কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা?
কৌশিকী ব্যানার্জী
গত ১০ অক্টোবর ছিল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি নিঃশব্দে চলে যায়। বেশিরভাগ ভারতীয় আজও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত নন। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা আরোপিত কলঙ্ক (stigma) আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রকট। এই কলঙ্ক গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে সাংস্কৃতিক লজ্জা, পারিবারিক সম্মান নিয়ে উদ্বেগ এবং এমন কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে, যা প্রায়শই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে অতিপ্রাকৃত কারণ কিংবা কর্মফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। বিশেষত কঠোর লিঙ্গ অবস্থান, পারিবারিক চাপ ও সীমিত সামাজিক ক্ষমতায়নের কারণে ভারতীয় নারীরা এক 'দ্বৈত কলঙ্ক' জনিত সমস্যার মুখোমুখি হন। অথচ ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি।
২০১৭ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মন্তব্য করেছিলেন, ভারত এক 'সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্য মহামারী'র মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সে বছর ভারতের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, যার মধ্যে ৪ কোটি ৫৭ লক্ষ মানুষ বিষণ্ণতাজনিত সমস্যায় এবং ৪ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। বলাই বাহুল্য, কোভিড-১৯ মহামারী এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। হু'র সাম্প্রতিক সমীক্ষায় পাওয়া গেছে, ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বোঝা হল, প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় ২,৪৪৩ জনের ‘ডিসঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ (DALYs) বা অক্ষমতাজনিত জীবনকাল; এছাড়া প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় বয়স-সামঞ্জস্যপূর্ণ (এজ-এডজাস্টেড সুইসাইড রেট) আত্মহত্যার হার ২১.১ শতাংশ। এর ফলে, ২০১২ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে দেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১.০৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকা (৬.৯ শতাংশ) এবং নন-মেট্রো শহরাঞ্চলের (৪.৩ শতাংশ) তুলনায় মেট্রো শহরাঞ্চলে মানসিক অসুস্থতার হার (১৩.৫ শতাংশ) তুলনামূলক বেশি। এনসিইআরটি (NCERT)-এর ‘স্কুল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা' বিষয়ক জরিপে বলা হয়েছে যে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের হার বাড়ছে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে আরও প্রকট হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী উদ্বেগ অনুভব করে, ১৪ শতাংশ তীব্র আবেগপ্রবণতা দ্বারা আক্রান্ত এবং ৪৩ শতাংশের মধ্যে মেজাজের ঘন ঘন পরিবর্তন (মুড সুইং) পরিলক্ষিত হয়।
অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য মানব পুঁজিকে ক্ষয় করার মাধ্যমে অর্থনীতির সক্ষমতা হ্রাস করে; অথচ এই মানব পুঁজিই হল শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কোনও ব্যক্তি যখন মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান, তখন তাঁর জ্ঞানীয় সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আবেগীয় সহনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা বাজারে গভীর অদক্ষতা সৃষ্টি করে। শ্রমবাজারে এর প্রভাব পড়ে শ্রমের সরবরাহ হ্রাস এবং শ্রমের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মাধ্যমে; পাশাপাশি এটি বিভিন্ন কর্মপরিচালনগত জটিলতাও তৈরি করে, যেমন, কর্মীদের ঘন ঘন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা (লেবার টার্নওভার) বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সমন্বয়হীনতা। অধিকন্তু, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য সম্পদের সঠিক বণ্টনে বাধা দেয়। এর ফলে সীমিত অর্থনৈতিক পুঁজি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত না হয়ে স্বাস্থ্যগত সংকট মোকাবিলায় ব্যয় হয়। পরিশেষে, এটি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা হ্রাস করে এবং শ্রমশক্তির সামগ্রিক উৎপাদনশীল সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার ওপর কাঠামোগত বাধা সৃষ্টি করে। 'ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ বেসিক অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি'-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে অসুস্থতাজনিত ব্যয়ের একটি মূল্যায়নে দেখা গেছে, জনপ্রতি বার্ষিক মোট অর্থনৈতিক বোঝা গড়ে ৫৯,৯৫১ টাকা। এর মধ্যে পরোক্ষ ব্যয় (কাজের ক্ষতি, পরিচর্যাকারীর ওপর চাপ ইত্যাদি) মোট ব্যয়ের ৫৬.৩৩ শতাংশ (প্রায় ৩৩,৮০০টাকা ) জুড়ে রয়েছে।
শিশু, কিশোরদের মানসিক সমস্যার প্রভাব আরও অনেক গভীর যদি সময়মতো নিরাময় না হয়। অনেক সময় সন্তানদের অমনোযোগিতা, হাইপার-এক্টিভিটি'র মতো সমস্যাগুলিকে শিশুসুলভ আচরণ ভেবে উপেক্ষা করলে পরবর্তীকালে তা গুরুতর মানসিক ও আচরণগত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাগুলো অর্থনীতির শ্রম সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন সক্ষমতা ও দুই প্রজন্মের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী এক অভিঘাত সৃষ্টি করে (ডুয়াল-জেনারেশন শক)। স্বল্পমেয়াদে, কোনও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের দেখাশোনা করতে গিয়ে মায়ের কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় যেহেতু মা হলেন প্রাথমিক পরিচর্যাকারী-- মায়েরা তাদের কাজের সময় কমাতে বাধ্য হন, অথবা শ্রমবাজার থেকে পুরোপুরি সরে আসেন। ভারতে মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের হার এমনিতেই হতাশাজনকভাবে কম, তার ওপর সন্তানের মানসিক সমস্যা মায়েদের কর্মপ্রবণতার হার আরও হ্রাস করবে। অপরদিকে, জীবনের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া এই স্বাস্থ্যগত অভিঘাতগুলো শিশুর জ্ঞানীয় (cognitive) ও অ-জ্ঞানীয় (non-cognitive) দক্ষতার বিকাশকে ব্যহত করে, যার ফলে স্কুলে উপস্থিতির হার কমে যাওয়া এবং শিক্ষা জীবনে পিছিয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটে। এই শিশুরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তাদের বিকাশের এই ঘাটতি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেয়। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার হ্রাস, কাঠামোগত বেকারত্ব, দীর্ঘস্থায়ীভাবে কম মজুরি প্রাপ্তি এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে।
এমনকি ভারতে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খরচের (আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার) ওপর অত্যধিক নির্ভরতা রয়েছে, যার ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি পরিবারকে প্রতি মাসে গড়ে ২,০০০ টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়, অথচ মাথাপিছু আয়ের মধ্যক (মিডিয়ান) প্রায় ১০,০০০ টাকার আশেপাশে হওয়ায় এই ব্যয়ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে, মানসিক সমস্যার সময়মতো চিকিৎসা অনেকাংশে হয় না।
'মেন্টাল হেলথ কেয়ার অ্যাক্ট, ২০১৭' ভারতে মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে বেশ কিছু বিধান প্রবর্তন করেছে। এই আইনটি 'মেন্টাল হেলথ কেয়ার অ্যাক্ট, ১৯৮৭'-কে বাতিল করে। নতুন আইনের আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে একটি 'অধিকার' হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ে 'মেন্টাল হেলথ অথরিটি' (SMHA) গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যাদের কাজ হবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলা। আইনটি পাস হওয়ার নয় মাসের মধ্যে রাজ্যগুলোকে একটি করে 'মেন্টাল হেলথ অথরিটি' (SMHA) গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র ১৯টি রাজ্যে এই কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে 'ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম' (NMHP) চালু করা হয়। যদিও এই কর্মসূচিটি সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর কারণে সীমিত থেকে গেছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি রাজ্য তাদের বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য আলাদা বরাদ্দ রেখেছে। ২০১৭ সালে আইনটি পাস হওয়ার পর 'ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম' (NMHP)-এর জন্য বাজেট বরাদ্দ ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৩৫ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৫০ লক্ষ হয়েছিল। তবে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এই বরাদ্দ কমিয়ে ৪০ লক্ষ করা হয় এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও তা একই পর্যায়ে রয়ে গেছে।
এই গোটা আলোচনায় ভারতে বহু উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হল যা থেকে স্পষ্ট এই সমস্যাটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং সঠিক সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে একদিন মহামারীর রূপ ধারণ করতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আইন ২০১৭’ (MHCA) কিংবা সাম্প্রতিক ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’য় এই সংকটের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে যা অবিলম্বে দেখা প্রয়োজন। স্থবির বাজেট বরাদ্দ, রাজ্য স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিপুল ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’ (চিকিৎসার অভাব) প্রমাণ করে যে, ভারত ১.০৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এক আসন্ন অর্থনৈতিক ক্ষতিকে মোকাবিলা করতে চাইছে নামমাত্র আর্থিক ও পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং একটি উৎপাদনশীল ও সহনশীল কর্মবাহিনী গড়ে তুলতে হলে ভারতকে এখন নিছক চিকিৎসাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পথে হাঁটতে হবে। আর এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক স্তরে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে কুসংস্কারের দেওয়াল ভেঙে ফেলা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য বিশেভাবে কিছু পদক্ষেপ জরুরি। এদের মধ্যে কোনওরকম মানসিক সমস্যার লক্ষণ অনুধাবন করতে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে সাইকোলজিকাল কাউন্সিলর রাখা প্রয়োজন। গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলছুট রোধ করতে ও দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার লক্ষ্যে প্রতিকারমূলক কর্মসূচি, ব্রিজ কোর্স-এর মতো বিকল্প ব্যবস্থা দরকার।
সর্বোপরি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত স্তরেও সংবেদনশীল হতে হবে; চারপাশের মানুষ কিংবা শিশুদের আচরণগত পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সঠিক সময়ে চিকিৎসার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পারস্পরিক সহমর্মিতা আর সচেতনতাই পারে আসন্ন এই নীরব মহামারী রুখে দিয়ে একটি সুস্থ, সুন্দর ও উৎপাদনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।

We often ignore mental problems. Thanks to the writer for making us realize the importance of good mental health
ReplyDeleteThank you
DeleteWell written, elaborating its impact on the economy
ReplyDeleteThank you very much
DeleteA very important social issue not properly recognised and addressed. Lot of food for thought in this article.
ReplyDeleteThank you. The objective of this article is to raise awareness on mental health
DeleteMental health is a major contributor to the well being of physical health, and so for the overall being. While giving importance and priority to the mental health well being of your children, yours' is equally important and calls for urgent care.
ReplyDelete