Pages

Thursday, 3 September 2026

উত্তম ১০০ (২)

ইতিহাস ও স্মৃতিমেদুরতা

সোমনাথ গুহ



‘উত্তমকুমার বাঙালিবাবু হিসাবে অনন্য’-- মহানায়কের মৃতুর পর পাহাড়প্রমাণ শোকবার্তার মধ্যে বলিউড হিরো রাজেশ খান্নার এই উক্তিটি উল্লেখজনক। ‘বাবু’ বা ‘ভদ্রলোক’ বলতে ঠিক কী বোঝায় তা বহু আলোচিত। সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য ঐতিহাসিক সুমিত সরকার মনে করতেন, শব্দটির পরিসর বহু বিস্তৃত, যাতে ‘ময়মনসিংহের মহারাজা থেকে ইস্ট-ইন্ডিয়া রেলের কেরানি সবাই অন্তর্ভুক্ত’। এর বিস্তৃত বিশ্লেষণে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, শুধু বলার ‘ভদ্রলোক’ ব্যক্তির একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখজনক, প্রায় সর্বজনীন: তাঁরা কায়িক শ্রম করেন না। নিম্নবিত্ত বা নিম্নবর্ণের থেকে এটি হল তাঁদের প্রধান পার্থক্য। শব্দটি মূলত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্প্রদায় হিসাবে উদ্ভব হলেও কালে কালে সাংস্কৃতিক পরম্পরায় রূপান্তরিত হয়। উত্তমকুমার, আজ যাঁর জন্মশতবার্ষিকী (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬), তিনি ছিলেন এই পরম্পরার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, কালচারাল আইকন।  

১৯৪৮ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’। সময়টা যুগান্তকারী: ১৯৪৩'এ মন্বন্তর, তিন বছর বাদে ফেব্রুয়ারিতে রশিদ আলি দিবস, উত্তাল আন্দোলন ও অনেকের মৃত্যু, ছয় মাস বাদে কুখ্যাত কলকাতা দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ ও আরও দাঙ্গা। কলকাতায় বিশেষ করে এবং সারা রাজ্যে উদ্বাস্তুদের ঢল। চারিদিকে খাদ্য, আশ্রয়ের অভাব; বাঙালি বিপন্ন, বিপর্যস্ত, বেঁচে থাকার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এরই মধ্যে এলেন তিনি। সুদর্শন নন কিন্তু মেধাবী; বেপরোয়া মনে হলেও দায়িত্বশীল; কিছু  চরিত্রে ধনী নন কিন্তু ন্যায়পরায়ণ, আবার কোনও চরিত্রে ধনী হলেও সহমর্মী। রোমান্টিক কিন্তু আগ্রাসী নন, বরং মেয়েদের সম্মুখে জড়সড়, দ্বিধাগ্রস্ত। স্মার্ট, বিংশ শতাব্দীর ভদ্রলোক বাঙালির মতো ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, আবার ক্ষেত্র বিশেষে গেঁয়ো, আটপৌরে। আপাত বিরোধী যাবতীয় দোষগুণ নিয়ে তিনি স্ক্রিনে উপস্থিত হলেন। 

১৯৪৯-১৯৫১ তাঁর পরপর কয়েকটি ছবি ফ্লপ। বাজারে নাম হয়ে গেল ফ্লপমাস্টার, সেটে কটূক্তি ভেসে আসত-- ‘পায়ে পাথর বেঁধে রাখ না হলে উড়ে যাবে’। পরের বছর ‘বসু পরিবার’ মুক্তি পেল, তার পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হল না, মহানায়কের পথে অবশেষে তাঁর যাত্রা শুরু। বাঙালি পেল তাঁর ম্যাটিনি আইডল, একই সঙ্গে পাশের ঘরের ছেলে। 

বলাই বাহুল্য, উত্তমকুমার রাতারাতি বাঙালির হৃদয় জয় করেননি। অধ্যবসায় তো ছিলই, আর কিছু গুণ ছিল মজ্জাগত, পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। অভিজাত এবং সাধারণ, এটাই তো ছিল তাঁর পরিবারের বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী আরও অনেক ভদ্রলোক পরিবারের মতো তাঁর গিরীশ মুখার্জি রোডের পরিবারেরও বংশগরিমা ছিল, কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এমন নয় যে তাঁরা দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু ফেলে ছড়িয়ে খাবার মতো অবস্থাও ছিল না। যেটা ছিল, পরিবারের একটি সখের থিয়েটার। তিনি নিজেই লিখেছেন, 'এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে শাড়ি, চাদর, সেফটি পিন এনে উইংস, স্ক্রিন তৈরি হয়ে যেত, কাগজ দিয়ে মুকুট আর রাংতা দিয়ে তলোয়ার, ব্যস শুরু হয়ে গেল নাটক।' তখন থিয়েটারের চেয়ে যাত্রাদলের রমরমা, ছোট উত্তমের যাত্রার মহড়া দেখার প্রবল নেশা। পাড়ার ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে যাত্রার সংলাপ মুখস্থ করতেন, তারপর বাড়িতে এসে আপন মনে সেটা বলে যেতেন। ‘মুকুট’ নাটক দিয়ে হাতেখড়ি, তারপর ক্লাবে, স্কুলে, কলেজে দেদার নাটক করেছেন। পরবর্তী সময়ে স্টার থিয়েটারে ‘শ্যামলী’ তো হিট। পাড়ার ক্লাবের তিনি ছিলেন এক সক্রিয় সদস্য, সমস্ত ধরনের খেলাধুলা করতেন, গানবাজনা করতেন, গানের তালিমও নিয়েছেন, পদ্মপুকুরে বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটতেন। পরে শিক্ষক রেখে উর্দু, হিন্দি শিখেছেন। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন এমনটাও নয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে, হাতে তেরঙ্গা নিয়ে প্রভাত ফেরি করেছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের ফান্ডের জন্য টাকাও তুলেছেন।

কলেজের পাঠ শেষ করে উপলব্ধি করেছেন যে যৌথ পরিবারের হাঁড়ি চালু রাখার জন্য চাকরি করা প্রয়োজন। তখনকার পোর্ট কমিশনার্সে চাকরি করেছেন আর বিভিন্ন স্টুডিও ঘুরে ঘুরে সিনেমায় কোনও মতে চান্স পাবার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন। দিনের পর দিন অফিস কামাই করেছেন, প্রযোজকদের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছেন। অনেক কষ্টে দৈনিক পাঁচ সিকি মজুরিতে ‘মায়াদোর’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে এক্সট্রার কাজ করেছেন, যে ছবি কোনওদিনও মুক্তি পায়নি। এই পর্বে তাঁর দুর্নিবার প্রচেষ্টা রীতিমতো শিক্ষণীয়। 

তাঁর পাড়াগত সক্রিয়তার কারণে ‘পাশের বাড়ির ছেলে’র বৈশিষ্ট্য তাঁর ছিলই। পারিবারিক সূত্রে আভিজাত্য পেয়েছেন, বাকিটা অনুশীলন করেছেন। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো ছবি ‘হারানো সুর’-এ আমরা মহানায়কের এই দুটি ভিন্ন মানসিক রূপ দেখতে পাই। প্রথম অংশে তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট, অসহায়, মহিলা ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় অংশে আত্মবিশ্বাসী, প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক, স্যুট বুট পরা আধুনিক শহুরে মানুষ। 

ফিরে যাই প্রথম হিট ছবি ‘বসু পরিবার’-এ। এখানে সেই আমলের ভদ্রলোক পরিবারের লক্ষণ দেখা যায়। বংশগরিমা আছে কিন্তু যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে। বসুদের যৌথ পরিবারেও একই ধরনের সংকট। পিতা মামলায় হেরে গিয়ে সম্পত্তি হারিয়েছেন। ছোট ছেলে এটর্নি হয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর্থিক অনটনের কারণে পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে। এর মধ্যে সুখেন বাড়ির বড় ছেলে সৎ, দায়িত্বশীল ও মেরুদন্ডসম্পন্ন। সে উপন্যাস লেখে যা ২০,০০০ কপি বিক্রি হয়, বিক্রির টাকা দিয়ে সে বাবার দেনা শোধ করেছে। পরিবারের সদস্যদের পেশা লক্ষণীয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে যেরকম হয়ে থাকে। এটি উত্তমের প্রথম হিট ছবি হলেও তিনি কিন্তু এখানে প্রথাগত নায়ক নন। এই প্রথম আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর অভিনয়ের সুখ্যাতি করা হয়। পরের ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সুপারহিট হলেও উত্তমের নাম কিন্তু ছবির বিজ্ঞাপনে ছিল না। ছবিটি মুক্তি পায় প্যারাডাইস হলে, সেই আমলের অন্যতম সিনেমা হল। বিজ্ঞাপনে এই তথ্য আর তুলসী চক্রবর্তী'র নামোল্লেখ ছিল। এই ছবিতে উত্তম প্রায় এক অনিচ্ছুক প্রেমিক, মনে ষোলআনা ইচ্ছা কিন্তু সুচিত্রার সামনে পড়লেই থতমত। 

অন্তত প্রথম দিককার ছবিতে প্রেমিক হিসাবে এটাই উত্তমের ইউএসপি। কোমল, সূক্ষ্ম, উদার, মৃদুভাষী, অনেক সময়ই আড়ষ্ট, অনিশ্চিত; বলিউডি হিরোদের মতো একদমই ম্যাচো নয়, বরং কিঞ্চিৎ নারীসুলভ। মেস-এ একগাদা ব্যাচেলার ছেলের মধ্যে সেও একজন, আর তার প্রতিই সুচিত্রার আকর্ষণ। এটা একদম টিভি আগমনের আগে বাঙালি পাড়ায় ছেলেমেয়েদের টিপিক্যাল প্রেম। পরস্পরের চোখাচুখি, আচমকা মুখোমুখি আর নিরন্তর চিঠি চালাচালি। সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে বরং যেটা বিস্ময়কর সেটা হল রমলার (সুচিত্রা) অনায়াস বিচরণ, তার সাবলীলতা। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির কাহিনি তাপসীর পরীক্ষা ছাড়াও কিরীটিরও পরীক্ষা। তার সিদ্ধান্তহীনতা, সমাজ কী চোখে ঘটনাটা দেখবে তা নিয়ে তার দ্বিধা, তাপসীকে প্ররোচিত করে বলতে কেন সে যেটা চায় সেটা ছলেবলে কৌশলে করায়ত্ত করতে পারে না। সে যুক্তি দেয় শুধুমাত্র বলিষ্ঠরাই ভোগ করতে পারে। এর উত্তরে কিরীটি যা বলে সেটাই প্রেমিক চরিত্রে উত্তমের মৌলিক, অনন্য রূপ যা তাঁকে আপামর বাঙালির কাছে এত প্রিয় করে তুলেছে। কিরীটি বলে, বলপ্রয়োগ করে কিছু হয় না, তপস্বীর মতো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। দেহমনের আকাঙ্ক্ষা সংযত করতে হবে, তিতিক্ষা, ধৈর্য, সংযম অর্জন করতে হবে। 

নায়কের প্রথম দশ বছরের অন্যতম সেরা ছবি অবশ্যই ‘সপ্তপদী’। এটা ষাটের দশকের শুরুর ছবি। উত্তম-সুচিত্রা তখন জুটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনের মধ্যে রসায়ন আড়ষ্ঠতাহীন, সাবলীল, আবেগপ্রবণ। আগের ছবিগুলির তুলনায় এখানে প্রেম অনেক উদ্দাম, বাঁধনছাড়া। দুজনে একই কলেজের শিক্ষার্থী, দুজনেই মেধাবী এবং গুণী, তাই তাদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য। বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। কৃষ্ণেন্দু কট্টর ব্রাহ্মণ ঘরের ছেলে, রীনা খ্রিস্টান। এখানেই ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে যে দ্বন্দ্ব তা ফিরে আসে: সংস্কার, সমাজের প্রতি আনুগত্য না সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলোকপ্রাপ্ত হওয়া। এই ছবিতে কিছুটা গোঁজামিল দিয়ে তার সমাধান হয়, কিন্তু ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ধর্মের বাধা অতিক্রম করে তাদের প্রেম মহিমান্বিত হয়। 

স্বাধীনতা-উত্তর পরের কয়েক দশকে বাঙালি সমাজের নারী-পুরুষ সম্পর্ক ভিক্টোরিয়ান মুল্যবোধে প্রভাবিত। প্রেম হতে পারে কিন্তু তা সংযমী, দায়িত্বশীল হতে হবে, পরিবারের কর্তৃত্ব, সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্কে এই মূল্যবোধের সাথে আধুনিকতার মিশেল ঘটেছে। যেমন আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’-এর চল ছিল। তথাকথিত লাভ-ম্যারেজ ছিল ব্যতিক্রম, বেশ সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা। এই জুটি এই বেড়াজাল ভেঙে দিল। রোমান্স শব্দটা বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে প্রবেশ করল। আবার নারী শুধুমাত্র গৃহিণী ছিল না, শিক্ষিতা তো বটেই, বাকপটু, কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টবক্তা। চলচ্চিত্র যদি সমাজের প্রতিফলন হয় তাহলে আজকে নারীর আরও অগ্রগতি এবং কর্মক্ষেত্রে অধিক উপস্থিতি থাকার কথা ছিল; অপর দিকে পুরুষ কম পিতৃতান্ত্রিক, অধিক কোমল এবং অনুভুতিপ্রবণ। বাংলা সিনেমার নিরিখে পিতৃতন্ত্রের দাপট আদৌ কমেনি, বেড়েছে।  

এতগুলি দশক পেরিয়ে আজ এইসব ছবি দেখলে ধাক্কা লাগে, বঙ্কিমের গদ্য পড়তে যেরকম ধাক্কা লাগে। যৌথ পরিবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরিবর্তনটা শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংলাপ, ভাবভঙ্গি অতি-নাটুকে লাগে। প্রেম আর শুধু ক্ষণিকের চাহনি নয়, সম্পর্ক বছরের পর বছর অপেক্ষা নয়। তবুও মানসপটে আঁকা ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ স্মৃতিতে ধূসর হয়ে থাকে, বাঙালি জীবনের কয়েক দশকের এক টুকরো ইতিহাস যার অবিসংবাদিত নায়ক হলেন উত্তমকুমার।


No comments:

Post a Comment