভাব।

কৃষকদের এই দুর্বল মুহূর্তকে উগড়ে নিতে শাসক বাহিনী যখন এইভাবে কদম কদম এগিয়ে আসছে তখনই যেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কৃষকেরা বেপরোয়া হয়ে আরও একবার রুখে দাঁড়ালেন। নিজেদের ভালমানুষীর সুযোগ যে ধূর্ত শিয়ালেরা আষ্টেপৃষ্টে আদায় করে নিচ্ছে তা তাঁরা এবারে প্রকৃত প্রস্তাবে ভাল মতো বুঝলেন। বলিষ্ঠ কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েতের কন্ঠে এবার অন্য সুর শোনা গেল। সমগ্র কৃষক সমাজের বেদনা ও অঙ্গার যেন তাঁর বাচন ও আহ্বানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল। বললেন, তাঁর নিজ বাসভূমি থেকে কৃষকভাইয়েরা জল না এনে দিলে তিনি আর জলস্পর্শ করবেন না। মরমী কৃষকের হৃদয়-যন্ত্রণায় যেন মৃত্তিকা উর্বরা হয়ে উঠল। সমস্ত কৃষকদের টিকায়েত ডাক দিলেন গাজীপুরে আক্রান্ত কৃষকদের পাশে সেই মুহূর্তে যেন সকলে চলে আসেন। এ শুধুমাত্র আহ্বান ছিল না, ছিল কনকনে শীতের রাতে এক উদ্দাম লহর। টিকায়েতের ডাক শুনে হরিয়ানার প্রতি ঘর থেকে দলে দলে মানুষ তৎক্ষণাৎ ওই মধ্যরাতেই বাসে, ট্রাকে, ট্রাকটরে, বাইকে, গাড়িতে, সাইকেলে, হেঁটে- যে যেভাবে পেরেছেন এসে পৌঁছতে শুরু করলেন গাজীপুর সীমান্তে। গাজীপুর এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গেল। যেন, ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট। পুলিশ বাধ্য হল পিছু হঠতে।

সেই মুহূর্তেই বদলে গেল আন্দোলনের চিত্রটাও। নিমেষের মধ্যে ধ্বস্ত হয়ে গেল শাসকের যাবতীয় প্ল্যান ও ছলছাতুরি। ২৯ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের মুজফফরপুরনগরে লক্ষাধিক কৃষকের মহাপঞ্চায়েত বসল। এই জনপ্লাবন কেউ কস্মিনকালেও দেখেননি। ঘোষিত হল কৃষক আন্দোলনে আরও উদ্দাম লহর তোলার অঙ্গীকার। তবুও ২৯ জানুয়ারি সকালে টিকরি ও সিঙ্ঘু সীমান্তে ‘স্থানীয়’ অধিবাসী সেজে আরএসএস’এর দুষ্কৃতীরা পুলিশের সহযোগিতায় ইট-পাটকেল ছুঁড়ে কৃষকদের আহত করল ও তাঁদের কিছু তাঁবুও ভেঙে দিল। পুলিশ দিল্লি সরকারের পাঠানো জলের ট্যাঙ্ক কৃষকদের কাছে পৌঁছনোর অনুমতি দিল না। তবে বলাই বাহুল্য, কৃষকদের বাড়তে থাকা জমায়েত ও মেজাজের কাছে শাসকের এই সমস্ত প্রয়াস খুড়খুটোর মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ হয়ে গেল। আওয়াজ উঠল: কৃষক টিকায়েত বনাম মোদি ডাকায়েত। ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে বহু মানুষ রাত জাগলেন। দিল্লিতে মধ্যরাতে কৃষকদের সমর্থনে মিছিল বেরল।    

ইতিমধ্যে ৬০ দিনের বেশি অবস্থান চলেছে। ১৫০’র ওপর কৃষক অবস্থানস্থলে মারা গেছেন। রাতের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবুও অন্নদাতারা স্থিতধী রয়েছেন। চোখে স্বপ্ন ও হৃদয়ে মমতা নিয়ে। দেশ জুড়ে আত্মহত্যায় নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। অধিকাংশের ঋণের বোঝা বওয়ার ক্ষমতা আর নেই। বিপর্যস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সন্তানেরা সস্তার মজুর হয়ে শহরের বুকে দুঃসহ জীবন অতিক্রম করছেন। বার বার শাসক, মিডিয়া ও গবেষকেরা বোঝাতে চাইছেন কৃষিতে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। কর্পোরেটদের হাতে কৃষি ব্যবস্থাকে তুলে দাও। বলা হচ্ছে, বাজারে গিয়ে ফসল বেচো, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের কথা ভুলে যাও। সস্তায় নিজের ফসল বেচে সেই ফসলই আবার বাজার থেকে বেশি দামে কিনে খাও। সমস্ত দেশবাসীকে কর্পোরেট বাজার ব্যবস্থার ইচ্ছে-অনিচ্ছের সওয়ার করে দাও। আর সে লক্ষ্যেই তিন কৃষি আইন। তাই, অন্নদাতারা জীবন বাজী রেখে নিজেদের ও আপামর দেশবাসীকেও আজ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই লড়াই কর্পোরেট শক্তির সঙ্গে কৃষক সমাজের লড়াই। যদি আমরা আজ কৃষকদের পাশে থেকে এই মরণপণ লড়াইয়ে সামান্য সাহায্যটুকুও না করি, ইতিহাস আমাদের কোনওদিন ক্ষমা করবে না। কৃষক সমাজ শেষ হয়ে গেলে ধরিত্রীর মাটিও শুকিয়ে কালো হয়ে যাবে।

আশার কথা, কিছুটা আচম্বিত ধাক্কা খেয়ে আবারও কৃষকেরা এ লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। গান্ধীজী স্মরণে ৩০ জানুয়ারি তাঁরা দেশবাসীকে অনশনের ডাক দিয়েছেন। সীমান্ত ঘিরে আবারও জনজমায়েতে কল-কলরবে সকলে গেয়ে উঠবেন। গোদি মিডিয়া নতুন নতুন মিথ্যার ডালি সাজাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃষকেরা নিজেদের হক বয়ান রেখে যাবেন। সে বয়ান আমাদের পড়ে নিতে হবে। বুঝে নিতে হবে যে, কৃষকেরা এক নতুন রাজনৈতিক-অর্থনীতির জগতে আমাদের নিয়ে চলেছেন। এক নতুন উজ্জ্বল দিনের দিকে আমাদের যাত্রা। কৃষকদের জিততেই হবে। না হলে আমরা বাঁচব না।

জয় কিষাণ।

Thursday, 28 January 2021

পরিস্থিতি যখন ঘোরতর

নতুন পরিসর কি গড়ে তোলা সম্ভব?

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত


এখন থেকে প্রায় একশ' বছর আগে (বৈশাখ, ১৩২৮) আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় 'প্রবাসী' পত্রিকায় যার শুরুতে আচার্য দেব লিখেছেন- 'এই যে সমস্যা আজ আপনারা আমার সম্মুখে উপস্থাপিত করেছেন এর মীমাংসা করা, বিশেষত এইরকম অল্প সময়ে, অত্যন্ত দুরূহ।'

দুঃখের হলেও সত্য এই যে, এখনও সমস্যাটির মীমাংসা হয়নি। হয়তো নয়, নিশ্চিতভাবেই সমস্যাটি গুরুতর আকার নিয়েছে। ওদিকে, মীমাংসার জন্য সময় কমেছে।

সমস্যাটা কী?

আচার্যদেব লিখেছেন, 'আমরা চিন্তাশীল হিন্দু, আমরা অত্যন্ত আধ্যাত্মিক' বলে গর্বস্ফীত ভাব একটা  রয়েছে। সেটাই সমস্যা। সে ভাবটা দেশের প্রায় প্রতিটি অংশে আজও আছে শুধু তাই নয়, তা অবশ্যই দৈর্ঘে-প্রস্থে  বেড়েছে। বলতেই হচ্ছে যে সমস্যাটি এ কালে গুরুতর আকার নিয়েছে। এ কালের কুচিন্তা-মগ্ন কিছু হিন্দু আধ্যাত্মিকতার নামে নৈরাজ্য বিস্তারে মন দিয়েছে। তারা হয়ে উঠতে চলেছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি। কেন এমন হল?

সে কালে যারা ছিল শাসক সেই ব্রিটিশ শক্তির প্রয়োজন ছিল তাই তারা সাম্প্রদায়িকতায় উৎসাহ দিয়েছে। কিন্তু এ কালে ব্রিটিশ রাজশক্তির সেই গৌরবদিন আর নেই। এ কালে তার জায়গা নিয়েছে কর্পোরেট শক্তি। তার সাথে সারা বিশ্ব জুড়েই হাত মিলিয়েছে রাষ্ট্র- দুয়ে মিলে (বাজার ও রাষ্ট্র)  গড়ে তুলেছে নয়া ফ্যাসিজম। ধর্মের উপস্থিতিতে মীমাংসা বুঝি আরও দূরে সরেছে। এমনকি  সমস্যাটি ভেঙ্গে ছোট ভূখন্ডে দেখতে গেলেও দেখি মীমাংসা দূরে থাকে।

চিন্তাশীল বলে বাঙালির গর্ব খুব। তাই এই ভূখন্ড নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ করি।

বাংলার বহু সমস্যা- অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক। তাতে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার সমস্যা, সংস্কৃতির সমস্যা। দোষ দেব কাকে? রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আছে তাদের দোষ বা দায় তো মানতেই হয়, তবে যারা শাসক নয়, বর্তমানে যারা শাসক-বিরোধী তারাও সমভাবে দায়ী নিশ্চয়। শাসকের অপরাধ কেবল এই নয় যে আত্মম্ভরিতায় সুড়সুড়ি দিতে দিতে সে আমাদের এক মোহময় মিথ্যার জগতে টেনে এনেছে। এই কথা ভারতবর্ষ বিষয়ে যতখানি সত্য বাংলা সম্পর্কে ততোধিক  সত্য।

একজন বলেছিলেন: What Bengal thinks today...। আমরা সেই কথাতে নেচে উঠি। ভারতীয় রাষ্ট্রনায়ক তথা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কলকাতা সম্পর্কে বলেছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। গর্বে আমাদের যেন আর মাটিতে পা পড়ে না। শাসক দলের প্রধান কর্তারা তারই সুযোগে যেন, আমাদের বাঙালিয়ানায় সুড়সুড়ি দিতে, কখনও রবীন্দ্রনাথ সাজছেন, কখনও বিচিত্র বাংলায় কথা বলছেন, কখনও গরিব আদিবাসী মানুষের আপনজন হতে তার বাড়িতে পাত পাড়ছেন। অথচ, আজ এ কথা স্পষ্ট যে, বঞ্চনায়, অবহেলায় বাংলা ও বাঙালি ক্রমে কোণঠাসা (অন্তত, সেই দেশভাগের সময় থেকে)। এদিকে, আমরা ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, আমাদের তেজ ও তারুণ্য, আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি, আমাদের ভয়হীনতা ও প্রত্যুতপন্নতা দেশের সেরা, কালের সেরা। শুধু কি তাই? আমাদের কবি বিশ্বকবি, আমরা শান্তির পূজারী হলেও আমাদের বিবেকানন্দ, আমাদের সুভাষচন্দ্র প্রয়োজনে হিংসার পক্ষে দাঁড়াতে মানা করেননি এবং তাই আমরা এক বীরোত্তম ও সংস্কৃতিবান জাতি। 

নেতাজি জন্মদিনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের অনুষ্ঠানের পর বাঙালির এমন ভাবনা যে অসার তা আর একবার স্পষ্ট হল। নেতাজির জন্মদিন জাতীয় ছুটির দিন হল না, পেলাম এক 'পরাক্রম দিবস' নামের 'দিল্লিকা লাড্ডু'। তাতেই উল্লসিত একদল নেতাজির নামে জয়ধ্বনি দিতে ভুলে গিয়ে মেতে উঠলেন 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনিতে। এভাবে আমার মতো বাঙালির দুশ্চিন্তা নিশ্চয় অনেক গুণ বেড়ে গেল।

ওদের অপরাধ কেবল এই নয় যে ওরা আমাদের গর্বে আঘাত হানতে চায় বা ওরা আমাদের গরিমায় ভাগ বসিয়ে রবীন্দ্রনাথের বদলে মনমোহন বসুকে বাংলার সেরা কবি রূপে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত, ব্যস্ত 'গদ্দার' শ্যামাপ্রসাদকে জাতীয় নেতারূপে প্রতিষ্ঠা করতে বা বিবেকানন্দের অন্যতম নীতি ধর্মনিরপেক্ষতা ভুলিয়ে দিতে। সে সব তো আছেই, তবে আরও আছে। ওরা জাতীয়তাবাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের দেশপ্রেম ভোলাতে চায়। তারা নেতাজি নামাঙ্কিত নদী-বন্দরের নাম বদলায়, নতুন এক শিক্ষানীতি দিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিলোপ ঘটাতে চায়, জাতীয় পরিকল্পনা পর্ষদ ভেঙ্গে নীতি-আয়োগের বিস্তার চায়। এমন আরও অনেক চাওয়া আছে তাদের। সেই সব চাওয়া পূর্ণ করতে তারা এই রাজ্যের শাসনক্ষমতা হাতে পেতে চায়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সে চাওয়াও দোষের নয়, কিন্তু যে পদ্ধতিতে তারা সবের দখল চায় তা যে গণতন্ত্রের মূল আদর্শের পরিপন্থী তা যেন তারা ভুলেছে ও আমাদের ভোলাতে চায়। এই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে রুখতে বাংলা ও বাঙালির কিছু করতেই হয়। কী করা যায়? রাজ্যের-শাসক-বিরোধী শক্তি যা করছে তেমন কিছু?

এখানে শাসক বিরোধী শক্তির দুটো প্রধান স্রোত। একটি রাজনৈতিক, অন্যটি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী। দুটো স্রোতই একসঙ্গে যেন শাসকের বানানো খেলায় বা ছকে অথবা ন্যারেটিভে মেতেছে। মূলত বামমনস্ক (বাঙালি যে স্বভাবত বামপন্থী) প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ভুলেই রয়েছেন 'প্রিন্সিপাল এনিমি' তত্ত্ব, তাঁরা খোয়াব দেখছেন 'এবার রাম, পরের বার বাম'। আর বর্তমান শাসক দল গান ধরেছে- হরে কৃষ্ণ হরে রাম/ দূর হঠো মেকি বাম।

ওদিকে, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কেবল যেন জেগে বা মেতে রয়েছে ‘সোস্যাল মিডিয়া’য় যখন দেশের কৃষকরা শ্রমিক ঐক্যের ডাক দিয়ে দিল্লী অভিযানে নেমেছেন। আর কি উদাসীন বা নিরপেক্ষ থাকা উচিত?    

সব দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাকে মুক্তির পথ দেখাতে, প্রকৃত বহুস্বর গণতন্ত্রের স্বাদ পেতে, নিরামিষ পথ ছেড়ে প্রতিরোধের আগুন জ্বালাতে তৃতীয় শক্তির উত্থান আসন্ন ও বিশেষ প্রয়োজন। ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’।


Tuesday, 26 January 2021

অভূতপূর্ব কিষাণ প্যারেড

এত বড় গণ অভ্যুত্থান কি এ দেশ আগে দেখেছে?

নীলকন্ঠ আচার্য


সরকারকে নিজ শক্তি বুঝিয়ে দিতে দিল্লি সীমান্তে আজ হয়ে গেল অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক কিষাণ ট্রাক্টর মিছিল। মিছিলে সামিল দেশের প্রায় সমস্ত প্রান্ত থেকে আসা দশ লক্ষাধিক কৃষক জনতা সহ সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষ। কৃষি ও কৃষক বিরোধী এবং জন ও দেশ বিরোধী তিনটি কৃষি আইন বাতিল, স্বামীনাথন কমিশনের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনে পরিণত করার দাবিতে গত দু' মাস ধরে দিল্লি সীমান্তে কয়েক লক্ষ কৃষক জনতার চলমান ধর্না অবস্হান এবং এই সময়কালে সরকারের সাথে ১১ দফা নিষ্ফল আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে গোটা দেশ ও বিশ্বব্যাপী এই ঐতিহাসিক মিছিল আজ শুরু হয় দিল্লির নয়টি প্রান্ত থেকে: সিঙ্ঘু, টিকরি, গাজীপুর, ঢাঁসা, চিল্লা, শাহজাঁপুর, মসিনাবরিজ,  পলবল এবং মাসানি-সুনেড়া প্রান্ত।

মহা মিছিল তো শুরু হল। কিন্তু শেষ হবে কখন? এ ছিল এক বড় প্রশ্ন। কিষাণ নেতৃত্বের অনুমান ছিল, কমপক্ষে প্রায় দেড় দিন লেগে যেতে পারে। প্রায় ৬০ দিন ধরে দিল্লির সীমান্তগুলিতে কভার করতে থাকা গণমিডিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় সাংবাদিক অজিত অন্জুম বা 'ন্যাশনাল দস্তক'এর শম্ভুর মতে এই মিছিল শেষ হতে আড়াই দিনও লাগতে পারে। এই নয়টি প্রান্ত থেকে শুরু হওয়া মিছিল কোথাও ১০০ কিমি, ৮২ কিমি, ৭২ কিমি বা ৬৮ কিমি পথ অতিক্ৰম করার কথা। 

সকাল থেকেই বোঝা গিয়েছিল, সারা দিনে কিষাণ মিছিলে নানা ধরনের গুরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে চলেছে। প্রথমেই সকাল আটটার দিকে কৃষকদের একটা অতি বিশাল মিছিল মুকারবা প্রান্তে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে কাঁদানে গ্যাস, লাঠি চার্জ অতিক্রম করে আউটার রিং রোডের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। এই সুবিশাল জনস্রোতের মুখে পুলিশ বাহিনীকে কার্যত অসহায় দেখায়। কৃষক জনতা সকলকে আশ্বস্ত করেন যে তাঁরা দিল্লি দখল করতে নয় বরং দিল্লির অধিবাসীদের মন জয় করতে যাচ্ছেন। শুরুর এই মিছিলটি ছিল আজকের সমস্ত মিছিলের ১০-১৫ শতাংশ মাত্র।

সব মিলিয়ে আজকের এই ঐতিহাসিক কিষাণ ট্রাক্টর মিছিলে আগত জনজোয়ারকে এক শক্তিশালী গণ উত্থান বললেও কম বলা হয়। যেহেতু এই জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে শাসক ও তার পৃষ্ঠপোষক কর্পোরেট পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আপামর মানুষের চরম ঘৃণা আর আক্রোশের স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে, তাই জনজোয়ারের এই মিছিলে স্বতঃস্ফূর্ততার একটা আচরণ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। যে মিছিল শুরু হবার কথা ছিল বেলা ১২টা থেকে, স্বতঃস্ফূর্ততার আবেশে তা শুরু হয়ে গেল সকাল ৮-৯টা থেকেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বুকের মধ্যে এতদিন ধরে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের আগুনে জর্জরিত ছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই বিশাল বিক্ষুব্ধ জনজোয়ারের মধ্যে এক স্বতঃস্ফূর্ততার বহিঃপ্রকাশ আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা ছিল। তাই এই মহামিছিল স্বতঃস্ফুর্তভাবেই নির্ধারিত সময় ও পথকে অনুসরণ করার বদলে দিল্লির রাজপথের অভিমুখে যাত্ৰা শুরু করল। নেতৃত্ব, রণনীতি, রণকৌশল ইত্যাদির নিরিখে এটা কাম্য না হলেও এইরকম বিরল শ্রেণির জনজোয়ারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও আঙ্কিক পদ্ধতির অনিবার্য অনুসরণ প্রত্যাশা করাটা বোধহয় বিশুদ্ধতাবাদী চিন্তার শিকার হয়ে পড়ার নামান্তর!

উচ্ছ্বাসে ভরপুর মিছিল পুলিশের যথাসাধ্য ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, কাদাঁনে গ্যাসের আক্রমণ অতিক্রম করে এগিয়ে গেল। কিন্তু প্রশাসনের তরফে মিছিলকে শান্তিপুর্ণ ভাবে যেতে না দিয়ে তাকে উত্যক্ত করা হল। মিছিলের একটা অংশ আরও শক্তিশালী হয়ে লালকেল্লার দিকে এগিয়ে গেল। এরপর যা হল তা ইতিহাসের পাতায় স্হান করে নেবে। হাজার হাজার কৃষক জনতা দিল্লির লালকেল্লায় প্রবেশ করলেন, জাতীয় পতাকাকে তুলে ধরে জাতীয় সংগীত গেয়ে অত্যাচারিত শাসকের বিরুদ্ধে নিজের অভিনব প্রতিবাদ জ্ঞাপন করলেন।

অন্যদিকে, দিল্লির বাকি ৮টি সীমান্ত থেকেও ট্রাক্টর মিছিল অব্যাহত ছিল। যদিও সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতৃত্ব এই মহামিছিলের একাংশের নির্ধারিত যাত্রাপথের বাইরে গিয়ে লালকেল্লার দিকে চলে যাওয়াকে সমালোচনা করেছে। পরে অন্যতম কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত জানিয়েছেন, যে রাস্তাগুলো খোলা রাখার চুক্তি হয়েছিল, দিল্লি পুলিশ সেগুলো অন্যায় ভাবে ব্যারিকেড করে দিয়েছিল। তারপর কৃষকদের অন্য রুট ধরতে জোরজবরদস্তি করা হয়। সেখান থেকেই অরাজকতার শুরু। টিকায়েত স্বীকার করেছেন যে কিছু হিংসা হয়েছে এবং কারা করেছে তা চিহ্নিত করা হবে। আবার এও বলেছেন, এত বড় একটা জমায়েতে পুলিশের উশকানিতে কিছু কিছু বিশৃংখলা এড়ানো হয়তো অসম্ভব ছিল। ইতিমধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন শিখ যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের সাথে কৃষক জনতার সংঘর্ষে উভয়পক্ষের হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।

 

দিনের শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেড় হাজার আধাসামরিক বাহিনী বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় পাঠানোর নির্দেশ জারি করেছে। বেশ কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা লাগু করা হয়েছে। দিল্লির কিছু এলাকা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা মাঝরাত পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষক নেতৃত্ব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, এই আন্দোলনকে আরও জোরালো ভাবে তাঁরা এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং যতক্ষণ না তিন কৃষি আইন বাতিল ও ন্যূনতম সহায়ক মূল্য গ্যারান্টি আইন লাগু হচ্ছে তাঁরা থামবেন না। ইতিমধ্যেই আজকের মহামিছিলের পর্যালোচনা ও আগামী দিনে আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃষক নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা তাকিয়ে আছি কৃষক জনতার জয়‌ কবে অর্জিত হয় সেই দিনটির দিকে। দেখা যাক, ‌জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার কৃষক আন্দোলনের কাছে মাথা নত করে কিনা।


Sunday, 24 January 2021

চীনা পণ্য বয়কটের বুজরুকি!

'মেক ইন ইন্ডিয়া' থেকে 'মেড ইন চায়না'

পি জে জেম্‌স

 


গত ৪৫ বছরে চীনের সাথে ভারতের তুমুল সংঘাতের পরে গৈরিক কেন্দ্রগুলির তরফ থেকে দেশ রক্ষার্থে যে সব কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নেহাত কম কিছু নয় বলে মনে হতে পারেযদিও এদিকে ভারতের ভূখণ্ডে চীনের  অনধিকার প্রবেশ দিন দিন আরও বেশি স্বতঃসিদ্ধ বলে প্রমাণিত হচ্ছে এই চীন বিরোধিতার অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক ভাবে চীনকে প্রত্যাঘাত করার একটা প্রচার কর্মসূচি পুরোদমে চলছেএই প্রচার কর্মসূচি মূলত চীনা দ্রব্য বয়কটের ডাক দিচ্ছেযেমন, আরএসএস প্রভাবিত কনফেডারেশন অফ অল ইন্ডিয়া ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন (সিএআইআইটি) মূলত ৪৫০ ধরনের চীনা পণ্য সোজাসুজি বর্জন করার ডাক দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রসাধন সামগ্রী, খেলনা, ফার্নিচার, জুতো, ঘড়ি ইত্যাদি সবশুদ্ধ ৩৫০০ ধরনের পণ্য। চীনা পণ্য বর্জন করার উদ্দেশ্য হল ওদের আমদানি ২০২১'এর ডিসেম্বরের মধ্যেই ১৩ বিলিয়ান ডলার বা এক লক্ষ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা, যেখানে ২০১৯-২০'তে ভারতে চীনা পণ্যের আমদানির পরিমাণ ৭০ বিলিয়ান ডলার বা ৫২৫,০০০ কোটি টাকা। তবে এ কথা সবার  আগেই বলা যায় যে এই সব পদক্ষেপ শুধুই বাক্‌সর্বস্ব, কারণ, চীনের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা এবং একাত্মতা এতটাই সুদূরপ্রসারী এবং জটিল যে 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র ঢক্কানিনাদ বা আরও সম্প্রতি 'আত্মনির্ভর ভারত'এর কথা হওয়া সত্ত্বেও চীনা বিনিয়োগ এবং পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ভারতের পক্ষে একরকম অসম্ভব        

ভারতের পক্ষে চীন দেশিয় জিনিসের বাজারে পরিণত হওয়া এবং চীনের বিনিয়োগের মূল লক্ষ্যস্থল হয়ে ওঠা একবিংশ শতাব্দীর এক অসামান্য ঘটনা। এই ঘটনা নব্য উদার বিশ্বায়নের অধীনে চীনের সমগ্র বিশ্বের কর্মশালা হয়ে ওঠার সঙ্গে জড়িত১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ এবং আরও বিভিন্ন বিরোধ, যেমন বলা যায় ১৯৬৭-র চোলার ঘটনা, সিকিম ভারতবর্ষের একটি অঙ্গরাজ্য হয়ে ওঠার সময় ১৯৭৫ সালে চরম পরীক্ষা, আর ১৯৮৭-র ভারত-চীন লড়াইয়ের মতো ঘটনার কারণে বিংশ শতাব্দীতে ভারত-চীন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারেই আশাপ্রদ ছিল না ২০০১ সালে ডব্ল্যুটিও’তে চীনের আনুষ্ঠানিক প্রবেশই চীনকে অন্য সব দেশের সঙ্গে এক হতে সাহায্য করেছে, চীনেরই 'কম্প্যারিটিভ অ্যাডভান্টেজের (অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক  অবস্থানের)' ভিত্তিতেএর ফলেই চীন তার প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাজারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার উৎসাহ পেয়েছে। ফলত, চীনের প্রিমিয়ার জু রংজি’র ভারত সফরের বিনিময়ে ২০০৩ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী গেলেন চীন সফরে তার পরবর্তী সময়ে ভারত এবং  চীন দু দেশের প্রতিনিধিরা একে অপরকে অনুসরণ করার জন্য এবং অসংখ্য দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের চুক্তি স্বাক্ষর করার উদ্দেশ্যে একে অপরের দেশে নিয়মিত সফরে গেছেন           

এর ফলে, ২০০০ সাল থেকেই ভারত এবং চীনের মধ্যে বাণিজ্যের গতি, অন্যান্য দেশের গোটা পৃথিবীর সঙ্গে বাণিজ্যের থেকে দ্বিগুণ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে২০০৮ সালেই মার্কিন দেশকে ছাপিয়ে চীন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ক্ষেত্রে অংশীদার (বিজনেস পার্টনার) হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে ভারত-চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০-০১'এ ২ বিলিয়ান ডলার থেকে ২০১৩-১৪'এ ৬৫ বিলিয়ান ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিলএই সময়ে চীন আর ভারতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য (আমদানি-রফতানি সহ) চীন-মার্কিন বাণিজ্যের থেকে তিন গুণ বেশি দ্রুত এগোচ্ছিল২০১৪ সাল থেকে মোদি শাসনের সূচনা  হওয়ায় বাণিজ্য ক্ষেত্র আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭-১৮তে চীনের সাথে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ, শুধুমাত্র হংকং (৩৪ বিলিয়ান ডলার)'কে বাদ দিলে, বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯.৭৬ ডলারে। ২০১৮-১৯'এ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৮৭.০৭ ডলার হলেও ঐ বছরেই ভারতের সাথে চীনের বাণিজ্যিক ঘাটতি ৫৩.৫৭ বিলিয়ান ডলার (মোটামুটি ৪০১,৭০০ কোটি)। তার কারণ, চীন থেকে ভারতের আমদানির মূল্য যেখানে ৭০.৩২ বিলিয়ান ডলার, সেখানে ভারত থেকে চীনে রফতানি মোটে ১৬.৭৫ বিলিয়ান ইউএস ডলার। এমনকি আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ভারতের সঙ্গে চীনের বড় রকমের বাণিজ্যিক ঘাটতিতে সামান্যই পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। সেভাবে দেখতে গেলে ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান সত্যিই প্রতিকূল।    

আইএমএফ'এর হিসেব (২০১৯ সালের তথ্যের ভিত্তিতে) অনুযায়ী চীন থেকে ভারতবর্ষে রফতানি ও ভারতবর্ষ থেকে চীনের আমদানি যথাক্রমে তার মোট রফতানি এবং আমদানির  ৩ শতাংশ ও ০.৯ শতাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই মতোই ভারতের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ হল ৫.১ এবং ১৩.৭ শতাংশ (সংখ্যাগুলো ২০২০'র ফেব্রুয়ারিতে ৫.৩৩ শতাংশ এবং ১৪.০৯ শতাংশ)। স্পষ্টভাবে দেখতে গেলে, ২০২০ ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট আমদানি ৭৫.৮ শতাংশের মধ্যে ইউএস থেকে ভারতের আমদানি হল চীনের থেকে ভারতের আমদানির অর্ধেক। এর থেকেই বেশ বোঝা যায় যে চীনের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা মার্কিন দেশের তুলনায় বেশি, যার সাথে জুনিয়র অংশীদার হিসেবে ভারতের রণনীতি সংক্রান্ত সামরিক সম্পর্ক আছে। চীনের থেকে ভারতের আমদানির দ্রব্যাদি অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে এই অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার গুরুত্বকে বোঝা যায়। যেমন ৭৬.৩ শতাংশ জীবাণুনাশক এবং ওষুধপত্র ভারত চীন থেকে আমদানি করে। চীনের ওপর ভারতের এই নির্ভরশীলতা যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে ৮৪ শতাংশ, নাইট্রোজেন কম্পাউন্ডের ক্ষেত্রে ৬৮ শতাংশ, ডায়োড এবং ট্রানজিস্টরের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ, লোহা ও স্টিলের পাইপ এবং টিউবের ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ পুঞ্জীভবনকারী যন্ত্রের (ইলেক্ট্রিক অ্যাকিউমুলেটর) ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ, টিভি'র এলসিডি, এলইডি ও এলইডি প্যানেলের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ, কীটনাশকের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ, ডেটা প্রসেসিং মেশিন, এসি ও ফ্যান'এর ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশএভাবেই আরও বিভিন্ন ধরনের জিনিসের কথা বলা যায়। ভারতবর্ষের এই সব আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই যে, অনেক কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী জিনিসপত্রও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, যা কিনা উৎপাদনের জন্য এবং অন্যান্য বাজারে জিনিস রফতানি করার জন্য জরুরি। অন্য ভাবে বোঝাতে গেলে, ভারত যেখানে চীন দেশের থেকে আমদানির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল, চীনের কিন্তু ভারতের ওপরে সেরকম কোনও নির্ভরশীলতা নেই। সুতরাং, অর্থনৈতিক ভাবে চীনকে বয়কট করা অদূর ভবিষ্যতে কোনওভাবেই সম্ভবপর নয়, বিশেষ করে এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে যখন দেখা যাচ্ছে ভারতের বৃদ্ধির হার ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে ৫ শতাংশে নেমেছে ভারতের অনেক অটো, ফার্মা এবং বৈদ্যুতিন জিনিসের কোম্পানি আছে, যারা চীনের থেকে আমদানি করা জিনিসের ওপর ভীষণভাবে নির্ভর করে। বিকল্প ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে তারা এরকম একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিরুদ্ধে বিপদসংকেত দিয়ে দিয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, চীন থেকে আসা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে থাকা যে সব মার্কিন কোম্পানি ভারতে কাজ করে, তারা চীনা দ্রব্য বর্জন করার এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপের ব্যপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ।       

শুরুর থেকেই অতি দক্ষিণপন্থী অর্থনৈতিক অবস্থান, সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের প্রতি আরএসএস’এর চাটুকারিতা বা দাসসুলভ মনোভাব; ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশদের প্রতি, আর যুদ্ধ পরবর্তী নব্য ঔপনিবেশিক যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরএসএস'এর মনোভাব একেবারেই বিতর্কের অপেক্ষা রাখে না সুতরাং, আরএসএস-চালিত মোদি সরকারের মার্কিন দেশের প্রতি আনুগত্য, এই সরকারের অত্যন্ত  স্বাভাবিক আচরণ বলে ধরে নেওয়া যায় তবে এ কথা সত্যি যে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী শাসনকালে তিনি বেসরকারিকরণ/ কর্পোরেটাইজেশনের অতি দক্ষিণপন্থী মডেলের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু গুজরাট কাণ্ডের পরে, আমেরিকার ভিসা অনুমোদিত না হওয়ায় মোদি মার্কিন দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেননি এ ব্যপারটাই হয়তো তাকে চীনের শাসকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য উৎসাহিত করেছে, যার জন্যে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চার বার এবং ফের ২০১৫-১৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বার চীন সফরে গেছেন।          

২০১১ সালের নভেম্বরে মোদির ৫-দিনের চীন সফর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, কারণ এই সফর তার চীনে যাওয়ার ওপর মনমোহন সরকারের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ছিলমোদি চীনে যান হংকং হয়ে রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে বেইজিং'য়ে ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে পৌঁছলেন আর এই সফরের দরুণ তিনি এমন অনেক চীনা কোম্পানির সাথে সাক্ষাৎ করলেন, যারা কিনা গুজরাটে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এর পরে এল ২০১৩ সালের ভাইব্র্যান্ট গুজরাট আর ২০১৪ সালেই রাজ্যে চীন দেশীয় বিনিয়োগের ব্যাপারে ৯,০০০ কোটি টাকার চুক্তিতে পৌঁছলেন মোদিগ্রেট ওয়াল মোটর্‌স কোম্পানি লিমিটেড এবং সাংহাই অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন রাজ্যে যানবাহন তৈরির অনেক বড় কারখানা স্থাপন করতে রাজি হয়, আর তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আদানির মুদ্রা পোর্টে কৌশলগত চীনের বিনিয়োগযেখানে মুম্বই এবং তুতিকোরিনের মতো পোর্টগুলো নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের কারণে চীনা বিনিয়োগের অনুমতি পায়নি, মুদ্রা পোর্টের ওপর চীনের বিনিয়োগ একটি ব্যতিক্রমী বিষয়সত্যি বলতে কি, চীনা বিনিয়োগের জন্য ব্যাপক হারে রেড কার্পেট বিছিয়ে দেওয়াও কিন্তু কেন্দ্রে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের বিরোধ উপেক্ষা করেই। আর গুজরাটকে চীনা বিনিয়োগের হটস্পট বানানোর অংশ হিসেবেই মোদি মান্দারিন (চীনের রাষ্ট্রভাষা) কোচিং ইন্সটিটিউট এবং গুজরাটের বিশ্ববিদ্যালয়ে মান্দারিনের পাঠ্যক্রম চালু করারও সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।     

কোনও সন্দেহ নেই যে এই 'গুজরাটি চীনি ভাই ভাই' প্রোজেক্টের গতি মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে আরও বেড়ে গেল আর তার নির্বাচনে চীনের মিডিয়া ‘গুজরাট মডেল’কে সাধুবাদ জানাতে থাকল। এরপর ২০১৪ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি আহমেদাবাদে এলেন, যার ফলে গুজরাটে চীন দেশীয় বিনিয়োগ অগ্রগতির মুখ দেখল আর ভারত চীনা পণ্যের একটি আস্তাকুঁড়ে পরিণত হল। ২০১৯ সালের ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সামিটে এসে হুয়াওয়েই সহ চীনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তিবদ্ধ বিনিয়োগের পেছনে কিন্তু ছিল ১৭০০০ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতিএছাড়া, ২১,৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব তো ছিলই, যা কিনা ঢোলেরা স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট জোনে চিনের সোলার জায়ান্ট ইস্ট হোপ গ্রুপ এবং ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানির পাওয়ার প্লান্টের সম্মিলিত বিনিয়োগএটা ২০১৭ সালের সেই ২২৫০ কোটি টাকার সেই চুক্তিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, যে চুক্তি আদানির সাথে চীনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়েছিল চীনের সাথে এই যোগাযোগের আরও অন্য দিকও নিশ্চয়ই ছিল        

ইতিমধ্যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা পাওয়ার পরেই মোদি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা হল তার অতি দক্ষিণপন্থী গুজরাট মডেলের ভারত-সংক্রান্ত ভাবনাচিন্তা, যা মনমোহনমিক্স থেকে মোদিনমিক্সে অবস্থান্তরের একটি পূর্বাবস্থাএকই সাথে এটাও সত্যি যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি আরএসএস'এর ঐতিহাসিক আনুগত্যের রীতি মেনেছেন মোদি, এমনকি অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে শি’র সঙ্গে সৌহার্দ্য এবং চীনের সাথে সুযোগ-সন্ধানী সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারেও তা সত্যিআর এভাবেই বিগত ৬ বছরে মোদি মার্কিন দেশের কৌশলগত জুনিয়ার অংশীদার হিসেবে দেশের অবস্থান পোক্ত করেছেন, চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক-রাজনৈতিক মতান্তরের ব্যপারে ওয়াশিংটনের সাথে অনেক সামরিক পার্টনারশিপে স্বাক্ষর করার মাধ্যমেঅতঃপর ৬৪ বছরের পুরনো যোজনা আয়োগ তুলে দেওয়া সহ নেহেরুপন্থী রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের নকশার পড়ে থাকা যা কিছু অংশ, সব একটু একটু করে সরিয়ে ফেলে রাষ্ট্রকে ‘কর্পোরেট সহায়ক’এ রূপান্তরিত করা হল। এর পরে ২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরে প্রবল ঢক্কানিনাদের মাধ্যমে মোদি তার আকর্ষণীয় পরিকল্পনা 'মেক ইন ইণ্ডিয়া' নিয়ে এলেনএই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের স্বল্পমূল্যের কর্মশালা হিসেবে চীনের অভিজ্ঞতাকে অনুসরণ করে ভারতকে বিশ্বের এমন একটি কারখানায় পরিণত করা, যেখানে নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিকদের দিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করানো হয়এর লক্ষ্য ছিল 'সহজে ব্যবসা করার' বিষয়টাকে আরও উন্নত করে, বিদেশি পুঁজির প্রবেশ এবং প্রস্থানের পথে সমস্ত বাধা সরিয়ে ফেলে, আর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভারতকে স্বল্প মূল্যের শ্রমিক তৈরি করার কারখানা হিসেবে দেখানোবিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নেওয়া সে সব পদক্ষেপ হিসেবে, শ্রমের ব্যাপক উদারীকরণ, বিভিন্ন বহুজাতীয় কোম্পানি ও তাদের ভারতীয় জুনিয়ার অংশীদারদের জন্যে পরিবেশ এবং শ্রমের অবাধ শোষণের সুবিধার্থে নিয়ে আসা কিছু পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের কথা বলা যায় নব্য উদারনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে মোদির উঁচুদরের সফরগুলোর সঙ্গে সঙ্গে 'মেক ইন ইণ্ডিয়া'র যে পূর্বাভাস, তা শাসক দলের এই মেকি জাতীয়তাবাদের মাঝে আন্তর্জাতিক পুঁজির ওপর ভারতের ভয়াবহ রকমের নির্ভরশীলতার একটি পথনির্দেশিকা তৈরি করে দিয়েছে।                         

এই পরিপ্রেক্ষিতেই চীন একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হওয়ার সুবাদে, আর জিডিপিতে তাদের উৎপাদনের ৩০ শতাংশ (যেখানে ইউএস'এর ক্ষেত্রে সেই পরিমাণটা হল ১১ শতাংশ) অবদান রাখার সুবাদে, মোদির 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র সুবিধা নেওয়ার মতো অবস্থানে আছে এর পটভূমিকা ইতিমধ্যেই মোদি আর শি’র বন্ধুত্বের মাধ্যমে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে মোট ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মোদির সাথে হওয়া শি’র মিটিংগুলির কথাও উল্লেখযোগ্য! পশ্চিমি দেশের তুলনায় আরও কম দামের এবং বেশি কর্মদক্ষ প্রযুক্তি চীনকে ভারতবর্ষে বাজার দখল করতে সাহায্য করেছে। খুব সম্ভবত, এ ক্ষেত্রে একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে বেইজিং প্রোটেক লিমিটেড সায়েন্স কোম্পানির চুক্তির কথা বলা যেতে পারে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হল বুলেট প্রুফ জ্যাকেট বানানোর জন্য মেটিরিয়াল ফ্যাব্রিক এবং বোরন-কার্বন হোয়াইট পাউডার আমদানি করা (www.thepolicytimes.com) আগে এইসব কাঁচামাল/মধ্যবর্তী জিনিসপত্র নেদারল্যান্ডস বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে আমদানি করা হত। কিন্তু এই পরিবর্তন অপরিহার্য করে তোলা হয়েছিল, কারণ চীনের জিনিসপত্র ৬০-৭০ শতাংশ বেশি সস্তা। আর ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস'এর তৈরি করা গুণের মাপকাঠি অনুযায়ী জিনিসের গুণমান নির্ধারণ করার জন্য নানান পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাবার পরেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো গিয়েছিলযখন চীনের এই চুক্তির ব্যাপারে যথারীতি সেই নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠল, ভি কে সারস্বত (নীতি আয়োগের সদস্য এবং ডিআরডিও’র প্রাক্তন প্রধান) সরকারের ‘অসহায়তা’কে এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন: 'এটা একটা বাজারগত শক্তি, এ ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ কিছুই করার নেই। শুধুমাত্র, যদি আমরা দেখি যে এই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটগুলো খুব একটা ভালো নয়, তবেই আমাদের কিছু বলার আছে। তবে এখনও পর্যন্ত সেরকম কোনও পরিস্থিতি আসেনি।' চীনের দ্বারা ব্রাজিল, পোল্যান্ড, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ভারতের নোট ছাপানোর খবর (চীন হল একমাত্র দেশ, যে কিনা ব্যাঙ্ক নোটের দুদিকেই নোট ছাপানোর ইন্ট্যাগ্লিও স্টাইল কালার ডান্সের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারে নোটের নিরাপত্তার জন্যে) মিডিয়ায় এসেছিল (ডেকান ক্রনিক্‌ল, ১৮ই এপ্রিল ২০১৮)। কিন্তু একজন কর্তাব্যক্তি, তার নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে, পরে বিষয়টাকে অস্বীকার করেছেন।          

সেই বাজারের আইন, যা কিনা এখন নব্য উদারপন্থী বিশ্বায়নকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা শেষ অবধি 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র আবরণ সরিয়ে তাকে 'মেড ইন চায়না' হিসেবে প্রকাশ করে দেওয়ার পক্ষে চূড়ান্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। মোদির শাসনব্যবস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও মজবুত করে ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ইন্দো-প্যাসিফিক ষড়যন্ত্রের কৌশলগত বুনিয়াদে পরিণত করেছিল। কিন্তু মার্কিন দেশ অনেক অতিপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল, আর সেই সাথে ছিল বেশি দামের সমস্যা। এই বিষয়টাই বিভিন্ন বিনিয়োগের ক্ষেত্র থেকে বাস্তবসম্মত ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়াতে চীনকে সক্ষম করেছিলসেই মতোই, ভারতে মোট চীনের বিনিয়োগ ২০১৪ সালে ১.৬ বিলিয়ান ডলার থেকে ২০২০ সালে ৮ বিলিয়ান ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল। যদি পরিকল্পিত এবং প্রস্তাবিত বিনিয়োগ এর সাথে যোগ করা হয়, তাহলে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়াবে ২৬ বিলিয়ান ডলারে (এ হল প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা, আর ওদিকে হিসেব মতো ভারতীয় বিনিয়োগ মোটে ৭০০০ কোটি টাকা)তবে এ কথা ঠিক যে, কোনও কোনও পর্যবেক্ষকদের মতে, চীনের পুঁজিবাদী বিনিয়োগের একটা বড় অংশ অনেক সময়েই অন্য পথে নিয়ে যাওয়া হয়, মানে তা করা হয় সিঙ্গাপুরের মতো কোনও তৃতীয় দেশ থেকে। প্রকৃত অর্থে সিঙ্গাপুর এখন ভারতের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎসস্থল। ইউপিএ’র শাসনকালে মরিশাস ছিল ভারতের জন্য এফডিআই'এর সব থেকে বড় উৎস, যাকে কিনা ভারতে মার্কিন পুঁজি রফতানি হিসেবে ছদ্ম আবরণ দেওয়া হয়েছিল (এটা করা হয়েছিল ভারত এবং মরিশাসের মধ্যে ট্যাক্স অ্যাভয়ড্যান্স ট্রিটির সুযোগ নিয়ে)। এখন মোদির শাসনে সিঙ্গাপুরের দ্বারা ভারতে সব থেকে বড় পুঁজি রফতানিকারী দেশ হিসেবে মরিশাসের স্থান দখল করে নেওয়ার বিষয়টা চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার পাশাপাশি পাঠযোগ্য যদিও এ বিষয়ের ওপর নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই কম এবং বিরল।       

এখন মূলত প্রযুক্তির খাতে জোর দেওয়া চীনের বিনিয়োগের বিষয়ে নজর দিলে বলা যায় যে এই চিত্রটা খুবই জটিল। ২০০৮ সালের মধ্যেই ১০০০ কর্মচারী-সমন্বিত ভারত (ব্যাঙ্গালোর) শেনজেন-ভিত্তিক হুয়াওয়েই টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেডের কাছে সব থেকে বড় বিদেশি গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠেফাইভ জি’র ক্ষেত্রে বিশ্বে অগ্রগণ্য হুয়াওয়েই টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেড'কে সব থেকে বড় কৌশলগত ফ্রণ্টিয়ার প্রযুক্তি হিসেবে ধরা হয়। ইতিমধ্যেই ভারতে এই কোম্পানির ফাইভ জি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খবর পাওয়া গেছে, যা অনেকটাই ট্রাম্প প্রশাসনের পরামর্শের পরিপন্থী। তবে সীমান্ত নিয়ে মতবিরোধের আবহে এর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অনিশ্চিত। মোদি ক্ষমতায় আসার পরে গেটওয়ে হাউসের হিসেব অনুযায়ী, চীনের প্রথম সারির টেক বহুজাতিক সংস্থাগুলি ভারতে স্টার্ট আপ'এর ক্ষেত্রে ৪ বিলিয়ান ডলার (৩০,০০০ কোটি টাকা) লগ্নি করেছেমোদি শাসনের পাঁচ বছর পার করে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালের মার্চে ভারতের ৩০টি ইউনিকর্ন কোম্পানির (ইউনিকর্ন কোম্পানি এমন একটি স্টার্ট আপ কোম্পানি যার মূল্য ১ বিলিয়ান ডলারের বেশি) মধ্যে ১৮টিই চীনের অর্থ সাহায্যে চলেআরও ৯২টি কম বিনিয়োগের স্টার্ট আপ কোম্পানিকেও অর্থ সাহায্য করে চীন। 

চীনের সফটওয়ার কোম্পানিগুলো যেমন, আলিবাবা, বাইটডান্স, টেনসেন্ট হুয়াওয়েই, জেডটিই; মোবাইল কোম্পানিগুলো যেমন, অপ্পো, ভিভো, ওয়ান প্লাস, কুলপ্যাড, মোটোরোলা, লইকো, লেনোভো, মিজু, অনার, জিওনি, জিফাইভ, হেয়ার, টিসিএল এবং অটোমোবাইল জায়ান্টগুলো যেমন, ভলভো, এসএআইসি, নিপ্পন, সাংহাই ইলেক্ট্রিক, বেইজিং অটোমোটিভ, ওইসকো, চায়না ডংফ্যাং, ইতিমধ্যেই ভারতবর্ষে গভীর শিকড় বিস্তার করেছে। ডিডি, চান্‌ক্সিং, শানওয়েই ক্যাপিটাল, ফসান ক্যাপিটাল, চায়না ইউরেশিয়া ইকনমিক কর্পোরেশন ফান্ড হল চীনের কিছু বিখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানি যারা ইন্ডিয়ান স্টার্ট আপ কোম্পানিদের অর্থ সাহায্য করে থাকে। সেই সব ইন্ডিয়ান স্টার্ট আপ কোম্পানির উদাহরণ হিসেবে পেটিএম, ওলা, স্ন্যাপডিল, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, মাই ডর্মাসি, হাইক মেসেঞ্জার, আইবিবো আর মেক মাই ট্রিপ, ড্রিম ১১, বাইজু’স অ্যাপ, বিগ বাস্কেট, ডেলহিভারি, ওয়ো, পলিসি বাজার, কুইক্‌র, রিভিগো, উড্ডান, জোমাটো ইত্যাদির কথা বলা যায়। চীনের ভিডিও অ্যাপ টিকটকের ২০০ মিলিয়ন ভারতীয় গ্রাহক আছে। ভারতে এই ভিডিও অ্যাপ ইউএস-ভিত্তিক ইউটিউবকে ছাড়িয়ে গেছে। আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইটড্যান্স, ভারতে ফেসবুক, অ্যামাজন, গুগ্‌লদের মতো ইউএস জায়ান্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছেঅপো আর জিয়াওমির মতো চীনের স্মার্টফোন ভারতের স্মার্টফোনের বাজার ৭২ শতাংশ দখল করে নিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এবং মার্কিন অ্যাপ্‌লের মতো ব্র্যান্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেআর ভারতে ৫টি সেরা মোবাইল ফোন ব্র্যান্ডের মধ্যে চারটেই হল চীনের কোম্পানিঅন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমতুল্য বিনিয়োগের ধারা না মেনে যেহেতু চীন দেশিয় বিনিয়োগ জটিল সংযোগ সহ দ্রুতগামী ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির এলাকায় (ফাস্ট মুভিং ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি এরিয়া) হয়ে থাকে, সেই কারণেই তাদের প্রভাবকে এই ধরনের বিনিয়োগের আয়তনের তুলনায় সামঞ্জস্যহীন বলে মনে করা হয়এখন, এটা পাঠকরাই ভাল করে ভেবে দেখুক যে, চীনকে বয়কট করার সামর্থ্য আদৌ ভারতের আছে কিনা ।      

এর সাথে সাথে শিল্প এবং কারিগরির বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের পুঁজির প্রবেশ ঘটছেএর উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে,  সৌরশক্তি উৎপাদনকারী সরঞ্জাম, কেমিকাল, অ্যালুমিনিয়াম, পশুখাদ্য, অটোমোবাইল, ধাতুবিদ্যা, নির্মাণকার্য, রেল এবং বন্দরের নির্মাণ ইত্যাদির কথা। ব্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রেও পিপ্‌ল্‌স ব্যাঙ্ক অফ চায়না (পিবিওসি) ভারতে বিভিন্ন ঘুঁটি সাজিয়েছেখুব সম্প্রতি পিবিওসি ভারতে হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ফিনান্স কর্পোরেশন লিমিটেডের (এইচডিএফসি) ওপর অংশীদারিত্বের জন্য আরও টাকা লগ্নি করেছে। এমনকি এখানে প্যাটেলের ৬০০ ফিট উঁচু মূর্তির কথাও বলতে হয়, যা কিনা তাঁর প্রতি মোদির উঁচু মাপের শ্রদ্ধাঞ্জলী। ২৯৯০ কোটি টাকায় তৈরি সেই স্ট্যাচু অফ ইউনিটিও মেড ইন চায়নার শিলমোহর বিরহিত নয়। ২০১০ সালে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এই মূর্তির কথা ঘোষণা করা হলেও এই স্ট্যাচু অফ ইউনিটির কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে। ১৭০০ মেট্রিক টন ওজনের ৬৫০০টি ব্রোঞ্জ প্যানেলের গোটাটাই জিয়াংক্সি টঙ্কিং মেটাল হ্যান্ডিক্রাফ্‌ট্‌স লিমিটেড কোম্পানিতে ঢালাই হয়েছিল, কারণ ভারতবর্ষে সেরকম সুযোগ-সুবিধা নেই       

ওদিকে ভারতের যে সব পিএসইউ'গুলো উন্নত সেমিকন্ডাক্টারে গবেষণাতে রাজি হয়েছিল, তাদের অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ভেঙে ফেলা বা দুর্বল করে দেওয়া হল পাশাপাশি, ঝুঁকি সাপেক্ষ কর্পোরেটাইজেশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা ভারী শিল্প বা প্রযুক্তির উন্নয়নের ব্যপারে বড় একটা আগ্রহী নয় ইতিমধ্যে, 'মেক ইন ইন্ডিয়া' এবং আত্মনির্ভর ভারতের পোস্ট ট্রুথ পূর্বাভাসের প্রভাবে ভারতের বেসরকারি কর্পোরেট সেক্টরকে বিদেশি সহযোগিতা বা যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি আমদানি করতে উৎসাহিত করা হচ্ছিল। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য দেশের সেই বহুজাতিক সংস্থাগুলো যারা কিনা আইটি, জৈব প্রযুক্তি (তবে ভারি শিল্পের ক্ষেত্রে নয়) আর অন্যান্য ক্ষেত্রে উদার আবহাওয়ার প্রভাবে ছুটে আসছে, তারা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নতিকরণের জন্যে একেবারেই ইচ্ছুক নয়। কোভিড-১৯ এসে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিনিয়োগ না হলে কোনও দেশই আত্মনির্ভরশীলতার দিকে যেতে পারে নাভারতের মতো এক বিশাল এবং বৈচিত্রপূর্ণ দেশের কাছে বাইরের দেশ থেকে অনুকরণ করার মতো কোনও মডেল নেইবেসরকারি কর্পোরেট ক্ষেত্রের ওপর  নির্ভরশীলতা, বহিরাগত উৎস থেকে অর্থের যোগান এবং মানুষের যোগদান সহ পরিকল্পিত সরকারি হস্তক্ষেপের বিনিময়ে অফশোর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্র (স্বল্পমূল্যে শ্রম পাবার জন্য অন্য দেশে বাণিজ্য স্থানান্তরিতকরণ)- এসবই ভারতের পক্ষে আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। চীনের সঙ্গে চলতে থাকা সীমান্ত নিয়ে বিরোধ ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বেশি করে প্রকট করে দিয়েছে এখন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর জন্যে, এরকম খারাপ পরিস্থিতিতে সঠিক রাজনৈতিক বিকল্পের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবার চূড়ান্ত সময়।  

অনুবাদ: মঞ্জিস রায়


Saturday, 23 January 2021

গোদি মিডিয়ার মাফিয়াগিরি

কারা চালাচ্ছে দেশ? 

সোমনাথ গুহ

 


সীমাহীন গলাবাজি, হিস্টিরিয়া-গ্রস্ত, তাক লাগানো খবর, দিনের মোক্ষম সময়ের ‘বিতর্কসভায়’ মৌখিক হামলাবাজি করে যিনি বক্তাদের ভেড়ায় পরিণত করতে অভ্যস্ত, শাসক দলের নির্লজ্জ তাঁবেদারি করে যে ব্যক্তিটি টিভি চ্যানেলের স্টুডিওকে বিরোধীদের বধ্যভূমি করে তুলেছেন, রিপাবলিক টিভির কর্ণধার সেই অর্ণব গোস্বামী আজ নিজেই খবর। অর্ণব এবং BARC (ব্রডকাস্ট অডিয়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল)'এর ভূতপুর্ব সিইও পার্থ দাশগুপ্ত'র ৩৪০০ পাতা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ মুম্বাই পুলিশের হস্তগত। 

অর্ণব ও পার্থ টাইমস গ্রুপে সহকর্মী ছিলেন মে ২০১৭তে অর্ণব রিপাবলিক টিভি শুরু করেন। এর আগেই অন্য একটি চ্যানেলে তিনি টিভি সাংবাদিকতার এক নতুন স্টাইল উন্মোচিত করেন। এই স্টাইল উৎকর্ষতার পরোয়া করে না, এ হচ্ছে পাতি ঢক্কানিনাদ, যেখানে খবর নয় খবরদারি, নিউজ নয় নয়েজ হচ্ছে নির্ণায়ক। পরিশীলিত অফিস কর্মী বাড়ি ফিরে রাত নটার প্রাইম টাইমে এই ধরনের শালীনতাহীন ধুন্ধুমার বাকযুদ্ধ দেখতে অস্বস্তি বোধ করেনতাঁরা রিমোটের সুইচ টিপে অন্য চ্যানেলে চলে যান যেখানে যুক্তিতর্কের একটা রেওয়াজ আছে। তথ্যের বিকৃতি, লাগামছাড়া আগ্রাসন, চিলচিৎকার করে পরস্পরের প্রতি দোষারোপ এই ধরনের তামাশা দেখবার জন্য প্রয়োজন হয় ভিড়, MOB, এবং সেটা করার একটিই উপায় টিআরপি বাড়ানো। যত বেশি মানুষ রিপাবলিক টিভি দেখবে তত সেটার টিআরপি বাড়বে, যত টিআরপি বাড়বে তত বিজ্ঞাপন আসবে।   

এখানেই শুরু হয় অর্ণব ও পার্থর যোগসাজশ। অর্ণবের প্রয়োজন টিআরপি বাড়ানো এবং বার্কের প্রধান হিসাবে পার্থ সেটা অনায়াসে করতে পারেন। অর্ণবকে সাহায্য করে পার্থ'র নিজের স্বার্থসিদ্ধি কী ভাবে হবে? অভিযোগ, তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে মিডিয়া অ্যাডভাইসার হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এমনও অভিযোগ যে পার্থ দাশগুপ্ত'র এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা অর্ণবের বাঁ হাতের খেল কারণ সমস্ত মন্ত্রীরাই তাঁর হাতের মুঠোয় এবং উচ্চতম দুই ব্যক্তির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ। মুম্বাই পুলিশের চার্জশিটে উল্লিখিত কথোপকথন অনুযায়ী পার্থ তাঁর অফিসিয়াল পদের সুযোগ নিয়ে ‘রিপাবলিক ভারত ইন্ডিয়া’ এবং ‘রিপাবলিক ইন্ডিয়া’ (ইংলিশ)'র টিআরপি (টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট) নানা ফন্দি করে বাড়িয়ে দেন, প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যানেলগুলিকে চেপে দেন যার ফলে রাতারাতি ঐ দুটি চ্যানেলেরই দর্শক সংখ্যা চড়চড় করে বাড়ে। এতে অন্য চ্যানেলের গাত্রদাহ হয়, যদিও এদের মধ্যে বেশির ভাগই কৃত্রিম উপায়ে টিআরপি বাড়ানোর দোষে দুষ্ট। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে অন্তত কিছু তো একটা করে দেখাতে হয়। TRAI (টেলেকম রেগুলেটারি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া) ঠিক করে যে কেবল অপারেটর গ্রাহকের টিভিতে একটা চিপ লাগিয়ে দেবে যেটা কে কোন চ্যানেল কতক্ষণ দেখছে তার হিসাব রাখবে। অর্থাৎ, ব্যাপারটা ডিজিটাল হয়ে গেল, অফিসে বসে আমার কাছের লোকের রেটিং বাড়াব, প্রতিযোগীদেরটা কমিয়ে দেব, এটা করা অসুবিধা হয়ে গেল। পার্থ জানায়, যে কোনও উপায়ে এই নতুন পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ অনুযায়ী এখানে এএস (AS)'এর সাহায্য নেওয়ার প্রসঙ্গ আসে যে এটা অনায়াসে ধামাচাপা দিয়ে দিতে পারে। রহস্যজনক কে এই এএস? 

রিপাবলিক টিভির বিরুদ্ধে এর আগেও সরকারি আনুকূল্য কাজে লাগিয়ে শ্রোতা-দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টার অভিযোগ এসেছে। দূরদর্শনের DTH সার্ভিস ব্যবহার করার জন্য সময়সীমা নিলাম করা হয়। কোটি কোটি টাকার মূল্যে বিভিন্ন সংস্থাকে সময় প্রদান করা হয়। অভিযোগ- রিপাবলিক টিভি নিলামে অংশগ্রহণ না করেও DTH সার্ভিস ব্যবহার করেছে যার ফলে প্রসার ভারতীর প্রায় ৫৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ঐ সময়েও এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয় যা মন্ত্রীসভার কোনও এক ‘রাঠোর’ ধামাচাপা দিতে সাহায্য করে।  

হোয়াটসঅ্যাপ'এর ঐ কথোপকথনে বিস্ফোরক সব তথ্য পাওয়া গেছে। পুলওয়ামায় সিআরপিএফ'এর ওপরে বিধ্বংসী আক্রমণের পর অর্ণব নাকি উল্লসিত হয়ে বলে উঠেন, এই হামলা আমাদের পক্ষে উন্মাদের মতো সহায়ক হবে। চল্লিশ জন সেনার মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণে সারা দেশ যখন শোকস্তব্ধ তখন এই ধরনের প্রতিক্রিয়া বিস্ময়কর। ‘আমাদের’ বলতে উনি কাদের বোঝাচ্ছেন, কাদের পক্ষে ‘সহায়ক’ হবে বলছেন? এই হামলার প্রত্যুত্তরে ভারতীয় বায়ু সেনা ২৬ ফেব্রুয়ারি বালাকোটে এয়ার স্ট্রাইক করে। অভিযোগ, অর্ণব এর তিন দিন আগে পার্থকে বলেন, বড় কিছু একটা হবে। পার্থ'র জিজ্ঞাসা, দাউদ? অর্ণব জানান আরও বড় কিছু, মানুষ উল্লসিত হয়ে যাবে। এতদিন অবধি আমরা জেনে এসেছি প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তারা ছাড়া এই স্ট্রাইকের কথা আর কেউ জানতেন না। টিভির একজন সঞ্চালক এত বড় একটা খবর কী করে পেয়ে গেলেন? এ তো দেশের নিরাপত্তা নিয়ে ছেলেখেলা করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করার দায়ে ওনাকে ১৯২৩'এর ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী গ্রেফতার করা যেতে পারে। 

আরও চমকপ্রদ তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। ধারা ৩৭০ যে রদ হবে এটা নাকি তিনি দু' দিন আগেই জানতেন, যে কারণে অন্য সব সংবাদ মাধ্যমের আগেই তিনি রিপাবলিক টিভি'র ৫০ জন কর্মীকে জম্মু-কাশ্মীরে মোতায়েন করতে পেরেছিলেন। অভিযোগ, তখন তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দুই বছরের অধিক সময় ধরে চলা তাঁদের এই কথোপকথনে অর্ণব এবং পার্থ কাউকেই রেয়াত করেননি। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি'র দক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন এমনকি তাঁর মৃত্যু বিলম্বিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন। বিশিষ্ট টিভি সাংবাদিকদের সম্পর্কে তীর্যক, অপমানজনক মন্তব্য করেছেন, যে তালিকায় তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীরাও আছেন। পার্থ যখন বলেছেন তিনি আদালতের একটি কেসে ফেঁসে আছেন, তখন বিচারককে কিনে ফেলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

রিপাবলিক টিভি শীঘ্রই বাংলায় পদার্পণ করছে। ইউটিউবের একটি বাংলা চ্যানেল জানাচ্ছে যে পার্থ দাশগুপ্ত পশ্চিমবাংলার ওপরে কিছু করার জন্য বারবার জোর দিয়েছেন। অর্ণব নাকি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন এবং বলেছেন উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ তিনি হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া এবং বসিরহাটের ‘দাঙ্গা’র কথা উল্লেখ করেন। টিভি সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ছলেবলে কৌশলে করায়ত্ত করে, ফেসবুকের ওপর নিজেদের প্রতাপ কায়েম করে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন করাতে বিজেপি সিদ্ধহস্ত। এটা আজ পরিষ্কার, দু' দুটি লোকসভা নির্বাচন জিততে, সারা দেশ জুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়াতে, জাতপাতের বিভাজন, নারী ও দলিতদের প্রতি বিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলতে এই সব চাটুকার সংবাদমাধ্যম নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না। নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কথার কথা ছিল মাত্র। কিন্তু পক্ষপাতহীনতার একটা ভড়ং ছিল, কোনও বিশেষ পক্ষের হলেও নিজের বা সংস্থার মতামতকে লুকোছাপা করার একটা প্রয়াস ছিল। রাজনীতি যত উগ্র হয়েছে, সাংবাদিকতাও তাল মিলিয়ে উগ্র হয়েছে। নেতানেত্রীদের মুখের ভাষা যত অশালীন হয়েছে, সাংবাদিকের ভাষ্যেরও ততোধিক অবনমন ঘটেছে। সমস্ত মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বহু সাংবাদিক, বিশেষ করে টিভির সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, একটা বিশেষ দলের হয়ে সরাসরি প্রচার করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার শুরু নতুন শতাব্দীর গোড়া থেকে যা ২০১৪ সালে প্রাক-নির্বাচনের সময় ত্বরান্বিত হয় এবং যা এখন অভুতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অর্ণবের সাফল্যের ফরমুলা অনুসরণ করে প্রায় সব টিভি চ্যানেল সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে উঠেছে, গোদি মিডিয়ার জন্ম হয়েছে। ভিড়তন্ত্র, মবোক্রেসি আজ টিভি স্টুডিওতেও পৌঁছে গেছে। প্রত্যহ সন্ধ্যায় সেখানে আজ মার মার কাট কাট রব! মিডিয়া এখন বিচারব্যবস্থার কাজও নিজের হাতে তুলে নেয়। প্রাইম টাইমের টিভি স্টুডিও আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ঘটনার বিচারকক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। মিডিয়া ট্রায়ালে সঞ্চালক ও তাঁর আজ্ঞাবহ বক্তারা ঠিক করে দেন রিয়া চক্রবর্তী সুশান্ত সিং রাজপুতকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছেন। তাঁরাই রায় দেন জাকির নায়েকের পয়সা দিয়ে শাহিনবাগের সংগঠকরা দিল্লিতে দাঙ্গা করেছেন। চিলচিৎকার করে তাঁরাই দেশকে বারবার জানান যে খালিস্তানিরা কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করছেন, জেএনইউ'র নেতানেত্রীরা দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করতে চাইছেন। তাঁরাই সত্যান্বেষী পুলিশ অফিসারকে মুসলিমদের দালাল বলে দেগে দেন, ফ্রিজে মাংসটা পাঁঠা নয় গরু ছিল জানিয়ে দেন, চমকপ্রদ প্রচার করেন যে মহিলার মৃত্যুকালীন জবানবন্দী ভুল, আসলে কোনও ধর্ষণই হয়নি।

এই পঙ্কিল পরিস্থিতিতে অর্ণব গোস্বামীরা রাজ করবেন না তো কে করবে। হোয়াটসঅ্যাপ'এর মেসেজের ওপর ভিত্তি করে যদি উমর খালিদকে গ্রেফতার করা যায়, তাঁকে যদি ইউএপিএ'তে অভিযুক্ত করা যায় তাহলে অন্যদের কেন নয়? রাজপথে, অলিতে গলিতে গলা ফাটিয়ে আজ বলার দরকার: দ্য নেশন ওয়ান্টস টু নো।